একটি অন্বেষণে – শম্ভু মিত্র

একটি অন্বেষণে – শম্ভু মিত্র

আমরা একটা যুগসন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। স্বাধীনতার পর আমরা জাতি হিসেবে নিজেদের একটা বিশিষ্ট পরিচয় অর্জন করবার চেষ্টা করছি। যাতে পৃথিবীর অন্যান্য জাতিরা আমাদের সেই ভারতীয় বৈশিষ্ট্য উপলব্ধি করে। কিন্তু ভারতীয়ত্বের সেই বিশিষ্ট আধুনিক পরিচয় যে কী হবে তা বোধহয় এখনও আমরা সঠিক ধরতে পারিনি।

প্রাচীন ভারতবর্ষের সংস্কৃতি ও সভ্যতার বহু প্রকাশই আমাদের সকলের কাছে খুব গৌরবের। কিন্তু জীবনধারণের সেই প্রণালী আমাদের আজকের দিনের পক্ষে অসম্ভব। চেষ্টা করে সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়াও অসম্ভব। তাহলে কি আমাদের দেশের যন্ত্রশিল্প যেমন ইয়োরোপীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে বিস্তৃত হচ্ছে, তেমনিই আমাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি-আচার-ব্যবহার সবই তাদের নকলে গড়ে উঠবে? যেমন ঐতিহ্যবিহীন যে কোনও অনুন্নত জাতি ইয়োরোপীয় পোষাক থেকে ধর্ম পর্যন্ত সবই নিজেদের সমাজে মেনে নেয়? নাকি আমরা বিচার করে গ্রহণ করব ও বর্জন করব? তা যদি করি তাহলে সেই বিচারের কেন্দ্র কী? – সন্দেহ নেই, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে পারার উপরেই আমাদের ভবিষ্যৎ তৈরি হবে। এবং ইতিহাস তার রায় দেবে।

এরই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের শিল্পকর্মেরও প্রত্যেক স্তরে বহুল ও বহুধা পরিশ্রমের প্রয়োজন আছে। তার একটি কথা আমাদের এই প্রবন্ধের আলোচ্য।

নাটকে আজকাল স্বগতোক্তি থাকে না। থাকলে আমাদের দর্শকদের হয়তো অবাস্তব লাগে। সেকেলে বলে মনে হয়। অনেক অভিনেতাও বলেন যে, কাউকে উদ্দেশ্য করে কথা বলা যায়, কিংবা বুড়োবুড়িদের মতো আপন মনে একটু-আধটু বকবক করাও যায়, কিন্তু গম্ভীর হয়ে নিজের মনে কথা গড়্গড় করে বলে যাওয়া-ভীষণ অস্বাভাবিক লাগে। আবার একথাও শুনেছি যে, এতে নাট্যকারের অক্ষমতাই প্রকাশ পায়, যে কথাটা ঘটনার মধ্যে প্রকাশ করা গেল না সেটা চরিত্রের মুখ দিয়ে বলিয়ে নিয়ে সহজে প্রকাশ করে দেওয়া হল।

কিন্তু হ্যামলেটের স্বগতোক্তি সম্পর্কে আমরা জানি যে সেগুলো অক্ষমতার প্রকাশ নয়, বরঞ্চ তাতেই সত্যের আর একটা গভীরতর স্তর আমাদের কাছে উন্মোচিত হয়। বিসর্জন নাটকে জয়সিংহের স্বগতোক্তিতেও তাই মনে হয়।

অর্থাৎ এক ধরনের নাটক হয় যার মধ্যে ঘটনাই নায়ক। সেখানে ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় চরিত্রগুলো যে আচরণ করে তাতেই তাদের প্রকাশ ঘটে। কিন্তু আর এক ধরনের নাটকে – অন্তত একটা মূল চরিত্র – বাইরের ঘটনার সংঘাতে জীবনকে নতুন দৃষ্টিতে উপলব্ধি করে। এই উপলব্ধির চিন্তাস্রোত বাইরের ঘটনাগুলোকে ছাড়িয়ে এক নতুন নাটকীয় অর্থ বহন করে।

অর্থাৎ একটাতে যেন আমরা তৃতীয় ব্যক্তির মতো বাইরে থেকে একটা অনবস্থিত দেয়ালের মধ্য দিয়ে কেবল আচরণটা দেখি। আর অপরটাতে যেন নাটকের চরিত্রের নিকটবর্তী হয়ে তার subjective জগৎটার মধ্যে চলে যাই।

বাস্তবকে দেখবার এই যে objective দৃষ্টি (প্রথমোক্ত ধরনের নাটকে যেটা প্রকাশ পায়) সেটা ইয়োরোপে শুরু হয়েছিল ঐতিহাসিক কারণে। আধুনিক বিজ্ঞানের অভ্যুদয়ে। তাই সেখানে অভিনয়েও বাস্তবানুকরণ প্রচুর বৃদ্ধি পায়। বিরাট চরিত্রের অভিনয়ের চেয়ে যৌথ অভিনয়ের প্রয়াস বাড়তে থাকে। দৃশ্যপট ও মঞ্চসরঞ্জামের দ্বারা পরিবেশকেও নাটকের একটা চরিত্র হিসাবে প্রকাশ করা হতে থাকে।

এই নতুন যুগের কলাকার হিসেবে Antoine Stanislavski প্রভৃতি নাট্য প্রযোজনায় নতুন রূপ ও নতুন আস্বাদ আনলেন। (তারপরে এই যৌথ অভিনয়ের উপর আবার একটা ঝোঁক আসে রুশ বিপ্লবের পর।) কিন্তু এই নব্যরীতির সঙ্গে সঙ্গেই প্রায় এর বাঁধন কাটাবার চেষ্টাও শুরু হয়ে যায়। অর্থাৎ চেষ্টা চলতে থাকে যে, ব্যক্তিগত মানুষের গভীর ও মৌল প্রশ্নগুলো কী করে প্রকাশ হতে পারে। সমাজগত মানুষ আর ব্যক্তিগত মানুষের সমন্বিত প্রকাশ কী করে নাট্যরীতিতে সম্ভব হয়ে উঠতে পারে। আর তাই, বাস্তবানুকরণের পথে সত্যপ্রকাশের যে বাধা সৃষ্টি হয়েছে সেই বাধা ভেঙে গভীরতর সত্যপ্রকাশের একটা নাট্যরীতির অনুসন্ধান চলছে। এবং তার ফলে বলা যায় পুরোনো নাট্যরূপ যেন অনেকটাই ভেঙে গেছে। এখন Martin Esslin প্রমুখ নাট্যবিদ আশা করছেন যে Brecht ও Absurdist-দের নাট্যরূপের সমন্বয় যদি কেউ ঘটাতে পারে তাহলেই পাশ্চাত্যে নাট্যসৃষ্টির একটা সার্থক যুগ আসবে।

আমাদের দেশের পরিবর্তনের ছন্দটা কিন্তু ভিন্ন। এবং অনেক ক্ষেত্রেই বেশ কুটিল। আমরা বিজ্ঞানের সে অভ্যুদয় দেখিনি যাতে সম্পূর্ণভাবে বাস্তববাদী হয়ে উঠতে পারি নাটকে। আমাদের দৃশ্যপট বা মঞ্চসজ্জা কখনওই বাস্তবের বিভ্রম ঘটাতে পারে না। মস্কো আর্ট থিয়েটার কত যুগ আগে চেকভের নাটকের বাস্তবানুগ রূপারোপ করেছে। গাছের ফাঁক দিয়ে হ্রদ দেখা যাচ্ছে, আকাশে বিকেল থেকে সন্ধ্যা হল, নিস্তব্ধ প্রান্তরে দূর থেকে ভেসে আসা একটা নিঃসঙ্গ আওয়াজ, বৃষ্টি এমনকি ট্রেন আসা, – এরকম অনেকানেক বাস্তববিভ্রম ঘটিয়ে দর্শককে পরিবেশের মুড ও কাব্য অনুভব করিয়েছে। সে অনেকদিন আগে।

কিন্তু আমাদের দেশে পার্শি থিয়েটারে, ও তারই অনুকরণে কিছু বাংলা থিয়েটারে, অশ্বপৃষ্ঠে ওসমানের প্রবেশ হত, রাস্তার দৃশ্যে মোটরগাড়ি ঢুকত (শুনেছি কোরিন্থিয়ান থিয়েটারে নাকি ট্রাম-গাড়িও চালানো হত), মহাদেবের তৃতীয় নয়ন জ্বলে উঠত, অপ্সরীরা আকাশে উড়ে যেত, সুদর্শন চক্র ঘুরতে ঘুরতে এসে শিশুপালের শিরশ্ছেদন করত। কেদার রায় নাটকে নৌকো ক’রে সোণা-র অপহরণ, দুর্গ আক্রমণ ক’রে জ্বালিয়ে দেওয়া ইত্যাদি করতালিপ্রদ দৃশ্য ছিল। যতদূর মনে পড়ে শচীন সেনগুপ্ত মশায়ের একটি নাটকে ভূমিকম্পে মঞ্চের উপর বাড়ি ঘর দোর ভেঙে পড়ত, এবং শ্রীমনোজ বসুর একটি নাটকে প্লাবনের মধ্যে একা অহীন্দ্র চৌধুরী একটি টিলা আঁকড়ে বাঁচবার চেষ্টা করতেন আর স্টিমারের তীব্র আলো ঘুরে ঘুরে যেত। এই শেষোক্ত নাটকটায় প্লাবনের পরবর্তী অবস্থা দেখাতে একটুকরো বায়োস্কোপও দেখানো হত বলে যেন মনে পড়ছে।

অর্থাৎ আমাদের ব্যবসায়িক থিয়েটার বাস্তবরূপের কাব্যকে ফুটিয়ে তোলার পরিবর্তে কেবলই রোমহর্ষক করতালিলুব্ধ মঞ্চকৌশল ঘটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ইওরোপীয় বাস্তবানুকৃতির মধ্যে জীবনকে নাট্যরূপের মধ্যে অনুবাদ করবার যে নিষ্ঠা ছিল, যে শ্রদ্ধা ছিল, তা আমাদের মঞ্চে সম্ভব হল না। তার চেয়ে হঠাৎ এক একটা দৃশ্যে ইন্দ্রজাল ঘটানো অনেক সহজ উপায় বলে মনে হয়েছে এঁদের কাছে। এবং যখনি এর প্রাদুর্ভাব ঘটেছে তখনি বাংলা রঙ্গমঞ্চ কলাশিল্প হিসেবে দেউলে হয়ে গিয়েছে।

আর তাই বিদেশ থেকে কেউ মঞ্চাভিনয় দেখে এলে তাকে সবচেয়ে বেশি এই প্রশ্ন করা হয় – ‘ওখানে আঙ্গিক কী রকম দেখলেন? দারুণ না?’ – অর্থাৎ নাট্যাভিনয় যে একটা কলাশিল্প, তার কাছে যে আমরা কিছু গভীর কথা শুনতে চাই, এসব চিন্তা আমাদের মন থেকে কত সহজেই মুছে যায়।

অথচ আমরা সেই বাস্তবানুগ অভিনয়ের কথা শুনেছি যেখানে অভিনেতা আর অভিনেয় চরিত্রকে এক বলে প্রতীয়মান হবে।

আমরা বিরাট চরিত্র বাদ দিয়ে সামান্য সাধারণ চরিত্রসমূহের যৌথ অভিনয় সম্পর্কে উচ্ছ্বসিত লেখা পড়েছি।

আবার একক অভিনেতার অলৌকিক অভিনয় প্রতিভার কথাও শুনেছি। একথাও শুনেছি যে অভিনেতা যদি সর্বদা তাঁর অভিনেয় চরিত্র থেকে দূরত্ব বজায় না রাখতে পারেন তাহলেই দুর্বলতা। তাঁকে যেন কখনও চরিত্রটি বলে ভুল না হয়। আমরা থিয়েট্রিক্যাল থিয়েটার সম্পর্কেও এমন কোটেশন-কণ্টকিত কথা শুনেছি যে না মানবার সাহস হয়নি। আবার যা দেখে চোখে জল আসে তাকেই এত নিশ্চিত নির্ঘোষ ‘মেলোড্রামাটিক’ বলতে শুনেছি যে চোখের জলের জন্যে লজ্জা বোধ করেছি। তখন আবার subdued acting সম্পর্কে বক্তৃতা শুনে মনে হয়েছে এইটাই বোধ হয় আসল আর্ট। শেষ পর্যন্ত উদগ্রীব হয়ে খবর নেবার চেষ্টা করি যে পশ্চিম থেকে একেবারে শেষ ডাকে কী খবর এসেছে সেখানে কী বলছে। কারণ তাহলেই বুঝতে পারব যে কোনটা আমাদের ভালো লাগা উচিত।

আমাদের পরিচয়ভ্রষ্টতার এটাই তো একটা বড় কারণ এবং নিদর্শন। কিন্তু এই হীনমননকে পেরিয়ে গিয়েই তো আমাদের নিজস্ব পরিচয় জয় করে আনতে হবে। এবং সেই অভিযানে আমাদের ডুবে যেতেই হবে আমাদের দেশের বোধের গভীরে। নান্যঃ পন্থা বিদ্যতে অয়নায়।

প্রাচীন ভারতবর্ষের শিল্পকর্ম বাস্তবের অন্তর্নিহিত সত্যকে রূপ দিতে চেয়েছে, এ আলোচনা আমরা শুনেছি। সেই যুগে নাটক ও নাট্যাভিনয় আমাদের থেকে ভিন্ন এক রীতিতে মানুষের এই অন্তরঙ্গ পরিচয় মঞ্চে প্রকাশ করে কলাশিল্পের মর্যাদা পেত। এবং সে শিল্প বোধ করি উপেক্ষণীয় ছিল না।

কিন্তু নিঃসন্দেহে ভিন্ন ছিল। ভারতবর্ষের স্বর্ণযুগের নাট্যশিল্প গ্রিকদের নাট্যশিল্পের মতো সংঘাতভিত্তিক ছিল না। অথচ দুই দেশের সঙ্গেই দুই দেশের পরিচয় ছিল। ব্যবসাবাণিজ্যের আদানপ্রদানও ছিল। কিন্তু শিল্পপ্রকাশের ক্ষেত্রে এ ব্যবধান কেন? চিত্রে, ভাস্কর্যে সর্বত্রই এই পার্থক্য। আধুনিক ইয়োরোপীয় দৃষ্টিভঙ্গি বহুলাংশে গ্রিক চিন্তার দ্বারা প্রভাবিত। আর ভারতবর্ষের নানান লোকনাট্য সংস্কৃত নাট্যের দ্বারা প্রভাবিত। অত্যাধুনিক যে Ionesco তিনিও বলেন যে সংঘাত ছাড়া থিয়েটার হয় না। অথচ গুজরাতের ভাওয়াই থেকে বাংলাদেশের কৃষ্ণযাত্রা পর্যন্ত সংঘাতভিত্তিক নয়। রবীন্দ্রনাথের নাটকও সংঘাতভিত্তিক নয় সেই ভাবে। অর্থাৎ এ ভিন্নতা যেন জীবনকে দেখার ভিন্নতা। দর্শনের ভিন্নতা।

এ সকল বিশ্লেষণ আমাদের বোধহয় করতেই হবে। না করে উপায় নেই বলে। তাই আশা করি আমাদের নাট্যোৎসাহী যুবকেরা এ তত্ব অনুসন্ধানের কাজে লাগবেন।

গ্রিসীয় সভ্যতার মধ্যে তবু প্রাচ্যের সঙ্গে বহু মিল ছিল, কিন্তু পরবর্তী ইউরোপে খ্রিস্টিয় সভ্যতার সঙ্গে এ পার্থক্য আরও গভীর হয়েছে। সেটাও দর্শনের ভিন্নতা। এ দেশের দর্শনের মধ্যে ঈশ্বর ও শয়তানের দুটো চিরন্তন পৃথক সত্তা সৃষ্টি হয়নি। এখানে ঈশ্বরই ভয়ংকর। তাঁরই দয়াহীন তাণ্ডবের ফলে পৃথিবীতে সংহার আসে। তিনি কেবল পালনকর্তা নন, তিনি রুদ্রও। ভালোমন্দ উভয়েরই জন্মদাতা তিনি। তিনি সর্বপ্রজঃ।-(এই দর্শনের বৈশিষ্ট্যের কথা ঐতিহাসিক টয়েনবিও উল্লেখ করেছেন)।

এই দর্শনের ভিত্তিতে তাই সংঘাত তার শেষ কথা নয়। বিরোধের সমন্বয়ে জীবন যে একটা নতুন স্তরে উত্তরিত হয় এইটেই বোধহয় প্রকাশ পেয়েছে। কামকে অতিক্রম করে দুষ্মন্ত শকুন্তলার ভালোবাসা প্রেমে উত্তীর্ণ হয়েছে, এবং সেই সূত্রে ভরতের দেশ বলে ভারতবর্ষ তার পরিচয় পেয়েছে, এ কবি বর্ণনা এ যাবৎকাল এদেশে নন্দিত হয়ে এসেছে। রবীন্দ্রনাথের শকুন্তলা সম্পর্কে লেখাই আমাদের দিশা দেখাবার পক্ষে অমূল্য।

কিন্তু মাঝখানে এল আমাদের অন্ধযুগ। আর তারপর হল ইংরেজের আগমন।

সেই থেকে আমাদের সমাজ অতি দ্রুত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে চলেছে। আমাদের সমাজে যেন ভূমিকম্প লেগে গেল। প্রত্যেকটি স্তরে যেন শুরু হল প্রচণ্ড সংঘাত। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গেল। তার সঙ্গে সঙ্গে ভেঙে গেল একত্র বাস করার নৈতিক অনুশাসনগুলো। জীবনের কেন্দ্রে যেসব ধর্মাচরণ ছিল সেসব ভেঙে গেল। সঙ্গে সঙ্গে সামন্ত্রতান্ত্রিক প্রথায় যেসব অবাধ অধিকার ছিল উচ্চবর্ণের হাতে সেসবও হারিয়ে গেল। মেয়েদের এক বিবাহের শাসন উড়ে গেল। কী না গেল! এমন কী ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার আগে পর্যন্ত যে শ্রেণীবিন্যাস ছিল এখন তাও আমাদের চোখের সামনে কত দ্রুত পরিবর্তিত হয়ে যাচ্ছে। এবং এই প্রত্যেকটা পরিবর্তনের মধ্যে যে কঠোর সংঘাত, যে কঠিন সংগ্রামের ইতিহাস রয়েছে, সে সমস্তেরই অনুভব আমাদের চেতনায় এসেছে। সুতরাং সেই স্বর্ণযুগের সংস্কৃত নাটকের মধ্যে আমাদের মন আর মুক্তি পাচ্ছে না। আমরা সংঘাত আর আলোড়ন দেখতে চাচ্ছি আমাদের নাটকে। অথচ এখনও মণিপুরী নাচ, বা রবীন্দ্রনাথের গান বা ওইরকম কোনও স্থির শান্ত তদগতভঙ্গি রসের প্রকাশ দেখলে আমরা মুগ্ধ ও আবিষ্ট না হয়ে পারি না। আমাদের যে নাড়ির মধ্যে আকাঙ্ক্ষা রয়েছে সেই সুছন্দ শান্তির। আমরা যে জানি রুদ্রের দক্ষিণ হস্তেই বরাভয়। তাঁর একমুখে পালন একমুখে ধ্বংস। আমাদের ধর্ম তো ইয়োরোপীয় religion নয়। আমরা নিরীশ্বর ন্যায়শাস্ত্রের কথাও জানি। সাংখ্য জানি, বৌদ্ধ-ন্যায় জানি। নাড়ির মধ্যে এইসব অনুভব নিয়েই তো আমরা ভারতীয়। কিন্তু আমরা সেতুস্থাপন করতে পারছি না। আমাদের নিজেদেরই সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের পথ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।

কেবল একজন নাট্যকার এই সংঘাতের মধ্যে থেকেও সেই স্বর্ণযুগের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন করতে পেরেছেন। তিনি রবীন্দ্রনাথ। তাঁর নাটকে আমরা আধুনিক সমাজের কাহিনি পাই, কিন্তু ইয়োরোপীয় ভঙ্গিতে নয়। তাই তো বিদেশি নাট্যশাস্ত্রীদের এত অসুবিধে হয় তাঁকে বুঝতে। তাই তো John Gassner কত সহজে এক লাইনে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় দিতে পেরেছেন যে – Tagore proved to be a cross between Maeterlinck and a Hindu Sage. (Theatre in our times)

অথচ আমরা জানি যে রবীন্দ্রনাথের নাটক কী পরিমাণ অনুপ্রাণিত করে আমাদের, কী ভীষণ ভালো নাটক বলে মনে হয় সেগুলোকে – তাই তো অনেক সময় আমার মনে হয় যে আমাদের সংস্কৃতি যে গভীর রূপটি আছে – যেটি যেমন সরল তেমনি sophisticated – রবীন্দ্রনাথের বোষ্টমির মতো – সেটা সাহেবদের পক্ষে বোঝা যেন সহজ নয়। সাহেবদের শিষ্যদের পক্ষেও।

‘রক্তকরবী’ আধুনিক সমাজের যন্ত্রসভ্যতার কাহিনি। এই সভ্যতা নিজের মধ্যে যে বিরোধের জন্ম দিচ্ছে সেই সংঘাতের প্রকাশ আছে এই নাটকে। ‘মুক্তধারা’তেও এক আধুনিক কাহিনি। অথচ ইয়োরোপীয় নাটকের রূপ নয় এদের। বাস্তবানুসৃত যে চরিত্রাঙ্কন পদ্ধতি তা একেবারেই অবলম্বন করা হয়নি এই সমস্ত নাটকে। অথচ অভিনয় করলে বুঝতে পারি যে এর বহু চরিত্রের বহু জায়গাটাই ভীষণ বাস্তব। এর কৌশলটা কী?

একটা কৌশল হল ভাষা। এই ভাষাটা বাজারচলিত ভাষা নয়। যেমন, ধরা যাক একটা জায়গা – কিশোর বলে; ‘একদিন তোর জন্যে প্রাণ দেব নন্দিনী, এই কথা কতবার মনে মনে ভাবি।’

এই ভাষা বলে অভিনয় করতে আমাদের বহু অভিনেতারই বিশেষ অসুবিধে হয়। মনে হয় এটা অনুভব হয়তো কিশোর করতে পারে, কিন্তু সে কথাটা এমন করে বলতে পারে কি কেউ? অর্থাৎ অন্তরের অনুভূতির প্রকাশ হিসেবে এটা ঠিক, কিন্তু উচ্চারিত সংলাপ হিসেবে ঠিক নয়। এভাবে কথা বলতে গেলে যে ন্যাকা ন্যাকা শোনায়। – এই চিন্তা মনের মধ্যে থাকে বলেই রবীন্দ্রনাথের নাটকের ভাষা বলতে আমাদের এত কষ্ট হয়।

কেন যে আমাদের দৈনন্দিন ভাষা এত পরুষ হয়েছে, কেন যে আমরা আমাদের অনুভবের কথা সহজভাবে, উন্মুক্তভাবে বলতে পারি না, সে আলোচনা এড়িয়েই আমরা বলতে পারি যে, কোনও উপায়ে যদি এই Uninhibited উন্মুক্তভাব প্রকাশ করতে পারি তাহলে কি সেটা কিশোরের অন্তরঙ্গ প্রকাশ হবে না।

‘চার অধ্যায়’ অভিনয়কালেও আমরা দেখেছি যে প্রেমের মুহূর্তে ওই ধরনের কথা আমরা কেউ বলি না। ‘আলো কমে গিয়েছে, এসো আরও কাছে এস। আমার চোখ দুটো এসেছে ছুটির দরবারে তোমার কাছে। একমাত্র তোমার কাছেই আমার ছুটি। অতি ছোট তার আয়তন…’ । কিংবা …’এই যা দেখছি এইটিই আশ্চর্য সত্য, এর মানে কী, কাউকে বুঝিয়ে বলতে পারব না, কোনও এক অদ্বিতীয় কবির হাতে ধরা দিতে পারল না বলেই এর অব্যক্ত মাধুর্যের মধ্যে এত গভীর বিষাদ।’

বলি না ঠিকই। কিন্তু আমাদের মনের গভীরে যে প্রেমের আবেগ আমরা অনুভব করি তার যদি কোনও ভাষা থাকত তাহলে সে হয়তো এই ভাষা। যে ভাষায় আমরা কথা কইতে পারি না, কিন্তু যেটা আমাদের অন্তরের আবেগের ভাষা, সেইটাই তো কবিতা। সেই ভাষা যিনি আমাদের শোনাতে পারেন তিনিই তো কবি।

তাই অভিনয়টাই এমনভাবে করা দরকার যাতে অন্তরের আবেগের কাব্য অবলীলায় প্রকাশ পায়। এবং সেটা কেবল naturalistic ভঙ্গিতেই চেষ্টা করলে আমরা পারব না। চেষ্টা করতে হবে, তারই সঙ্গে যেন অন্তরের কতাগুলোও অতি সহজে অনর্গল হয়ে প্রকাশ পায়। অর্থাৎ এই দুটো স্তরে সঞ্চরণ খুব যেন সহজে হয়। বাইরের জীবন আর অন্তর্জীবন দুটোই যেন গায়ে গায়ে মিশে অঙ্গাঙ্গীভাবে বর্তমান থাকে। ঠিক যেমন আগেকার দিনের নাটকে হ্যামলেটের পক্ষে স্বগতোক্তিতে চলে আসাটা একেবারে নির্বাধা ছিল।

এই বোধ নিয়ে যদি আমরা রবীন্দ্রনাটক অভিনয়ের চেষ্টা করি তাহলে দেখব যে আধা-রিয়ালিস্টিক ছাঁচে লেখা নাটকগুলো আমরা যেভাবে অভিনয় করি সেভাবে রবীন্দ্রনাথের নাটকে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করা যায় না।

আমাদের অভিজ্ঞতায় আমি দেখেছি যে ছেলেদের যদি তিক্তভাবে রাগারাগি করার দৃশ্যে অভিনয় করতে দেওয়া হয় তাহলে তারা অতি সহজেই সে অভিনয় করে দিতে পারে। মেয়েরাও ঠিক সেই রকম। কলহের দৃশ্য হলে প্রায় কিছু দেখাতেই হয় না। (তাই বুঝি ট্রামে বাসে প্রাত্যহিক কলহের মধ্যে আমাদের বঙ্গসংস্কৃতি অমন করে প্রকাশ পায়)। কিন্তু যদি গভীর অনুভবের কথা বলতে হয়, যদি প্রেমের কথা সহজভাবে বলতে হয়, তাহলে ওই কলহপটুতার তিক্ত কণ্ঠস্বরে তো সেটা হবে না। যে ভালোবাসে তার কণ্ঠস্বরে মিষ্টতা লাগে, সুর লাগে, কাব্য আসে। অত্যন্ত চেনাজানা সাদাসিধে পাঁচীও যখন প্রেমে পড়ে তখন তার চোখে কটাক্ষ আসে, দেহের ভঙ্গিমায় কাব্য আসে। এইটাই তো প্রকৃতির কীর্তি। সেই জন্যেই তো প্রেমে পড়া ছেলেমেয়েরা যেন আহ্লাদে সর্বক্ষণ খুশি হয়ে থাকে। তাদের দেখলেও তখন অত ভালো লাগে।

কিন্তু সেই কাব্যের প্রকাশ করতে গেলে ঝংকার থাকা চাই কণ্ঠে। কবিতায় যেমন প্রত্যেকটি কথা কী একটা রসে টসটস করে, যাতে সে নিজেকে ছাড়িয়ে আরও অনেক কিছু যেন প্রকাশ করে, এ কণ্ঠও সেইরকম রসাভিষিক্ত হওয়া চাই নাকি?

কিন্তু কথাটা কেবল প্রেমপ্রকাশের কথা নয়। কিশোর কেবল প্রেমপ্রকাশ করছে না। কথাটা হল আদ্যোপান্ত মানুষটাকে প্রকাশ করার। কিশোরের অন্তরটাকে অন্তরঙ্গভাবে প্রকাশ করার। তাই আমাদের সেই কণ্ঠের দরকার হয়, সেই ভঙ্গির দরকার হয়, যাতে আমরা অত্যন্ত সহজভাবে আমাদের মনের অনুভব প্রকাশ করতে পারি। এবং সেই চেষ্টা করলে আমরা দেখতে পাব যে-চরিত্রের কতখানি বলিষ্ঠতা থাকলে তবে মানুষ এত সহজে নিজেকে অনর্গলিতভাবে প্রকাশ করতে পারে। তখন বুঝতে পারব যে, এটা ন্যাকা-র কার্য নয়। এই সরলতা হল গভীর Sophistication-এর ফলস্বরূপ।

এটা খালি কিশোরের কথা নয়, প্রেমের কথাও নয়। এটা হল আমাদের নাট্যাভিনয়ে আমরা কেমন করে চরিত্রগুলোর বহির্জীবন আর অন্তর্জীবন একই সঙ্গে প্রকাশ করতে পারি সেইটে বোঝবার একটা প্রয়াস। আমাদের নাট্যপ্রচেষ্টার একটা নিজস্ব পথ খুঁজে পাওয়ার কথা, আমাদের একটা নিজস্ব পরিচয় লাভ করার কথা। এবং সে চেষ্টা যদি এখনি সাহেবগ্রাহ্য না হয় তাতেও কিছু না এসে যাওয়ার কথা।

আমাদের দেশের ভালো নাটক বলতে প্রথমেই নাম করতে হবে রবীন্দ্রনাথের। এবং সে নাটক অ্যাকশন নির্ভর নয়। যদি আমরা একটু মনোযোগের সঙ্গে পড়ি তাহলে দেখব ‘রক্তকরবী’তে মেজ সর্দারের ওই অত্যল্প ভূমিকার মধ্যেও কী স্পষ্টভাবে একটা মানুষ প্রকাশ পেয়েছে। কেন যে সে মানুষটার নাচওয়ালি আর বাজনাদারদের রওনা করে দিতে বেশি আগ্রহী, কীভাবে যে সে নিজের সম্বন্ধে বলে -‘রক্ত শুকিয়ে এলেই বালাই থাকবে না। এখনও সে আশা আছে’, এসব যেন স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। এই রকম একটা নতুন ধরনের চরিত্র এত স্বল্প জায়গার মধ্যে প্রকাশ করার আর কোনও উদাহরণ আমার জানা নেই। তেমনি ‘মুক্তধারা’র প্রত্যেকটি ছোট ছোট চরিত্র, তেমনিই ‘রাজা’র। সবাই অত্যন্ত বাস্তব।

এই প্রকাশ পদ্ধতিকে আত্মসাৎ করে যদি আমরা আমাদের যুগকে প্রকাশ করতে পারি, তবেই আমরা আমাদের বিশিষ্ট পরিচয় খুঁজে পাব। এবং তার ওপরেই আমাদের আত্মসম্মান থাকবে। সেকাজ কেবল রবীন্দ্রনাথের দোহাই দিয়েই হবে না। কারণ তিনি তো আমাদের পথের শেষ নন, তিনি আমাদের পথের পাথেয়। আমাদের মহার্ঘ দিশারী।

এবং এর জন্যে আমাদের বহু পরিশ্রমের প্রয়োজন। কারণ আমরা এখনও কেউ জানি না যে আমাদের নাট্যাভিনয়ের সেই বিশিষ্ট ভারতীয় রূপটি কী হবে।

৩য় বর্ষ ৫-৬ সংখ্যা

(শারদীয় ১৩৭২)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *