কার্ল হাইনরিখ মার্কস – মুরারি ঘোষ

কার্ল হাইনরিখ মার্কস – মুরারি ঘোষ

রাইন উপত্যকায় মোজেল নদের দক্ষিণ তীরে প্রাশিয়ার এক প্রাচীন শহর ট্রিয়ের। এই শহরে ১৮১৮ খ্রিস্টাব্দের ৫ মে কার্লের জন্ম ; পুরো নাম কার্ল হাইনরিখ মার্কস। কার্লের বয়স যখন ছয় তখন এই ইহুদি পরিবার ধর্ম ত্যাগ করে খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে। কার্লের পিতা হার্শেল লেভি নতুন নাম গ্রহণ করলেন হাইনরিখ মার্কস। তখনকার ইহুদি সমাজের নানা গোঁড়ামি ও সংকীর্ণতাই এই ধর্মত্যাগের কারণ। কার্লের মায়ের নাম হেনরিয়েটা, তাঁর আটটি সন্তান। কিন্তু শেষপর্যন্ত জীবিত ছিলেন কার্ল ও তাঁর তিন বোন সোফি, এমিলি ও লুইজি। স্থানীয় উচ্চ বিদ্যালয়ে মার্কসের লেখাপড়া শুরু হয়। তাঁর বাল্যজীবন সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানা যায় না। গণিত, ধর্মশাস্ত্র ও সাহিত্য বিষয়ে তাঁর বিশেষ আকর্ষণ ছিল। প্রবন্ধ রচনায় পারদর্শিতা অর্জন করেছিলেন কিশোর বয়সেই। ছাত্রজীবনে তাঁর শ্রমশীলতা ছিল উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য ও শিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহের কথা সুবিদিত। এ ব্যাপারে কার্লের পিতা, ও বিশেষত তাঁর পিতৃবন্ধু লুডভিক ফন ভেস্টফালেনের প্রভাব স্মরণীয়। উচ্চ পর্যায়ের সরকারি কর্মচারী ভেস্টফালেন ছিলেন শিক্ষায় ও মতামতের ঔদার্যে সেই শ্রেণীর প্রতিনিধি যাঁরা উনিশ শতকের প্রথম দিকে জার্মানির সমস্ত প্রগতিমূলক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন গ্যয়টে, শিলার ও হোল্ডারলিনের প্রত্যক্ষ প্রভাব যাঁদের জীবনে, যাঁরা দান্তে-হোমার-শেকসপিয়র ও তৎসহ গ্রিক নাট্যকারদের সৃষ্টিতে আকণ্ঠ আপ্লুত। এই ভেস্টফালেনের কাছেই ইসকাইলাস, শেকসপীয়র ও সার্ভেন্টিসের সঙ্গে কার্লের প্রথম পরিচয়। বিদ্যালয়ের শেষ কয়েক বছর এইভাবে মূল্যবান ও মনোরম অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে নিজের রুচি ও মানসিকতা গঠন করার সুযোগ পেয়েছিলেন। মার্কস তাঁর ডক্টরেট থিসিস ভেস্টফালেনকেই উৎসর্গ করেন। আর ভেস্টফালেনের কন্যা-ট্রিয়েরের শ্রেষ্ঠ সুন্দরী-জেনিকে পরবর্তী জীবনে মার্কস বিবাহ করেছিলেন।

সতেরো বছর বয়সে মার্কস বন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলেন। আঠারো বছর বয়সে মার্কসকে কিছুটা অস্থিরচিত্ত ও সাময়িক দোদুল্যমান মনের অধিকারী মনে হয়, কিছুটা বহির্মুখীও। একদিকে শ্লেগেলের কাছে হোমারের পাঠ, গ্রিক ও লাতিন কবিতার আস্বাদ গ্রহণ, জুরিসপ্রুডেন্স ও পলিটিকাল ইকোনমি অধ্যয়ন, অন্যদিকে জেনির প্রতি নবোন্নেষিত অনুরাগ।

মার্কসের চেয়ে জেনি চার বছরের বড় – তার দিদি সোফিয়ার সখী। জেনির পিতা বিত্তশালী, সে তুলনায় মার্কস দরিদ্রসন্তান। তাই প্রেমের পথ মসৃণ ছিল না। অবশ্য কঠিন আদর্শবাদী ও পরিশীলিত মননের অধিকারী ছিলেন মার্কস সেই কৈশোর থেকেই। আর জেনি ছিলেন চিরদিন তাঁর প্রেরণাদাত্রী।

পিতার পরামর্শে বন থেকে মার্কস যোগদান করলেন বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে। এখানে তখন দার্শনিক হেগেলের রাজত্ব। তাঁর পদতলে বসে যাঁরা শিক্ষা সমাপ্ত করেছেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন লুডহিবগ ফয়েরবাখ, ডেভিড স্ট্রাউস, ব্রুনো বাউয়ের। পিতার ইচ্ছা মার্কস আইনশাস্ত্রে পারঙ্গম হবেন। আইন তখন জার্মানির ছাত্রদের কাছে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার রাস্তা খুলে দিয়েছে। সরকারি কাজে কর্মে আইনজ্ঞ ছাত্রদের বড় চাকরি বাঁধা থাকত।

মার্কস আইন পাঠে মন দিলেন, কিন্তু মন পড়ে রইল দর্শনে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের পাঠ্যবস্তুতে। বার্লিনে মার্কসের শিক্ষাজীবন এমন কিছু উজ্জ্বলতর হল না। এখানেই পরিচয় হল তরুণ হেগেলপন্থী বন্ধুদের সঙ্গে। হেগেলপন্থী তরুণ বুদ্ধিজীবীদের সংগঠন ছিল (DOKTOR KLUB)। র্যাডিকাল চিন্তাধারায় বিশ্বাসী তরুণ বুদ্ধিজীবীরা মিলিত হতেন এখানে। হেগেলের শিষ্য বলেই নিজেদের তাঁরা পরিচয় দিতেন।

শুধু এই তরুণ বুদ্ধিজীবীরাই নয়, প্রায় সমস্ত জার্মানিই তখন হেগেলীয় দর্শনে প্রভাবিত। হেগেলের দর্শনকে জার্মান সরকার রাষ্ট্রীয় দর্শন হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। হেগেলের অনুজ্ঞার অংশবিশেষ সরকারি কার্যাবলির সমর্থনে সুযোগমতো লাগিয়ে জার্মান রাজতন্ত্রের সমর্থক জমিদারতন্ত্র ও সেনেট সরকারের দমননীতির একটা স্থায়ী ব্যাখ্যা তৈরি রেখেছিলেন।

প্রচলিত ব্যবস্থাকে দর্শনের পদ্ধতি দিয়ে সমর্থন করে হেগেল জার্মান রাজতন্ত্রকে বাঁচাবার হাতিয়ার জুগিয়েছিলেন। কিন্তু হেগেলীয় দর্শনের গতিময়তার দিকটি রক্ষণশীলদের কাছে পরিত্যক্ত ছিল। কেননা হেগেল বলেছিলেন যে কোনও এক সময়ে বাস্তব অবস্থা অবাস্তব হয়ে যেতে পারে, তখন তার অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। এমনিভাবে বিলুপ্ত হয়েছে ফরাসি রাজতন্ত্র। ফরাসি রাজতন্ত্রের যতদিন অস্তিত্ব ছিল ততদিন সেই অস্তিত্বের পেছনে যুক্তি ছিল।

হেগেলের দর্শনের মধ্যে স্পষ্ট দুটি ধারা দেখা যায়। একটি ধারায় দেখি বাস্তব অবস্থা যে কোনও উপায়ে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা। অপরদিকে বাস্তব অবস্থার পরিবর্তনে জগৎসংসারের গতিময়তার ব্যাখ্যা স্বীকার করা। শেষাক্ত বৈপ্লবিক দিক তরুণ হেগেলপন্থীদের আকর্ষণ করেছিল। বার্লিনে এঁদেরই নেতা ব্রুনো বাউয়ের, কোপ্পেন, স্ট্রাউস, ফয়েরবাখ। জার্মান রক্ষণশীলতার যথাযথ বিরোধিতা এল এঁদের কাছ থেকেই।

প্রচলিত ধর্ম ও সামাজিক রীতিনীতির বিরোধিতায় যখন হেগেলপন্থীরা তাঁদের বক্তব্যে শান দিচ্ছেন তখনই মার্কস এসে পড়লেন তরুণ হেগেলীয়দের সংগঠনে। আর্নল্ড রুগে-র সম্পাদনায় তরুণ হেগেলীয়দের মুখপত্র হ্যালে বার্ষিকী (Hallische Jahrbuche) প্রকাশিত হল (১৮৩৮)। এই পত্রিকাটি জন্মমাত্রেই প্রচলিত রাজনীতি ও সমাজনীতির বিরোধিতা শুরু করল। বাউয়ের ও কোপ্পেনের সঙ্গে মার্কসও সংকলনে লেখা শুরু করলেন। পরিচয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই বাউয়ের মার্কসের মনীষার যথাযথ পরিচয় পেলেন। বিশ বছরের এই ছাত্রটিকে তখনিই দলের নেতৃত্বের মর্যাদা দিতে হল। আর সে মর্যাদার মূল্য দিতে মার্কস দ্বিধা করলেন না।

খ্রিস্টান গসপেলের প্রথম সমালোচনা করেছিলেন স্ট্রাউস। পরে আরও কঠিন সমালোচনায় বাউয়ের তৎপর হয়ে উঠেছিলেন। বাউয়ের বললেন বাইবেলীয় গল্প-গাথার কোনও ঐতিহাসিক ভিত্তিই নেই। ওগুলি নিছক গল্প-খ্রিস্টধর্মের উৎপত্তি ঈশ্বরের বা যিশুর কোনও লোকোত্তর মহিমায় নয়। বাউয়ের তখন বন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। স্বভাবতই তিনি কর্তৃ পক্ষের বিষনজরে পড়লেন। কিন্তু মার্কসের সঙ্গে বিচ্ছেদ বাউয়ের চান না, বাউয়ের পরামর্শ দিলেন মার্কস পড়াশোনা শেষ করে ‘ডক্টরেট’ ডিগ্রি নিয়ে বন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনার চাকরি গ্রহণ করুন, বন থেকে দু’জন র্যাডিকাল মতামতের এক সাময়িকপত্র বার করবেন।

এদিকে মার্কসও বিদ্রোহী হেগেলপন্থী রূপে র্যাডিকাল মতামত ও নাস্তিকবাদে দীক্ষা নিয়েছিলেন। গবেষণাগ্রন্থে দার্শনিক মতামতে মার্কস নিজস্ব প্রত্যয় থেকে এক তিলও নেমে আসতে রাজি নন। অথচ বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কসের গবেষণাকর্মে পরীক্ষক হবেন তাঁর মতামতের চূড়ান্ত বিরোধীরাই। বিশ্ববিদ্যালয় বদল করে ১৮৪১ সালে মার্কস জেনা থেকে স্নাতকোত্তর গবেষণার ডিপ্লোমা পেলেন।

মার্কসের বিষয় ছিল ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দার্শনিক চিন্তার পার্থক্য। মূলত ধর্মতত্ব ও ধর্মের সামাজিক ভূমিকা নব্য-হেগেলবাদী মার্কসকে বস্তুবাদী গ্রিক দার্শনিক ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দর্শনের দিকে আকৃষ্ট করে। হেগেলবাদে দার্শনিক অনুভাবনা ও ঈশ্বরতত্বের মধ্যে যে অসামঞ্জস্য রয়েছে নব্য হেগেলপন্থীদের সেকালে তাই ছিল বিতর্কের বিষয়। সম্পূর্ণ বস্তুগত ধারণায় ঈশ্বরকে নামিয়ে আনার চেষ্টা ইয়োরোপে প্রথম দেখা যায় ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের চিন্তায়।

নব্য-হেগেলবাদীরা যখন নিছক ধর্মতত্বের মধ্যে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির প্রয়োগে মগ্ন রয়েছেন মার্কস তখন চূড়ান্ত বস্তুবাদের সঙ্গে ধর্মতত্বের সংযোগ ও বিরোধিতার ব্যাখ্যা রচনায় মন দিলেন। আর স্বাভাবিক কারণেই মৌলিক স্রষ্টাদের দিকে মার্কসের দৃষ্টি পড়ল-গ্রিক বস্তুবাদের দুই উদ্ভাবক ডিমোক্রিটাস ও এপিকিউরাসের দর্শনে।

ডিমোক্রিটাস বলেছেন শূন্য থেকে কোনও কিছুর উৎপত্তি হতে পারে না – কোনও কিছুই একেবারে ধ্বংস হয়ে যায় না, এক অবস্থা থেকে আরেক অবস্থায় রূপান্তর ঘটে এবং বিনা কারণে ও বিনা প্রয়োজনে কোনও কিছু ঘটে না। জগতের আদিতে রয়েছে পরমাণু, পরমাণু থেকেই জগতের সবকিছুর উৎপত্তি। পরমাণু সকল সময়ে গতিশীল। তবে পরমাণুর গতির পেছনে প্রকৃতিগত কারণ রয়েছে। পরমাণুর সবকিছুই প্রাকৃতিক কারণে নিয়ন্ত্রিত। যেহেতু পরমাণু দ্বারা মানুষের জীবন গঠিত, মানুষের জীবনও প্রাকৃতিক কারণে নিয়ন্ত্রিত। পরমাণুর স্বাধীন ইচ্ছা নেই, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা নেই।

এপিকিউরাস এই পরমাণুবাদ গ্রহণ করলেও বিপরীতভাবে পরমাণুর স্বাধীন ইচ্ছার স্বীকৃতি দিয়েছেন। আরও দেখিয়েছেন যে মানুষের জীবন স্বাধীন ও স্ব-ইচ্ছায় চালিত। প্রকৃতির অনড় ও অবিচল নিয়মের অসহায় ক্রীড়নক হিসেবে তিনি মানুষকে দেখেননি। মানুষ আপন ইচ্ছায় জীবনকে পরিবর্তিত করতে পারে। পরমাণু দিয়ে গঠিত ঈশ্বরের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা দিয়ে ডিমোক্রিটাস ধর্মতত্বের লোকোত্তর মহিমা স্বীকার করেন না। ডিমোক্রিটাসের এই ব্যাখ্যা এপিকিউরাস গ্রহণ করেছেন। এপিকিউরাস আরও এগিয়ে এসে বলতে চেয়েছেন মানুষের কোনও ব্যাপারে দেবতারা হস্তক্ষেপ করেন না। মানুষের ইচ্ছা ভগবানের দ্বারা পরিচালিত নয়। ডিমোক্রিটাসের প্রত্যয় থেকে মুক্ত করে এপিকিউরাস মানুষকে স্বাধীন ভূমিকায় প্রতিষ্ঠা দিলেন।

মানুষের ইচ্ছার পরবশ্যতা বা জড়ত্ব মার্কসের কাছে স্বীকৃত তথ্য নয়। মার্কসের কাছে মানুষ চিরকালই আপন ভাগ্যবিধাতা। এই কারণেই নানা প্রসঙ্গে ডিমেক্রিটাসের প্রতি বিরূপ মার্কসের উৎসাহ দেখা গেছে। তুলনায় এপিকিউরাস মার্কসের প্রত্যয়ে আরও গ্রহণযোগ্য। যে সময়ে এই তত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত যে, দেবতা বা ঈশ্বর মানুষের ভাগ্যের সিঁড়ি তৈরি করে দেয়, সেই কালে মার্কস প্রচণ্ড ঘৃণা ছড়িয়ে বলেছেন ‘যত দেবদেবী আছে সকলকেই আমি ঘৃণা করি।’ গবেষণা গ্রন্থের ভূমিকার একাংশে মার্কসের এই উক্তি।

ধর্মতত্বের লৌকিক ব্যাখ্যা থেকে মার্কস সরাসরি চলে এসেছেন বস্তুজগতের প্রগতিবাদে, যেখানে মানুষ স্বয়ং আপন ভাগ্যনির্মাতা। এ ব্যাপারে মার্কস কিন্তু হেগেলীয় ডায়ালেকটিকসের সাহায্য গ্রহণ করেননি। মোটামুটি বস্তুবাদী ডায়ালেকটিকসের রীতিনীতি মার্কসের আপন ব্যাখ্যায় যুক্তি জুগিয়েছে। একেবারে নিজস্ব পন্থায় মার্কস বলতে চেয়েছেন ধর্ম নয়, ঈশ্বর নয়, দর্শন থেকেই মানুষ আপন ভাগ্যপরিবর্তনের রসদ জোগাড় করে নেবে। দর্শন থেকেই আসবে বাস্তব জগৎ সম্পর্কিত ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি-যার শক্তিতে মানুষ জীবন ও জগৎকে প্রয়োজনমতো বদলে নিতে পারবে। মনোগত চেতনা থেকে জন্ম নেবে জাগতিক বিদ্রোহ। দর্শন যেন পুরাণের প্রমিথিয়ুস – স্বর্গ থেকে আগুন চুরি করে এনে মানুষের জীবনে বিল্পব এনে দেবে। গবেষণা গ্রন্থের মুখবন্ধে মার্কস বিদ্রোহী প্রমিথিয়ুসের এই উল্লেখ রেখেছেন। কিন্তু তখন কে জানত, মার্কস নিজেই আধুনিক কালের প্রমিথিয়ুস, যিনি একদিন পুরাণের দুরন্ত প্রমিথিয়ুসের মতো ভাগ্য জয় করার চিরকালীন হাতিয়ার মানুষের হাতে তুলে দেবেন।

মার্কসের পি এইচ ডি ডিগ্রি লাভ হল। কিন্তু কতকগুলো ঘটনা ইতিমধ্যে ঘটে গেল যা প্রত্যাশিত ছিল না। খ্রিস্টধর্মের সমালোচনা করে বাউয়ের-এর দ্বিতীয় বই প্রকাশিত হলে লেখকের উপর শিক্ষাজগতের রোষ বেড়ে গেল। বন থেকে বাউয়ের-এর চাকরি গেল। এমনকি বাউয়ের-এর শিক্ষকতার অধিকারও কেড়ে নেওয়া হল। ফলে শুধু বাউয়ের নন, মার্কসও চোখে অন্ধকার দেখলেন।

মার্কসের সামনে একটাই পথ খোলা রইল সাংবাদিকতা। ছাত্রজীবনেই সাংবাদিকতায় মার্কসের দীক্ষা হয়েছিল। রুগে-র সম্পাদনায় তরুণ হেগেলপন্থীদের মুখপত্র হ্যালে বার্ষিকী-তে। রুগে-র পত্রিকা জন্মের আড়াই বছর বাদে বন্ধ হয়ে যায়। রুগে ড্রেসডেনে গিয়ে নতুন সাময়িক পত্রের জন্ম দিলেন – ‘ডয়েশ্চে ইয়ারবুখের’। মার্কসের একাধিক আলোচনা ডয়েশ্চে ইয়ারবুখের-এ প্রকাশ পেয়েছিল। কিন্তু বছর ঘুরতে না ঘুরতেই প্রাশিয়ান সরকার পত্রিকার কণ্ঠরোধ করলেন।

একটি কী দুটি পত্রপত্রিকার প্রকাশ বন্ধ করে নতুন যুগের চিন্তাধারা রোধ করা যায় না। নব্য হেগেলীয়বাদীদের রাজনৈতিক মতামত ততদিনে পরিণত আন্দোলনের রূপ নিয়েছে। রাইনিশে ৎসাইটুং পত্রিকায় নব্য-হেগেলীয়বাদীরা এসে জড়ো হলেন। এলেন মার্কস, বাউয়ের, কোল্লেন, ম্যাকস স্টার্নার, হেস, হারহেবগ। পত্রিকা আরম্ভেব দশমাস পর রাইনিশে ৎসাইটুং পত্রিকার সম্পাদকের পদ গ্রহণ করলেন মার্কস।

দায়িত্ব পেয়ে মার্কসের কলম আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। তাঁর চিন্তা তখন প্রখর রাজনীতির দিকে বাঁক নিয়েছে। এই রাজনীতি প্রতিবাদমুখর ছিল সরকারি অব্যবস্থা, নিপীড়ন আর দমননীতির বিরুদ্ধে। মার্কসের হাতে পড়ে পত্রিকার সরকারবিরোধী রূপ আরও তীব্র হয়ে উঠল। সরকারি সেন্সরশিপের বিরোধিতা, ডায়েটের রাজনীতির সমালোচনা, মোজেলের আঙুরচাষিদের সমস্যা, দরিদ্র অরণ্যবাসীদের কাষ্ঠসংগ্রহের অধিকার ইত্যাদি মার্কসের লেখনীতে তীব্রভাষায় মুখর হয়ে উঠল। ১৮৪৩-এর মার্চ মাসে পত্রিকার কণ্ঠরোধ করা হল, মার্কসের চাকরি গেল। মনে রাখতে হবে নিষ্কলুষ মানবতার প্রেরণাই তখন মার্কসকে চালিত করেছিল – তখনও কোনো তত্ব বা বিশেষ কোনো দার্শনিক চিন্তার প্রেরণায় মার্কস উদ্বুদ্ধ হয়ে ওঠেননি, শুধু সাধারণ নীতিবোধের ভিত্তিতে দুস্থ সাধারণ মানুষের প্রতি সমবেদানায় সরকারি দমননীতির সমালোচনা করে এসেছেন।

এইবার নতুন উদ্যমে পড়াশোনা করতে গিয়ে মার্কস সাক্ষাৎ পেলেন সাঁ সিম-র প্রুধোঁ-র। ফরাসি সমাজতান্ত্রিকদের চিন্তার বিশেষত্ব তাঁর চোখে পড়ল। এরই মধ্যে এক সমৃদ্ধ জীবনদর্শনের নাতিস্পষ্ট আভাস তিনি পেলেন।

ইতিমধ্যে জেনির পিতৃদেব ব্যারন ভেস্টফালেন পরলোকগমন করেছেন। তাঁর অবর্তমানে অনেক বাধা অতিক্রম করে মার্কস জেনিকে বিবাহ করলেন। এর পর দু’জনে চলে গেলেন ফরাসি দেশে- পারিতে।

পারিতে তখন তরুণ বুদ্ধিজীবীদের মেলা বসেছে। বার্লিনে বা বনে যা সম্ভব নয়-পারিতে তা সম্ভব। মার্কস ও রুগে দুজনেই পরিকল্পনামতো পারিতে গিয়ে হাজির হলেন। হাইনে, বাকুনিন, কাবে-র মতো তরুণ বুদ্ধিজীবীরা তখন ফ্রান্সের চিন্তাজগৎ উজ্জ্বল করে রয়েছেন। পত্রিকা বেরুলো-নামকরণ হল, ডয়েশ্চে ফ্রানৎসোসিশ্চে ইয়ারবুখেব। লেখকগোষ্ঠীর মধ্যে অনেককেই পাওয়া গেল-মার্কস, রুগে, হাইনে, বাকুনিন, হারহেবগ, ফয়েরবাখ। আর একটি নতুন শক্তিশালী লেখকের সাক্ষাৎ মিলল- ফ্রিডরিশ এঙ্গেলস।

পত্রিকাটি কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হল না। কারণ, প্রথমত অর্থিক সংগতি ছিল না। দ্বিতীয়ত সম্পাদক দু’জনের মতের অমিল দেখা গেল। মার্কস যখন সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারায় আচ্ছন্ন হতে চলেছেন, রুগে উলটোপথ নিলেন, ধীরে ধীরে সমাজতন্ত্রের শত্রুপক্ষের দর্শনে আকৃষ্ট হতে শুরু করলেন। শেষ পর্যন্ত রুগেই সম্পর্ক ছিন্ন করতে আগ্রহী হলেন।

ডয়েশ্চে ফ্রানৎসোসিশ্চে ইয়ারবুখে-র পত্রিকার দুটি সংখ্যায় মার্কসের দুটি বিখ্যাত প্রবন্ধ স্থান পেয়েছিল। একটি ‘হেগেলীয় অধিকার দর্শনের আলোচনা’, দ্বিতীয়টি তৎকালীন ‘ইহুদি জীবনের সমস্যা’ সম্পর্কে। আপাতদৃষ্টিতে রচনা দুটির মধ্যে কোনও সম্পর্ক আছে বলে বোধ হবে না। কিন্তু বিষয়বস্তু আলাদা হলেও রচনা দুটির বক্তব্যে আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গির প্রচণ্ড মিল রয়েছে। মার্কসের মানসিক পরিণতির একটা সুস্পষ্ট স্তর রচনা দুটির মধ্যে লক্ষণীয়। এই দুটি রচনা থেকেই পরিষ্কার বোঝা যাবে সমাজ-সম্পর্কিত কোন ধ্যানধারণায় মার্কসের মনের গতি পরিণতি লাভ করতে চলেছে। প্রথম প্রবন্ধ থেকে মার্কসের ধারণামতো নির্বিত্ত মানুষের শ্রেণীসংগ্রামের কথা মোটামুটি জানা যাবে। দ্বিতীয় রচনায় সমাজতান্ত্রিক সমাজের অস্পষ্ট কাঠামো খুঁজে পাওয়া যায়। এই দুটি রচনাই আমাদের চোখে তুলে ধরবে ভবিষ্যতের কার্ল মার্কসের পরিণত চিন্তার আভাস।

প্রথম রচনায় মার্কস দেখিয়েছেন ধর্মের সমালোচনা নিছক ধর্মের ব্যাপার নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের সমালোচনার মধ্য দিয়ে ধর্মের যথার্থ সমালোচনা সম্ভব। ফয়েররাখের প্রভাব এখানে লক্ষ করার মতো। এই রচনাতেই প্রথম দেখা গেল মার্কসের আলোচনা আধুনিক বস্তুবাদী দর্শনের ভিত্তির উপর দাঁড়াতে চাইছে। ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যার এই প্রথম প্রয়োগ মার্কস নিজের রচনাতে দেখাতে চাইলেন। মার্কস বললেন শ্রমশিল্প ও পার্থিব সম্পত্তির সঙ্গে রাজনীতির যোগ রয়েছে। আর তার থেকেই আধুনিক কালের প্রধান প্রধান সমস্যার জন্ম হচ্ছে।

দ্বিতীয় রচনাটি মূলত বাউয়ের-এর এক নিবন্ধের সমালোচনা। ইহুদিদের সামাজিক মুক্তির উরায় হিসেবে বাউয়ের বলেছিলেন, জাতীয় ধর্মের বন্ধন থেকে মুক্তি না পেলে ইহুদিদের পরিত্রাণ নেই। মার্কস কিন্তু ধর্মীয় সমাধানের পথে গেলেন না। মার্কস বললেন সমস্যা আসলে অর্থনৈতিক। ধর্মের প্রভাবের থেকেও ইহুদি সমাজের উপর কার্যকর প্রভাব বিস্তার করেছে সমাজের বাণিজ্যিক ক্রিয়াকর্ম। ইহুদিদের সামাজিক মুক্তি এই সব ক্রিয়াকর্মের পরিবর্তনের উপর নির্ভর করছে। নতুন ধরনের সামাজিক শক্তির জন্ম দিয়ে নতুন সমাজ সংগঠনের সাফল্যে ইহুদি সমাজের মুক্তি। এই মুক্তির চেষ্টা মানুষের হাতেই রয়েছে। মোটামুটি একটা নাতিস্পষ্ট বিশ্লেষণে এই প্রথম মার্কস সমাজতান্ত্রিক সমাজ গঠনের কথা বলেছেন।

ফ্রান্স ইয়োরোপের তরুণ বুদ্ধিজীবীদের স্বর্গ। এখানে থাকার সুযোগ মার্কস হেলায় হারালেন না। হেলভেশিয়াস ও হলবাখের বস্তুবাদ, সাঁ সিমঁ-র অর্থনীতি, জোসেফ প্রুধোঁ-র নৈরাজ্যবাদ, ফুরিয়ের ও বাবুফের ইউটোপিয়ান চিন্তাধারা, গিজো-র ইতিহাসের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা ইত্যাদি মার্কসের দিনরাতের অধ্যয়নের বিষয় হয়ে উঠল। গভীরভাবে পড়াশোনায় ডুবে গেলেন মার্কস। পারির আকাশে বাতাসে সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদের বিভিন্ন ব্যাখ্যায় মুখর। সমাজতন্ত্রের নব নব তত্বে ও ব্যাখ্যায় চিন্তাশীল লেখকদের অভাব ছিল না। ফ্রান্সের চিন্তার জগৎ ভরে রেখেছিলেন অনেকেই। ছিলেন সাঁ সিমঁ-র শিষ্যরা, ফুরিয়ের গোষ্ঠীর লেরু, ক্যাথলিক পুরোহিত ল্যামেনে, সিসমন্ডি। শিল্পসাহিত্যের ক্ষেত্রেও বাদ ছিল না। বেরেঙ্গার-এর গীতি আর জর্জ সাঁ-র চমকপ্রদ উপন্যাস থেকেও সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা প্রচারিত হত।

সমাজতন্ত্রের এই সব ধারণার মধ্যে কোনওরকম সংগ্রামের কথা খুঁজে পাওয়া যেত না। প্রায় প্রত্যেক তত্বেই বিত্তবান শ্রেণীর মর্জির পরিবর্তনের প্রত্যাশা ছিল। আশা ছিল সমাজসংস্কারের চাপে বিত্তবান মানুষেরা একদিন না একদিন নিজেদের সম্পদ বণ্টনে উদ্যোগী হয়ে উঠবেন।

সম্পদ বণ্টনের এই সরল যুক্তির ফাঁকিতে মার্কসের মন সায় দেয়নি। সমাজতন্ত্রের প্রচলিত তত্বের সঙ্গে মার্কস সাঁ সিমঁ আর বাবুফের অর্থনৈতিক ও সমাজতান্ত্রিক ব্যাখ্যার সম্মিলন ঘটিয়েছেন। মার্কসের সমাজতান্ত্রিক দর্শনের কয়েকটি মৌল উপাদান সাঁ সিমঁ আর বাবুফের চিন্তার মধ্যে ছিল, মার্কস তা স্বীকার করেছেন। ফরাসি বিপ্লবের শ্রেণীচরিত্রের কথা সাঁ সিমঁ বলেছেন। আরও বলেছেন যে মানুষের সমগ্র ইতিহাস খুঁজলে শ্রেণীসংগ্রামের নানা কাহিনি পাওয়া যাবে। পণ্য উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে রাজনীতি জড়িত থাকার কথাও সাঁ সিমঁ জানিয়েছেন। রাজনীতির অর্থনৈতিক ব্যাখ্যায় পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কের তত্ব সাঁ সিমঁ বিস্তারিত করেননি, কিন্তু আভাস দিতে পেরেছেন। সাঁ সিমঁ-র ভাবনা থেকে মোটামুটি দুটি মৌল উপাদান মার্কস গ্রহণ করেছেন ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যায় মার্কসীয় চিন্তার দুটি উপাদান – প্রথমটি, মানবইতিহাসের শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস এবং দ্বিতীয়টি পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্কের গভীরতা। হলবাখ ও হেলভেশিয়াসের বস্তুবাদী দর্শন, বাবুফের বিপ্লবচিন্তা, সাঁ সিমঁ-র অর্থনীতি ও ইতিহাসের ব্যাখ্যা, বিভিন্ন ইউটোপিয়ান চিন্তাধারা, মার্কসীয় দর্শনের প্রাথমিক ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছে এবং সমাজতান্ত্রিক চিন্তার বিজ্ঞানসম্মত ভিত্তির সন্ধান দিয়েছে, যা একান্তভাবেই মার্কসীয়।

ইতিমধ্যে বিত্তহীন শ্রেণীর মধ্যে থেকেও এমন মানুষদের আবির্ভাব হল যাঁরা নিজেদের সামাজিক মুক্তির চেষ্টায় তত্ব ও নেতৃত্ব দুই-ই জুগিয়েছেন। লেরু, প্রুধোঁ-দুই চিন্তাবিদই শ্রমিক পরিবারের সন্তান। তত্বগত চিন্তায় সমমতাবলম্বী না হলেও দুজনের প্রতিই মার্কস শ্রদ্ধাসম্পন্ন ছিলেন। এঁদের তাত্বিক উপলব্ধির সীমাবদ্ধতা মার্কস নেননি। মার্কস ক্রমশ এক সামগ্রিক প্রকল্পের প্রান্তদেশে এসে পৌঁছলেন, যার মধ্যে শ্রেণীসংগ্রাম, সমাজতন্ত্রবাদ, সর্বহারা শ্রেণীর ভূমিকা ও পরিশেষে শ্রেণীহীন সাম্যবাদের ধারণা এক সমন্বয়ের মধ্যে থাকছে। সামাজিক মানুষের মুক্তির চেষ্টায় সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নে মার্কস ওই সামগ্রিক প্রকল্পের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন।

মার্কসের এই তাত্বিক উপলব্ধির মৌলিকত্ব হল এর সামগ্রিকতায়-মৌলিকত্ব শ্রেণীসংগ্রামের সঙ্গে সমাজতন্ত্রবাদ ও শোষণমুক্ত সমাজের ভবিষ্যৎ রূপকর্মকে এক প্রতীতির মধ্যে সমন্বিত করার চেষ্টায়। এই প্রতীতি এক নিবিড় দর্শনচিন্তার হাতিয়ারে সমৃদ্ধ – হেগেল থেকে যার শুরু এবং পরিণতি ফয়েরবাখে। বিদ্রোহী হেগেলীয়দের তিনটি শাখার একটির প্রেরণা ফয়েরবাখ। স্ট্রাউস, বাউয়ের হেগেলীয় ভাববাদ থেকে সরে এসে যেখানে থেমে গিয়েছিলেন ফয়েরবাখের আরম্ভ সেখান থেকে। হেগেলীয় পদ্ধতি অনুসরণ করে ঈশ্বরের নিত্যতায় বা নির্বূঢ় সত্তায় (Absolute Reality) প্রথম আঘাত দিয়েছিলেন স্ট্রাউস। স্ট্রাউসকে অতিক্রম করে গেলেন বাউয়ের। বাউয়ের হেগেলের পরমভাবের (Absolute Idea) কোনও স্বীকৃতি দিলেন না, বরঞ্চ বাইবেল ও ঈশ্বরকে নেহাৎ লৌকিক পর্যায়ে টেনে নামালেন। আরও এগিয়ে এসে ফয়েরবাখ বললেন ‘ধর্মের জগৎ আসলে কোনও জগৎই নয়, নিছক কল্পনা, মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষার ভাবগত ও আদর্শগত পরিপূরক।’

ফয়েরবাখকে বলা হল হেগেলের নিয়তি। হেগেল বলেছেন বিশুদ্ধ ভাবের বিকাশ থেকে বিশ্বের জন্ম। বিশ্ব হল পরমভাবের প্রকাশ। কিন্তু ফয়েরবাখ বললেন, প্রাথমিক সত্য হল মানুষ ও মানুষের জগৎ। জাগতিক বিকৃতি ও মানসিক দ্বন্দ্ব থেকে ধর্মের উৎপত্তি। ধর্মের ধারণা ও তত্ব মানুষেরই তৈরি। মানুষ তার আদর্শ সত্তাকে ধর্মের প্রতিচ্ছায়ায় স্থাপন করে দেখে। ধর্ম কোনো প্রকৃত সত্তাকে উন্মুক্ত করে না। আসলে হেগেলের পরমভাবের নিত্যতায় বিশ্বাস রাখলে ইতিহাসের গতিশীলতায় আস্থা হারাতে হয়। হেগেলকে অনুসরণ করলে মানুষের ভাগ্য পরমভাবের ইচ্ছার সঙ্গে বাঁধা রাখতে হয় – মানুষের ভাগ্য জয় করার চেষ্টায় তখন ইতি পড়ে, চরম নিয়তিবাদে শেষ হয় সমাজ ও সভ্যতার প্রগতি।

হেগেলের সংঘাতের পদ্ধতি ব্যবহার করেই ফয়েরবাখ খ্রিস্টধর্মের অবাস্তবতা দেখিয়েছিলেন। ফয়েরবাখ দেখালেন হেগেলের দর্শনকে সঠিক ব্যাখ্যা করলে হেগেলের নিজস্ব যা প্রতিপাদ্য, পরমভাব, তা আর ধোপে টেকে না। অথচ হেগেল নিজস্ব যুক্তির ফাঁক দিয়েই পরমভাবকে স্বীকার করে নিয়েছেন। হেগেলের চিন্তায় পরস্পবিরোধী প্রত্যয়গুলো ফয়েরবাখ উন্মুক্ত করে দিলেন হেগেলীয় বিচারপদ্ধতির রীতি মেনেই। তবু মার্কস দেখালেন ফয়েরবাখ এক জায়গায় এসে থেমে গেছেন। যেটা তাঁর প্রধান ত্রুটি তা হল ফয়েরবাখ বস্তুকে কেবল বস্তু হিসেবেই বিচার করেছেন-মানুষকে নিছক বিচ্ছিন্ন মানুষ হিসেবে।

ফয়েরবাখের সঙ্গে মার্কসের দৃষ্টিভঙ্গির অমিলটুকু বুঝতে পারলে মার্কসের মৌল প্রত্যয়গুলো ধরতে কষ্ট হয় না। মানুষকে সম্পূর্ণ বিমূর্ত বা ভাবমূলক পরিবেশে না দেখলেও ফয়েরবাখ মানুষকে জাগতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখেছেন-জাগতিক পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন মনুষ্যত্বের ধারণা হিসেবে। কিন্তু মার্কস দেখতে চাইলেন বাস্তব মানুষকে, মনুষ্যত্বের ধারণাকে নয়, যে মানুষের সত্তা পরিবেশ প্রভাবের চাপে বিমূর্ত থাকে না, ভিন্ন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে-বিশেষ করে আর্থিক ক্রিয়াকলাপের পরিবেশে অবস্থিত মানুষকে, আর্থিক ও সামাজিক সম্পর্কের পরিণতি স্বরূপ মানুষকে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে মানবদর্শনের বিচারে মার্কসকে অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের বিবিধ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়েছে। এই উত্তর খোঁজার তাগিদে মার্কসের কাছে সমাজকাঠামোর ছবি পরিষ্কার ধরা পড়ে। দর্শনবিচারের সঙ্গে আর্থিক ক্রিয়াকলাপের এই নিবিড় সম্পর্ক খুঁজে পাওয়াই মার্কসের মৌলিকত্ব। বিচ্ছিন্নভাবে মনুষ্যসত্তাকে খোঁজার প্রবণতা ছিল না বলেই মার্কস সামাজিক সম্পর্কের রূঢ়তা থেকে, অন্যায় থেকে মানবমুক্তির প্রশ্ন তুলতে পেরেছিলেন। দর্শনের ভাবমূলক পথ থেকে বাস্তব ক্রিয়াকলাপের পথে-বাস্তব কার্যক্রমের সঠিক রাস্তায় দর্শনকে নামিয়ে এনেছিলেন। মার্কস বললেন মানুষকে বিচার করতে গেলে দর্শন আর নির্লিপ্ত চিন্তাসমষ্টিরূপে প্রকাশ পায় না – দর্শন হয় তখন ‘প্রাোগ্রাম অব অ্যাকশন’।

প্রসঙ্গত দর্শনের আলোচনা থেকে মার্কস যুক্তিসংগতভাবে চলে এলেন অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপের বিবিধ প্রশ্নে। মার্কস তাঁর প্রথম অর্থনৈতিক বক্তব্য রাখলেন ১৮৪৪-এর অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি-তে। এই অর্থনৈতিক আলোচনাতেও মার্কস ফয়েরবাখের প্রভাব এড়াতে পারেননি। ফয়েরবাখের কতকগুলি দার্শনিক প্রত্যয়ও [প্রাকৃতিকতা (Naturalism), মানবতাবোধ (Humanism), বিযুক্তি (Alienation),- অবশ্য এই সব প্রত্যয়গুলি যথাসাধ্য পরিবর্তিত অর্থে নিজস্ব মতে মার্কস ব্যবহার করেছেন।] মার্কস অর্থনীতির আলোচনাতে ব্যবহার করেছেন। এগুলির মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ‘বিযুক্তি’ প্রত্যয়টি। অবশ্য হেগেলীয় দর্শনেই প্রত্যয়টির প্রথম ব্যবহার দেখা যায়। মার্কস কিন্তু প্রত্যয়টিকে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির আলোচনায় সার্থকভাবেই প্রয়োগ করেছেন।

মার্কস বিযুক্তির প্রশ্নকে শ্রেণীসমস্যারূপে দেখিয়েছেন। তিনি দেখালেন, শ্রমিক আপন শ্রমের পূর্ণ মূল্য পায় না, অর্থাৎ নিজের শ্রম থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়ে। এই বিযুক্ত শ্রমের দখল পায় পুঁজিপতি। শ্রমিকের বিযুক্ত শ্রম পুঁজিপতির সম্পদ স্ফীততর করে তোলে। শুধু তাই নয় উৎপাদনব্যবস্থার উপর শ্রমিকের দখল না থাকায় শ্রমিকও উৎপাদনব্যবস্থা থেকে বিযুক্ত থাকে। এই বিযুক্ত শ্রমের প্রশ্ন থেকেই মার্কস বুর্জোয়া সমাজের অর্থশাস্ত্র ও ধনতন্ত্রব্যবস্থার সমালোচনায় প্রবৃত্ত হলেন।

অর্থনীতির আলোচনায় এইবার মার্কস একটা নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গির সূত্রপাত করলেন-সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি। এতদিনের পুথিগত শিক্ষায় মার্কস যা জেনেছিলেন তা ছিল কল্পনাশ্রয়ী সমাজতন্ত্রবাদ। সমকালীন আর্থিক পরিমণ্ডলের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় যা রচিত হয়নি, মার্কসের মন তাতে সায় দেয়নি। সমকালীন আর্থিক পরিমণ্ডল বলতে তৎকালীন পণ্য উৎপাদনপ্রণালী, শ্রমের মূল্য, মুনাফা, সঞ্চিত পুঁজির ভূমিকা, ব্যক্তিগত মালিকানা-এই সবের সঙ্গে সমাজের যোগ বোঝায়। সমাজ অর্থে সামাজিক মানুষের উপর এদের প্রতিক্রিয়ার স্বরূপ। অবশ্য সমাজতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে প্রচলিত আর্থিক পরিমণ্ডলের প্রথম বিশ্লেষণ করেছিলেন এঙ্গেলস।

এঙ্গেলসের আউটলাইনস অফ এ ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকোনমি ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির সাধারণ সমালোচনার এক কাঠামো মাত্র, তবু এই রচনা মার্কসের কাছে অনেকটা পথনির্দেশকারী ছিল। ব্যক্তিগত মালিকানায় ও পুঁজির শাসনে সমাজের সঠিক চেহারা এঙ্গেলসই প্রথম তুলে ধরতে পেরেছিলেন। এঙ্গেলসই মার্কসকে ব্রিটিশ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও রিকার্ডোর অর্থনীতির দিকে আকৃষ্ট করেছেন। এই সূত্রে স্মরণীয়, রিকার্ডোই প্রথম বলেছিলেন যে, পণ্যের মূল্যকে দু’ভাগে ভাগ করা যায়, শ্রমিকের শ্রমের মূল্য ও মুনাফা। এই তত্বকে মার্কস আরও বিস্তৃত করেছিলেন। ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপিতে মার্কস যথার্থই ইঙ্গিত দিতে পেরেছিলেন যে প্রচলিত পণ্য উৎপাদনপ্রণালীর পরিবেশে ব্যক্তিগত মালিকানা ও পুঁজির দুষ্ট প্রভাবে একদিন বিপ্লব জন্ম নেবে – আর এই বিপ্লবই ধনতন্ত্রের সমাধি রচনা করবে।

১৮৪৫-এর জানুয়ারিতে মার্কস পারি থেকে বিদায় নিলেন। ফেব্রুয়ারি মাসে প্রকাশিত হল পবিত্র পরিবাব- মার্কস ও এঙ্গেলসের যৌথ রচনা। পারির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের পরিবেশের মধ্যে লেখা এই রচনাটি মূলত ভাববাদী দৃষ্টিভঙ্গির সমালোচনা।

বাউয়ের একদা বামপন্থী শিষ্যদের নেতৃস্থানীয় ছিলেন। হেগেলীয় বামপন্থার সঙ্গে বাউয়ের-এর যোগাযোগ শেষপর্যন্ত টিকে রইল না। যদিও বাউয়ের পরমভাবের সনাতন ঐতিহ্যে বিশ্বাস না রেখে পরিবর্তন বা বিপ্লবে বিশ্বাসী ছিলেন, কিন্তু বাউয়ের কথিত বিপ্লব জনগণের নেতৃত্বে সম্পন্ন হবে না। বাউয়ের-এর মতে শুদ্ধ বুদ্ধি বা চেতনার জাগরণ সমাজে এই বিপ্লব আনবে, এর জন্য কোনও কার্যক্রমের, প্রচারের বা সচেতন চেষ্টার প্রয়োজন নেই। শুদ্ধ চেতনার প্রভাব যেদিন মানুষের উপলব্ধিতে আসবে, সেই দিনই মানুষের মনের অন্ধকার দূর হয়ে সত্যিকারের বিপ্লবের জন্ম হবে।

বাউয়ের-এর সহযোগী ছিলেন তাঁর ভাইয়েরা-এডগার বাউয়ের ও এগবার্ট বাউয়ের। এর পর কয়েকটি নিবন্ধে বাউয়ের মার্কসকে কঠিন সমালোচনা করেন। মার্কস জবাব দিলেন পবিত্র পরিবাব গ্রন্থে। ভ্রাতাসহ বাউয়ের পরিবারকে মার্কস ও এঙ্গেলস আখ্যা দিলেন পবিত্র পরিবার। বাউয়ের -এর পুরো নাম ব্রুনো বাউয়ের-তাঁকে আখ্যা দিলেন ‘ সেন্ট ব্রুনো’।

হেগেলের দর্শনে ভাবের প্রাধান্য থাকলেও ভাবের সঙ্গে জগৎ অচ্ছেদ্য বন্ধনে যুক্ত। বাউয়ের ভাব-কে বস্তু বা জগৎ থেকে আলাদা করে দেখালেন। বাউয়ের বললেন ভাবনা বা চিন্তার প্রবাহ ইতিহাসের রূপান্তর ঘটায়-এ ক্ষেত্রে মানুষের সচেতন কোনও চেষ্টার প্রয়োজন নেই, এ প্রসঙ্গে শ্রেণীভেদের তত্ব কেবল গোলমালই বাড়াবে। মার্কস দেখালেন বাউয়ের-এর চিন্তায় গোড়াতেই গলদ। বস্তু ও জগৎ থেকে ভাব-কে আলাদা করা যায় না। ভাব-কে আলাদা করে দেখার অর্থ হল ভাববাদে ফিরে যাওয়া-পক্ষান্তরে নতুন ধর্মতত্বের উদ্ভাবনায় সাহায্য করা। এই সূত্রে বাউয়ের গোষ্ঠী ‘পবিত্র পরিবার’ আখ্যায় ভূষিত হতে পারে।

দুটি প্রধান বিষয় পবিত্র পরিবার থেকে পাওয়া যায়। প্রথম, হেগেলীয় ভাববাদের সুনিপুণ সমালোচনা। দ্বিতীয়, মার্কস-কথিত ঐতিহাসিক বস্তুবাদের পূর্ণ প্রতিষ্ঠা। বলা চলে, ‘পবিত্র পরিবার’ রচনা থেকেই মার্কস ও এঙ্গেলসের পরিণত চিন্তার অগ্রগতি লক্ষণীয়।

মার্কসের সাংবাদিকতা জার্মান সরকারকে উত্যক্ত করে তুলেছিল, তাই জার্মান সরকারের চাপে ফরাসি সরকার মার্কসকে ফ্রান্স পরিত্যাগ করার আদেশ দিয়েছিলেন। মার্কস এসে পৌঁছলেন ব্রুসেলসে। কিছুদিন বাদে এঙ্গেলসও মিলিত হলেন মার্কসের সঙ্গে। দু’জনে একসঙ্গে একটা বড়ো কাজে হাত দিলেন -জার্মান চিন্তাধারা রচনায়। এ প্রসঙ্গে মার্কস বলেছেন, তৎকালীন জার্মান চিন্তাধারার আলোচনার ফলে এঙ্গেলস ও তিনি নিজেদের ভাববৈশিষ্ট্য ও চিন্তা সমষ্টি সামগ্রিক বৈজ্ঞানিক বিন্যাসে স্থাপন করতে পেরেছিলেন। এই সূত্রে ফয়েরবাখ, বাউয়ের, ম্যাকস স্টার্নার ও জার্মান সমাজতান্ত্রিক চিন্তাবিদদের আলোচনা প্রসঙ্গে জাগতিক নিয়মের জটিলতায় ইতিহাসের প্রগতি ও আর্থিক বিকাশের যে বিশ্লেষণ এই গ্রন্থে লেখকদ্বয় দিয়েছেন তাকে বলা চলে মার্কসীয় চিন্তার প্রথম সামগ্রিক বিন্যাস।

জার্মান চিন্তাধারা-র প্রথম ভাগে রয়েছে ফয়েরবাখ-সম্পর্কিত আলোচনা। মানব ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা দিয়ে আলোচনা শুরু। এখানে দেখানো হয়েছে যে প্রকৃতি বা পরিবেশের প্রভাব যেমন মানুষের উপর সক্রিয় মানুষও পক্ষান্তরে প্রকৃতি বা পরিবেশকে বদল করে নেয়। প্রকৃতির সঙ্গে সংগ্রাম করে মানুষ তার প্রাথমিক চাহিদা সংগ্রহ করে। এই সংগ্রহের কাজে মানুষকে বিশেষ বিশেষ কলাকৌশল প্রয়োগ করতে হয়। মানুষের মুখের সামনে প্রকৃতি প্রতিনিয়ত তার প্রয়োজনীয় বস্তু জুগিয়ে দেয় না। এক এক যুগের এক এক ধরনের কলাকৌশলের প্রয়োগ বা বিশেষ প্রযুক্তিজ্ঞানে মানুষ জীবিকানির্বাহ করে থাকে-যথা, পাথরের ধারালো হাতিয়ার, লাঙল, কাঠের বা ধাতুর তাঁতযন্ত্র, বাষ্পীয় যন্ত্র। প্রত্যেকটিরই বিশেষ প্রযুক্তিজ্ঞান ও তৎসহ সামাজিক পরিপ্রেক্ষিত রয়েছে। এগুলির ব্যবহারে মানুষ যেমন প্রকৃতি বা পরিবেশকে আয়ত্ত করতে পারে তেমনি পরিবেশের প্রভাবও মানুষকে গড়ে তোলে। পরিবেশ মানুষকে ক্রমাগত উন্নত কলাকৌশলের সন্ধানে প্রেরণা দেয়-পরিবেশ ও মানুষ উভয়তই সক্রিয়। ফলে দেখা যায় প্রযুক্তিজ্ঞানের ক্রমাগত পরিবর্তন ও উন্নতির সঙ্গে মানুষ ক্রমশ নতুন শক্তি ও পণ্য উৎপাদনের হাতিয়ারের সন্ধান পাচ্ছে। এ দুয়ের যোগাযোগে সামাজিক বিন্যাসেরও বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটে। পণ্য উৎপাদনপ্রণালীর বদল হলে উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের চেহারাও বদল হয়, নতুন শ্রম সংগঠনের প্রয়োজন দেখা দেয় – ফলেই সামাজিক বিন্যাসের পরিবর্তন এসে পড়ে। ফয়েরবাখের নিষ্ক্রিয় অমূর্ত মানুষের ধারণা মার্কসের হাতে পড়ে সক্রিয় সামাজিক মানুষের ধারণায় পরিণতি পেয়েছে।

এই গ্রন্থের প্রথম ভাগের শেষার্ধে মার্কস বিস্তৃত করেছেন উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে সমাজসম্পর্কের স্বরূপ। বিভিন্ন যুগের বিভিন্ন সামাজিক বিন্যাসের কারণ হল যুগোপযোগী উৎপাদনব্যবস্থার সঙ্গে সমাজসম্পর্কের অটুট বন্ধন। উৎপাদন-ব্যবস্থার সঙ্গে প্রতিটি মানুষের যে প্রাথমিক সম্পর্ক তাকেই মূলত সমাজের আর্থিক কাঠামো বলা চলে। পণ্য উৎপাদন, পণ্য বিনিময় ও বণ্টনব্যবস্থার ত্রিমাত্রিক বনিয়াদে রটিত সমাজের আর্থিক কাঠামো। এই আর্থিক কাঠামোর উপরেই সামাজিক সংবিধান, আইন, রাজনৈতিক সংগঠন নির্ভরশীল এবং এ-সব কিছুর ভেতর দিয়েই যুগোপযোগী বিচ্ছিন্ন বা সম্পূর্ণ সামাজিক চেতনার উদ্ভব ঘটে। গ্রন্থের দ্বিতীয়ার্ধে মার্কস ও এঙ্গেলস জার্মান সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার বিশ্লেষণে নেমেছেন। কার্ল গ্রুন, অটো লুনিং, হারমান পুটম্যান, মোজেস হেস, ম্যাকস স্টার্নার – এই সব চিন্তাবিদদের চিন্তার অসংগতি তাঁরা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন।

দুটি খণ্ড মিলিয়ে মার্কস-এঙ্গেলস জার্মান ভাবধারা মার্কসীয় তত্বের এক সম্পূর্ণ চিত্র উদঘাটন করেছে। সমাজতন্ত্রের তাত্বিক হিসেবে মার্কসের প্রথম প্রতিষ্ঠা পারি-তে। ব্রুসেলসে এসে মার্কস ও এঙ্গেলস দুজনেই একসঙ্গে সমাজতান্ত্রিক ভাবধারার সমস্ত সূত্রের সন্ধান পেলেন-জার্মান চিন্তাধারা-য় তার সব কটিই বিধৃত হয়েছে।

ব্রুসেলসে মার্কসের অবস্থিতি ছিল শর্তাধীন। কর্তৃপক্ষের সঙ্গে শর্ত ছিল মার্কস বেলজিয়ান রাজনীতির মধ্যে মাথা গলাবেন না। কিন্তু ব্রুসেলসে আন্তর্জাতিক আন্দোলনের সুযোগ গড়ে উঠল। লন্ডন, পারি ও বার্লিনের সঙ্গে যোগাযোগের ভৌগোলিক সুবিধা থাকায় বহু পলাতক বিপ্লবী ব্রুসেলসে আশ্রয় নিয়েছিলেন। এঁদের অধিকাংশই সাম্যবাদী চিন্তায় দীক্ষিত। লন্ডনে, পারিতে ও ব্রুসেলসে বিপ্লবী শ্রমিকদের কোনো কোনো সংগঠন তৈরি হয়েছিল। মার্কস ও এঙ্গেলসের সাম্যবাদী চিন্তার সমস্ত সূত্র আর মৌলিক তত্বগুলি ততদিনে পরিণতি লাভ করেছে। ইতিমধ্যে বাস্তব অবস্থার এই যোগাযোগ মার্কসের রাছে পরম কাম্য হয়ে উঠল – এর থেকেই আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী সংগঠনের চিন্তার উদয়।

মার্কসের কাজ হল বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা সংগঠনগুলিকে একটি সংযোগে মিলিত করা। বিশেষ করে লন্ডনের শ্রমিক সংগঠনের সঙ্গে মার্কস যোগাযোগ রক্ষা করে চললেন। তাঁর নিজের উপলব্ধিগত তত্বের বিস্তর আলোচনা নানান সমালোচনা প্রসঙ্গে লিপিবদ্ধ করে লন্ডনে পাঠাতে লাগলেন। লণ্ডনের সংগঠন সুষ্ঠু রূপ নিল দি কম্যুনিস্ট লিগ নামে। মার্কসের একান্ত চেষ্টা সফল হল। কম্যুনিস্ট লিগের প্রথম কংগ্রেস আহূত হল লন্ডনে ১৮৪৭ সালের জুনে। দ্বিতীয় কংগ্রেস নভেম্বরে। সন্মেলনে মার্কস ও এঙ্গেলস সমাজতান্ত্রিক কার্যক্রম সম্পর্কে বিস্তৃত আলোচনা করলেন। তখনই মতবাদগত একটা তাত্বিক খসড়ার প্রয়োজন অনুভূত হল – যার ভিত্তিতে সংগঠনের আন্দোলন শুরু হতে পারে। ‘সাম্যবাদী ইস্তাহার’ (১৮৪৮) রচনার এটাই হল পশ্চাৎপট।

বিভিন্ন দেশে সাম্যবাদী বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তোলার বাস্তব চেষ্টার সঙ্গে সঙ্গে মার্কস তাত্বিক সংগ্রামের প্রয়োজনীয়তাও দেখলেন। কেবলমাত্র কল্পনাশ্রয়ী সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারার ক্ষেত্রে নয়, আন্দোলন গড়ে তোলার বিভিন্ন চেষ্টার মধ্যেও অনেক ভুলচুক বিচ্যুতি দেখা যাচ্ছিল, অথচ সমাজতন্ত্র সম্পর্কে ইয়োরোপের দেশে দেশে নির্বিত্ত শ্রমিক শ্রেণীর আগ্রহ ক্রমাগত প্রকাশ পাচ্ছে, শ্রমিক সংগঠনও তৈরি হচ্ছে। শ্রমিকশ্রেণীর মধ্য থেকেই নেতৃত্ব দেবার মতো ব্যক্তিদের আবির্ভাব শুরু হয়েছে – যাঁরা সমাজতান্ত্রিক তত্ব ও সংগঠন দুই-ই গড়ে তুলতে সক্রিয়, কিন্তু বিজ্ঞানসম্মত বিশ্লেষণে কোনও তত্বই শেষপর্যন্ত শ্রমিকশ্রেণীর যথাযথ হাতিয়ারে পরিণত হবে না। মার্কস দেখলেন এই সব বিচ্যুতি সম্পর্কে গোড়া থেকে কঠোর মনোভাব না নিলে কোনওদিনই সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা হবে না।

এই ধরনের বিচ্যুতি সম্পর্কে মার্কসের সঙ্গে প্রথম বিরোধ বাধল প্রুধোঁর। প্রুধোঁর গ্রন্থ প্রকাশিত হল দারিদ্র্যের দর্শন। তিনি সম্পত্তি ও দারিদ্র্যের বিরোধের মধ্যেই সামাজিক শ্রেণীদ্বন্দ্বের অস্তিত্বের কথা তুললেন সম্পত্তি আসলে চৌর্যবৃত্তি। সামাজিক শ্রমবিভাগই শ্রমিকশ্রেণীকে ক্রমশ নিঃস্ব করে তুলছে। প্রতিটি বস্তু বা ঘটনার মধ্যে সৎ ও অসৎ দুটি দিকই আছে। এই দুটি দিকের মধ্যে প্রতিনিয়ত দ্বন্দ্ব। আসলে এই বিরোধের অবসান হবে সমন্বয়ের মধ্যে – এর ফলশ্রুতি হল বস্তু বা ঘটনার মধ্যে অসততার অবসান এবং সততা ও ন্যায়ের জোরালো প্রতিষ্ঠা। অতএব প্রুধোঁর আবেদন ন্যায়পরতন্ত্রতায় – ভ্রাতৃত্বের আদর্শে। যেন কোনও এক শুভ মুহূর্তে সামাজিক শোষণ বন্ধ হয়ে যাবে, এবং ফলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ধনস্ফীতি ঘটবে না।

প্রুধোঁর সমালোচনা প্রসঙ্গে মার্কসের রচনা দর্শনের দারিদ্র্য (১৮৪৭)। সম্পত্তি অনুসারে সমাজকাঠামোর গঠন প্রুধোঁ যেভাবে দেখিয়েছিলেন মার্কসের কাছে তা স্বীকৃত তত্ব। কিন্তু বিরোধী চেতনার সমন্বয় থেকে প্রগতির নিরঙ্কুশ ধারণায় মার্কস নির্ভরশীল নন। ইতিহাসের বিশেষ স্তরে সমাজবিন্যাসের পরিণতি থেকে সামাজিক সৎ ও অসতের উদ্ভব। যতক্ষম না সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন হচ্ছে ততক্ষণ এক বিশেষ সামাজিক বিন্যাসের অন্তর্গত সৎ ও অসতের বিলোপ হতে পারে না। ধনতন্ত্রের বিশেষ ব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণীর অবস্থা সমাজের নিকৃষ্ট দিকের পরিচয় বহন করে। শোষণ ও দারিদ্র্য যত বাড়তে থাকে, মুক্তি আন্দোলনে শ্রমিকশ্রেণীর দায়িত্ব ও কার্যক্রম প্রখরতর হয়ে ওঠে। ফলে এই মধ্যর্বতী স্তরে সামাজিক বিরোধ তীক্ষ্ণ ও তীব্রতর হয়ে সামাজিক সংকটের জন্ম দেয়। প্রুধোঁ যা ধরতে পারেন নি তা হল এই যে, ক্রমবর্ধমান সামাজিক বিরোধে শ্রমিকশ্রেণীই ক্রমাগত ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। ফলে শ্রমিকশ্রেণীর উপরেই সমাজপরিবর্তনের দায়িত্ব ন্যস্ত হয়, যে পরিবর্তনে পূর্বেকার বিরোধগুলি আর থাকে না – পুরোনো সামাজিক সৎ ও অসৎ-এর বিলুপ্তি ঘটে।

সাম্যবাদী ইস্তাহার প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে ইয়োরোপ জুড়ে শুরু হয়েছিল বিপ্লবের তাণ্ডব। জার্মানি, অষ্ট্রিয়া, ইতালির রাষ্ট্রাধিনায়কদের চরম একাধিপত্যের বিরুদ্ধে বিক্ষুদ্ধ গণসংগ্রাম তীব্র হয়ে ওঠে। ফ্রান্সের বিপ্লব সফলতার দুয়ারে, সিংহাসন ত্যাগ করে লুই ফিলিপের পলায়ন, জনবিক্ষোভের চাপে কিছুকালের জন্য জনপ্রিয় সরকারের প্রতিষ্ঠা। কিন্তু এই সরকার টেকেনি-নতুন নির্বাচনে যাঁরা ন্যাশন্যাল অ্যাসেম্বলি সদস্য হয়ে এলেন তাঁরা আগের সরকারের শ্রমিক সহানুভূতি বজায় রাখতে পারলেন না। ফ্রান্সে অবশ্য একটা ব্যাপার ঘটল-তা হল বুর্জোয়া বিপ্লবের সম্পূর্ণতা। এতকাল রাজতন্ত্র ও সামরিক তন্ত্রের চাপে ধনতন্ত্রের স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ ছিল। ১৮৪৮-এর বিপ্লব ধনতন্ত্রের সম্পূর্ণ বিকাশের সব বাধা দূর করে দিল। বিপ্লবকালীন সময়ের কিছুদিন মার্কস পারিতে কাটালেন। এই সময়ের মার্চে মার্কস কম্যুনিস্ট লিগের সভাপতি (১৮৪৮) নির্বাচিত হলেন। জার্মানিতে তখন গণবিক্ষোভ বিপ্লবের আকার নিচ্ছে – মার্কসের পক্ষে জার্মানিতে প্রত্যাবর্তনের সুষ্ঠু সময়। কোলোন থেকে মার্কসের সম্পাদনায় নয়ে রাইনিশে ৎসাইটুঙ সাময়িক পত্র প্রকাশ পেল। অগ্নিগর্ভ পরিস্থিতির মধ্যে এই নতুন পত্রিকা সমস্ত ইয়োরোপের গণ আন্দোলন পরিচালনার যোগ্য হয়ে উঠল। স্বভাবতই পত্রিকায় আয়ুষ্কাল বেশিদিন হয়নি। জার্মানি থেকে মার্কস বিতাড়িত হলেন। এবার লন্ডন প্রবাস। ফ্রান্সের বিপ্লবচেষ্টা নষ্ট হয়ে যাবার পর সমস্ত ইয়োরোপে চকিতে নেমে এল বিপ্লব-ব্যর্থতার প্রতিক্রিয়া।

এই ব্যর্থতার বিশ্লেষণ দিলেন মার্কস তাঁর ‘ফ্রান্সে শ্রেণীসংগ্রাম’ (১৮৫০) রচনায়। মার্কস বললেন ধনতন্ত্রের চরম বিকাশের আগে সামাজিক শ্রেণীযুদ্ধের কালে শ্রমিকশ্রেণীর নেতৃত্ব সাফল্যলাভ করে না। অবশ্য শ্রেণী হিসেবে স্বাধীন সামাজিক শক্তির অধিকারী হিসেবে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের এই প্রথম শ্রমিকশ্রেণীর প্রতিষ্ঠা ঘটল। এর প্রাথমিক লাভ শ্রেণীসমাবেশের সক্রিয় চেষ্টা। দেখা গেল ফ্রান্সে একদা যারা বিপ্লবের অগ্রগামী স্তরে ছিল সেই মধ্যবিত্ত, ছোটখাট পুঁজিপতি , বিত্তবান কারিগর শ্রেণী বুর্জোয়াপক্ষে সামিল হয়ে যায় বিপ্লবের শেষ পর্যায়ে। শ্রেণীসমাবেশের (পোলারাইজেশন) এই চরিত্র ও প্রক্রিয়া ফরাসি বিপ্লবের পর পরিষ্কার ধরা পড়ে। ‘ফ্রান্সে শ্রেণীসংগ্রাম’ রচনায় শ্রেণীসমাবেশের ও শ্রেণীবিভাগের তত্বগত দিক মার্কস বিশ্লেষণ করে দেখালেন।

পুরোপুরি অর্থনীতি সংক্রান্ত মার্কসের প্রথম রচনা ১৮৪৪-এর অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি। কিন্তু বিভিন্ন প্রসঙ্গে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের প্রয়োগসূত্রে ও সামগ্রিক ব্যাখ্যায় সমাজের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষের বাস্তব সম্পর্কের প্রশ্ন ওঠে। এ সম্পর্কের মৌল রহস্য খুঁজে পাওয়া যাবে সমাজের আর্থিক ক্রিয়াকলাপের মধ্যে মূলত প্রচলিত পণ্য উৎপাদনের সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তারই মধ্যে। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যার প্রসঙ্গে সমাজে উৎপাদনশক্তির ক্রিয়াকলাপের সংগত প্রশ্নও বিবেচ্য। সমাজের ঐতিহাসিক প্রগতির সঙ্গে উৎপাদনক্রিয়ার যে সম্পর্ক মার্কসীয় দর্শন ও অর্থনীতিবিচার তারই পরিপূর্ণ ব্যাখ্যা দিতে পেরেছে। প্রসঙ্গত দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের মৌল প্রস্তাবগুলো বিশ্লেষণ কারণে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজের উৎপাদনক্রিয়ার ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে। উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে মার্কসের অর্থনীতি চর্চায় একাগ্র মনোনিবেশ। ১৮৫০ থেকে ১৮৫৭ পর্যন্ত একনাগাড়ে অর্থনীতি সংক্রান্ত যাবতীয় পুস্তক পড়ে নিলেন -মন্তব্যসহ প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে রাখলেন। তৎকালীন আর্থিক জগতের কাঠামো ও তার ইতিহাস, ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির ক্রিয়াকলাপ ও সমাজসম্পর্ক, সভ্যতার ঊষাকাল থেকে অর্থনীতির গতিপথ – সব কিছুই মার্কস আত্মস্থ করে নিলেন। এর ফল পরের বছর মে মাসে বারশো পৃষ্ঠার পাণ্ডুলিপি তৈরি হল মার্কসের ভবিষ্যৎ মহাগ্রন্থের প্রাথমিক খসড়া। এই খসড়াতেই মার্কসীয় অর্থনীতির সবচেয়ে মূল্যবান তত্ব-মূল্যমানের নিয়ম ও উদ্বৃত্ত মূল্যের তত্ব-ব্যাখ্যাত হল। পরের বছর (১৮৫৯) তাঁর গবেষণায় কিছু অংশ প্রকাশ করলেন-প্রাথমিক অংশটুকুই-এ কন্ট্রিবিউশন টু দি ক্রিটিক অফ পলিটিক্যাল ইকোনমি। এই গ্রন্থেই প্রথম মার্কস তাঁর উপলব্ধিগত মূল্যমানের নিয়মের ব্যাখ্যা দিলেন।

আর এ গ্রন্থের দ্বিতীয় অংশের জন্য কাজ শুরু করলেন বছর দুই বাদে। ১৮৬১ থেকে ১৮৬৩ দু বছরে ৪৮০০ পৃষ্ঠায় তিন খণ্ডের ক্যাপিটাল গ্রন্থের মোটামুটি এক পাণ্ডুলিপি তৈরি হয়ে গেল। মূল্যমান ও উদ্বৃত মূল্যের তত্বের বিশ্লেষণের প্রসঙ্গে অর্থনীতির বিভিন্ন প্রশ্নের সমাধানও মার্কস নিজস্ব পদ্ধতি প্রয়োগে বের করে আনলেন-যথা, গড়পড়তা লাভের নিয়ম, উৎপাদনের মূল্যনির্ণয়, ভূমিকর তত্ব। এই সব তাত্বিক প্রশ্নের সমাধানের ফলে মার্কসের উদ্বৃত্ত মূল্যমানের মতবাদ সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠা পেল।

মার্কসের ক্যাপিটালের প্রথম খণ্ড বের হয় ১৮৬৭ সালে। বাকি দুটি খণ্ডের প্রকাশনার কাজ মার্কস সুষ্ঠুভাবে করে যেতে পারেননি। ইতিমধ্যে তিনি আন্তর্জাতিক আন্দোলনের নেতার পদে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। প্রত্যক্ষ রাজনীতির মধ্যে জড়িয়ে থাকায় এবং অত্যধিক খাটুনির ফলে শারীরিক অসুস্থতার জন্যও দাস ক্যাপিটাল-এর বাকি দুটি খণ্ডের প্রকাশনা মার্কসের জীবিত কালে সম্ভব হয়নি। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে অর্থাৎ মার্কসের মৃত্যুর দু’বছর পরে এঙ্গেলসের চেষ্টায় ও উৎসাহে দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হল। ১৮৯৪-এ তৃতীয় খণ্ড।

বিক্রয়যোগ্য পণ্যের অতুল সঞ্চয় থেকে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে সম্পদের উদ্ভব-এরই বিশ্লেষণ ও সামাজিক সম্পর্ক ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ডের প্রতিপাদ্য। পণ্যের সামাজিক সম্পর্কের স্বরূপ – বিশেষ করে একাধিক পণ্যের বিনিময়যোগ্য তুলনাত্মক সম্পর্ক যা ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির বিশেষ ব্যবস্থার ফলেই গড়ে ওঠে – তারই ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ থেকে আমরা জানতে পারি যে পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে বিক্রয়যোগ্য পণ্য আসলে উদ্বৃত্ত মূল্যের বস্তুগত রূপ বা অর্থকর রূপ (যেখানে মূল্যের জন্য অর্থও বিশেষরূপে পণ্য হিসেবে পরিগণিত), সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের উৎপাদনকারী শ্রম ও পণ্যরূপে পর্যবসিত হয়। উৎপাদনকারী শ্রম ও উদ্বৃত্ত মূল্যের সহযোগে বিনিময়ের মাধ্যমে যে মুনাফা বা বাড়তি আয় ঘটে তার ক্রমবিনিয়োগে ক্রমশ বর্ধিত হারে মুনাফারও স্ফীতি ঘটে। একটা স্পাইরাল ধর্মী চক্রাবর্তনে যথা, শ্রম-উৎপাদন-বাড়তি মুনাফা-বিনিয়োগ-শ্রম-উৎপাদন-এইভাবে বর্ধিত পুঁজির সঞ্চয় থেকে বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির কার্যক্রম।

ক্যাপিটাল-এর প্রথম ভাগে সামন্ততান্ত্রিক অর্থনীতি থেকে ধনতন্ত্রের উদ্ভব ও প্রগতির ইতিহাস বর্ণিত আছে। সামন্ততান্ত্রিক আর্থিক ব্যবস্থার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক সম্পর্কের বদল ও নতুন আর্থিক ব্যবস্থার প্রচলনে নতুন সম্পর্কের জন্মের কথাও আমরা জানতে পারি। এই নতুন সমাজসম্পর্কের সামগ্রিক চিত্র থেকে এটাই সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে যে নির্বিত্ত শ্রমিকশ্রেণী উদ্বৃত্ত মূল্য উৎপাদনের যন্ত্র মাত্র, আর পুঁজির মালিক উদ্বৃত্ত আয়কে বিনিয়োগযোগ্য পুঁজিতে পরিণত করার যন্ত্রস্বরূপ।

কিন্তু এই অমানবিক সম্পর্কের অস্তিত্ব পুঁজিতান্ত্রিক সমাজে চিরস্থায়ী নয় – নির্বিত্ত শ্রমিকশ্রেণী ইতিহাসের হাতিয়ার হিসেবে এই অমানবিক সমাজসম্পর্কের বদল ঘটাবে। সমাজতান্ত্রিক আর্থিক ব্যবস্থার পরিবেশে এই বদল সম্ভব। সমাজদেহের এই মৌল পরিবর্তনের যুক্তিগ্রাহ্য প্রক্রিয়া মার্কসই বিবৃত করেছেন। অবশ্য মার্কসের আগে বিভিন্ন কল্পনাশ্রয়ী মতবাদ আশ্রয় করে সমাজতন্ত্রের বিভিন্ন স্বর্গ গড়ে উঠেছিল। ক্যাপিটাল-এর প্রথম খণ্ড সমাজতান্ত্রিক ধারণাকে সমাজবিজ্ঞানের যুক্তিগ্রাহ্য প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠা দেয়।

ক্যাপিটাল-এর দ্বিতীয় খণ্ডের উপনাম পুঁজির সঞ্চালনপ্রক্রিয়া-দি প্রসেস অফ সার্কুলেশন অফ ক্যাপিটাল। এ ক্ষেত্রে মার্কস ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে পুঁজির চক্রবৎ গতি বা আবর্তন, নিয়োজিত পুঁজির পণ্যে রূপান্তর ও পরিশেষে বাজারপদ্ধতির মধ্যে বিনিময়ব্যবস্থায় বিভিন্ন পণ্যে উৎপাদন ও মূল্যমানের ভারসাম্যের অবস্থায় সরল পুনরুৎপাদন পদ্ধতির প্রচলন ইত্যাদি বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছেন। অর্থনৈতিক সংকটের প্রশ্নও দ্বিতীয় খণ্ডে আলোচিত। ধনতান্ত্রিক অর্থনীতির স্থায়িত্ব নেই। ভারসাম্যের অবস্থা থেকে তার নিয়মিত বিচ্যুতি, কেননা ক্রমাগত উদ্বৃত্ত মূল্য আকর্ষণের পরিণামে উৎপাদনশক্তি একসময়ে অব্যবহার্য হয়ে পড়ে, তখনই অর্থনৈতিক সংকটের অবস্থা। আর সব সংকটই একটি মাত্র পরিণতির প্রতি দিকনির্দেশ করে – ধনতন্ত্রের যা নিয়তি।

ক্যাপিটাল-এর তৃতীয় খণ্ডের উপ-নাম পুঁজিতান্ত্রিক উৎপাদনব্যবস্থার সামগ্রিক চিত্র। এখানে মার্কস প্রসঙ্গত বিশেষ বিশেষ মূল্যমানের প্রশ্ন, পুঁজির মুনাফার হার ও উদ্বৃত্ত মূল্যের বিভাজন থেকে প্রাপ্ত মুনাফার কথা তুলেছেন এবং সুদ ও খাজনার প্রশ্নে আগের দুখণ্ডের আলোচনা থেকে আরও বিস্তৃত বিশ্লেষণ ও ব্যাখ্যায় এসেছেন। প্রথম খণ্ডে আলোচনার প্রাধান্য ছিল উদ্বৃত্ত মূল্যের হারের উপর – মার্কস যার গাণিতিক রূপ দিয়েছেন উদ্বৃত্ত মূল্য ও মজুরি ব্যয়ের অনুপাত হিসেবে। তৃতীয় খণ্ডে এই প্রাধান্য এসেছে মুনাফার হারের উপর।

যে সময়ে মার্কস ‘ক্যাপিটালে’র জন্য তথ্যসংগ্রহে ব্যাপৃত ছিলেন মোটামুটি সেই কালে ১৮৫১ থেকে ১৮৬২ পর্যন্ত তিনি ‘নিউ ইয়র্ক ডেলি ট্রিবিউন’-এ নিয়মিত লেখক ছিলেন। সমকালীন রাজনীতি ও অর্থনীতির বিভিন্ন প্রসঙ্গে যথার্থ মার্কসীয় চিন্তার বৈশিষ্ট্য তাতে পাওয়া যায়। ভারতবর্ষ, চীন, স্পেন, আমেরিকা ইত্যাদি দেশগুলির প্রকৃত অবস্থার বিশ্লেষণ এই সব লেখায় লক্ষ করা যায়। এ সময়ে ব্রিটেনে ‘চার্টিস্ট’ আন্দোলনে তাঁর সমর্থন ছিল – আর ফ্রান্সের লুই বোনাপার্টের স্বরূপ উদঘাটনে তিনি বেশ সচেষ্ট ছিলেন।

শুধু প্রবন্ধ রচনায় নয়, মার্কস সক্রিয়ভাবে রাজনীতি ও সংগঠনের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। ‘আন্তর্জাতিকে’র শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মার্কসই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান সংগঠক। আন্তর্জাতিকের সমস্ত দলিল ও ইস্তাহার মার্কসেরই রচনা।

১৮৭১-এর ১৮ মার্চ পারি শহরে কমিউনের জন্ম-বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর এই অভিনব ভূমিকায় পৃথিবী চমকিত হল। মার্কস লন্ডনে বসে এই কমিউনের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করলেন এবং নেতাদের সঙ্গে তাঁর গুপ্ত যোগাযোগ গড়ে উঠল। মার্কসের নির্দেশাদি যথাস্থানে পৌঁছাতে লাগল। তবু কমিউনের পতন রোধ করা গেল না। এই সব ইতিহাস বিশ্লেষিত হল ১৮৭১-এ রচিত ফ্রান্সে গৃহযুদ্ধ গ্রন্থে। মার্কস জানালেন এই প্রথম বিত্তহীন শ্রমিকশ্রেণীর সক্রিয় চেষ্টায় ও নেতৃত্বে ‘নির্বিত্তের রাষ্ট্র’ পৃথিবীর ইতিহাসে স্থান পেল। অবশ্য এক পূর্ববর্তী গ্রন্থে এইটিনথ ব্রুমেয়ার অব লুই বোনাপার্ট (১৮৫২)-এ পুরোনো শাসনযন্ত্র ধ্বংস করে শ্রমিকরাষ্ট্রে নতুন শাসনব্যবস্থার তত্বের প্রতিষ্ঠা মার্কস দিয়েছিলেন।

কমিউনের অভিজ্ঞতায় মার্কসীয় তত্বের প্রয়োগমূল্য যাচাই হয়ে গেল। আরও নতুন তাত্বিক আলোকে এবার মার্কস ‘প্রলেতারীয় ডিক্টেটরশিপ-এর চরিত্র বিশ্লেষণ তৎপর হলেন। তাঁর বক্তব্য হল, একমাত্র কমিউনের রাষ্ট্রিক কাঠামোয় শ্রমিকশ্রেণীর আর্থিক মুক্তি সম্ভব।

‘আন্তর্জাতিক’-এর ভূমিকার সঙ্গে সঙ্গে দেশে দেশে নির্বিত্ত শ্রেণীর নিজস্ব পার্টির ভূমিকা বা সাংগঠনিক ক্রিয়াকলাপে জোর পড়ল। পারি কমিউনের ব্যর্থতায় মার্কস এই শিক্ষা নিলেন ফ্রান্সে শ্রমিক শ্রেণীর সাংগঠনিক ও নেতৃত্বের দুর্বলতাই শত্রুপক্ষকে সবল করেছিল। জার্মানিতে শ্রমিকশ্রেণীর নিজস্ব সংগঠনে প্রধান বাধা লাসালীয় রাজনীতি। শ্রমিক রাজনীতির বিভিন্ন বিচ্যুতি লাসালীয় তত্বের ছত্রছায়ায় সম্মিলিত হল। গোথা অঞ্চলে তাদের ঐক্যবদ্ধ প্রস্তুতির সম্মেলন মার্কস ‘গোথা কার্যক্রমের সমালোচনা’ (১৮৭৫)-য় সমালোচিত। লাসালের ধারণায় শ্রেণীযুদ্ধ, ধর্মঘট, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদি শ্রমিক আন্দোলনের ক্ষেত্রে অবাস্তর, বরং রাজশক্তির সহানুভূতির সহায়তায় শ্রমিকশ্রেণীর মুক্তি সম্ভব। এই অবৈজ্ঞানিক ও সুবিধাবাদী রাজনীতির চেহারা মার্কস এখানে উন্মোচিত করলেন- দূরায়ত ভবিষ্যতের দিকে সন্ধানী দৃষ্টি মেলে তিনি সাম্যবাদী সমাজের খুঁটিনাটির বর্ণনা দিলেন।

নিদারুণ কায়িক ও মানসিক শ্রমের আধিক্যে মার্কসের দেহ ভেঙে পড়ে, ১৮৭৪ থেকে তা প্রায় চরম অবস্থায় পৌঁছায়। মাঝে মাঝে স্থানপরিবর্তন অপরিহার্য হয়ে উঠত। জেনি মার্কসের মৃত্যুতে (১৮৮১) প্রবল আঘাত এল। শেষপর্যন্ত ১৮৮৩-র ৪ মার্চ ‘একালের সর্বশ্রেষ্ঠ চিন্তানায়কের চিন্তা রুদ্ধ হল।’

৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা

(কার্লমার্কস ১৯৬৮)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *