দান্তে ও আমাদের আত্মপ্রতিকৃতি – অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
১৭ সেপ্টেম্বর ১৯৩০-এ মস্কৌ স্টেট ম্যুজিয়ামে রবীন্দ্রনাথের যে চিত্রপ্রদর্শনী শুরু হয়েছিল সেই উপলক্ষে একটি ছবির প্রসঙ্গে কোনও সমালোচক ও কবির কথোপকথনের একটি অংশ-
সমালোচক আপনার চিত্রাবলির কি কোনোই নাম নেই?
কবি কোনও নামই নেই। কোনও নামের কথা আমি আদৌ ভাবতে পারি না। কী ক’রে আমার ছবি বর্ণনা করা যায় সেটা আমার জানা নেই।
সমালোচক এই পোর্ট্রেট কি দান্তের?
কবি না, এটা দান্তের পোর্ট্রেট নয়। গত বছরে জাপান থেকে ফিরবার মুখে স্টিমারে এঁকেছি। আমার খেয়াল আমার লেখনীকে অনুসরণ করে চলেছিল বলেই এই ছবিটি এখন আপনাদের সামনে রয়েছে।
কবি-চিত্রী স্বয়ং একথা বললেও ১৯৩২-এ ২০ থেকে ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অনুষ্ঠিত রবীন্দ্র-শিল্প প্রদর্শনীর ক্যাটালগে ১৩২ সংখ্যক ছবিটির নাম ‘দান্তে’। মস্কৌতে যে ওই নাম প্রস্তাবিত হয়েছিল উদ্যোক্তারা নিশ্চয় সে খবর জানতেন। এবং ছবির নাম প্রসঙ্গে ১৯৩১-এর ডিসেম্বরে রামানন্দ চট্টোপাধ্যায়কে লেখা চিঠিতে রবীন্দ্রনাথের এই বক্তব্য নিশ্চয় সেই নির্ধারণ অপ্রমাণ করে না
ছবিতে নাম দেওয়া একেবারেই অসম্ভব। তার কারণ বলি, আমি কোনও বিষয় ভেবে আঁকিনে- দৈবক্রমে একটা কোনো অজ্ঞাতকুলশীল চেহারা চলতি কলমের মুখে খাড়া হয়ে ওঠে। জনক রাজার লাঙলের ফলার মুখে যেমন জানকীর উদ্ভব…রূপসৃষ্টি পর্যন্ত আমার কাজ, তারপরে নাম সৃষ্টি অপরের!
এ অঙ্গীকার অনৃতকথন না হলেও দ্ব্যর্থদ্যোতক। কবিতার নামকরণ সম্পর্কে মালার্মের সেই কুণ্ঠা রবীন্দ্রনাথের সপ্রতিভ এই সৌজন্যের অনিবার্য অনুষঙ্গ। নাম শুধু কবিতাকেই নয়, ছবিকেও পরিসরের মধ্যে সংকুচিত করে, তাকে বাড়তে দেয় না। তাছাড়া শিল্পীর রহস্যময় উদ্দেশ্যকেও সে বিকৃত করে। দান্তের যে কোনো আলেখ্য যাঁরা দেখেছেন তাঁদের পক্ষে সন্দেহ করবার সুযোগ নেই রবীন্দ্রচিত্রিত ওই প্রতিকৃতি দান্তের মুখাবয়বের বিশ্বস্ত সাক্ষ্য। সেক্ষেত্রে ছবিটিতে দান্তের নাম উৎকীর্ণ করে দিলে হয়তো সত্য কথা হত, কিন্তু সাংকেতিকতার মর্যাদা থাকত না। শিল্পে-সাহিত্যে সত্যভাষণের প্রাতিভাসিক উপায়টি উদ্দেশ্যের শুধু সমার্থকই নয়, কখনও কখনও অতিশায়ী। রবীন্দ্রনাথ যতই ভূমা আনন্দ ইত্যাদির অকপট ভাষ্যকার হিসাবে কীর্তিপতাকা বহন করুন না কেন, ছবি ও গানের প্রকৃতিগত ও পরিমাণগত বৈশিষ্ট্য তাঁর অবমানসের মহা-অজানাকেই নন্দিত করে। রবীন্দ্রনাথের রচিত দান্তে চিত্র তাঁর মনের অনাবিষ্কৃত প্রবণতা ও অভিমুখিতার একটি স্মৃতিধার্য নিদর্শন।
অন্তত সতেরো বছর বয়স থেকেই এই গোপন গঙ্গোত্রীর সূত্রপাত। সেই সময়ে ‘বিয়াত্রিচে, দান্তে ও তাঁহার কাব্য’ (ভারতী, ভাদ্র ১২৮৫) প্রবন্ধটি যে নিছক আকস্মিক বিষয় থেকে রচিত হয়নি, উদ্ধৃতির সাহায্যে সেটি প্রমাণ করা যেতে পারে-
ইতালিয়ার এই স্বপ্নময় কবির জীবনগ্রন্থের প্রথম অধ্যায় হইতে শেষ পর্যন্ত বিয়াত্রিচে। বিয়াত্রিচেই তাঁহার সমুদয় কাব্যের নায়িকা, বিয়াত্রিচেই তাঁহার জীবন কাব্যের নায়িকা! বিয়াত্রিচেকে বাদ দিয়া তাঁহার কাব্য পাঠ করা বৃথা, বিয়াত্রিচেকে বাদ দিলে তাঁহার জীবনকাহিনি শূন্য হইয়া পড়ে। তাঁহার জীবনের দেবতা বিয়াত্রিচে-তাঁহার সমুদয় কাব্য বিয়াত্রিচের স্ত্রোত্র। বিয়াত্রিচের প্রতি প্রেমই তাঁহার প্রথম কবিতার উৎস উৎসারিত করিয়ে দেয়। তাঁহার প্রথম গীতিকাব্য ‘ভিটা নুওভা’র প্রথম হইতে শেষ পর্যন্ত বিয়াত্রিচেরই আরাধনা; ইহার কিয়দ্দুর লিখিয়াই তাঁহার বিরক্তি বোধ হইল-তাঁহার মনঃপূত হইল না; পাঠকের চক্ষে বিয়াত্রিচেকে দূর স্বর্গের অলৌকিক দেবতার ন্যায় চিত্রিত করিয়াও তিনি পরিতৃপ্ত হইলেন না।
অতিকল্পনার আশ্রয় না নিয়েও এই সিদ্ধান্তে নীত হওয়া সম্ভব, এই পর্যালোচনায় রবীন্দ্রনাথের পরিণত বয়সের কাব্যমীমাংসার অস্থির সূচনা ব্যক্ত হয়েছে। প্রথমত, জীবন ও কবিতাকে একটি অবিভাজ্য রচনাকর্ম হিসেবে গণ্য করার যে আগ্রহ পরবর্তী কালে তাঁর নন্দনতত্বে অন্যতম উচ্চারণ হয়ে উঠেছে, এখানে তার পূর্বলেখ দেখতে পাওয়া যায়। দুই, প্রদত্ত বিশ্লেষণের শেষ অংশের ঘনিষ্ঠ পাঠকের পক্ষে এটি এড়িয়ে যাওয়া অসম্ভব যে এখানে জাতক-কবিগুরুর অতৃপ্ত, আত্মবিব্রত, সংগ্রামলাঞ্ছিত মনের উত্তরণের কান্না সংহত হয়ে আছে। অতঃপর এই উত্তেজনার শান্তায়ন (sublimation) ঘটেছে এবং দান্তের কাব্যে কবির রূপকসন্ধান ও ‘ভিটা নুওভা’ থেকে তাঁর তর্জমা পর পর পাঠ করলে বোঝা যায় তিনি নিজেও এর সম্ভাবনা সম্বন্ধে সচেতন হয়েছেন-
১. রূপক প্রভৃতির দ্বারা বিয়াত্রিচেকে দান্তে এমন-একটি মেঘময় অস্ফুট আবরণে আবৃত করিয়া রাখিয়াছিলেন যে, পাঠকের চক্ষে সেই অস্ফুট মূর্তি অতি পবিত্র বলিয়া প্রতিভাত হয়।
২. তিনি (বিয়াত্রিচে) রাজপথ দিয়া যাইবার সময় আমি যেখানে সসম্ভ্রমে স্তম্ভিত হইয়া দাঁডাইয়াছিলাম সেই দিকে নেত্র ফিরাইলেন, এবং তাঁহার সেই অনির্বচনীয় নম্রতার সহিত এমন শ্রীপূর্ণ নমস্কার করিলেন যে, আমি সেই মুহূর্তেই সৌন্দর্যের সর্বাঙ্গ যেন দেখিতে পাইলাম।
পবিত্রতা বিষয়ে আমাদের কবি যে, কোনও পূর্ব সংস্কারের দ্বারা অভিভূত হননি, সে কথা এর চেয়ে আরও উৎকীর্ণ রূপে প্রতিষ্ঠিত করা অসম্ভব। অপেক্ষাকৃত উত্তরকালে অবশ্যই সৌন্দর্যবোধ ও কল্যাণের এই সম্পর্ক ভিন্নতর আকার নিয়েছে। সৌন্দর্য তার নিজের গরজেই মঙ্গলকে আমন্ত্রণ করে, তখনও এরকম একটি অভীপ্সা অত্যন্ত স্পষ্ট। কিন্তু এর পরে- সমীক্ষাধর্মী কথাশিল্পের কিছু এবং শেষ পর্যায়ের পদাবলি বাদ দিয়ে অনায়াসেই বলা যায়- সৌন্দর্য আপেক্ষিক একটি পারমিতা। এবং তাঁর কবিতার আনুষ্ঠানিক আরম্ভের আগে ‘সৌন্দর্যের সর্বাঙ্গ’ যখন নিবিড় সমগ্রতায় রবীন্দ্রনাথের মনন অধিকার করেছিল তার প্রেরণা অব্যবহিত শিল্পসর্বস্ব আন্দোলন থেকে আসেনি, এসেছিল পিছুটানের সংস্পর্শে অবিশ্রাম অতীত পর্যটনের মধ্য দিয়ে এসে অবশেষে রোমান্টিকতার পুনরুত্থান যুগের মন্ত্রণায়। দান্তে, যিনি ‘তাঁহার মহাকাব্যের মহান ভাব দ্বারা সমস্ত ইউরোপমণ্ডল কাঁপাইয়া তুলিয়াছিলেন’ এবং বয়োক্রমে অত্যন্ত কনিষ্ঠ গ্যেটে , যিনি’নাটক লিখিয়া মানব হৃদয়ে সূক্ষ্মতম শিরা পর্যন্ত কাঁপাইয়া তুলিয়াছিলেন, যিনিই প্রথমে ইউরোপমণ্ডলে আমাদের শকুন্তলার আদর বর্ধিত করিয়াছিলেন’- তাঁরা সেই ভ্রাম্যমাণ কবির কাছে অতীত ও আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম দুই যোজক। প্রসঙ্গত আরও একজন তাঁর হৃদয় অধিকার করেছিলেন পেত্রার্কা। তিনজনেই সম্ভবত এক এক অর্থে আধুনিক কালে আপেক্ষিক বোধের প্রবর্তক। কিন্তু তার চেয়েও উল্লেখযোগ্য তথ্য, এই তিনজনের মধ্যে দান্তে তুলনায়িত হয়েছেন সবচেয়ে বেশি। কখনও তিনি লক্ষ করেছেন পেত্রার্কার সঙ্গে দান্তের ‘অনেক বিষয়ে…সৌসাদৃশ্য ছিল'(ভারতী আশ্বিন ১২৮৫), কখনও আরও গভীর সাদৃশ্যের সন্ধানে বলেছেন
গ্যেটের জীবনে এক-একটি প্রেম-আখ্যান শেষ হইলে, অমনি তাহা লইয়া তিনি নাটক রচনা করিতেন, দান্তে বা পেত্রার্কার ন্যায় কবিতা লিখিতেন না। বাস্তব ঘটনাই নাটকের প্রাণ, আদর্শ জগৎ কবিতার বিলাসভূমি। যাহা হইয়া থাকে, নাটককারেরা তাহা লক্ষ্য করেন-যাহা হওয়া উচিত কবিদের চক্ষে তাহাই প্রতিভাত হয়। গ্যেটে তাঁহার নিজের প্রেম নাটকে গ্রথিত করিতে পারিতেন, সাধারণ লোকেরা তাহাতে তাঁহার নিজ হৃদয়ের আভাস পাইত। কিন্তু বিয়াত্রিচের প্রতি অভিবাদনে, দান্তের হৃদয়ে যে ভাবতরঙ্গ উঠিত, তাহা তিনি কবিতাতেই প্রকাশ করিতে পারিতেন, তাহা দান্তে ভিন্ন আর কাহারো মুখে সাজিত না। (ভারতী কার্তিক ১২৮৫)
নাটক ও কবিতার প্রাকরণিক এই পার্থক্যনির্দেশ প্রকৃত প্রস্তাবে দোলাচলে বিচলিত কবিসত্তার অভিক্ষেপ।
কবিকিশোরের অপরিণত মনের দ্বারা দান্তে ও গ্যেটের দ্বৈতত্বের এই নির্ধারণ নিঃসন্দেহে সেই মনেরই নির্মীয়মাণ কার্যক্রম আভাসিত করছে। বাস্তব ঘটনাকে আদর্শ জগতে উন্নীত করবার আকাঙ্ক্ষা রবীন্দ্রহৃদয়ে আরব্ধ দায়িত্ব যার পরিপ্রেক্ষিতে এই তুলনা অর্থময়।
বাংলা ভাষায় দান্তের কবিতা অনুবাদ করিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রাণিত বোধ করেছিলেন। ইংরেজির মধ্যস্থতায় এই অসম্পূর্ণ ভাষান্তর সাধিত হয়েছিল বলে এক সময়ে তিনি পরিতাপ করেছেন
When I was young I tired to approach Dante, unfortunately through an English translation, I failed utterly, and felt it my pious duty to desist. Dante remained a closed book to me.
কিন্তু এই শোচনা শিল্পনিপুণ ছদ্ম-ভাষণ। যদিও তাঁর সামগ্রিক কৃতিত্বের পাশে দান্তে তর্জমার দৃষ্টান্ত এমন কিছু অবিস্মরণীয় নয়, এবং সেই কাজ বিশেষত বাল্যকালেই সম্পন্ন, তবু এর এমন একটি তির্যক সার্থকতা আছে যা উপেক্ষণীয় নয়। আক্ষর অনুবাদের একটি অংশ-
জীবনের মধ্য পথে দেখিনু সহসা
ভ্রমিতেছি ঘোর বনে পথ হারাইয়া-
সে যে কি ভীষণ অতি দারুণ গহন
স্মৃতি তার ভয়ে মোরে করে অভিভূত
সে ভয়ের চেয়ে মৃত্যু নহে ভয়ানক।
অতঃপর যখন লিখলেন-
আঁধারে অরণ্যভূমি নয়ন মুদিয়া
করিতেছে ধ্যান,
অসীম আঁধার নিশা আপনার পানে চেয়ে
হারায়েছে জ্ঞান।
… … …
আঁধারে নিজের পানে চেয়ে দেখি, ভালো করে
দেখিতে না পাই-
হৃদয়ে অজানা দেশে পাখি গায় ফুল ফোটে
পথ জানি নাই।
নিশীথজগৎ ছবি ও গান
তখন বোঝা গেল দিভিনা কম্মেদিয়া থেকে নিছক পুনরনুবাদ তাঁর উদ্দেশ্য ছিল না। আত্মপ্রতিকৃতির প্রয়োজনেই দান্তের আঁকা নরকনিসর্গ তিনি আবার আরেক রঙে আঁকতে চেয়েছেন, যেখানে নিজেই তিনি পথ হারিয়ে ফেলেছিলেন।
২
ঊনিশ-শতকে বাংলা সাহিত্যের আবহে দান্তের আবির্ভাব প্রকাশ্যে প্রবলরূপে অভিনন্দিত হয়নি। শেকসপিয়রের প্রেরণায় প্রথা ভেঙেছিলেন গ্যেটে এবং আমাদের ইয়ং বেঙ্গলের দ্রোহদর্পণে Sturm und Drung-এর ঝোড়ো হাওয়ার শ্বাসবাষ্প নিশ্চয় লেগেছিল। এরই মধ্যে দান্তের জন্য একটি প্রত্যাশাভূমি গঠিত হচ্ছিল। ‘চির অস্থির উদাত্ত এক শান্তি যেমন জেনেছে চণ্ডীদাস বা দান্তে’ (বিষ্ণু দে)-গত শতকের ক্রান্তিক্ষণে ঝড়তুফানের মধ্যেও কেউ-কেউ আত্মস্থতার আর্তিতে দান্তের দিকে তাকিয়ে বিবেকের তানপুরা বেঁধে নিচ্ছিলেন। মধুসূদন ‘কবিগুরু দান্তে’কে নিয়ে যে-স্তব লিখেছিলেন তার মৌলতা একই বিষয়ে টেনিসনের প্রণীত কষ্টকল্পিত স্তুতির বৈষম্যে অনুভব করা যায়। ভিক্টোরীয় রাজকবির সাত লাইনের পদ্যপ্রস্তাবটি –কবির স্বীকৃতি অনুযায়ী —‘Written at the request of Florentines’ এবং তাতে শেষ দু’ ছত্রে অভিনীত বিনয়ের প্রদর্শন থাকলেও অন্তরঙ্গ দৃষ্টির অভাব ছিল। কিন্তু মধুসূদন দান্তেকে স্বরচিত কবিতার পটভূমিতে প্রাসঙ্গিক বলে উপলব্ধি করেছিলেন —
নব কবি-কূল-পিতা তুমি, মহামতি,
ব্রহ্মাণ্ডের এ সুখণ্ডে। তোমার সেবনে
পরিহরি নিদ্রা পুনঃ জাগিলা ভারতী।
দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে
সে বিষম দ্বার দিয়া আঁধার নরকে,
যে বিষম দ্বার দিয়া, ত্যজি আশা, পশে
পাপ প্রাণ, তুমি, সাধু, পশিলা পুলকে।
জানি না, শ্যেলিং দান্তে সম্বন্ধে যে-সমীক্ষণ করেছিলেন, এই চতুর্দশপদী লিখবার মুহূর্তে মধুসূদন সে সম্পর্কে জাগর ছিলেন কি না। কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহ নেই, ইনফের্নোর তৃতীয় সর্গ থেকে গৃহীত চিত্রকল্প তিনি সনেটে সংহত করবার আগেই মেঘনাদবধ কাব্যের অষ্টম সর্গে তাঁর অভ্রান্ত তীক্ষ্ণতার সঙ্গে প্রয়োগ করেছিলেন —
আগ্নেয় অক্ষরে লেখা, দেখিলা নৃমণি
ভীষণ তোরণ-মুখে—‘এই পথ দিয়া
যায় পাপী দুঃখদেশে চির দুঃখভোগে—
হে প্রবেশি, ত্যজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে।
রবীন্দ্রনাথ-যিনি বারংবার মধুসূদনের অন্যমেরুর কবি বলে কীর্তিত— যে অনুবাদ করেছেন, মধুসূদনের প্রভাবে নিমজ্জিত —
দান্তে নরকের তোরণে গিয়া উপস্থিত হইলেন। তোরণে অস্ফুট অক্ষরে লিখা আছে —
মোর মধ্য দিয়া সবে যাও দুঃখদেশে;
মোর মধ্য দিয়া যাও চির-দুঃখভোগে;-
চিরকাল তরে যারা হয়েছে পতিত,
মোর মধ্য দিয়া যাও তাহাদের কাছে।
ন্যায়ের আদেশে আমি হয়েছি নির্মিত-
অনন্ত জ্ঞান ও প্রেম স্বর্গীয় ক্ষমতা-
আমারে পোষণ করা কার্য তাহাদের।
মোর পূর্বে আর কিছু হয় নি সৃজিত-
অনন্ত-পদার্থ ছাড়া, তাই কহিতেছি
হেথায় অনন্তকাল দহিতেছি আমি।
‘হে প্রবেশি, ত্যজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে।
এই অনুবাদ রবীন্দ্রনাথের মাইকেল মনস্কতার উচ্চারিত ও আভ্যন্তর অভিজ্ঞান। ইতিপূর্বে ছবি ও গান থেকে উদ্ধৃত অংশের সঙ্গে মধুসূদনের ‘নাহি ডাকে পাখি / নাহি বহে সমীরণ সে ভীষণ বনে / না ফোটে কুসুমাবলী বনসুশোভিনী’র আন্তর আত্মীয়তা স্পষ্ট। সন্দেহ নেই, মধুসূদনের দ্রঢ়িষ্ঠ নৈরাশ্য উদীয়মান উত্তরসূরীর হাতে অবারিত বিষাদ ও প্রার্থিত আশাবাদের মিশ্রণে পরিণত হয়েছে। সদ্যপ্রদত্ত দু’টি উদ্ধৃতি দুই কবির এই সম্পর্ক বিশদ করে দেয়। রবীন্দ্রনাথ দান্তে-অনুবাদ-কালে মধুসূদনের একটা গোটা লাইন ঢুকিয়ে দিয়েছেন বলেই নয়, একথা মনে করবার সংগত কারণ আছে, পূর্বসূরীর কবিতার প্রছন্ন অনুষঙ্গ মেলে ধরে সেই অনিবার্য প্রভাবকে ব্যবহার করছেন। অতঃপর সচেতন হয়ে তিনি তাঁর উপরে মাইকেলের ওই প্রভাব অস্বীকার করতে চেয়েছেন, কিন্তু ততক্ষণে স্বকীয় কবিতার মর্মে সেটি অনুস্যূত হয়ে গিয়েছে। আরও দুটি দৃষ্টান্ত এখানে উপস্থিত করা যায় —
১. অন্ধকারময় পুরী, উঠিছে চৌদিকে
আর্তনাদ; ভূকম্পনে কাঁপিছে সঘনে
জল, স্থল; মেঘাবলী উগরিছে রোষে
কালাগ্নি; দুর্গন্ধময় সমীর বহিছে,
লক্ষ লক্ষ শব যেন পুড়িছে শ্মশানে!
(অষ্টম সর্গ)
২. কবি বর্জিল ভীত দান্তেকে সান্ত্বনা করিয়া একস্থানে লইয়া গেলেন—
সেখানে— দীর্ঘশ্বাস, আর্তনাদ, ক্রন্দন, বিলাপ —
তারকা অবিদ্ধ শূন্য করিছে ধ্বনিত,
শুনিয়া, প্রবেশি সেথা উঠিনু কাঁদিয়া।
নানাবিধ ভাষা আর ভয়ানক কথা,
যন্ত্রণার আর্তনাদ, ক্রোধের চিৎকার
করতালি–কঠোর ও ভগ্নকণ্ঠ ধ্বনি—
নিরেট সে আঁধারের চারিদিক ঘেরি
ঘূর্ণ-বায়ে রেণুসম ফিরিছে সতত!
(রবীন্দ্রকৃত তর্জমা)
কড়ি ও কোমলে সমন্বিত মধুসূদনের প্রতিভা যেখানে মুহূর্তের পরিসরে প্রলয়শঙ্খ বাজিয়ে দিতে পেরেছে, রবীন্দ্রনাথের ব্যাখ্যাবর্ণনাধর্মী যন্ত্রণায় সেই মহিমা খুঁজে পাওয়া অসম্ভব। কিন্তু, শুদ্ধ অনুভবের সরলীকরণ সত্বেও রবীন্দ্রনাথের নন্দন-জিজ্ঞাসার বৈপ্লবিক যে পরিচয় এখানে লুকিয়ে আছে সেটি হল অন্তর্বিক্ষোভকে চূর্ণ-চূর্ণ করে অংশ-প্রত্যংশের মধ্যে তাকে জানা এবং পরিশেষে তার ভিতর থেকে দর্শকের ভঙ্গিতে বিবিক্ত হওয়া। যাঁরা মিলটনের সঙ্গে মাইকেলের সগোত্রতার তদন্তে তৎপর তাঁদের কাছে প্যারাডাইস লস্ট বিষয়ে জনসনের বক্তব্য আপত্তিকর হলেও পুর্নবার বিবেচ্য বলে মনে হয়। মিলটনের মানব মানবীরা সকলেই স্বীয় সন্তাপের মধ্যে অবরুদ্ধ—একজনের পক্ষে আরেকজনের যন্ত্রণাময় অবস্থান পরিজ্ঞাত হওয়া সম্ভব নয়; পাঠকের পক্ষেও পারাপারের সহানুভব-সেতুটি খুঁজে পাওয়ার কোনও উপায় নেই—জনসনের এই নিরীক্ষণ অন্তত অংশত সত্য। মধুসূদনের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে তো অপেক্ষাকৃত অনেক-বেশি সত্য। মধুসূদন তাঁর নির্মিত নরনারীর সুখদুঃখের সঙ্গে একান্ত জড়িত, তাদের জন্য সমবেদনায় আর্ত। এখানেই মিলটনের সঙ্গে তাঁর মানসিকতার ব্যবধান যোজনব্যাপী। রবীন্দ্রনাথ, যিনি বাংলা ভাষায় মনস্তত্বভিত্তিক উপন্যাসের জনক, সহানুভূতির (sympathy) চেয়েও সমানুভূতি (empathy) আশ্রয় করেছিলেন। মধুসূদন এবং রবীন্দ্রনাথ দুজনেই অজস্র বস্তু-বিভাব (objective correlative) ব্যবহার করেছেন এবং নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকে চরিত্রসৃষ্টি করেই সেই বিভাবগুলিতে প্রাণময়তা এনেছেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথে ক্রমশ যতই অনাত্ম-অহং বা anti-self কার্যকরী হয়েছে, মধুসূদন ততই আত্মস্বরূপের কাছে বিষণ্ণভাবে ধরা দিয়েছেন। তা সত্বেও তাঁর বেদনাকে সুন্দর আধারে সুরক্ষিত করতে পেরেছিলেন বলে যিনি ব্যক্তিগত বেদনাকে লুকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন সেই রবীন্দ্রনাথের অবচেতন প্রলোভন এবং দুর্দমনীয় সংস্কার মধুসূদন। দান্তের কাছে মধুসূদন গোপনে পাঠ নিয়েছিলেন। দান্তের কবিতার ভাবাসঙ্গ ও চরিত্রায়ণ তাঁকে স্পর্শ করেছিল। তাই কেরন আর অ্যাকেরন হয়ে উঠেছে কৃতান্তচর ও বৈতরণী নদী। দান্তে অগ্নিপরীক্ষা উত্তীর্ণ হবার আগে দেখেছিলেন উতরোল গঙ্গায় মধ্যদিনের সূর্য। কিন্তু দান্তের কবিতার ওই ভারতীয়তা মধুসূদনকে ততটা আলোড়িত করেনি যতটা দিভিনা কম্মেদিয়ার পাপ ও প্রতিবিধানের ধারণা। বঙ্কিমচন্দ্র যখন শৈবলিনীকে শাস্তি দিতে গিয়ে লিখেছিলেন ‘শৈবলিনী দেখিল সম্মুখে এক অনন্তবিস্তৃতা নদী। কিন্তু নদীতে জল নাই–দু’কূল প্লাবিত করিয়া রুধিরের স্রোতঃ বহিতেছে’ তখন ইনফের্নোতে বর্ণিত ফ্লেগেথনের ছবি তাঁর মনে ছিল। এবং বঙ্কিমের বর্ণনার প্রেরণা মধুসূদন, যিনি পাপপুণ্যের অনেক চিত্রকল্প দান্তের কাছ থেকে গ্রহণ করেছিলেন। মধ্যযুগের খ্রিস্টীয় কবি দান্তে এবং আধুনিক যুগের খ্রিস্টীয় কবি মধুসূদনের পাপ-বোধের প্রকৃতি এক ছিল না। কিন্তু দু’জনেই পাপের সঙ্গে সৌন্দর্যের রহস্যময় যোগাযোগে বিশ্বাসী ছিলেন। দান্তের নরক যত সুন্দর স্বর্গ তার কাছে নিষ্প্রভ এবং মধুসূদনের চিত্রিত নরকেও ‘দাবদগ্ধ বনে, মরি, ঋতুরাজ যেন বসন্ত’।
পাপের মধ্য থেকে যে-সুন্দরের জন্ম পরিশীলনের মধ্য দিয়ে মহাসুন্দরে তার �ালন হতে পারে। লৌকিক কবিতা এবং ত্রুবাদুর বাউলদের সঙ্গে পরিচিত দান্তে সে কথা জানতেন। তাই তাঁর অন্তিম সুন্দর জ্যোতির্ময় স্বর্গীয় গোলাপের প্রতীক ও সংজ্ঞায় উদ্ভাসিত। রবীন্দ্রনাথের আদিপর্বের কবিতায় অকল্যাণের অসিত আবহ উদঘাটিত ও বিশ্লেষিত হয়েছে। ‘মানসী’তে এই প্রবণতা শেষবারের মতো প্রকটিত। রবীন্দ্রনাথের দান্তে দ্বন্দ্বজটিল উত্তরণের শিক্ষক। এই দ্বন্দ্ব মধুসূদনের চেয়েও জটিল, কেননা, মধুসূদন স্বচ্ছতার প্রয়োজনে বিসংবাদী বৃত্তিগুলিকে ঐহিক পরিসীমার ভিতরে সংকুচিত করে তুলেছিলেন, বিচিত্রের সমবায়ী সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে পরমার্থিক ঐক্যের অনুশীলন করেননি।
এই সমস্যার সাহায্যে হেমচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়কে তাঁর শোচনীয় অখ্যাতির অন্ধকার থেকে পুনরুদ্ধার করা যায়। তাঁকে আমরা সাধারণভাবে জানি বিদ্রুপক্ষম এবং বিদ্রুপার্হ একজন পদ্যকর্তার ভূমিকায় যিনি মধুসূদনের আলোয় অন্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর ছায়াময়ী উনিশ-শতককে তার বহিরাশ্রয়িতা থেকে অন্তর্জগতের অনিকেত পরিস্থিতির দিকে আকর্ষণ করেছিল। গত শতকের প্রথম তিন দশকে ইংল্যান্ড দান্তের যে-পুনঃপ্রবর্তনা ঘটেছিল, ছায়াময়ীতে সমালোচক হরেন্দ্রমোহন তারই ছায়া লক্ষ করেছেন। ভারতীয় থিয়সফিক্যাল সোসাইটির আত্মিক গবেষণাগুলির ফলশ্রুতিসত্বেও ছায়াময়ী ভূতুড়ে গল্পের মতো এবং কবিতার চাহিদা মেটাতে অক্ষম; বরং এরই দু’বছর আগে দ্বিজেন্দ্রনাথের লেখা স্বপ্নপ্রয়াণ-এ দান্তেসংস্পর্শ আরও সার্থক-সমালোচকের এই সমস্ত নিরূপণ মেনে নিয়েও এই কাব্যে হেমচন্দ্রের প্রতিহত মানসের অসংখ্য সঞ্চারী সম্ভাবনা চোখে পড়ে। দিভিনা কম্মেদিয়া হেমচন্দ্রের কাছে ‘অদ্বিতীয় কাব্য’। দান্তের ‘ভাবের রচনা-প্রণালীর সাহায্য গ্রহণ’ করেছেন তিনি। পাওলো-ফ্রাঞ্চেস্কার কুটিল সমর্পণের রক্তিম রূপকথা অথবা মাতেলদার নিবেদিত সারল্যের টানাপোড়েনে দান্তের ভাবের যে-রচনাপ্রণালী গড়ে উঠেছিল হেমচন্দ্রের লেখায় তার আভাসমাত্র নেই। সাতটি পল্লবে সম্পূর্ণ এই কাব্যের অনেকগুলি পল্লবই জীর্ণ হয়ে এসেছে। শুধু রচনাদোষে নয়, দান্তের কবিতায় সর্গ থেকে সর্গে অনুভূতির বিন্যাসে বিজ্ঞানসম্মত যে-বিবর্তন পদ্ধতি প্রযুক্ত হয়েছে সেই ভাবক্রম ধরতে পারেননি বলে হেমচন্দ্রের পরাভব ঘটেছে। কিন্তু নরকচিত্রণে উৎসাহী হেমচন্দ্র আত্মার পরিবেশ রচনায় সামর্থ্য দেখিয়েছেন —
১. প্রবেশি গহ্বর-মুখে শুনিল শরীরী
যেন কত প্রাণি রব, একত্র মিলিছে সব
কলরবে সে প্রদেশ পরিপূর্ণ করি।
নিবিড় অরণ্য যথা মারুত-নিস্বনে।
পত্র ঝর-ঝর স্বরে, সর্বদিক পূর্ণ করে,
তেমতি অস্ফুটনাদ, ঘন স্বর সবিষাদ।
বহে স্রোত নিরন্তর সে ঘোর ভুবনে।
২. না পারে দেখাতে মুখ কেহ অন্য কারে,
জড়ীভূত শীর্ণ কায়া, সেই সব জীব-ছায়া
নিশ্চল–নির্বাক– যেন ভূজঙ্গ তুষারে!
এবং স্বর্গপথে বেয়াত্রিচের প্রতিরূপ —
চলিল গগনপথে অমর-সুন্দরী
কিরণের রেখা-মত শোভা করি নীল পথ
সুধাগন্ধে বায়ুস্তর পরিপূর্ণ করি
…
গগনের সেই দেশে যেখানে নক্ষত্রবেশে
অনন্ত ভূখণ্ডরাজি করয়ে ভ্রমণ।
এই সব বিচ্ছুরিত সমারোহের মধ্যে থেকে-থেকে আছে ভাবগত ছন্দপতন এবং সবশেষে ওড টু দি নাইটিঙ্গেল -এর স্বপ্নজাগর, হতচকিত চিত্তাবস্থার প্রতিধ্বনি। মনে রাখা আবশ্যক, কিটসে এই অবরোহণ রোমান্টিক কবিতার প্রতি অন্যান্যের মতো হেমচন্দ্রেরও আসক্তি প্রমাণ করে। রোমান্টিক মনস্তাপের মধ্যেই হেমচন্দ্র প্রত্যাবর্তন করেছেন এবং তারই মধ্যে হঠাৎ কখন সত্তার উত্থান-পতনের বৃত্তান্তটি একাকার হয়ে হারিয়ে গিয়েছে। প্রাচীন বিশ্বপরিক্রমার শেষে উনিশ-শতকের রোমান্টিকদের কাছেই থেমেছিলেন রবীন্দ্রনাথ, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের মনে সেই রোমান্টিকতা পুনর্জাত হয়েছিল। রোমান্টিক কবিতাকে হেমচন্দ্র ভালোবেসেও এই কারণে বিশ্বাস করতে পারেননি যে তার সহায়তায় ভাবীভাষণ চললেও যুগ, সভ্যতা বা সমাজের চেহারা পালটে দেওয়া যায় না। পক্ষান্তরে, রবীন্দ্রনাথ স্থির করে নিয়েছিলেন শুধুমাত্র আত্মসংস্কৃতিই তাঁর উদ্দিষ্ট। তাই হেমচন্দ্রের মতো ব্যবহারিক উচ্চাশার কবলে কবিতাকে অসাড় পঙ্গু না করে তিনি তাঁর রোমান্টিকতাকে ব্যক্তিত্বের পুনর্বিন্যাসের দিকে সঞ্চালিত করেছিলেন। রোমান্টিক কাব্যাদর্শ তাঁকে শিখিয়েছিল সম্পূর্ণ নিজের মতো হতে এবং তারপরে তিনি নিজেকে অতিক্রম করে গিয়েছিলেন। সেখানে, অর্থাৎ আত্মবিদারী অস্তিত্বের বিশাল মানচিত্র খুলে ধরার বেগবন্ত প্রক্রিয়ায় দান্তের সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য তুচ্ছ করবার মতো নয়। দুজনের জীবনই প্রতীকনাট্যের প্রধান চরিত্র। ওই নাটক শেষ হয়েছে দু’জনেই যেখানে চরিত্র থেকে সূত্রধারের ভূমিকায় সরে দাঁড়িয়ে অনুভব করেছেন।
একি রহস্য একি আনন্দ নূতন ভুবন জুড়ে
মহান বৃত্ত –দিব্য প্রতিমা তারি পরে সমাসীন,
ডানা মেলে নয়, উত্তরণের সৌরশিখরচূড়ে
এসেছি সহসা রৌদ্রাভিসারে, দেখেছি অন্তহীন
আবর্তরত আলোকচক্র নিহিত বহতা ধারা
অন্তরে সুধা সঞ্চিত ক’রে দিগন্তে বিস্তৃত
প্রেমের মন্ত্রে চলে চরাচর সূর্য চন্দ্র তারা।
গীতাঞ্জলি-কে এজরা পাউন্ড পারাদিসো-র সঙ্গে তুলনা কেন করেছিলেন, তার যুক্তি এখানেই।
৩
মহাভারতের তুলনায় দান্তের পটভূমি ছোট; কম্মেদিয়ার ভাবনা বেদনা শ্লেষ ধিক্কার আগুন ও গভীরতা সত্বেও আমার মনে হয় একটা প্রায় অনিঃশেষ ক্রন্দসীকে আলিঙ্গন করে মহাভারত বেশি গভীর। কিন্তু দান্তে সময়ের দিক দিয়ে আমাদের ঢের নিকটে। ঠিক আধুনিক পৃথিবীতে বাস না করলেও আধুনিক ভাবপৃথিবীর (সব দিকের নয়, খুব কম দিকের নয় তবুও) পিতা হবার সুযোগ তাঁর ঘটেছিল।
—জীবনানন্দ দাশ, ‘কি হিসেবে শাশ্বত’, কবিতার কথা
এই পর্যন্ত ব’লেও ‘কালপ্রবাহী’ দান্তের অমরতা জীবনানন্দ অনুযোগ উত্থাপন করেছেন, তাঁর কাব্যে তখনকার ইতালীয় রাষ্ট্রনৈতিক ইতিহাসের ঘনঘটা বড় বেশি। ‘উপলব্ধি প্রকাশের অদ্বিতীয় পদ্ধতি—যা আদি আধার ও আধারের মিলনীদেশের অনির্বচনীয় সত্যেরই সামিল প্রায়— সে রকম দান হিসেবে তাঁর কাব্য বেঁচে রয়েছে’,জীবনানন্দের এই উচ্চারণ গূঢ়ার্থজ্ঞাপক। দান্তে কোনও বিরাট তত্ব দিয়ে গেছেন ব’লেই তিনি মহাকবি তা নয়। তা যদি হত তাহলে তাঁর চিন্তাবস্তুর জন্য টমাস অ্যাকুয়েনাস প্রমুখ মনস্বীকেই কৃতজ্ঞতা জানালে চলত। কিন্তু পাপ-অপাপ, প্রেম-অপ্রেম, আলো-অন্ধকার, উপায়-উদ্দেশ্যকে দান্তে সতেজ নতুনত্ব নিয়ে নেড়ে-চেড়ে দেখেছিলেন এবং কবিতার প্রকরণকে তার বিষয়বস্তুর উৎস ও মোহনার সঙ্গে সমীকৃত করে দিতে পেরেছিলেন। বিষয়ের অত্যন্ত কাছে কণ্ঠস্বরকে সন্নিবেশিত করার ক্ষমতা ছিলো তাঁর। আমরা জীবনানন্দে এই ক্ষমতা দেখেছি, যদিও তাঁর কবিতায় দান্তের চেয়েও শেক্সপীয়রের অভিঘাত প্রচুরতর। ‘সৃষ্টির বিষের বিন্দু আর / নিষ্পেষিত মনুষ্যতার আঁধারের থেকে আনে কী করে যে মহা-নীলাকাশ / ভাবা যাক, ভাবা যাক /ইতিহাস খুঁড়লেই রাশি-রাশি দুঃখের খনি / ভেদ করে শোনা যায় শুশ্রূষার মতো শত-শত / শত জলঝর্ণার ধ্বনি’ –একটানা এই সংলাপে ‘পুর্গতোরিও’র (২৮।৮৫-৯৩; ১২১-৩০) নিলীন ভাবনা খনন ক’রে উপরে হয়তো দান্তের প্রগাঢ় প্রভাব আবিষ্কার করা যায়, কিন্তু আত্মপ্রশ্ন ও দৃপ্ত প্রতীতির সমীকরণে জীবনানন্দ আঙ্গিক ও প্রসঙ্গকে যেরকম কাছাকাছি এনেছেন সেখানে দান্তের প্রবর্তনা অনুসন্ধান করলেই পরিশ্রম সফল হবে বলে মনে হয়।
‘অন্ধকারে সবচেয়ে সে শরণ ভালো / যে-প্রেম জ্ঞানের থেকে পেয়েছে গভীরভাবে আলো’। দান্তে দেখিয়েছেন প্রজ্ঞান ও প্রেম জাগলে আলো ভাস্বরতায় অজস্র গুণ বেড়ে যায়। প্রজ্ঞান-প্রেম-আলোর পারস্পরিক এই সম্পর্ক দান্তের কবিতার প্রধান আকর্ষণ। দান্তে যখন বেয়াত্রিচেকে জিজ্ঞাসা করলেন, আরব্ধ প্রতিজ্ঞাগুলি যদি চরিতার্থ না হয়, মহৎ অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে সেই অপরাধের ক্ষতিপূরণ সম্ভব কিনা। বেয়াত্রিচে উত্তর দেবার আগে অমল সৌন্দর্যে দিগ্বিদিক আলো ক’রে তাঁকে নিরস্ত করলেন। কবিজীবনের প্রান্তিক উৎসর্গে জীবনানন্দও সেই নিরুত্তর আলোকবর্তিকার কাছে আনত হয়েছেন —
মহাবিশ্ব একদিন তমিস্রার মতো হয়ে গেলে
মুখে যা বলনি, নারি, মনে যা ভেবেছ তার প্রতি
লক্ষ্য রেখে অন্ধকার শক্তি অগ্নি সুবর্ণের মতো
দেহ হবে মন হবে—তুমি হবে সে-সবের জ্যোতি।
৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা
(দান্তে বিশেষ সংখ্যা ১৩৭৩)
