প্রতিমা নন্দলালের নূতন রূপকৃতি – কানাই সামন্ত
কবির ভাষাতে বলতে গেলে নির্জনে নিভৃতে ‘আছি’তে, ‘আছি’তে মৃদুমধুর করতালি বাজছে।…
‘আমার বেলা যে যায় সাঁজ বেলাতে’ এ গান যখন সবে রচিত হয়েছে, তারই সুরের রেশে অবনীন্দ্রনাথকে গাইতে শুনেছি গুনগুন স্বরে-
আমার বেলা যে যায় সাঁজ বেলাতে
তোমার সুরে সুরে সুর মেলাতে।
আমার একতারাটির একটি তারে
সুরের বেদন বইতে নারে
আমার তুলি সইতে নারে
নিখিল রঙের বেদন বইতে নারে-
ওগো, তোমার সাথে বারে বারে
আমি হার মেনেছি এই খেলাতে।
কত যে দরদ, কত বিচিত্র আখর তা বলা যায় না। এ গান তো আসর সাজিয়ে পাঁচজনকে শোনানো নয়, হাতের তুলি হাতে থাকতেই নিজের মনে নিজেকে শোনানো হাতওয়ালা আরামকেদারাটিতে বসে-অন্য কে শুনল না-শুনল বড়ো খেয়াল নেই-দক্ষিণের বারান্দায় সবে মাত্র চাঁপারং রোদটি এসে পড়েছে, চঞ্চল দুটি চড়ুই নাচানাচি করছে রেলিঙের উপর বা কার্নিশের ধারে, আর বাগানের গাছপালাগুলি দেখা যায় আলোছায়ায় বাতাসে ঝিলমিল করছে। কিন্তু গুরু অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে শিষ্য নন্দলালের সর্বাঙ্গীন তুলনা তো হয় না। তাই কবির অন্য একটি গানের ভাষায় বড়ো জোর বলতে পারি-
খেলার ছলে সাজিয়ে তোমার রূপের বাণী
দিনে দিনে ভাসাও দিনের তরীখানি।
না, তাও কি বলা যায়? শিল্পী নন্দলালের শিল্পসাধনায় চিরদিন ছিল একটি শুদ্ধসংযত আরাধনার ভাব, আর আজও আছে। অশীতিবর্ষের কাছাকাছি এসে শারীরিক শক্তি অল্প, ইচ্ছামতো হাঁটতেও পারেন না, আর মানসিক শক্তি সযত্নে সংরক্ষণ করে দিন থেকে দিনে উজিয়ে চলেছেন। অথচ আজ এক বছরের বেশি হল সদ্য-আলো- ফুটে -ওঠা সকাল বেলায় নির্জন ‘কাচের ঘরে’, নিজের কাজের ঘরে, বসে একমনে তুলি ধরে দিনের পর দিন যে ছবিগুলি আঁকছেন-প্রত্যহ প্রভাতে একখানি করে ছবি আঁকেন-‘খেলা’ না বলে এ কথা বলাই ভালো যে, যে তাঁর পক্ষে প্রকৃতির পূজা , আরাধনা, প্রকৃতির অন্তর্লীন সর্বানুভূ যে চেতনাসত্তা তাঁরই পূজা। এখানেই রবীন্দ্রনাথ বা অবনীন্দ্রনাথের সঙ্গে শিল্পী নন্দলালের চরিত্রগত প্রভেদ। পূজা যেমন বলা যায়, তেমনি বলা চলে ‘আমি আছি এবং তুমি আছ, সব হয়েই আছ’ এই নিগূঢ় গভীর অবচন বোধ থেকেই একটি সুখ বা সন্তোষ-রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেন দুই ‘আছি’তে আছি’তে অনুচ্চ মধুর করতালির আওয়াজ-এই যেন রূপের পুজারি , রূপদর্শী নন্দলালের নতুন এই চিত্রধারার নিহিত তাৎপর্য। যে নিষ্ঠা-সহকারে, যেমন নিয়ম-পূর্বক, ভক্ত বা সাধক প্রতিদিন ইষ্টের ধ্যানধারণা আরাধনা করেন, বুঝি তারই সঙ্গে এর অন্তর্গূঢ় সাদৃশ্য।
এই হল শিল্পী-প্রকৃতির বিশেষ পরিচয়। এই চিত্ররূপের বিশেষ প্রকৃতি কী সেটিও প্রণিধানের বিষয় আর বড়োই চমৎকারজনক। শ্রেষ্ঠ কাব্যে দেখা যায় নিরলংকৃত স্বভাবোক্তির ভাবলাবণ্য ও চমৎকারিত্ব। আমরা আলংকারিক নই, সংজ্ঞার্থ মিলিয়ে নির্দোষ উদাহরণ অবশ্যই উপস্থিত করতে পারব না। তবু নানা যুগের নানা কবির রসাত্মক বাক্য অন্তরে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত –
যখন মল্লিকাবনে প্রথম ধরেছে কলি
তখনি বন্ধু, তোমার লাগিয়া বেঁধেছিনু অঞ্জলি
এ উক্তিতে অলংকারের বাহুল্য কী আছে?-
আমি যে সইতে পারি নে,
সুরে বাজে মনের মাঝে গো,
কথা দিয়ে কইতে পারিনে
অথবা-
রূপনারায়নের কূলে জেগে উঠিলাম,
জানিলাম এ জগৎ স্বপ্ন নয়
এই সব ছত্র কি সত্যই নির্ভূষণ নয়? আছে অনায়াসে অব্যর্থ ছন্দ, অন্তর্নিহিত সুর, আর অনির্বচনীয় কত ভাবের অনুষঙ্গ। তাইতেই রসিকচিত্তের দূর-দূরান্তর পর্যন্ত শিহরন জাগে, জন্মজন্মান্তর বুঝি উদবোধিত হয়ে ওঠে। জানকীর স্পর্শ সুখে শ্রীরাম যখন বলেন-
বিনিশ্চেতুং শক্যো ন সুখমিতি বা দুঃখমিতি বা
প্রবোধো নিদ্রা বা কিমু বিষবিসর্পঃ কিমুমদঃ।
সুখ বা দুঃখ বুঝি নে স্বপ্ন অথবা জাগরণ, বিষের না অমৃতের এই প্রতিক্রিয়া। নব অনুরাগে উৎকন্ঠিতা শ্রীরাধা বলেন-
আস্তাং তদীয় নবযৌবনপূর্ণবাপী
কাপীয়মাত্র ন করোমি নিমজ্জনেচ্ছাম।
ইচ্ছামি তং কমপি কালমলজ্জমুচ্চৈঃ
আক্রন্দিতুং সুমুখি হা প্রিয় হা প্রিয়েতি।
নবযৌবনলাবণ্যে আপূর্ণ শ্যামসায়র আমার সামনে, আমার ভাগ্য হবে না সখি নিমজ্জনস্নানে নেমে যেতে, ঝাঁপ দিতে-ওরই নির্জন কূলে বসে ‘হা প্রিয়’ ‘হা প্রিয়’ বলে অলজ্জ উচ্চকন্ঠে একবার কাঁদতেও কি পাব না? এসব ক্ষেত্রেও বুঝি অতিশয় সাদাসিধে ভাষায় অতি গভীর আনন্দবেদনাকে ব্যক্ত করা হয়েছে-আলংকারিকেরাই বলতে পারেন সর্বশেষ দৃষ্টান্তে সাঙ্গরূপকের একটা অপূর্ব সুযোগ হেলায় হারানো হয়েছে কি না-আমরা জানি , অন্য কোনও কারুকৌশলে ভাব ভাষার সুনিপুণ সজাগ প্রয়োগে, ঝলোমলো ঐশ্বর্যে, যেন এর শতাংশের একাংশ সাড়া জাগানো যেত না রসিকহৃদয়ে। আমরা জানি, পরিপূর্ণ কলসের মতো অন্তঃকরণ যদি ভরা থাকে অলক্ষ্য রূপরাগে বা রসে, একটু হাত ঠেকালেই, এতটুকু হেলানো হলেই, উছলে পড়ে রস।এই অলৌকিক রস শুকনো জমিতে পড়ে শুষে যাবার নয়, নষ্ট হবার নয়-এ যে আপন আধার আপনি সৃষ্টি করে আর তখনই লক্ষগোচর হয়ে রসিককে বিস্মিত পুলকিত করে। কবি বা শিল্পীর এই হল সিদ্ধ অবস্থা। জরার অধিকারে দেহ হয়তো জীর্ণ এবং পুরাতন, কিন্তু আসক্তি-ক্ষয়ে-যাওয়া অনুরাগ-ধোওয়া দৃষ্টির ঝরোখায় বসে আছে যে জন, বাল্যে কৈশোরে বা যৌবনে যেমন ছিল আজও সে তেমনি নবীন, হয়তো নবীনতর। দৃষ্টি হয়তো অন্তরদৃষ্টিই হবে। চোখের দেখার যা কিছু অভাব বা অপূর্ণতা, মনের দেখায় যে সবই ছাপিয়ে গিয়েছে। চিনা-জাপানিরা এ তত্ব বিশেষভাবেই বোঝেন। রূপকথার পারগামী হতে হলে বিধিদত্ত প্রতিভা তো চাই-ই,আরও চাই সুদীর্ঘ জীবনের একাগ্র এবং অনবচ্ছিন্ন অনুশীলন-এ তাঁরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলেই জানেন। তাই বুঝি রূপরচনার জাদুকর হকুসাই বলেন অশীতি বৎসর বয়সে রূপের মর্মে আজ আমার প্রবেশলাভ ঘটেছে মনে হয়, আরও আশি বৎসরের পরমায়ু পেলে এমনও হতে পারে ‘চিত্রপটে যে ফোঁটাটি ফেলব-যে রেখাটি টানব-সবই কথা কইবে, জীবন্ত হয়ে উঠবে।’ আচার্য নন্দলালের রূপকলা -ব্যাখ্যানে এই চমৎকার উক্তিটি সংকলিত হয়েছে আর তাঁরই সাম্প্রতিক রসরূপ-সাধনার আলোচনায় ও উক্তির প্রাসঙ্গিকতা অল্প নয়।
অসুস্থ দেহের বাধা একটা আছেই এ কথা অস্বীকার করা চলে না। সে বাধা সত্বেও আনন্দঘন সত্তার প্রকাশ নির্ভূষণ সহজ বেশে, বেশি বৈ কম নয় তার স্বভাবসৌন্দর্য। এই কথাটাই এ পর্যন্ত নানাভাবে বলতে চেষ্টা করা গেছে। শিল্পী বলেছেন, একটু বাড়িয়েই বলেছেন আমাদের সে বিষয়ে সন্দেহ নেই বহুদিন ধরে তার ছবিতে ছিল একটা লড়াইয়ের ভাব। ভারতের প্রাচীন রূপরচনার ভাব এবং আদর্শ, সাধনা এবং সিদ্ধি, পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করা চাই অতুল মহিমার উন্নত বেদীতে-মনে মনে এ আকাঙ্ক্ষা তাঁর সর্বদাই ছিল। তিনি বলেন, অবনীন্দ্রনাথে এ ভাব ছিল না বললেই হয়; তাই ফুল ফোটা আর আলো ফুটে ওঠার মতোই সহজ সুন্দর তাঁর অধিকাংশ ছবি-সে যেন ছবি করা নয়, ছবির হওয়া-আপনাকে আপনি যেন রচনা করেছে ছবি। স্বতঃই মনে আসে স্বামী বিবেকানন্দে যে যোদ্ধৃভাব ছিল সেটি ছিল না ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণে। কিন্তু, শিল্পী যাই বলুন, আমরা জানি নন্দনালের চিত্রকৃতিতেও উত্তরকালে এই তন্ময়তা এই স্বাভাবিকতা উপজাত এবং ক্রম-উপচিত হয়ে আজ তাঁর ছবিতেও সৃজন করেছে একটি অবিশ্লেষণীয় ভাবলাবণ্য, রূপদক্ষ শিল্পীর বশীকৃত বর্ণতুলির দান রূপলাবণ্য সেটি নয়। এই গুণ কালে কালে বিস্ময়করভাবে ফুটে উঠেছে-নটীর পূজায়, পঞ্চপাণ্ডবের মহাপ্রস্থানে, প্রত্যাবর্তনে, গাছে-চড়া শবরীকন্যায়, কৃষ্ণকলিতে, আর পোয়ে নাচের ছবিতে গতিরাগের অপূর্ব গানে। বিস্তারিত তালিকা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। এ কথাও অবশ্য স্বীকার করতে হবে, ছাত্র নন্দলালের অতি পুরাতন চিত্র ‘সতী’তে বা ‘শিব-সতী’তে আত্মবিস্মৃত এই ভাবলাবণ্যের কিছুমাত্র ন্যূনতা নেই। গভীর গম্ভীর সৌন্দর্য আছে, লোক-দেখানো কোনও নৈপুণ্য সেখানে নেই ।
তবে আজই যে তাঁর ছবি বিশেষভাবে সহজ হয়েছে, একেবারে ভূষণহীন হয়েই সুন্দর হয়েছে, কেউ ভালো বলে বা মন্দ বলে সে ভাবনা চিত্তপট আর চিত্রপট থেকে সম্পূর্ণ মুছে গেছে, নিছক ইষ্ট-আরাধনায় উৎসর্গ করেছেন শিল্পী আপনার রং তুলি আর অবশিষ্ট শক্তি, প্রতিটি ছবি তার অন্তিম মূল্য পেয়েছে শিল্পীর ‘স্বাক্ষর’ হৃদয়ে ধারণ করে-শিল্পীর পূর্ণপরিণত ব্যক্তিসত্তার, নৈর্ব্যক্তিকতার সীমান্তে উপনীত ব্যক্তিসত্তার, নিগূঢ় পরিচয় সর্বাঙ্গে বহন করে-এজন্যই বিশিষ্ট হয়েছে, অন্যের অনুসরণের বা অনুকরণের অতীত হয়েছে-এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কোনও রূপ তুলনায় আলোচনার সুযোগ নেই, বিচার বিশ্লেষণ নিষ্ফ ল, বার বার শুধু এই কথাই মনে ওঠে-
বড়ো কঠিন সাধনা, যার
বড়ো সহজ সুর।
সেই সাধনার পরিণামেই এই সিদ্ধি। মনে হয়, যা সবচেয়ে সহজ তাই সব থেকে গভীর, গম্ভীর, তাৎপর্যপূর্ণ। আকাশভুবনব্যাপী কত আয়োজনের পরিণামে ঘাসের ডগায় এক ফোঁটা শিশির দেখতে পাই! আর ফুল?-
কত লক্ষ বরষের তপস্যার ফলে
ধরণীর তলে
ফুটিয়াছে আজি এ মাধবী।
নন্দলালের আলোচ্য ছবিগুলি, কদাচিৎ একটু আধটু রং-ছোঁয়ানো হলেও, মোটের উপর সবই প্রায় কালি তুলি দিয়ে আঁকা। চিনা কালি আর ভারতীয় তুলি। অর্থাৎ চৈনিক কালো কালির ছাপ-ছোপে ও রেখায় আঁকা হলেও, সেই বিশেষ পদ্ধতির প্রয়োগকর্তা হলেন ভারতীয় শিল্পী, ভারতেরই বিশেষ ধ্যানে ও জ্ঞানে প্রবীণ, পরিণত। চিনারাই বলে থাকেন, কালিতুলির কাজে তুলিকারই প্রাধান্য, কালি তার সহকারী। রং বা কালি সম্পর্কে চিত্ররূপের অভিজ্ঞ সমাঝদার মাত্রেই যা অনুভব করেন সেটি সুন্দরভাবে ব্যক্ত হয়েছে অবনীন্দ্রনাথের অনুপম ভাষায়, এখানে সংকলন করা যেতে পারে
বর্ণ মেশায় না চোখ, বর্ণ মেশায় মন। মন শরতের আকাশকে কতটা নীল দেখিতেছে বা কতটা উজ্জ্বল বা ম্লান দেখিতেছে তাহারই ওজনটুকু নীলে মেশানোই বর্ণকে ভঙ্গি দেওয়া। আমি কালি দিয়াও শরতের আকাশ দেখাইতে পারি, যদি মনের রঙটুকু সেই কালিতেই মেশাই। কালি তখন আর কালি থাকে না, যদি মন তাহাকে রাঙায় আপনার বর্ণে।
‘কালী কি কালো? [শ্রীকৃষ্ণ কি কালো?]
দূরে তাই কালো।
চিনতে পারলে আর কালো নয়।’১
মন যতক্ষণ কালী হইতে পৃথক আছে, কালী ততক্ষণ কালো কালী মাত্র। আর মন আসিয়া যেমনি মিলিয়াছে অমনি কালী আর কালো নাই, সে ষড়ঙ্গের বরণডালায় আলোর শিখার মতো জ্বলিয়া উঠিয়াছে।
চিত্রকারী শিল্পীর প্রকৃষ্ট উপায় ও উপকরণ -স্বরূপ বর্ণ আর সর্ববর্ণাত্মক কালি সম্পর্কে এ থেকে অধিক আর কিছু বলবার নেই। এ যেমন চিনা-জাপানি শিল্পীগণের উপলব্ধির সঙ্গে মেলে, তেমনি দেখা যায় ভারতের যোগী বা ভক্তদের অপরোক্ষ দর্শনের সঙ্গে, সত্যদর্শনের সঙ্গেও অভিন্ন। আর, শেষ বয়সে তাই শিল্পী নন্দলালও চলেছেন উত্তরোত্তর কালোর সরণীতেই আলোর অভিসারে-তারও বাইরে-বাইরে দৃষ্ট বা আবিস্কৃত কার্যকারণের অতিরিক্ত অন্য আন্তরিক হেতু ও সার্থকতা অবশ্যই আছে। হয়তো সে বহু থেকে একের দিকে মুখ ফেরাবার ইচ্ছাটিরও ইঙ্গিত করছে। এই অজস্র চিত্রের ধারায় শিল্পীর বিশেষ একটি মানসিক অবস্থা, একটি আত্মিক স্থিতি, ফুটে উঠেছে। সেটি ‘ বোধে বোধ’ করা যেমন সুনিশ্চিত, ব্যাখ্যা করা অথবা বর্ণনা করা তেমন দুরূহ। বোধ করি শ্রেষ্ঠ সংগীতের সমে পৌঁছে যে ভাব অনুভব করা যায়, অন্তরের তেমনি শমরস বা শান্তি নির্ভূষণ রূপসৌষম্যের আধারে আমাদের অনুভবগম্য হয়েছে। সংগীতজ্ঞ আমরা নই, তবু এমন আমাদের মনে হয় যে, ওই সমের অস্থির স্থিতিকালে মৌনের অন্তরেই সম্পূর্ণ সংগীতের ছন্দ সুর ও ভাবসুষমা ধরা দিয়েছে, আলোকপ্লাবিত অতিদূর আকাশে একবার স্বর্ণডানা দুটি সম্পূর্ণ মেলে দিয়ে ঈগল যেমন স্থির অচঞ্চল হয়ে থাকে। গতি ও স্থিতির নিত্যদ্বন্দ্বের ক্ষণিক অবসান।
দ্বন্দ্বের ভিতর দিয়েই নিখিল সৃষ্টির প্রতি পদক্ষেপ। রূপসৃষ্টির ক্ষেত্রেও তার অন্যথা হয় না। অন্তর-বাহিরের অন্য অনেক ঘাত-প্রতিঘাত ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া ছাড়াও চিত্রে আছে রূপ ও রঙের বিচিত্র দ্বন্দ্ব, সংস্থিতি আর সমন্বয়। নন্দলালের বর্তমান চিত্রপর্যায়ে রঙগুলি সবই যখন সংহৃত হয়েছে কালো কালিতে, নিখিল রূপের উদ্ভব ও বিলয়ের অন্তরবত যে দ্বন্দ্বটি বিশেষভাবে আমাদের নয়নগোচর সে হল গতি ও স্থিতি নিয়ে। ভাব যখনই নির্দিষ্ট কায়ার দুকূল প্রহত করে ছুটেছে, তারই ছন্দোবেগের পদে পদে, মন্দ বা দ্রুত লয়ের উত্থানপতনে, এ দ্বন্দ্ব চিরন্তন তাতে কোনও সন্দেহ নেই, অথচ এমন ভাবে আর কখনও আমাদের চোখে পড়েনি-কেননা, এমন রিক্ততার ভূমিকায় তা আর কখনও প্রকাশ পায়নি। গতি অপেক্ষা স্থিতির দিকেই শিল্পীর ঝোঁক বেশি, পরিণামে তারই বিশেষ বাজনা। মনে হয়, নদী পৌঁছুল সাগরসংগমের মোহানাটিতে। অথবা পূর্বোক্ত উপমারই আর একবার উল্লেখ করে বলা চলে-গতি ও স্থিতির পরমাশ্চর্য একটি সাম্য-অবস্থায় পৌঁছে এই চিত্ররূপ বিরাজ করছে অতিদূর আকাশের প্রসারিতপক্ষ গরুড়ের মতো। বিভিন্ন দৃষ্টান্তযোগে আমাদের বক্তব্যটি পরিস্ফুট করতে যত্ন করা যাক –
‘জলপ্রপাত’ ছবিটির গতি হল প্রাণ। সমস্ত ছবিটি যেন, সর্বাঙ্গে সর্বতো ভাবে চলিষ্ণু যে বারিরাশি তারই অবিরত অশ্রুত সংগীত। মাছগুলি চলেছে স্রোতের উজানে। কলরোলে প্রসারিত শতধারার তরলস্বর কানে শোনা যাচ্ছে না সে কি শুধু এজন্যই যে ছবি স্বভাবতই নিঃশব্দ? স্বপ্নে যখন ঝড় ওঠে, মহীরূহ ভেঙে পড়ে, এমনকি ভূমিকম্পও হয়, সবই দেখা বাস্তববৎ , তবু কোনও শব্দ শোনা যায় না; প্রাণ খুলে আলাপ করা যায়, এমনকি হয়তো চিৎকার করা হয়, তবু যে যেন মনের সঙ্গে মনেরই অব্যবহিত সংযোগে,শ্রবণেন্দ্রিয় দুটির কোনও কাজ থাকে না; আর স্বপ্নে এমন ছুটে যাওয়ার বা উড়ে যাওয়ার ব্যাপারও কি স্মরণ হয় না যাতে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের কোনও শ্রমসাধ্য চালনার প্রয়োজন থাকে না- সবটাই যেন অনায়াস ভেসে যাওয়া, যে ভাবে শরতের শুভ্রমেঘ ভাসে নীলাকাশে। আমরা শুনেছি , শান্তিনিকেতনের উত্তর সীমানায় নতুন খালের জলে যে প্রপাত সৃষ্টি করা হয়েছে সিমেন্ট,-বাঁধানো ‘ঢল’ বেয়ে তাই শিল্পী একদিন দেখে এসেছিলেন। শিশুর দৃষ্টি আছে বয়স্কের চোখে, তাই ভালো লেগেছিল সন্দেহ নেই, অথচ একটা ‘কিন্তু’ থেকে গিয়েছিল এই যে এ তবু কৃত্রিম, লীলাময়ী প্রকৃতির অলক্ষ্য হস্তের রচনা নয়। কয়েক দিনের মধ্যেই শিল্পী যখন ছবি আঁকতে বসলেন তাঁর নিভৃত ঘরে নিজের আসনে, বাস্তব তাই বুঝি রূপান্তরিত হল স্বপ্নে; এ শুধু জলপ্রপাত নয়, সেই সঙ্গে স্বপ্ন প্রপাতও বটে-‘চলা যেন বাঁধা আছে অচল শিকলে’। বিশেষ করেই বর্তমান পর্যায়ের ছবিতে শিল্পী দিনের পর দিন এঁকে যাচ্ছেন দূরের ছবি-দেশ কাল মানবিকতার সব দিক দিয়েই দূর, দূর অথচ মধুর। অতি নিকটের বাস্তবকেও তাই আপন মনের অনুকূলে, মুডের বশে, অতি দূরের করে নিয়েছেন। পাঁচটি পুঁটি মাছের ছবিতে মাছ ক’টির চোখের কোণে কোণে বা কানকোয় একটু আধটু লালিমা ছোঁওয়ানো আছে, ভস্মে-ঢাকা এক আধ রতি বহ্নিদীপ্তির মতো। প্রাচীন চীনা চিত্রকরেরা কালিতুলির ছবিতে রঙের এমন ব্যবহার করেছেন এ না হয় প্রসঙ্গত বলা গেল। ছবিটিতে দেখছি কি জলতলের শৈবাল বা উদ্ভিদ গতিশীল স্রোতে অধীরভাবে কাঁপছে অস্তিত্বের সুখে, আর সেই স্রোতে সেই একই বিশুদ্ধ ‘অস্তি’ র আনন্দে ছোট বড়ো মাছ ক’টি স্রোতের বিপরীত মুখে স্থির হয়ে রয়েছে। তারা চলছে না; যে তাদের জীবনের জীবন, আবাস ও আধার-স্বরূপ, অদৃশ্যপ্রায় স্বচ্ছ প্রবাহে সেই চলেছে অবিরল স্পর্শসুখে তাদের সর্বাঙ্গ প্লাবিত করে -স্থির মাছগুলির অপলক অক্ষিতারায় -তারায় চকিত ঝিকিমিকি অনুমান করলেও করা যায়।
গিরিসংকটে তিনটি হনুমান বা গিরিব্রজে সানু-সোপানে -অধিষ্ঠিত গুটি তিন বাংলো ছাঁদের বাড়ি, এ যেন আর এক প্রকারের চিত্র। পরিবেশ আর পরিপ্রেক্ষিতের বদল আর সেই সঙ্গেই শিল্পীর আত্মপরিচয়ের নতুন দিকও যেন উদঘাটিত। প্রথমোক্ত চিত্রে রুক্ষকঠিন তৃণতরুহীন পাষাণের সংহত স্থৈর্য আর তারই ক্রোড়ে তিনটি প্রাণী-তাদের আকারে অবয়বে বা ভঙ্গিতে প্রাণচঞ্চলতা অল্পই। পাথরে আর প্রাণীতে রূপের বৈপরীত্য বা বিশিষ্টতা (character) ফোটাবার প্রয়োজনে , বর্তনাপ্রয়োগে বা রেখাবিন্যাসে যেটুকু প্রভেদ না থাকলে নয় তাই ব্যবহার করেছেন শিল্পী ; সে এতই অল্প যে মনে করা যেতে পারে এই পাথর ভেদ করেই এই প্রাণ জেগেছে। রূপে ও ছন্দে সব নিয়েই আশ্চর্য একটি ঐক্য বা অবিচ্ছিন্নতা দেখা যাচ্ছে। সমস্ত ছবিটির একটি স্বয়ংসিদ্ধ সম্পূর্ণতা ও অবিচল স্থিতি আছে। অন্য ছবিটিতে পাহাড়ের শ্রেণী চলে গেছে এক দিগন্ত থেকে না-দেখা আর এক দিগন্তের অভিমুখে। সেই অজ্ঞাত সুদূর থেকেই আঁকাবাঁকা জলের ধার বয়ে আসছে। এ দিকে নিকটের পাহাড়ে ঋজু-দণ্ডায়মান দেওদার-বীথি আকাশে উন্নত মাথা তুলেছে, তাদেরই রহস্যছায়াশ্রিত বাড়িগুলি অনড় দুর্গ-সদৃশ। গতিশীল জীবনের কোনও চিহ্ন কোথাও দেখি নে, তাতে প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর নির্লোভ নিরাসক্ত বৈরাগ্য; জীবনের অনন্ত বৈচিত্র্যে যিনি পূর্ণ, আকাশের নিঃসীম শূন্যতাতেও তাঁরই প্রকাশ, এই যেন বলতে চায় নির্জন বাড়িঘর, স্থির দেওদার আর স্থির তরঙ্গাকারে দিগদিগন্তে উত্থিত পর্বতশ্রেণী।
নূতন দৃশ্যপটের উদঘাটনে দেখি ‘শ্যামলী’ মেয়েটি-কোথা তার ঘর, কী ভাবে বসে আছে, কোনওদিন জানা যাবে না। শুধু জানি, আপনাতে আপনি যে ডুবে আছে; আপনাতে আপনি স্থিত, বিধৃত। সে আছে এইমাত্র তার পরিচয়ের সীমা নেই, শেষ নেই।
চিরতুষারাবৃত ধবলগিরি, যেখানে কোনদিন কোন মানুষের পদপাত ঘটবে না; শান্ত সমাহিত যোগেশ্বর শিবের সে ধ্যানাসন। সেই ধ্যানলোকের দূরলক্ষ্যের অভিমুখী হয়ে নিঃসঙ্গ বৃক্ষরূপী কোনও শৈব-তপস্বী। নিম্নবাহিনী কোনও উৎসতল থেকে দিনান্তের ঘট ভরে নিয়ে শৈলসোপানে উঠছে ধীর মন্থর পদে দুটি পাহাড়ের মেয়ে, উপরের অধিত্যকাভূমে দেখা যায় একটি কুটীর। সমস্ত ব্যাপারটি ঘটছে অতিদূর অন্য কোনও জগতে, এখানে ঘটনাই যে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ তাও নয়। অস্থির ক্রিয়ার পরিবর্তে সুস্থির হওয়ার মহিমাই রূপ ধরে জেগে উঠেছে এই চিত্রে-গিরীশের হিমমৌলি চিরশুভ্র কয়েকটি শিখর।
সব শেষে আর একটি মাত্র চিত্রের উল্লেখে অবর্ণনীয়ের নিষ্ফল বর্ণনচেষ্টা থেকে নিবৃত্ত হব। জনশূন্য এক মগ্নশৈলের কঠিন পাষাণে মাথা কুটছে অহেতু আক্রোশে তরঙ্গগর্জিত স্ফূরণ ফেনায়িত মহাসিন্ধু, আকাশ থেকে আকাশে তখন বায়ু বৃষ্টির মাতামাতি, শ্রেণীবদ্ধ তালের বনে বনে তির্যক বারিবর্ষণ। আক্রোশ বলেছি বটে, হয়তো তা নয়-শার্দূলবিক্রীড়িত ছন্দে নেচে উঠেছে সমুদ্র তাণ্ডবমত্ত শঙ্করের পদপাতে। বিশেষ দ্রষ্টব্য দুটি কাঁকড়া, সমুদ্রের তরঙ্গদোলা থেকে উঠে পড়েছে ফেনার্দ্র শীতল পিছল পাষাণগাত্রে। জড় এবং জীব মিলে অভিন্ন একটি রূপ ও রেখার ‘ছন্দ’ (pattern) যেমন অন্য ছবিতেও দেখা গেছে। গাছ এবং প্রাণী এক দিকে, আর এক দিকে অন্ধ জড়জীবনের, দৃশ্য অদৃশ্য ভূতসংঘের দুর্বার আবেগ ও বিপুল উল্লাস-পাষাণরূপিনী সর্বংসহা পৃথিবী, অস্থির সমুদ্র, বৃষ্টি, এবং বায়ু যা চোখে না দেখেও মনে প্রাণে অনুভব করা যাচ্ছে। আরও রয়েছে জানি সর্বত্র প্রসারিত, সর্বভূতে অনুপ্রবিষ্ট, আকাশ-সেটি তো চিত্রীর চিত্ত বা চেতনারই নামান্তর মাত্র। সুতরাং এত যে আবেগ এবং গতি, তার অন্তরে রয়েছে অবিচল স্থিতি ও শান্তি এ আমাদের পরিকল্পনা নয়। এই হল শিল্পী নন্দলালের আয়াসহীন কৃতিত্বের পরম পরিসীমা, তাঁর নবতন চিত্রপর্যায়ের বিশেষ গুণ।
রচনার দিক দিয়ে সমকালীন হলেও, রূপশৈলীর দিক দিয়ে পূর্বকালীন স্কেচ বা কার্ড, স্কেচের সগোত্র, ‘খেজুর রসের ভিয়ান’ ছবিটি আমরা ঠিকই এই চিত্রপর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত মনে করি নে। অন্যান্য ছবির তুলনায় এ যেন নিকটতর পরিচয়ে পরিচিত, অপেক্ষাকৃত বস্তুভারযুক্ত বা বাস্তব। এর রস একটু আলাদা। সমতলে যে বাতাস আমরা নিশ্বাসে নিশ্বাসে গ্রহণ করি আর সূক্ষ্মতর শুদ্ধতর যে বায়ুমণ্ডল চিরহিমাবৃত গিরিশিখরে, উভয়ের মধ্যে যে প্রভেদ বিদ্যমান অনুরূপ একটি পার্থক্য দেখা যায় শিল্পী নন্দলালের সেকালের এবং একালের ছবিতে। ভাল মন্দের কোনো প্রশ্ন ওঠে না, রসাস্বাদের তবু ভিন্নতা বা বিশিষ্টতা আছে। এককালের আঙিনায় আর এককালের রূপ, বিশেষত ভাবীকালের ‘অপরূপ’, তারই নিদর্শন হিসাবে নন্দলালের আর একখানি ছবির কথাও এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে। এক যুগ অতীত হয়েছে খ্রিস্টীয় ১৯৪৭ সনের শারদীয় অবকাশে, ওড়িশার গোপালপুরে, রংতুলি যোগে ক্ষুদ্র কার্ডে নন্দলাল এঁকেছিলেন শ্যামসমুদ্রের কয়েকটি ঢেউ। শুধুই ঢেউ। মাঝসমুদ্রে ক’টি ঢেউয়ের এই প্রকার পরিচ্ছন্ন রূপ বা ক্লোজ-আপ, এ ছাড়া অল্প পরিসরে আর কিছুই দেখানো হয়নি, দেখাবার প্রয়োজনও ছিল না। অপ্রাণ নিসর্গের যা-কিছু আত্মনিমগ্ন উদবেলতা, অকূল সমুদ্রের দিকশূন্য আনন্ত্যের যা-কিছু সম্ভবপর ব্যঞ্জনা সবই অপূর্ব ভাবে প্রকাশ পেয়েছিল ওই চিত্রে-শিল্পীর কোনও সচেতন প্রয়াসে নয়, রংতুলির কোনও নির্ধারিত কৌশলে নয়- কেমন করে, তা কোনও শিল্প-সমাঝদার বলতে পারবেন না আর শিল্পী নিজেও জানেন না। সাম্প্রতিক চিত্রপর্যায়ের যে গুণে আমরা বিশেষভাবে আকৃষ্ট, মনে হয়, সে গুণেই ওই কার্ডখানিও দীপ্তিমান। কাব্যের রসধ্বনি যেমন সকল বিচার বিশ্লেষণের অতিরিক্ত, রূপের এ জাতীয় ভাবব্যঞ্জনাও তদ্রূপ।
প্রাচীন বয়সের এই একটা সুবিধা আছে যে, যথাকালের যথোচিত কৃত্যগুলি সমাধা হয়ে থাকলে মানুষকে ক্রমেই সে মুক্তি দেয় সকল দায়িত্ব থেকে, ‘বিষয়’ চিন্তা বা দুশ্চিন্তা থেকে। এটি স্বভাবতই বৈরাগ্যের কাল আর ব্যাপ্ত অনুরাগের কালও বটে। প্রায় নৈর্ব্যক্তিক অনুরাগ। তেমনি স্থির অনুরাগ থেকে, সর্বব্যাপিনী ‘জীবভূতাসনাতনী’ প্রকৃতি-পূজার নিষ্ঠা থেকে, নন্দলাল আজ বর্ষাধিক কাল যে ছবিগুলি আঁকছেন তার বিষয়বৈচিত্র্য আছে অনেক, প্রকরণের ভিন্নতা ঘটেছে মাঝে মাঝে, অথচ মতি বা মনোভঙ্গির অভিন্ন একটি বিশেষত্ব প্রায় সর্বত্র লক্ষ করা যায়। এ কথাও বলাই বাহুল্য যে, এই অজস্র চিত্রকৃতির ভিতর থেকে আটখানি বা ন’খানি ছবি বেছে নেওয়া চলে কেবল চোখ বুজে-চোখ চেয়ে প্রায় দিশেহারা হতে হয় দিকে দিকে চেনা-অচেনার হাতছানিতে। চেনার অন্তরেই ছিল অচেনা।
প্রাচ্য ছবি সহজেই হয় স্মৃতি থেকে, কল্পনা থেকে। নন্দলাল বলেন, সুজাতার ছবি করেছিলেন একাসনে বসে। গুরু অবনীন্দ্রনাথ বেহারে দেখেছিলেন সন্ধ্যাবেলায় খোলার ঘর থেকে ধোঁওয়া বেরোচ্ছে, পিতলের বোকনোয় দুগ্ধধারের শব্দ-তাঁর বলার গুণেই শিষ্যের মনে ছবি ফুটে উঠেছিল। তেমনি মুঙ্গেরে কাটনির জঙ্গলে, দূরে কোথাও বাছুরের হাম্বারব আর গাইয়ের হামলানো তা থেকেই ছবি হয়েছে উৎকণ্ঠিতা পয়স্বিনী গাভীর। শিল্পী উপস্থিত যে ছবিগুলি আঁকছেন সেগুলিও স্মৃতিচিত্র বলা যায়, তবে সে স্মৃতি বহু দূরের স্মৃতি, যেন বা আর এক জগতের আর এক জন্মের। কবে কাছারির বাড়ির দুয়োরে বাঁধা ছিল ধূমল পাহাড়ের মতো বিশাল রাজহস্তী, কবে দেখেছিলেন ইলামবাজারের খোড়ো ঘরে ঘোর-ঘোর অন্ধকারে আর প্রদীপের আলোর নিরিবিলি বসে পান সাজছে একটি বউ, স্বাধীন সচ্ছন্দ ময়ূর চড়ে বেড়াচ্ছে বনে পাহাড়ে, ভাগীরথীর পরিচিত বাঁকে অতিপরিচিত এক স্টিমার-ঘাটে, জটা-পাকনো বুড়ো বটের তলায় জলসত্রে আসীন আদ্যিকালের এক বুড়ো- দেশ বিদেশের পথ ঘাট, গাছপালা, মানুষ পশু, পাহাড় বন, নদী সায়র সমুদ্র-মনের নয়নে একের পর আর এক ভেসে ওঠে-কিছুই লুপ্ত হয়নি, তবে সূক্ষ্মভাবে রূপান্তরিত হয়েছে সে তো সত্যই আর সেই তার বিশেষ সার্থকতা।
আমরা পূর্বেই বলেছি, শিল্পীর মনের একটি দূরাপসরণ, মানসিকতায় ঈষৎ একটি পরিণতি বা পরিবর্তন, এজন্যই তাঁর চিত্রের অচ্ছিন্ন ধারাতেও নতুন রূপগুণ, নতুন লক্ষণ ফুটে উঠেছে-শারীরিক অস্বাস্থ্য বা দুর্বলতা এর মূল কারণ নয়। প্রকরণের দিক দিয়ে এই পরিবর্তন দেখছি যে, মৌলিক রূপ, আর অনেক সময় মৌলিক রূপও নয়-মৌলিক ভাব, সেইটি ফুটিয়ে তোলার দিকেই শিল্পীর যা কিছু অভিনিবেশ। রসের দিক দিয়ে প্রায় সব ছবিতেই দেখি একটি শান্তি, স্থিতি, বিরতি, দূরত্ব এবং ‘পরত্ব’ অর্থাৎ এক প্রকার বস্তুতন্ত্র নৈর্বক্তিকতা। যেন আর-এক জগতের আর-এক জন্মের সব দেখা। আমরা বা তোমরা বা বিশেষ করে মানুষের বসবাসের জগৎ যেন নয়, পরন্তু ‘ঈশাবাস্য’-সর্বগত ঈশ্বরের আবাস। এক ভাবে বলা যায়-যা স্থূল তাই সূক্ষ্মে, যা বিশেষ তাই নির্বিশেষে, যা আকার তাই নিরাকারে মগ্ন এবং বিধৃত। এ হয়তো দেশে দেশে আর যুগে যুগে উৎকৃষ্ট চিত্রের অন্যতম লক্ষণ, কিন্তু আমাদের চোখের সামনে একই কাল এমন প্রাচুর্যে ও প্রবলতায় আর কখনও প্রকটিত হয়নি। নিকট কখনত্ত এমন দূরে বিলীন হয়নি।
দূর শব্দেই কী মায়ামন্ত্র আছে জানিনে। সেই দূরে শোনা যায় অশ্রুত কুহুরব-
breaking the silence of the seas
among the farthest Hebrides.
ভূগোল বিবরণে যদিও কোনও ঠিকানা পাইনে। সেই দূরে নাইটিঙ্গেলের গানে দিগদিগন্তব্যাপী সিন্ধুহৃদয়ে চকিতে ঝরোখা খুলে যায় পরিলোকের। সেই দূর দূরান্তরের আকাশই অলক্ষ্যে শিউরে ওঠে সহসা অনাহত অশ্রুতগভীর এই মন্ত্ররবে-
হেথা নয়, অন্য কোথা, অন্য কোথা, অন্য কোনখানে!
অথচ এই ‘দূর’ আমাদের কবিকে যদি আকুল করে থাকে, যে কবি আশৈশব ‘সুদূরের পিয়াসী’, শিল্পীকে করেছে শান্ত, বিবিক্ত, স্থিতধী।
ছবি যখন কবিতার ছত্র স্বতঃই মনে এনে দিল এখানে আরও এইটুকু বলা দরকার-কবি ওয়ার্ড সওয়ার্থের মনে দূরের ইন্দ্রজাল বিছিয়ে দিয়েছে অতি নিকটের অতিসাধারণ একটি দৃশ্য; কীটসের স্বপ্নচারী বিমুগ্ধহৃদয়ও যুগে-যুগান্তরে দেশ-দেশান্তরে ফিরেছে একান্ত কাছের শ্যামান্ধকারে প্রচ্ছন্ন সুধাবর্ষী এক বিহগকণ্ঠস্বরে; আর কবি রবীন্দ্রনাথের দূরতম প্রয়াণের সূত্রও কিছু দূরে নয়। অর্থাৎ, দিব্য ভাবে ভাবিত কবি ও শিল্পীর নয়নে মনে নিকটই দূরের আবির্ভাবে পরমাশ্চর্যের আধার হয়ে ওঠে, পরিচিতই হয়ে ওঠে সকল পরিচয়ের অতীত। বস্তুত শিল্পী নন্দলালের এই ছবিগুলি দেখার অভিজ্ঞতার পরে চেয়ে চেয়ে দেখেছি এক শরৎসন্ধ্যায় ধান-ক্ষেতের শান্ত শিহরিত শ্যামলতার পরপারে বেণুবনে প্রচ্ছন্ন সাঁওতাল পল্লীটি, আবছা ধূমলেখা উঠছে অথবা অকালমেঘ শুভ্র ফেনায় উপচে পড়েছে দিগবলয়ের কোলে-চেয়ে দেখেছি ফাল্গুনের কোনও সোনালি বিকালবেলায় চিকন-কচি পাতায় পুলকিত অশ্বত্থ দেবদারু আর জামরুল আম নারিকেল সুপারির জটলা-কিছুই মনে হয়নি নিঃশেষিত অথবা পুরাতন-পরিচিতি বলে। বরং মনে হয়েছে, যেখানে যা দেখছি সবই কোন অরূপ বা অপরূপ লোকের সীমান্তরক্ষী যেন, বক্ষে ও বাহুতে তকমা-তাবিজে নানা অদৃশ্য অক্ষর-গাছ নয়, মানুষ নয়, পশু নয়-অরণ্য অথবা পর্বত, নদী অথবা সমুদ্র নয়-আমি বা তুমি নয়-সে-সবই বিচিত্র ছদ্মবেশ মাত্র। বুঝে না-বুঝে মন কেমন উদাস হয়ে গেছে। অনির্দেশ্য বিধুর এই ঔদাস্যের অপূর্ব রূপ দেখেছি কবির ‘যেতে নাহি দিব’ কবিতায়। যেতে নাহি দিব? তবু তো যেতে দিতেই হয়। সবই তবু চলে যায়-
কাঁদে যেন অনন্তের বাঁশি
বিশ্বের প্রান্তর-মাঝে। শুনিয়া উদাসী
বসুন্ধরা বসিয়া আছেন এলোচুলে
দূরব্যাপী শস্যক্ষেত্রে জাহ্নবীর কূলে
একখানি রৌদ্রপীত হিরণ্য-অঞ্চল
বক্ষে টানি দিয়া; স্থির নয়নযুগল
দূর নীলাম্বরে মগ্ন; মুখে নাহি বাণী।
শান্ত মুখশ্রী। নিষ্পলক চাহনি! একি নন্দলালেরই শিল্পীমানসের এক নিখুঁত ছবি নয় আজ-এক অপূর্ব প্রতিমা? 8
সূ ত্র নি র্দে শ
১। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের উক্তি।
২। ইংরেজিতে বলা যায় essential as opposed to accidental and superficial.
৩। বেলা তিনটা। মাস্টারমশাইয়ের দক্ষিণের বারান্দা। শান্তিনিকেতনের সীমানার পরে দক্ষিণে প্রায় দিগন্ত পর্যন্ত প্রসারিত শান্তনিথর সবুজ ধানক্ষেত-শান্ত অথচ লক্ষ লক্ষ বর্শাফলার মতো পাতায় পাতায় আর শিষে শিষে শিউরে রয়েছে। আলোক উদ্ভাসিত। আকাশে বেকার মেঘ, তারই এক ফালি ছায়া এদিক থেকে ওদিক সমস্ত আলোকে-ক্ষেত্রটিকে দ্বিধা বিভক্ত করেছে। ডান দিকে সাঁওতালি গ্রাম প্রচ্ছন্ন আছে দূরবর্তী বাঁশবাগানের শ্যামান্ধকারে, তার সম্মুখভূমিতে একটি মাত্র একচালা ঘর দেখা যায়-মাঠের মধ্যে দূরে দূরে বিদ্যুৎবাহী তারের দু-একটা দীর্ঘাকায় খুঁটি। প্রচুর আকাশ। অলস নিস্তব্ধ বেলা। পাখ-পাখালির ডাক মনোযোগ না দিলে শোনাই যায় না। আকাশে অলস ভ্রাম্যমান মেঘ। এই সবুজ, শ্যাম, পাণ্ডুর, ধূসর, শুভ্র*-ধানে-ভরা মাঠ, বনলেখা, একটি কুটীর, অনেকটা আকাশ-এই হল মাস্টারমশাইয়ের এখনকার significant ছবি, বিশেষ ছবি। প্রকৃতি। প্রকৃতির আশ্রিত জীবন কিভাবে আছে? গভীর জলের মধ্যে যেমন মাছ-একটি মাছ নয়, মাছের ঝাঁক-যেন তাদের গমনাগমনের চঞ্চলতামাত্র নেই, যেন একটিও ঢেউ উঠছে না। -দিনলিপি। ১৬ অক্টোবর ১৯৫৯
৪। প্রবন্ধ শেষে এই কথাটি বলবার আছে যে, আলোচ্য চিত্রাবলীর সম্যক পরিচয় পেতে হলে সেগুলি স্বচক্ষে দেখা দরকার। ‘বড়ো কঠিন সাধনা যার বড়ো সহজ সুর’-কথাটি প্রতিচিত্র-গ্রহণের ব্যাপারে অবাঞ্ছিত এবং অপ্রত্যাশিতভাবে সার্থক হয়েছে। সাবলীল তুলির টান-টোন, প্রতিরূপগ্রহণের প্রকরণগত দুরূহতায়, একটির ধার হয়ে গিয়েছে ভোঁতা আর অন্যটির ক্রমবিন্যস্ত স্তরগুলি সর্বত্র যথাযথ ফুটে ওঠেনি, বা মোলায়েম হয়নি (যেখানে যেখানে তুলি আদপে কাগজ ছোঁয়নি সেখানেও একটা সূক্ষ্ম ছোপ ধরে গিয়েছে)-ফলত মূলে যে টোনের লীলাবৈচিত্র্য অভিজাত ধ্রুপদ সঙ্গিতের মতো, তার মীড় মূর্চ্ছনার বহু অপরূপতা নষ্ট হয়েছে। আরও সহজগ্রাহ্য উপমায় বলা চলে যে, টাটকা ভাজা মুড়ির মুচমুচে ভাবটা নেই, প্রতিরূপ হয়ে পড়েছে ঈষৎ মিয়ানো মুড়ির মতো। কাজেই মূলের সঙ্গে পরিচয় না হওয়া অবধি, জানতে হবে, এ ছবিগুলির পরিচয় পুরো হল না।
* ডায়রির লেখায় এটুকু যোগ করা চলে; রংগুলি প্রায় সব সময় টোনে, অর্থাৎ সাদা-কালোর বিচিত্র পর্দায়,
অনূদিত হয়েছে, ব্যঞ্জনা পেয়েছে।
২য় বর্ষ ৩য় সংখ্যা
(ভাদ্র-আশ্বিন১৩৬৯)
