আমরা ও জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর – নীরদ মজুমদার

আমরা ও জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর – নীরদ মজুমদার

আগেভাগেই প্রচার করা সঙ্গত যে এ নিবন্ধ সংকল্প করা হয়েছে চিত্রশিল্পের দুই কৌণিক দৃষ্টির পটভূমিকায়, অর্থাৎ প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের তির্যক ভেদ ও মিলনে যা মূর্ত। ফলত আলোচ্য বিষয়টি দুই দফায় জটিল; বলার কথা অনেক, সময় অল্প, আনুপূর্বিক সব কথা বলা সম্ভব নয়। তথাপি বক্তব্য যেটুকু সরল-ভাষায় সেইটুকুই মোটামুটি নিবেদন করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব।

আর একটি কথা যে আমাদের পরিস্থিতির মর্মে জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর (Jean Dominique Ingres)-এর কথা প্রসঙ্গকথা। উপরন্তু তাঁর সম্পর্কে আমরা আলোচনা করতে পুনঃপ্ররোচিত একারণে যে এই বছর মতুবাঁ-র আচার্য অ্যাঁগর-এর মৃত্যু শতবার্ষিকী।

সর্বাগ্রে উপলব্ধি করা কর্তব্য, আমাদের বিংশ শতকের চিত্র আন্দোলন সরাসরি দুই বিপরীত নীতি ও পদ্ধতিতে বিভক্ত। ভেদ অতি তীক্ষ্ণ; যথা, গত দ্বিতীয় বিশ্বমহাযুদ্ধের সঙ্গে সঙ্গে জলরং হতে তেলরঙের চিত্রসৃষ্টি ও তার সংশ্লিষ্ট ঈক্ষণের রূপান্তরতায়ই চিত্রকলা প্রাকযুদ্ধ ও উত্তরযুদ্ধ অধ্যায়ে চিহ্নিত। এবং সেটাই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তনের কারণ। বলা বাহুল্য, প্রাক ও উত্তর মহাযুদ্ধের যে কালভেদ তা সত্যিই বাস্তব। অবশ্য তার ব্যতিক্রম যে কুত্রাপি দর্শে না তা নয়। আগেও কিছু তৈলচিত্রকর ছিল যেমন এখনও জলরঙের চিত্র আঁকা হয়ে থাকে, হলেও তা আন্দোলন হিসাবে বা তার রসাত্মক মূল্যে নিতান্তই গুরুত্বহীন। বস্তুত সে সব সৃষ্টি আজ গৌণ।

ইদানীং, আমরা আসমুদ্রহিমাচল তৈলচিত্রের নবরূপে চঞ্চল, নতুন উপাদানগত ঐশ্বর্যে ঐশ্বর্যবান। এটা সম্পূর্ণ এক নতুন ক্ষেত্র এবং রোমাঞ্চকর এক নব রঙ্গমঞ্চ।

আবার কোনওরূপ কিছু না করে এ কথা স্বীকার্য যে নব অধ্যায় যতই সুবিন্যস্ত হোক না কেন, তা কিন্তু যথোপযোগী ধ্যানধারণায় পরিপুষ্ট নয়, প্রায়শ বিশৃঙ্খল ও উদ্দেশ্যবিহীন। একাধারে উপাদানগত বিভ্রাট ও অন্যত্র ঈক্ষণগত অন্ধতা সত্যিই পীড়াদায়ক এবং যথার্থ আক্ষেপের কথা। এবং আমারও ঐ এক আক্ষেপ, শার্ল পেগির মতোই, ‘হায়, কেন কোনও মহান যুগে জন্মগ্রহণ করিনি।’ যুগ বড় কথা, মহান যুগ অন্য কথা।

ইদানীং আমরা এক পঙ্গু অধ্যায় হতে আর এক খঞ্জ অধ্যায়ে এসে উপস্থিত, আপাতদৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের অভিব্যক্তির তুলনায় তা মিথ্যা নয়। তবে এই নব উদ্যমের অন্তর্নিহিত যে সম্ভাবনা তা খুব বড় কথা; এককালীন সংক্রমণগত তীব্র অসুবিধা ও দৃশ্যমান অনতিক্রমণীয় প্রতিবন্ধকই ফেরে আবার সুযোগ ও সুবিধার পরিস্থিতিবলে গণনা করবে তারা, যারা কল্পনা-তেজ উদ্ভাসিত দুঃসাহসিক শিল্পী, নবযুগের সূচনায় যারা নিজেকে বর্তমানরূপে পাবে ও দাবিসুলভ জিদভরে ঘোষণা করবে ‘আমি উপস্থিত’।

অধুনা কাজ, তা যত সামান্যই হোক না কেন, তার আরোপিত প্রভাব কিন্তু কম নয়। আমাদের তথাকথিত সাংস্কৃতিক জগতে কী ক্ষয় ধরিয়েছে, কী ধস এনেছে, তা ভাবলে বিস্ময়ে অভিভূত হতে হয়। এককালের সমালোচক, চিত্রামোদী, রসিক, যাঁরা সগৌরবে জোরকদমে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন, তাঁদের পদতল হতে ধরিত্রী আজ দ্বিধা হয়েছেন। উপাদানগত বিড়ম্বনা ও ঈক্ষণগত পার্থক্য জলরং-প্রবুদ্ধ ব্যক্তিদের শ্বাসরুদ্ধ করেছে, তাঁদের প্রাথমিক শিক্ষার অভাব যে কতখানি তা যে কোনও শিল্প আলোচনা বা সমালোচনার যে কোনও পত্রিকার পাতায় চোখ বোলালেই প্রকট হয়ে দেখা দেবে। একদা যাঁরা বোদলেয়ার, এ্যাপলিনের সমকক্ষ আত্মাভিমানী, প্রাকযুদ্ধের কেষ্টু-বিষ্টু, আজ তাঁরা অন্য জন্যকল্পে রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হয়েছেন এবং অতিশয় ভাণশীলতার ছদ্ম আয়েসে তাঁরা সমাধিস্থ। ইংরেজিতে যাকে বলে They are bound through ignorance to ignore। এ অবস্থা কিন্তু শিল্পলোকের কম মুনাফা নয়।

এখন, একদিকে আমাদের নবযৌবনের আস্ফালনও কিছুটা বিসদৃশ সন্দেহ নেই; আমরা অল্পে তুষ্ট, কেউ কেউ লজ্জাকর অনুকরণ ও মেকি ব্যক্তিত্বের ভেঁপু-নিনাদে মুখর, তাদের সব লম্ভঝম্প যে নিছক হাস্যরসাত্মক এ বোধ তাদের শূন্য। শুম্ভ-নিশুম্ভরা আত্মসমালোচনায় পরাঙমুখ, কোনও মতেই একই কালে rapt and critical হতে পারার মতো বুদ্ধিবৃত্তি দুঃস্থ, এই হেতু চেতনাবান শিল্পসৃষ্টির উদাহরণ সর্বত্রই বিরল।

আসল কথা, তৈলচিত্র হিসাবে পাশ্চাত্যের যে সব সৃষ্টি হতে আমরা দীক্ষিত সে সৃষ্টির পিছনে যে অভিজ্ঞতা তা থেকে আমরা অনূ্যনপক্ষে চারশত বৎসর পশ্চাৎবর্তী। অর্থাৎ যে কাল হতে তেলরঙের এবং সংলগ্ন ঈক্ষণগত ভাবের সূত্রপাত তা থেকে কয়েক শত বছর আমরা পশ্চাৎবর্তী, এই বিচারে যে, সেদিনই চিত্রকলা তার ক্ষেত্রগত দাবিতে স্বয়ংসম্পূর্ণতা লাভের প্রয়াস পেয়েছে। এই হিসেবে বলা যেতে পারে, জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর হলেন তার পথিকৃৎ। অর্থাৎ তাঁকে ঘিরেই চিত্রকলার শুরু। যাই হোক, একথায় আমরা আবার ফিরে আসব যথাসময়ে। আপাতত প্রথমে উপাদানগত কতিপয় সমস্যার কথা বিবেচনা করা যাক।

একদা, ফরাসিদেশে থাকাকালীন প্রায়ই শুনতে পেতাম মজার একটি ছড়াগান। ছড়াটি ফরাসিদেশের কী গ্রামে বা কী শহরে কী পারি-তে সর্বত্রই সব শিশুকণ্ঠেই ধ্বনিত হয়ে থাকে। কিন্তু সে গান যতই শিশুসুলভ হোক না কেন, তা যে কোনও চেতনাবান শিল্পীকে থমকিয়ে দাঁড় করাবে, শুনতে বাধ্য করবে

আন এলেফাঁ স’ ব্যলাঁসে সুর উন তোয়াল দারিনিয়ে,

লা প্যাঁতুর আ লুইল সে বিয়াঁ দিফিসীল

মে বিয়াঁপ্লু বো ক’লা লা প্যাঁতুর আ লো।

অর্থাৎ, আন এলেফাঁ- একটি হাতি ; স’ব্যলাঁসে-দড়ির খেলা খেলছে ; সুর উন তোয়াল দারিনিয়ে- একটি মাকড়সার জালের উপর ; লা প্যাতুর আলুইল- তেল রঙের ছবি ; সে বিয়াঁ দিফিসীল- তা অতীব কঠিন কাজ ; মে- কিন্তু ; বিয়াঁপ্লু বো ক’লা লা প্যাঁতুর আ লো- জল রং হতেও তা অনেক অনেক সুন্দর।

যদিচ গানটি একটি অতি সাধারণ নমুনা, তবু বুঝতে বাকি থাকে না, কী পরিমাণে কোনও বিষয়বস্তু একটি গভীরতর মজ্জায় প্রবেশ করলে এমত অভিব্যক্তির গান শিশুকণ্ঠে ধ্বনিত হওয়া সম্ভব। সত্যিই চিত্রকলার রহস্যভাষা এই ছড়ায় বিধৃত এবং ওই দুই পঙক্তির মর্ম যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে পারলে যে কোনও চিত্রকলার শিক্ষানবিশির সিদ্ধিলাভের সম্ভাবনা থাকে।

কথিত আছে যে রেনেসাঁস-এর শুরুতে ফ্লেমিস শিল্পী Van Eyck ও ইতালীয় Antonello প্রমুখরাই তেলরঙের প্রবর্তক। কিয়দংশে তা সত্য। পূর্ণ তৈলচিত্র তখনও হয়নি এবং কে প্রবর্তক তা নিয়ে বিজ্ঞজনোচিত যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ আছে। আসলে যথার্থ শুরুর হদিশ মেলে না। তবে ওইকালেই যে তার গোড়াপত্তন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। পরে Lorenzo, di Credi, Pollajuolo, Perugin, Verrochio, Ghirlaudajo-র অবদান কম নয়। কিন্তু তৈলচিত্র ব্যবহারগত শীর্ষস্থানে এসে পৌঁছায় যখন Titien, Leonardo এবং Raphael জীবিত। তারপর তৈলচিত্রের উন্নতি ও অবনতি হয়েছে, ব্যবহার ও পদার্থগত জটিলতার দরুন। কিন্তু সেই হতে আজ অবধি যে তেলরঙের অভিজ্ঞতা তা ঘোরতর অধ্যবসায়ের ফল, এবং তার গুণবত্তাও আজ কম নয়। তেলরঙে আমরা আমাদের স্নায়ুনিবন্ধভুক্ত স্পন্দন তুলিকাগ্রে চিত্রপটে প্রতিফলিত করতে সক্ষম, যা জলরঙে সম্ভব নয়, যেহেতু জলরং সরাসরি কর্মনিরত কালে এক। এবং পরে তা শুকিয়ে ভিন্নরূপ ধারণ করে। এমন হেরফেরের দরুন সমতল ভূমিগত যে অধুনা camaieu-র কারিগরি তার বিন্দুমাত্র জলরঙে সম্ভব নয়। তাছাড়া matiere-এর যে মহিমা, যার কল্যাণে যে কোনও সমতল ক্ষেত্রের প্রতি অণুকণা রঙিন মোহজাল বিস্তার করতে সক্ষম তা জলরঙে দুরূহ, এবং মোটকথা এই সব মূল্যবান পরিবেশে রেখা ও চিত্র সংস্থান শতগুণে বর্ধিত হওয়ায় চিত্রগত মূল্য বহুতর সত্বে বর্ধিত হয়। অবশ্য জলরঙের যে গুণ নেই তা নয়, তা অন্যরূপে আছে বটে, এখানে, R. Hilder সাহেবের উক্তি উদ্ধৃত করলে শোনায় ভালো যে ‘Watercolour painting is to oilpainting what the string quartet is to the full orchestra’।

এদিকে তেলরঙেরও দোষের অবধি নেই। যথা ক্যানভাসের গুণভেদ, বিবিধ তেলের ব্যবহার এবং রাসায়নিক বিপর্যয়-যেমন পদার্থের ভৌতিকসংমিশ্রণ ঘটিত নানা দুর্ঘটনা, ইত্যাদির কথা সর্ববিদিত।

Dinet -বিরোচিত পুস্তক Les Fleaux de la Peinture-এ এবং Brascasst-এর বিশ্লেষণে দেখি, দুজনেই একমত যে, সকল দুর্যোগের যথার্থ কারণ হল আবহাওয়ার গ্যাস এবং আলোর কিরণের সংমিশ্রণ। উভয়ে মিলিত হয়ে যে রাসায়নিক ক্রিয়া রঙে আনে তাই যথার্থ রং-বিভ্রাটের কারণ। অতঃপর, কার্যত সব থেকে গোলমেলে কাণ্ড হল কোন রঙে কতখানি দস্তা বা কোন রঙে কতখানি গন্ধক বা কী প্রকার সংমিশ্রণ ব্যবহারে বিপরীত রাসায়নিক ক্রিয়া ছবিতে আনতে পারে তা চিত্রশিল্পীর জানা প্রয়োজন। রসায়নবিদ না হলেও কিছুটা রসায়নবুদ্ধি সত্যিই উপকারে আসতে পারে। তা না হলে, যথেচ্ছ রঙে ভেসে পড়লে বহুধা ভ্রান্তির সম্ভাবনা থাকে, এবং কণামাত্র ভ্রান্তি বহুকালের আক্ষেপের বিষয় হয়ে ওঠে।

ভুল রং প্রয়োগ বা তেলের তারতম্য বা রঙের অতি ঘনত্ববশত ছবি ফেটে চৌচির হতে পারে, বা যে কোনও সুন্দর সৃষ্টি কালের কবলে নিশ্চিহ্ন হয়ে কৃষ্ণরূপ ধারণ করতে পারে, বা সমস্ত সংস্থানগত চিত্রভারসাম্য ভেঙে পড়ে যদি কোনও একটি রঙের অপব্যবহারে রঙের রূপান্তর ঘটে। তাছাড়া শিল্পীসুলভ ভ্রান্তি, যেমন কোনও নক্সা রং দিয়ে ঢেকে সংশোধন করলে, পরে তা আবার প্রকট হয়ে মনোযন্ত্রণার কারণ হয়। Prado জাদুঘরে Velasquez-অঙ্কিত একটি অভিনব চিত্র দেখতে পাওয়া যায়। চিত্রটি চতুর্থ ফিলিপের প্রতিকৃতি। তিনি তাঁর ঘোড়ার উপর প্রতিষ্ঠিত। বিস্ময়ের বিষয় সেই ঘোড়ার চারটি পায়ের পরিবর্তে আজ আটটি পা প্রতীয়মানে সে ছবি এমন এক বিসদৃশ রূপ ধারণ করেছে যে দেখলে দুঃখ হয়। বলা বাহুল্য, এ কাজ Velasquez-এর ইচ্ছাকৃত নয়। আবার Henner-এর আঁকা একটি বনদেবীর চিত্র যা লুক্সাম্বার্গে রক্ষিত আছে-কোনও প্রকাশক সেই চিত্রের ফোটো তোলার কালে একটি বনদেবীর পরিবর্তে পরস্পরবিজড়িত দুটি বনদেবীর উপস্থিতি ফোটোয় দেখে চক্ষু বিস্ফারিত করেন। অবশ্য এতে প্রকাশকের সমূহ লাভ, কিন্তু শিল্পীর ক্ষতি সীমাহীন।

আরও দুঃখের কথা Rembrandt-এর খ্যাতনামা চিত্র Bathsheba, যা সত্যিই অপূর্ব নগ্ন সুন্দরী রমণীর চিত্র, সে সুন্দরীর অপরূপ নগ্ন উরুদেশের উপরাংশে ইদানীং Rembrandt-এর অনিচ্ছাকৃত একটি ন্যাকড়ার নক্সা বর্তমান, যা শিল্পী ত্বক ও মাংসের গোলাপী দিয়ে ঢেকে সংশোধন করেছিলেন। আজ আবার, Rembrandt-এর ইচ্ছার বিরুদ্ধে মাংস, ত্বক ভেদ করে সেই ন্যাকড়া পরিস্ফূট; বেচারা Rembrandt! শুধু তাই নয়, সব থেকে কৌতুহলের বিষয় হল এই যে, যে শিল্পী অতি খুঁতখুঁতে, সতর্কতা সহকারে রং ব্যবহার করার জন্য খ্যাতনামা, এমনকি তিনি জাঁ দমিনিক অ্যাঁগরও, তাঁর বিরাট চিত্র L’ Apotheose d’Homere, যা লুভর চিত্রগৃহে বর্তমান, তার দুর্ভাগ্য সত্যিই পীড়াদায়ক। চিত্রটি ভালোভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে, চিত্রের দক্ষিণ ঊর্ধ্বকোণে, ঠিক আলেকজান্দ্রার মাথার উপর আকাশদেশে অতর্কিতে আর একটা নক্সার আবির্ভাব। এই বিরাট চিত্রের যে কী পরিমান ক্ষতি তা বর্ণনার বাইরে, যে শিল্পী নির্ভুল রং ও রেখা ব্যবহারে অদ্বিতীয়, তাঁরও বিন্দুমাত্র অসর্তকতা আজ অনন্ত দুঃখের কারণ হয়েছে। এসব কথা হেলাফেলার কথা নয়, যেহেতু আর্টই একমাত্র দেশকালের ঊর্ধ্বে নিরপেক্ষ বিচারসাপেক্ষ। অতএব উপাদানগত বিড়ম্বনা কম নয়, এবং একথা সত্য যাঁদের কিঞ্চিৎমাত্র শিক্ষা এ বিষয়ে আছে তাঁরাই যে কোনও দেশীয় প্রদর্শনীতে গিয়ে যাচাই করতে পারেন যে রং ব্যবহারে আহাম্মক প্রতিক্রিয়া এদেশে কি পরিমাণে সম্ভব। এবং কোন সপ্তম নরকে আমরা ইদানীং অধিষ্ঠিত।

এখন ঈক্ষণগত আলোচনা আরও জটিল। বিংশ শতাব্দীর শুরুতে জাতীয়তা বোধের সাথে সাথে আমাদের দেশে যে চিত্র আন্দোলন তা নিতান্তই উপর উপর ও ভাসা ভাসা। ভারতীয়ত্ব ধারণায় বদ্ধপরিকর হয়ে যা সৃষ্টি হয়েছে তাকে ভারতীয় শিল্পের উপলব্ধির চর্চা মাত্র বলে গণ্য করা যেতে পারে। একথা কুমারস্বামী যথার্থভাবেই শনাক্ত করেন। ফের, আজ যা প্রায় হয়ে থাকে, তাকে পাশ্চাত্য শিল্পের উপলব্ধির চর্চা বলে মেনে নিতেই হয়। একারণে, যথার্থ ভারতীয়ত্বের যে স্বাতন্ত্র্য তার স্বরগ্রাম ছোঁয়াচ কোথাও নেই বললে হয় – যার প্রথম ও শেষ কথা পরোক্ষরূপতা এবং মহাজাগতিক সম্পর্কের ধাঁচ ও ধরন অন্য সকল শিল্প হতে বিভিন্ন, ভিন্নরূপে ও বৈশিষ্ট্যে তা একক। সে ক্ষেত্রে আজকের পদ্ধতিগত বৈষম্য এক অনতিক্রমণীয় বাধার সৃষ্টি করেছে চিত্রশিল্পীদের মধ্যে। অধুনা রংরেখার ব্যবহার মুখ্যত ইন্দ্রিয়জন্য, এই হিসাবে রূপান্তরতা ও স্বকীয় অভিব্যক্তির ক্ষেত্রে তার সকল প্রচেষ্টাই দ্বিধাগ্রস্ত। বাঁচার খাতিরে নব্য শিল্পীদের যে ওজর তা নিতান্তই বাতুলতার নামান্তর। গতানুগতিক ঐতিহাসিক ছাঁচ ও সুসংস্কারগ্রস্ত ধারণাসমূহ প্রায়ই বড় মুখে উচ্চারিত হয়ে থাকে। যেমন টেলিস্কোপ আবিষ্কার হবার দরুন মহাজাগতিক চেতনার সম্প্রসারণ, ফলত Baroque শিল্পের সৃষ্টি, তেমনি আমাদের সিদ্ধান্ত হল সুপারসনিক সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে ইয়োরোপ হতে ভারত অবধি সমস্ত ভূভাগ উদ্বায়ুরূপে নিশ্চিহ্ন। অতএব আমরা ও সাহেবরা একই কথা। বস্তুত কিয়দংশে একথা সত্য হলেও ক্যামেরা বা গ্যাসের আলোর প্রভাব চিত্রে আসা সত্বেও সমস্ত উক্তিই কাকতালীয়বৎ যুক্তি মাত্র। কোনও সমালোচক, Malraux-র la psychologie de l’art উদ্ধৃত করে ও পরিষ্কার ভাবে বিশ্লেষণ করে একমত হন যে ‘un art vient toujours d’un autre art, et jamais directement de la nature’- অর্থাৎ ‘একা শিল্পরূপ হতে অন্য রূপেরই জন্ম এবং কখনই সরাসরি প্রকৃতি হতে নয়।’ আরও সংস্কৃতিক ক্ষেত্রেও Levi Strauss -এর গবেষণায়-‘Aucune analyse reelle ne permet de saisir le passage entre les faits de nature et les fait de culture’ অর্থাৎ প্রাকৃতিক ও সাংস্কৃতিক ঘটনাবলির উত্তরণ রূপের কোনও বিশ্লেষণই বাস্তব বলে গ্রহণযোগ্য নয়। এবং মন্তব্য করেন শিল্পে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে কেবলমাত্র বর্ণনা করাই সম্ভব, কিন্তু হ্রস্বিকরণের অবকাশ কোথাও নেই। অতএব শিল্পকলার বিবেচনা শিল্পকলা মারফতই সত্যকার বিবেচ্য।

এখন আমাদের পরিস্থিতিগত সারসংক্ষেপ কথা হল অভিব্যক্তির মাত্রায় ঈক্ষণগত আত্ম-কেন্দ্রিকতা যদি ঔষুধি হয়, তবে উপাদানিক উপায় হবে তার অনুপান। সেই ব্যাপ্তিগুণ যা পাশ্চাত্যের অবদান তা কোন কৌণিক পটভূমিকায় সত্য ও আমাদের আত্মীকরণোপযোগী তারই আলোচনায় জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর-এর কথা আমাদের মনে সর্বাগ্রে উদয় হয়। তাঁকেই ধন্যবাদ যাঁর কল্যাণে এই মিলিত প্রসারের সম্ভাবনা হয়েছে। কিন্তু তাঁকে বুঝতে হলে তাঁর যথাযথ প্ররিপ্রেক্ষণে বোঝা প্রয়োজন।

ঐতিহাসিক ভাবে আধুনিক চিত্রকলা অষ্টাদশ শতক হতে আজ অবধি প্রচলিত। এর পত্তন কালকে Neo-classicism যুগ বলে অভিহিত করা হয়। মুখ্যস্থান হল পারি শহর। আরও গভীরভাবে মনে রাখা কর্তব্য যে ঐতিহাসিকভাবে ফরাসি দেশ ছিল মধ্যযুগীয় সভ্যতার কেন্দ্রস্থল। স্থাপত্য ও মূর্তি ছাড়া চিত্র নিদর্শন খুবই বিরল। তবু ধর্মেকর্মে প্রতীচ্য সংসর্গ কম ছিল না। পরে যখন পঞ্চদশ শতকে রেনেসাঁস যুগে ফরাসি দেশ রাজনৈতিক বিভেদে বহুধা বিভক্ত, তখন চিত্রশিল্পের কেন্দ্র ছিল Avignon, Dijon, Moulins Ý Bourgogne, Bourge এবং Tours। সেই সময় এই সব অঞ্চলে ফ্লেমিস প্রভাবে কাজ হত। Moulins-এর শিল্পী Nicholas Froment-এর কাজ মহিমান্বিত কুমারী মাতা Moulins ক্যাথেড্রালে আছে। আর এক খ্যাতনামা শিল্পী Tour শহরের জাঁ ফুকে (Jean Fouquet 1415-1477)। তিনি মুখ্যত মিনিয়েচার চিত্র আঁকতেন। এই সময়ে ধীরে ফ্লেমিস পদ্ধতি ছেড়ে ফরাসি দেশ ইতালীয় পদ্ধতিতে আকৃষ্ট হয়। এবং সঙ্গে সঙ্গে ফঁতেইনব্লো (Fontaineblau) স্কুলের প্রবর্তন হয়। রেনেসাঁ সভ্যতা ফ্রান্সে প্রবর্তনার মূলে হলেন ফরাসি দেশীয় অ্যাম্বাসেডর, বিশপ, কর্ডিনাল, ব্যবসায়ী শিল্পীগোষ্ঠীও; এবং ফরাসি রাজাদের ইতালি আক্রমণও অন্য এক কারণ যে কারণে ফ্রান্সে ইতালীয় শিল্প প্রচার বহুল পরিমাণে দেখা দেয়। রাজা প্রথম ফ্রান্সিস খ্যাতনামা ইতালিয় শিল্পীদের আমন্ত্রণ করে আনেন ফ্রান্সে; যথা Andrea del Sarto, denvenuto Cellini, Leonardo da Vinci এবং Rosso, Primaticcio শেষোক্ত শিল্পীদ্বয় ফঁতেইনব্লোতে ও প্রথমোক্ত শিল্পীত্রয় আঁম্বোয়জ Ambosie-এ বসবাস করতেন।

এইভাবে নানা দেওয়া-নেওয়ায় রেনেসাঁস অভিব্যক্তিগত Plastic বা sculpuresqne রূপায়ণের আবির্ভাব, Henric Wolfflin-এর ভাষায়। অর্থাৎ ত্রিমাত্রিক পরিপুষ্ট আকৃতির পরিপন্থী সর্বত্র ছড়িয়ে দেখা দিল। পরে সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতকে প্রথমে Baroque ও পরে Rococo রীতি প্রবর্তিত হয়, যা আবার Henric Wolfflin -এর ভাষায় painterly বা pictorial বলে অভিহিত হয়ে থাকে। হলেও চিত্রে তা ছিল ত্রিমাত্রা-বদ্ধ, বস্তুনিচয় আলোককিরণে স্নাত, প্রায়শ আলংকারিক। তখনকার শ্রেষ্ঠ শিল্পী হলেন নিকলা পুঁসা (Nicolas Poussin 1594-1665) এবং ক্লোদ লরাঁ (Claude Lorrain 1600-1622) একজন দৃশ্যপট আকৃতি ও অন্যজন দৃশ্যচিত্রের গুণীন ছিলেন। লরাঁই প্রথম খ্যাতনামা শিল্পী যিনি দৃশ্যচিত্রই মুখ্য বিষয়বস্তুরূপে রূপায়ণ করেছেন।

নিকলা পুঁসা-র চিত্রের বৈশিষ্ট্য অনেক। সমস্ত মনুষ্য আকৃতি, আলো ও অবকাশ মিশ্রিতরূপে অতীব ঐশ্বর্যবান, ছায়া অবকাশ সত্বেও কোথাও Rubens-এর মতো আকৃতি ছায়া ও অবকাশে মিলিয়ে যায় না। নক্সাকেই বর্ধিত করে চিত্র সৃষ্টি করা তাঁর রীতি। সেই নক্সাই আবার উচ্চ, নিম্ন, সমতল, গভীরত্ব পরিস্ফুট করে। পরিবর্তে লরাঁর চিত্রে আলো, দেশ, জল, বাতাস এবং অখণ্ড অবকাশ সম্পূর্ণ দিগবলয় উপস্থিত করে। অস্তমিত সূর্যের কিরণ স্পন্দিত হয় জলতরঙ্গে ও দীর্ঘ ছায়া তটে পড়ে এগিয়ে আসে চিত্রের সম্মুখভাগে, চিত্রের মধ্যভাগে প্রজ্জ্বলিত ডিমের কুসুমের মতো স্থির সূর্য। ক্লোদের চিত্রে প্রতিফলিত আলোকস্রোত আজ দূরাবহ রূপে ইমপ্রেশনিস্টদের কথা মনে জাগিয়ে তোলে।

সপ্তদশ শতকে le Nain ভ্রাতৃদ্বয়, Louis এবং Mathieu এর প্রতিকৃতির অভিনবত্ব হল, তাতে ফ্লেমিস ইতালিয় পদ্ধতি নামমাত্র রূপে দেখা যায়। কিন্তু অষ্টাদশ শতকে অতি ক্ষমতাবান শিল্পী জাঁ আঁতোয়ান ভাতো (Jean Antoine Watteau 1684-1721), তাঁর তুলিকাজালে এক নব পদ্ধতির রূপদান করেন যা পরে Rococo বৈশিষ্ট্যের নিদর্শন বলে গণ্য ও প্রচলিত হয়। ইনি রুবেনস-এর চিত্র অনুশীলন করেন। এঁর চিত্র সর্বদাই ক্ষুদ্র, রুবেনস-এর মতো খুব বড় রীতিতে আঁকা নয়। বড় পটভূমিকা গঠনের ক্ষমতা তাঁর ছিল না। ভাতো অন্যত্র Peintre des fetes galautes বলে পরিচিত। সেইমতো হালকা আবহাওয়ার চিত্র, প্রায়শ খোলা ময়দানের মেলার দৃশ্য, যেখানে মহিলারা এবং ভদ্রমহোদয়গণ সিল্ক সজ্জায় ভূষিত। কিন্তু Rococo সম্মত তরলস্বভাবের চিত্র অভিব্যক্তি, পরে Francois Boucher (1708-1770) এবং Jean Honore Fragonard (1732-1806)-এর মধ্যে আমরা দেখি। প্রায়শ রাজকীয় প্রতিকৃতি ও নগ্ন হ্বেনাস, কিউপিড ইত্যাদির চিত্রগীত তাঁরা রচনা করেন। কিন্তু ১৬০৯-১৭৮৯ হল Jean Baptiste-এর কাল, যাঁর স্বকীয় পদ্ধতি লক্ষণীয়, ঘনত্ব এবং রং ও রেখা দুই মুখ্যরূপে ব্যবহারে তাঁর চিত্রে বেশ একটা নতুন আদল পাওয়া যায়, মনে হয় তাতে আধুনিকত্বের ছায়া আছে। তথাপি আলোছায়া মিলিয়ে যাওয়া আকৃতির অংশে অষ্টাদশ শতকের ধারা তাঁর কাজে পুরোপুরি বাজায় দেখি। এই অষ্টাদশ শতকের কাজ প্রাকৃতিক বাঁধনে আঁটসাট বাঁধা, তরল আলোছায়া ও আবহাওয়াগত ঘনত্ব মূর্ত। কোথাও আলোকের গতিপথ সংক্রান্ত উৎস প্রচ্ছন্ন বা অপ্রচ্ছন্ন। কিন্তু সর্বত্রই বিরাজমান ত্রিমাত্রা এবং সবই পরিপূর্ণভাবে ঘন। ওই কালের বৈসাদৃশ্যগতভাবে আধুনিক যুগ যা ১৮০০ সাল হতে আজ অবধি চালু-তার পুরোধায় হলেন Neo-classicism-এর David (1748-1825)-এর শিষ্য জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর। তিনিই যথার্থ অধুনা মূল্যায়নে, নবধারার সূচনায় জগদগুরু।

অ্যাঁগর তাঁর চব্বিশ বছর বয়সেই দখল করেছিলেন তাঁর আর্টের সারাংশ। মতুবাঁ-য় তাঁর জন্ম ২৯ অগস্ট ১৭৮০। পিতা ছিলেন আলংকারিক মূর্তিকার। শিশুকালেই পুত্রকে নক্সার কাজ ও সংগীত শেখান। ১৭৯১ সালে Academis des Arte de Toulouse-তে শিক্ষানবিশির জন্য ভর্তি হন। এই সময় নিজের জীবিকা অর্জনের জন্য দ্বিতীয় ভায়লিনিস্ট হিসাবে কাজ করেন I’orchestre du Capitole -এ এবং পারি শহরে ১৭৯৭ সালে আসেন ও প্রথমে David-এর ছাত্র ও পরে Ecole des Beaux Arts-এ পাঠ নেন। ১৮০১ সালে তখনকার শ্রেষ্ঠ পুরস্কার Grand Prix de Rome লাভ করেন। ১৮০৪ সালে সরকার নিয়োজিত কাজ এই সময় করেন ও Premier Consul বোনাপার্তের প্রতিকৃতি আঁকেন ও আত্মপ্রকৃতিও ওই সালে আঁকা। উপরোক্ত চিত্র Musee des Beaux Arts, Liege এবং দ্বিতীয়টি Muse Conde Chantilly-তে রক্ষিত। দুটিই শিল্পইতিহাসে অনবদ্য চিত্র। বিস্ময়ের অবধি থাকে না একথা ভাবলে যে কেবলমাত্র চব্বিশ বছর বয়সে এ জাতীয় স্বকীয়তা, যাকে বলে chef d’ouvre সৃষ্টি, কোনও যুবকের পক্ষে সম্ভব।

শুধু তাই নয়, অ্যাঁগর-এর সঙ্গে সঙ্গে এক বিপরীত পদ্ধতির অবতারণা আমরা দেখতে পাই। পরের বছর তাঁর অঙ্কিত চিত্র মহাশয়, মাদাম ও মাদমোয়াজল রিভিয়ের-এর প্রতিকৃতিতে অভিব্যক্তি পরিপূর্ণভাবে মূর্ত-গঠনপ্রণালী, শীলত্ব বোধক, ভাবসাম্য সুগঠিত, বদান্য মনোভাব মূর্ত, রূপ সৃষ্টি মনোরম। madame Riviere-এর প্রতিকৃতিতে লক্ষিত হয় যেন অ্যাঁগর-এর সমূহ শক্তি উন্মোচিত। রেখার সৌন্দর্য, সম্ভ্রান্ত রং, বসনভূষণের উচ্ছ্বাস, জীবন্ত অভিব্যক্তি joi de vivre-এর উচ্ছ্বাস সত্যিই নয়নাভিরাম। ভদ্রমহিলার হাত থেকে এরাবেস্ক রেখা যা শালের রেখা থেকে ধাবিত তা যেন জীবন-ইপ্সিত গতিতে ছন্দিত। শালের কাশ্মিরী কাজ, পরিবেশে প্রাচ্য বৈভব ও আলোক-সমতা চিত্রের কানায় কানায় মোহাচ্ছন্ন করে। ১৮০৬ সালে পারি-তে তিনি চারটি প্রতিকৃতি দান করেন যা ফরাসি শিল্পজগতের সব থেকে সুন্দর রচনা বলে গণ্য করা চলতে পারে। Frank Elgar এই ছবির কথায় বলেন, অ্যাঁগর-ই জানতেন, ‘তিনি কী চান, তিনি কী পারেন রচনা করতে’। তাঁর কল্পনা স্বতন্ত্র ও শিল্প অভিনবত্বে ভরাট। এবং, বিশ্বাস অতি স্থির, উচ্চাকাঙ্ক্ষা তীক্ষ্ণ, পরিমাপহীন। যখন Salon-তে সমালোচক ও জনসাধারণ তাদের সুন্দর দাঁত দিয়ে তাঁর কাজ চিরে দিতে রত তিনি তখন রোমে গিয়ে চিত্রচর্চায় শান্তিতে নিয়োজিত।

এই রকম নানা চিত্রের নানা কথা সত্যিই আজ আমাদের মুগ্ধ করে, কিন্তু তদানীন্তন কালে সেই সেই গুণই ছিল কটাক্ষ ও বিদ্রুপেরও বিষয়। Robert de la Sizeranne জঘন্যভাবে কটাক্ষ করে বলেছিলেন, ‘পরিপ্রেক্ষণের আইন মানে না’- সত্যিই তা লক্ষণীয় L’ Apothé ose d’Homére, Le Martyre de Saint Symphorien, Jésus parmi les doctcurs এবং Bain ture ও c’Aged’or চিত্রগুলিতে। বেশ পরিষ্কার ভাবে বোঝা যায় তিনি কম্পোজিশনের ভারসাম্যের তাগিদে পরিপ্রেক্ষণ অবহেলা করেছেন। এ কিন্তু আবার আধুনিকতার মহা শিক্ষা। অ্যাঁগর-এর আর এক রুচিগত বীতরাগ ছিল অ্যানাটমির অত্যাচার। তাঁর চিত্রের ব্যক্তিগণের হাড়মাংস নিয়ে তিনি ব্যস্ত নয়, ঘনত্ব অতি স্বপ্ল পরিমাণে উদ্ধৃত ও চিত্র সমতলক্ষেত্রগতভাবে চাপা। যেহেতু অ্যাঁগর ক্লাসিক বিষয়বস্তুর পক্ষপাতী ও দ্বিমাত্রাপ্রবণ চিত্রী তাই তখনকার কোনও মূর্তিকার শ্রেষ্ঠ বাক্যে বলেন যে অ্যাঁগর হলেন এক চৈনিক যিনি এথেন্সের ধ্বংসে হারিয়ে গেছেন। Madame Devaucay-র প্রতিকৃতি – Jupiter et Thétis উল্লেখযোগ্য চিত্র – এবং অভূতপূর্ব Grande Odalisque চিত্রটি। কিন্তু তখন তা সমালোচ্য বিষয় ছিল এই হিসেবে যে Thétis গলগণ্ডযুক্তা এবং ওদালিস্ক-এর নারীদেহটি যেন তিনটি মেরুদণ্ডে প্রলম্বিত। আসলে এই চিত্রেই প্রথম চিত্রজগতে pictorial distortion-এর চক্ষুদান করে এবং যে কল্যাণে পাশ্চাত্য শিল্পীরা চৈনিক, ভারতীয়, সুমেরীয় ও তাদের মধ্যযুগীয় ও নেগ্রে, পারস্য শিল্পকলা উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়।

Distortion কদর্থে নয়, অ্যাঁগর-এর চিত্রে সমস্তই সদর্থে ও সৌন্দর্যের মাত্রায় নবরূপে প্রতীয়মান La Source, Venus, Les Baigneuses, les Odalisques ও apotheoses যেমন L’Aged’or এবং Le Bainturc ইত্যাদি চিত্র ঐতিহাসিক মহাসৃষ্টি। তাঁর প্রতিভার ছোঁয়াচে সমস্ত চিত্র তার পবিত্রতা সবলতা ও অভিব্যক্তির আঙ্গিক ও জ্যামিতিক স্বতঃসিদ্ধতায় উন্মীলিত। Elgar-এর মতে যে কোনও শিল্পীই হোক না কেন-Titien, Poussin, Goya, Delacroix, Manet, Courbet ও Renoir- অত পবিত্র রেখা কেয়ারি করতে সক্ষম হয়নি। অ্যাঁগর-এর চিত্ররেখা বা তাঁর রেখাচিত্রও এখনও নকল করার তাগিদ মহা মহা ধনুর্ধর শিল্পীদের মধ্যে প্রচলিত। এবং বলা বাহুল্য, Manet, Degas, Toulouse-Lautrec, Picasso প্রভৃতি ও আরও অনেকেই অ্যাঁগর-এর কাছে একান্ত ঋণী।

চিত্রের যে দ্বিমাত্রিক ও যুগপৎ গঠনপ্রণালী বা Simultaneity তা অ্যাঁগর-এর চিত্রেই আমাদের দৃষ্টি আঁচড়ায়। তাছাড়া কমনীয় ও নমনীয় মুখলাবণ্য তো বটেই, এমনকি হাতের বা আঙুলির ছন্দোবদ্ধ ভঙ্গি-দক্ষিণ ভারতীয় ব্রোঞ্জের মতো আন্তরিক ঠিকানায় ধৃত। চিত্রের কানায় কানায় আমরা পরিমিতভাবে ছাড়িয়ে পড়ি, শেলাইকরা ফুল ও পাতায়, ময়ূরপাখনার পাখায়, আলজেরিয়ান পাইপ ও গড়্গড়া ইত্যাদিতে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আমাদের অন্তর মন্থিত করে। এদিকে অ্যাঁগর-এর সমসাময়িক Romanticism-এর যে আন্দোলন তার পুরোধা হলেন অ্যাঁগর-এর প্রতিদ্বন্দ্বী Eugene Delacroix (1799-1863) এঁদের চিত্ররূপে স্বয়ংসম্পূর্ণ চিত্রপটের ধারণা কল্পনার বাইরে।

আমরা পাশ্চাত্যের কাছে চিত্রদীক্ষায় দীক্ষিত হলেও, ইতিপূর্বে হবার সম্ভাবনা ছিল না। কারণ, চিত্রগত স্বয়ংসম্পূর্ণতা আমাদের দেশের পদ্ধতি আবহমানকাল থেকে হয়ে এসেছে। তবে চিত্ররূপ অর্থবোধক হবার প্রয়োজনীয়তার সে চিত্র অন্যরূপে রচনা হত। কিন্তু অর্থহীন চিত্র, যেমন পশ্চিমে হয়ে থাকে, সেরূপ আধুনিকত্ব আমাদের মধ্যে নেই – অর্থাৎ আমাদের মনন ডৌল ও আকৃতি ওদেশের মতো একেবারেই নয়। এদেশে মঁতেইঙন বা দেকার্ত না জন্মগ্রহণ করারই ফল। অতএব আমরা যে ক্ষেত্রে মিলি তা নিছক প্রণালীবদ্ধ চিত্রকল্পে – এমন একটি জায়গায় যেখানে আমরা ঘর করতে পারি। এ কিন্তু সম্ভব হত না যদি দোলাক্রোয়া মারফত এক ত্রিমাত্রিক সরলপথ আজ অবধি চলে আসত।

অ্যাগর-প্রণোদিত পথেই এক সুখকর জোড়কলমের কাজ সম্ভব হয়েছে পক্ষান্তরে সেখানে আমাদের রুচি মন ও ইচ্ছের স্বীকৃতি পাই। অতএব এখানে Influence -এর কথা ওঠে না, ওঠে Confluence -এর কথা, অবশ্য যদি আমরা আমাদের কাজ ঈক্ষণ ও রচনার দ্বারা তাদের স্বতন্ত্র চিহ্নে চিহ্নিত করতে পারি। এই হিসাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বিমাত্রিক চিত্রপট অবদানের জন্য আমরা জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর-এর কাছে কৃতজ্ঞ, যা প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মধ্যে সেতু নির্মাণে সহায়তা করেছে। মোট কথা, ওপারের তটে ভাঙন ধরাতেই এপারের তট সৃষ্টি, ও সেই ভাঙলের স্রষ্টা হলেন জাঁ দমিনিক অ্যাঁগর, মৃত্যু ১৮৬৭ এবং এই তাঁর মৃত্যুশতবার্ষিকী – এই সূত্রে আমরাও তাঁকে আমাদের শ্রদ্ধা জানাই।

৫ম বর্ষ ৪-৫ সংখ্যা

(শারদীয় ১৩৭৪)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *