রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস দৃষ্টি – সুরজিৎ দাশগুপ্ত

রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস দৃষ্টি – সুরজিৎ দাশগুপ্ত

আঠারোশো একষট্টি খ্রিস্টাব্দে জোড়াসাঁকোর যে বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের জন্ম হয় সেই বাড়িতেই উনিশশো একচল্লিশ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মৃত্যু। নিরবধি কালের পটে মাত্র আশি বছরের সীমারেখাতে তিনি দেহধারণ করে গেলেন। ভারতবর্ষের হাজার হাজার বছরের ইতিহাসের পক্ষে এই সময়কাল যেন এক পা তুলে আর এক পা ফেলা। কিন্তু এক পা ফেলেই রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ভারতবর্ষের ইতিহাস যে কতগুলি যুগ এগিয়ে গেল তা একদিন ভবিষ্যতের ভারতবর্ষ বিচার করবে। ভবিষ্যতের মানববংশের কানে কবির সেই অলৌকিক বাণীপুঞ্জ যখন তাঁর আপন কালের বিশেষ কথাটি জানাবে তখন একই সঙ্গে তার মধ্যে গুঞ্জিত হতে থাকবে কবির অতীতকাল, স্মৃতিতে আক্রান্ত, বিধুর ও জ্বলন্ত। সেই যে তিনি অতীতের উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘বিস্মৃত যত নীরব কাহিনী স্তম্ভিত হয়ে বও। ভাষা দাও তারে, হে মুনি অতীত, কথা কও, কথা কও।’ – সেই ভাষাই তিনি জুগিয়েছেন অতীতের মুখে। তাই আজ আমাদের দেশে সংস্কৃতি-সম্পন্ন এমন ব্যক্তি পাওয়া কঠিন ‘পিতামহদের কাহিনী’ সম্বন্ধে যাঁর কল্পনা কোনও-না কোনওভাবে রবীন্দ্রনাথের দ্বারা আলোকিত নয়।

রবীন্দ্রনাথের জৈব-অস্তিত্ব একটি বিশেষ ও নির্দিষ্ট সময়কালের মধ্যে আবদ্ধ ছিল, কিন্তু তাঁর অলোকসামান্য চেতনা স্বচ্ছন্দে বিহার করেছে ভারতবর্ষের সুদীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে। এই ইতিহাস যতদিনের, তাঁর চেতনার বয়সও বুঝি বা ততদিন। এবং ব্যাপক অর্থে সে-বয়স আরও বেশি- তার মানে যেসব স্থানে তিনি বলেছেন, ‘আমার মিলন লাগি তুমি আসছ কবে থেকে’ অথবা ‘কবে আমি বাহির হলেম তোমারি গান গেয়ে’-সেসব স্থানে তাঁর চেতনার বয়সের হিসেব কে-ই বা রাখে! কিন্তু অঙ্কের পরিমাপে যেখানে সে-হিসেব করা সম্ভব সেখানেও তাঁর চেতনার গাছপাথর বের করা কঠিন। রবীন্দ্রনাথের শিরা-ধমনীতে যে রক্তস্রোত প্রবাহিত হত তা-ই যেন শয়নে স্বপনে দৈনন্দিনকার হাজারো কাজকর্মের মধ্যেও সেই অতীতকে বয়ে বেড়াত। সেই স্রোতের টানে অতীতের কত ঘটনা নতুন তাৎপর্য পেয়েছে, যেমন কচ বা কর্ণ মূল কাহিনির বাঁধন আলগা করে নতুন রূপ ধরে দেখা দিয়েছে তাঁর কাব্যে – এমন-কি ‘গান্ধারীর আবেদন’-এ দুর্যোধনও আপন লক্ষ্য নির্ণয়ে অকপট তথা সৎ, আকাঙ্ক্ষার প্রচণ্ডতায় পৌরুষে ভরপুর এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর বঙ্গমনীষায় যে আধুনিকতা বিকশিত হয় সেই মূল্যবোধে অনন্য। অবশ্য এ-কথা একশোবার সত্য যে, কাব্যরচনায় যে স্বাধীনতা স্বতঃসিদ্ধ ইতিহাসের বিচার করবার বেলায় তা একেবারে অচল। পক্ষান্তরে একথাও কি সত্য নয় যে ঐতিহাসিকমাত্রেই আপন বিবেচনার দ্বারাই কতকগুলি ঘটনাকে স্বপক্ষে ও কতগুলিকে বিপক্ষে দাঁড় করান এবং ঘটনা নির্বাচনের ব্যাপারটা বিশেষ বিশেষ ঐতিহাসিকের ব্যক্তিত্বের উপরেই নির্ভরশীল?

রবীন্দ্রনাথ তথাকথিত ঐতিহাসিকদেরই একজন হলে আপন ব্যক্তিত্ব অনুসারে ঘটনার শুধু বিন্যাস করেই ক্ষান্ত হতেন। কিন্তু তিনি একজন দ্রষ্টাও বটে। সেই বিশেষ অর্থেও তিনি একজন দ্রষ্টা যে-অর্থে অল্প ক’জন ক্ষণজন্মা ঐতিহাসিককেও আমরা দ্রষ্টা বলে থাকি। উপরন্তু তিনি অমর্ত্য প্রতিভাসম্পন্ন আশুচেতন কবি, তাঁর বুকের নিভৃত কেন্দ্রে জ্বলছে এক মহান দেশের সুদীর্ঘ সাধনা। এই দেশের কোনও ঘটনাই তাঁর সত্তার থেকে সম্পর্কশূন্য নয়, কোনওটাই তাঁর অস্তিত্বের পক্ষে সম্পূর্ণ অনাবশ্যক বা অতিরিক্ত নয়, কোনওটাই তাঁর চোখে পুথির পাতার অনড় নীরক্ত সুদূর তথ্য নয়, বরং সব কিছুকেই প্রশ্বাসের মতো টেনে নিয়েছেন নিজের ভিতরে, তারপর তার থেকে তত্বটুকু নির্যাসের মতো গ্রহণ করে, স্বীকার করে, বাকিটুকু ত্যাগ করেছেন নিঃশ্বাসে। রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং বলেছেন, ‘বাহিরের জগৎ আমাদের মনের মধ্যে প্রবেশ করিয়া আর-একটা জগৎ হইয়া উঠিতেছে।’ বাইরের উপকরণ সকলের মনের মধ্যে নতুন রূপ পায় এটা ভাবা ভুল, কিন্তু স্রষ্টার চিত্তে নিশ্চয়ই পায়। রবীন্দ্রনাথের চেতনায় ইতিহাসের নৈর্ব্যক্তিক ঘটনাবলি ‘আর-একটা জগৎ’ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সেটা সিদ্ধ জগৎ নয়, তাকে সাধ্য বলাই সমীচীন। বাস্তবের নয়, তা একান্তরূপে সাধনার জগৎ। সেজন্যে মানতেই হয় যে রবীন্দ্রনাথের ইতিহাস-চর্চা তত্বপ্রধান। কিন্তু স্বীকৃতিটুকুকে অভিযোগ হিসেবে খাড়া করতে গেলে ঐতিহাসিক অনুসন্ধানকার্যকে মাত্র একটি পথে বেঁধে রাখতে হয়। তাতে রবীন্দ্রনাথের কিছু এসে যাক বা না-যাক অন্তত ইতিহাস-চর্চার পক্ষে সমূহ সর্বনাশ।

অতএব মোদ্দা কথাটা দাঁড়ালো এই, যে প্রক্রিয়ার বশে রবীন্দ্রনাথ শিল্প সৃষ্টি করেছেন সেই একই প্রক্রিয়ার বশে তিনি ইতিহাস রচনা করেছেন। তবে তিনি তো পেশাদার ঐতিহাসিক নন, তাঁর ইতিহাস রচনার অর্থ ইতিহাস সম্পর্কে ইতস্তত কবিতা বা প্রবন্ধ লেখা। সে ধরনের রচনায় সত্য যতখানি স্থান পেয়েছে তার চাইতে আরও বেশি স্থান পেয়েছে সেই জিনিস যাকে তিনি নিজেই ‘গল্পসল্প’-এ চিহ্নিত করেছেন ‘আরও সত্য’ বলে। অবশ্য একথা বললে ইতিহাসের ছাত্রদের তরফ থেকে গুরুতর আপত্তি ওঠা খুবই সম্ভব। কেননা ‘সত্য’ বলতে নির্মল শীতল ঘটনাবলিকেই তাঁরা বোঝেন। পক্ষান্তরে ‘আরও সত্য’ বললে ব্যাপারটাকে এক সুসমঞ্জস কল্পনামাত্র মনে হয়। যদি আপাতচোখে দেখা যায় তবে প্রকৃতই রবীন্দ্রনাথ যে ইতিহাস রচনা করেছেন সেটা এক সুসমঞ্জস কল্পনা। ভারতবর্ষের ইতিহাসে নানা বিপরীত সুরের মধ্যে তিনি যে ঐকতান শুনতে পেয়েছেন, বাস্তব পরিস্থিতির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে তা বোধহয় শোনা যাবে না। আজও অনেক ডাকসাইটে ঐতিহাসিকের মতে ভারতের মুসলমান যুগগুলি প্রক্ষিপ্ত, মুসলমান শাসনের থেকেই হিন্দুস্থান তার স্বাধীনতা হারিয়েছে। আধুনিক উৎপাদন প্রথাকে পশ্চিম হতে আগত ভৌতিক উৎপাত বলে ঠেকাবার চেষ্টা মহাত্মাজি জানপ্রাণ দিয়ে করেছিলেন; একালে ইংরেজির মতো আন্তর্জাতিক ভাষাকে দেশ হতে ঝেঁটিয়ে তাড়িয়ে তার স্থলে বিশুদ্ধ হিন্দিকে বসাবার সরকারি উদ্যোগের কথাও এ প্রসঙ্গে স্মরণীয়। কিন্তু তাই বলে কি রবীন্দ্রনাথের শ্রুতিতে ভারতীয় ইতিহাসের যে-ঐক্যতান ধরা পড়েছিল তা একেবারে অবাস্তব কল্পনামাত্র? যখন কেউ বাইসাইকেলে চড়া শিখতে চায় তখন বারেবারে তাকে আছাড় খেতে হয়। তা দেখে যদি আর একজন বলে যে ওই আছাড়-খাওয়াটাই সত্যি আর মধ্যে মধ্যে অল্পক্ষণের জন্যে যে ভারসাম্য রাখছে সেইটে মিথ্যে তবে ধাঁধায় পড়তে হয় বৈকি। কারণ আমরা সবাই জানি যে ভারসাম্য রাখার মুহূর্তগুলোর মধ্যে যেসব ফাঁক পড়ছে সেসব ভরাট করে দিলেই সাইকলে চড়া হয়।

ভারতের ইতিহাস পতনে ও বিরোধে কতদূর বন্ধুর ও রোমাঞ্চকর সে-সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি ছিল মুক্ত ও সজাগ, কোনও মোহ তাঁর দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। তিনি নিজেই বলেছেন,

প্রত্যেক জাতির সমস্যা সেখানেই যেখানে তাহার অসামঞ্জস্য।… আমাদের প্রাচীন ভারতে অসামঞ্জস্য রাজায় প্রজায় ছিল না, সে ছিল এক জাতি সম্প্রদায়ের সহিত অন্য জাতি-সম্প্রদায়ের।

রাজা-প্রজার অসামঞ্জস্য ইংলন্ডের ইতিহাসকে একদা চঞ্চল করে তুলেছিল, সুতরাং এক্ষেত্রে ইংলন্ডের ইতিহাস থেকে ভারতের ইতিহাসের পার্থক্য সুস্পষ্ট, কিন্তু ইংলন্ডের ইতিহাসের ছকে ফেলে আজও আমরা এদেশের ইতিহাসকে যাচাই করতে চাই। কিন্তু উপরের উদ্ধৃতিতে রবীন্দ্রনাথের ইঙ্গিতকে পরিণত ও বিশদ করে তুললে এটাই প্রকাশ পাবে যে ভারতবর্ষের ইতিহাসে জাতি-সম্প্রদায়ের বিরোধ একটি অনস্বীকার্য নিদারুণ ও পুরাতন সত্য এবং সেজন্যেই বিভেদের মধ্যে ঐক্য একটি প্রতিষ্ঠিত ব্যাপার নয়, বরং তা প্রতিষ্ঠা করবার জন্যে ঐকান্তিক সাধনাই ভারতীয় ইতিহাসের বৈশিষ্ট্য। ঐক্যের অভাব আছে বলেই তো তা আমাদের অন্বিষ্ট। ‘কী করিলে পরস্পরে মিলিয়া এক বৃহৎ সমাজ গড়িয়া ওঠে, অথচ পরস্পরের স্বাতন্ত্র একেবারে বিলুপ্ত না হয়, এই দুঃসাধ্য-সাধনের প্রয়াস বহুকাল হইতে ভারতে চলিয়া আসিতেছে, আজও তাহার সমাধান হয় নাই।’ পেশাদার ঐতিহাসিকগণের পক্ষে ‘আজও তাহার সমাধান হয় নাই’ বলা সম্ভব হত না। অথচ এই প্রয়াস ও সাধনাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন ভারতবর্ষের ইতিহাসে ‘ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া’। এই প্রক্রিয়াটিকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন, সমাধানটিকে সরিয়ে রেখেছেন লক্ষ্য রূপে। কালক্রমে আরও নানা সমস্যা এসে প্রক্রিয়াটিকে জটিল করে তুলেছে, সে বিষয়েও তিনি সম্পূর্ণ সচেতন। ‘যেখানে যথার্থ পার্থক্য আছে সেখানে এই পার্থক্যকে যথাযোগ্য স্থানে বিন্যস্ত করিয়া, সংযত করিয়া, তবে তাহাকে ঐক্যদান করা সম্ভব।’ সেজন্য তিনি খুব স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছেন ‘সকলেই এক হইল বলিয়া আইন করিলেই এক হয় না। যাহারা এক হইবার নহে তাহাদের মধ্যে সম্বন্ধস্থাপনের উপায় তাহাদিগকে পৃথক অধিকারের মধ্যে বিভক্ত করিয়া দেওয়া।’

আমরা কি এখানে একজন ভবিষ্যৎ-দর্শী ঐতিহাসিকের পরিচয় পাচ্ছি না? অবশ্য ঐতিহাসিক হিসেবে তাঁকে খাটো করে দেখবার একটা ঝোঁক কোনও কোনও পণ্ডিতের মধ্যে দেখা যায়। তার কারণ তাঁর প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক নিবন্ধগুলিতে নাকি অনেক তথ্যের ভুল আছে। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ নিজেই তথ্যকে বলেছেন ঘটনামূলক এবং সত্যকে বলছেন ভাবমূলক। ভারতবর্ষের মহাকাব্য পুরাণ ইত্যাদিতে পাওয়া যায় সত্যের নিদর্শন। সাংস্কৃতিক নৃতত্বে যেমন জনসাধারণের মধ্যে প্রচলিত নানা সাংকেতিক কাহিনি, গাথা ও অনুষ্ঠানের মর্মভেদ করে জনসাধারণের পূর্ণতর ইতিহাস বের করা হয় তেমনই রবীন্দ্রনাথ মহাকাব্য, পুরাণ, বৌদ্ধ দোহা ও কাহিনি, লোকসমাজের কিংবদন্তী , মহাপুরুষদের হেঁয়ালিপূর্ণ বচন ও দোহা প্রভৃতির তাৎপর্য অনুধাবন করতে চেয়েছেন এবং তার মধ্যে থেকেই ভারতবর্ষের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার অনন্য অভিব্যক্তিকে অন্বেষণ করেছেন। তাঁর চর্চার বিষয় ভারতের বিভিন্ন রাজপুরুষ বা শাসকদের কাহিনি তথা রাষ্ট্রীয় ইতিহাস নয়। কেননা তাঁর বিবেচনায় রাষ্ট্রীয় সমস্যা এদেশের জনজীবনকে স্পর্শ করেনি-অন্তত ইংরেজদের আগমনের পূর্বে করেনি । তাহলে রবীন্দ্রনাথের ইতিহাসচর্চার বিষয়টা কী? এ প্রশ্নের উত্তরে এক কথায় বলা যায় যে সেটা হল ভারতবাসীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অভিব্যক্তির যথার্থ পরিচয়। এই দুটি ক্ষেত্রে ভারতবর্ষের জনজীবনে যে-বিরোধ তাকে কেন্দ্র করেই ভারতবর্ষের ইতিহাস প্রায় তিন-চার হাজার বছর ধরে আবর্তিত হয়েছে। সেই বিরোধ সাময়িকভাবে চাপা পড়েছিল ইংরেজদের অধীনতায়। কিন্তু সামান্য শত্রুর বিরোধিতায় যেমন ভারতবর্ষের সকল জাতি-সম্প্রদায় এক হয়েছিল, তেমনই আজ ইংরেজ অপসারণের সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরাতন সমস্যা পুনরায় ভিন্নতর রূপ নিয়ে ভারত ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঞ্চলে কি মাথা তোলেনি?

‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধটির আচার্য যদুনাথ সরকার-কৃত ইংরেজি অনুবাদ ‘My Interpretation of Indian History’ মডার্নরিভিউ পত্রিকায় ১৯১৩-র অগস্ট-সেপ্টেম্বর সংখ্যায় বের হয়েছিল এবং সমজাতীয় প্রসঙ্গে রবীন্দ্রনাথ আরও একটি প্রবন্ধ লেখেন ‘A Vision of India’s History’– দুটি প্রবন্ধের নাম দেখলেই বোঝা যায় যে ভারতবর্ষের ইতিহাসের যথাস্থিত রূপ বর্ণনা করার কোনও উদ্দেশ্যই রবীন্দ্রনাথের ছিল না। কেউ যদি শিব গড়বার উদ্দেশ্য নিয়ে শিব গড়েন তাহলে তিনি কেন রুদ্র গড়লেন না এমন নালিশ শুনলে খুবই অদ্ভুত লাগে। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ মনে করতেন যে সাইকেল চড়তে শেখার সময় আছাড় খাওয়ার চাইতে ভারসাম্য রাখার চেষ্টাটাই বড় সত্য। দ্বন্দ্ব তো আছেই ভারতবর্ষের ইতিহাসে, পুনঃপুন পতনও আছে এবং নিঃসন্দেহে পরিমাণের দিক দিয়ে সেগুলোই বেশি। কিন্তু হাজার হাজার বছর ধরে ভারতবাসী সমস্ত সংঘর্ষ ও �লনের ঊর্ধে ওঠার জন্যে যে প্রয়াস পাচ্ছে, যে সাধনা করছে রবীন্দ্রনাথের কাছে সেটাই প্রধান, সেটাই লক্ষণীয়, সেটাই শ্রদ্ধেয় এবং তাঁর বিবেচনায় সেই প্রয়াস ও সাধনাকেই সিদ্ধির পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। নিছক অতীতচর্চার কোনও মূল্য নেই। যতক্ষণ না বর্তমান ও ভবিষ্যতের সঙ্গে অতীতের ঘটনাবলি তার তাৎপর্য ও শিক্ষার আপেক্ষিক প্রয়োজনীয়তার সম্পর্ক স্থাপিত হয় অর্থাৎ যতক্ষণ না তা বর্তমানকে বিভ্রান্তির হাত থেকে বাঁচায়, বর্তমানকে প্রেরণাহত করে, যতক্ষণ-না তা ভবিষ্যতের নিশানা দেয়, অন্ধকার পথ চলবার সময় আলো দেখায় ততক্ষণ ইতিহাস পর্যালোচনার সার্থকতা কোথায়, ইতিহাস সংক্রান্ত রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধগুলি শুধু এই মূল্যদণ্ডেই বিচার্য। ‘স্থায়ীকে রক্ষা করিয়া, অবান্তরকে বাদ দিয়া, ছোটকে ছোট করিয়া, ফাঁককে ভরাট করিয়া, আলগাকে জমাট করিয়া’ দেখানো যেমন রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের তেমনই তাঁর ইতিহাসেরও আদর্শ। তাঁর সে ইতিহাস আমাদের সারাক্ষণ মনে করিয়ে দেয় যে এদেশের উৎকৃষ্ট চিত্তগুলি যে লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্যে যাত্রা করেছিলেন সেখানে আজও পৌছানো যায়নি, সে-যাত্রাকে যেন অব্যাহত রাখা হয়, যেন পথ ভুল না হয়ে যায়, যেন আমরা লক্ষভেদ করতে পারি। তিনি ইতিহাসের উপকরণ সংগ্রহ করেছেন অতীত থেকে তা তো করতেই হবে-কিন্তু তাকে চালনা করেছেন ভবিষ্যতের অভিমুখে, কেননা একমাত্রসেখানেই রয়েছে তার স্বাশ্রয়ী সার্থকতা।

রবীন্দ্রনাথের কবিসত্তা বরাবরই সমন্বয়ের কল্পনাতে অভিভূত, সকল বাহ্যিক বিরোধের অন্তরালে একটি ঐক্যের শক্তি নিত্য সক্রিয় এ উপলব্ধিতে মহিমান্বিত। সেই একই কবিসত্তা যে ঐতিহাসিক রবীন্দ্রনাথকেও নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করেছে তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু কবিসত্তাকে ঐতিহাসিকে রূপান্তরিত করেছে সে সময়ের ঘটনাবলি। প্রকৃতপক্ষে যা ছিল একটি কাব্যিক প্রক্ষোভ তাকে সুষ্ঠু ও তীব্র স্বদেশজিজ্ঞাসা করে তোলে তৎকালীন স্বদেশি আন্দোলন।

বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে রবীন্দ্রনাথ নেমে পড়েন দেশের সাধারণ মানুষদের মধ্যে। সবার হাতে রাখি বেঁধে প্রেমের পরিচয় দেওয়ার অপূর্ব কল্পনা করা তাঁর মতো কবির পক্ষেই সম্ভব। রাখি হল মিলনের প্রতীক। গান বাঁধা হল ‘এবার তোর মরাগাঙে বান এসেছে জয় মা বলে ভাসা তরী।’ কিন্তু দেশ যখন বিচ্ছেদের বিষাদে মুহ্যমান তখনও নেতাদের মধ্যে দলাদলি ও ভেদাভেদ। নেতাদের সংকীর্ণতায় উত্যক্ত হয়ে সে-আন্দোলন থেকে সরে দাঁড়ালেন রবীন্দ্রনাথ। হৃদয়ঙ্গম করলেন যে, দেশ যেখানে এত ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত, নানা আত্মঘাতী শক্তিতে বিদীর্ণ সেখানে স্বাধীনতার দাবি অনর্থক।

একথা বলাই বাহুল্য, যে দেশে একটি মহাজাতি বাঁধিয়া ওঠে নাই, সে দেশে স্বাধীনতা হইতেই পারে না। কারণ স্বাধীনতার ‘স্ব’ জিনিসটা কোথায়? স্বাধীনতা-কাহার স্বাধীনতা? ভারতবর্ষে বাঙালি যদি স্বাধীন হয়, তবে দাক্ষিণাত্যের নায়র জাতি নিজেকে স্বাধীন বলিয়া গণ্য করিবে না। এবং পশ্চিমে জাঠ যদি স্বাধীনতা লাভ করে, তবে পূর্ব প্রান্তের আসামী তাহার সঙ্গে একই ফল পাইল বলিয়া গৌরব করিবে না। এক বাংলাদেশেই হিন্দুর সঙ্গে মুসলমান যে নিজের ভাগ্য মিলাইবার জন্য প্রস্তুত, এমন কোনও লক্ষণ দেখা যাইতেছে না।

রবীন্দ্রনাথের মনে এ-বিষয়ে কোনও সংশয়ই ছিল না, যে বিভেদের উপরে নেতারা দেশের মঙ্গলের পরিকল্পনা করছিলেন তা একদিন চোরাবালির মতো সমস্ত আশা ও প্রযত্নকে গ্রাস করে নেবে।

এই তো সেদিন রবীন্দ্রনাথ কলকাতার পথে পথে গান গেয়ে গেয়ে মিছিল চালনা করেছেন, আবার তার থেকে মাত্র ছ’মাস পরেই তিনি বোলপুরের নির্জনতায় আশ্রয় নিয়েছেন, গান লিখেছেন, ‘বিদায় দেহ ক্ষম আমায়, ভাই। কাজের পথে আমি তো আর নাই।’ কী বেদনা! কী হতাশা! কিন্তু রবীন্দ্রনাথের পক্ষে নিশ্চেষ্ট বা নিষ্ক্রিয় হয়ে বসে থাকা আদৌ সম্ভব নয়। সেটা তাঁর ধাতেরই বিরুদ্ধে। এক দিকে যখন তাঁর প্রকাশ বাধা পেয়েছে তখন অন্যদিকে তা পথ খুঁজেছে। কোনও অবসাদই তাঁর উদ্যমকে ক্ষয় করতে পারেনি। তেরোশো বঙ্গাব্দের ছাব্বিশে অগ্রহায়ণ শান্তিনিকেতেন থেকে তিনি এক পত্রে বন্ধু রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী মহাশয়কে লেখেন

উন্মাদনায় যোগ দিলে কিয়ৎপরিমণে লক্ষ্যভ্রষ্ট হইতেই হয়, এবং তাহার পরিণামে অবসাদ ভোগ করিতেই হয়। আমি তাই ঠিক করিয়াছি যে অগ্নিকাণ্ডের আয়োজনে উন্মত্ত না হইয়া যতদিন আয়ু আছে, আমার এই প্রদীপটিকে জ্বালিয়া পথের ধারে বসিয়া থাকিব।

সেই প্রদীপটি হল দেশের ভাঙাচোরার মধ্যে সর্বমানবের মিলনের কল্পনা। বিভেদ, বিরোধ ও বিদ্বেষ যখন প্রবল আকার ধারণ করেছে তখনই মিলনের কল্পনা রবীন্দ্রনাথের মনে সবচাইতে উচ্চ ও তীব্র হয়ে উঠেছে। ঘোর তামসিকতার মধ্যে প্রদীপের প্রয়োজনই সবচাইতে বেশি। নেতাদের হীন স্বার্থপরতা ও রেষারেষির প্রতিবাদেই রবীন্দ্রনাথ চারদিকে সাধ্যমতো প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতে শুরু করলেন।

অবশ্য বঙ্গভঙ্গ নামক রাজনৈতিক বিচ্ছেদের চাইতেও সাংস্কৃতিক বিভেদ আরও মর্মান্তিক একথা অশ্বিনীকুমার দত্ত, আবদুল রসুল প্রমুখ কয়েকজন দেশপ্রেমিক হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিলেন। এই বিষবৃক্ষকে গোড়া থেকে উপড়ে ফেলবার জন্যে তাঁর তেরোশো তেরো বঙ্গাব্দে বরিশালে এক প্রাদেশিক রাজনৈতিক সম্মেলন আহ্বান করলেন এবং সে সঙ্গে ব্যবস্থা করলেন এক সাহিত্য সম্মেলনের। মনের মতো এক যজ্ঞে পৌরোহিত্য করবার জন্যে সানন্দে রবীন্দ্রনাথ সাড়া দিলেন। ইংরেজ শাসক এই যজ্ঞ পণ্ড করেই ক্ষান্ত হল না, কৌশলে বপন করল বিষবৃক্ষের উর্বর বীজ। এবং পরিণামে স্থাপিত হল মুসলিম লিগ, যার মুখ্য কাজ বিদ্বেষের বিষবৃক্ষে জলসেচন করা। এই সংকটের মুখে কেমন করে রবীন্দ্রনাথ নির্বিকার থাকবেন? তিনি যখন ‘গোরা’ লেখা শুরু করেন তখন তাঁর মাথায় ঘুরছে বিষবৃক্ষের বিভীষিকা। হিন্দুধর্মের ভিত্তিতে জাতীয়তার ব্যর্থতা ততদিনে তাঁর কাছে স্বতঃসিদ্ধ হয়ে ধরা পড়েছে। জাতীয়তা ও মানবিকতার বিরোধ যে কোনখানে তাও আস্তে আস্তে স্পষ্ট হয়ে উঠতে শুরু করেছে তাঁর চোখে। তেরোশো ষোলো বঙ্গাব্দে উপন্যাসটির উপসংহারে এসে পরেশবাবুকে গোরা বলেছে ‘আজ সেই দেবতার মন্ত্র যিনি হিন্দু মুসলমান খ্রীস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই-যাঁর মন্দিরের দ্বার কোনও জাতির কাছে, কোনও ব্যক্তির কাছে কোনওদিন অবরুদ্ধ হয় না-যিনি কেবল হিন্দুর দেবতা নন, যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।’

কিন্তু ইতিমধ্যে ভারতবর্ষের বাইরে বিশ্ব-ইতিহাসে এমন কতগুলি প্রবণতা দেখা দিতে শুরু করে যেগুলি রবীন্দ্রনাথকে শঙ্কিত করে তুলতে থাকে। উনবিংশ শতাব্দীর শেষ বছরে জার্মানিতে প্রকাশিত হয় বর্নর্ড হৌস্টন খেম্বারলেন রচিত ‘উনবিংশ শতাব্দীর বনিয়াদ’ এবং ক’ বছর পরে তা ইংরেজিতে অনূদিত হয়। সে বই উনবিংশ শতাব্দীর ভিত্তি হিসেবে যা-ই প্রমাণ করে থাকুক না কেন তা নরডিক জাতির শ্রেষ্ঠত্বের অভিমান ও শক্তির দম্ভকে প্রতিষ্ঠা করেছিল, তাতে সন্দেহ নেই। অথচ এই শ্রেষ্ঠ ও শক্তিমান জাতি-ই কিনা শিল্পপণ্যের বাজারে ইংরেজ ফরাসি প্রভৃতি জাতির থেকে পিছিয়ে রয়েছে। এর প্রতিকার হল বিসমার্ক কর্তৃক প্রদর্শিত পন্থা, অর্থাৎ মারকে লেঙ্গা উপনিবেশ। বাণিজ্যিক প্রতিযোগিতা ও জাতিবৈরিতায় ইউরোপ তখন দ্রুত এগিয়ে চলেছে এক সাংঘাতিক বিস্ফোরণের মুখে।

আর সেই সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের চেতনায় ‘হিন্দু’, ‘দেশ’, ‘জাতি’ ইত্যাদি শব্দের অর্থও দ্রুত পালটে যেতে থাকে। ‘গোরা’ শেষ করবার তিনবছর পরে হিন্দু কথাটির অর্থ তাঁর কাছে কোনও ধর্ম বা কোনও ধর্মালম্বী ব্যক্তিবিশেষ রূপে থাকল না। তিনি ব্যাখ্যা করে বললেন ‘হিন্দু শব্দে এবং মুসলমান শব্দে একই পর্যায়ের পরিচয়কে বুঝায় না। মুসলমান একটি বিশেষ ধর্ম কিন্তু হিন্দু কোনও বিশেষ ধর্ম নহে। হিন্দু ভারতবর্ষের ইতিহাসে একটি জাতিগত পরিণাম।’ ইউরোপে জাতিতত্ব যখন একটা পরাক্রান্ত রূপ নিয়ে আবির্ভূত তখন রবীন্দ্রনাথের কাছে ‘হিন্দু’ শব্দটির অর্থ একটা জাতিতে পরিণত হয়েছে। মুসলমান খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীরাও এই হিন্দু জাতির অন্তর্গত যদি তারা ভারতবাসী হয়ে থাকে। হিন্দু হওয়া সত্বেও ব্যক্তিবিশেষের পক্ষে মুসলমান বা খ্রিস্টান ধর্মসম্মত আচার ও সাধনা পালন করা সম্ভব, যেমন শৈশব বা বৈষ্ণব বা ব্রাহ্ম ধর্ম পালন করা একজন হিন্দুর পক্ষে নিতান্তই স্বাভাবিক। এই হিন্দু জাতির বিশেষ সাধনা ও লক্ষ্য কী? প্রশ্নটির উত্তর রবীন্দ্রনাথ বিশেষ ভাবে দিয়েছেন ‘ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা’ ও ‘A Vision of Indian History’ নাম প্রবন্ধ দুটিতে। ধর্ম ও সম্প্রদায়ের সূত্র ধরে বিভেদ জর্জরিত সমস্ত ভারতবাসীকে তিনি স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন তার অন্বিষ্ট ও আদর্শ, আবার জাতির সূত্র ধরে বিরোধে উন্মত্ত বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপন করেছেন সমগ্র মানববংশের বেধ্য ও লক্ষ্য। এই দিগনির্দেশেই ঐতিহাসিক রবীন্দ্রনাথের যথার্থতা।

৪র্থ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা

(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৩)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *