মার্কস ও একালের মানবতাবাদ – অ্যাডাম শাফ
ইতিহাস কেন ফিরে ফিরে নতুন করে লেখা হয় তার আলোচনা ইতিহাসের তত্ব আলোচনায় এক বিশেষ কৌতূহলোদ্দীপক অংশ। দুর্ভাগ্যক্রমে এটা অস্বীকার করার উপায় নেই, ইতিহাসে যা-কিছু গুরুত্বপূর্ণ সে-সম্পর্কে ধারণা বিভিন্ন লোক বিভিন্নভাবে করতে পারেন, একই যুগে বাস করেও। তার কারণ তাঁদের সামাজিক পরিবেশ, বিশ্বাস ইত্যাদির বিভিন্নতা। বিভিন্ন যুগে বাস করলে তো এটা আরও বেশি হতে পারে। ঘটনার বিশ্লেষণ, ব্যক্তিচরিত্রের ব্যাখ্যা যুগে যুগে পালটে যায়। বিশেষ করে মহৎ ব্যক্তিদের চরিত্রব্যাখ্যা। কেন এমন হয় ভাবতে গিয়ে আমার নানা ধরনের কারণ মনে আসছে। কয়েকটি অবশ্য সর্বস্বীকৃত মামুলি কারণ, আবার কয়েকটি জটিল ও তর্কসাপেক্ষ। মামুলি কারণগুলি এই
১. কোনও ঘটনা বা ব্যক্তি সম্পর্কে নতুন তথ্যের আবিষ্কার। ২. ঘটনাটি পরবর্তীকালে যখন সুষ্ঠু আকার পায় তখন সে সম্পর্কে ধারণাও সুষ্ঠু আকার পায় (শাস্ত্রে আছে, ফলেন পরিচীয়তে; মার্কসও বলেছিলেন, মানুষের শারীরগঠন দেখে বনমানুষের শারীরগঠন সম্পর্কে অনুমান সম্ভব।) ৩. বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিকাশ, বিশেষত রীতিপদ্ধতির (‘মেথডলজি’র), যার সাহায্যে ঐতিহাসিক ঘটনাপরম্পরা, ঘটনার যোগাযোগ নতুন আলোয় উদ্ভাসিত হয়, ফলে ঘটনাগুলো যে পরস্পর সংযুক্ত যে-সম্পর্কেও ধারণা জন্মায়। ৪. সামাজিক অনুজ্ঞা। এরই প্রভাবে তথ্যানুসন্ধানী ব্যক্তি একটি ঘটনার এমন সব অংশ বেছে নেন যা তাঁর সামাজিক অনুজ্ঞাকে লঙ্ঘন করে না। যে-জন্য একটিই ঘটনা, কিন্তু বিভিন্ন যুগে তো বটেই, একই যুগে সমাজের বিভিন্ন অংশে, তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা। এই অনুজ্ঞা তৈরি হয় অনুসন্ধানীর যুগের এবং সমাজব্যবস্থার প্রভাবে। মার্কস যে ইতিহাসের অন্যতম যুগন্ধর পুরুষ, সে বিষয়ে দ্বিমত নেই। তাঁর জীবনকালে যেমন, তাঁর মৃত্যুর পরেও তেমনি, কেউ তাঁকে পূজা করেছে, কেউ তাঁর প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করেছে। ইতিহাসের ও ব্যক্তিচরিত্রের ব্যাখ্যা নতুন নতুন কেন হয় তার চারটি যে-কারণ এই মাত্র বলা হল, সেই কারণেই ইতিহাসে মার্কসের অবদান সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন ধারণার সৃষ্টি হয়েছে।
এমনকি মার্কসের যাঁরা অনুগামী তাঁদের লক্ষ করলেও মনে হবে যে মার্কস একজন ছিলেন না, মার্কস নামে বহু লোক ছিলেন। তা না হলে সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী লোক একই মার্কসের অনুগামী হলেন? বহুদিন ধরে আলোচনা চলেছে মার্কসের অর্থনীতি নিয়ে, কখনও কখনও তাঁর সমাজ সম্পর্কে বক্তব্য নিয়ে। আজকের দিনে তাঁর মানবতাবাদ নিয়ে। ঘটনাটি অবশ্য সরল। বর্তমান যুগে, সমাজপ্রকৃতি এবং মানুষের মনের গতি এমন সব প্রেরণায় প্রভাবিত হচ্ছে যে, মানবতার প্রয়োজনীয়তা আবার নতুনভাবে অনুভূত হচ্ছে। ফলে মার্কসের মানবতাবাদের দিকেও নজর পড়ছে এবং মার্কসের আলোচনায় আজ নতুন একটা দিক খুলেছে। মোট কথাটা হচ্ছে, এযুগে এই দিকেই ঝোঁক। শুধু এই নয় যে, এই যুগেই কেবল মার্কসের মানবতাবাদ কাজে লাগছে। বর্তমান মার্কস-তত্বের ছাত্ররা অতীতের ইতিহাসেও মার্কসীয় মানবতাবাদ কীভাবে কাজ করেছে যে-বিষয়ে ভাবছেন, ব্যাখ্যা করছেন। এটা পূর্ববর্তী ছাত্ররা করেননি। মার্কসের কিছু লেখা যা আগে অপ্রকাশিত ছিল; আর ভাবগত কারণ, বর্তমান কালের মানুষ মানবতাবাদের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে। ফলে মার্কসের সমস্ত রচনাই এক নতুন দৃষ্টিতে দেখা হচ্ছে। বস্তুত মানবতাবোধ থেকেই মার্কসবাদের জন্ম–এই চেতনারও জন্ম হয়েছে এবং মানবপূজারী মার্কসের চরিত্র ‘আবিষ্কারে’র চেষ্টাই চারধারে আজকাল হচ্ছে।
মানবতাবিরোধী যতরকম অপরাধ, যত পৈশাচিক ধ্বংসলীলা সম্ভব, তা আমাদের যুগ থেকে বেশি অন্য কোনও যুগে হয়নি। ডেমোক্লিসের খড়গে নীচে আমরা বেঁচে আছি, যে-কোনওদিন হয়তো সমস্ত পৃথিবীই ধ্বংস হয়ে যাবে। আমাদের যুগেই আবার মানবতার আকাঙ্ক্ষা সবচেয়ে বেশি। আজকাল যত মারামারি তা এই মানবতাবোধ কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায় তার বিভিন্ন ব্যাখ্যা নিয়েই। হঠাৎ শুনলে পরস্পরবিরোধী মনে হয়, কিন্তু এটা সত্য। ইতিহাসে দেখা গেছে মানবতাবোধ যখন চরম সংকটাপন্ন, যা-কিছু মানুষের পক্ষে মঙ্গলের তাদের ধ্বংস যখন আসন্ন, তখনই মানবতার জন্য বিপ্লব শুরু হয়েছে।
প্রকৃতিকে আয়ত্ত রাখার জ্ঞান ও সামর্থ্যের অভূতপূর্ব উন্নতি হওয়া সত্বেও মানুষ তার অস্তিত্ব বজায় রাখা সম্পর্কেই আজ শঙ্কিত। এ জন্যই আবার সে নতুন সামর্থ্যের সাহায্যে নিজেকে বাঁচানোর তাগিদ অনুভব করছে। এর কারণ আছে।
প্রথমত, মানুষ আজ নিজেকে দেখতে পাচ্ছে দুই বিভিন্ন সামাজিক-অর্থনৈতিক ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে। এর ফলে যত শঙ্কা ও আশা। এ বিষয়ে তর্ক করে লাভ নেই, তা আমরা সমাজতন্ত্রে বিশ্বাস করি বা না করি। ইতিহাসে দেখতে পাচ্ছি, এই দুই ব্যবস্থার সন্ধিক্ষণে নানা ধরনের ভূমিকম্প ঘটছে। তাদের প্রধান হচ্ছে মূল্যবোধ সম্পর্কে সাবেকি চেতনায় সংকট। সাবেকি আমলের উৎপাদনব্যবস্থা যতদিন সমাজে পরস্পরের সম্বন্ধ নিয়ন্ত্রণ করবে ততদিন মানুষও সেই সমাজব্যবস্থায় আস্থা নিয়েই বাঁচবে, সেই সামাজিক সম্বন্ধগুলোকেই স্বাভাবিক মনে করবে, কারণ সেই সম্বন্ধগুলোই তখন মোটামুটি দৃঢ় ও সামাজিক মূল্যবোধ অনুযায়ী তৈরি। আবার উল্টোভাবে দেখলে, সেই মূল্যবোধগুলোই ‘স্বাভাবিক’ মনে হবে, কারণ সেগুলো তৎকালে প্রতিষ্ঠিত সামাজিক সম্বন্ধের সঙ্গে খাপ খায় এবং মানুষের প্রয়োজনেও কাজে লাগে। অর্থাৎ, সমাজে গ্রহণযোগ্য মূল্যবোধের জন্মই সামাজিক সম্বন্ধের মধ্যে এবং তা-ই আবার সামাজিক সম্বন্ধকে দৃঢ় করে তোলার মূলে। এজন্যই, যখন উৎপাদনব্যবস্থায় পরিবর্তন আসে তখন সমাজের স্বীকৃত মূল্যবোধও শিথিল হয়ে যায়। আবার বিপরীতভাবে, সামাজিক মূল্যবোধে পরিবর্তন সমস্ত সমাজব্যবস্থাই পাল্টে দিতে পারে। অসুখ হলেই দেহের অস্তিত্ব এবং কার্যপ্রণালী সম্পর্কে চেতনা জাগে, যা সুস্থ অবস্থায় থাকে না। সেরকমই সমাজব্যবস্থায় ‘অসুখ’ দেখা দিলে, অর্থাৎ যুগধর্ম অনুযায়ী যা উৎপাদনব্যবস্থা হওয়া উচিত এবং যা প্রচলিত তার মধ্যে বিভেদ দেখা দিলেই, মানুষ পরস্পর সম্পর্কে, সমাজ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে, বিদ্বিষ্ট হয়ে ওঠে। পুরোনো মূল্যবোধ যখন প্রায় শিথিল হয় ওঠে, অথচ নতুন মূল্যবোধও সৃষ্টি হয় না, অন্তত সমাজে স্বীকৃত হয়নি, বা ‘স্বাভাবিক’ বলে গণ্য হয়নি, এমন অবস্থায়ই এই বিদ্বেষ বেড়ে ওঠে। এমন অবস্থা ঘটেছিল সামন্ত্রতন্ত্র থেকে ধনতন্ত্রে পরিবর্তনের সময়, আজকে ঘটছে ধনতন্ত্র থেকে সমাজতন্ত্রে পরিবর্তনের সময়। অবশ্য বর্তমান যে-পরিবর্তন তা বিভিন্ন রূপ নিচ্ছে, বিভিন্ন নামে বিখ্যাত হচ্ছে ও হবে। সেইজন্যই, প্রথম পরিবর্তন সম্পর্কে তরুণ মার্কসের রচনা আজ এই দ্বিতীয় পরিবর্তনের যুগে এত আলোচনার বস্তু হয়ে উঠেছে। এই দুই পরিবর্তন চরিত্রে বিভিন্ন হলেও, তাদের মধ্যে কয়েকটি সাধারণ লক্ষণ আছে যেগুলো আবার দুটোকে সংযুক্ত করছে।
মানুষের সমস্যা সম্পর্কে, মানবতাবোধ সম্পর্কে এই সচেতনতা গড়ে ওঠার মূলে আছে শুধু যুগপরিবর্তনজনিত মূল্যবোধের ক্ষয়প্রাপ্তিই নয়, এই চেতনার আরও বড় কারণ যুদ্ধ—যে-যুদ্ধের ফলে সমস্ত পৃথিবী নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে, সেই যুদ্ধের আশঙ্কা। এক জন্মে দুটো ভয়াবহ যুদ্ধ ও হিরোশিমা থেকে এই শঙ্কার জন্ম। সমস্ত সমাজে যে-নতুন উদ্বেগের জন্ম হয়েছে, আজ পর্যন্ত তার সম্যক আলোচনা হয়নি, হয়তো রাজনীতির কারণেই। আলোচনার অভাব থাকলেও অনুমান করা যেতে পারে, মানুষের চেতনায় এই উদ্বেগের প্রতিক্রিয়া কী! আমাদের যুগে মানবতাবোধ , মানুষের জীবনের প্রাথমিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সচেতনতার মূলে আছে এই সব উদ্বেগজনিত প্রতিক্রিয়া।
মানুষের মন ক্রমশ মানবতাবোধের দিকে ফিরছে, তার কারণ আধুনিক যুদ্ধ-যন্ত্রের ভয়াবহ উন্নতি এবং তার ফলে মানুষের অস্তিত্বের বিপদ। তাছাড়া বর্তমান সভ্যতার ধাক্কায় মানুষের প্রাথমিক মূল্যবোধগুলোও শিথিল হয়ে যাচ্ছে।
এখানে এক জটিল প্রশ্নের উদ্ভব হবে। এই প্রশ্নের সহজ উত্তর দিয়েছেন অস্তিত্ববাদীদের মতো দার্শনিকেরা, কিন্তু সেই উত্তর অস্পষ্ট ভাসাভাসা আত্মমুখ দূর-কল্পনা-দোষে দুষ্ট। আবার ‘অস্তিত্ববাদী’ (existentialist) বা ব্যক্তিবাদী (personalist) ভাববাদ একেবারে উড়িয়ে দিলে, আধুনিক জীবনের অন্যতম তাৎপর্যময় সমস্যাকে অস্বীকার করা হবে, বর্তমান জীবনকে বোঝার অন্যতম এক দার্শনিক অস্ত্রের সাহায্য থেকেও আমরা বঞ্চিত হব। ফলে বাধ্য হয়েই, এ-রকম বাধ্যতা দার্শনিকদের জীবনে প্রায়ই ঘটে, আমাদের এই দুই বিপরীতের মধ্য দিয়ে চলতে হবে—একদিকে ভাববাদের ফাঁদ, অন্যদিকে সেটাকে একেবারে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষতি।
বর্তমান সভ্যতা হচ্ছে বৃহৎ জনমণ্ডলীর সভ্যতা। এর ব্যবহারিক ভিত্তি তৈরি হয়েছে সাধারণ মানুষের, বিশেষত শহরে নগরে, কাজের ও জীবনের মধ্য দিয়ে, জনসংযোগের বিভিন্ন পদ্ধতির মধ্য দিয়ে, সংস্কৃতির নানারকম প্রকাশের মধ্য দিয়ে। সভ্যতার ভিত্তির এইসব উপকরণ সম্পর্কে বিশদ আলোচনার স্থান এটা নয়, এইসব উপকরণের সামাজিক কারণ সম্পর্কে আলোচনাও আমি এখন করছি না। শুধু এটুকু বলাই বোধহয় যথেষ্ট, আধুনিক শিল্প ও প্রযুক্তিবিদ্যার যে-বিকাশ বর্তমান সভ্যতার ভিত্তিভূমি, সেই বিকাশের ফলে মানুষের সমাজজীবনে ব্যবহারিক এবং সাংস্কৃতিক দিকে অসম্ভব সুযোগসুবিধা এসেছে। মানুষ আজ সমাজে যেভাবে জীবন কাটায় তাতে সমাজের সঙ্গে তার যোগাযোগের সূত্র সংখ্যায় যেমন বেড়েছে তেমনই দৃঢ়তর হয়েছে। আবার এই গ্রন্থিসূত্রগুলোই সাবেকি বন্ধনগুলোকে শিথিল করে দিয়েছে—প্রতিবেশীদের সঙ্গে, পরিবারের সঙ্গে, জীবিকার সঙ্গে বন্ধন শিথিল হয়ে আসছে। সমাজজীবনের নানা দিকেই ব্যক্তিসত্তা ক্রমশ বিলুপ্ত হয়ে এসেছে। ভালোই হোক, মন্দই হোক, সমাজজীবনের এই দিকটি অস্বীকার করার উপায় নেই। যুগপরিবর্তনের ধাক্কায় ব্যক্তির নানা সমস্যার উদ্ভব, আর একদিকে জীবনে ব্যক্তিসত্তার বিলোপ, এই দুটো দিক একসঙ্গে মনে রাখলে বর্তমান মানুষের ‘বিচ্ছিন্নতাবোধে’র জন্মের কারণ নিয়ে দার্শনিকেরা কেন নানা কল্পনাপ্রবণ আলোচনা করছেন, কেন তাঁরা ‘অস্তিত্ববাদী হতাশা’র কথা বলেন তা বোঝা সহজ হবে। এর চরম ভাষ্য বা সমাধান স্বীকার করি না বলে এর সমস্যাগুলোও উড়িয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এই সমস্যার আলোচনা করলে আমরা বর্তমান মানুষের জীবনে মানবতাবোধে আকর্ষণ কেন জন্মাচ্ছে তার একটা উৎসের সন্ধান পাব। ব্যক্তির সামাজিক ও তাত্বিক স্থান, সমাজে তার নিজের স্থান এবং তার ভবিষ্যৎ—এইসব নিয়ে আলোচনাই (আজ সমগ্র পশ্চিমি সভ্যতায় যাকে বলা হয় ‘মানবতাবোধ সম্পর্কে আকর্ষণ’) বর্তমান দার্শনিক চিন্তায় প্রধান অংশ নিচ্ছে।
অন্য ধরনের হলেও আর-একটি কারণ পূর্ববর্তী কারণগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়ে মানবতাবোধ সম্পর্কে আজকের দিনের বৈশিষ্ট্য আমাদের উৎসুক করে তুলেছে। আধুনিক দর্শনচিন্তার বিকাশে, বিশেষ করে এর জ্ঞানতত্ব বিভাগে, একটা বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে জ্ঞানের আত্মমুখীন আলোচনা। এই ধরনের আলোচনার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে বিভিন্ন বিজ্ঞানের জন্মে মনোবিদ্যা, বিশেষত মনোবিকলন, ভাষাবিজ্ঞান, নৃতত্ব, জ্ঞান উদ্বুদ্ধ করা ব্যাপারে ভাষার স্থান নির্ণয় করে যে-তর্কশাস্ত্র, মানুষের জ্ঞানের বিকাশে সামাজিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে যে-বিজ্ঞান, সেই সব বিজ্ঞানের জন্মে। এইসব বিশেষজ্ঞ গবেষণার ফলে, সমাজের সঙ্গে মানুষের সম্বন্ধের মধ্যে মানুষের মনের যে-বিশেষ স্থান আছে সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই, কিন্তু তাই বলে পুরোপুরি আত্মমুখী ভাববাদে বিলীন হয়ে যাওয়ার কোনও কারণ ঘটেনি। নতুন চিন্তার প্রসার সম্ভব অবশ্যই হয়েছে, কিন্তু ভাববাদের নতুন করে প্রতিষ্ঠার কারণ নেই। পুরনো সাবেকি সমস্যাগুলোও, যথা কান্টের a priori জ্ঞান, নতুনভাবে ভাবা যেতে পারে। আধুনিক দর্শনের এই নতুন চিন্তার বিকাশ জ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে–বিশেষ করে লোকহিতকর জ্ঞানের ক্ষেত্রে নানারকম প্রভাব বিস্তার করছে। এর ফলে ব্যক্তি মানুষের সমস্যা সম্পর্কে, মানবতাবোধ সম্পর্কে নতুন ঔৎসুক্যের সঞ্চার হয়েছে।
বর্তমান জীবনে মানবতা সম্পর্কে ঔৎসুক্যের মূলে আছে এইসব কারণ। এদেরই প্রভাবে, আমাদের যুগ সমস্ত ঘটনা ও ব্যক্তিকে দেখে মানবতাবোধের চশমার মধ্যে দিয়ে। এদেরই প্রভাবে, মার্কসের যে-মানবতাবাদ এতদিন পর্যন্ত মার্কস-ভক্তদের মধ্যেও কোনও কৌতূহল জাগায়নি, সেই মানবতাবাদ আজ মার্কসীয় দর্শনের মূল আলোচ্য হয়ে উঠেছে এবং মার্কসবাদের ছাত্রদের মধ্যে নতুন উৎসাহী আলোচনার সৃষ্টি করেছে। আমরা যে-রীতিতে ইতিহাসকে দেখি বা ব্যাখ্যা করি, বর্তমান জগৎ আমাদের সেই রীতিকে সাহায্যই করছে—ইতিহাসের এই দর্শন ও ব্যাখ্যা ইতিহাসে ‘বর্তমানবাদ’ (presentism) প্রতিষ্ঠা করছে। এই তত্বের চরম রূপটি সবসময়ে ঠিক না হলেও, মোটামুটি এর চিন্তাভাবনাগুলো ইতিহাসকে বুঝতে সাহায্য করছে।
বর্তমান জীবনে বিভিন্নসূত্রে মানবতাবাদ সম্পর্কে আকর্ষণের মূলে তাহলে আছে এইসব কারণ। মানবতাবাদ বলতে আমরা যদি সেই তত্বসংগত দৃষ্টিভঙ্গি এবং ব্যবহারিক ধারণা বোঝাই যা ‘সবার উপর মানুষ সত্য’ এই কথাটা মেনে নেয়, তাহলে স্বভাবতই মানুষ বলতে কী বুঝি এই ধারণার উপর মানবতাবাদের নানা ভাষ্য হবে। তাছাড়া, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণ করে যে মূল্যবোধগুলো সেই মূল্যবোধগুলো কীভাবে ভাবা হচ্ছে এবং সেই মূল্যবোধ অনুযায়ী জীবনের লক্ষ্য কী ও সেখানে কীভাবে পৌঁছানো যায় সেই ধারণা সম্পর্কেও নানা ভাষ্য ও তাদের পরিপ্রেক্ষিতে বিভিন্ন মানবতাবাদের জন্ম হতে পারে। প্রত্যেকটিরই উত্তর নির্ভর করবে, যে-তত্বগত এবং বিশেষ করে যে-দার্শনিক দৃষ্টির সাহায্যে এগুলোর উত্তর দেওয়া হবে, তার উপর। যে-জন্যই জন্ম হয়েছে ক্যাথলিক মানবতাবাদ, আর মার্কসীয়, অস্তিত্ববাদী, প্রকৃতিবাদী ইত্যাদি মানবতাবাদ।
স্বভাবতই বিভিন্ন ধরনের মানবতাবাদের জন্ম হয়েছে, একই জিনিসকে একই দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার বিভিন্ন ভাষ্যের জন্য। সে-জন্যই বোঝা যায় কেন বিভিন্ন ধরনের মানবতাবাদের মধ্যে শুধু প্রতিযোগিতাই নয় বিরোধও দেখা দিচ্ছে। কথাটা হল এই মানবতাবাদ নির্ভর করে কর্মের পরিকল্পনা ও দৃষ্টিভঙ্গির উপর। সেজন্য একটি মতবাদ অন্য মতবাদের চাইতে বেশি অনুগামী সৃষ্টি করতে পারলে তা এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এই থেকে বোঝা যায় বিভিন্ন মানবতাবাদের মধ্যে কেন এত প্রতিযোগিতা ও বিরোধ।
মার্কসীয় মানবতাবাদের অনুগামীদের যুক্তিগুলো কী, যার সাহায্যে তাঁরা এই প্রতিযোগিতায় জয়লাভের আশা করেন? তাঁদের বিরোধী বা প্রতিযোগীদের চাইতে তাঁরা যে উন্নত যুক্তির অধিকারী, সেই বিশ্বাসের ভিত্তি কী? বহু দশকের অবহেলা সত্বেও আজ মার্কসীয় মানবতাবাদের এত আকর্ষণের উৎস কোথায়?
উৎস হল, মার্কসীয় মানবতাবাদের বৈজ্ঞানিক যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যার সঙ্গে একেবারে বিজ্ঞানবিরোধী না হলেও বৈজ্ঞান-নির্লিপ্ত ধর্মীয় মানবতাবাদের অতীন্দ্রিয় ও অকিঞ্চিৎকর ব্যাখ্যার সংঘর্ষ। মানবতাবাদের এই দুই ধারাই, মার্কসীয় মানবতাবাদ ও খ্রিস্টান মানবতাবাদ অধুনা প্রচলিত মতবাদগুলোর মধ্যে সব চাইতে প্রবল ও বিস্তৃত। এদের বিরোধের কারণ, জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টি ও যুক্তিবিরোধী অতীন্দ্রিয় ধর্মপ্রবণ দৃষ্টির বিরোধ। মানবতাবাদে বিরোধ এই বৃহৎ বিরোধেরই সামান্য অংশ। আমার মতে, এই বিরোধের ফল সম্পর্কে কোনও সন্দেহই থাকা উচিত হয়, যদিও যাঁরা উগ্র নিরীশ্বরবাদীর মতো অতিরিক্ত আশাবাদী আমি তাঁদের দলে নই। আজকের পরিস্থিতি এমন, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির বর্তমান বিকাশ ক্রমশই পুরনো দিনের সাবেকি ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপন্থী হয়ে উঠছে। অবশ্য এই বিকাশ এর নিজেরই অন্যতর প্রকাশের কিংবা ভবিষ্যতে সাবেকি ধর্মে বিশ্বাসের অন্তরায় নয়। তবুও সাধারণ লোকের জীবনে সাবেকি ধর্মীয় বিশ্বাস ক্রমশই, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতির বিকাশের ফলে, অন্তর্হিত হয়ে যাচ্ছে। বিশ্বাস যদি করতেই হয় তাহলে লোকের শুধু ইচ্ছাই নয়, সামর্থ্যও থাকতে হবে; অর্থাৎ বিশ্বাস তখনই সম্ভব যদি তার ভিত্তিগুলো credo quia absurdum ইত্যাদি শিথিল না হয়। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতি এইসব ভিত্তি শিথিল করে দিয়েছে। সত্যের দ্বৈতবাদী তত্ব এখনও আছে, তবুও এই তত্বে বিশ্বাস করতে হলে, সব কথা স্বীকার করেও, চিত্তভ্রংশী ব্যক্তিত্বের (schizohprenic personality) প্রয়োজন হয়, যা থেকে কিন্তু অধিকাংশ মানুষই মুক্ত। এই কারণেই বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং তার কৃষ্টিনির্ভর বর্তমান যুগ বিজ্ঞাননির্ভর মানবতাবাদের পক্ষে অধিকতর উপযোগী। এটাই শেষ পর্যন্ত মার্কসীয় মানবতাবাদকে জয়যুক্ত করবে, অবশ্য এই মতবাদকে যদি ঠিকভাবে বিকশিত করা যায়। তাহলেই ধর্মীয় বা ব্যক্তিবাদী মানবতাবাদকে দূর করে মার্কসীয় মানবতাবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে।
মার্কসীয় মানবতাবাদ এবং জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির মধ্যে সম্পর্ক কী? সম্পর্কের সন্ধান পাওয়া যাবে, মার্কসবাদে ব্যক্তিকে কীভাবে দেখা হয়েছে তার মধ্যে। এটাই দার্শনিক নৃতত্বের মূলসূত্র।
খ্রিস্টান ব্যক্তিবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষ বা ধর্মস্বীকৃত অস্তিত্ববাদ ব্যক্তিকে ভাববাদী দৃষ্টিতে দেখার উপর নির্ভর করে। খ্রিস্টান ব্যক্তিবাদে মানুষকে দেখা হয় personal spiritualis হিসেবে, অস্তিত্ববাদে তাকে দেখা হয় স্বাধীন ইচ্ছার অণু হিসেবে। উভয় ক্ষেত্রেই মানুষকে এইভাবে ভাবা হয় যাতে এর দর্শনচিন্তার সঙ্গে তা খাপ খায়, যাতে কতগুলো সূত্র তৈরি করা যায়, যার উপর ভিত্তি করে তার প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্তে আসা যায়, স্পষ্টতই মানুষ সম্পর্কে ভাববাদী ধারণা ভাববাদী দর্শনতন্ত্রের সঙ্গে মিলে যায় (বিশেষ করে ব্যক্তিত্ববাদী মতবাদের সঙ্গে)। এই ধারণা অনেক সুবিধার সৃষ্টিও করে দেয়; সূত্র হিসেবে এটা এমন সব বক্তব্য উপস্থাপিত করে যে সূত্রগুলোই প্রমাণসাপেক্ষ। এই ধরনের দর্শনের একটা অসুবিধা, বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির সঙ্গে খাপ খায় না। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিতে প্রমাণসাপেক্ষ সূত্রের দুর্বলতা সহজেই ধরা পড়ে যায় এবং যাকে স্বতঃসিদ্ধ বলে ধরা হয়েছে তার আত্মিকবাদমূলক চরিত্রটি উন্মোচিত হয়। এটা তথ্যনির্ভর তর্কে স্বীকৃত না-ও হতে পারে।
ব্যক্তি সম্পর্কে মার্কসীয় দর্শনের মধ্যে এই ধরনের বিরোধ নেই এবং বস্তুতান্ত্রিক দর্শনের সঙ্গে এর যথাযথ সামঞ্জস্য আছে। ব্যক্তিবাদী দর্শনের মতো নিজের সুবিধেমতো সূত্রও এ তৈরি করে নেয় না, বরং বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি অনুসরণ করে চলে দুর্বলতার সব বাধা থেকে এ মুক্ত। তথ্যনির্ভর পর্যবেক্ষণের উপর ভিত্তি করে এর কাঠামো, যাকে তিনটি সূত্রে বিবৃত করা যায়
ক. ব্যক্তি প্রকৃতিরই অঙ্গ, প্রকৃতির বিবর্তনের মধ্যে তার জন্ম এবং তাই যাবতীয় প্রাকৃতিক নিয়ম দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত;
খ. ব্যক্তি সেই সঙ্গে সমাজের অঙ্গ, সমাজের বিকাশের সঙ্গে তার বিকাশ, সামাজিক নিয়ম দ্বারা সে নিয়ন্ত্রিত; এবং
গ. ব্যক্তি আবার নিজের আত্মবিকাশের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে। ইতিহাসের স্রষ্টা ব্যক্তি নিজেই তার অস্তিত্বের ভিত্তি তৈরি করে, পরিবর্তিত করে, এবং সঙ্গে সঙ্গে নিজেকেও সামাজিক ব্যক্তি হিসেবে তৈরি করে, পরিবর্তিত করে। প্রকৃতি এবং সমাজের বিকাশের দ্বারাও আবার সে একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রিত হয়।
জগৎ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে ব্যক্তি সম্পর্কে এই ধারণা খাপ খায়। মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই তৈরি করে, এই দর্শন তা স্বীকার করে, তাই এই দর্শন আশাবাদী। অস্তিত্ববাদী দর্শন, সমাজের সঙ্গে ব্যক্তির বিরোধ কল্পনা করে বলে তা ‘হতাশার দর্শন’। মার্কসীয় দর্শন সেক্ষেত্রে আশার সঞ্চার করে —তাই তা ‘আশাবাদের দর্শন’।
ইতিহাসের এবং সেই সঙ্গে ব্যক্তির এই যে ব্যাখ্যা, যাতে ব্যক্তির আত্মবিকাশের ধারণা স্বীকৃত হয়েছে, এর ফলে মার্কসীয় মানবতাবাদ অন্যান্য মানবতাবাদের চাইতে, বিশেষ করে ধর্মীয় মানবাতাবদের চাইতে, অনেক বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। স্পষ্টতই, আত্মবিকাশের এই স্বীকৃতিই অন্যান্য মানবতাবাদ থেকে মার্কসীয় মানবতাবাদকে স্বাতন্ত্র্যে চিহ্নিত করেছে।
মার্কসীয় মানবতাবাদ স্বয়ংসম্পূর্ণ। অর্থাৎ এই দর্শনে ব্যক্তি শুধুমাত্র পরম শ্রেয় এবং যাবতীয় ক্রিয়ার লক্ষ্য মাত্রই নয়, নিজের বিকাশের কর্তাও সে নিজে। তার নিজের জগতে যে-সব মূল্যবোধ তা অন্য কোনও জগৎ থেকে আহৃত নয়, তার নিজেরই তৈরি সামাজিক ব্যক্তির তৈরি। এই মূল্যবোধ অনুযায়ী কাজ করাও তার কর্তৃত্বাধীন। ব্যক্তি তার নিজের ইতিহাস নিজেই তৈরি করে এবং সেজন্য সর্বতোভাবে দায়ী যে নিজেই। এই মানবতাবাদে কোনও অন্তর্বিরোধ নেই, কারণ ব্যক্তিকে উপলক্ষ করেই এর উদ্ভব মানুষ পরম শ্রেয়, চরম লক্ষ্য, সমাজবিকাশের চরম স্রষ্টা। এই দর্শন আশাবাদী, কারণ এর ক্রমাগত বিকাশের ধারায় কোনও বাধা এ স্বীকার করে না।
ধর্মবিশ্বাস সম্পর্কীয় যাবতীয় ধ্যানধারণার সঙ্গে জড়িত মানবতাবাদের ক্ষেত্র অন্যরকম। এখানে মূল্যবোধ তৈরি করে ব্যক্তি নিজে নয়, বাইরে থেকে তা আরোপিত হয়। ইতিহাসও, অর্থাৎ ব্যক্তির লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য যে-যাত্রা তা-ও, মানুষের আয়ত্তের বাইরে চলে যায়; হয় অদৃষ্টবাদীরা যেমন মনে করেন, কোনও অতিমানব ইচ্ছার দ্বারা তা পূর্ব থেকেই চালিত অথবা নিয়ন্ত্রিত। এই মানবতাবাদ স্বভাবতই ভেজাল-দেওয়া এবং অন্তর্বিরোধে ও অসামঞ্জস্যে দুষ্ট। এই দর্শন আশাবাদীও হতে পারে না, কারণ ব্যক্তি এই দর্শনে তার ভাগ্যনিয়ন্ত্রণ করতে পারে না।
এই দুই ধরনের মানবতাবাদের মধ্যে সংঘাত দেখা দিচ্ছে আমাদের যুগে। এই সংঘাতের মধ্যে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টির ক্রমাগত প্রভাবে, মার্কসীয় মানবতাবাদই মানুষের মন বেশি অধিকার করছে।
জনগণের মধ্যে মার্কসীয় মানবতাবাদের আকর্ষণের কারণ অবশ্য এই নয় যে মুখ্যত তত্বগতভাবে এই দর্শন অধিকতর গ্রাহ্য। এটা বলা বাড়াবাড়ি হয় যে যুক্তিগ্রাহ্য মানবতাবাদের জন্যই দক্ষিণ আমেরিকা বা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কম্যুনিস্টরা বা ফ্রান্স-ইতালির কম্যুনিস্ট সংস্থাগুলো মার্কসীয় মানবতাবাদ গ্রহণ করেছে। বরং এটা ভাবাই সংগত যে অধিকাংশ লোকই এইসব যুক্তিতর্ক সম্পর্কে সম্পূর্ণ অনবহিত এবং এর কঠিন শব্দ-সংজ্ঞা ইত্যাদি বুঝতেই পারবে না। তাহলেও কিন্তু, তাদের অজ্ঞাতসারেই, তাদের সংগ্রামের সঙ্গে এই তত্ব দৃঢ়ভাবে সংযুক্ত।
কর্মের ক্ষেত্রে, অন্যান্য সোস্যালিজমের মতো কম্যুনিজমও মানবতাবোধে উদ্বুদ্ধ, কারণ এ মনে করে মানুষের মঙ্গলই মানুষের চরম লক্ষে। জনগণের কাছে এই দর্শন আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে কারণ মানুষের মঙ্গলের কথাই এতে সুসংবদ্ধভাবে বলা হয়। এবং যেভাবে বলা হয় তা শুধু শূন্যে কথা ছোড়া নয়, জীবনের সংগ্রামে তা যাতে কার্যকর হয় সেইভাবেই বলা হয়। সেইজন্যই মার্কসীয় মানবতাবাদের আরও দুর্বার আকর্ষণ, এই মানবতাবাদ ‘জঙ্গিবাদী’ (militant)।
এই লক্ষণকে কোনওমতেই বিচ্ছিন্ন, খাপছাড়া বা শুধু আরও-একটা লক্ষণ বলে গণ্য করা উচিত হবে না। অন্যান্য যে-সব লক্ষণের কথা আমরা আগে উল্লেখ করেছি, এই লক্ষণটি তাদেরই অঙ্গ এবং তাদেরই পরিণতি। মানুষ তার ভাগ্য নিজেই তৈরি করে, তার ভবিষ্যতের রূপের জন্য সে নিজেই দায়ী, তার জীবন তার নিজের আত্মবিকাশের উপর নির্ভর করে ইত্যাদি স্বীকার করার অর্থ তাকে তার মূল্যবোধ অনুযায়ী তার নিজের ইতিহাস তৈরি করতে উদ্বুদ্ধ করার চেষ্টা। শুধু চেষ্টাই নয়, সে-এটাকে তার নৈতিক কর্তব্য বলে মনে করে, কারণ চেষ্টা বা চেষ্টার অভাবের ফল তাকে নিজেকেই ভোগ করতে হবে।
মার্কসীয় মানবতাবাদের এই দিকটি বহুদিন থেকে সুপরিজ্ঞাত। শুধু মার্কসীয় দর্শন সম্পর্কে ভুল ধারণার ফলে, যে-জন্য মার্কসের অনুগামীরাই দায়ী, এই সংগ্রামের দিক, তত্বগতভাবে ব্যবহারিকভাবে, মানবতাবাদের সঙ্গে স্পষ্টভাবে গ্রথিত হয়নি, বরং অনেক সময় একে মানবতাবোধের বিরোধীই মনে হয়েছে। সংগ্রামকে কেবলই শারীরিক সংগ্রাম বলে গণ্য করা হয়েছে, সংগ্রাম যে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেও, সহিষ্ণুতার সঙ্গেও হতে পারে, তা মার্কসীয় ছাত্ররা সঠিকভাবে ব্যক্ত করেন নি। আমার বক্তব্যের উপসংহারে আমি এই দিকটি আলোচনা করব, না হলে মাকাসীয় মানবতাবাদের যে ভুল ব্যাখ্যা আছে সে-সম্পর্কে স্থির ধারণা হবে না।
আমি শুধু এই সাদা কথাটা বলেই ক্ষান্ত হব যে মার্কসীয় দর্শনে সংগ্রাম শুধু শারীরিকই (Physical) নয়, আত্মিক (spiritual) ও আদর্শগতও (ideological) বটে। তত্বের এই সংগ্রামের উদ্দেশ্য বিরুদ্ধপক্ষকে নিজ মতের অনুকূলে আনা। বর্তমান আলোচনায় বিষয়টির এই দিকটি আমাদের নজরে আনা উচিত।
এই সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য হল একপক্ষের মূল্যবোধের সঙ্গে প্রতিপক্ষের মূল্যবোধের সংগ্রাম, প্রতিপক্ষের যুক্তি খণ্ডন করে আপন যুক্তি প্রতিষ্ঠা করা। এই অহিংস (bloodless) সংগ্রামের উদ্দেশ্য প্রতিপক্ষের মন ও হৃদয় জয় করা এবং নিজের চিন্তাধারায় তাকে প্রভাবান্বিত করা।
সংগ্রাম শব্দেই প্রকাশ, দু’পক্ষই পরস্পরের বিরোধী যুক্তির যাথার্থ্যও প্রমাণ করতে চাইছেন। এই বিরোধে কি চিন্তার আদানপ্রদানের কোনও স্থান নেই? ঘুরিয়ে বললে, দুই প্রতিপক্ষের মধ্যে শুধু কি বিরোধই আছে, সাদৃশ্য কি একেবারেই নেই?
এই প্রশ্নের উত্তর অনেক হতে পারে, অনেক সময় সাদৃশ্য থাকে, অনেক সময় থাকে না। অনেক সময় দু’পক্ষের ধারণা সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী হয়। যেখানে সংগ্রাম শুধুই নেতিবাচক, সেখানে আদানপ্রদানের প্রশ্নই ওঠে না। যথা কম্যুনিজম এবং ফ্যাসিজমে বিরোধ। আবার অনেক সময় দু’পক্ষের ধারণায় বিরোধ থাকে, দু’পক্ষের মধ্যে সংঘাতও অনিবার্য, কিন্তু কোনও কোনও ব্যাপারে দু’পক্ষের মধ্যে মিলও থাকে। যথা, আধুনিক যুগের বিভিন্ন ধরনের মানবতাবাদ। এই মন্তব্যে সেই ধরনের বিরোধই আলোচিত হচ্ছে।
চিন্তার জগতে সংগ্রাম এবং ভাববিনিময় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, বিশেষ করে আজকাল যখন শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের কথা উঠেছে। এ কথা উঠছে, তার কারণ, রাজনৈতিক এবং চিন্তাগত বিরোধের ফলে সমস্ত পৃথিবীই ধ্বংসের মুখে। তাছাড়া, দুই রাষ্ট্রের মধ্যে রাজনৈতিক বা অন্যান্য বিরোধ মেটানোর ক্ষেত্রেও এই বল-প্রয়োগের নীতি সরিয়ে রাখার চেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সুতরাং এই প্রশ্নের জবাব দিতেই হবে; উগ্র (militant) মার্কসীয় মানবতাবাদ কি অন্যান্য মানবতাবাদের সঙ্গে চিন্তার আদানপ্রদান করতে (conducting a dialogue) একেবারেই অসম্মত?
আমার মতে এর উত্তর না। অন্যান্য মানবতাবাদের সঙ্গে মার্কসীয় মানবতাবাদের সংগ্রামে চিন্তার আদানপ্রদান শুধু থাকতে পারে নয়, এ আদানপ্রদান মার্কসীয় মানবতাবাদেরই অঙ্গ। তার উদ্দেশ্য এই নয় যে, অন্যান্য মানবতাবাদকে একেবারে সমূলে বিসর্জন দিতে হবে, বরং ওইসব মতের যে সব অংশ গ্রহণযোগ্য নয় তাদের স্বরূপ উদঘাটিত করতে হবে এবং সেই সঙ্গে তাদের সঙ্গে হাত মেলাতে হবে মানবতাবিরোধী শক্তির সঙ্গে যুদ্ধ করার জন্য। এর একমাত্র উপায় চিন্তার আদানপ্রদান।
চিন্তার আদানপ্রদানও একধরনের সংগ্রাম, বিভিন্ন বিরোধী যুক্তি না থাকলে আদানপ্রদান হতে পারে না, বা নিরর্থক হয়ে দাঁড়ায়। তবে, এই আদানপ্রদান কার্যকর হয়ে ওঠে তখনই যখন দু’পক্ষের মধ্যে কোথাও না কোথাও মিল থাকে, যখন তারা একই ভাষায় কথা বলে, না হলে আদানপ্রদান অসম্ভব ও নিষ্ফল হয়ে ওঠে। তাই,আলাপ-আলোচনাও এক ধরনের সংগ্রাম, যদিও পুরো যুদ্ধ এটা নয়, এবং এই যুদ্ধক্ষেত্রে পরস্পরের মধ্যে খানিকটা আত্মীয়তা আছে। এই সংগ্রামে কিছুটা সহিষ্ণুতা দরকার, অন্যের যুক্তিতে কিছু পদার্থ আছে এটা স্বীকার করা আবশ্যক, এবং আমার মতই একমাত্র খাঁটি এই উগ্রভাবটাও ত্যাগ করা প্রয়োজন। অবশ্য সহিষ্ণুতার অর্থ দৌর্বল্য নয় বা বিশ্বাসের অভাবও নয়, নিজের যুক্তিকে সমর্থন করার অসামর্থ্যও নয়। অন্যের সম্বন্ধে নিজের যুক্তির সারবত্তা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হলেও, তাদের যাথার্থ্য প্রমাণ করা ব্যাপারে একনিষ্ঠ হলেও, অপরের যুক্তি সম্পর্কে সহিষ্ণু হওয়া সম্ভবপর। সহিষ্ণু একমাত্র প্রবলেরই হওয়া সাজে, এটা আত্মবিসর্জন বা দ্বিধাগ্রস্ততার চিহ্ন নয়। প্রবল ও নিঃসন্দিগ্ধ ব্যক্তি সহিষ্ণু হলে নিজেকে দুর্বল না করে বরং প্রবলতরই হয়ে ওঠেন। কারণ প্রতিপক্ষের যুক্তির কিছুমাত্র যাথার্থ্য আছে কি না জানার তিনি সুযোগ পান, ফলে নিজের যুক্তিকে আরও বিশ্লেষণ করে প্রবলতর করে তুলতে পারেন।
মার্কসীয় মানবতাবাদ উগ্র দর্শন হলেও তার মধ্যে কি অনুরূপ চিন্তার আদানপ্রদান, সহিষ্ণুতা ইত্যাদির সুযোগ আছে? নিশ্চয়ই। মার্কসের ছাত্রদের পুরোধা যাঁরা তাঁরা কখনই মার্কসের দর্শনকে একটা বাঁধাধরা ছকে ফেলতে চাননি, তাঁরা অন্যদের মতের কথা সব সময় শুনতে, অন্যের চিন্তাধারা আত্মস্থ ক’রে নতুন ক’রে প্রকাশ করতে প্রস্তুত। মার্কস তাঁর রীতিপদ্ধতি (methodology) হিসেবে কার্তেসীয় সন্দেহবাদকে অন্যতম পদ্ধতি হিসেবে নিয়েছিলেন। মার্কসের এই উদার দর্শন, যা আদানপ্রদানকে, সহিষ্ণুতাকে স্বীকার করে, তা কিন্তু বহু কম্যুনিস্ট আন্দোলনে বিকৃত অবস্থায় নেওয়া হয়েছে, যথা চিনে। অবশ্য এই বিকৃতিকে ‘শিশুকালে দাঁত ওঠার ব্যথা’ (teething pains of leftism) বলেই গণ্য করা উচিত, কোনও কোনও দেশের কম্যুনিস্ট আন্দোলনের দুর্বলতার চিহ্ন। এটা সবারই জানা কথা, আত্মবিশ্বাস এবং তার ফলে সহিষ্ণুতা প্রবলেরই গুণ, বহু বছরের অভিজ্ঞতার সঞ্চয়। এটা যেমন ব্যক্তির ক্ষেত্রে, তেমনি আন্দোলনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।
সে যাই হোক, মার্কসীয় মানবতাবাদের বর্তমান বিকাশ, অথবা বলা সংগত পুনর্জীবন, আজ যেভাবে হচ্ছে তাতে চিন্তার আদানপ্রদান এবং সহিষ্ণুতা অনেকাংশে স্থান নিয়েছে। বুদ্ধিজীবী মহলে মার্কসের আবেদন তাই আজ অনেক বেশি। মার্কসীয় মানবতাবাদ আজ এই দিকেই অগ্রসর হচ্ছে, জনগণের মুক্তিযুদ্ধের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে, এর জঙ্গিবাদী রূপের সঙ্গে চিন্তার আদানপ্রদানের ক্ষমতাও যুক্ত হচ্ছে। এই মাটিতেই আমরা দেখব নানা মানবতাবাদের ঐক্য ঘটবে, তাতে তাদের স্বরূপ নষ্ট হবে না, সত্যের বিকৃতি ঘটবে না, বরং মানুষের লক্ষ্যপথে যাত্রা আরও সুদৃঢ় হবে। এইভাবেই বিভিন্ন মানবতাবাদের মধ্যে আদানপ্রদান ঘটবে, তাতে তাদের দর্শন আরও সারবান হয়ে উঠবে। এইভাবেই মার্কসীয় মানবতাবাদের প্রভাব পুনরুজ্জীবিত হবে, কার্ল মার্কসের দর্শন যে আজও সজীব, আজও প্রযোজ্য, তার প্রমাণ হবে।
Dr. ADAM SCHAFF কার্ল মার্কস সংখ্যার জন্য পাঠিয়েছেন এই লেখাটি।
নাম Marx and Contemporary Humanism।
অনুবাদ প্রিয়ব্রত ঘোষ।
৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা
(কার্লমার্কস ১৯৬৮)
