সবাক চলচ্চিত্রের শিল্পসূত্র – চিদানন্দ দাশগুপ্ত
চলচিত্রের শিল্পপ্রকৃতি সম্বন্ধে আজ পর্যন্ত যা লেখা হয়েছে তার অধিকাংশই নির্বাক চলচিত্রের ভিত্তিতে চিন্তিত। দৃশ্যবস্তুর গঠন ও তার পরম্পরা-চলচ্চিত্রের এই দুই মৌলিক উপাদানে তার শিল্পভাবনার উৎপত্তি তো বটেই,পরিণতিও বলা যেতে পারে। বেলা বালাজ, আইজেনস্টাইন, পুডভকিন, রুডলফ আর্নহাইম- সকলেরই চিন্তার আরম্ভ নির্বাক দৃশ্যবস্তু থেকে। আইজেনস্টাইন সবাক চলচ্চিত্রের সম্পর্কে উৎসাহী হলেও তাঁর কান্তিতত্ব চর্চায় তার তেমন কোনও বিশিষ্ট প্রকাশ হয়নি। এমনকি তাঁর সবাক চলচ্চিত্রও মূলত নির্বাকযুগীয় রীতিরই সম্প্রসারণ। চ্যাপলিনের ছবিতেও তাই। এ বিষয় পরে আলোচ্য। আপাতত প্রধান কথা এই যে সবাক চলচিত্রের কোনও নন্দনতাত্বিক নিরীক্ষা এখনও নির্বাক যুগের রচনার মতো দৃঢ় ভূমিকা গ্রহণ করেনি। ১৯৩৩ থেকে ৩৮ সাল পর্যন্ত লেখা প্রবন্ধের বই ফিল্ম অ্যাজ আর্ট বই-এর ভূমিকায় ১৯৫৮ সালে আর্নহাইম লিখেছেন
To go back to my writings about film means more than retracing my steps. It means re-opening a closed chapter…film is, to me, a unique experiment in the visual arts which took place in the first three decades of this century.
আর্নহাইমের মতে সবাক চলচিত্র আদৌ শিল্প হতে পারে না কারণ তাতে চক্ষুগ্রাহ্য ও কর্ণগ্রাহ্য এই দুই সমান্তরাল ধাপকে মেলাবার বৃথা প্রয়াস; সে প্রয়াস সম্ভব কেবল মঞ্চনাট্যে যেখানে দৃশ্যবস্তু কথার ক্রীতদাস হয়ে থাকে, চলচ্চিত্রের মতো প্রাধান্য অর্জন করে না। তাঁর Film As Arts বই-এর শেষ পরিচ্ছেদের শিরোনামা হল ‘The dialogue paralyses visual action.’
একপক্ষে আর্নহাইমের কথাটা ঠিকই। কেননা বাস্তবকে অসম্পূর্ণ রেখে কেবল দৃশ্যমাত্রিক ছন্দের শিল্প হয়ে চলচ্চিত্র অন্যান্য চক্ষুগ্রাহ্য শিল্পের মতো দৃশ্যবস্তুর বিকৃতি (distortion)-র মধ্য দিয়ে যে তীব্রতা সঞ্চার করতে পারে সেটা সবাক চলচ্চিত্রের গোটা বাস্তবের মধ্যে সম্ভব নয় একথা মনে হওয়াই স্বাভাবিক। নির্বাক যুগের চলচ্চিত্রের মেজাজ, গঠনরীতি ও তার কেবল প্রকাশরীতি নয় প্রকাশ্য বস্তুর আলোচনায় দেখা যায় যে সেখানে জীবনের অতি সাধারণ বাস্তবের চেহারা নেই। আইজেনস্টাইনের তিন সিংহমূর্তি যখন আসীন অবস্থা থেকে উঠে দাঁড়ায় তখন তাতে এক সাহিত্যগত প্রতিমাকে চিত্রে পরিণত করে- ‘যেন নাবিকদের গোলার আঘাতে ক্রুদ্ধ রাজকীয় শক্তি সিংহের মতো উঠে দাঁড়াল।’ একে যদি সবাক চলচ্চিত্রে আমদানি করি তাহলে সিংহের গর্জন যোগ করা যেতে পারে। তখন তার সাহিত্যিক মর্ম এই দাঁড়ায়- ‘যেন নাবিকদের গোলার আঘাতে ক্রুদ্ধ রাজকীয় শক্তি সিংহের মতন গর্জিয়ে উঠে দাঁড়াল।’ সিংহের উত্থান এবং গর্জন একত্র হলেই এখানে ছন্দপতন অবশ্যম্ভাবী; হাস্যকর হয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা, কেননা যতক্ষণ ওই মর্মর সিংহ নীরব ছিল, ততক্ষণ তা প্রতিমা- যেই গর্জিয়ে ওঠে তখনি তা প্রতিমা থেকে বাস্তবে পরিণত হতে চায়, অথচ হতে পারে না, ফলে হাস্যকর হয়ে ওঠে।
ড্রায়ারের অবিস্মরণীয় ছবিতে যখন জোন তার কাতর মুখ দুই পাশে আন্দোলিত করে, তখন তার সঙ্গে যদি কাতরোক্তি জুড়ে দেওয়া যায় তাহলে তার রসভঙ্গ হতে বাধ্য। যদিও ড্রায়ার এ ছবিতে শব্দ সংযোগ করতেই চেয়েছিলেন-ফল কী হত আমরা জানি না- কিন্তু পারেননি, কারণ আমেরিকায় চালু হলেও ফ্রান্সে শব্দসংযোগের ব্যবস্থা তখনও সম্পূর্ণ নয়। ‘প্যাশন অভ জোন অভ আর্ক’কে বলা যেতে পারে নির্বাক ছবির প্রকাশশীলতার প্রত্যন্তসীমা। চ্যাপলিনের কমেডি তো বিশেষভাবে নির্বাক; ‘মডার্ন ‘টাইমমস’-এ বাক্যের পরিহাস, ‘ভের্দু’তে নির্বাক কমেডি ও সবাক বক্তৃতা দুই ভাগে বিভক্ত (কিন্তু ওই বক্তৃতাকে এমনভাবে চ্যাপলিন নির্বাক উত্তেজনার চূড়ায় চূড়ায় বসিয়েছেন যে তার ফল অতি সূক্ষ্ম এক ফাঁকের মধ্য দিয়ে উৎরিয়ে গেল); ‘লাইম লাইট’-এর সবাক অংশ হৃদয়াবেগে ভারাক্রান্ত হতে শুরু করে-নির্বাক কমেডির অংশ না থাকলে ছবি তার ভার বইতে পারত কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ চ্যাপলিন কোনওকালেই সবাক চলচ্চিত্রকে নির্বাক ছবির মতো বাগে আনতে পারেননি। সকলেই যে নির্বাক-সবাকের মধ্যবর্তী নদী পেরোতে পারেননি, এইটেই আমার বক্তব্য নয়, বক্তব্য এই যে নির্বাক ছবি বাস্তবকে কমেডির বা বীরোচিত ভঙ্গিমার বা ঐতিহাসিক দূরত্ব ইত্যাদির মধ্যে রেখে রীতিবদ্ধ (stylise) করে গোটা বাস্তবের সোজাসুজি চেহারাকে প্রকাশ করে না।
এখানে ভালোমন্দের কোনও প্রশ্নই নেই, কেননা নির্বাক যুগের নিখাদ শিল্পপ্রতিভা চলচ্চিত্র রসিকের অজানা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে সবাক চলচিত্রের শিল্প বৈশিষ্ট্য কী? তার প্রকাশভঙ্গিমার পার্থক্যই বা কোথায়? শিল্পসীমানা (artistic limitations) গোটা বাস্তবের মধ্যে চারিয়ে যাবার পরেও তার শিল্পপ্রকৃতি কীভাবে নবরূপ পেল যার জন্য তার মধ্যে অতি প্রামাণ্যধর্মী (documentery-style) ছবিও বাস্তবের শিল্পায়নে সমর্থ হয়েছে?
গোটা বাস্তব যাকে বলছি তার মধ্যেও সীমানা আছে বলা বাহুল্য, যেমন এখনও ছবিতে গন্ধযোগ চালু হয়নি, বা চলচ্চিত্রের নগ্নদেবীদের এখনও হাতে ছোঁয়া যায় না। এতৎসত্বেও এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে চলচ্চিত্রের পূর্বতন শিল্পসীমানা সবাক যুগের মধ্যে এসে বহুদূর বিস্তৃত হয়েছে, এবং বাস্তবের বহিরঙ্গের এত নিকট আর কোনও শিল্প নয়। শব্দে রঙে মিলে চলমান ছবির জগৎকে এমন একটা প্রত্যক্ষতা এনে দিয়েছে যার ফলে কেউ কেউ বলেন যে চলচ্চিত্র আগে যদি বা ছিল, এখন আর আদৌ শিল্প নয়, ওতে কেবল বাহ্য ঘটনাচঞ্চলতাই সম্ভব, মনের অন্তর্নিহিত সত্য এর মধ্যে প্রকাশ করা অসম্ভব।
কার্যত এই প্রত্যক্ষতা তীব্র হয়ে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে চলচ্চিত্র বাস্তব থেকে দূরে সরে আসার বা ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতার মধ্যে দিয়ে অন্তরের ভাবপ্রকাশের রীতিকেও অনেকখানি আয়ত্ত করেছে। সেইখানেই তার শিল্পমর্যাদা, এবং শিল্পপ্রকৃতির সূত্র।
চলচ্চিত্রের ভাষা চিত্রভিত্তিক, তাতে কথা বা ধ্বনি সাহায্য জোগায় মাত্র-এই সনাতনী ধারার সম্পূর্ণ বিরুদ্ধাচরণ করে যাঁরা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তাঁদের উদাহরণ দিয়েই ক্ষান্ত হওয়া চলে না, কেননা তাদের কাজ সমগ্রভাবে সবাক যুগের শিল্প পরিচায়ক নয়, যদিও তাতে কিছু বৈপ্লবিক সম্ভাবনার ইঙ্গিত আছে। ঠাট্টাছলে বলা যেতে পারে যে রেনের ‘হিরোশিমা মনামূর’-এ শিল্পরীতি অনেকটা আমাদের সরকারি প্রামাণ্যচিত্রের মতো; যেন পূর্বলিখিত ভাষ্যের অনুরূপ চিত্র (illustration)। হিরোশিমার অনেক অংশে এমন ছিন্নবিচ্ছিন্ন দৃশ্যবস্তুর সমাবেশ যে কথিত ভাষ্যের সাহায্য ছাড়া তার অর্থভেদ অসম্ভব। ‘মারিয়েনবাদ’-এও চিত্র ও কাব্য আর্নহাইম-এর মুখে চুনকালি দিয়ে সমান্তরাল পথে চলেছে, সার্থকভাবে। বার্গমানের ‘সেভেনথ সীল’-এ নাইট, জোফ ও তার স্ত্রীর সঙ্গে খেতে বসে বলে ‘এই দিনটি আমি কখনও ভুলব না-এই নীরবতা, এই গোধূলি, এই দুধ, ফল, সন্ধ্যার আলোতে তোমাদের মুখ’ ইত্যাদি ইত্যাদি। অন্তরের অনুভূতি বোঝাতে সোজা সাহিত্যের আশ্রয় নেওয়া। তবু বার্গমানকে আমরা চলচিত্রের বিচারে নস্যাৎ করতে পারি না, কারণ তিনি যে শিল্পের আশ্রয়ই নিন, চলচিত্র শিল্প তাঁর নখদর্পণে, এবং প্রকাশশীলতার শিখরে তিনি ঠিক পৌঁছিয়েছেন।
শেষ পর্যন্ত ‘সেভেনথ সীল’ সাহিত্যময়তা সত্বেও দৃশ্যবস্তুর সংগঠনের জোরেই চলচ্চিত্র হয়ে দাঁড়ায়। হয়তো সাবেকি চলচ্চিত্রধর্মিতার চূড়ান্ত নিদর্শন এ ছবি নয়। কিন্তু যদি রসাস্বাদই বজায় থাকে তবে ওই চুলচেরা বিচারে কাজ কী?
তবু কোনও শিল্পের নির্যাসিত শিল্পকে বা তার প্রকাশভঙ্গির পরম বৈশিষ্ট্যকে খুঁজতে গেলে সূক্ষ্মবিচার চাই। এই বিচারের গোড়ায় মাইকেল রোমার-এর একটি লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিই। তিনি বলেছেন
All of us bring to every situation, whether it be a business meeting or a love affair, a social and psychological awareness which helps us to understand complex motivations and relationships. This kind of perception, much of it non-verbal and based on apparently insignificant clues,is not limited to the educated or the gifted. We all depend on it for our understanding of other people and have become extremely proficient in the interpretation of subtle signs–a shading in the voice, an averted glance. This nuanced awareness however is not easily called upon by the arts, for it is predicated upon a far more immediate and total experience than can be provided by literature and the theatre with their dependence on the word, or by the visual arts–with their dependence on the image. Only film renders experience with enough immediacy and totality to call into play the perpetual processes we employ in life itself.
উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক ‘ব্রিফ এনকাউন্টার’ ছবির শেষ দৃশ্য। নায়ক চলে যাচ্ছে, রেল স্টেশনের চায়ের দোকানে বসে বিদায় নিচ্ছে নায়িকার কাছ থেকে। এর মধ্যে নলবনে হস্তীর মতো এক পরিচিতা বিশালবপু, প্রগলভা মহিলার প্রবেশ। নায়ক-নায়িকার মূল্যবান মুহূর্তগুলি একটি একটি করে নিঃশেষ হতে চলেছে। প্রতিবেশিনীর অনুরোধে নায়ক তাকে এক পেয়ালা চা এনে দেয়-তাঁর বাক্যস্রোত এদিকে অব্যাহত। নায়কের ট্রেনের ডাক পড়ে মাইক্রোফোনে। বিদায় মুহূর্তের শেষ সংলাপ
প্রতিবেশিনী মহিলা (নায়ককে) Where is the suger dear?
নায়ক (স্থির দৃষ্টিতে) It’s in the spoon.
বলেই নায়ক মুহূর্তের জন্য নায়িকার কাঁধে হাত রেখে বেরিয়ে যায়।
চিনির খোঁজখবরের এই দুটি লাইন থিয়েটারে অর্থহীন, এমনকি সাহিত্যেও। কেননা রোমার চলচ্চিত্রের যে immediacy ও totality -র কথা বলেছেন তাছাড়া এর সম্পূর্ণ ব্যঞ্জনা হয় না। চতুস্পার্শ্বিক দৃশ্য ও শ্রাব্যজগতের সম্পূর্ণতার মধ্যে অর্থগ্রহণের যে জটিল প্রক্রিয়ায় আমরা বাস্তবজীবনে অভ্যস্ত, যার মধ্যে বহু সূক্ষ্ম, স্থূল ও মধ্যবর্তী উপাদানের সংযোগে কোনও পরিস্থিতির একটি বিশেষ অর্থ আমাদের মনে অলৌকিকভাবে পৌঁছায়, এখানে গোটা ঘটনা এবং পরিবেশের একটি অটুট ঐক্য ও সত্যতার মধ্য থেকে সেই অর্থ আমাদের মনে প্রবেশ করছে। বহু ট্রেন ও যাত্রী পারাপারের মধ্যে অচল, ময়লা, ইঙ্গিতময়ী বারমেইড ও হাস্যমুখর গার্ডের প্রেমালাপ-সমস্ত মিলিয়ে ওই গোটা বাস্তবের সম্পূর্ণ প্রত্যক্ষভাব ব্যতিরেকে আমাদের কাছে চরম রোমান্টিক বেদনার মুহূর্তে ‘চিনিটা কোথায়’-এ প্রশ্ন অসংলগ্ন, অর্থহীন। এখানে পরিচালক যে কাজটি করেন সেটি বাস্তব জীবনে করে আমাদের মন। দৃশ্য ও শ্রাব্য সমস্ত বস্তু থেকে অর্থ আহরণ করে মন। সেই মনের স্থান যখন পরিচালক নেন তখন আমরা তাঁর দৃষ্টিতে বাস্তবের একটি বিশিষ্ট অর্থ দেখতে পাই-বাস্তববিন্যাসের রীতির ফলে।
নির্বাকযুগীয় অভিনয়ে অভিনেতার মুখ নড়ে কিন্তু কথা শোনা যায় না, এঅবস্থায় খানিকটা অঙ্গভঙ্গির আতিশয্য অর্থাৎ বাস্তব থেকে দূরত্বই ছিল স্বাভাবিক । কিন্তু যখন অঙ্গভঙ্গি এবং কথা দুই একত্রে পাওয়া গেল তখন অভিনয়কে রীতিবদ্ধতা (stylisation) থেকে সরে বাস্তবের অনেক কাছাকাছি এসে পড়তে হল। আজকের সবাক চলচিত্রে দর্শকের বাস্তববোধ এত ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে যে অভিনেতার বা চিত্রনাট্যের বিন্দুমাত্র পদ�লন-সামান্য আত্মসচেতন দৃষ্টি, অন্যমনস্কতা বা সংলাপের একটি অযথার্থ কথা -তৎক্ষণাৎ ধরা পড়ে, বাস্তবতার বিশ্বাস চলে যায়। কেননা সর্বক্ষণই দর্শকের চক্ষু কর্ণ সজাগ। বাস্তব জীবনে যেমন আমরা কারও মুখের দিকে চেয়ে বলতে পারি সে সত্যি কথা বলছে কি না, সন্দেহে আন্দোলিত হই বা সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি, এটা অনেকটা সে রকম। সবাক মুখের ক্লোজ-আপ দৃশ্যে আর ফাঁকির কোনও স্থান নেই এইভাবে আজকের অধিকাংশ শ্রেষ্ঠ সবাক ছবির মধ্যেই প্রত্যক্ষ বাস্তবতার অবিচ্ছিন্ন একটি বিশ্বাস উৎপাদন করা হয়-দৃশ্য ও সংলাপের মধ্য দিয়ে পরিচালক সচেষ্ট থাকেন যেন কোথাও দর্শক হোঁচট খেয়ে এই মায়াবাস্তব থেকে জেগে না ওঠে-কারণ জেগে উঠলেই রূপধ্বনি থেকে অবিচ্ছিন্ন অর্থ আহরণের এই বাস্তব জীবনগত ধারা বাধা পাবে। বাস্তব জীবনে আমরা সচেতন, অর্ধসচেতনভাবে দেখি শুনি, অবচেতনভাবে ও আমাদের অচেতনে দৃশ্যশ্রাব্য জগৎ আমাদের যেভাবে প্রভাবিত করে, আজকের চলচ্চিত্রের প্রধান ধারা তারই অনুসারী। এই ধারার মধ্যে ত্রুফোর ‘জুল ও জিম’, রেনের ‘হিরোশিমা’ ও ‘মারিয়েনবাদ’, গদার-এর কিছু ছবি, এবং আংশিকভাবে ইংগমার বার্গম্যান বাদে প্রায় সারা পৃথিবীর সমস্ত শ্রেষ্ঠ পরিচালককেই ফেলা যেতে পারে। আজকের শ্রেষ্ঠ সবাক চলচ্চিত্রের বৈশিষ্ট্য এই যে তাতে ক্যামেরার সঙ্গে শব্দগ্রহণ যন্ত্র যোগ দিয়ে বাস্তবকে আরও মূর্ত, আরো হুবহু প্রতিফলনে পরিণত করেছে। কিন্তু এই বহিরঙ্গকে অতিক্রম করে তারই সাহায্যে মনের ঘটনাকে প্রকাশ করছে আজকের শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র। এই চলচ্চিত্রের ভাষাকে সাহিত্যের ভাষার সঙ্গে তুলনা করা চলে। কেননা শব্দের যেমন সহস্র সম্ভাব্য ব্যঞ্জনা সাহিত্যে, তেমনি চলচিত্রে। সাহিত্যের ভাষায় ‘প্রভাত’ বা ‘সন্ধ্যা’, ‘মানুষ’, ‘ঘোড়া’ ইত্যাদি সমস্ত শব্দের সম্ভাবনা বহুল অর্থময়। জীবনেও তাই। যেহেতু ক্যামেরায় মানুষের ছবি একটি বিশিষ্ট মানুষের সেহেতু তার কোনও ambihuity নেই, সে কেবল একটি স্থূল প্রতিকৃতি মাত্র, নিকোলা চিরায়োমন্তে এবং অন্যান্য কারও কারও এ জাতীয় মন্তব্য অর্থহীন। বাস্তব জীবনে যেমন বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন মনের কাছে ওই মানুষের দৃশ্য থেকে নানা বিমিশ্র ভাবের উৎপত্তি হতে পারে (যার মধ্যে চেতন-অবচেতন সবেরই অংশ থাকে) চলচ্চিত্রের দৃশ্যের বেলায়ও তাই। ‘জলসাঘর’ প্রথমে বা ‘লাভেন্তুরা’র শেষ দৃশ্যে আমরা একটি পরিবেশে একটি দুটি মানুষকে শুধু কথা নয়, প্রায় অঙ্গভঙ্গি বর্জিত অবস্থায় দেখি, যেন আঁকা ছবির মতো-অথচ তা সম্পূর্ণ বাস্তব। আমাদের বাস্তব জ্ঞান সেই পরিবেশ ও পাত্রপাত্রীর মনের কথা আমাদের সামনে পৌঁছে দেয় যেমন দিত বাস্তব জীবনে, যদি পরিচালকের দৃষ্টি দিয়ে আমরা দেখতাম ওই ঘটনাকে। একটি মেয়ে জানলার ধারে বসে আছে, এই ঘটনার তো কত অর্থ, ব্যঞ্জনা, নিরর্থকতা কত লোকের কাছে দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী। শুধু দৃশ্যবস্তুতে নয়, সেই সঙ্গে ধ্বনি-শব্দের ক্ষেত্রেও এই সম্পূর্ণ বাস্তবতার জীবনগত অর্থ আমরা খুঁজি। চলচ্চিত্রে সংগীত এই অর্থ আহরণে নেপথ্য থেকে সাহায্য করে বটে কিন্তু যেই সে সামনে এসে দাঁড়াতে চায়, স্বপ্নভঙ্গ ঘটে আমাদের। এইজন্য পাশ্চাত্য ছবিতে সংগীত ব্যবহার ক্ষীয়মাণ, এবং সবচেয়ে অন্তর্মুখী শিল্পী আন্তোনিয়োনির ছবিতে প্রায় বিরল-কেবল বাস্তব সঙ্গীত- যেমন রেস্তোরাঁয় ইত্যাদি ছাড়া (অবশ্য এই জাতীয় সংগীত ব্যবহারে আন্তোনিওনি অতুলনীয়)। সত্যজিৎ রায়ের ‘চারুলতা’-য় অন্তর্মুখী দৃষ্টির বলে সংগীত ব্যবহার খুবই সংক্ষিপ্ত এবং অতি সাবধানী।
অতএব সবাক যুগের ছবিতে শিল্পসীমানা বিস্তৃত হয়ে চলচিত্র শিল্পের নতুন অভিব্যক্তির পথ সৃষ্টি হয়েছে, যে অভিব্যক্তির মধ্য দিয়ে বাস্তবের বাহ্যরূপই তার অন্তর্নিহিত মনোজগতের সন্ধান দিতে পারে। এবং সেই কারণেই আজকের চলচ্চিত্রে নির্বাক ছবির সঙ্গে কথা ও ধ্বনি যোগ করে না,-ছবি, কথা, ধ্বনি এ সমস্তের একটি নতুন সম্পর্ক বিন্যাসে নব শিল্পরীতির সূচনা করে। একটি সবাক ছবির নির্বাক পরিচ্ছেদেও আর সেই নির্বাক যুগীয় অভিনয়ে আতিশয্য নেই। যেখানে কথা নেই, সেখানে কথা না থাকাটাই বাস্তব।
এ পর্যন্ত যা বলা হল তা আজকের চলচ্চিত্রের প্রধান অর্থাৎ বর্ণনাত্মক (narrative) ধারার সম্পর্কে প্রযোজ্য। এর পরবর্তী যে অধ্যায় রেনে, ত্রুফো এবং বিশেষত গদার-এর মধ্যে সূচিত হচ্ছে তাতে বাস্তবের মায়াকে ভেঙে দিয়ে বাস্তবের ধারাবাহিকতাকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে, তার মধ্যে সাহিত্যগত, সাহিত্যবহির্ভূত, সাংগীতিক, বুদ্ধিগত, প্রত্যক্ষ অপ্রত্যক্ষ নানা পৃথক স্তরকে একই ছবিতে নানা ভাবে মেলানোর জন্য ছবি শব্দ ও সংগীতের গুরুত্ব ও স্থান পরিবর্তন নিয়ে পরীক্ষা চলেছে। এই পরীক্ষা থেকে হয়তো এক নতুন ভাষা জন্ম নেবে, কিন্তু তার ব্যাকরণ নির্ধারণের সময়ই এখনও আসেনি।
৪র্থ বর্ষ ৫-৬ সংখ্যা
(শারদীয় ১৩৭৩)
