রামেন্দ্রসুন্দর – শিশিরকুমার দাশ
ঊনবিংশ শতাব্দীর বাঙালি মনীষী মূলত ইউরোপের সাহিত্য সংস্কৃতির-ধারার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। ইউরোপের নবজাগরণের শক্তির সঙ্গে বাঙালির পরিচয় এই সাহিত্য ধারার মধ্যে দিয়েই ঘটেছিল কিন্তু নবজাগরণের শক্তির একটা বড় দিকের সঙ্গে দীর্ঘকাল পর্যন্ত অপরিচয় ছিল বাংলা তথা ভারতবর্ষের। ইউরোপে, গ্যালিলিওর সময় থেকেই বলা চলে যে সংস্কৃতির দুটি ধারাই পাশাপাশি বয়ে চলেছিল, একটি সাহিত্য দর্শন শিল্পের আর অন্যটি বিজ্ঞানের। বর্তমান ইউরোপীয় সভ্যতা এবং সংস্কৃতি এই দুটি ধারারই সম্মিলনে গড়ে উঠেছে। ইতালিতে নবজাগরণের সময় থেকেই ইউরোপে মধ্যযুগের অবসান এবং আধুনিক যুগের সূচনা বলে ঐতিহাসিকেরা অভিহিত করেছেন। এই আধুনিক যুগের স্বকীয় রূপ প্রতিষ্ঠা পেল প্রকৃতপক্ষে আরও পরে, সপ্তদশ শতাব্দীতে যখন থেকে বিচিত্র বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারে মানুষের দৃষ্টি বিভিন্ন দিকে প্রসারিত হল। নবজাগরণের সময় পর্যন্ত প্রাচীনের সঙ্গে নবীন যুগের ব্যবধান দুস্তর হয়ে ওঠেনি। বার্ট্রান্ড রাসেল তাঁর পশ্চিমি দর্শনের ইতিহাস-এ লিখেছেন
নবজাগরণের কালে ইতালিয়ানরা এমন কোনও গ্রন্থ লেখেননি যা প্লেটো বা অ্যারিস্টটল পড়ে অর্থোদ্ধার করতে পারতেন না; লুথারের লেখায় টমাস অ্যাকুইনাস হয়তো ভীত হতেন, কিন্তু তাঁর বুঝতে কোনও অসুবিধে হত না। সপ্তদশ শতাব্দীর ব্যাপার সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল অ্যাকুইনাস এবং ওকাম কেউই নিউটনের তত্বের কিছুই বুঝতে পারতেন না।
ইউরোপীয় সংস্কৃতির সঙ্গে বাঙালির যখন পরিচয় ঘটেছিল, তখন সেই সংস্কৃতির এই আধুনিকতম ধারাটির সঙ্গে আমাদের পরিচয় ঘটেনি।
ইউরোপীয় ভাব-ভাবনা আমাদের জীবনে অনেকটা আলোড়ন এনেছিল, আমাদের উনিশ শতকের পূর্বপুরুষেরা সেই ভাব-ভাবনার প্রতি গভীরভাবে আকর্ষণও বোধ করেছিলেন কিন্তু ইউরোপীয় সংস্কৃতির বৈজ্ঞানিক ধারাটিকে আমরা স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারিনি। বুঝতে পারিনি যে বৈজ্ঞানিক মানসিকতার থেকেই একটি নূতন জীবন দর্শন গড়ে উঠতে পারত। ইউরোপীয় শিক্ষা ব্যবস্থা আমাদের দেশে যখন প্রবর্তিত হল তখন থেকেই বিজ্ঞান শিক্ষা শুরু হল সন্দেহ নেই। কিন্তু বিজ্ঞান শিক্ষা, দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের কাছে ব্যবহারিক বিদ্যা মাত্র হয়ে রইল, তা এক নূতন জীবনদর্শনের বাহন রূপে দেখা দিল না। এই নূতন জীবনদর্শনের প্রতিষ্ঠাভূমি বৈজ্ঞানিক মানসিকতা আর এই মানসিকতার জন্ম হতে পারে যেখানে মন মুক্ত এবং স্বাধীন চিন্তা এবং জিজ্ঞাসার একটি পরম্পরা প্রতিষ্ঠিত। ইউরোপের আধুনিক বৈজ্ঞানিক সংস্কৃতির প্রধান স্থপতি চারজন- কোপারনিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এবং নিউটন। অন্যপক্ষে ভারতবর্ষে, বৈজ্ঞানিক চিন্তার একটি অবিচ্ছিন্ন ধারা নেই বললেই হয়। এবং ধর্ম এবং দৈব যেখানে প্রবল সেখানে বৈজ্ঞানিকচিন্তার বীজ অঙ্কুরিত হবার সুযোগই পায় না। এর সঙ্গে হয়তো এটুকুও বলা দরকার যে পরাধীন দেশে মনের স্বাধীনতা স্বভাবতই খর্ব হয়, মুক্ত জিজ্ঞাসার ধারা দীর্ঘজীবী হতে পারে না। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার সমাজ, শিক্ষা, ধর্ম সব মিলিয়ে যে বিরাট জাগরণ ঘটেছিল তার একটি দুর্বলতা এইখানে। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথম পর্ব বিশেষ ধর্মান্দোলনের পর্ব, সমাজ সংস্কারের পর্ব। বাঙালি মনীষা মূলত ওই দুটি ক্ষেত্রেই তার সর্বশক্তি নিয়োজিত করেছিল। বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহী একটি মানুষের পরিচয় অবশ্য আমরা জানি-তিনি অক্ষয়কুমার দত্ত। তিনি তত্ববোধিনী পত্রিকায় বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিষয়ে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। তাঁর আগেও অনেকে বিজ্ঞানগ্রন্থ বাংলায় লিখেছেন, কিন্তু তিনিই প্রথম সাহিত্যিক যিনি বিজ্ঞানে উৎসাহ বোধ করেছেন। বিজ্ঞানে এই উৎসাহ নিতান্ত ব্যবহারিক প্রয়োজনে নয়, আত্মিক প্রয়োজনেও। ‘বাহ্যবস্তুর সহিত মানব মনের সম্বন্ধ বিচার’ এই বৈজ্ঞানিক মানসিকতার ফসল। অক্ষয়কুমার দত্ত তাঁর লেখার মধ্য দিয়ে বৈজ্ঞানিক পরিভাষাও গড়ে তুলেছিলেন। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে তিনিই একমাত্র বিজ্ঞানপ্রিয় বাঙালি সাহিত্যিক।
ঊনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে বিজ্ঞানচর্চার বাঙালির উৎসাহ বেড়েছিল সন্দেহ নেই। বিজ্ঞানের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাঙালির কৃতিত্বের কথাও আমরা শুনেছি। কিন্তু সেই সব বিজ্ঞানীরা তাঁদের নবলব্ধ জ্ঞান দিয়ে আমাদের সংস্কৃতির কাঠামোতে নূতন উপাদান সংযোজন করার চেষ্টা করেননি, অন্যদিকে সাহিত্য সাধকরা সেই বৈজ্ঞানিক চৈতন্যের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে বিলম্ব করেছেন। কেউ কেউ অবশ্য করেছেন। সেই স্বল্পসংখ্যক লোকের মধ্যে বঙ্কিমচন্দ্র একজন। তিনি যে সময় বিষবৃক্ষ লিখছেন সেই সময়ই বিজ্ঞান রহস্য-এর প্রবন্ধগুলি লিখছেন। অক্ষয়কুমার এবং বঙ্কিমচন্দ্র যা করেছেন তা মূল্যবান। তাঁরা বৈজ্ঞানিক পরিভাষা, বৈজ্ঞানিক গদ্যের পথ রচনা করেছেন। ইউরোপীয় সংস্কৃতির একটি জটিল অংশকে আমাদের মাতৃভাষার মধ্যে প্রকাশ করার জন্য প্রাথমিক চেষ্টা করেছেন। কিন্তু দুটি কারণে তখনও পর্যন্ত আমাদের প্রত্যাশা অতৃপ্ত থেকে যায়। প্রথমত, অক্ষয়কুমার এবং বঙ্কিমচন্দ্র উভয়েই মুখ্যত বিজ্ঞানের ছাত্র নন। দ্বিতীয়ত, তাঁরা দুজনেই ছাত্রদের জন্য যা ইংরেজি না-জানা বাঙালির জন্য বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধ লিখেছেন। আমাদের প্রত্যাশা, ইংরেজিশিক্ষিত বাঙালির জন্যই বাংলায় বৈজ্ঞানিক গদ্য এবং তার লেখক হবেন বিজ্ঞানের ছাত্র। তার ফলেই আমাদের সাহিত্যের একটি প্রধান অংশই হয়ে উঠবে বৈজ্ঞানিক গদ্য, পরিণত মনের আকাঙ্ক্ষিত ভোজ্য। এই প্রত্যাশা প্রথম যিনি পূরণ করলেন তিনি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
রামেন্দ্রসুন্দরের জন্ম ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে। তার মাত্র পাঁচ বৎসর আগে ডারউইনের Origin of Species প্রকাশিত হয়েছে। রামেন্দ্রসুন্দরের বয়স যখন আট তখন বেরুল বঙ্কিমচন্দ্রের বিজ্ঞান রহস্য। ১৮৮১-তে রামেন্দ্রসুন্দর এন্ট্রান্স পরীক্ষায় প্রথম হন। এই বছরই তাঁর প্রিয় বৈজ্ঞানিক হেলমহলৎস বিদ্যুৎ সম্পর্কে তাঁর নূতন প্রতিপাদ্যটি আবিষ্কার করেন। অন্য সব পদার্থের মতোই বিদ্যুৎও পরমাণুর সমষ্টি। ১৮৮৬-তে রামেন্দ্রসুন্দর পদার্থ বিদ্যা এবং রসায়ন বিদ্যায় অনার্স নিয়ে বি এ পাশ করেন প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে। এই বছরটি বিজ্ঞানের ইতিহাসে অতি স্মরণীয়। মাদাম কুরী এই বছর রেডিয়াম আবিষ্কার করেন। এক বছর পরে ১৮৮৭ তে পদার্থবিদ্যায় এম এ পাশ করেন রামেন্দ্রসুন্দর, এবারও প্রথম শ্রেণীতে প্রথম। এই বছরটিও বিজ্ঞানের ইতিহাসে আর একটি স্মরণীয় বছর। এতদিন পর্যন্ত ইথার নামক ভারহীন এক কাল্পনিক বস্তুর অস্তিত্ব কল্পনা করেছিলেন বৈজ্ঞানিকেরা। মাইকেলসন ও মর্লির পরীক্ষায় তার অস্তিত্ব কল্পনা করার আর প্রয়োজন থাকল না। রামেন্দ্রসুন্দরের ‘শক্তি’ এবং ‘অভিব্যক্তি’ নামক দুটি প্রবন্ধ বেরোয় ১৮৯৪-৯৫-এ, আর এই সময়েই রঞ্জন-রশ্মি আবিষ্কৃত হয়। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘প্রকৃতি’ প্রকাশিত হয় ১৮৯৪-এ, এই বৎসরই স্যার জগদীশচন্দ্র বোস লন্ডনে কেলভিন, জে. জে. টমসন প্রমুখ বৈজ্ঞানিকদের সামনে তাঁর বৈদ্যুতিক তরঙ্গ সম্পর্কিত পরীক্ষা প্রদর্শন করেন। ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় রামেন্দ্রসুন্দরের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ জিজ্ঞাসা। তার এক বছর পরেই আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্বের প্রতিষ্ঠা।
এই হল রামেন্দ্রসুন্দরের সময়। এরই মধ্যে তিনি শিক্ষা পেয়েছেন, চিন্তা করেছেন এবং লিখেছেন। ইউরোপের বৈজ্ঞানিক মনীষীদের বিভিন্ন আবিষ্কার এবং চিন্তার সঙ্গে যেমন একদিকে তিনি পরিচিত ছিলেন, অন্যদিকে তেমনই নবীন ভারতীয় বিজ্ঞানছাত্রদের গবেষণার ধারা কৌতূহলের সঙ্গে লক্ষ করছিলেন। তিনি হেলমহলৎস, কেলভিন, রাদারফোর্ড বা হাক্সলির গ্রন্থাদি গভীর ভাবেই অধ্যয়ন করেছিলেন এবং তাঁদের বক্তব্য ও চিন্তার সঙ্গে শিক্ষিত বাঙালির যোগাযোগ ঘটুক এ চেষ্টা তিনি করেছেন। তবু নিজে তিনি প্রত্যক্ষভাবে বিজ্ঞানচর্চায় সম্পূর্ণ আত্মনিয়োগ করতে পারেননি। তিনি কোনও বৈজ্ঞানিক গবেষণা করেননি। বিজ্ঞান সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞানকেও তিনি নিজে বিশেষ দূর প্রসারিত করতে পারেননি। কিন্তু বৈজ্ঞানিক জ্ঞান, যে জ্ঞান আমরা ইউরোপীয় বৈজ্ঞানিকবৃন্দের কাছ থেকে পেতে পারি, তা আমাদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ুক, এই ছিল তাঁর কামনা। এ বিষয়ে তাঁর বৃত্তি তাঁকে সাহায্য করেছিল। তিনি ছিলেন বিজ্ঞানের অধ্যাপক। তিনি বুঝেছিলেন বিজ্ঞান এক নৈর্ব্যক্তিক তথ্যসমষ্টি এবং জ্ঞানের সমষ্টি, তা তখনই আমাদের জীবনকে অর্থবান এবং প্রাণবান করতে পারবে যখন সেই নৈর্ব্যক্তিক জ্ঞানরাশিকে আমাদের সামগ্রিক জীবনধারার সঙ্গে আমরা মিলিয়ে নিতে পারব। সেই জন্যই মাতৃভাষায় বিজ্ঞান পঠিত হোক এই ছিল তাঁর ইচ্ছা। এটি তাঁর ইচ্ছামাত্র নয়, তিনি মুখে বলেই ক্ষান্ত হননি, তিনি বাংলাতে পদার্থবিদ্যার অধ্যাপনাও আরম্ভ করেছিলেন। তাঁর বহু বৈজ্ঞানিক প্রবন্ধের সূচনা এই ভাবেই। একই সময়ে যখন জগদীশচন্দ্র বিজ্ঞানের মৌলিক গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেছেন, তখন সমপ্রতিভাপ্রাণ ছাত্র রামেন্দ্রসুন্দর বিজ্ঞানের শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ করলেন। দুটি কাজ পরস্পরের পরিপূরক। নূতন যুগের বৈজ্ঞানিক গঠনের পথপ্রস্তুতি।
এই বিজ্ঞানের শিক্ষা শুধু ক্লাসের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না, রামেন্দ্রসুন্দরের লেখার মধ্য দিয়ে তা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে বিকীর্ণ হল। এই সব লেখার মধ্য দিয়ে এক বিশ্বের ছবি এঁকেছেন তিনি। এই বিশ্বচিত্রের উপাদান প্রধানত তাঁর সমকালীন বৈজ্ঞানিক চিন্তা। আর অংশত তাঁর নিজস্ব জীবনচিন্তা। যে বিশ্বের সঙ্গে তিনি পাঠকের পরিচয় করিয়েছেন, সে বিশ্ব সুনিয়ন্ত্রিত, শৃঙ্খলাবদ্ধ, নিয়মানুবর্তী। সেই বিশ্ব পদার্থ দিয়ে গড়া। পদার্থ গড়া অনুপরমাণুতে। স্থিতি বিজ্ঞান এবং গতিবিজ্ঞানের নিয়মাবলির দ্বারা তারা নিয়ন্ত্রিত। এই নিয়মের কোনও ব্যতিক্রম নেই। সমস্ত রাজত্বটাই নিয়মের রাজত্ব।
এই বিশ্ব সুবৃহৎ। এত বৃহৎ যে তার সম্বন্ধে আমাদের জ্ঞান সম্পূর্ণ নয়। এই বিশ্বসংসার বৃহৎ। মানুষ ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র। এই বিশ্ব অতি প্রাচীন। মানুষ নিতান্ত নবাগত। তার ফলে মানুষের সামনে এক নূতন সমস্যার উদ্ভব হয়। এই বিশ্বে তার স্থান কতটুকু। এই স্থানের বিশালতা এবং কালের ব্যাপ্তি দুই-এর মাঝখানে তার অস্তিত্বের অসহায় রূপ ফুটে ওঠে। একদা মানুষের ধারণা ছিল মানুষের গ্রহ এই পৃথিবী বিশ্বজগতের কেন্দ্র। তারই চারিদিকে সূর্যের আবর্তন। কোপারনিকাস এই ধারণাকে চূর্ণ করেন। বিশ্বজগতের কেন্দ্র থেকে পৃথিবী তার কাল্পনিক গৌরব ভ্রষ্ট হল। আর পৃথিবীর মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের প্রাচীনত্ব এবং মহত্বের গৌরবও চূর্ণ করলেন ডারউইন। ভূতাত্বিকেরা লক্ষ লক্ষ বছরের পরিমাপে কথা বলে দেখালেন পৃথিবী কত প্রাচীন। কত লক্ষ বছর সেখানে প্রাণের আবির্ভাব হয়নি। আর মানুষ কত নবীন। জ্যোতির্বিদেরা লক্ষ আলোকবর্ষের পরিমাপে কথা বলে দেখালেন কত অজস্র গ্রহতারার মধ্যে পৃথিবী একটি। কত তারার আলো এখনও পৃথিবীতে এসে পৌঁছায় না। কী বিশাল ব্যাপ্তি-স্থানের এবং কালের। স্যার জেমস জীনস লিখেছেন পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রতীরের সমগ্র বালুকারাশির সংখ্যা যত বিশ্বজগতের নক্ষত্রসংখ্যা প্রায় তারই কাছাকাছি। আর পৃথিবী সেই নক্ষত্র সংখ্যার একটি। এই বিশ্বচিত্রে আশা নেই, আলো নেই। অসহায়তার অন্ধকার। রামেন্দ্রসুন্দর লিখছেন
মনুষ্য যখন জগতের মধ্যে আপন শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন করিয়া গর্বের সহিত বুক ফুলাইয়া নিশ্চিন্ত ছিল, এবং যখন বিজ্ঞান বিদ্যা তাহার সেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিপাদন কর্মে নিযুক্ত রহিয়া মনুষ্যের জয়ঢক্কা বাজাইতেছিল, ঠিক সেই সময়েই তাহার সুখের স্বপ্ন ভাঙ্গিয়া গেল। বিজ্ঞানই আবার মানুষকে সম্বোধন করিয়া বলিতে লাগিল, প্রভু, প্রভুত্ব গর্বে গর্বিত হইও না; তুমি জগতের মধ্যে ক্ষুদ্রাদপি ক্ষুদ্র, তুমি তৃণাদপি সুনীচ, তুমি বালুকণা হইতেও অধম।
কিন্তু এই আশাহীন বিশ্বজগৎ-এর যে ছবি রামেন্দ্রসুন্দর এঁকেছেন তারই পাশে পাশে আছে আশার ছবি। রামেন্দ্রসুন্দর বিজ্ঞানের কৃতী ছাত্র কিন্তু তিনি বিজ্ঞানের কাছ থেকেই সত্যের রূপের সন্ধান করেননি। সত্য তাঁর কাছে কবিকথিত সেই বিচিত্র বর্ণ-স্ফটিক। বিজ্ঞান তার সমস্তরূপ দেখতে পায় না-এই ছিল তাঁর ধারণা। বিজ্ঞান স্বভাবতই সমস্ত কিছুর ব্যাখ্যা বা বর্ণনা করতে এখনও সমর্থ নয় নয় এবং একটি জিনিসেরও সামগ্রিক সত্যের রূপ বিজ্ঞান দিতে উৎসাহী নয়। সি ই এম জোডের ভাষায় বলি, ‘… it only provides us with partial truth about those aspects of things which it has selected for treatment because they are amenable to its methods.’ বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক থেকেই অবশ্য ঊনবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিকদের তৈরি এই যান্ত্রিক বিশ্বের শৃঙ্খলায় বৈজ্ঞানিকরা সন্দেহ করলেন। রামেন্দ্রসুন্দর আর কিছুদিন জীবিত থাকলে দেখতে পেতেন যে পরমাণুর আচরণ সম্বন্ধে বৈজ্ঞানিকদের জ্ঞান যখন আরও সম্পূর্ণতা লাভ করল তখনই ঊনবিংশ শতাব্দীর যান্ত্রিক বিশ্বের নিয়মের রাজত্বে অরাজকতার সন্ধান পাওয়া গেল। সাধারণত দেখা গেছে যে একটি বৈদ্যুৎ কণিকা একটি চক্র থেকে অন্য চক্রে লাফ দেয়, যখন তা তেজ আহরণ করে তখন ভেতরের চক্র থেকে বাইরের চক্রে, আরও যখন তেজ বিকিরণ করে তখন বাইরের চক্র থেকে ভেতরের চক্রে। কিন্তু বৈজ্ঞানিকেরা বুঝতে পারছেন না, এর কারণ কী, কখন এবং কেন, এবং কোনটি কোন চক্র থেকে চক্রান্তরে যাবে। একেই বলা হয়েছে পরমাণুর free-will। এই free-will পদার্থবিদ্যায় অনির্দেশ্যবাদের জন্ম দিয়েছে।
রামেন্দ্রসুন্দর বিজ্ঞানজিজ্ঞাসার সঙ্গে সঙ্গে জীবনজিজ্ঞাসাকে মিলিয়ে নিয়েছেন। এবং শেষ পর্যন্ত তিনি বৈজ্ঞানিকের সৃষ্ট জগতের মধ্যে জীবনের অস্তিত্বের মূল্য আবিষ্কার করেছেন। প্রথমে আমরা লক্ষ করেছি তাঁর জীবনে বৈজ্ঞানিক চিন্তা এবং সাধনার একটি ধারা যেমন বয়ে চলেছিল তেমনই আর একটি ধারা বইছিল তা হল দর্শনের। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাবে বাংলাদেশে দার্শনিক চিন্তারও বিশেষ বিকাশ হচ্ছিল। সেই দার্শনিক চিন্তা মূলত আধ্যাত্মিক চিন্তার সঙ্গেই জড়ানো। এই সময়ে নূতন করে হিন্দুত্বের অভ্যুদয়, বঙ্কিমচন্দ্রের হিন্দুধর্ম ব্যাখ্যা, বিবেকানন্দের বেদান্ত প্রচার স্বাভাবতই রামেন্দ্রসুন্দরের সংবেদনশীল মনে সাড়া জাগিয়েছিল। ইউরোপে এবং আমেরিকায় দার্শনিক চিন্তার এক নূতন ধারা গড়ে উঠেছিল। উইলিয়াম জেমস-এর The Willto Believe and other Essays, ১৮৯৭, Pragmatism, ১৯০৭; ১৯০৭; জি. ই. মূর-এর Principia Ethica, ১৯০৩; ক্রোচের Philosophy of Spirit, /১৯১৩-২২; জর্জ সানটায়নার The Life of Reason, ১৯০৫-৬; বার্গসঁর Creative Evolution ১৯১১, এবং, হোয়াইটহেড এবং রাসেল-এর Principia Mathematica, ১৯১০-১৩- এই সমস্ত গ্রন্থ রামেন্দ্রসুন্দরের জীবৎকালে এবং সক্রিয় চিন্তার কালেই প্রকাশিত হয়েছে এবং এঁদের অনেকেরই লেখার সঙ্গে রামেন্দ্রসুন্দর পরিচিত ছিলেন। কিন্তু তাঁর জীবনচিন্তা মূলত গড়ে উঠেছিল পাশ্চত্য metaphysician-এর চিন্তার সঙ্গে Vedanta-র সমন্বয়ে। তাঁর কাছে চরম সত্য হল আমি-বোধের চিরজীবী ধারা বা আত্মার অবিনাশিতা। যখন বিজ্ঞানের জগতে মানুষের স্থান সংকীর্ণ, তার গৌরব লুণ্ঠিত তখন রামেন্দ্রসুন্দর বলতে চান, ”আমিই এই বিশ্বজগতের কল্পনা কর্তা, এবং আমিই উহার রচনা কর্তা; আমি উহার রূপ দিয়াছি এবং আমিই উহার ‘নাম’।” যখন রাসেলের মতো দার্শিনিক বলবেন
The man is the product of causes which had no prevision of the end they were achieving… এবং … no fire, no heroism, no intensity of thought and feeling can preserve individual life beyond grave.
রামেন্দ্রসুন্দর তখন সেখানে বলবেন
সমুদয় প্রতীতির মধ্যে দেশ ও কাল নামক দুইটা কাল্পনিক প্রত্যয় বিশালকায় বিস্তার করিয়া আমাদের সমক্ষে দণ্ডায়মান হয়। আমরা জড়ের অস্তিত্ব ও এমনকি, শক্তির অস্তিত্ব উড়াইয়া দিতে পারি; কিন্তু এই দেশ ও কাল যেন কী একটা বিকট স্বাধীন অস্তিত্ব লইয়া আমাদের আত্মাকে ম্রিয়মান করিয়া রাখে। আমার সম্মুখে ও পশ্চাতে সীমাহীন মহাকাশ, আমার পূর্বে ও পরে অনাদি অনন্ত মহাকাল, আমার ক্ষুদ্র অস্তিত্বকে সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে আবদ্ধ করিয়া আমাকে অবসন্ন করিয়া কি এক বিভীষিকা দেখায়। .. বস্তুত দেশ ও কাল আমারই কল্পনা বা আমারই সৃষ্টি। আমার প্রত্যয়গুলিকে আমি দুইটা রীতিতে সাজাইয়া থাকি, তাহার মধ্যে একটা সজ্জার নাম দেশ, আর একটার নাম কাল। …আমি জীব সাজিয়া আপনাকে ক্ষুদ্র সংকীর্ণ দেখি; কিন্তু আমি ক্ষুদ্র নহি, সংকীর্ণ নহি। কেন না, আমিই ব্রহ্ম ও আমিই জীব-যে জ্ঞাতা, সেই জ্ঞেয়-দুইই এক-একমেবাদ্বিতীয়ম।
বিজ্ঞানচিন্তা এবং দার্শনিক চিন্তার সমন্বয়ের মধ্যে কোনও অভিনবত্বের দাবি নেই। তা সভ্যতার ইতিহাসে বারবার ঘটেছে। কিন্তু রামেন্দ্রসুন্দরের এই সমন্বয়ের মধ্যে বৈশিষ্ট্য হল এই যে বিশ্বের সম্পূর্ণ ছবিটি যদি আমরা পেতে চাই-তা হলে বিজ্ঞান এবং দর্শন উভয় ধারার সাহায্যেই পেতে পারি। এই বৈশিষ্ট্যটি অর্জন করেছেন রামেন্দ্রসুন্দর বহু মূল্য দিয়ে, জীবনের বহু দুঃখে। তাঁর সেই অন্তর্জীবনের জ্বালাযন্ত্রণার কাহিনি রামেন্দ্রসুন্দর বড় সততা দিয়ে লিখেছেন। পদার্থবিদ্যা থেকে অধ্যাত্মচিন্তায় পরিভ্রমণের এই যে ইতিহাস তা আমাদের সাহিত্যের পরম মূল্যবান বস্তু। রামেন্দ্রসুন্দর অল্পবয়সে পিতাকে হারান। কবির ভাষায় ‘Life’s early cup with such a draught of woe’, রামেন্দ্রসুন্দরের সমগ্র জীবনের অন্তরালে এক বেদনার অন্তঃশীল স্রোত সৃষ্টিতে সাহায্য করেছিল । বিজ্ঞান এবং দর্শনচিন্তায় তিনি বাঙালি পাঠকের সামনে যে ছবিটি তুলে ধরেছেন তার অন্তরালে আছে তাঁর বেদনাজর্জর প্রতিমূর্তি। তিনি ‘প্রকৃতি’র উৎসর্গ পত্রে হঠাৎ সেই মনকে প্রকাশ করেছেন
জ্ঞানের প্রবাহ সংসার প্লাবিত করিয়া ছুটিয়াছে। এই দুর্বল দেহে সেই প্রবাহে ভাসিয়া চলিবারও ক্ষমতা নাই। কিন্তু ঊষর সংসারমরুতে জ্ঞানের অপেক্ষা প্রেমের প্রবাহের প্রয়োজন অধিক… কেন আসে, কেন যায়, দিয়া কেন হরিয়া লয়, – প্রকৃতির এই নিষ্ঠুর লীলাখেলার উদ্দেশ্য বুঝিবার জন্য দেশবিদেশের জ্ঞানিজনের চরণতলে লুষ্ঠিত হইয়াছি। জ্ঞানের নিকট সান্ত্বনা মিলে নাই; স্নেহের পিপাসা জ্ঞানে মিটায় নাই।
বঙ্কিমচন্দ্রের অমরনাথের উক্তি মনে পড়ে, ‘প্রভো, তোমায় অনেক সন্ধান করিয়াছি, কই তুমি? দর্শনে বিজ্ঞানে তুমি নাই। জ্ঞানীর জ্ঞানে, ধ্যানীর ধ্যানে তুমি নাই।’ আবার ‘জিজ্ঞাসা’র উৎসর্গে লিখেছেন, ”বিষাদের ঘনচ্ছায়ায় সংসার ক্ষেত্র আবৃত রহিয়াছে, কোটি মানবের হাহাকার সেই অন্ধকার বিদীর্ণ করিয়া ভীত পথিকের ত্রাস জন্মাইতেছে।’ এই ছবি আমাদের অভিজ্ঞতার কাছে সত্য বলে মনে হয়। মানুষের জীবন অন্ধকারে, অদৃশ্য শত্রু নিপীড়িত পথে বেদনাদায়ক যাত্রার বেশি কিছু নয় এমন কথা যখন দার্শনিক বলেন তখন তা আমাদের কাছে প্রত্যক্ষ হয়ে ধরা দেয়। রামেন্দ্রসুন্দরের সমকালেই রাসেল তাঁর ‘A Free Man’s Worship’, ১৯০২ প্রবন্ধে এই ভীত জীবনের ছবিটি এঁকেছেন
In action, in desire we must submit perpetually to the tyranny of outside forces; but in thought, in aspiration, we are free, free form out fellowmen, free from the petty planet on which out bodies impotently crawl, free even while we live, from the tyranny of death.
রামেন্দ্রসুন্দর এই অন্ধকার বিশ্বজগতের ছবিটিকে স্বীকার করবেন না, তিনি বলবেন;
জগৎ কোথায়? জগৎ তোমার বাইরে নহে, জ্ঞাননেত্রে চাহিয়া দেখ, জগৎ তোমার অন্তরে। জীবসমাকুলা বসুন্ধরা, সূর্যকেন্দ্রক সৌরজগৎ, তারকাকীর্ণ নভস্থল তোমারই অন্তরে। তুমি বিশ্বজগতের অন্তর্গত নহ, বিশ্বজগৎই তোমার অন্তর্গত। বিশ্বজগতের স্বাধীন অস্তিত্বের প্রমাণই নাই; তুমি আছ বলিয়াই বিশ্বজগৎ আছে।… তোমার জগতে নিয়ম আছে, ব্যবস্থা আছে; কেননা, সেই নিয়ম, সেই ব্যবস্থা তুমি স্থাপন করিয়াছ। তুমিই জগতের স্রষ্টা, তুমিই তাহার বিধাতা।
৩য় বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৭২)
