সখারাম গণেশ দেউস্কর – ভবতোষ দত্ত

সখারাম গণেশ দেউস্কর – ভবতোষ দত্ত

স্রষ্টা বা শিল্পী বলতে যা বোঝায় সখারাম গণেশ দেউস্কর (১৭ ডিসেম্বর ১৮৬৯-২৩ নভেম্বর ১৯১২) তা ছিলেন না। উপন্যাস কবিতা নাটক বা গল্প তিনি লেখেননি। তবু বাংলা সাহিত্যে তিনি স্মরণীয়। রসের ক্ষেত্রে তাঁর দান নয়, মননের ক্ষেত্রেও নয়। মননের সঙ্গে যেখানে জীবনের যোগ সখারামের স্মরণীয়তা সেখানেই। বাংলা গদ্যসাহিত্য এই যোগসাধনের কাজটি করে এসেছে। যে চিন্তাধারা রামমোহনের সময় থেকেই রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাত্রা করেছিল বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে তা এমন একটি পর্যায়ে পৌঁছল যখন থেকে আধুনিক জীবনাদর্শের বাহক রাজা এবং নব উদ্বুদ্ধ প্রজার মধ্যে সম্পর্ক একটি স্পষ্ট আকৃতি পেল। সখারামের প্রধানতম রচনা ‘দেশের কথা’য় তার চরম রূপটি ফুটে উঠেছিল। সখারামকে ইতিহাসে স্থাপন করতে গেলে বাঙালি চিন্তাধারার এই গতিরেখাটিকেই অনুসরণ করে আসতে হবে।

ভারতবর্ষের অন্য অঞ্চলের প্রসঙ্গ বাদ দিয়ে বাংলাদেশের কথাই বলি। এখানে ইংরেজের আধিপত্যের আরম্ভ, এখানেই ইংরেজি সভ্যতা ও সংস্কৃতির প্রত্যক্ষ প্রভাব। বাঙালি মনীষীরাই এর সুফল এবং কুফল চিন্তা করেছিলেন। সখারাম বাঙালি ছিলেন না, যদিও বাংলাই ছিল তাঁর কর্মভূমি, জন্মভূমি ছিল দেওঘর, পিতৃভূমি মহারাষ্ট্র। সখারামের জীবনকথা সংক্ষেপে বলে নেওয়া ভালো।

বৈদ্যনাথের কাছে করো গ্রামটি সম্ভবত বর্গীর হাঙ্গামার সময় মরাঠাদের হস্তগত হয়। সদাশিব বিবাহসূত্রে এই গ্রামটি পান। সদাশিব ছিলেন সখারামের পিতামহ, সদাশিবের পুত্র ছিলেন গণেশ। গণেশ সদাশিব কাশিধামে বেদ অধ্যয়ন করেন। সখারাম বৈদ্যনাথে জন্মগ্রহণ করেন ১৭ ডিসেম্বর ১৮৬৯। বাল্যকালেই সখারাম মাতৃহীন হন। তাঁর পিসিমাই, তাঁকে লালন করেছিলেন। পিসিমা ছিলেন বুদ্ধিমতী, বিদ্যানুরাগিণী। মরাঠা সাহিত্যে এবং ইতিহাসে তাঁর বিশেষ দখল ছিল। সখারামের জীবনের আদর্শ গড়ে ওঠে এই পিসিমারই প্রভাবে। মরাঠা জাতির ইতিহাস, শিবাজীর কীর্তিকলাপ সখারামের কিশোরমনে ছায়া ফেলেছিল। পরবর্তী জীবনে নূতনতর ইতিহাসের পরিবর্তিত পটভূমিতে দেশাত্মবোধক কার্যকলাপে সেটাই হয়েছিল ফলবান।

পিতা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন বেদ-অধ্যয়নে। দেওঘর ইস্কুলে তিনি পড়াশোনা আরম্ভ করেছিলেন। বাংলাও স্বাভাবিকভাবেই তিনি শিখতে থাকেন। তখন দেওঘর ইস্কুলের হেডমাস্টার ছিলেন যোগীন্দ্রনাথ বসু, মাইকেল মধুসূদন দত্তের বিখ্যাত জীবনীকার। সখারামের বাংলা ভাষায় অনুরাগের মূলে প্রভাব ছিল যোগীন্দ্রনাথের। দেওঘরে তখন থাকতেন রাজনারায়ণ বসু। রাজনারায়ণের গৃহে সখারাম প্রায়ই যেতেন। হেমেন্দ্রপ্রসাদ ঘোষের সঙ্গে সখারামের পরিচয় হয় সেখানেই। হেমেন্দ্রপ্রসাদ সখারামের মৃত্যুর পর একটি স্মৃতিকথা লিখেছিলেন।

দারিদ্র্যের জন্য সখারাম পড়াশোনা বেশিদিন চালাতে পারলেন না। প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে দেওঘরেই তিনি শিক্ষকের পদ গ্রহণ করলেন। তখন থেকেই তিনি তখনকার শ্রেষ্ঠ পত্রিকা সুরেশচন্দ্র সমাজপতির সাহিত্য-র লেখক। ভারতী প্রদীপ বঙ্গদর্শন আর্যাবর্ত-এ তাঁর ভারতীয় ও মহারাষ্ট্রীয় ইতিহাস-সম্পর্কিত প্রবন্ধ প্রকাশিত হতে থাকে । তাঁর প্রথম পুস্তিকা এটা কোন যুগ শিক্ষকপদে নিযুক্ত হাবার আগেই ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে বেরিয়েছিল। প্রবন্ধটি ‘সাহিত্য ও বিজ্ঞানে’-এ এবং স্থানে স্থানে পরিবর্তিত হয়ে তত্ববোধিনী পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। বইটি রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়ে লেখা নয়, যুগ সম্বন্ধে শাস্ত্রীয় বিচার। পিতার প্রভাবে তিনি ধর্মশাস্ত্র ও ইতিহাসচর্চা করেছিলেন, এটা তারই ফল। তারপরেই বেরোতে থাকে মহামতি রানাডে (১৯০১), ঝাঁশীর রাজকুমার (১৯০১), বাজীরাও (১৯০২), আনন্দবাঈ (১৯০৩)। কিন্তু এই বইগুলি ছাড়াও তাঁর বহু রচনা পুস্তকাকারে অনিবদ্ধ। এই রচনাধারা অনুসরণ করে গেলে সখারামের ইতিহাস-সন্ধান এবং দেশানুরাগের ক্রমগভীরতার পরিচয় পাওয়া যায়। মরাঠাজাতির গৌরবপূর্ণ ইতিহাস, শিবাজীর দেশ ও জাতি গঠন, দিল্লির বাদশাহের সঙ্গে তাঁর দুঃসাহসিক সংগ্রামে তার চূড়ান্ত পরিণতি-এই ইতিহাস সখারাম ভালো করেই পড়েছিলেন। তাঁর পড়া শুধু পুথিগত ছিল না, তাঁর ব্যক্তিজীবনেও দেশানুরাগের শিখা জ্বলে উঠল। দেওঘরের ম্যাজিস্ট্রেট মি. হার্ডের অন্যায় আচরণ সম্বন্ধে হিতবাদীতে যে সব লেখা বেরিয়েছিল, সখারামই তার লেখক অনুমান করে স্কুল কমিটির সভাপতি ম্যাজিস্ট্রেট মি. হার্ডি সখারামকে কর্মচ্যুত করলেন। শুধু তাই নয় ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে সখারাম দেওঘর ছেড়ে কলকাতায় চলে আসতে বাধ্য হলেন।

‘হিতবাদী’র সম্পাদক তখন কালীপ্রসন্ন কাব্যবিশারদ। কাব্যবিশারদই সখারামকে হিতবাদী-তে চাকরি দিলেন। কাজ আরম্ভ করলেন ত্রিশ টাকায়, কর্মদক্ষতাগুণে সে বেতন বৃদ্ধি পেল। ইতিমধ্যে সখারাম নানা বিষয়ে জড়িয়ে পড়লেন। শিবাজী-উৎসব প্রবর্তন, বঙ্গভঙ্গ-অন্দোলন ছাড়াও রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গেও তাঁর যোগ স্থাপিত হল। তাঁর বিখ্যাত বই দেশের কথা লেখা হল ১৯০৪-এ ১৯০৭ সালে কাব্যবিশারদ স্বাস্থ্যান্বেষণে জাপান যাত্রা করেন। সেখান থেকে ফেরার পথে জাহাজেই তাঁর মৃত্যু হয়। কাব্যবিশারদের অনুপস্থিতি কালে সখারাম ছিলেন হিতবাদী-র সম্পাদক, পরে তিনিই হলেন স্থায়ী সম্পাদক। কিন্তু সেই কাজেও তিনি বেশিদিন থাকতে পারলেন না। সুরাট কংগ্রেসের (২৯০৭) ঘটনা উপলক্ষ্য ক’রে সখারাম হিতবাদী-র কাজ ছেড়ে দিলেন। দ্রুতপন্থী এবং ধীরপন্থীদের বিরোধে সুরাট কংগ্রেসের অধিবেশন ভেঙে গেল। দ্রুতপন্থীদের নেতা তিলককে দোষারোপ করতে চাইলেন হিতবাদী-কর্তৃপক্ষ। সখারাম তাতে অসম্মত হলেন। রাজনৈতিক আদর্শের গুরুকে তিনি কিছুতেই সমালোচনা করতে চাইলেন না। তেজস্বী মরাঠা সামান্য আয়ের উপায়টিও ছেড়ে দিলেন।

হিতবাদী-র সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদের পর তিনি জাতীয় বিদ্যালয়ে ইতিহাসের অধ্যাপক নিযুক্ত হয়েছিলেন। এদিকে দেশের কথা এবং তিলকের মোকদ্দমা বই দু’খানাই সরকার বাজেয়াপ্ত করলেন। দেশের কথা সম্পর্কে হেমেন্দ্রপ্রসাদ একটি কৌতূহলোদ্দীপক সংবাদ দিয়েছেন

১৩১১ থেকে ১৩১৪ সাল এই চারি বৎসরে দেশের কথা চারি সংস্করণে ১০০০০ খণ্ড বিক্রীত হয়। তাহার পর সরকার ইহার প্রচার বন্ধ করিয়া দেন। কিন্তু পুস্তকের প্রচার যত বাড়িতে লাগিলে শিক্ষাব্রতী সখারাম তাহার মূল্য তত কমাইতে লাগিলেন।

হেমেন্দ্রপ্রসাদ সখারামের ব্যক্তিত্বদ্যোতক আর-একটি ঘটনার কথা বলেছেন, সেটিও উল্লেখযোগ্য

বাঙ্গালার রাজনৈতিক জটিলতাজড়িত স্বদেশী আন্দোলনের বহুপূর্ব রানাডে প্রমুখ অর্থনীতিবিশারদের চেষ্টায় বোম্বাই অঞ্চলে ভারতীয় শিল্পের উন্নতিচেষ্টা হইতেছিল। তখন বোম্বাই অঞ্চলের কলে যে বস্ত্র উৎপন্ন হইত তাহার পাড়ের বর্ণ পাকা হইত না। সখারাম সেই মোটা কাপড় ব্যবহার করিতেন।

সরকারের রোষভাজন সখারামকে জাতীয় পরিষদও কাজে রাখতে ভরসা পেলেন না। সখারাম নিজেই অধ্যাপকপদ ত্যাগ করলেন। ১৯১২-র ২৩ নভেম্বর দেওঘরে করো গ্রামে দারিদ্র্য ও ব্যাধির আক্রমণের মধ্যে সখারাম গণেশ দেউস্কর মৃত্যুবরণ করলেন। ইতিপূর্বে পুত্র ও পত্নীকে তিনি হারিয়েছিলেন। সখারাম দেশসেবার পুরস্কার পেলেন অর্থ বিত্ত স্বাচ্ছন্দ্যের দ্বারা নয়, স্বরাজ-আন্দোলনে রাজরোষকে উপহার করে দেশের কথা এবং তিলকের মোকদ্দমা-র লেখকরূপে জনচিত্তে স্থায়ী আসন-লাভের দ্বারা। ‘স্বরাজ’ শব্দটি সখারাম গণেশ দেউস্কর তাঁর বাংলায় লেখা দেশের কথা (১৯০৪) গ্রন্থে সর্বপ্রথম ব্যবহার করেন২।

কলকাতায় চলে আসার পর থেকেই সখারাম দেশাত্মবোধক কর্মে অধিকতর নিবিষ্ট হয়ে পড়েছিলেন। তখন বাংলাদেশে সর্বজনপরিচিত শ্রেষ্ঠ পুরুষ স্বামী বিবেকানন্দ। স্বামীজির সঙ্গে সাক্ষাৎ করে সখারাম যে উদ্দীপনা এবং দৃষ্টি লাভ করেছিলেন, সে-কথা সখারাম স্বামীজির দেহত্যাগের পর নিজেই বলেছিলেন।

পাঞ্জাব প্রদেশাগত এক বন্ধুকে নিয়ে সখারাম একবার বিবেকানন্দের সঙ্গে দেখা করতে যান। বিবেকানন্দ আরম্ভ করলেন পাঞ্জাবের অন্নকষ্ট ইত্যাদির আলোচনা। জনসাধারণের প্রতি আমাদের যে বিশেষ কর্তব্য রয়েছে স্বামীজি তার কথা বিশেষভাবেই উল্লেখ করতে থাকলেন। শিক্ষা অন্ন বস্ত্র ইত্যাদি নানা দিক দিয়ে পতিত অগণ্য ভারতবাসীর উন্নয়নের নানা আলোচনায় সময় কেটে গেল। বিদায় গ্রহণের সময় পাঞ্জাবি ভদ্রলোকটি বললেন যে তিনি আশা করেছিলেন স্বামীজির কাছে আধ্যাত্মিক উপদেশ শুনবেন কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে সমস্ত আলোচনার গতিই ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হল। একথা শুনে স্বামীজি গম্ভীর হয়ে গেলেন। বললেন

Sir, so long as even a dog of my country remains without food, to feed and take care of him is my religion and anything else is either non-religion or false religion.

স্বামীজির দেহত্যাগের দীর্ঘকাল পর সখারাম এই ঘটনা বর্ণনা করে বলেছিলেন স্বামীজির কথাগুলি তাঁর অন্তরকে দগ্ধ করেছিল, সেদিন বুঝতে পেরেছিলেন দেশাত্মবোধ কাকে বলে। দেশের কথা রচনামূলে যে প্রজ্বলন্ত দেশচেতনা ছিল স্বামী বিবেকানন্দের তেজোগর্ভ অনুপ্রেরণাও যে তার অন্যতম ইন্ধন ছিল, এই অনুমান খুবই যুক্তিসংগত।

অবশ্য সবচেয়ে বড়ো প্রেরণা ছিল তিলকের। মহারাষ্ট্র আন্দোলন ক্রমেই বলশালী হয়ে উঠেছিল। লোকমান্য তিলক মহারাষ্ট্রে গণপতি-পূজার নূতনতর ব্যাখ্যা দিয়ে সার্বজনিক পূজারূপে তার প্রবর্তন করলেন। ভারতবর্ষের প্রাচীন ইতিহাসে তিলকের জ্ঞান ও গবেষণা তাঁর দেশচেতনাকে গঠিত করেছিল। দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে রাজনৈতিক কর্তব্যকে যুক্ত করে একটি নূতন মূল্যমানকে সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন তিলক। একই প্রেরণাতে প্রবর্তিত হল শিবাজী-উৎসব। প্রতাপগড়ে তিলকের চেষ্টায় মহারাজ শিবাজীর উপাস্য ভাবানীদেবীর মন্দিরের সংস্কার হয়। শিবাজী ধর্মবলে ভারতবর্ষে ধর্মরাজ্য স্থাপন করার স্বপ্ন দেখেছিলেন, তিলকেরও আকাঙ্ক্ষা ছিল আমাদের নতুন জাতীয়তাবাদ ধর্মের বলেই বলীয়ান হয়ে উঠুক। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে শিবাজী-উৎসবের অনুষ্ঠান হল মহারাষ্ট্রে। এই উপলক্ষে কেশরী প্রবন্ধ-কবিতায় এবং উৎসব-বিবরণে মুখর হয়েছিল। তারপরে দু’জন ইংরেজ যখন আততায়ীর হাতে নিহত হলেন, তখন শাসন কর্তৃপক্ষ মনে করলেন তিলকের রচনাই এই হত্যাকাণ্ডকে প্রণোদিত করেছিল। তিলক কারারুদ্ধ হলেন।

সখারামের চিন্তাপথ তিলকের পথকেই অনুসরণ করেছিল। তিলকের মতোই তিনি ধর্মশাস্ত্র আলোচনা করতে করতে বর্তমান ভারতে তার উপযোগিতা চিন্তা করেছিলেন। ধর্মের বন্ধনেই ভারতচিত্তকে বাঁধতে হবে। নতুন জাতীয়তা ধর্মকে আশ্রয় করেই গঠিত হবে। ধর্মবিচ্ছিন্ন দেশাত্মবোধের চিন্তা তখনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশে এই দেশাত্মবোধের পটভূমি রচনা করেছিলেন বঙ্কিমচন্দ্র। আনন্দমঠে বঙ্কিমচন্দ্র যে ত্যাগব্রতী দেশসাধকদের কল্পনা করেছিলেন, তারা সন্ন্যাসী, দেশ এবং ঈশ্বর তাদের কাছে প্রায় সমার্থক।

সখারামের দেশকল্পনার পরিচয় পাই ‘শিবাজীর দীক্ষা’য়

ভারতবর্ষের ইতিহাস আলোচনা করিলে দেখা যায় যে এদেশে ধর্ম্ম ভিন্ন কখন কোন জাতির বা কোন সাহিত্যের সর্ব্বাঙ্গীণ উন্নতি সাধিত হয় নাই। শিখজাতির উন্নতির সহিত গুরু নানকের প্রচারিত ধর্ম্মের ঘনিষ্ঠ সকলেই স্বীকার করিয়া থাকেন। প্রাণনাথ নামক জনৈক মহাপুরুষ বুন্দেলখণ্ডে যে নবধর্ম্মভাবের প্রবর্ত্তন করেন তাহারই ফলে বুন্দেলা জাতি মোগল শাসনের উচ্ছেদ সাধনে সমর্থ হয়। মুসলমান আমলে রাজপুতনায়, পঞ্জাব ও বুন্দেলখণ্ডের ন্যায় নবধর্ম্মের উদ্দীপনা ও মূর্ত্তি পরিপ্লাবন সংঘটিত হয় নাই বলিয়া সেখানে আমরা হিন্দু শক্তির বিজয়িনী মূর্ত্তি দেখিতে পাই নাই। …

যে সকল কারণের সমবায়ে মহারাষ্ট্রীয়গণ অল্পদিনের মধ্যে সমগ্র ভারতব্যাপী হিন্দু সাম্রাজ্য স্থাপনে সমর্থ হইয়াছিলেন মহারাষ্ট্র দেশে ধর্ম্মসংস্কার ও ধর্ম্মভাবের উদ্দীপনা তাহাদিগের মধ্যে প্রধান। মহারাষ্ট্রীয় জাতির অভ্যুদয়ের ইতিহাস তাহাদিগের দেশের ধর্ম্মশিক্ষক ভক্ত কবিগণের জীবনের কার্য্যাবলীর সহিত ঘনিষ্ঠ ভাবে সংশ্লিষ্ট। মহারাজ শিবাজীর জীবনীর সেহিত ঐ সকল সাধু পুরুষের সম্পর্ক অধিকতর ঘনিষ্ঠ। … রামদাস স্বামীর নিকট মহাত্মা শিবাজী ও তাঁহার অনুগামী মহারাষ্ট্র সমাজ যে অপূর্ব্ব দীক্ষা লাভ করিয়াছিল, তাহারই ফলে মুসলমান-প্লাবিত ভারতে হিন্দুশক্তির প্রাধান্য প্রতিষ্ঠিত হয়। হিন্দুশক্তির এই প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বিধর্স্মীর চক্ষে অরাজকতার ইতিহাস রূপে প্রতিভাত হইতে পারে। কিন্তু হিন্দুর চক্ষে এই ইতিহাস তাঁহাদিগের গৌরবকাহিনীতে পরিপূর্ণ।’ ৪

ধর্মের সাহায্যে জাতিগঠন-কল্পনা রবীন্দ্রনাথেরও ছিল। সম্ভবত তিলকের শিবাজী-উৎসব অনুষ্ঠানের উদ্দীপনাতেই তিনি ‘প্রতিনিধি’ (১৮৯৭) কবিতাটি রচনা করেছিলেন। যে-রাজ্য শিবাজী গুরুকে দান করেছিলেন, গুরু শিষ্যকে সেই রাজ্যই শাসন করতে আদেশ দিলেন অন্ধ কর্তৃত্বে নয়, ঈশ্বরের প্রতিনিধিরূপে মাত্র। শিবাজী ঈশ্বরের রাজ্যকে অপ্রমত্ত চিত্তে শাসন করবেন ধর্মেরই সেবকরূপে

গুরু কহে তবে শোন করিলি কঠিন পণ

অনুরূপ নিতে হবে ভার

এই আমি দিন কয়ে মোর নামে মোর হয়ে

রাজ্য তুমি লহো পুনর্বার।

তোমারে করিল বিধি ভিক্ষুকের প্রতিনিধি

রাজ্যেশ্বর দীন উদাসীন।

পালিবে সে রাজধর্ম জেনো তাহা মোর কর্ম

রাজ্য লয়ে রবে রাজ্যহীন।

শিবাজীর এই রাজ-আদর্শ আকৃষ্ট করেছিল সখারামকে, মুগ্ধ করেছিল রবীন্দ্রনাথকে। এই সমধর্মিতাতে সখারাম এবং রবীন্দ্রনাথ পরস্পরের নিকটে এলেন। ১৯০২ সালে বাংলাদেশেও মহারাষ্ট্রের এই উৎসব পালিত হল। সখারামই ছিলেন তার প্রধান উদ্যোক্তা। কয়েকবারের শিবাজী-উৎসব উপলক্ষে সখারাম শিবাজীর মহত্ব (১৯০৩), শিবাজীর দীক্ষা (১৯০৪) এবং শিবাজী (১৯০৬) নামে তিনটি পুস্তিকা রচনা করেন। তিনটিই বিনামূল্যে বিতরিত হয়েছিল। দ্বিতীয়টিতে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘শিবাজী-উৎসব’ এবং প্রেমতোষ বসুর একটি কবিতা যুক্ত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথের এই কবিতার মধ্যেও সেই বিশ্বাসই ধ্বনিত

এক ধর্মরাজ্য হবে এ ভারতে এ মহাবচন

করিব সম্বল।

ধর্মের নির্দেশেই রাজ্য গড়তে হবে। জনচিত্তকে উদ্বুদ্ধ করতে ধর্মের চেয়ে মহত্তর অনুপ্রেরণা ও শক্তি আর কিছুই নেই। রবীন্দ্রনাথ গদ্যরচনাতেও বলেছেন

আমাদের দেশে মোগল শাসনকালে শিবাজীকে আশ্রয় করিয়া যখন রাষ্ট্রচেষ্টা মাথা তুলিয়াছিল, তখন সে-চেষ্টা ধর্মকে লক্ষ্য করিতে ভুলে নাই। শিবাজীর গুরু রামদাস এই চেষ্টার প্রধান অবলম্বন ছিলেন।৫

শরৎকুমার রায়ের শিবাজী ও মরাঠা জাতি গ্রন্থের (১৯০৮) ভূমিকাতেও রবীন্দ্রনাথ একই কথা বলেছিলেন। এ বিষয়ে সখারাম ও রবীন্দ্রনাথ ছিলেন একমত।

ধর্ম ও জাতীয়তার মিশ্রণকে অনেকেই অনুকূলচিত্তে গ্রহণ করতে পারেননি। এই মিশ্রণের বিপদ এই যে ভিন্ন ধর্ম যারা আচরণ করে, এই জাতীয়তার আদর্শ তাদের চিত্তে সাড়া জাগাতে পারে না। ফলে হিন্দুধর্মাশ্রিত জাতীয় চেতনা ভারতবর্ষের এক বৃহৎ অংশকেই অবহেলা করতে চায়। অবশ্য এর উদার ব্যাখ্যাও আছে। তবু অনুভূতি যুক্তিতে নিরস্ত হবার নয়। ১৯০৬-এর শিবাজী-উৎসবে অনুষ্ঠিত ভবানী পূজায় তিলক কলকাতায় এসেছিলেন। কিন্তু রবীন্দ্রনাথ তাতে যোগ দেননি। কিন্তু তাই বলে শিবাজী-উৎসব পালন করতে তিনি কোনো বাধা অনুভব করেননি। কারণ যে-ধর্ম জাতীয় সংহতি গড়ে তোলে সে-ধর্ম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের ধারণা কিছু বিশিষ্ট। রবীন্দ্রনাথের সেকালীন গদ্যরচনা যিনি মনোযোগের সঙ্গে পড়েছেন তিনি সহজেই উপলব্ধি করবেন, আমাদের সকল কর্মপ্রচেষ্টাতেই তিনি ধর্ম রক্ষা করে চলতে উপদেশ দিয়েছেন, সে-ধর্ম কোনও সাম্প্রায়িক, পৌরাণিক বা ঔপনিষদিক ধর্ম নয়; সে-ধর্ম মানবনীতির ধর্ম। আমরা যখনই কোনও সংকট সমাধানের চেষ্টা করব তখন আমরা যেন শুধু আশু প্রয়োজনকেই বড়ো করে না দেখি। সকল সমস্যার মূল চরিত্রশুদ্ধি। আমাদের বুদ্ধি যদি হয় দুর্বুদ্ধি, চরিত্র যদি হয় সংকীর্ণ তবে কোনও সমস্যারই স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। রবীন্দ্রনাথের মতে তারই নাম ধর্ম। মারাঠা রাজ্য স্থায়ী কেন হল না, তার কারণ বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বললেন

একদিন সেই ধর্মসাধনা স্বার্থসাধনে বিকৃত হইয়া গেল। তখন সমস্ত দেশের শক্তি আর একত্র মিলিতে পারিল না, তখন পরস্পর অবিশ্বাস ঈর্ষা বিশ্বাসঘাতকতা বটগাছের শিকড়জালের মত মারাঠা প্রতাপের বিশাল হর্ম্যকে ভিত্তিতে ভিত্তিতে দীর্ণ বিদীর্ণ করিয়া দিল। ধর্ম সমস্ত জাতিকে এক করিয়াছিল এবং স্বার্থই তাহাকে বিশ্লিষ্ট করিয়া দিয়াছে- ইহাই মারাঠা অভূ*্যত্থান ও পতনের ইতিহাস।

সাম্প্রদায়িক সমস্যা, সামাজিক সংস্কার, এমনকি ইংরেজের সঙ্গে বিরোধের সময়ও রবীন্দ্রনাথ এই ধর্মাচরণের অনুকূলে বারবার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছিলেন।

সখারাম যে-সময়ে লেখকরূপে দেখা দিয়েছেন, সে সময়টায় রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ প্রখর হয়ে উঠেছে, ইংরেজ ও ভারতবাসীর সম্পর্কও এক শতাব্দী পর নতুন দিকে মোড় ফিরেছে। ইংরেজ জাতি আমাদের কাছে তো শুধু রাজার জাতি ছিল না, সে ছিল জঙ্গম শক্তির প্রতীক, জাতীয় জড়তা ঘোচাবার মন্ত্রদাতা। ভারতীয় সমাজের বিভিন্ন বিকাশের সহায়ক শক্তিরূপেই আমরা ইংরেজকে গ্রহণ করেছিলাম। কিন্তু আমাদের সেই বিশ্বাসের ভাণ্ডার ক্রমে ক্রমে নিঃস্ব হয়ে এল সেই শতাব্দীর শেষে। অবিশ্বাস রূপ নিল তীব্র রাজনৈতিক উদ্যোগ আয়োজনে। জাতীয় মহাসভার ধীরগতি কর্মসূচি মনঃপূত হয়নি অনেকেরই। মহারাষ্ট্রে তিলক এবং বাংলাদেশে সন্ত্রাসবাদী যুবসংগঠন এক অধীরতার আবহাওয়া সৃষ্টি করে তুললেন। সখারাম গণেশ দেউস্করের দেশের কথা (১৯০৪) রচিত হয়েছিল এই উত্তাল জনচেতনার মুহূর্তে। এই বইতে সখারাম ইংরেজ শাসনের দু’দিক নিয়েই প্রশ্ন তুলেছিলেন, অর্থনৈতিক রাজনৈতিক সার্থকতা এবং নৈতিক সার্থকতা। প্রথম যুগে ইংরেজ জাতির প্রভুত্বের নৈতিক প্রভাবের চিন্তাই হয়েছিল বড়ো, কিন্তু উনিশ শতকের দ্বিতীয় ভাগে ইংরেজ প্রভাবের প্রত্যক্ষ কুফল সম্বন্ধে সচেতনতা দেখা দিল। নৈতিক প্রভাবের সার্থকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠল। ইংরেজ ও ভারতবাসীর সম্পর্কের ক্রমপরিবর্তিত রূপান্তরের সাক্ষ্য আছে মনীষীদের চিন্তায়। আধুনিক বাংলার মননধারার এদিকের আলোচনার গুরুত্ব কম নয়, কারণ এর সঙ্গে জড়িত আছে আমাদের আত্ম-অভিব্যক্তির কাহিনি অন্ধ বিদেশি অনুকরণের স্থলে স্বাধীন চেতনার প্রতিষ্ঠা। প্রায় প্রতি চিন্তাশীল ব্যক্তিরই এই সম্পর্কে মন্তব্য আছে। অতএব এই ইতিহাস সংক্ষেপে অনুসরণ করা অসংগত হবে না, কারণ সখারামের বই এই ইতিহাসেরই ফসল।

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাণিজ্যের ছলনায় এদেশে যখন রাজদণ্ড বিস্তার করে বসল তখন বিদেশি বণিকের শাসন আমাদের কাছে অবমাননাজনক মনে হয়নি। তার ছিল দুটো কারণ। একটা কারণ, এটা যে অপমান এ-বোধ দেখা দেয়নি অন্তত হিন্দুদের কাছে। অর্থাৎ দেশাত্মবোধের তখনই জন্মই হয়নি। দ্বিতীয় কারণ, ইংরেজ শাসনে আমাদের দেশীয় সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা প্রকট হয়ে উঠেছিল, সেই জন্যই উন্নততর জাতির সান্নিধ্য এবং প্রভাব সুফলদায়ক বলেই মনে হয়েছিল। ভারতবর্ষের ইতিহাসের নতুন অধ্যায়ের সূচনায় দেখা দিলেন রামমোহন। অসাধারণ তেজস্বী পুরুষ তিনি, অসামান্য ধীশক্তি এবং অপরিমেয় কর্মপ্রেরণা তাঁর। তবু তিনি ইংরেজের অধীনতাকে বাঞ্ছনীয় মনে করেছিলেন। একটি প্রবন্ধে তিনি বলেন

…for having unexpectedly delivered this country from the long continued tyranny of its former rulers and placed it under the Government of the English, a nation who not only are blessed with the enjoyment of civil and political liberty, but also interest themselves in promoting liberty and religious subjects among those nations to which that influence extends.

এই বহুবিধ সুফল উনিশ শতকের বাঙালিদের চিন্তাকে দীর্ঘকাল আচ্ছন্ন করেছিল। শিক্ষার নবতর পদ্ধতিতে, উন্নততর নীতিবোধে সর্বভারতীয় সংহতি-সাধনে, সমাজ ও ধর্ম সংস্কারের সহায়তায় ইংরেজ শাসন আমাদের খণ্ড ও বিচ্ছিন্ন জাতিকে প্রবুদ্ধ করেছে। ধর্ম ও সামাজিক সংস্কারের দ্বারা একদিন রাষ্ট্রনৈতিক উদ্দেশ্য সাধিত হবে-রামমোহনের এই বিশ্বাসের মধ্যে নিহিত ছিল সূদুর ভবিষ্যতের একটি পরম আকাঙ্ক্ষিত স্বপ্ন। পাশ্চাত্য সভ্যতার অন্তর্নিহিত মানবিকতা, যার ধারক সেদিন ছিল ইংরেজ শাসন, ভারতীয় জাতিগঠনে প্রেরণা স্বরূপ কাজ করেছিল।

নব্যবঙ্গের ইংরেজিপ্রীতি এই বিশ্বাসেরই আতিশয্যপূর্ণ প্রকাশ। তাঁরা নির্বোধ অনুকারক ছিলেন না। কিন্তু তাঁদের বিশ্বাস ছিল ইংরেজের সহযোগিতায়, তাদের দেওয়া মানববিদ্যা দিয়েই দেশের অচল জড়তার স্তূপকে নিরাকৃত করতে হবে। ইংরেজই এ বিষয়ে সহায়ক হবে। তাদের উদ্দেশ্যের সাধুতায় তখনও সন্দেহের কীট প্রবেশ করেনি। শিক্ষালয় স্থাপনে ইংরেজ সহায়তা করেছে, সতীদাহের মতো সামাজিক অন্যায় দূরীকরণে দেশবাসীর ইচ্ছাকে তারা দিয়েছে স্বীকৃতি, নিরপেক্ষ শাসন-বিধান প্রয়োগে দেশীয় জাতি এবং সম্প্রদায় ভেদকে মান্য না করে মানবিক মূল্যকে তারা প্রতিষ্ঠা দিয়েছে। নব্যবঙ্গের কর্মপদ্ধতি নির্দিষ্ট করে দিয়ে জর্জ টমসন বলেছিলেন ইংরেজ শাসনে আস্থা রেখেই তাদের চলতে হবে ৮। আস্থা তাঁরা রেখেছিলেন। ১৮৫৭-র সিপাহি যুদ্ধের সময়ে বাঙালি শিক্ষিত সমাজ তার পরিচয় দিয়েছিলেন। ইংরেজ শাসনের সৌধ যে দেশের মাটিতে গড়ে উঠছে, সে-মাটির থেকে প্রাণরসধারা ক্রমেই নিঃশেষিত হয়ে চলেছে, সেদিকে তখনও মনোযোগ পড়েনি। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন

তখন আমরা স্বজাতির স্বাধীনতার সাধনা আরম্ভ করেছিলুম, কিন্তু অন্তরে অন্তরে ছিল ইংরেজ জাতির ঔদার্যের প্রতি বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস এত গভীর ছিল যে এক সময়ে আমাদের সাধকেরা স্থির করেছিলেন যে এই বিজিত জাতির স্বাধীনতার পথ বিজয়ী জাতির দাক্ষিণ্যের দ্বারাই প্রশস্ত হবে। কেননা এক সময়ে অত্যাচার-প্রপীড়িত জাতির আশ্রয়স্থল ছিল ইংলন্ডে। যারা স্বজাতির সম্মানরক্ষার জন্য প্রাণপণ করেছিল তাদের অকুণ্ঠিত আসন ছিল ইংলন্ডে। মানবমৈত্রীর বিশুদ্ধ পরিচয় দেখেছি ইংরেজ চরিত্রে। তাই আন্তরিক শ্রদ্ধা নিয়ে ইংরেজকে হৃদয়ের উচ্চাসনে বসিয়েছিলেম। তখনো সাম্রাজ্যমদমত্ততায় তাদের স্বভাবের দাক্ষিণ্য কলুষিত হয়নি।৯

ইংরেজ জাতির যে মহত্বের কথা রবীন্দ্রনাথ এখানে উল্লেখ করেছেন তার প্রতি বিশ্বাস বহুদিন পর্যন্ত অক্ষুণ্ণ থাকলেও একটি বিপরীত চিন্তার আভাস ক্রমেই পাওয়া যাচ্ছিল। এই নতুন মনোভাবের কারণ ছিল ক্রমজাগ্রত দেশাত্মবোধ। ইংরেজ শাসনের সঙ্গে সহযোগিতা করেই দেশাত্মবোধ প্রথম দিকে গড়ে উঠেছিল। রঙ্গলালের কাব্যে স্বাধীনতাহীনতার জন্য দুঃখবোধের ইংরেজের কৃপাপ্রার্থনা ছিল, তেমনি ছিল ঈশ্বর গুপ্তের কবিতায়। ইংরেজই আমাদের আত্মনির্ভরশীল হয়ে উঠতে সাহায্য করবে- ইংরেজ চরিত্রের মহত্বে এই বিশ্বাসটুকু ভাঙতে দীর্ঘ সময় লেগেছিল। উইলসন হেয়ার বেথুন বেন্টিঙ্ক মেটকাফ হারডিনজ প্রভৃতি কয়েকজন শাসক যাঁরা এদেশীয় ভাবুক সমাজের সঙ্গে মিশেছিলেন, তাঁদের সান্নিধ্যই ইংরেজ চরিত্রের অন্তর্নিহিত মহত্বে আস্থা জন্মিয়ে দিয়েছিল। ইংরেজ-প্রবর্তিত ন্যায়নীতিও আমাদের মধ্যে মুগ্ধতার সৃষ্টি করেছিল। বঙ্কিমচন্দ্র স্পষ্টতই বলেছিলেন

ইংরেজের জন্য পৃথক বিচারালয় হউক, কিন্তু আইন পৃথক নহে। যেমন একজন দেশীয় লোক ইংরেজ বধ করিলে বধার্হ, ইংরেজ দেশী লোককে বধ করিলে আইন অসুসারে সেইরূপ বধার্হ। কিন্তু ব্রাহ্মণ রাজ্যে শূদ্রহস্তা ব্রাহ্মণের এবং ব্রাহ্মণহস্তা শূদ্রের দণ্ডের কত বৈষম্য; কে বলিবে প্রাচীন ভারতবর্ষ হইতে আধুনিক ভারতবর্ষ নিকৃষ্ট?১০

ইংরেজ-প্রবর্তিত বিধিবিধানের সততাই শিক্ষিত বাঙালির চিত্তে ইংরেজ মহত্বকে আকাঙ্ক্ষিত করে তুলেছিল। কিন্তু সংশয়ের সরীসৃপ একটু একটু করে মাথা তুলতে লাগল। ইংরেজের ন্যায়বিধি চমৎকার কিন্তু তার প্রয়োগ বড়ো সহজ নয়। বঙ্কিমচন্দ্রই ‘বঙ্গদেশের কৃষক’ এবং ‘বাঙ্গালা শাসনের কল’ (১৮৭৪) প্রবন্ধ দুটিতে সে-অসুবিধার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন। যদি ন্যায়বিধি প্রয়োগ করাই না যায় অথবা কঠিন হয়, তবে সে-বিধির সার্থকতা কী? সরকারি শাসনকার্যে অংশভাক হবার সুযোগেও বাঙালির বাধা হচ্ছিল। দেশীয় ব্যক্তিদের জীবনধারার সঙ্গে অপরিচয় যেমন একদিকে শাসকশ্রেণীকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিল, তেমনি এ বিষয়ে দেশীয় ব্যক্তিদের সাহায্যকে কাজে লাগাবার অনিচ্ছাও শাসকদের প্রতি নানা সন্দেহের সৃষ্টি করে তুলছিল।১১ এ-সন্দেহেরও নানা প্রমাণ বঙ্কিমচন্দ্রের রচনাতে ছড়িয়ে আছে। ইংরেজ চরিত্রের প্রতি ব্যঙ্গ তাঁর রচনায় সহজপ্রাপ্য। তিনিই ১৮৭৩ সালে ইংরেজ ও দেশীয় এই দুই সম্প্রদায়ের অসহযোগের উল্লেখ করেছিলেন; কিন্তু অসহযোগের দ্বারাই সুফল অর্জন করতেও বলেছিলেন

ইংরেজের নিকট অপমানগ্রস্ত উপহসিত হইলে যতদূর আমরা তাহাদিগের সমকক্ষ হইবার জন্য যত্ন করিব তাহাদিগের কাছে বাপু বাছা ইত্যাদি আদর পাইলে ততদূর করিব না – কেন না সে গায়ের জ্বালা থাকিবে। বিপক্ষের সঙ্গেই প্রতিযোগিতা ঘটে, স্বপক্ষের সঙ্গে নয়। উন্নত শত্রু উন্নতির উদ্দীপক – উন্নত বন্ধু আলস্যের আশ্রয়। আমাদিগের সৌভাগ্য ক্রমেই ইংরেজের সঙ্গে আমাদিগের জাতিবৈর ঘটিয়াছে।১২

এই জাতিবৈর থেকেই দেশাত্মবোধের সৃষ্টি হল। যে-সময়ে বঙ্কিম এই কথাগুলি লিখেছেন সেই সময়েই বঙ্গদর্শনের পৃষ্ঠায় ভারতবর্ষ ও বাংলাদেশের ইতিহাস সম্বন্ধে আত্মচেতনামূলক বিশ্লেষণাত্মক ব্যাখ্যা লিখছেন। কমলাকান্তের দপ্তর-এ দেশের মাতৃমূর্তি দেখা দিয়েছে, লোকরহস্যে দেখা দিয়েছে ইংরেজের বৈরীমূর্তি। অবশেষে ধর্মতত্বে বঙ্কিম বুঝিয়েই বললেন ইংরেজের থেকে কতটুকু নিতে হবে, কোথায় তার শ্রেষ্ঠত্ব, আর দেশের ভাণ্ডারেই বা লুকিয়ে আছে কোন ঐশ্বর্য। কমলাকান্তের থেকে আনন্দমঠে দেশাত্মবোধ হল তীব্রতর। ইংরেজ চরিত্রের মহত্ব বঙ্কিমের চোখে যেন নিষ্প্রভ হয়ে এল, মুখ্য হয়ে উঠল দেশ ও জাতীয় চরিত্রের পরিণাম-ভাবনা। বিভিন্ন প্রসঙ্গে বঙ্কিমচন্দ্র আমাদের আধুনিক সভ্যতার ব্যর্থ পরিহাসের উল্লেখ করেছেন। আধুনিক সভ্যতার আলোক থেকে বঞ্চিত রামা কৈবর্ত, হাসিম শেখ, পরাণ মণ্ডল, রামধন পোদদের ভাবনা বঙ্কিমচন্দ্রকে অধিকার করল। এই বিভেদের জন্য দায়ী ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষাপদ্ধতি আর উদ্দেশ্য ছিল ‘বাবু’-শ্রেণী তৈরি করা এবং জনসমাজ থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে নিয়ে আসা।

ইংরেজ কী কৌশলে ভারতবাসীর জীবনধারা শোষণ করছিল রমেশচন্দ্র দত্ত তার জ্বলন্ত বর্ণনা দেবার আগে আর-একজন ঋষিকল্প ব্যক্তি ধীর গম্ভীরভাবে এই সর্বনাশের দিকে আমাদের দৃষ্টি ফেরাবার চেষ্টা করেছিলেন। কঠিন নিরপেক্ষতার সঙ্গেই ভূদেব মুখোপাধ্যায় নতুন সভ্যতার সুফল-কুফল বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন। দশটি সূত্রে তিনি তাঁর এই আলোচনাকে সংহত করে দেখিয়েছিলেন। তার ষষ্ঠ ও সপ্তম সূত্র যথাক্রমে এই

শুল্ক বা বাণিজ্যকর আদায় সম্বন্ধে বৈদেশিক ভাব এই যে যাহাতে ইংরাজী শিল্পজাত ভারতে বিক্রীত হয় তদনুকূল ব্যবস্থা প্রণয়ন হওয়াতে দেশীয় শিল্পের বিলোপসাধন ক্রমেই বৃদ্ধি পাইতেছে।

স্বায়ত্তশাসন প্রদত্ত হইয়াছে। কিন্তু শাসন ক্ষমতা প্রায় সমুদায়ই ইংরাজ কর্ম্মচারীর হস্তগত।১৩

রমেশচন্দ্র দত্ত এবং সখারাম গণেশ দেউস্কর বহু তথ্য প্রমাণ সহযোগে যে কথা বলেছিলেন, ভূদেবও সংক্ষেপে সেই কথাই বলেছিলেন। পূর্ববর্তীর রচনাতে তখনও কোনও তিক্ততা ফুটে ওঠেনি, রমেশচন্দ্র হয়তো তখনও ভেবেছিলেন রাজকার্যে ভারতীয়দের অধিকতর সুযোগ দিলে এইসব দোষ এড়ানো যাবে। ইংরেজের শাসনযন্ত্রে ভারতীয়রা অধিক সংখ্যায় স্থান গ্রহণ করতে পারলে সেও একরকমের স্বায়ত্তশাসনই হবে। তাতে পীড়ন যেমন কম হবে তেমনি দেশীয় লোকসমাজে আত্মনিয়ন্ত্রণের আত্মপ্রসাদ আসবে। ১৮৯৭ খ্রিস্টাব্দে রমেশচন্দ্র দত্ত England and India নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তাতে ইংরেজ ও ভারতবাসীর সম্পর্কের বর্ধমান বিচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি বলেন

A feeling of unrest is perceptible in India, not of unrest under the British rule, but of unrest under a form of government framed forty years ago and which no longer suits the circumestances of the present day. Indian opinion seeks to be heard, and is not heard ; Indian feeling seeks to be represented and is not represented.১৪

ইংরেজ শাসনের প্রতি যে প্রত্যাশা নিয়ে আমাদের আধুনিক যুগের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ওই শতাব্দীর শেষে সে-প্রত্যাশা ফুরিয়ে এল। ইংরেজের প্রতি আমাদের সন্দিগ্ধতার উল্লেখ করেছেন রমেশচন্দ্র, ভারতবাসীর আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতি অধিকতর মনোযোগ দেবার পরামর্শও দিয়েছিলেন, কিন্তু যে সর্বনাশ ইতিমধ্যেই হয়ে গিয়েছে তার বিবরণ দিয়েছেন রমেশচন্দ্র তার পরের বই The Economic History of India (1901)-তে। কিন্তু ইতিমধ্যেই ইংরেজের প্রতি আমাদের অবিশ্বাসের পাত্র পূর্ণ হয়েছে। যে ইংরেজ ভারতবর্ষ শাসন করছে তার কাছ থেকে আমাদের পাওয়ার আর কিছু নেই। বাহুবলে যে কোটি কোটি লোককে পদানত করে রেখেছে, বাহুবল দিয়ে তার প্রতিকার হবে না। প্রতিকারের একমাত্র উপায় আত্মগঠন, চরিত্রবল-আমাদের স্বভাবকে ক্ষুদ্রতামুক্ত করা। ১৮৯৩ খ্রিস্টাব্দে চৈতন্য লাইব্রেরিতে বঙ্কিমচন্দ্রের সভাপতিত্বে পঠিত রবীন্দ্রনাথের ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ প্রবন্ধে একথাই বলা হয়েছিল। বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পূর্বোক্ত প্রবন্ধে যে সুফল লাভের জন্য ইংরেজ শাসনকে সহ্য করতে বলেছিলেন, রবীন্দ্রনাথের প্রবন্ধে তার কোনও কথা নেই, এমন কী রমেশচন্দ্র শাসনকার্যের দায়িত্ব দিয়ে ভারতবাসীর অবিশ্বাস দূর করার প্রস্তাব করেছিলেন, রবীন্দ্রনাথ সে-চিন্তাও করেননি। তিনি বললেন

সকল দিক পর্যালোচনা করিয়া রাজা প্রজার বিদ্বেষভাব শমিত রাখিবার প্রকৃষ্ট উপায় এই দেখা যাইতেছে ইংরেজ হইতে দূরে থাকিয়া আমাদের নিকট কর্তব্য সকল পালনে একান্ত মনে নিযুক্ত হওয়া। কেবলমাত্র ভিক্ষা করিয়া কখনোই আমাদের মনের যথার্থ সন্তোষ হইবে না। আজ আমরা মনে করিতেছি ইংরেজের নিকট হইতে কতকগুলি অধিকার পাইলেই আমাদের সকল দুঃখ দূর হইবে।… আমাদের অন্তরের শূন্যতা না পুরাইতে পারিলে কিছুতেই আমাদের শান্তি নাই। আমাদের স্বভাবকে সমস্ত ক্ষুদ্রতার বন্ধন হইতে মুক্ত করিতে পারিলে তবেই আমাদের যথার্থ দৈন্য দূর হইবে এবং তখন আমরা তেজের সহিত, সম্মানের সহিত রাজসাক্ষাতে যাতায়াত করিতে পারিব।১৫

এই প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের যে পন্থা নির্দেশ করেছেন, বস্তুত সেটা সমাধানই নয়। তিনি সমস্যার কোনও নির্দিষ্ট সমাধান না দিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন নিজেদের চারিত্রিক দোষক্রটিগুলি সংশোধন করতে। বঙ্কিমচন্দ্র ব্যঙ্গ করে, ভর্ৎসনা করে, সমালোচনা করে বাঙালিকে বলেছিলেন তার চরিত্রধর্মকে গঠন করতে। স্বামী বিবেকানন্দের রচনার মূল বক্তব্য ছিল ত্যাগ বীর্য সেবার দ্বারা চরিত্রগঠন। এজন্য সেকালের সাহিত্যে নীতির প্ররোচনা যেন বেশি বলেই মনে হয় আজ আমাদের কাছে।

ইংরেজ সম্বন্ধে বাঙালির মনোভাব আধুনিক যুগের প্রারম্ভকাল থেকে ধীরে ধীরে কীভাবে পরিবর্তিত হয়েছে, প্রধানত সাহিত্য থেকে তার পরম্পরাগুলি বোঝা যায়। কিন্তু আমাদের বাস্তব ক্ষেত্রে এই পরিবর্ত্যমান মনোভাবের যে কারণ নিহত ছিল, তার জ্বলন্ত তথ্যসমৃদ্ধ ইতিহাস দিয়েছেন রমেশচন্দ্র, ডিগবি, দাদাভাই নৌরোজি প্রভৃতি। সখারাম দেশের কথা-র উপকরণ এঁদের বই থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন। এ ছাড়া নানা রিপোর্ট ও গ্রন্থের প্রভূত সাহায্য নিয়ে সখারাম ইংরেজশাসনের কুফল বর্ণনা করেছিলেন। শুধুমাত্র দেশীয় ঐতিহাসিক ও পণ্ডিতের অভিমত দিয়ে তিনি বই রচনা করেননি। সরকারের পক্ষে বিশেষ অসুবিধাজনক হয়েছিল বিদেশিদেরই স্বীকৃতি। সখারাম গর্ভনর এবং ভাইসরয়দের অর্থপূর্ণ মন্তব্যগুলি উদ্ধৃত করেছিলেন, যার ভিতর দিয়ে ইংরেজের রাজনৈতিক অভিপ্রায় প্রকাশ পেয়েছে। মেকলে লিটন নর্থব্রুক মনরো টাউনসেন্ড কটন প্রভৃতির উক্তিগুলি সখারাম-বর্ণিত দেশের শোচনীয়তাকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। বিদেশি রাজপুরুষেরা ভবিষ্যৎ কালের জন্য স্বজাতির উদ্দেশ্য যে সতর্কতার বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, সেদিন ইংরেজ সে-কথার কর্ণপাত করেনি। সখারাম যখন লিখছেন তখন অবস্থা চরমে পৌঁছে গিয়েছে। রবীন্দ্রনাথের রাজনৈতিক প্রবন্ধগুলিতে ‘ছোটো ইংরেজ’ এবং ‘বড়ো ইংরেজ’-এর শ্রেণীনির্দেশ পাওয় যায়১৬, উনিশ শতকের বাঙালি বড়ো ইংরেজেরই ভরসা করেছিল, কিন্তু দেখা গেল ছোটো ইংরেজ সে-ভরসাকে চূর্ণ করেছে। সখারাম বড়ো ইংরেজের মন্তব্য দিয়ে ছোটো ইংরেজের কুকীর্তিকে উদঘাটিত করেছিলেন।

দেশের কথা রচিত হয়েছিল জাতীয় মহাসমিতির আরব্ধ কাজে সহায়তা করবার উদ্দেশ্যে – এ কথা সখারাম বইয়ের ভূমিকাতেই বলেছেন। ডিগবির The Prosperous British India–A velation from Official Records, (London, 1901), দাদাভাই নৌরোজির ‘Poverty and un-British Rule in India’ (London 1876-1901), রমেশচন্দ্র দত্তের ‘The Economic History of India’ (1901) প্রভৃতি বই সাধারণ পাঠকেরা হয়তো পড়েনি ইংরেজি ভালো করে না জানার জন্যই। দেশের কথা-য় সখারাম তাদের সংগৃহীত তথ্যগুলিই সর্বসাধারণের উপযোগী করে প্রকাশ করেছেন।১৭ ভূমিকায় তিনি স্পষ্টই বলেছেন রাজশক্তির যথেচ্ছাচারের বাধা প্রজার তরফ থেকে আসা উচিত। ‘আমাদের আন্দোলন ভিক্ষুকের আবেদন মাত্র। আমাদিগকে দাতার করুণার উপর একান্তই নির্ভর করিয়া বসিয়া থাকিতে হয়’-সখারামের এই কথাগুলি ইঙ্গিতপূর্ণ। তিনি মডারেটপন্থী ছিলেন না, ছিলেন তিলকপন্থী। বঙ্কিম-কথিত বৃষজাতীয় পলিটিকসের তিনি ছিলেন ভক্ত। সখারাম প্রত্যক্ষ ভাবেই রাজনৈতিক আন্দোলনে সাহায্য করেছিলেন, বিপ্লবীদের ক্লাস নিয়ে। শ্রীঅরবিন্দের নির্দেশে দেশের কথা রচিত বলে শোনা যায়। বইটি নিস্পৃহ ইতিহাস নয়, এর পিছনে সচেতন উদ্দেশ্য ছিল। যুগসঞ্চিত কারণে এই বইয়ের জন্ম। এতে ইংরেজশাসনের অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক কুফলের সঙ্গে নৈতিক অধোগতির বিবরণও ছিল।

বইয়ের শেষ অধ্যায়টি (‘সম্মোহন-চিত্ত-বিজয়’) বিশেষভাবেই প্রণিধানযোগ্য। আমাদের মূল্যবোধের ক্ষেত্রে, ধ্যানধারণা ভালোমন্দ বিচারবোধের ক্ষেত্রে ইংরেজশাসন যে গুরুতর পরিবর্তন এনেছিল, এই অধ্যায়টিতে তার বিস্তৃত আবেগপূর্ণ আলোচনা আছে। এককালে ইংরেজি শিক্ষার মহত্বে মুগ্ধ বাঙালির আজ প্রয়োজন ষাট বছর পরে সেই শিক্ষার ফল বিচার করে দেখা। পাশ্চাত্য শিক্ষার একটি প্রধান ফল ‘বুদ্ধিবৃত্তিকে মোহাভিভূত’ করেও ‘আত্মাভিমান এবং আত্মশক্তির প্রতি বিশ্বাস’ নষ্ট করা।১৮ বিজয়ী জাতির প্রতি সম্ভ্রমে বিজিত জাতি নিজের প্রতি শ্রদ্ধাকে হারিয়েছে; শিক্ষিত-অশিক্ষিতের মধ্যে প্রভেদ বেড়েছে। পরাধীনতার ফলে চিত্তবৃত্তির অবনতি ঘটেছে, পরস্পরে সংশয় ও ঘৃণা বৃদ্ধি পেয়েছে। আমরা স্বার্থপর ও দায়িত্বজ্ঞাশূন্য হয়েছি। ইংরেজশাসনে ভারতবাসী সভ্য হয়েছে, এই মিথ্যা কিংবদন্তির অন্তঃসারশূন্যতা দেখিয়ে সখারাম বলেছেন ‘এই তত্ব ইংরাজী শিক্ষার মোহে আমরা সকল সময়ে উপলব্ধি করিতে না পারিয়া আপনাদিগকে পাশ্চাত্যদিগের অপেক্ষা স্বভাবতঃ হীন বলিয়া মনে করি।’

ইংরেজি শিক্ষার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রসার। সখারাম বলছেন, শাসক কর্তৃপক্ষ বিজ্ঞান প্রচারে নানা প্রতিকূলতাই করেছেন। পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের লক্ষ্যই বা কী? বিশ্বের ঐক্যকে বিশ্লেষণ করে অনৈক্যকে উদঘাটিত করা। পক্ষান্তরে অদ্বৈতবাদের অপ্রতিরোধ্য প্রভাবে ভারতবাসীর লক্ষ্য বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সন্ধান। বিরোধকে গ্রাস করে ঐক্যাভিমুখী করে তোলাই ভারতবর্ষীয় বৈশিষ্ট্য।১৯ সখারাম বিস্তৃতভাবে দেখবার চেষ্টা করেছেন আমাদের দেশেরই দুই প্রধান সম্প্রদায় হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিরোধ সেভাবে কখনওই ছিল না। ইংরেজের ভেদনীতিই বিরোধ সৃষ্টি করেছে। হিন্দু-মুসলমান সম্বন্ধে সখারামের মৈত্রীসূচক দৃষ্টিভঙ্গির মূল্য এবং তাৎপর্য অনেকখানি। তিলকপন্থী সখারামের জাতীয়তাবোধ উদারতাচিহ্নিত। তিনি বলেছেন, ‘হিন্দুধর্মের এই বিরোধগ্রাসিতা বা সামঞ্জস্যসাধনী শক্তির জন্য ইসলামভক্ত মুসলমানও হিন্দুর চিরবিদ্বেষের পাত্র হন নাই।’ এই প্রসঙ্গে তিনি হিতবাদী পত্রিকার একটি মন্তব্য তুলেছেন

মুসলমান শাসনপ্রণালী কষ্টকর ছিল, একথা আমরা স্বীকার করি না। যখন অল্প আয়ে এত অভাব হইত না, দেশের লোকে জাতি ধর্ম্মনির্ব্বিশেষে রাজ সরকারে সর্ব্বোচ্চ পদ পর্য্যন্ত প্রাপ্ত হইত, দেশের টাকা দেশেই থাকিত, একখানা বড়ো ছোরা রাখিতে হইলে ‘পাশ’ লইতে হইত না, এত লোক অনাহারে কষ্ট পাইত না, তখনকার অবস্থা যে বর্ত্তমান অবস্থা অপেক্ষা অধিকতর শোচনীয় ছিল একথা কেমন করিয়া বলিব? হিন্দুরাজ্যে মুসলমান গুণীর আদর ছিল, মুসলমান রাজ্যে হিন্দু গুণবানের উন্নতি হইত। এসকল কথা আমরা ইংরাজের কল্পিত কথায় ভুলিতে পারি না। ২০

মুসলমান রাজত্ব সম্বন্ধে এই পরিবর্তিত মনোভাব নিশ্চয়ই লক্ষ করবার যোগ্য। অবশ্য ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের মতো আচারনিষ্ঠ পূর্বেই এই নতুনতর দৃষ্টিভঙ্গির সূচনা করে গিয়েছিলেন। এক্সট্রিমিস্টদের হিন্দু জাতীয়তাবাদের প্রসঙ্গে সখারাম এবং হিতবাদীর এই চিন্তাধারা নিশ্চয়ই বিশেষভাবে বিবেচ্য। মুসলমানরা নয়, খ্রিস্টানরাই ছিল নিপীড়ন-পারদর্শী, এমন কথা সখারাম বলেছিলেন, সেটা কতটা ইতিহাসসম্মত কতটা দেশাত্মবোধক প্রয়োজনসম্মত বলতে পারি না। রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন ‘মিথ্যাময়ী ইতিবৃত্ত কথা’। সখারাম রবীন্দ্রনাথের ‘ভারতবর্ষের ইতিহাস’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন বিদেশি প্রয়োজনেই ইতিহাস হয়েছে মিথ্যাময়। আমরা যে দেশের সত্যকার ইতিহাস জানতেও পারি না ইংরেজি শিক্ষার বহু কুফলের মধ্যে এটি একটি। নিজেদের সম্বন্ধে এমন অজ্ঞতা সৃষ্টির আয়োজন আর নেই। রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীর ‘সামাজিক ব্যাধি ও তাহার প্রতিকার’ প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে গ্রন্থ সমাপ্ত করতে গিয়ে সখারাম যা বলেছিলেন সেটিই ‘দেশের কথা’র মর্ম

রাজনীতিক উদ্দেশ্যে সৃষ্ট এই মোহের হস্ত হইতে পরিত্রাণ-লাভের পক্ষে স্বদেশপ্রীতিই একমাত্র মহৌষধ। পাশ্চাত্য সংস্রবে আমাদিগের সমাজশরীরে যে বিষ প্রবিষ্ট হইয়াছে, যে জাতীয় ও নৈতিক অধঃপতনের বীজ সর্ব্বত্র উপ্ত হইয়াছে, তাহার অনিষ্টকারিতা দূর করিবার পক্ষে স্বজাতি-প্রেমই একমাত্র উপায়।

দেশের কথা স্বদেশপ্রীতির শিখাকে নভোস্পর্শী করেছিল। সেকালের দেশব্রতী যুবকেরা এই বইখানিকে প্রায় ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা দিয়েছিল। ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে বইটি বাজেয়াপ্ত হল; কিন্তু গান্ধীজির আন্দোলনকাল পর্যন্ত বইটির প্রেরণা ছিল অক্ষুণ্ণ। এতে দেশের যে শোচনীয় সর্বনাশের দিকটি উদঘাটিত, তাতে ইংরেজ-বিদ্বেষ প্রবলতা লাভ করেছিল। সখারাম এই আগুন মহারাষ্ট্রের প্রাচীন ইতিহাস এবং সমকালীন রাজনীতি থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন। বাংলাদেশেও বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন বাঙালি মনকে প্রচণ্ডভাবে নাড়া দিয়েছে। বঙ্গভঙ্গকে ঠিক রাজনৈতিক আন্দোলন যেন বলা যায় না। এ অনেকটা একান্নবর্তী পরিবার ভাঙার সামাজিক ঘটনার মতো। অন্তত রবীন্দ্রনাথ-রামেন্দ্রসুন্দর প্রভৃতি ব্যক্তিগণ একে বাঙালি সৌভ্রাত্র্যের উপর আঘাত বলেই ভেবেছিলেন। তাঁরা যেসব পরিকল্পনা করলেন এই সন্ধিক্ষণে যে সবই হল গঠনমূলক-ইংরেজের মুখাপেক্ষী না থেকে চিন্তায় ও কর্মে নিজেদের সংগঠিত করা। সখারাম বঙ্গভঙ্গের অসন্তোষের মধ্যে দেশপ্রেমের অভিপ্রকাশ দেখলেন, তাতে তিনিও যোগ দিলেন। বাংলাদেশের এই আন্দোলনকে মহারাষ্ট্রের সমাজসংস্কারক দলের মুখপাত্রেরা বিদ্রুপ করেছিল। বয়কট-পন্থাকেও তারা নিন্দা করেছে। তখন সখারামের গুরু তিলক বাঙালির পক্ষসমর্থনে সপ্তাহের পর সপ্তাহ প্রবন্ধ লিখেছেন। একমাত্র তাঁরই চেষ্টায় মহারাষ্ট্রের গ্রামাঞ্চলে বিলাতি পণ্য বর্জন ও পঞ্চায়েত প্রতিষ্ঠা হয়েছে। বন্দেমাতরম-কে মরাঠা যুবকরাও গ্রহণ করে নিয়েছে২১। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলনের মধ্যেই সখারামের বই বেরিয়েছে। এই উত্তেজনায় দেশের কথা ঘৃতাহুতি দিলেও রবীন্দ্রনাথ প্রমুখ জননেতারা আন্দোলনকে যে গঠনমূলক কর্মাপন্থায় চালিত করতে চেয়েছিলেন দেশের কথা-য় তার নির্দেশ ছিল না। এই বইতে আঁকা হয়েছিল একটা প্রচণ্ড শূন্যতার দিক, শতাব্দীব্যাপী ইংরেজ শাসনের ফলে দেশের ভগ্ন দলিত ধ্বংসদশা। দীনেশচন্দ্র সেন এই বই পড়ে লিখেছিলেন

কোন সাধুপুষ্পিত সুন্দর উদ্যান দাবদগ্ধ হইয়া গেলে কিংবা কোন সুদর্শন পরিচিত বন্ধুর হঠাৎ কঙ্কাল দেখিলে মনের যেরূপ অবস্থা হয় বর্ত্তমান চিত্রে অঙ্কিত ভারতীয় শিল্প বাণিজ্যাদির অবস্থা দর্শনে সেইরূপ একটা ভাবের উদয় হইবে অথচ দেউসকর মহাশয় কোন উত্তেজিত বক্তৃতা প্রদান করেন নাই। কতকগুলি সংখ্যাবাচক অঙ্ক এবং সেন্সাস ও স্ট্যাটিসটিক হইতে সমৃদ্ধত কথা নিঃশব্দে একটি মর্মচ্ছেদী দৃশ্য উদঘটান করিয়া দেখাইবে। এই দৃশ্য একটি বিয়োগান্ত নাটকের ন্যায় – প্রভেদ এই যে ইহাতে কাল্পনিক দুঃখের কথা নাই, ইহা আমাদের নিজেদের দুঃখদারিদ্র্য ও মৃত্যুর চিত্র প্রদর্শন করিতেছে।২২

এ দৃশ্য পাঠকের গভীর অসন্তোষ ও ক্ষুদ্ধ বিদ্রোহে তপ্ত করে। সখারাম আমাদের দেশাত্মবোধে আগুন ধরাতে চেয়েছেন। এই উত্তেজনার মুহূর্তে রবীন্দ্রনাথ দাবানলের শিখা থেকে গৃহকোণের দীপটি জ্বালতে পরামর্শ দিলেন

এ কথা যেন মনে না করি, জাতীয় স্বার্থতন্ত্রই মনুষ্যত্বের চরম লাভ। তাহার উপরেও ধর্মকে রক্ষা করিতে হইবে। মনুষ্যত্বের ন্যাশনালত্বের চেয়ে বড়ো বলিয়া জানিতে হইবে। ন্যাশনালত্বের সুবিধার খাতিরে মনুষ্যত্বকে পদে পদে বিকাইয়া দেওয়া, মিথ্যাকে আশ্রয় করা, ছলনাকে আশ্রয় করা, নির্দয়তাকে আশ্রয় করা প্রকৃতপক্ষে ঠকা। সেইরূপ ঠকিতে ঠকিতে অবশেষে একদিন দেখা যাইবে, ন্যাশনালত্ব-যুদ্ধ দেউলে হইবার উপক্রম হইয়াছে।২৩

রবীন্দ্রনাথের এই পরামর্শ ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’-প্রবন্ধে প্রকাশিত আদর্শ থেকে আলাদা ছিল না। কিন্তু তখন দেশে বিপ্লব-আন্দোলন গড়ে উঠেছে। অরবিন্দের মামলা, তিলকের মামলা নিয়ে দেশ উত্তেজিত। সখারামের পরবর্তী বই তিলকের মোকদ্দমা ও সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত (১৩১৫) এই উত্তেজনাকে বাড়াল ছাড়া কমাল না। এতে মোকদ্দমার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ দেওয়া হল। কেশরীর প্রবন্ধগুলি উদ্ধৃত হলে, তার স্বকৃত অনুবাদ দিলেন সখারাম। সংবাদপত্রের সংবাদ, প্রতিদিনের মামলার বিবরণ, তিলকের নিজের বক্তৃতা কিছুই বাদ পড়েনি। তাছাড়া তিলকের দণ্ডের সংবাদে সংবাদপত্র ও বিভিন্ন ব্যক্তির মন্তব্যও সংযোজিত হয়েছে। তিলককে নিয়ে হিতবাদী-র সঙ্গে সখারামের মতভেদ হয়েছিল, হিতবাদীও তিলকের দণ্ডে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছিল। সখারাম এর পূর্বেই হিতবাদী-র কর্ম ত্যাগ করেছিলেন। তিলকের মোকদ্দমা উপলক্ষে সখারাম আর-একবার তীব্র জাতীয়তাবাদের ঢেউ তুলে দিলেন। এই বইটি সেই মুহূর্তে রচিত। ফলে দেশের কথা-র সেই অনিবার্য পরিণতি এল ‘তিলকের মোকদ্দমা ও সংক্ষিপ্ত জীবনচরিতে’র ক্ষেত্রেও। বইটি বাজেয়াপ্ত হল। কিন্তু সখারাম গণেশ দেউস্কর দেশের চিত্তে লাভ করলেন স্থায়ী আসন২৪।

সূ ত্র নি র্দে শ

১ আর্যাবর্ত, ২য় বর্ষ, ৮ম সংখ্যা, অগ্রহায়ণ ১৩১৯।

২ সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায়, বাঙালীর রাষ্ট্রচিন্তা (১৯৬৮) পৃ ২০৪।

৩ The Life of Swami Vivekananda by his Eastern and Western Disciples (1960), p. 644 । এই বই প্রথম প্রকাশিত হয় ১৯১২-তে সখারামের মৃত্যুর বছর।

৪ শিবাজীর দীক্ষা (১৩১১)।

৫ ভারতবর্ষ, ধর্ম্মপদং’ (১৯০৪)।

৬ ‘শিবাজী ও মারাঠা জাতি’, ভূমিকা।

৭ The English Works of Raja Rammohun Roy, Part III. p 105 (Final Appeal to the Christian Public)। সৌরেন্দ্রমোহন গঙ্গোপাধ্যায় প্রণীত বাঙালীর রাষ্ট্রচিন্তা-য় উদধৃত পৃ ৪২। কিশোরীচাঁদ মিত্র ও রামমোহন সম্পর্কে বলেছেন ‘… he cheerfully and gratefully admitted the manifold blessings it conferred on his country and was strogly of opinion that the English were better fitted to govern it than the native themselves.’ —Calcutta Review, 1845।

৮ ভবতোষ দত্ত, চিন্তানায়ক বঙ্কিমচন্দ্র (১৯৬১), পৃ ৯২-৯৩।

৯ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সভ্যতার সঙ্কট।

১০ বঙ্কিমচন্দ্র, ভারতবর্ষের স্বাধীনতা এবং পরাধীনতা (১৮৭৩)।

১১ দ্রষ্টব্য British Paramountcy and Indian Renaissance, vol. IX, Part I (1963), p. 410।

১২ বঙ্কিম-রচনাবলী, বিবিধ, ‘জাতিবৈর’ (১২৮০)।

১৩ সামাজিক প্রবন্ধ (১৮৯২), ইংরাজাধিকার – ইংরাজের বৈদেশিক ভাব।

১৪ জে এন গুপ্ত-প্রণীত Life and Works of Romesh Chunder Dutt (1911) গ্রন্থে উদধৃত। p. 380 ।

১৫ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রাজাপ্রজা, ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ (১৮৯৩)।

১৬ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কালান্তর, ছোটো ও বড়ো (১৯১৭)।

১৭ দেশের কথা-র সূচিটি (১৯০৪ সং) উদধৃত করছি আমাদের দেশ ; ইংরাজ শাসনের দোষ-গুণ; দেশের অবস্থা; মানসিক অবনতি ; কৃষকের সর্ব্বনাশ; রেল ও খাল; বঙ্গীয় শিল্পিকুলের সর্বনাস ; দেশীয় শিল্পের ধ্বংস; দেশের আয়-ব্যয় সম্মোহন-চিত্ত-বিজয়। পরিশিষ্টে বিনিময় ক্ষতি; আদমসুমারির তালিকা; শিক্ষকের তালিকা; ভারতীয় কৃষকের অবস্থা ; দেশীয় রাজ্যের উত্তমর্ণ ; বঙ্গে পাশ্চাত্য বর্গী ; কৃষকের অবস্থা; মিশনারিদিগের কুসংস্কার ; সামরিক ব্যয় ; দেশীয় রাজন্যবৃন্দ ; স্বাধীন হিন্দুরাজ্য নেপাল ; লবণে রাজস্ব ; দেশের আয়-ব্যায়। মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৩৪২।

১৮ বস্তুত ঐতিহাসিকদের মত এই যে, ইংরেজি শিক্ষা পেয়ে বশংবদ কেরানিকুল সৃষ্ট হবে, শাসক-কর্তৃপক্ষের মনে এই অভিসন্ধি থাকলেও আসলে ফল হয়েছিল বিপরীত। জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মুক্ত বুদ্ধির সাধনাকে ইংরেজি শিক্ষাই প্রশস্ত করেছিল। রবীন্দ্রনাথও ‘শিক্ষার মিলন’ প্রভৃতি প্রবন্ধে পাশ্চাত্য শিক্ষার সঙ্গে সহযোগিতা বর্জন করাকেই বলেছিলেন অন্ধতা।

১৯ রবীন্দ্রনাথ ভারতবর্ষের ইতিহাস (১৯০২) প্রবন্ধে এই তত্বের কথা বলেছিলেন।

২০ দেশের কথা, ১৯০৪, পৃ ৩০৩।

২১ সখারাম গণেশ দেউস্কর, ‘তিলকের মোকদ্দমা ও সংক্ষিপ্ত জীবনচরিত’ (১৩১৫), পৃ ৫১।

২২ বঙ্গদর্শন (নবপর্যায়), শ্রাবণ, ১৩১১, পৃ ২১০।

২৩ বঙ্গদর্শন (নবপর্যায়), শ্রাবণ, ১৩১১, পৃ ২১০। প্রবন্ধটি দীনেশচন্দ্র সেনের মন্তব্যসহ রবীন্দ্ররচনাবলি ১০ (বিশ্বভারতী সং) পরিশিষ্টে সংকলিত হয়েছে।

২৪ এই প্রবন্ধের কোনও কোনও তথ্য শ্রীযুক্ত পুলিনবিহারী সেনের আনন্দবাজার পত্রিকা-য় প্রকাশিত (১৭ ডিসেম্বর ১৯৬৯) ‘সখরাম গণেশ দেউস্কর’ প্রবন্ধ থেকে পেয়েছি। সখারামের পূর্ণাঙ্গ গন্থতালিকার জন্য সাহিত্য সাধক চরিত দ্রষ্টব্য।

৭ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা

(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৭৬)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *