কার্ল মার্কস ও অ্যালিয়েনেশন – সতীন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
যোসেফ শুমপিটার এক জায়গায় মহৎ সৃষ্টির লক্ষণ নির্ণয়ের চেষ্টা করেছেন। তাঁর মতে বুদ্ধি অথবা কল্পনার অধিকাংশ সৃষ্টিই কালোত্তীর্ণ নয়। কিছুকাল স্থায়ী হলেও অধিকাংশ সৃষ্টিই মহাকালের দরবারে স্থায়ী আসন লাভ করে না, বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। শুমপিটার পরিহাস করে বলেছেন যে এ-সব সৃষ্টি কতদিন স্থায়ী হবে-ডিনার-শেষের কয়েকটি ঘণ্টা না একযুগ, তা নির্ভর করে এদের গুণাগুণের উপর। এটাই সাধারণ নিয়ম। কিন্তু এমন সৃষ্টিও আছে যারা ক্ষণস্থায়ী নয়। এদের উত্থানপতন আছে-কিন্তু বার বার এদের আবির্ভাব ঘটে নিত্যনবরূপে। আর যখন এই আবির্ভাব ঘটে তখন আমরা তাকে অন্তরঙ্গ হিসাবেই গ্রহণ করি। এই সব সৃষ্টি নিজের বর্ণসুষমা নিয়ে হয়তো বা ক্ষতচিহ্ন নিয়ে স্বকীয় বৈশিষ্ট্যেই প্রকাশ পায়। এবং তখন এদের আমরা ‘বিশেষ বস্তু’ হিসেবে গ্রহণ করি, ধরা ছোঁয়ার মধ্যে যেন পাই, মনে হয় ‘এরা তো আমাদের অপরিচিত নয়।’ শুমপিটার বলেছেন যে এই সব লক্ষণাক্রান্ত সৃষ্টিকে ‘মহৎ’ আখ্যা দেওয়া চলে এবং মার্কসের বাণীও মহৎ-সৃষ্টির মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ। অর্থনীতির ক্ষেত্রে ‘মহাপ্রাজ্ঞ’ ব্যবহারিক রাজনীতির ক্ষেত্রে শ্রেণীসংগ্রামের ‘নাইট’ ইতিহাসের ক্ষেত্রে ‘বস্তুবাদী’ বললেই কার্ল মার্কসের সম্যক পরিচয় দেওয়া হয় না। ব্যক্তিমানুষের সমস্যা, মানবিকবাদী দৃষ্টি তাঁর লেখার অন্তরঙ্গ অঙ্গ। তাঁর সমালোচকরা তাঁর রচনায় একদেশদর্শীতা, অতিসরলীকরণ, বিতণ্ডা-প্রবণতার অভিযোগ এনেছেন; তৎসত্বেও তাঁর লেখা ভিন্ন মতাবলম্বীদের আকর্ষন করার ক্ষমতা রাখে। বিশেষত তাঁর তরুণ বয়সের রচনাবলি একালে অনেকেরই সশ্রদ্ধ দৃষ্টি আকর্ষম করেছে। শ্রমিক আন্দোলনের নেতা, শ্রেণীসংগ্রামের প্রবক্তা কার্ল মার্কস যে কবি এবং দার্শনিক, প্রবুদ্ধ মানবিকতার প্রবক্তা একথা বিস্মৃত হওয়ার উপায় নেই।
কার্ল মার্কস সাম্যবাদকে গ্রহণ করেছিলেন ‘স্বাধীনতা’র স্বার্থে। সাম্যবাদী সমাজের প্রত্যেকটি ব্যক্তিমানুষের অবাধ বিকাশ সম্ভব হবে, মানুষ স্ব-স্বরূপে অধিষ্ঠিত হয়ে সৃষ্টিকর্মে লিপ্ত হবে, এই ছিল মার্কসের বিশ্বাস। নিরাপত্তার প্রয়োজনে কিংবা প্রাচুর্যের জন্য সাম্যবাদী সমাজ কাম্য, কিংবা বলৈষণার স্বার্থে এই সমাজ বরণীয়, এ-বক্তব্য আর যারই হোক মার্কসের নয়। Economic and Philosophic Manuscripts of 1844-এর শেষভাগে এবং German Ideology-তে মার্কস ভাবীকালের সাম্যবাদী সমাজের ছবি এঁকেছেন। সে ছবি কল্পনায় স্নিগ্ধ, সেই ছবিতে কবি মার্কসের পরিচয়ই প্রধান। সাম্যবাদী সমাজের চিত্রটি কেমন? মার্কস বলেছেন এই সমাজ নিপীড়নহীন, স্বাধীন, প্রবুদ্ধ মানুষের স্বতঃপ্রণোদিত সহযোগিতায় গড়ে ওঠা অভিনব সমাজ। এই সমাজে শোষণ নেই, পরবশ্যতা নেই, শ্রমবিভাগের গ্লানি নেই, নেই লোভ ও টাকার দাসত্ব, অর্থগৃধ্নুতা। সমষ্টিতান্ত্রিকতার যুপকাষ্ঠে ব্যক্তিমানুষ এ সমাজে বলিপ্রদত্ত নয়। পূর্ণতার সাধনায়, মানবধর্মের সাধনায় সকলেই এখানে আনন্দযোগে নিযুক্ত। এচিত্র যে শুধু তরুণ মার্কসের চিত্তপটে বিধৃত হয়েছিল তাই নয় ; আজীবন মার্কস কল্পনার স্নিগ্ধ এই চিত্রটিকে সযত্নে লালন করেছিলেন। German Ideology-র বহু বিক্ষিপ্ত অংশে, ১৮৫০-৫৯ এর মধ্যে প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায়, ১৮৭৫-এর Critique of the Gotha Programme-এ এবং Capital-এর তিনখণ্ডের নানা অংশে মার্কসের মানকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় মেলে। অভিজ্ঞ মার্কস জিজ্ঞাসুরা (সমাজতান্ত্রিক দেশেরও) অনেকেই আজ স্বীকার করছেন যে মার্কস যে শুধু অর্থনীতিবিদ, শ্রমিক আন্দোলনের তাত্বিক তাই নন, মার্কস নীতিবিদ ও মানবিক দার্শনিকও বটে। মার্কসের দার্শনিক ও সাহিত্যশিল্পবিষয়ক রচনা পাঠ করলে স্বীকার করতে হয় যে তিনি ইয়োরোপীয় রেনেসাঁসের ও জার্মানির ‘এনলাইটেনমেন্টে’র উত্তরসাধক। জার্মানির ক্লাসিকাল আইডিয়ালিজমের উত্তরাধিকার বহন করেই যে মার্কসীয় সাম্যবাদের বিকাশ, দর্শনের ক্ষেত্রে মার্কস যে প্রবুদ্ধ মানবিকতার সংগ্রামী দার্শনিক এ-সত্যও আজ স্ব-প্রকাশ। স্তালিন আমল পর্যন্ত শোনা গেছে যে মার্কস সামূহিকতার দার্শনিক, ব্যক্তিত্বের শিশিরবিন্দু সমাজরূপী কিংবা রাষ্ট্ররূপী মহসমুদ্রে বিলীন না হলেই নাকি ‘মহতি বিনষ্টি’। স্তালিনোত্তর যুগে মার্কস নবরূপে আবির্ভূত হয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক দেশসহ অনেক দেশের ভাবুকেরাই অধুনা বলছেন ‘মার্কস ব্যক্তিমানুষের দার্শনিক’। এই যুগে মার্কস চর্চার নতুন জোয়ারও এসেছে। জার্মানির ক্লাসিকাল দর্শন থেকে কোন সূত্র অবলম্বন করে মার্কসীয় সাম্যবাদের আবির্ভাব এই প্রশ্নও নতুন করে আলোচিত হচ্ছে। অধুনা অনেক ভাবুক এ-ও বলেছেন যে মার্কবাদের মধ্যমণি ‘বিযুক্তি’ (alienation) তত্ব। এবং এই তত্বের পূর্ণাঙ্গ বিচার না হলে মার্কসবাদ জিজ্ঞাসা অসমাপ্তই থেকে যাবে।
২
বিযুক্তি (alienation) এবং ‘বিচ্ছিন্নতা’ (estrangement) এই দুটি পদ সমাজবিজ্ঞানীরা ও দার্শনিকেরা আজকাল প্রায়শই ব্যবহার করছেন। আধুনিক সমাজে মানুষ বৃন্তচ্যুত। ঈশ্বরে তার বিশ্বাস নেই, প্রকৃতির সঙ্গে যোগাযোগ নেই। সমাজের সঙ্গে সাধারণীকৃতিও তার নেই। সমকালীন ইয়োরোপীয় সাহিত্য, চলচ্চিত্র, শিল্পকলা – সবেরই অন্যতম বিষয় শূন্যতা ও বিচ্ছিন্নতাবোধ, ব্যাপকভাবে বলা চলে (alienation)।
কী সে চায়, মানুষ নিজেই তা জানে না। অথচ ক্ষ্যাপার মতো সে পরশপাথর খুঁজে বেড়াচ্ছে। জীবনবিমুখতা, অস্থিরতা, আত্মিকবোধহীনতা মানুষকে আজ নৈরাশ্যপীড়িত করে তুলেছে। নীটশের ভাষায় মানুষের জগতে ঈশ্বর আজ মৃত। ফলে জগৎ আজ উন্মুক্ত, প্রকাশিত, ভাগবত সুষমা বঞ্চিত। মানুষের আশা-আকাঙ্ক্ষা, আবেগ-অনুভবের দিক থেকে জগত পুরোপুরি নিরপেক্ষ। অনির্বচনীয়তার মায়াঞ্জনমুক্ত জগতের সঙ্গে মানুষ কাজের সম্পর্ক স্থাপন করেছে, প্রকৃতিকে অনাবৃত করে বৈষয়িক সমৃদ্ধির প্রয়োজনে প্রাকৃতিক শক্তিকে ব্যবহারও করেছে। কিন্তু গ্রিক আমলে কিংবা রেনেসাঁসের যুগে প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে আত্মিক যোগ ছিল সেই যোগ আজ ছিন্ন। সব মিলিয়ে মানুষ যেন আজ জগতে পরবাসীর মতো। মানুষ আজ আত্মচ্যুত, বিচ্ছিন্ন, নিঃসঙ্গ, একাকী-self-alienated। Karl Jaspers, Sartre, Merleau Ponty, Begot, Rubel ও অন্যান্য খ্যাতিমান ইয়োরোপীয় ভাবুকেরা মানুষের ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর সমস্যাটিকে মানবজীবনের মূল সমস্যা হিসাবে গ্রহণ করেছেন। স্তালিনোত্তর যুগে সমাজতান্ত্রিক দেশে যখন নতুন জিজ্ঞাসা এবং কিঞ্চিৎ চিত্তমুক্তির সুযোগ দেখা দিয়েছিল তখন সে সব দেশেও দেখা গিয়েছিল ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর সমস্যা নিয়ে মুখর বাদানুবাদ। পোলান্ডের দার্শনিক Adam Schaff তো নতুন আবহাওয়ায় লিখলেন ‘A Philosophy of Man’ বললেন যে এতাবৎকাল মার্কসবাদ কতগুলি প্রত্যয়ের দাসত্ব করেছে, মানুষকে রেখেছে নেপথ্যে, অথচ মার্কসবাদ আসলে ব্যক্তিমানুষেরই দর্শন। এই প্রসঙ্গে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় যে হাংগেরির দার্শনিক Georg Lukacs ১৯২৩ সালে সর্বপ্রথম দেখিয়েছেন যে ‘অ্যালিয়েনেশন’ মার্কসবাদের অন্তরঙ্গ অংশ। ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর মাধ্যমেই মার্কসবাদের সঙ্গে জার্মানির ক্লাসিকাল দর্শনের যোগাযোগ এবং এই তত্বটির সম্যক উপলব্ধি না হলে মার্কসের পুঁজিবাদের সমালোচনার সারমর্ম অনুধাবন করা যায় না। সমাজতন্ত্র সম্পর্কে মার্কসের ধারণা বিশ্লেষণ করতে হলেও ‘অ্যালিয়েনেশন’ তত্বটির বিচার প্রয়োজন। আমাদের এই তাপ পারমাণবিক বৈজ্ঞানিক যুগে এ-বিচার নতুন দাবি নিয়ে আজ উপস্থিত। এ যুগে তাপ-পারমাণবিক প্রলয়ের বিপদ মানুষের মাথার উপর ঝুলছে। যন্ত্রনির্ভর, শিল্পায়িত, গণসমাজে ব্যক্তিমানুষ ক্রমশই যাচ্ছে নেপথ্যে। রাষ্ট্রনায়কতা, পার্টিনায়কতা, সামূহিকতা ও আমলাতন্ত্রের দৌরাত্ম্যে ব্যক্তি মানুষ আজ নিরাকার ব্রহ্মের মতো ক্রমশই হয়ে উঠছে নামগোত্রহীন, মুখাবয়বহীন, গাণিতিক অ্যাবস্ট্র্যাকশন। তাই এই যুগে মানুষের সমস্যা, তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সভ্যতার সম্পদগুলি বাঁচানো ও তাকে সমৃদ্ধ করে তোলার প্রশ্নগুলি এখন বিশেষ গুরুত্ব অর্জন করেছে। এই প্রশ্নগুলি যে সমাজতান্ত্রিক সমাজেও বর্তমান, মানুষের স্বাধিকারলাভের সমস্যা যে ওই সমাজে এখনও প্রকট, সমকালীন ইতিহাসের ছাত্রের সে কথা জানা আছে।
মার্কস তরুণ বয়সে মানুষের স্বাধীনতার সমস্যার মুখোমুখি হন, ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্বটির স্বরূপ ও প্রকারভেদ, অ্যালিয়েনেশনের নিরাকরণ প্রভৃতি বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন। সেই আলোচনা প্রসঙ্গে মার্কস রাজনীতির সমালোচনা, অর্থনীতির সমালোচনা করে আত্মচ্যুতিমুক্ত দ্যুতিময় ব্যক্তিমানুষের চিন্ময় মূর্তিকে তুলে ধরেন। আজও মানুষের সমস্যা, তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে প্রশ্নগুলি কোনো সমাজেই অপ্রাসঙ্গিক নয়, তাতে সন্দেহ নেই।
৩
তরুণ মার্কসের কিছু লেখা সম্প্রতি প্রকাশিত হওয়ায় মার্কসবাদের নতুন মূল্যায়নের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। অবশ্য এই নতুন মূল্যায়ন দুটি বাধার সম্মুখীন। সরকারি মার্কসবাদীরা তরুণ মার্কসের লেখায় শ্রেণীসংগ্রাম ও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিশ্লেষণ কম থাকায় এই সব লেখাকে ‘অর্বাচীন’ আখ্যা দিয়ে হেয় করতে চান। তাঁদের মতে শ্রেণীসংগ্রামতত্ব ও আর্থনীতিক শোষণতত্বই মার্কসবাদের সারাৎসার, ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্ব নয়। অন্যদিকে অনেক ভাবুক ‘অ্যালিয়েনেশন’-কে মার্কসবাদের তত্বচিন্তামণি আখ্যা দিয়ে শোষণতত্ব ও শ্রেণীসংগ্রামতত্তবকে গৌণ মনে করেন। মার্কস-মানসের অখণ্ডতা ও ঐক্য স্বীকার করে এ-কথা বলা চলে যে এই দুই তত্বের মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই। কেননা ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্বেরই বিস্তার শোষণতত্বে এবং শোষণহীন সমাজরূপায়ণের সাধন হিসাবেই শ্রেণীসংগ্রামতত্বের স্বীকৃতি।
তরুণ মার্কস একদিকে যেমন হেগেলীয় দর্শনের প্রভাবাধীন ছিলেন তেমনি ফয়েরবাখের কাছেও তাঁর ঋণ সামান্য নয়। Phenomenology-তে হেগেল মানুষের আবির্ভাব ও বিকাশ সম্পর্কে যে ধারণা তুলে ধরেন সেই ধারণার প্রশংসা করেছেন মার্কস। হেগেল বলেছেন যে ইতিহাসের ধারাপথে মানুষ নিজেকে সৃষ্টি করে চলে, আর এই সৃষ্টির সঞ্চালকশক্তি হল মানুষের শ্রম। অর্থাৎ সমাজবদ্ধ মানুষের কর্মধারা ইতিহাসের সঞ্চালকশক্তি হিসাবে কাজ করে, আর এই ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে মানুষ নিত্যনবরূপে প্রকাশ পায়। মার্কসের ভাষায়
The outstanding thing in Hegel’s phemomenology is that Hegel grasps self-creation of man as a process, regards objectification as…alienation and as transcendence of this alienation ; and that he therefore grasps the nature of Labour and conceives the object man…as the result of his own labour.
হেগেল দর্শন সম্পর্কে শ্রদ্ধান্বিত হয়েও মার্কস বলছেন যে হেগেল ‘শ্রম’কে শুদ্ধ আত্মতত্বের (pure spirit) আত্মচ্যুত অবস্থা হিসাবে ব্যাখ্যা করেছেন। হেগেলের মতে ইতিহাসের প্রবাহে নির্বিশেষ প্রত্যয়েরই (abstract categories) শুধু সংঘাত। ব্যক্তিমানুষ এই প্রত্যয়ের শুধুই ছায়া। হেগেল রাজনৈতিক কিংবা অর্থনীতিক ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর স্বরূপ বুঝেছেন তাঁর নিজস্ব দর্শনের পটভূমিতে। ফলে হেগেল-দর্শনে শুদ্ধচিন্তার লোকোত্তর স্তরেই ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর বিস্তার।
The phenomenology is a concealed, unclear and mystifying criticism, but so far as it grasps the alienation of man…all the elements of criticism are cont5ained in it, and are often presented and worked out in a manner which goes far beyond in Hegel’s own point of view.
‘অ্যালিয়েনেশন’-এর নিবৃত্তি কেমন করে হবে? এই প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রসঙ্গে হেগেল চলে গেছেন বিমূর্ত চিন্তার স্তরে। সামাজিক সংস্থাগুলির (institutions) সঙ্গে অ্যালিয়েনেশনের যে অন্তরঙ্গ যোগ হেগেল তা স্বীকার করেন নি। ফলে হেগেলের দর্শন পরিবার কিংবা সমাজ, রাষ্ট্র এবং অন্যান্য সামাজিক সংস্থাগুলি যে যেমনটি আছে ঠিক সেইভাবেই গৃহীত হয়েছে। হেগেল-দর্শনে পুনর্গঠনের (reconstruction) প্রস্তাব আছে, কিন্তু তার পরিসর কল্পলোকেই সীমিত। মার্কস বলছেন যে অ্যালিয়েনেশন-নিবৃত্তির জন্য বাস্তব পুনর্গঠন চাই। মানুষ যেহেতু বায়ুভুক, নিরালম্ব, নিরাশ্রয় নয় সমাজবদ্ধ জীব, সেজন্য সমাজ রূপান্তর না হলে অ্যালিয়েনেশন-নিবৃত্তির সম্ভাবনা দেখা দেবে না। সমাজের মানবিক পুনর্গঠন হলে তবেই মানুষের স্বকীয় গুণাবলির প্রাপ্য-প্রাপ্তির ক্ষেত্র তৈরি হবে, সৃষ্টি হবে নতুন নৈতিকতার পরিবেশ। ফয়েরবাখের সমালোচনা করে মার্কস বলেছেন যে ফয়েরবাখ শুধু ধর্মীয় চ্যুতি (alienation)-র পর্যালোচনা করেছেন। হেগেল দর্শনে ছিল alienation of Idea- অর্থাৎ ব্রহ্মের উৎসর্জনতত্ব। ফয়েরবাখ নতুন পথ পরিক্রমা করে উপনীত হলেন alienation of man – অর্থাৎ মানুষের আত্মচ্যুতিতত্বে, অবশ্য ধর্মচেতনার পরিমণ্ডলে।
কিন্তু কোন অবস্থায় মানুষ স্বকীয় ক্ষমতা অন্য বস্তুতে আরোপ করে, মনের মাধুরী মিশিয়ে নিজের কামনা বাসনা, আবেগ-আকুতিকে চরিতার্থ করবার মানসে কল্পিত ঈশ্বরতত্বে উপনীত হয়, সেই ‘সামাজিক কারণানুসন্ধান’ ফয়েরবাখের দর্শনে নেই। ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি, দি হোলি ফ্যামিলি (১৮৪৫), দি থিসিস অন ফয়েরবাখ (১৮৪৫) ও জার্মান ইডিওলজি (১৮৪৬) – এই চারটি পুস্তকে মার্কস ইতিহাসের দর্শন ও সমাজবিকাশের এক নতুন তত্ব প্রতিপন্ন করেন সমাজনির্ভর অ্যালিয়েনেশন-প্রত্যয়ের সাহায্যে। হেগেলের কাছ থেকে মার্কস শিখলেন যে মানুষ নিজেকে ও নিজের জগতকে সৃষ্টি করে ব্যবহারিক ঐতিহাসিক কর্মের মাধ্যমে। এই কর্মের প্রভাবে মনুষ্য-প্রকৃতির পরিবর্তন হয়, একই সঙ্গে বহিঃপ্রকৃতিরও রূপান্তর ঘটে।
Since for socialist man the whole of what is called world history is nothing but the creation of man by human labour and the emergence of nature for man, he therefore has the evident and irrefutable proof of his self-creation, of his won origins.
ফয়েরবাখের কাছ থেকে মার্কস শিখলেন যে নৃতত্ব ইতিহাসের চাবিকাঠি। কিন্তু ফয়েরবাখের নিত্য সনাতন মনুষ্যস্বরূপের (human essence) তত্ব মার্কসের মতে ভ্রান্ত। মার্কস বললেন যে মানুষকে দেখতে হবে ইতিহাসের পটভূমিতে। মানুষ নিজেকে কীভাবে সৃষ্টি করবে তা নির্ভর করছে বিভিন্ন শক্তির ঘাত-প্রতিঘাতের উপর। এই শক্তিগুলির মধ্যে একদিকে যেমন রয়েছে ‘মানুষের শক্তি’, অন্যদিকে তেমনি আছে মনুষ্যসৃষ্ট বিভিন্ন সামাজিক সংস্থার সমবায়ে গঠিত পরিবেশ। মার্কস যে সমাজের ‘ক্রিটিক’ হলেন তার হেতু এই যে, মার্কসের মতে সমাজ মানুষের সুপ্ত সম্ভাবনাকে বিকশিত করতে পারেনি। সমাজজীবনেই মানুষ মনুষ্য-নামধেয় জীব হয়ে ওঠে একথা সত্য, তবুও সমাজই আবার মানুষের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে, মানুষকে এমন অবস্থায় বন্দী করে রাখে যা নিতান্তই অমানবিক। ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যে যেহেতু দ্বৈতাদ্বৈতসম্বন্ধ সেই হেতু মানুষের সৃজনশীল ক্ষমতা সমাজ-এর রথচক্রের তলায় নিষ্পিষ্টও হতে পারে।
মার্কস মানুষকে নিষ্ক্রিয় ও নির্গুণ বলে একপাশে সরিয়ে না রেখে মানুষকে বসালেন জগতের কেন্দ্রে, স্বীকার করলেন যে মানুষের শ্রমই জগৎ-ক্রিয়ার মূল শক্তি। ফলে ভাববাদীদের মতো তাঁকে বলতে হল না যে মানুষ কর্মের দ্বারা, সামাজিক শ্রমের দ্বারা বদ্ধ। ‘মানুষের শ্রম’ শুধু তো অর্থনীতির প্রত্যয় নয়, মানুষের অস্তিত্বের সঙ্গে মানুষের সচেতন কর্মধারার সঙ্গে এই শ্রমেরই আত্যান্তক যোগাযোগ। মানুষ যে তার সুপ্ত ক্ষমতা বিকশিত করে বিশ্বানুগ (universal) হয়ে উঠতে পারে সেও এই শ্রমেরই মাধ্যমে। ফলে সামাজিক শ্রম থেকে বিচ্ছিন্ন করে মানুষকে দূরে বসিয়ে তাকে কল্পলোকে খুব একটা বড় পদ দিয়ে তার সঙ্গে সমস্ত সম্বন্ধ পরিত্যাগ করবার দায় অন্তত মার্কসের নেই। সামাজিক শ্রমের মধ্য দিয়েই মানুষ নিত্যনবরূপে প্রকাশ পায়, প্রকৃতির উপর কর্তৃত্বাধিকার লাভ করে, সমাজকে পুনর্গঠিত করে নিজের প্রয়োজন অনুসারে। এই শ্রমের মাধ্যমেই মানুষ মুক্তি লাভ করে, স্বাধীনতার আস্বাদ পায়।
সংবাদপত্রের স্বাধীনতার উপর মন্তব্য করতে গিয়ে মার্কস বলেছেন যে স্বাধীনতা মানুষের স্বরূপলক্ষণ, আগন্তুক ধর্ম নয়
Freedom is so much the essence of man that its very enemies realise it in struggling against its reality. No man fights against freedom ; at most he fights against the freedom of others ।
আর এই স্বাধীনতা হবে খাঁটি যদি তা সর্বজনে প্রসারিত হয়, যদি মানুষ ব্যক্তিসত্তার মুকুরে মানবসত্যকে (potentialities inherent in the species) প্রতিফলিত করতে পারে। দেখা যাবে এই সব বক্ত্যব্যে জার্মানির ক্লাসিকাল ভাববাদী দর্শনের ধারা, অন্যদিকে ফয়েরবাখের নৃতাত্বিক বস্তুবাদী চিন্তাধারা মার্কস-ভাবনায় প্রভাব রেখেছে। অবশ্য জার্মান দর্শনের ভাববস্তুকে মার্কস মর্ত্যের মাটিতে প্রোথিত করেছেন, আর ফয়েরবাখের দর্শনকে বেঁধেছেন ইতিহাসের বাঁধনে।
৪
The Shorter Oxford Dictionary. ‘অ্যালিয়েনেশন’ পদটির অর্থ করেছে ক. the action of estranging or state of estragement ; খ. the action of transferring ownership to another গ. diversion of anything to a different purpose ঘ. the state of being alienated ঙ. loss or derangement of mental faculties ; insanity । ইয়োরোপীয় বিভিন্ন ভাষায় ‘অ্যালিয়েনেশন’ পদটি অপ্রকৃতিস্থ কিংবা উন্মাদ ব্যক্তিকে বোঝাতে ব্যবহৃত হয়েছে দেখা যায়। গত শতাব্দীতে হেগেল ও মার্কস পদটি ব্যবহার করেছেন অন্য অর্থে। আত্মচ্যুত ব্যক্তি হয়তো অপ্রকৃতিস্থ নয়, ব্যবহারিক জীবনে হয়তো সে স্বাভাবিকভাবেই কাজকর্ম করে, কিন্তু নানাভাবে সে উদভ্রান্ত, দিশেহারা। মার্কস ‘অ্যালিয়েনেশন’-কে বোঝাতে গিয়ে বলেছেন যে আত্মচ্যুতি হল মানুষের এমন অবস্থা যখন তার নিজের ক্রিয়াকলাপ অনাত্মীয় শক্তি হয়ে ওঠে। তাকে ছাপিয়ে ওঠে, মানুষের শাসনে না থেকে মানুষকেই গৌণ করে ফেলে। ‘অ্যালিয়েনেশন’ এমন এক অবস্থা
where his own act becomes to him an alien power, standing over and against him, instead of being ruled by him।
এই বিশেষ অর্থে যদিও অধুনা পদটির বহুল ব্যবহার, তবুও ধর্মশাস্ত্রে পদটি বহুদিন ধরেই প্রচলিত। একেশ্বরবাদীরা পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে আপত্তি করেছেন এ জন্য নয় যে ঈশ্বর এক অতএব বহুদেবতাবাদ ভ্রান্ত। তাঁদের আপত্তিটা এইখানে যে পৌত্তলিকতায় মানুষের আত্মচ্যুতি ঘটে, নিজের শক্তি ও শিল্পক্ষমতা প্রয়োগ করে মানুষই দেবমূর্তি গড়ে, অথচ ওই মূর্তির পায়ে মাথা লুটিয়ে দেয় মানুষ ; এ কথা বোঝেন যে মানুষই স্রষ্টা এবং ওই দেবমূর্তি মানুষেরই সৃষ্ট। যেখানেই স্রষ্টা মানুষ, কর্মী মানুষ, ভাবুক মানুষ, নিজের জ্ঞান, বল ও ক্রিয়ার কথা ভুলে নিজেকে দীনহীন বলে ভাবে, নিজেকে বিলিয়ে দেয় দেবতার পায়ে, সে দেবতা লোকোত্তর বা লৌকিক যাই হোক না কেন, নিজের সৃষ্টির উপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে সৃষ্টবস্তুর দাস হয়ে পড়ে, সেখানেই দেখা যায় আত্মচ্যুতির অবস্থা।
মার্কস শ্রেণীবিন্যস্ত সম্পত্তিনির্ভর সমাজে ‘অ্যালিয়েনেশন’ যে সর্বব্যাপী এ সত্যকে বুঝতে পেরেছেন, বিশেষত আধুনিক শিল্পায়িত সমাজে। যাঁরা বলেন যে মার্কসের ‘অ্যালিয়েনেশন’ তত্ব শুধুমাত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থা সম্বন্ধে প্রযোজ্য তাঁরা ইচ্ছে করেই মার্কসবাদকে বিকৃত করেন। কেননা মার্কসের বিশ্বদর্শনে মানুষের সমগ্র ঐতিহাসিক অস্তিত্ব ও ইতিহাস বিধৃত। পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উত্থানপতন, তার অন্তর্লীন নিয়মের বিশ্লেষণে মার্কস জীবনের অধিকাংশ সময় ব্যয় করেছেন একথা সত্য। তার কারণ মার্কস পুঁজিবাদের ফলশ্রুতি প্রত্যক্ষ করেছেন, প্রবাহমান ইতিহাসে পুঁজিবাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বিশ্লেষণ করেছেন। কিন্তু ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্ব শুধু যে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার শোষক ও শোষিতের সম্পর্কের মধ্যে সীমিত নয় Economic and Philosophic Manuscripts ও তরুণ মার্কসের অন্যান্য লেখায় একথা স্পষ্ট। ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্ব আরও অনেক গভীরে প্রবেশ করেছে এবং এই তত্বটির অনুশীলন করে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে সমাজের, মানুষের নিজস্ব স্ববিরোধিতা প্রসঙ্গে মার্কসের বক্তব্য তুলে ধরা সম্ভব। সরকারি মার্কসবাদীরা অধুনা বিপাকে পড়ে ‘অ্যালিয়েনেশন’-তত্বটি বর্জন করতে পারছেন না। তবুও এই তত্বটিকে শুধুমাত্র পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অঙ্গীভূত করে দেখিয়ে তাঁরা মার্কসবাদকে সংকুচিত করে রেখেছেন।
৫
পূর্বেই বলা হয়েছে যে হেগেল ও ফয়েরবাখ ‘অ্যালিয়েনেশন’-এর প্রশ্ন তুলেছেন। একজন ব্রহ্মবাদের অঙ্গ হিসেবে, অপরজন নৃতাত্বিক দর্শনের পটভূমিতে। মার্কস হেগেলের alienation of Idea-কে বর্জন করেছেন। ফয়েরবাখের alienation of man -কে অনেক গভীরে নিয়ে গেছেন।
পশুপক্ষী কীটপতঙ্গ থেকে মানুষের পার্থক্য কোথায়? জীবধর্মের দিক থেকে, আহার নিদ্রা ভয় মৈথুন ইত্যাদি বৈশিষ্ট্যর দিক থেকে বিচার করে শংকরাচার্য তো বলেছিলেন মানুষ পশুর চাইতে খুব একটা আলাদা নয় (পশ্চাদিভিঃ চ অবিশেষাৎ)। মার্কস বলছেন মানুষের বিশেষতা অন্যত্র। ক্রমবিকাশের ধারাপথে কীটপতঙ্গ, পশুপক্ষী প্রকৃতির সঙ্গে নিজেদের খাপ খাওয়াবার চেষ্টা করে, কিন্তু মানুষ চেষ্টা করে প্রকৃতিকে পাল্টাতে। মানুষ ও প্রকৃতির দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও ঐক্যের মধ্য দিয়ে ইতিহাসের সূত্রপাত হয়, শ্রমপ্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতির জগতকে পরিবর্তিত করে। একদিক থেকে মানুষ শ্রমেরই ঐতিহাসিক ফল। সামাজিক উৎপাদনের ধারাপথে মানুষ প্রকৃতিকে নিত্যনবরূপে অভিষিক্ত করে এবং এই কাজে মানুষ সাহায্য পায় স্বকীয় একটি বিশেষ ক্ষমতা থেকে। এই ক্ষমতাটি হল বুদ্ধিবৃত্তি বা চিন্তাশক্তি, যেটি মনুষ্যেতর প্রাণীর নেই। ক্যাপিটাল-এ মার্কস তাই বলেছেন
What distinguishes the worst architect from the best of bees is this, that the architect raises his structure in imagination before he erects it in reality. At the end of every labour process, we get a result that already existed in the imagination of the labourer at its commencement. He not only effects a change of form in the material on which he works, but he also realises a purpose of his own that gives the law to his modus operandi.
মানুষ যে মৌমাছি নয়, কীটপতঙ্গ নয়, অশিক্ষিতপটু জন্তু থেকেও যে মানুষ আলাদা, মানুষের যে স্বকীয় উদ্দেশ্য অনুযায়ী চলবার ক্ষমতা আছে, ‘আছে’-র জগতে থেকে ‘উচিত’-এর, ‘ইষ্ট’-এর জগতের দিকে অগ্রসর হবার প্রেরণা আছে, মার্কস বহু লেখায় এ কথা বলেছেন। প্রয়োজনের তাগিদে মানুষ অবশ্য কাজ করে অনেক সময়, সে কাজ প্রয়োজন মেটাতেই ব্যস্ত। সে-কাজ তাই নেহাৎই একপেশে, সংকীর্ণ। কিন্তু মনুষ্যেতর প্রাণী থেকে মানুষ স্বতন্ত্র এইখানে যে মানুষের ইচ্ছাশক্তি, কল্পনাশক্তি, কর্মশক্তি – যখন বাধামুক্ত হয়ে প্রয়োজনের সীমার বাইরে সৃষ্টি করে তখনই মানবসৃষ্টি সর্বমানবে ও সর্বকালে প্রসারিত হয় (man produces universally)। এই প্রয়োজনাতিরিক্ত সম্পদই মানধর্মের বৈশিষ্ট্য। চেতনার প্রাচুর্য, উদ্দেশ্য অনুযায়ী চলবার ক্ষমতা মানুষের বেলায় অভিব্যক্তির পথ খোঁজে। মানুষ সুন্দরের সাধনা করে, প্রকৃতি ও জীবনকে মনের মাধুরী মিশিয়ে মনোহররূপে সৃষ্টি করে (creates according to the laws of beauty )। শিল্পে ও সাহিত্যে বিশেষ করে প্রকাশ করে তার মানবিক স্বরূপকে, যে স্বরূপ স্রষ্টা এবং সুন্দর। বিষয়কে রূপকলার মাধ্যমে সুন্দর আকৃতি দেয় মানুষ এবং মানুষেরই সৃষ্ট কর্মই শুধু সর্বমানবে এবং সর্বকালে প্রসারিত হয়, মানুষ সেইভাবেই বিশ্বানুগ হয়ে ওঠে। মার্কস এসব কথাই বিশেষ জোর দিয়ে বলেছেন।
To be sure animals also produce. They build nests, dwellings etc. like the bees, beavers, ants and others. But they only produce for their own or their offsprings’ immediate needs; they produce one-sidedly. While man produces universally ; they produce under the domination of immediate physical needs, while man produces independently of physical needs are really produces when free of these needs. They produce only for themselves while man reproduces all nature ; their product belongs directly to their physical body ; while man freely faces his product. Animals create only according to the measure and need of the species while man can produce according to the measure of every species and can everywhere supply the inherent measure of the object. Hence man also creates according to the laws of beauty.
বিষয়-এর তথা সৃষ্টবস্তুর দাস নয় মানুষ, কেননা মানুষ বিষয়কে চেতনাসম্পদের সাহায্যে স্বাধীনভাবে রূপের বাঁধনে আনে (freely faecs his product)-অপ্রয়োজনের ফসল হিসাবে ‘সুন্দর’কে সৃষ্টি করে মানুষ (man creates according to the law of beauty) – এই সব নানা ভাষায়, নানাভাবে স্রষ্টা মানুষের প্রশস্তি গেয়েছেন মার্কস। মানুষ যে সামাজিক জীব, সমাজ-আশ্রয়েই যে মানুষ ‘সামাজিক’ ও ‘মানবিক’ হয়ে ওঠে একথা মার্কস অবশ্যই স্বীকার করেছেন। সমাজবিচ্ছিন্ন মানুষ যে শুধু অ্যাবস্ট্র্যাকশন, সামাজিক সম্পর্কের তন্তুজালে অবস্থিত (ensemble of social relations) মানুষই যে ‘ঐতিহাসিক মানুষ’ এ বক্তব্যও মার্কসের। কিন্তু মার্কসবাদ কখনও একথা বলেনি যে সমগ্রের মহাসমুদ্রে ব্যক্তিত্বের শিশিরবিন্দু শুধুই বুদবুদের মতো, মায়ায় ঘেরা, অযথার্থ। বলেনি যে ‘মানুষ কর্মী’ মৌমাছির মতো সমগ্রের প্রয়োজনে কাজ করা ও প্রজাতিকে (species) বাঁচিয়ে রাখার মধ্যেই যার চরিতার্থতা। মার্কস বরং বলেছেন যে, স্রষ্টা মানুষের কাজ শুধুই প্রয়োজনের শিকলে বাঁধা নয়। মানুষের কাজের বিশেষত ভাবকর্মের আছে সর্বকালীন বিস্তার। প্রয়োজনের সীমা পেরিয়ে সৃষ্টির ক্ষেত্রে মানুষ সুন্দরের সাধনা করে ব্যক্তিজীবনে ও সমাজজীবনে শ্রেয়কে পাবার জন্য সচেষ্ট হয়। মানবাত্মাকে মার্কস বহুতন্ত্রী বীণা হিসেবেই দেখেছেন, আত্মার ভাস্বর সূর্যকিরণ ব্যক্তির ও বস্তুর বিচিত্র প্রকাশধর্মিতায় অভিব্যক্তি লাভ করেছে দেখে উৎফুল্ল হয়েছেন। যখনই দেখেছেন যে নানাভাবে এই বহুতন্ত্রী বীণাকে দীনহীন একতারায় পরিণত করবার চেষ্টার অন্ত নেই, তখনই মসিযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছেন।
৬
মানুষের সঙ্গে মৌমাছির যে পার্থক্য মার্কস করেছেন তার তাৎপর্য কী? মৌমাছিতন্ত্র ও মানবধর্ম যে আলাদা, মানবিক সম্পর্কের ভিত্তি স্থাপিত করতে হলে যে মানুষের উদ্দেশ্যকে, চিন্তাভাবনাকে ও শ্রেয়োবোধকে বুঝতে হবে-এ-কথাই মার্কস বোঝাতে চেয়েছেন। মানুষকে যদি খণ্ডিত করে দেখি, ভাবি যে মানুষ শুধুই টেকনিক্যাল মানুষ, আর্থনীতিক মানুষ, লোভী মানুষ, মানুষকে যদি মানবীয় স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত না করে দেখি তবে, মার্কসের মতে, মানুষের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব পালন করা যাবে না।
মার্কস আত্মচ্যুতি ও আত্মআবিষ্কারের পটভূমিকায় প্রকৃতি, মানুষ ও সমাজের প্রশ্ন তুলেছেন। জীবনচর্চার সকল ক্ষেত্রে মানুষ যে মহিমাময় হয়ে উঠতে পারেনি, আজও জ্ঞানে, কর্মে, স্নেহপ্রেমপ্রীতিতে, সুন্দরের সাধনায় সার্থকতা লাভ করতে সক্ষম হয়নি, আশু প্রয়োজনের বৃত্তে ঘুরে ঘুরেই জীবনপাত করেছে, তার মূল কারণ হিসেবে অ্যালিয়েনেশন-কে চিহ্নিত করেছেন মার্কস। মার্কস দেখেছেন যে, শ্রমবিভক্ত, অর্থলোলুপ, সম্পত্তিকেন্দ্রিক সমাজে মনুষ্যত্ব সীমা ও তুচ্ছতার বাঁধনে পীড়িত ও অবমানিত। সৌন্দর্যের প্রকাশ নেই এই সমাজে। সামাজিক কর্মে (সে-কর্ম অর্থনৈতিক উৎপাদন হোক, কিংবা সাংস্কৃতিক সৃষ্টিই হোক) আজ যদিও বিশ্বানুগ হয়ে ওঠার বাস্তব সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে তবু এই সম্পত্তিনির্ভর সমাজে দেহে দেহে জীব স্বতন্ত্র, অহংমাভিমান, মালিকানা প্রভৃতির প্রভাবে জীব ব্যক্তিসীমায় সীমিত। মানবজীবনের প্রকাশধর্মিতার আসল রূপ প্রয়োজনাতীত প্রেম ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে। কিন্তু সমাজে সে-রূপ নেই। আধুনিক সমাজে পুঁজি মহারাজ (My Lord Capital) লোভের মোহে বাঁধা। আর শ্রমজীবী সাধারণ শ্রমবিভাগ ও শোষণের শিকলে বাঁধা। এই অসুন্দর যন্ত্রপুরীর বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করেছেন মার্কস আবেগমুখর ভাষায়
Private property has made us so stupid and onesided that an object is only ours when we have it, when it exists for us as capital or when we possess it dirtectly, eat it, drink it, wear it out on our body, live in it, in short use it…For all the physical and spiritual senses, therefore, the sense of having…has been substituted.
কী দাস সমাজে, কী সামন্ততান্ত্রিক সমাজে, কী পুঁজিবাদী সমাজে, সর্বত্রই মার্কস অ্যালিয়েনেশনের প্রকাশ দেখেছেন। পাণ্ডুলিপি-তে মার্কস সম্পত্তি-নির্ভর, পণ্য উৎপাদনকারী সমাজের বিশ্লেষণ করেছেন গভীর অভিনিবেশের সঙ্গে। এ-সমাজে স্ববিরোধিতা খুবই স্পষ্ট। শ্রমিক যত বৈষয়িক সম্পদ সৃষ্টি করে ততই তার জীবনধারণের গ্লানি বৃদ্ধি পায়। পুঁজিপতিরা যতই প্রতিযোগিতায় নামে ততই বেশিসংখ্যক পুঁজিপতির বরাতে সর্বনাশ নেমে আসে।
The more riches the worker produces the more his production increases in power and scope, the poorer he becomes. The more commodities a worker produces the cheaper a commodity becomes. The devaluation of the world of men proceeds in direct proportion to the exploitation of the world of things. Labour not only produces commodities, but it turns itself and the worker into commodities and does so in proportion to the extent that is produces commodities in general.
মার্কস বলছেন যে এটাই হল অর্থনীতির সারাৎসার। আর আমরা যে অর্থনীতির সঙ্গে পরিচিত সেই অর্থনীতির মৌলিক বস্তুই হল অ্যালিয়েনেশন। অ্যালিয়েনেশন আছে বলেই শ্রমজীবী মানুষ যত বেশি উৎপাদন করে ততই তার নিজের উপভোগের পরিমাণ কমে, যত বেশি সে মূল্যসৃষ্টি করে ততই তার নিজের মূল্যহীনতা প্রকট হয়, তার সৃষ্টবস্তু যত সুন্দর হয়ে ওঠে, ততই সে আকার প্রকারহীন বস্তুতে পরিণত হয়।
The more the worker produces the less he has to consume, the more values he creates, the less value – the less diginity-he himself has ; the better-shaped the product the more misshapen the worker, the more civilised his product, the more barbaric the worker. Thus labour produces wonders for the rich, but strips the worker…It produces culture, but idiocy cretinism for the worker.
শিল্পায়িত যন্ত্রনির্ভর শ্রমবিভক্ত সমাজের কার্য-পরিস্থিতি (work situation) দেখে মার্কস চার প্রকারের অ্যালিয়েনেশনের কথা তুলেছেন ক) ক্রিয়াকাণ্ড থেকে অ্যালিয়েনেশন (alienation from the process of work) ; খ) সৃষ্ট বস্তু হতে অ্যালিয়েনেশন (alienation from the products of work); গ) নিজের মানবিক স্বরূপ থেকে অ্যালিয়েনেশন (alienation of the worker from himself); এবং ঘ) অপর মানুষ থেকে অ্যালিয়েনেশন (alienation of the worker from others )।
মার্কসের বক্তব্য উদ্ধৃত করা যাক
What, then, constitutes the alienation of labour ? Firstly in the fact that labour is external to the worker i.e., it does not belong to his essential being, in fact that he therefore does not affirm himself in his work, but negates himself in it, that he does not feel content, but unhappy in it…His work, therefore, is not voluntary but coerced ; it is forced labour. It is therefore, not the satisfaction of a need but only a means for satisfying needs external to it…The relation of the worker to the product of labour as an alien object exercising power over him. The result therefore is that man (the worker) no longer feels himself acting freely except in his animal functions, eating, drinking and procreating, while in his human functions he feels more and more like an animal. What is animal becomes human and what is human becomes animal. Alienated labour therefore turns the generic being of man, both Nature and the intellectual wealth of his species, into a being alien to him…It alienates his own body from man, it alienates from him both outside him and his intellectual being, his human nature. A direct consequence of the fact that man is alienated from the product of his labour, from his life actrivity from his generic being is the alienation of man from man.
উদ্ধৃতিগুলি শ্রমসংক্রান্ত এবং মার্কস কখনও পুঁজিবাদী ব্যবস্থার উল্লেখ করেননি। কেননা মার্কস অ্যালিয়েনেশনকে ঐতিহাসিক সমাজের সমস্যা হিসাবে দেখেছেন, যদিও তাঁর মতে এই সমস্যা পূর্ণতা লাভ করে পুঁজিবাদী সমাজে। অ্যালিয়েনেশনকে মার্কস এমন সর্বব্যাপী প্রত্যয় হিসাবে দেখেছেন যে তাঁর মতে পুঁজিপতিও অ্যালিয়েনেশনের দায়ভাগ বহন করে শ্রমিকের মতোই। পার্থক্য শুধু এইখানেই যে শ্রমিক অ্যালিয়েনেশন-সঞ্জাত দুঃখের ভারে ভারাক্রান্ত, আর পুঁজিপতি দুঃখ সম্পর্কে সচেতন নয়। পবিত্র পরিবাব-এ মার্কস বলেছেন
The propertied class and the class of the proletariat present the same human self-alienation. But the former class finds in this self-alienation its confirmation and its good, its own power ; it has in it a semblance of human existence. The class of the proletariat feels annihilated in its self-alienation ; its sees in it its own powerlessness and the reality of an inhuman existence.
জার্মান ইডিওলজি-তে মার্কস বলছেন যে অ্যালিয়েনেশনের উৎস শ্রমবিভাগ। শ্রমবিভাগ থেকেই অ্যালিয়েনেশন এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তি উভয়েরই আবির্ভাব। স্থূল কমিউনিজমের সমালোচনা করে মার্কস বলেছেন যে এই মতবাদ ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রত্যয়কে অতিক্রম করে অ্যালিয়েনেশনের তত্বে উত্তীর্ণ হতে পারেনি। ফলে এই মতবাদে বিভ্রম থেকে গেছে। এই মতবাদের যাঁরা সমর্থক তাঁরা ভেবেছেন যে অর্থনীতির স্ববিরোধিতা দূর করবার উপায় শুধু একটি। ব্যক্তিগত সম্পত্তির নিরাকরণ করে সামাজিক সম্পত্তির প্রতিষ্ঠা হলেই ইষ্টলাভ, এই অতিসরলীকৃত সূত্রের প্রভাব এই মতবাদে প্রত্যক্ষ। অথচ মার্কসের মতে অ্যালিয়েনেশনের নিবৃত্তি যদি না ঘটে এবং এই নিবৃত্তির ফলশ্রুতি হিসাবেই শুধু সম্পত্তি প্রত্যয়ের দাসত্ব পবিহার করা যদি না যায়, তবে শ্রম স্বধর্মে সংস্থিত হবে না।
On the one hand communism is so much under the sway of material property, that it wants to destroy everything which cannot be owned by everybody as private property ; on the otherhand, it regards direct physical ownership as the only aim of life and existence. How little this annulment of private property is really an appropriation is in fact proved by the abstract negation of the entire world of culture and civilisation the regression to the unnatural simplicity of the poor and undermanding man who has not only failed to go beyond private property, but has not yet even attuned to it.
মার্কস ভেবেছেন যে প্রকৃত সাম্যবাদে আত্মচ্যুতির সম্পূর্ণ নিবৃত্তি ঘটবে, মানুষ প্রতিষ্ঠিত হবে মানবধর্মে। শ্রমবিভাগ বহাল রইল, মানুষের সত্তা খণ্ডিত হয়ে রইল মুখাবয়বহীন গণসমাজে, রাষ্ট্রনায়কতা, ধর্মনায়কতা, আমলাতন্ত্রের শাসনাধীন হয়ে রইল মানুষ, ব্যক্তির সঙ্গে সমাজের সাযুজ্য সংসাধিত হল না, ব্যক্তিমানুষের সঙ্গে মানবিক মানুষের ব্যবধান স্থায়ী হল, এমন অবস্থায় অ্যালিয়েনেশনের নিরাকরণ হবে কেমন করে? মার্কস মনে করেছেন যে এই শ্রমবিভক্ত, অসুন্দর জগতের যূপকাষ্ঠে মনুষ্যস্বরূপ বলি হয়েছে। মানবিক প্রকৃতিকে আপন করে নিয়ে আনন্দ ও সৌন্দর্যোপলব্ধির পথে আজও মানুষ বিশ্বানুগ হয়ে উঠতে পারেনি। মার্কস ভেবেছেন যে শ্রমবিভাগের ও শোষণের অবসান হলে মানুষ স্বাধিকার পাবে, অধিষ্ঠিত হবে মানবধর্মে। বাহ্যজগতে যে এক অর্থে মানুষেরই জগৎ, মানুষের জ্ঞান, কর্ম ও অনুভবশক্তির পরিসর অনুযায়ী এ-জগৎ তার বিশেষ রূপ ও আকৃতি লাভ করেছে, মার্কস সে-সম্পর্কে অবহিত ছিলেন। অন্যদিকে মার্কস এ-কথাও জানতেন যে মানুষের জ্ঞান কর্ম ও অনুভব শক্তির পরিসর আজও নেহাৎ-ই সংকীর্ণ-বিষয়বুদ্ধি, ক্ষমতালিপ্সা, লোভ ও নানাধরনের শোষণের শৃঙ্খলে বাঁধা। আত্মচ্যুত জীবসত্তা মানবিক জীবনকর্মের মধ্যে দিয়ে (human life activity) মনুষ্যত্বের আদর্শকে যতটা রূপায়িত করতে পারবে, নিজের মানবিক স্বরূপকে (individual social being) আবিষ্কার করে বিশ্বজনীনতার সাধনায় সিদ্ধিলাভ করবে, ততই প্রগতির পথ হবে অবারিত। সেই বিশ্বজনীন পূর্ণতার সাধনাই মানুষের পরম ইষ্ট। মার্কস স্থূল সাম্যবাদকে প্রত্যাখ্যান করে ছিলেন। সামাজিক মালিকানা হলেই নতুন মানবিক সমাজ প্রতিষ্ঠিত হল এই শিশুভোলানো কাহিনিকে গ্রহণ করেননি। পাণ্ডুলিপি-তে সাম্যবাদী সমাজ সম্পর্কে তাই তিনি লিখেছেন যে আত্মচ্যুতির নিরাকরণ চাই, প্রবুদ্ধ ব্যক্তিমানুষের প্রকাশ চাই, নচেৎ কমিউনিজম ব্যর্থ। তিনি চেয়েছেন যে সাম্যবাদ তা মানবিকবাদের সঙ্গে অভিন্ন
Communism as the positive transcendence of private property, as human self-estrangement, and therefore as the real appropriation of the human essence by and for man ; communism therefore as the complete return of man to himself as a social (i.e. human) being – a return become conscious and accomplished within the entire wealth of previous development.
যতদিন শ্রমবিভাগ আছে সম্পত্তি চেতনা আছে, স্রষ্টা মানুষের প্রকাশ নেই, যতদিন ক্ষুদ্র তুচ্ছাতিতুচ্ছ কর্মে মানুষ বাঁধা থাকবে, পরবশ হয়ে থাকবে – হয় শিকারী, নয় ধীবর, নয় গোপালক নয়তো তাত্বিক সমালোচক হিসাবে খণ্ডিতভাবে যতদিন মানুষকে জীবনপাত করতে হবে, বুঝতে হবে মানুষ ততদিন স-স্বরূপে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সাম্যবাদে স্বাভাবিক মানবিকবাদ পূর্ণতালাভ করবে, মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, মানুষের সঙ্গে অন্য মানুষের সংঘাতের পরিসমাপ্তি ঘটবে
This communism is the consummated naturalism = humanism, the consummated humainism = naturalism, it is the genuine resolution of the conflict between man and Nature and between man and man – the true resolution of the strife between existence and true being.
৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা
(কার্লমার্কস ১৯৬৮)
