‘দাস ক্যাপিটাল’ প্রসঙ্গে – অশোক মিত্র
কৌতুক করছি না, এটা সত্যিই আমার আন্তরিক বিশ্বাস আমাদের দুর্ভাগ্য, পৃথিবীর দুর্ভাগ্য যে Das Kapital জর্মন ভাষায় মার্কসকে লিখতে হয়েছিল। জর্মন সংগীত এবং জর্মন ভাষার মধ্যে এক আশ্চর্য বৈষম্য। জর্মন সংগীতে যে উত্থান অবরোহণ আলোড়ন ব্যাপ্তি গাম্ভীর্য লালিত্য, তার তুলনা নেই সংগীত অবলীলায় চপল হচ্ছে, গভীরে প্রবেশ করছে, ফিরে আসছে, কখনও উদাসীনতা, কখনও শান্তি, কখনও ঝড়, কখনও উদ্বেগ, কখনও কান্না, কখনও হিংসা, পরক্ষণেই হয়তো প্রেম-আনন্দ-উচ্ছলতার উপচে-ওঠা ঝলকানি। একসঙ্গে এতগুলি বিভঙ্গ, অথচ জট পাকিয়ে যায় না, এক অনুভাব থেকে অপর অনুভাবে প্রস্থানের পরিসরে কোনও আয়াসের চিহ্ন নেই, মনে হয় না যেন জোর করে চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে, মীড়ের ব্যঞ্জনায় কোনও ফাঁকি নেই, কৃত্রিমতাও নেই।
জর্মন ভাষা অথচ আদপেই তা নয়। অলংকারবহুল এই ভাষা, ব্যাকরণের অনুশাসনে সবদিকে বাঁধা, একমাত্র দুরূহতার দৌত্যই যেন এই ভাষাকে সাজে। তারল্যের কথা ছেড়েই দিলাম, এমনকি সারল্যও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে জর্মনের মধ্যবর্তিতায় পরাহত। ভাষার এমনই জটিলতা, যে-কোনও চিন্তাভাবনাই তত্বকথার কঠিন বর্ম পরে তবে সভাস্থলে উপস্থিত হতে সফল হয়, তা আপাত বিচারে যত সামান্য চিন্তাই হোক না কেন। আমার এই বক্তব্য গর্হিত বলে মনে হতে পারে, গ্যেয়টে-হেগেল-কান্টের সৃষ্টিকে নস্যাৎ করবার স্পর্ধা অক্ষমার্হ এমনতর কথাবার্তাও অবশ্যই শুনতে হতে পারে। এই কবিমনীষীদের আমি অবহেলা করছি না; শুধু বলতে চাইছি, তাঁদেরও দুর্ভাগ্য, জর্মন ভাষার নিগড়ে তাঁদের প্রতিভার প্রকাশকে আবদ্ধ রাখতে হয়েছিল। কারণ যা মহৎ, তা-ও জর্মন ভাষার রুদ্ধশ্বাস গুহায় একটু হাঁপিয়ে ওঠে, অন্য কোনও ভাষার-ফরাসি বা ইংরেজির-ঋজু, মুক্ত পরিবেশে তা সম্ভবত আরও বহুগুণ উজ্জ্বল দীপ্তি নিয়ে উদ্ভাসিত হতে পারত। প্যাঁচানো, ঘোরানো, ঠোঁট জিভ-ক্লান্ত-করা শব্দ অক্ষর চক্রমণে জর্মন ভাষা বোধকে নিস্তেজ করে আনে, খানিক দূরে এগিয়ে প্রায়ই এটা মনে হয়, থাক, এবার থামি।
মার্কসকে আজীবন এই ভাষার বোঝা বইতে হয়েছে। মাতৃভাষার পরিধি পেরিয়ে অন্য বৃত্তে আশ্রয় নেওয়ার মতো ঘটনা কদাচিৎই ঘটে, তাছাড়া মার্কসের ক্ষেত্রে তার কোনও প্রশ্নই ছিল না। অবশ্যই তিনি বহুভাষী ছিলেন, কিন্তু শৈশব থেকে অধ্যয়ন-চিন্তা-অনুশীলনের একমাত্র না হলেও প্রধান বাহন ছিল জর্মন। কান্ট-হেগেলের পাঠ নিয়েছেন এই ভাষায়, ইয়োরোপের নানা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বিন্যাস-বিবর্তনের বিবরণ জেনেছেন এই ভাষার সূত্রে, যুক্তিতর্ক-মীমাংসার প্রকরণের উৎক্ষেপণ কেমন হওয়া উচিত, তা-ও শিখেছেন জর্মন ভাষাশ্রয়ী আদর্শে। এবং নিজের সমস্ত চিন্তাভাবনাদর্শন-ইতিহাসবিচার-সামাজিক অভিজ্ঞান-ধনবিজ্ঞানেরসূত্র প্রকাশ করেছেন জর্মন ভাষায়। Das Kapital-এর মহীরুহ কীর্তি, গোথা কার্যক্রমের আলোচনা, এঙ্গেলস এবং আরও নানা অমুক-তমুককে লেখা চিঠিপত্র কমিউনিস্ট ঘোষণাপত্র, সাংবাদিকতার এলোমেলো পাহাড়, সব-কিছুতেই জর্মন ভাষার হাঁসফাঁস বন্ধন।
মহৎ চিন্তা অবশ্য আধারের বাধার অপেক্ষা রাখে না, তা ফুঁড়ে বেরোয়, জ্যোতিতে উদ্ভাসিত হয়, চারদিক উদ্ভাসিত করে। তাহলেও আমার আক্ষেপ থেকেই যায়। Das Kapital-কে উপলক্ষ করেই বলি, বড়ো কষ্টকর এই বই প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত নিটোল স্থৈর্য এবং অভিনিবেশ নিয়ে পড়ে ওঠা, থেকে থেকে জিরোতে হয়, ভাষার চৌকাঠে হোঁচট খেয়ে থমকে দাঁড়াতে হয়, কী বলা হচ্ছে একপাতা-দেড়পাতা অন্তর-অন্তর ভালো করে ভেবে, সাজিয়ে নিতে হয়। কোনও কোনও জায়গায় মনে হয়, একটু আগে যা বলা হয়েছে তার সঙ্গে বুঝি সমানুকম্পা নেই; যে বিরাট কাঠামো মনে মনে দাঁড় করিয়ে নিয়ে মার্কস ভাষ্য লিখতে বসেছিলেন, ভাষার কর্কশ ভূখণ্ডে দীর্ণ-লাঞ্ছিত হতে হতে তা গুলিয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়। Das Kapital দুরূহ গ্রন্থ আসলে নয়, দুরূহ করে লেখাও নয়, কিন্তু দুরূহ ভাষায় লেখা। অন্যথা আমাদের এত প্রতিহত হয়ে ফিরতে হত না, মার্কস যা বলতে চেয়েছিলেন তা বোঝবার জন্য, এই একশো বছর বাদেও, টীকা থেকে টীকান্তরে প্রব্রজ্যার কোনও প্রয়োজনই থাকত না, এবং এই গ্রন্থের প্রভাব আরও বহুগুণ উজ্জ্বলতা নিয়ে ব্যাপ্তি পেত।
অনুবাদেও তেমন-কিছু সুরাহা হয় না। তথ্যকে আর এক ভাষায় স্বচ্ছন্দে হৃদয়ঙ্গম করে নেওয়া চলে, কিন্তু, যেমন কবিতা আসে না, কল্পনার সূক্ষ্মতর কারুকর্মগুলি ধরা দেয় না, তত্বও তেমনি প্রকাশের অপূর্ণতায় স্থিত থাকে। প্রত্যেক দর্শনেই একটা আন্বীক্ষিক অবয়ব থাকে, ভাষাসূত্রের সঙ্গে তার অঙ্গাঙ্গি সম্পর্ক। আমরা বড়ো জোর তত্বের সারাংশটুকু ছেঁকে নিয়ে অন্য ভাষায় পরিবেশন করতে পারি, কিন্তু মৌলিক ভাষ্যের সেই নিখাদ ভাস্কর্য ভাষান্তরে অধিকাংশ সময়েই অনুপস্থিত। কট্টর মার্কসবাদীরা আমার এই অনার্য, অনার্ষ উক্তিতে কুপিত হবেন, কিন্তু অবয়বের আকর মানতেই হয়, এবং মানতে হয় সবচেয়ে বেশি মার্কসের নিজের রচনাবলির প্রসঙ্গে।
এবংবিধ বাগাড়ম্বর Das Kapital-কে সম্মান জানাবার উপলক্ষ ব্যবহার করে আমি করছি, কারণ আমার সন্দেহ, অনুবাদে এবং অনুবাদের অনুবাদে, বইটির নিহিত ঐশ্বর্য ক্ষুণ্ণ থেকে ক্ষুণ্ণতর হয়েছে, অথচ আদিপাঠে সে-ঐশ্বর্য আহরণ করতে এগোলেও পদ�লনের সম্ভাবনা প্রায় অপ্রতিরোধ্য। এখানেই অবাক হবার পালা। কারণ তা সত্বেও, দেশ থেকে দেশান্তরে, মহাদেশ ছাপিয়ে অন্য মহাদেশ, দশকের পর দশক ধরে, অহরহ, অক্লান্ত অধ্যবসায়ে, পণ্ডিত শ্রমিক নেতা অধ্যাপক কর্মী শিল্পী রাজনীতিক ধনবিজ্ঞানী সমাজতাত্বিক নৃতত্ববিদ সাধারণ গৃহস্থ কবি শিল্পী কৃষক সংখ্যাতত্ববিশারদ ঐতিহাসিক ধর্মনায়ক কাতারে কাতারে জড়ো হয়েছেন, এই বইয়ের ব্যাখ্যায় বিশ্লেষণে উপলব্ধিতে প্রত্যাবর্তন করেছেন, নিজেদের ভাবনার কল্পনার অনুলেপে বইটি থেকে আপাত জ্ঞানাহরণ করে তৃপ্ত-কৃতার্থ বোধ করেছেন। পৃথিবীর ইতিহাসে এ-বই অনন্য।
না, ধর্মগ্রন্থের প্রসঙ্গও প্রক্ষিপ্ত, তুলনা চলে না। Das Kapital-এর পূর্ণতা অখণ্ডতা-ব্যাপ্তি কোনও ধর্মগ্রন্থেই নেই। বেদ উপনিষদে কবিতার গীতলতা আছে, সমাজসংস্থা নিয়ে চিন্তাও আছে, কোন উপলক্ষে গোমাংস ভক্ষণ প্রেয়, সে সম্বন্ধেও হয়তো নির্দেশ পাওয়া যায়; কিন্তু প্রাচীন জ্ঞানের নির্ভর কতদূর আর এগোনো যায়, অনেক কিছুই তো নেই, ধনবিজ্ঞানের এমন কোনও নির্দেশ নেই যা আমরা, ঈষৎ পরিশীলন করে নিয়েও হালের পৃথিবীর সঙ্গে পারম্পর্য-সম্পর্কে স্থাপন করতে পারি, এমন কোনও আন্বীক্ষিক প্রজ্ঞাও নেই যাকে স্থান-কাল থেকে বিমূর্ত করে নিয়ে সমকালীন প্রসঙ্গের বিশ্লেষণে নিযুক্ত করতে পারি। বাইবেল পর্যন্ত, তার বিরাট বিস্তার সত্বেও, তুলনায় সংকীর্ণ লোকগাথা প্রচুর, নানা অধ্যায়ে বিচ্ছুরিত দর্শনকণার অভাব নেই, কিন্তু ইতিহাস কীভাবে এগোয় তার কোনও ইঙ্গিত পাওয়া যায় না। মানুষের সমাজব্যবস্থার বিবর্তনে যে নানা ধরনের সমস্যা প্রতিনিয়ত দেখা দেবে-অর্থনীতির সমস্যা, রাজনীতির জটাজট, গোষ্ঠী ও ব্যক্তির সম্পর্কের অয়নযন্ত্রণা-তাদের মুখোমুখি হতে হলে কোনও স্বয়ম্ভর চিন্তার আশ্রয় প্রয়োজন, একটি অখণ্ড কাঠামোর প্রয়োজন। প্রসিদ্ধ ধর্মগ্রন্থগুলি একটার-পর-আরেকটা নেড়ে-চেড়ে দেখা যেতে পারে, পরিশ্রম পণ্ডশ্রম, এরকম সম্পূর্ণ যুক্তির পৃথিবী কোনওটিতেই নেই; সহস্র ভাষাগত লাঞ্ছনা সত্বেও, Das Kapital-এ অথচ আছে।
এমন বলাও অগ্রাহ্য যে ধর্মগ্রন্থগুলি লেখা হয়েছিল দু’হাজার বছর কিংবা আরও বহু আগে, তাছাড়া তারা ধর্মগ্রন্থই, তাদের ভাষ্যে সমাজতত্ব-ধনবিজ্ঞান-ইতিহাসবিচারের প্রকরণ খুঁজতে যাওয়া মূর্খতা। ধ্রুপদী সংজ্ঞায় যে-যে কীর্তি আমরা চিহ্নিত করি, তাদের কিছু কিছু লক্ষণ মেনে নিয়েই করি, কতিপয় কালাতীত গুণের উপস্থিতি সম্বন্ধে নিশ্চিত হয়ে করি। Das Kapital মাত্র একশো বছর আগে লেখা হয়েছিল বলেই তাতে এই কালজয়ী লক্ষণ আছে, তা আদৌ নয়; আরও একহাজার-দেড়হাজার বছর গেলে সেই লক্ষণ মিলিয়ে যাবে, তা-ও নয়। ইতিহাসের ধারা বিশ্লেষণের একটি বিশেষ প্রকরণ গ্রন্থটিতে দৃষ্টান্তিত, প্রকরণটি অব্যয়; একহাজার অথবা চারহাজার বছর পিছনে চলে গিয়েও প্রকরণটিতে এমনই অন্তর্লীন জাদু, সময়ের এক স্তর থেকে আরেক স্তরে প্রবেশ-প্রস্থানের ব্যাখ্যানও তাতে বিধৃত। কোনও-এক বিশেষ সময়ের সংস্থানে দাঁড়িয়ে অবশ্যই ভবিষ্যৎ মানবসমাজের সহস্রমুখী সমস্যার বিশ্লেষণ সম্ভব নয়, ধর্মগ্রন্থগুলিকে এ-কারণে দুয়ো দিতে যাওয়াও তাই অহেতুক নির্দয়তা, কিন্তু Das Kapital-এ অন্তত আগে থেকে একটা ছক কাটা আছে। কোনও সমস্যাই তাই লজ্জা দেবে না, দর্শন এবং প্রকরণ মেশানো বিশ্লেষণের সূত্র প্রস্তুত, মার্কসীয় প্রজ্ঞায় একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর বিকশিত হবেই।
অবশ্য নাক-সিঁটকোবার মতো লোকের অভাব নেই। বলা হবে, Das Kapital-এ ব্যাপ্তি আছে, গভীরতার মূলে ঢুকে যাওয়া আছে, উদারতম ইতিহাসবোধ আছে, কিন্তু সব-কিছুই বড়ো বেশি সরল, বড়ো বেশি ছেলেভোলানো। বচন-প্রতিবচন-সংশ্লেষণের নিকষ বিন্যাসে কারও কারও ভক্তি নেই, আবার অন্য কারও কারও আপত্তি ভূতচৈতন্যবাদের দর্শনবৃত্তান্তে। কিন্তু বাণী না মেনেও ভক্তি সম্ভব আমার নিজের আদর্শ-বিশ্বাসের সঙ্গে অন্বয় না ঘটলে নিশ্চয়ই পৃথগীকৃত বিবৃতি পেশ করব, অথচ সেই সঙ্গে যদি বুঝতে পারি যে-তত্বের সঙ্গে আমার মিল হচ্ছে না, যে-যুক্তিতে আমার বুদ্ধি সায় দিচ্ছে না, তাতে তথাপি মহত্বের ছাপ আছে, তাহলে সন্নত নমস্কার জানানো আমার কর্তব্য। আসলে হেগেলীয় ঐতিহ্যধারক বিশ্লেষণশৈলী Das Kapital-এর প্রধান কথা নয়; এ শৈলী হাতের কাছে না থাকলে অন্য কোনও প্রকরণের সাহায্যে হয়তো মার্কস তাঁর ইতিহাস-সমাজ-ধনবিজ্ঞানচিন্তার কাঠামো রচনা করতেন, সৃষ্টির কাজে ঠেকে থাকত না। তাছাড়া, সারল্যে আপত্তি তোলাটা অতি দুর্বল যুক্তি। এত কথা বলার পর নতুন করে আরেক দফা স্পষ্ট করে বলা প্রায় হাস্যকর। Das Kapital আর যা-ই হোক সরল গ্রন্থ নয়, দর্শনের মূল সূত্রটি শুধু সরল। অভিজ্ঞান একপেশে নয়, অভিজ্ঞানকে বছরের পর বছর ধরে পরিচর্যা করে নিয়ে যে-মর্মপাঠ হল, তা একপেশে। ধর্মের ঘোষণা, বিশ্বাসের ঘোষণা একপেশে হতে বাধ্য। কিন্তু Das Kapital -এর ক্ষেত্রে অন্তত দরাজ গলায় এটা বলা চলে, বিশ্বাসের প্রকাশ বিজ্ঞানের সূত্র ধরে ঘটেছে। বিজ্ঞান ও বিশ্বাস, আবেগ ও বুদ্ধি, চিন্তা ও অনুকম্পা, পরস্পরের সঙ্গে নিবিড় হয়ে মিশে গেছে। মানবসমাজের সম্পূর্ণ বিবর্তনের ইতিহাস এভাবে এক নিটোল-নিবিড় যুক্তি-শৃঙ্খলার নিগড়ে বন্দী করে আনা ব্রহ্মপ্রতিম কারুকীর্তি।
তাছাড়া, এপিকের ক্ষেত্রে যেমন, Das Kapital-এ চিন্তার অজস্র শাখা-উপশাখা ছড়ানো, তারা প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র, অথচ সেই সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। নিছক প্রতিভার ঝিকিমিকি দিয়েই যদি পরিচয় ঝালিয়ে নিতে হয়, তাহলে প্রত্যেকটি উত্তীর্ণ; অন্যদিকে, যদি এতগুলি চিন্তাকে একটি বৃহৎ সংগতির মধ্যে যুক্ত করাই মহৎ সৃষ্টির পরিচায়ক হয়, তাহলেও কোনও �লন নেই। একসঙ্গে ইতিহাস, ধনবিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান; কিন্তু পাশাপাশি সেই সঙ্গে প্রত্যেকটি আলাদা তত্বের গহনে অণুতত্বের উন্মোচন-বিশ্লেষণ-প্রসাধন। এবং এরকম না হলে Das Kapital মহৎ গ্রন্থ হতে পারত না, কারণ কীর্তির এই উভমুখিতা আসলে মানবসমাজের সংস্থান-বিবর্তনের প্রতিবিম্ব। সমাজ কোনও মুহূর্তেই এক জায়গায় থেমে থমকে দাঁড়িয়ে নেই দুটো আলাদা অর্থেই এক জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই ইতিহাসের নিয়ম মেনে নিয়ে সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, দ্বান্দ্বিকতায় দীর্ণ হচ্ছে, প্রতিমূহূর্তে পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে, ফের সংঘাতে পিষ্ট হচ্ছে, ফের নতুন সত্তার নির্ভরে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই সঙ্গে সমান্তরাল পরিবর্তন ঘটছে সমাজের একেবারে মূলে, যে-মানুষের সমষ্টি নিয়ে আমাদের সমাজ, সেই সমষ্টির গভীরে। সামাজিক মানুষের পারস্পরিক বিনিময়সম্পর্ক বদলে যাচ্ছে, কারণ এখানেও সংঘাত ঘটছে, সংঘাত ঘটছে কারণ সম্পত্তি ও ধনগত চেতনা শ্রেণী-বিভাজনের দায়ভাগভুক্ত, কোনও মানুষই এই শ্রেণীচেতনার আশ্রয়ে বাইরে নিরালম্ব থাকতে পারে না।
দুটো তত্ব পাশাপাশি পা ফেলে সামাজিক গতির তত্ব, পুরুষগতি, প্রকৃতিগতি। এবং এই দুই গতির গহনে আরও অনেক অণুপ্রতিম গতির প্রবাহ, যে-প্রবাহের শেষে কিন্তু সেই বিশাল মোহানা সমাজ, সমাজের ইতিহাসের ছক-কাটা ঢল বেয়ে ভবিষ্যতের সমুদ্রস্রোতের দিকে এগিয়ে চলা। ভূতচৈতন্যবাদে যাঁরা আস্থা রাখেন না, দ্বান্দ্বিক অন্বীক্ষায় যাঁদের অনীহা, ইতিহাস চেতনা যাঁদের কাছে জুজুবুড়ি, তাঁদের কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা জায়গায় এসে জব্দ হতে হয়, Das Kapital-কে প্রত্যক্ষ হোক, পরোক্ষ হোক, কুর্নিশ করতে হয়। অন্যসব-কিছু যদি পাশে সরিয়ে রাখা যায়, মার্কস ভবিষ্যৎদ্রষ্টা ঋষি ছিলেন-মহান দার্শনিক ছিলেন-ঐতিহাসিক চেতনাসম্পৃক্ত ন্যায়রত্ন ছিলেন, এ-সমস্তই যদি ভুলে যাওয়া যায়, তাহলেও যা অবহেলা করা চলে না তা চিন্তার খণ্ডিত জগতেও তাঁর অপরূপ আশ্চর্য কর্মকুশলতা।
একটু বিশদ করে বলি, আমি ক্ষুণ্ণিবৃত্তি করি জ্ঞানের যে-শাখার বেসাতিতে, সেই ধনবিজ্ঞান থেকে একটা উদাহরণ দিয়ে। Das Kapital-এরতাত্বিক কচকচি বাদ দিয়ে দেওয়া হল, সামাজিক বিবর্তনের প্রসঙ্গ নির্বাসনে পাঠানো হল, কোনও সমাজব্যবস্থার আর্থিক কাঠামোতে কী করে চিড় ধরে, কী করে নিহিত বৈপরীত্যের চাপে তা গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে ভেঙে পড়ে, তা-ও খুব ভালো করে উপলব্ধিরশরীর থেকে লেপে মুছে দেওয়া হল, কিন্তু তাহলেও মার্কস পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ধনবিজ্ঞানী থেকেই যাবেন। কারণ অখণ্ড স্থপতি গড়ার প্রয়োজনে অর্থনীতির যে-কটি ছোটখাটো তত্ব তাঁকে উত্থাপন করতে হয়েছিল, তাদের উৎকর্ষের তুলনা নেই প্রকরণের শাখানদী-উপনদী যে-কটি তাঁকে স্রোতস্বিনী করতে হয়েছিল, ধনবিজ্ঞানে তাদের উচ্ছলতা চোখ-বুদ্ধি-মেধা ধাঁধিয়ে দেয়। ধনবিজ্ঞানের স্রেফ ব্যাকরণিক দিক নিয়ে মাথা ঘামাবার মতো সময় মার্কসের ছিল না, স্থাপত্যের যে-আদর্শ তাঁর ধ্যানবস্তু, তার প্রয়োজন মেটাতে নেহাৎ যেটুকু অভিনিবেশ না করলেই নয়, তার বেশি নিজেকে তিনি ধনবিজ্ঞানের প্রাকরণিক অরণ্যে জড়াননি। সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম গণিতের চর্চা তিনি করেননি, একেবারে হালে ধনবিজ্ঞানে গাণিতিক সূত্র বেছে নিয়ে, সিদ্ধান্তের অনুলিপি অহরহ বদলে নিয়ে, যে-ধরনের কালোয়াতি দেখানো হচ্ছে, তা তাঁর কাছে অসহ্য না ঠেকে যেত না। অথচ আধুনিক ধনবিজ্ঞানের মূল্যবান যে-কটি আবিষ্কার ও প্রাকরণিক ঝোঁক Das Kapital-এ সেই একশো বছর আগে তাদের প্রচ্ছন্ন উপস্থিতি। শ্রীযুক্ত শুম্পেটারের উৎসাহের প্রেরণায় এবং শ্রীযুক্ত লিওন্টিয়েফের অধ্যাবসায়ের কল্যাণে অর্থব্যবস্থা বিশ্লেষণের যে-শৈলী বিগত কুড়ি-পঁচিশ বছরে সর্বখ্যাত হয়েছে, Das Kapital-এর দুই শাখামণ্ডিত উৎপাদনসংস্থার বিবরণে তার অঙ্কুর। কোনও স্থিত অর্থব্যবস্থার গতিপথে কেন বন্ধুরতা দেখা দেয়, চক্রায়ত পরিক্রমণ কেন অপ্রতিরোধ্য, একশো বছরের পুরনো এই বইতে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ ব্যাখ্যা। এমনকি মুদ্রাব্যবস্থার উদভ্রান্ত হেঁয়ালি, মুদ্রার সংকোচন-সম্প্রসারণের সামাজিক প্রতিফল, ইত্যাদি নিয়ে Das Kapital-এ যে আলোচনা লিপিবদ্ধ, তার সঙ্গে মতভেদ সম্ভব, কিন্তু বিশ্লেষণের আঁটো পদক্ষেপ চমকিত না করে পারে না।
সব শেষে এক চূড়ান্ত সওয়ালের মুখোমুখি হতে হয়। যুক্তি থাক, প্রাকরণিক চমৎকারিত্ব থাক, বিশ্বাস থাক, দর্শন থাক, গভীর মানবিকবোধ থাক, Das Kapital তাহলেও তাচ্ছিল্যের বস্তু, কারণ ওই গ্রন্থে মার্কস যুক্তি, সাক্ষ্য এবং অন্বীক্ষার সাহায্যে যে-যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তাদের অধিকাংশই ফলেনি, যেখানে যে-বিপ্লব হিসেব কষে বলে দিয়েছিলেন, তা কেঁচে গণ্ডুষ। তাহলে এই বই নিয়ে মাতামাতি-লাফালাফি কেন, সমস্ত দর্শনই যদি অলীক প্রতিপন্ন হয়, তাহলে কী লাভ ইতিহাসবোধে বিস্তৃত-প্রসারিত হয়ে, কী লাভ ভবিষ্যতের রূপকথা রচনায়? কিন্তু এই জিজ্ঞাসারও উত্তর সোজা। মার্কসের বিয়োগ ঘটে ১৮৮৩ খ্রিস্টাব্দে পৃথিবীর চেহারা তারপর এই পঁচাশি-নব্বুই বছরে অনেকটাই বদলে গেছে। অনেক তুলকালাম কাণ্ড ঘটেছে, পৃথিবীর অনেকগুলি দেশ জুড়ে, ঝাঁকে-ঝাঁকে শ্রমিক আন্দোলন, কৃষক আন্দোলন, নিছক জাতীয় স্বাধীনতার আন্দোলন মাথা চাড়া দিয়েছে। লেনিন রুশ দেশে ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে এক জাদু ঘটিয়ে দিলেন, তারপর বাকি পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস ক্ষিপ্রবেগে এগিয়েছে, মাও-ৎসে-তুং-এর নেতৃত্বে চিনে যা ঘটেছে ও ঘটছে তা ইতিহাসকে আরও জোরে সামনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এরই মধ্যে শোষণ যাঁদের রক্তঅস্থিমজ্জাগত, দুটো গোটা মহাযুদ্ধে নিজেদের মধ্যে তাঁরা খাওয়াখাওয়ি করেছেন, ঈষৎ থেমে কিছুটা সামলে নিয়েছেন, কিন্তু ইতিহাস এই দ্বন্দ্বসন্ধি-কাহিনির চোরাগলিতে ঢুকে পড়ে স্বীয় সিদ্ধি আরও একটু এগিয়ে নিয়েছে। অন্যপক্ষে, মার্কস যা-যা ঘটবে মনে করেছিলেন, তার বেশ-কিছু সংঘটিত হয়নি, এই এতগুলি দশক বাদেও পশ্চিম ইওরোপে বিপ্লব পরাহত, উত্তর আমেরিকায় শ্রমিক আন্দোলন নির্জীব-নিবীর্য, এবং বহু দেশের অভ্যন্তরে তথা বাইরে শোষণের ধারা অব্যাহত।
এ সমস্ত কিছুর জন্যই তো, আমার বিবেচনায়, Das Kapital-এর প্রতি বিমুখ হওয়ার পরিবর্তে, আমাদের অভিভূত-সকৃতজ্ঞ হওয়া উচিত। গত আট-ন’দশকে এই পৃথিবীর চেহারা যদি এমন বিস্ময়জনকভাবে বদলে গিয়ে থাকে, তার কারণ ওই একটি গ্রন্থ। Das Kapital লিখিত হয়েছিল বলেই মার্কসের ভবিষ্যদ্বাণী অনেক ক্ষেত্রে ব্যর্থ হয়ে গেছে। Das Kapital-এর মর্মকথায় উদ্বুদ্ধ হয়ে শ্রমিক আন্দোলন ইউরোপ-আমেরিকায় মাথা উঁচিয়ে দাঁড়াল বলেই মার্কসের একটি সূত্রের গ্রন্থি ছিঁড়ে পড়ল, মজুরির হার নীচে ঝুঁকল না, বরঞ্চ বেড়েই চলল, ফলে যে-সংকট উপান্তে ছিল, তা অপসৃয়মান হয়ে হয়ে অবশেষে মিলিয়ে গেল। কিন্তু এই সংঘটনাকে Das Kapital-এর ব্যর্থতা বলে দাবি করার নিহিতার্থ ভাষার উপরে খামখেয়ালি।
সব কথার শেষ কথা, ওই বইটি লেখা না-হলে এশিয়া-আফ্রিকা-লাতিন আমেরিকায় জাতীয় আন্দোলন অন্য রাস্তায় মোড় নিত, আরও অনেক হতাশ্বাস অন্ধকারের মধ্যে পৃথিবীর শোষিত মানুষের দিনযাপন চলত। যদি দ্বান্দ্বিকতায় আস্থা রাখি, তাহলে এটাও আমাকে মানতে হয়, একশো বছর আগে যে-বই লেখা হয়েছিল, তার বিশ্লেষণ-ব্যাখ্যা-অনুশীলনও এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না; আমাদের প্রয়োজনের সঙ্গে ছন্দ মিলিয়ে এই ব্যাখ্যারও প্রব্রজ্যা, বদলে যাওয়া আদর্শের সঙ্গে মিলিয়ে অহরহ নতুন করে বিশ্বেষণ। আসলে গ্রন্থটিও সমগ্রভাবে দেখলে একটি আদর্শের ভাস্বর প্রতীক, যে-আদর্শ অব্যয়, যে-আদর্শ ঘোষণা করে বহুতর বিবর্তনের মধ্য দিয়ে গিয়ে মানুষ একদিন শ্রেণীহীন সংঘাতহীন অমরাবতীতে পৌঁছাবে, যেখানে সে, পরিণতির উপান্তে, মহত্তম, বৃহত্তম, উদারতম। এই একশো বছরেও এই আদর্শে সামান্যতম ফাটল ধরেনি, তাই Das Kapital যেমন উত্তঙ্গ বিজ্ঞান, তেমনি নিখাদ মহাকাব্যও।
৫ম বর্ষ ৪-৫ সংখ্যা
(শারদীয় ১৩৭৪)
