বাংলায় ‘আন্তিগোনে’ – প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য

বাংলায় ‘আন্তিগোনে’ – প্রদ্যুম্ন ভট্টাচার্য

আমি গ্রিক জানি না। অতএব আমার পক্ষে আন্তিগোনে’-র বাঙলা অনুবাদের আলোচনা অনধিকারচর্চা এবং সমালোচনা হিসেবে তার মূল্য নগণ্য। যে-লোক ইংরেজি তর্জমায় ‘আন্তিগোনে’ পড়েছে তার প্রতিক্রিয়া যদি কারও (বিশেষত অনুবাদকের) কিছুমাত্র কাজে লাগে সেটাই এ-লেখার একমাত্র দাম।

বঙ্কিমচন্দ্রের একটা চিঠিতে (১৯ পৌষ ১৩০০) ‘আন্তিগোনে’র উল্লেখ আছে। গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়কে বঙ্কিমচন্দ্র লিখেছেন, বিষবৃক্ষের ইংরেজি অনুবাদ পড়ে কোনও সমালোচক বলেন যে, ‘Sophocles প্রণীত Antigone চরিত্রের পর আর ইহার তুল্য স্ত্রীচরিত্র কোনও সাহিত্যে সৃষ্ট হয় নাই। এ-সকল কথা আমি বড় গৌরবের কথা মনে করিয়াছিলাম।’ এ-চিঠি পড়ে বহুবার ভেবেছি, ঠিক কী জন্যে ওই তুলনায় বঙ্কিম গৌরব বোধ করেন? আন্তিগোনেকে অনেক সময় ইওরোপীয় সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ নারীচরিত্র বলা হয়; সাহিত্যকৃতি হিসেবে সূর্যমুখী বা কুন্দনন্দিনী তার সমপর্যায়ভুক্ত-এই প্রশংসাই কি তার কারণ? অথবা, মহত্তর অর্থে ধর্ম বলতে যা বোঝায় তার, মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠায়-এবং বিশ্ববিধানের শক্তি হিসেবে-আন্তিগোনের যে-তাৎপর্য, তার সঙ্গে কুন্দনন্দিনী-সূর্যমুখীর ভূমিকা তুলনীয়-এই স্বীকৃতি বঙ্কিমচন্দ্রের উৎসাহের কারণ? এ-প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর পাওয়া কঠিন। তবে বঙ্কিমচন্দ্রের এই মন্তব্য বাঙালির বিশ্বসাহিত্য-চর্চার ইতিহাসে একটি মূল্যবান বিবৃতি হিসেবে গণনীয় তো বটেই, আমাদের বর্তমান আলোচনায় তার বিশেষ প্রাসঙ্গিকতা আছে। কারণ, তাঁর সাহিত্য- সাধনার পটভূমি ছিল, প্রাচ্য-পাশ্চাত্য সমাজ ও মূল্যবোধের দ্বন্দ্ব এবং তা থেকে জাতীয় আত্মস্বরূপের সন্ধান।

বঙ্কিমচন্দ্রের মন্তব্য চমকপ্রদ লাগে আরও এইজন্যে যে তারপর দীর্ঘ ৭০ বছরের মধ্যে ‘আন্তিগোনে’র কোনও বাঙলা অনুবাদ হয়নি। আমাদের অনুবাদকের আগ্রহ আবর্তিত হয়েছে প্রধানত ইংরেজি সাহিত্যের একটা সংকীর্ণ পরিধির মধ্যে। (অন্য সাহিত্য থেকে ইদানীং যে-টুকু তর্জমা হয়েছে তারও চোদ্দো আনা ইংরেজি মারফত) উনিশ শতকের রেনেসাঁস এবং তৎসঞ্জাত সংস্কৃতির এটা একটা দুর্লক্ষণ। ইউনেস্কোর আনুকূল্যে সাহিত্য অকাদেমি আন্তিগোনে-র অনুবাদ প্রকাশ করে সেই পরিধি প্রসারিত করে দিলেন। অনুবাদ্য গ্রিক নাটকের তালিকায় অকাদেমি প্রথমেই বেছে নিয়েছেন আন্তিগোনেকে। তাঁদের এই নির্বাচন সর্বতোভাবে সমর্থনযোগ্য। ‘আন্তিগোনে’তে এক জায়গায় ভারতবর্ষের প্রসিদ্ধ স্বর্ণসম্পদের উল্লেখ আছে। পুরানো বিদেশি নাটকের স্বদেশ-প্রসঙ্গ স্বভাবতই ভালো লাগে; আর সোনার ভারতের প্রতিমা তো আমাদের জাতীয় স্মৃতি ও আবেগের অবিভাজ্য অঙ্গ। এমনিতে বিশ্বসাহিত্যের চিরায়ত নাটক হিসেবেই ‘আন্তিগোনে’র অনুবাদ-যোগ্যতা অসামান্য। তাছাড়া গ্রিক মননের ধর্মই ছিল, যা বিশেষ ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তাকে নিঃসক্ত, তন্নতন্ন বিশেষণ করে নির্বিশেষে ও সাধারণ নীতিতে পৌঁছনো। সর্বকাল ও সর্বজনকে স্পর্শ করার গুণ তাই অন্যান্য গ্রিক নাটকের মতো আন্তিগোনের প্রকৃতিগত। তবে ‘আন্তিগোনে’ যেন অন্য নাটকের তুলনায় আরও তীব্রভাবে আমাদের সমকালকে ছুঁতে পারে। ব্রেখট হয়তো এইজন্যেই ‘আন্তিগোনে’র ‘টপিক্যালিটি’র কথা বলেছিলেন। বলা যায় ফ্যাসিস্ট-বিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় থেকে আন্তিগোনে নতুন তাৎপর্য পেয়েছে। এই নাটক তখন ইওরোপে বারংবার অভিনীত হয়েছে, মনুষ্যত্বের হন্তারক স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে মানুষের অপরাভূত সংগ্রামের আলেখ্য হিসেবে। তারপর, হিটলার-মুসোলিনী প্রভৃতি একনায়কের পতন, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশ কংগ্রেস, স্ট্যালিনের পুনর্মূল্যায়ন ও সমাধি-উৎখনন, গণতন্ত্রের সংকট, সাম্প্রতিক ইতিহাসের নানান বাঁক, সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জোয়ার-ভাঁটা-এই সবের পটভূমিতে আন্তিগোনে যেন নতুনতর অর্থ গভীরতা পায়। কতকগুলো জিনিস আছে-যেমন মনুষ্যত্ব, মানুষের জীবন বা তার অন্তিম সৎকার-যার মূল্য পরম, চূড়ান্ত ও অলঙ্ঘনীয় ‘আন্তিগোনে’ নাটকের এই প্রজ্ঞা সমকালকে বহু স্তরে স্পর্শ না করে পারে না।

অর্থাৎ মূল্যবোধের প্রশ্ন আন্তিগোনে-র কেন্দ্রগত বিষয়। সেই জন্যে ‘প্রাচ্য এবং পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পারস্পরিক সপ্রশংস-গ্রহণেচ্ছা পরিবর্ধনের জন্য ইউনেস্কোর যে সুবৃহৎ পরিকল্পনা আছে এই গ্রন্থপ্রকাশ তাহারই অন্তর্গত’,- সাহিত্য অকাদেমির এই বিজ্ঞপ্তি তাৎপর্যময়। অনুবাদের সাফল্য-বিচারের সময় ওই লক্ষ্য স্বভাবতই খুব সামনে এসে পড়ে। পশ্চিমের মূল্যমান পাঠকের বোধে সঞ্চারিত হতে পারে একটাই শর্তে। তা হচ্ছে নাটকের আধেয়বস্তু অনুবাদক কতটা সাফল্যের সঙ্গে পাঠকের কাছে হাজির করতে পারছেন। এবং সেটা আবার শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে অনুবাদকের ইন্টারপ্রিটেশন বা অর্থনিরূপণের ওপর। আন্তিগোনে নাটকের এই তাৎপর্য-নির্ণয়ের ব্যাপারে অনেক জায়গায় অলোকরঞ্জনের সঙ্গে একমত হওয়া কঠিন। এ-রকম মতান্তরের কয়েকটা দৃষ্টান্ত দেওয়া যেতে পারে।

তর্জমার ৫৪ পৃষ্ঠায় মঞ্চনির্দেশ দেখছি ‘ক্রেয়োনের প্রবেশ।’ তক্ষুনি প্রশ্ন ওঠে ক্রেয়োনের প্রস্থান ঘটল কখন? তার কোনও নির্দেশ বা ইঙ্গিত অনুবাদক দেননি।

চতুর্থ ওড শুরু হবার আগে কোনও কোনও ইংরেজ অনুবাদক Exit Creon এ-রকম স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন। সম্ভবত অলোকরঞ্জনেরও তাই অভিপ্রায় ছিল; কোনও কারণে তা ছাপা হয়নি।

ককতোর ‘আন্তিগোনে’তে এই জায়গায় ক্রেয়োন প্রস্থান করে না। কিটোর তর্জমায় তো স্পষ্ট নির্দেশই রয়েছে Creon remains on the stage। কুশীলবের প্রস্থান-প্রবেশ বিষয়ে সোফোক্লেস নিজেই যথেষ্ট স্পষ্ট সংকেত দিয়ে থাকেন। এখানে ক্রেয়োনের নিষ্ক্রমণ হোক, এ-রকম ইঙ্গিত তাঁর লেখায় নেই।

ব্যাপারটা শুধু মঞ্চনির্দেশের কূটকচালি ঘটিত নয়। চতুর্থ ওড অভিনীত হবার সময় ক্রেয়োন মঞ্চে উপস্থিত থাকবে, নাটকের তাৎপর্যের দিক দিয়েই এটা দরকারি। তার কারণ বলি।

পলুনিকেসের মৃতদেহ সংস্কার করা হবে না-তার দেহ শকুনি-শিয়াল-কুকুরে ছিঁড়ে খাবে- ক্রেয়োনের এই আদেশ সহোদরের প্রতি স্বাভাবিক ভালোবাসার টানে আন্তিগোনে আগ্রাহ্য করল। তাই ক্রেয়োন তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়। ক্রেয়োনের আচরণ অমানুষিক। এবং তা অমানুষিক বলেই প্রাকৃতিক ও ঐশ বিধানের প্রতিকূল।

আন্তিগোনে আর ক্রেয়োনের পুত্র আইমোন পরস্পরের প্রতি বাগদত্ত ছিল। আইমোন ক্রেয়োনকে বোঝাতে চাইল, তার দণ্ডাদেশে ন্যায়ধর্মের অনুমোদন এবং প্রজাপুঞ্জের সমর্থন নেই।

পলুনিকেসের অন্ত্যেষ্টি নিষিদ্ধ ক’রে ক্রেয়োন বিশ্ববিধানকে লাঞ্ছিত এবং (ফলে) স্বর্গ ও পাতালের দেবতাদের রুষ্ট করেছিল। এখন আইমোনের আবেদন অগ্রাহ্য এবং আন্তিগোনেকে তার সামনেই হত্যার সংকল্প ঘোষণা করে সে ভালোবাসার দেবতাকে অপমানিত করল।

কিন্তু ভালোবাসার দেবতা অপরাজেয় আর এই কথাটিই চতুর্থ ওডের বিষয়বস্তু।

কোরাসের মধ্যে গিয়ে সোফোক্লেস এই ভাবী ঘটনার পূর্বাভাস দিতে চাইছেন, লাঞ্ছিত প্রেমের দেবতার প্রতিশোধ অমোঘ সর্বনাশের রূপ নিয়ে ক্রেয়োনের মাথার ওপর প্রহত হবে। গড়ন থেকে বোঝা যায়, এই নাটক দৃশ্যত আন্তিগোনের, কিন্তু গভীরতর অর্থে ক্রেয়োনের ট্র্যাজেডি (মঞ্চ থেকে আন্তিগোনের চূড়ান্ত প্রস্থানের পরেও নাটক আরও টেনে নিয়ে যাবার জন্য যাঁরা সোফোক্লেসের নিন্দে করেন, তাঁরা এই দিকটি ধরতে পারেন না)। ক্রেয়োনের ট্র্যাজেডি দর্শকের কাছে উন্মীলিত করার জন্য চতুর্থ ওডে তার উপস্থিতির প্রয়োজনীয়তা আছে। ওই ওড শুনতে শুনতে দর্শক যদি চোখের সামনে ক্রেয়োনকে দেখতে পায় তা হলে ওডের মানে-এবং সমগ্র নাটকের অভিপ্রায়-তার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। তাছাড়া, ওই নিহিত তাৎপর্যের জন্য-এবং সেই তাৎপর্য সব চরিত্রের কাছেই এখনও প্রচ্ছন্ন বলে-এখানে ক্রেয়োনের উপস্থিতি নাট্যমুহূর্তে টান ও তীব্রতা এনে দেয়। আমি গ্রিক কোরাসের নাচের ছন্দ সম্বন্ধে কিছুই বিশেষ জানি না। তবে এটুকু সহজেই বুঝতে পারি, নাচের তালে তালে কোরাস প্রচণ্ড নাটকীয়তা তৈরি করতে পারে এখানে। আর তখন স্টেজে ক্রেয়োন নিশ্চলভাবে দাঁড়িয়ে থাকলে এ জায়গায় নাটকের আবেগ আরও উঁচু গ্রামে চড়তে পারে।

অবশ্য ওই নাটকীয়তার দিক দিয়ে একটা বিরুদ্ধ যুক্তিও তোলা যায়। নাচ-গান-আবৃত্তির সহযোগে চতুর্থ ওডের অভিনয় যতক্ষণ চলতে থাকবে, ততক্ষণ ক্রেয়োন মঞ্চে কী করবে? তার সংলাপ তো বেশ কিছুক্ষণ পরে। এই আপত্তি দুটো কারণে অগ্রাহ্য! ১. অন্য ওডের (যেমন তৃতীয় ওডের) জায়গায় অলোকরঞ্জন নিজেও ক্রেয়োনকে মঞ্চে রেখেছেন। ২. অভিনয় ও সংলাপ অভিন্ন মনে করা কুসংস্কার ছাড়া কিছু নয়। মনে হয়, এই নাটকে সোফোক্লেস নির্বাক অভিনয় নিয়ে একাধিকবার সার্থক ও সাহসিক পরীক্ষা করেছেন। উদাহরণত ৬৫ পৃষ্ঠায় এউরুদিকের নীরব প্রস্থান উল্লেখ করা যায়।

তেতাল্লিশ পৃষ্ঠায় আন্তিগোনে বলছে, ‘এই কি তোমার পিতা? আইমোন দয়িত আমার।’ (গিলবার্ট মারের তর্জমায় Haemon beloved! Thy father wrongs thee sore । জেবের অনুবাদে Haemon beloved! How thy father worngs thee। কিটো O my dear Haemon! How your father worngs you!) ইংরেজির সঙ্গে বাঙলা তর্জমার কিছুটা তফাত আছে, কিন্তু আপাতত সেটা আমার বক্তব্য নয়। আমার আপত্তি ওই উক্তি আন্তিগোনের ওপর আরোপ করায়। পণ্ডিতেরা বলেন, ‘আন্তিগোনে’ নাটকের সমস্ত পাণ্ডুলিপিতেই এটা ইসমেনের সংলাপ হিসেবেই স্থান পেয়েছে। অধিকাংশ সম্পাদক (ও অনুবাদক) অবশ্য আন্তিগোনের মুখে এই উক্তি বসিয়েছেন। লেটার্স ঠিকই বলেছেন, সম্পাদকদের ‘রোম্যান্টিক ঝোঁক’ এই পরিবর্তনের কারণ। সহজ বুদ্ধিতে মনে হয়, ক্ল্যাসিকল গ্রিক রুচি, নীতি এবং আন্তিগোনের চরিত্রের সঙ্গে তার মুখে এই সংলাপের সংগতি নেই। গ্রিক নাটকের নায়িকারা ‘দুর্গেশনন্দিনী’র আয়েষা-প্রমুখ রোম্যান্টিক নায়িকার মতো পুরুষের সামনে অকুণ্ঠিত প্রেম-ঘোষণায় অভ্যস্ত নয়। তাই আন্তিগোনের জবানিতে এ-কথা বসালে সমস্ত ব্যাপারটা সোফোক্লেসের জগৎ থেকে অনেকটা দূরে সরে আসে। (এ প্রসঙ্গে দুটো জিনিস লক্ষণীয় ১. সুইনবার্নপন্থী রোম্যান্টিক ফেনিলতার জন্য গিলবার্ট মারের তর্জমা নিয়ে এলিয়ট একদা বহু ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিলেন। সেই নিন্দিত গিলবার্ট মারে কিন্তু এই উক্তি বসিয়েছিলেন ইসমেনের মুখেই। ২. ওয়াটলিঙে এটা যদিও আন্তিগোনের সংলাপ, তবে তা থেকে beloved বা তার প্রতিশব্দ সম্পূর্ণ বর্জিত হয়েছে।)

আর একটা কথা। গ্রিক নাটকের stychomathia বা ‘কথা-কাটাকাটি’র রীতি অনুযায়ী এ-উক্তি আন্তিগোনের হতে পারে না। ‘কথা-কাটাকাটি’র মধ্যে এ-রকম ক্রমভঙ্গের নজির, যতদূর জানি, আর কোনও গ্রিক নাটকে নেই।

নাটকের পঞ্চম ওড রীতিমতো জটিল। ওই কোরাসে পর পর দানাএ, লুকাউর্গাস এবং ক্লেওপেত্রা-ফিনেউসের দুই শিশুসন্তানের উল্লেখ আছে। ব্যাপারটা এমনিতে অসংবদ্ধ লাগতে পারে। ক্লেওপেত্রার সন্তানরা ও দানাএ নির্দোষ; আর লুকাউর্গাস ছিল দোষী। তাছাড়া এদের জীবন-কাহিনিতে মিল নেই। আন্তিগোনের সঙ্গেই বা ওদের যোগ কোথায় তাও অস্পষ্ট। একটু লক্ষ করলেই দেখা যাবে, সমস্ত অনুপুঙ্খের মধ্যে সোফোক্লেস এই ঘটনার ওপর জোর দিয়েছেন লুকাউর্গাসকে পাথরের আর দানাএ-কে ধাতব কারাগৃহে অবরুদ্ধ করা হয় আর ক্লেওপেত্রার নিষ্পাপ সন্তানদের দু’ চোখ অন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। শুদ্ধ যুক্তিক্রমের স্তরে দেখলে দানাএ, লুকাউর্গাস ও ক্লেওপেত্রা-সন্তানদের পুরাণ প্রসঙ্গ দুর্বোধ্য ও অসংগলগ্ন মনে হবে। কবিতার গভীরতর স্তরে যা এই সব বিষম ও বিচ্ছিন্ন বিষয়কে ঐক্যবদ্ধ-এবং সমস্ত ওডকে একটি অভিন্ন কেন্দ্রে স্থাপিতকরেছে, তা হচ্ছে, বারংবার প্রত্যাবৃত্ত ‘অন্ধকার’ বা তার সমার্থক শব্দ। সোফোক্লেসের নাটকে অন্ধকার সব সময়ই তাৎপর্যময় এবং নিয়তি বা অতিযৌক্তিকের (ইরর্যা্শনেল) সঙ্গে সম্পৃক্ত।

নাটকের গড়নের দিক দিয়ে একটা জিনিস এখানে লক্ষ করার মতো। পঞ্চম ওড স্থান পেয়েছে ‘আন্তিগোনে’র শেষ দৃশ্য এবং তাইরেসিয়াস দৃশ্যের ঠিক মাঝখানে। অর্থাৎ অন্ধকারের পুনরাবৃত্ত অভিঘাত এক দিকে আন্তিগোনের নির্মম পরিণামের উপযুক্ত আবহ এবং অন্যদিকে অন্ধ ভাবী-কথক তাইরেসিয়াসের (যে আকাশপ্রদীপের মতো মহা-অন্ধকারকে ছুঁয়ে জ্বলতে থাকে) আবির্ভাবের যোগ্য ভূমিকা তৈরি করে।

নাটকের ঠিক মোড় ঘোরার সময় আবেগঘন একটি অসাধারণ মুহূর্তে সমগ্র জাতির স্মৃতি মন্থন করে আনা কয়েকটি পুরাণ-ঘটনার উল্লেখের সঙ্গে সঙ্গে ‘অন্ধকার’ শব্দের ক্রমাগত উচ্চারণের আক্ষেপ একটা অসম্ভব অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটিয়ে দেয়।

অলোকরঞ্জনের তর্জমায় অন্ধকারের এই গুরুত্ব থাকেনি। ঊনচল্লিশ পঙক্তি জুড়ে তিনি পঞ্চম ওডের তর্জমা করেছেন, তার মধ্যে ‘আঁধার’ শব্দটি মাত্র একবার ব্যবহৃত হয়েছে। প্রতিতুলনার জন্য গিলবার্ট মারের তর্জমার প্রথম স্ত্রোফের প্রথম তিন পঙক্তি উদ্ধৃত করা যেতে পারে

So Danae from sun-light was forbidden

In that brass-walled prison-house immured;

Tomb-dark was her marriage chamber hidden.

তিন লাইনের মধ্যেই অন্ধকারের কথা দু’বার এল form sunlight was forbidden এবং Tomb-dark। কিটোর তর্জমাতেও প্রথম স্ত্রোফের কেবল প্রথম তিন লাইনের মধ্যে অন্ধকারের প্রসঙ্গ এসেছে দুইবার। অলোকরঞ্জন কিন্তু সমগ্র স্ত্রোফের অনুবাদে একবারও অন্ধকারের উল্লেখ আনেননি।

নাটকের প্রথম পঙক্তির অনুবাদই অর্থগ্রহণের দিক দিয়ে অসুবিধে সৃষ্টি করে ‘ইসমেনে শুনেছিস, ইসমেনে বোনরে আমার।’ ইসমেনে আন্তিগোনের দিদি। আন্তিগোনে তার দিদিকে বোন বলে ডাকলে সম্পর্কটা বিভ্রান্তিকর হয়ে পড়ে। ব্যাপারটা এমনিতে তুচ্ছ মনে হতে পারে। তবে আমার বিশ্বাস, আন্তিগোনেই যে বয়সে ছোট, এই তথ্য বাদ দিলে বিশেষ করে প্রারম্ভিক দৃশ্যের নাট্যমূল্য অনেকটা হারিয়ে যায়। আর সে সবচেয়ে ছোট বলেই (বা কথাটাকে একটু অন্যভাবে বললে, সে আমাদের বাড়ির ছোট বোনটির মতো বলেই) ট্র্যাজেডির সমস্ত মহনীয়তার মধ্যে অকথ্য কোমল কারুণ্যের মায়া এসে পড়ে।

তাছাড়া আন্তিগোনের অনমিত চরিত্রের সঙ্গে মিলিয়ে ভাবলে ব্যাপারটা নাটকের দিক দিয়ে অতটা গৌণ লাগবে না। নখদংস্ট্রাল রাষ্ট্রশক্তির বিরুদ্ধে একা দাঁড়াতে তার লেশমাত্র ভয় নেই। দিদি ইসমেনেও যেখানে দ্বিধাগ্রস্ত ভীত, আন্তিগোনে সেখানে নির্দ্বন্দ্ব নিঃশঙ্ক। আন্তিগোনের অনুজত্ব তার আত্মবোধে উজ্জ্বল নিঃসঙ্গ দৃঢ়তা ও নিষ্পাপ চিত্তবৃত্তির স্বাধীনতাকে আরও দীপ্ত করে তোলে। এই শুদ্ধ চারিত্রের শক্তিতেই সে এত সহজে জেনেছে; যা প্রাকৃতিক, তা-ই বিশ্ববিধানসংগত।

আসলে তর্জমায় কতকগুলো বিচ্ছিন্ন অংশের প্রশ্ন নয় যে-নীতি ও পদ্ধতিতে অলোকরঞ্জন অনুবাদ করেছেন তা আমার গ্রহণযোগ্য মনে হয় না। এ-রকম মন্তব্য করলেই অনুবাদকের বিকল্প নীতি-অর্থাৎ আমার সমালোচনার প্রতিমান-বিবৃত করার দায় আসে। সে দায় এড়াব না। কিন্তু তার আগে অন্য একটা কথা স্পষ্ট করা দরকার।

অনেক সময় লেখকরা ক্ল্যাসিক অবলম্বন করে সাহিত্য রচনা করেন। এ ধরনের লেখাকে মোটা হিসেবে অনুবাদ-সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত করা হলেও এগুলো ঠিক তর্জমা নয়। এ ক্ষেত্রে ক্ল্যাসিক আসলে তাঁদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য রূপায়ণের বা রূপকল্পগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার বাহন। অনুবাদের সাধারণ বিধি-বিধান এই ধরনের লেখায় প্রযোজ্য নয়। ককতোর আন্তিগোনে এই শ্রেণীর সাহিত্যের দৃষ্টান্ত। সমকালীন সামাজিক ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়ার জন্য ককতো মূল নাটকের অংশত রূপান্তরিত (এবং সংক্ষিপ্ত) করেছিলেন। ১৯২৭ সালের মঞ্চ-বিবরণ থেকে কিছুটা অংশ উদ্ধৃত করলে আমার কথাটা স্পষ্ট হবে

Five monumental plaster, heads of youngmen framed the Chorus…The costumes were worn over black bathing suits, and arms and legs were covered. The general effect was suggestive of a sordid carnival of kings, a family of insects.

আন্তিগোনে অবলম্বনে এই ধরনের নাটক লেখার অধিকার, আর সকলের মতো, অলোকরঞ্জনের আছে। এবং সে ক্ষেত্রে অনুবাদের নীতিগত প্রশ্ন তোলা অবান্তর।

কিন্তু অকাদেমির মতো সাহিত্যমান সংরক্ষক সংস্থা যখন কোনও নাটকের অনুবাদ (রূপান্তর নয়) ছেপে বার করেন এবং যদি তার ঘোষিত উদ্দেশ্যই হয়-পাশ্চাত্য সাংস্কৃতিক মূল্য প্রাচ্যদেশীয়দের উপলব্ধিগত করানো, তখন ব্যাপারটা অন্য রকম হয়ে দাঁড়ায়। এবং সেক্ষেত্রে তর্জমার নীতি-বিষয়ক প্রশ্ন তোলা সংগত ও স্বাভাবিক হয়ে পড়ে।

ই ভি রিউ-এর সাধারণ সম্পাদনায় প্রকাশিত পেঙ্গুইন ক্ল্যাসিকস গ্রন্থমালা বর্তমান শতাব্দীতে অনুবাদ-সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আন্দোলন হিসেবে গণ্য হতে পারে। সম্প্রতি (১৯৬০) একটি প্রবন্ধে রিউ তাঁর অভিজ্ঞতার কথা এবং যে সুচিন্তিত নীতি তাঁর সম্পাদন-কর্মের নিয়ামক ছিল তা লিপিবদ্ধ করেছেন। ওঁদের অভিজ্ঞতার থেকে শেখবার জিনিস অনেক আছে। তবে নিশ্চয়ই মাছি-মারা-কেরানির মতো করে নয়। যা গ্রাহ্য তা হচ্ছে মূলনীতি। এবং বাঙলা ভাষার বিশিষ্ট সমস্যা বা আমাদের বিশেষ প্রয়োজনের সঙ্গে খাপ খাওয়াবার জন্য প্রয়োগের সময় ওই মূলনীতির কিছু হের-ফেরও করে নিতে হবে। রিউ পেঙ্গুইন ক্লাসিকসএর অনুবাদ-নীতির নাম দিয়েছেন ‘প্রিন্সিপল অফ ইকুইভ্যালেন্ট এফেক্ট’। ওই ‘সমমানিক প্রতিক্রিয়ার তত্ব’কে বিশ্লেষণ করলে দুটো সরল সূত্র পাওয়া যায় ১.মূলের ভাব ও স্টাইল (স্টাইল ও ইডিয়মের অভেদ রিউ মানেন না) অবিকৃত রাখতে হবে। ২. তর্জমার ভাষাকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সমকালীন বাগরীতির ওপর। এই দুটো সূত্রকেই আমি আলোচনার প্রতিমান হিসেবে কাজে লাগিয়েছি।

প্রথম সূত্রটি প্রায় স্বতঃসিদ্ধের মতোন লাগে। কিন্তু দাবিটা যত সহজ, কাজটা তত কঠিন। কবিযশঃপ্রার্থী ভিক্টোরিয়ান তর্জমাকারদের কাব্যিয়ানায় উত্যক্ত হয়ে কার্লাইল যখন বলেছিলেন, ‘Tell us what they thought; none of your silly poetry’, তাঁর ধারণা ছিল গ্রিক সাহিত্যের অনুবাদ পদ্যে করলে ভাববিকার ঘটতে বাধ্য। পদ্য-তর্জমা দুরূহতর সন্দেহ নেই, তবে গদ্যের জুড়ি হাঁকালেই ভাবান্তরের ফাঁড়া কেটে যাবে তাঁর এ-ধারণা ভুল। কারণ সাহিত্যের প্রাথমিক উপকরণ হচ্ছে শব্দ বা শব্দবন্ধ; আর শব্দবন্ধের মতো প্রায়-অননুবাদ্য বস্তু খুব কম আছে। শুধু অভিধা ছাড়া প্রত্যেক শব্দে নিহিত থাকে ভাব ভাবনা আবেগ ও মূল্যবোধ। আর শব্দার্থের এ-সব উপাদান ভ্যাকুয়ামে ঝোলানো নির্বিশেষ স্বয়ম্ভূ পদার্থ নয়; ওগুলোর মূল গ্রথিত থাকে ইতিহাস-নির্ধারিত দেশ-কাল-সমাজের মাটিতে এবং লোকস্মৃতির অনুষঙ্গে। অনুবাদ-নীতির প্রশ্ন তাই এত জরুরি। অলোকরঞ্জনের পদ্ধতি ভাবের অবিকৃত অনুবাদ উপযোগী নয়। কারণ, তাঁর তর্জমা-রীতির মূল লক্ষ্যই হল, ভারতবর্ষ ও গ্রিসের ভাবলোকের দূরত্ব সরিয়ে ফেলা। এই উদ্দেশ্যে তিনি স্থানে স্থানে ঋক-মন্ত্র বসিয়েছেন, গ্রিক পারিভাষিক শব্দকে ভারতীয় রূপ দিয়েছেন এবং হিন্দু ও গ্রিক দেব-দেবীকে প্রতিন্যস্ত করেছেন। তাঁর ভূমিকা থেকেই উদ্ধৃত করি একাধিক স্থলে জিউস বা আরেস বা দিয়নুসাসকে তাই আঞ্চলিক দুর্গমতা থেকে সরিয়ে এনে অনুষঙ্গে সদৃশ কোনো-কোনো ভারতীয় দেবতার পাশাপাশি বসিয়েছি। এভাবে পাশাপাশি বসালে দুটি নামের সান্নিধ্যে সেই নাটকীয় মুহূর্তের ইষ্টার্থ সাধিত হয় এবং গ্রীস ও ভারতবর্ষ একটি মহাদেশের অভিন্ন আকাশের নিচে মিলিত হতে পারে।’

এভাবে ‘সেই নাটকীয় মুহূর্তের ইষ্টার্থ’ কী করে সাধিত হয়, তা বোঝা কঠিন। তার চেয়ে গুরুতর প্রশ্ন হল ভারতবর্ষ ও গ্রিসকে এইভাবে মিলিয়ে দেওয়া সম্ভব ও সংগত কি না? ভারত ও গ্রিসের ভাবলোকে যথেষ্ট পার্থক্য আছে; দুটো জগৎ একাকার করা সত্যও নয়, অনুবাদে তার প্রয়োজনও নেই।

ইওরোপ ও ভারতবর্ষের মধ্যে এই ধরনের সাদৃশ্য-সন্ধানের চেষ্টা আসলে পণ্ডশ্রম; এবং তা ইতিহাস-বোধের বিরোধী। ইওরোপ ও ভারতবর্ষের পৃথকত্ব-জনিত ডায়ালেকটিকস উভয়ের সংযোগের মুহূর্ত থেকে ভারতবর্ষের ইতিহাসের ধারা বহুলাংশে নিরূপিত করেছে। যেমন সামাজিক বা রাষ্ট্রিক ইতিহাসে, তেমন মধুসূদন-বঙ্কিমচন্দ্রের যুগ থেকে আরম্ভ করে রবীন্দ্রনাথ ও আধুনিক কাল পর্যন্ত আমাদের সাহিত্যের ইতিহাসে এই ডায়ালেকটিকস ক্রিয়াশীল। ইওরোপের অভিজ্ঞতাকে অধিগত করেই আমাদের জাতিগত আত্মপরিচয়ে পৌঁছতে হবে ও এগিয়ে চলতে হবে, এ আমাদের ঐতিহাসিক নিয়তি। গত শতাব্দী থেকে ভারতবর্ষে কি রাজনীতিতে, কি সাহিত্যে যে-কাজ হয়েছে, তা মূলত এই প্রচেষ্টারই সাফল্য-ব্যর্থতার ইতিহাস। ভুল হয়েছে, যখন আমরা পেণ্ডুলামের মতো দুটো উল্টো বিন্দুর দিকে ঝুঁকেছি; একদিকে ইওরোপের মডেলে ভারতবর্ষকে হুবহু মিলিয়ে দেখার বিকার; অন্যদিকে ইওরোপের অস্তিত্বই সম্পূর্ণ অস্বীকার করার অন্ধতা। অন্য প্রত্যয়, অন্য জগৎ দেখার একটা বড়ো ফল হচ্ছে তাতে নিজের কাছে নিজের স্বরূপটা স্পষ্ট হয়। সরল সমীকরণের দ্বারা ভেদরেখা লুপ্ত করে নয়, ইওরোপ বা তার আদি জননী গ্রিসের ভাবজগৎ অবিকৃতভাবে স্থাপিত করেই আমাদের অনুবাদকেরা এই প্রক্রিয়াকে সাহায্য করতে পারেন।

যাঁহাদের প্রাণ বিদেশী হইয়া গিয়াছে, তাঁহারা কথায় কথায় বলেন-ভাব সর্বত্রই সমান। কথাটা শুনিতে বেশ উদার, প্রশস্ত। কিন্তু আমাদের মনে একটি সন্দেহ আছে। আমাদের মনে হয়, যাহার নিজের কিছুই নাই, সে পরের স্বত্ব লোপ করিতে চায়।…দুইটি স্বতন্ত্র জাতির মধ্যে মনুষ্যস্বভাবের সাম্যও আছে, বৈষম্যও আছে। আছে বলিয়াই রক্ষা, তাই সাহিত্যে আদান-প্রদান, বাণিজ্য-ব্যবসায় চলে।

রবীন্দ্রনাথ

যা স্ব-ভাবে গ্রিক তাকে ভারতীয় রূপ দিলে অর্থ ও ভাব-গত বিকৃতি ঘটতে বাধ্য। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, অলোকরঞ্জন আন্তিস্ত্রোফের নাম দিয়েছেন ‘অন্তরা’ এবং স্ত্রোফের ‘স্থায়ী’। আন্তিস্ত্রোফের অর্থ, lines recited during returning movement from left to right in Greek choruses । স্ত্রোফের অনুরূপ পারিভাষিক অর্থ আছে। অন্তরা বা স্থায়ী সেই বিশিষ্ট অর্থ বহন করে না; বরং এ-ধরনের প্রতিশব্দ ব্যবহারে ভুল বোঝার-এবং না-বোঝার-আশঙ্কা বাড়ে। একই কারণে, কোরাসের মুখে ঋক মন্ত্র বসানো যুক্তিহীন। ষষ্ঠ ওডে গ্রিক দেবতা দিয়নুসাসের স্তব আছে। অলোকরঞ্জন তার প্রথমে ঋগবেদের অগ্নিবন্দনা সংযোজন করেছেন। অগ্নি ও দিয়নুসাসের একত্ব এতই দুর্নিরীক্ষ্য যে এখানে দিয়নুসাস-বন্দনার যা উদ্দেশ্য তার সঙ্গে অগ্নিস্তবের যোগ খুঁজে বার করা অসম্ভব। অনুবাদের এই রীতি অর্থ পরিগ্রহের দিক দিয়ে কী বিপত্তির সৃষ্টি করে ক্রোয়োনেক এই উক্তি তার দৃষ্টান্ত

ঈশ্বরের ঈগলের ঝাঁক

মৃতের কঙ্কাল বয়ে জিউসের শীর্ষসিংহাসনে

নিয়ে যাক। (পৃষ্ঠা ৫৯)

ঈগলগুলো যে আসলে জিউসেরই, এ-ভাবে অনুবাদ করলে তা বোঝা দুষ্কর।

অলোকরঞ্জন আর একটি রীতি নাটকের ভাবলোক অবিকৃত রাখার ব্যাপারে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা হচ্ছে কথার আধিক্য। পণ্ডিতেরা বলেন, সোফোক্লেস গ্রিক নাট্যকারদের মধ্যেও আবার বিশেষভাবে মিতবাক। এই সংযত সমাহৃত ঋজু গড়নের সঙ্গে নাটকের তাৎপর্য অমোঘভাবে যুক্ত। ইংরেজ অনুবাদকরা লিখেছেন, সোফোক্লেসের ভাষার বাহুল্যবর্জিত রূপ ইংরেজিতে অব্যাহত রাখা কঠিন। বাঙলায় যে তা কঠিনতর, সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। কিন্তু অলোকরঞ্জনের সঙ্গে জেব বা কিটোর তর্জমা মিলিয়ে পড়লে বোঝা যাবে, তাঁর অনুবাদে কথার যে কলোচ্ছ্বাস, বাঙলা ভাষায় স্বাভাবিক প্রগলভতাই তার একমাত্র কারণ নয়। দৃষ্টান্ত হিসেবে ক্রেয়োনের এই উক্তিটি নেওয়া যেতে পারে

‘এ-কোন লাগামছাড়া মুখ-আলগা অবাধ্য বাচাল!’ (পৃষ্ঠা ৩৫)

Thou art a born babbler (জেব)

You are a babbling fool (কিটো)

যেখানে অলোকরঞ্জন চারটে বিশেষণ ব্যবহার করেছেন, জেব ও কিটো সেখানে দুটো।

‘ঘাসের চাপড়া ঠিক আছে’ (পৃষ্ঠা ৩৩) প্রহরীর এই সংলাপের অথবা ”বুকে ভৈরবী ‘ভোর ভয়ি’ভোর ভয়ি” দ্বিতীয় ওডের ওই চরণটির (পৃষ্ঠা ৩৬) অনুরূপ কোনও পঙক্তি আমি যে-কটা ইংরেজি তর্জমা দেখেছি, তার একটাতেও পাইনি।

এমনিতে শেষ ওডের তর্জমা রীতিমতো সুখপাঠ্য ও কবিত্বঘন। সবটা উদ্ধৃত করি

মানুষের কাছে প্রজ্ঞার চেয়ে মহত্তর

আর-কিছু নেই। বিধাতার বাণী সগৌরবে

নিত্য ধ্বনিছে, সেইখানে মাথা নোয়াতে হবে।

মুখর দম্ভ প্রভুর অনল এড়ালো কবে?

মহানির্বাণে দর্প হরো,

তার আগে তুমি বৃদ্ধেরে করো জ্ঞানবৃদ্ধ, গোধূলিনভে। (পৃষ্ঠা ৬৯)

আমার আপত্তি ত্তই শেষের ‘গোধূলিনভে’ শব্দবন্ধে। ইংরেজি অনুবাদগুলোয় এ-রকম কোনও শব্দ দেখিনি। সম্ভবত ওটা সংযোজন। অনুষঙ্গের টানে ‘গোধূলিনভে’ আমায় এখানে অস্বস্তিকরভাবে অলোকরঞ্জনের কবিতার জগৎ মনে পড়িয়ে দেয়। তাই এটা শুধু সাধারণ সংযোজন নয়, এখানে অনুবাদকের কবি-ব্যক্তিত্বের অভিক্ষেপ ঘটেছে।

এবার অনুবাদ-নীতির দ্বিতীয় সূত্রে আসা যাক। আন্তিগোনের নিজস্ব নিহিত শক্তিই আছে আমাদের দেশ-কালের মানুষকে স্পর্শ করার, এ-কথা আগেই বলেছি। তাই আমাদের সংবেদ্য করে তোলার জন্য অন্তত অনুবাদে কোনওরকম বাইরের অলংকরণ-রূপান্তরণের দরকার পড়ে না। ভাব ও স্টাইল যথাসম্ভব অবিকৃত রাখা অনুবাদকের প্রাথমিক দায়িত্ব। তাছাড়া তাঁর করণীয় শুধু সমকালীন বাগরীতির ওপর তর্জমার ভাষাকে দৃঢ়ভাবে স্থাপিত করা। নাটকে এ-দায় আবার অন্য শিল্পরূপের চেয়ে বেশি। বাগরীতিবিরুদ্ধ ভাষা সংলাপে চলে না। তাছাড়া, আবেগের চাপ, পরিস্থিতি ও চরিত্র-বিশেষের চাহিদা অনুযায়ী সংলাপের ভাষার ওঠা-নামা করতে পারা চাই; এ-কারণেও স্নায়ুময় জীবন্ত ভাষার সঙ্গে তার যোগ অপরিহার্য। অলোকরঞ্জনের অনুবাদে বাঙলা ভাষার বিশিষ্ট বাগরীতি সর্বত্র রক্ষিত হয়েছে কি না, এ-বিষয়ে আমার কিছু সংশয় আছে।

১. ‘কেউ তাকে এককাঠা কবর কি একফেঁাটা জল দিতে পারবে না’ (পৃষ্ঠা ২৬)

২. ‘জোর চল’ (পৃষ্ঠা ৩২)

৩. ‘মৃতের পুণ্যাহ করতে দাও’ (পৃষ্ঠা ৪২)

৪. ‘এ মেয়েটি নিরিবিলি কবর সাজাচ্ছিলো মড়া লোকটার’ (পৃষ্ঠা ৩৭)

৫. ‘বেআইনি মড়া লোকটাকে যেই কবর দিচ্ছিলো আমি ওকে দেখতে পাই’ (পৃষ্ঠা ৩৭)

৬. ‘মড়া পোলুনাইকেস প’ড়ে ছিল’ (পৃষ্ঠা ৬৪)

চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ দৃষ্টান্তে ‘মড়া’ হয় বানান ভুলের, নয়তো বাগরীতি লঙ্ঘনের উদাহরণ।

কাব্যনাট্যে, শেষ বিশ্লেষণ, বাগরীতির সঙ্গে বাকস্পন্দের প্রশ্ন জড়িত। বিদেশি নাটকের তর্জমায় এ-দিকটার ওপর বাঙলায় এখনও যথাযোগ্য গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। ম্যাকবেথের তর্জমায় গিরিশ ঘোষ বা যতীন সেনগুপ্ত যে-সব সমস্যা নিয়ে ভেবেছিলেন সেগুলোই যথেষ্ট নয়; Edward II-এর ভাষান্তর করতে গিয়ে ব্রেখট যে-সমস্ত প্রশ্ন সম্বন্ধে অব্যহিত ছিলেন, সেগুলো এড়িয়ে চললে কাব্যনাট্যের অনুবাদের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। অর্থাৎ মসৃণ নিয়মিত প্যাটার্ন বজায় রাখাই সব নয়; আবেগের চাপে দরকার মতো বাঁধা ছাঁদ ভেঙে ফেলে কথা বলার জীবন্ত ও জটিল ছন্দ-স্পন্দের ওপর নাট্যভাষাকে দাঁড় করাতে হয়। এ-ধরনের বেড়ি-ভাঙার চেষ্টা অলোকরঞ্জন করেছেন বলে মনে হয়নি। আমার বিশ্বাস, ‘আন্তিগোনে’র সর্বসাকুল্যে ১৩৫৩ পঙক্তির মধ্যেই আবেগের এত বিচিত্র মাত্রাভেদ, বিস্তার ও নাটকীয় প্রতিন্যাস আছে যে ছন্দোমুক্তির প্রসারিত আকাশ-গঙ্গাতেই তার সেই বহুস্বর কাঁপনকে তিনি ধরতে পারতেন। আর, পেরিক্লেসের আথেন্সের জীবন-যাত্রার ছন্দকে বাঙলায় ধ্বনিত-প্রতিধ্বনিত করার অন্য কী উপায় আছে? আমার ধারণা, প্রাকৃতিক ছন্দের তালে তালে শব্দগুলোকে বাজিয়ে নিতে পারলে আজকের বাঙলা দেশের বহরহীন দৈর্ঘ্যহীন মধ্যবিত্ততার প্যাটার্ন থেকে সম্পূর্ণ অন্য এক দুরন্তবীর্য জগতের আদল আনা সম্ভবপর।

পরিশিষ্টে ‘আন্তিগোনে নাটকের দেবতায়ন’ যোজিত হয়েছে। দেবতায়ন সম্ভবত প্যানথিয়ানের তর্জমা। তাহলে প্রশ্ন ওঠে ফিনেউস বা লাইআস-এর নাম দেব-দেবীর তালিকায় কেন এল? আমার মনে হয় নাটকে উল্লিখিত সমস্ত পুরাণ-প্রসঙ্গের ওপরেই টীকা থাকলে ভালো হত।

সাহিত্য অকাদেমির বই বলেই কিছু মুদ্রণ-ত্রুটির উল্লেখ করছি। একচল্লিশ পৃষ্ঠায় ‘কোন’-র জায়গায় ‘কোণ’ ছাপা হয়েছে। কয়েকক্ষেত্রে বানানসম্মিতি রক্ষিত হয়নি। যেমন, প্রথম পৃষ্ঠায় ‘ঊষা’ অথচ ৬৯ পৃষ্ঠায় ‘প্রত্যুষা’; ৫৬ পৃষ্ঠায় ‘লুকাউর্গাস’, কিন্তু ৭৫ পৃষ্ঠায় ‘লুকাউর্গোস’।

গোড়ার কথায় আবার ফিরে আসি। গ্রিক না জানার জন্য এ আলোচনায় আমি প্রায় পদে পদে হোঁচট খেয়েছি। আর লিখতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি, পুরো বিষয়টা সম্বন্ধেই আমার অজ্ঞতা কী আকাট। আসলে আমরা প্রায় সকলেই এখনও যবন পণ্ডিতের গুরু-মারা চেলা। আর সেইজন্যই আমাদের সংস্কৃতিচর্চার মৌলিক গৌণতা কিছুতেই ঘুচছে না। গ্রিকভাষা ও সংস্কৃতি যথোপযুক্ত অনুশীলন ওই গৌণতা কাটানোর একটা প্রশস্ত উপায় তবে সেটা বাণিজ্যিক পুঁজিতে অথবা শৌখিন পাণ্ডিত্যবিলাসে দাঁড়িয়ে যাবার একটা ভয় আছে। সেই অনুশীলন চরিতার্থতা পায় আমাদের জাতিগত সত্তার পরিচয় খুঁজে বার করার তদগত স্বনির্ভর চেষ্টার সঙ্গে সংলগ্ন হলে। স্বদেশচেতনা, অন্তত এ-যুগে, আত্মবোধেরই ওপিঠ। নিজেকে এবং নিজেদের শনাক্ত করার ব্যাপারে অনুবাদচর্চা কখনও কখনও পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে; সাংস্কৃতিক ইতিহাসে তার বহু নজিরও আছে।

আর একটা কথা। অনুবাদের নীতি সম্বন্ধে সাহিত্য অকাদেমি ভাববেন এবং তাঁদের সুসংবদ্ধ ভাবনা সাধারণ্যে বিবৃত করবেন, অকাদেমি কর্তৃপক্ষের কাছে এই দাবি পেশ করতে চাই। এটা এমন একটা কাজ যেটা অকাদেমির মতো সাহিত্য-সঙ্ঘের এক্তিয়ারে পড়ে। তাছাড়া, ওঁদের কর্মসূচিতে তর্জমার প্রাধান্যও কিছু কম নয়।

১ সোফোক্লেস, ‘আন্তিগোনে’, অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত অনূদিত, সাহিত্য অকাদেমি, নিউ দিল্লি ১৯৬৩

৫ম বর্ষ ২য় সংখ্যা

(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৭৩)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *