বাংলার নবজাগৃতি ও টম পেন – অশোক মুস্তাফি

বাংলার নবজাগৃতি ও টম পেন – অশোক মুস্তাফি

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের, তথা ভারতের একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক ইতিবৃত্ত সম্বন্ধে যাঁরা ইদানীং কৌতূহলী হয়েছেন, তাঁদের অনেকেই The Age of Reason-এর প্রখ্যাত লেখক টম পেন সম্বন্ধে সম্যক অবগত নন। উনিশ শতকের নবজাগরণের ক্ষেত্রে পেনের যে একটি নেপথ্য-ভূমিকা ছিল, এটা তাঁদের কাছে হয়তো একটা অভিনব আবিষ্কারের পর্যায়ে পড়বে। অথচ এই বিদেশি এবং অধুনা বিস্মৃত চিন্তানায়ক একসময় বাংলার সমাজচিন্তাকে যে কিছুটা প্রভাবিত করেছিলেন তার অকাট্য সাক্ষ্য-প্রমাণ আমাদের ইতিহাসের পাতায় ইতস্তত ছড়ানো আছে। জীর্ণরিক্ত ঐতিহ্যবাদের বিরুদ্ধে এবং যুক্তিবাদের স্বপক্ষে, বাংলার তরুণ বুদ্ধিজীবীরা একদা যে সংগ্রাম চালিয়েছিলেন, তাতে পেনের রচনাবলি তাঁদের বাস্তবিক খানিকটা প্রেরণা যুগিয়েছিল, সে বিষয়ে আজ আর সন্দেহের অবকাশ নেই।

বাংলার নবজাগরণের পরিপ্রেক্ষিতটি পেনের সাংস্কৃতিক অবদানের সুষ্ঠু বিচারের জন্য সবিস্তারে আলোচনা করা প্রয়োজন। নবলব্ধ পশ্চিমের মানবিকতাবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ এবং ধার্মিক নিরপেক্ষতাবাদের আদর্শ ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রগতিবাদী শিক্ষিত বঙ্গযুবকদের প্রেরণার প্রধান উৎসস্থল ছিল একথা বলা যায়। মুখ্যত হিন্দুকলেজের চিন্তাশীল এবং পাশ্চাত্য-শিক্ষায় শ্রদ্ধাবান কতিপয় তরুণ, ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে যুক্তিবাদের অভিযানে সক্রিয় ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন। হেনরি ডিরোজিওর নেতৃত্বে এঁরা ফরাসি বিপ্লব এবং ইংলন্ডের সংস্কার আন্দোলনের আদর্শগুলিকে বাংলার অবনত সামাজিক অবস্থার পরিবর্তনে ব্যবহার করতে চেয়েছিলেন। ভক্তিকে নয়, যুক্তিকেই প্রগতির হাতিয়ার হিসাবে সমাজজীবনে ব্যবহার করতে এঁরা প্রয়াস পেয়েছিলেন এই কারণে যে আমাদের পুরাতন সামাজিক রীতি ও ধর্মগত প্রতিষ্ঠানগুলি, আচারসর্বস্বতা, এবং কু-সংস্কারের মধ্যেই এ যাবৎ বিশিষ্টতা দাবি করে আসছিল। এক ধরনের কর্তৃত্ব- পরায়ণতা এবং গোঁড়ামি বাংলার সামাজিক চিন্তার ক্ষেত্রে উনিশ শতকের প্রথম দিকে প্রাধান্য লাভ করেছিল। ফরাসি enlightenment এবং ইংলন্ডের সংস্কার আন্দোলনের আদর্শগুলির আলোকে এই ধরনের অন্ধবিশ্বাস যে বাঙালির সুস্থ সমাজ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বিশেষ ক্ষতিকারক এবং সমূহ বিপজ্জনক এই ধারণা প্রসারের প্রয়োজন তখনকার ইংরেজিশিক্ষিত কয়েকটি ছাত্র বিশেষ করে অনুভব করেছিলেন। এঁরা খ্রিস্টীয় সভ্যতা এবং পাশ্চাত্য জ্ঞানসঞ্জাত সামাজিক সচেতনতার মনোভাবের দ্বারা সমধিক আকৃষ্ট হয়েছিলেন, বস্তুত তৎকালীন বাংলার জাতীয় ক্ষেত্রে কি বিপ্লববাদী, কি সংস্কারবাদী-সকলেই উভয়ের থেকেই ফললাভে প্রয়াসী ছিলেন, যুক্তির পথে এঁদের সত্যকে জানবার এবং লাভ করবার প্রচেষ্টার মধ্যে এক ধরনের ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ প্রচ্ছন্ন ছিল; আর কর্তৃত্ব-পরায়ণতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্যে নিহিত ছিল এক ধরনের মানবিকতাবাদ এবং সমাজচিন্তার ক্ষেত্রে উভয়কেই আদর্শ হিসাবে স্বীকার করে বাংলার মুষ্টিমেয় বুদ্ধিজীবীরা একধরনের নূতন স্বাজাত্যবোধের পরিচয় দিলেন একথা সন্দেহ না রেখে বলা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় ইউরোপীয় যুক্তিবাদী উদারনৈতিক সমাজদর্শনের প্রভাব প্রথম পর্যায়ে সংঘর্ষ এবং সন্দেহের মধ্যে কিন্তু দ্বিতীয় পর্যায়ে সংস্কারবাদী অথবা সৃষ্টিশীল সামাজিক চিন্তা এবং ক্রিয়াকর্মের মধ্যে প্রতিফলিত দেখি। ভারতের প্রাচীনবিদ্যার নূতন আলোকে অধ্যয়ন এবং আমূল সমাজসংস্কারের দিকে প্রবণতা এই নবজাগরণেরই একটি অব্যবহিত প্রতিক্রিয়া এবং ফল। কেউ কেউ এটাকে প্রাচ্যাভিমান বলেছেন। আসলে একটা বন্ধনমুক্তি এবং ঐতিহ্য আশ্রয়ী ধর্মভাবের রূপান্তরই এই নবজাগরণের লক্ষণ। প্রাচীন সংস্কৃতির পুনরভ্যুত্থান নয়, একটি নূতন সামাজিক জীবনচর্যাই এই অগ্রগতির বৈশিষ্ট্য। তখনকার সংবাদপত্র এবং সভাসমিতিগুলি আমাদের এই পশ্চিমি প্রত্যয়ের সাক্ষ্য নির্ভুলভাবে বহন করে। পুরাতন সামাজিক মূল্যজ্ঞানের বিরুদ্ধে এই গোষ্ঠীগত জেহাদে একটি নূতন অভিজাততান্ত্রিক মননশীলতা এবং গণতান্ত্রিক সচেতনতা বিশেষভাবে পরিলক্ষিত হয়। এই সময় আমাদের শিক্ষিত সমাজে সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার আগ্রহ এবং একটি নূতন স্বজাত্যবোধ সমভাবেই প্রকাশমান দেখি। হিন্দু ধর্মের সংস্কারের প্রচেষ্টাও এক অর্থে এই নবজাগরণের প্রতিক্রিয়া। স্মরণ রাখতে হবে যে ঐতিহ্যবাদী হিন্দুধর্ম বা আনুষ্ঠানিক খ্রিস্ট ধর্ম কোনওটিই এই নবজাগ্রত হিন্দু যুবকদের দ্বারা গৃহীত হয়নি। বরং ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় এই নবজাগরণে আমাদের সমাজচিন্তার একটা নিছক ধর্মগত এবং লৌকিক ভিত্তিই বিশেষভাবে আক্রান্ত হল। নূতন বুদ্ধিবাদী এই সামাজিক আন্দোলনে-প্রকাশের দিক থেকে তা যত আংশিক, অস্বাভাবিক বা অসচেতন হোক না কেন-আমাদের ঐতিহ্যগত ভাগ্যবাদই বিশেষ ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হল। যে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের উন্মেষ হিন্দুকলেজে এবং ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে দেখা দিল তা জনসাধারণের মধ্যে যথেষ্ট সঞ্চারিত হয়নি; সমাজ জীবনের মানপরিবর্তনে শিক্ষিত যুবকমহলে প্রচণ্ড রকমের একটা সামাজিক তাগিদ অনুভূত হল যার বেগ ধীরে ধীরে প্রশমিত হতে থাকে। এই চিন্তার জাগরণ অসমাপ্ত, কিন্তু অসামান্য এই অর্থে যে এর ফল সুদূরপ্রসারী। এখনকার একজন লেখক বাংলার এই নব্য মানবিকতাবাদকে বলেছেন, ‘মানুষের বিশ্বরূপদর্শন’। চিন্তার ক্ষেত্রে এবং বিশেষ করে মানবিক ঐক্যের ভিত্তিতে বহির্জগতের সঙ্গে ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলার একটি যোগসূত্র স্থাপিত হল মুখ্যত এই নবজাগৃতির কল্যাণে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব বাংলার সামাজের ক্ষেত্রে নয়, ব্যক্তি ও আদর্শের ক্ষেত্রেই দেখা গেল। একটি নূতন সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গিই এই নবজাগরণের মুখ্য অবদান।

এই নব্য সামাজিক আন্দোলনের অনুপ্রেরণা বহুলাংশে আহূত হয়েছিল বেকন, লক, নিউটন প্রভৃতির বৈজ্ঞানিক এবং দার্শনিক রচনারাজি থেকে। তৎকালীন বাংলার অনতিবয়স্ক প্রগতিপন্থীরা হিউম, গিবন, ভলটেয়ার, কোঁত, বেন্থাম, বার্ক এবং পেনের লেখায় তাঁদের মতবাদের সূত্র এবং সমর্থন পেলেন। ফলে সামাজিক আচার আচরণের ব্যাপারে একটি বৈজ্ঞানিক এবং বিশ্লেষণমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অবলম্বন করা তাঁদের পক্ষে কিছুটা সম্ভব হল, যদিও তাঁদের চিন্তার বৈপ্লবিকতা অনেক ক্ষেত্রে উদ্দেশ্য সাধনের উপায় না হয়ে, উদ্দেশ্যেই রূপ নিল। তখনকার সমাজে প্রতিক্রিয়াশীল ব্যক্তি মাত্রই সনাতন ঐতিহ্য, অন্ধ ভক্তির মাহাত্ম্য এবং হিন্দুত্বের গৌরবের উপর এই প্রচণ্ড আক্রমণে মর্মাহত এবং ত্রুব্ধ হয়েছিলেন। নূতন দৃষ্টিকোণ থেকে উনিশ শতকীয় বাংলার সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং রীতিগুলির পুনর্বিচারের প্রচেষ্টাকে তাঁরা পশ্চিমের নির্লজ্জ পদাঙ্ক অনুসরণ বলেই অ্যাখা দিয়েছিলেন। অথচ অন্ধ পৌত্তলিক উপাসনা এবং যুগসঞ্চিত সংস্কার সমাজজীবনকে সংক্রামিত করলে সংস্কারকামনা যুক্তিপ্রয়োগ অথবা মানবিক অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম প্রভৃতি মূল প্রশ্ন থেকে জনগণের দৃষ্টি বিক্ষিপ্ত হতে পারে এই আশঙ্কাই নূতন উদারপন্থীরা করেছিলেন। ফলে, সনাতন হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধে তাঁরা ধর্মের ক্ষেত্রে ব্রাহ্ম এবং খ্রিস্টান মিশনারীদের বিভিন্ন সখ্যতা লাভ করেছিলেন। বস্তুত তত্বের দিক থেকে তাঁরা ছিলেন নিরীশ্বরবাদ এবং বিশুদ্ধ ইউরোপীয় যুক্তিবাদের মধ্যপন্থা অবলম্বনকারী এবং হিন্দুধর্মের নিতান্ত ব্যক্তিক এবং আত্মিক রূপটির বিরুদ্ধে তাঁদের কোনও অভিযোগ ছিল না। পাশ্চাত্য উদারনৈতিক শিক্ষার দাক্ষিণ্যে পুষ্ট এই যুবকবৃন্দ হিন্দু সমাজের অবনত অবস্থার জন্য সংগতভাবেই অজ্ঞানতা এবং কুসংস্কারকেই দায়ী করতেন, বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মানুষের আত্মার স্বাধীনতার কথাই এঁরা উচ্চারণ করেছিলেন এবং মানুষের প্রাকৃতিক অধিকারের পরিপন্থী বলেই তাঁরা ঐতিহ্যসর্বস্ব রাজনীতিকে স্বীকার করতে পারেননি। এঁরা অনুষ্ঠানিক ধর্মের সঙ্গে সমাজনীতির অশুভ যোগই বরদাস্ত করতে অক্ষম ছিলেন। একধরনের সামজিক হিতবাদে এই মধ্যশিক্ষিত যুবকবৃন্দ গভীর বিশ্বাসী ছিলেন যার জন্য সর্বোচ্চ নৈতিকতা বা মধ্যযুগীয় ধর্মের গোঁড়ামি তাঁদের নূতন সামাজিক চেতনাকে আহত করেছিল। অর্থহীন এবং বিষম হিন্দু আচার আচরণের অন্তঃসারশূন্যতা সর্ম্পকে যে নির্ভীকতা এবং স্বতঃস্ফূর্ততা তাঁরা দেখিয়েছিলেন তা মূখ্যত হিউম,ডুগাল্ড স্টুয়ার্ট এবং টম পেন পড়ার পরোক্ষ ফল। নূতন সমাজচেতনায় উদ্বুদ্ধ মধ্যবিত্ত শাহরিক এই শিক্ষিত বুদ্ধিজীবীরা বস্তুত হিন্দুধর্মকে যুক্তির কাঠগড়ায়দাঁড় করালেন। খ্রিস্টান ধর্মের শ্রেষ্ঠ যে অংশের সঙ্গে ইউরোপীয় সংস্কৃতির অন্তরের যোগ ঘটেছে তার, দিকেই তাঁরা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন এঁরা কিন্তু দেশীয় পৌত্তলিকতাকে সরাসরি বর্জন করে ইউরোপীয় ধর্মগত অবিশ্বাসকে বা শুধু খ্রিস্ট ধর্মকে পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রেরণায় আশ্রয় করেননি।

Indeed, their dislike of Christianity was second only to their dislike of Hinduism, (Calcutta Review 1852; Jan-June vol xvii; History of Native Education in Bengal, p. 354)

ধার্মিক আনুষ্ঠানিকতার বিরুদ্ধে এই নির্বিশেষ প্রতিবাদে এঁরা পেন প্রমুখ বিদেশি লেখকদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন তৎকালীন ইতিহাসই তার প্রমাণ দেয়। তাঁদের মানসজগতে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করায় ডিরোজিও সাহেবের পার্থেনন কাগজ এবং Academic Association প্রভূত সাহায্য করেছিল। ‘ঈশ্বরের অস্তিত্ব’ স্বাধীন ইচ্ছা, ‘নারীদিগের অধিকার’ প্রভৃতি সামাজিক সমস্যার আলাপ আলোচনার এই সাংস্কৃতিক চক্রটি প্রধানত কয়েকজন বিদেশি চিন্তানায়কের ধ্যানধারণার অনুবর্তী ছিল। নিম্নলিখিত উদ্ধৃতি থেকেই স্পষ্ট হবে যে তাঁদের এই বাস্তবনিষ্ঠ সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির উৎস কোথায় ছিল

Bacon, Hume and Tom Paine became the favourite authors of the students. (Presidency College Register,1927;p.81).

বস্তুত ইংলন্ড এবং ফ্রান্সে ধর্মগত চিন্তার ক্ষেত্রে টমাস পেনের Age of Resson প্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছিল। ধর্মক্ষেত্রে কর্তৃত্ব এবং ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে স্বাধীন চিন্তার স্বপক্ষে, মূলত যুক্তি ও ন্যায়বিচারের স্বপক্ষে এই গ্রন্থটি রচিত হয়। ইতিহাসের এমন এক সন্ধিক্ষণে পেনের এই রচনাটি রচিত হয় যে অনতিবিলম্বে এটি দেশের বিভিন্ন দেশের চিন্তাশীল মহলে বিস্ময় এবং আলোড়নের সৃষ্টি করে। ধর্মের ক্ষেত্রে আত্মাকে বাদ দিয়ে অযৌক্তিক এবং মানবিক দিক থেকে অন্যায্য আচার আচরণকে প্রাধান্য দেওয়া যে প্রতি ক্রিয়াশীলতার নামান্তর একথা পেন অত্যন্ত স্পষ্টভাষায় ঘোষণা করলেন। ঐতিহ্যকে চ্যালেঞ্জ করে এই পুস্তক রচনার জন্য ব্যক্তিগত জীবনে পেনকে যথেষ্ট লাঞ্ছিত এবং নিন্দিত হতে হয়েছে। তাঁর এই গ্রন্থটির প্রভাব যে নিতান্তই আঞ্চলিক ছিল না তার প্রমাণ বাংলাদেশের একটি ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে এর প্রচার এবং আশাতিরিক্ত সমাদর।

বস্তুত সামাজিক ঐতিহ্যবাদীরা বাংলাদেশে পেনের এই প্রগতিমূলক চিন্তাধারাকে প্রীতি তো নয়ই, বরং সমধিক ভৃতির চক্ষে দেখেছিলেন। শিক্ষিত যুবক মহলে Age of Reason -এর আশ্চর্য জনপ্রিয়তা যে তাঁদের যথেষ্ট শিরঃপীড়ার কারণ হয়েছিল নিম্নের উদ্ধৃতিতেই তার প্রমাণ হয়

Hume’s works were then read with avidity, also Tom Paine’s The Age of Reason for a copy of which eight rupees were offered by some of the pupils.

Calcutta Christian Observer August1832.

নির্ধারিত মূল্যের অতিরিক্ত দিয়েও ছাত্রেরা যে পুস্তকটিকে সংগ্রহ করতেন তা এর লোক প্রিয়তাকে নিশ্চিতভাবে প্রমাণ করে। হিন্দু কলেজের ছাত্রমহলে পেনের বুদ্ধিগত আবেদন সন্বন্ধে তাঁর একনিষ্ঠ সমালোচক আলেকজান্ডার ডাফের একটি মন্তব্য বিশেষ প্রণিধানযোগ্য

If the subject was historical, Robertson snd Gibbon were appealed to, if political, Adam Smith & Jeremy Bentham, if scientific, Newton & Day, if religious, Hume and Paine , if metaphysical, Locks & Reied, Dugald Stuart & Brown.

( India & India Missions 1839Appendix p.615)

পরিবর্তনশীল জগৎ সম্বন্ধে যে সচেতনতা নব্যবঙ্গ লাভ করেছিলেন, তা তাঁদের সামাজিক মনের গতি নির্ণয়ে নিঃসংশয়ে সাহায্য করেছিল। পেনের প্রগতিশীল ধ্যানধারণার প্রভাব তখনকার ছাত্রসমাজের উপর বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ না হলে সমালোচকের নিষ্করুণ লেখনী তাঁকে নিশ্চিত রেহাই দিত। কিন্তু কলেজপ্রাঙ্গণের বাইরেও যে তাঁর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল, তার প্রমাণ পাই ড. ডাফের জীবনীকার স্মিথের একটি উক্তিতে

Outside of the classes, but constantly reffered to by the teachers, the favourite book was Paine’s The Age of Reason.

Life of Alexander Duff 1879; p.144

আলোকপ্রাপ্ত হিন্দু ছাত্রসমাজ দুর্নীতি এবং সংস্কারে নিমজ্জিত সামাজিক অবস্থার প্রতিকার যে পেনপ্রমুখ লেখকদের রচনায় খুঁজবেন, তা আর বিচিত্র কি?

ঐতিহ্যগত সামাজিক ব্যবস্থায় কর্তৃত্বপরায়ণতা সর্বদা পরিহার করে এবং সামাজিক ক্ষেত্রে একটি ধ্বংসবাদী ভূমিকা গ্রহণ করে যাঁরা নূতন সমাজব্যবস্থা আনয়নে বিশ্বাসী ছিলেন সেই সব বয়ঃকনিষ্ঠ হিন্দু ছাত্র পেনের লেখায় নিজেদের বিক্ষিপ্ত চিন্তাভাবনার যুক্তিবদ্ধ পূর্ণাঙ্গ রূপই খুঁজে পেয়েছিলেন। এমনকি ভূদেব মুখোপ্যাধ্যায়ের মতো স্থিরবুদ্ধি নির্দলীয় ব্যক্তি পেনের Age of Reason পাঠ করে তখনকার দিনের মিশনারি প্রভাব অনেকটা এড়াতে সমর্থ হয়েছিলেন, তারও প্রমাণ আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় নবজাগরণ ড. সুশীল গুপ্ত ; পৃ ১৩১)। Enquirer কাগজে রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জির ধর্মীয় নির্ভীক উক্তির জন্য একজন গবেষক তাঁকে ‘বাঙালি পেন’ এই আখ্যা দিয়েছেন (যুগন্ধর মধুসূদন ড. শীতাংশু মৈত্র; পৃ ৬১)। পেনের প্রকাশভঙ্গির ঋজুতা যে তৎকালীন ছাত্রমহলে অনুকরণের বস্তু হয়েছিল তা তাঁর গভীর আবেদনেরই সাক্ষ্য দেয়।

Age of Reason সম্বন্ধে ১৮৩২-এর জুলাই মাসের সমাচার দর্পণ-এর একটি বিশেষ অংশ উদ্ধারের যোগ্য

…which falling in the hands of some young men educated in England, the anxiety to purchase the work became great…we hear that his whole stock was sold among the natives in few days.

ওই সংখ্যাতেই ছাত্রমহলে পেনের এই যুগান্তকারী গ্রন্থটি কী পরিমাণ আগ্রহ ও কৌতূহল সৃষ্টি করেছিল। সে সম্বন্ধে একটি কাহিনি আছে। একজন ভারতীয় পুস্তক বিক্রেতা Age of Reason-এর একশত কপি আমদানি করেছিল এবং প্রত্যেকটির মূল্য এক টাকা ধার্য করে একটি পত্রিকা স্তম্ভে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। কিন্তু ‘such was the demand for the book that he sold them for five rupees per copy.’ তখনকার দিনে কোনও বিদেশি পুস্তকের এই জাতীয় সমাদর প্রায় অভাবনীয় ছিল। তৎকালীন হিন্দু ছাত্রদের মানসিক প্রবণতার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করতে গিয়ে Calcutta Review (1982, vol xvii Jan-June, p. 354) লিখেছেন

The influence of the Europeans whom they looked up to with most respect was decidedly anti-christian and it is notorious that their notions of the religion of jesus were drawn chiefly from Paine’s Age of reason and the pages of Gibbon and Hume.

বস্তুত পেনের ভাষার সরলতা এবং তীক্ষ্ণতা এবং ভাবের গাম্ভীর্য স্বভাবতই পাশ্চাত্য শিক্ষিত এই যুবামহলের মনকে আকৃষ্ট করেছিল। তাঁর যুক্তি অন্তত বাংলাদেশের সে যুগের ভক্তিপ্রবণ প্রাচীনপন্থীদের আত্মপক্ষ সমর্থনে যে বাধ্য করেছিল তারও প্রমাণ আছে। পেনের পুস্তকটি বস্তুত এমন সময় প্রচারিত হয়েছিল যখন উদারনৈতিক বহুমুখী পাশ্চাত্য শিক্ষা আমাদের দেশজ শিক্ষিত সম্প্রদায়ের একটি অংশকে নূতন প্রত্যয়ে নূতন সামাজিক মূল্যায়নে উদ্বুদ্ধ করেছিল। এই নব্য যুবকদের চিন্তাজগতে ধর্মীয়বোধ একটি নূতন সামাজিক বোধে বিলীন হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে ড. ডাফের আক্ষেপ-উক্তি স্মরণীয়

Their great authorities…were Hume’s ‘Eassys’ and Paine’s ‘Age of Reason’ with copies of the letter in paraicular, they were abundantly supplied––supplied form a land which has taught more than one invaluable lesson to mankind, if mankind were only wise to learn. It was some wretehed book-seller, in the United States of America who basely taking advantege of the reported infidel leanings of a new race of men in the East and apparently regarding no God but his silver dollars––despatched to Calcutta––a cargo of that malignant and pestiferous of all anti-Christian publications, Form one ship a thosuand copies were landed and at first sold at the cheap rate of one rupee per copy but such was the demand that the price soon rose and after a few months it was quadrupled. Besides the separate copies of the Age of Reason, there was also a cheap edition in one thick volume of all Paine’s works, including the Rights of Man and other minor pieces, political and theological

India & Indian Mission A.Duff, 1839; Appendix p. 616

এই খেদোক্তি থেকে এইটিই প্রমাণিত হয় যে তৎকালীন বাঙালি শিক্ষিত সমাজ পেনের মানবিক অধিকারবাদী স্বাধীন চিন্তাধারার সঙ্গে বিশেষভাবে এবং গভীরভাবে পরিচিত হবার পূর্ণ অবকাশ পেয়েছিল এবং সেগুলি তাদের মানসিক অনুসন্ধিৎসার যথেষ্ট নিবৃত্তি ঘটিয়েছিল।

তবে ডাফ সাহেব পেনের যে বিধর্মী হিসেবে বা খ্রিস্টধর্মবিরোধী হিসেবে অভিহিত করেছেন তার যথেষ্ট সংগত কারণ নেই। এই প্রসঙ্গে ভারতে সাম্রাজ্যবাদী ইংলন্ডের প্রথম পর্যায়ের কার্যকলাপ সম্বন্ধে পেনের একটি উক্তি আমাদের অনেক সন্দেহের নিরসন করে

That instead of Christian examples to the Indians, she hath basely tampered with their passions, imposed on them ignorance and made them tools of treachery and murder.

A Serious Thought Paine’s Collected Works ed. by Conway Vol-I

অন্যত্র পেন ভারতের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা এবং জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে একটি বিরল একাত্মতা অথচ সঙ্গে সঙ্গে খ্রিষ্টধর্মের প্রতি তাঁর গভীর বিশ্বাসের পরিচয় দিয়েছেন

Oh India! Thou loud procalimer of European cruelties, thou bloody monument of unnecessary deaths, be tender in the day of enquiry and show a Christian world thou canst suffer and forgive.

Life and Death of Robert Clive Vol-1, Paine’s Collected Works by Conway

অতএব বাংলা তথা ভারতের মুক্তি আন্দোলনের একজন সহৃদয় এবং ধর্মপ্রাণ বিদেশি বন্ধু হিসাবেই পেনকে গ্রহণ করতে আমরা যেন দ্বিধাগ্রস্ত না হই। বস্তুত বাংলার নবজাগরণের মধ্যে স্বাজাত্যবোধের ধারাটি পেনের এই জাতীয় উক্তির দ্বারা কিছুটা পুষ্ট হয়েছিল তা বোধ হয় সাক্ষ্য প্রমাণের ভিত্তিতে বলা যায়। বাংলা তথা ভারতের সমাজ সংস্কারের ধারাটি-যা নবজাগরণের অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাও পেনের ভাবনার দ্বারা সমৃদ্ধ এটা হয়তো অনেকেই জানেন না, সে যুগে এশিয়া ভূখণ্ডে স্ত্রীজাতির হীন অবস্থার কথা উল্লেখ করে পেন তাঁর Occasional Letters to the Female Sex (Conway Vol–1) নামক প্রবন্ধে বলেছিলেন

In Turkey, in Persia in India in Japan and over the vast empire of China––one-half of the human species in oppressed by the other the multitude of women there assembled have no will, no inclination but his.

তখনকার বাংলাদেশের স্ত্রীজাতির অবস্থা সম্বন্ধে এই উক্তিগুলি সমাধিক প্রযোজ্য। এমনকি বর্তমান ভারতে যে সামাজিক পরিবর্তন আমাদের চোখের সামনে সংঘটিত হচ্ছে তার পরিপ্রেক্ষিতেও পেনের এই বহু পুরোনো কথাগুলি মূল্যবান মনে হয়।

পেনের ধ্যানধারণার সঙ্গে ঘনিষ্ট হবার আগ্রহ তখনকার তরুণ বুদ্ধিজীবীদের যে বিলক্ষণ ছিল তার একটি প্রকৃষ্ট প্রমাণ হাজির করা যায়। তাঁর Age of Reason-কে বাংলায় অনুবাদের একাধিক চেষ্টা হয়েছিল তার স্পষ্ট নজির আছে। দুটি উদ্ধৃতি এই মহৎ প্রচেষ্টার নির্ভুল সাক্ষ্য দিচ্ছে-

In 1983, a book had appeared against Christianity, chiefly a translation of Paine’s Age of Reason. (Long Descriptive Catalogue, Tract Society, Tract No. 381) এই মর্মে ডাফ সাহেবেরও একটি মন্তব্যের উক্তি অন্যত্র পাই।

Here the evil genius of Paine was again resusticated. Passages his Age of Reson were often translated verbative into Bengali and inserted in the native news papers. (S.C.Sanyal History of the Press in India Calcutta Review, Jan. 1911, p. 28).

তখনকার সংবাদপত্রগুলি যে যুগের দাবিকে অথবা মননশীল তরুণ বাংলাকে স্বীকৃতি জানাবার জন্য পেনের রচনার আংশিক অনুবাদ মাঝে মাঝে প্রকাশ করতেন তাও এর থেকে জানা যায়। অধ্যাপক প্রিয়রঞ্জন সেনের Western Influence in Bengali Literature p. 153-তে দেখি aspirants after literary fame translated portions of Pain’s Age of Reason in the Provakar, the christian missionaries were called upon by way of challenge to reply to it . সংবাদ প্রভাকর-এ যে এই অনুবাদ প্রকাশিত হয়, তার একাধিক সাক্ষ্য রয়েছে

some one soon after took the trouble to translate some part of the Age of Reason into Bengali and to publish in the Provakar…

Bengali Harkuru, 1832 Native Paper.

১৮৩২ সালের জুলাই মাসের সমাচার দর্পণ-এ ওই একই সংবাদ সরবরাহ করা হয়েছে। ডাফ সাহেব নিজেই এই জাতীয় সংবাদের পরোক্ষ সমর্থন করেছেন

The editor of one of the dailies published a separate pamphlet attacking the Bible on the score of its alleged inconsistency. A copy of it he transmitted to me with the compliments challenging a reply.

India & India Missions A. Duff; 642

এই স্বতন্ত্র পুস্তিকাটি যে পেনের Age of Reason-এরই চর্বিতচর্বন বা তার সারাংশ তারও প্রমাণ ডাফ সাহেবের লেখায় পাই

I found it to consist chiefly of patched extract from Paine clothed in a Bengali grab

India & India Missions A. Duff; p. 642

এই খণ্ডবিক্ষিপ্ত সাক্ষ্যগুলির ভিত্তিতে অধ্যাপক ভবতোষ দত্ত (ঈশ্বর গুপ্তের কবিজীবনীর সম্পাদনার ভূমিকায়, পৃ ৪৬) এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে সম্ভবত কবি ঈশ্বর গুপ্ত তাঁর সম্পাদিত সংবাদ প্রভাকর-এ পেনের Age of Reason-এর বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছিলেন। এই অনুমানের সমর্থন বিশেষ কয়েকটি কারণে জানানো সম্ভব নয়। প্রথমত, ঈশ্বর গুপ্ত নিজে রক্ষণশীল ছিলেন এবং ইংরেজি ভাষায় ততটা অভিজ্ঞ ছিলেন না। তিনি ব্রাহ্মও ছিলেন না। অধিকন্তু তখনকার অন্যান্য কয়েকটি সংবাদপত্র ধর্মগত প্রশ্নের আলাপ আলোচনা চালাতো। আর যদি ঈশ্বর গুপ্ত স্বয়ং এই অনুবাদ ছদ্মনামেও করে থাকতেন, সেটিও তাঁর ভাষার অনন্যতা থেকে পরবর্তী গবেষকরা আবিষ্কার করতে পারতেন। আর এ বিষয়ে সন তারিখের সঠিক অনুসরণ করে কোনও স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো শক্ত। তবে এ সমস্তই প্রমাণ করে যে পেন ইয়ং বেঙ্গলের মধ্যে কতটা জীবিত ছিলেন।

পেনের এই বৈপ্লবিক রচনাটির ক্রমবর্ধমান লোকপ্রিয়তা বাংলার সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীল মহলে ত্রাসের সঞ্চার করেছিল তার বহু প্রমাণ আছে। বঙ্গদেশে এই গ্রন্থটির প্রকাশকে তাঁরা একটি হিমবাহের অগ্রগতির সঙ্গে সমার্থবোধক মনে করেছিলেন। Age of Reason-এর প্রভাব তরুণ বাংলার মন থেকে দূরীভূত করবার জন্য তখনকার মিশনারিরা বাংলার স্কুলগুলিতে বাইবেলকে পাঠ্যপুস্তক হিসাবে ধার্য করবার কথা চিন্তা করেছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের প্রতি বীতশ্রদ্ধ ধর্মান্ধ কয়েকজন মিশনারি ও হিন্দু Age of Reason-কে নিছক একটি বৈদেশিক এবং বিজাতীয় প্রভাব বলেই অভিহিত করেছেন। এই প্রসঙ্গে ডাফের জীবনীকার বলেছেন

Pain’s coarse ‘Age of Reason’ which a respectable deist would not mention save as a warning. That book, has bitter reply to Burke, his Rights of Man and his minor pieces born of the fifth of the worst period of the French Revolution.

Smith; Life of Duff, Vol-1 1879, p 144

অবশ্য পেনের প্রগতিবাদী চিন্তাধারাকে হীন প্রতিপন্ন করা এবং বাজারে তাঁর গ্রন্থাদির প্রচার বন্ধ করবার যথাসাধ্য চেষ্টা প্রায় সব দেশেই ঐতিহ্যপ্রাণ প্রাচীনদের তরফ থেকে করা হয়েছিল। বাংলায় এটা নূতন নয়। আরও উল্লেখযোগ্য এই যে এই বিদেশি গ্রন্থটি তখনকার হিন্দু কলেজের ধর্মনিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীদের এবং প্রাচীনপন্থী ধর্মপ্রধান মিশনারিদের তুমুল বিবাদের কারণ হয়েছিল। হেনরি ডিরোজিও-এর লেখক এডওয়ার্ডস তৎকালীন বয়স্ক হিন্দুদের এই বিরূপ মনোভাবের সাক্ষ্য দিয়েছেন এই বলে যে ডিরোজিও-এর ছাত্ররা আনন্দলাভ করত মূলত যার থেকে তা হচ্ছে

licentious plays of the Restoration and in the minor pieccs of Tom Paine

Edwards Henry Dorozio; p.35

Sermon on the Mount-এর উপর কয়েকটি বিকৃত রচনার উল্লেখ করতে গিয়ে তদানীন্তন বাংলার দেশি এবং বিদেশি রক্ষণশীলদের মুখপাত্র ডাফ সাহেব বলেছেন যে সেগুলি greatly exceeded anything exhibited in the paged even of Paine. –India & India Mission Dr. Duff; p. 619

অন্যত্র ডাফ সাহেব ওই একই কথা বলেছেন

How little could it have entered the imagination of Paine himself that from the banks of the Ganges, there would hereafter spring a race whose ruined splints would one day upbraid him as the author of the curse.

পুস্তকটি ডাফ সাহেবকে কতটা আতঙ্কিত এবং চিন্তিত করেছিল, তা সহজেই অনুমেয়। বস্তুত ডাফের আক্ষেপ এবং শ্লেষমিশ্রিত এই উক্তিটি তৎকালীন মননশীল বাঙালির উপর পেনের গভীর প্রভাবের সাক্ষ্যই বিপরীতভাবে বহন করে। সে যুগের অত্যুৎসাহী এবং প্রতিহিংসাপরায়ণ মিশনারিদের সহস্র অপপ্রচার সত্বেও পেনের যুক্তিবাদ যুববাংলার মর্মস্থলে প্রবেশ করেছিল। এই কারণে তাঁরা পুস্তকটিকে নিষিদ্ধ ও নিশ্চিহ্ন করবার চেষ্টা সর্বতোভাবে করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে অপর একটি উক্তি সমস্ত বিষয়টির ওপর যথেষ্ট আলোকপাত করে

The book spread like wild fire among the native students and scholars and Dr. Duff, finding that it was a great obstacle in the path of converting the Hindus bought all copies that are in the market piled them in the street and made a bonfire of them but Hindus reprinted the book and distributed it among themselves .

India & Her People Abhedananda, p.197

এই বহ্নুৎসবের ঘটনা এবং বইটির পুনঃপ্রকাশ দু’টি একই কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ইতিহাস খুঁজলে দেখা যায় যে পৃথিবীর সকল পথপ্রদর্শনকারী রচনার এই এক পরিণতি ঘটেছে। টম পেন বাঙালি শিক্ষিত তরুণদের হৃদয় এবং মস্তিষ্কের কাছে যে নিশ্চিত আবেদন রেখেছিলেন সে বিষয়ে বোধ হয় আর অতিরিক্ত প্রমাণের প্রয়োজন নেই।

উনিশ শতকের প্রথম পর্যায়ে নব্য বাঙালি পেনের ভাবধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে হিন্দু ধর্মের অলৌকিকতাবাদ, অযথা আধিপত্য এবং আচারসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানগুলির সামাজিক উপযোগিতা সম্বন্ধে সংগতভাবেই সন্দিহান হতে থাকবেন। ব্যক্তিক এবং বুদ্ধিক রাজ্যে একটি ধর্মের উদগাতা হিসাবে পেন হার্ডার, দিদেরো, এবং দ্য অ্যালেম্বারের সমকক্ষ। তিনি নিছক নিরীশ্বরবাদী বা অগভীর তথাকথিত বাস্তববাদী হিসাবে কোনও কোনও মহলে অযথা নিন্দিত হয়েছেন। বস্তুত তিনি নব্য বাংলাকে একটি ন্যায্য ধর্মাচারণ এবং বুদ্ধিগ্রাহ্য সামাজিক জীবনচর্যাতেই উদ্বুদ্ধ করেছিলেন। আরও একটি কথা। একটি বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং প্রাকৃতিক অধিকারের ধারণা বাংলায় প্রসার লাভের জন্য পেন প্রমুখ পাশ্চাত্য যুক্তিবাদীদের অবদান কম নয়। একটি উদারনৈতিক মানবিকতাবাদ যা পাশ্চাত্য প্রত্যয়ের শ্রেষ্ঠ অংশ, বুদ্ধিজীবী তরুণ বাঙালি অনেকটা আত্মস্থ করেছিল পেন জাতীয় পাশ্চাত্য চিন্তানায়কদেরই দাক্ষিণ্যে। যুক্তির প্রয়োগ এবং মানুষের চরম বিকাশ ও সার্থকতার বিষয়ে আশাবাদ, এঁদের শ্রেষ্ঠ উত্তরাধিকার। বিভেদদীর্ণ ধর্মসর্বস্ব হিন্দুসমাজ কিছুটা তাঁর যুক্তিবাদের ফলেই উত্তরকালে ভক্তি এবং যুক্তির সমন্বয় সাধনে প্রয়াস পেয়েছিলেন। অবশ্য ১৮৫০-এর পর, অর্থাৎ হিন্দুধর্মের পুনর্ভু*্যত্থানের পর থেকেই পাশ্চাত্য যুক্তিবাদের প্রভাব বাংলাদেশে হ্রাস পেতে থাকে।

উপসংহারে বলা যায় যে ইয়ং বেঙ্গলের ওপর পেনের প্রভাব গঠনমূলক দিক থেকে তেমন প্রত্যক্ষ ছিল না অথবা স্থায়ীও হয়নি। কেননা মুষ্টিমেয় কয়েকটি শিক্ষিত হিন্দু পাশ্চাত্য শিক্ষা থেকে অত্যন্ত দ্রুত ফল লাভের আকাঙ্ক্ষায় অনেকটা আধুনিকতার ঝোঁকে এবং গোঁড়া খ্রিস্টান ধর্ম এবং হিন্দুধর্মের বিরুদ্ধবাদের জন্যই সেই সামাজিক আলোড়নের সময় পেনকে অধ্যয়ন করেছিলেন। কতটা সত্যকার মূল্য তাঁর রচনায় লোকে আরোপ করেছিল তা গভীর বিবেচনার বিষয়। পেনের সঙ্গে তখনকার বুদ্ধিজীবীরা বোধ হয় এক ধরনের সাময়িক মানসিক সান্নিধ্য বোধ করেছিলেন। পেনের যুক্তিবাদ এবং তাঁকে কেন্দ্র করে বিতণ্ডা হিন্দুধর্মের পুনর্ব্যাখ্যানেই ঐতিহ্যবাদীদের পরোক্ষভাবে সাহায্য করেছিল। বস্তুত নব্যবঙ্গ আন্দোলনের অস্তিত্ব একটি অস্বাভাবিক সামাজিক interlude হিসাবে ছাড়া পরবর্তীদের আর তেমন করে চিন্তিত অথবা প্রভাবিত করেনি। সামাজিক বিষয়ে ব্যক্তির স্বাধীন চিন্তার অধিকার সাব্যস্ত করতে এবং ব্যক্তিগত বিবেচনার ক্ষেত্রটি নির্দেশ করতেই বোধ হয় পেনের প্রেরণায় তখনকার হিন্দু কলেজের ছাত্রগোষ্ঠী চেয়েছিলেন। নূতন ভাবধারা প্রচারের একটি মাধ্যম হিসাবেই বাংলায় পেনের চিন্তাধারার মূল্য, নূতন চিন্তার উৎস হিসাবে ততটা নয়। তাঁর Age of Reason ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে যে খানিকটা সহায়তা করেছিল, সে ব্যাপারটি আজ তর্কাতীত।

১ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা

(ভাদ্র-আশ্বিন১৩৬৮)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *