চণ্ডীদাস বা দান্তে – শঙ্খ ঘোষ
যে সনেটটিকে মধুসূদন দান্তের সমাধিতে ফুল হিসেবে দিতে চেয়েছিলেন, তার মধ্যে দান্তের আত্মার কোনও গাঢ় স্পর্শ আছে বলে মনে হয় না। ওর ব্যবহৃত দুটি লাইন ‘দেবীর প্রসাদে তুমি পশিলা সাহসে’ কিংবা ‘তুমি, সাধু, পশিলা পুলকে’র মধ্যে শব্দব্যবহারের কোনও অব্যর্থতা দেখি না বা অন্যভাবে বলা যায় যে, এই ‘সাহস’ বা ‘পুলক’ শব্দদুটি ডিভাইন কমেডির প্রেতলৌকিক সংকেতকে মুহূর্তমধ্যে নিষ্প্রভ করে দেয়। অনুমান করা যায়, সাহস শব্দটি সরাসরি এসেছিল ইনফের্নোর দ্বিতীয় সর্গ থেকে (২/১৩০-৩২)। কিন্তু ওই একটি মাত্র শব্দের ব্যবহারে এবং ওর ঠিক পাশেই পুলক-এর প্রতিষ্ঠায় মধুসূদন আমাদের ধরতে দেন না দান্তের নির্জন আত্মার কোনও কম্পমান ছায়া। ঈনিস আর সেন্ট পলের প্রতিতুলনায় আপন শীর্ণতা জেনে কেমন করে তাঁর হৃদয় নিশীথ তুহিনে কুসুমিকার মতো ভেঙে পড়ছিল (২/১২৭-২৯), সেই দ্বন্দ্ব ক্ষতের কোনও চাপ লাগে না মধুসূদনের উচ্চারণে। এর পাশাপাশি বায়রনের ‘dark eyes of a Seer’ বা মিকেলাঞ্জেলোর ‘souls most perfect bear the greatest woe’ দান্তের প্রেত-শুদ্ধি-স্বর্গলোকের ত্রিপর্বিক অভিজ্ঞতার সামনে দাঁড় করিয়ে দিতে বরং বেশি সাহায্য করে। অবশ্য মিকেলাঞ্জেলোর তুলনা এখানে হয়তো অনুচিত, এমন আর ক’জন শিল্পী ছিলেন দান্তের মর্মের এত সমীপে? কিন্তু কথাটা তুলতে হল এই জন্য যেন মধুসূদনে অথবা উনিশ শতকের বাংলায় দান্তেকে ব্যবহার করার মধ্যে একটা অর্ধস্বস্তির চিহ্ন যেন ফুটে ওঠে। ইউরোপের পক্ষে যা সত্যি ছিল না। অন্তত ইতালি জার্মানি বা ইংল্যান্ডে উনিশ শতকের দান্তের পুনর্জীবন তাঁকে অনেকটা অন্তর্মূল থেকে দেখতে সাহায্য করেছিল বলে মনে করা যায়।
কেবল সনেটটিতে নয়। মেঘনাদবধকাব্যের যে অংশ দান্তে-প্রভাবে প্রকট সেই অষ্টম সর্গের নরকবর্ণনাও শেষ পর্যন্ত নৈতিক বা আত্মিক কোনও সমস্যার আঘাত আনে না বাঙালি পাঠকের জন্য। ঠিক, পাপের কথা এখানে উঠে আসে বটে ; কিন্তু প্রথম সর্গে রাবণের প্রথম বিলাপ (‘কী পাপে হারানু আমি তোমা হেন ধনে’) থেকে শুরু করে অষ্টম সর্গে দশরথের শেষ আর্তি (‘স্বপাপে মরিনু আমি মোর বিচ্ছেদে’) পর্যন্ত তাঁর প্রায় সমগ্র রচনাতে ওই শব্দ সাংসারিক পীড়াজনিত অস্পষ্ট আক্ষেপের মতো শোনা যায়, ঊর্ধ্বতন কোনও আত্মিক মুক্তির সাধনস্তর হিসেবে আসে না। তাই ক্ষীণ পরিসরেও নারকী বীভৎসতার আয়োজনে মধুসূদন একটু বেশি তৎপর ; এবং এই অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টির জন্যই হয়তো তাঁকে লিখতে হয় ‘আগ্নেয় অক্ষরে লেখা দেখিলা নৃমণি’-যদিও দান্তের নরক তোরণের অক্ষরগুলি অগ্নিময় ছিল না, ছিল ধূসরিমা মাখা; ব্লেকের আঁকা ইনফেরনোর ছবিতে অস্পষ্ট উৎকীর্ণ শব্দাবলির কুহেলিতে যা অনেকটা ধরা আছে।
এইজন্য মনে হয়, দান্তের রচনায় একই সঙ্গে যে চতুঃস্তর উপলব্ধির প্রয়োজন ছিল, ইনফেরনোকে ব্যবহার করবার সময়ে মধুসূদন তাকে অনেকটা উপেক্ষা করেছেন। আর, কেবলমাত্র ইনফেরনোকেই স্বতন্ত্রভাবে ধরতে গেলে এ উপেক্ষা অনিবার্যও হয়ে পড়ে। কিন্তু যে কবি মনে করতেন যে কেবল ডিভাইন কমেডি-র পক্ষেই নয়, যে কোনও গণনীয় কবিতা বিচারের জন্যই চাই চতুঃস্তর অর্থের ধারণা, তাঁকে কেবল আক্ষরিক বোধে গ্রহণ করা কতদূর সংগত? কখনও কখনও মনে হয় বটে যে এলিয়টের পরামর্শ না শুনে আমরা ভিতা নুওভা-ই আগে পড়ব (কার্যত তা হয়ে ওঠে না যদিও) ডিভাইন কমেডি-র পথ দিয়ে ভিতা নুওভায় না পৌঁছে ভিতা নুওভার আলোতেই কমেডিকে দেখব ; কিন্তু শেষ পর্যন্ত তা কতটা ভালো? এ দৃষ্টিতে দান্তে পাঠে কেবল একটা অস্থায়ী লাবণ্যের বেশি শেষ পর্যন্ত আর কিছু পাওয়া যায় কিনা সন্দেহ।
লিটার্যাল, অ্যালিগোরিক্যাল, মর্যাল এবং অ্যানাগগিক – কনভিভিওতে বর্ণিত এই চার ধরনের অর্থের কেবল আক্ষরিক তাৎপর্যের দিকটাই মধুসূদন লক্ষ করতে চেয়েছিলেন দান্তের মধ্যে, এইরকম মনে হতে থাকে। এইজন্যই হোমার বা মিলটনের সঙ্গে তাঁর যে ধরনের মানসিক যোগাযোগ হতে পেরেছিল, দান্তে বিষয়ে কখনওই তেমন নয়, দান্তে তাঁর অলংকরণ মাত্র। আর কেবল মধুসূদনই নয়, গত শতাব্দীর বাংলা কবিতায় দান্তে যতটুকু আসেন তার প্রায় সর্বত্রই এমনি বহিরাভরণ হিসেবে তাঁর ব্যবহার।
অল্পই আসেন অবশ্য, আর আভরণও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে নেওয়া। যেমন স্বপ্নপ্রয়াণ-এর কবি দেখেছিলেন রূপকের উল্লাস। স্বপ্নপ্রয়াণের রূপক আয়োজনের মধ্যে দান্তের স্মৃতি একেবারে অস্পষ্ট ছিল মনে হয় না। (রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় দ্বিজেন্দ্রনাথের কোনও প্রেরণা কি নেই?- কবিহৃদয়ের বিচিত্র জগৎ পরিভ্রমণ ছাড়াও ‘অজগর মহিষ সর্প ছাগ বাঘ কুক্কুরে’র রূপক মনে করিয়ে দেয় কমেডির বাঘিনী বা নেকড়ের মতো পশুরূপক। এর চেয়ে সক্রিয়ভাবে কমেডির রূপককে নিয়েছেন নিশ্চয় হেমচন্দ্র। এমনকি কখনও যেন মনে হয় তিনি পারলৌকিক থেকে একটা নৈতিক চিন্তাও অস্পষ্টভাবে স্পর্শ করতে চাচ্ছেন। ছায়াময়ী অনুবাদ নয়, তবে কমেডির দ্বারা তা অনুভাবিত ; কিন্তু এতোটা দুয়ারসমীপে থেকেও হেমচন্দ্র সমগ্র দান্তেকে জানলেন না কেন? এখানেও কেবল ইনফেরনোর ব্যবহার কেন? যদিও বলেন খুব ভালো ‘ঘনতর কুয়াশায় আবৃত সে বনকায়’ ‘ধূমবর্ণ বাষ্পরাশি – গাঢ়তর ঘন’ এবং যদিও শেষ মুহূর্তে ‘বিগত-কলুষ-তাপ বিগত-সকল-পাপ আত্মাময় নন্দিনীর’ দেখা পাওয়া যায়, তবু মধ্যবর্তী অভিজ্ঞতার কোনও যথাযথ বাস্তবতা থাকে না সেখানে, বোঝা যায় না হঠাৎ কেন চলে আসে এন্টনি আর কাইসরের ‘মৃত তনু’। হেমচন্দ্রে পুরগাতোরিও অনুপস্থিত, এবং প্রোচ্চারিত তত্বকথাকে কীভাবে অভিজ্ঞতার মতো ব্যবহার করতে হয় তারও কোনও নিরিখ নেই এখানে।
এসব ব্যাপারকে অপপ্রতিভার ফলাফল বলে ব্যাখ্যা করা অবশ্য কঠিন নয়। কিন্তু তা হলেও মনে ভাবনা পুঞ্জিত হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ কী করেছিলেন? দান্তে বিষয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধটি অল্প বয়সের খেলা, কিন্তু অভ্রান্ত রবীন্দ্রচারিত্র যে তার মধ্যে থেকে গেছে তাও সত্যি। ‘বিয়াত্রীচেই তাঁহার সমুদয় কাব্যের নায়িকা, বিয়াত্রীচেই তাঁহার জীবনকাব্যের নায়িকা’ তাঁর এই ব্যাখ্যা অল্প বয়সের খণ্ডদর্শন নয়, বিশেষ চরিত্রেরই দৃকভঙ্গি। বেয়াত্রীচেকে তিনি প্রায় কল্পলক্ষ্মী হিসেবে দেখেছেন দান্তের রচনায়, কিন্তু তার আবির্ভাব যেন রবীন্দ্রনাথের ধারণায় রোমান্টিকদের ‘নিষ্ঠুরা সুন্দরী’র মতো বড়ো জোর। সেইজন্য যখন বিশদ করে তিনি এতটা বলেন ‘তিনি বিয়াত্রীচের মৃত্যু ও জন্ম তিথি মিলাইয়া তখনকার জ্যোতিষগণনার অনুসারে স্থির করিলেন – বিয়াত্রীচের মৃত্যুর সহিত নিশ্চয়ই খ্রিস্টীয় ত্রিমূর্তির (Holy Trinity) কোনও না কোনও যোগ আছে’ তখনও এর ত্রিমূর্তিগত তাৎপর্যের দিকে বেশি এগুতে প্রস্তুত হন না, তিনি একে মনে করেন আলস্যের স্বপ্ন, রোমান্টিক বিহ্বলতা ‘এই কল্পনা করিয়াই তাঁহার কত সুখ হইল!’ তাই পরিণত বয়সে যখন তিনি ভাষাবোধের অভাব বশত আক্ষেপ করছিলেন যে দান্তে তাঁর কাছে রুদ্ধ বই – ‘closed book’-তখন নরকবাসের নরকবর্ণনা সত্বেও সে হতাশোক্তি গভীরতর অর্থে সত্য বলে ভাবতে হয়। গ্যেটের মতো ছটফট করে এমন তিনি বলেননি বটে যে ‘প্রেতলোক বিরক্তিকর, শুদ্ধিলোক দ্ব্যর্থক আর স্বর্লোক ক্লান্তিজনক’* কিন্তু এই ত্রিলোককে এক সামগ্রিক বোধের মধ্যে ধারণ করবার আয়োজনও রবীন্দ্রনাথ আর করেছিলেন বলে জানা যায় না।+
কেন এমন হল? মধ্যযুগীয় নন্দন বোধের সমস্তটাই প্রতিফলিত ছিল দান্তের মধ্যে, ক্রোচের এই সিদ্ধান্ত মনে করুন। সুন্দরের জন্য যে তিনটি বিষয়ের অপরিহার্যতা বুঝেছিলেন টমাস অ্যাকুইনাস, সেই সামগ্রিকতা সমানুপাত এবং প্রোজ্জ্বল স্পষ্টতার পূর্ণ সমন্বয়ের নাম ডিভাইন কমেডি। কিন্তু বস্তুত বহিরাবয়বে এই ঝকঝকে স্পষ্টতাই কি অনেক সময়ে অনুরাগীকে ‘কলস ভাসায়ে জলে’ বসে থাকতে অনুপ্রাণিত করে না? ‘যদি মরণ লভিতে চাও এসো তবে ঝাঁপ দাও’ এই আহ্বান যেন গোপন হয়ে যায় অনেক সময়ে এই স্পষ্টতারই ফলে। তবে এর পরেও প্রশ্ন থেকে যায়, অতলের এই আহ্বান যে এসে পৌঁছচ্ছে না কবিতায়, এ কি ব্যক্তিগত কবিরুচির ব্যাপার অথবা দেশীয় কোনও চরিত্রলক্ষণও প্রচ্ছন্ন আছে এর ভিতরে?
।। দুই।।
এলিয়ট যখন শেলি-ব্রাউনিংয়ের নাম করছিলেন দান্তে প্রসঙ্গে, তখন অনুচ্চারিত রেখেছিলেন কোলরিজের কথা। কিন্তু কোলরিজেই বরং ছোট আধারের মধ্যে ত্রিপর্বিক অভিজ্ঞতার এক প্রবল চেহারা দেখতে পাই।১ হয়তো তা সম্পূর্ণ দান্তের দিক থেকেই পরিকল্পিত ছিল না, হয়তো তা পাওয়া কেবল ঐতিহ্যসূত্রে। কিন্তু কোলরিজ মনে করিয়ে দিয়েছেন যে দান্তে এক ‘living link between religion and philosophy’। এদিক থেকে ভেবে দেখলে মনে হয় খ্রিস্টীয় সত্তার উপলব্ধি দান্তেমানসের অনেকটা কাছে নিয়ে যায় কবিকে। বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কথা এ নয় ; এলিয়টের একথা অনেক শ্রদ্ধেয় যে ‘poetic assent’-এর দিক থেকেই দান্তের বিশ্বাস বা অভিজ্ঞতাকে লক্ষ করতে হবে, নিজস্ব বিশ্বাস বা অবিশ্বাস দুইই সরিয়ে রাখতে হবে সাময়িকভাবে। একথা সত্যি যে দান্তের বিশ্বাসে আমরাও বিশ্বাস রাখব কিনা, ডিভাইন কমেডির পাঠকের পক্ষে এ চিন্তা সেই মুহূর্তে তেমন জরুরি নয়। কিন্তু দান্তের সেই বিশ্বাসকে আমরাও আমরাও জানব কিনা, এ প্রশ্নের সমীচীনতাকে হয়তো তেমন করে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এবং প্রশ্নটা যখন এইখানে এসে দাঁড়ায় যে বাংলা কবিতার অভিজ্ঞতাতে তাঁর সমযোগ্য কোনও আয়োজনের প্রস্তুতি থাকে না। কেন, তখন ইউরোপীয় মনের সঙ্গে ভারতীয় মনের তুলনার পুরোনো কথাটাই চলে আসে।
Evil -এর সমস্যাকে দেখতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর কেন্দ্র রেখেছিলেন এইখানে the potentiality of perfection outweighs actual contradictions (The Problem of Evil Sadhana)। বস্তুত এ হল ভারতীয় বোধেরই পরিণাম, ‘outweigh’ কথাটির জোরে আমরা সব সময়েই জীবনের একটা বড়ো অন্ধকারকে ঢেকে রাখতে পারি, তার আভাসমাত্র দেখে নিয়েই তার থেকে উত্তীর্ণ হবার কথা ভাবতে পারি। গীতা – এলিয়টের ধারণায় যা ডিভাইন কমেডি-র পরেই দ্বিতীয় মহত্তম দার্শনিক কবিতা – সেই গীতা-ও যখন বিশ্বরূপে এসে পৌঁছোন, বর্জন করে যান অস্তিত্বের জটিল রূপ। গীতা শেষ পর্যন্ত হয়তো কাব্য নয়, দর্শনই-কিন্তু এ বর্জন যে কেবল সেই জন্যেই তা মনে হয় না। ভারতীয় সাহিত্যে এইখানে একবার উঠে এসেছিল প্রবল নেতির সমস্যা, কিন্তু ‘অনেকাদ্ভুতদর্শনম’ সূত্রটুকু দিয়েই যেন তাকে মিটিয়ে দেয়া হল, বড় জোর দেখানো হল ভাবী ঘটনার ছায়াপাত হিসেবে মুখগহ্বরে জ্বলন্ত পতঙ্গের মতো ধাবমান শরীরগুলিকে। এবং অর্জুন প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যেন স্তবাতুর হয়ে ওঠেন, তাঁর এক পর্ব থেকে অপর পর্বে উত্তরণে কোনও রূপময় জীবনাভিজ্ঞতা কাজ করে না। তেমনি আবার বৈষ্ণব পদগুলির অভিসারিকা রাধামূর্তির মধ্যেও একধরনের তিতিক্ষার আকার আছে বটে, আছে যাত্রিকমূর্তি, কিন্তু তা কেবল ভক্তিপ্রাণতারই প্রাকৃতিক প্রকরণ, তার সহিষ্ণুতাকে মনে হয় অনেকটা শৌখিনতাময়, সৌন্দর্যের ছল। দান্তের রচনায় বিবেকানন্দ যেমন ‘বহিপ্রকৃতির বিশাল ভাব, দেশকালের অনন্ত ভাবের বর্ণনা’ দেখেন এখানে কোথায় তা পাব? ‘যখনই মিলটন বা দান্তে অনন্তের চিত্র আঁকিবার প্রয়াস পাইয়াছেন’ তখন শেষ পর্যন্ত স্বামীজী তাঁদের ব্যর্থতাই দেখেন, কিন্তু তাঁর ধ্যানের ভারতবর্ষ ‘এই সমস্যা সমাধানে ইন্দ্রিয়গণের সম্পূর্ণ অক্ষমতার কথা জগতের নিকট নির্ভীকভাবে প্রকাশ করে।’২ এইভাবে ধর্মীয় চেতনার মধ্যে একদিকে এক ইন্দ্রিয়হীন মহাশূন্যতা আমাদের আলগা সুতোয় ঝুলিয়ে রেখেছে, অন্যদিকে তেমনি লোকালোকের মধ্যবর্তী ঝাঁপটা কখনওই স্পষ্ট করে দেখানো হয় না বলে জটিলতার আস্বাদেও আমরা বঞ্চিত থাকি। আমাদের মনে ও আমাদের শিল্পে তাই খ্রিস্টীয় পাপ ও পরিত্রাণের ছবি কোনও স্পষ্ট আলোড়ন আনতে পারে না।
‘পাপ কী, কী করলে পাপ হয়, এ সকল বিচার করিয়া আমার পাপ বোধ হয় নাই। পাপদর্শনে পাপ বোধ হইল; পলকের মধ্যে সহজেই পাপ বোধ করিলাম’- দেশীয় চেতনার মধ্যে থেকে যিনি সবচেয়ে বেশি ঝুঁকে পড়েছিলেন খ্রিস্টধর্মের দিকে, সেই কেশবচন্দ্রও তাঁর জীবনবেদে এই স্বীকারোক্তি রেখে যান। পাপ ও প্রায়শ্চিত্তের কথা তিনি বারংবার বলেন বটে কিন্তু ‘সহজেই’ এবং ‘পলকের মধ্যে’ই জন্মায় তাঁর এই পাপবোধ। উপরন্তু নবীনচন্দ্রদের মতো নব্য মানবতন্ত্রীও যেমন অল্প পরেই বৈষ্ণবীয় ফল্গুপ্রবাহের মধ্যে মিলিয়ে যান অবলীলায়, কেশবচন্দ্রের নূতন ধর্মেও তেমনি কীর্তনবন্দনার এক বৈষ্ণবসুলভ ভক্তিমত্ততার ঢেউ লাগে শেষ পর্যন্ত। এ হল দেশীয় প্রকৃতির প্রতিশোধ।
তাহলেও কেশবচন্দ্রের ধর্মোপলব্ধির মধ্যে এক সংকটবোধ ছিল এবং কেবল কেশবচন্দ্র কেন, গত শতাব্দী বিষয়ে এ হল সাধারণ সত্য। কিন্তু ওর সান্নিধ্যে থেকে মধুসূদনকেও এই দ্বন্দ্ব কি ভিতর থেকে আন্দোলিত করে? আবহের নানা প্রভাব এখানে ওখানে ছড়িয়ে থাকে তাঁর চিত্তচেতনায়, কিন্তু মনে হয় না যে, এমন কোনও ধর্মীয় সমস্যার টান তাঁর কাছে স্পষ্ট হতে পেরেছিল। খ্রিস্টবন্দনার একটি কবিতা লিখেছিলেন তিনি কর্তব্যবোধে, কিন্তু ধর্মান্তরিত হবার মূল উত্তেজনা ছিল বরং এই দীর্ঘশ্বাসে I sight for Albion’s distant shore! ফলে যখন তিনি জয়দেবকে স্তুতি করে জানান ‘কে আছে ভারতে ভক্ত নাহি ভাবে মনে’ তখন এই ‘ভক্ত’ শব্দের প্রচলিত বাঙালিয়ানা সরিয়ে দেবার কোনও চেষ্টাই তিনি করেন না এবং ‘ যে বিষম দ্বার দিয়া’ দান্তে তাঁর ‘আঁধার নরকে’ প্রবেশের চেষ্টা করেছিলেন তার সঙ্গে এই আবহমান চেতনাকে কোনও প্রত্যক্ষ দ্বন্দ্বে সাজাবার কথাও তিনি ভাবেন না।
দ্বন্দ্বের অপেক্ষা ছিল আরও একটি ক্ষেত্রে, প্রেম ও প্রজ্ঞার মিলনক্ষেত্রে। এমনকি এ-ও হয়তো বলা যায় যে এ দুয়ের সংঘর্ষ ও সমন্বয়ের ওপরেই নির্ভর করে ছিল মধ্যবর্তী স্তরটির অস্তিত্ব, যে স্তর প্রায়ই অতিক্রম করে যাই আমরা। দান্তেকে প্রথমেই মীমাংসা করে নিতে হয়েছিল এই সমস্যার। Francis অথবা Dominic, প্রেমের তাপ না কী প্রজ্ঞার প্রভা – শেষ পর্যন্ত প্রাধান্য কার? মধ্যযুগের এই প্রশ্নের যে উত্তর আছে দান্তের মধ্যে, তা এ দুয়ের সমবায়ে জাত। তাই তাঁর নিবিড়তম প্রতীক হয় সূর্য, যার মধ্যে পরিপূরক ভাবে রয়ে গেছে তার উত্তাপ সমানভাবে প্রকীর্ণ হয়ে যায়, সবার ওপর। কেবল সূর্যপ্রতীকেই নয়, স্বর্গোলোকের দ্বাদশ সর্গে পরস্পর এমন তিনি আরও অনেক প্রতীক আনেন প্রজ্ঞাপ্রেমের পরস্পরসাপেক্ষতা প্রমাণের জন্য। ‘sacred millstone’ (১-৩), ‘two bows parallel and like in colour’ (১০-১২) অথবা ‘wheels of the chariot’ (১০৬-১০৮) এই ভাবেই চলে আসে একের পর এক।
কিন্তু ভারতীয় সাধনার মধ্যে, বিশেষত বাঙালি সাধনায়, এ দুই বিপরীতের তেমন কোনও মিলনবিন্দু শেষ পর্যন্ত ধরা যায়নি। আমরা জ্ঞানের সাধনা দেখি, দেখি প্রেমের সাধনা, কিন্তু দুই সাধনাকে মিলিয়ে এনে ব্যক্তিজীবনে প্রয়োগের কোনও সম্ভাবনা আমরা ঐতিহ্যের মধ্যে থেকে আত্মসাৎ করিনি। চৈতন্যদেব যে মুহূর্তে গঙ্গায় তাঁর নৈয়ায়িক প্রচেষ্টাকে ডুবিয়ে দিয়েছিলেন, সেই সঙ্গেই যেন বাঙালির ভাবী জীবনের একটা নির্দিষ্ট পথ চিহ্নিত হয়ে যায়, যেন ঘটনাটি প্রতীক তাৎপর্যে আমাদের কাছে বড় হয়ে ওঠে। প্রজ্ঞা বা অভিজ্ঞতা অনেক সময়ে আমাদের ধারণায় বাধা হিসেবেই দাঁড়ায় যেন, ‘নামৈব কেবলম’ কিংবা ‘মামেকং শরণং ব্রজ’ কথার ওপর নির্ভর করতে পেরে আমরা বিশ্বাসেই বস্তু মিলাই, তর্কে আমাদের কাছে সব কিছুই সরে সরে যায়। অথচ আমাদের ভাবনাতেই এটা ঘটতে পারা সম্ভবপর ছিল ‘প্রকৃত সত্তা, প্রকৃত জ্ঞান, প্রকৃত প্রেম অনন্তকালের জন্য পরস্পরসম্বন্ধ – ইহারা একে তিন’ (কর্মযোগ) বিবেকানন্দের এই দৃষ্টি তো ভারতচিন্তা থেকে সহজেই তুলে আনা স্বাভাবিক ছিল, কর্মাত্মিকা ও জ্ঞানাত্মিকা ভক্তির সাধনা তো ছিল গীতারই কেন্দ্রীয় দীক্ষা। কিন্তু জীবনক্ষেত্রে প্রয়োগের বেলায় পরস্পরসম্বন্ধ ওই সৎ-চিৎ আনন্দ স্বরূপকে অথবা জ্ঞানময় ভক্তির ব্রতকে আমরা হৃদয়ের মধ্যে ধরতে পারিনি, আনতে পারিনি ব্যবহারে। তাই দান্তের সূর্য আমাদের কাছে উত্তাপ আনলেও আলোক আনে না, – প্রেমের তাপ, কিন্তু প্রজ্ঞার প্রভা নয়।
৩
কোনও সমালোচক আক্ষেপ করেন এই বলে যে দুর্ভাগ্যবশত ‘Abandon all hope ye who enter here’ লাইনটিই অনেকের কাছে ডিভাইন কমেডি-র পরিচয় বা প্রবেশপত্র। কিন্তু এ হয়তো সম্পূর্ণ দুর্ভাগ্যের বিষয়ও নয়। ত্রিপার্বিক অভিজ্ঞতার ভূমি অতিক্রম করবার পরেও ঐ লাইন আমাদের কাছে গুঞ্জরিত হতে পারে হয়তো বা কিছু পৃথক অর্থে, তার অভিঘাত নিতান্ত অর্থহীন থাকে না। মধুসূদন কেন এর অনুবাদ করেছিলেন ‘হে প্রবেশি, ত্যজি স্পৃহা, প্রবেশ এ দেশে’ এই প্রশ্ন হঠাৎ ভাবা যায়, কেন অনুপ্রাসের প্রলোভন পর্যন্ত জয় করে নিয়ে ‘আশা’ শব্দটির পরিবর্ত চাইলেন তিনি ‘স্পৃহা’য়? ‘ছায়াময়ী’ পাঠকের এই প্রসঙ্গে মনে পড়তে পারে
অমরী কহিলা ধীরে চাহিয়া মানবে-
‘যত দিন স্পৃহা-লেশ রবে চিত্তে, রবে ক্লেশ
জীবনের পাপাস্বাদ যত কাল অবসাদ
না হইবে চিত্তমূলে, এইভাবে রবে’।
এখানে অবশ্য প্রসঙ্গ ঈষৎ রূপান্তরিত – কিন্তু অভিপ্রায়ে যেন সাদৃশ্যের আভাস আসে এবং গীতার উপস্থিতি এই উচ্চারণের পটে কাজ করে বলে মনে হয়। মধুসূদন স্পষ্টত কতদূর ভেবেছিলেন বোঝা যায় না, কিন্তু সামর্থ্যময় ওই ‘স্পৃহা’ শব্দের অর্থ ও ধ্বনিগত লাফ কথাটিকে সঙ্গে সঙ্গে অনেক দূরে নিয়ে যায় – এবং ডিভাইন কমেডি-র অভিজ্ঞতার কাছে এই নিস্পৃহ প্রবেশকে নিতান্ত অনিবার্য মনে হয়। আর আজ, কমেডির আক্ষরিক রূপক নৈতিক এবং আত্মিক। এই সমস্ত তত্বার্থের পরেও স্পৃহাহীন এই নৈর্ব্যক্তিকতার অনুভবই আমাদের সামনে নিঃশব্দ সমস্যা হিসেবে উপস্থাপিত হতে থাকে – এ দেশে ক্রমেই যার উন্মোচন হবে বলে আশা রাখা যায়। ডিভাইন কমেডি-র সমস্ত বৈচিত্র্যের পরেও তার কেন্দ্রীয় বিষয় কবির আত্মা, কিন্তু এমনই তার ব্যবহার যে এ কাব্যের চেয়ে বিশ্বজনীন অথচ এর চেয়ে ব্যষ্টিজনীন আর ব্যক্তিগত কিছুই আর হতে পারত না।৩ ব্যক্তি আর বিশ্বকে একই আধারে ধরবার এই চিরন্তন আধুনিকতার খোঁজে যত বেশি উন্মুখ হবে বাংলা কবিতা, ততই বেশি আমরা দান্তের সমীপবর্তী হতে থাকব বলে মনে হয়। তাই গত শতাব্দীর শেষার্ধ তাকে যেভাবে পেয়েছিল, এ শতকের শেষে তার চেয়ে ভিন্ন কোনও দাবিতে তাঁকে সার্থকতর রূপে পাওয়া যাবে বলে বিশ্বাস করা যায়।
উপরন্তু আছে পূর্বকথিত প্রেম ও প্রজ্ঞার সেই মিলনভূমির প্রশ্ন। কখনও কখনও বঙ্গসংস্কৃতির মৌলিক হৃদয়বত্তা থেকে সরে যাবার চেষ্টা করেছে বাংলা কবিতা, ধরতে চেয়েছে প্রজ্ঞাভূমির দৃঢ়তা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এ দুয়ের সংগত মিলন যেন ঘটে উঠতে পারল না, মধ্যপথে বাধা ছিল কোথাও। জীবনানন্দের অন্তিম পরিণাম ভারতীয় আনন্দধারণার মধ্যে, ব্যাপকতম প্রেমবোধে। হয়তো জীবনানন্দেই ছিল এর আভাস, মিলিয়ে দেবার একটা অতর্কিত আকস্মিক চেহারা – ‘এই সব দিনরাত্রি’, ‘এইখানে সূর্যের’, ‘১৯৪৬-৪৭’ বা ‘অনন্দা’র মতো কবিতাবলিতে ‘অদ্ভুত আঁধারে’র নারকী অভিজ্ঞতার কিছু তাপ এসে লাগে এবং কখনও মনে হয় ‘his feet are always firmly planted in the things of sense, but his will soars on wings of love’৪ দান্তে প্রসঙ্গে ব্যবহৃত এই উক্তি হয়তো জীবনানন্দ বিষয়েও অল্প ভাবা যায় – কিন্তু কেমন করে প্রেমের এই ব্যাকুল পাখা সঞ্চালিত করে দেন তিনি, তা আমরা বুঝতে পারি না যেন। অর্থাৎ ঐতিহ্যের সূত্র বহন করে জীবনানন্দও জানেন না কোনও শুদ্ধিলোক, প্রথম থেকে তৃতীয় পর্বে উত্তীর্ণ হবার মধ্যে তিনিও রাখেন না কোনও মধ্যবর্তী সিঁড়ি। অথচ যে প্রজ্ঞার ওপর নির্ভর করতে চেয়েছিলেন তিনি, তার দ্বারা কি এই সিঁড়ি তৈরি হতে পারত না? যখন তিনি বলেন ‘দান্তের উপলব্ধির শাশ্বত জিনিসে মরচে পড়েছে অনেক দিন হল’ তখন বুঝতে পারি যে ডিভাইন কমেডির ‘চরিত্রকূটের অতিবিষম ঠাসাঠাসি’ ভেদ করে জীবনানন্দও পৌঁছতে পারলেন না এর উপলব্ধিস্বরূপে,৫ – অথচ স্বভাবে তার সঙ্গে আত্মীয়তার কত কাছাকাছি এসে গিয়েছিলেন তিনি। জ্ঞান ও প্রেমের যুগলকে যিনি বাঁধতে চেয়েছিলেন এইভাবে
মানুষের ভাষা তবু অনুভূতিদেশ থেকে আলো
না পেলে নিছক ক্রিয়া ; বিশেষণ ; এলোমেলো নিরাশ্রয় শব্দের কঙ্কাল
জ্ঞানের নিকট থেকে ঢের দূরে থাকে। … …
… … জ্ঞানের বিহনে প্রেম নেই। (১৯৪৬-৪৭)
অনুপম ত্রিবেদীর মতো তাঁর বিষয়েও অবশেষে মনে হল ‘জ্ঞানের চেয়েও তার ভালো লেগে গেল মাটি মানুষের প্রেম।’ তাই ‘ রেলের লাইনের মতো পাতা জ্ঞানবিজ্ঞানের অন্তহীন কার্যকারিতায় / সুখ আছে, সৃষ্টি নেই। অনেক প্রসাদ আছে, প্রেম নেই’ বলে তিনি সরে গেলেন দূরে। ‘মানব প্রাণের রহস্যময় গভীর গুহার থেকে / সিংহ শকুন শেয়াল নেউল সর্পদন্ত ডেকে’ যে মানুষ নিজেরই শব বহন করছে – তার জন্য জীবনানন্দেরও অমোঘ শেষ উচ্চারণ থাকল ‘তবুও নদীর মানে স্নিগ্ধ শুশ্রূষার জল, সূর্য মানে আলো / এখনো নারীর মানে তুমি, কত রাধিকা ফুরালো’। আর এই সূর্য – অন্তজীবনে যে প্রতীক বারংবার ব্যবহার করেন কবি – প্রায় সব সময়েই প্রেমের আলো জ্বালিয়ে রাখে। এ আলো দান্তের অর্থে আসে না, বরং দান্তে যাকে বলবেন তাপ, এ হল তাই
Then I thus began Love & Intelligence, soon as the prime equality appeared to you, became of equal poise to each of you,
because the sun which lightened you and warmed with heat and brightness hath such equality that illustrations all fall short of it.
স্বর্লোক ১৫/৭৩-৭৮
বৈদিক ঋষিরাও জ্ঞানের দেবতার নাম দিয়েছিলেন সূর্য, কিন্তু জীবনানন্দের মতো বিষ্ণু দে-ও যখন আনেন এই প্রতীক, সেও ভালোবাসার টানে ‘সূর্য যেন আকাঙ্ক্ষায় লাল ভালোবাসা’ অথবা ‘সূর্য যেন ভালোবাসা প্রতি ঘরে ঘরে’। তাই তিনিও (যিনি কবিতায় আনেন ‘ব্যক্তিগত উচ্ছ্বাসের প্রাবল্যের চেয়ে ব্যক্তিসমাজের নিহিত ভাষা বিনিময়ের আততি’৬ এবং যাঁর মধ্যে আমাদের অভীষ্ট মিলনের সন্ধান ছিল অনেক দূর পর্যন্ত) অবশেষে তিনিও এই আলো-উত্তাপকে একত্র না বেঁধেই এক সমীকরণ আনেন চণ্ডীদাস আর দান্তের মধ্যে ‘চিরঅস্থির উদাত্ত এক শান্তি / যেমন জেনেছে চণ্ডীদাস বা দান্তে’।++
এখনও পর্যন্ত তাহলে আমাদের কাছে মরমি প্রেমের এই বোধের মধ্যেই গচ্ছিত আছে দান্তের পরিচয়। মধুসূদন-দ্বিজেন্দ্রনাথ-হেমচন্দ্রের বিলাসী নরকভাবনা সরে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু হয়েছিল প্রেমিক দান্তের গান। তাই নরকে নয় আর, আলোড়িত হৃদয়ের জটিল ছবি আনতে গিয়ে এই শতাব্দী বারংবার ফিরে তাকিয়েছে পাওলো-ফ্রাঞ্চেস্কার প্রেমকাহিনিতে।৭
৪
এমনকি ইউরোপীয় আধুনিকদেরও দান্তের তুলনায় ‘slight and shadowy’ ভেবেছিলেন ইয়েটস,৮ পাপ আর দুঃখের তেমন বড় কোনও দিব্যদর্শন ছিল না বলে। এদেশের পক্ষে সে বেদনা স্বভাবতই আরও বেশি সত্য। কিন্তু ইতিমধ্যে সূর্যকরোজ্জল ভূমিতে আমরা যে নিবিড় বিষণ্ণতা নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছি, হতাশ্বাসের পঙ্কপল্বল যেভাবে আমাদের পা দুটি প্রোথিত করে রেখেছে তাকে শুধু একদিনের জ্বর ভাবলে ভুল হবে। এরকম মানুষের জন্য কুরটিউস অবশ্য হাসপাতালের ব্যবস্থা করেন,৯ কিন্তু তাহলে তো সব পৃথিবীটাই হাসপাতালে দাঁড়িয়ে যায়! ইনফেরনোর সপ্তম সর্গে পাপী মানবকদের মতো এখন আমাদেরও মধ্যে বাজছে এই সব কথা
Sullen were we in the sweet air!—
that there are people underneath the water, who sob, and make it bubble at the surface as thy eye may tell thee whichever way it turns.
Fixed in the slime, they say, ‘Sullen were we in the sweet air that is gladdened by the sun, carrying lazy smoke within our hearts ;
now lie we sullen here in the black mire. This hymn they gurgle in their throats, for they cannot speak it in full words.
(প্রেতলোক ৭/১১৮-১২৭)
ভরাট শব্দে কথা বলবার অভ্যাস আবার কবে হবে কে জানে, কিন্তু সে রকম শব্দের পিছনে এখন আমরা অনেক অতিক্রম চাই, প্রজ্ঞাপ্রেমের মিলন চাই, কোনও সহজ সমাধানে আনন্দলোকে উত্তীর্ণ হবার স্বপ্ন আর চাই না এখন। তাই এখন মানবধর্মানুভূতির একটা বিশ্বব্যাপক অভিজ্ঞতা অর্জনের নূতন সময়ে দান্তে হয়তো আমাদের কাছে অন্যভাবে আসবেন, এই রকম মনে হতে থাকে।
সূ ত্র নি র্দে শ
* অবশ্য মনে রাখতে হবে গ্যেটেও এ-রকম বলেছিলেন সাময়িক উত্তেজনাবশে এবং পরে তাঁর ধারণার পরিণতি-পরিবর্তনও ঘটেছিল।
+ রবীন্দ্রনাথের চব্বিশ বছর বয়সে লেখা পুষ্পাঞ্জলি-র কল্পনাপটে কি ভিতা নুওভা-র প্রচ্ছায়া ছিল কিছু? এ প্রশ্নটা এখানে মনে ওঠে। দান্তে বিষয়ক রচনাটিতে তিনি ‘ভিতা নুওভা’র অনুবাদ ও ব্যাখ্যা করেছেন এর মাত্র সাত বছর আগে। পুষ্পাঞ্জলির পাণ্ডুলিপিতে গদ্যাংশের সঙ্গে একটি গানও দেখা যায় (কেহ কারও মন বুঝে না) এবং ‘ যে গেছে সে সমস্ত জগৎ হইতে তাহার লাব্যণ্যচ্ছায়া তুলিয়া লইয়া গেছে’ ধরনের উচ্চারণ অনিবার্যভাবে মনে ধরিয়ে দেয় দান্তেকে ‘After this gentlest of women had left this world, our city remained as though widowed and despoiled of all dignity.’ (গ. ৩১) অথবা আরও দু-একটি অংশ ‘সে আমার জীবনের খেলাঘর এখান হইতে ভাঙিয়া লইয়া গেছে – যাবার সময় সে আমার কাছে কাঁদিয়া গেছে – যাবার সময় সে আমাকে তার শেষ ভালবাসা দিয়া গেছে’ এর সঙ্গে যদি তুলনা করি
‘Since she fled to heaven so suddenly
Leaving Love here to lament with me’ (কা. ৪)
বা, ‘তবে এই অতিশয় কঠিন নিয়মের মধ্যে আমি থাকিতে চাই না। আমি সেই বিস্মৃতদের মধ্যে যাইতে চাই – তাহাদের জন্য আমার প্রাণ আকুল হইয়া উঠিয়াছে’ – এর সঙ্গে
‘So now I call Death here
As my sweet and soothing rest.
Crying ‘Come’! with so impassioned a sigh
I am jealous of all men who die.’ ( কা. ৫)
কিন্তু এসব আপাতদৃশ্যতা লক্ষ করবার মুহূর্তেও স্মরণীয় যে, রবীন্দ্রনাথ কেবল প্রকাশ করেন তাঁর মৃত্যু-অভিজ্ঞতার লিরিক-আবেগ, ভিতা নুওভা ঠিক তা নয়।
++সমীকৃত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথও, যখন বলেছিলেন তিনি ‘বিয়াত্রীচে দান্তের কল্পনাকে যেখানে তরঙ্গিত করে তুলেছে সেখানে বস্তুত একটি অসীম বিরহ। দান্তের হৃদয় আপনার পূর্ণচন্দ্রকে পেয়েছিল বিচ্ছেদের দূর আকাশে। চণ্ডীদাসের সঙ্গে রজকিনী রামীর হয়তো বাইরের বিচ্ছেদ ছিল না, কিন্তু কবি যেখানে তাকে ডেকে বলছে – তুমি বেদবাদিনী হরের ঘরণী তুমি সে নয়নের তারা – সেখানে রজকিনী রামী কোন দূরে চলে গেছে তার ঠিক নেই’।
যাত্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুব
১। ক্রিস্টাবেল, এনশেন্ট মেরিনার আর কুবলা খান যে পর্যায়ক্রমে প্রেতশুদ্ধি স্বর্গলোকের প্রতিরূপ নাইট এক প্রবন্ধে তা সুন্দর করে দেখিয়েছেন (Coleridge’s Divine Comedy G. W. Knight, English Romantic Poets ed. M. H. Abrams p. 158-69) । অথবা অতই বা কেন এনশেন্ট মেরিনারই কি পুরো এই পরিক্রমার কুঞ্চিকা নয়?
২। স্বামী বিবেকানন্দের বাণী ও রচনা, পঞ্চম খণ্ড, পৃ ১২৫, ২২৬।
৩। Nothing could be more universal and nothing could be more individual, nothing even more personal–A History of AEsthetic B. Bosanquet, p. 153
৪। AEsthetic Experience in Religion G. MacGregor, p. 171
৫। কবিতার কথা জীবনানন্দ দাশ, পৃ ৫৫।
৬। একালের কবিতা সম্পা. বিষ্ণু দে, পৃ ৯।
৭। লক্ষণীয় সত্যেন্দ্রনাথ, বিষ্ণু দে ও অলোকরঞ্জনের অনুবাদ।
৮। In Excited Reverie, ed. A. N. Jeffares & K. G. W. Cross, p. 104
৯। European Literature & the Latin Middle Ages E. R. Curtius, p. 596
৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা
(দান্তে বিশেষ সংখ্যা ১৩৭৩)
