পশ্চিমের ঘাটে – শান্তি বসু
হাঃ! হাঃ! হাঃ! তুমি যাই বলো না কেন, তুমি তো জানো, বাস্তবে বাছাই বলে কোনও বস্তু নেই।
ডস্টয়েভস্কি
আমরা আবিষ্কার করেছি যে আমরা আমাদের ভূমিকা জানিনে। একটা আয়না খুঁজছি আমরা। আমাদের সাজ খুলে ফেলতে চাচ্ছি, যা কিছু আমাদের মিথ্যে সরিয়ে ফেলতে চাই, হতে চাই সত্য। কিন্তু ভুলে গেছি এমন একটা টুকরো ছদ্মবেশ, কোথাও তবুও লেগে আছে। আমাদের ভুরুতে একটা আতিশয্যের চিহ্ন থেকে গেছে। দেখতে পাচ্ছিনে যে আমাদের মুখের কোণটা বেঁকে। আর তাই ইতিউতি ঘুরে বেড়াই, যেন একটা বিদ্রূপ আর শুধুই অর্ধেক সত্তা লাভ করিনি আমরা এবং অভিনেতাও নই।
রিলকে
রবীন্দ্রনাথ একবার ভেবেছিলেন পশ্চিমের দুয়ার খুলেছে আমাদের জীবনে, পুব-পশ্চিমের দ্বন্দ্ব বুঝি নিঃসংশয়ে ঘুচেছে। ঘোচা উচিত, কারণ সভ্যতায় আদান-প্রদানে বিরোধের বীজ নষ্ট হয়; আর সম্পূর্ণই যদি নষ্ট না হয় তো বিরোধের নদীতে পারাপারের সেতু জোটে। আরও একবার রবীন্দ্রনাথেরই মনে হয়েছিল শেষ পর্যন্ত বুঝি প্রতীচ্য শুধু বিরোধের বীজই সারা বিশ্বে ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। সভ্যতার সংকটে আমাদের মনে, প্রাচ্যের স্মৃতিতে থাকবে শুধুই জ্বালা, যন্ত্রণা ও তিক্ততার স্বাদ। অথচ, আমরা যারা ইউরোপের চাপে বা আলোয় নতুন জীবনের আস্বাদ পেয়েছি, কার্যত না-হোক, বক্তব্যে, চিন্তায় নতুন জীবন গড়ার আশ্বাসে পশ্চিমের দিকে তাকিয়ে থাকি। নবজাগরণের জোয়ার যদি ভাঁটায় নেমে থাকে তো পশ্চিমের জীবনযাত্রা, কল্পনা ও চর্চা আমাদের এখন মাথায়। মনে করি পশ্চিমের শৌর্য, বীর্য, চিন্তা আমাদের পাড়ানির কড়ি। কার্যতই নয় বা কেন; আমাদের উনিশ শতকের একাংশ নিমচাঁদের ইতিবৃত্ত আর বর্তমান শতকের অধিকাংশই তো ঘরে ফেরার রাস্তা খোঁজে পশ্চিমের খুঁট ধরে। সমাজবিন্যাসের ছক, রাষ্ট্রগঠনের রীতি, শিল্পসাহিত্যের কেন্দ্রিক আত্মসচেতনতা, এককথায় চৈতন্যের রূপটিই আমরা পড়ে পেতে চাই ইউরোপের নজিরে। আত্মাবিষ্কারের প্রশ্নে সহজেই মনে পড়ে বুঝি আমাদের স্বকীয় কোনও পথ নেই, যা কিছু আছে তা নিতান্তই ভাবালুতা, অন্তঃসারশূন্য বাগাড়ম্বর, ফাঁপা আধ্যাত্মিকতার অযৌক্তিক কার্যক্রম। ভালো বা মন্দ যাই হোক, এমনকি সত্যমিথ্যার প্রসঙ্গ না তুলেও জানি, আমাদের কোনও কবি ভারতে বা বাঙলা দেশেই ফেরেন পশ্চিমের সূত্রে, রাজনীতিজ্ঞ তাত্বিকের মনে হয় ভারতীয় সাধনার ধারা য়ুরোপীয় সাধনার খাতেই। হাল আমলের রাজনীতি ঘোরে ইউরোপীয় রাষ্ট্রতত্বের চাকায়; এমনকি তার খুঁটিনাটি ত্রুটিবিচ্যুতি বাদ না-দিয়েই, কী ডাইনে কী বাঁয়ে, ইউরোপের বুলি সর্বত্রই উচ্চারিত হয় মন্ত্রের মতো, যদিও পথ ও ঐতিহ্যের কথা নামাবলির মতো জড়ানো থাকে। আমাদেরও ভাববার কথা ছিল, আমাদেরও যে দেখবার মতো নিজস্ব ভঙ্গি ছিল বা সেই ভাবনা ও দেখার নজির ছড়িয়ে আছে বিরাট দেশের হাজার বছরব্যাপী সংস্কৃতির নানা স্তরে, ঐশ্বর্যের বিচিত্র সম্ভারে, সে কথা সচরাচর মনে পড়ে না। কোনও একজন মধুসূদন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র বা রবীন্দ্রনাথে কথাটা উঠলে আমরা কখনও হকচকিয়ে যাই, কখনও বা চুপিসারে তাদের স্মৃতি ইতিহাস থেকে মুছে ফেলি যেমন মুছে গেছেন মধুসূদন বিদ্যাসাগর বা বঙ্কিমচন্দ্র, আর রবীন্দ্রনাথের মতো কেউ কাঁধে চেপে বসলে হুজুগে স্রোতের ফুলের মতো তাকে ভাসিয়ে দিই ঘোলাজলের বানে। যেমন রবীন্দ্রশতবর্ষের মাতামাতিতে বাঙলাদেশে বাঙলা ভাষার কথা পেছনে পড়ে থাকে আর দেশীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের হিসেবনিকেশ, রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনের শত বক্তব্য সত্বেও, জাতীয় মানসে দাগ কাটে না। আমরা যেমন ছিলুম এতকাল তেমনিই থাকি, ভারতীয় ইতিহাসের ধারা পুথিপত্রেই চাপা পড়ে, জীবনে চর্চার বিষয় হিসেবে গণ্য হয় না, ইউরোপীয় ইতিহাসের গাড়ি আমাদের দাপটের সঙ্গে টেনে নিয়ে যায় তার বাঁধা পথে।
অথচ ইউরোপে নিজের আত্মা বিষয়ে ভাবনাচিন্তার শেষ নেই। সেই আত্মা নিছক ঈশ্বরের প্রতিরূপ কী শয়তানের কাছে বিক্রীত এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ, আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। আমরা অবশ্য কখনও কখনও এলিয়ট কী অন্য কাউকে আউড়ে বলতে ভুলি না যে ইউরোপের মন বর্তমানে অবক্ষয়ের শেষ তলানিতে, সমস্ত জীবনটাই একটা পোড়া পতিত জমি। আমরাও বুঝি ওদেরই মতো শূন্য ফাঁপা মানুষ। ওদের অপরাধ, ওদের গ্লানি আমাদেরও অপরাধ, আমাদেরও গ্লানি। আবার কখনও স্পেঙলার বা টয়েনবির উদ্ধৃতিতে বলতে চাই যে ইউরোপের শেষ আসন্ন, পতনের অনিবার্যতা ইউরোপের ভাগ্যবিধাতা রুখতে পারবে না। অথবা, মার্কসের সুসমাচারে, বর্তমান য়ুরোপের চিতাভস্মের ওপর উঠবে শৃঙ্খলমুক্ত শ্রমিকশ্রেণীর বিজয়সৌধ। প্রাচীন অথর্ব বুর্জোআ সমাজের পাদপীঠ ইউরোপ ভেঙে বদলে নতুন রূপ পাবে আসল ইতিহাসের শুরুতে। প্রাক-পৌরাণিক জীবন অর্থাৎ ইউরোপের প্রাক-ঐতিহাসিক পর্যায় ঘুচবে আগামী সাম্যবাদী সমাজের স্বাধীন সুখি অস্তিত্বে। চক্রাকার ঘুরে এসে ইউরোপের নবীন উদবর্তন হবে কী হবে না, দ্বান্দ্বিক ইতিহাসের পরিণতি সাম্যবাদের অনিবার্যতায় কিনা এ বিষয়ে নানা মুনির নানা মতের সংঘর্ষে আমরা নিশ্চয়ই ব্যতিব্যস্ত, এমনকি শেষ বিচারের ভার আমাদের ওপরেও ন্যস্ত নয় তবু ইউরোপের মনে যে একটা বিরাট সংক্ষোভ উপস্থিত হয়েছে তা বুঝি, তার আঁচ আমাদের গায়ে লাগে। আমাদের কোনও কোনও পূর্বপুরুষ ভেবেছিলেন প্রতীচ্য থেকে আমাদের নেবার প্রধান বস্তু হল যন্ত্র বা যন্ত্রশিল্প আর তার বদলে আমরা দেব আমাদের আধ্যাত্মিকতা। প্রতীচ্য আমাদের প্রাচীন জগতে এসে গেছে ওদের এলাকায় পৌঁছবার অনেক আগে। আমরা যখন তার ধাক্কায় দিশেহারা বা অনেকটাই গ্রহণ করে সেই ছাঁচে নিজেদের গড়তে ব্যস্ত তখন বহু হাত ঘুরে ভারতবর্ষ গিয়ে পৌঁছোল ওই দেশে। চিনের দাপট তার আগে থেকেই। আমাদের শাস্ত্র পাঠ করে, সংস্কৃতির ছিটেফোঁটা পেয়েই ওঁরা ভারত আবিষ্কারে ব্যস্ত হলেন আর আমরা নতুন করে পাঠ নিলুম ওঁদেরই কাছে ভারতবর্ষের আত্মার। ওঁদের কেউ কেউ নিশ্চয় ভাবলেন যে ইউরোপের মুক্তি ভারতবর্ষের পথে, কিন্তু ভারতবর্ষের পরিচয় কখনওই সত্য হল না ওঁদের মনে যেহেতু ভারতীয়দের জীবনেই ভারতবর্ষের রূপ মৃত। আর যে নতুন ভারতবর্ষ, বুদ্ধ ইত্যাদির বাণী আউড়ে সামনে এগোল সেই ভারতবর্ষ ইউরোপেরই একটি নিকৃষ্ট সংস্করণ মাত্র। ফলে ইউরোপের আধ্যাত্মিক সংকটের চেহারা আমাদের সচেতনতায় তেমন স্পষ্ট হয়ে ফোটে না বা এমন কি সত্যিসত্যিই য়ুরোপের যে মৌল সমস্যা থাকতে পারে এমন বোধ আমাদের অনেকের কাছে অস্পষ্ট। যদিও আমরা সংকট, অবক্ষয় ইত্যাদি শব্দ সদাই আউড়ে চলেছি। কারণ, সংকটের বোধ বা সমস্যার রূপ বিষয়ে সচেতন হলে আমরা নকলনবীশ না হয়ে নিজেদের চরিত্র বিষয়েই চিন্তিত হতাম বেশি। যতটুকু আঁচ গায়ে লাগছে তার জ্বালা মনের গভীরে বিশেষ পৌঁছায় না; মন কোনও আত্মজিজ্ঞাসার প্রশ্নেই জাড্য থেকে মুক্তি পায়, কারণ মন অভিজ্ঞতাবাদীদের পরিচ্ছন্ন একটি শ্লেট মাত্র নয়। এমনকি কোন একটি সুদৃশ্য আরশিও নয়।
আমাদের পূর্বপুরুষরা মোটামুটিভাবে সঠিক বুঝেছিলেন যে ইউরোপ দেবে যন্ত্র আর যন্ত্রশিল্প। কারণ যন্ত্রের গৌরবেই ইউরোপের অগ্রগতির গৌরব। যে কোনও ইতিহাসের পুথিতেই আমরা পড়েছি যে ইউরোপের বিস্তীর্ণ মধ্যযুগ জমি ও প্রাক্তন সংস্কারের বেড়াজালে মানুষ ও মানুষের মনকে বেঁধে রেখে দিয়েছিল। টলেমীয় জগচ্চিত্রে মানুষ ছিল নতান্ত সুখি, ঘরকুনো। নিজেকে ছড়িয়ে, গতির অখণ্ড প্রয়াসে, বিশ্বকে জানবার সুযোগ ছিল না তার জীবনে। স্তরবিভক্ত সমাজে উঁচুনিচুর অনুশাসন চেপে বসেছিল জগদ্দল পাথরের মতো। সমাজের ক্রম ও শান্তি স্থির ছিল পরস্পরের স্বীকৃত কর্তব্যে ; যে-যার যথাবিহিত চরিত্রানুগ কাজ করে যাবে এবং নির্দিষ্ট কর্মের সূত্রেই সামগ্রিক শান্তি আসবে জীবনে, ঐশ্বর্য বিকশিত হবে সৃষ্টিকর্তার নিয়মে, যে নিয়ম স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও ভাঙেন না। ঈশ্বরের দিব্যজগৎ ও দৈনন্দিন মানুষের জগতে, আত্মা ও দেহের মধ্যে মৌলিক তফাত নিশ্চয়ই ছিল। তবু দৈনন্দিন জগতের কার্যকারণ জেনে, নির্দিষ্ট সত্তার চাপে পরিচালিত হয়েই দিব্যজগতে উত্তরণের কথা, যেমন এই দেহকে এড়িয়ে নয় দেহের নিয়মকানুন জেনে আত্মার অনুসন্ধান। দৈনন্দিন জগৎ নিশ্চয়ই অসত্য, যেমন অসত্য এই দেহ। আত্মার লক্ষ্যে, দিব্যজীবন লাভের আকাঙ্ক্ষায় দেহকে পরিচালনার কথা ছিল। আর জাগতিক বিশ্বে ঈশ্বরের প্রতিভূ ছিলেন রাজা। এই জগতে যন্ত্র ছিল, কিন্তু যন্ত্রের প্রয়োজন ছিল সীমাবদ্ধ। যন্ত্রকে ঘিরে শিল্পের সম্ভাবনা দেখা দেয়নি। অ্যারিস্টটলের হিসেবে গতি শুধুই চক্রাকারে পরিণতি পেত, সোজা সরল রেখায় চলত না। দিব্যজগৎ ও মানুষী জগতের সেতু রচনা করবার কথা ছিল ঈশ্বরপুত্রের আত্মদানে, তাঁর পুনর্জন্মের ইতিবৃত্ত। এই মধ্যযুগের কল্পনাতেও তাই ইউরোপের বিনাশের কথা লুকিয়ে, আত্মাবিষ্কারের বক্তব্য স্বর্গ ও মর্ত্যের দ্বন্দ্ব ও দ্বন্দ্ব সমাধানে মধ্যয়ুগের এই চিন্তায় ও লক্ষ্যে প্রথম কিছুটা অন্য কথা শোনালেন সন্ত টমাস। তিনি নিশ্চয়ই গির্জার আধিপত্য অস্বীকার করেননি কিন্তু এরিস্টটলের শরণ নিয়েছিলেন এই বলে যে তিনিই জ্ঞানীদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। পুরাণের নজিরে সন্ত টমাস শুধুই মানতে চাননি, জানতেও চেয়েছিলেন। যুক্তি ও বোধিতে কোনও বিরোধ তিনি দেখেননি বরং বুঝিয়েছিলেন তারা পরস্পর সম্পূরক। এরা একই সত্য, ঈশ্বরের সত্যকেই বিভিন্নভাবে প্রকাশ করে। যদি কখনও বিরোধ ঘটে – সন্ত টমাস জানতেন বিরোধ নিশ্চয়ই ঘটে-তবে যুক্তির পাল্লা বোধির চাইতে হালকা; অবশ্যই মানুষের চিন্তাতে বিরোধের কার্য-কারণ। প্রকৃতির জগৎ ও ঈশ্বরের করুণার ক্ষেত্রে কোনও বিরোধ নেই, যে যার ক্ষেত্রে পূর্ণ ও নিজের নিয়মে অধিষ্ঠিত। সুতরাং সন্ত টমাসের ব্যাখ্যায় পদার্থবিদ্যা বিশ্বাসের হাত থেকে ছাড়া পায়। টমাস-গুরুশ্রেষ্ঠ এলবার্ট ঘোষণা করেন যে প্রাকৃতিক ঘটনার কোনও ব্যাখ্যাই মিলবে না ন্যায়ে বা ধর্মের অনুশাসনে, প্রকৃতি নিজেকে খোলে বিশেষ অভিজ্ঞতায়। টমাস দেখিয়েছেন অধিবিদ্যার আলোচ্য নিশ্চয়ই প্রাথমিক বা আদি কারণ কিন্তু আদি কারণই একমাত্র কারণ নয়। বিশ্বের সমস্তই, যা কিছু সীমাবদ্ধ, আংশিক ও ইন্দ্রিয়জ, ঈশ্বরের সৃষ্টি ; এ কারণেই তারা ঈশ্বরের পূর্ণতায় অংশগ্রহণ করে এবং তাদের স্বকীয় ক্রম ও সৌন্দর্য আছে। তারা অবশ্যই পরিপূর্ণ সৌন্দর্য লাভ করে না যেহেতু তাদের সৌন্দর্য অংশগ্রহণের ফলে তবু নিজেদের সীমায় তাদের তাৎপর্য পূর্ণতার। দিব্যজগৎ ও ইন্দ্রিয়ের জগতে যে পুরানো বিরোধ ছিল মধ্যযুগের গোড়ায় সন্ত টমাস সেই বিরোধ ঘোচালেন এবং জানালেন যে মানুষ কেবলমাত্র দুটি সম্পূর্ণ পৃথক ও বিরোধী পদার্থের মিশ্রণ নয়, মানুষ পরিপূর্ণ একটি ঐক্য। সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের ক্ষেত্রে কর্মের স্বাধীনতা স্বীকৃত হল। নিজের চেষ্টায় ন্যায় ও সত্যের জগৎ গড়ে নেবার কথা এল। আর এই সূত্রেই পরবর্তী কাল এল জ্ঞানের নতুন সম্ভাবনা নিয়ে। ব্রুনো, কেপলার, গ্যালিলিও হয়ে প্রকৃতি-বিজ্ঞান নিউটনে এসে একটা চুড়ান্ত রূপ পেল। ঈশ্বরের দিব্যজগৎ ও প্রাকৃতিক জগতের দ্বন্দ্ব চাপা পড়ে থাকে পিছে। সমাজের স্তরবিন্যাস ধাক্কা খেল যন্ত্রশিল্পের সম্ভাবনায়। উৎপাদনের নতুন ব্যবস্থায় জমি থেকে ছাড়া পেয়ে মানুষ নিজেকে ছড়াতে চাইল মুক্তির সম্ভাবনায় বিরাট বিশ্বে। সমস্ত বিশ্বজগতে মানুষের কর্তৃত্বের প্রতিরূপ হল যন্ত্র। অমিত শক্তির অধিকারী মানুষ পৃথিবীকেই একটি যন্ত্র বলে ধরে নেয়। লাপলাসের গর্বিত উক্তিতে উচ্চারিত হয় মানুষের সৃষ্টিজয়ের সংকল্প। ঈশ্বরের স্থানে প্রকৃতিই প্রধান হয়ে ওঠে, ঈশ্বরের দিব্যজগতেও মানুষের হাত পৌঁছতে চায়। নবজাগরণের চূড়ায় উনিশ শতক পর্যন্ত বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সংশয়ের চিহ্ন নেই কোনও, সর্বত্রই মানুষের বিজয় ঘোষণা।
অথচ এই যন্ত্র, যন্ত্রশিল্প ও মানুষের অনায়াস-অর্জিত ক্ষমতাই বর্তমান ইউরোপের সবচেয়ে বড় সমস্যা। প্লেটোর জগতে যন্ত্রের ছায়া বিরাট হয়ে পড়েনি কিন্তু ক্ষমতার দাপটে তিনি চিন্তিত হয়ে উঠেছিলেন। একটি নৈতিক পরিবেশের কল্পনায় তিনি মথিত হয়েছিলেন ; তাঁর সমসাময়িক জগতে রাষ্ট্র ও শক্তির চাপ তৈরি করেছিল তাত্বিক সোফিবাদীরা। আদর্শ রাষ্ট্রের আলোচনায়, তাঁরা বলতেন, একমাত্র ক্ষমতাই সমস্ত সমস্যা দূর করতে পারে। ‘ক্ষমতাই ন্যায়’ এই তত্ব আমদের মতো এথেনীয়দের মাতাতে দেরি করেনি। ন্যায়ের ভাবনায় চিন্তিত প্লেটোর সমস্ত চেষ্টায় ছিল এই তত্বকে অস্বীকার করা, এই তত্বের সম্ভাবনাকেই নির্মূল করা। প্রথম লড়াই তিনি শুরু করেন ‘জর্জিয়স’ গ্রন্থে সোক্রাতেস ক্যালিকলসের আলাচনায়, দ্বিতীয় পর্ব পাই বিখ্যাত ‘রিপাবলিক’ গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে থ্র্যাসিমেকস ও সোক্রাটেসের বাক্যযুদ্ধে। সোক্রাতেসের মুখে প্লেটো প্রশ্ন তোলেন সমস্ত কামনা ও আবেগের লক্ষ্য কী? শুধুমাত্র চাইবার জন্যেই কেউ চায় না প্লেটো জানতেন, প্রতিটি বাসনার লক্ষ্য থাকে এবং সমস্ত প্রয়াসই সেই লক্ষ্যের সঙ্গে বাঁধা। কিন্তু ক্ষমতার বাসনায় কোনও ছেদ নেই। এই বাসনার চরিত্রই হল সীমাহীন দাবি; কোনও এক রাজা ক্যানিউট এসে বলবে না, আর নয়- এটুকুই শুধু। প্লেটোর ভাষায় এই বাসনার তৃপ্তি ফুটো পাত্রে জল ঢালবার মতো। জীবনে ক্ষমতার এই লোভকে প্লেটো পাপ মনে করতেন, নাম দিয়েছিলেন, ‘প্লিও-নেক্সিয়া’ অর্থাৎ আরও আরও-র জন্য অতৃপ্তবাসনা। প্লেটোর কল্পনায় তাই একদিকে, ‘ন্যায়’ ও অন্যদিকে ‘ক্ষমতার লোভ’; এই দুই বিরোধী বাসনার টানাপোড়েনে মনুষ্যত্বের পরীক্ষা। নীতির প্রমাণ ‘ন্যায়’-এর কষ্টিপাথরে আর মানুষ তখনই পূর্ণ যখন সে তার জীবনে ন্যায়কে প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। প্লেটোর চিন্তার আলোতেই আধুনিক ইউরোপের সংকট প্রত্যক্ষ হয়ে ওঠে। যে যন্ত্র মানুষকে বিশ্বের কেন্দ্রে বসিয়েছিল সেই যন্ত্রই আজ মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। যন্ত্র হয়ে উঠেছে যন্ত্রী। বিজ্ঞানের হাতে মারণাস্ত্র জমে উঠেছে বিভীষিকার সংকেতে আর স্রষ্টা বৈজ্ঞানিকরা অবোধ বিস্ময়ে ভাগ্যের কার্য-কারণ তত্বে দিশেহারা। মানুষের কল্যাণের বদলে মানুষের জ্ঞান মারণাস্ত্রের রাজনীতির ঘুঁটি। আত্মহননের প্রতিটি ধাপ তৈরি করছে মানুষ নিজে। অগ্রগতি ও আবিষ্কারের নিজস্ব যুক্তিতে যন্ত্র ও যন্ত্রের দাপট ক্রমেই বেড়ে চলেছে এবং এই ফ্র্যাঙ্কেনস্টাইনের ছায়া বর্তমানে সারা বিশ্বে। মানুষ যন্ত্রের নজিরে নিজেরাই যন্ত্র হয়ে পড়েছে। মধ্যযুগের মানবিক সম্পর্কের শৃঙ্খল ভেঙে দুটি মানুষের মধ্যে নৈর্ব্যক্তিক বন্ধন এনেছে যন্ত্র এবং যন্ত্রের বন্ধনে যেহেতু মানুষের প্রয়োজন নেই মানুষেরাই প্রাণহীন পুতুল হয়ে উঠছে। যন্ত্র যেমন মানুষের হয়ে কাজ করে দেয়, মানুষকে নির্ভরশীল করে তোলে তেমনি, ইউরোপের মনীষীরা সোচ্চারে ঘোষণা করছেন, সমস্ত দেশ জুড়ে সাধারণ মানুষরা অন্যনির্ভরশীল ছায়ামূর্তি হয়ে উঠেছে। যুক্তিবান, স্বাধীন বিবেকি মানুষ নয়; জনসাধারণ, নামহীন গোত্রহীন একটা পিণ্ড। একটা কবন্ধ যেন, যে কেবল অন্যের দ্বারা চালিত হয়, যার সম্মিলিত বাহুতে অমিত বীর্য কিন্তু যার কোনও মস্তিষ্ক নেই, চোখ নেই, হৃদয় নেই। যন্ত্রের চাপে, যন্ত্রের সর্বগ্রাসী কর্তৃত্বের প্রভাবে ব্যক্তি যে নিষ্পেষিত হয়ে একটি সাধারণীকৃত সূত্র হয়ে উঠবে সমাজতত্ব বা রাষ্ট্রতত্বের সতরঞ্চে সে কথা ব্যক্তি-স্বাধীনতার গুরু জন স্টুয়ার্ট মিলের নজর এড়ায়নি। তিনি লিখেছিলে লিবাটি গ্রন্থের চতুর্থ অধ্যায়ের শেষ অনুচ্ছেদে
The combination of all these causes forms so great a mass of influences hostile to Individuality, that it is not easy to see how it can stand its ground. It will do so with increasing difficulty, unless the intelligent part of the public can be made to feel its value––to see that it is good that there should be difference, even though not for the better, even though, as it may appear to them, some should be for the worse. If the claims of individuality are even to be asserted, the time is now, while much is still wanting to complete the enforced assimilation. It is only in the earlier stages that any stand can be successfully made against the encroachment. The demand that all other people shall resemble ourselves grows by what it feeds on. If resistance waits till life is reduced werely to one uniform type, all deviations from that time will come to be considered impious, immoral, even monstrous and contrary to nature.
যন্ত্র সব এক ছাঁচে ঢালে, কারণ যন্ত্র হল নৈর্ব্যক্তিক একটি মাধ্যম যা নিজের প্রয়োজনে নির্দিষ্ট ছাঁচ গড়ে, নিজেকে প্রতিটি মুহূর্তে ভেঙে ভেঙে ব্যক্তির প্রাতিস্বিকতায় আত্মাকে ব্যস্ত করে না। কারণ, যন্ত্রের আত্মা নেই এবং উৎপাদনের প্রয়োজনই তার প্রয়োজন। উৎপাদনে সংখ্যার হিসেব। ফলে সভ্যতায় গড়পড়তা মানুষের, সংখ্যার লক্ষ্যটাই প্রধান। তখন যন্ত্রের হিসেব মতোই সাধারণ নিয়ম বা সূত্রের চালে জীবন চালাতে সুবিধে। ব্যক্তি বা ব্যক্তিত্বের প্রশ্নে যন্ত্রের গতি ব্যাহত হয়। বৈদ্যুতিক বোতাম টিপে দূরবর্তী যন্ত্র চালাবার কৌশলে ব্যক্তিদেরও চালানো হচ্ছে জনসাধারণ নামক বস্তুপিণ্ডের আকারে। সামনে শুধু আশার ছলনা, ভবিষ্যতের রঙিন স্বপ্নবিলাস।
যন্ত্র ও যন্ত্রকৌশলকে ঘিরে ইউরোপের সংকটের দ্বৈতরূপ। যন্ত্রের অনন্ত সম্ভাবনার পরিণতি একদিকে মারণযজ্ঞের লেলিহান আগুন ও অন্যদিকে ব্যক্তির ওপর নির্বিশেষ জনসাধারণের অন্ধ দাপট। কুরি, রাদারফোর্ড, আইনস্টাইন, বোর, হাইসেনবার্গ এই অসামান্য পদার্থতত্ববিদদের জ্ঞানার্জনের চুড়ান্ত ‘সিদ্ধি’ পারমাণবিক অস্ত্রসজ্জায় বৈজ্ঞানিকদের আত্মবিক্রয়ে। অথচ একথাও জানা যে মানুষের অস্তিত্বের প্রাথমিক অবলম্বনই হল যন্ত্র, তার হাতিয়ার। উন্নত যন্ত্রকৌশলের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সভ্যতার প্রতিটি ধাপ। সভ্যতার আদিতে প্রথম হাতিয়ার ও আগুন মানুষকে ঠেলে দিয়েছে বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে, নিয়ে এসেছে জটিল যন্ত্রবিন্যাসের রাজপথে। আর সঙ্গে সঙ্গেই মানুষের সামনে কঠিন প্রশ্নটি মাথা তোলে, এই যন্ত্রকৌশল দিয়ে সে কী করবে! কারণ মানুষের ভাগ্যে একই সঙ্গে জড়িত তার বিচিত্র সম্ভাবনা আর তার অন্ধ নিয়তি, হুব্রিস ; কারণ মানুষের হৃদয় ন্যায়ের সঙ্গেই শঠতায় পূর্ণ, সত্যেরা সঙ্গে অসত্যে। চিনের তাও কল্পনায় আদিতে যে অখণ্ড শান্তির ছবি ছিল তা ভাঙে মানুষের উদ্দেশ্য প্রণোদিত কাজে, আবিষ্কারে, কৃষিতে। যন্ত্রকৌশল এই অন্যায়ের একটি হাতিয়ার। যন্ত্রকৌশলের তাড়নাতেই মানুষ সহজে তার স্বাভাবিকতা হারায়, অন্যায়ের পথে, লোভের পথে পা বাড়ায়। কনফুসিয়সের এক শিষ্যের সঙ্গে একটি মালির কথোপকথনে জানতে পারি এই উভবলী টানের কথা। পাথরের সিঁড়ি বেয়ে জল টেনে এনে সেই মালিটি অনেক কষ্টে বাগানে জল দিচ্ছে একদিন। কনফুসিয়সপন্থী দেখতে পেয়ে তাকে নতুন এক আবিষ্কারের কাহিনি শোনায়। দ্বিধাহীন জবাব আসে মালির, ‘যেখানেই অসৎ আবিষ্কার সেখানেই তার অসৎ ব্যবহার, আর যেখানে অসৎ ব্যবহার সেখানেই অসৎ হৃদয়। অসৎ হলে হৃদয়ের শুদ্ধতাই নষ্ট। আমি আবিষ্কারটি জানি কিন্তু ওটা ব্যবহার করতে আমি লজ্জিত।’ বোঝাই যাচ্ছে যন্ত্রকৌশলতত্ব দিয়ে যন্ত্রকৌশলের সংকট ঘোচে না। সমস্যা মানুষের, মানুষের হৃদয় পরিবর্তনের।
কিন্তু মানুষের হৃদয়পরিবর্তনের সমস্যাই জটিল হয়ে উঠেছে ইউরোপে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রের চাপে। ব্যক্তি যে নির্বিশেষ জনসাধারণে পরিণত হচ্ছে তার প্রধান কারণও রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ। প্লেটো যদিও জেনেছিলেন যে ক্ষমতার দ্বন্দ্বে মানুষে মানুষে হানাহানি অনিবার্য এবং সেই সংঘর্ষের জগতে ন্যায়নীতির প্রশ্ন নেই এবং সেই জ্ঞানের সূত্রে আদর্শ রাষ্ট্রের শুধু পরিকল্পনাই করেননি কার্যত তা রূপ দিতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ফিরেছিলেন, তবু প্লেটোর নজির ইউরোপের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করে না। সন্তু টমাসের প্রভাবে মধ্যযুগের ব্যক্তির নিজস্ব কর্মের ক্ষেত্র প্রস্তুত হল, নবজাগরণ আনল নতুন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রতত্ব ও পরিকল্পনা যদিও ব্যক্তির স্বাধিকারের ওপর দাঁড়িয়ে তবু ব্যক্তির স্বার্থের এমনই তাড়না যে প্রগতির মধ্যপাদেই ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে স্বার্থপরতার বিরোধ প্রকট হয়ে ওঠে। ঈশ্বরের প্রতিভূ রাজা যদিও ক্রমশই ক্ষমতাহীন হতে থাকে, রাষ্ট্রকর্ণধারদের দাপট বাড়তে দেরি হয় না। ব্যক্তির প্রত্যক্ষ শাসনের বদলে নৈর্ব্যক্তিক যন্ত্রের ক্ষমতা আকাশ পরিমাণ হয়ে ওঠে। রাষ্ট্রশক্তির প্রতিভূ আর রাষ্ট্রের কর্ণধার জনসাধারণ বা জনসাধারণের প্রতিনিধিই হোক না কেন রাষ্ট্রশক্তির কাছে প্রত্যেকে নতি স্বীকার করতে বাধ্য। দার্শনিক হবস রাষ্ট্রের এই চরম ক্ষমতার কথা শোনালেন এবং ইতিপূর্বেই মাকিয়াভেলি তাঁর প্রিন্স গ্রন্থে আধুনিক রাষ্ট্রের পত্তন করেছেন। ঈশ্বরকে মাকিয়াভেলি অপ্রয়োজনীয় বোধে পরিত্যাগ করেন তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যে এবং এ কথা জানাতে ভেলেন না যে ঈশ্বরবিশ্বাসী ব্যক্তিরা কখনই ভালো যোদ্ধা হবে না যদিও তারা ভালো সামাজিক মানুষ হতে পারে। আসলে তিনি জানাতে চাচ্ছেন যে রাষ্ট্রের সঙ্গে বা রাজপুরুষের সঙ্গে গির্জার কোনও যোগ নেই। শক্তিই মূল লক্ষ্য। এ কারণেই তিনি লেখেন
A prince ought to know how to resemble a beast as well as a man, upon occasion and this is obscurely hinted to us by ancient writers who relate that Achilles and several other princes in former time were sent to be educated by Chiron the Centaur; that as their preceptor was half-man and half-beast, they might be taught to imitate both natures since one cannot long support itself without the other. Now, because it is so necessary for a prince to learn how to act the part of a beast sometimes, he should make the lion and the fox his patterns for the lion has not cunning enough of himself to keep out the snares and toils ; nor the fox sufficient strength to cope with a wolf So that he must be a fox to enable him to find out the snares, and a lion in order to terrify the wolves.
প্রজাতান্ত্রিক রুশো অবশ্য জনসাধারণের ‘সাধারণ ইচ্ছা’র কথা বলেন কিন্তু সাধারণ ইচ্ছার হিসেব গুলিয়ে ফেলায় তিনি জবর-দস্তিতে সংখ্যালঘুকে মানিয়ে নেবার কথা তোলেন, যে রন্ধ্রপথে সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রকর্তৃত্বের প্রস্তাব আনেন হেগেল। রুশোর সাধারণ সরল ‘সাধারণ ইচ্ছা’কে হেগেল ‘পরমভাব’ ও ‘চৈতন্যে’-র সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে দেন যে পরমভাবের চূড়ান্ত প্রকাশ রাষ্ট্রের মধ্যেই ঘটতে থাকে। যদিও তিনি নেপোলিয়নে ব্রহ্মকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন তবু প্রুশীয় রাষ্ট্রের হাতেই জীবন ও জগতের শেষ এবং সর্ববিধ ক্ষমতা ছেড়ে দিতে দার্শনিক প্রস্তাবনা দিয়েছিলেন যেহেতু –
The State is the spirit that dwells in the world and realizes itself in the world through consciousness … It is the course of God through the world that constitutie the State …
ঐতিহাসিক ক্রমপরিণতির ধারায় যে হেগেলীয় বক্তব্য রাষ্ট্রের হাতে অমোঘ ও সর্বগ্রাসী কর্তৃত্ব তুলে দেয় তারই সম্প্রসারিত কাঠামো দেখতে পাই ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ও সাম্যবাদের রাষ্ট্রতত্বে। একথা নিশ্চয়ই ঠিক যে ফ্যাসিবাদী গণতন্ত্রের মতোই রাষ্ট্র অব্যয়-অক্ষয়, কিন্তু মার্কসীয় সাম্যবাদে রাষ্ট্রের মৃত্যু ঘোষিত। তবু কার্যত হেগেল-পন্থী এই দুই বক্তব্যে রাষ্ট্রের বাহু জীবনের সর্বস্তরেই প্রসারিত। প্রাক-সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থায় শ্রমিকশ্রেণীর রাষ্ট্র শ্রেণীশত্রুনিরোধের যন্ত্র অর্থাৎ নিষ্পেষণের যন্ত্র এবং সাম্যবাদী দলের কর্তৃত্বে এই রাষ্ট্র শেষ পর্যন্ত দলীয় স্বার্থের বাহন। শ্রেণীর বিচারে যেহেতু ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রশ্ন গৌণ, মার্কসীয় রাষ্ট্রতত্বে ব্যক্তির প্রসঙ্গ নিতান্তই অবান্তর। দল-ব্যাখ্যাত সত্য বা দলপ্রধান ব্যাখ্যাত সত্যই সত্য, রাষ্ট্র এই সত্যের বাহন মাত্র। ব্যক্তি এই রাষ্ট্রে একটি সংখ্যা বা সমাজতত্বের গড়পড়তা হিসেব, তার ভাগ্য সাম্যবাদী দলের উত্থানপতনের নিয়তির সঙ্গে জড়িত সাম্যবাদী ও ফ্যাসিবাদী বক্তব্যের পাশে নিশ্চয়ই গণতান্ত্রিক বক্তব্য আছে, যেমন কান্টে, জন স্টুঅর্ট মিলে, টমাস হিল গ্রিনে কিন্তু গণতন্ত্রের প্রত্যক্ষ হিসেবে অভিজ্ঞতায় এতই গোঁজামিল যে সাম্যবাদের ধাক্কা তার পক্ষে সহ্য করা অসম্ভব। মার্কস সঠিক ভাবেই দেখিয়েছিলেন যে যন্ত্রের নিয়ামক মানুষেরা বুর্জোয়া সমাজে ব্যক্তিগত স্বার্থে পরিচালিত, তাই যন্ত্রও ব্যক্তিগত স্বার্থ ও হিংসার বাহন। মার্কস আরও দেখিয়েছিলেন যে একদিকে ব্যক্তিগত মালিকানা ও মালিকানা-জাত লাভ আর অন্যদিকে সামাজিক সংগঠিত উৎপাদন ও ব্যক্তিগত ও শ্রেণীগত অভাব। তাই মার্কসের চিন্তায় শোষণ নির্মূল করার ছবি ফুটোছিল সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর ক্ষমতা দখলের সংগ্রামে। ব্যক্তির স্বাধীনতার প্রশ্নে মার্কস বলতে চেয়ছেন যে গণতন্ত্রের সার্থকতা কখনওই অর্থনৈতিক শোষণমুক্তি ছাড়া সম্ভব নয়। সাম্যবাদই শ্রেষ্ঠ গণতন্ত্র।
গণতন্ত্রের বিশৃঙ্খল নৈরাজ্যে, একচেটিয়া মালিকানার নিয়মে ব্যক্তির স্বাধীনতা নিশ্চয়ই সীমাবদ্ধ। রাষ্ট্রে সঞ্চিত শক্তি ও ব্যক্তির অধিকারের সীমা ও গুরুত্ব এখনও সবিশেষ নির্ধারিত হয়নি। এবং স্বভাবতই তাই অর্থনীতির যুক্তিতে বিচ্ছিন্ন একক ব্যক্তি সংগঠিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের চৌহদ্দিতেই নিজেকে একা, নিঃসহায় বোধ করবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাস গণতন্ত্রের পীঠস্থান যুক্তরাজ্য পর্যন্ত সর্বত্রই এক ইতিহাস। এ কারণেই দেশজুড়ে একটা অলক্ষ্য চাপ থাকে চিন্তায়, রুচিতে, ব্যবহারে নির্দিষ্ট ছাপ ফেলে দেবার দিকে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যেমন, আমরা কেন মার্কিন মনীষীরাও, ইয়াঙ্কি-অন্ধতা ও বোধহীন রুচিবিকারের কথা বলেছেন। শুধু হালের রিজম্যানরাই নয়, সাবেকি ফরাসি দ্যটকেভিলও এমন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। জন স্টুয়ার্ট মিলের দুশ্চিন্তা তাই প্রায় নিছক সত্য হয়ে উঠেছে। আর ফ্যাসিবাদী দেশে বা সাম্যবাদী রাষ্ট্রে মিল কথিত ‘enforced assimilation’ তো সর্বজনস্বীকৃত ঘটনা। মার্কসবাদীদের এ বিষয়ে লজ্জিত হবার কোনও কারণ নেই যেহেতু তাঁরা শ্রেণীকে মানেন, ব্যক্তিকে নয়। শ্রেণীবিলোপের আগে ব্যক্তির কথা মার্কসীয় শাস্ত্রে যেহেতু থাকতে পারে না, বাধ্যতামূলকভাবে নির্দিষ্ট ছাঁচ গড়ার আপত্তি কোথায়? গণতন্ত্রে কবন্ধ ‘জনসাধারণ’ আর সাম্যবাদী রাষ্ট্রের কবন্ধ ‘শ্রেণী’। গণতন্ত্র অবশ্য মৌল স্বাধীনতার কথা বলে, সাম্যবাদের সে দায় একমাত্র সভ্যতার বর্তমান পর্ব শেষ হলে। তাই উচ্ছ্বাসের প্রাবল্যেও রুশ শিক্ষাব্যবস্থায় নির্দিষ্ট ছাঁচের ছায়া রবীন্দ্রনাথের নজরে পড়েছিল।
কী সাম্যবাদ কী গণতন্ত্রে স্বতঃই যে রাষ্ট্রের ক্ষমতা সর্বগ্রাসী হয়ে উঠতে চায় তার কারণ ইউরোপের ইতিহাসের মৌল ঝোঁকে নিহিত। ভারতবর্ষের প্রতিপক্ষে, ইউরোপে সভ্যতার শুরু থেকেই দৃঢ়, কঠিন সংগঠন গড়ে উঠেছে। ইউরোপীয় সভ্যতার গুরু প্রাচীন গ্রিক মানসেও এই সংগঠনের চিন্তার ছাপ আছে। মানুষের স্বাধীনতা ও মুক্তি বিষয়ে যদিও গ্রিকেরা চিন্তিত ছিল, যদিও ইউরোপে সর্বপ্রথম ব্যক্তির অধিকার ও দায়িত্বের কথা গ্রিসেই উচ্চারিত হয় তবু সমাজবিন্যাস শোষণের ব্যবস্থা গ্রিকসংগঠনের প্রমাণ দেয়। সংগঠন নিশ্চয়ই প্রত্যেক সমাজব্যবস্থার ভিত্তি, কিন্তু গ্রিসে এই সংগঠনের রূপ মানুষের সত্তার ‘স্বাভাবিকতার’ নজিরে এমন ভাবে বেঁধে ফেলার চেষ্টা হয় যে ব্যক্তির স্বাধীনতার ক্ষেত্র সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। স্বয়ং অ্যারিস্টটল দাসপ্রথার বিরুদ্ধে তেমন জোরালো প্রতিবাদ করেন না, আর মহৎ দার্শনিক প্লেটো মানুষের মনকে ত্রিবিধ ভাগে ভাগ করে ধাতুর নজিরে শ্রেণীবদ্ধ করেন গুণাগুণ ছকে। গ্রিসে অবশ্য পাকাপাকিভাবে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভিত্তি স্থাপিত হয় না, হয় পরবর্তী রোমে। সাম্রাজ্যবাদী রোম সমাজসংগঠনের ক্ষেত্রে গ্রিসকে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ায়। এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো শোষণের ওপর তৈরি হয় যার ছাপ এমন কি খ্রিস্টীয় গির্জা-সংগঠনের ওপর দেগে থাকে। স্তরবিভক্ত সমাজের ছবি মধ্যযুগ পায় রোমক রাষ্ট্রবিন্যাসে ও খ্রিস্টীয় সংগঠনে। ব্যক্তি এখানে গোষ্ঠী ও শ্রেণীতে বিভক্ত। খ্রিস্টীয় গির্জা-সংগঠনে ব্যক্তি তার নির্দিষ্ট বীজমন্ত্র ও গির্জা অবলম্বন করেই জীবন গড়ে। এর বাইরে তার স্বাধীনতার সীমা বিস্তৃত নয়। ব্যক্তির নিজস্ব সম্ভাবনা ও পরিণতি স্পষ্টতই রাষ্ট্র ও ধর্মের অনুশাসনে চালিত। ইউরোপের ইতিহাসে তাই সমাজের চাইতে রাষ্ট্রের দাপট বেশি, ধর্মের চাইতে গির্জার। ফলে স্বভাবতই ইউরোপে সর্বগ্রাসী কর্তৃত্বের মনোভাব ও সংগঠন গজিয়ে ওঠে, একনায়কতন্ত্র দাপটে রাষ্ট্রপরিচালনা করে। যন্ত্রকৌশল ও যন্ত্রপ্রসঙ্গে দেখিয়েছি যে ইউরোপের সমস্যা হৃদয় পরিবর্তনের সমস্যা। আপাত সরল এই ভারতীয় বা কনফুসীয় মৌল সমাধানের ক্ষেত্রটি যে কত জটিল তার প্রমাণ মিলবে জীবনে নীতিপ্রয়োগের ক্ষেত্রে। মার্কসবাদীরা বলে হৃদয় পরিবর্তন নির্ভর করে সংগঠন পরিবর্তনের ওপর। সমাজবিন্যাস বদলাতে পারলেই প্রায় যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে মানুষেরা বদলে যাবে। ইউরোপে মার্কসবাদী ও অ-মার্কসবাদীদের নীতিশাস্ত্রের আলোচনায় ধরা পড়ে তারা কে কেমনভাবে নিয়তই ভাবের ঘরে চুরি করছে। নীতিশাস্ত্রের নজির এ কারণে যে মানুষের জীবনযাত্রা ও জীবনযাত্রার মূল্যবোধে চরিত্রের ও সংস্কৃতির পরিচয়। কোনও সংস্কৃতিই তার নীতির পরীক্ষা না দিয়ে স্বীকৃত হতে পারে না। ইউরোপে যন্ত্র ও মনুষ্যত্বের যে সমস্যার পরিচয় আমি তুলেছি তার স্বরূপ আরও স্পষ্ট হবে বর্তমানে চালু নীতিবিরোধী দার্শনিকতার কয়েকটি মতামত বিচার করলে।
পাশ্চাত্য দর্শনের ইতিহাস গ্রন্থে রাসেল লেখেন, ‘আগুয়ান দেশে প্রয়োগ তত্বকে অনুপ্রেরিত করে, অন্যত্র তত্ব প্রয়োগকে।’ প্রাচ্যের তুলনায় প্রতীচ্য নিঃসন্দেহেই উন্নত, কাজেই তার তত্বের চরিত্র প্রয়োগের ক্ষেত্রে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। যেমন জীবনে ন্যায়নীতির প্রশ্নে রাসেল নিজেই লেখেন
If we all agreed, we might hold that we know values by intuition. We cannot prove, to a colour-blind man, that grass is green and not red. But there are various ways of proving to him that he lacks a power of discrimination which most men possess, whereas in the case of values are no such ways, and disagreements are much more frequent than in the case of colours…Hence, the conclusion is forced on us that the difference is one of tastes, not one as to any objective truth.
এই বক্তব্যে আমরা জানছি যে মূল্যবোধের কোনও বিচার্য মান নেই। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে অসংখ্য বিভেদের মতো রুচিতেও অসংখ্য পার্থক্য। মূল্যের বোধ সম্পূর্ণ রুচি-নির্ভর। বিভিন্ন রুচি বিষয়ে কারও কোনও তাত্বিক বক্তব্য থাকতে পারে না। সুতরাং মূল্য বিষয়েও কোনও তাত্বিক আলোচনা সম্ভব নয়। রাসেলের এই উক্তি প্রত্যক্ষবাদীদের নীতিশাস্ত্র বিষয়ক তত্বের একটি অংশ। বর্তমানে সারা পৃথিবীতে প্রত্যক্ষবাদীদের প্রচণ্ড দাপট। তাঁরা বোঝাতে চাচ্ছেন নীতিশাস্ত্র বলে সত্যিই কিছু হয় না, নীতিশাস্ত্রের কোনও বচনই সত্যবচন নয়। যে যে উক্তি নীতিশাস্ত্রে আমাদের আলোচ্য তা একান্তই আবেগ-প্রধান, আমাদের মনোভাব মাত্র সুতরাং ন্যায়ের বচন নয়। অধ্যাপক এয়ার যেমন লিখেছেন ‘কোনও বচনে নীতিশাস্ত্রের প্রতীক থাকলেই তার তথ্যগত তাৎপর্য বাড়ে না। তাই যদি কাউকে বলি, ‘ওই টাকা চুরি করে তুমি অন্যায় করেছ’ তবে আমি ‘তুমি টাকা চুরি করেছ’ বাক্যটির চেয়ে অন্য বাড়তি কিছু বলতাম না। ‘তুমি অন্যায় করছ’ এইটুকু জুড়ে দিলেই এ বিষয়ে বাড়তি মন্তব্য করা হচ্ছে না। আমি শুধুমাত্র আমার নৈতিক অসমর্থন প্রকাশ করছি। যেন ‘তুমি টাকাটা চুরি করেছ’ বলেছি ভয়ের এক বিশেষ কণ্ঠস্বরে, বা কয়েকটা বিশেষ আশ্চর্যবোধক চিহ্ন জুড়ে ওটা লিখেছি।’ এই তত্বের নানাবিধ ভ্রান্তির মধ্যে প্রধান একটি হল এই মূল্যকে তার স্বাভাবিক স্থান থেকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে। যেমন ধরা যাক আমি ‘ক’ বাবুর বন্ধু। আমার প্রতি ওঁর অখণ্ড বিশ্বাস ও শ্রদ্ধা। কিন্তু আমি সামান্য কৌশলে ওঁর উইলটা পালটে সমস্ত সম্পত্তি নিয়ে নিলুম আর জলের সঙ্গে বিষ দিয়ে ওঁর জীবন শেষ করে দিলুম। ‘ক’ বাবু নিশ্চিন্তমনে চিরনিদ্রায় ডুবলেন। কোনও যন্ত্রণা তিনি পাননি, আমিও কৌশলে ধরা পড়বার সমস্ত সূত্র মুছে ফেললুম। এবারে আমাকে কী বলা হবে? ‘ক’ বাবু বেঁচে থাকলে নিশ্চয়ই কিছু বলতে পারতেন কিন্তু জীবদ্দশায় ওঁর মনোভাব ছিল শ্রদ্ধার, বিশ্বাসের। সুতরাং হত্যা বিষয়ে বলবার কিছু নেই প্রত্যক্ষতার অভাবে, কার্যত হত্যাই ঘটেনি। একমাত্র আমি নিজে সাক্ষাৎ ভাবে জানি বা ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু আমি দূরদর্শী লোক, তাই কাউকে দুঃখকষ্ট যন্ত্রণা না দিয়ে আমার ভবিষ্যতের পাকা ব্যবস্থা করেছি। আর একথা এয়ার-রাসেলরা নিশ্চয়ই মানবেন যে কারও কোনও প্রতিবাদী বা আপত্তিকর মনোভাবের অনুপস্থিতিতে কোনও অর্থেই আমাকে খুনি বলা চলে না বা ঘটনাটাকে নিন্দে করা যায় না। সুতরাং এই তত্বে হত্যাপরাধ কেমন চমৎকার নীতিশাস্ত্রের আওতার বাইরে চলে যাচ্ছে। প্রতিবাদের ক্ষেত্রেও অনেক ঝামেলা, কারণ পরস্পরবিরোধী মনোভাবের প্রসঙ্গে সত্যবিচারের কোনও মানদণ্ড নেই। ফলে এই দার্শনিক প্রস্তাবনায় জগৎজোড়া অন্যায়ের বিরুদ্ধে কড়ে আঙুলও তোলবার সমর্থন নেই। ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে নীতির সত্যতা বিষয়ে প্রশ্ন নেহাৎই অবান্তর। তাই বর্তমানে পারমাণবিক অস্ত্র নিরোধে বৃদ্ধ রাসেলের অসমসাহসী সংগ্রাম তাঁর নিজের নীতিশাস্ত্রবিরোধী বক্তব্যের পাশে ইউরোপীয় মানসের শূন্যতাকেই তুলে ধরে।
প্রত্যক্ষবাদের পাশে মার্কসবাদের সাপেক্ষ নীতিতত্ব সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। এই সাপেক্ষ তত্ব অবশ্যই ব্যক্তিনির্ভর নয়। ফ্যাসিবাদের ‘ফোক’-এর স্থানে, মার্কসাবাদের ‘শ্রেণী’। লেনিনের উক্তিতে জানি, ‘আমাদের নীতিতত্ব সম্পূর্ণই শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রামের স্বার্থের দাবি মেনে চলে। শ্রমিকশ্রেণীর শ্রেণীসংগ্রামের তথ্য ও প্রয়োজন থেকে আমরা নীতিতত্বকে আহরণ করি।’ অবশ্য এঙ্গেলস ঘোষণা করতে ভোলেন না যে
A really human morality which transcends class antagonisms and their legacies in thought becomes possible only at a stage of society which has not only overcome class antagonisms, but has even forgotten them in practical life.
এই তত্বে প্রমাণ হচ্ছে সামাজিক শ্রেণীগুলোর স্বার্থ সম্পূর্ণই পরস্পরবিরোধী। এই বিরোধ থেকে পৃথক পৃথক নীতিশাস্ত্র জন্মায়। যদিও মার্কসীয় শাস্ত্রে বলা হয় না পৃথক শ্রেণীর কারণে বা পৃথক স্বার্থের কারণেই কোনও পৃথক নীতিবোধ জন্মাবে তবু সহজবুদ্ধিতে এ কথা নিশ্চয়ই বোঝা যায় যে সামাজিক-অর্থনৈতিক কারণে, ইতিহাসের বিশেষ বিশেষ পর্যায়ে বিভিন্ন নীতির জন্ম। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা এই যুক্তির নজির সত্বেও মার্কসবাদীরা আকস্মিকভাবে দাবি করেন বুর্জোয়া নীতিবোধের চাইতে শ্রমিকশ্রেণীর নীতিবোধ শ্রেষ্ঠ। যদি কেউ প্রশ্ন করেন এই শ্রেষ্ঠত্ব কীভাবে প্রতিপন্ন হচ্ছে তবে ওঁরা মানবতা ও সভ্যতার দোহাই তোলেন। কারণ মার্কসের ভাষায় শ্রমিকশ্রেণীই বুর্জোয়া পর্যায়ে সমগ্র মানবতার প্রতীক। যদি এ কথা সত্য হয় তবে সঙ্গে সঙ্গেই মানতে হবে আদিতে, মানবসভ্যতার সূত্রপাতেই মানবিক নীতিবোধ আছে। অথচ এ-বক্তব্যের সঙ্গে নীতির শ্রেণীতত্ব কোনওক্রমেই মেলে না। মানবিক নীতিবোধ সর্বজনীন নীতিবোধ, তাতে প্রত্যেক শ্রেণীরই অংশীদারিত্ব আছে এবং সেক্ষেত্রে সমাজকে সম্পূর্ণ বিরোধী স্বার্থের শিবির মনে করবার কোনও কারণ নেই। সুতরাং বোঝাই যাচ্ছে মার্কসবাদ নীতিবিচারের সঠিক মানদণ্ড উপস্থিত করে না। আরও আশ্চর্যের কথা এই যে আদিতে নয়, বিশিষ্ট পর্যায়ের অন্তেই সর্বজনীন নীতিশাস্ত্র আসছে। প্রশ্ন তোলা যায় এই সর্বজনীন নীতি এল বা আসবে কোথা থেকে? ওঁরা নিশ্চয়ই জবাব দেবেন শ্রেণী না থাকলেই সর্বজনীন নীতি আসে। কিন্তু একথা বোঝা যায় না, কেমন করে, কোথা থেকে শ্রেণী মুছে গেলেই সর্বজনীন নীতিগুলো হুড়মুড় করে এসে পড়বে! কারণ সাম্যবাদের সূত্রপাত পর্যন্ত শ্রেণী থাকবে, রাষ্ট্র সেই শ্রেণীস্বার্থের বাহন হবে, রাষ্ট্রে শ্রেণীর নীতিও নিশ্চয়ই থাকবে। শ্রেণীর নীতির সঙ্গে সঙ্গেই কি সর্বজনীন নীতি তৈরি হচ্ছে? যদি হয় তো কেমন করে হচ্ছে? যদি হয় তো বর্তমানের পৃথিবীতে অন্যত্র শ্রেণীর পাশাপাশিই সর্বজনীন নীতি সম্ভব নয় কেন? মার্কসবাদে এই সমাজতত্ব ও নীতিতত্বের টানেই হিংসার বক্তব্য প্রধান হয়ে পড়ে কারণ প্রতিটি মানুষ যদি শ্রেণীস্বার্থের বাহন হয় এবং সমাজ পরস্পরবিরোধী শক্তির আকর, তবে মানুষে মানুষে সম্প্রীতি, যুক্তি বিবেচনার ক্ষেত্র সংকীর্ণ থেকে সংকীর্ণতর হয়, হয়তো বা সম্পূর্ণ বিলোপ পায় আর তখন একমাত্র হিংসারই পথ খোলা থাকে। শান্তির ললিতবাণী তখন সত্যিই ব্যর্থ পরিহাস।
প্রত্যক্ষবাদ ও মার্কসবাদ উভয়তই মানুষকে যুক্তি বিবেচনার পাত্র হিসেবে ভাবা হচ্ছে না, তাকে প্রাণহীন যন্ত্রের মতো অজ্ঞানের হাতে, রাষ্ট্রের হাতে, দলের হাতে তুলে দেওয়া হচ্ছে। অজ্ঞান ও চৈতন্যহীন রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত জনতার চাপে ব্যক্তির অবস্থা তখন কাফকার ‘কে’র মতো, যার বিচার চলছে অথচ যে অপরাধ বিষয়ে অবহিত নয়। কাফকা লিখেছেন –
ওদের বেছে নিতে বলা হল রাজা হবে কী হবে তার বার্তাবহ। শিশুরা যেমন করে, ওরা সব বার্তাবহ হতে চাইল। তাই রইল শুধু বার্তাবহের দল যারা বিশ্বে শুধু ছুটে বেড়ায়, চিৎকার করে পরস্পরের প্রতি সেই সংবাদগুলো-কারণ রাজা তো নেই- যা অর্থহীন হয়ে গেছে। ওরা ওদের এই দীন জীবনকে খতম করে ফেলতে চায় কিন্তু সাহস পায় না যেহেতু তারা সেবা করবার শপথ নিয়েছে।
বর্তমানের সবচেয়ে চালু শাস্ত্র সমাজতত্বের মানহাইমের জবানিতে একই কথা পাচ্ছি, সেই অজ্ঞানের জয়যাত্রা। মানহাইম মনে করেন সমস্ত তত্বই হল ‘আইডিওলজি’ অর্থাৎ যা সামাজিক অবস্থার ফসল মাত্র। নির্দিষ্ট সামাজিক অবস্থার চাপেই সব তত্বের জন্ম, এর বাইরে সত্যের কোন স্থান নেই। গর্বভরে মানহাইম লিখতে পারেন
The view which holds that all cultural life is an orientation towards objective values is just one more illustration of a typically modern rationalistic disregard for the basic irrational mechanisms which govern man’s relation to his world … there is, then, no norm which can lay claim to formal validity …
এবং ভাবেন ‘জ্ঞানের সমাজতত্ব’ তৈরি করলেই বুঝি সভ্যতা ও সচেতনতার দায় ঘোচে। ওঁর মতে দুটি পথ মাত্র খোলা আছে। একটি হল যুক্তির পথ। যুক্তিই মানুষের প্রধান অবলম্বন এবং যুক্তির দাবিতেই মানুষ বিশ্বরহস্যের দুয়ার খুলছে, আপাতবিরোধ বিচ্ছিন্ন ঘটনাবলির মধ্যে ঐক্য খুঁজে পাচ্ছে। দ্বিতীয়টির মতে, সংসার কেবল নিরন্তর ঘটনাপ্রবাহ, এই ঘটনাপ্রবাহে কার্যকারণের সূত্র অনুপস্থিত যেহেতু যুক্তির নিয়মে ঘটনাবলি নিয়ন্ত্রিত নয়। ঘটনা ঘটছে, অতীতে ঘটেছে, ভবিষ্যতেও ঘটবে। কোনও ঘটছে, কী তার পরিণতি বা উদ্দেশ্য জানতে বাসনা হলেও জানার চেষ্টা অর্থহীন কারণ আমরা জানি জ্ঞানে যুক্তির পরম্পরায়, কিন্তু ঘটনাপ্রবাহের পেছনে কোনও যুক্তির খেলা নেই। মানহাইম দ্বিতীয় মতটিই মানেন কিন্তু ভুলে যান যে জ্ঞান যদি নিছক সমাজ ও সময়-সাপেক্ষ হয় তবে এই জ্ঞানের বোধ বা বক্তব্যটিরও অর্থাৎ মানহাইমের জ্ঞানের সমাজতত্বেরও সমাজতত্ব থাকবে এবং এমনি করে সমাজ তত্বের পিছুহটা চলবে নিরবধি কাল ধরে, মানহাইম এই বিপদমুক্তির পথ খোঁজেন এই বলে ব্যক্তি যদিও অন্ধতার রোগী তবু পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাদের অন্ধতা ভেঙে হয়তো একটা স্বীকৃত সম্মত অবস্থা তৈরি করা যায়। কিন্তু তিনি ভুলে যান তার জন্যে শুরুতেই একটি মানদণ্ডের প্রয়োজন যা ব্যক্তির অন্ধতা ও অজ্ঞানের সৃষ্টি হতে পারে না।
মনস্তত্বের ‘অজ্ঞান’-এর কথা আজ বিশ্ববিশ্রুত। সুতরাং মনস্তত্ব ছেড়ে আমরা দর্শনের রাজ্যে আসি। প্রত্যক্ষবাদ আদিতেই বিজ্ঞানের বাইরে সমস্ত জ্ঞানের সম্ভাবনাকে বাতিল করে দিয়েছে। আর নির্জ্ঞানের প্রসারে অস্তিত্ববাদ প্রত্যক্ষবাদকে অনেক পেছনে ফেলে এসেছে। যুক্তির পথে, চিন্তার নেতৃত্বে সত্যজ্ঞানের সম্ভাবনা অস্তিত্ববাদ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে। একক মানুষদের দিয়ে অস্তিত্ববাদের সূত্রপাত। প্রতিটি মানুষই একক ও নিঃসঙ্গ। তাকে গড়ে নিতে হবে নিজের জগৎ, তেমনি নিজেকে। কোনও কিছুই তার চারপাশে স্থির নেই, নির্দিষ্ট নেই। তার যেমন নেই পশ্চাৎ, তেমনি নেই নির্দিষ্ট ভবিষ্যৎ। পূর্ববর্তী দর্শনে জ্ঞানের অনন্ত সম্ভাবনা ও মানুষের বিপুল ভবিষ্যতের কল্পনা করা হয়েছিল কিন্তু অস্তিত্ববাদের ঘোষণায় সেই মানুষ অর্থহীনভাবে শুধুই যুক্তির হাতে ধরে চলে, মানুষ শুধুই তার চরিত্রের নির্দিষ্ট স্বাভাবিকতায় পরিণতি পায়। অথচ বিশ্বে কোনও কিছুই যুক্তির নিয়মে চলে না, পুরোনো প্রতিটি প্রত্যয় ভেঙেচুরে নষ্ট হয়ে গেছে। সার্ত্র লিখছেন ‘মানুষ আর কিছুই নয় সে নিজেকে যা বানায় তা ছাড়া। এটাই হল অস্তিত্ববাদের প্রথম সূত্র।’ লিখছেন
For we mean to say that man primarily exists — that man is, before all else, something which propels itself towards a future and is aware that it is doing so … Before the projection of the self, nothing exists ; not even in the heaven of intelligence man will only attain existence when he is what he purposes to be. Not, however, what he may wish to be. For what we usually understand by wishing or willing is a conscious dicision taken much more often than not —after we have made ourselves what we are.
সার্ত্র অবশ্য ব্যাখ্যা করেন না কোনও একমাত্র মানুষই নিজেকে সৃষ্টি করবে আর সৃষ্টি করবে কী ভাবে, কোনও লক্ষ্যে। তিনি লিখেছেন যে সত্তার আগে অস্তিত্ব স্বীকৃত হলে মানুষ নিজের জন্যে নিজেই দায়ী। কিন্তু এই দায়িত্বের সাধারণ বক্তব্যের পর প্রশ্ন উঠবে দায়িত্ব নিশ্চয়ই নিজেকে গড়বার কিন্তু মানুষ নিজেকে গড়বার প্রেরণা পাবে কেন? প্রেরণা ছাড়া তার দায়িত্বের অর্থই বা কি? সার্ত্র আরও জানান যে নিজেকে গড়বার সূত্রেই ব্যক্তি ‘নিজেকে বাছাই করে।’ ‘যদি বলি মানুষ নিজেকে বাছাই করে তবে নিশ্চয়ই বোঝাতে চাই যে আমাদের প্রত্যেককেই নিজেকে বাছাই করতে হবে। এ দ্বারা আরও বোঝাতে চাই, যে নিজের জন্যে বাছাই করে সে সবার জন্যেই বাছাই করে।’ মানুষ যদি সম্পূর্ণই নিজে নিজেকে বাছাই করে তবে অন্যের সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক থাকবার কথা নয় এবং প্রসঙ্গত সার্ত্র তা মানেনও না। অথচ তিনি বিনা দ্বিধায় বলতে পারেন যে নিজেকে বাছাই করে অন্যদের জন্যেও বাছাই করা হচ্ছে। ‘এটা ওটার মধ্যে বাছাই করা হল যা বাছাই করা হয়েছে তার মূল্যকেই সমর্থন করা; কারণ আমরা কখনওই খারাপ বাছাই করতে পারিনে।’ কেন যে পারিনে সার্ত্র তা জানান না। সবচেয়ে আশ্চর্যের কথা হল অগ্রপশ্চাৎহীন মানুষ একক বিশ্বে শুধু নিজেতেই বিশ্বাস রেখে এগোতে পারে এবং নিজেকে গড়ে নিতে পারে। অথচ তার অস্তিত্বের স্বীকৃতি আসবে কোথা থেকে ও কার কাছে সার্ত্র ব্যাখ্যা করেন না। এমন একটা বিশ্বে সে এসে পড়েছে যা সে নিজে গড়েনি, এমন কোন স্বীকৃত নীতি নেই যা সে সমর্থন করে এগোতে পারে। তাই তার জীবন নিঃসন্দেহেই শুধু ‘এঙ্গস্ট’ ও ‘সোর্জ’ অর্থাৎ ‘দুশ্চিন্তা’ ও ‘যত্ন’। তাই হাইদেগেরের কাছে ‘মায়া থেকে মুক্তি একমাত্র সেই মানুষটিই পেতে পারে যে যন্ত্রণার কাছে নিজেকে মেলে ধরে দৃঢ়চিত্তে শূন্যতার মুখোমুখি দাঁড়ায় আত্মবিলুপ্তির অপেক্ষায়।’
লা নসি-র নায়ক হঠাৎ আকস্মিক এক মুহূর্তে পার্কে বসে তার অস্তিত্বের আস্বাদ পেয়েছিল। সেই মুহূর্তের আগে সে জানত না অস্তিত্বের কী অর্থ
আমি ছিলুম অন্য সবার মতো, ওই লোকগুলোর মতো যারা বসন্তের সাজে সমুদ্রের পাড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ওদের মতোই আমি বলছি ‘সমুদ্রটা সবুজ, ওই উঁচু জমি যেটা সমুদ্রে নেমে গেছে তার রং সাদা, ওই যে একটা সী-গাল উড়ল।’ কিন্তু অনুভব করিনি যে ওদের কেউ আছে, সী-গাল সত্যিই একটা অস্তিত্ববান সী-গাল। কার্যত অস্তিত্ব নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। আমাদের চারপাশে আছে, আমাদের ভেতরেও, আমরাই তা, তার কথা না-বলে দুটো কথাও আওড়াতে পারিনে তবু শেষ পর্যন্ত তা আমাদের নাগালের বাইরে। যখন কল্পনা করেছি আমি তার বিষয় ভাবছি, তুমি নিশ্চয়ই বুঝবে যে আমি মোটেই ভাবছিলুম না, আমার মন ছিল ফাঁকা অথবা হয়তো আমার মনে একটি মাত্র কথা ছিল, সেই কথাটি ‘সত্তা’। …নিজেকে বললাম সমুদ্র সবুজ বস্তুর মধ্যে পড়ে অথবা সবুজ সমুদ্রের একটা গুণ। যখন এর দিকে তাকিয়েছি তখনও আমি চিন্তায় একশো মাইলের মধ্যে নেই যে তারা অস্তিত্ববান; মঞ্চের দৃশ্যের মতো মনে হচ্ছিল তাদের। … আগে যদি কেউ জিজ্ঞেস করত অস্তিত্ব কী, আমি বিশ্বাসের সঙ্গে জবাব দিতুম, ওটা কিছুই নয়, বাইরের বস্তুতে চাপানো একটা শূন্য আকার মাত্র যাতে বস্তুর চরিত্র একটুও পালটায় না। আর এখন, এক মুহূর্তেই, সে উপস্থিত, দিনের মতো স্বচ্ছ; অস্তিত্ব আকস্মিকভাবে আবরণমুক্ত হয়েছে।
বোঝাই যাচ্ছে অস্তিত্ব চিন্তার বিষয় নয়, জ্ঞানে তার পরিচয় মেলে না। বাহ্য বস্তুপুঞ্জের ওপর চাপানো অর্থহীন একটা আকারের মতো সে থাকতে পারে, নাও থাকতে পারে। তার স্বরূপ প্রকাশিত হয় অতর্কিতে, মনের গভীর থেকে। প্রায় যেন ফ্রয়েডীয় নির্জ্ঞান হঠাৎ মনের আগল ঠেলে এসে পৌঁছেছে সচেতনতায়। আর তাই যুক্তিবিরোধী বক্তব্যটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে অস্তিত্ববাদের শব্দরূপে। চিন্তায় নয়, সত্তার আভাস মেলে যেহেতু আবেগে, আকস্মিক দীপ্তির জৌলুসে সেহেতু প্রতিটি ব্যক্তিকে প্রস্তুত থাকতে হয় কর্মে, নিজেকে গড়ে নেবার চেষ্টায়। এই গড়ে নেওয়া বা নিজেকে জড়ানো প্রায় স্বপ্নে ঘুমন্ত মানুষের চলার মতো। ‘এক্স’ ও ‘সিসটেয়ার’ অর্থাৎ ‘কাজে নামা’।
সার্ত্রর সমগ্র রচনাবলিতে এই চিন্তাহীন ‘কাজে নামা’র পরিচয় ছড়িয়ে আছে। কাজের মধ্যেই সার্ত্র ঘোষণা করেন ‘পুরো মানুষ’টিকে পাওয়া যাবে। এই কাজের চরিত্রটি কেমন? সার্ত্র চমৎকার ব্যাখ্যা করে দেখান যে আমাদের পূর্ববর্তী শিল্পী, যাদের কাছে আমরা পেয়েছি আমাদের সংস্কৃতি, বোধ, বিধি, নিষেধ, আমাদের প্রবাদ, আমাদের বাসস্থান, তাঁরা ছিলেন নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলের লোক। অর্থাৎ নির্ঝঞ্ঝাট। তাঁরা ‘সমগ্র মানুষ’টির খোঁজে চাননি এমন সমসাময়িক অবস্থা যা অত্যাচারে, নৃশংসতায়, চাপে পাত্রপাত্রীদের নিষ্পেষিত করবে। ঘাম ও রক্তে সর্বাঙ্গ ভাসবে মানুষদের আর সেই অসহায়তায় জ্ঞানের ও সচেতনতার সাহায্য ছাড়াই হঠাৎ জানতে পারবে নিজেদের অস্তিত্বের কথা। কিন্তু সার্ত্র জানেন এই রক্ত ও ঘামের, ইতিহাসের চাপের কাহিনিতে মানুষের দৃষ্টি ঢেকে যায়। সমসাময়িক কালের চরিত্র নজরে আসে না কারণ সময়ের কেন্দ্রে অন্ধ মানুষ নিজের বাইরে তাকাতে পারে না। আর তার চারপাশেই তো কেবল চাপের কথা যেহেতু রুদ্ধশ্বাস আবহাওয়ার মানুষের মনুষ্যত্ব না হোক সার্ত্র-কথিত সামগ্রিকতার বিকাশ। অবশ্য সার্ত্র জানতেও চান না কারণ তিনি বলেন সবটাই ‘অবোধ্য’, শুধু মারাত্মক চাপটা অনুভব করলেই চলবে। সার্ত্রর নায়করা তাই এমন ধরনের লোক যাদের জীবনে সব কিছুই ঘটে, তারা ঘটায় না। তারা নিষ্ক্রিয় সব মানুষ, উইন্ডহাম লুইসের মতে, ‘গিনিপিগ জাতীয়’। শুধু কি সার্ত্রতেই? এলবেয়র কামুর নায়ক মিরশ একটি অপোগণ্ড ভ্যাবলা মাত্র-তার ভাবনা-চিন্তার প্রশ্ন নেই।
সার্ত্রর মতো আন্দ্রে মালরোরও একই সমস্যা। মালরোর বিশ্বেও মানবিকতার প্রবেশ কর্মে এবং সেই কর্ম হত্যায় সংঘটিত হয়। মালরো তাই লেখেন
In imposing his personality upon the external world man finds the only outlet which remains to him, his one and only chance of escaping—imprefectly—from Nothingness (an néant).
আসলে জগৎটা মানবিকই নয়। মানবিকতা নিশ্চয়ই প্রকাশ পায় কর্মে কিন্তু সেই কর্ম যুক্তি ও সচেতনতার হাত ধরে নিজের স্বভাবকে প্রকাশ করবার চেষ্টায়। সার্ত্ররা যেহেতু জগৎকে শূন্যের নামান্তর মনে করেন এবং পূর্বাপর সমস্ত অতীতকে অস্বীকার করেন সুতরাং তাদের মুক্তি পলায়নের পথেই আসে এবং সেই পলায়ন কখনও হত্যার রূপে, কখনও নিরঙ্কুশ চাপের রূপে। মালরোর ভাষাতেই তাই বাঁচার তাৎপর্য হল ‘to lead, to be he who decides, to coerce. That is to live.’ সার্ত্র অবশ্য এই পলায়নের কর্মে ভাবেন শিল্পীর স্বাধীনতা আসে রাজনীতির ভাগাভাগিতে। রাজনীতির পরিমণ্ডল ছাড়া শিল্পীর অস্তিত্বের কোনও জগৎ নেই। আর বর্তমানের রাজনীতিতে আছে অবিসম্বাদী দুই পক্ষ বুর্জোয়া ও সাম্যবাদী। সার্ত্র বলতে চান শিল্পীকে পক্ষ বাছাই করে নিতে হবে এদের মধ্যে যদিও তিনি নিজে বুর্জোয়াদের ছেড়েছেন তবু ভাবতে পারেন না যে সাম্যবাদী দলে যোগ দেবেন। অথচ ওঁর অভিযোগের অন্ত নেই যে সাম্যবাদীরা ওঁর পাঠক অর্থাৎ শ্রমিক শ্রেণীকে কেড়ে নিয়েছে। শিল্পীদের যে পক্ষ বাছাই করে নিতেই হবে, রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ছাড়া শিল্পীর মুক্তি নেই, এই তত্বে সার্ত্র সাম্যবাদীদের কাছে এগিয়ে আসেন (যদিও তিনি লেখেন ‘For Communists a writer is suspect on principle’) এবং অস্তিত্ববাদের অন্ধতায় শিল্পীর স্বাধীনতাকে তুলে দেন সর্বগ্রাসী দল ও দলসমর্থিত রাষ্ট্রের হাতে।
মালরোর, মানুষের ভাগ্য উপন্যাসটিতে একটি আশ্চর্য কথোপকথন আছে। এই কথোপকথনে শূন্যতার বিকট দাঁত অন্ধকারেও ঝলসে ওঠে। জানতে পারা যায় জীবনের স্তরে স্তরে ইউরোপে কেমন সন্দেহ, হতাশা ও অজ্ঞানের অন্ধকার জমেছে।
‘গিসরকে সে ইতিমধ্যেই খুন করেছে কিনা’ জিজ্ঞেস করে নেতিবাচক উত্তর পাবার পর চেনের হঠাৎ মনে হল যে গিসরের মধ্যে কিছু একটার অভাব আছে।
গিসর জিজ্ঞেস করল
‘প্রথম যখন কোনও মেয়ের সঙ্গে শুয়েছিলে-পরে কী ভেবেছ?’
‘গর্ব।’
‘মানুষ হবার জন্যে?’
‘মেয়েমানুষ না হবার জন্যে’, চেন জবাব দিল…
‘মেয়েদের কথা তুলে ভালোই করেছ। যে লোকটিকে খুন করা হয়েছে তার জন্যে হয়তো একটা বিরাগ থাকে। তবে অন্যদের ঘৃণার চাইতে তাকে কমই ঘৃণা করা হয়।’
‘তুমি বলছ তাদের চাইতে যারা খুন করেনি?’
‘যারা খুন করেনি তাদের চাইতে- কুমারদের চাইতে।’
এই হল বর্তমান ইউরোপের অবস্থা। আমরা যারা এখনও কর্মের পথে পলায়নের জন্য খুন করিনি, যারা এখনও ইতিহাসের প্রয়োজনে নিষ্পেষণের যুক্তি, রক্ত ও ঘামে দরবিগলিত হবার বাসনা প্রকাশ করিনি তারা নিছক ‘কুমার’ অর্থাৎ জীবনের পূর্বাপর অভিজ্ঞতাহীন নিরেট বোকা ছেলে। জীবনের কোনও তাৎপর্যই নেই আমাদের সত্তায়, অস্তিত্বের অর্থ এখনও ফোটেনি আমাদের স্বপ্নে, আমরা তাই ঘৃণার পাত্র। এ কথা নিশ্চয়ই সত্য নয় যে ইউরোপের প্রতিটি মানুষ এমনি করে ভাবে বা ইউরোপের সবাই সচেতনতা ও যুক্তির দিকে পেছন ফিরে দাঁড়িয়েছে, তবু এটাই বর্তমান ইউরোপের জীবনচর্চার প্রধান দিক। যন্ত্রের ও যন্ত্রকৌশলের ক্রমিক অগ্রগতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে মানুষের নৈতিক চেতনার উদবর্তন হয়নি, মস্তবড় ফারাক থেকে গেছে। এই ফাঁকটাই বর্তমানে বিরাট মুখব্যাদান করে মানুষের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে আর থ্রাসিমেকাসের উত্তরসাধকরা ক্ষমতার লোভে, স্বার্থের তাড়নায় রাষ্ট্রকে তাদের হাতিয়ার করে বিশ্ব অভিযানে বেরিয়েছে। ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ রাখবার জন্যে মানুষের লোভ ও মোহ এমন একটা সংগঠন চালু রাখতে চাচ্ছে যার চাপে ব্যক্তি দলে পিষে পিণ্ডে পরিণত হবে, তার স্বাধিকারের স্বপ্ন ফুৎকারেই উড়িয়ে দেওয়া যাবে। নিষ্পেষণের আগে তার বুদ্ধিবিবেচনা কেড়ে নেওয়া দরকার যেহেতু বুদ্ধি বিবেচনাহীন মানুষ অন্ধতার দুর্বল পুতুলমাত্র। তাই ইউরোপজোড়া অজ্ঞানের অভিযান। মানুষের মহত্বের কথা না শুনিয়ে তাকে নিছক অস্তিত্বের অনুকূলে আটকে রাখবার চেষ্টায় দার্শনিক শিল্পীরা সর্বক্ষণ ব্যস্ত। শয়তানের কাছে আত্মা বিক্রি করে ইউরোপ এখন এমন এক নিঃসীম গহ্বরের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে যে হয় তাকে অতল আঁধারে নিমজ্জিত হতে হবে নয়তো আত্ম আবিষ্কারের বাসনায় জ্ঞান, যুক্তি ও বিশ্বাসের সচেতন লক্ষ্যে জীবনের সমস্ত কর্ম ও প্রেরণাকে চালিত করতে হবে। কোনও দল, গোষ্ঠী বা শ্রেণীর হাতে স্বাধিকারের প্রশ্ন তুলে না দিয়ে ব্যক্তির নিজেকেই খুঁজে নিতে হবে সমগ্র মানবসভ্যতার ঋদ্ধির আলোয়। শ্রেয় ও প্রেয়র দ্বন্দ্বে সজ্ঞানে বুঝে শ্রেয়কেই আশ্রয় করতে হবে। মানুষের সামনে সমস্ত সম্ভাবনার পথই খোলা, ইচ্ছায় সে হতে পারে দেব বা দানব। ইউরোপ কী হবে তার ওপর অনেক মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।
২য় বর্ষ ১ম সংখ্যা
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ১৩৬৯)
