দিব্যনাট্যের কবি দান্তে – সুনীলচন্দ্র সরকার
বিশ্বকবির আধুনিকতা।
যাঁরা বড় কবি তাঁরা সকল যুগেই আধুনিক – এমন একটা কথা বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। পৃথিবীর সংস্কৃতি-চিত্ত মহান কবিদের সঙ্গে এমন ব্যবহার করে যে তাতে সংশয় জন্মাতেই পারে বুঝি তা নিল না কবিকে, দিল না উপযুক্ত স্থান। কিন্তু কবি যদি সত্যিই কিছু দিয়ে থাকেন, দেখা যায় তাকে ঠেলে রাখা, ভুলে যাওয়ার উপায় নেই। প্রাথমিক হয়তো কয়েক শতকের অবহেলা আবার শেষ হয় বৃহত্তর আবাহনে, নিন্দা-প্রশংসার-উত্থান পতন ক্রমে স্থায়ী হয় একটা জনস্বীকৃতির অধিত্যকায়। জীবন থেকে আলাদা করে পূজামন্দিরে তুলে রাখা কাব্য আবার এসে অবতীর্ণ হয় জীবনের, সাহিত্যসৃষ্টির রঙ্গভূমিতে। তাই যখন রবীন্দ্রনাথের পশ্চিমদেশে জনপ্রিয়তা হ্রাস নিয়ে দুর্ভাবনার কথা শুনি, তখন এ বিষয়ে আমাদের যে একটা কর্তব্য আছে তা স্বীকার করি, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তেমন উদ্বেগ বোধ করতে পারি না।
এই যে তাঁর জন্মদিনের সাতশো বছর পরে আমরা দান্তেকে স্মরণ করছি একি শুধু স্মৃতিতর্পণ, সাহিত্যজগতের একটি পারলৌকিক ক্রিয়া? না, তাঁর কাব্য-আত্মার পুনর্বোধন চাইছি আমরা। তিনি ‘কমেডি’ লেখবার সময় পুনরুজ্জীবিত করেছিলেন তাঁর জন্মের তেরশ বছর আগেকার কবি ভার্জিলকে। তাঁকে গুরুবরণ করে সম্মানের স্থান দিয়েছিলেন ডিভাইন কমেডিতে। আবার এই দান্তের প্রভাব পরে গ্রহণ করলেন স্পেনসর তাঁর Faery Queene-এ, মিলটন তাঁর Paradise Lost-এ। শেলির মধ্যে দান্তে-প্রভাব স্পষ্ট। এবং একেবারে আধুনিক যুগে এজরা পাউন্ড, টি. এস. এলিয়ট প্রভৃতি কবির কাব্যসাধনায়।
বাংলার আধুনিক সাহিত্যের প্রথম থেকেই দেখি ‘ডিভাইন কমেডি’র ছায়াপাত। মাইকেলের ‘মেঘনাদবধকাব্য’-র অষ্টম সর্গে রামের পিতৃলোকযাত্রাপথে নরকদর্শনের মূল ছাঁচ আছে ভার্জিলের ঈনিডের ষষ্ঠ খণ্ডে। সেখানে ঈনিস পিতৃ-আত্মার সঙ্গে মিলনের পথে অতিক্রম করলেন নরক। দান্তেও নরক ভ্রমণ করলেন বিয়াত্রিচে-মিলনের পথ হিসাবে। তাঁর ভাবৈশ্বর্যের কাছে মেঘনাদবধ-এর ওই সর্গ অনেক ঋণী। এমনকি নরকের গেটে যে হৃদকম্পজনক নিষেধবাণী রয়েছে দান্তের কাব্যে ‘এখানে ঢুকছ যারা বাইরে ফেলে এসো সব আশা’ ইত্যাদি, তার আক্ষরিক অনুবাদ করে দিয়েছেন মধুসূদন। এই সর্গ সম্পূর্ণ বাদ দিলে মেঘনাদবধকাব্য-র কি ক্ষতি হত জানি না। আর বঙ্কিমচন্দ্রও চন্দ্রশেখরে শৈবলিনীকে যে নরক দেখিয়েছেন তার মধ্যেও ইনফারনোর নানা বিভীষিকা-চিত্রের অনুসরণ দেখি; অবশ্য আমাদের ভারতীয় নরকধারণার সঙ্গেও মিল রাখার চেষ্টা রয়েছে। রবীন্দ্রনাথ প্রথম যৌবনেই দান্তের সম্বন্ধে ঔৎসুক্য অনুভব করেছিলেন। সে কিন্তু ইনফারনোর উগ্র উত্তেজনা, সুস্পষ্ট বর্ণনা ও নাটকীয়তার জন্য নয়, দান্তের বিয়াত্রিচে-প্রেমের স্বরূপ বোঝবার জন্য। কিন্তু দান্তে যেমন ভার্জিলের আদর্শ মেনেও ডিভাইন কমেডিতে করলেন নতুন যুগের উপযোগী নতুন সৃষ্টি কতকটা সেই ধরনের কাজ আমাদের সাহিত্যে করেছেন দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর স্বপ্নপ্রয়াণে। তাই দান্তে আমাদের অপরিচিত নন, শ্রদ্ধার্হ সুহৃদের মতোই তাঁকে আজ আমরা আবাহন করছি বাংলা সাহিত্যের অঙ্গনে।
ভার্জিল কেন?
সংসারে পথভ্রষ্ট দান্তেকে ভার্জিলই ত্রিলোক-নরক, তপোলোক বা শুদ্ধিলোক (purgatory) ও স্বর্গলোক ভ্রমণ করালেন, প্রথম দুটিতে স্বয়ং নেতা হয়ে এবং তৃতীয় রাজ্যের নেতৃত্বভার বিয়াত্রিচেকে সমর্পণ করে। একি শুধু একটি কাহিনিবিন্যাসের ব্যাপার, না এর কোনো গূঢ় তাৎপর্য আছে?
যাঁদের দৃষ্টির পরিসীমায় সমসাময়িক জীবনের সমস্ত অভিজ্ঞতা ও সম্ভাবনা কুলিয়েছিল, অন্তত সেই ধরনের নিখিলজীবনচেতনার সাধনা যাঁরা করেছিলেন পাশ্চাত্যদেশে তাঁদের সংখ্যা দুই হোমার ও ভার্জিল। হোমারের কাব্যজগৎ পেগ্যান – লৌকিক বাসনা-কামনার অসংকোচ স্ফূরণের সেই দেশ। তাঁর স্বর্গ মর্ত্য নরকের মধ্যে সুখ ঐশ্বর্য সম্ভাবনার ক্ষমতা ও কর্তৃত্বদর্পের একটা ভেদ আছে। কিন্তু কোনো নৈতিক আধ্যাত্মিক সোপান কল্পনা নেই। ভার্জিলের প্লট নেওয়া হোমরের ইলিয়ড থেকে, কিন্তু তাঁর মহাকাব্যের নায়ক একিলিস এগামেমননের মতো অলজ্জ মানবতার মুখপাত্র নয়, এক আদর্শ ব্যক্তি। উচ্চ এক দৈবনির্দিষ্ট উদ্দেশ্যসাধনে তাঁর জীবনকে তিনি উৎসর্গ করেছেন। তারই ফলে ভার্জিলের মহাকাব্যের গতি ও মেজাজ, তার ভাবানুভূতি ও রসসাধনা হেলেছে পশ্চিমি ঐতিহ্য থেকে পুবের দিকে; ভারতীয় মহাকাব্যের দিকে। ভার্জিলও কিন্তু পেগ্যান, কারণ তাঁর জন্ম যিশু খ্রিস্টের জন্মের কিছু আগে, এবং ব্যাপটিজম-এর সৌভাগ্য তাঁর হয়নি। দান্তের কাব্যপ্রেরণা অনেকটা তাঁর খ্রিস্টধর্ম সাধনার থেকে। ল্যাতিন কবিরা লিখেছিলেন প্রার্থনার সংগীত, খ্রিস্টজীবনের গাথা, মিষ্টিক কবিতা। বৃহৎ জীবনের থেকে সে যেন আলাদা ভূমিতে প্রবাহমান ধারা। দান্তেই প্রথম বড় কবি যিনি মেলাতে চাইলেন জীবন অনুভূতির সঙ্গে অধ্যাত্মসাধনার রস, মস্তিষ্কের সঙ্গে হৃদয়। ইয়োরোপীয় কবিরা এখন পর্যন্ত অমিশ্র শুভচেতনার কাব্য বা নাট্য সম্ভাবনায় অবিশ্বাসী, তাদের চাই ‘সু’ ও ‘কু’র মিশ্রণ, তাই এখনও প্রধান ধারা হোমরের পেগ্যান আদর্শের হিউম্যানিজম-এর অনুবর্তন। কিন্তু দান্তের প্রধান কাব্যকীর্তি এই যে উচ্চতম আদর্শ সাধনেরও যে একটা কাব্যরূপ সম্ভব তা তিনি প্রমাণ করেছেন তাঁর কাব্যে। এখনও ইয়োরোপের সমালোচকরা কিন্তু সে কথা সম্পূর্ণ স্বীকার না করে দেখাতে চান দান্তের সার্থকতা তাঁর অধ্যাত্মসিদ্ধিতে ততটা নয়, যতটা তাঁর সংসার অভিজ্ঞতার তীব্রতায় ও যাথার্থ্যে ও তার নিপুণ চিত্রণে – অর্থাৎ প্রধানত ইনফারনো রচনায়। তার তুলনায় পারগেটোরিও ও প্যারাডাইসোর কাব্যমূল্য অনেক কম। কিন্তু আমাদের প্রতিপাদ্য অন্য রকম। কমেডির গুণাগুণ পরীক্ষা করে আমরা দেখাব সেটা কী।
কমেডির গঠন প্যাটার্ন।
কমেডির structure বা গঠন প্যাটার্নটি লক্ষ করলে দান্তের পরিকল্পনার কতকগুলি বিশেষত্ব আবিষ্কার করা যায়। তাঁর আসল দ্রষ্টব্য বা ধ্যেয় বস্তু কি? মানুষের জগৎ ও জীবন ও তার ভিত্তিতে এক নবমানবিকতা (neo-humanism)? মানুষের অপূর্ণতা, অশুদ্ধি ও পাপদুষ্ট জীবন ও স্বভাবের পরিশোধন ও সম্ভব হলে উর্ধ্বায়ন – অন্তত একটি বদ্ধতার প্রাচীর অতিক্রমণের ঈঙ্গিত? যাকে অ্যারিস্টটল নাম দিয়েছেন (catharsis বা purgation) এবং যা গ্রিক ট্র্যাজেডিকারদের ছিল কাব্যিক লক্ষ্য? কিংবা খ্রিশ্চান করুণাতত্বের (grace) আওতায় মানুষ-আত্মার বন্ধনমুক্তি (salvation)-এর আনন্দঘোষণা? – যে কল্পনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে মিলটন লেখেন প্যারাডাইস রিগেনড, শেলি প্রমিথিউস আনবাউন্ড, কীটস আরম্ভ করেন হাইপিরেরিয়ন, রবীন্দ্রনাথ লেখেন অরূপরতন আর শ্রীঅরবিন্দ সাবিত্রী?
কোনও মতাসক্তির (dogmatism) দ্বারা চালিত না হলে সকলেই স্বীকার করবেন যে তত্বান্বেষী খ্রিশ্চান সাধক দান্তের নক্ষ্য ছিল মানুষের জগতের হাবভাব ব্যাপারবৈচিত্র্য ঘটনাধারাকে ঘৃণা বিদ্রুপ ও বিভীষিকাচিহ্নিত করে তার পরিবর্জনের পথ দেখানো, কারণ খ্রিশ্চান ধারণায় মূল পাপ (original sin) সর্বজনীন ও তা সমূলে বিসর্জন না দিলে আর এগোবার উপায় নেই। কাজেই সেই জগৎকে যথাসম্ভব বাস্তব এবং প্রত্যক্ষ ক্রিয়াশীল করে তুলে ধরতে পারলেই মানুষের চৈতন্যোদয় হবে। ইনফারনোর উদ্দেশ্য সেই ‘সংসার’কেই গ্রাহকচক্ষে প্রকটিত করা, অবান্তর কোনো নরককল্পনা নয়। যারা ওই ইনফারনোয় কষ্ট পাচ্ছে তাদের দেখে গ্রাহকচিত্ত যাতে মুক্তধারার সেই পাগলা-বটুর মত মনে মনে বলে উঠতে পারে ‘ও পথে যেও না বাবা, ও পথে আছে তৃষ্ণা, তৃষ্ণারাক্ষসী।’ হোমারের প্রতিষ্ঠাভূমি থেকে দেখলে এ তো হিউম্যানিজম বা নিও-হিউম্যানিজম নয় – ante-humanism। সাহিত্যে এর স্থান বরং স্যাটায়ার জাতীয় রচনায়। কিন্তু ইনফারনোকে কি আমরা সেই শ্রেণীতে ফেলতে পারি? না।
তবে একে কি গ্রিক ট্র্যাজেডির সমপংক্তিতে রাখব? মিল অনেকটা আছে – বিশেষত ইনফারনোর, কিন্তু সমস্ত কাব্যের নয়। কৌতূহলের বিষয় এই যে ইনফারনোয় কোনও নায়ক বা নায়কোপম চরিত্রের শোধন বিবর্তন চলছে না, বরং বলা যায় নায়কই হলেন কবি-বক্তা, দান্তে নিজে। তিনি নিজেই যেন নায়ক, নিজেই গ্রিক কোরাসের মতো টিকাকার, রসের ধূয়াধারক। পার্গেটোরিওতে চলল সত্যকার শোধন – কিন্তু তার রস ঘুমে-জাগরণে আনন্দ-বেদনায় মেশা। আর প্যারাডাইসোর মুক্তিলোকে আনন্দধামে মহা আনন্দ ব্যক্তিক-চেতনা বিবর্তনের প্রয়াসযন্ত্রণায় গভীর। এই সব মিলিয়ে দান্তে একে কমেডি আখ্যাই দিয়েছেন। এই কথাটা মনে রাখা দরকার।
ট্র্যাজিক উপাদান জড় করলেই ট্র্যাজেডি হয় না। ট্র্যাজেডিত্ব নির্ভর করে ওই উপাদান ব্যবহারের উপর, বিশেষরকমের অঙ্গীভাব (total impression) রূপায়ণ চেষ্টার উপর। একই থীম গ্রিক ট্র্যাজেডিতে একভাবে ব্যবহৃত, অনেক পরে ইতালিতে সেনেকার নাটকে তাই নিয়েই উত্তেজনাবিলাসের (sensationalism) আয়োজন, আবার কয়েক শতাব্দী পরে ফরাসি নাট্যকার রাসিনে তাঁর মনস্তাত্বিক ভাবাবেগ ওঠানামার গ্রাফ অঙ্কন। দান্তে সামাজিক নক্সাই শুধু আঁকতে চাননি, শুধু উত্তেজনা বা মানসবৈচিত্র্যের অনুসরণও তাঁর কাম্য নয়। তাঁর কাম্য দুঃখ অভিজ্ঞতার বেদনাময় কিন্তু শিল্পরস অনুধাবনের মধ্য দিয়ে, তপস্যার পথ পেরিয়ে মিলনে পৌঁছানো। ট্র্যাজেডির মধ্য দিয়ে এমন কমেডিতে যাওয়া যা সমস্ত দুঃখসুখের সমবায়েই উঠেছে সমস্ত দুঃখসুখের উপরে।
এই মহৎ সাহিত্যিক উদ্দেশ্যসাধনায় দান্তের সহায় হয়েছে চার রকমের রসের সাধনা ১. ভ্রমণ রস ২. প্রকৃতি ও জীবন সম্ভোগরস ৩. মানবিক সহবেদন রস ৪. প্রেম ও অধ্যাত্মরস।
ভ্রমণ রস।
ভ্রমণ রস কথাটা অদ্ভূত শোনাচ্ছে সন্দেহ নেই, কিন্তু রেনেসাঁসের সময়ে তো বটেই, তারও আগে কাব্যে ভ্রমণকাহিনি কথনের যে একটা স্বতন্ত্র আবেদন ফুটেছে এবং অসংখ্য গ্রাহকচিত্তকে আকৃষ্ট করেছে তাতে সন্দেহ নেই। যেখানে যে উদ্দেশ্যে ভ্রমণই হোক তার নিপুন কথন যে ঔৎসুক্য উৎকণ্ঠা বিস্ময় আবিষ্কারের আনন্দ ইত্যাদি জাগাতে পারে তাকেই একত্রে নাম দিচ্ছি ভ্রমণ রস। হোমরের ওডিসিউসের প্রধান সামর্থ্য এই রসের প্রাচুর্যের জন্য। আর দান্তে ইউলিসসকে নরকে স্থান দিয়েও যে কতটা তার গুণমুগ্ধ ছিলেন তা ইনফার্নোর ছাব্বিশ সর্গেই দেখা যায়। ভার্জিল-এর ‘ঈনিড’ও ভ্রমণবৃত্তান্তের উপর গড়া কাব্য। ‘ফাউস্ট’ও তাই। ‘প্যারাডাইস লস্ট’ও অনেকটা তাই। আর শ্রীঅরবিন্দের ‘সাবিত্রী’ও তাই। দান্তে খ্রিস্টধর্মের গোঁড়া প্রচারক হিসাবে তাঁর নরকস্বর্গ ভ্রমণ বর্ণনা করেননি, নিপুণ রসিক ভ্রাম্যমাণ হিসাবেই তা করেছেন। আজকালকার travelogue বা ভ্রমণ সাহিত্যের মাপকাঠিতে দান্তেকে এ ক্ষেত্রে একজন উচ্চতম শিল্পী বলা যায়। তাঁর ক্যান্টোর পর ক্যান্টো বর্ণনা কোথাও একঘেয়ে বা বিরস হয়নি তা শুধু তাঁর সদাজাগ্রত সদা-উৎসুক সদ্যস্পর্শী মনের ছোঁয়ায়। আমরাও এই মহাপথিকের সঙ্গেই যেন জুটে যাই ও একাত্ম হয়ে যাই তাঁর সমস্ত মানস প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে। তাঁর ঋজু পাহাড়ের সামনে এসে অক্ষমতাবোধ ও হতাশা, কিম্ভূতকিমাকার বা ভীষণ জন্তু জানোয়ার দানব ইত্যাদি দেখে ভয় বিস্ময়, আলো আঁধারের মধ্যে ‘ঠাওর’ করতে করতে বোঝা দৃশ্যটা কী, সঙ্গী ও নেতা ভার্জিলকে বারবার উৎকণ্ঠিত প্রশ্ন করে জানা এটা কী, ওটা কী, এ রকম কেমন করে হল; আর এইসব কৌতূহল মেটাবার কাজে তাঁর সময়ের সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞানের ও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ পদ্ধতির ব্যবহার করা। দান্তে শিক্ষায়, সংস্কৃতি-সাধনায় গ্যেটে ও রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তুলনীয়। ধর্মতত্ব, জ্যোতিষ, চিত্রসঙ্গীত-ভাস্কর্যতত্ব সবেই তাঁর পারদর্শিতা ছিল প্রচুর। তাঁর ভূগোল ও জ্যোতিষ, তাঁর অ্যারিস্টটল প্ররোচিত জগৎ ও নরকবিভাগ ইত্যাদি দেখে আজ হাসি পেলেও তার পেছনে যে দীপ্তিমান বুদ্ধির সাক্ষাৎ পাওয়া যায় তাকে চিরকালের শ্রেষ্ঠ সম্মান একটা দিতেই হয়। এবং এই মন তার বিশ্বপরিক্রমায় এমন সরস অভিজ্ঞতা অর্জন ও বিতরণ করেছে যে তাই তুলেছে কমেডিকে উচ্চতর সাহিত্যভূমিতে। ভ্রমণ ও অ্যাডভেঞ্চার কাহিনির সমুচিত রসগ্রাহী হচ্ছে ইতালীয়রা। এক ইতালিয় কন্যা ডেসডেমোনা ভ্রমণের গল্প শুনে প্রেমে পড়েছিলেন। আর এই ইতালিয় কবির ভ্রমণ রসে মুগ্ধ হয়ে কেউ তাঁর প্রেমে পড়লে আশ্চর্য বোধ করব না।
বাইরের দৃশ্যান্তর ঘটনার সঙ্গে কত তীব্র মানসিক আবেগের যোগ ঘটতে পারে এবং তার ফলে পথযাত্রা হয়ে ওঠে চিরস্মরণীয় তার নিদর্শন দিচ্ছি। Styx নদীর বেখয়ার মাঝি সেই বুড়ো ক্যারন (Charon) – যার ঝুলে পড়া গাল, যার দুচোখ ঘিরে ঘুরছে আগুনের চাকা, যার নৌকো থেকে লোক নামছে যেন ছড়িয়ে যাচ্ছে শীতঝড়ের ঝরাপাতা-সে যখন নৌকোয় তুলল দান্তেকে তখন কেমন করে যে ওই নদী পার হলেন তা তিনি জানলেন না। কারণ
অশ্রুভেজা মাটি পাঠালো ঝড়দমক,
চোখ সমুখে জ্বালালো যেন আগুন লাল,
অসাড় ঢাকায় ঢাকল সব বোধচমক-
পড়ে গেলুম … যেন একটা ঘুম মাতাল…
ইনফারনো, ২য় কান্টো
জেগে দেখেন একেবারে নদীর ওপার। কোলরিজের Ancient Mariner-এর বর্ণনাকৌশল অপূর্ব, কিন্তু তা দান্তের শিল্পকলা স্মরণ করিয়ে দেয়।
আবার হতাশার অবসাদের পর নতুন উৎসাহে যাত্রারম্ভের প্রসঙ্গে
ফুলরা রাতের শৈত্যে বুজিয়ে বুক
আবার ফোটায় নোয়ানো পাপড়ি বোঁটা
পেতে সকালের প্রথম আলোর সুখ
তেমনি আমারো নব উদ্যমে ওঠা।
প্রকৃতি ও জীবন সম্ভোগ।
কমেডির দ্বিতীয় গুণ এর মধ্যে ফুটে উঠেছে একটি চমৎকার চিত্রশালা জীবনের প্রকৃতির নানা মূর্তি পরিস্থিতি ও পশ্চাৎপটে সম্পূর্ণ এক এক জগৎ-চিত্র। এগুলি তাদের নিজস্ব শিল্পমূল্যেই মূল্যবান। বিভিন্ন চক্রে প্রেতাত্মাদের নিয়মতান্ত্রিক বিলিব্যবস্থা যত অনম্য কাঠিন্যেই উপস্থিত থাকুক এই কাব্যে, তবু দেখি দান্তের দৃশ্যসম্ভোগ ও বর্ণনা মানবিক আবেদনপূর্ণ, তাঁর শিল্পদৃষ্টি মুক্ত।
এক একটি চক্র বা লোকপরিবেশ ফুটিয়ে তুলতে তিনি বেছে নেন এক এক ধরনের জীবনপ্রবেগ বা বাসনাতাড়ন যেমন প্রেমের আতিশয্য, লোভ, অসংযম, কৃপণতা, অপব্যয়িতা, ক্রোধহিংসাদ্বেষ, নাস্তিকতা, ভণ্ডামি, দেশদ্রোহিতা, বিশ্বাসঘাতকতা ইত্যাদি। স্বর্গেও প্রধান খ্রিশ্চান গুণগুলি যথা বিশ্বাস (Faith), আশা (Hope), ও ভালোবাসা (Love)-র লোকবিভাগ রয়েছে। তারপর নির্দিষ্ট জীবনরীতির সঙ্গে মিলিয়ে একটি বিশেষ প্রাকৃতিক পরিবেশ – যার উপাদান আমাদের চেনা পৃথিবীর জলবায়ু থেকেই নেওয়া – গড়ে তোলা এবং তা একেবারে প্রত্যক্ষ্যগম্য করে তোলা। সমস্ত ইন্দ্রিয় শরীর মন অনুভূতি দিয়ে কেমন করে জগৎকে নিতে হয় তা দান্তে জানতেন এবং তারই পরিচয় দিয়েছেন তিনি তাঁর কাব্যে। আধুনিক কাব্যের ইমেজিজম, নানা রকমের ইমেজ বা প্রতিচিত্রের প্রতি অনুরাগের আদি প্রেরণা দান্তে। কিন্তু দান্তের ইমেজ শুধু চোখের (visual) নয়। চোখের, কানের, ঘ্রাণের, স্পর্শের, গতিবোধ-ইন্দ্রিয়ের (motor) বোধির – সব রকমের এলাকাভুক্ত ইমেজ।
যেমন ধরা যাক নরকের গেটের মাথায় লেখা সেই ‘এখানে ঢুকছ যারা ফেলে এস সব আশা’, আর তারপর আপোষহীন অন্ধকারের (truceless gloom) রাজ্য, আর তার মধ্যে উঠছে
অচেনা অসংখ্য ভাষা, তর্ক ভয়ানক
ক্রুদ্ধ কণ্ঠস্বর আর দুঃখ ইতিহাস
হাতে হাতে ঠোকা আর ভগ্ন তীক্ষ্ণ স্বর…
ঘূর্ণিঝড় বইছে ; ক্রমে অন্ধকার সয়ে স্পষ্ট হয়ে উঠল ছত্রভঙ্গ ছায়ামূর্তির দল। একদল এক নিশান তুলে চলছে শোভাযাত্রা করে কেমন যেন অস্থির হয়ে। একদল দৌড়চ্ছে নগ্নদেহে মৌমাছি ভীমরুলের হুল খেতে খেতে, তাদের রক্ত পড়ছে মাটিতে, কৃমিকীটরা পুষ্ট হচ্ছে সেই রক্তে ইত্যাদি …। এইখানে থাকে সেই সংশয়াত্মারা যারা ভালো বা মন্দ কিছুই একটা বেছে নিতে পারেনি।
অতিকামনার দেশের অভিভাবক মিনস। সে তার ল্যাজের যত পাক দিয়ে ধরে কাউকে, বোঝা যায় তার স্থান নরকের তত নম্বর চক্রে। এখানে সব সময়ে বইছে ঝড়। শীতকালের ঝড়ে অসহায় পাখির মতো আত্মারা এখানে অস্থির হয়ে বেড়াচ্ছে। ‘বকের সারি যেমন আকাশে দাগ কাটে আর রব তোলে করুণ, তেমনি সেই ঝড়ের মত্ততায় আর্তনাদ করতে করতে ভেসে বেড়াচ্ছে দেখলুম ছায়ামূর্তির দল।’
তৃতীয় চক্র অমিতাচারীদের ; এখানে অভিভাবক সেই বিখ্যাত নারকীয় ড্র্যাগন বা কুকুর সেরবেরাস (Cerverus) যার চিৎকারে কান ফাটে। ঠান্ডা বর্ষা ও করকাপাত ; আর নোংরা কাদা পাঁকের সমুদ্র। সেই পাঁকে হাবুডুবু খাচ্ছে প্রেতরা, এপাশ ওপাশ ফিরে বৃষ্টির চাবুক থেকে শরীরের একবার এ পাশ একবার ওপাশ বাঁচাচ্ছে। ভার্জিল কাদা ছুড়ে গিলিয়ে ওই রাক্ষুসে কুকুরের মুখ খানিকক্ষণের জন্য থামালেন। একটা প্রেতকে কাদার মধ্যে মাড়িয়ে ফেলে দান্তে দেখেন শুধুই শূন্যগর্ভ ছায়া, বস্তু কিছু নেই।
সপ্তম চক্র উগ্রপন্থীদের স্থান। জায়গাটা একটা বিস্তীর্ণ উদ্ভিদহীন বালুপ্রান্তর। এখানে উগ্র নাস্তিকরা পড়ে আছে চিৎ হয়ে, শিল্পের চোরা ব্যবসায়ীরা বসে আছে টাকার থলি আঁকড়ে, অস্বাভাবিক কামবিলাসীরা ঘুরছে পাগলের মতো, আর আগুনের হলকা বৃষ্টি হচ্ছে আল্পসের চূড়ায় তুলোর মতো ফাঁপানো তুষারপাতের মতো।
পাপে সহযোগী দুই বন্ধুর মধ্যে একজন আবার বিশ্বাসঘাতকতা করে অপরকে ও তার সন্তানদের কারাগারে অনাহারে মেরেছিল। দু’জনেই এখন বরফের দেশে এই বরফজমা গুহায় আটকে রয়েছে, পালাবার উপায় নেই। যে অন্যায়ভাবে মরেছিল সে বিশ্বাসঘাতকের মাথা কামড়ে খাবার চেষ্টা করছে। কারণ তার সে অধিকার আছে। তার মুখে তার গল্প শুনলে মনে পড়ে দ্বিজেন্দ্রলালের কাত্যায়নের কথা – ‘আমার সাত সাত ছেলেকে অনাহারে মরতে দেখেছি’ ও মনে হয় ইনফারনোর তেত্রিশ ক্যান্টোয় ইউগোলিনের এই গল্প তিনি পড়েছিলেন।
শুধু ভয়ংকর চিত্রই নয়। সুন্দর চিত্রও আছে অনেক, তার একটি মাত্র দিচ্ছি। চাঁদের দেশের বাসিন্দাদের মনে হচ্ছে ঠিক যেন একটা আয়নার ভিতরকার ছায়া। এই বিশ্বজগতে ফুটে উঠছে সুন্দরী মেয়েদের অস্পষ্ট ঝিলিক। গৌরবর্ণা মেয়ের কপালে যেমন মুক্তোর টায়রা মিলিয়ে থাকে দেখা যায় না, শুধু তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিতেই একটু চিকিয়ে ওঠে, তেমনি ফুটে উঠছে ওই সুন্দরীদের রূপ।
তত্বের নিগড়ে বন্দী থেকেও দান্তে যেন ‘সহস্রবন্ধন মাঝে লভিব মুক্তির স্বাদ’। তাঁর শিল্পকৃতিত্বের প্রভাব এজরা পাউন্ড, ইমেজিস্ট কবিরা, টি. এস. এলিয়ট ছাড়াও স্যুররিয়্যালিষ্ট কবিদের মধ্যেও দেখা যায়।
মানবিক সহবেদন
প্রশ্ন উঠতে পারে যে সমবেদনা তো যে কোনো সার্থক কবির পক্ষেই অপরিহার্য, বিশেষভাবে সে কথা দান্তে প্রসঙ্গে তোলা কেন? তার মানে এই যে তাঁর ক্ষেত্রে এই ‘সহবেদন’ সমস্ত মতবাদবদ্ধতার বাধা অতিক্রম করে এমন ভাবে প্রকাশ পেয়েছে যার একটা বৈশিষ্ট্য, একটা বিশেষ রস আছে। এ শুধু মন বা কল্পনার সহনশীলতা বা ঔদার্য নয়। এ হৃদয়নিঃসৃত এক ধারা যা নৈসর্গিক ঝরণার মতো স্বতঃউৎসারিত। বুদ্ধিবিচারের ব্যাপার এ নয়, মূলত এ একটা আধ্যাত্মিক সিদ্ধিও নয়। এ একটা মানবিক স্তরের হৃদয়সিদ্ধি – মানবিক নবজন্মের (humanistic renaissance) এক প্রধান প্রেরণা, এবং এর প্রধান উৎস দান্তে। সেই হিসাবে ইতালীয় রেনেসাঁসের প্রধান পুরুষ যদি দান্তেকে বলি, (যেমন ইংলন্ডের শেকসপিয়র ) তবে গ্রহণযোগ্য হবে বলে আশা করি।
ইনফারনোর প্রথম চক্র লিম্বোতে সম্পূর্ণ নিষ্পাপ অশেষ গুণাণ্বিত পেগ্যানদের থাকতে দেওয়া হয়েছে, তাদের একমাত্র দোষ জীবৎকালে তাদের খ্রিশ্চান হবার সৌভাগ্য হয়নি। কষ্ট যন্ত্রণা কিছু নেই, কিন্তু এদের ভবিষ্যৎ ‘আশা’ বলেও কিছু নেই। কারণ তা হচ্ছে খ্রিশ্চানদেরই একচেটে অধিকারের বস্তু। ভার্জিল হোমর ইত্যাদি সকলেই এখানে। যখন ভার্জিলের কাছে দান্তে শুনলেন এখানকার কথা তখন ‘দারুণ-দুঃখের মোচড় খেল আমার হৃদয় তাই শুনে।’
আবার অষ্টম চক্রে আছেন ইউলিসিস, কারণ তিনি এক ধূর্ত পরামর্শদাতা, খ্রিশ্চান বিশ্বস্ততাগুণ তিনি লঙ্ঘন করেছেন – তা সে অন্যরকমের গুণে মহত্বে যতই তিনি মহীয়ান হোন। এই চক্রে অবশ্য নোংরা বীভৎস তেমন কিছু নেই। এখানকার বর্ণনা দিচ্ছে দান্তে
সূর্যের মুখ যখন আমাদের দৃষ্টিসহ হয় ( সন্ধ্যায় ) যখন মাছিরা মশাদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে বিদায় নেয়, তখন পাহাড়ের উপর বিশ্রামরত চাষি নীচে উপত্যকার দিকে তাকিয়ে দেখে অসংখ্য জোনাকি, তারা ঢেকে ফেলেছে সেইসব জমি জায়গা যেখানে হয়তো সে নিজেই চাষ করে বা আঙুর ফল তোলে ঠিক সেইরকম অসংখ্য শিখায় এই অষ্টম চক্রের সব দিক পরিপূর্ণ।
এই হল হোমেরিক সিমিলিরীতির দান্তে সংস্করণের নমুনা। আধুনিক কাব্যিক ইমেজের এই উৎস (ইমেজটা অবশ্য দান্তের নিজস্ব)। এই চক্রে একটি দ্বিচূড় শিখার মধ্যে একত্রে আবিষ্কার করা গেল ইউলিসিস ও ডায়োমেডকে। প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করাতে আগুনের জিভের মতো লকলকিয়ে উঠে উত্তর দিল ইউলিসিস শিখা। বলল তার মহৎ আদর্শের কথা। জানালো তার অদম্য ভ্রমণ পিপাসা, জগৎ-এর অন্যমেরু আবিষ্কার-অভিযানের কাহিনি, সেই অভিযানে নাবিকদের উদ্রিক্ত করবার সেই আহ্বানবাণী ‘পশুর মতো বাঁচা আমাদের নয়, আমাদের জন্ম মানুষের লভ্য সমস্ত জ্ঞান শ্রেষ্ঠসিদ্ধির অনুধাবনের জন্য।’ নরকবাসী ইউলিসিসের এই উজ্জ্বলচিত্রণের উদারতা লক্ষণীয়।
তারপর পার্গেটোরি-ওর শেষ দিকে বিয়াত্রিচে আসার মুহূর্তে ভার্জিলের অন্তর্ধান, কারণ ওই লেথে নদী (Lethe) পার হবার অধিকার তাঁর নেই। তখন দান্তে বলছেন ‘আমাকে শোকে ভাসিয়ে চলে গেলেন ভার্জিল, যিনি আমার অতিপ্রিয় পিতার মতো, যাঁর জন্যই আমার মুক্ত হল পাপের বন্ধন। আমার গাল শিশিরে ধুয়ে হয়েছিল পবিত্র, এখন আবার তাতে পড়ল অবিশ্রাম অশ্রুর কলঙ্ক।
আর সেই বিখ্যাত দুই প্রেমিক ফ্রাঞ্চেস্কা আর পাওলো। ঠিক ওদেরই মতো প্রেমের মোহে পড়ে দান্তে বিয়াত্রিচেকে ভুলতে বসেছিলেন। নরকের তৃতীয় চক্রে (আগেই বর্ণনা করেছি) ঝড় ঝাপটায় দুর্যোগ-অশান্ত দেশে রয়েছে ওই প্রেমিকযুগল। ওদের ইতিহাস মেয়েটির মুখে শুনে দান্তের মনোভাব একেবারেই নীতিবাগীশের নয়, গোঁড়া খ্রিশ্চানেরও নয় – পরম সহানুভূতির।
ফ্রাঞ্চেস্কা বলল
একদিন একত্রে পড়ছি পড়ারই আনন্দে
লনসলট কাহিনি, মজল কেমনে প্রেমে সে…
শুধু দুজনেই আছি, পড়ছি নির্দ্বন্দ্বে ;
এক জায়গায় এসে চোখে চোখ মেশে,
দু’জনেরই গালে চোরা রং ফুটে ওঠে…
…হবার যা হল এই জায়গাটিতে এসে –
‘বহু আকাঙ্ক্ষিত হাসি যেই প্রিয়াঠেঁাটে
ফোটা – তা প্রেমিকবর চাপল চুমা দিয়ে’-
-পড়ামাত্র দুই হয়ে থাকবে না যে মোটে
আমা থেকে, সারাদেহ শিউরিয়ে শিউরিয়ে
সেও একটি চুমো এঁকে দিল এই মুখে…
দান্তের প্রতিক্রিয়া –
একজন বলছিল, আর অপরটি কেঁদে
ভাসাচ্ছিল … প্রাণ আমার সব
সত্যিই বেরোল যেন ও দু’টির খেদে-
শরীর লুটিয়ে ভুঁয়ে পড়ল যেন শব!
আপনজনকে ফেলে রেখে কোনও ভালো জায়গায় যেতে পেলেও যেমন মন কেমন করতে থাকে তেমনি সেন্টিমেন্ট দান্তে বারবার সুন্দরভাবে প্রকাশ করেছেন। মহাপ্রস্থানের সময় এক এক আত্মীয়ের পতনে যুধিষ্ঠিরের মতো স্থির অনাসক্ত অন্তর্মুখ তিনি নন। একটি কোমল সংবেদনশীল মানুষের মনের সুন্দরগভীর প্রতিক্রিয়াই তাঁর। এমনকি পিকার্ডো মেয়েটি স্বর্গধামের একটা নীচের স্তরে থেকে যাচ্ছে এও তাঁর ভালো লাগছিল না। সে আরো উপরে যাবার চেষ্টা করবে না কেন? শেষে পিকার্ডোই এর যা জবাবদিহি দিলে তাতে দান্তে পেলেন সৃষ্টি বিন্যাসের একটি মূল সূত্র ; সেই ‘যাথাতথ্যতোর্যান ব্যদধাৎ’ এর মতো একটি যেন মন্ত্রোচ্চারণ ‘E’n la sua volontate e nostra pace’—’and in His Will is our peace…’ আর সেই তাঁর ইচ্ছাতেই সুখ – আমাদের শান্তি। মানের দিক দিয়ে যত না হোক ধ্বনির দিক দিয়ে এই বাক্যটি এনে দেয় এমন একটি উপলব্ধি যাকে বলা যায় উচ্চতম কাব্যসিদ্ধি। এর সঙ্গে তুলনা করতে পারি ‘সকলি তোমার ইচ্ছা ইচ্ছাময়ী তারা তুমি’, ‘তোমার, ইচ্ছা হউক পূর্ণ করুণাময় স্বামী’ ইত্যাদি। এর প্রত্যেকটির এক এক স্তরের, এক এক তীব্রতার (intensity) কাব্যমূল্য আছে। দান্তের লাইনটি চরম ঔপনিষদিক উচ্চারণের সুরে বাঁধা।
প্রেম ও অধ্যাত্মরস
দান্তের কাব্যের প্রধান সম্পদ, প্রধান রসের উৎস তিনি নিজে। তাঁর অপূর্ব অতুলনীয় প্রেম চরিত্র ও মন। এর মধ্যে আবার মূল শক্তি ওই প্রেমে, তাই থেকেই জন্মেছে, পরিণত হয়ে উঠেছে তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। প্রেমের কতকগুলি সার্বিক টাইপ আমরা জানি, মানি বা কল্পনা করে নিতে পারি যেমন, হরপার্বতীর প্রেম, রাধাকৃষ্ণের প্রেম, মানুষ জগতে নেমে এসে রামসীতার প্রেম, সাবিত্রী সত্যবানের প্রেম, আবার কাব্যজগতের যেসব প্রেম ঊর্ধ্বতম শিখর স্পর্শ করেছে তাদের মধ্যে দেখা যায় কত বৈচিত্র্য স্বতন্ত্র টাইপ-গত কত বৈশিষ্ট্য। মা, বোন, বন্ধু, ক্রীড়াসঙ্গিনী ইত্যাদির সম্বন্ধের নানাধরনের মিলনে, ভক্তি প্রীতি আকাঙ্ক্ষার কত রকমের মিশ্রণে, সুন্দরের আকর্ষণ, সত্যের আহ্বান, কল্যাণের ইঙ্গিত কত রকমের প্রেরণার যোগে তৈরি হয় এক একটি চিরন্তন টাইপ, যদিও প্রতিটি টাইপে শেষ পর্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে একটি বিশেষ রূপ। প্লেটোর আদর্শ প্রেম, শেলির এপিসাইকিডিয়ন, কীটসের এনডাইমিয়ন, রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদা ইত্যাদি মনে মনে সাজিয়ে সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের দ্বারা বিচার করা যায়। কিন্তু এখানে তার দরকার নেই। শুধু বলতে পারি যে এই সব প্রেমটাইপের মধ্যে দান্তের প্রেম একটি বিশেষ মর্যাদার দাবি করে। তাঁর প্রেম অপরজগতের নয়, যদিও অপরজগৎ-চুম্বী, ওয়ার্ডসওয়ার্থের স্কাইলার্কের মতো মাটি ও স্বর্গের মর্মকেন্দ্রচারী। তাঁর প্রেম সম্পূর্ণ নিজস্ব (private) অথচ সার্বিক (universal)। এই প্রেমে আত্মরক্ষণ বা বলা যাক আত্মচারিত্ররক্ষণ থাকলেও স্বার্থপরতা নেই, আত্মসমর্পণ থাকলেও নৈরূপ্যে বিলয় নেই। কাজেই এ প্রেম সংসারেও নদীর জলের মতো ব্যবহার্য, কাব্যেও।
আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করতে পারি, কল্পনায় নিজের সামনে নতুনসৃষ্টি করে নিতে পারি নয় বছরের বালক দান্তের বিয়াত্রিচে বালিকাদর্শন এবং তৎক্ষণাৎ অনুভব ‘এ কোন গগনের তারা, কোন কাননের ফুল!’ তারপর সেই প্রতিমা মনে মনে লালন, সামান্যতম দৃষ্টিবিনিময়, নমস্কার ইত্যাদির উপর নির্ভর করে মনে মনে অচ্ছেদ্য আত্মিক সংযোগ রচনা, অনাদিকালের যুগলপ্রেমের স্রোতটিকে খুঁজে নিয়ে তাতে আরোহন করা। ‘তুমি আছ, আমি আছি’ শুধু এইটুকু প্রত্যয় ও আশ্বাসের উপরই জীবনের সব কিছুকে গড়ে তোলবার সাধনা করা। ভিটা নুওভায় যে প্রেমের বর্ণনা তা তো হৃদয়ের তন্ত্রীছেঁড়া বেদনার সাক্ষ্যে জীবন্ত। তা যে গুরুতর ব্যক্তিগত ঘটনা সে কথা মুহূর্তের জন্য সন্দেহ করার কথাও ওঠে না। ভিটা নুওভায় যে চারিত্রিক বিস্ফোরণ ও বিস্ফোরণের আরম্ভ, সমস্ত ডিভাইন কমেডি কাব্যে তারই বিবর্তন ও সমাপ্তি। আত্মজীবন-রচনা আর আত্মজীবনের মহত্তম ঘটা বিয়াত্রিচেপ্রেমের উদঘাটন দান্তের কাব্যজীবনের সাধনা ও সিদ্ধি।
নিষ্পাপ, কিশোরসরল, স্বতঃস্ফূর্তস্বভাব, অথচ উচ্চতম গভীরতম চিন্তায় তত্বে কৌতূহলী – এই হল দান্তের মন। মানবজীবন পাঠশালার তিনি আদর্শ ছাত্র। সংসারে তিনি কিছুটা অখ্যাতি কুড়িয়ে থাকতে পারেন অহঙ্কারের জন্য, কিন্তু অন্তর্মানসে তাঁকে যেন তুলনা করতে পারি সেই ছেলেটির সঙ্গে যে কিছুকাল কাটিয়েছিল হিমালয়ে শান্তিনিকেতনে তার ঋষিপিতার সঙ্গে। বিয়াত্রিচের প্রতি দান্তের ভাব ওই রকম শ্রদ্ধার, যেন গুরুশিষ্য সম্বন্ধ, মা ছেলে সম্বন্ধ। ভয়, পাছে কিছু ভুল করে ফেলি বলে ফেলি, পাছে মূঢ় মাটির ঢেলার মতো বোবা হয়ে থাকি, বীণার তারের মতো বেজে উঠতে না পারি।
পার্গেটোরিওর শেষে লেথে নদীর কূলে হঠাৎ বিয়াত্রিচের আবির্ভাব এবং ভর্ৎসনা, সেই ভর্ৎসনার সামনে অপরাধীর মতো সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ – ‘দাঁড়ায়ে ছিলাম মাথাটি করিয়া নীচু’-আর অনুশোচনা। তারপর এই শোধনের পর ভালোবাসার দূতীদের সাহায্যে লেথে নদীতে অবগাহন এবং তার ফলে পুরনো গ্লানির স্মৃতিমুক্ত হয়ে শুদ্ধ প্রেমের অধিকার লাভ – এই সব কিছুর মধ্যেও দান্তে বিয়াত্রিচে সম্বন্ধে কোথাও কৃত্রিমতার বা পরুষতার কলঙ্ক লাগেনি। এইসব শাসনভর্ৎসনা শুধু আপনজনের কল্যাণ কামনায়, এতে মান অপমান উঁচু-নীচু নেই, এর বেদনা দু’জনেরই সমান কারণ ওরা বাইরের দৃশ্যে দু’জন কিন্তু গভীর আত্মিক মিলনে অভিন্ন – কমেডির পাঠকের কাছে এই সত্য অনাবিষ্কৃত থাকতে পারে না। এই মিলন এমন যে বাইরের কথাবার্তার প্রয়োজনও কমে গেছে। সামান্য ভাবভঙ্গি, পাশফেরা, চোখে কথাভরা আভা, মুখ তোলা নামানো, ঠোঁটের উপক্রম থেকেই ওরা পরস্পরের মনের অবস্থা বুঝে নেয়। দান্তে তাই বিয়াত্রিচের দিকে চেয়েই আছেন, বিয়াত্রিচে বারবার তাঁকে বলছে অন্য সব কিছু দেখতে। দান্তে বিয়াত্রিচেজ্যোতি চোখ দিয়ে পান করে তার সঙ্গে নিজের সুর মিলিয়ে নিচ্ছেন। তাঁর ঘোলা চোখের দৃষ্টি এই করে ক্রমেই স্বচ্ছতর হতে লাগল, হৃদপদ্ম ক্রমেই পাপড়ি খুলতে লাগল। মিলটনের Holy Light-এরই মতো যে জ্যোতিরূপিনীকে পুরোবর্তিনী করে দান্তের যাত্রা তাঁকে তিনি দেখলেন দিব্যজ্ঞান – Divine Wisdom-এর দূতী হিসাবে।
বহ্নিবীণা বক্ষে লয়ে দীপ্ত কেশে, উদ্বোধিনী বাণী
যে পদ্মের কেন্দ্রমাঝে নিত্য বাজে, জানি তারে জানি…
বিয়াত্রিচের কথায় ঝড়ের মুখে গাছপালার মতো দোলে দান্তের প্রাণ। তার রূপ তার দৃষ্টিসুধায় তাঁর চোখ করে স্নান, অন্তরাত্মা পায় পুষ্টি। সমস্ত প্যারাডাইসো এইসব অনুভব আর অভিজ্ঞতার এমন মহৎ কাব্যিক ঝংকার তুলেছেন যে তার মূল্য না দিয়ে Divine Comedy -র মধ্যে শুধু Inferno-ই সাহিত্যিক মূল্যে শ্রেষ্ঠ এমন কথা শুনে অবাক লাগে।
এক জ্যোতি উদ্ভাসিত স্বর্গলোকের সত্য উপলব্ধি হয়েছিল দান্তের এবং তাকে উদঘাটিত করে দেখাতেও পেরেছেন তিনি প্যারাডাইসোতে আলোর বহুধারাসঙ্গম। নানা ঋতুর নানা রঙের ফুলের মতো উছলে উঠছে তার ঢেউ-এর উল্লাস, তাই থেকে তৈরি হচ্ছে বিচিত্র জগৎ। সেই আলোর গভীরে ঢুকতে ঢুকতে ক্রমশ এমন অবগাহন যে সব যেন ডুবে গেল নিঃসীম অন্ধকারে, সবচেয়ে সচেতন জাগরণ হযে গেল সুষুপ্তি, আর যখন তার থেকে বেরিয়ে এলেন তখন সেই পরম অভিজ্ঞতার মুহূর্তকে যেন এসে ঘিরল বহু সহস্র বছরের বিস্মরণ। মার স্তন্য নিবিষ্ট শিশু যদি আত্মকথা শোনাতে যায় সে যেমন হবে, দান্তে যে জীবন্ত আলোর সাক্ষাৎ পেয়েছিলেন তার বর্ণনা করতে গেলেও হবে সেই দশা। এই আলোর স্বরূপ বিয়াত্রিচেই বুঝিয়ে দিলেন দান্তেকে ‘ও হল প্রজ্ঞার জ্যোতি ভালোবাসায় ভরা। আবার কল্যাণময় এই ভালবাসা ভরা আছে আনন্দে। এই আনন্দ পরমজগৎ-এর সব সুখবোধের উপরে।’
যা পাবার সবই দান্তে পেলেন বিয়াত্রিচের মধ্য দিয়ে। মুক্তকণ্ঠে স্বীকার করেছেন সেই কথা ‘সেই প্রথম যেদিন মুখ দেখলুম ওর এই মর্ত্যলোকে, সেইক্ষণ থেকে এই আজ পর্যন্ত আমার গান ওরই চলার পথ অনুসরণ করে চলেছে, একবারও বিরত হয়নি’ (Paradiso, Canto XXX—)।
তার সাহায্যেই দান্তে দেখলেন দিব্য গোলাপ, Delestial Rose। হার মানলেন, স্বীকার করলেন পৃথিবীর যে কোনো কবির পক্ষেই তার উপযুক্ত কাব্যায়ন অসম্ভব।
তখন যা দেখলুম তা ছাপালো মহত্বে
আলোচনার কূল। সব দৃশ্য গেল ভেসে,
আলোর আলিঙ্গনে স্মৃতি ডুবলো নিঃশর্তে।
যখন কেউ স্বপ্ন দেখে, আর সেই স্বপ্নশেষে
দৃশ্যপট হারিয়ে যায়, তার আবেগকম্পনই
বাজতে থাকে, আর কিছুই রয় না স্মৃতিদেশে
আমার তো ঠিক তাই।… সেই সমস্ত দর্শনই
মুছে গেছে ; কিন্তু আজো মধুফেঁাটা তার
একটু একটু করে যেন চিনছে ধমনী।
এমনি করে রোদ ছোঁয়ায় মিশায় তুষার,
হারিয়ে যায় সিবিল মেয়ের বাণীলেখা পাতা
দমক লেগে হঠাৎ জাগা দখিনা হাওয়ার।
রসনায় শক্তি দাও হে বিশ্ব বিধাতা,
তার কিছু স্মৃতি প্রতিধ্বনি ফুটুক এ শ্লোকে
তাতে হয়তো সার্থক হবে এই দিব্য গাথা।
অপার অনন্ত দয়া!- আমি যার দিব্য ঝোঁকে
মত্ত হয়ে চেয়েছিলুম পরম আলোর দিকে,
সেই হোমে হব্য হয়ে দৃষ্টি গেল চোখে
শুধু দেখেছিলুম সে আলোয় অনেক লেখা লিখে
কেউ উড়িয়ে দিয়েছে যেন বিশ্বের সবখানে।
আর প্রেম তা কুড়িয়ে এনে বাঁধছে পুঁথিটিকে।
প্যারাডাইসো, শেষ ক্যান্টো
সাহিত্যভূমিতে বহুতীর্থের জলই বাঞ্ছনীয়। দান্তের এই অলৌকিক অথচ গভীরভাবে মানবিক প্রেমসরস্বতীর ধারা এসে নামুক বাংলা সাহিত্যে এই কামনা করি।
৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা
(দান্তে বিশেষ সংখ্যা ১৩৭৩)
