তরুণ মার্কস – পরেশ চট্টোপাধ্যায়

তরুণ মার্কস – পরেশ চট্টোপাধ্যায়

মার্কসবাদকে যাঁরা তত্বের অচলায়তনে আবদ্ধ না রেখে জগৎ-পরিবর্তনের হাতিয়ার রূপে ব্যবহার করবেন

-তাঁদের উদ্দেশ্যে।

তরুণ মার্কস সম্পর্কে উৎসাহ এদেশে সাম্প্রতিক। মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে যে মার্কস-রচিত, ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি-র প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গেই১ ইয়োরোপের মার্কস বিশেষজ্ঞ মহলে তরুণ মার্কস সম্পর্কে ব্যাপকভাবে আলোচনা শুরু হয়। আমাদের দেশে সে আলোচনার আরম্ভ বোধহয় উক্ত ‘পাণ্ডুলিপি’র মস্কো-প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদ এদেশে পৌঁছানোর পরে। কিন্তু সে আলোচনা বিশেষ বিস্তৃতি লাভ করেনি ; তদুপরি সে আলোচনা থেকে তরুণ মার্কসের অন্যান্য লেখা প্রায় বাদ পড়েছে বললেই হয়। একথা স্বীকার করতেই হবে যে, তরুণ মার্কসের সামগ্রিক চিন্তাধারার আলোচনা মোটেই সহজ নয়। ভাষার অসুবিধার কথা ছেড়ে দিলেও প্রধান অসুবিধে বোধহয় এই যে আলোচনাকারীর পক্ষে হেগেল ও ফয়ারবাখের দর্শন সম্পর্কে মোটামুটি জ্ঞান থাকা একান্ত প্রয়োজন। পূর্বাহ্নেই জানিয়ে রাখা ভালো যে বর্তমান আলোচক দর্শনের ছাত্র নয়, কিংবা মার্কসবাদীও নয়, এমনকি মার্কসবাদের বিশেষ কোনও জ্ঞানের দাবিও করে না। তথাপি এ দুঃসাহসে সে প্রবৃত্ত হয়েছে মার্কসবাদ বিষয়ে কিঞ্চিৎ আগ্রহ আছে বলেই। ফলে প্রবন্ধটিতে তার ভ্রমপ্রমাদ থাকা খুবই স্বাভাবিক। ত্রুটিবিচ্যুতির প্রতি আকর্ষণ করে সুধী পাঠকবৃন্দ আশা করি প্রবন্ধলেখককে অনুগৃহীত করবেন।

লুকাচ২ (G. Lukace) এবং আলথুসে৩ (L. Althusser)-কে অনুসরণ করে বলা যায়, যে পর্বের রচনাবলি ‘তরুণ মার্কসের রচনা’ নামে চিহ্নিত হয়ে থাকে তার ব্যাপ্তি ১৮৪০ থেকে ১৮৪৪ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ তাঁর ডক্টরেট থিসিস ‘ ডেমক্রিটুস ও এপিকুরুসের প্রাকৃতিক দর্শনের পার্থক্য’। (Differenz der demokritischen und epikureischen Naturphilosophic) থেকে পবিত্র পরিবার (Die Heilige Familie) পর্যন্ত।

বর্তমান প্রবন্ধের জন্য তরুণ মার্কসের প্রধান রচনাগুলিকেই বেছে নেওয়া হয়েছে। ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি’ ছাড়া অন্যান্য রচনার ক্ষেত্রে এই আলোচনায় বের্লিন থেকে প্রকাশিত মূল জার্মান সংস্করণগুলির উপরে নির্ভর করা হয়েছে।৪ ‘১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি’র মূল জার্মান পাঠ সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। মস্কো থেকে প্রকাশিত উক্ত রচনার ইংরেজি অনুবাদের তুলনায় এমিল বত্তিজেল্লি (Emile Bottigelli)-কৃত ফরাসি অনুবাদটি৫ অধিকতর সন্তোষজনক মনে হওয়ায় সেটিকেই ব্যবহার করেছি। এর প্রধান কারণ এই যে ১৯৫৯ সালের ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশকালেও মূল পাণ্ডুলিপিটির কোনও নির্ভুল সংস্করণ প্রকাশিত হয়নি – তখনো মস্কোর মার্কস-এঙ্গেলস ইনস্টিটিউটে নানা ধরনের ভ্রমপ্রমাদের সংশোধন চলেছে। কিন্তু পূর্বোল্লিখিত ফরাসি অনুবাদটি ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হওয়ায় তাতে সে-সব ত্রুটির অনেকটা সংশোধন সম্ভব হয়েছে। তা ছাড়া এই ফরাসি সংস্করণের দীর্ঘ ভূমিকাটিও অতিশয় মূল্যবান। বর্তমান প্রবন্ধরচনার ব্যাপারে লেখকের সর্বাধিক ঋণ কর্নু (A. Cornu)-কৃত তিন খণ্ডে সম্পূর্ণ ‘কার্ল মার্কস ও ফ্রেডরিখ এঙ্গেলস’৬ নামক অসামান্য গ্রন্থের কাছে। তরুণ মার্কস ম্পর্কে এটিই সম্ভবত সর্বোৎকৃষ্ট গ্রন্থ। আর্ভ (H. Arvon) লিখিত মার্কসবাদ নামক স্বল্পায়তন অথচ পরিচ্ছন্ন গ্রন্থটি (Le Marxisme)৭ থেকেও অনেক সাহায্য পাওয়া গেছে।

একটি মাত্র প্রবন্ধের পরিসরে এবংবিধ বিস্তীর্ণ বিষয়ের যথাযোগ্য আলোচনা সম্ভব নয়। সুতরাং তৎপরিবর্তে মোটামুটি রকমের একটা সামগ্রিক খসড়া উপস্থাপনের চেষ্টা করব।

লক্ষ করা যায় যে পবিত্র পরিবার গ্রন্থের পূর্ব পর্যন্ত তরুণ মার্কসের চিন্তার বিকাশ ‘বিযুক্তি’ (Entfremdung ; Entausserung) প্রত্যয়টিকে কেন্দ্র করে। অবশ্য প্রত্যয়টি মার্কসের আবিষ্কার নয়, হেগেল ও ফয়ারবাখ থেকে পাওয়া।

হেগেলীয় দর্শনে, বিশেষত তাঁর মনের চেতনা-বিজ্ঞান গ্রন্থে ৮ (Phanomenologie des Geistes) ইংরেজি অনুবাদে (Phenomenology of the Mind) বিযুক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছে। লুকাচের ভাষায় বলতে গেলে, হেগেল-কৃত উক্ত গ্রন্থের প্রত্যয় (zentralbegriff) হল বিযুক্তি৯। এর প্রকাশ প্রধানত ভাব ও বস্তু এবং বিষয় ও বিষয়ীর বিচ্ছিন্নতায়। হেগেলের পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থে এবং দাসের পারস্পরিক সম্পর্কের উপর যে আলোচনা আছে১০ সেই আলোচনাকে আমরা হেগেলীয় বিযুক্তিতত্বের একটি পরিষ্কার দৃষ্টান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে পারি।

প্রভু এবং দাসের সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য, যদিও পরস্পরবিরোধী। আপাতদৃষ্টিতে মনে হবে যে দাস ও প্রকৃতি এই উভয়ের পরিপ্রেক্ষিতেই প্রভু মুক্ত। দাসত্ব থেকে সে মুক্ত যেহেতু তাকে প্রভু বলে স্বীকার করে এবং প্রকৃতির পরিপ্রেক্ষিতে মুক্ত যেহেতু দাস প্রকৃতিদত্ত বিষয়গুলিকে প্রভুর ভোগের বস্তুতে পরিণত করে। অতএব প্রভু মনে করে যে দাস এবং প্রকৃতি এই উভয়ের উপরেই তার প্রভুত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত। আসলে কিন্তু এটি ভ্রান্তি। প্রভু তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার বন্দী মাত্র। যেহেতু তার প্রভুত্ব দাসের শ্রমের উপরে নির্ভরশীল, সুতরাং বাস্তবিকপক্ষে সে দাসের দাস। অবশ্য দাস যদি বিদ্রোহ করে জয়লাভ করে তবে পূর্বেকার সম্পর্ক বিপরীত সম্পর্কে পরিণত হবে মাত্র, দাসের প্রকৃত মুক্তি হবে না। প্রকৃত মুক্তি তখনই সম্ভব যখন বাইরের কোনও ব্যক্তির উপর আধিপত্য করা আর সম্ভব হবে না, যখন প্রভূত্ব করা যাবে কেবলমাত্র নিজের উপরেই-অর্থাৎ যখন একই ব্যক্তির মধ্যে প্রভূত্ব এবং দাসত্বের মিলন ঘটবে। এমন ব্যক্তিকে বলা হয়েছে স্টোয়িক (stoic)১১। এই হল হেগেলীয় ডায়ালেকটিকের মূল কথা। এই পদ্ধতির তিনটি মুহূর্ত প্রভু, দাস এবং স্টোয়িক। প্রথমটি ইতি, দ্বিতীয়টি নেতি এবং তৃতীয়টি নেতির নেতি। মনে রাখতে হবে যে নেতি ইতির বিপরীতধর্মী বলেই নেতি। স্বতন্ত্রভাবে দেখতে গেলে নেতিও ইতি। ইতি এবং নেতির দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়েই নেতির নেতিকরণ ঘটে, অর্থাৎ উচ্চতর ইতির সৃষ্টি হয় নেতিকে জয় করে এবং মূল ইতি ও নেতি এই উভয়ের শ্রেষ্ঠাংশকে আত্মসাৎ করে। ইতি ও নেতির মধ্যে যে সম্পর্ক তারই অপর নাম ‘বিযুক্তি’। নেতির মধ্যে ইতি নিজেকে খুঁজে পায় না, যেন মনে হয় নিজের কাছে নিজেই পর হয়ে গেছে। এই বিযুক্তির সমাধান হবে যেভাবে স্টোয়িকের মধ্যে প্রভুত্ব এবং দাসত্বের সমাধান হয় সেইভাবে, অর্থাৎ ইতি ও নেতি যখন তাদের বিরোধকে এক উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে যাবে, যেখানে এই পারস্পরিক বিরোধের শ্রেষ্ঠাংশকে নিয়েই এক উচ্চতর মিলন সম্ভব।

বলাই বাহুল্য যে হেগেলের বিযুক্তিতত্ব মূলত ভাবরাজ্যেই সীমাবদ্ধ। হেগেলের শিষ্য এবং প্রতিদ্বন্দ্বী ফায়ারবাখ বিযুক্তিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করেন। তিনি বিযুক্তিকে ভাবরাজ্যে সীমিত না রেখে তার সন্ধান করলেন মানুষের বাস্তব জীবনে। খ্রিস্টধর্মের সারমর্ম (Das Wesen des Christentums ১৮৪১) গ্রন্থে তিনি বিযুক্তি প্রত্যয়টিকে ধর্মের সমালোচনায় প্রয়োগ করলেন। তিনি দেখালেন যে মানুষের মধ্যে যে বিশেষ বৃত্তিগুলি আছে – যার জন্য মানুষ অন্যান্য জীব থেকে পৃথক – সে সম্পর্কে মানুষ সচেতন হয় তখনই যখন সেগুলি তার চিন্তার বিষয়বস্তু হয়ে দাঁড়ায়, অর্থাৎ যখন মানুষ তাদের সম্পর্কে ভাবতে পারে তাদেরকে নিজ থেকে পৃথক করে। এ অবস্থায়ই ঈশ্বরের সৃষ্টি হয়। মানুষের চেতনায় ঈশ্বরের আবির্ভাব এমন এক সত্তা হিসেবে যাকে মানুষ তার সমস্ত সদবৃত্তি আরোপ করতে পারে। এভাবেই এক দ্বৈতাবস্থার সৃষ্টি হয়। মানুষ নিজেকে উজার করে দিয়ে ঈশ্বরকে তার সমস্ত সদবৃত্তির আধার হিসেবে কল্পনা করে১২। এই প্রাথমিক স্তর নেতির স্তর ; মানুষ নিজেকে হারিয়ে ফেলে ঈশ্বরের কাল্পনিক সত্তার মধ্যে। সে নিজেকে ফিরে পেতে পারে একমাত্র এই প্রাথমিক স্তরের নেতিকরণ করে অর্থাৎ নেতির নেতিকরণ করে। অর্থাৎ প্রাথমিক দ্বৈতকে বিনষ্ট করে তাকে ফিরে আসতে হবে আবার পরিপূর্ণতায়, যে পরিপূর্ণতা ঈশ্বরে আরোপ করে সে নিজ সত্তাকে দ্বিধাবিভক্ত করেছিল। ধর্মীয় বিযুক্তিকে লঙ্ঘন করে মানুষকে নিজ সত্তার উপলব্ধি করতে হবে নিজের মধ্যে। লক্ষণীয় যে, বিযুক্তি সম্পর্কে ফয়ারবাখের এই আলোচনা কিন্তু শুধু ধর্মের সমালোচনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। মানুষ ঈশ্বরকে বিসর্জন দিয়ে নিজেই ঈশ্বরে রূপান্তরিত হয়েছে। পরবর্তী লেখায় অবশ্য ফয়ারবাখ এই ত্রুটি কাটিয়ে উঠেছেন আংশিকভাবে। পরবর্তী গ্রন্থ ‘ভবিষ্যতের দর্শনের নীতি’ (Grundsatze der Philosophie der zukunft ১৮৪৩)-তে ফয়ারবাখ বিযুক্তি প্রত্যয়টিকে আর ধর্মের চৌহদ্দির মধ্যে সীমিত রাখলেন না, তিনি তাকে প্রসারিত করলেন মানুষের সত্তা ও চিন্তার সমগ্র সম্পর্কের মধ্যে। তিনি দেখালেন যে ধর্ম যেমন মানুষের সমস্ত সারবস্তুকে গ্রাস করে, সেই একইভাবে মানুষের চিন্তা তার সত্তার উপর অন্যায়ভাবে আধিপত্য বিস্তার করে। অতএব ভাব ও সত্তার মধ্যে হেগেল-প্রতিষ্ঠিত সম্পর্ককে উলটে দিয়ে প্রাধান্য দিতে হবে সত্তাকে, ভাবকে নয়। সত্তা ও ভাবের ঐক্য মিলবে একমাত্র বাস্তব মানুষের মধ্যে। ফয়ারবাখের এই মানুষ কিন্তু সমাজজীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একাকিত্বের মধ্যে আশ্রয় নেয় না। সমাজের সমষ্টিগত জীবনের মধ্যেই তার মহত্বের প্রকাশ।

বিযুক্তির বিরুদ্ধে সত্যিকারের সংগ্রাম এখান থেকেই শুরু। এ সংগ্রাম বিমূর্ত চেতনা দ্বারা পরিচালিত হয় না, এ সংগ্রাম পরিচালনা করে বাস্তব মানুষ। চিন্তা বা ভাব দিয়ে বিযুক্তিকে দূর করা যাবে না, একে দূর করতে হবে কাজের মধ্য দিয়ে এবং সেই কাজটি হবে সমষ্টিগত।

ফয়ারবাখ যেখানে শেষ করলেন সেখান থেকেই বিযুক্তিসমস্যার মার্কসীয় আলোচনা আরম্ভ। এ সম্পর্কে মার্কসের প্রথম গুরুত্বপূর্ণ রচনা ‘হেগেলীয় অধিকার দর্শনের সমালোচনা হেগেলের রাষ্ট্রীয় অধিকারের সমালোচনা’ (Zur Kritik der Hegelschen Rechtsphilosophie. Kritik des Hegelschen Staatsrechts, ১৮৪৩)১৩। হেগেলের সমালোচনায় ফয়ারবাখ দেখিয়েছিলেন যে হেগেল জগতের স্রষ্টা হিসেবে ভাবকে দেখেছেন এবং বাস্তবের সারমর্ম দেখেছেন প্রত্যয়ের মধ্যে। আসলে এর বিপরীতটাই ঠিক। ফয়ারবাখের এই গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য মার্কসকে নিশ্চিতভাবে প্রভাবিত করে। অবশ্য একথা ভুললে চলবে না যে ফযারবাখের বিমূর্ত মানবতাবোধ মার্কসকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি এবং মার্কস হেগেলের সমালোচনা করতে গিয়েও মনে রেখেছেন যে সমাজবিবর্তনের ঐতিহাসিক নিয়মগুলির হেগেলীয় বিশ্লেষণের তুলনায় – মূলত তা ভাববাদী হলেও – ফয়ারবাখীয় বিশ্লেষণ বহুলাংশে ম্লান। তদানীন্তন একটি চিঠিতে মার্কস লিখেছেন ‘আমার মতে তিনি (ফয়ারবাখ) রাজনীতির তুলনায় প্রকৃতির উপরে অনেক বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আমি মনে করি যে একমাত্র রাজনীতির উপর নির্ভর করেই দর্শন আত্মোপলব্ধি করতে পারে’১৪। বস্তুত হেগেল ও ফয়ারবাখ-উভয়ের কাছেই তিনি প্রেরণা লাভ করেন। হেগেল থেকে নিলেন তাঁর ইতিহাসের ডায়ালেকটিক বিশ্লেষণ এবং ফয়ারবাখ থেকে নিলেন তাঁর দর্শনের বস্তুবাদী দিক ও বিযুক্তি সম্পর্কে তাঁর মূল বক্তব্য। এইভাবে যুগপৎ উভয়ের থেকে গ্রহণ করে উভয়ের মতবাদকে খণ্ডন করেই মার্কস অগ্রসর হলেন।

মার্কস তাঁর উল্লিখিত রচনাটি শুরু করেন হেগেলের অধিকার দর্শন (Philosophie des Rechts) গ্রন্থের প্রতিটি পঙক্তির বিশ্লেষণ করে। উক্ত গ্রন্থে হেগেলের প্রধান আলোচ্য বিষয় ব্যক্তিগত স্বার্থ ও সমষ্টিগত স্বার্থের পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রথমটি প্রতিফলিত হয় পরিবার ও সমাজে, দ্বিতীয়টি রাষ্ট্রে। হেগেলের সমালোচনা মার্কস এই বলে আরম্ভ করলেন যে ‘হেগেল সর্বত্র ভাবকে বিষয়ীতে (subjekt) পরিণত করেছেন’১৫। ভাব এবং বিষয়ীর স্বাভাবিক সম্পর্ককে এভাবে বিপরীত সম্পর্কে পরিণত করাকেই মার্কস হেগেলের প্রধান দোষ বলে মনে করলেন। হেগেল দেখিয়েছিলেন যে মানুষের সমষ্টিগত জীবনের স্তর বিন্যাসে রাষ্ট্রের আসন সর্বোচ্চ। তার নীচে সমাজ এবং সমাজের নীচে পরিবার। মার্কস তার সমালোচনায় বললেন যে হেগেল সহজ ব্যাপারটাকে ইচ্ছাকৃতভাবেই ঘোলাটে করে তুলেছেন। (হেগেলের মতে) পরিবার এবং বুর্জোয়া সমাজ রাষ্ট্রের প্রত্যয়ের এলাকায় (bagriffsspharen )। … এদের মধ্যেই রাষ্ট্র নিজেকে বিলিয়ে দিয়েছে এবং এদের অস্তিত্ব রাষ্ট্রের জন্যই (der sie voraussetzt )১৬। অতএব বাস্তবতা ঠিক যেমনটি তেমন করে হেগেল তাকে দেখাচ্ছেন না, তিনি তাকে দেখাচ্ছেন স্ববিচ্ছিন্ন রূপে ১৭। বাস্তবিকপক্ষে সমাজই রাষ্ট্রের উপরে, রাষ্ট্র সমাজের উপরে নয়। এই স্বাভাবিক সম্পর্ককে বিপরীত সম্পর্কে পরিণত করে হেগেল বুর্জোয়া রাষ্ট্রকে আদর্শ রূপে দেখাবার চেষ্টা করেছেন। হেগেল যেখানে রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়েরই সাধারণ ভিত্তি হিসেবে ব্যক্তিগত মালিকানাকে দেখাতে চেয়েছেন সেখানে কিন্তু তিনি রাষ্ট্রের পরস্পরবিরোধী রূপকেই প্রকাশ করেছেন। অর্থাৎ যদিও একদিকে বলা হচ্ছে যে আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে রাষ্ট্র সামগ্রিক স্বার্থকে রক্ষা করছে, বাস্তবে দেখা যাচ্ছে এই রাষ্ট্র আসলে বর্তমান সমাজব্যবস্থা এবং তার ভিত্তি ব্যক্তিগত স্বার্থকেই রক্ষা করছে। মনে হতে পারে যে মানুষের সাধারণ স্বার্থ সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আরও উচ্চতর স্তরে অর্থাৎ রাষ্ট্রে গিয়ে আশ্রয় লাভ করেছে। এটা নিছক ভ্রান্তি। যেভাবে ঈশ্বরে আরোপিত মানুষের শ্রেষ্ঠাংশকে মানুষের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে সেই একই ভাবে রাষ্ট্রে আরোপিত সমাজের সারাংশকে (wesen) সমাজের মধ্যেই ফিরে আসতে হবে। এই হল রাজনৈতিক বিযুক্তির মূল সমস্যা। রাজনৈতিক বিযুক্তির অবসান তখনই হবে যখন রাষ্ট্র ও সমাজের মধ্যে কোনও বিভেদ থাকবে না, ব্যক্তিগত এবং সৃষ্টিগত স্বার্থ এক হয়ে যাবে।

মার্কসের মতে রাষ্ট্র ও সমাজের বিভেদ দূর হতে পারে একমাত্র ‘যথার্থ’ গণতন্ত্রে। একমাত্র এখানেই ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগত জীবনের বিরোধ থাকবে না। এখানে সাধারণ বিষয় ব্যক্তিগত বিষয় থেকে স্বতন্ত্র নয়; এখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক জীবনের মিলনের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্র ও সমাজ একাকার হয়ে যায়। মার্কস বলেন, ‘গণতন্ত্রে তাত্বিক ও বাস্তব নীতি একই। সেজন্যই সাধারণ এবং বিশেষের মধ্যে সত্যিকারের মিলন এখানে সম্ভব। … গণতন্ত্রে সংবিধান, আইন ও রাষ্ট্র জনসাধারণের আত্মনিয়ন্ত্রণেরই প্রকাশ’।১৮

মার্কসের এই আলোচনায় দেখতে পাচ্ছি যে তিনি রাজনৈতিক ও সামাজিক বিযুক্তির অবসান খুঁজছেন গণতন্ত্রের মধ্যে। তিনি তখনও বিযুক্তিকে সামাজিক বিরোধ বা শ্রেণীসংগ্রামের পরিপ্রেক্ষিতে দেখছেন না। সুতরাং বুর্জোয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিবর্তন যে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবের মধ্য দিয়েই আসবে তখনও তিনি তা ভাবছেন না। তাঁর সমাধান তখনও বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সমাধানের গণ্ডি সম্পূর্ণভাবে অতিক্রম করতে পারছে না। তবে তিনি ইতিমধ্যেই উপলব্ধি করেছেন যে সমাজের শ্রেণীবিভাগের মূলে রয়েছে সম্পত্তির ব্যক্তিগত মালিকানা।

মার্কসের পরবর্তী রচনা জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী (Deutsch-Franzosische Jahrbucher, ১৮৪৪)-তে প্রকাশিত ইহুদি সমস্যা প্রসঙ্গে (Zur Judenfrage) প্রবন্ধ ১৯। এই প্রবন্ধটিকে পূর্বেকার হেগেলীয় অধিকার দর্শনের সমালোচনা প্রবন্ধটির সম্প্রসারণ হিসেবে দেখতে হবে। সমকালীন জার্মানিতে বিশেষ করে সেখানকার হেগেলপন্থী বামগোষ্ঠীর মধ্যে ইহুদি-সমস্যাটি বহু বিতর্কিত। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে ইহুদিদের সমান অধিকারের দাবি তুলছেন তদানীন্তন উদারনৈতিকেরা। এই বিশেষ সমস্যা সম্পর্কে মার্কস আলোচনা আরম্ভ করলেও তিনি তার মধ্যেই নিজেকে সীমিত রাখলেন না; মানুষের মুক্তির সমগ্র প্রশ্নটি তিনি তুলে ধরলেন। এই প্রসঙ্গে তিনি পূর্বেকার প্রবন্ধে বিশ্লেষিত রাষ্ট্র ও সমাজের সম্পর্কের সমস্যাকে আরও বিশদভাবে আলোচনা করলেন। রাজনৈতিক রাষ্ট্র ও বুর্জোয়া সমাজের বিরোধকেই তিনি মানুষের মুক্তির পথে প্রধান অন্তরায় হিসেবে দেখলেন।

১৭৮৯ এর ফরাসি বিপ্লবের কথা উল্লেখ করে মার্কস দেখালেন যে ফরাসি বিপ্লব সমাজের তুলনায় রাষ্ট্রকে অধিকতর শক্তিশালী করে উভয়ের দ্বন্দ্বকে তীব্র করেছে এবং রাজনৈতিক ও সামাজিক মানুষের মধ্যে ব্যবধান সৃষ্টি করে মানুষের সারাংশকে রাষ্ট্রে আরোপ করেছে। ফলে রাজনৈতিক বিযুক্তি তীব্রতর হয়েছে। মানুষ ও নাগরিকের অধিকার সম্পর্কে ফরাসি বিপ্লবের ঐতিহাসিক ঘোষণাকে ‘Declaration des Droits de I’Homme et du Citoyen’ বিশ্লেষণ করে মার্কস দেখালেন যে এটি আসলে মানুষের অধিকারেরই ঘোষণা, নাগরিকের নয়, এবং সে মানুষ আসলে বুর্জোয়া মানুষ। স্বাধীনতা, সম্পত্তি, সাম্য ও নিরাপত্তার অধিকার মানুষ ভোগ করে বুর্জোয়া সমাজের সভ্য হিসেবে যে সমাজ ব্যক্তিগত মালিকানার উপর প্রতিষ্ঠিত এবং যে সমাজে স্বার্থপর মানুষ সমষ্টিগত জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন। নাগরিকের অধিকার শুধু এক কাল্পনিক সত্তার অধিকার, অবাস্তব মানুষের অধিকার, যার সঙ্গে সত্যিকারের রক্তমাংসের মানুষের কোনও সম্পর্ক নেই। বস্তুত ফরাসি বিপ্লব রাজনৈতিক মুক্তির নামে আসলে বুর্জোয়া মানুষকে তার ব্যক্তিগত স্বার্থসাধনেরই সুযোগ করে দিয়েছে এবং শ্রমিকশ্রেণীকে দৈন্য ও দাসত্বের পথে ঠেলে দিয়েছে।

ইহুদি সমস্যা প্রবন্ধে রাজনৈতিক মুক্তি সম্পর্কে মার্কসের বক্তব্য তাঁর পূর্বেকার রচনা ‘ হেগেলীয় অধিকার দর্শনের সমালোচনা’র মূল বক্তব্যের উপরেই প্রতিষ্ঠিত। অর্থাৎ বিযুক্তিসমস্যার সৃষ্টি ব্যক্তিগত মালিকানা থেকে এবং ব্যক্তিগত মালিকানাই স্বার্থপরতার উৎস। এই স্বার্থপরতা প্রকাশ পায় ব্যক্তি ও সমষ্টি এবং বুর্জোয়া সমাজ ও রাজনৈতিক রাষ্ট্রের বিরোধিতার মধ্যে। পূর্বের মতোই বর্তমান প্রবন্ধের মূল বক্তব্য বুর্জোয়া সমাজের সমালোচনা, কিন্তু যে বিষয়টি নতুন সেটি হল এই যে এই প্রবন্ধে মার্কস বুর্জোয়া সমাজের সমালোচনাকে তুলে ধরেছেন মানুষের মুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে। এমনকি পূর্বেকার রচনার তুলনায় বর্তমান প্রবন্ধটিতে মার্কস আরও পরিষ্কারভাবে বললেন যে সমগ্র বুর্জোয়া সমাজকে এবং রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রিত করে ব্যক্তিগত মালিকানা এবং ব্যক্তিগত মালিকানার অবসানের মধ্যে দিয়েই মানুষের মুক্তি সম্ভব। ব্যক্তিগত মালিকানার সমালোচনা করে মার্কস প্রবন্ধশেষে সমাজের অর্থের ধর্ম ও ভূমিকা বিশ্লেষণ করলেন এবং বিযুক্তিসমস্যাকে এই প্রথম অর্থনৈতিক দিক থেকে দেখলেন। ২০ এই প্রবন্ধে মূল সমস্যার যে সমাধানের কথঅ মার্কস চিন্তা করলেন তার পরিষ্কার ঈঙ্গিত সাম্যবাদের দিকে। এদিক থেকেও পূর্বেকার রচনার সঙ্গে এই লেখাটির পার্থক্য লক্ষ করা যায়। প্রবন্ধটির প্রথমাংশের শেষে মার্কস দেখালেন যে যখন মানুষ এবং নাগরিক এক হয়ে যাবে, যখন মানুষ প্রাত্যহিক জীবনে, ব্যক্তিগত কাজে এবং পারস্পরিক সম্পর্কে সমষ্টিগত সত্তার (gattungswesen) সঙ্গে মিলে যাবে, যখন সে তার নিজস্ব শক্তিকে সামাজিক শক্তি হিসেবে চিনবে ও সংগঠিত করবে এবং এইভাবে সামাজিক শক্তিকে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজের থেকে অবিচ্ছিন্নভাবে দেখবে – একমাত্র তখনই মানুষের মুক্তি সম্ভব হবে ২১। প্রবন্ধের দ্বিতীয়াংশে তিনি এ সিদ্ধান্তকে আরও এগিয়ে নিয়ে গেলেন২২। ইহুদি ও খ্রিস্টানদের বিরোধিতা সম্পর্কে তদানীন্তন অগভীর আলোচনাকে আক্রমণ করে তিনি দেখালেন যে খ্রিস্টানদের মধ্যে ইহুদি মনোভাব প্রবেশ করেছে এরং খ্রিস্টধর্মকে দেখা যাচ্ছে ব্যক্তিগত মালিকানার ভাবাদর্শের প্রকাশ হিসেবে। ফলে বুর্জোয়া সমাজের রূপ প্রকাশ পাচ্ছে ব্যক্তিগত স্বার্থপরতায় এবং মুনাফা ও অর্থের জন্য অপরিসীম লোভে। এ অবস্থায় মানুষের মুক্তি – অর্থাৎ খ্রিস্টান ও ইহুদি উভয়েরই মুক্তি – আসতে পারে একমাত্র ব্যক্তিগত মালিকানাকে উৎখাত করে সমাজব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।

জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী (১৮৪৪)-তে মার্কসের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘হেগেলের অধিকার দর্শনের সমালোচনা প্রসঙ্গে ভূমিকা’ (Zur Kritik der Hegelschen Rechtsphilosophie Einleitung)২৩। মার্কসীয় চিন্তার বিকাশে এই প্রবন্ধটির স্থান অতি গুরুত্বপূর্ণ। দেখা গেছে যে ইহুদি-সমস্যা প্রবন্ধে মার্কস ব্যক্তিগত মালিকানার অবসানের মধ্য দিয়ে বুর্জোয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তনের কথা বলেছেন। আলোচ্য প্রবন্ধে তিনি আরও এগিয়ে গিয়ে দেখালেন কীভাবে এই ঈপ্সিত পরিবর্তন আসবে এক সামাজিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যার লক্ষ্য থাকবে সাম্যবাদ।

ফয়ারবাখ তাঁর খ্রিস্টধর্মের সারমর্ম গ্রন্থে বিযুক্তিকে ধর্মের চতুঃসীমায় আবদ্ধ রেখে তার আধাভাববাদী সমাধান খুঁজেছিলেন। আলোচ্য প্রবন্ধে মার্কস মূল ফয়ারবাখীয় বিশ্লেষণ থেকে শুরু করলেও ক্রমে তিনি বিযুক্তিসমস্যাটিকে ধর্মীয় সমালোচনার ক্ষুদ্র গণ্ডির মধ্যে থেকে সামাজিক সমালোচনার বৃহত্তর ক্ষেত্রে নিয়ে এলেন। ধর্মের সমালোচনায় ফয়ারবাখ দেখিয়েছিলেন মানুষ কীভাবে ঈশ্বরে তার সত্তার সারাংশকে আরোপ করে নিজেকে হারিয়ে ফেলে। মার্কস দেখালেন যে শুধুমাত্র এই আত্মাহুতিকে সমালোচনা করলেই মানুষ তার সত্তাকে ফিরে পাবে না। ধর্মীয় মোহের বিরুদ্ধে সংগ্রাম তখনই সফল হবে যখন তার মূলে আঘাত করা যাবে, ধর্মীয় বিযুক্তির উদ্ভব যে অবস্থার মধ্যে সে অবস্থাকে যখন আঘাত করা যাবে। অর্থাৎ সংগ্রাম করতে হবে সমগ্র সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে।

মার্কস দেখালেন ধর্মের দৈন্য যুগপৎ বাস্তব দৈন্যের প্রকাশ এবং তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ। ধর্ম শোষিতের দীর্ঘশ্বাস, হৃদয়হীন পৃথিবীর আত্মা, মনোহীন জগতের মন-ধর্ম জনগনের অহিফেন২৪। ধর্ম মানুষকে মুক্তির মোহ এনে দেয় এবং তার সত্যিকারের মুক্তিসংগ্রামকে বিপথে পরিচালিত করে। মোহ হিসেবে ধর্মকে দূর করতে হলে যে অবস্থার মধ্যে এই মোহের উদ্ভব তাকে দূর করতে হবে। অতএব যখন আমরা ধর্মের সমালোচনা করছি তখন আমরা আসলে সমালোচনা করছি সেই অশ্রুর উপত্যকাকে (Jammertales) ধর্ম যার স্বর্গীয় প্রতিফলন (Heiligenschein) ২৫। পরলোকের সত্যকে ধ্বংস করার পর ইহলোকের সত্যকে ধ্বংস করাই ইতিহাসের কাজ। আবার ইতিহাসের সেবক হিসেবে দর্শনের কাজ হবে মানুষের আত্মবিযুক্তির (selbstenmtfremdung) স্বর্গীয় মুখোশ খোলার পর তার জাগতিক মুখোশ খুলে ফেলা। এইভাবে স্বর্গের সমালোচনা পরিণত হবে মর্ত্যের সমালোচনায়, ধর্মতত্বের সমালোচনা পরিণত হবে রাজনীতির সমালোচনায়২৬।

আলোচ্য প্রবন্ধটি তরুণ মার্কসের একটি শ্রেষ্ঠ রচনা। এই প্রবন্ধের মধ্য দিয়েই মার্কসের তরুণ হেগেলীয় যুগের সমাপ্তি। এখানেই এক নতুন যুগ শুরু হল যে যুগে মার্কসের প্রধান অবদান বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গির দৃঢ় এবং সুস্পষ্ট অভিব্যক্তি। প্রবন্ধটির প্রধান বক্তব্য যদিও মানুষের মুক্তি, তথাপি মার্কস এখানে ফয়ারবাখের নৃতাত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করেন। ইহুদি-সমস্যা-র বক্তব্যকে অতিক্রম করে তিনি আলোচ্য প্রবন্ধে দেখালেন যে মানব মুক্তির প্রয়োজনে ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান একমাত্র শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবের মধ্য দিয়েই সম্ভব। মানবমুক্তির বিপ্লব সাফল্যমণ্ডিত হবে শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে দর্শনের মিলনের ফলে। শ্রমিকশ্রেণি যেমন দর্শনের বাস্তব অস্ত্র (materiellen waffen), দর্শন তেমনি শ্রমিকশ্রেণীর মানসিক অস্ত্র (geistigen waffen)। দর্শন মানবমুক্তির মস্তক, শ্রমিকশ্রেণি তার হৃদয়। শ্রমিকশ্রেণীর অবলুপ্তি (Aufhebung) না হলে দর্শন রূপায়িত হতে পারে না, আবার দর্শনের বাস্তব রূপায়ণ না হলে শ্রমিকশ্রেণীর আত্মাবলুপ্তি সম্ভব নয়২৭।

মার্কসের প্রথম যুগের লেখায় রাজনৈতিক বিযুক্তি দেখা দিচ্ছে ছিন্ন চেতনার ফল হিসেবে। মানুষ নিঃসম্বল হয়ে নিজের শ্রেষ্ঠাংশ রাষ্ট্রকে আরোপ করে ঠিক যেমনভাবে সে নিজেকে দেউলে করে ঈশ্বরকে উজার করে দেয় আপন সারমর্মটুকু। রাজনৈতিক বিযুক্তি সম্পর্কে মার্কসের এই প্রথম যুগের লেখায় দেখা যাচ্ছে যে তাঁর আলোচ্য বিষয় রাষ্ট্র ও মানুষের সম্পর্ক। ক্রমে মার্কস দেখলেন যে রাজনৈতিক বিযুক্তির সন্তোষজনক আলোচনা করতে গেলে শুধু রাষ্ট্র ও মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কের আলোচনা করলেই চলবে না, সমগ্র সমাজব্যবস্থার বিশদ আলোচনা প্রয়োজন। এই পথ অনুধাবন করে মার্কস যখন দেখলেন যে বর্তমান সমাজ পরস্পরবিরোধী শ্রেণীতে বিভক্ত তখন তিনি পূর্বের মতো আর মনে করলেন না যে রাষ্ট্র শুধুমাত্র মানুষের শ্রেষ্ঠাংশকে নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে ; রাষ্ট্রকে তখন ভাবতে লাগলেন শাসকশ্রেণীর শোষণযন্ত্র হিসেবে।

সমগ্র সমাজব্যবস্থার এই বিশদ আলোচনার সূত্রপাত ১৮৪৪-এর ‘অর্থনেতিক ও দার্শনিক পাণ্ডুলিপি’-তে।

ঈশ্বর এবং রাষ্ট্র উভয়েই মানুষের আংশিক বিযুক্তি। ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক জগতের সমস্ত বিশ্লেষণ শেষ অবধি পর্যবসিত হচ্ছে অর্থনৈতিক বিযুক্তিতে বিকৃত সমাজের বিশ্লেষণে। ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি-তেই মার্কস প্রথম অর্থনৈতিক বিযুক্তি সম্পর্কে তাঁর মূল বক্তব্য রাখলেন মানুষ এবং তার উৎপন্ন দ্রব্যের স্বাভাবিক সম্পর্ককে ধনতন্ত্রে এসে বিপরীত সম্পর্কে পরিণত করেছে। ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থায় উৎপাদক উৎপন্ন দ্রব্য থেকে বিযুক্ত হয়ে পড়ে। মানুষ যাকে সৃষ্টি করে সে মানুষের অধীনে না থেকে উল্টে মানুষের উপরেই আধিপত্য স্থাপন করে। বিষয় বিষয়ী থেকে বিযুক্ত হয়ে পণ্যে পরিণত হয় এবং মানুষের পারস্পরিক স্বাভাবিক সম্পর্ককে বিকৃত করে নিছক আর্থিক সম্পর্কে পরিণত করে। সমস্ত কিছুর মূল্যবিচার হয় অর্থের মাপকাঠিতে। মানুষ অর্থকে এক বাইরের শক্তি বলে মনে করে, ভাবে না যে অর্থ তারই আংশিক বিযুক্তির প্রকাশ মাত্র। এবং ক্রমে সে হয়ে দাঁড়ায় অর্থেরই দাস। এইভাবে অর্থ ‘বিশ্বাসকে অবিশ্বাসে, প্রেমকে ঘৃণায় এবং ঘৃণাকে প্রেমে, পাপকে পুণ্যে এবং পুণ্যকে পাপে, প্রভুকে দাসে এবং দাসকে প্রভুতে, মূর্খতাকে বুদ্ধিমত্তায় এবং বুদ্ধিমত্তাকে মূর্খতায় পরিণত করে২৮।

পারি-র বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণীর প্রত্যক্ষ প্রভাবের মধ্যে রচিত ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি মার্ক সীয় চিন্তাধারার ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। পূর্বের লেখাগুলির তুলনায় আলোচ্য রচনাটিতে জগৎ সম্পর্কে মার্কসের বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অধিকতর প্রসারিত।

মানুষ সম্পর্কে হেগেলীয় ধারণাকে – বিশেষত যে ধারণা হেগেল-কৃত মনের চেতনা বিজ্ঞান গ্রন্থের বিষয়বস্তু – সমালোচনা করেই মার্কস অগ্রসর হলেন। হেগেলের মতে জগতের সারমর্মে প্রবেশ করে মানুষ নিজেকেই নিজে সৃষ্টি করে। মানুষের আত্মসৃষ্টি শেষঅবধি পর্যবসিত হয চেতনার ক্রমবিকাশে, স্বতন্ত্র সত্তা হিসেবে ভাবের অগ্রগতিতে। মানুষের বিকাশ যখনই চিন্তার বিকাশে পর্যবসিত হল তখনই হেগেলের কাছে আর বিযুক্তি সমস্যা রইল না, কেন না চিন্তা তার নিজের বিষয় (objekt) মধ্যে হারিয়ে যেতে পারে না অর্থাৎ বিযুক্ত হতে পারে না। হেগেলের সমালোচনায় ফয়ারবাখের মতোই মার্কস দেখালেন যে বিযুক্তিই হল আধুনিক কালের মূল সমস্যা এবং বিযুক্তির সম্পূর্ণ অবসানের মধ্য দিয়েই মানুষের মুক্তি সম্ভব। কিন্তু ফয়ারবাখের সঙ্গে মার্কসের মতানৈক্য এখানেই যে মার্কস শেষ পর্যন্ত বিযুক্তি সমস্যাকে শ্রেণীসমস্যারূপে দেখতে আরম্ভ করলেন। অর্থাৎ মার্কস দেখালেন যে বিযুক্তি সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে শ্রমিকশ্রেণীকে এবং বিযুক্তির চরম প্রকাশ বিযুক্ত শ্রমে যাকে সৃষ্টি করেছে ধনতান্ত্রিক সমাজ। এই বিযুক্ত শ্রমের প্রশ্ন থেকেই মার্কস বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্র ও ধনতান্ত্রিক সমাজের সমালোচনায় প্রবৃত্ত হলেন। বুর্জোয়া সমাজ-ব্যবস্থায় শ্রমের উৎপাদন পরিণত হয় পণ্যে, এই পণ্য উৎপাদক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এই বিযুক্তির প্রকাশ দেখা যায় ধনতান্ত্রিক সমাজের বিভিন্ন জাতির মধ্যে অর্থাৎ বিনিময়, বাণিজ্য, মূল্য, অর্থ প্রভৃতির মধ্যে। এই বিযুক্ত শ্রম সমাজের আভ্যন্তরীন সম্পর্ককে নিয়ন্ত্রিত করে পণ্যরূপে, যার ফলে মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক পরিণত হয় প্রধানত পণ্য বিনিময়ের সম্পর্কে। এইভাবে বিযুক্ত হয়ে শ্রম তার প্রকৃত কর্তব্য থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়ে অর্থাৎ মানুষের সঙ্গে মানুষের স্বাভাবিক মানবসম্পর্ক স্থাপন করার ক্ষমতা সে ফেলে হারিয়ে। শ্রমিক থেকে শ্রমকে বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা করে এবং শ্রমের বিযুক্ত রূপকে অবহেলা করে বুর্জোয়া অর্থবিজ্ঞানীরা বুর্জোয়া সমাজের যথার্থ বিশ্লেষণে ব্যর্থ হয়েছেন। ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় বিযুক্ত শ্রমের ফলাফল বিশ্লেষণ করে মার্কস দেখালেন যে এখানে শ্রমোৎপাদিত দ্রব্য শ্রমিক থেকে স্বতন্ত্র হয়ে শ্রমিকের ক্রমবর্ধমান দৈণ্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শ্রমিকের সৃজনশীল অংশের প্রকাশ না হয়ে শ্রম হয়ে দাঁড়ায় তার নেতির সূচক। ব্যক্তিগত মালিকানা ব্যবস্থায় কোনও মানুষই বিযুক্তির প্রভাবমুক্ত নয়। ‘প্রত্যক্ষভাবে অনুভূত বাস্তব এই ব্যক্তিগত সম্পত্তি বিযুক্ত মানবজীবনের বাস্তব প্রকাশ। এই ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রকৃতি ও গতির মধ্য দিয়েই প্রতিফলিত হচ্ছে অতীতের সমগ্র উৎপাদন। ধর্ম, পরিবার, রাষ্ট্র, অধিকার, নীতি, বিজ্ঞান, কলা এই উৎপাদনেরই বিশেষ বিশেষ রূপ এবং এরই সাধারণ নিয়মের অধীন’২৯। শুধু তাই নয়। ব্যক্তিগত মালিকানার ফলে প্রতিযোগিতার জন্ম হয় এবং এই প্রতিযোগিতা মানুষের সঙ্গে মানুষের বিরোধিতার সৃষ্টি করে সমাজকে পরস্পরবিরোধী শ্রেণীতে বিভক্ত করে ফেলে। শ্রমবিযুক্তির বিশ্লেষণ করে মার্কস ব্যক্তিগত মালিকানার অবসান ও সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করলেন। তিনি বললেন যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির যথার্থ অবলুপ্তির অর্থই হল সমস্ত বিযুক্তির যথার্থ অবসান, যার ফলে মানুষ ফিরে আসে তার নিজস্ব অর্থাৎ সামাজিক সত্তায়। ধর্মীয় বিযুক্তি চেতনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ অর্থাৎ মানুষের আভ্যন্তরীণ সমস্যা, কিন্তু অর্থনৈতিক বিযুক্তি বাস্তব জীবনের সমস্যা। অতএব তার বিলুপ্তির মধ্যে উভয় সমস্যারই সমাধান নিহিত আছে ৩০। এই ভাবে মার্কস দেখালেন যে ব্যক্তিগত সম্পত্তির অবসান ঘটিয়ে সাম্যবাদী সমাজব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই সমস্ত রকম বিযুক্তির অবসান হতে পারে। বিযুক্ত শ্রমের আলোচনা করে মার্কস ধনতান্ত্রিক সমাজের চরম সমালোচনা করলেন এবং এই সমালোচনার মধ্য দিয়েই তিনি মানুষের জীবন এবং ইতিহাসের ক্রমবিকাশে শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গভীরভাবে উপলব্ধি করলেন।

তরুণ মার্কসের পরবর্তী এবং শেষ গুরুত্বপূর্ণ রচনা পবিত্র পরিবার (Die Heilige Familie ১৮৪৪)। এটিই মার্কস ও এঙ্গেলস-এর প্রথম যৌথ রচনা। অবশ্য এখানে মার্কসের অবদান নিয়েই আলোচনা করা হচ্ছে। এই গ্রন্থ রচনায় মার্কস শুধু পূর্বোল্লিখিত ‘পাণ্ডুলিপি’ই ব্যবহার করেননি, তিনি সমানভাবে কাজে লাগিয়েছেন ইংরেজি ও ফরাসি বস্তুবাদ এবং ফরাসি বিপ্লব সম্পর্কে তাঁর নিজস্ব পাঠ ও চিন্তা। এই লেখাটির মধ্য দিয়ে তিনি ঐতিহাসির বস্তুবাদ সম্পর্কে তাঁর নতুন দৃষ্টিভঙ্গিকে আরও পরিষ্কারভাবে প্রকাশ করেন।

প্রাক্তন বন্ধু বাউয়ের (Bauer)-এর সমালোচনা করতে গিয়ে মার্কস দেখালেন যে কল্পনাসর্বস্ব দর্শন (spekulative philosophie) – বিশেষত হেগেলের বাস্তবকে দেখে ভাবের ছায়া হিসেবে মনকে দেখে জগতের সারাংশ হিসেবে এবং ইতিহাসকে দেখে মনের ক্রমবিকাশ হিসেবে। এই ভাবসর্বস্ব জগতের শুদ্ধরূপ পাওয়া যায় হেগেলের মনের চেতনা বিজ্ঞান গ্রন্থে। এই গ্রন্থে মানুষের স্থান অধিকার করেছে স্বচেতনা (selbstbewusstsein), প্রকৃতির স্থান অধিকার করেছে প্রকৃতি সম্পর্কে মানুষের চেতনা এবং মানুষ ও প্রকৃতির ক্রমবিকাশের স্থান অধিকার করেছে ভাবের ক্রমবিকাশ। যে মানুষ বাস্তব জগতে প্রাণধারণ করছে এবং বাস্তবজগতের দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে তাকে বিষয়ী এবং স্বচেতনাকে বিষয় না করে হেগেল তার বিপরীতটাই করেছেন। অর্থাৎ হেগেলের জগৎ পায়ের উপর না দাঁড়িয়ে মাথার উপর দাঁড়িয়ে আছে। চেতনা বিজ্ঞান দেখাচ্ছে যে স্বচেতনাই একমাত্র এবং সমগ্র বাস্তব ৩১।

বাউয়ের হেগেলীয় ভাববাদী দর্শনকে আরও চরমে নিয়ে গেছেন। হেগেলীয় দর্শনে ভাবের প্রাধান্য থাকলেও আমরা সেখানে দেখি যে ভাব এবং জগৎ অবিচ্ছেদ্য ভাবে যুক্ত। কিন্তু বাউ-এর মধ্যে দেখি যে ভাব ও জগৎ পরস্পরবিরোধী এবং মানুষের পারস্পরিক সম্পর্কগুলি পর্যবসিত হয়েছে বিমূর্ত জাতিসমূহে (kategorie)। সেদিক থেকে বাউয়ের হেগেলের সমৃদ্ধ দর্শনকে এক প্রহসনে পরিণত করেছেন। বস্তুত হেগেলীয় দর্শনকে কেউ যদি অতিক্রম করে থাকেন তিনি ফয়ারবাথ। কিন্তু বাউয়ের এবং তাঁর গোষ্ঠী নন। ফয়ারবাখ হেগেলীয় পরম ভাবের (der absolute Geist) স্থলে নিয়ে এসেছেন বাস্তব মানুষকে যে মানুষ প্রকৃতি এবং অন্যান্য মানুষের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত।৩২ বাউয়ের ও তাঁর সম্প্রদায়ের হাতে ইতিহাসের ক্রমবিকাশ রূপায়িত হয়েছে চেতনা ও জগতের পারস্পরিক বিরোধে এবং এই বিরোধ বস্তুত পর্যবসিত হয়েছে বুদ্ধি (Geist) এবং জনগণের (Masse) বিরোধে। বুদ্ধি জনগণের মধ্যে প্রবেশ করতে পারে না, সে জনগণের বিরোধিতা করে তাকে অতিক্রম করে। অর্থাৎ জনগণ পর্যবসিত হয় পরম ও পরিপূর্ণ মূর্খতায়। মার্কস দেখালেন যে এই জনগণের সঙ্গে সত্যিকারের জনগণের কোনও সম্পর্ক নেই। বাউয়ের-এর জনগণ আসলে একটি বিমূর্ত জাতি (kategorie) এবং সে বিশ্বচেতনার নেতীকরণ করে ইতিহাসে এক সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করে। বুদ্ধি বা মন ইতিহাসের সক্রিয় অংশ এবং জনগণ তার নিষ্ক্রিয় অংশ এ বক্তব্যটি সমস্ত প্রতিক্রিয়াশীল তত্বের মধ্যেই দেখা যায়। বাউয়ের বক্তব্যের অনুসারে বুদ্ধি স্বাধীন সত্তা হিসেবে জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েই জনগণের মুক্তি আনবে যেহেতু জনগণ স্বচেষ্টায় মুক্ত হতে পারে না। অর্থাৎ বাউয়ের মতে মানুষের যথার্থ উন্নতির পথে জনগণ বাধাস্বরূপ। এই বক্তব্যের সমালোচনা করে মার্কস লিখলেন যে প্রগতির শত্রু জনগণ নয়, জনগণের আত্মাবমাননা (selbsterniedrigung), এবং প্রগতির শত্রু আত্মবিযুক্তির (selbstentausserung) ফল হিসেবেই জন্মলাভ করে। জনগণ রুখে দাঁড়ায় তার নিজস্ব অভাবের বিরুদ্ধে, তার আত্মাবমাননার ফলের বিরুদ্ধে। যেহেতু জনগণের বিযুক্তির ফলগুলি বাস্তব জগতে বর্তমান সেহেতু এদের বিরুদ্ধে সংগ্রামও জনগন করবে বাস্তবভাবেই। এইগুলিকে নিছক কল্পনাপ্রসূত বলে জনগণ ভাবতে পারে না যেমনি পারে না এইগুলিকে তার স্বচেতনার নিছক বিযুক্তি হিসেবে দেখতে এবং ভাবতে যে কেবলমাত্র মানসিক প্রয়াসের দ্বারা এদের অবসান ঘটান যাবে ৩৩। মার্কসের মতে বাউয়ের সম্প্রদায় যে প্রশ্নগুলি তুলে ধরেছেন তার উত্তর মিলবে একমাত্র সমগ্র অর্থনৈতিক ও সামাজিক সম্পর্কের গভীর বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে। ঐতিহাসিক স্তর জ্ঞান এমনকি শুরুও হতে পারে না যতক্ষণ ইতিহাসের গতি থেকে বাদ দেওয়া হচ্ছে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির, প্রকৃতিবিজ্ঞানের এবং শিল্পের (Industrie) তাত্বিক ও ব্যবহারিক সম্পর্ককে। কোনো ঐতিহাসিক যুগের যথার্থ পরিচয় পাওয়া যাবে না যদি না পরিচিত হওয়া যায় যে যুগের জীবনের প্রত্যক্ষ উৎপাদন পদ্ধতি (die unmittelbare Produktionsweise des Lebens) এবং শিল্পের সঙ্গে৩৪।

পবিত্র পরিবারের এই হল মূল তাত্বিক বক্তব্য। গ্রন্থটিতে বিশেষ বিশেষ সমস্যা আলোচনা করতে গিয়ে মার্কস বার বার এই বক্তব্যটিকেই বিভিন্নরূপে তুলে ধরেছেন। ফরাসি বিপ্লবের আলোচনায় তিনি দেখালেন যে বুর্জোয়া শ্রেণী সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার নামে জনগণের সাধারণ স্বার্থরক্ষা না করে নিজেরই শ্রেণীস্বার্থ রক্ষা করছে। ইংরেজি ও ফরাসি বস্তুবাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি দেখালেন যে ই বস্তুবাদ ইংল্যান্ড এবং ফ্রান্সের অর্থনৈতিক ও সামাজিক ইতিহাসের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত এবং এর উদ্ভব সম্ভব হয়েছে ওই দুই দেশের শিল্পের উন্নতি ও শক্তিশালী বুর্জোয়া শ্রেণীর আবির্ভাবের জন্য। এই বস্তুবাদ কিন্তু বুর্জোয়া ভাবাদর্শের দ্বারা সীমিত। প্রুধ (Proudhon)-র সমালোচনায় তিনি প্রুধ-র অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের বৈপ্লবিক চরিত্রের প্রশংসা করতে গিয়ে সঙ্গে সঙ্গে দেখালেন যে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার সমালোচনায় প্রুধ বেশি দূর অগ্রসর হতে পারেননি, কেননা সম্পত্তিতে ব্যক্তিগত মালিকানার ধ্বংসের পরিবর্তে তিনি তাকে রক্ষা করতে চেয়েছেন। অবশেষে ইহুদি-সমস্যার আলোচনা করতে গিয়ে তিনি আধুনিক রাষ্ট্রের বুর্জোয়া শ্রেণীচরিত্র তুলে ধরেন এবং দেখান যে বুর্জোয়া রাষ্ট্রদত্ত তথাকথিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা শ্রমিকশ্রেণীর বিযুক্তি সমস্যাকে তীব্রতর করে তুলেছে।

পবিত্র পরিবার তরুণ মার্কসের শেষ রচনা। এই রচনাটির সঙ্গেই মার্কসীয় চিন্তার ক্রমবিকাশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শেষ হয়। এই অধ্যায়ের আরম্ভ হেগেলীয় অধিকার দর্শনের সমালোচনা দিয়ে। এই সমালোচনার মুখ্য বক্তব্য এই যে সামাজিক সমস্যাই মূল সমস্যা এবং এর তাত্বিক ও ব্যবহারিক সমাধান বুর্জোয়া সমাজ ও রাষ্ট্রের অবসানের মধ্য দিয়েই সম্ভব। এই বক্তব্য আরও পরিষ্কার ভাবে আমরা দেখি মার্কসের পরবর্তী দুটি রচনায় জার্মান-ফরাসি বার্ষিকী-তে প্রকাশিত ‘ইহুদি সমস্যা’ ও ‘হেগেলীয় অধিকার দর্শনের সমালোচনার ভূমিকা’ প্রবন্ধে। এখানে তিনি সচেতনভাবে শ্রমিকশ্রেণির পক্ষ সমর্থন করে বললেন যে মানুষের মুক্তির জন্যই ব্যক্তিগত মালিকানার অবসানের প্রয়োজন এবং এই কার্য সম্পন্ন করবে বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণী। মার্কস কিন্তু তখনও পরিষ্কারভাবে ভাবছেন না যে ধনতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা স্বশ্রমজীবী ও পরশ্রমজীবীর মধ্যে শ্রেণী সংগ্রাম তীব্র করে তুলবে এবং এরই ফলে আসবে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লব। সে সময় এঙ্গেলস তাঁর ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনার সংক্ষিপ্তসার’ (Umrisse zu einer Kritik der Nationalokonomie)৩৫ প্রবন্ধে দেখালেন যে বুর্জোয়া সমাজ শ্রমিকশ্রেণিকে জন্ম দিয়ে অনিবার্যভাবেই সাম্যবাদী বিপ্লবকে ডেকে এনে নিজের মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করে। এই প্রবন্ধটি মার্কসকে যথেষ্ট প্রভাবিত করে এবং তাঁকে অর্থশাস্ত্রের গভীর গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করে। ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি তারই পরিণতি। রচনাটির আলোচ্য বিষয় দুটি – বুর্জোয়া সমাজে বিযুক্ত মানুষের বর্ণনা এবং সাম্যবাদী সমাজে এই বিযুক্তির অবসান। এই দুটি বিষয় আলোচনা করতে গিয়ে মার্কস দেখালেন যে বিযুক্তির উদ্ভব ও তার অবসান ব্যক্তিগত মালিকানার প্রসারের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। বলা যেতে পারে যে উক্ত ‘পাণ্ডুলিপি’র সমগ্র আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ‘বিযুক্ত শ্রম’। ক্লাসিকাল জার্মান দর্শনের পরিপ্রেক্ষিতে ‘বিযুক্ত শ্রম’ সম্পর্কে মার্কসের আলোচনা নিঃসন্দেহে বৈপ্লবিক। কিন্তু একথা মনে রাখতে হবে যে এই সমস্যা সম্পর্কে মার্কস তখনও চিন্তা করছেন প্রধানত দার্শনিক হিসেবে, অর্থাৎ বিমূর্তভাবে। এ ধরনের চিন্তার সুযোগ নিয়েই মার্কসের বুর্জোয়া এবং সোশ্যাল ডেমক্র্যাটিক সমালোচকেরা ‘পাণ্ডুলিপি’র সত্যিকারের বৈপ্লবিক দিকটি বাদ দিয়ে তাকে মার্কসবাদের নৈতিক ভিত্তি হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। এমনকি কোনও কোনও সমালোচক একথাও বলেছেন যে উত্তরকালের মার্কসের মধ্যে আর তাঁর তারুণ্যের মানবতাবোধ নেই, অর্থাৎ পরিণত মার্কস তরুণ মার্কসকে প্রতারিত করেছেন। পরিণত মার্কস দর্শনকে বলি দিয়েছেন অর্থশাস্ত্রের কাছে, নীতিকে বিজ্ঞানের কাছে, মানুষকে ইতিহাসের কাছে। বলা বাহুল্য যে মার্কসের চিন্তাধারার স্বাভাবিক বিকাশকে বিকৃত করে তাঁকে এভাবে দ্বিখণ্ডিত করা রাজনৈতিক সুবিধাবাদের নামান্তর মাত্র। একথা ভুললে চলবে না যে ১৮৪৪-এর পাণ্ডুলিপি-র গুরুত্বপূর্ণ অবদান সত্বেও রচনাটি মার্কসের চিন্তাধারার ক্রমবিকাশের একটি স্তর মাত্র এবং স্বাভাবিকভাবেই ত্রুটিহীন নয়। বুর্জোয়া অর্থশাস্ত্রের বহু জাতিকে তখনও মার্কস বর্জন করেননি। সমাজের উৎপাদন সম্পর্কের উপর তাঁর ধারণা তখনও স্বচ্ছ নয় এবং তখনও তিনি পরিষ্কারভাবে ভাবছেন না যে প্রত্যেক সমাজের উৎপাদন সম্পর্ক তার আভ্যন্তরীণ সমস্ত সম্ভাবনাকে নিঃশেষ করে দিয়ে তবেই সমকালীন ইতিহাস থেকে বিদায় নেয়। দ্বিতীয়ত শ্রেণী সম্পর্কে মার্কস বিস্তৃত আলোচনা করলেও ইতিহাসের অগ্রগতির মূল শক্তি হিসেবে শ্রেণীসংগ্রাম তখনও তাঁর স্বীকৃতি লাভ করেনি।

‘পাণ্ডুলিপি’তে বিযুক্তি প্রত্যয় মার্কসীয় চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু হলেও পরবর্তীকালে অতি শ্রীঘ্রই মার্কস তাকে বর্জন করেন। কেননা ‘বিযুক্ত শ্রমে’-র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি ইতিহাসের শ্রমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা উপলব্ধি করেন এবং সেই সঙ্গেই উপলব্ধি করেন সমাজের ঐতিহাসিক ক্রমবিকাশে ব্যবহারিক দিক অর্থাৎ প্রয়োগ (praxis)-এর অসামান্য গুরুত্ব। এর ফলেই তিনি ক্রমে ক্রমে তাঁর চিন্তার কেন্দ্রীয় প্রত্যয় হিসেবে ‘বিযুক্তি’-কে বর্জন করে গ্রহণ করেন ‘প্রয়োগ’-কে। এর মধ্যে অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত কিছু নেই, বরং এটাই তরুণ মার্কসের চিন্তাধারার অনিবার্য পরিণতি। যে চিন্তাধারার মধ্য দিয়ে তিনি সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিযুক্তির চরম প্রকাশ অর্থনৈতিক বিযুক্তি তথা শ্রমবিযুক্তির মধ্যে দেখতে পেলেন সেই চিন্তাধারাকে অনুসরণ করেই তিনি দেখলেন যে এই বিযুক্তির অবসান একমাত্র প্রয়োগের মধ্য দিয়ে হতে পারে এবং সেই প্রয়োগের চরম প্রকাশ শ্রেণীসংগ্রামের পরিণতি হিসেবে প্রলেতারীয় বিপ্লব। অতএব বিযুক্তিসমস্যার স্বতন্ত্র বিশ্লেষণের আর প্রয়োজন রইল না। ১৮৪৫ সালে ফয়ারবাখ সম্পর্কে মার্কস রচিত থিসিসগুলিতেই এর সুস্পষ্ট এবং নির্ভুল প্রমাণ মিলবে। উত্তরকালে মার্কসের সমগ্র কর্মকাণ্ড এই বিপ্লবের ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণকে ঘিরে ৩৬। বুর্জোয়া ও সোশ্যাল ডেমক্র্যাটিক লেখকেরা এবং পরোক্ষভাবে আজকের দিনের অনেক ‘মার্কসবাদী’ মার্কসের মানবতার জয়গান করতে গিয়ে তাঁর ‘প্রয়োগ’ সম্পর্কে আলোচনাকে অনেকাংশে অবহেলা করেছেন, অর্থাৎ তাঁর বৈপ্লবিক দিকটাকে কৌশলে এড়িয়ে গেছেন। বিযুক্তি থেকে প্রয়োগে উত্তরণের প্রথম প্রকাশ ‘পবিত্র পরিবার’। এই গ্রন্থে পূর্বেকার রচনাগুলির তুলনায় ফয়ারবাখীয় দর্শনের প্রভাব গৌণ এবং বিযুক্তির তুলনায় প্রয়োগ অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করেছে। পবিত্র পরিবার যেমন তরুণ মার্কসের শেষ রচনা (এঙ্গেলসের সহযোগিতায়) তেমনি এই গ্রন্থটি মার্কসের আসন্ন পরিণতির প্রথম তাৎপর্যপূর্ণ সূচক। বলতে গেলে এই গ্রন্থ থেকেই প্রত্যক্ষভাবে উদ্ভূত মার্কসের ফায়ারবাখ সম্পর্কে থিসিস (১৮৪৫) এবং (এঙ্গেলসের সহযোগিতায় রচিত) জার্মান ভাবাদর্শ (১৮৪৫)।

সূত্রনির্দেশ

১। ১৯৩২ সালে।

২। লুকাচ, তরুণ মার্কসের দার্শনিক বিকাশ প্রসঙ্গে (Zur philosophischen Eutwicklung des jungen Marx, Deutsche Zeitschrift fur Philosophie, ১৯৫৪ সালে প্রকাশিত।

৩। আলথুসে, ‘তরুণ মার্কস প্রসঙ্গে’ (Sur le jeune Marxe), La Pensee, মার্চ এপ্রিল, ১৯৬১ সালে প্রকাশিত।

৪। এদের মধ্যে ‘পবিত্র পরিবার’ ছাড়া অন্যান্য রচনার জন্য আমরা ‘মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলী’র (Karl Marx, Friedrich Engels, Werke) প্রথম খণ্ডের ১৯৬৪ সালের বের্লিন সংস্করণের উল্লেখ করব। ‘পবিত্র পরিবার’-এর ক্ষেত্রে ১৯৬৫ সালের বের্লিন সংস্করণের উল্লেখ থাকবে।

৫। এমিল বাত্তিজেল্লি, ‘১৮৪৪-র পাণ্ডুলিপি’ (Manuscrits de 1844) পারি, ১৯৬২।

৬। যুগপৎ জার্মান ও ফরাসিতে প্রকাশিত। আমরা ফরাসি সংস্করণের (পারি, ১৯৫৫-১৯৬২) ব্যবহার করেছি।

৭। পারি, ১৯৫৫।

৮। গ্রন্থটির বিষয়বস্তুর দিকে লক্ষ রেখেই আমরা এই নামকরণ করেছি। এই গ্রন্থ সম্পর্কে হেগেলের নিজস্ব বক্তব্য তুলনীয় ‘বিষয়ের (Gegenstand) সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ বিরোধ থেকে আরম্ভ করে পরমজ্ঞান পর্যন্ত চেতনার ক্রমবিকাশকে আমি (এই গ্রন্থে) রূপ দিয়েছি।’-যুক্তিবিজ্ঞান (Wissenschaft der Logik, লাস-সম্পাদিত ) প্রথম খণ্ড, হামবুর্গ ১৯৬৩, পৃ ২৯।

৯। লুকাচের ‘তরুণ হেগেল’ (Der junge Hegel, বের্লিন, ১৯৫৪) গ্রন্থে একটি অধ্যায়ের নামকরণই হয়েছে ‘মনের চেতনা বিজ্ঞানে’ দার্শনিক কেন্দ্রীয় প্রত্যয় হিসেবে বিযুক্তি’ (“Die Entausserung als philosophischer Zentralbegriff der Phanomenoclgie des Geistes” )

১০। ‘মনের চেতনা বিজ্ঞানে’ বের্লিন, ১৯৬৪ সংস্করণ, ১৪৬ এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলি।

১১। গ্রিক দর্শনে যিনি বহির্বিশ্ব থেকে স্বতন্ত্র হয়ে ও তাকে জয় করে এবং নিজের উপর নিজের প্রভূত্ব বিস্তার করে আপনার মধ্যেই সুখ উপলব্ধি করেন।

১২। তুলনীয়, প্লেখানভ ‘ঈশ্বরের সারাংশ মানুষেরই সারাংশ অর্থাৎ মানুষের শুদ্ধীকৃত সারাংশ’ – এঙ্গেলস রচিত ‘লুডভিক ফয়ারবাখ’ গ্রন্থের রুশ অনুবাদের টীকা, নির্বাচিত দার্শনিক রচনাবলী (ইংরেজি অনুবাদ মস্কো) প্রথম খণ্ড পৃ ৫০৩।

১৩। মার্কস-এঙ্গেলস রচনাবলি (Werke) প্রথম খণ্ড, বের্লিন ১৯৬৪, পৃ ২০৩-৩৩৩। রচনাটির প্রথম প্রকাশ ১৯২৭ সালে। কখনও কখনও রচনাটিকে ‘১৮৪৩-র পাণ্ডুলিপি’ নামে অভিহিত করা হয়।

১৪। রুগে (Ruge) -কে লেখা ১৩/৩/১৮৪৩-এর চিঠি কর্ণু (পূর্বোল্লিখিত গ্রন্থ দ্বিতীয় খণ্ড পৃ ১৯১) কর্তৃক উদ্ধৃত। অল্পকাল পরে রচিত ‘জার্মান ভাবদর্শ’ (১৮৪৫) গ্রন্থে ফয়ারবাখ সম্পর্কে মার্কসের সমালোচনা আরও পরিষ্কার ‘ফয়ারবাখ যখন বস্তুবাদী তখন তাঁর মধ্যে ইতিহাসকে দেখতে পাই নে। যখন তিনি ইতিহাস আলোচনা করেন তখন তিনি আর বস্তুবাদী নন।’ (Die Deutsche Ideologiea বের্লিন, ১৯৬০, পৃ ৪৩)

১৫-২৭। মার্কস এঙ্গেলস রচনাবলি প্রথম খণ্ড পৃষ্ঠা সংখ্যা যথাক্রমে ২০৯, ২০৫, ২০৬,২৩১-২, ৩৪৭-৭৭, ৩৭৫, ৩৭০, ৩৭১, এবং পরবর্তী পৃষ্ঠাসমূহ, ৩৭৮-৩৯১, ৩৭৮, ৩৭৯, ৩৭৯, ৩৯১।

২৮-৩০। ‘১৮৪৪-র পাণ্ডুলিপি’ বত্তিজেল্লি-কৃত ফরাসি অনুবাদ, পৃষ্ঠা সংখ্যা যথাক্রমে ১২৩, ৮৮, ৮৮।

৩১-৩৪। ‘পবিত্র পরিবার’ বের্লিন ১৯৬৫, পৃষ্ঠা সংখ্যা যথাক্রমে ২০৪, ১৪৭, ৮৬-৭, ১৫৮-৯।

৩৫। জার্মান ফরাসি বার্ষিকীতে (Deutsch Franzosische Jahrbucher) ১৮৪৪ এ প্রকাশিত।

৩৬। এই অর্থেই আন্তেনিও গ্রামসি (Antonio Gramsci) মার্কসবাদকে প্রয়োগ দর্শন (Filosofia della Prassi) নামে অভিহিত করেছেন। দ্রষ্টব্য গ্রামসি ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ও বেনেদেত্তা ক্রোচের দর্শন (II Materialisomo storici e la Filosofia di Benedetto Croce) মিলানো ১৯৫৫ সালের সংস্করণ, ৭৩ ও পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলি।

৫ম বর্ষ ৪-৫ সংখ্যা

(শারদীয় ১৩৭৪)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *