বিষ্ণু দে-র ‘চোরাবালি’ – অরুণ সেন
চোরাবালি সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথের সেই বিখ্যাত প্রবন্ধটি রচিত হওয়ার পর প্রায় তিরিশ বছর পার হয়ে গেছে, কিন্তু ওই কাব্যগ্রন্থটির উজ্জ্বলতা এখনও হ্রাস পায়নি। ‘উজ্জ্বলতা’ শব্দটি আমি ইচ্ছা করেই বসালাম, কারণ উর্বশী ও আর্টমিস-এর ঈষৎ ভাবালুতার চিহ্নমাত্রও নেই এখানে – সপ্রতিভ, ব্যঙ্গচতুর, মননশীল কবির কখনও তির্যক হাসি, কখনও সংযত ও সচেতন আবেগ কবিতাগুলোতে যেন আছড়ে এসে পড়ছে। এই বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বলতা এতই মৌলিক এবং হৃদয়গ্রাহী যে, এর নবীনতা এখনও ক্ষুণ্ণ হয়নি।
অথচ এ গ্রন্থের রচনাকাল ১৯২৬ থেকে ১৯৩৬-এর মধ্যে – অর্থাৎ বিষ্ণু দে-র বয়স যখন আঠারো থেকে আঠাশের মধ্যে। অবশ্য অধিকাংশ কবিতা ১৯৩৩ থেকে রচিত (একুশটির মধ্যে তেরোটি) – অর্থাৎ চোরাবালি-র অধিকাংশ কবিতা রচিত হয়, যখন বিষ্ণু দে-র বয়স পঁচিশ থেকে আঠাশের মধ্যে।
প্রসঙ্গত বলে রাখা ভালো, অনেকে উর্বশী ও আর্টমিস-এর পরে চোরাবালি-কে বিষ্ণু দে-র কাব্য-বিবর্তনের আরেকটি ধাপ বলে মনে করেন। এ ভুল আগে আমিও করেছি। কিন্তু সালের হিসেব দেখিয়ে দেয় যে, চোরাবালি এবং উর্বশী ও আর্টেমিস-এর বহু কবিতা একই সময়কালের মধ্যে রচিত এমন কি চোরাবালির কিছু কবিতা উর্বশী ও আর্টমিস-এর আগে-যদিও চোরাবালি-র রচনাকালের ব্যাপ্তি সামান্য বেশি। কোন ভিত্তিতে কবিতাগুলোকে দুভাগে ভাগ করে কবি প্রকাশ করলেন? কবিতাগুলোর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য বুঝিয়ে বলার দরকার হয় না। অর্থাৎ দুটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা প্রায় অনিবার্য ছিল। কিন্তু উর্বশী ও আর্টেমিস বেরিয়েছে ১৯৩৩ সালে, চোরাবালি ১৯৩৭ সালে। শুনেছি, প্রায় একই সময়ে রচিত এই কবিতাগুলো সুধীন্দ্রনাথের পরামর্শেই দুটি ভাগে ভাগ করে প্রকাশিত হয়। অনুমান করা অসংগত নয় যে, সুধীন্দ্রনাথ যে কবিতাগুলোকে আপেক্ষিকভাবে বেশি পছন্দ করতেন সেগুলোকেই, অর্থাৎ সমাজসচেতন ও নানার্থব্যঞ্জক কবিতাগুলোকেই চোরাবালি-তে স্থান দেওয়ার কথা ভেবেছেন। অবশ্য আমাদের কাছে এটা অত্যন্ত স্পষ্ট যে শুধু কলাকৌশলের দিক থেকেই নয়, সামগ্রিক কাব্য অভিজ্ঞতাতেও চোরাবালি অনেক পরিণত এবং আগেই বলেছি, অত্যাধুনিক পাঠকের কাছে আজও চিত্তাকর্ষক।
বুদ্ধদেব বসুর লেখা পড়ে জানা যায়, বহু কবিতা, বিশেষত সমাজসচেতন ব্যঙ্গ কবিতাগুলো বিচ্ছিন্নভাবে প্রগতি ও কবিতা পত্রিকায় বেরিয়েছিল, পরে সেগুলি একত্রিত করে সাধারণ শিরোনামায় প্রকাশিত হয়। যেমন, ‘গার্হস্থ্যাশ্রম’ বা ‘শিখণ্ডীর গান’। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন ‘ট্রিওলেট ও অন্যান্য ক্ষুদ্র রচনাগুলোকে বিক্ষিপ্ত না রেখে যে ভাবে পারস্পরিক সম্বন্ধ-সূত্রে আবদ্ধ করেছেন (কবি) তাতে প্রচুর নৈপুণ্য প্রকাশ পেয়েছে।’
অবশ্য নানা দিক থেকে উর্বশী ও আর্টেমিস-এর সঙ্গে এ গ্রন্থের যে সম্পর্ক নেই, সে কথাও বলা যায় না। বিশেষত উর্বশী ও আর্টেমিস-এর বহু কবিতায় তিনি যে প্রেম সম্পর্কে বিরাগ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন, এমনকি কখনও অপ্রেমও যাচ্ঞা করেছেন, তা চোরাবালিতে বরং আরও উগ্র হয়েছে এবং তিনি নিজেও যেন এই দুরবস্থাটা উপভোগ করছেন। উর্বশী ও আর্টেমিস-এর কিছু কবিতায় স্বাস্থোজ্জ্বল যুবকের যে দীপ্ত প্রেম ফুটে উঠেছে তা এখানে সাময়িকভাবে অনুপস্থিত।
প্রেম সম্পর্কে মোহভঙ্গ তাঁর সতেরো-আঠারো বছরের নিপুণ কবিতা ‘মন-দেওয়া-নেওয়া’তেই প্রকাশ পাচ্ছে। আর্তনাদ নয়, বরং মারাত্মক যুক্তিবাদী এবং অত্যন্ত পরিপক্ব মনোভাবই প্রকাশ পাচ্ছে এই অতি-তরুণ কবির কণ্ঠে
আসল কথাটা আমি যা বুঝি,
প্রেম ফ্রেম বাজে, আসলে নতুন খুঁজি।
নারীকে পুরুষ, পুরুষকে নারী তাই তো খোঁজে-
তার ওপর তো সে জীবের ধর্ম উপরি আছে।
এরই নাম ”প্রেম ”।
কিংবা আরও পরে
আগেই বলেছি অজানাই হল প্রেমের নানা,
শরীর মানস, ভাবের বাণী… ইত্যাদি।
অবশ্য এটাকে একটা বিশেষ মানসিক অবস্থার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই কবি উপস্থিত করেছেন, মনে হয় – যেটাকে আমরা আমাদের দেশের বিশেষ বুর্জোয়া বিকাশের পটভূমিকায় নিরালম্ব নাগরিক মধ্যবিত্তদের লক্ষণ বলতে পারি।
চোরাবালির এই পটভূমিকে ভুললে চলবে না। দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ের বাংলাদেশের, কলকাতার বাস্তবতা এই আত্মঘাতী ব্যঙ্গ কবিতাগুলির পরিবেশ। এ সময়ে রাজনৈতিক-সমাজনৈতিক যে শূন্যতাকে আমরা অতিক্রম করেছিলাম, তা এখন ইতিহাসের বিষয়। কিন্তু, এই কবিতাগুলি সমাজের যে অংশকে মুখ্যত প্রতিফলিত করছে, সেই বাঙালি নগরবাসী উচ্চ মধ্যবিত্ত ও বিত্তবান সমাজ এখনও অল্পবিস্তর সেই চরিত্র নিয়েই আছে। তাই এই সমাজচিত্র এখনও আমাদের খুব চেনা লাগে। শুধু মধ্যবিত্ত সমাজ বললে ঠিক বলা হয় না-কিছুটা কপালফেরা বিত্তবান ইঙ্গবঙ্গ সমাজ, যারা হয়তো উনিশ শতকের অনেক আতিশয্যেরই ঐতিহ্য বহন করে নিয়ে চলেছে, তাদের কথাই বলা হয়েছে। এখনও তাদের খুঁজে পেতে স্বর্গমর্ত্য সেচতে হবে না। সম্প্রতি একটি লেখায় তার কৌতুকময় বিবরণ পাওয়া গেল ‘এরা সব বালিগঞ্জের ছটাকি-সভ্য কালোবাজারি পরিবারের, মা যেখানে ডাঙরি-পরে কালো-চশমা-চোখে প্রচণ্ড গাড়ি চালিয়ে ছেলেকে বা মেয়েকে স্কুলে পৌঁছে দেয় – স্কুলে তারা পেটকাটা জামা পরা আন্টির শিথিল ভুঁড়ি দেখতে দেখতে আর্ট শেখে’। এখন অবশ্য স্বাধীন দেশে বঙ্গীয় চর্চার উল্টে া সফিস্টিকেশন দেখা দিয়েছে, যেখানে অনুবাদের গন্ধ প্রায় সমপরিমাণ উগ্র। আর সেই তিরিশের যুগে তো বলারই নেই, এই ভুঁইফেঁাড় চরিত্রহীন, কাপুরুষ, মধ্যবিত্ত সমাজ অন্ধ অনুকরণে এবং নীরক্ত শৌখিনতার চর্চাতেই ব্যস্ত। এই সমাজই বিষ্ণু দে-র তথাকথিত সামাজিক কবিতাগুলির ব্যঙ্গের বিষয়।
সুধীন্দ্রনাথ দত্ত প্রকারান্তরে ‘চোরাবালি’র কবিতাগুলোকে দু’ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, ‘নানার্থব্যঞ্জক’ কবিতা-যার মধ্যে পড়ছে সম্ভবত ‘ঘোড়সওয়ার’, ‘ওফেলিয়া’ ‘ ক্রেসিডা’ ইত্যাদি কিছু কবিতা। বলা বাহুল্য এগুলো শেষের দিককার রচনা এবং এগুলো সম্পর্কে সুধীন্দ্রনাথের অনুরাগ উচ্ছ্বসিত-এগুলোর কারণেই বোধহয় তিনি পৃথক-গ্রন্থ প্রকাশের প্ররোচনা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়ত আরেক ধরনের কবিতা, যাকে কখনও তিনি বলেছেন ‘স্বচ্ছ ও ঋজু কবিতা, কখনও ‘যথাযথ সমাজচিত্র’ – যেগুলো, তাঁর স্বীকার করতে বাধেনি, তাকে অপেক্ষাকৃত কম টানে। তিনি নিজেই এই রুচিবোধের তারতম্যের কারণ নির্দেশ করে বলেছেন, তিনি যেহেতু, সামান্যীকরণের মোহ’ কাটাতে পারেন না, তাই ‘বিষয়াতিরিক্ত কাব্যচর্চা আর নৈর্ব্যক্তিক পুরুষসিদ্ধি’ যেখানে ঘটে, ‘ নৈরাত্ম্য উপকরণে স্বকীয়তার সৃষ্টি’ যেখানে হয়, সেখানেই তাঁর মন সায় দেয়। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাব্যসংস্কার ভিন্ন পথে চলে। বিভিন্ন ধরনের কাব্যোপভোগ সম্ভব বলেই শুধু নয়, কাব্যের মধ্যে সমাজের, একেবারে বিশেষ কালের ও সমাজের রং পড়লে বা তার টান থেকে কবিতার জন্ম হলে, সার্থকতার ক্ষতি হয়, এমন অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। তাছাড়া, চোরাবালি-র কবিতাগুলোকে এক সঙ্গে পড়তে বা একটি কবিতার স্মৃতিতে (রেশ থাকতে থাকতে) আরেকটি কবিতা পড়তে আমি অভ্যস্ত বলেই হয়তো এরকম বিভাগে আমার মন সায়ও দেয় না ( যা হয়তো সম্ভব ছিল না সমসাময়িকদের কাছে, যাঁরা কবিতাগুলোকে বেশ সময়ের ব্যবধানে পত্রস্থ হতে দেখেছেন)।
চোরাবালিতে যাকে বলা হয় পাণ্ডিত্য-অর্থাৎ গ্রিক নামের উল্লেখ, য়ুং-এর তত্ব, ক্রেৎসমার-এর মন্তব্য ইত্যাদি ইত্যাদি কাজ করেছে। ফলে বহু কবিতাই যথোচিতভাবে হয়তো পৌঁছোয় না- অপরিচিত বা অর্ধ-পরিচিত থাকে। এই পাণ্ডিত্য অনিবার্য নয়, একথা যেমন আমার মনে হয় না, তেমনি পাণ্ডিত্যের বিষয়টাই একটা মজার ব্যাপার, একথা আমি ভুলেও ভাবতে পারি না। কিন্তু বুদ্ধদেব বসু যখন সুধীন্দ্রনাথের উক্তি ‘বিষ্ণু দে-র মতো এলিয়ট-ভক্ত কখনও নিছক অন্তঃপ্রেরণার তাড়নে কাব্য লেখেন না’ উধৃতি করে প্রশ্ন করেন ‘তবে কিসের তাড়নায় লেখেন?’ – তখন যেমন বুঝি, শুধু ‘নিছক’ শব্দটি চোখ এড়িয়ে গেছে বলেই নয়, এই পাঠকের অনাধুনিকতা আরও গভীরে (সুধীন্দ্রনাথের বর্তমানভক্ত বুদ্ধদেব বসু আশা করি এখন আর সে প্রশ্ন করেন না), তেমনি চোরাবালি-র পাণ্ডিত্য-চর্চাতেই যিনি কালক্ষেপ করবেন এবং কোন শাস্ত্র না জানলে কবিতা বোঝাই যাবে না, এই হিসেবে মাতবেন, সেই অরসিকের ছায়া না মাড়িয়ে গ্রন্থটি পাঠ করারই আমি পক্ষপাতী।
১৯২৬ থেকে ১৯৩১ সাল পর্যন্ত মাত্র পাঁচটি কবিতা স্বতন্ত্রভাবে ছাপা হয়েছে – প্রত্যেকের বছর একটি করে (১৯২৭ সাল বাদ)। তাছাড়া ১৯২৫ থেকে ১৯৩০ সালের মধ্যে লেখা ষোলোটি ছোট ছোট কবিতা (কবিতাগুলি বিচিত্র ও তাৎকালিক অভিজ্ঞতার দ্বারা আক্রান্ত) একসঙ্গে পরে গ্রথিত হয়েছে, বোঝা যায়। এই একুশটি কবিতাকে মোটামুটিভাবে সমাজসচেতন ব্যঙ্গ কবিতা বলে গ্রহণ করা যায় এবং এগুলো উর্বশী ও আর্টেমিস-এর আগে বা সঙ্গে সঙ্গে লেখা। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে বিষ্ণু দে-র মনে এ সময়ে বিচিত্র ও বিপ্রতীপ কতকগুলি অভিজ্ঞতা কাজ করে যাচ্ছিল। একদিকে ‘উর্বশী ও আর্টমিস’ গ্রন্থের ‘প্রত্যক্ষ’ (১৯৩০), ‘সাগর উত্থিতা’র (১৯২৯) মতো উৎফুল্ল কবিতা তিনি লিখছেন, অন্যদিকে ঠিক তখনই তিনি চোরাবালি-তে ‘বিবমিষা’, ‘উভচর’, ‘প্রথম পার্টি’র মতো কবিতায় ব্যঙ্গ ও বিরক্তি প্রকাশ করেছেন। একদিকে সমাজসচেতন ব্যঙ্গ, অন্যদিকে খানিকটা কবিতা-নির্দিষ্ট আবেগ একই সঙ্গে আসছিল বটে, কিন্তু প্রথম কাব্যগ্রন্থে সুধীন্দ্রনাথের পরামর্শে তিনি দ্বিতীয়ভাগের কবিতাগুলিকে স্থান দেন, বোধহয় খানিকটা বিনয়ী সূচনা করার সুবুদ্ধিতে। বহুদিন পরে চোরাবালি গ্রন্থে আবার ওই উজ্জ্বল সমাজব্যঙ্গমূলক কবিতাগুলো যেন মুক্তি পেল।
চোরাবালি-র কবিতাগুলিকে কালানুক্রমিকভাবে দেখলে দেখা যায় প্রথম থেকেই প্রকরণের কী নৈপুণ্য তিনি আয়ত্ত করেছিলেন। ১৯২৬ সালে রচিত ‘মন-দেওয়া-নেওয়া’র কথা তো আগেই বলা হয়েছে। তরুণ কবির এই বিদগ্ধ নাগরিকতা ও সুতীব্র বিরাগ বিস্ময়কর। তারপর একবছর বাদ দিয়েই ১৯২৮ সালে রচিত হয় ‘প্রথম পার্টি’। খানিকটা সেন্টিমেন্টাল শোনালেও এর অভিজ্ঞতার সততা প্রথম কবির কাজ থেকে খুব আশাপ্রদ – বিশেষত এর চিত্রকল্প রচনার অভিনবত্বে ও শব্দব্যবহারের চাতুর্যে। তারপর ১৯২৯ সালে ‘বিবমিষা’ এবং ১৯৩০ সালে ‘উভচর’। এই কবিতা দুটোই কিন্তু এক হিসেবে উর্বশী ও আর্টেমিস গ্রন্থের সুরটাকে মনে করিয়ে দেয় – একদিকে ‘বিবমিষা’ কবিতার তীব্র ঘৃণা, ‘উভচর’ কবিতার নিঃসঙ্গতা ও ক্লান্তি এবং অন্যদিকে বাঁধভাঙা আবেগের জন্য দুর্মর প্রতীক্ষা।
১. গভীর আমার ঘৃণা- ঘৃণার এ সমুদ্রের পাশে
প্রেম যে গোষ্পদজল শুষ্ক গ্রামের ডোবার। (বিবমিষা)
২. নিঃসঙ্গতা মুখোমুখি অপলক!
দু’পাশে ঘনায় ক্লান্তির মেঘাবেশ। (উভচর)
বিষ্ণু দে-র কবিতার মূল বিষয় এবং দৃষ্টিভঙ্গি যেন প্রথম কাব্যগ্রন্থেই স্থির হয়ে গেছে, তারপর সারা জীবন ধরে চলেছে নতুন নতুন অভিজ্ঞতা ও প্রকরণের মধ্যে দিয়ে সেই একই সিদ্ধান্তে পৌঁছনো।
১৯৩২ সাল থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত সময়ে রচিত কবিতার সংখ্যাই বেশি – এসময়ে তিনি দু-ধরনের কবিতাই লিখেছেন – সেই তথাকথিত সমাজসচেতন এবং নানার্থব্যঞ্জক কবিতা। তার মধ্যে ১৯৩৩-৩৪-৩৫-এই তিন বছরেই হচ্ছে সবচেয়ে উর্বর সময়- এ গ্রন্থের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলো এ সময়েই রচিত, এ কথাও বলা চলে।
চোরাবালি গ্রন্থের মূল থীম আলোচনা করলে দেখতে পাব, যে কয়েকটি বিষয় পূর্বগ্রন্থ উর্বশী ও আর্টেমিস-এ ছিল, তা এখানেও ঘুরে ফিরে এসেছে। অর্থাৎ ঘৃণা ও ক্লান্তি ; প্রেমের ক্ষণস্থায়িত্ব বা অসারত্ব সম্পর্কে চেতনা এবং শেষ পর্যন্ত প্রেমের একটি দীপ্ত ও প্রসন্ন রূপ। তাই ‘উর্বশী ও আর্টেমিসে’র সিগনেট সংস্করণের ( বৈশাখ ১৩৬৭) পেছনের মলাটে লেখা আছে বটে ”ঘৃণা আর হিংসা, হতাশা আর শ্লেষ যখন একশ্রেণীর আধুনিক লেখকদের মূলধন, বিষ্ণু দে-র অবলম্বন তখন প্রীতি আর প্রেম”, কিন্তু একথা পুরোপুরি সত্য নয়। এই দুটি কাব্যগ্রন্থেই ঘৃণা বা হতাশা বা শ্লেষ পুরোমাত্রায় আছে – কিন্তু লক্ষ করবার যেটা তা হচ্ছে এগুলো কোনও নেতিবাচক বা চূড়ান্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে নেই এখানে। বরং প্রবল ভালবাসা ও প্রবল ঘৃণা একই সত্য থেকে বা একই উপলব্ধি থেকে আসছে, এদের মধ্যে কার্যকারণ সম্পর্ক তাঁর চিন্তার কাঠামোয় সুনিশ্চিতভাবেই রয়েছে। এটাই বরং আরও স্পষ্ট এবং শাণিত হয়েছে তাঁর পরিণত জীবনের কাব্যে। তুলনা করলে অবশ্য দেখা যায় চোরাবালি-তে শ্লেষটাই জোরালো, উর্বশী ও আর্টমিস-এ যেমন প্রেম।
চোরাবালি-র বেশ কতকগুলি কবিতাতেই দেখছি ক্লান্তি-হতাশা-নিঃসঙ্গতাবোধ কখনও ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে, কখনও ব্যাপকতর সমাজচেতনায় হানা দিচ্ছে -উর্বশী ও আর্টেমিস-এ যে লক্ষণ আমরা প্রধানত ১৯৩১ সালের কবিতাগুলোতে বার বার পেয়েছি।
১. তোমাকে দেখিলে রী রি করে মোর গ্রন্থিস্নায়ুশিরা… (বিবমিষা, ১৯২৯)
২. প্রহর যায়,
প্রহর যায়
একেলা কাটাই সঙ্গীহীন। ( হেলেনিস্ট, ১৯৩২)
৩. ভুলে গেছি কিবা ভুল – দিনগুলি ক্লান্ত হতাশ্বাস
হেমন্তের কুষ্ঠরোগে গতপত্র অরণ্যের মতো। (প্রিরাফায়েলাইট, ১৯৩২)
৪. কফির পেয়ালা হাতে,
শহরের স্তব্ধ প্রাতে,
বিস্বাদ হৃদয়ে
বিষণ্ণ আলোয় বসে বিহ্বল রাত্রির
স্মৃতি দেখি… ( খোঁয়ারি, ১৯৩২)
উর্বশী ও আর্টমিস গ্রন্থে কিন্তু দেখেছিলাম, ১৯৩১ সালের ওই ক্লান্তি ও বিরাগ থেকে উঠে এসে ১৯৩২ সালের কবিতাগুলোর মধ্যে যেন প্রেমে আস্থা ফিরে পেয়েছেন। অবশ্য দু-এক বছরের মধ্যে এরকম চুলচেরা বিচার করা হয়তো অবাস্তব, বিশেষত কবির জীবনের তৎকালীন ঘটনা আমার যখন জানা নেই। বড় জোর বলা যায় এসময়ের রচনায় দুটো মনোভাবই পর্যায়ক্রমে কাজ করে যাচ্ছিল। কিন্তু আমাদের এখানে মূলত লক্ষণীয় এ গ্রন্থে একদিকে ‘দিনগুলি যায় ক্লান্তিতে উচ্ছলি’ এবং অন্যদিকে ‘এ জীবন এক দীর্ঘশ্বাস’ খুব অনিবার্যভাবেই আত্মপ্রকাশ করেছে। বলাবাহুল্য, পূর্বে উল্লিখিত সামাজিক পটভূমি এবং সে সম্পর্কে বিষ্ণু দে-র বিভিন্ন স্তরে প্রতিক্রিয়াই এর জন্য দায়ী।
এই মনোভাব থেকেই সংগতভাবে জন্মায় প্রেম সম্পর্কে একটি বিশেষ ধারণা, অর্থাৎ ‘প্রেম-ফ্রেম’ সম্পর্কে অবিশ্বাস এবং সুতীক্ষ্ণ ব্যঙ্গপরিহাস। প্রথমটা অবশ্য উর্বশী ও আর্টেমিস-এই পেয়েছিলাম, কিন্তু এখানে তার প্রকাশ আরও তীব্রভাবে এবং আবেগের তুলনায় মননের চাপে রূপান্তরিত হয়ে।
১. অভ্যাস, শুধু অভ্যাস, লিলি, তাই তো আসি
তোমার উষ্ণ প্রেমের হাস্যচপল নীড়ে।
(‘কনডিশনড রিফ্লেক্স’, গার্হস্থ্যাশ্রম)
২. সুযোগ পেয়ে তো তবে পাশাপাশি মিলি?
আমাদের ভালোবাসা প্রাকৃতিক লিলি।
(‘আত্মজ্ঞান’, ওই)
৩. নতুন তো নেই কিছুই! এখন করব কি যে!
করব কি যে?
বেজায় ক্লান্ত, শ্রান্ত লাগে!
(‘মন-দেওয়া-নেওয়া’)
৪. সে কথা তো জানি তোমাতে আমার মুক্তি নেই …
হৃদয়দানের সুর ভেঁজে যাই অভ্যাসেই।
(‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’)
কিন্তু ব্যঙ্গপরিহাসটা নতুন – চোরাবালি-তেই প্রথম পেলাম সমাজসচেতন ব্যঙ্গ। অর্থাৎ এই ঘৃণা, ক্লান্তি, অবিশ্বাস এগুলো প্রধানত আবেগাশ্রিত উর্বশী ও আর্টেমিস-এর কবিতায়, চোরাবালি-তে সেখানে স্থান নিয়েছে বুদ্ধি ও মনন। আমার ব্যক্তিগতভাবে এই সামাজিক ব্যঙ্গ কবিতাগুলো ভারি পছন্দ। পরবর্তীকালে এই ধরনের বহু কবিতা লেখা হয়েছে এবং এগুলোর পেছনে বিষ্ণু দে-র প্রভাব বিশেষ কাজ করেছে বলে মনে হয়। উদ্ধৃতি দেওয়া খুব মুশকিল, সারা গ্রন্থ জুড়েই রয়েছে। তবু আমি একটু বিস্তৃত উদাহরণ দেওয়ার চেষ্টাই করব।
১. নাকি আমি সংস্কৃত, প্রাকৃত ও পালি
পড়েছি প্যারিসে গিয়ে, তাই চোখে আনো
কৌতূহল নামে বস্তু, অলকা, বলো তো। (পূর্বরঙ্গ, গার্হস্থশ্রম)
২. লেকে আজকাল সকলেই যায়!
সকলেরই মতো ম্লান সন্ধ্যায়
তুমিও যাচ্ছ! কী বুর্জোয়া! ( বেতাল, ওই)
৩. তোমার পাশে তো তাই ঘেষে এসে মিলি
সিগারেট না খেয়েই হাসছ যে লিলি! (আধিদৈবিক প্রত্যাদেশ, ওই)
৪. শহরের বুকে পাঁচতলায়
নেব সখী এক ছোট্ট ফ্ল্যাট!
ট্রাম বাস ভিড় নিত্য যায়-
উচ্চ বৃক্ষচূড়ে দোঁহায়
ভিড়েতে থেকেও কী নিরালায়!
গোলমাল যেন পায়ের ম্যাট! (কবি কিশোর)
৫. অতএব, মেসে কাটাও তক্তপোষে
দৈনিক দেখ কাজ খালি কোথা কষে
খেলার নেশায় ভিড় ভাঙো মাঠ চষে
আর দেখ রসে সিনেমার পোস্টার,
এলবার্ট হলে তারপর শোনো বসে
ঘোলা ইতিহাসে নানাঘাটে উদ্ধার। ( বেকার বিহঙ্গ)
৬. সুরেশের সুবর্ণের অশ্লীল নিশ্বাসে
ভারাক্রান্ত হাওয়া হেথা। (প্রথম পার্টি)
৭. ডনের প্রেত শরীরহীন ঘুরে বেড়ায় আজো
ড্রয়িংরুমে – হে অতনু! বীর তনুতে সাজো। (কথকতা)
৮. ডরথি যে নেই এই লিলি রমা অলকার ভিড়ে,
গ্রামোফোন-সঙ্গীতের ইন্দ্রজাল বিচিত্র সন্ধ্যায়,
গোধূলি মায়ায় মুগ্ধ মোটরের সীটে,
চুম্বনতাড়নাকম্প্রবায়ু সিনেমায়
মেলে নাকো ডিয়োটিমা, তার কিছু আছে কি প্রমাণ? (কথকতা)
৯. সুরেশের অবসরক্ষয়ের ধরন
তাই
সুরেশের মানসজীবন। (ওই)
১০. অথবা শোনো-
মানুষ যে পশু প্রমাণ তার
আহার তার।
মুখব্যাদান, দন্তবিকাশ, চর্বণ, ঠোঁটে হাতে মাখামাখি,
অজীর্ণতা
ইত্যাদি সব কী দারুণ রূঢ় বর্বরতা! (কথকতা)
বলাবাহুল্য, এই ব্যঙ্গ ও বিদ্রূপের উদ্দিষ্ট স্থল আমাদের খুব পরিচিত উচ্চ মধ্যবিত্ত এবং ধনী সমাজের সেই অংশ, যাদের কৃত্রিমতা এবং স্বার্থপরতা শেষপর্যন্ত ক্লীব বৃহন্নলার রূপ ধারণ করেছে। জীবন তাদের কাছে সাজানো বানানো এক কূপ। এদের সম্পর্কে কোনও সামাজিক দলিল আমাদের হাতে নেই। বরং দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তীকালীন এই সমাজের চেহারা সাহিত্য থেকেই পেতে হয়। যেমন, রবীন্দ্রনাথের ‘শেষের কবিতা’য় আমরা তার কিছু কিছু আভাস পেয়েছিলাম। বুর্জোয়া সমাজের ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার সেই চরিত্রহীন সেবকদের সম্পর্কে ঘৃণা জমা করেছেন এখানে বিষ্ণু দে, তারাই তো আধুনিক কবি ও পাঠকের সবচেয়ে পরিচিত জগৎ।
সুধীন্দ্রনাথ এই ধরনের কবিতা, যেখানে ‘অর্থবৈচিত্র বা বিষয়াতিক্রমের অবকাশ অত্যল্প’, তার প্রতি অনীহা থাকার জন্যই অন্যায়ভাবে মন্তব্য করেন ‘ক্রেসিডা বা ওফেলিয়ার মতো এই নিঃসম্বল লিলি-রমা-অলকার ভাগ্যে বিষ্ণু দে-র করুণা-কণা জোটেনি … এবং এর ফলে এরা তাঁর বিশ্ববীক্ষার দৃষ্টান্ত হয়ে ওঠেনি, শুধুই জুগিয়েছে তাঁর নেতিবাচক অবজ্ঞার উপলক্ষ’। ব্যঙ্গের সঙ্গে করুণার যে বিরোধ নেই, এ কথা সুধীন্দ্রনাথ তখন খেয়াল করেননি – বরং সুনিশ্চিত মানবপ্রীতির সঙ্গেই আছে বিদ্রূপ বা ব্যঙ্গের নিকট সম্পর্ক। নেতিবাচক অবজ্ঞা তো নয়ই। এটা মনে রেখেই ব্রেখট বলেছিলেন, নাটকে মেয়েটির দুঃখে কাঁদব বটে, কাঁদব নাও বটে। সুধীন্দ্রনাথ যখন বলেন ‘বোঝা যায় না বিষ্ণু দে কখন হাসছেন, কাঁদছেনই বা কখন’- তখন তার জবাবে ব্রেখটের ওই উক্তির প্রতিধ্বনিতে রঙ্গ করে বলা যায়, তিনি সব সময়ই কাঁদছেন বটে, হাসছেনও বটে।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিদ্রুপেই যেহেতু তাঁর কবিতা শেষ হয়ে যায় না, তাই বোঝা যায় তাঁর মানসিকতার সর্বগ্রাসী সমগ্রতাকে, সমব্যথীর তৎপরতাকে। প্রেম সম্পর্কে একটি সন্দিগ্ধ মনোভাব যেমন এই ব্যঙ্গের উৎস এবং সেটা খুবই স্বাভাবিক পটভূমির অবিকৃত প্রতিক্রিয়া হিসেবে, তেমনি কবির সীমাতিশায়ী এবং পরাক্রান্ত জীবনচেতনার পরিচয় পাই, যেখানে প্রেম সম্পর্কে তাঁর উৎসাহী মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে-যদিও উর্বশী ও আর্টেমিস-এর তুলনায় এই বোধ খানিকটা হয়তো এখানে সংকুচিত।
১. বারবার বাতাসের হাতে লেগে লেগে
পুঞ্জীভূত বাতাসের বেগে
ঝরে যাবে বিড়ম্বনা, মুক্তি পাবে মানসবলাকা।
হৃদয় তোমার প্রিয়া আমার মনের নীলে মেলে দেবে পাখা।
তোমার ও দীপ্তি মুক্তি পাবেই আমার চিত্তে, কোনও তরুণ তমালে,
একদিন, একরাতে, কোনও এক কালে। (পঞ্চমুখ ৩)
২. হে বীর অতনু, নচিকেতা ধনু টানো,
দেহদুর্গের রক্ষায় মোরে আনো-
তোমার প্রাকৃত বাহুতে, মহাশ্বেতা। (মহাশ্বেতা)
সুধীন্দ্রনাথের সুলিখিত রচনাটির গুণে এবং আধুনিক বাংলা কবিতার সংকলনগুলোর আনুকূল্যে ‘চোরাবালি’র বিশেষ কয়েকটি কবিতা জনপ্রিয়তা লাভ করেছে পাঠকসমাজে। তার মধ্যে অবশ্য তিনটিই সুধীন্দ্রনাথ-কথিত বিবিধার্থক কবিতা ওফেলিয়া, ক্রেসিডা এবং ঘোড়সওয়ার। বাকিটা ‘প্রহসনজাতীয় নাট্যরচনা’ টপ্পা-ঠুংরি।
‘ওফেলিয়া’ এবং ‘ক্রেসিডা’ দুটো কবিতার পেছনেই শেক্সপীয়রের নাটক এবং অন্যান্য বহু রচনা প্রত্যক্ষভাবে কাজ করেছে। অথচ এ বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই, তিনি অসামান্য মৌলিক দুটি কবিতা রচনা করেছেন – সুধীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘নৈরাত্ম্য উপকরণেও এতখানি স্বকীয়তার সৃষ্টি’। এই অর্থেই তিনি কবিতা দুটিকে বলেছেন ‘সংক্ষিপ্ত সামান্যীকরণের প্রকৃষ্ট উদাহরণ’। আরও বলেছেন, গীতিকবিতা ও নাট্যের অপূর্ব সন্মিলন ঘটেছে এখানে। ‘বাহ্যত ওফেলিয়া যদিচ গীতিকবিতার শ্রেণীভুক্ত ; তবু তার ভাববিস্তার একখানা পঞ্চাঙ্ক নাটকের উপযোগী।’ অথচ শেক্সপীয়রের এই নাটকের পুনর্বর্ণন করে তিনি কিন্তু ব্যাপকতর সত্যের কথাই বলেছেন- ‘প্রেমিক সাধারণের সুদীর্ঘ জীবনকাহিনির সারসংগ্রহই শুধু নয়,’ তাদের অবশ্যম্ভাবী ট্র্যাজেডিকেও। ওফেলিয়া তাই বিষ্ণু দে-র কবিতায় ‘সার্বভৌম বিপ্রকর্ষের প্রতীক’। প্রাত্যহিক তুচ্ছতার ঊর্ধ্বে ট্র্যাজেডির মহিমা আরোপের জন্যই তিনি হ্যামলেটের মধ্যস্থতায় এই কথা বলেছেন এবং তাঁর ব্যক্তিগত অভাববোধের গোষ্পদে ‘শেক্সপীয়রের বিশ্বমানবিক ছায়া পড়েছে’। ক্রেসিডা কবিতাতেও আছে এই নাট্যরচনার প্রচেষ্টা – তিনি নাকি এখানে ‘বাদী, বিবাদী ও অনুবাদী ভাবের নাটকীয় প্রতিসাম্য ঘটিয়েছেন’। এ বিষয়ে তিনি চসর, হেনরিসন ও শেক্সপীয়রকে এককভাবে গ্রহণ করেননি, প্রত্যেককেই অসম্পূর্ণ ঠেকেছে, প্রয়োজনমতো তাঁদের মিলিয়েছেন স্বাধীন ও স্বকীয় নির্বাচনে। তিনি দেখাতে চেয়েছেন, ‘প্রাণযাত্রার প্রত্যাবর্তন নেই এবং অভ্যাসবশে আমরা ক্রমাগত পিছনে তাকাই বটে, কিন্তু কার্যত পুনরুজ্জীবিত অতীতের সাদর সংবর্ধনা মর্ত্যবাসীর স্বভাববিরুদ্ধ’। কবিতাদুটি সম্পর্কে এই হচ্ছে সুধীন্দ্রনাথের বক্তব্য।
সন্দেহ নেই চোরাবালি-তে প্রেম সম্পর্কে অবিশ্বাস এবং মোহবর্জন যে বহু সমাজব্যঙ্গমূলক কবিতায় প্রকাশ পেয়েছে, সেই মনোভাব থেকেই কবিতা দুটি রচিত। অবশ্য উচ্চারণরীতি সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখানে, তিরিশের কবিদের, বিশেষত সুধীন্দ্রনাথ ও বিষ্ণু দে-র তৎকালীন কাব্যাদর্শের পরিচয় মেলে। নিজের একান্ত প্রাতিস্বিক অভিজ্ঞতার মধ্যে বিশ্ববীক্ষা নয়, বরং কোনও নৈরাত্ম উপকরণের মধ্যেই স্বকীয় অভিজ্ঞতার সমীকরণ তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল। ‘কবির ব্রত তার স্বকীয় চৈতন্যের রসায়নে শুদ্ধ চৈতন্যের উদ্ভাবন’। (কাব্যের মুক্তি, সুধীন্দ্রনাথ)। এবং তখন এই কাব্যাদর্শের তাগিদেই পাণ্ডিত্য এবং মননচর্চা এবং প্রাসঙ্গিক দুর্বোধ্যতা খানিকটা অনিবার্য ব্যাপার। ইংরেজি সাহিত্যের এই দুটি নারী চরিত্রের মধ্য দিয়েই বিষ্ণু দে তাঁর উপলব্ধির কথা বলতে চেয়েছেন, তার কারণ ‘বিশ্বাসভঙ্গের দায়ে অভিযুক্তা’ এই চরিত্র-দুটিই তো হতে পারে তাঁর তৎকালীন চিন্তার সার্থক objective correlative। হ্যামলেট মনে করেছিলেন, ওফেলিয়া অবিশ্বাসিনী – তাই প্রেম সম্পর্কে তার সব সাধ-আশা ধূলিসাৎ হয়। ক্রেসিডা কবিতাতেও ট্রয়লাসের জবানিতে এই অবিশ্বাসিনীকে দেখানো হয়েছে। চসার, শেক্সপীয়র কিংবা হেনরিসনের কাব্যে বর্ণিত এই চরিত্রটি পুনরায় বিষ্ণু দে-র কবিতায় ফিরে এসেছে বিশ্বাসভঙ্গের প্রতীক হিসেবে।
এই দুটি চরিত্রের মধ্য দিয়েই তিনি শেষ পর্যন্ত যা প্রকাশ করতে চেয়েছেন, তাতে আমরা বুঝতে পারি তিরিশের যুগের বাংলা দেশের বিত্তবান সমাজের পটভূমিকায় মুক্ত ও সুস্থ প্রেমের অভাব কীভাবে এই নৈরাশ্য ও বৈরাগ্যে পৌঁছে দিয়েছে কবিকে। যে ওফেলিয়া হ্যামলেটের মন ভুলিয়েছিল, তার মনে জাগিয়েছিল উদ্ধত প্রেমের উজ্জ্বল সম্ভাবনা – তিনি দেখতে পাননি মেঘের রেশমি আড়ালে বজ্রের যাওয়া আসা- ফলে যা ঘটবার ঘটল ‘অমরাবতীর দৈব প্রাচীর চুরমার হল মর্ত্যলোকে’। হ্যামলেটের মোহ; প্রেম সম্পর্কে আশা এবং সম্ভাবনা বারবার জাগছে বহু চিত্রকল্পের মধ্যে – মাঝে মাঝেই সন্দেহ উঁকি দিচ্ছে বটে – কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই আলোছায়ার লীলা ভেঙে যায় চূড়ান্ত বিনাশে। ক্রেসিডা কবিতাতেও তাই আশা ও নৈরাশ্যের দ্বন্দ্ব, স্মৃতি ও বর্তমানের দ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত নির্বিকার অভাবে শেষ হয়। একদা যে ক্রেসিডা ট্রয়লাসকে ছেড়ে গিয়েছিলেন, তাকেই আবার তিনি পান অসুস্থ, হৃত-ঐশ্বর্য রূপে। ক্রেসিডার স্মৃতি বারবার আসে, বারবার মনে পড়ে তার প্রাক্তন সাহচর্যের মাধুর্য- কিন্তু ফেরার উপায় নেই, বিচ্ছেদ সম্পূর্ণ হয়ে গেছে – শুধু অবশিষ্ট পড়ে থাকে বড় জোর একটি লাইন ‘স্মরণে তোমার হানে আজো তরবারি’। এই হচ্ছে কেন্দ্রীয় বিষয় কবিতা-দুটির – এই দ্বন্দ্ব – তারই প্রেরণায় আসছে একের পর এক চিত্রকল্প ; অনুভূতির মধ্যে দ্বন্দ্ব জাগছে ; চিত্রকল্পের বিন্যাসে, আপাতবিচ্ছিন্ন সমাহারে ও আকস্মিকতায় তার আভাস।
ওফেলিয়া ও ক্রেসিডা – কবিতার ‘নৈরাত্ম্য উপকরণে’র মধ্যে দিয়ে যা বলার চেষ্টা হয়েছে, তাই সামাজিক বাস্তবতার ভাষায় বলেছেন তিনি ‘টপ্পা-ঠুংরী’ কবিতাটিতে। অর্থাৎ আমাদের নাগরিক জীবনের খণ্ডতা ও অসংলগ্নতা এবং নৈরাশ্যের ফলশ্রুতি। চোরাবালি-তে এলিয়টের প্রভাব গভীরভাবে কাজ করেছে, সবাই বলেছেন। গীতিকবিতায় নাটকীয়তা বা টেনসন সৃষ্টির যে নির্দেশ এলিয়ট দিয়েছেন, তার ব্যবহার পেলাম ‘ক্রেসিডা ও ওফেলিয়া’ কবিতায় এবং বস্তুধর্মিতার চূড়ান্ত সাধনা। ‘টপ্পা-ঠুংরী’ কবিতাতেও এলিয়টের প্রকরণ কৌশলের স্পষ্ট ছাপ আছে। এ ধারায় অবশ্য পরবর্তীকালে আরও অনেক কবিতা লেখেন, যেমন সমর সেন। অর্থাৎ কোনও প্রতিষ্ঠিত কবির কবিতাকে পুনর্লিখন করে বৈপরীত্যটা স্পষ্ট বুঝিয়ে দেওয়া হল দুই যুগের, দুই জগতের পার্থক্য। তাছাড়া কবিতার ভেতরেও সর্বত্র, উপমায় চিত্রকল্পে উল্লেখে পুরনো কবিতার ছিন্ন চরণ, টুকরো শব্দ বসিয়ে বসিয়ে কখনও প্রতিতুলনায়, কখনও সার্থক অনুষঙ্গে বিচিত্র মেজাজ তৈরি করা হয়েছে – আবেগ ও মননের এক জটিল মিশ্রণ, ব্যঙ্গ ও সরলতার দ্বৈতলীলা। কবিতাটি যেন রবীন্দ্রনাথের ‘শ্যামলী’ কাব্যগ্রন্থের ‘বঞ্চিত’ ও ‘অপর পক্ষ’ কবিতার পুনরাবৃত্তি। কিন্তু বলা বাহুল্য, এই সম্পূর্ণ মৌলিক কবিতায় রবীন্দ্রনাথের সরল আবেগ অনুপস্থিত, আমাদের খণ্ডিত বর্তমান ফুটে উঠেছে এর বক্রোক্তিতে ও প্রকরণে।
দাঁড়িয়ে আছে একটা খালি ট্রেন-
যেন আদিকালের প্রকাণ্ড সরীসৃপটার কঙ্কাল…
ডাকলাম নাম ধরে,
কী জানি ছাড়া আর কোনও কারণ নেই
যেন পাগলামির।
ভগ্ন আশা শূন্য প্ল্যাটফরম জুড়ে ভূলুণ্ঠিত। (অপরপক্ষ)
এল ট্রেন
মন্থিত করে রক্তের জোয়ার…
হায়রে! আশার ছলনে ভুলি!
কোথায় তুমি! ট্রেন তো এল!
কয়লাখনি ধ্বসে পড়ুক,
ধর্মঘট নাই বা থামল,
ট্রেন তো এল!’ (টপ্পা-ঠুংরী)
লিপিকার জগৎ, বলাকার জগৎ, কখনও বা লৌকিক ছড়া – পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তব চিত্রকল্প, তার ঘন আবেগ, কখনও নিকষ গদ্য ( ‘ স্বেচ্ছাতন্ত্র ছেড়ে, দ্বৈরাচারী ট্রামই ভালো’…), শেষ স্তবকে হঠাৎ ভাবালু আত্মপ্রকাশ, ইত্যাদি ইত্যাদি এক সমাজনাট্য তৈরি করেছে, যেখানে ওই অপ্রাপ্তির নৈরাশ্যই বাজছে তীব্রভাবে। ওফেলিয়ার পাশে ‘টপ্পা-ঠুংরী’র এই পার্থক্য বিষ্ণু দে-র বিচিত্র আঙ্গিক-সাধনার ও পরীক্ষানিরীক্ষার সচেতনতা প্রমাণ করে।
এর পাশে একই বছরে লেখা (১৯৩৫) ‘ ঘোড়সওয়ার’ কবিতাটিকে আমি এই নৈরাশ্য থেকে মুক্তির নিদর্শন হিসেবে দেখি।
‘টপ্পা-ঠুংরী’ কবিতাটি শেষ হয়েছিল এই আত্ম-সংলাপে
হায় রে!
-আমার ফাঁকা লিবিডোকে এখন চালাবো
কোন বুর্জোয়া খেয়ালের বাঁকা খালে?
কোন ধ্রুপদী অবদমনের নিদ্রাহীনতায়?’
লিবিডোকে শেষ পর্যন্ত কোনও বুর্জোয়া খেয়ালের বাঁকা খালে কিংবা ধ্রুপদী অবদমনে চালাতে হয়নি; এই লিবিডোরই অবাধ প্রকাশ দেখছি ‘ ঘোড়সওয়ার’ কবিতায়। সবাই জানেন, ফ্রয়েড যার মধ্যে যৌনতার প্রাধান্য দেখতেন, মনোবিজ্ঞানী য়ুং সেই লিবিডো বা জীবনীশক্তিকে আরও ব্যাপক পৌরাণিক ভিত্তিতে দেখেছেন। এই কবিতার পিছনে ফ্রয়েড বা য়ুং কোনটার প্রভাব অধিক কার্যকর, সে প্রশ্নও ততখানি জরুরি নয়। সুধীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘ঘোড়সওয়ার শুধু রিরংসার রূপক নয়, তাদের উপরে প্রকৃতি-পুরুষ বা ভক্ত-ভগবানের সম্বন্ধারোপ সহজ ও শোভন, অনেকে পরবর্তীকালে বিপ্লবের বার্তাবহ হিসেবেও এটাকে দেখেছেন।’ বিষ্ণু দে-র জীবনেতিহাস আমাদের কাছে নেই, কিন্তু মনে হয়, শেষোক্ত ব্যাখ্যা কালানৌচিত্য দোষে দুষ্ট হবে, অন্তত কবির প্রেরণা বিচার করতে বসলে। বরং ফ্রয়েড বা য়ুং-নির্দিষ্ট মনস্তত্বের প্রভাব চোরাবালি-র বহু কবিতাতে আছে মনে করলে এই কবিতা বিষয়েও সেই তত্বের প্রাসঙ্গিকতাই অনেক যুক্তিসহ।
অবশ্য আমি দেখেছি এই কবিতা ব্যাপক পাঠক সাধারণের কাছে জনপ্রিয় যে কারণে, তা হচ্ছে এর কেন্দ্রীয় আবেগ, যে আবেগ প্রতিটি চিত্রকল্পে, প্রতিটি লাইনে, প্রতিটি শব্দে সঞ্চারিত। ধ্বনি ও বিষয়ের এমন সুষ্ঠু বিবাহ বাংলা কবিতাতে অল্পই ঘটেছে। সমস্ত কবিতায় প্রতীক্ষার সুর এমন আপাদমস্তক জড়িয়ে আছে, প্রতীক্ষার উৎকণ্ঠা ও আবেগে কাঁপছে যে, কবিতাটির টেনসন সকলকে তাড়িত করে।
নয়নে ঘনায় বারে বারে ওঠা পড়া?…
আযোজন কাঁপে কামনার ঘোর…
কঁ াপে তনুবায়ু কামনায় থরো থরো।…
কামনার টানে সংহত গ্লেসিয়ার।…
এই ব্যাকুল প্রতীক্ষার পর মিলন ঘটবে যখন, তখন বলার থাকবে শুধু, ‘হালকা হাওয়ায় হৃদয় আমার ধরো’। লক্ষণীয় যে, সমস্ত কবিতায় এই ‘হালকা হাওয়া’র সম্ভাবনা বা প্রাপ্তির কথা বলা হয়েছে বার বার।
হালকা হাওয়ায় বল্লম উঁচু ধরো।…
হালকা হাওয়ায় হৃদয় দুহাতে ভরো।…
পাহাড় এখানে হালকা হাওয়ায় বোনে…
হালকা হাওয়ায় কেটে গেছে কবে/লোকনিন্দার দিন …
এর কোনও মনোবৈজ্ঞানিক গূঢ়তত্ব আছে কিনা জানি না, আমার কাছে এর মানে আনন্দ বা প্রীতির সেই আকাঙ্ক্ষিত জগৎ, যার জন্য এই প্রাণাবেগের আকুল উৎসার। ‘গার্হস্থ্যাশ্রমে’র অন্তর্গত ‘গ্রহণ’ কবিতাটিতেও এই স্বীকৃতি আছে
তোমার কথার পাখা নিল প্রিয়া আমাকে আকাশে,
নক্ষত্র-কম্পিত লোকে আনন্দের লঘিষ্ঠ হাওয়ায়।
নিয়ে গেল আন্দোলিত রজনীগন্ধার শুভ্রবনে।…
অন্ধকার চোখে নির্ভরের মাধুরী ঘনায়।
উর্বশী ও আর্টেমিস গ্রন্থের যেমন সামাজিক বিস্বাদের পর উচ্চারণ করলেন ‘ভয়ের আবেগে ছেঁড়া তোমার সে নির্ভরের দান/চিরজীবী নোজগে আমার’। এই কবিতাটি যে আবেগের কথা বলছে, তারই রেশ যেন বাজছে বহু পরবর্তী আরও একটি কবিতাতে – অন্তত আমার তা-ই ভাবতে ভালো লাগছে
সমষ্টি গুরুভারে অহল্যার স্বকীয় মর্যাদা
ধার দিক সবাইকেই বিপ্লবীর লঘিমা দুর্বার
লাখো লাখো ঘোড়সওয়ার সমুদ্রের ঢেউ-
সফেন চঞ্চল নৃত্যে সমুদ্র ছাড়া কি কিছু কেউ?
(বহু বড়বা/নাম রেখেছি কোমলগান্ধার)
সুতরাং, যতই কালের ও সমাজের প্রভাবে তিক্ততা জমুক, ব্যঙ্গ শাণিত হয়ে উঠুক, এ সমস্তই আসছে সেই প্রাণাবেগ চঞ্চল প্রেমিকের কাছ থেকে যিনি হালকা হাওয়ায় হঠকারিতার ভীরু দ্বার ভেঙে দিতে উদ্যত, যিনি আবেগের সমুদ্রে ভাসবেন অতঃপর নিজের অভিজ্ঞতার দেওয়ালকে ক্রমশ ভাঙতে থাকবেন।
চোরাবালি-র কলাকৌশলের প্রশ্ন খুব মূল্যবান। এর প্রশংসায় অনেকেই মুখর। কেউ প্রবহমান মাত্রাবৃত্তের তারিফ করেছেন, কেউ রাবীন্দ্রিক মাত্রাবৃত্তকেও তিনি যে ‘নিজের সুরে’ বাজিয়েছেন, সেজন্য প্রশংসা করেছেন, কেউ বা শব্দব্যবহারের অসামান্য চাতুর্যের কথা বলেছেন। সুধীন্দ্রনাথ দৃষ্টান্ত দিয়ে দেখেছেন, মাত্রা বন্টনের কৌশলে তিনি কীরকম গদ্য-পদ্যের বিরোধ ভঞ্জন করেছেন কোথাও কোথাও; কথ্যরীতি থেকে তিনি দূরে সরে যাননি, অথচ ব্যাকরণগত নৈরাজ্যও ঘটাননি। কিছু কিছু শৈথিল্যের অভিযোগ করেছেন বটে, কিন্তু সাধারণত এর কলাকৌশলের প্রশংসায় তিনি বিস্ময়করভাবে প্রগলভ-বিশেষত সুধীন্দ্রনাথের মতো আঙ্গিকসচেতন লেখক।
শুধু ছন্দের নৈপুণ্য ও বৈচিত্রের কারণেই নয় বা ধ্বনিগৌরবেই নয়, চিত্রকল্প সমাবেশেও তাঁর নূতনত্ব ও অক্লান্ত ঔৎসুক্য দেখা যায়। কখনও বা রোমান্টিক মেজাজে ইন্দ্রিয়ঘন আচ্ছন্নতায় কখনও স্বদেশী-বিদেশি শব্দের সমারোহে তিনি নানা মেজাজ তৈরি করেছেন।
১. খরস্নায়ু স্তব্ধতার পাখা মেলে চকিত শহরে
রুদ্ধ পেশী মেঘবন্ধে সন্ধ্যা নামে কান্তি মুখে। (সন্ধ্যা)
২. খর যৌবনে হৃদয়বিহীন তোমার হিয়া,
হাসি তো তোমার বৃথাই ছড়াল তুষার, প্রিয়া! (পঞ্চমুখ ২)
৩. উদাস উর্দুসুর মৃদুমিঠে স্বরে
শহুরে ছাতেও অকাল দখিনা করে
উতলা উদাস … (শৃঙ্গ চ…/ গার্হস্থ্যাশ্রম)
৪. হে মোনালিসা, হে সাইনারা, স্বপ্নজীবনীর বীজনে
এসো এসো এই মলিন আলোয় সাগরের শ্বেত কেশর
পাণ্ডু দুপায়ে ঢেকে। ( জ্যোকন্দা)
৫. নয়নে তোমার মদিরেক্ষণ মায়া
স্তনচূড়া দিল ক্ষীণ কটিতটে ছায়া। (মহাশ্বেতা)
৫ম বর্ষ ৩য় সংখ্যা
(বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ ১৩৭৪)
