শিল্পীর সংকট দুটি চিঠি – মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

শিল্পীর সংকট দুটি চিঠি – মানবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়

এখন অত্যন্ত পুরোনো ও বাঁধাধরা তর্কে পর্যবসিত হয়েছে, কিন্তু তবু গত কয়েক বছরের বাংলাদেশের দিকে তাকিয়ে আমার বারে-বারেই মনে হয়েছে যে একেকটা সময় আসে যখন পুরোনো প্রশ্নও নতুন উত্তর দবি করে। শিল্পীর দায়িত্ব কী, প্রশ্নটা এতই ছোট ও সামান্য-কিন্তু সর্বগ্রাসী। শিল্পের- এবং আরও জরুরি শিল্পীর-সঙ্গে কী সম্বন্ধ রাজনীতির? নিশ্চয়ই কোনও সদুত্তর নেই। কারণ কোনও স্পর্শাতুর ব্যক্তিই কি এ-সম্বন্ধে সত্যি করে মনঃস্থির করতে পারবেন? আমার, অন্তত, মনে হয় না। জানি, এখনও যাঁরা উনিশ শতকি কলাকৈবল্যবাদের স্তাবক, তাঁদের মুখে এর উত্তর উঁচিয়ে আছে। তাঁদের একটা মস্ত সুবিধে এই যে তাঁরা যেভাবেই হোক একটা স্থির উত্তর পেয়ে গেছেন। কিন্তু আমরা, যারা কস্মিনকালেও এই অস্থিরতা কাটাতে পারব বলে বোধ হয় না, আমরা কী করব? আগেকার মতো তেমন-কোনও মূল্যবোধ আমাদের নেই যেটা আঁকড়ে ধরে স্বস্তি পেতে পারি; একের পর এক স্তম্ভপাত হয়েছে -কোনও বিশেষ মতবাদ, কোনো বিশেষ ঈশ্বরে আমরা অনেকেই আর বিশ্বাস করি না। অথচ দেশ যখন আগুনে পোড়ে, জগৎ যখন অধঃপাতে যায়, তখন নিশ্চিন্ত ও নির্বিকারভাবে শিল্পসাহিত্যের চর্চা করতেও বিবেকে বাধে। এই হাৎড়ানিটা সেই জন্যই।

এই হাৎড়াতে গিয়েই প্রথমে চিঠি দুটো চোখে পড়ে। প্রথম চিঠির লেখক গোটফ্রিড বেন, কবি ও চিকিৎসক, রচনাকাল ১৯৩৩, রচনাস্থল নাৎসি-অধ্যুষিত জার্মানি। দ্বিতীয় চিঠির লেখক টমাস মান, ঔপন্যাসিক, রচনাকাল ১৯৪৫, জার্মানির পতনের পর, রচনাস্থল ক্যালিফোরনিয়ার উপকূল। অন্তবর্তী বারো বছরের ইতিহাস ভাবলেই আজ আমাদের গায়ে জ্বর আসে। অথচ সেই সময়ে, হিটলারের রাজত্বকালে ও তার অব্যবহিত পরে, প্রত্যেক জর্মন মনীষা নিশ্চয়ই এই প্রশ্নটা নিয়েই ব্যাকুল ও বিপন্ন বোধ করেছিলেন-অন্তত যে-দুটি চিঠি আমরা এখানে পড়তে চাচ্ছি, তাতে তারই ইঙ্গিত আছে।

১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দের জর্মন মনীষার নিদর্শন আগুনে পোড়ানে হয়েছিল। ছিল কড়া সেনসরশিপ, সর শৃগালের মুখে এক রব, অপ্রচার…ইত্যাদি। সেই সময়ে তৎকালীন জার্মানির অনেকেই স্বদেশ ত্যাগ করে বিদেশে পুনর্বাসন চাচ্ছিলেন- এই শরণার্থীদের মধ্যে ছিলেন হাইনরিখ ও টমাস মান, হেরমান হেসসে, বেরটোন্ট ব্রেখট, লওনার্ড ফ্রাঙ্ক, ফ্রিৎজ ফোন উনরু প্রমুখ। কিন্তু কেউ-কেউ স্বদেশ ত্যাগ ক’রে যেতে রাজি হননি, গোটফ্রিড বেন তাঁদের অন্যতম। ক্লাউস মান১ তখন ফরাসি রিভিয়েরার একটি ধীরপল্লী থেকে গোটফ্রীড বেনকে একটি চিঠি লেখেন, বেন-এর খোলা চিঠি ছিল তারই উত্তর। ক্লাউস মান-এর পত্রটির অন্তত অংশবিশেষ এখানে স্মরণ করা প্রাসঙ্গিক হবে বলে বোধ হয়।

প্রিয় ডাক্তার বেন,

আপনার চিৎ-বৃত্তির অস্তিত্ব সম্বন্ধে উৎকন্ঠিত বলে, আপনার লেখার কোনো বিশ্বস্ত ও অকৃত্রিম অনুরাগী একটি কথা জিগেস করতে পারি কি?…’জর্মন ঘটনাবলি’ সম্বন্ধে আপনার কী মনোভাব-এ সম্বন্ধে- গত কয়েক সপ্তাহের মধ্যে আমি এমন সব গুজব শুনেছি যা নিজেকে বিশ্বাস করাতে পারলে আমি একটা মোক্ষম নাড়া খেতুম। এ-সব জনরবকে আমি মোটেই বিশ্বাসযোগ্য বলে মনে করতে পারি নি, অথচ এখন আমি এটা অতি সত্যিকথা বলেই জেনেছি যে আপনি-আমরা যাঁদের উপর আস্থা রেখেছিলুম, আপনিই তাঁদের মধ্যে ‘একমাত্র’ জর্মন লেখক, যিনি-এখনও আকাডেমিতে ইস্তফা দেননি। …ওখানে আপনার সঙ্গী কারা? আপনার নাম আমাদের কাছে ছিল উচ্চমানের সমার্থক-তো মোটেই অন্ধতাময় শুচিবাতিকের দৃষ্টান্ত ছিল না; সেই আপনি কীসের দ্বারা প্ররোচিত হয়ে নিজেকে তাদের হাতেই সঁপে দিলেন, ভালো-মন্দ বিচার করার অক্ষমতা যাদের ইয়োরোপের ইতিহাসে অতুলনীয়, আর যাদের নৈতিক কদর্যতা দেখে সারা জগৎ গুটিয়ে যাচ্ছে।… এর গর্হিত ও অসংগত একটি দলে কাকে আপনি বন্ধু পাবেন? ওখানে আপনাকে বোঝে কে? আমি জানি, আপনার তরুণ ভক্তরা আজ সকলেই পারি, ৎজুরিখ, আর প্রাহার সস্তা হোটেলে দিন কাটাচ্ছে- আর আপনি, যিনি তাদের আদর্শমূর্তি, ওই রাষ্ট্রের আকাডেমি সদস্যপদে দিব্যি বাহাল আছেন! না-হয় আপনি আপনার ভক্তদের সম্পর্কে নির্লিপ্তই থাকলেন, কিন্তু আপনার স্পর্শময় আগ্রহ-উদ্দীপনা যে-সব বস্তুর উপর পড়ত, তাদের অবস্থাটা একবার লক্ষ করে দেখুন। হাইনরিখ মান২, আপনি যাঁকে প্রায় পুজো করতেন, যে-সংগঠন থেকে ধিক্কারজনকভাবে বিতাড়িত হয়েছেন, আপনি স্বয়ং তাতে থেকে গেছেন। এই নতুন প্রভুরা দেশটাকে যে-পরিমাণে উচ্ছন্নে দিতে চাচ্ছেন, অনুপাতে ততটা না-হলেও আমার পিতা এ-দেশের জগৎজোড়া প্রতিষ্ঠা কিঞ্চিৎ বাড়িয়েছিলেন, আর তাঁর কথা আপনি কথায়-কথায় উদ্ধার করতে ভালবাসতেন- সেই তিনি আজ যুযুৎসুদের একটি চাঁদমারি ভিন্ন আর-কিছুই নন। আপনার কাছে যাঁরা মূল্যবান বলে গণ্য হতেন, অন্যান্য দেশের সেই শ্রেষ্ঠ মনীষারাও এখন প্রতিবাদে সোচ্চার। আঁদ্রে জিদ-এর কথাই ভাবুন- তিনি নিশ্চয়ই সেই অন্তঃসারশূন্য ‘মার্কসবাদী’দের একজন নন, যারা আপনাকে অমন ক্ষুব্ধ করত।

আর এখানেই বোধহয় আমরা বিনিশ্চায়ক প্রশ্নটায় এসে পড়লুম। জর্মন ‘মার্কসবাদী’ লেখকদের সম্বন্ধে আপনার বিরাগ আমি সব সময় কত ভাল করে বুঝেছি- কতবার যে আপনার সঙ্গে-সঙ্গে সেই বিরাগবোধের শরিকও হয়েছি।… এ-সব লোকের হাতে আমার মতো নির্যাতিতও আর কেউই হয়নি। অথচ তবু, বহু বছর ধরে এটাই আমাকে এখন উৎকন্ঠিত করছে যে এই সব স্থূলমুণ্ড জরদগবদের প্রতি অনীহাই আপনাকে- গোটফ্রিড বেনকে – তীব্রতর ও ক্রমবর্ধমান কোনও ভয়ংকর যুক্তিহীনতায় ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। আপনার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে গেছে শুধুমাত্র বুদ্ধিজাত- আর, স্বীকার করি, এই দৃষ্টিভঙ্গি আমাকেও প্রলুব্ধ করে- কিন্তু এর বিষম বিপদগুলো আন্দাজ করে নিতে আমাকে বেগ পেতে হয়নি। … কেউ যদি শয়তানের মতো সজাগ না থাকে, তাহলে আজকাল প্রবল, যুক্তিবর্জিত সহমর্মিতা যে শেষটায় রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়ার মধ্যে টেনে নিয়ে যায়, এটা প্রায় প্রাকৃতিক বিধানে পরিণত হয়েছে। প্রথমে আসে ‘সভ্যতা’র বিরুদ্ধে একটা মহান প্রতীকী হাতনাড়া- এই হাতনাড়া যে বুদ্ধিজীবীদের কাছে কত চিত্তাকর্ষক তা আমি জানি; তারপরে দেখা গেল আচম্বিতে পৌঁছে গেছেন শক্তিমদমত্ততায়, আর তারপরের ধাপই আডোলফ হিটলার। …আমার স্থান যে সত্যি কোথায়, তা আমি এখন জানি – আগের চেয়ে আরও স্পষ্ট ও স্পষ্টভবে জানি। কোনো মার্কসবাদী অশালীনতা আমাকে আর উত্যক্ত করতে পারবে না। আমি জানি যে কোনো লোককে কাণ্ডজ্ঞানসম্বল হবার জন্য বা স্নায়ুপীড়িত পশুত্বাচরণকে ঘৃণা করবার জন্য স্থূল ‘জড়বাদী’ হতে হয় না।

আমি যে কোনও ঢাকা না-রেখেই কথা বলেছি – এটা অশোভন; আবারও আপনার ক্ষমা চাচ্ছি। কিন্তু আমি চাই যে আপনি জানুন আপনি সেই মুষ্টিমেয় ব্যক্তির একজন যাকে ‘অপর পক্ষে’ হারালে আমি – এবং আরও অনেকে- ভীষণ কষ্ট পাব। আর এই মুহূর্তে যিনিই ‘অপর পক্ষে’র সঙ্গে নিজের সমীকরণ করবেন, তিনিই চিরকালের জন্য আমাদের মধ্য থেকে সরে যাবেন। আপনি, বলাই বাহুল্য, নিশ্চয়ই বুঝতে পারবেন আমাদের বদলে ও-দলে কী পাবেন – এবং ওখানে কী বিপুল বিনিময় আপনাকে নিবেদন করা হবে; আমি যদি অত্যন্ত বাজে প্রবক্তা না-হই, তাহলে তা পরিণামে অকৃতজ্ঞতা ও বিদ্রুপ হতে বাধ্য। কারণ এখনও যদি কোনো কোনো মহান মানবাত্মা না-জানেন তাঁদের সত্যিকার স্থান কোথায়, ওখানে ওরা ভাল করেই এটা জানে যে কে ওদের দলের নয় মানবাত্মা।

যে-কোনও উত্তর পেলেই আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ হব।

ভবতীয়

ক্লাউস মান

ক্লাউস মান-এর স্পষ্টভাষী চিঠি কতগুলো ব্যাপারকে যে সোজাসুজি তুলে ধরেছিল তাতে সন্দেহ নেই। যেমন, কোনও রাজনৈতিক সাহিত্যের যুক্তিহীন কুশ্রীতার উলটো জের হিসেবেই কি কারও পক্ষে বিপরীত দলে গিয়ে যোগ দেয়া উচিত? বা দলাদলি সাহিত্যের ও চিৎবৃত্তির অনুশীলনের পক্ষে অমঙ্গলকর, কিন্তু এই বোধ থেকে কি কারও একেবারে উলটো দলের সঙ্গে গিয়ে হাত মেলানো উচিত? বাংলাদেশে যে এ-রকম দুঃজনক ডিগবাজি কখনও হয়নি। তা নয়। আজকের পৃথিবীতে নিরপেক্ষতা কেবল বাকছল ছাড়া আর কিছুই নয়, এটা আমরা বুঝতে শিখেছি। অথচ ব্যক্তি হিসেবে, কেউ যদি নামগোত্রহীন হয়ে গিয়ে সমষ্টির একজন হয়ে পড়তে না-চান, কিংবা কারও যদি উলটো-সোজা কোনো বিশ্বাসও না-থাকে, তখন?

গোটফ্রিড বেন তাঁর খোলা চিঠি রচনার কালে ভেবেছিলেন যে তিনি রাজনৈতিক নোংরামির মধ্যে কোনওদিন নামবেন না, যেহেতু সেটা তাঁর সত্যিকার স্থান নয়; সেই জন্যই খোলাখুলি তিনি বলেছেন যে তিনি কোনও পার্টির সদস্য নন-হতেও চান না। কিন্তু নাৎসি-হিস্টিরিয়া থেকে বেরুবার চেষ্টা করেননি বলে তাঁর পরিণাম হল মনস্তাপে ভরা। আর তাঁর খোলা চিঠি থেকেই তাঁর ভুলগুলো আমাদের চোখে পড়ে যায় – অথচ তাঁর শুদ্ধতা থাকে তর্কাতীত। যাবতীয় জাগতিক সমস্যাকে, মানবিক সমস্যাকে কেবল অধিবিদ্যক দৃষ্টিকোণ থেকে লক্ষ করেছিলেন বলেই বোধহয় এটা ঘটেছিল। তাঁর চিঠিটির বয়ান এখানে তুলে দেয়াই ভালো- পাঠক নিজেই কতগুলো জিনিস স্পষ্টভাবে সেখানে দেখতে পাবেন।

গোটফ্রিডবেন-এর খোলা চিঠি (১৯৩৩)

মার্সেইর আশেপাশে কোথাও থেকে আপনি আমাকে লিখেছেন। লিয় উপসাগরের ছোটো-ছোটো বসতি, ৎজুরিখ, প্রাহা, আর পারির হোটেলগুলোয়- আপনি লিখেছেন – তরুণ জর্মনরা- যারা একদিন আমার ও আমার বইয়ের ভক্ত ছিল, আর তারা উদ্বাস্তু; আপনি লিখেছেন, খবর-কাগজ পড়ে আপনাদের দেখতে হয় যে আমি নতুন রাষ্ট্রের তাঁবে আছে বলে ঘোষণা করেছি, দেখতে হয় যে একে আমি সর্বসমক্ষে সমর্থন করি ও বাঁচাবার চেষ্টা করি, দেখতে হয় যে আকাডেমি সদস্য হিসেবে আমি এর সাংস্কৃতিক পরিকল্পনাগুলোয় কোনও প্রতিবাদ করি না। আপনি – সুহৃদ হিসেবে – তার কৈফিয়ৎ চাচ্ছেন এবং বেশ কড়া ভাষায়। আপনি লিখছেন ‘আপনার নাম আমাদের কাছে ছিল উচ্চমানের সমার্থক – তা মোটেই অন্ধতাময় শুচিবাতিকের দৃষ্টান্ত ছিল না – অথচ কীসের প্ররোচনায় আপনি আপনার নাম তাদের ব্যবহার করতে দিলেন, বাকি ইয়োরোপ যাদের একেবারে ত্যাগ করেছে? যে পুরোনো বন্ধুদের আপনি হারাচ্ছেন তাদের বদলে আপনি কাদের পাবেন ওখানে? আপনাকে ওখানে কে বুঝতে পারবে? আপনি হলেন, বুদ্ধিজীবী, অর্থাৎ সন্দেহভাজন – কেউ আপনাকে ওখানে স্বাগত জানাবে না।’ আপনি আমাকে সাবধান করেছেন, হদিশ চেয়েছেন সব-কিছুর, দাবি করেছেন সদুত্তর, বাকছল নয় ‘এই মুহূর্তে যিনি ‘অপর পক্ষে’ থেকে যাবেন, তিনি চিরকালের মতো আমাদের হারাবেন’, এই কথা বলেছেন আপনি। তাহলে দয়া করে আমার উত্তর শুনুন; বলাই বাহুল্য, এটা দ্ব্যর্থহীন, স্পষ্টভাষণ।

এক, প্রথমেই আপনাকে বলা উচিত যে গত কয়েক সপ্তাহের অসংখ্য অভিজ্ঞতা আমাকে নিঃসংশয় করেছে যে জার্মানির ঘটনাগুলোকে যারা জার্মানিতে থেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন, কেবল তাঁদের সঙ্গেই কোনওরকম আলোচনা সম্ভব। যাঁরা এই মাসগুলোর অস্থিরতা ও উত্তেজনার মধ্যে সারাক্ষণ কাটিয়েছেন, যাঁরা একেবারে কাছে থেকে ঘণ্টায়-ঘণ্টায় এই অস্থিরতা ও উত্তেজনা প্রত্যক্ষ ও অনুভব করেছেন, কুচকাওয়াজ থেকে কুচকাওয়াজ, বেতার প্রচার থেকে বেতার প্রচারে, খবরের টুকরো থেকে খবরের টুকরোর মধ্য দিয়ে যাঁরা এই অস্থিরতা বোধ করেছেন, – এমনকি যাঁরা এ-সবকে পরমাহ্লাদে অভিনন্দন জানাননি, বরং ঘা খেতে-খেতে সয়েছেন, কিন্তু কাছে ছিলেন- কেবল তাঁদের কাছেই সব কথা খুলে বলা যায় – কিন্তু যে-সব বাস্তুত্যাগী পালিয়ে গেছেন তাঁদের সঙ্গে নৈব নৈব চ। কারণ তাঁরা কাকে জনগণ বলে, এটা বোঝবার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন; জনগণের সব বোধ ও চেতনা থেকে তাঁরা আমূল বিচ্ছিন্ন – ধীরে ধীরে জীবন্ত অভিজ্ঞতা হিসেবে লোকের মধ্যে এই বোধ গজিয়েছে – চিন্তা হিসেবে নয়, নির্বস্তুক ভাবনা হিসেবে নয় – গজিয়েছে সংহত প্রাকৃতিক শক্তি হিসেবে। কাকে জাতীয়তাবাদ বলে তাকে দেখার সুযোগ তাঁরা হারিয়েছেন। যে-জাতীয়তাবাদকে আপনিও আপনার চিঠিতে অত্যন্ত কদর্য ও ঘৃণ্যভাবে ব্যবহার করেছেন সেই জাতীয়তাবাদ তার নিজস্ব ধারার একটি অকৃত্রিম প্রাকৃতিক অবস্থা। অবয়বময়, মূর্তিময়, ইতিহাস কী করে একটা ট্র্যাজিক কিন্তু নিয়তিনির্দিষ্ট রূপ নেয়, তার প্রক্রিয়াকে দেখবার সুযোগ হারিয়েছেন তাঁরা। এবং এখানে আমি ঘটনাগুলোর জমকালো ও রমরমে দিকগুলোর কথা বলছি না, মশাল ও গানের বিশ্বধর্মী মোহসৃজনক্ষমতা সম্বন্ধে বলছি না – বলছি তার গভীর ও অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার কথা, তার সৃষ্টিশীল অভিজ্ঞতার কথা, যা এমনকী এই প্রাথমিক ও অস্থির পর্যবেক্ষকের কাছেও উদ্দীপক মানবিক রূপান্তর ঘটাতে চাচ্ছে।

একমাত্র এই কারণেই বোধহয় আমরা পরস্পরকে বুঝতে পারব না। কিন্তু আরেকটা সমস্যাতেও এসে এই অনুধাবনচেষ্টা হোঁচট খাবে – আপনাদের গোষ্ঠীর সঙ্গে অনেক বছর ধরেই একটা তাত্বিক বিষয় নিয়ে মতভেদ ছিল, যেটা হঠাৎ এখন এমন হৃদয়হীনভাবে তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে যে প্রত্যেকের কাছ থেকেই সোজাসুজি ও স্পষ্টাস্পষ্টি উত্তর চাচ্ছে। আমাদের আলোচনার সব চেয়ে ভাল দৃষ্টিকোণ হল ‘বর্বরতা’ কথাটাকে বিবেচনা করে দেখা – যে-কথাটা আপনার চিঠিতে – ও আমার-কাছে-আসা আরও অনেক চিঠিতে- বারে-বারে ব্যবহৃত হয়েছে। আপনি ব্যাপারটাকে এমনভাবে দেখিয়েছেন যে জার্মানিতে এখন যা ঘটছে তা যেন সংস্কৃতির মূলোচ্ছেদ করতে চাচ্ছে, চাচ্ছে সভ্যতারই সর্বনাশ, যেন এক দঙ্গল বর্বর জমায়েৎ হয়ে মানবতার আদর্শকে প্রচণ্ড ও উপর্যুপরি আধাত ক’রে যাচ্ছে। কিন্তু উলটো আমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করতে দিন ইতিহাসের প্রবাহকে আপনারা কীভাবে দ্যাখেন? তাকে কি ফরাসি দেশের সমুদ্রতীরের স্নানার্থীদের মতোই বিশেষভাবে সক্রিয় বলে ভাবেন? যেমন ধরুন, আপনারা দ্বাদশ শতাব্দীকে কী চোখে দ্যাখেন – রোমানেস্ক থেকে গথিক ধরনের জীবনে এসে পৌঁছাবার সেই জ্বলন্ত দিনগুলোকে কীভাবে প্রত্যক্ষ করেন আপনারা- এই রূপান্তর কি আলোচনানির্ভর ছিল? আপনি কি ভাবছেন যে যে-দেশের দক্ষিণ প্রান্ত থেকে আপনি চিঠি লিখছেন তার উত্তর ভাগে কেউ-একটা নতুন স্থাপত্যরীতি ভেবে ফেলেছে, যা গম্বুজ সম্বন্ধে ‘মনস্থির’ করে ফেলেছে তা বর্তুল হবে না, বহুভুজ সম্বল হবে, না কি লোকে ভোট দিয়ে ঠিক ক’রে ফেলেছে যে এর পর থেকে সব খিলেন গোল বা ছু’চলোভাবে বানানো হবে? আমার মনে হয় ইতিহাস সম্বন্ধে আপনি উপন্যাসপ্রতিম ভাবনাগুলো ছেড়ে দিয়ে ইতিহাসকে একেবারে আদিম ও আবেগতাড়িত একটা অপ্রতিরোধ্য প্রাকৃতিক বিকাশ বলে ভাবলে ভালো করবেন। তোষাখানায় দাখিল-করা একটি হিসেব খাতা-এইভাবে উনিশশতকি বুর্জোয়া মস্তিষ্কপ্রসূত সৃষ্টিরূপে ইতিহাসকে দেখা ছেড়ে দিলে আপনি জর্মন ঘটনাগুলোর কাছাকাছি আসতে পারবেন বলে মনে হয় – আপনার কাছে সে-চিন্তাধারার কোনও ঋণ নেই, কিন্তু আপনারা তো তার কাছে বিকিয়ে বসে আছেন। ইতিহাস ভারী অদ্ভুত বস্তু – সে না জানে আপনাদের গণতন্ত্র, না জানে আপনাদের কষ্ট করে টিকিয়ে-রাখা যুক্তিবাদ; তার না আছে কোনো পূর্বকল্পিত পদ্ধতি, না আছে কোনো বিশেষ শৈলী – কেবল তার মোড় ফেরার মুহূর্ত ও বাঁকগুলোয় জাতির অনবসাদ গর্ভ থেকে প্রসব করে এক নতুন মানব জাতিরূপ নিজের পথ যাকে নিজেকেই লড়াই করে নিতে হয়, যাকে উপার্জন ক’রে নিতে হয় তার নিজের যুগের ভাবনাকে, নিজেকে প্রবিষ্ট করাতে সব সময়ের গ্রন্থনার মধ্যে – জীবনের বিধান যা দাবি করে সেই অটল কর্মোদ্যোগ, ও যন্ত্রণাই তার সর্বস্ব। এটা আধিবিদ্যক দৃষ্টিভঙ্গি – এবং মানুষকে আমি যেভাবে দেখি তাতে তা হয়তো আরও বেশি আধিবিদ্যক। আর সেখানেই আমরা আমাদের পুরোনো বিরোধের একেবারে অন্তঃস্থলে প্রবিষ্ট হলুম-যখন আমি যুক্তিহীনতার জন্য লড়াই করছি বলে আপনি আমাকে সোপর্দ করেছেন।

আপনার চিঠি অনুযায়ী ধাপগুলো এই রকম ‘প্রথমে কেউ যুক্তিহীনতার গুণগান করে, তারপরে বর্বরতার আর তারপরেই দ্যাখে যে আডোলফ হিটলারের পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।’ এ-কথা আপনি এমন একটা সময়ে লিখেছেন যখন মানুষ সম্বন্ধে আপনাদের সুবিধাবাদী প্রগতিশীল ভাবনা দূরে-কাছে সবখানেই প্রকাশ্য দিবালোকে দেউলে হয়ে গিয়েছে; যখন এটা চারিদিকেই স্বতঃপ্রমাণ হয়ে উঠেছে যে এটা একটা অন্তঃসারশূন্য, চপল প্রমোদবিলাসী চিন্তাধারা, যখন এটা নিঃসংশয় যে মানব-ইতিহাসের কোনও সত্যিকার মহাযুগই কখনো মানবিক সারাৎসারকে যুক্তিহীনতা ছাড়া অন্য কোনওভাবে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেনি – কারণ যুক্তিহীনতা মানেই হল সৃষ্টিমুহূর্তের নিকটবর্তী ও সৃজনক্ষম। আপনাদের ওই লাতিন বেলাভূমিতে বসে আপনারা কি শেষ মুহূর্তেও অনুধাবন করবেন না যে জার্মানির ঘটনাগুলো মোটেই রাজনীতির হাতসাফাই নয়, যাকে দুমড়ে-মুচড়ে কথা বলে সুপরিজ্ঞাত দ্বন্দ্বমূলক ধরনে মেরে ফেলা যাবে – বরং জার্মানির ঘটনাগুলো হল নতুন এক জীববিদ্যাসম্ভব জাতিরূপে উদ্ভব-ক্ষণ, ইতিহাসের একটা সম্ভাবনার স্ফূর্তি, নিজেকে উৎপন্ন করার জন্য জনগণের একটি উৎকাঙ্ক্ষা! এটা সত্যি যে এই প্রজনচিন্তার মধ্যকার মানবরূপ তাকেই গন্য করে যা যুক্তিবাদী হলেও, যেমন পৌরাণিক, তেমনি গভীর। এটাও সত্যি যে তার ভবিষ্যৎ ভাবা হচ্ছে প্রায় গুঁড়িশুদ্ধ ছেঁটে দিয়ে কলম ক’রে ফেলবার মতো করে – কারণ মানুষ ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও প্রাচীন আর আলোকপ্রাপ্ত, যা বিশ্বাস করেছিল তার চেয়েও শ্রেণীবিন্যস্ত। সত্যি যে তাকে প্রধানত প্রকৃতি হিসাবেই বিবেচনা করা হচ্ছে, সৃজনক্ষণের নিকটবর্তী বলে অনুভব করা হচ্ছে- কারণ এটা তো মানতেই হবে যে যতটা ভেবেছিলুম মানুষকে তার চেয়েও কম স্বাধীন বলে প্রত্যক্ষ করছি – অন্তত তথ্য ও সত্যের ২০০০ বছরের পুরোনো দ্বন্দ্ব মনে রেখে তাকালে যা দেখাত তার চেয়েও বেদনাদায়কভাবে সে অস্তিত্বের মূলের সঙ্গে জড়ানো। আসলে সে হল শাশ্বত চতুর্যোজী (quaternary) এমনকি অন্তিম তুষারযুগেও সে সুরম্যভাব বয়ন করে রেখেছিল দলবদ্ধভাবে ঘূর্ণ্যমান, মানবগোষ্ঠীর ইন্দ্রজাল, বিশ্বপ্লাবনকালীন চেতনার একটি গ্রন্থনা, ‘টারশিয়ারি’, যুগের টুকিটাকির সমষ্টি; বস্তুত সে হল চিরকালীন আদি পরাদৃষ্টি জাগরণ, জাগরজীবন, সত্তা- সংগোপন সৃষ্টিশীল উন্মাদনার শিথিলগ্রথিত ছন্দ। আপনারা যারা সভ্যতার শৌখিন বাবুমশাই, প্রতীচী প্রগতির চারণকবি, আপনারা কি শেষমুহূর্তেও এটা অনুধাবন করবেন না যে এখানে যা বিপন্ন সেটা কোনো সরকার বা রাষ্ট্রাযন্ত্র নয় – বরং মানুষ্যজন্মের এক নতুন পরাদৃষ্টি – হয়তো তা প্রাচীননস্য প্রাচীন, হয়তো তা শ্বেত জাতির শেষ ‘জমকালো’ চেতনা – সম্ভবত মহাজাগতিক ঐক্যচেতনার এটা অন্যতম শ্রেষ্ঠ অনুভূতি, গ্যেটের নিসর্গস্তোত্রে যার পূর্বাভাস ছিল! এবং আপনারা কি এটাও মানবেন না যে কোনো সাফল্য, কোনো সামরিক বা শিল্প সংক্রান্ত প্রতিক্রিয়া এই পরাদৃষ্টির কী নিয়তি তা স্থির করতে পারবে না। যদি প্রাচী ও প্রতীচী থেকে এই জর্মন জাতিকে চূর্ণ করার জন্য দশ-দশটা যুদ্ধ বেধে যায়, যদি তার শীলমোহর ভেঙে ফেলে জলেস্থলে আপকালিপসও আসন্ন হয়, তবু মানুষের এই পরাদৃষ্টি আমাদের থেকেই যাবে- এবং যিনি তা সম্ভাবনা থেকে বাস্তবের স্তরে উন্নীত করাতে চাইবেন না তাঁকেই এর প্রজয়িতা হতে হবে; এবং এত বড় বিধিসংগত ঐতিহাসিক অস্তিত্বের কাছে সভ্যতা ও বর্বরতা সম্বন্ধে আপনার ভাষাতাত্বিক তদন্ত শেষপর্যত হাস্যকর হয়ে ওঠে।

কিন্তু দর্শন ছেড়ে দিয়ে আমরা বরং রাজনীতির দিকেই তাকাই পরাদৃষ্টি ত্যাগ করে, বরং অভিজ্ঞতা ও বাস্তব ঘটনার মুখোমুখি দাঁড়াই। তথ্য হল আপনার সৈকতে বসে আমাদের কাছে কৈফিয়ত চাচ্ছেন কেন আমরা একটি রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সহযোগিতা করছি, যে রাষ্ট্র তার বিশ্বাসে অটল, যার নিষ্ঠা অনুপ্রাণিত; এবং যার আভ্যন্তরীণ ও বহির্পরিস্থিতি এতই ভীষণ যে তার নিয়তির কথা বর্ণনা করতে ইলিয়ড-এর পর ইলিয়াড, ইনিদ-এর পর ইনিদ লেগে যাবে। সব বৈদেশিক রাষ্ট্রের আগে আপনারা এই রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য যুদ্ধ, ধ্বংস, বিনাশ ও সর্বনাশ চাচ্ছেন। যে-জাতির ভাষা আপনাদের মুখে, যার বিদ্যালয়ে আপনারা লেখাপড়া করেছেন, যার জ্ঞানবিজ্ঞান শিল্পসাহিত্যের চর্চার দ্বারা আপনাদের মনকে সমৃদ্ধ করেছেন, যার মূদ্রাযন্ত্র আপনাদের গ্রন্থ মুদ্রণ করেছে, যার মঞ্চ উপস্থাপিত করেছে আপনাদের নাট্য সৃষ্টি, যে-জাতি আপনাদের খ্যাতি ও সম্মান দিয়েছে, যে-দেশের লোক সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় আপনাদের রচনাবলি পড়ুক বলে আপনারা কামনা করেন, সে-দেশে ও সে-জাতির মধ্যে আপনারা যদি থেকে যেতেন তবে এই সময়েও সে-দেশ আপনাদের বিশেষ ক্ষতিসাধন করত বলে মনে হয় না। কাজেই আপনারা তাকিয়ে আছেন সেই সমুদ্রের দিকে, যার ঢেউ আর জল আফ্রিকা পর্যন্ত ছড়িয়ে আছে- হয়তো কোনও মানোয়ারি জাহাজ নিগ্রো সেনাবাহিনী নিয়ে সেই সমুদ্রের কোথায়ও এখন বিচরণ করছে, কুখ্যাত ফরাসী forces d’ourtremer ৬০০০০০ ঔপনিবেশিক পল্টনেরই হয়তো এক অংশ রয়েছে সেই জাহাজে যারা জার্মানির বিরুদ্ধে অভিযানে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ, অন্যরা হয়তো তাকিয়ে আছেন আর্চ অভ ট্রায়াম্ভ বা হ্রাডকানি কাসল-এর দিকে, এ-দেশের উপর প্রতিহিংসা নেবে বলে বদ্ধপরিকর; কেন-না, যাকে একযোগে এই বিপুল বিদেশ আত্মিকভাবে কেবল শোষণ করেই এসেছে এই জার্মানি তার ভবিষ্যৎকে নিরাপদ করা ছাড়া যেহেতু আর-কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য গ্রহণ করেনি।

চিঠিতে আপনি লিখেছেন যে এখনই আপনি ‘প্রকৃত মার্কসিস্ট হয়েছেন’ -কিন্তু এখন ‘অশালীন মার্কসবাদ’ বা বস্তুবাদের কোনও নালিশ বা নিগ্রহই আপনাকে আমাদের ‘স্নায়ুতাড়িত পশুত্বাচরণের’ বিরুদ্ধে লড়াই করা থেকে বিরত করতে পারবে না; আরও যে এখন আপনি পুরোপুরি ‘মানবাত্মার’ পক্ষে এবং ‘রাজনৈতির প্রতিক্রিয়া’র বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। এই কথাগুলোর দ্বারা আপনি যে কী বোঝাতে চাচ্ছেন, তা আমি ঠিক বুঝতে পারছি না – মনে হচ্ছে যেন ভূবিদ্যায় উল্লিখিত কোনও বহুপ্রাচীন যুগের কথা শুনছি; হয়তো জিজ্ঞেস করতে পারি আপনাদের যে-দেশে মার্কসবাদ জিতে গেছে, আপনি সে-দেশের ২০০০০০০ বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করার স্নায়ুতাড়িত পশুত্বাচরণের কথা বলছেন কি না। কিন্তু আমি ধরে নিচ্ছি আপনি সমাজবাদের কথা বলছেন, এবং সত্যিই, গত কয়েক বছরে জর্মন শ্রমিকদের অধিকার ও স্বার্থ বর্তমানে প্রবাসী অগ্রণী জার্মানির চিন্তানায়কদের দ্বারা সমর্থিত হয়েছে – সবচেয়ে অকৃত্রিম ও স্পষ্টভাবে এবং বারে-বারে টমাস মান দ্বারা। এ-সম্বন্ধে আমি বলতে পারি যে জার্মানির শ্রমিকরা আগের চেয়ে অনেক ভালো আছে। আপনি জানেন চিকিৎসক হিসেবে আমাকে নানাস্তরের লোকের সংস্পর্শে আসতে হয়, সামাজিক বীমা চিকিৎসক হিসেবে বহু শ্রমিকের সঙ্গেও আমার চেনা আছে- প্রাক্তন কমিউনিস্ট ও সোস্যাল ডেমোক্রাটরাও আমার পরিচিত। সন্দেহ নেই- যেহেতু এদের প্রত্যেকের কাছ থেকেই আমি নিজে শুনেছি – তারা আগেকার চেয়ে অনেক ভাল আছে। কারখানায় আগের চেয়ে ঢের ভাল ব্যবহার পায় তারা, সুপারভাইজাররা আরো সতর্ক, কর্তৃপক্ষ অনেক ভদ্র; শ্রমিকদের ক্ষমতা এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি, আগের চেয়ে তাঁরা অনেক বেশি সম্মান পায়, কাজ করে অনেক ভালো মেজাজে-সুনাগরিকের ভঙ্গিতে – এবং সোস্যালিস্ট পার্টি তাদের যা দিতে পারেনি এই জাতীয়তাবাদী সমাজবাদ তাদের তা-ই দিয়েছে; দিয়েছে জীবনের একটা অর্থপূর্ণ উদ্দেশ্যময় চালনশক্তির বোধ। এটাও নিশ্চিত জানবেন এই নবীন শক্তি দ্বারা শ্রমবিজয়ের অভিযান চলবেই, কারণ জর্মন জাতীয়তাবাদী সংঘ কোনো ক্ষণস্থায়ী, আগুনশ্বাসী অর্থসিংহ অর্ধছাপ কল্পনা নয়, আর পয়লা মে তারিখটা পুঁজিবাদীদের কোনো ছদ্মবেশী ধূর্তকৌশল বা ধাপ্পা নয়। জানেন না এটা কত বড় দাগ কেটেছে, কী বিপুল এর অকৃত্রিমতা, হঠাৎ কাঁধের জোয়াল সরিয়ে ফেলছে শ্রমিক, গত দশকগুলোয় সর্বহারাদের দুঃখযন্ত্রণার যে শাস্তিমূলক বৈশিষ্ট্য ছিল-আচম্বিতে তা সবে গেছে এখন। তার বদলে বরং এই নতুন চেতনা দাঁড়িয়ে আছে একটি নবগঠিত শ্রেণীবিলোপকারী গোষ্ঠীর একেবারে বুনিয়াদের উপর। কয়েক দশক ধরে ইয়োরোপে সমাজবাদের যে-হাওয়া উঠেছিল, এই ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দ সেই চেতনার একটা স্পষ্ট, নবীন ও সতেজ চেহারা নিয়েছে। মানবাধিকারের অন্তত একটি অংশকে এই বছর নতুনভাবে ঘোষণা করেছে; আর আপনার ‘রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া’ কথাটার অর্থ যদি কোনওভাবে এই হয় যে আপনি শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার ও স্বার্থের জন্য লড়তে চাচ্ছেন, তাহলে আপনার উচিত এই নতুন রাষ্ট্রে এসে যোগ দেয়া – একে অবমানিত করা নয়।

সব শেষে অবিশ্যি আপনি ব্যক্তি হিসেবে আমাকেও সম্বোধন করেছেন। আমাকে প্রশ্ন করেছেন, সাবধান করেছেন, ভাষা সম্বধে আমার মৌলিক ধারণার বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে সন্ধানী জিজ্ঞাসা উপস্থিত করেছেন – যে-মৌল বৈশিষ্ট্য সম্বন্ধে কিছু বলতে গেলেই অপর পক্ষের ঠাট্টা-টিটকিরি আর-কিছুই জুটবে না; এবং আরও জিজ্ঞেস করেছেন যে এই মুহূর্তে ‘আপনাদের দলে’ আছেন এ-রকম ক-জন সাহিত্যস্রষ্টা সম্বন্ধে আমার কতটুকু শ্রদ্ধা আছে। এই আমার উত্তর আলেমান ভাষায় যাঁকেই আমার আদর্শ ও শিক্ষণীয় বলে বোধ হয়েছে, তাঁকেই আমি চিরকাল শ্রদ্ধা করে যাব; এমনকি লুগানো ও লিগুরিয়ান সমুদ্রের জলে ডুবতে ডুবতেও তাঁকে আমি শ্রদ্ধা নিবেদন করব। কিন্তু আমি, ব্যক্তিগতভাবে এই নতুন রাষ্ট্রের পক্ষেই নিজেকে যুক্ত করেছি, কেননা যেহেতু আমারই দেশের মানুষ এই অগ্নিকাণ্ডে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে, তখন আমি কে, যে নিজেকে তাদের ভাগ্য থেকে আলাদা করে নেব? আমি কি বেশি জানি তাদের চেয়ে? না। আমি কেবল আমার সর্বশক্তি দিয়ে তাদের পথ দেখাবার চেষ্টা করতে পারি, কোন পথে গেলে ভালো হয় বলে দিতে পারি; আমি যদি হেরেও যাই, আমার সব চেষ্টাই যদি ব্যর্থ হয়, তবুও এরা আমারই দেশের মানুষ থেকে যাবে। আর দেশের মানুষ মানে অনেকখানি। আমার মেধা ও আর্থনীতিক অস্তিত্ব, আমার ভাষা, আমার জীবন, আমার যাবতীয় মানবিক সম্পর্ক, আমার মস্তিষ্কের সমস্ত যোগফল- সব আমি দেশের মানুষের কাছ থেকে পেয়েছি। এই জনগণেই খুঁজে পাই আমাদের পূর্বপুরুষদের; জনগণের মধ্যেই ফিরে যায় আমাদের শিশুরা। আর আমি গ্রামাঞ্চলে প্রকৃতির কোলে বড় হতে হতে জেনেছি- এবং এখনও জানি – ‘স্বদেশ’ বলতে সত্যি কী বোঝায়। বড় নগর, শিল্পায়ন, বুদ্ধির চর্চা – সময় আমার চিন্তার উপর যত ছায়াই ফ্যালে, আমার কাজের মধ্য দিয়ে শতাব্দীর যত শক্তির সঙ্গে আমাকে মুখোমুখি হতে হয়েছে- সব সত্বেও তেমন মুহূর্ত মাঝেমাঝে আসে যখন এই যন্ত্রণাবিদ্ধ জীবন কোথায় মিলিয়ে যায়, শুধু থাকে বিস্তীর্ণ প্রান্তর, ঋতুর দল, মাটি পৃথিবী, সরল সাদাসিদে কথার টুকরো মানুষ, জনগণ। আপনার মতে সারা পৃথিবী যাকে মোটেই পাত্তা দিচ্ছে না, তারই সেবায় সেই জন্যই আমি নিজেকে নিয়োগ করেছি। আর, এই ইয়োরোপ! তার বড়-বড় অনেক মূল্যবোধ থাকতে পারে বটে, কিন্তু যেখানে সে উৎকোচ দিতে পারে না বা গুলি মেরে চুপ করিয়ে দিতে পারে না, সেখানে তার চেহারা, সত্যিই, করুণা জাগায়। এখন সে আপনাদের কানে মন্ত্র দিচ্ছে যে হিটলার-এর পিছনে জনগণ নেই, আছে কেবল তার ‘ভেড়ার পাল’ – এই সেদিনও নিউজ ক্রনিকল-এ লেডি অক্সফোর্ড যে-কথা লিখেছেন। মস্ত ভুল! জনগণই এরা! হিটলার আর নাপোলিয়ঁ – এই দুই বিরাট ব্যক্তিত্বকে একবার তুলনা করে দেখুন। সন্দেহ নেই নাপোলিয়ঁ ছিলেন একটি অসামান্য প্রতিভা – ফরাসিরা দেশসুদ্ধ জনগণসুদ্ধু পিরামিড জয় করতে বেরোয়নি, তারা যে পলটনে সারা ইওরোপ ছেয়ে ফেলেছিল, তার কারণ অন্য কিছু নয়, কেবল সেই বিশাল সামরিক প্রতিভাই তাদের চালিত করেছিলেন। কিন্তু এখানে আজ আপনি বারে-বারে প্রশ্নটা মাথা চারা দিচ্ছে দেখতে পাবেন হিটলারই আন্দোলনের স্রষ্টা, না কি তিনি আন্দোলনের সৃষ্টি। খুবই তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন – কারণ এই থেকেই বোঝা যায় উভয়কে মোটেই ভিন্ন করে দেখা যায় না – তারা অভেদ্য। এখানেই আমরা সত্যি করে পাই ব্যক্তি আর সমষ্টির সেই ঐন্দ্রজালিক সমাপতন, বুর্খাট তাঁর বিশ্ব-ইতিহাসের নীরিক্ষায় বিশ্ব-ইতিহাসের প্রবাহের মধ্যে জগতের বিপুল ব্যক্তিত্বগুলির উপর যেটা আরোপ করেছেন। জগতের বিপুল ব্যক্তিত্ব – সব এখানে দেখা যাবে জন্মমুহূর্তের ঝড়ঝাপটা, কেবল ভীষণ সময়েই প্রায় সর্বদা তাঁদের আবির্ভাব; সেই প্রচণ্ড সহ্যশক্তি; এমনকি জৈব দিকগুলি সব বৃত্তিরই এক অস্বভাবী উপযোগিতা; কিন্তু শুধু তা-ই নয়, এখানকার তাবৎ চিন্তাশীল ব্যক্তির এই ধারণা যে এখানেই কেবল সেই ব্যক্তি আছেন, যিনি সমস্ত আবশ্যিককেই পূরণ করতে পারবেন এবং যা কিনা শুধু তাঁরই দ্বারা সম্ভব। আমি যা বলছি, শুনে রাখুন আপনি এবং সব চিন্তাশীল ব্যক্তিই জানেন যে চিন্তাশক্তিকেই আমি সর্বোচ্চ স্তরে স্থান দিই। ‘চিন্তার দ্বারা যা স্বীকার্য নয়, তাকে তত্বগত সম্মতি দিতে অস্বীকার করা একটা প্রচণ্ড ও প্রশংসনীয় জেদের পরিচায়ক’- হেগেল-এর এই কথাগুলো দিয়েই আমি সব সময় আমার রাজনৈতিক আবেগকে যাচাই করে দেখেছি। সেইজন্যই, নিজেকে প্রতারিত না-করে, বিশ্বাস করুন যে ইয়োরোপ আপনার কানে-কানে যা-ই বলুক, এই আন্দোলনের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মানুষ, যারা শান্তি ভালোবাসে, কাজ করতে উৎসুক, এবং দরকার হলে ধ্বংস হয়ে যেতে প্রস্তুত।

এমন-কিছু দিয়ে আমার কথা শেষ করছি যা আপনি দেশান্তরে – যদি এতদূর অবধি পড়ে থাকেন- নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন; আমি পার্টিতে নাম লেখাইনি, পার্টির নেতাদের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ নেই, এবং নতুন বন্ধুদের উপর আমি মোটেই নির্ভর করি না। আমার দৃষ্টিভঙ্গিকে নিয়ন্ত্রিত করেছে আমারই অন্ধতাময় শুচিবাতিক, আমারই চিন্তা ও অনুভূতির শুষ্কতা, যার কথা আপনার পত্রে উল্লেখ করে আপনি আমাকে সম্মানিত করেছেন। যাঁরাই ইতিহাস নিয়ে ভেবেছেন, তাঁদের সকলের মধ্যেই আপনি এরই বনিয়াদ দেখতে পাবেন। একজন বলেছেন, ‘বিশ্ব-ইতিহাস মোটেই সুখের নয়’ (ফিখটে); আরেকজন ‘ব্যক্তির সুখস্বাচ্ছন্দ্য বা সর্বাধিকসম্ভব গোষ্ঠীসুখের কথা চিন্তা নাকরেই সব জাতি যেন কতগুলো জলজ্যান্ত প্রবণতাকে সামনে তুলে ধরে, (বুর্খার্ট); তৃতীয় একজন ‘মানুষের ক্রমবর্ধমান হ্রস্বীকরণই তাকে বলিষ্ঠতম কোনো জাতির প্রজননবিষয়ে ভাবাচ্ছে, এবং ‘কোনো শ্রেষ্ঠ জাতির উদ্ভভ হতে পারে কেবল ভীষণ ও সংক্ষুব্ধ সূচনা থেকেই। সমস্যা বিংশ শতাব্দীর সেই বর্বরেরা কোথায়’ (নিটৎশে)। ব্যক্তিবাদী ও উদারনৈতিক যুগ এ-সব কতা সম্পূর্ণ ভুলে বসেছিল; তা ছাড়া ধীশক্তি ও মেধা দিয়ে একে দাবি হিসেবে গ্রহণ করা ও এর রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়াগুলো প্রত্যক্ষ করা তার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কিন্তু বিপত্তি জেগে ওঠে আচম্বিতে, অতর্কিতে আঁটো হয়ে ওঠে সংঘ ও সম্প্রদায়, আর সবাইকেই, সাহিত্যিদের সুদ্ধু, ঠায় দাঁড়িয়ে বেছে নিতে হয় কী তিনি নেবেন – ব্যক্তিগত খেয়ালখুশি, নাকি রাষ্ট্রাভিমুখী গতিপথ। আমি বেছে নিয়েছি শেষেরটাই – এবং এই রাষ্ট্রের জন্যই যদি আপনি আপনার সিন্ধুতীর থেকে বিদায় জানান, তাহলে তা আমি গ্রহণ করতে বাধ্য।

বেন-এর চিঠি থেকে বোঝা যাচ্ছে যে ক্লাউস মান-এর কতগুলো কথা তিনি সঠিক ধরতে পারেন নি। কারণ ‘ক্লাউস মান লিখেছিলেন ‘জর্মন লেখকসম্প্রদায়ের মধ্যে ‘মার্কসবাদী’ শ্রেণির প্রতি আপনার ঘৃণা কত ভালো করে আমি বুঝতে পেরেছিলুম-কতবার আমি নিজেই তা আপনার সঙ্গে-সঙ্গে ভাগ করে নিয়ে বোধ করেছি। কী দুর্বুদ্ধিতা এঁদের…সমাজতত্বঘটিত উপকরণ দিয়ে এঁরা কিনা কবিতাকে বিচার করতে চান। কাউকে পীড়িত করার পক্ষে তা-ই ছিল যথেষ্ট- আর এঁদের হাতে আমার মতো নির্যাতিত ও নিপীড়িত আর কেউই হননি…।’ ক্লাউস মান কেবল বলতে চেয়েছিলেন যে নাৎসিবাদকে আলিঙ্গন করার জন্য সেটা কোনও কারণই নয় ‘আগে জানতুম না, কিন্তু এখন স্পষ্ট করে জানি আমার সত্যিকার স্থান কোথায়। কোনও মার্কসবাদী অশ্লীলতাই আর আমাকে উত্যক্ত করতে পারবে না। কারণ আমি জানি যে কাণ্ডজ্ঞান যাকে সমর্থন করে তাকে আকাঙ্ক্ষা করার জন্য আর মনপ্রাণ দিয়ে কোনও স্নায়ুতাড়িত পশুত্বাচরণকে ঘৃণা করবার জন্য কাউকে কোনো স্থূল ‘জড়বাদী’ হতে হয় না।’ এই কথাগুলো সত্বেও যেন ভেবেছিলেন ক্লাউস মান বুঝি কমিউনিস্ট হয়ে গেছেন। কিন্তু ক্লাউস মান যার উপর জোর দিয়েছিলেন সেটা কাণ্ডজ্ঞান, যুক্তিবোধ – কোনও মতবাদের প্রতি অন্ধ ও জড় অনুগত্য নয়।

আরও কতগুলো দিক লক্ষ করা যেতে পারে। মনে করার কোনও কারণ সেই যে বেন ছিলেন আপোগণ্ড নিঃসাড় মানুষ – তাঁর কবিতা ও রচনাবলি তার উলটো সাক্ষী দেয়। এই তীব্র চিঠি থেকেই বোঝা যাবে হিটলারকে তাঁর মনে হয়েছিল জর্মন জাতির ত্রাণকর্তা। শুধু তাঁর নয়, তৎকালীন অনেক শিল্পীর। হ্বিলহেল্ম ফুর্টহ্ব্যাঙলার, যিনি ছিলেন জার্মানির সিমফনি-অর্কেস্ট্রার সবচেয়ে সেরা ‘কমপোজার’ বা সংগীত-রচয়িতা রিখার্ড স্ট্রাউস নাৎসি-বর্বরতার সমর্থনে দাঁড়িয়েছিলেন। গেরার্ট হাউপ্টমান, আধুনিক নাটকের স্রষ্টাদের যিনি শীর্ষস্থানীয়, তিনিও তৎকালে জর্মন শাসকদের তাঁবেদারি করেছিলেন। জার্মানির সবচেয়ে জনপ্রিয় অভিনেতা ও পরিচালক গুস্টাফ গ্রয়ন্ডগেন্স, ‘ম্যাটিনি-আইডল’ হেবারনের ক্রাউস, সবচেয়ে প্রিয় নক্ষত্র এমিল ইয়ানিঙস-এঁরা প্রত্যেকে তা-ই করেছিলেন। হাউপ্টমান নিজে তো একদা ছিলেন মার্কসবাদেরই সমর্থক-তাঁর এই ডিগবাজি সবচেয়ে বিস্ময়কর। সবাই ধাপ্পায় ভুলেছিলেন? কিন্তু ব্যাপারটা কি এতই সোজা? তাহলে নেন-এর মন্ত্রমুগ্ধ, দ্ব্যর্থহীন, আবেগপ্লুত ও তীব্র চিঠিটিকেও আমাদের ধাপ্পা বলে গ্রহণ করতে হয়। কিন্তু ইতিহাস অনুসরণ করলে বোঝা যায় যে এটা মোটেই ধাপ্পা ছিল না-বা তাঁরা ধাপ্পায় ভোলেননি। বরং, সত্যি করে বলা ভালো, তাঁরা ভুল করেছিলেন। বেন-এর আত্মচরিত ‘দুই জীবন’-এ তারই স্বীকৃতি লক্ষণীয়। বেন নাৎসি ছিলেন না। কোনওদিন পার্টিতে নাম লেখাননি, যতদূর জানা যায় স্বপ্নেও পার্টিতে যোগদান করার কথা ভাবেননি, ১৯৩৩-এ যখন প্রতিটি জর্মন দশ মিনিটি অন্তর নিজেদের নাৎসি বলে ঘোষণা করত, তখনও না – তবে কেন এই ‘নতুন রাষ্ট্রের’ জন্য তাঁর ঐকান্তিক ঘোষণা। তাঁর বন্ধুরা বলেন বামপন্থী সাহিত্যিকদের সাফল্য ও প্রভাবের সেটা প্রতিক্রিয়া। কিন্তু বেন চিরকালই, জার্মানির চরম দুঃখের দিনেও, সাফল্য ও স্তবস্তুতির দিকে ফিরে তাকাননি। খানিকটা মারটিন লুথারের ভঙ্গি বোধ হয় ‘ইখ কান নিখট আনডেরস’-‘আমি অন্য রকম করতে পারতুম না’; ছিলেন লুথারীয় পাদ্রির ছেলে, লুথারেরই প্রতিধ্বনি শোনা যায় না কি তাঁর কথায়, যখন ক্লাউস মানকে তিনি বলেন ‘আমারই দেশের মানুষ এই অগ্নিকাণ্ডে ভস্ম হয়ে যাচ্ছে, তখন আমি কে, যে নিজেকে তাদের ভাগ্য থেকে আলাদ সর্বশক্তি দিয়ে তাদের পথ দেখাবার চেষ্টা করতে পারি, কোন পথে গেলে ভাল হয় বলে দিতে পারি… দেশের মানুষ মানে অনেকখানি… ইয়োরোপের আপনার কানে কানে বলে দিয়ে যাচ্ছে জনগণ হিটলারের পিছনে নেই…মস্ত ভুল!… এই আন্দোলনের পিছনে দাঁড়িয়ে আছে সমগ্র মানুষ – এমনকি পিষে মরার জন্যও তারা প্রস্তুত…।’ আর এই জন্যই, দেশের চরমতম দুর্দিনে, বেন সম্ভবত স্বদেশ ত্যাগ করতে পারে নি।

এই চিঠি গ্যেববেল নানাভাবে সম্প্রচার করলেন, বারে-বারে বেতারে তা শোনানো হল – এমনকী যেন যখন শিল্পীসত্তার জন্য নাৎসিদের হাতে নির্যাতিতও হচ্ছেন, তখনও।

এবং এইভাবেই কেটে গেল বারো বছর।

বেরলিনের পতনের পর জর্মন কবিতা-আকাডেমির প্রাক্তন সভাপতি হ্বালটের ফোন মোলো – তিনি নিজে একজন মাঝারি পর্যায়ের কবি – ক্যালিফরনিয়ার উপকূলে পত্রযোগে টমাস মানকে স্বদেশে ফেরবার আবেদন জানালেন। উত্তরে মান যা লিখেছিলেন, এই দ্বিতীয় ঐতিহাসিক চিঠি তাই। নিচে তার সম্পূর্ণ বয়ান প্রকাশ করা হল।

টমাস মান-এর খোলা চিঠি (১৯৪৫)

প্রিয় হের ফোন মোলো,

আমার জন্মদিনে আপনি যে প্রীতিপূর্ণ শুভেচ্ছা পাঠিয়েছেন, তার জন্য-এবং জার্মানির খবর-কাগজে প্রকাশিত আমার উদ্দেশ্যে লেখা খোলা চিঠির জন্যও-আপনাকে ধন্যবাদ জানাই; আপনার সেই খোলা চিঠি মার্কিন কাগজগুলোতেও অংশত পুনর্মুদ্রিত হয়েছে। ওই খোলা চিঠিতে আপনি অত্যন্ত জোরালো ও জরুরিভাবে এই আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ করেছেন যে আমি যেন আবার জার্মানিতে ফিরে গিয়ে বসবাস করি, যেন ‘বুদ্ধি পরামর্শ দিই ও কাজ করি’ – প্রায় বেন একটা আনুষ্ঠানিক দাবিই করেছেন আপনি এই মর্মে। আপনি যে একাই আমাকে এই আবেদন করেছেন, তা নয়, শুনেছি, রুশ-নিয়ন্ত্রিত বেরলিন-বেতার ও জার্মানির সংযুক্ত গণতান্ত্রিক দলগুলির সরকারি মুখপাত্রও নাকি সেই আবেদনই জানিয়েছে; ‘জার্মানিতে আমার নাকি একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব সম্পন্ন করার আছে’ – এ-রকম একটি বেশ অতিরঞ্জিত মস্ত উদ্দেশ্য চাপিয়ে তাঁরা যুক্তি প্রতিষ্ঠা করেছেন।

কেবল আমার বইগুলোই নয়, ব্যক্তি ও মানুষ হিসেবে আমাকেও যে জার্মানি ফিরে চাচ্ছে এতে আমার সত্যি খুশি হওয়া উচিত। অথচ আমার যেন মনে হয় এ-সব আবেদনের মধ্যে কেমন একটা অস্থির-করা অস্বস্তিকর দিকও আছে – কী একটা আছে যা যুক্তিহীন, অসংগত ও কিঞ্চিৎ বিভ্রান্ত। প্রিয় হের ফোন মোলো, আপনি তো খুব ভালো করেই জানেন যে আমার দুর্ভাগা দেশের মানুষ নিজেদের উপর যে-আশাভরসাহীন দুর্বিপাক ডেকে এনেছে, তাতে ওই ‘বুদ্ধিদান ও কর্মোদ্যোগ’ ব্যাপারটার দাম আজ খুব চড়া। এই বিপন্ন সময়ে যার বুকের পেশি অবশেষ এই বুড়ো হাড়ে দাবি জানিয়েছে, তার পক্ষে সশরীরে ও ব্যক্তিগতভাবে আপনার দ্বারা স্পর্শাতুরভাবে বর্ণিত, ওই অসাড় ও পঙ্গু মানবতার মধ্যে, উপস্থিত থেকে তার কিছু করতে পারবেন কি না সে-বিষয়ে আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে। কিন্তু সেটা মূল কথা নয়। আমার ধারণা, আমার ফিরে যাবার পথে বাস্তব, সামাজিক ও নৈতিক বাধাগুলির কথা যথেষ্ট গুরুত্ব সহকারে বিচার করে দেখা হয়নি।

এই বারো বছর, ও তার বিষময় পরিণামকে কি শ্লেটের গা থেকে একেবারে মুছে ফেলা যায়? যেন কোনও উৎপাতই ঘটেনি, এই ভঙ্গি করে সত্যি কোনও কাজ আমরা করতে পারব কি? আমার অভ্যস্ত জীবনযাত্রা ১৯৩৩-এ যে-ধাক্কা খেয়েছিল, তা ছিল অত্যন্ত কঠিন ও শ্বাসরোধকারী – সব কদর্য ঘটনা, সব নির্বাসন ও বিতাড়ন, সব বহিষ্কারের মধ্যেও আমার বাড়িঘর, দেশ, বই, স্মারকচিহ্ন, সম্পত্তি সব আমার সঙ্গেই থেকে গিয়েছে। আমার হ্বাগনার প্রবন্ধের বিরুদ্ধে ম্যুনখেন-এ বেতারে ও খবর-কাগজে সুপরিকল্পিতভাবে যে-অশিক্ষিত, অশ্লীল ও জিঘাংসাপ্রণোদিত প্রচার চালানো হয়েছিল, তা আমি কোনওদিনই ভুলতে পারব না। আর সেটাই আমাকে প্রথম বুঝতে বাধ্য করেছিল যে ফেরার পথ রুদ্ধ; আত্মপ্রকাশের জন্য আমার সংগ্রাম, আমার লেখার চেষ্টা, উত্তর দেবার চেষ্টা, নিজেকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা – সব ব্যর্থ হয়েছিল; আমার হারানো বন্ধুদের একজন – রেনে শিকেল – এই কন্ঠরোধী একা বাণীগুলোকে ‘তিমিরাচ্ছন্ন পত্রগুচ্ছ’ বলে বর্ণনা করেছিলেন। তার পরে যা ঘটেছিল, তাও ছিল বেশ কঠিন; দেশ-দেশান্তরে ভ্রাম্যমাণ ভবঘুরে জীবনে, ছাড়পত্র ও কাগজ-পত্রের উদ্বেগ, হোটেলে-হোটেলে যাযাবর অস্তিত্ব, আর এরই মধ্যে রোজ, সারাক্ষণ, লজ্জা ও ধিক্কারের একের পর এক কাহিনি কানে এসে পৌঁছাত – বর্বরযুগে ফিরে গেল আমার স্বদেশ, হারিয়ে গেল, একেবারে অচেনা হয়ে গেল। আপনারা যারা তখন গ্যেববেলসের নির্দেশে ‘দৈবের দান ফ্যুরের’-এর প্রতি একনিষ্ঠ আনুগত্য প্রকাশ করেছিলেন (জঘন্য, জঘন্য এই বিহ্বল প্রচার) – তাঁরা কেউ এ-সবের মধ্য দিয়ে যায়নি। আমি ভুলিনি যে আপনারা আরও ভয়ংকর-কিছুর মধ্য দিয়ে গিয়েছিলেন, আমি যার হাত থেকে উদ্ধার পেয়েছিলুম; কিন্তু আপনি তো নির্বাসনের এই শ্বাসকষ্ট টের পাননি, আপনি তো টের পাননি সেই শিকড়ওপড়ানো স্নায়ু-কাঁপানো ভয়, বাড়ি না-থাকার ভয়।

মাঝে-মাঝে আমার মন বিদ্রোহ করেছে, বিশেষত যখন ভাবতুম আপনারা কী-সব সুযোগ-সুবিধে পাচ্ছেন। এর ভিতর আমি দেখেছিলুম ঐক্যবোধের প্রত্যাখ্যান। যদি সেই সময় জার্মনির বুদ্ধিজীবী – যাঁদের নাম আছে, যাঁরা ছিলেন জগৎবিখ্যাত -প্রতিটি চিকিৎসক, গায়ক, শিক্ষক, লেখক ও শিল্পী এই পরম অবমাননার বিরুদ্ধে একটি আস্ত মানুষের মতো উঠে দাঁড়াতেন, যদি ঘোষণা করতেন এক সাধারণ ধর্মঘট – তবে হয়তো ঘটনার স্রোত ভিন্নখাতে প্রবাহিত হত। কিন্তু ইহুদি না-হলেই ব্যক্তিমানুষ সব সময়ে নিজেকে জিজ্ঞেস করতে প্রলুব্ধ হতেন ‘কেন? অন্য-সবাই তো সহযোগিতা করছে। নিশ্চয়ই যতটা মনে হচ্ছে ব্যাপারটা ততটা খারাপ নয়।’

বলেছি যে আমি মাঝে-মাঝে অত্যন্ত ক্ষুব্ধ বোধ করতুম। কিন্তু জানবেন, কোনওদিনই আমি আপনাদের ঈর্ষা করিনি – আপনারা যাঁরা জার্মানিতে থেকে গিয়েছিলেন, আপনাদের চরম সাফল্যের দিনেও আপনাদের আমি ঈর্ষা করিনি। কারণ আমি খুব ভালো করেই জানতুম যে এই তথাকথিত মহান দিনগুলো কেবল রক্তের বুদ্বুদ ছাড়া আর-কিছু নয়, এবং এই বুদ্বুদও যে অচিরেই ফেটে যাবে, তাও আমার জানা ছিল। আমি ঈর্ষা করতুম হেরমান হেসকে – যাঁর সঙ্গে প্রথম সপ্তাহ ও মাসগুলোয় আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলুম, যাঁর সঙ্গে থাকলে আমি সাহস ও সান্ত্বনা পেতুম। আমি তাঁকে ঈর্ষা করতুম, কারণ তিনি অনেকদিন স্বাধীন ছিলেন। এমন-এক ভিত্তিতে তিনি অনেক আগেই নিজেকে মুক্ত করে নিয়েছিলেন, যা ছিল সদুদ্দেশ্যপ্রণোদিত ‘জর্মনরা যে মহান ও প্রতিপত্তিশালী জাতি, তা কে অস্বীকার করছে? পৃথিবীর অভিজাতদের দেশ? হবেও বা, কিন্তু রাজনৈতিক জাতি হিসেবে তারা একেবারেই অসম্ভব। সেদিক থেকে তাদের সঙ্গে আমি কস্মিনকালেও কোনো সম্বন্ধ রাখতে চাই না।’ দিব্যি নিরাপদে তিনি থাকতেন তাঁর মোনটাগনোলার বাড়িতে আর তাঁর অন্যমনস্ক অতিথিদের নিয়ে বাগানের মধ্যে ‘বোচ্চিয়া’ খেলতেন।

ধীরে-ধীরে, আবার আমার জীবনে সুস্থিরতা এল। আমি গুছিয়ে বসলুম। প্রথমে বাসা বাঁধলুম ফরাসিদেশে, পরে স্যুইটজারল্যান্ডে – ছিলুম সর্বস্বান্ত ও সম্পূর্ণ বিমূঢ়, ক্রমে ফিরে এল কিঞ্চিৎ পরিমাণে স্থিতাবস্থা, ফিরে এল কোথা যে ‘আছি’ তার বোধ, বসবাসের প্রশান্তি। আবার হাতে তুলে নিলুম পরিত্যক্ত কাজ, এক সময়ে ভেবেছিলুম এ-সব কাজের কোনো মানেই নেই, পৃথিবীতে তাদের অস্তিত্ব আছে কিনা তাই সন্দেহ হয়েছিল একসময়। স্যুইটজারল্যান্ড ঐতিহ্যগতভাবেই অতিথিবৎসল, কিন্তু প্রবলতর প্রতিবেশিদের ভীতিপ্রদ চাপে সবসময় মার খায়, আর তাদের নিরপেক্ষতার বন্ধন প্রায় যেন নৈতিক বন্ধনে পৌঁছেছিল। ফলে এটা বেশ সুবোধ্য কেন সে সবসময় সংকুচিত লজ্জিত ও উদ্বিগ্ন ছিল- কারণ কাগজপত্রহীন অতিথিটি তার নিজের দেশের সরকারের সঙ্গে এমন এক জঘন্য সম্পর্ক পাতিয়ে বসে আছে সেক্ষেত্রে সতর্ক ব্যবহার অত্যাবশ্যক। তারপরেই অবিশ্যি মার্কিন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আমন্ত্রণ এল, আর আচম্বিতে এই বিপুল মুক্ত দেশ – যেখানে আর সন্তর্পণ ব্যবহারের প্রশ্ন নেই, সেখানে – সব কিছু মুক্ত, নির্বোধ ও প্রাণখোলা বন্ধুতায় ভরা। সেখানে মূলমন্ত্র ছিল ‘ধন্যবাদ হিটলার সাহেব।’ প্রিয় হের ফোন মোলো, এই দেশের প্রতি কৃতজ্ঞ থাকার যথেষ্ট কারণ আছে আমার এবং সেই সঙ্গে দায়িত্ব আছে সেই কৃতজ্ঞতা প্রমাণ করার।

আজ আমি মার্কিন নাগরিক জার্মানির ভীষণ পতন হবার অনেক আগেই আমি প্রকাশ্যে ও অন্তরঙ্গভাবে ঘোষণা করেছিলুম যে কোনওকালেই আমার মার্কিন মুলুক ছেড়ে চলে যাবার ইচ্ছে নেই। আমার ছেলেমেয়েরা – আমার দুই ছেলে এখন মার্কিন পলটনে আছে – এই দেশের মাটিতে আত্মস্থ। আমার নাতি-নাতনিরা আমার আশপাশে ইংরেজি ভাষাতেই মানুষ হচ্ছে। আমিও নানাভাবে এ-দেশে নোঙরবদ্ধ, এবং এদিকে-ওদিকে আমার কতগুলো অবৈতানিক দায়িত্ব আছে – ওয়াশিংটনের প্রতি আছে, এ-দেশের প্রধান বিশ্ববিদ্যায়গুলির প্রতি আছে – তাঁরা আমাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দিয়েছেন। আমার বাড়ি বানিয়েছি এই সুন্দর সমুদ্রতীরের দিকে – যে-তীর তাকিয়ে আছে দূরকালের দিকে, ভবিষ্যতের দিকে – আর শক্তি, সুবুদ্ধি, প্রাচুর্য আর শান্তির এই আবহাওয়ার মধ্যে তারই একটি অংশ হিসেবে এই আশ্রয়ের মধ্যে আমার জীবনের সাধনায় ছেদ পড়ুক এটাই আমি চাই। খোলাখুলি বলি আপনাকে নিয়তির চক্রে আমি যেটুকু সুযোগসুবিধে পেয়েছি, সেগুলি আমি কেন গ্রহণ করব না? বিশেষত যখন এত তিক্ততা আমাকে ভোগ করতে হয়েছে? আমি বুঝতেই পারি না জর্মন জাতির কোন সেবা আমি করতে পারব, যা এই ক্যালিফোর্নিয়ার উপকূল থেকে করা সম্ভব নয়।

যা-কিছু ঘটেছে, যেমনভাবে ঘটেছে, তা নিশ্চয়ই আমার কৃতকর্ম নয়। জর্মন চরিত্রেরই অনিবার্য ফল ওটা – জর্মন জাতির নিয়তি – এত বৈচিত্র্যময় যে জাতি, যে-জাতি প্রায় ট্রাজেডির মতো রহস্যময়, তার আরও-বেশি সহিষ্ণুতা থাকা উচিত। এটা মেনে নিয়েই সবকিছুর ফলাফল নির্ণয় করতে হবে আমাদের, সবকিছুকেই সাধারণ বলে উড়িয়ে দেয়া যায় না ‘ফিরে এসো, সব ক্ষমা করা হয়ে গেছে,’ এ-রকম একটা কথা বলে সব ঝেড়ে ফেলা যায় না। ধর্মকথা বলা আমার ধাত নয়। বাইরে, বিদেশে বসে, ধর্মের পথ অনুসরণ করা আর হিটলার সম্বন্ধে সব বলে ফেলা খুবই সহজ ছিল আমাদের পক্ষে। আমি কারও উদ্দেশ্যেই ঢিল ছুড়তে চাই না। আমি লোকটা এমনিতে একটু চাপা, লাজুক, ছোটদের মতোই ‘অচেনাকে ভয়’ পাই। হ্যাঁ- জার্মানি এতদিনে আমার কাছে একেবারে বিদেশ হয়ে গেছে। ও একটা ভয়ংকর দেশ, মানতেই হবে। সত্যি করে বলি, আমি জার্মনির ধ্বংসস্তূপকে ভয় পাই – ধ্বংসস্তূপ- পাথরের আর মানুষের, সবকিছুর। আর আমার ভয় যে-লোক স্যাবাথ-এর ডাইনির দিকে বাইরে থেকে তাকিয়েছে আর আপনারা যাঁরা ডাইনিদের সঙ্গে নৃত্য করেছেন এবং প্রভু দুরিয়ানের ধামা ধরেছেন – এ-দুয়ের মধ্যে মেলবার সূত্র কিছুই নেই। আমি যে নাড়া খাইনি, তা নয়- জার্মানি থেকে রোজ যে-সব লম্বা-লম্বা চিঠি আছে, দীর্ঘদিন-চাপা-দিয়ে-রাখা-প্রীতিতে ভরা একেকটা চিঠি, তখন নাড়া না-খেয়ে পারি কীভাবে? হৃদয়ের এই টানাপোড়েন খাঁটি এবং মর্মস্পর্শী, সন্দেহ নেই। কিন্তু আমার আনন্দ অনেকটাই কমে যায় যখন ভাবি যে হিটলার জিতে গেলে এরা কেউই আমাকে চিঠি লিখতেন না। অধিকন্তু, এ-সব চিঠির লেখকরা বড়ই ভোঁতা আর সরল – এই জন্যই তাঁরা অমন চট করে আমার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করতে পারলেন, যেন এই বারো বছরের (নাৎসি-শাসনের এই এক যুগের) কোনও অস্তিত্বই ছিল না। বইও পাঠানো হয় আমাকে। সত্যি বলব? তাদের দিকে তাকাতেই আমার ইচ্ছে করে না, প্রায় তক্ষুনি আমি তাদের পাশে সরিয়ে রাখি। হয়তো এটা কুসংস্কার, কিন্তু আমার মতে, ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫-এর মধ্যে জার্মানিতে যে-সব বই ছাপা হয়েছিল, সে-সব অপাঠ্য জঞ্জাল স্পর্শেরও অযোগ্য। রক্তের ছিটে আর লজ্জার গন্ধ লেগে আছে তাদের গায়ে; এ-সব ধ্বংস করে ফেলা উচিত।

জার্মানিতে তখন যা ঘটছিল তার মধ্যে বসে সংস্কৃতি ‘ফলানো’ নিষিদ্ধ ও অসম্ভব ছিল। তার মানে ছিল একটাই সব কুকর্ম ও অপজন্মকে প্রশ্রয়দান। যে-সব যন্ত্রণা অনবরত ও অবিশ্রাম সহ্য করেছি, তার একটা এই বোধ থেকেই উৎসারিত হয়েছিল যে চূড়ান্ত অধঃপাত ও দুরাচারিতার বর্ম ও রক্ষাকর্তা হিসেবেই জর্মন আত্মা ও শিল্প তখন নিজেকে উপস্থাপিত করছিল। এটা একেবারে কল্পনাতীত ঠেকে যে যে হিটালারের Bayreuth-এর জন্য হ্বাগনার মঞ্চসজ্জার সৃষ্টি করা ছাড়া আর-কোনো সম্মানজনক সৃষ্টিকর্ম খুঁজে পাওয়া যায়নি। এটাকে চরম অনুভূতিহীনতা বলে মনে হয়। জর্মন রাইখ-এর জন্য চতুর সব বক্তৃতা মুখস্থ ক’রে গ্যেববেলসের অনুমতি নিয়ে হাঙারি বা অন্য-কোনও ইয়োরোপীয় দেশে গিয়ে ‘কুলটুরপ্রপাগান্ডা’র উন্নতিসাধন করা – আমি বলি না যে এ না-করে কোনো উপায় ছিল, হয়তো না-করলে তিরস্কার ও শাস্তিও পেতে হত; আমি শুধু বলতে চাই যে আমি তা মোটেই বুঝতে পারি না। আর সেইসব লোকদের সঙ্গে মুখোমুখি দেখা হবে ভাবতেই আমার গায়ে জ্বর আসে।

বেটোফেন বাজাবার জন্য হিটলার-কর্তৃক ৎজুরিখ, পারি বা বুডাপেস্ট-এ প্রেরিত কোনো সংগীতনির্দেশক সেইজন্যই এই অশ্লীল ও জঘন্য মিথ্যাচারের জন্য দায়ী, যেহেতু তাঁর ছল ছিল তিনি একজন সংগীতসিল্পী এবং শুধু সংগীতই তাঁর বিবেচ্য বিষয়। আর সবচেয়ে বড়ো কথা, স্বদেশেই তখন তাঁর সংগীত মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। বেটোফেনের ‘ফিডেলিয়ো’ – যে-অপেরা ছিল জার্মানির মুক্তি উদযাপনের জন্য নির্ধারিত – যে কী করে ওই বারো বছরে জার্মানিতে নিষিদ্ধ হয় নি, তাই এক তাজ্জব কাণ্ড! এটা যে নিষিদ্ধ হয়নি, তা-ই ছিল ধিক্কারজনক ও কেলেঙ্কারির একশেষ – তার উপর তার যে অতি পরিমার্জিত অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল, এবং তাতে গলা মেলাবার জন্য গায়ক পাওয়া গিয়েছিল, বাজাবার জন্য মিলেছিল যন্ত্রশিল্পী, আর লোক জুটেছিল শোনবার জন্য – এ সব তখ্য আমার মধ্যে একটা ন্যক্কারজনক অনুভূতি জাগায়। কারণ হিমলারের জার্মানিতে বসে-বসে- দু-হাতে মুখ ঢোকে হল থেকে বেরিয়ে না-গিয়েও – ‘ফিডেলিয়ো’ শোনবার মতো চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা আমি কল্পনা করতে পারি না।

আমার বিদেশ-হয়ে-যাওয়া, অচেনা-হয়ে যাওয়া মাতৃভূমি থেকে মার্কিন সার্জেন্ট আর লিউটেনান্টরা কত চিঠিই এনে দিয়েছেন আমাকে; কেবল যে নামজাদা লোকের চিঠি তা নয়, সাদাসিদে মানুষ, তরুণ যুবক সকলেই আমাকে লিখেছেন – আর, আশ্চর্য, এদের কোনওতেই আমাকে এক্ষুনি জার্মনিতে ফিরে যাবার জন্য উপরোধ করা হয়নি। ‘যেখানে আছেন, সেখানেই থাকুন’, সে-সব চিঠির সোজা বয়ান, বাকি জীবনটা আপনার নবার্জিত সুখি স্বদেশেই কাটিয়ে দিন! এখানে জীবন দুঃখে ভরা…’ শুধু দুঃখে ভরা? হায়রে, যদি তা-ই হত! কিন্তু আছে অপরিহার্য পাপ ও শত্রুতার অবিরাম প্রবাহ! একজন উচ্চপদস্থ নাৎসি অধ্যাপক এবং ‘ডক্টর অনরিস কর্জা দ্বারা প্রকাশিত একটা কাগজের পুরোনো সংখ্যা (ফোলক ইম হেব্বরডেন, মার্চ ১৯৩৭, হানজেয়াটিশে ফেরলাগসানস্টানট, হামবুর্গ) পুরস্কার হিসেবে একজন মার্কিন আমাকে পাঠিয়েছেন। অধ্যাপকটির নাম KRIEG নয় Krieck – বানানে ‘CK’ আছে। পড়তে গিয়ে আতঙ্ক হচ্ছিল। বারো ‘বছর ধরে এই ঝাঁঝালো আরক যাদের গেলানো হয়েছে, তাদের জীবন কিছুতেই আক সহজ ও স্বাভাবিক হতে পারে না। ‘সন্দেহ নেই, সেখানে তোমার অনেক নবীন-প্রবীণ সৎ ও বিশ্বস্ত বন্ধু আছেন’, আমি মনে-মনে বলি, ‘কিন্তু ঝোপে-ঝোপে নেকড়েও তো আছে কত – গুপ্ত শত্রু; হেরে গেছে, সন্দেহ নেই, কিন্তু জখম বলেই আরও ভয়ংকর ও বিষঢালা!’

এবং তবু, তৎসত্বেও, প্রিয় হের ফোন মেলো, আপনি জানবেন এ-সবই হল কেবল একদিক। আরেকটা দিকও শোনা দরকার। যে-গভীর কৌতূহল ও উৎকন্ঠার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে পাওয়া জার্মানির বার্তার জন্য আমি অপেক্ষা করি এবং আমার কাছে তার যে-বৃহত্তর আবশ্যিকতা আছে বলে অনুভব করি, জার্মানির শোচনীয় ও অপ্রয়োজনীয় নিয়তি সম্বন্ধে উদাসীন বিশ্বের আর-কোনও অঞ্চলের বার্তার জন্যই আমার সে-অপেক্ষা বা আকুলতা নেই। আর এই উৎকন্ঠা ও কৌতূহলই রোজ আমাকে নতুন করে বোঝায় যে সব সত্বেও এক অবর্ণনীয় বন্ধনসূত্রে আমি সেই দেশের সঙ্গে যুক্ত, যে-দেশ একদিন আমার নাগরিকতাহরণ করেছিল। একজন মার্কিন বিশ্বনাগরিক? ভালো কথা। কিন্তু এই সত্য আমি কিছুতেই অস্বীকার করতে পারি না যে এই বৈদেশিক ধ্যানধারণা সম্পর্কে আমার সার্থক অনুরাগ সত্বেও আমার শিকড় রয়েছে সেখানে – সব সত্বেও আমি বেঁচে আছি ও সৃষ্টি করি জর্মন ঐতিহ্যেই, যদিও সমকাল আমাকে বহু ক্ষেত্রেই যা-কিছু জর্মন তার একটা দূরবর্তী প্রতিধ্বনি ও অসুস্থ প্যারডি ছাড়া আর কিছুই রচনা করতে দেয়নি।

জর্মন লেখক ছাড়া আর-কোনোভাবেই আমি নিজেকে ভাবতে পারি না – কোনওদিনই পারব না; এমনকি আমার রচনা যখন কেবল ইংরেজি তরজমাতেই টিকে ছিল, তখনও আমি আলেমান ভাষার প্রতি বিশ্বস্ত ও বশংবদ ছিলুম – তার কারণ শুধু এটাই নয় যে তখন যে ভাষা পাল্ট াবার পক্ষে আমি বড্ড বুড়ো হয়ে পড়েছিলুম, তার প্রধান কারণ এটাই ছিল যে আমার রচনার সামান্য যা-কিছু মূল্য ও স্থান, আছে শুধু জর্মন সাহিত্যেরই ইতিহাসে। জামানির নিবিড়তম তমসায় বসে আমি রচনা করেছিলুম গ্যেটের উপর একটি উপন্যাস৩, যার কয়েক কপি লুকিয়ে-চুরিয়ে চোরাই পথে জার্মানিতে গিয়ে পৌঁছেছিল – সেটা কেবলমাত্র বিস্তৃতি, বর্জন বা আমাকে তাড়িয়ে দেবার দলিল নয়। এবং আপনাকে বোধহয় বলার দরকার নেই দেখুন, আমি আমার শান্তির দিনগুলোর জন্য বড্ড অনুতপ্ত – আপনাদের সঙ্গে থেকে সব যন্ত্রণা ও মনস্তাপ সহ্য করা আমার পক্ষে ঢের মূল্যবান হত!’ জার্মানি আমাকে কোনও দিনই শান্তিতে থাকতে দেয়নি। আমি ‘আপনাদের সঙ্গেই যন্ত্রণা ও মনস্তাপ সয়েছি।’ এটা জানবেন যে বেন-এর চিঠিতে আমি যখন উৎকন্ঠায় ছিঁড়ে যাবার কথা লিখেছিলুম, যখন যন্ত্রণা, উদ্বেগ আর উৎকন্ঠার কথা লিখেছিলুম, তখন এক বর্ণও বাড়িয়ে বলিনি – ‘যা থেকে, চার বছর ধরে, এক ঘন্টার জন্যও আমার জীবন মুক্ত ছিল না এবং যার বিরুদ্ধে সৃষ্টিশীল কাজ চালাবার জন্য রোজ আমাকে যুদ্ধ করতে হয়েছে!’ মাঝে-মাঝে এমনকী কোনও দোটানাও ছিল না। জার্মানির উদ্দেশে কাকুতিমিনতিতে ভরা যে-পঞ্চাশ বা ততোধিক বেতার ভাষণ প্রচার করেছিলুম – যা এখন সুইডেনে ছাপা হচ্ছে – তারাই সাক্ষী দেবে যে সবসময়েই ‘শিল্পকলা’ বা আর্ট ছাড়াও অন্য – কিছু আমার কাছে অত্যন্ত জরুরি ও অব্যবহিত বলে মনে হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ আগে আমি লাইব্রেরি অভ কংগ্রেসে ‘জার্মানি ও জর্মন জাতি’ সম্বন্ধে একটা ভাষণ দিয়েছিলুম। লিখেছিলুম আলেমান ভাষাতেই, লেখাটা নয়ে রুন্ডশাড়-র (৪৫-এর জুন মাসে যার পুনর্জন্ম হয়েছে) আগামী সংখ্যা প্রকাশিত হবে। এ-সব জার্মানিতে ঘটলো কেন ও কীভাবে সম্ভব হল – ভাষণটায় মনস্তাত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে শিক্ষিত মার্কিনদের শুধু তা-ই দেখবার চেষ্টা ছিল। এই ভীষণ যুদ্ধের অব্যবহিত পরেই যেভাবে তাঁরা আমার ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে উন্মুখ ছিলেন, তাতে তাঁদের নীরব ঔৎসুক্যের প্রশংসা না করে আমি পারি না। দৃষ্টিকটু ক্ষমাপ্রার্থনা ও ততোধিক দৃষ্টিকটু দায়িত্ব এড়াবার চেষ্টা – এই দুয়ের মধ্যে আমার পথ খুঁজে পাওয়া মোটেই সহজ ছিল না। কিন্তু কোনোক্রমে ব্যাপারটা সামলেছিলুম। প্রায়ই যে পৃথিবীতে অমঙ্গলের মধ্যে থেকে মঙ্গলে বেরিয়ে আসে, এই দিব্য তথ্যের সঙ্গে-সঙ্গে এই শয়তানি-তথ্যের কথাও আমি বলেছিলুম যে মাঝে-মাঝে শুভ্রবোধের মধ্যে থেকেও গজিয়ে ওঠে পাপ। আমি সংক্ষেপে জর্মন আত্মার কাহিনি শুনিয়েছিলুম তাঁদের। ‘আসলে জার্মানি দুটো আছে, একটা সৎ আর অপরটি অসৎ’ – এই তত্বের আমি প্রতিবাদ করেছিলুম। অসৎ জার্মান হচ্ছে – আমি বলেছিলুম – সেই সৎ জার্মানি যে ব্যর্থ হয়েছে, যে পাপরোধে পীড়িত ও দুর্দশাগ্রস্ত; অসৎ জার্মানি হচ্ছে সৎ জার্মনিরই অমঙ্গলদীর্ণ অধঃপতিত রূপ। বলেছিলুম যে, আমি আত্মশ্লাঘা করার জন্য এ-কথা বলছি না- আত্মপ্রশংসার জঘন্য রীতি অনুযায়ী সৎ, ন্যায়নিষ্ঠ, মহান ও শুভ্রবসন জার্মানির প্রতিনিধি হিসেবে এ-কথা বলছি না। শ্রোতাদের যা বলতে চাচ্ছিলুম, তার কিছুই বহিরাগত কোনো ঠাণ্ডা হিম নিরপেক্ষ প্রজ্ঞা থেকে উত্থিত হয়নি। তার প্রতিটি কথা ছিল আমারই কথা – আমারই অস্তিত্বের মর্মমূল থেকে উত্থিত – এ-সবই ছিল আমার নিজের অভিজ্ঞতার অংশ।

হয়তো যাকে বলে নিশ্চিদ্র ঐক্যের ঘোষণা, এটা তাই কিন্তু এই মুহূর্তে এই ঘোষণা করা ছিল সবচেয়ে কঠিন। জাতীয়তাবাদী সমাজবাদের সঙ্গে আমি একাত্মবোধ করিনি, আমি নিজেকে এক ক’রে দেখিয়েছিলুম সেই জার্মানির সঙ্গে যে-প্রলুব্ধ জার্মানি শেষপর্যন্ত শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করেছিল। জার্মানির ঐতিহ্যের মধ্যেই শয়তানের সঙ্গে চুক্তি করার একটা গভীর প্রলোভন রয়ে গেছে, এবং গত কয়েক বছরের যন্ত্রণার উপর গড়ে-ওঠা কোনও আলেমান উপন্যাসে৪ এই ভীষণ চুক্তিকেই বিষয় করে না নিয়ে উপায় নেই। কিন্তু আমাদের মহত্তম কাব্যবাণীতে৫ শয়তান শেষপর্যন্ত ঠকে গিয়েছিল – এমনকী ফাউস্টের ব্যক্তিসত্তাকেও সে হারিয়ে বসেছিল; এবং আমরা এই ভাবনাকে যেন সজোরে প্রত্যাখ্যান করি যে এবারই শেষবারের মতো জার্মানি শয়তানের কবলিত হল, ঐশী করুণা আরও-উচুঁ বিধান – পৃথিবীর যে-কোনও রক্তে-লেখা চুক্তির চেয়েও মহান আমি ঈশ্বরের করুণায় বিশ্বাস করি, আমি আস্থা রাখি জার্মানির ভবিষ্যতের উপর বর্তমান মুহূর্তকে যত হতাশ মরীয়া ও অসহায়ই ঠেকুক না কেন, ধ্বংসস্তূপকে যত হতাশ্বাসই মনে হোক না কেন, আমরা যেন কিছুতেই না বলি যে জর্মন ইতিহাসের শেষ হয়ে গেছে। জার্মনি যেন কিছুতেই সেই ক্ষুদ্র ও তামসকাহিনির সঙ্গে নিজেকে এক করে না-দেখে যার নাম আডোলফ হিটলার। প্রুশো-জর্মন রাইখ-এর বিসমার্কীয় যুগের সঙ্গে যেন তাকে এক করে না দেখা হয়, যার নিজের আয়ুষ্কাল ছিল অতি অল্প। এবং মহান ফ্রেডেরিকের যুগের দুই শতাব্দীর সঙ্গেও যেন তাকে একীভূত করে না দেখা হয়। জার্মনি কেবল নতুন আকার, নতুন অবয়ব নেবার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে এখন, বার করতে চাচ্ছে জীবনের একটা নবীন ভঙ্গি – যা হয়তো রূপান্তর ও সন্ধিক্ষণের প্রথম দুর্দশা কেটে গেলে প্রকৃত সুখসম্মানের প্রতিশ্রুতি পূরণ করবে, হয়তো জাতির গভীরতম প্রবণতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে আগের চেয়েও সৃষ্টিশীলভাবে সাধিত হবে তার সংগতি।

এখানেই কি বিশ্ব-ইতিহাসের শেষ হয়ে গেল বলে ভাবছেন? আমরা এখন বিশ্ব-ইতিহাসের সবচেয়ে সক্রিয় যুগে আছে – আর জার্মানির ভবিষ্যৎও তারই সঙ্গে জড়ানো। অনবচ্ছিন্ন চলেছে ক্ষমতার লড়াই, আর তা-ই আমাদের সাবধান করে দিচ্ছে যে আমরা কেন অতিরিক্ত-কিছু প্রত্যাশা না-করি। কিন্তু তার মধ্যে এই আশাও কি নেই যে সব বেদনা মনস্তাপ ও বাধ্যতা – অনিশ্চিত ভাবে হলেও-এমন-এক বিশ্বপরিস্থিতির দিকে অগ্রসর হবে যেখানে উনিশশতকি জাতীয় স্বাতন্ত্র্যবাদ কালক্রমে একদিন সম্পূর্ণ মিলিয়ে যাবে? একটি বিশ্বআর্থনীতিক ব্যবস্থা, জাতীয় ভেদ-চালিত সীমার ক্রমক্ষীণতা, রাষ্ট্র হিসেবে প্রত্যেকটির কিয়ৎপরিমাণ ‘রাজনীতিদাসত্ব অস্বীকার’, ব্যাবহারিক ক্ষেত্রে এক অকপট ঐক্যচেতনায় মানবজাতির জাগরণ – একটিমাত্র বিশ্বরাষ্ট্রের চেতনার পশ্চাদ্বর্তী যে প্রথম মানবিক চিন্তাধারা – বুর্জোয়া গণতন্ত্রের চেতনার চেয়ে বহু অগ্রবর্তী এতসব ‘সমাজবাদী মানবতা’ এবং আমাদের কালের যা মহত্তম চিন্তাসূত্র-তা কী করে জর্মন আত্মার কাছে বৈদেশিক ও বিসংগত, এবং সেইজন্যই প্রতিবাদযোগ্য, ঠেকতে পারে? জার্মানির বর্হির্বিশ্ব বিষয়ে আতঙ্কের মধ্যেই ছিল বড্ড বেশি বিশ্বরোধ। কে একে অস্বীকার করতে পারবেন যে এই একাকিত্বের পিছনে – যে-একাকিত্বের জন্য দায়ী তার সব দুষ্ক্রিয়া- আছে ভালোবাসার ও ভালোবাসা পাবার উৎকাঙ্ক্ষা। জার্মানিতে মিথ্যাগর্ব, বিদ্বেষবোধ ও অহংবোধ ত্যাগ করতে দাও, আবার সে ফিরে পাক তার ভালোবাসা, তখন সবাই তাকে ভালোবাসবে। কারণ, সব সত্বেও এটা অনস্বীকার্য যে জার্মান জাতির প্রাচুর্য ও মূল্যবোধ অসামান্য – জার্মানি এমন এক দেশ যে তার জনগণের ক্ষমতায় ও জগতের সাহায্যের উপর আস্থা রাখতে পারে, এবং যার কাছে এই সাম্প্রতিক দুঃসময় কেটে গেলেই সফল কীর্তি ও বিপুল সম্মানে ভরা এক নবজন্ম আসবে।

প্রিয় হের ফোন মোলো, এই চিঠিতে আমি অনেকটা প্রসঙ্গান্তরে চলে গেছি। অবশ্য জার্মানির উদ্দেশে লেখা কোনও চিঠিতে অনেক কথা না-পেড়েও কোনো উপায় নেই। আমি কেবল আরেকটা কথা বলতে চাই। মার্কিনদেশে আমার আরামে-ভরা অলসজীবন সত্বেও এ-স্বপ্ন আমার দিনরাত্রির সর্বক্ষণের, যে পায়ের তলায় অনুভব করছি পুরনো মহাদেশের মাটি। যখন সময় হবে – যদি আমি বেঁচে থাকি এবং যাতায়াতব্যবস্তার ও কর্তৃপক্ষের ছাড়পত্র মেলে – আমি ফিরে যাবার আশা রাখি। একবার ফিরে গেলে – বহিরাগত বোধ করার ভয় ও অমুভূতি যা এই বারো বছরে গড়ে উঠেছে- বোধহয় সেই টানকে ঠেকাতে পারবে না যার পিছনে আছে হাজার বছরের স্মৃতি। সেইজন্যই, যদি ঈশ্বর করেন, ‘আউফ হ্বিডের জেহেন’ – পুনর্দর্শনায় চ।

এই চিঠিকে ভুল বোঝার অনেক কারণ ছিল জার্মানির – এবং তৎকালীন জার্মানিতে একটি বিপুল জনমত মান-এর প্রতি কটূক্তি ও ধিক্কারে ভরে গিয়েছিল। কেননা যে-বারো বছরের বিভীষিকা। জার্মানি তখন ভুলে যেতে চাচ্ছিল, মান কেবল তাকেই খুঁচিয়ে তুলেছিলেন।

কিন্তু এ-ছাড়াও এখানে কতগুলো দ্ব্যর্থহীন কথা আছে, যা কলাকৈবল্যবাদী বা শুচিবাতিকগ্রস্তদের মনঃপূত হবার কথা নয়। যেমন মান কল্পনাই করতে পারেননি কী করে তখন জার্মানিতে বেটোফেনের মুক্তিপিপাসু অপেরা ‘ফিডেলিয়ো’র অত্যন্ত ‘সফিস্টিকেটেড’ অনুষ্ঠান সম্ভব হয়েছিল ও শ্রোতা জুটেছিল। তার কাছে পুরো শিল্পচর্চার প্রহসনটাই ঠেকেছিল ন্যক্কারজনক। মান যে বারে-বারে বেতারভাষনে জর্মন জনগণকে জাগাবার চেষ্টা করেছিলেন, জার্মানি, শোন গ্রন্থে যে-ভাষণগুলো পরে সংকলিত হয়েছিল, তা, মান বলেছেন, তাঁর সেই বোধেরই সাক্ষী যা বোঝাবে যে আর্টের চেয়ে জরুরি ও অব্যবহিত কোনও-কিছু পৃথিবীতে আছে বলে তিনি ভাবতেন। জানি, এই কথা অনেকের পক্ষেই অরুচিকর ঠেকবে-বরং মানুষের দুর্দশার সঙ্গে শিল্পের ও শিল্পীর কোনো সংস্রবই নেই, এই কথা বললেই অনেকের পক্ষেই হাঁফ ছেড়ে বাঁচার কারণ হয়, তবু তাঁরা যেহেতু কথায়-কথায় বহুবার মান-এর নামে কলাকৈবল্যবাদের প্রচারকর্ম চালিয়েছেন সেইজন্য এখানে এই চিঠি আদ্যোপান্ত উদ্ধার করা জরুরি বলে মনে হল। এই চিঠির জন্য অনবরত মান-এর বিরুদ্ধে যখন আরেক দফা অপপ্রচার চলেছিল, তখন বাধ্য হয়ে মান-কে বেতার মারফত নিজের বক্তব্য আরও আঁটো করে ও সোজাসুজি প্রকাশ করতে হয়। মান-এর সেই বেতারভাষণও এখানে শোনা যায় – এই জন্যই শোনা যাক যে মান এই শতাব্দীর একজন শ্রেষ্ঠ মনীষা, যিনি বহুবার ব্যক্তি ও সভ্যতার ভাঙনকে নিজের রচনার বিষয় করেছেন।

টমাস মানের বেতার ভাষণ (১৯৪৫)

…ঈশ্বরের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার সিদ্ধান্ত প্রতিরোধ করতে প্রস্তুত এবং উত্তরকালই বলবে যে তা যুক্তিযুক্ত ছিল।

দেখে মনে হচ্ছে, জার্মানিতে থেকে যেমন, না-থেকেও তেমনি কেউ সোহংবাদের পরিচয় দিতে পারেন। মার্কিন সাংবাদিকদের কাছে সাক্ষাৎকারে জগতের প্রমোদ বিতরণের জন্য রিথার্ড স্ট্রাউস যে-পর্বতপ্রতিম নিঃসাড়তার পরিচয় দিয়েছেন, আমি তা থেকে অনেক দূরে বাস করি। শয়তানের বরপুত্র যে জাতীয়তাবাদী সমাজবাদ, তা আমাকে ঘৃণা করতে শিখিয়েছে- জীবনে এই প্রথমবার আমি ঘৃণা করতে শিখলুম – অকৃত্রিম, গভীর, অকথ্য ও মারাত্মক এক ঘৃণা-এমন এক ঘৃণা যা আমি আধিদৈবিকভাবে অনুভব করি, এবং তা যে ঘটনাস্রোতের উপর কোনো প্রভাব ফেলেনি, তা নয়। একেবারে প্রথম দিন থেকেই আমি এই অমঙ্গলের পতন ঘটাবার জন্য চেষ্টা করে এসেছি-কেবল যে জার্মানির উদ্দেশে প্রচারিত আমার বেতারভাষমের মধ্য দিয়ে, তা নয়; আর এই আপদের হাত থেকে জর্মন জাতি যাতে নিজেরাই নিজেদেরই উদ্ধার করে, আমার ভাষণগুলির মধ্যে ছিল তারই একমাত্র অকপট আবেদন। কিন্তু, অন্য সবকিছুর সঙ্গে-সঙ্গে আমার সেই ভাষণের পিছনে কী উদ্দেশ্য ছিল বলে মনে করেন আপনারা? যে আমাকে বলবামাত্র আমি ফিরে আসব? আর কখন বলা হচ্ছে? যখন বড্ড দেরি হয়ে গেছে।

বাড়ি ফেরা! কীভাবে যে বছরের পর বছর স্যুইজারলান্ডের অতিথি হিসেবে কাটাতে কাটাতে আমি তার স্বপ্ন দেখেছি, বাড়ি ফেরার প্রত্যাশা করেছি- কী গভীর অগ্রহের সঙ্গে আমি প্রত্যেকটা খুঁটিনাটি চিহ্ন গ্রহণ করেছি, আর ভেবেছি বুঝি অবশেষে জার্মানির অধঃপাত ও ভিমরতি কেটে গেল! নিজেকে মুক্ত করবার ভার যদি জার্মানিরই থাকত, তাহলে সবকিছু কেমন ভিন্নরকম হত! যদি ১৯৩৩ থেকে ‘৩৯-এর মধ্যে আপনাদের মধ্যে মুক্তিবিপ্লব ফেটে পড়ত, আপনারা কি ভাবছেন যে আমি তক্ষুনি প্রথম স্বদেশগামী ট্রেনে চেপে বসতুম না!

তা হয়নি, হতে পারেনি! অসম্ভব ছিল- প্রতিটি জর্মন বলছেন এ-কথা – আর আমার নিশ্চয়ই সে-কথা বিশ্বাস করা উচিত। এটা হতেই পারে যে সাত কোটি অতি সুসভ্য ব্যক্তি, কতগুলো পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে, ছ-বছরের জন্য একটা রক্তাপ্লুত বর্বরতা রাজত্বকালকে মেনে না নিয়ে পারেনি-হতেই পারে যে যেটা আত্মার অন্তঃস্তলে অরুচির ঠেকছিল এবং যাকে চূড়ান্ত উন্মত্ততা বলে জেনেছিল, সেই যুদ্ধে সেই বর্বরতা অনুসরণ না করে কোনও উপায় ছিল না! এবং এই একই মানুষ – সেই সাত কোটি মানুষই – আরও ছ-বছর ধরে তার চূড়ান্ত করেছে, কাজে খাটিয়েছে তার উদ্ভাবনীশক্তি, সাহস, বুদ্ধি, শৃঙ্খলাবোধ, সামরিক ক্ষমতা – তার সমস্ত, যাতে সেই বর্বর রাজত্বকাল জিতে যায় এবং অমরত্বকে স্পর্শ করে। তা-ই ছিল নিয়তিনির্দিষ্ট, আর আমার মতো লোকের কাকুতিমিনতি তাই একেবারে নিষ্ফল হয়েছিল। ‘আভ্যন্তরীণ শরণার্থীদের’ একজন সদস্য, ফ্র্যাঙ্ক টিস বলে কজন লেখক বলছেন, ‘অন্ধরা শুনতে চাচ্ছিল না, আর জ্ঞানবৃদ্ধরা মুখের কথা খসাবার আগেই সব সময় এক পা এগিয়ে যাচ্ছিলেন’ – বলেছেন অবশ্যি একেবারে শেষের দিকে। এই ছিল জার্মানির অবস্থা। সারা ইয়োরোপকে সে নির্যাতিত করেছে, আর অবশিষ্ট পৃথিবীর একাধিক ছিন্নভিন্ন হৃদয় সেই সময় আমার এই অকেজো ভাষণায় সান্ত্বনা পেয়েছে – কাজেই আমার কোনও খেদ নেই। কিন্তু, জার্মানির কাছে আমার এই সব আবেদন-নিবেদন যতই অর্থহীন ঠেকুক না কেন, তা নিশ্চয়ই আমার জার্মানিতে ফিরে যাবার বাধ্যতামূলক কারণ হতে পারে না। ‘আপনি, মশাই, ভান করছেন যেন জর্মন জাতির আধ্যাত্মিক নেতা,’ এই তো বলা হচ্ছে ওখানে, ‘তা বেশ, আসুন, এই জনগণের মধ্যে বাস করুন, বাঁচুন। কেবল মুখে তাদের যন্ত্রণার শরিক হয়ে কী করবেন, এই যন্ত্রণার হাত থেকে তাদের মুক্তি দিন, আর যে-বিদেশিরা এর জন্য দায়ী তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান।’

কিন্তু কোথায় জার্মানি, কোনখানে? কোথায় পাব তাকে- কেবল ভূগোলের মধ্যে, মানচিত্রে? কোনও একক হিসেবেই যার অস্তিত্ব নেই, সেই পিতৃভূমিতে কেউ ফেরে কী করে? ছিন্নভিন্ন একটা দেশ, ভিন্ন-ভিন্ন দখলিকৃত এলাকায় ভাগ-করা, যার একটার খবর আরেকটা অংশ রাখে না। রুশদের কাছে যাব, না কি ফরাসিদের কাছে? না কি ইংরেজদের কাছে? না কি আমার সহনাগরিক মার্কিনদের কাছে গিয়ে ভিক্ষে চাইব তাদের বেয়নেটের আশ্রয় যেন আমাকে জাতীয়তাবাদী সমাজবাদের হাত থেকে বাঁচায় – যে নাৎসিবাদ এখন গোর দেয়া দূরে থাক আমাদের সৈন্যদের সুদ্ধু নষ্ট করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে? আমি কি – নানা ক্ষেত্রে যেরকম ঔদ্ধত্য ও বিবেচনাহীনতা দেখানো ও তারিফ করা হচ্ছে সে-রকমভাবে – জার্মানির দুঃযন্ত্রণার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব, দখলকারী শক্তিদের আঙুল দিয়ে দেখাবো যে জার্মানির সঙ্গে ব্যবহারে ও শাসনব্যবস্থায় তারা একের পর এক ভুল করছে? কেবল এই কর্মই আমার দ্বারা হবে না। জর্মন হিসেবে একজন জর্মনকে কিছু বলবার দাবি ও সামর্থ্য ছিল আমার, জার্মানির আসন্ন বিনাশ সম্বন্ধে সাবধানে করে দেবার ক্ষমতা ছিল। যা-কিছু জর্মন তা এক বিষম জাতীয় পাপবোধ আক্রান্ত হয়ে আছে, জর্মন হিসেবে এ-কথা আমি গভীরভাবে বোধ করি বলেই আমি বিজেতাদের নীতির সমালোচনা করার স্বাধীনতা রাখি না, কারণ আমার সমালোচনাকে সব সময়েই আত্মকেন্দ্রিক স্বাদেশিকতার নজির বলে অন্তরাখ্যাত করা হবে আর অন্য জাতিদের উপর জার্মানি বছরের পর বছর যে বিপুল দুর্দশা চাপিয়েছে, তার প্রতি নিঃসানড় বলে চিহ্নিত করা হবে। জার্মানির সর্বত্র এক পর্বতপ্রমাণ ঘৃণার প্রতিষ্ঠা দেখে যে একবার বিভীষিকা দেখেছিল, এবং যে অনেক আগেই এই বিনিদ্র যামিনীগুলি আন্দাজ করে কল্পনা করবার চেষ্টা করেছেন নাৎসি বাহিনীর অমানুষিক অত্যাচার কী ভীষণভাবে জার্মানির উপরেই ডিগবাজি খেয়ে ফিরে আসবে, সে এখন রুশ চেক ও পোল জাতির বৈরি নির্যাতনের নমুনা দেখে স্বদেশপ্রেমে আচ্ছন্ন হয়ে হাত মোচড়াতে পারে না! জার্মানি নিজে যে-দুষ্কর্মের হোতা ছিল, এটা তারই এক যান্ত্রিক ও অপ্রতিরোধ্য প্রতিক্রিয়া – যার জন্য এখন একটা গোটা জাতি শাস্তি পাচ্ছে, এবং যেখানে এখন একেকটা প্রাতিস্বিক ন্যায়বিচার বা ব্যক্তিগত অপরাধ বা নির্দোষিতা – দুর্ভাগ্যবশত – মোটেই ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

এখন থেকে ইয়োরোপকে সাহায্য করা, অনাহার মৃত্যু থেকে জর্মন শিশুকে বাঁচাবার চেষ্টা, জর্মন-ভাগ্যকে নমনীয় করার উত্তেজিত চেষ্টার চেয়ে অনেক ভালো – হয়তো ওই উত্তেজনা থেকে আবার নির্বোধভাবে জর্মন জাতীয়তাবাদ গজিয়ে উঠবে। কারণ, আমি নিজে জাতীয়তাবাদী নই। আপনারা তা ক্ষমাই করুন আর না-ই করুন, জার্মানি যখন অন্যান্য দেশকে নিপীড়ন করছিল তখনও আমি কষ্ট পেয়েছি – উল্টোদিকে এখনও কষ্ট পাচ্ছি জার্মানির দুর্দশায়। আর আমার বিদেশে বাস-করা সম্বন্ধে বলি আমাকে পরদেশি করে তোলবার জন্য আমার দেশ আমাকে যত সময় দিয়েছে তাতে কেবল সমর্পণের ভঙ্গিতে আমি যে নিজেকে অভ্যস্তই ক’রে নিয়েছি তা নয় – অকপটভাবে এটাও মেনে নিয়েছি যে এই ভবিতব্য বিধানই বুঝি সবচেয়ে ভালো হল। অতীতে আমি অধীরভাবে বাড়ি ফেরার জন্য প্রতীক্ষা করতুম। সেদিন হঠাৎ একটা পুরোনো চিঠি চোখে পড়ে গেল – সেই ১৯৪১-এ আমার এক হাঙ্গারীয় বন্ধুকে লেখা সে-চিঠিতে আমি বলেছিলুম ‘নির্বাসন ক্রমেই অতীতের চেয়ে ভিন্ন রূপ নিচ্ছে-এখন আর প্রত্যাশার অবস্থায় বসে নেই আমি, আর ফিরে যাবার উপায় মনপ্রাণ সঁপে বসে নেই – বরং এর মধ্যেই দেখতে পাচ্ছি জাতিগুলোর সীমা ভেঙে যাচ্ছে, আর বিশ্ব-ঐক্যের সম্ভাবনা জেগে উঠছে।’ সত্যি কথাই লিখেছিলুম। যা-কিছু জাতীয় তা অনেক আগেই প্রাদেশিক ও গ্রাম্য হয়ে গেছে – এবং পিতৃভূমির আবহাওয়ায় আর যা-ই থাক খোলাবাতাস নেই, আছে বন্দীশালার হাওয়া।

‘জার্মানি, জার্মানির- জার্মানিকে ছেড়ে দিলেই অবক্ষয়!’ এই ছিল তাঁদের আহ্বান যাঁরা সর্বনাশ আসন্ন ও অবশ্যম্ভাবী জেনেও একবারও সাবধান ক’রে দেবার জন্য মুখ খোলেননি, আর সেইজন্যই ১৯৩৩-এর জার্মানিতে থাকবার অনুমতি পেয়েছিলেন। কিন্তু সেটাই ছিল পর্বতপ্রতিম ভুল! প্রবাসজীবন আমার পক্ষে ভালোই হয়েছে। আমি আমার সঙ্গে করে নিয়ে এসেছি আমার জর্মন ঐতিহ্য ও উত্তরাধিকার; গত কয়েক বছরে প্রতিটি জর্মন যা প্রত্যক্ষ করেছেন, তার কিছুই আমাকে এড়িয়ে যাননি – যদিও আমার বাড়ি যখন ধ্বংস হয়ে গেল তখন আমি ম্যুনখেন-এ ছিলুম না। আমাকে আমার বিশ্ব জর্মনিকতাই দিল – দেশে থাকতেই সেটা আমার কাছে সহজে ও স্বাভাবিকভাবে এসেছিল – এবং আমাকে দয়া করে জর্মন সংস্কৃতির সীমাবহির্ভূত শিবিরটিই দিন, যার সম্মান – আমি আশা করি – অবশিষ্ট জীবন বজায় রাখতে পারব।

বেন-এর কাছে জার্মানিতে থাকার লুথারীয় তাগিদ আর টমাস মান-এর জার্মানিতে না-ফেরার অতিনৈতিক কৈফিয়ত দুটোই যেহেতু সমান অকপট বলে ঠেকে, তখনই আমাদের পক্ষে সংকট আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

বোধহয় লুপ্ত বিবেকের পুনরুজ্জীবন বা সদসৎ জ্ঞানের পুনর্জাগরণই এখন একমাত্র করণীয়। দেশ-বিদেশের ফাসিস্তরা অপপ্রচার চালাবে, শ্লীলতালঙ্ঘন করবে, এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলে নানাভাবে নিপীড়িত করবে – কিন্তু তবু বিপন্ন শিল্পীরা জানবেন যে যেখানে জীবনের অসম্মান হয়, সেখানে শিল্পেরও সমাধি; অর শিল্পের পক্ষে বলেই জীবনের পক্ষে দাঁড়ানো তাঁদের পক্ষে জরুরি ও আবশ্যিক। জীবনানন্দ দাশ মৃত্যুর আগে এ-কথা অনুভব করেছিলেন বলেই বলতে পেরেছিলেন

অদ্ভূত আঁধার এক এসেছে এ-পৃথিবীতে আজ,

যারা অন্ধ সবচেয়ে বেশি আজ চোখে দ্যাখে তারা;

যাদের হৃদয়ে কোনো প্রেম নেই – প্রীতি নেই- করুণার আলোড়ন নেই

পৃথিবী অচল আজ তাদের সুপরামর্শ ছাড়া।

যাদের গভীর আস্থা আছে আজো মানুষের প্রতি

এখনো যাদের কাছে স্বাভাবিক বলে মনে হয়

মহৎ সত্য বা রীতি, কিংবা শিল্প অথবা সাধনা শকুন ও শেয়ালের খাদ্য আজ তাদের হৃদয়।

নিশ্চয়ই এখন অনেকের কাছে ‘মহৎ সত্য বা রীতি’ কিংবা শিল্প অথবা সাধনা’

‘শকুন ও শেয়াল’ সত্বেও ‘স্বাভাবিক বলে বলে বোধ হয়।’৬।

সূত্রনির্দেশ

১। টমাস মান-এর জ্যেষ্ঠপুত্র; হিটলারের জার্মানি থেকে স্বেচ্ছানির্বাসিত। তাঁর সম্বন্ধে পরে গোটফ্রিড বেন তাঁর আত্মজীবনী দুই জীবন (১৯৫০)-এ লিখেছেন ‘একদিক থেকে ক্লাউস মান আমার অন্তরঙ্গ ছিলেন, নানা সূত্রে প্রায়ই আমার কাছে তিনি আসতেন; তীক্ষ্ণধী, বহু দেশ ভ্রমণ করেছেন, ভালভাবে প্রতিপালিত ও শিষ্টাচারী, এবং বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে কথা বলবার সময় সম্মান প্রদর্শন করার অধুনালুপ্ত গুণটিও তাঁর ছিল।’

২. টমাস মান-এর ভ্রাতা; ঔপন্যাসিক; প্রধানত ইতিহাস-নির্ভর উপন্যাস রচনার জন্য বিখ্যাত। জার্মানিতে তৎকালে তাঁর জনপ্রিয়তা কোনো-কোনো দিক থেকে, এমনকি তাঁর বিশ্ববিশ্রুত ঔপন্যাসিক ভ্রাতার চেয়েও বেশি ছিল।

৩. লোটটে ইন হ্বাইমার (১৯৪০) উপন্যাসের কথা বলছেন টমাস মান, যাতে গ্যেটে ও শারলোটটের প্রণয়কাহিনি বিবৃত হয়েছে।

৪. এখানে মান তাঁর বহুস্তর উপন্যাস ডক্টর ফাউষ্টুস (১৯৪৯)-এর কথা বলছেন, যার বিষয় ছিল হিটলারের জার্মানি, বা হ্বাগনারের সংগীত, বা শিল্প ও ব্যাধি ইত্যাদি – অর্থাৎ ফাউস্ট-পুরাণ, অর্থাৎ যার অর্থ অনেক-কিছুই হতে পারে। ‘একটি উপন্যাসের জন্মকথা’ গ্রন্থে মান তাঁর এই উপন্যাস কীভাবে লেখা হল তার একটি উদ্দীপক ও মনোজ্ঞ কাহিনি রচনা করেছেন।

৫. বলাই বাহুল্য, গ্যেটের ফাউস্ট -এর কথা বলা হচ্ছে – কিন্তু বলা হচ্ছে ‘অখণ্ড’ ফাউস্ট-এর কথা, অর্থাৎ মাত্র তার প্রথম খণ্ডের কথা নয়। আজকাল যে দান্তের পুরো কাব্যের মধ্যে কেবল ‘ইনফেরনো’ বা গ্যেটের ফাউস্ট-এর প্রথম খণ্ডই বারংবার উদ্ধৃত হচ্ছে, তার পিছনে হয়তো কেবল যুচেতনাই নিহিত নেই – কোনো গভীর বারংবার উদ্ধৃত হচ্ছে, তার পিছনে হয়তো কেবল যুগচেতনাই নিহিত নেই – কোনও গভীর উদ্দেশ্যও বিদ্যমান।

৬. গ্যেটফ্রীড বেন ও টমাস মান-এর চিঠি দুটি তরজমা করার সময় যে অবিরলভাবে শ্রীসুবীর রায়চৌধুরীর পরামর্শ ও সাহায্য দ্বারা উপকৃত হয়েছি, এখানে এ-তথ্য কৃতজ্ঞচিত্তে উল্লেখ করা জরুরি মনে করি।

৬ষ্ঠ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা

(ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৭৫)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *