কলিকাতা নামের বুৎপত্তি – রাধারমণ মিত্র

কলিকাতা নামের বুৎপত্তি – রাধারমণ মিত্র

বঙ্গাব্দ ১৩৫৫-র প্রথম সংখ্যা সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় শ্রীযুক্ত সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ” ‘কলিকাতা’ নামের ব্যুৎপত্তি” এই শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লেখেন। ওই প্রবন্ধ প্রকাশিত হওয়ার প্রায় ৩০ বছর পরে দেশ পত্রিকার ২৫ ফাল্গুন ১৩৭৪ (ইং ৯ মার্চ ১৯৬৮) সংখ্যায় ওই প্রবন্ধটি লেখকের সম্মতি-ক্রমে হুবহু পুনর্মুদ্রিত হয়।

ইং ১৯৩৮ সালের সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় প্রকাশিত প্রবন্ধটি আমি বহুকাল পূর্বে পড়ি, এবং তখন আমার মনে কতকগুলি বিষয়ে সংশয় দেখা দেয়। আমি ওই বিষয়ে পড়াশোনা ও চিন্তা করতে থাকি। শেষে আমার মনে হয় ‘কলিকাতা’ নামের ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে সুনীতিবাবুর সিদ্ধান্ত ভুল; শুধু মূল বিষয়েই নয়, ইতিহাসাদি আনুষঙ্গিক অনেক বিষয়েই ভুল। এই ধারণা আমার কেন হল তার কারণগুলি এখন সুধীবৃন্দের সামনে উপস্থিত করলাম। আমার লেখায় ভুল থাকলে যদি কোনও সহৃদয় পাঠক তা দেখিয়ে দেন বিশেষ উপকৃত হব।

সুনীতিবাবুর প্রবন্ধটি দীর্ঘ, দেশ পত্রিকার প্রায় সাড়ে-তিন পৃষ্ঠাব্যাপী। তার মধ্যে যেগুলি প্রধান বিষয় সেগুলি লেখকের ভাষায় (দেশ পত্রিকার পাঠ অনুসরণে) প্রথমে তুলে দিয়ে তার নীচে আমার বক্তব্য জানিয়েছি।

মূল প্রবন্ধের ক্রম যতদূর সম্ভব এই আলোচনায় অনুসরণ করার চেষ্টা করেছি। তবে আলোচনার সুবিধার জন্য মাঝে মাঝে তার ব্যতিক্রম ঘটেছে। আপত্তিজনক উক্তিগুলি ভেঙে সাজানো ও সেগুলিকে ক্রমিক সংখ্যার দ্বারা চিহ্নিত করা হয়েছে।

এক

সুনীতিবাবু লিখেছেন ”আমরা সকলেই জানি, কলিকাতা শহর খুব প্রাচীন স্থান নহে। অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ ও ঊনবিংশ শতকের প্রারম্ভ হইতে কলিকাতার গৌরবের পত্তন।

১. ইহার কয়েক শতক পূর্বে কলিকাতার কোনও বিশেষ পরিচয় নাই।

২. তবে অনুমান হয়, অন্ততঃ খ্রীষ্টীয় পঞ্চদশ শতকের শেষ ভাগ হইতে, একটি বড়ো বা সমৃদ্ধ স্থান হিসাবে কলিকাতার নাম অন্ততঃ দক্ষিণ-বঙ্গে সুপরিচিত হইয়াছিল,

৩. এবং ষোড়শ শতকে ইহার নাম বাঙ্গালার বাহিরেও পঁহুছাইয়াছিল।

৪. সপ্তদশ শতকের শেষ ভাগে বাণিজ্য-কেন্দ্র হিসাবে কলিকাতা বিখ্যাত স্থান হইয়া দাঁড়ায়।”

মন্তব্য

১. ১ ও ২ সংখ্যক উক্তি পরস্পরবিরোধী। দুই উক্তিই একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।

২. ২ সংখ্যক উক্তি লেখক আরম্ভই করেছেন ‘অনুমান হয়’ এই বাক্যাংশ দিয়ে। কলকাতার সমৃদ্ধি ইতিহাসের ব্যাপার। এত গুরুতর একটি উক্তির সমর্থনে লেখক ইতিহাস থেকে একটি তথ্যও সঙ্কলন করে দেখাতে পারেননি। ইতিহাস বিষয়ে অনুমান ঐতিহাসিক সাক্ষ্য-প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত না হলে গ্রাহ্য হতে পারে না। অনুমান নিয়ে অধিক আলোচনা নিষ্প্রয়োজন। আমি পরে দেখাবো লেখক অন্যত্র এই উক্তিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।

৩. ষোড়শ শতকে কলকাতার নাম বাংলার বাইরে কোথায় পৌঁছেছিল স্পষ্ট করে লেখক তা বলেন নি।

৪. এই উক্তিটি অনৈতিহাসিক। সপ্তদশ শতকের শেষভাগে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে কলকাতা একটা বিখ্যাত স্থান হয়ে দাঁড়ায়নি। অখ্যাত নগণ্য গ্রাম মাত্র ছিল।

প্রথমত, সপ্তদশ শতকের শেষভাগে ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দের ২৪ অগস্ট তারিখে জোব চার্নক এখানে পদার্পণ করে ভারতের ভবিষ্যৎ রাজধানীর ভিত্তি স্থাপন করেন। কলকাতার সমৃদ্ধি তখন ভবিষ্যতের গর্ভে। তখন কলকাতা তিনটি নগণ্য গ্রামের একটি মাত্র। আট বছর পরেও অর্থাৎ ১৬৯৮ সালেও যখন ইংরাজ কোম্পানি ওই তিনটি গ্রামের খাজনা আদায়ের অধিকার খরিদ করে তখনও কলকাতা নগণ্য গ্রাম মাত্র ছিল।

দ্বিতীয়ত, জোব চার্নক মাদ্রাজ থেকে ফিরে এসে কলকাতায় নামেননি, নেমেছিলেন সুতানুটি গ্রামে, আর ওই গ্রামেই তিনি বসবাস করেন। পরবর্তী ‘টাউন’ কলকাতায় অর্থাৎ বর্তমান ডালহাউসি স্কোয়ার অঞ্চলে তিনি থাকতেন ও ওইখানেই তিনি মারা যান –এর আদৌ কোনও প্রমাণ নেই। বরং উল্টো প্রমাণ আছে। সেন্ট জন গির্জার সংলগ্ন কবরখানায় তাঁর সমাধি-সৌধটি তাঁর মৃত্যুর দু-তিন বছর পরে তাঁর জামাতা চার্লস আয়ার নির্মাণ করেন। চার্নকের মৃত্যুর পর থেকেই কোম্পানির কর্মচারীরা ডালহাউসি অঞ্চলে বাস করতে আরম্ভ করে এবং ওই স্থানই তাদের কর্মকেন্দ্র হয়ে ওঠে। চার্নকের আগমনের পূর্বেই যদি কলকাতা একটি বিখ্যাত বাণিজ্যকেন্দ্র হয়ে থাকত, তাহলে চার্নক কলকাতাতেই নামতেন, সুতানুটিতে নয়। সুতানুটিতে নেমেছিলেন এইজন্য যে সুতানুটি বরং তখন একটা বিখ্যাত না হোক, বাণিজ্যকেন্দ্র ছিল।

তৃতীয়ত, সপ্তদশ শতকের শেষভাগে বাণিজ্যকেন্দ্র হিসাবে কলকাতা যে কত নগণ্য স্থানে ছিল তার আরও কতকগুলি প্রমাণ এখানে দিচ্ছি

ক. Col. Henry Yule, যিনি A. C. Burnell -এর সঙ্গে Hobson-Jobson গ্রন্থ রচনা করেন, তিনি ইংল্যান্ডের ইস্ট ইন্ডিয়া হাউস ও অন্যান্য জায়গার দপ্তর তন্ন তন্ন করে খুঁজে ১৬৭৫ সালের English Pilot গ্রন্থে ও একটি পুরাতন Marine Chart-এ ‘Chuttanuttee’ ও ‘গোবিন্দপুর’ নাম পেয়েছেন, কিন্তু ‘কলিকাতা’ নাম পাননি। কোম্পানির পুরোনো কাগজপত্রে ‘কলিকাতা’ নামের সর্বপ্রথম উল্লেখ যা তিনি আবিষ্কার করতে পেরেছেন তার তারিখ ১৬ অগস্ট ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দ।

খ. শুধু তাই নয়। বিলাতের ইন্ডিয়া অফিসে কলকাতার Factory Council-এর লেখা যে সব চিঠিপত্র আছে, সে সব চিঠির মাথায় ১৭০০ সালের ২৭ মার্চ পর্যন্ত কলকাতার নাম নেই, আছে Chuttanuttee-র নাম। ওই বছরের ৮ জুন থেকে যে সব চিঠি লেখা হয় তাদের মাথায় আছে Calcutta নাম এবং ওই বছরের ২০ অগস্ট থেকে যে সব চিঠিপত্র লেখা হয়েছে তাতে স্থানের নাম আছে ‘Fort William in Calcutta’।

গ. ১৬৯৮ সাল পর্যন্ত ভারতবর্ষের মাত্র একটি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি একচেটিয়া ব্যবসা ক’রে আসছিল। তার নাম ছিল London Company। ওই সালে ইংল্যান্ডের রাজা আর একটি ইংরেজ কোম্পানিকে ভারতবর্ষে একচেটিয়া ব্যবসা করার লাইসেন্স দেন। এই কোম্পানির নাম English Company। ফলে চার বছর ধরে এই দুই কোম্পানির মধ্যে প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলতে থাকে। তাতে দুই কোম্পানিরই প্রচুর লোকসান হয়। শেষে কোম্পানি দুটি বুঝল যে মারামারি না করে দুই কোম্পানি মিলে এক হয়ে যাওয়াই ভালো। ১৭০২ সালে মিলিত হবার চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হল কলকাতায়। কিন্তু সে চুক্তিপত্রে স্থানের নামের উল্লেখ আছে কলিকাতা বলে নয়, Chuttanuttee বলে।

ঘ. ১৭০৩ সালের John Thornhill-এর Chart-U Kitherpore (খিদিরপুর)- এর উল্লেখ আছে, কলকাতার কোনও উল্লেখ নেই।

উপরের তথ্যগুলি থেকে প্রমাণিত হয় যে সপ্তদশ শতকের শেষভাগে কেন, অষ্টাদশ শতকের প্রথম দিকেও, কলকাতা বিখ্যাত স্থান হয়ে ওঠেনি।

দুই

এরপর সুনীতিবাবু ‘কলিকাতা’ নামের প্রচলিত ছ’টি ব্যুৎপত্তির উল্লেখ করেছেন এবং সব ক’টিকেই গ্রহণযোগ্য নয় বলে খারিজ করে দিয়েছেন।

করুন, তাতে আমাদের আপত্তি নেই। তবে আর একটি ব্যুৎপত্তি আছে যেটি অন্য কোনও কারণ না হলেও নিছক ভাষাতত্বের দিক থেকে চিত্তাকর্ষক এবং সুনীতিবাবুর মতো ভাষাতাত্বিকের সেটি খেয়াল রাখা উচিত ছিল।

সুনীতিবাবু বলেছেন ”সাধু বা পুরাতন বাঙ্গালার রূপ ‘কলিকাতা’, কলিকাতা-অঞ্চলে ও পশ্চিম-বঙ্গে প্রচলিত কথিত বাঙ্গালার (চলিত-ভাষার) রূপ ‘ক’লকাতা, ক’লকেতা (কোলকাতা, কোলকেতা)’।”

‘কলিকাতা’কে আমরা যেমন উচ্চারণ করি ‘কোলিকাতা’, ‘কলকাতা’কেও আমরা সেই রকম উচ্চারণ করি ‘কোলকাতা’। এখন, যে ব্যুৎপত্তির কথা বলছি সে অনুসারে ‘কোলিকাতা’=কোলি কা হাতা এবং ‘কোলকাতা’=কোল কা হাতা। এর অর্থ ‘কোলি’ বা ‘কোল’ নামক জাতির গণ্ডি বা দেশ।

তিন

এরপর সুনীতিবাবু লিখেছেন ” ‘কলিকাতা’ নামটির ইতিহাস, পুরাতন পুস্তক ও কাগজ-পত্রে ইহার অবস্থান লইয়া বিচার করা যাউক।

(১) কলিকাতার সর্বপ্রাচীন উল্লেখ পাওয়া যায় বিপ্রদাস-কৃত মনসামঙ্গল কাব্যে। এই পুস্তক খ্রীস্টীয় ১৪৯৫ সালে (১৪১৭ শকে) রচিত হয় (বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল সম্বন্ধে দ্রষ্টব্য, শ্রীযুক্ত সুকুমার সেনের প্রবন্ধ, ‘সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকা’ ১৩৪৩ বঙ্গাব্দ, দ্বিতীয় সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৬৪-৭৩)। …চাঁদ সদাগরের সিংহল-যাত্রা প্রসঙ্গে কলিকাতার উল্লেখ আছে (সুকুমার সেনের প্রবন্ধ, পৃঃ ৭০)। কলিকাতার পাশ দিয়া গিয়া, …চাঁদ সদাগর কালীঘাটে গিয়া কালিকার পূজা করেন।

১৪৯৫-এর লেখা বইয়ের প্রমাণে, কলিকাতা ও কালীঘাট দুইটি পৃথক স্থান। কালীঘাটের বিকারে কলিকাতা–আধুনিক বাঙ্গালার এইরূপ ধ্বনি-পরিবর্তন, এবং প্রাচীন ও নবীন দুই রূপের এভাবে পাশাপাশি অবস্থান-ইহা অসম্ভব।”

মন্তব্য

বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল নিয়ে দু’জন নামকরা সাহিত্যিক বিশেষ আলোচনা করেছেন। একজনের নাম সুনীতিবাবু নিজেই উল্লেখ করেছেন-অধ্যাপক শ্রীযুক্ত সুকুমার সেন। দ্বিতীয় জন হচ্ছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা সাহিত্যের রবীন্দ্র-অধ্যাপক শ্রীযুক্ত আশুতোষ ভট্টাচার্য। শ্রীযুক্ত ভট্টাচার্য তাঁর ‘মঙ্গল কাব্যের ইতিহাস’-এ বিপ্রদাসের মনসামঙ্গলের রচনাকাল ও ভাষা সম্বন্ধে বিস্তৃত আলোচনা করে শেষে মন্তব্য করেছেন ওই কাব্যে কলকাতাসমেত গঙ্গাতীরবর্তী যতগুলি গ্রামের নামের উল্লেখ আছে সবগুলিই প্রক্ষিপ্ত, কারণ তাঁর মতে ওই নামগুলি আধুনিক।

সুনীতিবাবু বাংলা ১৩৪৩ সালের দ্বিতীয় সংখ্যা সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় প্রকাশিত শ্রীযুক্ত সুকুমার সেনের বিপ্রদাসের মনসামঙ্গল প্রবন্ধের উল্লেখ করেছেন এবং একমাত্র তারই উপর নির্ভর করেছেন। তাতে শ্রীযুক্ত সেন কী মত প্রকাশ করেছেন জানি না, কেননা সে প্রবন্ধ আমি পড়িনি, কিন্তু তাতে কিছু যায়-আসে না। সময় দাঁড়িয়ে নেই। সুকুমারবাবুর কলমও থেমে থাকেনি। বাংলা ১৩৪৩ সালের পরে তিনি ‘বাঙ্গালা সাহিত্যের ইতিহাস’ রচনা করেছেন। সেই প্রামাণ্য ইতিহাসের প্রথম খণ্ডের পূর্বার্ধের ১৯৬৩ সালে প্রকাশিত ৪র্থ সংস্করণে (পৃ ১৮৪-২১৪) শ্রীযুক্ত সেন সপ্তগ্রাম থেকে আরম্ভ করে কালীঘাট পর্যন্ত কাব্যে উল্লিখিত গঙ্গাতীরবর্তী স্থানগুলির একটি তালিকা দিয়েছেন। সেই তালিকায় নিম্নলিখিত স্থানগুলির নাম আছে কুমারহট্ট, হুগলি, ভাটপাড়া, বোরো, কাঁকিনাড়া, মুলাজোড়, গাড়ুলিয়া, পাইকপাড়া, ভদ্রেশ্বর, চাঁপদানি, ইছাপুর, বাঁকিবাজার, জমিন, দিগঙ্গ, নিমাইতীর্থ, চাণক্য, বুড়নিয়ার দেশ, আকনা মাহেশ, খড়দহ, রিষিড়া, সুখচর, কোননগর, কোতরং, কামারহাটী, আড়িয়াদহ, ঘুসুড়ি, চিত্রপুর, কলিকাতা, বেতড়, ধনণ্ড, কালীঘাট। খড়দহের পাদটীকায় শ্রীযুক্ত সেন লিখেছেন ”এ বর্ণনা অনেকাংশেই প্রক্ষিপ্ত। খড়দহের প্রসঙ্গে আছে, ‘খড়দহে শ্রীপাটে করিয়া দণ্ডবৎ।’ নিত্যানন্দ এখানে আনুমানিক ১৫৩৫ সালের দিকে বাস করিয়াছিলেন। তাহার আগে নয়। সুতরাং অন্যথা অ-খ্যাত এই স্থানটি ১৪৯৫ সালে ‘শ্রীপাট’ অর্থাৎ বৈষ্ণব মহান্তের বাস হেতু তীর্থস্থান বলিয়া গণ্য হইতে পারে না।”

শুধু তাই নয়। অন্তত আরও একটি জায়গা শ্রীযুক্ত সেন-এর দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে — সেটি নিমাইতীর্থ। ১৪৯৫ খ্রিস্টাব্দে নিমাই-এর বয়স ছিল ১০ বছর। সুতরাং সেই সময় তিনি বৈদ্যবাটীতে আসতেই পারেন না, এসেছিলেন ঢের পরে, পুরী যাবার পথে। তখনই এই স্থান তাঁর নামে তীর্থস্থান হয়ে ওঠে। অতএব ১৪৯৫ সালে নিমাইতীর্থ ছিল না। শ্রীযুক্ত সেন লিখেছেন ”বিপ্রদাসের কাব্যের সবচেয়ে পুরাণো পুঁথি অষ্টাদশ শতকের প্রথমার্ধের আগেকার নয়।” তা নয় হল, —কিন্তু ‘কলিকাতা’ নাম? শ্রীযুক্ত সুকুমার সেন লিখেছেন ”কলিকাতা নামও প্রক্ষেপ বলিয়া মনে করি।”

এরপর সুনীতিবাবু লিখেছেন ”(২) কবিকঙ্গণ মুকুন্দরামের চণ্ডীকাব্যে (খ্রিস্টাব্দ ১৫৮০-১৫৮৫?) কলিকাতা ও কালীঘাটের পৃথক-পৃথক উল্লেখ আছে। এই উল্লেখ সুপরিচিত।”

মন্তব্য

মুকুন্দরামের চণ্ডীমঙ্গল কাব্যের রচনাকাল সম্বন্ধে পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়। শ্রীযুক্ত সুকুমার সেন ও শ্রীযুক্ত আশুতোষ ভট্টাচার্য দুজনেরই মত —সুনীতিবাবুর উল্লিখিত কালে ওই কাব্য রচিত হয়নি, তার পরে হয়েছে। সুনীতিবাবু নিজেও নিজের দেওয়া সাল সম্বন্ধে সন্দিহান। অন্যদিকে বাংলা ১৩১৩ সালের সাহিত্য-পরিষৎ-পত্রিকায় অম্বিকাচরণ গুপ্ত ‘কবিকঙ্কন ও তাঁহার চণ্ডীকাব্য’ এই শিরোনামায় এক প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। তাতে তিনি লিখেছেন —”আমরা দামুন্যা গ্রামের তিন মাইলের মধ্যে অবস্থিতি করি….প্রায় ৫০/৬০ খানি পুঁথি (চণ্ডীর —রা. মি.) আমাদের হস্তগত হইয়াছে, তাহাদের কোনখানিতে ঐ (অর্থাৎ রচনার কাল-নির্দেশক –রা. মি.) শ্লোক দেখি নাই।” (দ্র ‘মঙ্গল-কাব্যের ইতিহাস’)। এই উক্তির পর আমার মনে হয় চণ্ডীকাব্যের রচনাকাল সম্পর্কে মৌন অবলম্বন করাই শ্রেয়।

এখন দেখা দরকার ওই কাব্যে সত্যসত্যই কলকাতার নাম আছে কি না। সাহিত্য-রথী অক্ষয়চন্দ্র সরকার তাঁর স্বগৃহে সযত্নে রক্ষিত একখানি পুঁথি থেকে মুকুন্দরামের চণ্ডীকাব্যের দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশ করেন। এই সংস্করণ সম্বন্ধে পূর্বোক্ত অম্বিকাচরণ গুপ্ত বলেছেন ‘শ্রীযুক্ত অক্ষয়চন্দ্র সরকার চণ্ডীকাব্যের যে একটি সংস্করণ প্রকাশিত করিয়াছেন তাহার পাঠ অনেকটা নির্ভরযোগ্য বটে।’ (দ্র ‘মঙ্গলকাব্যের ইতিহাস’)। সরকার মশাইয়ের এই সংস্করণে ‘কলিকাতা’ ও ‘কালীঘাট’ কারওরই উল্লেখ নেই।

দ্বিতীয়ত, বাংলা ১২৯৯ সনে (ইং ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে) মুদ্রিত তৃতীয় সংস্করণ ”বিশ্বকোষ”-এ লেখা ‘কলিকাতা’ প্রবন্ধের লেখক বলেছেন ”মুদ্রিত পুস্তকে থাকিলেও, কবিকঙ্কণ রচিত চণ্ডীমঙ্গলের যে কয়েকখানি প্রাচীন পুঁথি দেখিলাম, তন্মধ্যেও ‘কলিকাতা’ নামের উল্লেখ নাই।”

তৃতীয়ত, দ্বিজমাধবাচার্যের চণ্ডীকাব্যে ধনপতি ও শ্রীমন্তের সমুদ্র-যাত্রা বর্ণনা প্রসঙ্গে বরাহনগর, চিত্রপুর, কালীঘাট ইত্যাদি কাছাকাছি জায়গার উল্লেখ থাকলেও, ‘কলিকাতা’ নামের উল্লেখ নেই। অবশ্য কবি মাধবের রচনাকাল সম্বন্ধে নানা মুনির নানা মত। কেউ বলেন ১৫৭৯, কেউ বলেন ১৬৪৫, কেউ বলেন ১৬৪৭, আবার কারও মতে ১৬৬৪ সাল। প্রথম তারিখের কথা ছেড়ে দিয়ে একেবারে শেষের তারিখকে রচনাকাল ধরলেও দেখা যাচ্ছে ১৬৬৪ সালেও দ্বিজমাধবের চণ্ডীকাব্যে ‘কলিকাতা’র নাম নেই।

সুতরাং মুকুন্দরামের চণ্ডীকাব্যে ‘কলিকাতা’ নামের উল্লেখ সুনিশ্চিতরূপে প্রমাণিত হল না।

এরপর সুনীতিবাবু লিখেছেন ”(৩) ইহার পরে কলিকাতার উল্লেখ পাওয়া যায় আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে –আনুমানিক ১৫৯০ খ্রীষ্টাব্দ। Hobson-Jobson-এ আইন-ই-আকবরীর প্রমাণ উদ্ধৃত আছে।

১. Blochmann ব্লখ মান সাহেবের সম্পাদিত মূল ফারসি (‘দেশ’ পত্রিকায় ভুল করে ‘ফরাসী’ ছাপা হয়েছে –রা. মি.) আইন-ই-আকবরীতে Klkt (Kalkata বা Kalikata) রূপে নামটি পাওয়া যায়; আবার এই বইয়ের বিভিন্ন হস্তলিখিত পুঁথিতে পাঠান্তর আছে –Kln=’কলনা’, Klt= ‘কলতা’, Tlp = ‘তলপা’। ‘কলকাতা’ ও ‘কলপা’ এই দুই পাঠভেদ সর্বপ্রাচীন দুইখানি পুঁথিতে পাওয়া যায়।

২. ‘কলকাতা, Bkw’ বকোয়া ও Brbkpur বারবকপুর’ এই তিনটি মহাল সাতগাঁ সরকারের অধীনে ছিল। ….

৩. তবে ১৫৯০ খ্রিস্টাব্দে আইন-ই-আকবরীর সময় কলিকাতা যে একটি লক্ষণীয় স্থান ছিল, তাহা অনুমান করা যাইতে পারে –

৪. ১৪৯৫ খ্রীষ্টাব্দের পূর্বেই ইহা ভাগীরথীর তীরে উল্লেখযোগ্য গ্রাম বা ব্যবসাকেন্দ্র-রূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল।”

মন্তব্য

১. ক. আমার মতো আনাড়ি ঐতিহাসিকের পক্ষে এ ব্যাপারে কথা বলতে যাওয়া ধৃষ্টতা হবে, তাই নিজের মত ব্যক্ত না করে এ বিষয়ে বাংলাদেশের তথা ভারতের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ ঐতিহাসিকের মত উদ্ধৃত করব। কিন্তু তার আগে আমার পক্ষ থেকে সুনীতিবাবুর কাছে এইটুকু সবিনয় নিবেদন করতে চাই যে যেখানে এতরকম পাঠভেদ দেখা যাচ্ছে সেখানে অন্য পাঠ বাদ দিয়ে শুধু ‘কলিকাতা’ বা ‘কলকাতা’ পাঠ গ্রহণ করবার পক্ষে কী যুক্তি থাকতে পারে? যদি বলেন সর্বপ্রাচীন পুথিতে এই পাঠটি আছে, তাহলে ‘তলপা’ পাঠ গ্রহণ করতে আপত্তি কি, যখন, তিনি নিজেই বলেছেন, এ পাঠটিও সর্বপ্রাচীন পুথিতে আছে?

খ. এখন স্যার যদুনাথ সরকারের মতো ঐতিহাসিকের মত উদ্ধৃত করছি। তিনি লিখেছেন ‘Calcutta is unlikely. I prefer the variant in text Kalna’।

মূল ফারসি আইন-ই-আকবরি গ্রন্থের মাত্র প্রথম খণ্ড Blochmann সাহেব ইংরেজি ভাষায় অনুবাদ করেন। তার দ্বিতীয় ও তৃতীয় খণ্ড সটীক অনুবাদ করেন Col. H.S. Jarrett যথাক্রমে ১৮৯১ ও ১৮৯৪-৯৬ খ্রিস্টাব্দে। Jarrett-কৃত এই দুই খণ্ড অনুবাদ ‘corrected and further annotated’ হয়ে প্রকাশিত হয় যথাক্রমে ১৯৪৯ ও ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দে। Jarrett-কৃত দ্বিতীয় খণ্ডের অনুবাদের পাদটীকায় স্যার যদুনাথ ওই মন্তব্য করেছেন।

২. যদি তর্কের খাতিরে মেনেও নেওয়া যায় যে আইন-ই-আকবরীতে কলকাতার নাম আছে, সে কলকাতা কি একটি গ্রাম না মহল? আইন-ই-আকবরি বলছে ‘মহল’, সুনীতিবাবু ধরে নিয়েছেন ‘গ্রাম’। (৩ ও ৪ অংশে তাঁর উক্তি দ্রষ্টব্য।) গণ্ডগোলের মূল এইখানেই।

বলা বাহুল্য মহল (এক বচনে ‘মহল’, বহু বচনে ‘মহাল’) ও গ্রাম এক জিনিস নয়। মহল গ্রামের চেয়ে অনেক, অনেক বড়। কত বড় তার খানিক ধারণা হবে এই হিসাব থেকে বাংলা ‘সুবা’র মধ্যে মোট ২৪টি ‘সরকার’ ও ৬৮৭টি ‘মহাল’ ছিল। সরকার সাতগাঁর অধীনে তথাকথিত কলকাতা নিয়ে মোট ৫৩টি মহাল ছিল। সরকার সাতগাঁর মোট রাজস্ব ছিল ১৬,৭২৪,৭২৪ দাম; সরকার সাতগাঁর অধীনে কলকাতা (অথবা কলনা), বকোয়া ও বারবাকপুর এই তিনটি মহালের মিলিত রাজস্ব ছিল ৯৩৬,২১৫ দাম।

এ থেকে স্পষ্ট বোঝা যায় যে একটি ‘মহাল’ একটি ‘গ্রাম’-এর থেকে বহু, বহু গুণ বড় ছিল-পরবর্তী কালের প্রায় একটি ‘পরগণা’র সমান ছিল। প্রকৃতপক্ষে বহু পরবর্তী কালে ‘মহাল’ কলকাতার বদলে একটি ‘পরগণা’ কলকাতার সাক্ষাৎ পাই। তথাকথিত কলকাতা মহলের মধ্যে কতগুলি গ্রাম ছিল ও তাদের কি কি নাম ছিল তা আইন-ই-আকবরীতে দেওয়া নেই।

৩. এই উক্তিটি এক/৩-এর পুনরাবৃত্তি মাত্র। সমস্তটাই ‘অনুমান’। আইন-ই আকবরির মতো অত বড় এক ইতিহাসগ্রন্থ থেকে লেখক একটা প্রমাণও বার করতে পারেননি।

৪. এই উক্তিটিও এক /২-এর পুনরাবৃত্তি মাত্র। সুতরাং এক/২-এর সম্বন্ধে যে মন্তব্য করা হয়েছে সেই মন্তব্য এখানেও প্রযোজ্য। অধিক বলা অনাবশ্যক।

এর পর সুনীতিবাবু লিখেছেন

৫. ”কলিকাতা-শহরের মধ্যে প্রাপ্ত প্রাচীনতম দলিল হইতেছে একখানি পাথুরে দলিল। বহুকাল হইতে, কলিকাতার অধিবাসী বিখ্যাত আরমানী ইতিহাসবিৎ শ্রীযুক্ত Mesrobv J. Seth মেসরোভ সেথ মহাশয়, কলিকাতার আরমানী গির্জার সংযুক্ত গোরস্থানে প্রাচীন আরমানী সমাধি-ফলকগুলির মধ্যে একখানিতে নিম্নপ্রমাণে লিপি পাঠ করেন-‘এই সমাধি-ফলক হইতেছে, দানশীল বণিক Sukias সুকিয়াস-এর পত্নী Rezabeebeh রেজা-বী-র’। ইহাতে আরমানী সন-তারিখ দেওয়া হইয়াছে, হিসাব করিয়া খ্রীষ্টান বা ইংরেজী শকের ১৬৩০ (ভুল ক’রে ছাপা হয়েছে ১৬৩২-রা. মি.) অব্দ হয়।…

৬. এই লেখা হইতে জানা যায় যে, ১৬৩০ সালের দিকে, সম্রাট জাহাঙ্গীরের রাজত্বশেষে ও শাহজাহানের রাজত্বের প্রারম্ভে, কলিকাতায় আরমানী বণিকদের একটি কেন্দ্র ছিল, এবং এই কেন্দ্রে ইঁহারা স্ত্রী পুত্র পরিবার আনিয়া বাস করিতেন। ইংরেজ Job Charnock যোব চারনক ১৬৯০ খ্রীষ্টাব্দে কলিকাতায় আসিয়া বাস করিবার প্রায় ৬০ বৎসর আগে-দুই পুরুষ আগে-আরমানীরা কলিকাতায় উপনিবিষ্ট হইয়াছিল।”

মন্তব্য

৫. ক. কলকাতা শহরের মধ্যে প্রাপ্ত প্রাচীনতম দলিলখানি নিজেরই প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে, কলকাতার প্রাচীনত্ব প্রমাণ করে না। যদি পাথুরে দলিলের গায়ে কলকাতার নাম লেখা থাকত, তাহলেই প্রমাণ হত যে ১৬৩০ সালেও কলকাতা নামে এক গ্রাম বা শহর বাংলাদেশে ছিল। শোনা যায় আমাদের কালীঘাটে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে এককালে কতকগুলি রোমান বা গুপ্ত যুগের (?) মূদ্রা পাওয়া যায়। তা থেকে প্রমাণ হয় না যে রোমানদের বা গুপ্তদের সময়ে কালীঘাট গ্রাম বিদ্যমান ছিল বা ওইসব রোমানদের বা গুপ্তদের মুদ্রা কালীঘাটে মুদ্রাঙ্কিত হয়েছিল।

খ. যে মেসরোভ সেথ ওই দলিলখানি আবিষ্কার করেন তাঁরই ইতিহাস গ্রন্থ থেকে জানা যায় যে ১৬৩০ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের কোনও গ্রামে বা শহরের আরমানি বণিকদের বসবাস আরম্ভ হয়নি। পরবর্তীকালে সৈদাবাদ (মুর্শিদাবাদের উপকণ্ঠে), চুঁচড়া, চন্দননগর, ঢাকা ও কলকাতা-বাংলাদেশের মাত্র এই পাঁচটি গ্রামে বা শহরে তাদের উপনিবেশ গড়ে ওঠে।

মেসরোভ সেথ লিখেছেন ‘Armenians formed their first settlement in Bengal in the year 1665 by virtue of a farman issued by Moghul Empeor Aurangzeb granting them a piece of land at Saidabad, wih full permission to form a settlement there’। সে যুগে মোগল সম্রাটগণ জমি ও অনুমতি না দিলে কোনও বিদেশিই ভারতের কোথাও বসবাস করতে পারত না।

চুঁচড়া সম্বন্ধে সেথ মশাই লিখেছেন ‘The Armenians had attached themselves to their confreres in trade, the Dutch, at Chinsurah, in the year 1645 under the leadership of the famous Margar family’। এখানে সেথ সাহেবের ভাষা লক্ষণীয়। তিনি বলছেন না যে আরমানিরা ১৬৪৫ সালে চুঁচড়ায় বসবাস আরম্ভ করে। তা বললে তো তাঁরই আগেকার উক্তিকে খণ্ডন করা হয়। বলছেন তারা ওই সালে ওলন্দাজদের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপন করে অর্থাৎ তাদের সঙ্গে ব্যবসাবাণিজ্য করতে আরম্ভ করে। তাহলে নিশ্চয় তারা এই ব্যবসা বাংলার বাইরে থেকে চালাত। বাংলাদেশে আরমানিদের সর্বপ্রথম গির্জা ১৬৯৫ সালে চুঁচড়ায় নির্মিত হয়। সুতরাং ১৬৬৫ ও ১৬৯৫-এর মধ্যে কোনও সময়ে তারা চুঁচড়ায় বসবাস আরম্ভ করে।

আরমানিরা চন্দননগরে প্রথম কখন আসে সে কথা সেথ সাহেব বলতে পারেননি। মাত্র এইটুকু বলেছেন যে চন্দননগরের ফরাসি কবরখানায় সব থেকে পুরোনো আরমানি কবর আছে একজন বণিকের, যিনি মারা যান ১৭৫৩ খ্রিস্টাব্দে।

সেথ সাহেবের মতে ঢাকায় আরমানিরা বসবাস আরম্ভ করে অষ্টাদশ শতকের গোড়ার দিকে।

তাহলে দেখা যাচ্ছে ১৬৩০ সালে বা তার পূর্বে আরমানিদের কলকাতায় বসবাস করার কথা অলীক কল্পনা মাত্র।

৬. ১৬৩০ সালের কলকাতায় আরমানি বণিকদের একটি কেন্দ্র ছিল এবং এই কেন্দ্রে তারা স্ত্রীপুত্র পরিবার নিয়ে বাস করত-এ কথা প্রথমে বলেন মেসরোভ সেথ সাহেব, তাঁকে অনুসরণ করে সুনীতিবাবু এই প্রবন্ধে সেই কথা বলেছেন।

অষ্টাদশ শতকের কলকাতায় Catchick Arakiel নামে এক ধনী আরমানি বণিক বাস করতেন। তিনি স্থানীয় আরমানি গির্জার জন্য অনেক কিছু করেন। গির্জার অভ্যন্তরভাগ অলঙ্কৃত করেন, গির্জার ঘড়ি-ঘরে যে ঘড়িটা আছে গির্জা-সংলগ্ন সমাধিক্ষেত্রের চারিদিকে যে উঁচু পাঁচিল আছে সেই পাঁচিল নির্মাণ করিয়ে দেন। এঁরই পুত্র Agah Moses Catchick Arakiel কলকাতায় জন্মান অষ্টাদশ শতকে। তিনি ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে Hawksworth নামে এক সাহেবকে একখানি চিঠি লেখেন। Hawksworth সাহেব সেই চিঠিখানি East Indian Chronologist নামে এক পত্রিকায় ছাপিয়ে দেন। সেই চিঠিতে Arakiel সাহেব বলেছেন

Shortly after the establishment of Calcutta by the English, the Armenians settled among them,…The site of the present Armenian church was at that time their burying ground in which there are tombstones dated 80 years back and consequently older than the present church।

বর্তমান আরমানি গির্জাটি তৈরি হয় ১৭২৪ সালে এবং তার সংলগ্ন সমাধিক্ষেত্রে ওই চিঠি লেখার সময় থেকে ৮০ বছর আগেকার অর্থাৎ ১৭২০/২১ সালের সমাধি আছে। ১৬৩০ সালের রেজা বিবির কবর ছাড়া এই গোরস্তানে সপ্তদশ শতকের দ্বিতীয় একটি কবর নেই। অন্য যেসব কবর আছে সবগুলিই অষ্টাদশ শতক ও পরবর্তী কালের। কেননা ১৭২০ সালে Kenanentch Phanoos নামে এক আরমানি নিজের সম্প্রদায়ের জন্য কবরস্থান করবার উদ্দেশে ওই জমি খরিদ করেন। ১৭২৪ সালে ওই কবরস্থানের এক পাশে Agsh Nazar নামে অন্য একজন আরমানি গির্জাঘর তৈরি করে দেন।

সপ্তদশ শতকের ‘একমেবাদ্বিতীয়ম’ কবর থেকে এটা প্রমাণিত হয় না যে ওই সময়ে কলকাতায় আরমানিদের একটি উপনিবেশ গড়ে উঠেছিল। একটিমাত্র লোক দিয়ে তা আর উপনিবেশ হয় না! আরমানিরা কলকাতায় ১৬৩০ থেকে ১৭২০ সাল পর্যন্ত ৯০ বছর স্ত্রীপুত্র পরিবার নিয়ে বাস করল অথচ তাদের মধ্যে আর একটি লোকও মরল না-এটা কি করে সম্ভব হতে পারে? যদি মরত তবে নিশ্চয় কবর থাকত এবং যদি বাস করত নিশ্চয়ই মরত। সুতরাং ইংরেজ আসার দুই পুরুষ আগে কলকাতায় আরমানিদের উপনিবেশ ছিল-এটা একেবারে আষাঢ়ে গল্প। কোন মোগল সম্রাট ১৬৩০ খ্রিস্টাব্দে বা তার পূর্বে আরমানিদের কলকাতায় বসবাসের অনুমতি দিলেন? সে অনুমতিপত্র কোথায়?

১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে জোব চার্নকের কলকাতায় আসার পর যে আরমানিরা এখানে আসে তার আর একটি প্রমাণ দিচ্ছি।

সপ্তদশ শতকের শেষের দিকে Khojah Phanoos Kalanthar (বা Kalandar) নামে একজন বিখ্যাত আরমানি বণিক সুরাতে বাস করতেন। তাঁর এক ভাগ্নে ছিলেন। তিনি কলকাতার ইতিহাসে আরও বিখ্যাত। তাঁর নাম Khojah Israel Sarhad। মামা-ভাগ্নে দুজনে মিলে ইংল্যান্ডে যান ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দে। সেখানে তখন Sir Josiah Child ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ডিরেক্টর বোর্ডের চেয়ারম্যান। সে সময়ে এই পদাধিকারীকে চেয়ারম্যান না বলে, গভর্নর বলা হত। বিলাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ভারতের আরমানি সম্প্রদায়ের মধ্যে ১৬৮৮ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন তারিখে দুটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়। কোম্পানির তরফে স্যার জোশিয়া চাইল্ড ও আরমানিদের তরফে খোজা ফানুস ও খোজা সরহদ স্বাক্ষর করেন। দ্বিতীয় চুক্তিটির বয়ান ছিল এই রকম

The Honourable East India Company stipulated ”that wherever forty or more of the Armenian nation shall become inhabitants of any of the garrisons, cities or towns belonging to the Company in the East Indies, the said Armenian shall not only have and enjoy the free use and exercise of their religion but there shall also be attached to them a parrel of ground to erect a church thereon for the worship and service of God in their own way. And that we will also at our own charge, cause a convenient church ro be made of timber which afterwards the said Armenians may alter and build with stone and solid material to their own good liking. And the said Governor and Company will also allow £ 50 per annum, during the space of seven years, for the maintenance of such priest or minister as they shall choose to officiate therein.

এই চুক্তি সম্পাদিত হওয়ার দু-বছর পরে জোব চার্নক ১৬৯০ খ্রিস্টাব্দে শেষবারের মতো কলকাতায় আসেন। তাঁর আসার ১৭ বছর পরে ১৭০৭ খ্রিস্টাব্দে উপরে উদ্ধৃত চুক্তি অনুসারে ইংরেজ কোম্পানি বর্তমান আরমানি গির্জার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে আরমানিদের জন্য একটি কাঠের ছোট গির্জাঘর (chapel) তৈরি ক’রে দেন। আর পুরোহিতের মাইনে বাবদ ৭ বছর পর্যন্ত ৫০ পাউন্ড করে বছরে দিয়ে যান। ১৭১৪ সালে এই সাহায্য বন্ধ হয়। এবং তার দশ বছর পরে আরমানিরা ওই কাঠের গির্জা পরিত্যাগ করে ১৭২০ সালে কেনা কবরখানার হাতার মধ্যে পাকা গির্জঘর তৈরি করে।

১৬৯০ সালে জোব চার্নকের আসার পর থেকে একটি দুটি করে আরমানি বণিক কলকাতায় আসতে থাকে। ১৭০৭ সালের আগে তাদের সংখ্যা চল্লিশেও পৌঁছায়নি। সুতরাং ১৬৩০ সালে স্ত্রীপুত্র পরিবার নিয়ে বাস ও উপনিবেশ স্থাপনের প্রশ্নই উঠতে পারে না। যদি তর্কের খাতিরে ধরে নেওয়া যায় যে সত্যিই ওই সময়ে কলকাতায় তাদের একটি উপনিবেশ ছিল, তাহলে এটা কি আশ্চর্যের কথা নয় যে তাদের মতো ধনী ও ধর্মপ্রাণ জাত ৯৪ বছরের মধ্যেও নিজেদের জন্য একটা গির্জাঘর ও ৯০ বছরের মধ্যেও একটা গোরস্থান তৈরি করল না? প্রায় একশো বছর ধরে তারা রবিবারের উপাসনা করত কোথায়? মৃতের সৎকার করত কোথায়?

এতকিছু বলার পরেও কিন্তু প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে ১৬৩০ সালের ওই রেজা বিবির কবর সম্বন্ধে। ও কবরের ব্যাখ্যা কী? মেসরোভ সেথ সাহেব যাঁকে ‘That renowned scholar’ এবং ‘Author of Early Annals of the English in Bengal’ বলেছেন সেই ‘Late Professor C. R. Wilson’ কবরটির ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন

Regarding the earliest grave of an Armenian in the Armenian churchyard in Calcutta, the tombstone is dated 11th July, 1630 A. D. This has been taken as showing that the Armenians were established in Calcutta as early as 1630. The inference does not seem valid. The instance is isolated. No other tombstones in the churchyard are dated earlier than the 18th century. There is nothing to show that the stone is in situ. It may well have been brought to Calcutta from elsewhere. An inscribed stone has recently been found in St. John’s churchyard which must somehow have come from China. Even if the stone is in situ it does not prove the existence of an Armenian colony. In India a person must be buried where he dies. If an Armenian voyager died in a ship near Calcutta, it would be necessary to bury the body there.

কলকাতার ‘পুরাতন প্রসঙ্গ’ এখানেই সাঙ্গ হয়নি। দেশ পত্রিকার আরও আধ পৃষ্ঠা ধরে বিস্তৃত হয়েছে। তাতে আরমানিদের পরে পোর্তুগিজদের ও তাদের পরে ইংরাজদের কলকাতায় আগমন, ১৭২৭ খ্রিস্টাব্দে ওই তিন জাতির কলকাতায় পাশাপাশি বাস ও বাণিজ্যসম্পদের সমান অংশীদারি, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে দিল্লি থেকে ইংরাজদের বাংলাদেশের অন্তর্বাণিজ্যে ও বহির্বাণিজ্যে কতকগুলি বিশেষ সুবিধালাভ, ১৬৯৮ (ভুলক্রমে ছাপা হয়েছে ১৭৯৮-রা. মি.) সালে বড়িষার সাবর্ণ চৌধুরী জমিদারদের কাছ থেকে সুতানুটী, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর এই তিনটি গ্রাম খরিদ, ১৬৯৯ সালে কলকাতা ইংরেজদের পুরো অধিকারে আসবার ফলে আরমানি ও পোর্তুগিজদের বাংলার বাণিজ্যে ও কলকাতায় প্রতিপত্তি হ্রাস, সুতানুটী, কলিকাতা ও গোবিন্দপুর গ্রামের সীমা ও ভৌগোলিক অবস্থিতি ইত্যাাদি মামুলি ও সুপরিচিত বিষয় বর্ণিত হয়েছে।

এই বর্ণনায়ও কতকগুলি ভুল আছে। প্রথম, পোর্তুগিজদের পরে ইংরেজরা আসেনি, ইংরেজদের পরেই পোর্তুগিজরা এসেছে। দ্বিতীয়, আরমানি, পোর্তুগিজ, ও ইংরাজ এই তিন জাতির বাণিজ্যসম্পদে সমান অংশীদারি কোনওদিনই ছিল না। পোর্তুগিজরা কলকাতায় ব্যবসা করল কবে? তারা তো ইংরেজদের সৈনিক হত, কেরানি হত, চাকর-বাকর হত এমনকি ক্রীতদাসও হত। তাদের মধ্যে তো একমাত্র ব্যবসাদার Baretto ও De Suja পরিবার। এঁরা কলকাতার লোক নন। এসেছিলেন বোম্বাই (মুম্বাই) থেকে অষ্টাদশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে। তৃতীয়, ১৬৩৮ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজরা বাংলাদেশের আন্তর্বাণিজ্যে ও বহির্বাণিজ্যে দিল্লি থেকে কোনও বিশেষ সুবিধালাভ করেনি। পরে করেছে। চতুর্থ, সাবর্ণ চৌধুরীদের কাছ থেকে ইংরেজরা তিনটি গ্রাম খরিদ করেনি, তিনটি গ্রামের খাজনা আদায়ের স্বত্ব খরিদ করে।

এইসব মামুলি ইতিহাস শুধু শোনাবার জন্যই শোনানো হয়েছে। অন্য কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। কলকাতার পাথুরে দলিলের কথাও শুধু আরমানিদের ইতিহাস শোনাবার জন্য পাড়া হয়েছে। বিপ্রদাস ও মুকুন্দরামের কাব্যের উল্লেখের তবু অর্থ বোঝা যায়। অর্থ হচ্ছে দেখানো যে ‘কালীঘাট’ নাম থেকে ‘কলিকাতা’ নাম হয় নি। নেতিবাচক প্রমাণ হলেও ‘কলিকাতা নামের ব্যুৎপত্তি’র সঙ্গে তার কিছুটা সম্বন্ধ আছে। কিন্তু আইন-ই আকবরির আলোচনা কী জন্য? তাতে তো কালীঘাটের নাম নেই। ওই দুটি কাব্য ও একটি ইতিহাস-গ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে যদি লেখক প্রমাণ করতে পারতেন কলকাতায় সেই যুগে শামুকপোড়া কলিচুনের উৎপাদন ও ব্যাবসা এবং তজ্জনিত তার সমৃদ্ধি ও খ্যাতি ছিল, শুধু তাহলেই ওই গ্রন্থগুলির আলোচনা সার্থক এবং প্রবন্ধের যা একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ছিল তা সিদ্ধ হত। তা না করে লেখক আমাদের কতকগুলি প্রাচীন পুস্তকে ‘কলিকাতা’ নামের উল্লেখ দেখিয়েছেন মাত্র। তিনি যেন ধরে নিয়েছেন শুধু এর দ্বারাই কলকাতার প্রাচীন সমৃদ্ধি ও খ্যাতি প্রমাণ করা যায়। এ ধারণা (যদি তাঁর সত্যই থেকে থাকে) একান্তই ভুল। কোনও গ্রন্থে কোনও স্থানের উল্লেখ থাকলেই প্রমাণিত হয় না যে সে স্থান বিখ্যাত। মনসামঙ্গল কাব্যে ‘জমিন’, ‘বুড়নিয়ার দেশ’-এর উল্লেখ আছে। কেউ তাদের নাম কখনও শুনেছে? আইন-ই-আকবরিতে তথাকথিত কলকাতার সঙ্গে ‘বকোয়া’ ও ‘বারাকপুর-এর উল্লেখ আছে। এদের পরিচয় কেউ জানে? সুতরাং এইসব পাণ্ডিত্যপূর্ণ পুরাতাত্বিক আলোচনা একেবারে অবান্তর ও নিরর্থক। এ দীর্ঘ আলোচনার মধ্যে লেখক একবারও একথা বলেননি যে ১৪৯৫ সাল বা তার আগে থেকেই কলকাতায় কলিচুন তৈরি হত, নতুবা গ্রামের নাম কলকাতা হতে পারত না। একথাটি তিনি অনেক পরে এবং অন্য প্রসঙ্গে কথায় কথায় বলেছেন-‘এখন হইতে সাড়ে চারি শত পাঁচ শত বৎসর পূর্বে’ (পাঁচ/৮.দ্রষ্টব্য)। প্রবন্ধের প্রায় শেষে আর একটি বাক্যে এই কথারই অস্পষ্ট ইঙ্গিত আছে-‘সম্ভবতঃ প্রথমটায় এই গ্রামে শামুক-পোড়া (কাতা) চুন বা কলিচুন প্রস্তুতই ইহার লক্ষণীয় ব্যবসায় ছিল।’

এই সুদীর্ঘ আলোচনা লেখকের আসল প্রস্তাবের ভূমিকা মাত্র। এইবার তিনি ”কলিকাতা নামের ব্যুৎপত্তি”র কথা আরম্ভ করছেন।

চার

সুনীতিবাবু লিখেছেন

১. ” ‘সুতানুটী’ নাম সম্বন্ধে কোনও গোলমাল নাই। বেশ বুঝিতে পারা যায়, সুতানুটীতে সুতার হাট বা বাজার বসিত-সুতার নুটী, অর্থাৎ জড়াইয়া গোলাকার তাল বা পিণ্ড করিয়া রাখা সুতা, বহুল পরিমাণে বিক্রয় হইত বলিয়া ঐ নাম।

২. হয়তো ঐ অঞ্চলের আদি নাম ছিল ‘চিৎপুর’, পরে চিৎপুরের অন্তর্গত বা সন্নিকটে যে ‘সুতার নুটীর হাট’ বসিত, তাহাই ‘সুতানুটীর হাট’ বা ‘সুতানুটী হাট’ রূপে পরিচিত হয় ও শেষে সংক্ষেপে হাট ও হাটের সংশ্লিষ্ট স্থানেরই নাম দাঁড়ায় ‘সুতানুটী’।

৩. এই ‘সুতীনুটী’ নামেরই অনুরূপ ‘কলিকাতা’ নাম।

৪. ‘কলিকাতা’-একটি খাঁটি বাঙ্গালা শব্দ।

৫. ইহার অর্থ, ‘কলি’ বা কলিচূনের জন্য ‘কাতা’ শামুক পোড়া।

৬. সুতার নুটী বা গোলার হাট বা আড়ত হইতে যেমন ‘সুতানুটী’ নাম, তেমনি কলির বা চূনের ও কলিচূনের জন্য শামুকের আড়ত, এবং চূনের কারখানা হইতে ‘কলি-কাতা’ নাম।

৭. পাথরিয়া চূন দক্ষিণ-বঙ্গে হয় না, এ অঞ্চলে শামুক ও ঝিনুক পোড়াইয়াই চূন প্রস্তুত হয়।

৮. এই চূন দেওয়ালে চূনকাম করিবার বা ‘কলি ফিরাইবার’ জন্যই প্রস্তুত সেই জন্য ইহাকে কলিচূন বলে।

৯. শামুক-পোড়ানো চূন জৈব পদার্থের বিকার বলিয়া, নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ বা ব্রাহ্মণেতর অন্য ঘরের নিষ্ঠাবতী বিধবারা ঐ চূন দিয়া পান খাইতেন না।

১০. পাথরিয়া চূন এ অঞ্চলে সুলভ হওয়ার পূর্বে, ঐ কারণে পান খাওয়াই সদাচার-পালনের বিরুদ্ধ হইয়া দাঁড়াইত।

১১. ‘কলি’-শব্দ বাঙ্গালায় সুপরিচিত। ‘কাতা’ শব্দ চূন অর্থে কলিকাতা অঞ্চলে ব্যবহৃত হইত, প্রাচীনদের মুখে শুনিয়াছি।…উত্তরবঙ্গে রাজশাহী জিলায়, শামুক পোড়াইয়া, তাহাতে জল দিয়া চূনে রূপান্তরিত করিবার পূর্বে, পোড়ানো শামুক বা জোঙ্গড়াকে ‘কাতা’ বলে। পোড়ানো শামুক বা জোঙ্গাড়াকে বাঙ্গালাদেশে কোনও-কোনও অঞ্চলে ‘বাখারী’ও বলে।…

১২. ‘কলি’ শব্দ (হিন্দুস্থানীতে ‘কলী’) দেওয়ালে লাগাইবার জন্য শামুকপোড়া চূন অর্থে উত্তর-ভারতে সুপ্রচলিত। শব্দের ব্যুৎপত্তি অজ্ঞাত।…

১৩. বাঙ্গালায় ও উড়িয়াতে ‘কাতা’ শব্দ ‘নারিকেল-দড়ি’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই অর্থেও ‘কাতা’ শব্দের ব্যুৎপতি অজ্ঞাত। ‘কলি’ ও ‘কাতা’ অর্থাৎ কলিচূন ও নারিকেল-দড়ি, এই দুই জিনিসের নাম হইতে ‘কলিকাতা’ নামের উদ্ভব, এরূপ ব্যাখ্যা যদি কেহ করেন, তাহার বিরুদ্ধে জোর করিয়া বলিবার কিছু নাই,…

১৪. কিছুকাল পূর্বে আমি ‘কাতা’ শব্দকে চলিত বাঙ্গলা ‘কাতা’ অর্থাৎ ‘পার্শ্বদেশ’ অর্থে ব্যাখ্যা করিয়াছিলাম (‘কলির কাতা’-‘কলিচূনের স্থান বা আড়ত’)। এখন সে ব্যাখ্যা সমীচীন বলিয়া মনে করি না।”

মন্তব্য

১. ১-এ আছে ‘সুতানুটীতে সুতার হাট বা বাজার বসিত’। আবার ৬-এ আছে ‘শামুকের আড়ত, এবং চূনের কারখানা’। আবার পাঁচ/৮-এ আছে ‘কাতা-চূনের বা শামুক-পোড়া কাতার আড়ত’।

তিনটি জায়গায় চারটি শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে-হাট বা বাজার, আড়ত এবং কারখানা। ‘আড়ত’ শব্দটি দুবার, অন্য তিনটি শব্দ একবার করে ব্যবহার করা হয়েছে।

আজ থেকে ৪০০/৫০০ বছর আগেকার কথা বলা হয়েছে। অতদিন আগে বাংলাদেশের কোথাও কি বাজার, আড়ত কিংবা কারখানা ছিল? অন্তত সুতানুটি, কলিকাতা ও গোবিন্দুপুর-এই তিন গ্রামে ছিল না।

‘হাট’ বা ‘বাজার’-এখানে বাজার কি হাটের সমার্থক শব্দ? অর্থাৎ হাট মানে যা, বাজার মানেও তা? তা কখনওই নয়। হাট একদিন মাত্র বসে, সেইদিনই ভাঙে। বাজার ভাঙে না, অপেক্ষাকৃত স্থায়ী। হাটে আড়ত থাকে না, বাজারে থাকে, কেননা আড়তও স্থায়ী। হাট প্রাচীনতর, বাজার, আড়ত, কারখানা অপেক্ষাকৃত আধুনিক। সমাজ ও শিল্পবিবর্তনের আদিতে হাট, পরবর্তীকালে গঞ্জ, বাজার, আড়ত, কারখানা দেখা দেয়। ৪০০/৫০০ বছর আগে বাজার, আড়ত, কারখানা থাকা সম্ভব ছিল না। শুধু হাট থাকাই সম্ভব ছিল। সুতরাং সময়ের দিকে লক্ষ না রেখে ওই শব্দগুলি অত্যন্ত অবৈজ্ঞানিভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। লেখা উচিত ছিল-শামুকের, চুনের, কাতা চুনের, শামুক পোড়া কাতার হাট ছিল। সুতানুটি ‘বাজার’ কেউ কখনও শোনেনি, সকলেই শুনে এসেছে সুতানুটির ‘হাট’।

২. ‘হয়তো’ সুতানুটি হাট অঞ্চলের ‘আদি নাম ছিল চিৎপুর’। ‘হয়তো’ কেন? ওই অঞ্চলের আদি নাম কোনওদিনই চিৎপুর ছিল না। চিৎপুর বাগবাজারের খালের পরপারে উত্তর দিকে আগেও ছিল, আজও আছে। যখন খাল ছিল না তখনও চিত্তেশ্বরীর মন্দির-সংলগ্ন অঞ্চলকে চিত্তেশ্বরীপুর বা চিৎপুর বলা হত। বর্তমান ‘চিৎপুর রোড’-এর পার্শ্ববর্তী স্থান চিৎপুর নয়। চিৎপুর রোডের পুরো নাম Road to Chitpur, অর্থাৎ চিৎপুরে যাবার রাস্তা। এ রাস্তারও নাম আগে চিৎপুর রোড ছিল না, ছিল Pilgrim Path বা Road to Collegot (তীর্থযাত্রীদের রাস্তা বা কালীঘাটে যাবার রাস্তা)। সুতানুটি হাট চিৎপুরের অন্তর্গত তো ছিলই না, সন্নিকটেও ছিল না। চিৎপুর থেকে অনেক দূরে গঙ্গার ধারে ছিল। সুতানুটির হাট বসত হাটখোলায়। ওই হাটের জন্যই হাটের স্থানের নাম হয়েছে ‘হাটখোলা’।

৩. ‘সুতানুটি নামেরই অনুরূপ কলিকাতা নাম’ হয়েছে-বলেছেন সুনীতিবাবু এবং আরও দুই জায়গায়-৬ ও পাঁচ/৮.-এ ওই উক্তিরই পুনরাবৃত্তি করেছেন।

একটু আগেই দেখালাম ‘বাজার’, ‘আড়ত’, ‘কারখানা’-এসব শব্দ ব্যবহার করা ভুল হয়েছে। ব্যবহার করা উচিত ছিল ‘হাট’ শব্দ। কিন্তু সুনীতিবাবু একবারও কলিচুন সম্পর্কে ‘হাট’ শব্দটি ব্যবহার করেননি। না করবার কারণ আছে। কেউ কখনও যেমন ‘সুতানুটি বাজার’-এর কথা শোনেনি, তেমন ‘কলিচুন বা কাতাচুনের হাট’-এর কথাও শোনেনি। কলিচুনের হাট ছিল না, তাই শোনেনি। থাকলে শুনত। সুতানুটি হাটের মতো যদি কলিচুনের হাট একটা থাকত তাহলে সুতানুটির অনুরূপ প্রক্রিয়ায় ওই হাটের নাম থেকে ‘কলিকাতা’ নাম হতে পারত। সুতরাং যত বারই, যত রকম ভাষাতেই ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে ব্যপারটাকে দাঁড় করাবার চেষ্টা হয়ে থাক না কেন, সে চেষ্টা সফল হয়নি। অতএব ‘সুতানুটি’ নামের অনুরূপ ‘কলিকাতা’ নাম হয়েছে এ কথা আদৌ বলা চলে না।

৪. লেখক এখানে বলেছেন ‘কলিকাতা’ একটি খাঁটি বাংলা শব্দ। আবার ১২-তে বলেছেন ‘কলি শব্দ (হিন্দুস্থানীতে ‘কলী’)…ব্যুৎপত্তি অজ্ঞাত।’ পরস্পরবিরোধী উক্তি এবং ‘কলি’ শব্দের ব্যুৎপত্তি লেখক জানেন না একথা অবিশ্বাস্য শোনায়।

আসলে শব্দটি ‘কলি’ নয়-‘কলী’। এটি হিন্দুস্থানি শব্দ নয়, আরবি শব্দ-আরবি থেকে হিন্দুস্থানিতে এসেছে। পুরো শব্দটি Al-Qualiy। Al=the, Qualiy=ash বা calcined ash। ইংরেজিতে শব্দটির রূপ Alkali। Potash, Soda ও Lime (চুন)-এই তিনটি Alkali। তুলনীয় ইংরেজি শব্দ Alchemy, Algebra, Alcohol।

‘কলী’ বা ‘কলি’ শব্দ Hobson-Jobson-এ নেই।

৫. ‘কাতা’ শব্দ নিয়ে সুনীতিবাবু বড়ই বিব্রত হয়ে পড়েছেন। নানা জায়গায় নানা মানে করেছেন,-যথা, ১. শামুকের আড়ত [দ্র ৬], ২. চুনের কারখানা [দ্র ৬], ৩. শামুক পোড়া [দ্র ৫], ৪. (শুধু) চুন [দ্র ১১], ৫. পোড়ানো শামুক [দ্র ১১], ৬. নারিকেল দড়ি [দ্র ১৩], ৭. আনত [দ্র ১৪]।

সর্বশেষ, অর্থটি এখন তিনি ত্যাগ করেছেন। সেটি ছেড়ে দিলেও একই ‘কাতা’ শব্দ ছয়টি বিভিন্ন অর্থে ব্যবহার করা হয়েছে। তার ফলে গুরুতর বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। কোনও একটা সুস্পষ্ট মানে পাওয়া যায় না। ‘কলি’ শব্দের সঙ্গে মিলিয়ে ব্যবহার করলে একটা কিম্ভূতকিমাকার বা জবরজঙ্গ মানে দাঁড়ায়। সুনীতিবাবু ‘কলিকাতা’ শব্দের তিন জায়গায় তিন রকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। ব্যাখ্যা তিনটি উত্তরোত্তর বেশি ঘোরালো-প্যাঁচালো, লম্বা ও জটিল হয়ে উঠেছে। সেই তিনটি ব্যাখ্যা পরপর নীচে তুলে দিচ্ছি

(১) ‘কলি বা করিচূলের জন্য কাতা বা শামুক পোড়া’। [দ্র ৫]

(২) ‘কলির বা চূনের ও কলিচূনের জন্য শামুকের আড়ত, এবং চূনের কারখানা’। [দ্র ৬],

(৩) ‘জোঙ্গড়া চূন, শামুক-পোড়া কলিচূনের ও অন্য চূনের কাজের জন্য ‘কলি-কাতা’ বা কলিচূন এবং কাতা-চূনের বা শামুক-পোড়া কাতার আড়ত।’ [দ্র পাঁচ/৮.]

লক্ষণীয় যে ২-এর অর্থ ১-এর অর্থের চেয়ে জটিল, আবার ৩-এর অর্থটি ২-এর অর্থের চেয়ে আরও জটিল ও ঘোলাটে, ভাষা সেখানে এমন তালগোল পাকিয়ে গেছে যে জট ছাড়িয়ে একটা সুস্পষ্ট মানে করাই দায়।

২-সংখ্যক ব্যাখ্যায় লেখা হয়েছে-‘কলির বা চুনের ও কলিচূনের’। ‘বা’ এবং ‘ও’ শব্দের মানে কি? ‘বা’-এর পর শুধু ‘চূন’ শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে কেন? ‘কলি’ মানে কি শুধু ‘চূন’? তাহলে পাথুরে চুনও কি কলি? ‘ও কলিচূনের’ই বা কি অর্থ? কোনও অর্থই তো সুস্পষ্ট হয়ে ওঠেনি।

৩-সংখ্যক ব্যাখ্যায় বাবহৃত ‘ও অন্যচুন’ কি? পাথুরে চুন?

যখন ‘কাতা’ শব্দেরই অর্থ পরিষ্কার করা দরকার তখন ব্যাখ্যার মধ্যে ‘কাতাচূন’ ও ‘কাতার আড়ত’ শব্দ ব্যবহার করা উচিত হয়নি। ক্ষণে ক্ষণে অর্থ পরিবর্তন না করে একটি সুনির্দিষ্ট অর্থে ‘কাতা’ শব্দটিকে ব্যবহার করা উটিত ছিল।

৭. ‘পাথরিয়া চূন দক্ষিণ-বঙ্গে হয় না, এ অঞ্চলে শামুক ও ঝিনুক পোড়াইয়াই চূন প্রস্তুত হয়।’-লিখেছেন সুনীতিবাবু ১৯৩৮ সালে। অর্থাৎ ১৯৩৮ সালেও দক্ষিণবঙ্গে শামুক ও ঝিনুক পুড়িয়ে চূন তৈরি হত। ‘রসপুর-কলিকাতা’ ছাড়া আর কোথায় কোথায় হত? এখন কি হয় না? যদি না হয় কলি ফেরানো হয় কোন চুনে? যদি দক্ষিণবঙ্গে পাথুরে চুন হত তাহলেও কি শামুক ও ঝিনুক পুড়িয়ে চুন তৈরি করবার দরকার হত? যেখানে পাথুরে চুন, হয় সেখানেও কি কলি ফেরাবার জন্য শামুকপোড়া চুন দরকার হয়?

৮. ‘কলিচুন’ মানেই কি শামুক ও ঝিনুক পোড়া চুন? পাথুরে চুন কি ‘কলিচূন’ নয়? সে চুন দিয়ে কি কলি ফেরানো যায় না?

শামুক ও ঝিনুক পোড়ানো চুন দেওয়ালে কলি ফেরানো ছাড়া অন্য কোনও কাজে লাগে না? যদি লাগে কী কী কাজে লাগে?

৯. নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণেতর নিষ্ঠাবতী হিন্দু বিধবারা শামুক পোড়ানো চুন না খেতে পারেন, আর সকলে খেতেন? না, খেতেন না?

১০. ‘পাথরিয়া চূন এ অঞ্চলে সুলভ হওয়ার পূর্বে…পান খাওয়াই সদাচার-পালনের বিরুদ্ধ’ ছিল। কিন্তু সুলভ হওয়ার পরে কি হল? আর সদাচারবিরুদ্ধ রইল না, এমনকী নিষ্ঠাবতী হিন্দু বিধবাদের পক্ষেও?

শামুক পোড়ান চুন জৈব পদার্থের বিকার বলে নিষ্ঠাবতী হিন্দু বিধবারা এই চুন দিয়ে পান খেতেন না তা নয়। তাঁরা মোটেই পান খেতেন না, পাথুরে চুন দিয়েও না। অল্পবয়স্ক বালক ও ছাত্ররাও পান খেত না। এদের ও বিধবাদের ব্রহ্মচর্য পালন করতে হত। পান খাওয়া বিলাস বলে গণ্য হত। বিলাস ব্রহ্মচর্যের পরিপন্থী বলে বিবেচিত হওয়ায় বর্জনীয় ছিল।

৭ থেকে ৯ উপবিভাগে পাথুরে চুন ও শামুক চুনের উৎপাদন ও ব্যবহার, পাথুরে চুনের দক্ষিণবঙ্গে দুষ্প্রাপ্যতা, শামুক চুনের কলি ফেরাবার কাজে প্রশস্ততা সম্বন্ধে মত প্রকাশ করা হয়েছে। সেইজন্য ‘চুন’ সম্বন্ধে এখানে কিছুটা বিস্তৃত আলোচনা দরকার। তাহলে বোঝা যাবে সুনীতিবাবু যে মতামত ব্যক্ত করেছেন তা কতখানি সত্য ও গ্রহণযোগ্য। বলা বাহুল্য এই আলোচনা আমি সাধ্যমতো সংক্ষিপ্ত করব।

চুন

চুনের আকর দু’রকম-১. শামুক, ঝিনুক, জোংড়া (বড় শামুক) ও প্রবাল (coral) এবং ২. চুনের পাথর। প্রথমগুলি পুড়িয়ে বাখারি চুন ও দ্বিতীয় জিনিসটি পুড়িয়ে পাথুরে চুন পাওয়া যায়।

বাখারি চুন (Shell-lime)

বাখারি মানে শক্ত খোলা। সংস্কৃত বল্কল, বাকল বা গাছের ছাল, তা থেকে মানে-কঠিন আচ্ছাদন বা বর্ম। বাংলাদেশে প্রবাল পাওয়া যায় না। এখানে শামুক, ঝিনুক, জোংড়ার শক্ত খোলা পুড়িয়ে এই চুন তৈরি হত। শামুক ও ঝিনুক জলচর প্রাণী। মাদ্রাজে ডাঙার শামুকও পাওয়া যায়। তারা জঙ্গলে থাকে। ঝিনুক তিনরকম-একরকম ঝিনুক লোকে খায়, একরকম থেকে মুক্তো হয়, আর একরকম থেকে চুন হয়। শামুক ও চুনের ঝিনুক মিষ্টি জলের বিল, ঝিল, পুকুরেও হয়। আবার নোনা জলেও হয়। মিষ্টি জলের শামুক ধানক্ষেতেও পাওয়া যায়। মিষ্টি জলের শামুক-ঝিনুকের চেয়ে নোনা জলের শামুক-ঝিনুক আকারে অনেক বড় হয়। কলকাতার পাশে ধাপা বা লবণহ্রদে ও সুন্দরবনে বড় বড় শামুক ও ঝিনুক প্রচুর হয়। শুনেছি একসময়ে এই দুই জায়গার শামুক ও ঝিনুক পোড়া চুন কলকাতায় আমদানি হত। পূর্ব দিক থেকে আসত বলে এই চুনের প্রবেশদ্বার ছিল বেলেঘাটা। তাই বেলেঘাটা বহুকাল থেকেই চুনের আড়তের জন্য বিখ্যাত। দ্রষ্টব্য যে ধাপা বা সুন্দরবন অঞ্চলে একসময়ে বাখারি চুন তৈরি হলেও সেখানে একটা গ্রামও নেই যার নাম ‘কলিকাতা’।

আবার ধাপা বা সুন্দরবনের চেয়ে ঢের বড় শামুক ও ঝিনুক হয় সমুদ্রের নোনা জলে। তাই মাদ্রাজের করমণ্ডল ও মালাবার উপকূলের বাখারি চুন বহুদিন যাবৎ কলকাতার বাজার একচেটিয়াভাবে দখল করেছিল। মাদ্রাজে উৎকৃষ্ট পাথুরে চুন তৈরি হলেও, কলকাতার সাহেবেরা ‘Chunam’ বলতে মাদ্রাজের বাখারি চুনকেই বুঝত।

বাখারি চুন বিশুদ্ধ চুন। একে ইংরেজিতে rich বা fat lime বলে। এই চুনের ব্যবহার তিনরকম-ক. পানের সঙ্গে খাবার জন্য, খ. ইমারতে পঙ্খের কাজ (stucco)-এর জন্য, গ. দেওয়ালে চুনকাম করবার জন্য। বাখারি চুনের দাম পাথুরে চুনের দামের চেয়ে ৪/৫ গুণ বেশি। সেই জন্য এই চুন দেওয়ালে কলি ফেরাবার কাজে বিশুদ্ধ পাথুরে চুনের সঙ্গে টেক্কা দিতে পারে না।

পলাশির যুদ্ধের পর ইংরেজদের ভাগ্য ফিরে গেল। তারা চৌরঙ্গি অঞ্চলে ও এসপ্ল্যানেড রো-তে নতুন নতুন বাড়ি তুলতে লাগল। একজন ইংরেজ লেখক সেই অবস্থা বর্ণনা করেছেন এইভাবে

Palace rose upon palace with classic portico, column and balustrade, each simulating the glories of ancient Rome. Everywhere there was elegance and refinement. The insides of the house similarly took on a new beauty with the introduction of ‘chunam’, a type of plaster made from powdered oyster shells brought from the Coromondol coast, which, when applied to the walls and staircases, gave a fine glossy finish nearly as beautiful as marble.

Eastern Interlude

A Social History of the European Community in Calcutta by R. Pearson.

এখানে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে যে ‘চুনাম’ অর্থে মাদ্রাজের উপকূল থেকে আনা ঝিনুক-চুনকেই বোঝাত ও তা দিয়ে বাড়ির দেওয়াল প্রভৃতিতে পঙ্খের কাজ করা হত। মাদ্রাজের বাখারি চুন যে পঙ্খের কাজের পক্ষে অতি উৎকৃষ্ট ছিল এবং একমাত্র বাখারি চুন ছাড়া অন্য কোনও চুন দিয়ে এই কাজ হত না সেকথা আর একটি প্রামাণিক পুস্তক থেকে পাচ্ছি। তাতে লেখা আছে

Madras Chunam is a very fine stucco. It is laid on in three coats, the first a mixture of shell-lime and sand, tempered with jaghery water, about half an inch thick; the second made of sifted shell-lime and fine sifted white sand without jaghery, as it would colour the plaster. The third coating which receives the polish is prepared with great care; the finest and whitest shells being selected for the lime, and mixed with from ¼ to 1/6 th of the volume of the finest white sand.–Thomason Civil Engineering College Manual (new series) No 1 a–Limes, Mortars and Cements, compiled by Capt. C. C. Moncrieff R. E., Fourth Edition, Edited by Major A. M. Lang R. E, Roorkee.

Hobson-Jobson-এ আছে

1750-60–The flooring is generally composed of a kind of loam or stucco, called chunam, being a lime made of burnt shella.–Grose।

1809–The row of chunam pillars which supported each side…were of shining white.–Lord Valentia।

এই পঙ্খের কাজই হয়ে দাঁড়ায় পরবর্তীকালে বাখারি চুনের প্রধান ব্যবহার। কিন্তু প্রাচীনকালে এর প্রধান ব্যবহার ছিল পানের চুন হিসাবে। Hobson-Jobson-এ এর প্রমাণ আছে

1510–And they also eat with the said leaves (betel) a certain lime made from oyster shells which they call cionama.–Vaptheme।

1673–The natives chew it (betel) with china (lime of calcined oyster shells).–Freyer।

1689–Chinam is lime made of cockel-shells or lime stone. and Pawn is the leaf of a tree.–Ovington।

দ্রষ্টব্য Hobson-Jobson-এ চুন সম্বন্ধে যতগুলি উদ্ধৃতি দেওয়া আছে তাদের মধ্যে একটিতেও দেওয়ালে কলি ফেরাবার জন্য বাখারি চুনের ব্যবহারের উল্লেখ নেই।

পাথুরে চুন

আগেই বলা হয়েছে চুনের পাথর পুড়িয়ে পাথুরে চুন হয়। চুনের পাথরের ইংরেজি রাসায়নিক নাম Carbonate of Calcium (CaCO3)আর পাথুরে চুনের নাম Oxide of Calcium (CaO)। কোনও কোনও চুনের পাথরে চুনের সঙ্গে Sulphuric Acid মেশানো থাকে। এরকম পাথরকে Sulphate of Lime বা Gypsum বলে। Gypsum পুড়িয়ে যে চুন হয় তাকে Plaster of Paris বলে। Plaster of Paris বড় বড় অট্টালিকার স্তম্ভ ও ভেতর দেওয়ালের প্লাস্টার ইত্যাদিতে ব্যবহৃত হয়। এরকম পাথর সচরাচর পাওয়া যায় না।

বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চুনের পাথরে চুনের সঙ্গে Carbonic Acid মেশানো থাকে। যে পাথরে এক হাজার ভাগের মধ্যে ৪৩৬ ভাগ Carbonic Acid ও ৫৬৪ ভাগ চুন থাকে তাকে বিশুদ্ধ পাথর ও সেই পাথর থেকে যে চুন হয় তাকে বিশুদ্ধ চুন বলে। সাদা চা খড়ি ও রাজস্থানের মাকরানা মার্বল পাথর বিশুদ্ধ চুনের পাথর।

আবার কোনও কোনও পাথুরে চুনের সঙ্গে Alumina, Silica, Magnesia, Manganese, Oxide of Iron ইত্যাদি মেশানো থাকে। এইরকম পাথর অবিশুদ্ধ পাথর। কঙ্কর বা খোয়া যা পুড়িয়ে ঘুটিং চুন হয় তা অবিশুদ্ধ পাথর। তার চুনও অবিশুদ্ধ চুন। অবিশুদ্ধ চুনে জল ঢাললে তা ক্রমশ পাথরের মতো শক্ত হয়ে ওঠে। সেইজন্য এই চুনকে Hydraulic চুনও বলা হয়। এই চুন ইমারতের গাঁথনিতে ব্যবহার করা হয়। বিশুদ্ধ চুনে জল ঢাললে তা শক্ত হয় না, গলে যায়। এই চুনকেই rich বা fat চুন বলে। এই চুন পানে খাবার জন্য ও দেওয়ালে চুনকাম করবার জন্য ব্যবহৃত হয়। বাখারি চুন ও বিশুদ্ধ পাথুরে চুন-দুইই rich বা fat চুন। সুতরাং বিশুদ্ধ পাথুরে চুন কলি ফেরাবার কাজে অনায়াসেই বাখারি চুনের বিকল্পে বা পরিবর্তে ব্যবহৃত হতে পারে। এই চুনের দামও বাখারি চুনের দামের চেয়ে চার-পাঁচ গুণ কম। সুতরাং খাঁটি পাথুরে চুন পেলে লোক অত দাম দিয়ে বাখারি চুন ব্যবহার করতে যাবে কেন?

পাথুরে চুন নানাপ্রকার। তার মধ্যে সিলেট চুন, কাটনি চুন, মাইহার চুন, বিসরা চুন ও সাতনা চুন প্রধান। এদের মধ্যে আবার ছাতক বা সিলেট চুন সর্বোৎকৃষ্ট বিশুদ্ধ চুন। অসামের খাসি ও জয়ন্তিয়া পাহাড়ে এই চুনের পাথর অপর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায়। সিলেট চুনের বিশুদ্ধতা ও প্রাচুর্য সম্বন্ধে Robert Lindssy সাহেব (যিনি ১৭৭৮ সালে সিলেট জেলার কালেক্টার ছিলেন) লিখেছেন

The mountain was composed of the purest alabaster lime and appeared in quantity equal to the supply of the whole world…The only great staple and steady article of commerce (in the Sylhet District–R. M.) is chunam or lime. In no part of Bengal or even Hindustan, is the rock found so perfectly pure or so free of alloy, as in this province. Therefore Calcutta is chiefly supplied from hence.

বাখারি চুন বাংলাদেশে এতই দুর্মূল্য ও দুষ্প্রাপ্য ছিল যে কলিচুন হিসাবে ক্বচিৎ এ চুন ব্যবহৃত হত। আবহমান কাল থেকে বাংলাদেশে বিশুদ্ধ ও প্রচুর সস্তা সিলেট চুন বরাবর ব্যবহৃত হয়ে এসেছে। Archdeacon Firminger সাহেব লিখেছেন

…the lime referred to was Sylhet lime, and came from Khasi and Jaintia Hills which contain inexhaustible beds of lime-stone. Sir William Hunter states that ‘from time immemorial a large part of the supply of Bengal has been derived from this source’.–Imperial Gazetteer of India, Vol. I, p. 348।

বাকি রইল একটি প্রশ্ন। সত্যসত্যই কলি ফেরাবার কাজে বাখারি চুনের পরিবর্তে বিশুদ্ধ পাথুরে চুন ব্যবহার করা চলে কি না ও বাংলাদেশে ব্যববার করা হত কি না। পূর্বোক্ত রুরকির Thomason Civil Engineering College Manual-এর মতো প্রমাণিক গ্রন্থে লেখা আছে

White-wash. The interior walls of Indian houses, as also in some cases the exterior, are generally white-washesd in lieu of being painted or papered. ‘White-wash’ is merely a thin solution of slaked lime, with some ingredient, as gum, glue or rice-water, to render it adhesive to the walls…For 1000 superficial feet of ordinary white-wash are required 1½ seers of stone-lime and .05 chitacks of gum.

এই পুস্তক প্রকাশিত হয় প্রায় একশো বছর আগে ১৮৭৩ খ্রিস্টাব্দে। এতে white-wash-এর জন্য বাখারি চুনের উল্লেখমাত্র নেই। শুধু এই বইয়ের নয়, আমি সরকারি-বেসরকারি পুস্তক, পুস্তিকা, বিবরণ, রিপোর্ট, কাগজ-পত্র যথাসাধ্য খুঁজেও কলি ফেরাবার জন্য বাখারি চুনের ব্যবহারের কথার, অথবা কলকাতায় যে এই চুন কস্মিনকালে তৈরি হত তার, উল্লেখ পাইনি।

পাঁচ

তার পর সুনীতিবাবু লিখেছেন

১. ”কলিকাতা-গ্রামে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত চুন প্রস্তুত হইত, তাহার নিদর্শন আছে।

২. এখনকার বহুবাজার স্ট্রীট (অষ্টাদশ শতকে এই রাস্তা ‘বৈঠকখানা স্ট্রীট’ নামেও পরিচিত ছিল) খাস কলিকাতা-গ্রাম বা নগরের একটি প্রধান রাস্তা-পূর্ব হইতে পশ্চিমে শহরের মেরুদণ্ড-স্বরূপ ছিল। এই রাস্তার উত্তর ধারে যে এক সময়ে চুনের কাজ হইত, কতকগুলি রাস্তা ও পল্লীর নামে তাহার নিদর্শন পাওয়া যায়।

৩. বহুবাজার স্ট্রীটের উত্তরে ‘চূনাগলি’ পল্লী, মেটে বা কালো ফিরাঙ্গীদের (অর্থাৎ পোর্তুগীস ও অন্য ইউরোপীয়দের সহিত মিশ্রিত দেশীয় খ্রীষ্টানদের) বাসস্থান বলিয়া এক সময়ে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল।

৪. এখন যেখান দিয়া নূতন রাস্তা ‘চিত্তরঞ্জন আভেনিউ’ গিয়াছে, বহুবাজারের উত্তরে সেই অঞ্চলে, অর্থাৎ চিৎপুর ও ছাতাওয়ালা গলির পূর্বে এবং আধুনিক কলেজ স্ট্রীট-এর পশ্চিমে মাঝামাঝি একটি স্থানে ‘চূনারীতলা’ (Chunarytollah) নামে একটি পল্লীর উল্লেখ, অষ্টাদশ শতকের কলিকাতার পুরাতন নকশা ও কাগজ-পত্রে পাওয়া যায়।

৫. এই ‘চূনারীতলা’-তে ‘চূনারী’ বা চূনের কাজ করিত, এমন লোকেরা বাস করিত। এখন যেমন ‘শাঁখারীটোলা’-তে এক ঘরও শাঁখারী নাই, তেমনি ‘চূনারীতলা’ হইতে চূনারীদের অস্তিত্ব অনেক কাল হইল লোপ পাইয়াছিল, কিন্তু অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগেও তাহাদের অধ্যুষিত পল্লীর নাম তাহাদের স্মৃতি বহন করিয়া বিদ্যমান ছিল এবং ‘চূনাগলি’র রাস্তা ও পল্লীর নামে এখনও তাহাদের ব্যবসায়ের স্মৃতি জড়িত রহিয়াছে।

৬. চূনারীতলার আরও একটু পূর্বে, এখনকার কলেজ স্ট্রীট ও আমহার্স্ট স্ট্রীটের মধ্যে লেডি ডফরিন হাসপাতালের সন্নিকটে, বহুবাজার স্ট্রীট হইতে বাহির হইয়াছে ‘চুনাপাথুরে লেন’। এই অঞ্চলও চূনের ব্যবসায়ের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।

৭. সুতরাং, খাস কলিকাতা-গ্রামে, উত্তর হইতে দক্ষিণে মিলিত সুতানুটী ও কলিকাতা গ্রামদ্বয়ের মেরুদণ্ডস্বরূপ চিৎপুর রোড ও কসাইটোলা রোডের (এখানকার বেন্টিক স্ট্রীটের) পূর্বে কলিকাতা গ্রামের পূর্ব সীমানায় বৈঠকখানা পর্যন্ত যে রাস্তা বিস্তৃত ছিল, তাহার উত্তরে অনেকখানি জুড়িয়া-‘চূনাগলি, চূনারীতলা ও চূনারীপুখুর’ অঞ্চলগুলিকে আশ্রয় করিয়া-চূনের কাজ হইত।

৮. সুতানুটী গ্রাম যদি সুতার ব্যবসায়ের জন্য, তাঁতের কাপড়ের জন্য (কলিকাতার আদি অধিবাসীদের মধ্যে তন্তুবায়-জাতীয় লোকেরা প্রধান ছিল, একথা স্মরণ করিতে হইবে) ক্রমে ঐ নাম পাইয়া থাকে, জোঙ্গড়া চূন, শামুকপোড়া কলিচূনের ও অন্য চূনের কাজের জন্য ‘কলি-কাতা’ বা কলিচূন এবং কাতা-চূনের বা শামুক-পোড়া কাতার আড়ত হিসাবে, এখন হইতে সাড়ে চারি শত পাঁচ শত বৎসর পূর্বে, দ্রব্যের নাম হইতে স্থানের নাম-স্বরূপ এই নাম গৃহীত হইয়া যাইতে কোনও বাধা নাই।”

মন্তব্য

১. প্রথমত, এত সময় থাকতে সুনীতিবাবু ‘অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ’ বেছে নিতে গেলেন কেন? ১৬০০ থেকে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ তো কলকাতার ইতিহাসে অন্ধকার যুগ বা প্রাগৈতিহাসিক যুগ। এ যুগের তো বিশেষ কোনও লিখিত বিবরণ বা কাগজ-পত্র নেই। সুতরাং কাগজপত্রের সাহায্যে তো প্রমাণ করবার উপায় নেই যে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত কলকাতা গ্রামে চুন তৈরি হত।

দ্বিতীয়ত, অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগের পর থেকে চুন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে গেল। আগে সুনীতিবাবু আমাদের বলেছেন যে দক্ষিণ বঙ্গে ইং ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত বাখারি চুন তৈরি হত (চার/৭. দ্র)। কলিকাতা ও দক্ষিণ বঙ্গে। তা সত্বেও, এখন জানলাম যে অন্তত কলকাতা গ্রামে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ থেকে ওই চুন তৈরি হওয়া বন্ধ হয়ে যায়। আড়াইশো বছরের কারবার হঠাৎ বন্ধ হয়ে গেল কেন? কোনও গুরুতর কারণ না থাকলে এ রকম একটা ব্যাপার ঘটতে পারত না। কিন্তু সেই গুরুতর কারণটি বা কারণগুলি যে কি সুনীতিবাবু ঘুণাক্ষরেও আমাদের জানাননি।

তৃতীয়ত, ‘অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ’ পর্যন্ত বলতে তিনি ঠিক কোন সাল পর্যন্ত ধরেছেন-তারও কোনও ইঙ্গিত দেননি। সুতরাং যে যার খুশিমতো একটা সময় ধরে নিতে পারে। আমি তাঁর কথার আক্ষরিক মানে করে ১৭৫০-৫১ সাল ধরলাম।

২. ”অষ্টাদশ শতকে এই রাস্তা (বহুবাজার স্ট্রীট) ‘বৈঠকখানা স্ট্রিট’ নামেও পরিচিত ছিল”-এই উক্তিটি অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর। একটা শতক দীর্ঘ সময়। সুতরাং ওই শতকের কোন ভাগে-অদিতে, মধ্যে, না শেষভাগে-বৌবাজার স্ট্রিটের বৈঠকখানা স্ট্রিট নাম ছিল? যে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত এসে সুনীতিবাবু কলকাতায় বাখারি চুন তৈরির ইতিহাসে দাঁড়ি টেনেছেন সেই ১৭৫০-৫১ সালেও এই মেরুদণ্ডস্বরূপ রাস্তাটির ‘বহুবাজার স্ট্রিট’ বা ‘বৈঠকখানা স্ট্রিট’ এ দুটো নামের কোনওটাই হয়নি।

ওই বছরের মাত্র ৮/৯ বছর আগে ১৭৪২ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার সর্বপ্রথম নকশা তৈরি হয়। তাতে শুধু ইংরেজ, পর্তুগিজ, ও আরমানি অধ্যুষিত কলকাতাটুকু দেখানো হয়েছে। উত্তরে বর্তমানের আরমানি স্ট্রিট থেকে দক্ষিণে বর্তমানের হেষ্টিংস স্ট্রিট পর্যন্ত, পূর্বে বর্তমানের চিৎপুর রোড থেকে পশ্চিমে গঙ্গার ধার পর্যন্ত, কলকাতার মাত্র এইটুকু অংশ চতুর্দিকে একটা কাঠের বেড়া বা বেষ্টনী ( Pallisades)-র মধ্যে দেখানো হয়েছে। একটি রাস্তারও নাম তাতে নেই। কিন্তু এই নকশাটি স্বতন্ত্রভাবে পাওয়া যায় না। ১৭৯৪ খ্রিস্টাব্দের ২ এপ্রিল তারিখে  A. Upjohn সাহেব আর একটি বৃহত্তর নকশার অংশরূপে এই নকশাটি প্রকাশ করেন। ওই তারিখে Upjohn সাহেব নিজের আঁকা বৃহত্তর কলকাতার আরও একটি নকশা প্রকাশ করেন। তার কথা আমি পরে বলব। Upjohn প্রকাশিত প্রথম যে নকশাটির কথা বললাম তার পুরোনাম —Plan of the territory of Calcutta as marked out in the year 1742, exhibiting likewise the Military operations at Calcutta when attacked and taken by Seraj ud Dowlah on the 18th of June 1756. Printed and Pulbished according to the Act of Parliament by A.Upjohn. 2nd April 1794।

অর্থাৎ এই নকশাটিতে দুটি নকশা আছে —১৭৪২ সালের আদি কলকাতার ও ১৭৫৬ সালের বৃহত্তর কলকাতার — উত্তরে বাগবাজারের খাল থেকে দক্ষিণে Governapore (গোবিন্দপুর) পর্যন্ত মারাঠা খাতের অন্তবর্তী কলকাতা। এই ১৭৫৬ সালের নকশায় মাত্র একটি রাস্তারই নাম দেওয়া আছে —Avenue leading to the Eastward। এই রাস্তাটি পশ্চিমে বর্তমান চিৎপুর রোড থেকে আরম্ভ হয়ে পূর্বে মারাঠা খাত পর্যন্ত চলে গেছে —অর্থাৎ বর্তমান ‘বৌবাজার স্ট্রিট’। সুতরাং এই নকশা থেকে দেখা যাচ্ছে যে ১৭৫০-৫১ সালে কেন, ১৭৫৬ সালেও বর্তমান বৌবাজার স্ট্রিটের নাম বৈঠকখানা স্ট্রিট ছিল না, বৌবাজার স্ট্রিটও ছিল না —ছিল Avenue leading to the Eastward ।

১৭৪২ ও ১৭৫৬ সালের নকশা দুটির মধ্যে ১৭৫৩ সালে Lieutenant Wells নামে একজন সৈনিক কলকাতার আর একটি নকশা আঁকেন। সেই নকশার নাম হচ্ছে —Plan of Fort William and Fort of the City of Calcutta. Surveyed by W. Wells, Lieutenant of the Artillery company in Bengal, 1753। নামেই নকশার পরিচয় —পুরাতন ফোর্ট উইলিয়াম ও ড্যালহাউসি স্কোয়ার অঞ্চলটুকু মাত্র এতে দেখানো হয়েছে। এই নকশাতেও কোনও রাস্তার নাম নেই। মনে রাখতে হবে যে ১৭৫৩ ও ১৭৫৬ সাল আমাদের নির্ধারিত ১৭৫০-৫১ সালের সীমার বাইরে পড়ে যাচ্ছে।

Lieutenant Wells-এর নকশার ৩১/৩২ বছর পরে Lieutenant-Colonel Mark Wood (ইনি Surveyor-General of India ছিলেন এবং এঁরই নামে কলকাতার Surveyor-General-এর অফিসের সামনের রাস্তার নাম Wood Street হয়েছে)। কলকাতার পুলিশ কমিশনারদের জন্য ১৭৮৪-৮৫ সালে একটি বড় প্রমাণের কলকাতার নকশা তৈরি করেন। তাতে দেশি ও সাহেবি দুই পাড়াই দেখানো হয়েছিল। মূল নকশাটি পুলিশ কমিশনারদের অপিসেই ছিল। সাধারণে এই নকশার কথা জানত না। তাই ওই নকশা তৈরি হবার ৭/৮ বছর পরে ১৭৯২ সালে William Baillie নামে এক ভদ্রলোক ওটিকে একটু ছোট করে কমিশনারদের অনুমতি নিয়ে প্রকাশ করেন। এই নকশার নাম —Plan of Calcutta reduced by permission of the Commissionars of Police from the original one executed by Lieutenant-Colonel Mark Wood in the year 1784 and 1785. Published in October 1792 by William Baillie.

Mark Wood -এর নকশাতেই সর্বপ্রথম কলকাতার রাস্তার নাম পাওয়া যায় এবং এই নকশাতেই প্রথম ‘বহুবাজার স্ট্রিট বা বৈঠকখানা স্ট্রিট’-এই নাম পাই। এই নকশায় চিৎপুর রোডের পূর্বে ও বৌবাজার স্ট্রিটের উত্তরে মাত্র দুটি রাস্তা ও দুটি পাড়ার নাম দেওয়া আছে। রাস্তা দুটি হল Old Hurrenbury (হরিণবাড়ি) Lane ও Chhatawallah (ছাতাওয়ালা) Lane ও পাড়া দুটি হল Colootollah ও Chunarytollah । এই নকশায় ‘চুনাগলি’ ও ‘চুনাপুখুর লেন’ -কোনওটারই নাম কিংবা অস্তিত্ব নেই। সুনীতিবাবুর ধারণা এগুলি অনেক পুরনো গলি —কয়েকশো বছরের পুরনো। আমরা নকশায় দেখছি যে ১৭৮৪-৮৫ সাল পর্যন্ত চুনাগলি ও চুনাপুকুর গলির জন্মই হয়নি।

৩. বাকি রইল Chunarytollah। নকশায় Colootollah ও Shakerytollah আছে। Colootollah-র উচ্চারণ সুনীতিবাবু ‘কলুতলা’ করেন, না ‘কলুটোলা’ করেন? Shakerytollah-কে তিনি এই প্রবন্ধে শাঁখারিটোলা, Cossitollahকে কসাইটোলা লিখেছেন। তবে Chunarytollah-কে ‘চূনারীটোলা’ না লিখে ‘চূনারীতলা’ লিখেছেন কেন? বোধহয় তাঁর মনে তখন Dhurrumtollah-র নজির ছিল। কিন্তু এরও উচ্চারণ হওয়া উচিত ‘ধর্মটোলা’। আমরা ভুল করে উচ্চারণ করি ‘ধর্মতলা’। ঠিক সেইরকম ভুল করি কালীতলা, মদমোহনতলা, ষষ্ঠীতলা, শীতলাতলা ইত্যাদি সম্বন্ধে। এগুলো কোনও ঠাকুরের মন্দির মাত্র বোঝায় না, মন্দিরকে কেন্দ্র করে যে পাড়া গড়ে উঠেছে সেই পাড়াগুলিকে বোঝায়। ‘টোলা মানে ‘পাড়া’, ‘টুলি’ মানে ‘ছোট পাড়া’ (যথা, কুমারটুলি)। এ শব্দ দুটি বাংলা ‘টোল’ শব্দের স্বগোত্র। যেখানে বহুলোক (বিশেষত একই পেশার) একত্রে বাস করে তার নাম ‘টোলা’। যেখানে বহু ছাত্র একসঙ্গে বাস করে এবং সংস্কৃত বিদ্যা শিক্ষা করে — সেই জায়গাকে বলি ‘টোল’। কলকাতায় অনেকপাড়া আছে যাদের নাম কোনও বিশিষ্ট গাছ বা গাছের শ্রেণীর নামের সঙ্গে ‘তলা’ শব্দ যোগ ক’রে করা হয়েছে; যেমন নেবুতলা, বটতলা, ঝাউতলা, বেলতলা,আমড়াতলা ইত্যাদি। যদিও গাছে ‘তলা’ থাকে, তবুও নেবুতলা ইত্যাদি নাম গাছের তলাকে বোঝায় না। ওই গাছ বা গাছের সারিকে কেন্দ্র ক’রে তার কাছে যে লোকের পাড়া বা টোলা গড়ে উঠেছে সেই টোলাকে বোঝায়। গাছের যদিও বা ‘তলা’ থাকে, দেবদেবী যথা ধর্ম বা মনসা ইত্যাদির ‘তলা’ কল্পনা করা হাস্যকর। আবার হিন্দি ‘তালাও’ (পুকুর) শব্দ অনুরূপ বিভ্রান্তি ঘটিয়েছে। ‘তালাও’কে আমরা ‘তলা’ করে নিয়েছি প্রায় সব ক্ষেত্রে। যেমন ‘বির্জী তলাও’ অর্থাৎ বির্জী পুকুরকে আমরা বলি ‘বির্জীতলা’। যদিও পুকুর মাত্রেরই একটা ‘তল’ বা ‘তলা’ থাকে, তাহলেও বির্জীতলার ‘তলা’ সে ‘তলা’ নয়। হিন্দি ‘গোলতালাও’ (গোলদীঘি)-কে আমরা ‘গোলতলা’ ক’রে নিয়েছি। ইংরেজিতেও সমান ভুল করা হয়েছে-বির্জীতালাওকে লেখা হয়েছে Birjeetollah, অর্থাৎ ‘বির্জীটোলা’ বা পাড়া। তবুও এ নামের একটা অর্থ হয়, কিন্তু বির্জীতলার কোনও অর্থ হয় না, যদি না ‘তলা’ মানে ‘টোলা’ বা ‘পাড়া’ ধরা হয়।

এখন আমাদের আলোচ্য বিষয়ে ফিরে আসা যাক। Baillie-র নকশা প্রকাশিত হবার দেড়বছর পরে Upjohn-এর নকশা প্রকাশিত হয়। এটা অষ্টাদশ শতকের কলকাতার শেষ নকশা। শুধু কলকাতা নয় মারাঠা খাতের বাইরের ও গঙ্গার ওপারে হাওড়াও অনেকখানি অঞ্চল এতে দেখান হয়েছে। এই নকশার নাম —Calcutta and its environs from an accurate survey taken in the year 1792 and 1793 by A. Upjohn, 2nd April 1794 । Mark Wood- এর নকশার চেয়ে এই নকশায় রাস্তার সংখ্যা স্বভাবতই বেশি। তবু এতেও ‘চুনাগলি’ ও ‘চুনাপুকুর গলি’র নাম নেই। (সুনীতিবাবু ভুল ক’রে চুনাপুকুরের জায়গায় ‘চুনারী পুকুর’ লিখেছেন) তখন এই দুটো গলি তৈরি হয়েছিল কিনা বলা শক্ত। কেন না সংখ্যা বাড়ার দরুন রাস্তা ও গলিগুলো ঘিজি ঘিজি দেখানো হয়েছে। যদি হয়ে থাকে ১৭৮৫ ও ১৭৯৩ —এই দুই সালের মধ্যে কোনও সময়ে হয়ে থাকবে। তবে না হওয়াই সম্ভব। হলে নিশ্চয়ই নাম থাকত। সুনীতিবাবুও বলেননি যে এই দুটি গলির নাম নকশায় আছে, যেমন বলেছেন চুনারিটোলার বেলায়।

সুতরাং দেখা যাচ্ছে অষ্টাদশ শতকের শেষ পর্যন্ত ‘চুনাগলি’ ও ‘চুনাপুকুর গলি’র জন্মই হয়নি। অত বড় যে ‘সার্কুলার রোড’ তার জন্ম মাত্র ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে। অন্যে পরে কা কথা? কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট, কলেজ স্ট্রিট, ওয়েলিংটন স্ট্রিট, ওয়েলেসলি স্ট্রিট ও স্ট্র্যান্ড রোড তৈরি হয় ১৮১৭ সালের পর Lottery Committee-র দ্বারা। ১৮১৭ থেকে ১৮৩৬ সালের মধ্যে কলকাতার অধিকাংশ রাস্তা তৈরি হয়। সর্বপ্রথম Surveyor of Roads কলকাতায় নিযুক্ত হন ১৭৬৬ সালে। অন্ধকূপে যে সব ইংরেজকে হত্যা করা হয়েছিল বলে ইংরেজ ঐতিহাসিকেরা বলেন তাঁদের দেহগুলো পুরনো দুর্গের ফটকের সামনে যে খানায় ফেলে দেওয়া হয়েছিল সে খানা বুজানো হয় ওই ১৭৬৬ সালেই। কিন্তু এসব ব্যাপার ১৭৫০-৫১ সালের অর্থাৎ আমাদের আলোচনা-সীমার অনেক পরের কথা, কোনওটিই আগের নয়।

সুতানুটী, গোবিন্দপুর ও কলিকাতা —এই তিন গ্রামের জমি, বাড়িঘর ও রাস্তার কোম্পানির তরফ থেকে প্রথম জরিপ হয় ১৭০৬ সালে, দ্বিতীয় ১৭২৬ সালে, তৃতীয় ১৭৪২ সালে ও চতুর্থ ১৭৫৬ সালে। ওই চার সালে যথাক্রমে কলকাতার ছোট-বড় রাস্তার মোট সংখ্যা কত ছিল তার সরকারি হিসাব নীচে উদ্ধৃত করছি ১৯০১ সালের আদম-শুমারির অ্যাসিস্ট্যান্ট সেন্সাস অফিসার এ. কে. রায়-এর A Short History of Calcutta, 1902 থেকে

সাল বড় রাস্তা গলি ছোট গলি

(স্ট্রিট) (লেন) (বাই লেন)

১৭০৬ ২ ২ ০

১৭২৬ ৪ ৮ ০

১৭৪২ ১৬ ৪৬ ৭৪

১৭৫৬ ২৭ ৫২ ৭৪

১৭৫৬ সাল আমাদের আলোচ্য সীমার বাইরে পড়ে।

এখন দেখা যাক ‘চুনারিটোলা’ নাম কবে হল। ১৬৯০ থেকে ১৭৫১ সাল পর্যন্ত এই ৬০/৬১ বছরের মধ্যে কলকাতার দেশি লোকেরা যার যেখানে খুশি বাস করেছে। বসবাসের কোনও বিধিনিষেধ বা আইনের কড়াকড়ি ছিল না। কারণ তখন বাইরে থেকে লোক ডেকে এনে কলাকতায় বসবাস করানই ইংরেজদের প্রধান লক্ষ্য ছিল। ১৭৫১ সাল পর্যন্ত কলকাতার লোকসংখ্যা অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে গেল। তখন কড়াকড়ির দরকার হল। ১৭৫২ সালে অর্থাৎ সুনীতিবাবুর নির্দিষ্ট আলোচনা-সীমার পরের বছর Holwell সাহেব কলকাতার জমিদার হয়েই হুকুম জারি করলেন যে এরপর থেকে বেশি লোকেরা যার যেখানে খুশি বাস করতে পারবে না। এক পেশাবলম্বী লোকেদের নির্দিষ্ট স্থানে একসঙ্গে বাস করতে হবে। এই আইন জারি হওয়ার পর থেকে অর্থাৎ ১৭৫২ সাল থেকে কলকাতায় ‘পাড়া’, ‘টোলা’ ও ‘টুলি’ ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে লাগল। সুতরাং ১৭৫২ ও ১৭৮৪ এই দুই সালের মধ্যে কোনও সময়ে ‘চুনারিটোলা’র জন্ম হয়ে থাকবে। সুনীতিবাবুর ধারণা যে ‘চুনারিটোলা’ অনেক পুরনো পাড়া, সে ধারণা ভুল।

অতএব ১৪৯৫ সাল কিংবা তার পূর্ব থেকে আরম্ভ ক’রে ১৭৫০-৫১ পর্যন্ত প্রায় ২৫০ বছর ধরে কলকাতায় বাখারি চুন তৈরি হয়ে এসেছে —সুনীতিবাবুর এ বিশ্বাস একেবাইে ভিত্তিহীন। যে তিনটি জায়গার নাম থেকে তাঁর এ বিশ্বাস জন্মেছে তার কোনওটিরই উৎপত্তি ১৭৫০-৫১ সালের মধ্যে হয়নি, পরে হয়েছে। ওই তিনটি নামের জোরে যদি বলতেই হয় যে এককালে কলকাতায় ‘চূন’ তৈরি হত (দ্র. লেখক শুধু বাখারি চুনের কথাই বলেননি ‘অন্য চূন’-এর কথাও বলেছেন) তা হলে এও বলা উচিত যে অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগের অনেক পরে ইংরেজ আমলে ওই ব্যবসার সূত্রপাত হয়। কিন্তু যেমন বাখারি চূন ছাড়া অন্য চূন হত স্বীকার করলে তাঁর ‘থিয়োরি’ টেকে না, একথা স্বীকার করলেও তেমনি টেকে না।

কিন্তু সত্যিই কি ‘চূনাগলি’, ‘চুনাপুকুর’ ও ‘চুনারিটোলা’ এই তিনটি নাম থেকে কলকাতার বৌবাজার অঞ্চলে যে চূন, বিশেষ করে বাখারি চূন তৈরি হত তার প্রমাণ মেলে? আমার মতে মেলে না। নাম তিনটির আদিতে ‘চুন’ শব্দ থাকায় লেখক নামগুলি ‘চূন’ এই অর্থে নিয়েছেন। এইখানেই তাঁর বোঝবার ভুল হয়েছে। এক-একটি নাম নিয়ে বিচার করা যাক।

৩.ক. ‘চূনাগলি’তে কি হত? চূন তৈরি হত, না বিক্রি হত? তা তিনি স্পষ্ট করে বলেননি। মাত্র চূনের ‘কাজ’ হত বলেছেন। এটা অত্যন্ত অস্পষ্ট।

খ. শুধু ‘চূন’ শব্দ মাত্র বাখারি চূনকেই বোঝাবে কেন? পাথুরে চূনকেও বোঝাবে না কেন? তিনি নিজেও তো ‘অন্য চূন’ কথা ব্যবহার করেছেন। তাহলে ‘চূনাগলি’ নাম তো সে গলিরও হতে পারে যে গলিতে চূনের পাথর পুড়িয়ে চূন তৈরি হত বা যেখানে পাথুরে চূন বিক্রি হত? আর যদি ‘চূনা’র ইংরেজি হয় Chunam তাহলে চূনাগলিতে পাথুরে চূন কিংবা মাদ্রাজ প্রদেশের বিখ্যাত বাখারি চূনের আড়ত ছিল–এ মানে হতেও বাধা নেই।

গ. এর কোনওটাই কিন্তু আমার মতে আসল মানে নয়। সুনীতিবাবু আসল মানের কাছ ঘেঁসে গেছেন কিন্তু ধরতে পারেননি। তিনি নিজেই লিখেছেন ‘চূনাগলি পল্লী, মেটে বা কালো ফিরাঙ্গীদের (অর্থাৎ পোর্তুগীস ও অন্য ইউরোপীয়দের সহিত মিশ্রিত দেশীয় খ্রীষ্টানদের) বাসস্থান বলিয়া এক সময়ে প্রসিদ্ধি লাভ করিয়াছিল।’ তিনি যাদের ‘মেটে’ বা ‘কালো’ ফিরিঙ্গি বলেছেন তাদেরই বলা হয় ‘চূনো ফিরিঙ্গি’। ‘চূনো’ মানে ছোট, খুদে, যেমন ‘চুনোপুঁটি’। চূনো ফিরিঙ্গি মানে অত্যন্ত ওঁচা ফিরিঙ্গি। তাহলে চূনোগলি মানে হয় যে গলিতে চুনো ফিরিঙ্গিরা বাস করত। এই ফিরিঙ্গিরা যে ওই গলিতে বা করতো তা সর্বজনস্বীকৃত ঐতিহাসিক সত্য।

৫. ‘চূনারীটোলা’—সুনীতিবাবু ‘চূনারী’র মানে করেছেন যারা ‘চূনের কাজ করিত’। আবার সেই অস্পষ্টতা! স্পষ্ট করে বলা উচিত ছিল যারা চূন তৈরি করত। কিন্তু যারা চূন তৈরি করে বাংলায় তাদের বলে ‘চুনিয়া’, যেমন যারা নুন তৈরি করে তাদের বল ‘নুনিয়া’। যারা চুন তৈরি করে তাদের আমরা ভুল করে ‘চুনারি’ বা ‘চুনুরি’ বলি। শব্দটি আসলে বাংলা ‘চুনারি’ নয়, হিন্দি ‘চুনরি’। ‘চুনরি’ শব্দ হিন্দিতে বহুল প্রচলিত শব্দ, বহু হিন্দিগানে এই শব্দটি পাওয়া যায়। ‘চুনরি’র দুই অর্থ ক. রং-এ ছোপানো কাপড়, শাড়ি, ওড়না ইত্যাদি, খ. যারা এই রকম কাপড় রং-এ ছোপায়। এই কাজ যারা করে তাদের হিন্দিতে ‘রংরেজ’ও বলে (ইং dyer)। ‘চূনারিটোলা’র মানে, যে-পাড়ায় রংরেজরা বাস করে।

৬. ‘চূনাপুকুর গলি’– সুনীতিবাবু লিখেছেন ‘এই অঞ্চলও চূনের ব্যবসায়ের সহিত সংশ্লিষ্ট ছিল এরূপ অনুমান করা যাইতে পারে।’ কী থেকে তাঁর অনুমান হল? চূনাপুকুর নাম থেকে। কিন্তু চূনা মানে যদি চুন হয় তাহলে ‘চূনাপুকুর’ মানে কী হয়? হয়, যে পুকুরে ‘চূন’ জন্মায়। কোনো পুকুরেই চূন জন্মায় না বা তৈরি হয় না। যে পুকুরে যে প্রাণী বা উদ্ভিদ জন্মে সেই প্রাণী বা উদ্ভিদের নাম থেকেই পুকুরের নাম হয়। যেমন গোলপুকুর (গোলপাতা থেকে), কাশপুকুর, নলপুকুর, কৈপুকুর, শামুক পুকুর, ঝিনুক পুকুর ইত্যাদি। এমনকী পুকুরের পাড়ে কোনো গাছ জন্মালে সেই গাছের নাম থেকেও পুকুরের নাম হয় — যেমন, তালপুকুর। কিন্তু সুনীতিবাবু এইরকম সোজা মানে না করে ঘুরিয়ে চূনাপুকুরের মানে করেছেন, যে পুকুরে চুনের উপাদানস্বরূপ শামুক বা ঝিনুক জন্মায়। অর্থাৎ ‘চূন’ শব্দের বাচ্যার্থ ছেড়ে দিয়ে লক্ষার্থ ধরে মানে করেছেন। এ রকমভাবে পুকুরের নাম হয় না। অথচ চুনাপুকুরের একটা সরল ও সুবিদিত মানে আছে। সে মানে তিনি নেন নি। কথাটা ‘চূনা’পুকুর নয়, ‘চূনো’পুকুর। ‘চূনো’ খাঁটি বাংলা শব্দ। চুনোগলির সম্পর্কে এর মানে আমরা আগেই পেয়েছি —‘খুদে’, ‘ছোট’। ‘চূনোপুকুর’ মানে যে পুকুরে ‘চূনোমাছ’ বা ‘চূনোপুঁটি’ জন্মে।

৭. সুতরাং ‘চূনাগলি’, ‘চূনাপুকুর’ ও ‘চূনারিটোলা’ কোনও নামেরই চুনের সঙ্গে সম্পর্ক নেই। তবু যদি কেউ ‘চূনা’ শব্দের চূন অর্থই ঠিক মনে করেন তাঁকে কতকগুলি প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে।

প্রথম, সমস্ত কলকাতায় তো একটি-মাত্র চূনাপুকুরের সন্ধান পাচ্ছি; সুতানুটীতে পাচ্ছি না, গোবিন্দপুরে পাচ্ছি না, মারাঠা খাতের মধ্যে অন্য কোনও গ্রামেও পাচ্ছি না, তাহলে কি বুঝতে হবে এই মাত্র একটা পুকুরের শামুক ঝিনুক পুড়িয়েই সমস্ত কলকাতা, সুতানুটী, গোবিন্দপুর ও নিকটবর্তী অন্যান্য গ্রামের চূনের প্রয়োজন মিটত? সেটা কি সম্ভব?

দ্বিতীয়, চুনুরিটোলায় অনেক চুনুরি থাকত। মাত্র একটা পুকুরের শামুক, ঝিনুক পুড়িয়ে চূন তৈরি করতে এতগুলো লোক লাগত? আশ্চর্য!

তৃতীয়, কলকাতা, সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও আশেপাশের গ্রামগুলোতে সত্যসত্যই কি এমন আর অন্য পুকুর ছিল না যেখানে শামুক বা ঝিনুক পাওয়া যেত? যদি থেকে থাকে তাহলে তাদের একটিরও নাম ‘চুনাপুকুর’ হল না কেন?

চতুর্থ, সারা বাংলাদেশ কি এমন একটি গ্রামও আছে যার মধ্যে দু’চারটে চুনাপুকুর নেই? যদি থেকে থাকে তাহলে কি সেইসব গ্রামে চূন তৈরি হত না? যদি হত, সেইসব গ্রামের নাম ‘কলিকাতা’ হল না কেন?

পঞ্চম, ১৪৯৫ সাল থেকে (তার আগের কথা ছেড়েই দিলাম) ১৬৯০ সাল পর্যন্ত এই দুশো বছরের মধ্যে কলকাতায় যে পরিমাণ কলিচূন তৈরি হয়েছে তা কী কাজে লেগেছে? ক-টা পাকাবাড়ির দেওয়াল চুনকাম করা হয়েছে? ওই সময়ে কলকাতা ও আশপাশের গ্রামে ক’টা পাকাবাড়ি ছিল? সকলেই শুনে এসেছি ১৬৯০ সালে যখন জোব চার্নক সুতানুটিতে আসেন, তখন সেখানে একটা পাকাবাড়িও ছিল না। তাঁকে ও তাঁর সঙ্গীদের মাটির চালাঘরে থাকতে হয়। গোবিন্দপুরেও কোনও পাকাবাড়ি ছিল না। মাত্র কলকাতায় ড্যালহাউসি অঞ্চলে সাবর্ণ জমিদারদের একটিমাত্র পাকাবাড়ি ছিল। সেইটি ভাড়া নিয়ে চার্নক সরকারি কাগজপত্র সেই বাড়িতে রাখেন। C. R. Wilson এ গল্প মিথ্যা প্রমাণ করেছেন। তবু আমি সত্য বলেই ধরে নিলাম।

ইংরেজ আসার পর থেকে প্রধানত কলকাতায়, অল্পস্বল্প সুতানুটী ও গোবিন্দপুরে পাকাবাড়ি তৈরি হতে থাকে। কোন সালে কত পাকা ও কত কাঁচাবাড়ি ওই তিন গ্রামে ছিল তার সরকারি সংখ্যা পূর্বোক্ত এ. কে. রায়-এর ‘A short History of Calcutta থেকে তুলে দিলাম

সাল পাকা বাড়ির সংখ্যা কাঁচাবাড়ির সংখ্যা

১৭০৬ ৮ ৮,০০০

১৭২৬ ৪০ ১৩,৩০০

১৭৪২ ১২১ ১৪,৭৪৭

১৭৫৬ ৪৯৮ ১৪,৪৫০

১৭৫৬ সাল আমাদের আলোচনা-সীমার বাইরে।

সুতরাং কলকাতায় ইংরেজ আগমনের সময় যখন মাত্র একটি পাকাবাড়ি ছিল তখন তার পূর্বে দুশো বছর ধরে এখানে দেওয়ালে কলি ফেরাবার জন্য কলিচুন তৈরি হয়েছে একথা বলা বাতুলতা। আসল কথা ইংরেজদের আসবার পর থেকে এখানে পাকাবাড়ি তৈরি হতে আরম্ভ হয়েছে, আর তাদের সংখ্যা ক্রমশ বেড়েছে। এইসব বাড়ি তৈরি করার জন্য চুনের প্রয়োজন হয়েছে ও ক্রমশ চাহিদা বেড়েছে। চুন সিলেট, মাদ্রাজ প্রভৃতি প্রদেশ থেকে আমদানি হয়েছে। কলকাতায় চুনের গোলা ও আড়ত বসেছে।

এই প্রসঙ্গে আমার শেষ কথা। যে দুটি গলি ও একটি পাড়ার নাম সুনীতিবাবু নির্দশন হিসাবে উল্লেখ করেছেন —তাদের কোনওটিরই আদিতে’কলি’ শব্দ নেই, আছে ‘চূনা’ শব্দ। অন্যদিকে ”কলিকাতা” নামের আদিতে ‘চূনা’ বা ‘চূন’ শব্দ নেই। আছে ‘কলি’ শব্দ। শুধু চুন শব্দ ব্যবহার করলে একমাত্র পাথুরে চূনকেই বোঝায়। অন্য চূন বোঝাতে হলে জোংড়া, শামুক, ঝিনুক, বাখারি ইত্যাদি শব্দ ‘চূন’ বা ‘চূনা’ শব্দের আদিতে বসাতে হয়। সুতরাং কলিকাতা নামের আদিতে ‘কলি’ শব্দ না থেকে ‘চূনা’ শব্দ থাকা উচিত ছিল –নামটি হওয়া উচিত ছিল চুনাটোলা, চুনাপাড়া, চুনাহাট বা চুনাগ্রাম –এর যে কোনও একটা। এমনকি ‘চুনাকাতা’ও চলতে পারত। কিন্তু তা না করে ‘চূনা’ শব্দের ব্যাচ্যার্থ ছেড়ে দিয়ে লক্ষার্থ ধরে অর্থ ‘কলিচুন করে চুনাপুকুর, চুনাগলি ও চুনারিটোলা থেকে ‘কলিকাতা’ শব্দ নিষ্পন্ন করা কতখানি ভাষাতত্বের নিয়মসম্মত সুধীজনেরাই তা বিচার করবেন। এর অনুরূপ দৃষ্টান্ত আমার দ্বিতীয়টি জানা নেই।

ছয়

এরপর সুনীতিবাবু লিখেছেন ” ‘কলিকাতা’ নামটি মাত্র কলিকাতা-মহানগরীতে নিবদ্ধ নহে—বাঙ্গালাদেশের দুই কোণে, পূর্বে ও পশ্চিমে, ‘কলিকাতা’ নামে দুইটি গ্রাম আছে। ….ঢাকা জেলার লোহজঙ্গ থানার অধীনে, এবং হাওড়া জেলার আমতা থানার অধীনে এই দুই কলিকাতা গ্রাম। গত ১৯৩৭ সালের মে মাসে আমি ঐ দুই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মচারীদের পত্র লিখিয়া গ্রাম দুইটির সম্বন্ধে খবর আনাই। লোহজঙ্গ থানার শ্রীযুক্ত ক. মুখোপাধ্যায় মহাশয় জানাইয়াছেন যে, উক্ত থানার প্রায় তিন মাইল উত্তরে ‘কলিকাতা-ভোগদিয়া’ নামে একটি ক্ষুদ্র গ্রাম আছে; ইহার অধিবাসী-সংখ্যা মাত্র ৩/৪ শত, প্রায় সকলেই মুসলমান চাষী; ঐ গ্রামে চূনের কাজ হয় না। আমতা থানার সব-ইনস্পেকটর শ্রীযুক্ত অ. বন্দ্যোপাধ্যায় মহাশয় লিখিয়াছেন, আমতা থানার বায়ুকোণে প্রায় আড়াই মাইল দূরে ‘রসপুর-কলিকাতা’ গ্রাম অবস্থিত। (এই গ্রামকে ‘ছোট-কলিকাতা’ বলিতেও শোনা যায়)। সব-ইনস্পেকটর মহাশয়ের বিবরণ তুলিয়া দিতেছি

The village is situated on the northern bank of the river Damodar. Its population is about 1000, mainly cultivators. Lime is manufactured in this village from snail-shells ( শামুক চূন) on an extensive scale so as to meet the local demands.

ঐ স্থানে তিনজন চুনারী মহাজন আছেন, তাঁহাদের নামও দিয়াছেন।”

মন্তব্য

ক. আর দুটো ‘কলিকাতা’ গ্রামের নাম শুনে সেখানে কলিচুন হয় কিনা সুনীতিবাবু দারোগাদের লিখে যাচাই করতে গেলেন, অথচ যে কলকাতা তাঁর এই আলোচনার প্রধান বিষয় সেই কলকাতায় সত্যসত্যই চুন তৈরি হত কি না তা কাগজপত্র থেকে স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করবার বিন্দুমাত্র প্রয়োজন বোধ করলেন না, শুধু ভাষাগত ব্যুৎপত্তির উপর ও তিনটি নামের উপর নির্ভর করেই সন্তুষ্ট হয়ে রইলেন। ব্যুৎপত্তি যাই বলুক, ‘কলিকাতা’ নামের গ্রাম থাকলেই যে সেখানে কলিচুন তৈরি হতেই হবে এমন কোনও কথা নেই। কলিচুন না তৈরি হলেও গ্রামের নাম ‘কলিকাতা’ হতে পারে, প্রমাণ ‘কলিকাতা-ভোগদিয়া’। যদি একটি মাত্র দৃষ্টান্তের দ্বারাও কোনও তত্ব (theory) বা প্রকল্প (hypothesis) অপ্রমাণিত হয় তাহলে সেই তত্ব বা প্রকল্প দাঁড়াতেই পারে না। সুনীতিবাবু মোট তিনটি ‘কলিকাতা’ নিয়ে আলোচনা করেছেন, তার মধ্যে এ পর্যন্ত দুটির বেলায় তাঁর ‘তত্ব’ মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে। বাকি আছে একটি –‘রসপুর-কলিকাতা’। তার ব্যাপারটা আমরা পরে দেখব। আপাতত যদি ধরেও নিই যে এই শেষের ‘কলিকাতা’ সম্বন্ধে তাঁর তত্ব সত্য প্রমাণিত হয়েছে, তাহলে সত্যমিথ্যার অনুপাত দাঁড়ায় ১ ২। সুতরাং তাঁর তত্ব গ্রাহ্য হতে পারে না।

যদি মাত্র ‘কলিকাতা’ নামের একটা যেমন-তেমন ব্যুৎপত্তি নির্ণয় করাই তাঁর প্রকৃত উদ্দেশ্য হয়ে থাকে, তাহলে ‘কোল কা হাতা’ বা ‘কোলি কা হাতা’তো চমৎকার ব্যুৎপত্তি। কিন্তু সুনীতিবাবু কি এ ব্যুৎপত্তি গ্রহণ করবেন? করবেন না, বলবেন কোলরা বা কোলিরা যে কলকাতায় বাস করত তার প্রমাণ কি? আমিও সুনীতিবাবুকে তাঁর ব্যুৎপত্তি সম্বন্ধে সেই কথাই বলি। কলিচূন যে কলকাতায় হত তার প্রমাণ কি? ‘রসপুর-কলিকাতা’ কোনও প্রমাণ নয়। সেখানে যা হত তাই হতে হবে এমন কোনো কথা নেই। তাহলে ‘কলিকাতা-ভোগদিয়া’তেও হত।

খ. ‘রসপুর-কলিকাতা’—এখন এই গ্রামের ব্যাপারটা দেখা যাক।

‘কলিকাতা-ভোগদিয়া’কে লোহজঙ্গ থানার দারোগা একটি গ্রাম বলেছেন। আমতা থানার দারোগাও বলেছেন ‘রসপুর-কলিকাতা’ একটি গ্রাম। গোড়ায় গলদ! এ দুটি কখনওই এক গ্রাম হতে পারে না, তারা আলাদা অথচ পাশাপাশি গ্রাম। বাংলাদেশে এরকম যুগ্ম গ্রামের নাম বহু আছে। কোনও জেলায়, মহকুমায় বা থানায় একই নামের একাধিক গ্রাম থাকলে, একটি গ্রামকে অন্য গ্রাম থেকে পৃথক করবার জন্য যুগ্ম গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়। ভোগদিয়া গ্রাম ওই অঞ্চলে নিশ্চয়ই একের বেশি আছে। সেই জন্য আলোচ্য ভোগদিয়াকে শনাক্ত করবার উদ্দেশ্যে তার পূর্বে তার পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম ‘কলিকাতা’ জুড়ে দেওয়া হয়েছে। এখানে কলিকাতা গ্রাম দিয়ে ভোগদিয়া গ্রামকে সনাক্ত করা হয়েছে। সেইরকম রসপুর ও কলিকাতা দুটি আলাদা গ্রাম। এখানে কলিকাতা গ্রামকে শনাক্ত করবার জন্য তার নামের আগে ‘রসপুর’ নাম জুড়ে দেওয়া হয়েছে। যে গ্রামকে দিয়ে নিকটবর্ত্তী অন্য গ্রামকে শনাক্ত করা হয়, যে গ্রামের নাম প্রথমে বসে, সেটি সাধারণত অন্যটির চেয়ে বেশি বিখ্যাত। প্রথমটিতে ভোগদিয়ার চেয়ে কলিকাতা বেশি বিখ্যাত। দ্বিতীয় দৃষ্টান্তে রসপুর কলিকাতার চেয়েও বেশি বিখ্যাত। এই আলোচনা থেকে জানা গেল যে রসপুর ও কলিকাতা এক গ্রাম নয়, দুটি পাশাপাশি গ্রাম এবং কলিকাতার চেয়ে রসপুর অনেক বেশি বিখ্যাত। প্রকৃত পক্ষেও তাই-ই। আমতা থানার দারোগা সাহেব যখন রসপুর-কলিকাতাকে ‘this village’ বলেছেন তখন কলিকাতা না রসপুর কোন গ্রামে শামুক চূন হত এবং প্রায় ১০০০ চাষি কোন গ্রামে বাস করত বোঝা যাচ্ছে না। তিনি কি দুটি গ্রাম একসঙ্গে ধরেছেন? তাহলে তো বুঝতে হবে রসপুর ও কলিকাতা দুই গ্রাম মিলিয়েই ১০০০ বাসিন্দা এবং দুই গ্রামেই শামুক চূন হত। শামুক চুনকে যদি কলিচুন বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে জিজ্ঞাস্য রসপুরের নামও কলিকাতা হল না কেন?

আর একটি কারণে যুগ্ম গ্রামের নাম ব্যবহার করা হয়। যদি গ্রাম দুটি স্বতন্ত্র মৌজা না হয়ে দুটি গ্রাম মিলিয়ে এক মৌজা হয়। কলিকাতা-ভোগদিয়ার কথা জানি না। রসপুর-কলিকাতা বিভিন্ন মৌজা, এক মৌজা নয়।

শুধু দারোগাবাবুই রসপুর ও কলিকাতাকে একটি গ্রাম বলে ধরেছেন তা নয়, এ অঞ্চলের সকলেই ধরে থাকে। রসপুর চাষিপ্রধান গ্রাম নয়, কলিকাতা চাষি-প্রধান। রসপুরে ব্রাহ্ম, কায়স্থ ইত্যাদি বহু ভদ্র গৃহস্থের বাস। গ্রামে স্কুল আছে, বড় বড় পাকাবাড়ি আছে, দেবালয় আছে। এই গ্রামের খ্যাতি এত বেশি যে কলিকাতা গ্রামের নাম এ অঞ্চলের অধিকাংশ লোকই জানে না। তারা কলিকাতাকে রসপুর গ্রামের অহিন্দু এবং নিম্নশ্রেণীর হিন্দুপাড়া হিসাবেই জানে। প্রকৃতপক্ষে কলিকাতা আগে তাই ছিল, পরে স্বতন্ত্র মৌজা হয়।

গ. ১৯৩৭ সালে থানার দারোগাবাবু সুনীতিবাবুকে লেখেন, রসপুর-কলিকাতা গ্রামে স্থানীয় প্রয়োজন (local needs) মেটাবার জন্য শামুক চূন প্রচুর পরিমাণে তৈরি হয় (‘manufactured …on an extensive scale’)। অর্থাৎ ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত হত। ‘স্থানীয় প্রয়োজন’-এর মানে স্পষ্ট নয়। শুধু রসপুর-কলিকাতার প্রয়োজন, না সমগ্র আমতা থানার প্রয়োজন? কোন কাজে এই চূন ব্যবহার হত দারোগাবাবু তাও লেখেন নি। শুদ্ধ গোটাকতক গ্রামের পাকাবাড়ির দেওয়ালে কলি ফেরাবার জন্য লাগত? সে তো অল্প চুনেই হয়। তার জন্য extensive scale-এ manufacture করবার প্রয়োজন করে না। শুধু বাইরে চালান গেলেই extensive scale-এ চুন তৈরি করা দরকার হয়ে পড়ে। কিন্তু বাইরে চালানের কথা তিনি বলেননি। তাঁর উক্তি স্ববিরোধী ও উদ্ভট মনে হয়।

এ বিষয়ে L. S. S. O’ Malley I. C. S ও বিখ্যাত ঐতিহাসিক মনোমোহন চক্রবর্তী বি. সি. এস প্রণীত ও ১৯০৯ সালে প্রকাশিত Howrah District Gazetteer-এর বিবরণ এখানে উদ্ধৃত করছি

Amta—It has long been an important centre of trade. Formerly it contained many salt and coal depots, being an entrepot for salt brought from Midnapore and coal brought from the Ranigunj coalfield. TheDamodar then formed a broad highway of commerce bearing hundreds of cargo boats. …The railways have killed the river-borne trade in salt and coal; but on the other hand the trade in paddy and straw, carried partly by boats and partly by rail, has flourished; and there are also large exports to Howrah of jute, vegetables and fish. Brown country paper used to be manufactured here but that industry had been crushed by the pressure of competition.

There are several important villages in the jurisdiction of Amta Thana, such as Raspur (রসপুর নয় রাসপুর), Joypur, Jhinkra and Narit. Other places which may be mentioned are Pandua…..the home of the well-known poet Chandra Rai; Amrajuri with a charitable disensary, Rautra, the home of Babu Jiban Krishna Rai, said to be the richest kaibarta in the Sub-Division; and Bhatora on the Rupnarain river with a police beat-house.

উপরের উদ্ধৃতিতে আমতা শহর ও আমতা থানার প্রধান প্রধান গ্রামের ও বাণিজ্যদ্রব্যের উল্লেখ আছে। রসপুর বা রাসপুর গ্রামের উল্লেখ আছে কিন্তু ‘কলিকাতা’ গ্রামের ও সেই গ্রামে প্রভূত পরিমাণে উৎপন্ন শামুক চুনের কোনও উল্লেখ নেই। এই গেজেটিয়ার দারোগাবাবুর চিঠি লেখার ২৮ বছর আগে প্রকাশিত হয়। তাহলে বুঝতে হবে, হয় গেজেটিয়ার প্রকাশের সময় পর্যন্ত কলিকাতা গ্রাম ও তার চূনের উৎপাদন এত নগণ্য ছিল যে গেজেটিয়ার-প্রণেতাদের কর্ণগোচর হয়নি, নয় গেজেটিয়ার প্রকাশিত হবার পরে কলিকাতা গ্রামে শামুক চুন তৈরি আরম্ভ হয়। শেষেরটি হয়ে থাকলে শামুক চুন তৈরির সঙ্গে ওই গ্রামের নামের কোনও সম্বন্ধ নেই। কারণ গ্রামটি তো আর ১৯০৯-এর পরে হয়নি!

ঘ. দুই দারোগাবাবুর চিঠিতেই একটি অত্যন্ত জরুরি কথা, যা গ্রামের নাম নির্ধারণের পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়, সেই কথাটিই নেই। লোহজঙ্গের দারোগা জানিয়েছেন ‘ঐ (কলিকাতা-ভোগদিয়া) গ্রামে চূনের কাজ হয় না।’ অর্থাৎ ১৯৩৭ সালে হত না, কিন্তু জানা দরকার ছিল আগে কখনও হত কি না। তবেই কলিকাতা নামের ব্যুৎপত্তির সাহায্য হত। ঠিক সেইরকম আমতার দারোগা জানিয়েছেন শামুক চুন হয়। তার চেয়ে যা জানা দরকারি ছিল সে হচ্ছে, কতদিন থেকে হয়ে আসছে। যদি জানা যেত শহর কলকাতার আগে না হোক, একই সময় থেকে হয়ে আসছে, তা হলে বোঝা যেত আমাদের কলকাতার পরে নয়, তার দ্বারা প্রভাবিত হয়ে নয়, স্বতন্ত্রভাবে ওই গ্রামের নাম কলিকাতা হয়েছে কলিচুন থেকে। কিন্তু তা যে হয়নি তা প্রমাণিত হচ্ছে ওই গ্রামের ‘ছোট-কলিকাতা’ নাম থেকে। অর্থাৎ ‘বড়’ কলিকাতা নাম থেকেই ‘ছোট’ কলিকাতা নামের উৎপত্তি হয়েছে।

ঙ. সুনীতিবাবু নিজে কখনও ‘রসপুর-কলিকাতা’ গ্রামে গেছেন কি না জানি না। আমি ৩/৪ বার গেছি। প্রথম যাই বহুবছর আগে, তাঁর প্রবন্ধ পড়বার পরই। তারপরেও কয়েকবার গেছি। আমি অনুসন্ধান ক’রে কলিকাতা গ্রাম সম্বন্ধে যা জানতে পেরেছি তা এই।

আজ থেকে অনেক বছর আগে—অষ্টাদশ শতকের শেষ কিংবা ঊনবিংশ শতকের গোড়ার দিকে জনা-কয়েক ইংরেজ কলকাতা শহর থেকে এসে এই গ্রামে দামোদর তীরে কুঠি তৈরি করে। তখন এই গ্রাম রসপুর গ্রামেরই একটি পাড়া ছিল। মুসলমান ও তপশিলি হিন্দুরা এই পাড়ায় বাস করত। কলকাতার খ্রিস্টান সাহেবরা তো হিন্দু-প্রধান রসপুর গ্রামে বাস করতে পারত না। সেইজন্য তারা এই পাড়ায় এসেছিল। কিসের কুঠি তারা বানিয়েছিল তা স্থানীয় অধিবাসীরা নিশ্চিত করে বলতে পারেন না। তবে তাঁরা প্রাচীনদের কাছ থেকে শুনেছেন যে নীলকুঠি। যে কুঠিই বানাক, সেই কুঠি নির্মাণের সূত্রেই তারা রাজমিস্ত্রি, ছুতারমিস্ত্রি প্রভৃতির সঙ্গে কয়েকঘর চুনিয়াকেও এই পাড়ায় আনে। যখন তাদের ব্যবসা জেঁকে ওঠে ও এই পাড়া সমৃদ্ধিশালী হয় তখন তারা এর নাম রাখে ‘ছোট-কলিকাতা’। তখনই এই সাহেবপাড়া রাসপুর গ্রাম থেকে আলাদা হয়ে এক স্বতন্ত্র মৌজায় পরিণত হয়। সুতরাং চুন তৈরির সঙ্গে ছোট-কলিকাতা নামের কোনও সম্বন্ধ নেই। আমি প্রথমবার যখন সে গ্রামে যাই তখন সেই বিরাট কুঠিবাড়ির ধ্বংসাবশেষ দেখে স্তম্ভিত হয়েছিলাম। শেষবার দিয়ে দেখি যে ভগ্ন-স্তূপ প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়েছে। চুনিয়াদের বংশধর আর কেউ নেই। চুন তৈরি বন্ধ ।

চ. ইংরেজরা ঘর ছেড়ে বিদেশে গিয়ে যেখানেই বসবাস করেছে সেই জায়গার নাম রেখেছে তারা যে গ্রাম, শহর, জেলা বা দেশ থেকে এসেছে সেই-সেই গ্রাম শহর ইত্যাদির নামে। শুধু সেইসব নামের আগে একটা New (নতুন) শব্দ বসিয়ে দিয়েছে, যেমন NewBritain, New Caledonia, New Cumberland, New England, New Glasgow, New Hampshire, New Ireland, New York ইত্যাদি। বর্তমানে ইংরেজদের অনুকরণেই আমরা ‘নব-ব্যারাকপুর’, ‘নব-বৃন্দাবন’ তৈরি করেছি। এদেশে কলকাতা থেকে ইংরেজরা গিয়ে বাংলার পল্লীতে বাস করলে সে পল্লীর ‘নতুন কলিকাতা’ নাম রাখত না, রাখত ‘ছোট কলিকাতা’। সুনীতিবাবু যদি নিজে গিয়ে ভোগদিয়া-কলিকাতার তথ্যানুসন্ধান করতেন, আমার দৃঢ় বিশ্বাস তিনি রসপুর-কলিকাতার মতোনই একটা ইতিহাস সে কলিকাতাতেও পেতেন। রসপুর-কলিকাতা তো অত্যন্ত অখ্যাত কলিকাতা। স্থানীয় লোকেরাও জানে না, হাওড়া জেলা গেজেটিয়ারও জানে না। কিন্তু যে ‘ছোট কলিকাতা’ প্রায় শতবর্ষ ধরে বাংলার ইতিহাসে বিখ্যাত হয়ে ছিল, তা ছিল নদীয়া জেলার ‘সুখসাগর’ গ্রাম –ওয়ারেন হেস্টিংস ও পোর্তুগিজ ধনকুবের জোসেফ ব্যারেটোর লীলানিকেতন। ১৮৫৯-৬০ সাল নাগাদ সে ‘ছোট কলিকাতা’ গঙ্গাগর্ভে বিলীন হয়েছে। শুধু তার ক্ষীণ স্মৃতিটুকু জেগে আছে ‘সাহেব ডাঙা’ এই নামের আড়ালে।

মোট কথা, নাম একটি মনগড়া (arbitary) চিহ্ন, যা বস্তু বা ব্যক্তি বা স্থানের গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হয়, তাকে অন্য বস্তু ব্যক্তি বা স্থান থেকে পৃথক করে শনাক্ত করবার জন্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নামের সঙ্গে বাস্তবের মিল হয় না। হিন্দুদের নাম আগে প্রায় ঠাকুর-দেবতার নামে রাখা হত। যার নাম নারায়ণ বা শঙ্কর বা পার্থসারথি সে সত্যিই নারায়ণও নয় শঙ্করও নয় পার্থসারথিও নয়। আজকাল ছেলেমেয়েদের অন্য নাম দেওয়া হয়। সেখানেও নামের অর্থের সঙ্গে বাস্তবের মিল নেই। কানাছেলের নাম পদ্মলোচন-এর মতো কালোমেয়ের নাম শুক্লা হয়, আবার ফর্সা মেয়ের নামও কৃষ্ণা হয়। যার নাম অসীম বা অনন্ত সে সত্যিকার অসীম বা অনন্ত নয়।

স্থানের নামের ক্ষেত্রে এ অসংগতি আরও বেশি প্রকট ও ব্যাপক। বস্তুত ব্যক্তির নামের মানে তবু বোঝা যায়। স্থানের নামের মানে বহু ক্ষেত্রে বোঝাই যায় না। টালা, বড়িষা, বন্ডেল, গর্চা, ধাপা, ধাপধাড়া, শালিমার ইত্যাদি নামের কী মানে? যেখানে স্থানের নাম যুগ্ম শব্দের দ্বারা গঠিত সেখানে হয় প্রথম শব্দটি বোঝা যায়, দ্বিতীয়টি বোঝা যায় না, যেমন বাজারসহু; নয় দ্বিতীয়টি বোঝা যায়, প্রথমটি বোঝা যায় না, যেমন গোঁদলপাড়া। আবার যেখানে দুটো শব্দেরই মানে বোঝা যায় সেখানে গোটা নামটার অর্থ বাস্তবের সঙ্গে মেলে না, যেমন নারায়ণপুর বা বৈকুণ্ঠপুর (যদি ব্যক্তির নাম থেকে না হয়ে থাকে) সত্যিই বিষ্ণুর গোলোকধাম নয়। কলিকাতাও সেইরকম একটি নাম। ‘কলি’ ও ‘কাতা’—এই দুই শব্দের টেনেবুনে একটা অর্থ দাঁড় করালেও এটা সত্য নয় যে গোটা নামটা ‘কলিকাতা’ নামক স্থানের বাস্তব বৈশিষ্ট্যকে প্রতিফলিত করছে।

তাঁর প্রবন্ধের গোড়ায় সুনীতিবাবু লিখেছেন ‘দেড় শত বৎসরের অধিক কাল ধরিয়া ভারতে বৃটিশরাজ্যের রাজধানী হইবার গৌরব ছিল যে নগরীর, সেই কলিকাতা-নগরীর নামের ব্যুৎপত্তি এখনও (অর্থাৎ ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত — রা. মি.) নির্ধারিত হইল না, ইহা বড় আশ্চর্যের বিষয়।’ এই নির্ধারণ কার্যটি এ যাবৎ কেউ করতে পারেননি বলে সুনীতিবাবু অনেক ভেবেচিন্তে কলিচুন থেকে কলিকাতা নামের উৎপত্তি হয়েছে —- এই তত্ব ‘আবিষ্কার’ করেছেন। কিন্তু সুনীতিবাবু বোধ হয় জানেন না যে আজ থেকে ৭৭ বছর আগে ১৮৯২ খ্রিস্টাব্দে মুদ্রিত তৃতীয় সংস্করণ বিশ্বকোষ-এ ‘কলিকাতা’ নামে এক দীর্ঘ প্রবন্ধ সন্নিবিষ্ট হয়। প্রবন্ধ-লেখকের নামের উল্লেখ না থাকলেও বিশ্বাস করবার যথেষ্ট কারণ আছে যে তিনি আর কেউ নন, মাইকেলের পরম বন্ধু পুরাতত্ববিদ ও এশিয়াটিক সোসাইটির সহকারী সচিব গৌরদাস বসাক। তিনি এই প্রবন্ধে পূর্ব থেকে ১৮৯২ সাল পর্যন্ত প্রচলিত কলিকাতা নামের উৎপত্তি সম্বন্ধে চারটি মতবাদের উল্লেখ করেছেন। তার মধ্যে একটা হচ্ছে কলিচুন থেকে কলিকাতা। এই মতবাদ সম্বন্ধে তিনি মন্তব্য করেছেন ‘কলিচূন হইতে কলিকাতা নাম হওয়া নিতান্ত উষ্ণ মস্তিষ্কের কথা, এরূপ প্রলাপবাক্যে কর্ণপাত করা যাইতে পারে না।’

* ‘বিশ্বকোষ’-এ কলিকাতা নামের এই উত্পত্তির কথা আমাকে জানানর রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক ডঃ প্রদীপ কুমার সিংহ, ডি. ফিল । এর জন্য তাঁর কাছে আমি কৃতজ্ঞ । রা.মি.

৭ম বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা

(কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৭৬)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *