ছাত্রদের বিপ্লবী ভূমিকা – নিত্যপ্রিয় ঘোষ

ছাত্রদের বিপ্লবী ভূমিকা – নিত্যপ্রিয় ঘোষ

১৯৬৮ সালের মে মাসে ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রবিক্ষোভ যখন ক্রমশ ছাত্রবিপ্লবে আকার নেয় এবং ছাত্রবিপ্লব শ্রমিকবিপ্লবে পরিণত হতে যাচ্ছে তখন ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির দ্বিতীয় সর্বাধিনায়ক জোর্জ মার্শেই লিখলেন ‘এইসব আপাত-বিপ্লবীরা শুধু যে ছাত্রদের খেপিয়ে তুলছে তাই না, এরা শ্রমিকদের বিপ্লব শেখানোর ধৃষ্টতাও দেখাচ্ছে।’ ছাত্ররা যে শ্রমিকদের সঙ্গে কাঁধ মিলিয়ে বিপ্লব করতে পারে, এটা মার্শেই কিংবা ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির পক্ষে ভাবা কঠিন ছিল, তাই এই ব্যঙ্গ। ড্যানিয়েল কোন-বেন্ডিট তাঁর পাঁচ সপ্তাহে লেখা মে-জুন মাসের বিপ্লব সম্পর্কে বইতে*, মার্শেই-এর ব্যঙ্গের উত্তর লিখেছেন, ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির চিন্তার ধারা মার্শেই-র লেখা থেকেই বোঝা যায়। এঁরা শুধু ‘শেখানোতেই’ বিশ্বাস করেন, এঁদের দৌড় লেকচার দেওয়াতেই, বিপ্লব করানোতে নয়, বিপ্লবাত্মক পরিস্থিতির উদ্ভব হল কি না তা বুঝবার ধৈর্য বা বৃদ্ধি বা ইচ্ছা এঁদের নেই।

ছাত্রদের প্রতি ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টির অবিশ্বাসের কারণ কী? একজন বাইরের ছোকরা, একটা জার্মান ইহুদি, নাম ড্যানিয়াল কোন-বেন্ডিট, এদের চালনা করেছে বলে? এই বিপ্লবী ছাত্ররা কম্যুনিস্ট ছাত্র ইউনিয়ন ইউ ই সি-র কর্তৃত্ব মানেনি বলে? এই বিপ্লবীরা পার্টিতে বিশ্বাস করে না বলে? অথবা ছাত্রদের স্বরূপই বিপ্লব-বিরোধী বলে? যে কারণেই হোক মার্শেই লিখলেন

এইসব ‘বিপ্লবীদের’ চিন্তা এবং কার্যকলাপ দেখলে হাসি পায়। এরা সকলে এসেছে কারখানা মালিকদের বাড়ি থেকে। এরা শ্রমিকের ছেলেদের, যাদের দুয়েকজনের সঙ্গে পড়াশুনা করতে বাধ্য হয়, তাদের অনুকম্পা করে। বিপ্লব-টিপ্লব সেরে এরা সবাই বাবার ব্যবসায়ে কারখানায় নেমে পড়বে এবং শ্রমিক শ্রেণীর চূড়ান্ত শোষণে তৎপর হয়ে ধনতন্ত্রের ধ্বজা ওড়াবে।

ফরাসি কম্যুনিস্টরা যাই ভাবুন না কেন, মে-জুন মাসের ছাত্রবিপ্লব প্রমাণ করেছে ছাত্রদের পক্ষে বিপ্লবী হওয়া সম্ভব। ড্যানিয়েল কোন-বেন্ডিট তাঁর বইয়ের প্রথমার্ধে বর্তমান জগতে ছাত্রদের বিপ্লবী ভূমিকা আলোচনা করে এই সিদ্ধান্তেই এসেছেন, এবং মে-জুন মাসে তার বাস্তব রূপায়ণ প্রত্যক্ষ করেছেন বলে দাবি করছেন।

ধনতন্ত্রের অন্তর্দ্বন্দ্ব, কোন-বেন্ডিটের ধারণায়, আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও প্রকট হয়ে উঠেছে। আমলাতান্ত্রিক ধনতন্ত্রে রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজব্যবস্থা চালু রাখতে হলে দরকার ইঞ্জিনিয়ার, টেকনিশিয়ান, বৈজ্ঞানিক, শিক্ষক, প্রশাসক, মনস্তত্ববিদ। না হলে উৎপাদন অব্যাহত রাখা, শিল্পোদ্যোগের গতিপ্রকৃতি আপন স্বার্থের অনুকূলে রাখা, রাষ্ট্রযন্ত্র চালু রাখা, এমনকি অবসর সময় কীভাবে কাটালে ধনতন্ত্র নিরাপদে থাকবে সেদিকে খেয়াল রাখা, ইত্যাদি ঠিক থাকে না। বিশ্ববিদ্যালয় নামধারী শিক্ষাযন্ত্রের উদ্দেশ্যই হচ্ছে ধনতন্ত্রের পক্ষে অত্যাবশ্যক এই ধরনের কর্মী তৈরি করা। এক সময় বুর্জোয়া শ্রেণীর আপন লোকজনই যথেষ্ট ছিল, তারাই এইসব শিক্ষাযন্ত্রে তৈরি হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের ভার গ্রহণ করত। কিন্তু ধনতন্ত্রের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এই দীক্ষায় দীক্ষিত কর্মীদের চাহিদা বাড়তে লাগল, তার ফলে ক্রমশই স্কুলকলেজের দরজা শ্রমিকশ্রেণীর কাছে খুলতে লাগল। বর্তমানে শ্রমিকশ্রেণী থেকে উত্তরোত্তর বেশি সংখ্যায় ছাত্রছাত্রী আসছে। কিন্তু এইটুকুই। শ্রমিকশ্রেণী থেকে ছাত্ররা আসছে বলেই ধনতন্ত্রের শিক্ষাযন্ত্র হঠাৎ গণতান্ত্রিক হয়ে উঠবে না। বর্তমান শিক্ষাযন্ত্রের উদ্দেশ্যই হচ্ছে এই-নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রমিক বা কৃষকশ্রেণীর ছেলেমেয়েদের ধনতন্ত্রের ছাঁচে গড়ে তোলা। এবং কার্যত ঘটছেও তাই। এই নতুন শ্রেণীর ছাত্ররাও বড় হয়ে ম্যানেজার হয়ে উঠছে, ধনতন্ত্রের ছাঁচে সুন্দর নিজেদের মিলিয়ে রাখছে।

কিন্তু কতদিন? বিজ্ঞানের উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে অদক্ষ কর্মীর চাহিদা যতই কমবে, দক্ষ কর্মীর চাহিদা যতই বাড়বে, স্কুলকলেজের দরজা ততই কৃষক-শ্রমিক শ্রেণীর কাছে উন্মুক্ত হবে। তারপর এমন অবস্থা হবে, যখন সব ছাত্রদের চাকরি দেওয়া ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রযন্ত্রের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না। তখনই শ্রমিক ছাত্রদের চোখ ফুটবে। তাদের মধ্যে বিক্ষোভ সঞ্চারিত হবে। তারা বিপ্লবী হয়ে উঠবে।

কিন্তু এর চাইতেও বড় কথা, যার জন্য স্কুলকলেজে ধনতান্ত্রিক অন্তর্দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হয়ে ওঠে, তা হল, শিক্ষাজগতের অন্তর্দ্বন্দ্ব। একদিকে যেমন স্কুলকলেজগুলো দক্ষ কর্মী তৈরি করতে ব্যস্ত, অন্যদিকে তেমনি এগুলো সৎ চিন্তাবিদদের উৎসাহ না দিয়েও পারে না। কৃষ্টি, বিজ্ঞান, মানবতাবোধ ইত্যাদির আধার বিশ্ববিদ্যালয়ে মধ্যে মধ্যে শিক্ষার উদ্দেশ্য, মানব-চরিত্র, সমাজ-উন্নতি ইত্যাদি বিষয়ে আলোচনা, তর্ক হয়েই পড়ে। একজন ছাত্র যখন শিক্ষা নিয়ে ভাবে, তর্ক করে, তখন তার চোখের সামনে এই অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রকট হয়ে দেখা দেয়। পদার্থবিদ্যার ছাত্র দেখে, বিজ্ঞানী মানুষের উন্নতির জন্য গবেষণা চালাচ্ছেন এবং হাইড্রোজেন বোমা তৈরি করেছেন। একজন মনস্তত্ববিদ কেবলই চিন্তা করছেন, মানুষকে কী করে কাজের উপযোগী করে তোলা যায়, কিন্তু কাজকে কী করে মানুষের উপযোগী করা যায়, সে বিষয়ে কোনও চিন্তাই তাঁর নেই। উন্নত দেশ ও অনুন্নত দেশের অর্থনৈতিক বৈষম্য কোনও মানবিক যুক্তিতেই কোনও ছাত্র ব্যাখ্যা করতে পারে না। অর্থাৎ কেবলমাত্র মানবতাগ্রাহ্য ব্যাখ্যা দিয়ে সে আধুনিক জগৎকে বিশ্লেষণ করতে পারে না, তার সামনে ধনতান্ত্রিক রাষ্ট্রের শোষণব্যবস্থার মূল চরিত্র উন্মুক্ত হয়ে পড়েই। যে বিশ্ববিদ্যালয় তাকে নিয়েছিল নিছক আপন প্রয়োজনে, দক্ষ কারিগর হিসেবে তৈরি করে নিতে, সেই বিশ্ববিদ্যালয়ই তার চোখের পর্দা সরিয়ে শোষণযন্ত্রের স্বরূপ চিনিয়ে দেয়।

তাই বর্তমান জগতের সর্বত্র, বার্কলেতে, টোকিওতে, মাদ্রিদে, রোমে, ওয়ারশতে, কলাম্বিয়াতে, নিউইয়র্কে, ছাত্ররা বিপ্লবী হয়ে উঠছে। তাদের বিক্ষোভের ধরন আগেকার তরুণসমাজের বিক্ষোভের চেহারা থেকে স্বতন্ত্র। পুরোনো যুবসমাজ অশান্ত হয়ে উঠত, তার কারণ বড়দের আসন কত তাড়াতাড়ি তারা অধিকার করে নিতে পারবে, তার জন্য। আজকের যুবসমাজ অশান্ত হয়ে উঠছে, তার কারণ বড়দের আসন অধিকার করার লোভ নয়, বর্তমান সমাজ ব্যবস্থার শোষণস্বরূপের উপলব্ধি। ফ্রান্সের ছাত্রসমাজ অর্থনৈতিক দারিদ্র্যে পীড়িত নয়, তারা শাসনযন্ত্রের অর্থহীনতায়, ধনতন্ত্রের শোষণস্বরূপের নগ্নতায় পীড়িত। তাই তাদের বিক্ষোভ শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠনের বিরুদ্ধেই নয়, পূর্ণ সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধে। তাই তারা হাত মেলায় শ্রমিকশ্রেণীর সঙ্গে, কৃষকশ্রেণীর সঙ্গে, যাতে পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে উৎখাত করে নতুন সমাজ তৈরি করতে পারে।

তাই বলে সব ছাত্রই বিপ্লবী নয়। অনেক ছাত্রই বিনা দ্বিধায় ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও শিক্ষা মেনে নেয়, বড় হয়ে সেই ব্যবস্থার সঙ্গে মিশে যায়। অনেক ছাত্র এই শোষণব্যবস্থার স্বরূপ চেনে, কিন্তু সংঘর্ষের ভয়ে আপত্তি করে না। অনেক ছাত্রই কিন্তু বিবেকের তাড়নায়, মানবতাবোধের তাগিদে বিক্ষোভ করতে বাধ্য হয়, বিপ্লবী হয়ে ওঠে।

ড্যানিয়েল কোন-বেন্ডিট এই কথার উপর বারবার জোর দিয়েছেন, ফ্রান্সের ছাত্রদের বিক্ষোভ, চাকরির জন্য নয়, শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে আধুনিক জগতের ব্যবচ্ছেদের জন্য নয়, সমাজব্যবস্থার পরিবর্তনের জন্য। সংস্কার নয়, বিপ্লব। সাময়িক শান্তি নয়, সাময়িক স্বাধীনতা নয়, আমূল পরিবর্তন, যাতে সমাজের নিম্নমধ্যবিত্ত, শ্রমিক, কৃষক কোনও বিশেষ শ্রেণীর অনুগত প্রজা হয়ে না থেকে আপন জীবনের ভার নিজ হাতে নিতে পারে।

অবশ্য একথা অনস্বীকার্য যে ছাত্রসমাজ সুসংহত সমাজ নয়। কেউ চিরকালই স্কুলকলেজের ছাত্র থাকে না। নানা শ্রেণীর মানুষ ছাত্রসমাজে সমবেত হয়। কৃষক-শ্রমিকের দারিদ্র্যের চাপ এদের উপর নেই। তাদের স্বাধীনতা আছে, ভোরে উঠেই কারখানায় যেতে হয় না, মাঠে যেতে হয় না, স্ত্রী-পুত্রের ভরণপোষণ করতে হয় না। কারখানায় যেমন ফোরম্যান সব সময় ঘাড়ের উপর চেপে থাকে, জমিদারের চেলাচামুণ্ডারা যেমন পিছন পিছন লেগে থাকে, তেমন কোনও রুদ্ধশ্বাস অশান্তি এদের নেই। অর্থাৎ ছাত্রসমাজের অর্থনৈতিক কারণে বিপ্লবী হয়ে ওঠার আশু সম্ভাবনা এখনই নেই, যদিও পাশ করে বেরিয়ে চাকরি পাবে না, এই ভয় তাদের বিক্ষুব্ধ করে তুলছে। কিন্তু তার থেকেও বড় কথা, বুদ্ধিগতভাবে বিপ্লবের সর্বাঙ্গীণ প্রয়োজন তারা অনুভব করছে। কীভাবে এই অনুভূতি বিপ্লবের কাজে লাগাতে পারে? শিক্ষাজগতে বিপ্লব ঘটিয়ে শ্রমিক-কৃষককে উদ্বুদ্ধ করে।

ড্যানি কোন-বেন্ডিট এই কথা বারবার বলছেন। বার্কলের ছাত্রদের আন্দোলনের ব্যর্থতার কারণ, তাঁর মতে, তারা ছাত্র-আন্দোলনকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভেবেছিল। সেই আন্দোলনকে কৃষক-শ্রমিকের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে পারেনি। ফ্রান্সের ছাত্ররা পেরেছে। তাদের ২২ মার্চ আন্দোলন থেকে নাঁত বিশ্ববিদ্যালয়ের বয়কট আন্দোলন, তা থেকে নাঁতের বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন, তা থেকে সোরবোন, তা থেকে ১৩ মে-র শ্রমিক ধর্মঘট – ছাত্রবিপ্লব থেকে শ্রমিকবিপ্লবে উত্তরণ।

শ্রমিকযন্ত্রের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ জানিয়ে শিক্ষাযন্ত্রকে দখল করে ছাত্ররা যেমন শ্রমিকশ্রেণীকে বিপ্লবের পথ দেখানোতে সাহায্য করবে, তার সঙ্গে সঙ্গে আর একটি গুরু দায়িত্বও তাকে বহন করতে হবে। শ্রমিককে শেখানো হয়েছে যে কারখানা চালানোর যোগ্যতা তাদের নেই, সেজন্য দরকার ম্যানেজারের, সমাজ চালানোর যোগ্যতা তাদের নেই, সেজন্য দরকার প্রশাসকের। এই ভাঁওতা দিয়ে তাদের সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে। ছাত্রদের তৈরি করা হচ্ছে ওই ম্যানেজারের, প্রশাসকদের পদে উপযুক্ত করে। ছাত্রদের দায়িত্ব শ্রমিকদের কাছে এই বুর্জোয়া বুজরুকি ভেঙে দেওয়া। শ্রমিকরাও যে কারখানা চালাতে পারে, সমাজ চালাতে পারে, সেদিকে চোখ খুলে দেবে শিক্ষিত ছাত্ররা। এক একটা বিশ্ববিদ্যালয় ধরে, তার সংগঠন দখল করে (যাকে বলা যায় ‘ক্রিটিক্যাল ইউনিভার্সিটি’), ক্রমে তাকে জনগণের বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত করতে হবে।

নাঁতের-এ ঠিক এই ঘটনাই ঘটেছিল। ১৯৬৭-৬৯ সালের ধর্মঘট সেখানে শুধু চিরাচরিত রাজনৈতিক ধর্মঘট ছিল না। দশ থেকে বার হাজার ছাত্র লেকচার বয়কট করেছিল, আপাত-উপলক্ষ ছিল ছোট লেকচার হলে গাদাগাদি ছাত্রের ভিড়। এই ধর্মঘটে তথাকথিত বামপন্থী ন্যাশনাল ইউনিয়ন অফ স্টুডেন্টস কোনও নেতৃত্বই দেয়নি। ছাত্ররা স্বতঃস্ফূর্তভাব লেকচার বয়কট করেছিল। তারপর একটার পর একটা ঘটনা ঘটে যাওয়ায় দ্রুত দৃশ্যপরিবর্তন ঘটে। ড্যানিয়েল কোনো-বেন্ডিট তখনকার মিনিস্টার অফ ইয়ুথ মিসোফ-কে হিটলারের অনুচর বলে আখ্যা দেওয়ায় পুলিশ ড্যানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থাগ্রহণে তৎপর হল, ফলে দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার পড়ল, ছবি আঁকা হল, দেখানো হল পুলিশ সাদা পোশাকে কীভাবে অধ্যাপকদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াচ্ছে। ড্যানি-বিতাড়নের বিরুদ্ধে ছাত্ররা সংঘবদ্ধ হল, ডীন রায়ট-পুলিশ ডাকলেন। পুলিশ-ছাত্রের লড়াইতে পুলিশ পিছু হটল।

এখানে বলা প্রয়োজন নাঁতের-এর ডিন সত্যিসত্যিই ফ্যাসিস্ট ছিলেন না, বরং বামপন্থী বলেই পরিচিত ছিলেন। অথচ ছাত্রদের সঙ্গে সংঘর্ষের সময় ছাত্রদের সঙ্গে বোঝাপড়া না করে তিনি রায়ট-পুলিশ ডাকলেন। অর্থাৎ, মানবতাবোধের আধার বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্তির মাধ্যমে ছাত্রদের সমস্যা সমাধানের পথে না গিয়ে তিনি রাষ্ট্রযন্ত্রের কাণ্ডারি পুলিশকে ডাকলেন। সুতরাং ছাত্ররা স্লোগান দিল ‘অধ্যাপকেরা, তোমাদের হয়ে এসেছে, তোমাদের সংস্কৃতিরও।’ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে স্লোগান পড়ল ‘পরীক্ষাঘরে উত্তর দিতে বসে কেবল প্রশ্ন করে যাও।’

ফ্রান্সের সর্বত্র, যেখানেই গোলযোগ দেখা গেছে, সেখানেই পুলিশ এসেছে বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে। অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয় যাঁরা চালান, তাঁদের মূল অস্ত্র তথাকথিত মানবতাবোধ, যুক্তি, তর্ক সেসব কিছু না, সেই একই অস্ত্র পুলিশ। অর্থাৎ যে পুলিশ শ্রমিকদের দাবিয়ে রাখে মালিকের স্বার্থের জন্য, সেই পুলিশই ছাত্রকে দাবিয়ে রাখে ডিনের স্বার্থসংরক্ষণের জন্য। বিপ্লবী ছাত্র তাই বিপ্লবী শ্রমিকেরই শরিক।

ন্যাশনাল ভিয়েতনাম কমিটির ছয়জন জঙ্গি সদস্য গ্রেপ্তার হবার পর, নাঁতের-এ ছাত্ররা সমবেত হয় প্রতিবাদসভায় ২২ মার্চ। সভাশেষে ঠিক হয় অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ বিল্ডিং দখল করা হোক। সাদা পোশাকে পুলিশের নাঁত এবং নাঁতের বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ঢোকার প্রতিবাদে তারা বলল, পুলিশ এখন আর প্রতিবাদসভায় গ্রেপ্তার করে খুশি থাকছে না, সভাশেষে বিশ্ববিদ্যালয়েও ঢুকে পড়ছে ছাত্রদের সন্ধানে, সমস্ত সমাজকেই মনে করছে যেন পুলিশের ব্যারাক, সুতরাং এর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। এটা শুধু পুলিশের অত্যাচার নয়, এটা আসলে ধনতন্ত্রের অত্যাচার, মেকি গণতন্ত্রের অত্যাচার।

সেদিন দেড়শো ছাত্র, যার মধ্যে অর্ধেকেরই কোনও দলগত আনুগত্য ছিল না, ঠিক করল ২৯ মার্চ আলোচনাসভা ডাকা হোক, যাতে বিষয় হবে ১৯৬৮ সালে ধনতন্ত্র এবং শ্রমিকদের সংগ্রাম, ইউনিভার্সিটি এবং অ্যান্টি-ইউনিভার্সিটি, সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রাম, পূর্ব-পশ্চিম দেশে শ্রমিকদেরও ছাত্রদের সংগ্রাম। সেই সঙ্গে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সি ব্লক দখলের সিদ্ধান্তও নিল।

২৮ মার্চ ডিন বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ করে দিলেন। তিনশো ছাত্র জমায়েত হল। দরজাবন্ধ ঘরের সামনে তারা আলোচনা চালিয়ে গেলে পুলিশ তাদের ঘিরে থাকল। ১লা এপ্রিল সমাজবিদ্যার ছাত্ররা পরীক্ষাবর্জনের সিদ্ধান্ত নিল, সমাজবিদ্যাকে ধনতান্ত্রিক বুজরুকি আখ্যা দিল। অধ্যাপকেরা কেউ কেউ ক্লাস বন্ধ করে দেওয়ায় আপত্তি করে বললেন, ছাত্রদের আলোচনা করতে দেওয়া হোক। ২রা এপ্রিল ১২০০ ছাত্র লেকচার হল দখল করল, যদিও ডিন ভয় পেয়ে তাদের জন্য একটা ছোট হল ছেড়ে দিয়েছিলেন।

এর পর ইস্টারের ছুটি। ছুটির পর একটা সভা ডাকা হল, আধা-ফ্যাসিস্ট প্রকাশক স্প্রিঙ্গার ট্রাস্টের উপর জার্মান ছাত্রদের আক্রমণকে সমর্থন করে, রুডি ডুচকের উপর আক্রমণের প্রতিবাদ জানিয়ে। নাঁতের-এর ছাত্ররা ক্রমশ তাদের আত্মকলহ ভুলে গিয়ে, ভিয়েতনামের সমর্থনে, জার্মান এস ডি এস-এর সমর্থনে, রেড রুডির সমর্থনে এক প্ল্যাটফর্মে জমা হল। প্রত্যেকদিন সভা, পোস্টার, পরীক্ষাবর্জন। ২রা ও ৩রা মে নির্ধারিত হল সাম্রাজ্যবাদ সম্পর্কে আলোচনার দিন হিসেবে। আধা-ফ্যাসিস্ট দল ‘অকসিদাঁ’ হুমকি দিল, ফলে নাঁতের-এর ছাত্ররাও পাথর নিয়ে তৈরি হল। ডিন ভয় পেয়ে আবার ক্লাস বন্ধ করে দিলেন। ২২ মার্চের আন্দোলনের সাতজন কর্মীকে আদেশ হল সোরবোনের এক বোর্ডের সামনে হাজির হতে। ছাত্ররা দলে দলে সেই বোর্ডের কাছে গিয়ে হাজির হল।

এইসব ছাত্রের চরিত্র বিশ্লেষণ করে ড্যানিয়েল কোন-বেন্ডিট বলছেন, এরা সকলেই বামপন্থী ছিল না। কিন্তু মুষ্টিমেয় বামপন্থী ছাত্র ছাত্র-অসন্তোষের মূল কারণ বেছে নিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে এমন একটা অবস্থা তৈরি করে যখন কর্তৃপক্ষের মূল চরিত্র উদঘাটিত হয়ে পড়ল। যুক্তিতে না পেরে, পুলিশ দিয়ে তাদের ঠান্ডা করতে চেষ্টা করা হল। যার ফল, পুলিশি অত্যাচার, যার ফলে যে সব ছাত্র ছিল না, তারাও বামপন্থীদের দলে চলে এল।

৩ তারিখ থেকে ঘটনাবলি বহুশ্রুত। প্যারিসের রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ, সোরবোনের ভেতরে পুলিশ, ক্লাসের ভেতর ঢুকে চারশো ছাত্রকে গ্রেপ্তার, ল্যাটিন কোয়ার্টারে রায়ট-পুলিশের মুখোমুখি ছাত্র, রাত্রিবেলা ছাত্রদের বা ছাত্র মনে হওয়া লোককে ঠেঙানি। ছাত্ররা সংগ্রাম লিপ্ত হল। ছাত্রদের সমর্থনে এগিয়ে এল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতি এবং নাঁতের-এর চারজন অধ্যাপক।

এই সময় কম্যুনিস্ট মতাবলম্বী ছাত্ররা ফতোয়া দিল, ‘কিছু সংখ্যক অতি-বাম ছাত্র সরকারি গাফিলতি এবং ছাত্র অশান্তির সুযোগ নিয়ে ক্লাসের পড়া নষ্ট করছে, পরীক্ষা নষ্ট করছে। এরা দ্যগলের অনুচর, শ্রমিকশ্রেণীর ছেলেমেয়েরা যারা পড়াশুনা করতে চাইছে তাদের শত্রু।’

৭ মার্চ লং মার্চে, আল ও ভ্যাঁ-এ বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ছাত্রবিক্ষোভের সময় অবশ্য সমস্ত বামপন্থী ছাত্রদলই কর্তৃত্ব হাতে নেওয়ার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু ছাত্ররা কোনও দলেরই আনুগত্য মানেনি। শাঁজেলিজ-এ যে ৩৫০০০ ছাত্র জমা হয়েছিল তাদের কোনও নেতার দরকার হয়নি। সোরবান দখল করতে পারলে কী হতে পারত বলা যায় না, কিন্তু ইউ এন এফ-এর আমলাতান্ত্রিক নেতারা বক্তৃতার তোড়ে ছাত্রদের ফিরিয়ে দিলেন। ৮ মে প্লাস দ্যু ল্যুকসাঁবুর্গ-এ কম্যুনিস্ট নেতারা ছাত্রদের ভুজুং ভাজুং দিয়ে ঘরে যেতে বাধ্য করলেন। কিন্তু ছাত্ররা দমেনি। তার পরের দিন সোরবোন খুললে ছাত্ররা টিচ-আউট অনুষ্ঠিত করে কম্যুনিস্ট নেতাদের কাছে জানতে চাইল, আগের দু’দিন ছাত্রদের বিক্ষিপ্ত করে দেওয়ার অর্থ কী? লুই আরাগঁ কম্যুনিস্ট পার্টির বক্তব্য পেশ করতে এসে তাড়া খেলেন। সাধারণ লোক ছাত্রদের সমর্থন জানাল। ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে সদস্যরা ছাত্রদের আন্দোলনের সপক্ষে দু’দল হয়ে গেলেন, দ্যগলের অবস্থা টলমল করে উঠল, পুলিশের অত্যাচার ছাত্রদের প্রতি সমর্থন জোরদার করে তুলল। ছাত্রদের আন্দোলনে এসময় কোনও নেতা ছিল না, ছাত্ররা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে পুলিশের হাত থেকে রক্ষার ভার নিজেরাই তুলে নিয়েছিল। ব্যারিকেড তৈরি হতে লাগল, আলোচনা চলতে লাগল, একদল থেকে দূত গেল অপর দলের কাছে খবরাখবর দেওয়ার জন্য। একই সঙ্গে হঠাৎ দেখা গেল সাধারণ শ্রমিক আর ছাত্ররা বসে মতবিনিময় করছে।

ড্যানি এইভাবে ১০ জুন পর্যন্ত ছাত্র-শ্রমিক বিপ্লবের প্রতিদিনের ঘটনা বিবৃত করেছেন। তাঁর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হল, কম্যুনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠন আর কম্যুনিস্ট পার্টি বারবার স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র আন্দোলনকে বিপথে চালানোর চেষ্টা করছে এবং সংকটময় মুহূর্তে সফল হয়ে ছাত্র আন্দোলনকে থামিয়ে দেওয়ার প্রাণপণ চেষ্টা করেছে। কিন্তু পারেনি। তথাকথিত নেতা ছাড়াই ছাত্র আন্দোলনের সাফল্য ঘটেছে, যার পরিণতি ১৩ মে-র শ্রমিক ধর্মঘট। নেতা ছাড়া, সংগঠন ছাড়া, কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব ছাড়া কী করে এটা সফল হল? ড্যানি দেখিয়েছেন কর্তামি ছিল না, কিন্তু দায়িত্ববোধসম্পন্ন ছাত্রসমাজ ছিল, যারা একই সঙ্গে বিভিন্ন কমিটি গঠন করে অন্দোলন চালিয়ে গেছে-ল্যাবরেটরি কমিটি, সাধারণ ছাত্র কমিটি, স্টাফ কমিটি, স্ট্রাইক কমিটি।

ছাত্র-আন্দোলন থেকে ড্যানি ক্রমশ শ্রমিক-আন্দোলনে চলে গেছেন। সেখানকার ঘটনাবলি বিবৃত করে তিনি দেখিয়েছেন কম্যূনিস্ট পার্টি, সি জি টি কীভাবে প্রাণপণে শ্রমিকবিপ্লবকে ব্যর্থ করার চেষ্টা করেছে। শ্রমিকরা যখন কারখানা দখল করছে, তখন ২১ মে সেগু্যই সি জি টি-র পক্ষ থেকে বললেন; ‘আত্মনিয়ন্ত্রণ একটা ফাঁকা বুলি, শ্রমিকরা যা চায় তা হল কিছু দাবিপূরণ।’ কিন্তু শ্রমিকদের অনমনীয় মনোভাব বুঝতে পেরে সি জি টি পথে নামতে বাধ্য হল, ২৪ মে দুটো বিশাল মিছিল বার করল। দু’লক্ষ শ্রমিক-ছাত্রের দল সেই মিছিলে যোগ দিল। আর একলক্ষ শোভাযাত্রী জমা হল গার দ্য লিঅঁ-তে। প্যারিসের অন্যান্য রাস্তায় হাজার নরনারী। স্টক এক্সচেঞ্জ দখল করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হল। প্যারিস জনতার হাতে, বিপ্লব আরম্ভ। পুলিশের সাধ্য ছিল না সমস্ত সরকারি বাড়ি পাহারা দেওয়া -এলিজে, ওতেল দ্য ভিল, রেডিও অফিস-সব অরক্ষিত। এমন সময় কম্যূনিস্ট ছাত্রেরা আবার এগিয়ে এল। জে সি আর-এর একজন নেতা ছাত্রদের চালনা করল আবার সোরবোনের দিকে। ইউ এন এফ আর পি এস ইউ-র নেতারা অর্থমন্ত্রক আর ন্যায়মন্ত্রকের বাড়ি দখল করতে দিল না, বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ছাত্র-শ্রমিককে বাড়ি পাঠিয়ে দিল। বিপ্লবের শেষ।

ড্যানির বক্তব্য সরল। ফরাসি কম্যূনিস্ট পার্টি বা ট্রেড ইউনিয়ন কর্তারা বিপ্লব চাননি, তাই বিপ্লবী পরিস্থিতির উদ্ভব হলেও, শ্রমিকসমাজ তৈরি থাকলেও, অসৎ নেতৃত্বের জন্য বিপ্লব হল না। পার্টি বিপ্লব চায়নি, তার কারণ রাষ্ট্রযন্ত্র করায়ত্ত করার পর তাকে চালনা করার মতো সংগঠন বা মনোবল তার নেই। তার নেতারা সব স্বার্থান্বেষী এবং মূলত মালিকেরই ধামাধরা। ড্যানির দৃঢ় বিশ্বাস, কারখানার মালিকেরা এখন ট্রেড ইউনিয়নের কর্তাদের আপন স্বার্থের অনুকূলেই ভাবেন। অসংখ্য শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করা দুঃসাধ্য, কিন্তু অসংখ্য শ্রমিককে নিয়ন্ত্রণ করে যে ট্রেড ইউনিয়নগুলো সেগুলো হাত করতে পারলেই নিশ্চিন্ত। এবং ফ্রান্সে তাই ঘটেছে। এখানকার ট্রেড ইউনিয়ন শ্রমিকের প্রতিনিধি নয়, মালিকের প্রতিনিধি।

ড্যানি এখানেই থামেননি। তাঁর ধারণা, পার্টি মাত্রেই ব্যুরোক্রাসি। ব্যুরোক্রাসির যাবতীয় দোষ তাতে বর্তাবেই, ফলে পার্টি নামে জনগণের হলেও আসলে মুষ্টিমেয় নেতার অস্ত্র। সুতরাং পার্টিতে বিশ্বাস করা মানে আত্মহত্যা। শুধু ফরাসি কম্যুনিস্ট পার্টি নয়, পৃথিবীর যাবতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি এই একই স্বার্থান্বেষী লোকেতে ভর্তি। সে জন্য নাঁতের-এ স্লোগান পড়েছিল ‘দয়া ক’রে, কম্যুনিস্ট পার্টি ঢোকার সময় যতটা পরিষ্কার দেখেছিলেন, বেরুবার সময় ততটাই পরিষ্কার রেখে যাবেন।’ কিন্তু এই আবেদন নিস্ফল। পার্টি আর ডিমোক্রাসি খাপ খায় না। মায় বলশেভিক পার্টিতেও খাপ খায়নি।

মে-জুন মাসে কম্যুনিস্ট পার্টি এবং সি জি টি-র কাণ্ডকারখানা দেখে ড্যানির এই বদ্ধমূল ধারণা। মে মাসের ঘটনা ঘটার আগে কম্যুনিস্ট ব্যুরোক্র্যাটরা প্রাণপণে ধর্মঘট ডাকায় বাধা দিয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয়চত্বরে ছাত্ররা যখনই কোনও বৈপ্লবিক কাজ করতে গেছে, তখনই পার্টি ব্যঙ্গ করেছে। পার্টি কেবলই শ্রমিক-শ্রেণীর ছেলেদের ভর্তি করার আন্দোলন করেছে, অথচ বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে রাষ্ট্রযন্ত্রের হাতিয়ার সেদিকে তার কোনও হঁশই নেই। তার কারণ কী? কারণ, পার্টির নেতারাও ওই একই বুর্জোয়া রোগে ভোগেন, কী ক’রে সমাজের উপরের ধাপে ওঠা যায়, নিজেদের ছেলেদের তোলা যায়। এটা তাদের খেয়াল নেই, শ্রমিকশ্রেণীর সব ছেলে একসঙ্গে উঁচু ধাপে উঠতে পারে না, উঠতে পারবে মুষ্টিমেয় কয়েকজন, সুতরাং আসল ওষুধ হল ধাপগুলোই ভেঙে দেওয়া। অথচ যতবার ছাত্ররা ৩রা মে থেকে ১৩ই মে পর্যন্ত বিক্ষোভ জানিয়েছে, ততবারই পার্টির পক্ষ থেকে তা দাবিয়ে দেওয়ার চেষ্টা চলেছে। দ্বিতীয় পর্যায়ে যখন শ্রমিক ধর্মঘট ঘটলই, তখন সি জি টি চেষ্টা করেছে বিপ্লব না ঘটিয়ে গুটিকয়েক দাবি পুরণের। তৃতীয় পর্যায়ে ধর্মঘট বানচাল করে দেওয়ার চেষ্টা।

তাহলে বিপ্লব ঘটবে কী করে কে ঘটাবে? ছোট ছোট অ্যাকশন কমিটি। এদের সঙ্গে পার্টির পার্থক্য কোথায়?

১. বিপ্লবের স্রোতের প্রত্যেকটি তরঙ্গের স্বাতন্ত্র্য ও বৈচিত্র্যকে মর্যাদা দিতে হবে, মূল্য দিতে হবে। প্রত্যেককেই আপন আপন পথে চলতে দিতে হবে। আদেশের শৃঙ্খল থাকবে না।

২. কমিটির প্রত্যেকটি প্রতিনিধি প্রতি মুহূর্তে জনসাধারণের কাছে জবাবদিহি করতে দায়ী থাকবেন, প্রয়োজন হলে তাকে ফিরিয়ে নেওয়া চলবে। বিশেষজ্ঞর কোনও স্থান নেই, কেউ যদি বিশেষজ্ঞ হতে চান, তাঁকে বাধা দেওয়া হবে। জ্ঞানের দরজা সবার কাছে সমান খোলা থাকবে।

৩ তত্ব বা তথ্যের নিরন্তর আদানপ্রদান চলবে। কেউ জ্ঞান দেওয়ার চেষ্টা করবে না, করলে বাধা দেওয়া হবে। তথ্য বা তত্বের খবরদারি সহ্য করা হবে না।

৪. কমিটিতে উঁচুতলা নিচুতলা বরদাস্ত করা হবে না।

৫. শ্রমিকসমাজে সর্বপ্রকার পার্থক্য ঘোচাতে হবে, কায়িক বা মানসিক কোনওপ্রকার তারতম্য চলবে না।

৬. কারখানা ব্যবসা চালাবে তারা যারা সেখানে কাজ করবে।

৭. বিপ্লবের জন্য কোনওপ্রকার স্বার্থত্যাগ আত্মদান ইত্যাদি বুলি বরদাস্ত করা হবে না। বিপ্লব কেউ দয়া করে করে না, করিয়ে দেয় না, বিপ্লব করে কারণ বিপ্লবই বাঁচার শ্রেষ্ঠ পথ, একমাত্র পথ।

ফ্রান্সের ছাত্রসমাজ এই বিপ্লবের পথে বিশ্বাস করে তাই সফল হয়েছিল। রাষ্ট্রযন্ত্র আয়ত্ত করা যায়নি, তার কারণ মহামহিমান্বিত কম্যুনিস্ট পার্টি এবং সি জি টি, যার তুলনায় দ্যগল আর দ্যগলের পুলিশ নস্যি।

নাঁতের-এর অধ্যাপক তুরেন বলেছেন

বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি ঢুকেছে, কখনও আর বেরুবে বলে মনে হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় যতই আধুনিক আর বিজ্ঞানসম্মত হয়ে উঠবে, ততই এর রাজনৈতিক বিশ্বাসের ভিত পাকা হবে। যতই তরুণদের বলা হবে, নিজেদের হয়ে ভাব, ততই তারা প্রতিবাদ জানাবে, সমালোচনা করবে, প্রতিরোধ করবে। বিশ্ববিদ্যালয় নিজেই তার প্রতিদ্বন্দ্বী তৈরি করবে। এই বিক্ষোভ বাড়তেই থাকবে…যদি রাজনীতিকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছুড়ে ফেলতে হয়, তাহলে আমাদের সবাইকেই তার সঙ্গে ছুড়ে ফেলতে হবে।

ড্যানির ভাষায় প্রত্যেক ইউনিভার্সিটি হয়ে উঠবে অ্যান্টি-ইউনিভার্সিটি এবং তারপর পপুলার ইউনিভার্সিটি। এখন ছাত্রদের দায়িত্ব

১. নিজেদের পাঠক্রম নিজেদের হাতে নেওয়া অর্থাৎ আত্মনিয়ন্ত্রণ।

২. ব্যক্তিগত স্বাতন্ত্র্য বা দলগত স্বাতন্ত্র্যকে দাবিয়ে রাখে যে ক্রমোচ্চ শ্রেণীভাগ তা দূর করা।

৩. যাঁরা দায়িত্বশীল পদে অধিষ্ঠিত তাঁদের ছাত্রদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা।

৪. জ্ঞানক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞতা, জ্ঞানবিভাগ, যা ছাত্রদের একের কাছ থেকে অন্যকে বিচ্ছিন্ন করে তা মুছে ফেলা।

৫. বিশ্ববিদ্যালয়ের দরজা সকলের কাছে খুলে দেওয়া।

তার আগে ছাত্ররা কী করবে? বৈপ্লবিক চিন্তা করবে, স্বতঃস্ফুর্তভাবে কাজ করবে, তাদের সংগঠনে ব্যুরোক্রাসি থাকবে না, শ্রমিকশ্রেণীর সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করবে, পার্টির আদেশ-শৃঙ্খল থেকে মুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করবে। পদে পদে কর্তৃপক্ষকে বাধা দিয়ে তাকে বাধ্য করাবে পুলিশ ডাকতে অথবা ক্লাস বন্ধ করে দিতে যাতে জনসাধারণের চোখে খুলে যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আসল চেহারাটা। আর সবসময় মনে রাখতে হবে ছাত্রসমাজের দায়িত্ব শ্রমিক-কৃষককে নেতৃত্ব দেওয়া নয়, তাদের সঙ্গে কাজ করা।

৭ম বর্ষ ১-৩ সংখ্যা

(বৈশাখ-আষাঢ় ১৩৭৬)

*Obsolete Communism The Left-Wing Alternative – Daniel Cohn-Bendit and Gabriel Cohn-Bendit Tr. Arnold

Pomerans. Pp 256 ; Andre Deutsch ; 25 sh.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *