ঐতিহ্য ও অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর – সত্যজিৎ চৌধুরী
Tradition is a matter of much wider significance. It cannat be inherited, and if you want it you must obtain it by great labour. It involves, in the first place, the historical sense; …This historical sense, which is a sense of the timeless as well as of the temporal and the timeless and of the temporal together, is what makes a writer traditional. And it is at the same time what makes a writer most acutely conscious of his place in time, of his own contemporaneity…I mean this as a principle of aesthetic, not merely historical, criticism.
T. S. Eliot
‘ক্ষীরের পুতুল’ বা ‘শাজাহানের মৃত্যু’ কিংবা শেষ জীবনের তৈরি খেলনা কাটুম-কাটম—এক অর্থে সবই রূপ রচনা, রূপসৃষ্টির নিহিত প্রেরণার নানামুখী প্রকাশ। কখনও সংচিত্রিত ভাষায়, কখনও সপ্রাণিত রেখায় ও বর্ণে, কখনও-বা শুধুই প্রাকৃত বস্তু রূপান্তরের দক্ষতায়। তাঁর রূপসৃষ্টিতে যে-সিদ্ধির পরিচয় ধরা আছে তাকে মনে হতেও পারে অনায়াসলব্ধ, স্বভাবগত দক্ষতায় রচিত। কিন্তু জীবনব্যাপী নিজেকে নিয়ে ভাঙাগড়ার অন্তহীন পরীক্ষা বিষয়ে অবহিত থাকলে কোনও রচনাকেই অনায়াস সিদ্ধির দৃষ্টান্ত মনে করা চলে না আর। ‘বিফলতার পর বিফলতা। …শেখা, ও কি সহজ জিনিস? কী কষ্ট করে যে আমি ছবি আঁকা শিখেছি১।’ কিছুই সহজে আসেনি, না মাতৃভাষার প্রাণময় ছন্দে অনায়াস অধিকার, না রেখা ও রঙের রহস্যভেদে দক্ষতা। তাঁর শিল্পীজীবনের পরতে-পরতে প্রচ্ছন্ন আছে সৃষ্টিময় শিল্পচৈতন্যের স্বাভাবিক দায়ে নিজেকেই জানার ক্লান্তিহীন প্রয়াস। সেই পুরুষার্থের, যুযুধান মনোবৃত্তির, আর-এক পরিচয় ফুটেছে কান্তিবিদ্যা বিষয়ে লেখা তাঁর প্রবন্ধাবলিতে। নিছক তত্ব গড়ার শৌখিনতা বা পাণ্ডিত্যাভিমান নয়, এসব রচনার মূলে আছে আপন শিল্পীস্বভাবে নিহিত প্রখর আত্মান্বেষণ এবং সেই সূত্রেই দেশের আবহমান শিল্প-ঐতিহ্যকে আধুনিকতার দিকে বাঁক ফেরানোর দায়িত্ববোধ। শিল্পক্রিয়ার কর্মিষ্ঠ আবেগই সংক্রামিত হয় তত্বভাবনার স্তরে। তাই ঐতিহ্যস্মৃতির মর্ম, বর্তমানের সত্তাধর্ম ও ভবিষ্যৎ উত্তরণের পথ বিষয়ে জিজ্ঞাসা জাগে। তাই অবনীন্দ্রনাথের ভাবনা শিকড় ছড়ায় দেশের আস্তীর্ণ ঐতিহ্যের মর্মের দিকে। নিজেকে জানার গরজেই শিল্পশাস্ত্র বা সৃজিত মহিমান্বিত শিল্প-কীর্তিগুলির মূল্যায়নে তাঁকে নিয়োজিত দেখি, দেখি ব্রাত্যবাঙলার মর্মসন্ধানে নিবিষ্ট হতে। শুধু প্রাচীনকে পাঠ করা নয়, বর্তমানের দায়ে অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতে মিলে অখণ্ড শিল্পপ্রবাহের বোধ ধারণায় আনবার পদ্ধতি বিষয়েও ভাবনা আসে। স্ব-দেশ বা স্ব-কালের দায় এড়িয়ে শিল্পী কখনও উল্লম্ভনবত্তায় মহাকালের আশ্রয়ে পৌঁছাবেন—এমন বিশ্বাস তাঁর ছিল না।
‘পৃথিবীর সেকালের ভিত্তির উপরে একালের প্রতিষ্ঠা হল স্বাভাবিক প্রতিষ্ঠা’২,
‘সেকাল ছেড়ে কোনো শিল্প নেই এটা ঠিক, কিন্তু একাল ছেড়েও কোনো শিল্প থাকতে পারে না বেঁচে এটা একেবারেই ঠিক৩।’
‘শিল্প… সেকাল, একাল ও ভবিষ্যকালের যোগাযোগে বর্ধিত হয়ে চলল, কোনও এককালের ক্রিয়াকলাপের মধ্যে তাকে ধরে রাখবার উপায় রইল না৪।’
প্রত্যেক শিল্পীর কাছে তাঁর বর্তমানই তরঙ্গচূড়া, —ঢেউ ওঠা-পড়ার, অতীত-ভবিষ্যতের সংঘাত এই বর্তমানকেই দিচ্ছে উত্তত মহিমা। বর্তমানেই তিনি সংবদ্ধ, কিন্তু বর্তমানের দায়েই অতীত-ভবিষ্যতের চেতনা তাঁর শিল্পীমানসের জলবায়ুতে মেশে রাসায়নিক মিশ্রণে। বর্তমানের বোধ তাৎপর্য পায় অতীত-ভবিষ্যতের আতত পটে। বা অতীত ভবিষ্যৎই তাৎপর্যে মণ্ডিত হয় বর্তমানের আলোকে। শিল্পক্রিয়াতে যেমন মুখ্য হয়ে ওঠে প্রকরণের প্রশ্ন, টেকনিকেরই সাধনা শিল্পমুক্তির জন্য; স্বাবলম্বী কোনও তত্বভাবনাতেও তেমনই পদ্ধতির প্রশ্নটি মুখ্য। পদ্ধতির অভ্রান্তিতেই ভাবনা কেলাসিত হয়, সংহতি আসে, গড়ে ওঠে সমর্থ কোনও প্রস্থান। বলার কথা অবনীন্দ্রনাথ মজলিশি চালেই বলতে অভ্যস্ত ছিলেন। বলার ঢং তাই কথকতার আমেজে রম্য, তবুও ভাবনাক্রম শিথিলিত নয়। নয় যে, তার কারণ তাঁর চিন্তাপদ্ধতির বিজ্ঞাননিষ্ঠ চারিত্র, অনাবিল বুদ্ধির সক্ষম ব্যবহার।
অবনীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যভাবনার মূলে ছিল শিল্পীধর্মের অপরিহার্য আত্মোপলব্ধির গরজ। কিন্তু ব্যাপারটা কোনও অর্থেই বিচ্ছিন্ন একক প্রয়াস নয়। শিল্পকর্মে অবনীন্দ্রনাথের সাবালকত্ব বঙ্গভঙ্গ নিরোধ আন্দোলনের সমসাময়িক। সাহিত্যে অন্তত ততদিনে আমাদের আত্মানুসন্ধানী রেনেসাঁস-এর সংকট ও শক্তি নানা কীর্তিতে প্রাঞ্জলভাবে মূর্ত। মাইকেলের প্রাথমিক বিভ্রান্তি ও শিল্পসিদ্ধির বৃত্তান্ত ততদিনে বিদিত, ইয়োরোপের প্রবল আকর্ষণে কেন্দ্রাতিগ বাবুসমাজের বিকার বিকৃতির মধ্যেও অনাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে পাশ্চাত্যের মূল্যায়নের স্বকীয়তায় বিদ্যাসাগর চরিত্র ধ্রুবতারার মর্যাদায় ভূষিত, বঙ্গদর্শনের বঙ্কিমচন্দ্র ততদিনে আত্মসামর্থ্যের দৃঢ়বনিয়াদ রচনা করেছেন মাতৃভাষায়। আর স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ পতিসর-শিলাইদহর অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ শিল্পীমানসের একাগ্র অভ্রান্ত সাধনার ঔপনিবেশিক শাসন-জনিত সংকটের মধ্যেও সাহিত্যসংস্কৃতির নব্যস্তরটিকে অগ্রসর করে নিচ্ছেন পূর্ণতার অভিমুখে। সাহিত্যে অন্তত বিভ্রান্তির যুগ অনেক আগেই অতিক্রান্ত হয়েছে, জাতীয় মানস ইংরেজির সমান্তরালে অনুলিপি রচনার মারাত্মক ভ্রান্তি বিষয়ে প্রখরভাবে সচেতন। চাকুরিজীবী মধ্যবিত্তের অগ্রসর মানস খাতে প্রবাহিত সংস্কৃতির এই নব্যধারা আপন তটসীমার বাইরের বৃহৎ জনচিত্তভূমির সঙ্গে সংযোগরচনায় ব্যাকুল হয়নি এমনও নয়। স্মরণীয় সাহিত্যকীর্তি স্থাপিত হয়েছে বৈশ্যরাজতন্ত্রে ঔপনিবেশিক কৃষিব্যবস্থার অর্থনৈতিক সংকটে বিদ্ধ মানুষের পরাক্রান্ত সংগ্রামের ও বেদনার আলেখ্য-নীলদর্পণে। সেই আকাঙ্ক্ষাতেই রবীন্দ্রনাথ লালন ফকিরের বন্ধুতার সূত্রে ব্রাত্য বাঙলার শুদ্ধ বিবেক অঙ্গীকারে উৎসুক। অবনীন্দ্রনাথের জন্ম ১৮৭১ খ্রিস্টাব্দে, বঙ্গদর্শন প্রকাশ ও ন্যাশানাল থিয়েটার প্রতিষ্ঠার আগের বছরে। বাল্য-কৈশোরের শিক্ষাদীক্ষা দ্বারকানাথ ঠাকুরের গলির পাঁচ আর ছয় নম্বর আবহে, যেখানে ততদিনে নব্য বাঙলার মানস কুসুমগুলি প্রস্ফুট, তাঁর আত্মীয়-পরিজনদের প্রতিভায়। স্বাদেশিকতার বাণী ঠাকুরপরিবারের প্রযত্নে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে সেই কালে। এমন পরিবেশের প্রভাবে স্বতঃই অবনীন্দ্রনাথের দৃষ্টি খুলেছিল স্বদেশের পট ও ব্যক্তি-প্রতিভার সম্পর্ক সন্নিপাত বিষয়ে। তাঁর সম্পর্কে অন্তত দৃষ্টিবিভ্রমে আর-এক রবিবর্মা হবার চোরাবালিতে পদপাতের আশঙ্কা ছিল না। শিক্ষানবিশির যুগ শেষ না হতেই শিল্পমুক্তির পৃচ্ছনা জাগে তাঁর মনে, ধাপে ধাপে নানা পরীক্ষায় আয়ত্তে আনেন স্বয়ম্ভর টেকনিক, নিজের কাজে সম্ভব করেন চিত্রকলায় রেনেসাঁস। শিল্পচৈতন্যের অনাচ্ছন্ন আলোকে বর্তমানের শিল্পভাষার প্রকৃত স্বরূপ ধরা দিয়েছে অবনীন্দ্রনাথের তুলিকায়, সেই অভিজ্ঞতারই তাত্বিক বিবৃতি মেলে কান্তিবিদ্যা-বিষয়ক রচনাবলির নানা প্রবন্ধে। সেই বিক্ষিপ্ত বক্তব্যগুলি গেঁথে তুলে ঐতিহ্য ও বর্তমান বিষয়ে তাঁ ভাবনার স্বরূপটি তুলে ধরতে ইচ্ছা করি।
অবনীন্দ্রনাথের শিল্পভাবনার মূলে আছে শিল্পীর স্বাধীনতা বিষয়ে নানামুখী জিজ্ঞাসা। এই জিজ্ঞাসার সূত্রেই ঐতিহ্য অনুসৃতি বা প্রত্যাখ্যানের প্রশ্ন ওঠে। দুটি বাঁধা পথ নবীন ভারতের শিল্পীসমাজের সামনে। এক শাস্ত্রবিহিত প্রাচীন ঐতিহ্যের পথ, অপরটি পাশ্চাত্য রীতির আনুগত্য। কিন্তু শিল্পীচৈতন্যের যে আত্মনির্ভরতা তাঁর অণ্বিষ্ট, প্রস্তুত এই সমাধান দুটি সেই সিদ্ধির পক্ষে সহায় নয়, প্রবল বাধা। পথই নয়; বিপথ, কুহক মাত্র। তিনি বুঝেছিলেন, ওই বাঁধা পথ শিল্প-মুক্তির পূর্ণিমায় উপনীত করে না, নিয়ে যায় ঘোর বিভ্রান্তির অমাবস্যায়। ঐতিহ্য অনুসৃতি বলতে তিনি স্বদেশীয় নির্বিচার পরিগ্রহ বোঝেননি কখনও। ইংরেজিয়ানার বাঁধা সড়কের প্রগতি যেমন বর্জন করেছেন তেমনি প্রাচীনের নির্বিচার আনুগত্যও প্রকারান্তরে যে কুহকী মায়া—অবনীন্দ্রনাথে এ-জ্ঞান অনাচ্ছন্ন প্রথমাবধি। ঐতিহ্য ও দেশকালের দায় বিষয়ে এ-প্রমিতি সম্ভবত তাঁর শিল্পপ্রতিভারই আর এক লক্ষণ। ১৩২২ সালে এক প্রবন্ধে লেখেন
আমরা যখন চলতে চাচ্ছি, পথ চাচ্ছি, তখন গোড়াতেই প্রাচীনের এই ভয়ংকর বোঝাটাকে আমাদের কাঁধ থেকে নামাতে হবেই, গণ্ডুষের কুক্ষি ভেদ ক’রে আমাদের আর একবার সেইখানে বেরিয়ে দাঁড়াতে হবে যেখানে আমরা শিল্পী সম্পূর্ণ স্বাধীন, যেখানে আমাদের পুরাতনটা আমাদের বাধা দেবে না, অন্যের নতুনটাও আমাদের ভুলিয়ে রাখতে পারবে না; এক কথায় প্রাচ্য প্রবীণতার তৈলকটাহ এবং পাশ্চাত্য নূতনতার অগ্নিকুণ্ড এ দুই থেকেই দূরে এমন একমুখে আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে, যে মুখে আমাদের চোখের দৃষ্টি মনের প্রসার আনন্দের প্রবাহ অপ্রতিহত৫।
চোখের দৃষ্টি মনের প্রসার আনন্দের প্রবাহ অপ্রতিহত রাখা চাই—শিল্পক্রিয়ায় এ প্রাথমিক শর্ত। এ-জন্য ঘুরে দাঁড়াতে হবে প্রাচীন প্রাচ্য আর সদ্যজ্ঞাত পাশ্চাত্যের দিক থেকে। কোন দিকে ঘুরে দাঁড়াতে হবে তার? প্রবীণের শাসন শুধুই তৈলকটাহ? পাশ্চাত্য নতুনতা কেবলই অগ্নিকুণ্ড? আমরা জানি প্রাচীন শিল্পশাস্ত্রপাঠ এবং তার মর্মোদ্ধারে তিনি ছিলেন ক্লান্তিহীন। আর ইয়োরোপীয় শিল্পপদ্ধতির শিক্ষা তাঁর কোনওই কাজে আসেনি এ-কথাও সত্য নয়। কোন বিচারে তবে এমন সিদ্ধান্তে আসেন খুঁটিয়ে দেখা কর্তব্য আমাদের। ঘুরে দাঁড়াবার কথা ওঠে, কারণ
শিল্পের অধিকার নিজেকে অর্জন করতে হয়। পুরুষানুক্রমে সঞ্চিতধন যে আইনে আমাদের হয় তেমন ক’রে শিল্প আমাদের হয় না। … বিধাতার নিয়মের মধ্যেও ধরা দিতে চায় না সে। নিজের নিয়মে সে নিজে চলে, শিল্পীকেও চালায়, দায়ভাগের দোহাই তো তার কাছে খাটবে না৬।
শিল্পীর উত্তরাধিকার নিজেরই সামর্থ্যে অর্জনীয়, এই অর্জনে আত্মজ্ঞান তার একমাত্র সহায়। বর্তমানের পটে নিজের ক্রিয়াকর্মের দায়িত্ববোধ থেকেই আসে এই আত্মজ্ঞান এবং এই আত্মোপলব্ধির দিক থেকে প্রবেশ করতে হয় ঐতিহ্যের মর্মে। ঐতিহ্যের ধারা অতীত থেকে বর্তমানের বুকের উপর দিয়ে ভবিষ্যতের দিকে স্বচ্ছন্দে বয়ে যায় না। এমন অনায়াস স্বচ্ছন্দ প্রবাহ শিল্প জগতের সত্য নয়। শিল্পসংস্কৃতির বিশিষ্ট কাঠামোর ভিত অতীতের গর্ভেই প্রোথিত। তারই উপরে যুগে যুগে রচিত হয়েছে এক-একটা নতুন মহল। ছকটা সম্পূর্ণ গড়নে রূপ পেয়ে সুসম্পূর্ণ হয়ে উঠছে কালে কালে। ভিত গড়া হয়েছে যে-আদর্শে তার রূপকল্প নতুন যোজনাগুলিকে নিয়ন্ত্রিত করেই। আবার যা সংযোজিত হচ্ছে তার স্বকীয়তায় সেই মূল আদর্শটাকেই কালে কালে শিল্পীরা অন্তঃসংগতি রেখেও নবনবায়মান করে তোলেন। ঐতিহ্যে-বর্তমানে এ যোগ যান্ত্রিক নয়, জলধারার আদ্যন্ত প্রবাহের মতোও নয়। প্রত্যেক যুগে শিল্পীকে নিজের দিক থেকে অতীতের সঙ্গে সংযোগের সূত্রটি উদ্ভাবন করতে হয় নতুন করে। শিল্পক্রিয়ায় শিল্পীকে তাই প্রথমেই ঘুরে দাঁড়াতে হয় নিজের দিকে। নির্মোহ হতে হয়। পূর্বপুরুষের বাঁধা পথে সিদ্ধিতে পৌঁছে যাবার যে মোহ টানে, তার প্রভাবসীমার বাইরে আসতে হয়। এই মোহ শিল্পীর পক্ষে মারাত্মক, নব্য ভারতীয় শিল্পী-সমাজের উদ্দেশ্যে তাই অবনীন্দ্রনাথ সাবধানতার কথা তোলেন
সপ্তম সর্গ, অষ্টম সর্গ, সাতকাণ্ড, অষ্টাদশ পর্বগুলোর ছাঁচের মধ্যে নিজের লেখাকে ঢেলে ফেলতে পারলেই কিংবা নিজের কারিগরি কি কারদানিটাকে হিন্দু বা মোগল অথবা ইউরোপীয় এমনি কোনো একটা যুগের ও জাতির ছাঁচের মধ্যে ধরে ফেলতে পারলেই আমাদের ঘরে শিল্প পুনর্জীবন লাভ ক’রে কলাবৌটি সেজে ঘুর ঘুর করে ঘুরে বেড়াবে, এই যে ধারণা এইটেই হচ্চে সব শিল্পীর যাত্রাপথের আরম্ভে একটুখানি অথচ অতি ভয়ানক, অতি পুরাতন চোরাবালি। এর মধ্যে একটা চমৎকার চকচকে সাধুভাষায় যাকে বলে, লোষ্ট্র পড়ে আছে, যার নাম Tradition বা প্রথা। অনন্তকালের সঞ্চিত ধনের মতো এর মোহ, একে অতিক্রম ক’রে যাবার কৌশল জানা হলে তবে শিল্পলোকের হাওয়া এসে মনের পাল ভরে তোলে, ডোববার আর ভয় থাকে না৭।
এ মোহ অতিক্রম করতে হয় অনন্যপরতন্ত্র শিল্পীধর্মের স্বয়ম্ভরতায়। ভারত-শিল্পে রেনেসাঁস ঘটানোর দায়িত্বে স্বেচ্ছাকৃত অবনীন্দ্রনাথ বর্তমানের দায়েই ইতিহাস বিষয়ে অনুসন্ধিৎসু। অতীত যে-মূর্তি ধরে আছে তাকে একদিক থেকে বলা যায় অপরিবর্তনীয়, সুচিরপ্রতিষ্ঠিত। কিন্তু বর্তমানের দিক থেকে সেই অতীতের সম্মুখীন যখন হন কোনও শিল্পী—তিনি নিজের সাময়িকতার সমস্যার সূত্রে অতীতের চেহারাটাকেও আপন বোধের ভেতরে ভাঙেন গড়েন নানা প্রকারে। অতীতের স্থাণুতা ঘুচে যায় ক্রিয়াবান শিল্পীর সজীব শিল্পীমানসের জগতে। অনেক গৌণ জিনিস মূখ্য হয়ে ওঠে, প্রখ্যাত কোনও শিল্পকীর্তি তার প্রথিত মহিমা সত্বেও মনে হয় অবান্তর। দৃষ্টি পড়ে আনাচে-কানাচে, একদা উপেক্ষিত পুনরাবিষ্কৃত হয় নতুন তাৎপর্যে। এই তো শিল্পীর ইতিহাসচেতনার বৈশিষ্ট্য। এই শিল্পচেতনাপ্রবুদ্ধ ইতিহাসবোধ নিয়েই অবনীন্দ্রনাথ ঐতিহ্যের বিচার করেন। একাল-সেকালে সেতুবন্ধ রচনা শুদ্ধ শিল্পচৈতন্যেই সম্ভব, শিল্পীর প্রাতিভজ্ঞানের দ্বারা। ইতিহাস আলোচনায় এইটিই অবনীন্দ্রনাথের নিজস্ব পদ্ধতি। এ পদ্ধতি ঐতিহাসিকের নয়, অতীত-বর্তমানের দুই কোটি জ্যাবদ্ধ করে শিল্পে তাৎক্ষণিক সমস্যার রহস্যভেদ যাঁর লক্ষ্য, সেই শিল্পীর।
এবার দেখা যেতে পারে প্রাচ্য শিল্পের ঐতিহ্যবিচারে তিনি কীভাবে এই তত্ব প্রয়োগ করেন।
‘প্রাচ্য প্রবীণতার তৈল কটাহ’ কথাটা একটা তীব্র আঘাতের মতো বাজে। ভারত শিল্পের নবজন্ম যাঁর হাতে তাঁরই লেখনী থেকে নিঃসৃত এমন উক্তি! ভারতের প্রাচীন শিল্পকীর্তি সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথের গর্ববোধ ও মমত্ব সর্বজনবিদিত। পুরীতীর্থে জগন্নাথের মাসি বাড়ি (গুণ্ডিচা) সংস্কারের ভয়ানক আয়োজন প্রসঙ্গে তাঁর যন্ত্রণার বিবরণে সেই দরদ ব্যক্তিগত ক্ষতির বোধে মিশে প্রকাশ পায়। ইংরেজি শিক্ষাজনিত বিকারে আমাদের দৃষ্টিবিভ্রম বিষয়ে কঠিন সমালোচনা করেন ‘স্পষ্টকথা’ (ভারতী, ফাল্গুন ১৩১৫), ‘ভাবসাধন’ (ভারতী, অগ্রহায়ণ ১৩১৭) প্রভৃতি প্রবন্ধে। দেশের ঐতিহ্যের প্রতি মমত্বের আকর্ষণ জাগানোর আবেগ এসব রচনার ছত্রে-ছত্রে। ‘ভারতশিল্প’ হবে পাশ্চাত্য প্রভাবের ছায়ায়—এ মোহের প্রতি ধিক্কার এমন স্পষ্ট ভাষায় অবনীন্দ্রনাথই প্রথম উচ্চারণ করেছেন বাঙলায়, হ্যাভেলের উপদেশ অনুসরণ করেই অবশ্য।’পশ্চিমমুখে দাঁড়াইয়া সূর্যোদয় দেখিবার প্রত্যাশা’ তিনি করেননি কখনও। কিন্তু এ দরদ মোহ নয়, বরং প্রকৃত মমত্বের বলেই তিনি মোহ অতিক্রম করে দৃষ্টির শুদ্ধতা অর্জন করেন। লক্ষ করতে হবে, ভারত শিল্পে রেনেসাঁসের জনক অবনীন্দ্রনাথ—প্রাচ্য শিল্প বলতে শুধু ভারতীয় শিল্প বোঝেননি, চিন-জাপানসহ প্রায় গোটা এশিয়ার শিল্পধারার তাৎপর্য বুঝতে চেয়েছেন। আর দেশের ঐতিহ্য বিচার করেছেন শাস্ত্রীয় শিল্প ও লোকশিল্প—এই দুই স্তরে। প্রথমেই অবশ্য শাস্ত্রীয় শিল্পধারার শক্তি ও দুর্বলতার কথা ওঠে।
প্রাচীন ভারতে দক্ষ শিল্পী বা সমজদারের অভাব ছিল না, কিন্তু সব আয়োজন সত্বেও শিল্পের বিকাশ স্বতঃস্ফুর্ত হতে পারেনি সম্পূর্ণ বাইরের থেকে আরোপিত চাপের ফলে। সেই বাইরের শক্তি, শাস্ত্রবিহিত প্রথার শাসন। ভারতে শাস্ত্রবিৎ কুলপুত্রেরা ‘দুষ্কুল থেকে আনা স্ত্রীরত্নের মতো’ কলালক্ষ্মীকে জাতে না তুললে শুধুই নিজের রূপগুণে তার মর্যাদা পাবার উপায় ছিল না। ভারতশিল্পের সীমাবদ্ধতার কথা ঘুরে ঘুরে এসেছে তাঁর অনেক লেখায়। এই বিশ্লেষণে তিনি ধরতে চেয়েছেন, ভারতে শিল্পশাস্ত্রের শাসনে শিল্পীর স্বাধীন ক্রিয়াকর্মের পঙ্গুত্ব ও খর্বতার দিক।–
পণ্ডিতেরা লিখেছেন দেবতার ধ্যান, আর পণ্ডিতদের চেয়ে জাত্যংশে খাটো শিল্পীগুলো সেই ধ্যানমূর্তিসকল ফুটিয়ে তুলছে পাষাণের অক্ষরে–এমনকি, লেখার ছাঁদটুকুর সম্বন্ধেও শিল্পীর স্বাধীনতা নেই, পণ্ডিতের দেওয়া মান-পরিমাণের নাগপাশে শিল্পীর সমস্ত শক্তি এবং স্ফুর্তি মূর্ছাহত। প্রাচীন ভারতের লক্ষ কোটি শিল্পী, যাদের প্রাণের অভাব ছিল না, পণ্ডিতের অপেক্ষা সুকুমার মনোবৃত্তি সকলেরও অভাব ছিল না, তারা একাসনে একমনে বসে শুক্রনীতি ও মানসারের পুথির রেখাগণিত ও অগণিত সম্পাদ্য প্রতিজ্ঞাসকল পূর্ণ করেছে এবং তারি ফলগুলি স্তূপাকার ক’রে সাজিয়ে যাচ্ছে-কখনো রাজমন্দিরে মতো, কখনো বা তেত্রিশ কোটি মূর্তির বত্রিশ সিংহাসনের মতো। এই মন্দিরে এই সিংহাসনে ভারতশিল্পরা তাদের প্রতিভাকে প্রতিষ্ঠিত ক’রে গেছে বললে ভুল হয়, কেননা, সিংহাসন কি মন্দির, যা কিছু তারা গড়েছে, সে তাদের হৃদয়দেবতার জন্যে নিজের মনোমত ক’রে গড়তে তাদের অনুমতি ছিল না। গড়েছে তারা অনুশাসন এবং হুকুমের চাকর, দেশের বিক্রমাদিত্য সকলের জন্যে যারা প্রাচীনের ছদ্মবেশে আজও সমান বিক্রমে রাজত্ব করছে-আমাদের ধর্মে কর্মে শিক্ষা দীক্ষায়৮।
ফলে শিল্পের বিকাশ হয়েছে খর্বিত। ‘যথাসুখে নিজের বাঞ্ছিত পথে চলার অধিকারে বঞ্চিত শিল্পীকুল যা গড়েছেন, অবনীন্দ্রনাথের উপমায়, তা মঞ্চে বাঁধা পঞ্চবটীর মতো। তার থেকে অনেকখানি ছায়া পাবার আশা নেই, দেশের অন্তরেও সে শিকড় মেলতে পারেনি। এ শিল্প থেকে আচার্যদের বিদ্যাবত্তার পরিচয় মেলে, আর মেলে ‘শিল্পীর স্বাধীনতার উপরে শিল্পাচার্যগণের হস্তক্ষেপ করার আদ্যন্ত একটি সুস্পষ্ট ইতিহাস।’ পণ্ডিতের মত ধরে, আচার্যের পরিচালন-দক্ষতায় এই যা সৃষ্টি হয়ে উঠেছে, শিল্পীদের পক্ষ থেকে অবনীন্দ্রনাথ তার সবটুকু নিজস্ব বলে মানতে পারেন নি। শাস্ত্র-অনুমোদিত বলেই যার গুরুত্ব, সেই শিল্পীর গর্বে জাত্যভিমানী স্ফীত হয়ে উঠতে পারেন। কিন্তু স্বাধীনতাহীনতায় ব্যথিত সেই প্রাচীন শিল্পীকুলের বেদনাই ভাষা পায় অবনীন্দ্রনাথের উক্তিতে
পণ্ডিতেরা খুব উচ্চজাতি হতে পারেন এবং তাঁদের অভিমত শিল্পটাও খুব বড়ো দরেরও হতে পারে কিন্তু সে বা সে জাতির শিল্প এত বড়ো নয় যে আমাদের বলে, শিল্পীর নিজস্ব বলে পরিচয় দেওয়া চলে। প্রাচীন ভারতে পণ্ডিতেরা আচার্যেরা ছিলেন সর্বেসর্বা এবং তাঁদের বচনই ছিল সব। শিল্পটাও তাঁদেরই বচনগুলির তেত্রিশ কোটি পাষাণমূর্তি-দুই পায়ে শিল্পীর হৃদপদ্ম দলিত ক’রে বরাভয়ের অভিনয় করছে। প্রাচীন ভারতশিল্পে এই করুণ রসটুকুই সত্যকার, কেননা এই টুকুর সঙ্গেই শিল্পীর প্রাণের যোগ ছিল; আর যে রসগুলো পাষাণের ভানে ধরা যাচ্ছে সেগুলোর সঙ্গে শাস্ত্রবচনের যোগ, শাস্ত্রীগণের যোগ; যথার্থ রসের উৎপত্তির যোগাযোগ সেখানে নাই৯।
এ বিচারে স্পষ্টতই অবনীন্দ্রনাথ একটা ভেদরেখা টানছেন। শাস্ত্রবিহিত শুদ্ধ শিল্পপ্রথা সে-রেখার একদিকে; অপর দিকে শাসনের চাপে দলিত-হৃদয় শিল্পীদের, যে শিল্পী হৃদয়ের একূল-ওকূল দুকূল জুড়ে অনুর্বরতার অভিশাপ পুঞ্জিত। দেখা যাচ্ছে, ঐতিহ্যের আনুগত্যে অবনীন্দ্রনাথ নির্বিচারে প্রাচীন মাত্রেরই সালোক্য বোঝেন নি। শিল্প-ইতিহাসের তথ্যস্তপের প্রতি তার কোনও আকর্ষণ নেই। তিনি ধারণায় আনতে চাইছেন ভারতশিল্পের মর্মগত ধারাটির স্বরূপ-যা বয়ে এসেছে শিল্পীর স্বকীয় ক্রিয়াকর্মের স্বাধীনতাকে ধরে। তাঁর উদ্দেশ্য সেকালের শিল্পীর হৃদয়ের সঙ্গে, তাঁদের কল্পনাবৈশিষ্ট্যের সঙ্গে যোগসাধন, ভাবসাধন। প্রথার প্রচণ্ড চাপ সত্বেও, রাজদ্বারে বা দেবতার দ্বারে মুজরা খাটতে গিয়েও আত্মনিষ্ঠ শিল্পীদের প্রকাশবেদনা কোথায় কতটুকু রূপ পেয়েছে তাই তাঁর অন্বিষ্ট। প্রাচীন শিল্পক্রিয়ায় শিল্পীর শুদ্ধ শিল্পচৈতন্য যেখানে অনাচ্ছন্ন-তারই অঙ্গীকারে একালের প্রয়োজনের দিক থেকে সেকালের শিল্পভাবনার সঙ্গে সেতুবন্ধ রচনায় তাঁর আগ্রহ। একেই তিনি নিজের পরিভাষায় বলেন ‘ভাবসাধন১০।’ পূর্বপুরুষের ভাব সঞ্জীবিত, শিল্পের সঙ্গে একালের শিল্পের সজীব যোগসম্ভব আত্মসচেতন শিল্পীমানসের নির্মোহ অনুসন্ধিৎসায়। ঐতিহ্যের সেই নিহিত মর্ম-যা যুগে যুগে নানা সংঘাতের মধ্যেও ‘ভৃগুপদচিহ্নের মতো’ চিরদিন ভারতের বুকে শোভা পাবে-তাকে একালের সঙ্গে মিলিয়ে জানা নব্য ভারতের শিল্পীর প্রাথমিক দায়িত্ব। এই বসন্তে যে মুকুল আসছে, সম্ভাবনার দিক থেকে তার একটা যোগ অতীতের বীজটির সঙ্গে। একালের শিল্পীকে সেই যোগাযোগের রহস্য ধরতে হয় অতীতের সঙ্গে ভাবসাধনে, কারণ শিল্পে যা ফুটে ওঠে সে তো শিল্পীরই মানসকুসুম। তার মনই শিল্পের আশ্রয় এবং আধার। শাস্ত্রীয় শাসনের চাপ সত্বেও প্রাচীন শিল্পমুক্তির দৃষ্টান্ত অবিরল। শিল্পে দেবলোকের আদর্শ ফলিয়ে তোলা শাস্ত্রীয় বিধি, মর্তের দিকে দৃষ্টি যদি দেন শিল্পী, তবে তিনি মহাপাতকী হবেন। অন্ধত্ব, বংশলোপ প্রভৃতি ভয় দেখিয়ে এমন অনাচাররোধের আয়োজন করা হল শিল্পশাস্ত্রে। তবুও ভারতশিল্প থেকে ইহলোক মুছে যায়নি। শিল্পীর শিল্পবৃত্তি বার বার তাকে নিয়ে গেছে শাস্ত্রনির্দিষ্ট মান-পরিমাণ-লক্ষণাদির বাঁধা নিয়মের বাইরে। প্রাচীন প্রতিমাশিল্প পূজার উদ্দেশ্যে শাস্ত্রের নিয়ম ধরে গড়া হলেও-তার গড়নে এবং সাজসজ্জায় নিয়মের ব্যতিক্রম রোধ করা সম্ভব হয়নি। এই ব্যতিক্রম ধরেই প্রকাশ পেয়েছে শিল্পীর স্বাধীন রুচি। অবনীন্দ্রনাথের দৃষ্টি পড়ে এই সব ব্যতিক্রমের দৃষ্টান্তে, এখানেই তিনি বন্ধনমুক্ত শিল্পীর শুদ্ধ আত্মপ্রকাশ দেখেন। পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণে প্রাচীন শিল্পক্রিয়ায় বন্ধনমুক্তির ক্ষেত্রগুলি নজরে আসে তাঁর-
ছবি modelling, plaster cast এমনি অনেক জিনিস এবং স্ফটিক ও নানা রত্নভূষা এবং ছোটখাটো শিল্পদ্রব্য সমস্তই বাঁধনের বাইরে পড়ল, কেবল পাষাণ ও ধাতুজ পূজার জন্য যে মূর্তি তাই রইলো শাস্ত্রের মধ্যে বাঁধা, কিন্তু এখানেও গোল বাধলো ঠিক-ঠিক শাস্ত্রমতো গড়ন কে জানে কেন শিল্পীর হাতে এলো না, এদিক-ওদিক হতেই থাকলো কিছু-কিছু দেশভেদে কালভেদে শিল্পীর কল্পনাভেদে পূজকের অন্তর্দৃষ্টিভেদে…।১১
শাস্ত্রের বাঁধন দৃঢ় হতে পারেনি, পঙ্গু করে দেয়নি শিল্পীদের। এ স্বাধীনতার মূলে আছে শিল্পীর স্বাভাবিক অনন্যপরতন্ত্র শিল্পজ্ঞান। প্রতিভার আদিম প্রেরণা। শাস্ত্রীয় সংস্কার যে এই ভারতীয় শিল্পীদের মনে দৃঢ়মূল হতে পারেনি-এর একটি বাস্তব কারণ তাদের নিরক্ষরতা। শাস্ত্রীয় প্রথার শাসন রয়ে গেছে বাইরে থেকে আরোপিত বিধিবিধান, ভাবনা-চিন্তার স্বাচ্ছন্দ্য আড়ষ্ট করে আনবার মতো সংস্কার রূপে মজ্জাগত হতে পারেনি। শিল্পশাস্ত্রের পুঁথিপত্র জমা হয়েছে রাজার বা মন্দিরের সংগ্রহশালায়, ক্রিয়াবান শিল্পীদের ঘরে যদি বা মেলে-সে-পুঁথির সঙ্গে তাদের প্রাত্যহিক শিল্পক্রিয়ার কোনও যোগ প্রমাণ করা যায় না। পুথি তাঁরা পুজো করেছেন সিদুঁর চন্দনে, চর্চা করবার উপায় ছিল না। পাঠের উপায় না জানায়।
শাস্ত্রে অপণ্ডিত কিন্তু শিল্পক্রিয়াতে সম্পূর্ণ পারগ শিল্পীদের পুথি ক্কচিৎ পাওয়া যাচ্ছে।…শাস্ত্রের চাপ ভয়ংকর হয়ে ওঠে নি, তা থেকে বেঁচে গেছে এদেশের শিল্পীরা কাজের দিক দিয়ে শুধু তারা নিরক্ষর ছিল বলে।১২
একালের অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন শিল্পীদের পক্ষে প্রাচীন শাস্ত্রচর্চার ফল অন্যভাবে ফলবে। শাস্ত্রচর্চায় পাকা হয়ে শিল্পক্রিয়ায় যাঁরা অগ্রসর হবেন-শাস্ত্রের বিধি-বিধান তাঁদের ক্রিয়াকর্মের স্বাধীনতায় একটা রাসের মতো কাজ করবে যদি নিজের আদর্শ স্থির করে নেবার সামর্থ্য তাঁর না থাকে। প্রাচীন মাত্রেরই প্রতি মোহ যেমন শিল্পীর পক্ষে বৈনাশিক, শাস্ত্রের বচনের প্রতি মোহও তেমনি। শাস্ত্রবচন ধরে ভারতশিল্পের পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা বার বার অবনীন্দ্রনাথের বিদ্রুপের লক্ষ্য হয়েছে। ভারতশিল্পে মূর্তি পুস্তিকার ভূমিকায় শাস্ত্রীয় বিধির মোহ বিষয়ে শিষ্য ও সতীর্থদের সতর্ক করেছেন। শিল্পচৈতন্যের আলোক শিখাটি যদি পূর্ণশক্তিতে জ্বলে ওঠে, নিজেকে যদি চেনেন দেশকালের নানামুখী দায়-দায়িত্বের টানাপোড়েনে জীবনেরই সঙ্গে সংলগ্ন সমর্থ ও ক্রিয়াবান শিল্পীরূপে, তবেই শাস্ত্রও হয়ে ওঠে তাঁর কাজের সহায়। সেকালের বিধিবিধানের সঙ্গে একালের স্বাভাবিক যোগ সম্ভব একালের জীবনরসে তাকে জারিত করে, একালের ‘শিল্পমতি’র দিক থেকে। কারণ-
সেকাল এগিয়ে চলবে একালের ক্রিয়ার ছন্দ ধরে ভবিষ্যৎ কালের সফলতার দিকে…। শিল্পের গতি কালে কালে নতুন-নতুন শিল্পীর মতি ধরে চলেছে, কোনো এক কালের বা এক শাস্ত্রের মত ধরে চলে নি, চলতে পারেও না।১৩
‘শিল্পীর intention বা ধ্যান, তারই অনুপাতে’ চলে শিল্পক্রিয়া কালে কালে। শিল্পবিধি জোর করে আরোপ করার অবশ্যম্ভাবী ফল শিল্পক্রিয়ার পঙ্গুত্ব। সেকালের শিল্পীকুল শাস্ত্রীয় শাসনের বাইরে আসবার সামর্থ্যেই সীমিতভাবেও শিল্পীর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন। এই দৃষ্টান্ত একালের শিল্পীদের পক্ষে শিক্ষাপ্রদ। ইংরেজিয়ানার প্রতিক্রিয়ায় শুদ্ধ হিন্দু আদর্শের পুনরাবৃত্তির প্রবণতা আমাদের চিন্তায় একটা বিপরীত সংকট সৃষ্টি করেছিল। রামমোহন থেকে রবীন্দ্রনাথ অবধি এই প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে জোরালো সংগ্রামের একটা পর্ব গেছে। শিল্পীচিন্তায় শুদ্ধতার নামে শাস্ত্রবিধির শেকল পরানোর বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হয়েছে অবনীন্দ্রনাথকে। সেকালের সঞ্চয়ের সীমা মেনে নিতে বলার অর্থ একালের শিল্পক্রিয়াকে ভবিষ্যৎ নয়, অতীতের দিকেই বইয়ে নিয়ে যাবার উদ্যোগ। ‘ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি’ যে একালের পক্ষে আত্মহননের নামান্তর-অবনীন্দ্রনাথ স্বাভাবিক শিল্পপ্রত্যয়ে এ সত্য বোঝেন। ‘বর্তমান ধরে তবে বর্তে থাকে শিল্পকলা, অতীতের সঙ্গে বিচ্ছিন্ন নয় কিন্তু অতীতমুখীও নয় শিল্প১৪।’ ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি নয়, ঐতিহ্যকে বাবহার বর্তমানের ধর্মের দিক থেকে-একালের শিল্পীর পক্ষে অবশ্যমান্য এ দায়। একালের সকল উদ্যোগ এই লক্ষ্যে নিবিষ্ট হয়েই তাৎপর্য পায়, না হলে সমূহ বিফলতা। অবনীন্দ্রনাথের ঐতিহ্য ভাবনা স্থিরনিবদ্ধ এই লক্ষ্যে
একটা জায়গায় এসে সমস্ত ব্যাপারটা ঠেকে-সেটি হচ্চে একাল। প্রাচীন জাতির কুলানুগত আচার ব্যবহার আজকের কালানুযায়ী হল কিনা সেইটেই দেখবার বিষয়।…কালসূত্রে ধরা রইলো কালকের সকালের সঙ্গে আজকের সকাল, কালকের জাতির সঙ্গে আজকের জাতি, কাব্যকলা সঙ্গীতকলা শিল্পকলা জ্ঞানবিজ্ঞান নিয়ে প্রাচীন ভারতবর্ষের জাতীয় জীবনটিও তেমনি কালসূত্রে গাঁথা রইলো-বেজোর মুক্তা। আমাদের জাতির উপরে সবচেয়ে যে বড় দায়িত্ব তা হচ্চে এই অতীতকালের মালায় যে বেজোর মুক্তা দুলছে তার সঙ্গী আর একটি কালসূত্রে গেঁথে যাওয়া।১৫
নিজেরই রচনা দিয়ে সেই জোড় মেলাতে হয়, পুরোনো সঞ্চয়ের পাশে একালের সৃষ্টিটিকে ধরে দিয়ে। জোড় মেলানোর প্রশ্ন আছে, একালের সৃষ্টির সঙ্গে ঐতিহ্যের সেই নিহিত সাদৃশ্য ফুটে উঠবে, ফুটিয়ে তুলতে হবে। একাল ত্রিশঙ্কু তো নয়, ঐতিহ্যের ভিতের উপরেই গড়ে-ওঠা একটা নতুন মহল। তবুও নতুন। আপনকালের মুদ্রাঙ্কনে তার নতুনত্ব। শাস্ত্রের সীমার বাইরে এসে যে শিল্পীকুল নিজেদের স্বাধীন রুচির পরিচয়চিহ্ন ধরে গেছেন ভারতীয় শিল্পধারায়, প্রত্যক্ষ জ্ঞানে সেই শিল্পের স্বরূপ জানা এবং আপনকালের দায় মেনে নতুন সৃষ্টিলোকে উত্তরণের পথনির্দেশ-অবনীন্দ্রনাথের এ আলোচনার উদ্দেশ্য।
ঐতিহ্যের কথায় তিনি ভারতীয় শিল্পবৃত্তের বাইরে-গোটা প্রাচ্যের শিল্পরুচির বিচারও আবশ্যক বিবেচনা করেন। প্রাসঙ্গিক তুলনা আসে চিন জাপানের সঙ্গে ভারতের, আসে ভারতের শিল্পকলা এশিয়ার বৃহত্তর পটে ছড়িয়ে যাবার কথা। ভারতের সীমার মধ্যে শাস্ত্রীয় শাসনের চাপে রুদ্ধশ্বাস শিল্পের খর্বতার পাশে-ভারতশিল্পেরই বহির্মুখী ধারা কেমন সজীব হয়ে বয়ে গেছে দেশের বাইরে, শিল্প মুক্তির দৃষ্টান্ত হিসেবে-তার উল্লেখ এবং এ সজীবতার হেতু নির্ণয় করেন। বৌদ্ধযুগে ধর্মের সঙ্গে ভারতীয় শিল্প গেছে বিদেশে। ভিক্ষু শিল্পীদের হাতে সেইসব উপনিবেশে ভারতশিল্প পুষ্ট হয়েছে স্থানীয় আবহাওয়ায়, স্থানীয় প্রবণতার মিশ্রণে।
অভারতীয় অন্তরের’ মধ্যে বয়ে গেছে ভারতশিল্পের নিহিত প্রাণ সম্পদ। বিদেশে ধর্ম প্রচারের সঙ্গে শিল্পপ্রচারের দায়িত্ব যাঁরা বহণ করেছেন তাঁরা ধর্মের অনুশাসন অন্যব্রতদের ওপরে খুব কঠিনভাবে প্রয়োগ করলেও শিল্পশাস্ত্রের নিয়মগুলো ঢিলে করে দিয়েছেন দেশে দেশে। শিল্পের দেশীয়তার সঙ্গে শাস্ত্রমতো বিশুদ্ধ শিল্পের মিশ্রণ ঘটিয়েছেন-কোনো বাধা দেন নি সে পথে।…কালে কালে দেশে দেশে একই শিল্পের পুনরাবৃত্তি যে একেবারেই দোষ, বিচিত্রতাই যে শিল্পের মূল কথা, সেটা তাঁরা ভালো করেই জানতেন।১৬
এ-দৃষ্টান্তে দৃঢ়তর হয় সেই যুক্তি, শিল্পে মুক্তি আসে প্রগতি সম্ভব হয় শিল্পক্রিয়ার স্বাধীনতার পথে। ‘শিল্পীর মতি’ বা তার অভিপ্রায়টিকে মেরে দিয়ে পথের বৈচিত্র্য রুদ্ধ করে দিয়ে শিল্পকে বাঁচানো যায় না। কোনও বিধিব্যবস্থা চাপিয়ে দিয়ে সৃষ্টি করা যায় না শুদ্ধ শিল্প। এই দৃষ্টি নিয়ে অবনীন্দ্রনাথ আবার অবেক্ষণ করেন ভারতীয় শিল্পধারায় নানা পদ্ধতি ও প্রকরণ মিশ্রণের তাৎপর্য। শিল্প-শাস্ত্রীকেও মানতে হয়েছে, শিল্পীর হাত সবসময়ে শুদ্ধ। সংকরত্বে সৃষ্টির জাত যায় না। শুদ্ধি আসে সমর্থ শিল্পীর ধ্যানের শুদ্ধতা থেকে-
পণ্ডিতের ব্যবস্থা মতো গোবর গঙ্গাজলে হাত ধুয়ে শাস্ত্রের মন্ত্র পড়ে ধ্যান করে গড়লেই বিশুদ্ধি আসে না, অন্তরের পূতধারা তারি স্রোত যখন শিল্পীর হাতের কাজ ধুয়ে দেয় তখনই সে হয় বিশুদ্ধ, ভারতশিল্প বা আর কোনো বিশুদ্ধ শিল্প। হিন্দুশাস্ত্রমতে গড়া হলেই ভারতশিল্প হবে একথা বলা চলতো যদি ভারতবর্ষ কেবল হিন্দুরই হত-গ্রীক মোগল চীন নেপাল, কত কি নিয়ে যে ভারতশিল্প হযেছে তা কে জানে। সুতরাং ভারতবর্ষে যেমন একটি মাত্র ধর্ম নেই তেমনি ভারতশিল্পে কৌলীন্য বলে পদার্থ একেবারেই নেই। কেননা ভারতবর্ষ যেমন প্রকাণ্ড বিস্তার নিয়েছে সেই রকম তার আর্টও বিস্তার পেয়েছে শাস্ত্রগত পদ্ধতি ছেড়েই।১৭
শিল্পসাক্ষ্যের বিচার-বিশ্লেষণের পথেই অবনীন্দ্রনাথের ভারতজিজ্ঞাসা অনার্য, হিন্দু বৌদ্ধ মুসলমান-ইত্যাকার গণ্ডিবদ্ধ ধারণার ভ্রান্তি এড়িয়ে যায়। উপনীত হয়, নানা ধারার সম্মিলনে, আত্মীকরণে প্রাণবান ভারতশিল্পের উদারতর পটে। ভারতশিল্পের ধারায় কালে কালে বিমিশ্রিত হয়েছে নানা প্রকরণ-পদ্ধতি। ‘আর্য শিল্পের ক্রম’ (বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী) প্রবন্ধে দেখান আর্যকল্পনার রূপান্তর বৌদ্ধশিল্পে, বিশ্লেষণ করেন আর্যেতর জাতির শিল্পচেষ্টার সঙ্গে উৎকৃষ্ট আর্য কল্পনার পরিণয়বন্ধনের তাৎপর্য। বিশ্লেষণ করেন, কীভাবে তুর্কি ধারা ধরেছে ভারতীয় ছন্দ, হিন্দুরীতি মিলিত হয়েছে মোগল রীতিতে। এ মিলন জোর করে সম্ভব হয়নি, শিল্পীর স্বাধীন শিল্পক্রিয়ায় সামঞ্জস্য ফুটে উঠেছে। বিদেশি প্রভাব আত্মীকরণের দৃষ্টান্ত পান আজমীড়ের মসজিদে, কুতবমিনারে, আলতমাসের, আলাউদ্দিন বা তোগলকশাহের সমাধিতে। তাজমহলকে গ্রহণ করেন সেই সার্থক সম্মিলনেরই তুলনারহিত দৃষ্টান্ত রূপে। তরঙ্গের উত্থান পতনের মতো ভারতশিল্পের ধারায় এক একটি স্তর, পরস্পর্যে গ্রন্থিত এই স্তরগুলি নিয়ে সমগ্রতার ছবি ফোটে। সেই সমগ্রের পরিচয়ে ভারতশিল্পের প্রকৃত পরিচয়। তাকে হিন্দু বা তুর্কি বা মোগল-কোনও একটা পরিচয়ে চিহ্নিত করা যায় না কখনও। অন্তহীন বৈচিত্র্যের মধ্যে অক্ষুণ্ণ যে ভারতীয়তা-তাকে অনুভব করার দৃষ্টিই মূল্যবান ভারতশিল্পের ইতিহাস পর্যালোচনায়। অনিবার্যভাবে এখানে মনে আসে ভারতীয় ইতিহাসের মর্মবিচারে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে অবনীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গির মিলের কথা। শিল্পের দৃষ্টান্ত ধরে অবনীন্দ্রনাথ অখণ্ড ভারতীয়তার বোধে উত্তীর্ণ হন। ঠিক এই অখণ্ড ঐক্যের, বিচিত্রের মধ্যে ঐক্যসাধনের এই ভারতীয় প্রতিভার কথাই রবীন্দ্রনাথও বড়ো করে তুলে ধরেছিলেন তাঁর প্রখ্যাত ‘ভারতবর্ষে ইতিহাসের ধারা’ প্রবন্ধে। ভারতবর্ষময় ছড়ানো শিল্পনিদর্শনগুলির বৈসাদৃশ্যের চেয়ে রূপ ও রীতির গভীরতর সাদৃশ্যের প্রতিই অবনীন্দ্রনাথ আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। কারণ শিল্পের ইতিহাস আলোচনায় তাঁর নিজস্ব পদ্ধতি-শিল্পের প্রাণছন্দের মর্মটিকে আবিষ্কার করা। পুরাতত্বের পদ্ধতি পরিহার করে তিনি শিল্পদৃষ্টির উপরেই নির্ভর করেন। প্রকরণ-পদ্ধতির দিক থেকে ভারতশিল্পের এক একটা পর্বকে চিহ্নিত করা যায় ভিন্ন ভিন্ন নামে, পুরাতাত্বিকের উৎসাহ সেই শ্রেণীবিন্যাসে, জাতগোত্রের প্রভাব পরিমাপের বিচারে। কিন্তু এই সব গণ্ডিকে জেনে, গণ্ডিকে পেরিয়ে শিল্পধারার অবিচ্ছিন্ন প্রবাহের সমগ্রতাটুকু অবনীন্দ্রনাথ ধরে দিতে চেয়েছেন আমাদের বোধে। সেই সপ্রাণিত শিল্পধারার প্রসঙ্গেই বলেন
হিন্দু ভারতবর্ষের চেয়ে যে বড় ভারতবর্ষ, হিন্দু ভারতশিল্পের চেয়ে যে বড় ভারতশিল্প, তাই গড়ে তোলার প্রকরণ অর্জনের যে আনন্দ তারি মধ্যে ভারতবর্ষ এবং ভাতরশিল্পের মূল যুক্ত রয়েছে বলেই…সে নতুন থেকে নতুনতর অর্জনের মধ্যে চলে বলে বেঁচে রইলো। যুগ যুগান্তরের অর্জন প্রথা প্রকরণ তাকে চেপে মারতে পারলো না, সে আনন্দের সঙ্গে ভাঙতে লাগলো গড়তে লাগলো সৃষ্টির জিনিস। ভারত সভ্যতার এই বড় দিক,-এই দিক দিয়েই ভারতশিল্পের মর্যাদা ও মহিমা।১৮
প্রথা-প্রকরণ বাইরে থেকে আরোপিত হলেই শিল্পক্রিয়ায় খর্বতা ঘটে। শাস্ত্রীয় বিধিবিধানের শাসন বা যে-কোনও বাঁধন সম্পর্কেই সেই একই কথা অবনীন্দ্রনাথের। শিল্পীর স্বাধীনতা অক্ষুণ্ণ রাখা চাই। তাঁর স্বাধীন শিল্পরুচি প্রথা-প্রকরণ গ্রহণে-বর্জনে স্বভাবের পথে আপন প্রতিভাকে ফলবান করে তুলবে। স্বদেশের ঐতিহ্যে সেই শিল্পমুক্তির সাক্ষ্য তিনি সন্ধান করে ফিরেছেন। সন্ধানের গরজ আসে একালের শিল্পমুক্তির পথ-নির্দেশের, আধুনিক শিল্প আন্দোলনে নায়কত্বের দায়িত্ববোধ থেকে। শিল্পে নবযুগ আনতে চেয়েই শিল্পক্রিয়ায় প্রবৃত্ত হতে গিয়ে এ-বিচার-বিশ্লেষণ তাঁর কাছে অপরিহার্য মনে হল। কারণ, প্রবল পাশ্চাত্য প্রভাবের অভিঘাতে বিভ্রান্ত এই যুগে নিজেকে চেনাই শিল্পীর সবচেয়ে বড়ো দায়। স্বদেশের ঐতিহ্যের পটপ্রেক্ষায় সংস্থিত শিল্পজ্ঞান নিয়েই একালে শিল্পীর স্বকীয় কৃত্য বিষয়ে সংকল্প সম্ভব। অবনীন্দ্রনাথের ঐতিহ্যভাবনার মূল নিহিত আপনকালের শিল্পক্রিয়ায় চরিতার্থতার পথটি ধারণায় আনবার দায়িত্ববোধে। এবং এই কারণেই তাঁর সুবিস্তৃত বিচার-বিশ্লেষণ নিরালম্ব তাত্বিক আলোচনায় পর্যবসিত হয় না কখনও। আলোচনার সমগ্রে সঞ্চারিত হয় সেই কর্মিষ্ঠ আবেগ, যে আবেগে তিনি অন্তহীন পরীক্ষায় নিজেরই শিল্পকীর্তিতে সম্ভব করে তোলেন আধুনিকতার সূচনা।
রীতিমতো চিত্রবিদ্যা চর্চার শুরুতে তখনকার রেওয়াজ অনুসারে অবনীন্দ্রনাথকেও কাজ করতে হয়েছিল পাশ্চাত্য শিল্প-শিক্ষকদের তত্বাবধানে। গিলার্দি ও পামার তাঁকে বিদেশি পদ্ধতি শেখান। কিন্তু সে-শিক্ষা ছিল যান্ত্রিক, নিজের অভিমতে কাজ করে যাবার সুযোগ ছিল না সেখানে। দ্রুত নানা পদ্ধতি আয়ত্ত করার পাট চুকিয়ে দিলেন। ইচ্ছাসুখে কাজ করবার সুযোগ এল বৈষ্ণব পদাবলির বিষয় নিয়ে চিত্ররচনায়, রবীন্দ্রনাথের উপদেশেই অবশ্য। নিজের পায়ে দাঁড়াবার চেষ্টা শুরু সেই থেকে। দেখা দিল দেশি রীতি শেখার গরজ। বিষয়ের দিক থেকে দেশীয়তা শুধু নয়, গোটা ছবিটাকেই রীতি-পদ্ধতিতে এদেশের শিল্পধারার মর্মের সঙ্গে ঐক্যসূত্রে মিলিয়ে দেওয়ার উপায় সন্ধান। ভারতশিল্পের নবজাগরণের পথ নিজের কাজে ধাপে ধাপে প্রস্তুত করে তোলার সেই সুদীর্ঘ প্রয়াসে মোগল রাজপুত প্রভৃতি প্রসিদ্ধ ভারতীয় শিল্পরীতি আয়ত্তে আনতে হয় তাঁকে। শিল্পশাস্ত্রের বিধিব্যবস্থাগুলির মূল্যবিচার করতে হয় একালের ক্রিয়াকর্মের দিক থেকে। সেই সঙ্গে মনে রাখতে হয় ভারতশিল্পের এই নবপ্রবর্তনা বাঙলার মাটি থেকেই শুরু করছেন। শিল্পস্বভাবের স্বাভাবিক টানে তাঁকে নামতে হয় দেশের, বিশেষ করে বাঙলা দেশেরই লোকজীবনের আশ্রয়ে ধরা আছে যে লোকশিল্প-তারও মর্মানুসন্ধানে। পণ্ডিতের মত বা শাস্ত্রে মতের সঙ্গে সম্পর্ক নেই তবুও ‘হৃদয় যার সঙ্গে যুক্ত আছে’, সেই লোকশিল্প। এ শিল্পের ভাষা মেলে ‘পট পাটা গহনাগাটি ঘটি বাটি কাপড় চোপড় এমনি যে সব art’, ধর্মকর্ম চাষবাস নিয়ে বাঙলার দিনানুদৈনিক জীবনযাত্রার ধারার সঙ্গে বয়ে আসা শিল্পক্রিয়ার সচল ধারায়। এখানেই, এই দেশের মাটিতে নানা অনুষ্ঠানে পালাপার্বণে বাঙালি হৃদয়ের আশা আকাঙক্ষা ফোটে যে ব্রতকথায় ব্রতের আলপনায় পটচিত্রে লক্ষ্মীমনসার সরায়-আধুনিক শিল্পীর শিক্ষায় তারও উপযোগিতার কথা একালে অবনীন্দ্রনাথই প্রথম বলেন। উচ্চমার্গের ভারতীয় শিল্পধারার মর্মগ্রহণেই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় পূর্ণাঙ্গ হয় না। দেশের হৃদয়ের মধ্যে প্রবেশের পথ সন্ধানেই জিজ্ঞাসু শিল্পীকে তাই সুবিস্তৃত অনুশীলন করতে হয় ‘বাঙলার ব্রত’ নিয়ে। পুরাতত্বের দৃষ্টি নিয়ে তথ্যানুসন্ধান নয়, লোকজীবনের সজীব আশা আকাঙক্ষার স্পর্শ পাবার প্রত্যাশায় অবনীন্দ্রনাথ ব্রতকথার ভাবসম্পদ আর আলপনা-শিল্পের রূপ-শুদ্ধির বিচার-বিশ্লেষণ করেন। লোক-হৃদয়-পুটে লালিত এই শিল্পকলায় মানুষের সুস্থ কামনা-বাসনার রসে পুষ্ট অঙ্কন ও মণ্ডন রীতিতে শিল্পগত শুদ্ধতার দিকটিই তাঁকে টানে। শিল্পসৃষ্টির মৌলিক আবেগ কীভাবে আলপনাতেও কাজ করে দেখিয়ে দেন। আকাঙক্ষার অতৃপ্তিটি কল্পমায় চরিতার্থতার পূর্ণ মূর্তি ধরে ওঠে যখন, শিল্পী তাকে বাইরে আনেন রেখায় বর্ণে প্রস্ফুট করে। সেই কামনার আবেগ থেকেই আসছে ব্রতানুষ্ঠান। যা নেই, যে আকাঙক্ষা চরিতার্থই হবে না হয়তো-ব্রতের কথায় আলপনায় তাকেই প্রমূর্ত করে তোলা হয়। কল্পনা কাজ করবার অবসর পায় এখানে। তাই আলপনা সৃষ্টির পর্যায়ে আসে। লোকশিল্পের বিচারেও দেখি সেই একই পদ্ধতি তাঁর, শিল্পচেতনা-প্রবুদ্ধ ইতিহাসবোধ নিয়ে ঐতিহ্যের মর্মগ্রহণ। সজাগ শিল্পদৃষ্টিই তাঁর সহায়। রূপসৃষ্টিতে রেখার ব্যবহারের নিতান্ত টেকনিক্যাল আলোচনাতে বাঙলার পটুয়াদের কাজের দৃষ্টান্ত আনেন। রেখা দিয়ে রূপকে বাঁধেন না প্রকৃত শিল্পী, রেখা হয়ে ওঠে রূপমুক্তির উপায়। কালীঘাটের পটে অ-জটিল অলংকারহীন সাবলীল রেখায় রূপমুক্তির দৃষ্টান্ত তাঁর তাত্বিক আলোচনাকে প্রত্যক্ষ প্রমাণের নিশ্চিত ভিত্তি জোগায়। রসসৃষ্টির উপায় নিয়মে বেঁধে যে দেওয়া যায় না কখনও, এই উক্তিরই সমর্থন খোঁজেন পুতুল শিল্পের গড়ন ও রং ব্যবহারে শাস্ত্রীয় বিধির কিছুই না মেনেও রসের অনির্বচনীয়তা ধরে দেবার অনায়াস দক্ষতায়। আলপনা, পট-পাটা, মাটি বা কাঠের পুতুল; ফুলকারি কাঁথা সুজনি, দুর্গাঠাকুরের ডাকের সাজ, নৌকোর গলুই-লোকশিল্পীদের হাতের কাজের এমন অজস্র দৃষ্টান্ত-সবই তাঁর কাজে আসে শিল্পে স্বদেশজিজ্ঞাসার সূত্রে। দেশের মাটির উপরে দাঁড়াতে চান বলেই কাজে আসে।
অবশ্যই অবনীন্দ্রনাথ আর একজন কালীঘাটের পটুয়া হবার সাধনা করেননি। লোকশিল্পের পুনরাবৃত্তি একালের শিল্পমুক্তির পথ নয়, যেমন নয় শাস্ত্রীয় শিল্পের পুনরাবৃত্তি। আধুনিক বাঙলায় বা ভারতে গ্রাম্য লোকচিত্তের উপরে যে আর একটি স্তর রচিত হয়ে উঠেছে বিশ্বের সঙ্গে আদান প্রদানে, দেশের চিত্তের সেই স্তরটিই একালের শিল্প ক্রিয়ার ভিত্তি। এই আধুনিক চিত্তস্তরের ঘনতা যতটাই হোক-এখানেই আধুনিক শিল্পীর আশ্রয়। এখানেই বিশ্বের আলো হাওয়া-খেলা করে। গড়ে ওঠে রুচির বিশ্বগত মান। শাস্ত্রীয় বা লোকশিল্পের ঐতিহ্যের পুনরাবৃত্তি নয়, একালের প্রয়োজনের দিক থেকেই সেই ঐতিহ্যকে ব্যবহার আধুনিক শিল্পীর কৃত্য।
কান্তিবিদ্যায় অবনীন্দ্রনাথ এক পূর্ণাঙ্গ প্রস্থান গড়েছেন তাঁর সমগ্র রচনাবলিতে। তারই এক গুরুত্বপূর্ণ দিক এই ঐতিহ্য ও আধুনিক শিল্পের দায়দায়িত্ব-বিষয়ক আলোচনা। ভারতশিল্পে নবজাগরণের নায়কত্বে স্বেচ্ছাকৃত অবনীন্দ্রনাথ তত্বগত ভাবে যা বলেন সেই তত্ব শিল্পক্রিয়ায় তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতারই নির্যাসিত সূত্র। নিজের কাজের অভিজ্ঞতাই তাঁকে শিখিয়েছিল আধুনিক শিল্পীর পক্ষে মুক্তির পথ কী। ইংরেজ শিক্ষক পামার এবং ইতালীয় গিলার্দির কাছে তিনি পাঠ নিয়েছিলেন পাশ্চাত্য শিল্পরীতির। ড্রয়িং-এ দক্ষতা, পারস্পেকটিভের বোধ, প্যাস্টেলের কাজ, তেলরঙের ব্যবহার ও প্রতিকৃতি আঁকার প্রকরণ-এই শিক্ষার স্তরে তাঁর আয়ত্তে আসে। শিক্ষালব্ধ এই দক্ষতায় পাশ্চাত্য রীতির একজন ভারতীয় চিত্রী হিসেবে খ্যাতি অর্জন তাঁর পক্ষে অনায়াসেই সম্ভব হত। কিন্তু দেশকালের হাওয়ায় ছিল তখন জাগরণের নতুন বাণী, অবনীন্দ্রনাথেও জেগেছিল শিল্পীচৈতন্যের আত্মনির্ভরতার গরজ। সেই গরজেই ঘরের দিকে মুখ ফেরাতে হল। নিশ্চয়ই হ্যাভেলের সৎ পরামর্শ তাঁর আত্মানুসন্ধানে সহায়ক হয়েছিল। কিন্তু প্রতিভার প্রেরণায় তিনি প্রতিষ্ঠার পথ আত্মপ্রকাশের পথ খুঁজতে চোখ মেলেছিলেন যে যুগে যে পরিবেশে-সেই প্রেরণা এবং পরিবেশের প্রভাবই কি তাঁকে চালনা করেনি ভারতশিল্পে নবযুগ নির্মাণে দুরভিসম্ভব পথে। বর্তমানের সত্তাধর্ম মেনে তাঁকে একালের শিল্পক্রিয়ার প্রয়োজনের দিক থেকে ঐতিহ্যস্মৃতির মর্মানুসন্ধানে নিয়োজিত হতে হল। শিল্প-ঐতিহ্যের সংস্কারসাধন মাত্র তাঁর উদ্দেশ ছিল না, তিনি জানতেন প্রাচীনের বেশ পরিবর্তন করলেই সে-শিল্প একালের হয়ে ওঠে না। ‘আমিই বর্তমান’ বা ‘আমাতেই বর্তমান’ শিল্পী তো এই বোধই ফুটিয়ে তোলেন তাঁর কাজে। এই বর্তমানের শিল্পীতেই, অবনীন্দ্রনাথের নিজেরই কাজে মেলে ইয়োরোপীয় শিক্ষা আর শাস্ত্রীয় জ্ঞান, মোগল-রাজস্থানী রীতি বা লোকশিল্পের প্রাণময় ধারার অভিজ্ঞতা অন্তরঙ্গ সামঞ্জস্যে। সৃষ্টিময় প্রতিভার সামর্থ্যেই এ মিলন সম্ভব। আপন কালের দায়দায়িত্ব বোধের ভিতের উপরেই গড়ে ওঠা সম্ভব ব্যক্তিপ্রতিভার অভ্রান্ত শিল্পজ্ঞান ও সংকল্প। সমর্থ প্রতিভার অধিকারে অবনীন্দ্রনাথ একালের দাবি পূরণ করে গেছেন সারা জীবনের কাজে। আর তাত্বিক আলোচনায় বিচার-বিশ্লেষণে সেই সৃষ্টিময় শিল্পচৈতন্যের অভ্রান্ত উপলব্ধিগুলি ধরে দিয়ে গেছেন নবীন ভারতের শিল্পীসমাজের উদ্দেশে।
সূত্রনির্দেশ
১। জোড়াসাঁকোর ধারে, কলিকাতা, ১৩৬৯ বঙ্গাব্দ। পৃ ১২৫।
২। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, ‘শিল্পশাস্ত্রের ক্রিয়াকাণ্ড’। কলিকাতা ১৩৬৯। পৃ ১২৫।
৩। ঐ। পৃ ১২৫।
৪। ঐ। পৃ ১১৭।
৫। ‘পথে পথে’, ভারতী, জ্যৈষ্ঠ, ১৩২২ বঙ্গাব্দ।
৬। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, ‘শিল্পে অনধিকার’। পৃ ১১।
৭। ঐ। পৃ ৪-৫।
৮। ‘পথে পথে’, ভারতী, জ্যৈষ্ঠ, ১৩২২।
৯। ঐ।
১০। ‘ভাবসাধন’, ভারতী। অগ্রহায়ণ, ১৩১৭।
১১। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, ‘শিল্পশাস্ত্রের ক্রিয়াকাণ্ড’। পৃ ১৪০।
১২। ঐ। পৃ ১৪০।
১৩। ঐ। পৃ ১৪১।
১৪। বাগেশ্বরী শিল্প প্রবন্ধাবলী, ‘জাতি ও শিল্প’। পৃ ১৯১।
১৫। ঐ। পৃ ১৯৪, ১৯৫, ১৯৮।
১৬। ঐ, ‘শিল্পীর ক্রিয়াকাণ্ড’। পৃ ১৪০।
১৭। ঐ, ‘শিল্পের ক্রিয়া প্রক্রিয়ার ভালোমন্দ’। পৃ ১৫২, ১৫৩।
১৮। ঐ। পৃ ১৫৪।
৬ষ্ঠ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা
(ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৭৫)
