টমাস মানের সঙ্গে – অসীম রায়

টমাস মানের সঙ্গে – অসীম রায়

একালের কথা, গোপাল দেব, দ্বিতীয় জন্ম – এই তিনটি উপন্যাসেই তোর একটি বিশেষ ত্রুটিপূর্ণ ঝোঁক ক্রমে প্রকট হয়েছে এবং দ্বিতীয় জন্মে তা একটি সর্বাত্মক শিল্পগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা দিয়েছে। সে ত্রুটি হল অনেক সময় (সব সময় নয়) আশে পাশের যেখানে যে জ্যোতি রায়, শোভা দত্ত, বিষ্ণু দে, বৌধায়ন চট্টোপাধ্যায়, দিলীপ রায়, রাম বসু, মুরলী ঘোষ ও আরও অনেক হতভাগ্য, কোনও একজনের মা, তার বোন, তার ভুরু, তার ভাগ্নে, তার নাক-চোখ-রক্ত, তার মা-র অর্থলোলুপতা, তার বাঁচা-কাঁদা-মরা, তার জীবনের কমা-দাঁড়ি, বিশেষ্য-বিশেষণ-সর্বনাম (তা না হলে তুই খুকু ও বাঘার নাম বদলে রাখতে পারতিস) আছে, সব কিছুকে উপন্যাসের কাঁচামাল হিসেবে তুই আবিষ্কার করে ফেলেছিস। কিন্তু মুশকিল হল, তোর শিল্পে তাদের আমদানি হয়েছে প্রায় সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তির মতো।

১৯৫৬ সালে দ্বিতীয় জন্ম প্রকাশের পরই এ চিঠির অভিযোগ এমন প্রচণ্ড ও মর্মান্তিক যে তা জবাবের অপেক্ষা রাখে না। এ জবাব সহজলভ্য চাতুরির উপর নির্ভর করে দেওয়া মানে আত্মবঞ্চনা, বিশেষ করে অভিযোগকারীর বছরের পর বছর সান্নিধ্য লেখকের গভীর পরিতৃপ্তির কারণ ঘটানো ছাড়াও এ অভিযোগের উত্তরের সঙ্গে তার নিজের শিল্পপ্রক্রিয়াও যুক্ত। লেখকের সামনে এমন এমন বক্তব্য আসে যা আসলে বক্তব্যের মুখোস পরা শূন্যতা, কখনও তা কথার পিঠে কথা বলার অভ্যাস-দোষ-সঞ্জাত, কখনও বা সংক্রামক চালাকির ব্যাধিতে রুগ্ন ; কিন্তু লেখকের কাঁধ ধরে ঝাঁকি দেবার ক্ষমতাও বয়ে আনে কোনও বক্তব্য, যখন সে বক্তব্যের সঙ্গে মিশে থাকে শিল্পকর্ম সম্পর্কে গভীর জিজ্ঞাসা।

আরও বছর পরেও এ চিঠির নৈর্ব্যক্তিক কোনও উত্তর খুঁজবার চেষ্টা করার মধ্যে বক্তব্যের মর্মান্তিকতা ও প্রচণ্ডতা হারায় না। কারণ চিঠিতে যে সব নামোল্লেখ আছে সেসব নামধারী নরনারী লেখক তাঁর উপন্যাসে কাঁচামাল রূপে ব্যবহার করেছেন কিনা সে সম্পর্কে মতভেদের অবকাশ যথেষ্ট থাকলেও, চারপাশের প্রত্যক্ষ যে জগতে লেখক হাঁটেন-ফেরেন-কথা বলেন সেই জগৎ-টাই যে তাঁর লেখায় ফিরে ফিরে এসেছে ও আসবে এ অভিযোগ তিনি যে শুধু মাথা পেতে নেবেনই না বরং একথা বলবার চেষ্টা করবেন যে, এই প্রত্যক্ষ জগৎকে মানসলোকের সঙ্গে যুক্ত করাই তাঁর লেখার একমাত্র না হলেও অন্যতম প্রেরণা।

অনেক সময়ই আলোচনায় রিয়ালিজম ও ন্যাচারালিজম দুই অভিন্নসত্তা বস্তু রূপে দেখানোর চেষ্টায় ভুল ঘটা স্বাভাবিক। মধ্যদিন ও মধ্যরাত্রির মতো নিউইয়র্ক ও শিয়াখালার মতো, ধনতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের মতো দুই নির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও পরিবেশে চিহ্নিত হয়ে সত্যের চেহারা আসে না লেখকের কাছে। এ রকম অভিন্নসত্তা, এ রকম নির্দিষ্ট সংজ্ঞা সাহিত্যের মানদণ্ড স্থাপনে হাতের পাঁচ হয়ে দাঁড়ালেও শিল্পকর্মের প্রক্রিয়াটা তলিয়ে দেখতে তা বিঘ্ন ঘটায়। রবীন্দ্রনাথের বহু পরিচিত কবিতার লাইন ‘ঘটে যা তা সব সত্য নহে’ ঘটনা নিশ্চয় বাদ দিয়ে নয়। আর এই ঘটনা কারো-ওর জীবন্ত মঙ্গোলীয় চোখ, নিচু খাদে কারও বা গলার স্বর, কোনও মহিলার ঠোঁটের ভাঁজে কোঁকড়ানো গোলাপের ইঙ্গিত, কথার যথার্থতা প্রতিষ্ঠার অভিলাষে হাত নাচানো, মেকি বিষাদে পরিপূর্ণ জনৈক ব্যক্তির আয়ত চোখ, কারওর বা গলায় লাল স্কার্ফ এমন কী কোনও নাম যা পাল্টাবার যান্ত্রিকতা অতিস্থূল কারণ, তা সেই মানুষটা ও তার পরিবেশের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এই নাক-চোখ-মুখ বলার ভঙ্গি এগুলো হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে ডুব দিয়ে আবিষ্কারের বস্তু না। এগুলো প্রত্যক্ষ, জীবন্ত, বাস্তব যা জলের মতো আমাদের চারপাশে, আমরা সাঁতরাচ্ছি সেই মুখ-চোখ-নাক-কথা জামা-র জগতে। তাদের বাদ দিয়ে ডুব দিলে রত্নাকরও রত্নহীন।

তার মানে ন্যাচারলিজম, সাংবাদিকতা, ফোটোগ্রাফি কিংবা মাছিমারা কেরানির পেশাই শিল্পকর্ম? এ প্রশ্নের ধাক্কা অস্বাভাবিক নয়। অর্থাৎ কোটি কোটি চোখ, কোটি কোটি হাত নাচানো, কোটি কোটি গলার উঁচু-নিচু স্বর আমাদের আগে গিয়েছে, পরে আসছে, কয়েকশো কোটি জামা জুতো চোখ মুখ গলার আওয়াজের ফিরিস্তিই আমাদের শিল্পকর্মে আকর্ষণ? তাহলে নিশ্চয় উপন্যাস নামধেয় শিল্পকর্ম বেশ স্থূল ব্যাপার, চারপাশের যত রসালো চটকদার ঘটনা জমিয়ে লিখতে পারলেই তা দাঁড়িয়ে যাবে উপন্যাসে, এবং তা যতই চটুল চাঞ্চল্যকর হোক কিংবা লেখক কেমন আষ্টেপৃষ্ঠে জীবন দেখেছেন তার পাতার পর পাতা বর্ণনা থাক, বয়স্ক মানুষের পক্ষে তা নিঃসন্দেহে বাহ্য।

এ কথা সর্বজনবিদিত যে হৃদি-রত্নাকরের অগাধ জলে ডুব দেবার ব্যাপারটা না থাকলে কাহিনি কাহিনিমাত্র, উপন্যাস নয়। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে খেয়াল করা দরকার, প্রত্যেক উপন্যাস এক গভীর আত্মমুখিনতা ও প্রবল বহির্মুখনিতা এক সূত্রে বাঁধবার চেষ্টা। আরও বছর আগের চিঠির জবাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে এ কথা বলা যেতে পারে যে দুটো আলাদা এবং অনেক সময় সমান্তরাল জগৎ এক সঙ্গে অনেকদিনের ধীর অভিনিবেশে ধরবার চেষ্টাই উপন্যাস লেখার একমাত্র সাফাই। যে জগৎ সেই বিশেষ বইটির (দ্বিতীয় জন্ম) প্রসঙ্গে উল্লিখিত সে-জগতে লেখকের বাস বেশ কিছুকালের। এ-ক্ষেত্রে চেষ্টা করে জীবন দেখবার জন্যে বার হবার কোনও দরকার ছিল না। এ জগতের চেহারাটা এসেছে নিঃশ্বাস নেবার মতো স্বাভাবিকতায়। কাজেই একটা চমৎকার তৈরি বাগানকে আবার উপড়ে নষ্ট করে সেই জায়গায় নতুন বাগান সৃষ্টি না করে শুধু নতুনভাবে সাজিয়ে দেবার প্রয়াস ছিল লেখকের। আর সেই সাজানোর ছকটার জন্যে যেমন তাঁকে ভাবতে হয়েছে তেমনি তাঁর কাছে মূল্যবান ঠেকেছে সেই সত্যের অনুভূতিতে স্পন্দমান জগৎখানা তুলে ধরবার প্রয়াস।

কিন্তু উপন্যাস প্রক্রিয়ার এই তত্ব ডিশে সাজিয়ে দেবার মতো পাঠকের সামনে গুছিয়ে রাখলেই অভিযোগকারীর যুক্তি খণ্ডায় না। বস্তুত অভিযোগ অভিযোগই থেকে যায়, জবাব জবাবই থাকে। আহত মানসের কাছে এ প্রক্রিয়া অসামাজিক, চৌর্যবৃত্তি, সাম্রাজ্যবাদী জবরদস্তি, প্রায় ছ্যাঁচড়ামি। যদি পালটাপালটি বসা যায় তবে বর্তমান প্রবন্ধলেখকের কাছে এ বক্তব্যের যথার্থতা অনস্বীকার্য। আবার লেখক হিসেবে এ ছাড়া কোনও রাস্তা নেই, মূর্ত প্রত্যক্ষ রূপ ছাড়া বিমূর্ত রূপের ধ্যান অসম্ভব।

এ বক্তব্যের সঙ্গে আর একটি বক্তব্যের সহাবস্থান অনস্বীকার্য। উপন্যাস তা একটাই হোক বা সারা জীবনব্যাপী লেখার মালাই হোক, তা লেখকের এক অবিচ্ছিন্ন আত্মজীবনী। অর্থাৎ লেখক তাঁর জগতে যেভাবে হাঁটেন-চলেন-ফেরেন, তাঁর স্বকীয় ব্যক্তিত্ব, তাঁর বিশেষ মেজাজের ছায়াপথ সমস্ত লেখাতেই প্রতিভাত। তা যদি না হয়, যদি সাহিত্যের জগৎ এবং লেখকের মানসিকতার মধ্যে ব্যবধান থাকে অনড়, ভিতর ও বাহিরের যোগাযোগ অনুপস্থিত, তাহলে আবার পুরোনো কথায় ফিরে আসা যায়, কাহিনি কাহিনি মাত্র, উপন্যাস নয়। এই বিশেষ কারণেই ভালো লেখকের কোনও একটি বিশেষ লেখা নিয়ে চেঁচামেচি অর্থহীন ; মাস্টারপিস-মৃগয়া একেবারে অচল। কারণ লেখকের মানসিকতায় নতুনের আবির্ভাব হ্যাঁচকায় না, বয়ে নিয়ে চলে, বিস্তারিত করে। প্রত্যক্ষের ধাক্কায় উৎসাহিত, ক্ষুব্ধ কিংবা আলোড়িত হয়ে তিনি আবার ফিরে যান তাঁর স্বকীয় ব্যক্তিত্বে। অন্তর ও বাহিরের দ্বন্দ্বে তাঁকে প্রাথমিক পর্যায়ে অনেকখানি ভাবতে হয় তাঁর বিষয়টা বিষয় কিনা। তারপর লিখতে লিখতে সমস্ত বিষয় এক নতুন নকশায় ধরা পড়ে, যা একান্তভাবে ব্যক্তিগত এবং একেবারে বাইরের প্রত্যক্ষ জগতের কাঁচামাল। এই দুই পৃথক বস্তুর দুই সুতোয় বুনোটের কাজ চলে। এই নকশা বোনার উৎসাহে ভরা পালে কাজ এগোতে থাকে, তখন দুটো সুতোর চেহারা আর আলাদা করে চেনা যায় না, ভিতর ও বাইরের ব্যবধান কমে আসে।

একেবারেই ব্যবধান থাকে না? গোটা উপন্যাসটাই অখণ্ড রূপ পরিগ্রহ করে? এ প্রসঙ্গে কোনও পারফেকশানিজমের অবকাশ আছে কিনা সে বিষয় সন্দেহ কাটানো মুশকিল। দুশো-তিনশো কিংবা চার-পাঁচশো পাতার পরিক্রমায় বা দুদিন কী দু-দশ বছরের যাত্রায় কোনও ঘটনা কিংবা চরিত্র নাও জুড়তে পারে, তাতে কি গোটা উপন্যাসটার শিল্পকর্ম ব্যর্থ? সেখানে কি উইলিয়াম শেক্সপিয়রের ওথেলো নাটকের রুমাল কাহিনির অনিবার্যতা মাত্র স্মরণীয়? বরং এ প্রসঙ্গে লেখকের সমস্ত উপন্যাসব্যাপী পরিক্রমা বিচার্য। সে ক্ষেত্রে দেখা যাবে কোনও-কোনো আকাঁড়া কাঁচামালের স্বাদ অনাস্বাদিত, জোড়ে নি এমন সুতোও সুন্দর নকশার পরিচায়ক।

তাছাড়া কাহিনি যখন অনেক সময় ধরে অনেক রকম মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বয়ে চলে তখন সমস্ত চরিত্রতেই বইটির অন্তর্লীন ভাব বা ‘লেইট মোটিফ ‘ থাকবে এমন কোনও কথা নেই। অনেক সময় পার্শ্বচরিত্র জমে, তা অনেকটা গ্রিক কোরাসের মতো অবিচ্ছিন্ন হয়েও স্বয়ংসম্পূর্ণ, মূল ঘটনার সঙ্গে তাদের বৈপরীত্যেই তারা প্রাসঙ্গিক। তাদের ছেঁটে ফেলে কাহিনিকে এক সম্পূর্ণ নিটোল রূপ দেবার চেষ্টা শিল্পচর্চায় বিশুদ্ধবাদীদের সন্তোষের কারণ ঘটালেও তা শিল্পের দিগন্ত সংকুচিত করারই নামান্তর। যেমন প্রেমের প্রবল আকর্ষণে মুগ্ধ দুই নরনারীর পরিবেশ হতেই পারে এমন যেখানে স্বার্থপরতা, আত্মম্ভরিতা, বাক সর্বস্বতা ইত্যাদি মানুষের ক্ষুদ্রতার খেলা চলেছে। অর্থাৎ কোনও পর্বতশিখর যেমন ধাপে ধাপে সমতল থেকে উঠেছে, যার উপর পর্বত-অভিযানকারী দল অনেকটা কম পরিশ্রম ও কষ্টে আরোহণের গৌরব অর্জন করেন তেমনি এমন শিখরও আছে যেখানে ধাপগুলো কম, যেখানে খাড়া চড়াই। প্রকৃতির এই দুই ধরনের সৌন্দর্যের মতো অনেকটা বাস্তবের চেহারা। সেখানে একটা নিটোল মসৃণ, শিল্পসম্ভাবনাপূর্ণ এবং আর একটা কর্কশ স্থূল ভাববার কারণ নেই।

দ্বিতীয় জন্ম প্রকাশের পাঁচ বছর পর ইংরেজিতে প্রথম প্রকাশিত টমাস মানের আমার জীবনের স্কেচ বইখানা পাওয়া অনেকটা হাতে চাঁদ পাওয়ার শামিল হয়ে দাঁড়ায়। তাঁর আবিশ্ব ভক্তমণ্ডলীর মধ্যে একজন অকিঞ্চিৎকর জর্মন ভাষা-অনভিজ্ঞ ভক্তের কাছে এই ছিয়াত্তর পাতার ছোট্ট বইখানা এক আত্মিক সংকটের আশ্রয়। কারণ যে আসামি কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারপতির বিরুদ্ধ রায় শুনেও ভাবছে সে নির্দোষ এবং জেলখানা থেকে বেরিয়ে এসে আবার তাকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে, তার মানসিক অবস্থা নিশ্চয় আত্মিক সংকটের সমতুল্য। মান অবশ্য অনেক জায়গাতেই শিল্পপ্রক্রিয়ার অপরূপ বর্ণনার মারফত শিল্পের অসাধারণ গুরুত্বে পাঠকের প্রত্যয় এনেছেন, কিন্তু এমন খোলাখুলি সাদামাটা ভাষায় নিজের লেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেননি। মান বলেছেন

‘টেনিও ক্রোয়গার’-এর অন্তর্নিহিত প্রতীক এবং বাস্তবের নিতান্ত অপ্রয়োজনীয় খুঁটিনাটি তুলে ধরবার প্রসঙ্গে নিজের অভিজ্ঞতার কথা মনে আসে। কেউ কেউ ভাবতে পারেন, আমার যৌবনের সেই কাহিনিতে লাইব্রেরি-ঘরে পুলিশ অফিসারটির সঙ্গে যে সব দৃশ্য তা আমি তৈরি করেছি আমার বক্তব্যের সপক্ষে। কিন্তু তা মোটেই নয় ; স্রেফ যা ঘটেছে তা থেকে তুলে ধরা হয়েছে। ঠিক এমনিভাবে ‘ভিনিসে মৃত্যু’ কাহিনিতেও কোনও কিছু উদ্ভাবিত হয়নি। উত্তুরে কবরখানার তীর্থযাত্রী, ধড়ধড়ে নৌকো, সেই শুভ্রকেশ বাউণ্ডুলে আর অনামুখো গণ্ডোলা-মাঝি, তাজিও আর তার পরিবার, মালপত্তরের গন্ডোগোলে যাত্রার সাময়িক বিঘ্ন, কলেরা, ট্র্যাভেল ব্যুরোর ধর্মপুত্তুর যুধিষ্ঠির কেরানি আর বজ্জাত কবিয়াল – এই সব কিছু এবং আরও যা আছে তা সব সেখানে ছিল। আমাকে খালি সেগুলো সাজাতে হয়েছে, কারণ অদ্ভূতভাবে হলেও তারা যে একই কম্পোজিশানের অঙ্গ তা আমার কাছে দপ করে মনে পড়েছে।

১৯২৪ সালে প্রকাশিত ইন্দ্রজাল পর্বত পাঁচ বছর পর মান-কে দেয় নোবেল পুরস্কার, কিন্তু সংগতভাবেই মানপত্রে লেখা ছিল যে প্রধানত ল্যুবেক শহরের ব্যবসায়ী পরিবারের জীবনকাহিনি, বুডডেনব্রুক বইখানার দরুন উত্তর ইউরোপের বাসিন্দাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার এ পুরস্কার। এ সহরেই মানের জন্ম ও বাল্যকাল অতিবাহিত ; তাঁর বাবাও শস্যের ব্যাপারী এবং শহরের জনৈক ব্যবসায়ীর জীবন-কাহিনি লেখাই ছিল তাঁর বইয়ের প্ল্যান। অর্থাৎ আমাদের মূল প্রতিপাদ্য, নাক-চোখ-মুখ, গলার আওয়াজের জগৎ থেকেই লেখকের যাত্রা। মূর্ত প্রত্যক্ষ রূপ ছাড়া বিমূর্ত রূপের ধ্যান অসম্ভব।

এই মূর্ত ও বিমূর্তের মাঝখানে সেতু বাঁধবার যে বিচিত্র প্রয়াস তা টমাস মানের ছেলে গোলো মানের পিতৃস্মৃতি-তে সম্প্রতি চমৎকার প্রকাশিত। বস্তুত এ-প্রয়াস ন্যাচারালিজম ও রিয়ালিজমের বহু আলোচিত বাঁধা সড়ক থেকে আলাদা এবং আরও সম্ভাবনাপূর্ণ। এ প্রয়াসে অন্তর ও বাহির এ দুই জগৎ গুরুত্বপূর্ণ, লেখকের উন্নত মানসিকতা ও তাঁর অন্তর্দৃষ্টি যেমন গোড়ার কথা তেমনি প্রাথমিক এই চার পাশের জগৎ – মানুষের মুখচোখ-নাককান-গলার আওয়াজ, লেখক যে রাস্তায় হাঁটেন চলেন ফেরেন। এবং এই আত্তীকরণের পেছনে কোনও প্রবল তাড়া নেই, নেই নাটকীয়তা বা উদভ্রান্তি।

একবার যখন আমি গ্রামার স্কুলের ছাত্র বাবা আমার কোনও বন্ধুর কিছু ফটো চাইলেন। সে ছেলেটি নজরে এসেছিল তার স্কুলে আসার সময়। সেই স্পেনীয় তরুণ আজ প্রতিষ্ঠাবান ব্যবসায়ী এবং জর্মন ও স্পেনীয় বাণিজ্যের অন্যতম সংযোজক। প্রথমে এ অনুরোধ আমার কাছে ছিল দুর্বোধ্য ; পরে দেখা গেল এই ফোটোগুলোর প্রয়োজনীয়তা তাঁর সেই মহৎ উপন্যাসে জোসেফের গড়নের জন্যে ; যে মুখখানা তিনি আলগোছে দেখেছেন স্কুলে তা আরও খুঁটিয়ে পরীক্ষা করার বাসনা। সচরাচর তাঁর স্মৃতিচারণে দরকার ছিল না এ রকম নোট বইয়ের। একথা প্রায় সর্বজনবিদিত যে তিনি সাধারণত ছিলেন না চরিত্র-উদ্ভাবনকারী, ছিলেন আবিষ্কারক; এবং জীবন থেকেই আঁকতেন চরিত্র। ক্রুল পরিবার কীভাবে এমন দুর্দান্ত জীবন্ত করে আঁকলেন – জনৈক রাইনল্যান্ড-অভিজ্ঞ ব্যক্তির এ প্রশ্নে তাঁর জবাব, ‘আরে আমি একবারমাত্র আধ ঘন্টার জন্য রাইন নদীতে এক জাহাজে তাদের দেখেছিলাম’। তাঁর মডেলের সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের স্থলে অনেক সময় নামটাও বাদ দিতে তিনি ছিলেন অপারগ; অর্থাৎ তিনি সেই সব নাম রাখতেন যা অবিকল যে সব লোকদের ‘ব্যবহার’ করছেন তাদের নামের মতো, কারণ তাঁর এ বোধ ছিল যে ব্যক্তির সঙ্গে তার নামের অচ্ছেদ্য যোগাযোগ। উদাহরণস্বরূপ ইন্দ্রজাল পর্বতে প্রিভি-কাউন্সিলারের বা ‘পূর্ব বিষাদ’ ছোট উপন্যাসে অভিনেতার নাম তাদের আসল নামের প্রতিধ্বনি। এ জন্য মডেল ও চরিত্রের সম্পর্ক তাঁর পক্ষে অস্বীকার করা মুশকিল হত ; যাঁরা ব্যাপারটা জানতেন তাঁরা মুচকি হাসতেন। আর প্রায়শ তিনি এই সম্পর্ক প্রবলভাবে মুক্তকণ্ঠে অস্বীকার করতেন, কারণ রিয়ালিস্ট বা ন্যাচারালিস্ট কোনওটাই তিনি নন, এ বিষয়ে ছিলেন সচেতন। তাঁর প্রথম উপন্যাস বুডডেনব্রুকে একমাত্র প্যারামানেডার ছাড়া কোনও চরিত্রই বানানো নয়। একমাত্র বানানো ছিল বইটার নাম।

তাঁর শেষের দিকের কাজে বানানো বস্তুর ব্যবহার অনেক বেশি ; এক্ষেত্রে জীবন থেকে তিনি ক্রমশ কম এঁকেছেন। তাছাড়া বহির্জগতের প্রয়োজনীয়তা এক্ষেত্রে ছিল কম ; যা দরকার তার উপর ছিল আসল ব্যাপার, অর্থাৎ কল্পনা। খনি শ্রমিকদের জীবনকাহিনি লিখবেন বলে তিনি জোলার মতো খনিসংলগ্ন গাঁয়ে বাস করেননি কয়েকমাস, অথবা হোটেলের মানুষ লিখবার উদ্দেশ্যে ভিকি বামের মতো তাঁকে কয়েক মাসের জন্যে হোটেলের পরিচারিকা হতে হয়নি। এরকম ব্যাপার আমার বাবার কাছে নিশ্চয় জ্যাবড়া লাগত। তিনি মোটেই ন্যাচারালিস্ট ছিলেন না। তাঁর পদ্ধতি ছিল কিছু সময় ধরে দূর থেকে নিস্পৃহ দৃষ্টিতে দেখা, তারপর ফের নিজের অন্তরের দিক থেকে বাইরে তাকানো।

কোনও একটি বিশেষ লেখার প্রসঙ্গে টমাস মানকে টেনে আনা কেন, পাঠকের এ প্রশ্নের উত্তরে বলা যেতে পারে যে উপন্যাস রচনার পদ্ধতি প্রসঙ্গেই এ আলোচনা। সঙ্গে সঙ্গে মানের গুরুদেব গয়টের এক বিশেষ উক্তি, যার উল্লেখ বারে বারে ঘটেছে মানের লেখায়, সে উক্তিও এক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। সম্ভবত ‘একারমানের সঙ্গে আলাপ’ গ্রন্থে গয়টে বলেছিলেন, ‘কিছু করতে গেলে কিছু হতে হবে’। কথাটা গয়টের উপর তাঁর বিশেষ উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধে এবং অন্যত্র মান বার বার উল্লেখ করেছেন। কারণ লেখকের কাজের অসাধারণ গুরুত্ব সম্পর্কে তিনি ছিলেন বরাবর সচেতন। তাঁরই ভাষায় বলতে গেলে লেখক একজন ‘অসুস্থ দেবদূত’ নন, মানুষের সভ্যতা ও ঐতিহ্য সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট দায়। এ জন্য তাঁর নিজের উন্নত মানসিকতা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। এই উন্নত মানসিকতাই বলতে গেলে অন্তর ও বাহিরের দ্বন্দ্বের অনেকখানি সমাধান ঘটায়, কাহিনিকে রূপান্তরিত করে উপন্যাসে। এ জন্যে লেখকের যে সমৃদ্ধ জীবনবোধ তার পিছনে কাঠ-খড় পোড়ানোর ব্যাপার থাকে।

এ জীবনবোধ গড়ে তোলার ব্যাপারে যে সাংস্কৃতিক প্রভাব তা আত্তীকরণ প্রক্রিয়ায় নিজের ক্ষমতা ও স্বজ্ঞা অনুযায়ী ব্যক্তিগত বাছবিচারের কথা বলেছেন মান। যেমন তাঁদের গড়ে ওঠার সময় নীটশের এবং কিছু পরবর্তীকালে শোপেনহাওয়ারের অপরিসীম প্রভাব শুধু উল্লেখই করেনি ‘বুডডেনব্রুক’ উপন্যাসের নায়ক টমাস বুডডেনব্রুকের মৃত্যুর দৃশ্যের আগে শোপেনহাওয়ারের প্রভাব তিনি স্বীকারও করেছেন। ইউরোপীয় সংগীতের গড়নে সাজানো বিস্তৃতকালব্যাপী দীর্ঘ উপন্যাসের গঠনপ্রক্রিয়া প্রসঙ্গেও তিনি সংগীত ঐতিহ্যের ঋণ ভোলেননি। তাছাড়া নীটশের পাঠ তাঁর লেখা কিভাবে প্রভাবিত করেছে, কিভাবে তন্ময় এষণার নীটশে-পাঠের রূপান্তর ঘটালেন তিনি, শৌখিন নীটশেবাদীদের অতিমানবতা ও আত্মিক নৈরাজ্যের অন্ধকার গ্রহণ করলেন কঠিন আত্মানুসন্ধানের তীর্থযাত্রারূপে তা টমাস মানের যে কোনও আলোচনার অঙ্গাঙ্গী। কারণ গয়টের কর্ম ও অস্তিত্বের অখণ্ডতা বোধের প্রয়োজনীয়তা মান প্রসারিত করেছেন পাঠ্য নির্বাচন ও অনুধাবনে। যা পাঠ্য, যা মনীষা আলোড়িত তা কীভাবে লেখক গ্রহণ করেছেন তাঁর ব্যক্তিত্বে ও অভিজ্ঞতায় তা অনেকখানি জীবনবোধ গঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ত। শিল্প যেহেতু মনীষার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য, তাই শিল্পীর কাছে পড়ে পাওয়া জিনিস বলে কিছু নেই। প্রথম জীবনে কিছু লেখায় নীটশের প্রভাব থেকে শুরু করে তাঁর ‘শেষ রচনায়’, তাঁর অবিস্মরণীয় ‘সাম্প্রতিক ইতিহাসের আলোয় নীটশে দর্শন’-এর মতো লেখার পরিক্রমায় ঐতিহ্য আত্তীকরণে লেখকের যে অসামান্য দায় সেই কথাই স্মরণীয়। কারণ লেখক দুটো স্পষ্ট বিপরীতমুখী স্রোতের দোটানায় পড়েন, একদিকে অতি উৎসাহে অতিরঞ্জনের নেশায় মনীষার ক্ষেত্রে প্রায় অবতারবাদ প্রতিষ্ঠার সংক্রামক চেষ্টা, অন্যদিকে নকলনবিশি যান্ত্রিকতার বশে রক্ষণশীলতার দাসত্ব বা ঐতিহ্যের নামে নড়বড়ে ধড়ধড়ে বাড়ির দারোয়ানি। ঐতিহ্যকে স্বকীয় অভিজ্ঞতা ও আত্মানুসন্ধানের আলোয় কীভাবে নতুন রূপে আবিষ্কার করা যায় টমাস মান-ছাত্রের তাই প্রথম পাঠ।

মান যেভাবে বলেছেন ইউরোপীয় মনীষার ক্ষেত্রে শেষ অংশে ঊনবিংশ শতাব্দীর বস্তুত নীটশের শতাব্দী, তেমনি বলা যায় বিংশ শতাব্দীর মার্কস শতাব্দী। অবশ্য মার্কসের ক্ষেত্রে একটা প্রধান অসুবিধে মার্কসবাদ জীবনবোধরূপে দাঁড়ালেও সংস্কৃতি ও শিল্প প্রসঙ্গে মার্কস ও এঙ্গেলসের প্রাসঙ্গিক লেখা প্রায় অনুপস্থিত। কাজেই অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সাংস্কৃতিক মূল্যায়নের অঙ্গাঙ্গী হলেও সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চায় বিশেষ সমস্যার বিশেষ সমাধান অনেকখানি নির্ভর করছে লেখক ও শিল্পীদের হাতে ; এক্ষেত্রে নতুন পাঠের প্রয়োজন তর্কাতীত। তাছাড়া শিল্প ও সমাজের রূপ বর্ণনায় এঙ্গেলসের স্ট্রাকচার ও সুপারস্ট্রাকচারের তুলনার মতো কতগুলো এদিকে সেদিকে বিক্ষিপ্ত মন্তব্য ছাড়া এ বিষয়ে লেখা বিরল। এই সব বিরল লেখাগুলি নাড়াচাড়া করে মাঝে মাঝে যেসব লেখা দাঁড় করানো হয় তা বাস্তবিক পাতে দেওয়ার মতো নয়। একদিকে আর্থিক সামাজিক চিন্তায় সংগতভাবেই উদ্বুদ্ধ এবং দায়িত্বশীল লেখার সঙ্গে মিশে থাকে একেবারে সাংস্কৃতিক দায়শূন্যতা ও বাকসর্বস্বতা, যা লেখক ও শিল্পীর পক্ষে শুধু বাহ্যই নয়, যার অনুসরণ সংস্কৃতির ক্ষেত্রে প্রায় আত্মিক মৃত্যুর সমান। আর্থিক কাঠামোর পরিবর্তনে নতুন মানবতাবোধ প্রতিষ্ঠার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার যে স্বপ্ন তা বিংশ শতাব্দীর মানুষেরই স্বপ্ন। এ স্বপ্ন ও তা বাস্তবে রূপান্তরের আজ আবিশ্ব চেষ্টা। কিন্তু এ যাত্রার সার্থকতা অনেকখানি নির্ভর করে সাংস্কৃতিক কর্মীদের নিরলস ও নির্ভীক প্রয়াসে। নীটশে নানা রূপে ফিরে আসে, আপ্তবাক্য ব্যবহারে জবরদস্ত দখলই মানুষের মুক্তির সোপান নয়। মানুষের অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় সংগ্রাম তার সভ্যতা ও সংস্কৃতিবিচ্যুত হঠকারিতার নামান্তর নয়। টমাস মান বলেছেন তিনি নীটশেকে প্রকৃত বুর্জোয়া বানিয়েছেন, এ রূপান্তর প্রতিষ্ঠা করার মতো ক্ষমতা ও আত্মবিশ্বাস আমাদের সংস্কৃতিকর্মীদের আসুক। তাঁরা বলুন নতুন মানবতাবোধের প্রতিষ্ঠায় তাঁদের দায়ের কথা। মার্কসবাদী সাহিত্য আলোচনার শৌখিন যান্ত্রিকতা ত্যাগ করে সংস্কৃতির ক্ষেত্রে লেখকদের স্বকীয় অভিজ্ঞতা ও আত্মানুসন্ধানে নতুন আবেগ সঞ্চারিত হোক। এইখানেই টমাস মানের চ্যালেঞ্জ আমাদের জীবনে।

৬ষ্ঠ বর্ষ ৪র্থ সংখ্যা

(ভাদ্র-আশ্বিন ১৩৭৫)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *