দান্তের জীবনী – চঞ্চলকুমার চট্টোপাধ্যায়
১২৬৫ খ্রিস্টাব্দে সম্ভবত মে মাসে ইতালির ফ্লরেনস শহরে দান্তে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি প্রাচীন রোমান বংশোদ্ভূত এ কথা তিনি নিজেই বলেছেন। তাঁর আদি পুরুষেরা ফ্লরেনস শহরের অন্যতম পত্তনিদার। এমনও হতে পারে যে তাঁর পূর্বপুরুষেরা প্রথমেই কিছু সম্ভ্রান্ত হিসাবে পরিগণিত হননি, উত্তরকালে উপাধির বশে তা অর্জন করেন। পারাদিজো-তে দান্তে বলেছেন তাঁর বৃদ্ধ প্রপিতামহ কাচ্চাগুইদা সম্রাট তৃতীয় কনরাদ (কোররাদো) কর্তৃক ‘নাইট ‘(মিলিৎসা) উপাধিতে সম্মানিত হন। কাচ্চাগুইদার বংশধরেরা শহরের ‘পুরোনো বাজার’ ছেড়ে সান মারতিনো দেল ভেসকোভো পাড়ায় বসবাস করতে শুরু করেন। এখানেই দান্তে জন্মগ্রহণ করেন, জন্মগৃহটি এখনও রক্ষিত আছে। পিতার নাম আলিগিএরো, পিতামহ বেল্লিনচোনে। মাতার নাম বেল্লা। তিনি সম্ভবত দুরান্তে-র কন্যা ছিলেন। কেউ কেউ মনে করেন ‘দান্তে’ নামটি ‘দুরান্তে’র সংক্ষিপ্তকরণ (Durante)। দান্তের পিতা দু’বার বিবাহ করেন, দান্তে তাঁর প্রথম পক্ষের একমাত্র সন্তান। ছ’বছর বয়সে মাকে হারান, পিতাকে আঠারো বছরের মুখেই, মানুষ হন বিমাতা লাপা-র কাছে। সৎভাই ফ্রানচেসকো, দান্তের চেয়ে কুড়ি বছর বেশি বাঁচেন। সৎভগ্নী তানা (অর্থাৎ গাইতানা), আর একটি সৎভগ্নী, লেওন পোজ্জির স্ত্রী, তাঁর নাম জানা যায় না, কিন্তু তিনিই সম্ভবত ভিতা নুওভায় উল্লিখিত- দোন্না জোভানে এ জেন্তিলে, নম্র কিশোরী ভদ্রা। তাঁরই ছেলে আনদ্রেআ বোক্কাচ্চ-র বন্ধু ছিলেন। আনদ্রেআ মামা দান্তের অবিকল প্রতিকৃতি , এ কথা বোক্কাচ্চ বলে গেছেন। দান্তের অনেক কিছু খবর ভাগ্নে আনদ্রেআ বোক্কাচ্চ-কে দেন, যার ফলে দান্তের জীবনী লেখা সম্ভব হয়।
দান্তের জন্মসময়ে উত্তর ইতালি দু’টি রাজনৈতিক দলে বিভক্ত ছিল। একটির নাম গুএলফো, অপরটি গিবেল্লিনো। বহুবচনে গুএলফি, গিবেল্লিনি। সে-যুগে ফ্লরেনসে অপেক্ষাকৃত নিম্ন অভিজাত বংশের লোকেরা, কারুশিল্পী, ব্যবসায়ী, ইত্যাদি গুএলফো দলে ছিলেন; অপর দিকে রাজন্যবর্গ, জমিদার, ইত্যাদি গিবেল্লিনো দলে। এই দুটি দলের ঝগড়া বিবাদ, রক্তাক্ত যুদ্ধবিগ্রহ ইতিহাসপ্রসিদ্ধ। বলা বাহুল্য আদি আভিজাত্য, আর্থিক গৌরব দান্তে পরিবার অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছিলেন। অন্যান্য নিন্ম সম্ভ্রান্ত পরিবারের মতো আলিগিএরি ছিলেন গুএলফি এবং চিরকাল গিবেল্লিনি-র বিপক্ষে সংগ্রাম চালিয়েছেন। তেমন স্বচ্ছল অবস্থা না থাকলেও উপযুক্ত শিক্ষালাভে বঞ্চিত হননি, দান্তে একজন ভদ্রবংশীয় ‘ভদ্রলোক’-এর মতোই প্রথম জীবন কাটাতে পারেন। নগর সঙ্ঘের (Commune) তরফে ১২৮৯-এ তিনি কামপালদিনো যুদ্ধক্ষেত্রে একজন প্রথম সারির অশ্বারোহী যোদ্ধা হিসাবে লড়াই করেন গিবেল্লিনির বিরুদ্ধে। কামপালদিনো যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা দান্তে একাধিক বার উল্লেখ করেছেন পুরগাতোরিও ও ইনফেরনো-তে। বন্ধুকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি যুদ্ধের চমৎকার বর্ণনা করেন, এমনকি যুদ্ধক্ষেত্রের একটি নকশাও পাঠান। শ্রেণীগত বৈষম্য থাকলেও আভিজাত্যে গর্বিত কবি গুইদো কাভালকান্তির সঙ্গে তাঁর হৃদ্যতা জন্মে। দান্তের পিতা আলিগিএরো মৃত্যুর পূর্বে (১২৮৩?) সম্ভ্রান্ত কিন্তু পড়তি দোনাতি পরিবারের কন্যা জেম্মা-র সঙ্গে দান্তের বিবাহ ঠিক করেন। কবে বিবাহ হয় তা ঠিক জানা যায় না।
অনেকে মনে করেন দান্তে ছেলেবেলায় সান্তা ক্রোচে মঠে ফ্র্যানসিসকান ব্রতী হিসাবে ছিলেন। তখনকার দিনে মঠে লেখাপড়া করবার সুযোগ ছিল, হয়তো সেজন্য তিনি কিছুকাল ব্রতী হয়েছিলেন, ভবিষ্যতে ধর্মযাজক হবেন এমন কোনও লক্ষণ তাঁর পিতামাতা দেখতে পাননি। সম্ভবত তিনি প্রথমে ফ্র্যানসিসকান পাঠশালায় পাঠ নিতে যেতেন, এমনকি পরে মঠের বিদ্যালয়ে দর্শনশাস্ত্র চর্চা করে থাকবেন। সে-যুগে অবশ্য লাতিন ভাষা শেখা শুধু ধর্মযাজকদের মধ্যেই আবদ্ধ ছিল না, উচ্চাকাঙ্ক্ষী নাগরিকদের মধ্যেও এর রীতিমতো চর্চা ছিল। দেশের শাসন, আইন আদালত সব ক্ষেত্রেই লাতিন ব্যবহার হত। এমনকি ব্যক্তিগত চিঠিপত্রও লেখা হত লাতিনে। লাতিন না জানলে কেউ শিক্ষিত ভদ্রলোক বলে গণ্য হতেন না। সে-কালের বিখ্যাত পণ্ডিত ব্রুনেত্তো লাতিনি-র কাছে দান্তে শিক্ষা লাভ করেন, বিশেষ করে প্রাচীন লাতিন সাহিত্য। তিনিই তাঁকে শিখিয়েছিলেন দিনের পর দিন, কী করে অসীমের উত্তরাধিকারী হওয়া যায়। দান্তের সময়ে বোলোঞাঁ শহর অলংকার শাস্ত্রের জন্য বিখ্যাত ছিল, সেখানে যৌবনে তিনি গিয়েছিলেন শাস্ত্রচর্চা করতে। ধর্ম, বিজ্ঞান, শিল্প, সাহিত্য, সংগীত, এমন কোনও বিষয় সে-যুগে ছিল না যা তিনি জানতেন না বা চর্চা করেননি। দান্তে গ্রিক জানতেন না, লাতিনে অনূদিত গ্রিক সাহিত্য, দর্শন পড়েছেন। ইনফেরনো কাব্যখণ্ডে একটি জায়গায় ভার্জিলের একটি উক্তি থেকে মনে হয় দান্তে গ্রিক ভাষা না জানার দরুন নিজে কিছুটা বিব্রত বোধ করে থাকবেন। প্রভাঁসাল জানতেন, আজও অসামান্য, এমন নিবন্ধ লিখেছেন ত্রুবাদুর কবির ওপর; আর অবশ্য ফরাসি। প্রসঙ্গত উল্লেখ করা যেতে পারে, তাঁর গুরু, শিক্ষক, কবি ব্রুনেত্তো লাতিনি-র বিখ্যাত পুস্তক তেজোরো ফরাসি ভাষাতেই লেখা, যদিও ইতালিতে এই বইটির একটি ইতালিয়ান অনুবাদই চলিত ছিল। এই বইটির প্রতি অনুরাগ কতখানি তা ‘ইনফেরনো’-র কয়েকটি ছত্র পড়লেই বোঝা যায়।
যৌবনের প্রারম্ভেই তিনি কাব্যচর্চা শুরু করেছিলেন। শীঘ্রই শহরের অন্যান্য কবিদের সঙ্গে পরিচয় হল, তাঁরা পরস্পর কবিতা আদান প্রদান করতেন, কবিতায় থাকত প্রশ্ন, আসত উত্তর, যেমন সে-সময়ের রেওয়াজ ছিল। বলা বাহুল্য প্রেমই ছিল কাব্য তথা আলোচনার প্রধান বিষয়। একটা রীতিমতো সাহিত্য সঙ্ঘ নব্য আদর্শে গড়ে উঠছিল সমবায়ের ভিত্তিতে, সঙ্ঘের সভ্যরা যে প্রভাঁসাল কবিদের চেয়ে পৃথক তা বেশ বোঝা যাচ্ছিল, তবু তাঁদের অনেকরই কাব্যর্চচা ছিল শৌখিন পর্যায়ের, রমণীয় পদ্যরচনা, অনেক সময় সূক্ষ্ম কারুকার্য, জীবন ও কাব্যের অবশ্যম্ভাবী আকর্ষণে দীপ্ত নয়। দান্তের ক্ষেত্রে এর ব্যতিক্রম গোড়া থেকেই দেখা যায়, ধীরে ধীরে কাব্য তাঁর জীবনের সবখানিই জুড়ে বসল, তার দায়িত্ব জীবনের শেষদিন পর্যন্ত পালন ক’রে এসেছেন। প্রথমে সে-কালের কবিগুরু গুইদো গুইনিৎসেল্লি-র কাব্যাদর্শে আকৃষ্ট হন, গুইদো কাভালকান্তি-র কবিতা ভালোবাসেন, পরে নিজেই সরে আসেন, তৈরি করেন সম্পূর্ণ নতুন ধরনের কাব্য না হলেও কবিতায় নতুন সুর, আনেন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। যে-প্রেমের আদর্শ গুইনিৎসেল্লি প্রমুখ কবিদের লেখায় অস্পষ্ট ছিল, তাই দান্তের রচনায় ক্রমশই স্পষ্ট হতে লাগল। ভার্জিল হন তাঁর গুরু, যাঁর কাব্য থেকে তিনি সবচেয়ে বেশি প্রেরণা পান, ‘সুন্দর রচনা-রীতি’-র উৎস তিনিই। গুইদো কাভালকান্তির সঙ্গে বন্ধুত্বের সূত্রপাত একটি কবিতার মারফত, তার প্রথম চরণ- আ চিআস্কুন আলমা প্রেজা এ জেন্তিল কোরে- প্রত্যেক বিমুগ্ধ প্রাণ ও নম্র হৃদয়। কবিতাটি পাঠিয়ে তিনি প্রচলিত রীতিতে উত্তর ভিক্ষা করেন কবিদের কাছ থেকে, উত্তরদাতাদের মধ্যে একজন ছিলেন কাভালকান্তি। সেই থেকে তিনি তাঁর প্রথম বন্ধু অর্থাৎ শ্রেষ্ঠ বন্ধু বলে পরিগণিত হলেন। কাভালকান্তির সঙ্গে তৎকালীন ইতালীয় ‘স্থূল কবিদের’ রচনা নিয়েও আলোচনা হত। ক্রমে গড়ে উঠল একটি কবিদল, কবিতায় এল একটি বিশিষ্ট রচনা-রীতি, দান্তে নিজেই তার নাম দিয়েছেন- লা দলচে স্টিলনুওভো বা নতুন রম্য-রীতি। গুইদো গুইনিৎসেল্লি, গুইদো কাভালকান্তি ছাড়াও দান্তের এই কবি-চক্রে অনেক সুকবি ছিলেন, যেমন দান্তের আর এক কবি বন্ধু- চিনো দা পিসতোইআ। নতুন রম্য-রীতির প্রেরণায় দান্তের ভিতা নুওভা রচিত হলেও, দান্তে নিজেকে সম্পূর্ণ এই রীতির মধ্যে আবদ্ধ রাখেননি; ভবিষ্যতে তিনি কী রীতিতে লিখবেন, কী কাব্যদৃষ্টিতে বিশ্বচরাচর দেখবেন তার আভাস ভিতা নুওভা-র মধ্যে পাওয়া যায়। দান্তের কবি প্রতিভার খ্যাতি শুধু আর কবি বন্ধুদের মধ্যেই আবদ্ধ রইল না।
ফ্লরেনসীয় অভিজাত পরিবারের একটি কিশোরীর মাধুর্য মণ্ডিত মুখশ্রী তাঁর মনে গভীর রেখাপাত করে। আনুমানিক ১২৭৫ খ্রি.-তে কোনও একটি সামাজিক প্রীতি সন্মেলনে অন্যান্য কিশোরীদের সঙ্গে তাকে তিনি দেখেন; কিশোরীর বয়স তখন সবে নয়ে পৌঁছেছে, আর দান্তের বয়স নয় পার হতে চলেছে। লোকে তার নাম সংক্ষিপ্ত করে ডাকত ‘বিচে’, দান্তে ভালোবাসতেন ডাকতে তার পুরো নামেই, অর্থাৎ, বেআত্রিচে-যার দর্শন আনন্দময়। এ সব কথা দান্তে নিজেই বলে গেছেন তাঁর ‘ভিতা নুওভা’ নামক কাব্যগ্রন্থে। যতদূর জানা যায় বেআত্রিচে ফোলকো পোরতিনারি-র কন্যা ছিলেন, পরে বিবাহ হয় সিমোনে দেইবারদি-র সঙ্গে। অতি সুন্দরভাবে বোকাচ্চ তাঁর ভিতা দি দান্তে দান্তের জীবনী নামক গ্রন্থে এই প্রীতি সন্মেলনের বর্ণনা ক’রে গেছেন। দান্তের হৃদয়ে সেই প্রথম ভালোবাসার সূত্রপাত। ত্রুবাদুরদের মতো ‘ভালোবাসা’কে কেন্দ্র করে কাব্যরচনা সে-যুগে রেওয়াজ ছিল, দান্তের নিজের কবিদলের মধ্যেও তার বিশেষ উৎকর্ষ দেখা যায়, গুইনিৎসেল্লি-র বিখ্যাত চরণ-‘নম্র হৃদয়ে প্রেম চিরাশ্রিত’, এ ক্ষেত্রে স্মরণ করা যেতে পারে, কিন্তু দান্তের ব্যক্তিত্ব, কাব্যিক বিকাশ প্রায় প্রথম থেকেই স্বতন্ত্র, অন্য কবিদের তুলনায় তাঁর কবিতায় একটা ‘রূপগত পার্থক্য’ধরা যায়। তদানীন্তন রীতি অনুযায়ী বিরহীর অশ্রুপাত থাকলেও চোখের জলে তাঁর কবিতা, এমনকি প্রথম প্রেমের কবিতাও, ভিজে যায়নি। অপর পক্ষে তিনি বেআত্রিচেকে দেখেছেন নম্র সৌজন্যের প্রতিমা হিসাবে, যাঁর গুণাবলি অনুভব করে মানুষ ধন্য, বিশ্বস্ত প্রেমিকের হৃদয়ে যিনি মঙ্গলময়ী। খ্রিস্টীয় ভাষায় তাই দান্তে বেআত্রিচে-কে বলেছেন ‘মিরাকল’, ঈশ্বর প্রেরিত, অলোক-সামান্যা।
এই অনুভবে যখন তাঁর প্রথম যৌবনে হৃদয় পরিপূর্ণ, তখনি তাঁর আশ্চর্যভাবে সন্দেহ হয়েছিল বুঝি এ মর্ত্যধামের জন্য নয়। এবং অনিশ্চিত আশঙ্কার মধ্যেই প্রথম খবর এল বেআত্রিচের পিতার মৃত্যু, পরে ৮ জুন ১২৯০ খ্রি তাঁর প্রিয়তমার। দান্তের বয়স তখন প্রায় পঁচিশ বছর। এই কিছুদিন আগে রাজনৈতিক দল ও নগর সঙ্ঘের তরফে ১২৮৯ খ্রি, তাঁকে কামপালদিনোতে যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে হয়েছিল। জয়ী হয়ে ফ্লরেনসে ফিরে এই দুঃসংবাদ। সারা দেশ তখন বিজয়ীর উল্লাসে নন্দিত, শুধু দান্তের মনে হয়েছিল এই ‘জনাকীর্ণ শহর কী নিঃসঙ্গ’। গভীর বেদনায় অশ্রুসজল দৃষ্টি, বহির্জগত, যতই ঝাপসা হয়ে আসে ততই অন্তরে তিনি প্রত্যক্ষ করেন বেআত্রিচের ঐশী লাবণ্য। এইভাবে এক বছর কেটে যায়। এমন সময় বেআত্রিচের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীর কিছুদিন বাদে কোনও এক অভিজাত রমণীর অনুকম্পা তাঁর হৃদয় স্পর্শ করে। কিন্তু তা অতি ক্ষণস্থায়ী মাত্র; এবং শীঘ্রই তিনি, অনুতপ্ত, আরও গভীর ভাবে তাঁর প্রিয়তমার স্মৃতিতে নিমগ্ন হলেন। যাঁরা তাঁর জীবনী ও কাব্য অনুধাবন করেছেন তাঁরাই জানেন যে, দান্তে অকপটভাবে তাঁর নিজের চ্যুতিবিচ্যুতির কথা স্বীকার করে গেছেন। যেটি লক্ষণীয় সেটি হল, প্রত্যেক চ্যুতিবিচ্যুতির পরই দান্তের আত্মানুসন্ধানের গভীর প্রয়াস। ভিতা নুওভা থেকে কোমমেদিআ পর্যন্ত একাধিক দৃষ্টান্ত মিলবে। এমনকি কোমমেদিআর অনেক জায়গায় যেখানে তিনি বিরুদ্ধ শক্তির কাছে পরাভূত হয়ে মূর্ছিত হয়ে পড়েছেন, সংজ্ঞালাভের পর ঐশী অনুগ্রহে তাঁর সেই অপূর্ব অনুপ্রবিষ্ট দৃষ্টিলাভ সে যুগের তো বটেই অদ্যাবধি কাব্যে তার তুলনা মেলে না।
ক্ষণস্থায়ী বিস্মৃতির পরই একদিকে যেমন বেআত্রিচের স্মৃতি তাঁকে নিবিড়ভাবে আবদ্ধ করল, অপরদিকে দান্তে তার প্রিয়তমার স্মৃতিকে চিরস্থায়ী করবার জন্য এতদিনকার লেখা কবিতাগুলি সংগ্রহ করতে লাগলেন। এই সংগ্রহের ফলে আনুমানিক ১২৯২-১২৯৩ খ্রি একটি ছোট কবিতার বই বার হয়। দান্তে নাম দেন ভিতা নুওভা বা নতুন জীবন, উৎসর্গ করেন কবিবন্ধু গুইদো কাভালকান্তিকে। এই নামকরণের মূলে কবির কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে তা নিয়ে পণ্ডিতেরা নানারকম ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি হল এখন প্রস্তুতির পর্ব শেষ। আরম্ভ হল নতুন জীবন।
ইতিমধ্যে বইখিউস ও কিকেরোর রচনাবলি পাঠে তাঁর চিন্তার চৌহদ্দি আরও অনেক বিস্তৃত হল, জীবনকেই তিনি মনে করলেন একটি ‘দীর্ঘ পাঠ’। দান্তের জন্মের বেশ কিছু আগেই গ্রিক, লাতিন, ফরাসি প্রভাঁসাল সাহিত্যের চর্চা ও অনুবাদ ইতালিতে দেখা যায়, আরিস্ততলের যুক্তি এসে মেশে খ্রিস্টীয় ধর্মতত্বের মধ্যে, যেমন দান্তের অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রভাব সেন্ট টমাস একইনাসের রচনাবলি। একদিকে ‘ফেদে’-বিশ্বাস, অন্যদিকে বিজ্ঞান, বৈজ্ঞানিক যুক্তি, বিশ্বাস ও যুক্তির নিখুঁত সমন্বয় এল ইতালিতে, যদিও ১২১৩ খ্রি প্যারিসে আরিস্ততল পড়ানো নিষিদ্ধ হয়। কবিতায় এই নব্য ইতালীয় দৃষ্টিভঙ্গি, এক ধরনের নতুন মানবিকতার বোধ, তার প্রভাব সে সময়ে স্পষ্টতই দুটি কবির মধ্যে ধরা পড়ে। এক, গুইদো কাভালকান্তি; দুই, দান্তে আলিগিএরি। প্রাচীন পেগান সাহিত্য দর্শনের চর্চা ধর্মমন্দিরেও অব্যাহত হওয়ায় দান্তে তার পুরো সুযোগ নিয়েছিলেন। সান্তা ক্রোচের ফ্র্যানসিসকানদের মধ্যে অনেক ভালো শিক্ষক ছিলেন, দান্তে প্রসঙ্গে একজনের নাম কেউ কেউ উল্লেখ করেন, যেমন মিকেলে বারবি, তিনি হচ্ছেন পিএত্রো জোভান্নি ওলিভি, ১২৮৭ থেকে ১২৮৯ পর্যন্ত তাঁর উল্লেখ পাওয়া যায়। দান্তে বোধ হয় এঁর পড়ানো শুনে থাকবেন। সান্তো স্পিরিতো-র অগাস্টিনিয়ানরাও ধর্ম ও বিজ্ঞানচর্চার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। দান্তের নিজের উক্তি থেকে জানা যায় ১২৯০ পর থেকে তিনি দর্শন শাস্ত্রের চর্চা করতে লাগলেন; দর্শনের মাধুর্যে এতই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, অন্য সব চিন্তা মনে ঠাঁই পায়নি। অধিক পাঠের ফলে তাঁর চোখের দৃষ্টি কিছুটা ক্ষীণ হয়।
এই গভীর পাঠানুরাগের ফল তাঁর কাব্যেও মেলে। ঋজু কারুকার্য-খচিত ‘কানৎসোনি’ আমরা স্মরণ করবার আগেই কানে শুনব —আমোর, কে নেল্লা মেনতে মি রাজোনা; আমোর, কে মুওভি তুআ ভিরতু দাল চিএলো; আল পোকো জ্যরনো এদাল গ্রান চেরকিও দোমব্রা, ইত্যাদি। গভীর পাঠ, অধ্যবসায়ের মধ্যে দর্শন হল অন্যতম প্রেয়সী, একসময় তাকেই তিনি একমাত্র মনে করতেন; অন্যান্য কবিদের তুলনায় কাব্যরচনায় এল অনেক বেশি সংযম, চিত্রকল্পে সমন্বয়, চিন্তায় সংহতি, আধুনিক অর্থে সচেতনতা এবং সে-যুগের পক্ষে সবচেয়ে চমকপ্রদ-দায়িত্ববোধ।
যতই তিনি দর্শনশাস্ত্র চর্চা করুন, গভীর পাঠে অভিনিবিষ্ট হোন, তিনি ছাড়তে পারেননি ‘ লে দলচি রিমেদামোর’ — প্রেমের মধুর চরণ, তাঁর কথামৃত। জীবিত ভদ্রাদের কবিতা উৎসর্গ করে তিনি প্রেমের মহত্বই অনুভব করেছেন। তিনি মনে করতেন, মধ্যযুগীয় ভাব ধারণার বশবর্তী হয়েই মনে করতেন যে, একজন অভিজাত ব্যক্তির কাছে পৌরুষ হবে অপরাজেয় আর ‘শিষ্টাচার’ অনন্য। যাঁরাই তাঁর জীবন ও কাব্য অনুধাবন করেছেন তাঁরাই এই দুটি গুণের বিশেষ অভিব্যক্তি লক্ষ করেছেন। আর শিষ্টাচার আর কাব্য যেন অভিন্ন হৃদয়, এমনকি একথা বলা যেতে পারে, সমগ্রভাবে দেখতে গেলে দান্তের কবিতা শিষ্টাচারের এক মহান প্রকাশ। শিষ্টাচারের মধ্য দিয়ে মানুষ এত গভীরভাবে জীবন ও কাব্য অনুভব করতে পারে, সেকথা দান্তের পূর্বে সিসিলিয়ান বা প্রভাঁসাল কবিদের জানা ছিল না, এমনকি স্তিল নুওভো দলের মধ্যে একমাত্র গুইদো কাভালকান্তিই দান্তের সমকক্ষ ছিলেন বলা যেতে পারে। ক্রমেই দান্তে তাঁর কবি-ভাইদের থেকে অন্যপথে অগ্রসর হতে লাগলেন, অনুভূতির স্বীকৃতি পেল তর্কে, মীমাংসা হল প্রেমে — এমন এক প্রেম যে বিশ্বের তুচ্ছ থেকে মহান আচরণ ধারণ করে আছে।
আমরা এমন কথা মনে করব না যে, দান্তে কেবলমাত্র এ সময়ে পড়াশোনা ও কাব্যচর্চায় মন উৎসর্গ করেছিলেন। ফ্লরেনসের জীবনই ছিল এক প্রবল বাস্তবতা, তার দৈনন্দিন ঘাত-প্রতিঘাত এড়িয়ে দান্তের মতো মরমী কবিও গজদন্তমিনারে বাস করবার কথা ভাবতেও পারতেন না। এ প্রশ্ন অবশ্য ওঠে না, কারণ কিছু কিছু মরমীবাদ থাকলেও দান্তের কবিতা বাস্তবানুরাগী, জীবনের ফরমায়েস ছাড়া তিনি কিছুই প্রায় লেখেননি, প্রতিটি ঘটনাকে তিনি কাব্যমণ্ডিত করেছেন, প্রতিটি কবিতা ঘটনাকে আশ্রয় ক’রে আছে। ফ্লরেনস শহর তথা ইতালিতেই তখন এক বিরাট সামাজিক বিপ্লব ঘটছিল। ফিউডাল সমাজ ভেঙে পড়ছিল, দেখা দিয়েছিল কারুশিল্পী ব্যবসায়ীরা, নতুন বুর্জোয়া সমাজ। ব্যবসা, টাকার লোভে বহু বিদেশিরাও ফ্লরেনসে বাস করতে শুরু করে। রাজনীতির নানা হাওয়া বইতে লাগল। পুরোনো অভিজাত বংশের লোকেরা ব্যবসার ধার ধারত না, কী করে চালাতে হয় তা জানা ছিল না, অবস্থা খারাপ হবার সঙ্গে সঙ্গে নানারকম রাজনীতির আশ্রয়ে, কখনও পোপের সমর্থক হয়ে কখনও সম্রাটের সমর্থক হয়ে নিজেদের বাঁচাবার চেষ্টা করতে লাগল। এদিকে লা জেনতে নুওভা, নতুন ধনী সম্প্রদায় টাকার গরবে উদ্ধত। সমাজে প্রতিপত্তি পাবার জন্য এল দলাদলি। আজ যে রাজা কাল সে ফকির-হামেশাই এ দৃশ্য দেখত পাওয়া গেল। দান্তে নিজেই এর উল্লেখ করেছেন রিক্বি এ মেনদিচি-দনী ও ভিক্ষুক (পারাদিজো, ১৭, ৯০)। সৌভাগ্যবশত দান্তের পিতা পৈত্রিক সম্পত্তি যা পেয়েছিলেন তা অক্ষত রাখতে পেরেছিলেন, সম্ভবত নতুন ব্যবসা করে কিছু বাড়িয়েওছিলেন। ছেলে বাপের পথ বেছে নেননি, এমনকি ফ্রানচেসকো তাঁর সৎ-ভাইও। শোনা যায় পিতা কুসীদজীবী ছিলেন। কি কারণে ঠিক বলা যায় না, দান্তে পিতার নাম একবারও উল্লেখ করেননি, আর একজন সম্বন্ধেও তিনি নীরব, —তাঁর স্ত্রী। সৎ-ভাই ফ্রানচেসকোর কিছু ভূসম্পত্তি ছিল, বিবাহ মোটামুটি ভালো ঘরেই হয়েছিল, লেখাপড়া সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র উৎসাহী ছিলেন না। দান্তে ও ফ্রানচেসকো নিজের নিজের পৈত্রিক সম্পত্তির ওপর নির্ভর করতেন মোটামুটি ভাগে গবাদি পশু পালন ক’রে কিছু বাড়তি রোজগার হত দু’ভাইয়েরই, এই পর্যন্ত। আর সকল সাধারণ ভূস্বামীর মতো আমাদের কবিও মাঝে মাঝেই অভাব অনটনে পড়তেন। দু’একটি নথিপত্র থেকে জানা যায় ত্রয়োদশ শতাব্দীর শেষভাগে দান্তে ও ফ্রানচেসকো উভয়কেই ঋণ করতে হয়। জেম্মা দি মানেত্তো দোনাতি-র সঙ্গে বিবাহ হবার পর কয়েক বছর দান্তে ঘর সংসার করতে সময় পান। বোকাচ্চ মনে করেন দান্তে বিবাহিত জীবনে অসুখী ছিলেন; কিন্তু নিশ্চিতভাবে সে কথা বলা যায় না। দান্তের দুই ছেলে —ইআ কোপো, পিয়েত্রো; কন্যা —আনতোনিয়া (বেআত্রিচে নামে পরিচিত, রাভেন্নার সানতো স্তেফানো মঠে সন্ন্যাসিনী হন) আরও একটি ছেলের নাম পাওয়া যায় ফ্লরেনসের নিকটে লুক্বা শহরের এক মামলার নথিতে —সাক্ষ্য হিসাবে আছে ২১ অক্টোবর, ১৩০৮ খ্রি (দান্তে তখন অবশ্য নির্বাসনে) —ইওহানেস ফিলিউস দান্তিস আলিগিএরি দে ফ্লোরেনতিঅ, অর্থাৎ ফ্লরেনস নিবাসী দান্তের পুত্র ইওহানেস বা জন বা জোভান্নি।
১২৯৪ খ্রি মার্চ মাসে ২য় শার্লের পুত্র — আঁজুর রাজপুত্র শার্ল মারতেল তোসকানা তে আসেন পিতামাতার সঙ্গে দেখা করতে। এই উপলক্ষে ফ্লরেনস শহর তাঁকে এক বিরাট সংবর্ধনা জানায়। দান্তের বয়স তখন ঊনত্রিশ বছর, শার্ল মারতেলের চেয়ে ছ’বছরের বড়। তিনি ইতিমধ্যেই একজন গণ্যমান্য নাগরিক, কবিকুলের নেতা, উৎসাহী, আদর্শবাদী, জনোপকারী, ন্যায়নিষ্ঠ, আত্মবিশ্বাসী — তাঁর সঙ্গে সুদর্শন, সংগীতজ্ঞ, জনপ্রিয় রাজকুমারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব হয় বলে অনুমিত, অন্তত পারাদিজো-র কয়েকটি ছত্র থেকে এই অনুমান অসংগত নয় (পারাদিজো, ৮,৫৫.৫৭)। দান্তে এই তরুণ সুদর্শন রাজকুমারের কাছ থেকে অনেক কিছু আশা করেছিলেন, ভেবেছিলেন ইনিই একদা তাঁর আদর্শ অনুরূপ সম্রাট হবেন, আনবেন ইতালিতে একতা আর তার সঙ্গে শান্তি। কিন্তু রাজকুমার ফ্লরেনসে আসবার একবছর বাদেই প্লেগ রোগে মারা যান। দান্তে যেমন আঘাত পেলেন তেমনি নিরুৎসাহ হয়ে পড়লেন।
যতই তিনি চান মধ্যযুগীয় আদর্শ –যথা, শৌর্য, শিষ্টাচার তাঁর জন্মভূমিতে প্রতিষ্ঠিত হোক, ততই তিনি দেখেন স্বার্থপর দলাদলি, মনুষ্যত্বের চরম অপমান—না ধর্মীয়, না রাজকীয়, না মানবীয় কোনও আদর্শই ফ্লরেনসে তার নাগরিকদের উদ্ধুদ্ধ করেছে। যাঁরা দান্তের সমসাময়িক ঐতিহাসিত ভিল্লানি অথবা পঞ্চদশ-ষোড়শ শতাব্দীর মাকিআভেল্লির ইসতোরিয়ে ফিওরেনতিনে, ফ্লরেনসবাসীর ইতিহাস পড়েছেন তাঁরাই জানেন কী ভাবে সে সময় স্বার্থান্বেষী দলাদলির মধ্যে পড়ে, ব্যক্তিত্বে ব্যক্তিত্বে, পরিবারে পরিবারে, অভিশপ্ত দাঙ্গা হাঙ্গামায় জীবন ধনসম্পত্তি রক্ষা করা দায় হয়ে পড়েছিল। আর দেশজোড়া দরিদ্র উলুখাগড়ার দল একবার পোপের হয়ে একবার সম্রাটের হয়ে প্রাণ দিয়েছে। বলা বাহুল্য স্বদেশপ্রেমিক দান্তের কাছে ফ্লরেনসের এই অধোগতি জীবনযাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠছিল; তাঁর শান্ত অথচ উদ্বেলিত বেদনা সে-সময়কার কয়েকটি কানৎসোনিতে প্রকাশ পেয়েছে, তাছাড়া কবিবন্ধু চিনো দ্য পিসতোইয়া-কে উদ্দেশ্য করে লেখা সনেটে।
Le dolci rime d’amor, ch’1′ solia
Cercar ne’ miei peusieri,
Convien ch’io lasci….
II Convivio
লে দোলচি রিমে দামোর, কি’ সোলিআ
চেরকার নে’ মিয়েই পেনসিয়েরি,
কোনভিয়েন কিয়ো লাশি …
মধুর পদাবলী প্রেম, অভ্যাসেই
খুঁজেছি আমারই চিন্তায়;
বাধ্য কিবা, আমি তাদের ছাড়ি….
Poscia ch’ Amor del tutto m’ha lasciato…
Canzone XIX
পোশ্যা কামোর দেল তুত্তো মা লাশ্যাতো …
যেহেতু আমারে ছাড়ে প্রেম একেবারে …
Oh, messer Cin, Come’l tempo e’ rivolto
A danno nostro e delli nostri diri …
ও মেসসের চিন, কোমেল তেম্পো এ্যা রিভোলতো
আ দান্নো নোসত্রো এ দেল্লি নোসত্রি দিরি …
হায়, প্রিয় চিনো, কালের চাকা ঘোরে
আঘাতে করে দীর্ণ জীবন ও ছন্দ …
চিনো দা পিসতোইআ-কে লেখা সনেট
কিন্তু মহানপ্রাণ দান্তে জীবন-সংগ্রাম থেকে দূরে সরে যাননি। সারা জীবনই তিনি আদর্শ নিয়ে লড়েছেন স্বৈরাচারীদের বিরুদ্ধে, বিশেষ করে পোপের বিরুদ্ধে। ১২৯৩ খ্রি ফ্লরেনসে নতুন ‘অর্ডিনান্স’ জারি হল নগর সঙ্ঘ (Commune) শাসন পরিষদ, ইত্যাদির নির্বাচনে প্রার্থী হিসাবে কেবলমাত্র তাঁরাই দাঁড়াতে পারবেন যাঁদের শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে। এতে অভিজাতবর্গের বিশেষ ক্ষতি হল, তাঁরা পরশ্রমজীবী, রাষ্ট্রপরিচালনায় তাঁদের হাতে থাকা খুবই কঠিন। দান্তে অভিজাত শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত হলেও এই বিধানের স্বপক্ষে ছিলেন। ১১৯৫ খ্রি ৬ জুলাই এই কড়া বিধান একটু আলগা করা হল, বলা হল সম্ভ্রান্ত পরিবারের লোকেরা অন্তত যদি কোনও শিল্পপ্রতিষ্ঠানে নাম লেখান (কাজ করুন বা না করুন) তাহলে তাঁরাও পরিষদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারেন। দান্তে বৈদ্য ও ভেষজকারী সঙ্ঘে নাম লেখান। সে যুগে ওষুধ যাঁরা বেচতেন তাঁরা পুথিও বেচতেন। জ্ঞানী গুণী বিদ্যার্থীরা তাই এসব দোকানে বই পড়বার জন্য ভিড় করতেন; এই সব দোকানগুলি অনেকটা পাঠাগারের কাজও করত। দান্তেও এই সব দোকানে যেতেন পুথি পড়তে বা কিনতে। গল্প আছে যে, একদা তিনি সিয়েনায় গিয়েছিলেন, একটি দরকারি পুঁথি পড়বার জন্য দুপুরবেলা একটি এই ধরনের দোকানে আসেন। পুথিটি তাঁর বাড়িতে নিয়ে আসবার উপায় ছিল না অথচ তাঁকে পড়তেই হবে, তিনি দোকানের সামনে একটি বেঞ্চিতে বসে পড়তে শুরু করেন। কিছুক্ষণ বাদেই দোকানের নিকটেই একটি খোলা জায়গায় একটি উৎসব —ইতালীয় উৎসব, অর্থাৎ যথেষ্ট হই চই আকাশ ফাটানো গান বাজনা নৃত্যসহ, শুরু হয়। পাঠে এতই তন্ময় হয়েছিলেন যে, একটি বারের জন্যও দান্তের চোখ পুথির বাইরে যায়নি। সন্ধ্যা হল, উৎসবও শেষ হল, আর তার সঙ্গে দান্তের পড়াও। যখন তাঁকে উৎসব সম্বন্ধে জিজ্ঞাসা করা হল, তখন তিনি খুব বিস্মিত হলেন, ঠিক বুঝতে পারলেন না তাঁকে কী জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে। গল্পটি অবশ্য বলেছেন জোভান্নি বোকাচ্চ।
এই সংঘে যোগ দেবার ফলে ১লা নভেম্বর ১২৯৫ খ্রি থেকে ৩০ এপ্রিল ১২৯৬ পর্যন্ত বিশেষ জাতীয় পরিষদে পরিচালনার কাজে সুযোগ পান। ১৪ ডিসেম্বর ১২৯৬ খ্রি শহরের বিভিন্ন এলাকা থেকে বিজ্ঞদের ডাকা হয় ‘প্রিঅর’দের নির্বাচন করবার জন্য। এঁদের মধ্যে দান্তে ছিলেন একজন। ‘শতজন পরিষদ’-এও তিনি একজন সভ্য ছিলেন ১২৯৬ মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। এই পরিষদই অর্থ এবং অন্যান্য দরকারি বিষয় পরিচালনা করত। সম্ভবত ১২৯৭ খ্রি আর একটি পরিষদেরও সভ্য ছিলেন।
দুঃখের বিষয় জুলাই ১২৯৮ থেকে ফেব্রুয়ারি ১৩০১ পর্যন্ত এই সব পরিষদের কার্য পরিচালনার কোনও ‘মিনিট’ বই পাওয়া যায় না। কিন্তু দু’একটি নথিপত্র দেখে মনে হয় দান্তে পৌরসংস্থার পরিচালকদের মধ্যেও একজন ছিলেন। ১৩০০ মে মাসে তাকে রাষ্ট্রদূত হিসাবে সান জিনিঞানো শহরে পাঠানো হয়, উদ্দেশ্য —আসন্ন তোসকানা গুএলফো দলের অধিবেশনে যাতে সান জিনিঞানো তাদের অধিকর্তাদের পাঠায়। গুএলফো দলকে আরও দৃঢ় করা প্রয়োজন, বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যে বোঝাপড়া দরকার, তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন একজন রণাধিপতি নির্বাচন করা। ফ্লরেনস বিপদের আশঙ্কা করছিল। দান্তের এই নতুন পদ এমন কিছু সম্মানজনক নয়, কিন্তু লক্ষণীয় যে, কূটনৈতিক কাজে ফ্লরেনস তাঁর ওপর নির্ভর করতে পারত। দান্তের নির্বাসনকালেও আমরা দেখেছি একাধিক রাষ্ট্র দান্তের কূটনৈতিক বুদ্ধির ওপর অপরিসীম আস্থা রেখেছে। সে যাই হোক ফ্লরেনসে গুএলফো দলের প্রধান কর্তব্য হল পোপ অষ্টম বোনিফাৎসো-র বিরুদ্ধে নিজেদের সংঘবদ্ধ হওয়া। সে-সময় ফ্লরেনস কোনও সম্রাটের অধীন ছিল না, সিংহাসন শূন্য, অস্ট্রিয়ার অ্যালবার্ট তখন স্বীকৃত হননি বা সিংহাসনে বসেননি, পোপ বোনিফাৎসো এই সুযোগে তোসকানা নিজের করায়ত্তে আনবার মতলব করলেন। ফ্লরেনস দান্তেকে নিযুক্ত করলেন এই বিপদ ঠেকাবার জন্য। ১৫ জুন থেকে ১৫ অগস্ট গোটা দু’মাস দান্তেকে ক্রমাগত পোপের বিরুদ্ধাচরণ করতে হল, তাঁর অভিসন্ধি মুখোস খুলে ধরলেন—তাঁর তত্ব প্লেনিতুদো পোতেসতাতিস, অর্থাৎ, চার্চের এমনকি ধর্মযাজকেরাও ধর্মচিন্তা ভুলে কোনও না কোনও উপদলে যোগ দেয়। দিনো কোমপাঞি তাঁর ক্রোনিকা নামক গ্রন্থে এর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন। যেহেতু সামনে বিপদ, আর কেউ নয় স্বয়ং পোপের কাছ থেকেই, সম্রাট অনুপস্থিত, শাসনকার্য শহরের প্রজাতন্ত্রের হাতেই —দান্তের পক্ষে সংগ্রামের জন্যই রাজনীতি ছাড়া সম্ভব হল না। যদিও তিনি দু’টি উপদলের একটিকেও সমর্থন করতে পারতেন না, তবু তার মধ্যে অপেক্ষাকৃত যে উপদলটির কিছুটা বিবেক বুদ্ধি আছে বলে ভেবেছিলেন সেই চেরকির দলকেই তিনি সমর্থন করলেন। ভালোআ-র শার্ল-এর সঙ্গে গোপন সহযোগিতায় পোপ বোনিফাৎসো-র আসন্ন এই ঘৃণ্য আচরণের বিরুদ্ধে তাঁর সমস্ত শক্তি দিয়ে দাঁড়ালেন।
আগেই বলেছি নগর পরিষদের ‘মিনিট’ বই ১২৯৮ থেকে ১৩০১ পর্যন্ত পাওয়া যায় না। ১৩০১ অগাস্ট মাসে তাঁর সভ্যপদ উত্তীর্ণ হবার কথা। তারপর অন্য কোনও পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন কিনা বলা কঠিন। তবে আমরা এটা জানতে পারি যে, ১৩০১ এপ্রিলে তিনি সান প্রোকোলো নামক একটি জায়গায় একটি পুরোনো রাস্তাকে নতুনভাবে তৈরি করার কাজে নিযুক্ত হন। কাজটি কোনও সরকারি নয়; কয়েকজন প্রতিবেশী মালিকের সুবিধে হবে বলে তাঁদেরই সহযোগিতায় রাস্তাটি তৈরি করা হয়। নানাবিদ্যায় পারদর্শী তাঁর বৈষয়িক ও জাগতিক বুদ্ধির ওপরও লোকের আস্থা ছিল। সেই বছরেই ১৫ মার্চ কয়েকজন বিজ্ঞ লোককে (সাভি) ডাকা হয় একটি গুরুতর বিষয়ে তাঁদের মত নেবার জন্য। দান্তে তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন। আলোচনার বিষয় ছিল আজুঁর রাজা শার্লকে সিসিলি পুনরুদ্ধারের কাজে অর্থসাহায্য দেওয়া হবে কিনা। দান্তে অর্থসাহায্যের বিরুদ্ধে মত দেন। সেই বছরেই ১৪ এপ্রিল প্রিঅর-দের কী ভাবে নির্বাচন করা যায় তার জন্য দান্তেকে পুনরায় ডাকা হয়। পোপ তাঁর প্রতিনিধি মারফত ইচ্ছা প্রকাশ করেন যে, ফ্লরেনসের দুটি দলেরই নিজস্ব মনোনীত ব্যক্তিদের নিয়েই অধ্যক্ষ গঠিত হোক। কিন্তু শহরের মঙ্গলের জন্য দান্তে ঠিক করলেন যারা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয় অথবা অসাধু সন্দেহভাজন কিংবা পোপের নীতি অনুসরণ করে তাদের প্রার্থী হিসাবে গণ্য করা হবে না। সারা জীবন, এমনকি দুঃখময় দীর্ঘ নির্বাসনকালেও, তিনি তাঁর জন্মভূমির মঙ্গলকামনা করে এসেছেন এবং তার মঙ্গলের জন্য কী করা উচিত সে-বিষয়ে নির্ভীক মতামত প্রকাশ করতে কখনও দ্বিধা বোধ করেননি। ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বর তিনি আবার ‘শতজন পরিষদ’-এর সভ্য হন। তিনি সেখানে সভ্য থাকাকালীন দু’বার কথা ওঠে — পোপকে একশোটি সৈন্য দিয়ে সাহায্য করা হবে কিনা। পোপের এই সৈন্যদলের প্রয়োজন—তোসকানার প্রান্তে আলদো ব্রানদেসকি নামক জায়গায় অভিযান চালাবার জন্য। দু’বারই দান্তে এ সাহায্যদানের বিরুদ্ধে মত দেন। ১৩ সেপ্টেম্বর একটি যুক্ত পরিষদ ডাকা হয়, সেখানে গণ্যমান্য ব্যক্তিরাও উপস্থিত থাকেন। এই ধরনের যুক্ত পরিষদের সভা তখনই ডাকা হত যখনি দেশে বিপদ দেখা দিত। দান্তে এই সভায় দু’টি মূল বিষয়ে বক্তৃতা করেন। একটি হচ্ছে, ন্যায় বিচারের কথা মনে রেখে যে-সব ‘বিধান’ জারি করা হয়েছে, সে বিষয়ে; অপরটি, দেশের গণতান্ত্রিক আইন সম্পর্কে। সভার কার্য-বিবরণীর কোনও লিপিবদ্ধ নথি না পাওয়াতে দান্তের মতামত জানা যায় না। তবে আজ অনুমান করা শক্ত নয় ন্যায়নিষ্ঠ দেশপ্রেমিক দান্তে কী মতামত দিয়েছিলেন।
১৩০১ অক্টোবর মাসে ভালোআ-র শার্ল ফ্লরেনস অভিমুখে যাত্রা করেন। নগর সঙ্ঘ ঠিক করে পোপ বোনিফাৎসো-র কাছে একটি দৌত্য পাঠানো হোক, যদি তাতে কৃষ্ণ দলের কুমতলব কিছুটা প্রতিহত করা যায়। তিনজনকে নিয়ে এই দৌত্য গঠিত হয়। তাঁরা হচ্ছেন, মাজো দি রুজ্জিএরিনো; কোরাৎসা দি সিঞা এবং দান্তে আলিগিএরি। এর ফলে দান্তের স্বচক্ষে দেখবার সৌভাগ্য হয় পোপের রাজকীয় দরবার। দিনো কোমপাঞি তাঁর ক্রোনিকা নামক গ্রন্থে এই দৌত্যের বিবরণী দিয়েছেন
যখন দূতেরা রোমে পৌঁছলেন, পোপ তাঁদের নিজের ঘরে একলা দেখা করলেন, কানে কানে বললেন,
তোমরা কেন এত অবাধ্য? আমার বশ্যতা স্বীকার কর, আমি সত্যই বলছি তোমাদের শান্তি ফিরিয়ে আনা ছাড়া আমার কোনও উদ্দেশ্য নেই। তোমাদের মধ্যে দু’জন ফিরে যাও, গিয়ে তাদের বল তারা যদি আমার ইচ্ছা পূর্ণ করে তাহলে তারা আমার আর্শীবাদ-ভাজন হবে।
ধূর্ত পোপ অতি কৌশলে দু’জনকে ফিরে যেতে বললেন, দান্তেকে নিজের কাছে আটকে রাখলেন, জানতেন তাঁর সবচেয়ে ভয় দান্তের কাছ থেকেই। সেই বিপদের দিনে দান্তে ফ্লরেনসে থাকলে ভীরু চেরকি-র দল অন্তত বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারত না।
যথাসময়ে পূর্বকল্পিত ব্যবস্থা অনুযায়ী ভালোআ-র শার্ল তোসকানা-তে এলেন। ভিএরি দে’ চেরকী পাছে তাঁর ধনসম্পত্তি লগ্নী খোয়া যায় সেই ভয়ে শার্লকে কোনও বাধাই দিলেন না। শার্ল বিনা বাধায় ফ্লরেনসে পদার্পণ করেন। মনে হয় শার্লের সাহায্যেই কোরসো শহরে ফিরে এসে শ্বেতদলকে ধ্বংস করবার জন্য প্রস্তুত হলেন। দান্তের বিধান অনুযায়ী এতদিন তিনি নির্বাসিত ছিলেন, তাই প্রথমেই দান্তের বাড়ি লুঠ করা হয়; সেই লুণ্ঠিত বাড়ি দেখবার সৌভাগ্য আর দান্তের হয়নি, কারণ তিনি আর স্বদেশে ফিরে আসতে পারেননি। পোপের কাছে আটকে থাকার পর তিনি সিয়েনা শহরে গিয়েছিলেন; সেখানে দলের শোচনীয় পরাজয়ের খবর শোনেন। ১৩০২-এর ২৭ জানুয়ারি তিনি তাঁর প্রথম দণ্ডাজ্ঞা শুনলেন। দান্তে ও আরও চারজনের পাঁচ হাজার ফ্লোরিন জরিমানা, দু’বছরের জন্য নির্বাসন। তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ অবৈধভাবে নিজ দলের স্বার্থে দেশের ও পৌর প্রতিষ্ঠানের ধনসম্পত্তি আত্মসাৎ, গচ্ছিত তহবিল তছরুফ, পোপ ও ভালোআ-র শার্লের বিরুদ্ধতা, পিসতোইআ-দের সঙ্গে ষড়যন্ত্র (যার ফলে পোপের ভক্ত কৃষ্ণদলকে কোণঠাসা হতে হয়) ইত্যাদি। যেহেতু দান্তে যথাসময়ে ফিরে এসে জরিমানা দেননি বা নিজের দোষালনের বিন্দুমাত্র চেষ্টাও করেননি, অতএব ১০ মার্চ দ্বিতীয় দণ্ডাজ্ঞা তাঁর এবং আরও চোদ্দোজনের ওপর জারি হল এই মর্মে যদি দান্তে (এবং অবশ্য আরও চোদ্দোজনও) কখনও নগর সঙ্ঘের চৌহদ্দির মধ্যে আসে এবং ধরা পড়ে তাহলে তাকে ‘জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হবে’—ইগনে কমবুরাতুর সিক কুত্তদ মরিআতুর। ইতালিতে এইসব নথিপত্র বর্তমান ও ভাবীকালের জন্য সযত্নে রাখা হয়েছে।
নির্বাসনের ফলে ফ্লরেন্সীয় নাগরিক বিশ্বের নাগরিক হলেন। ১৩০৩-এ আমরা তাঁকে দেখতে পাই স্কারপেত্তা ওরদেলাফফির কর্মসচিব হিসাবে। সেই বছরেই ভেরোনায় তিনি স্কালিজার পরিবারের তরফে দৌত্যকার্য করেন। ১৩০৪-এ শ্বেতদলের বারোজন সভ্যের একজন সভ্য হয়ে পার্টির কাজকর্ম করেন। কাজ প্রধানত পত্রাদি খসড়া করা কার্ডিনাল দা প্রাতো-র জন্য। সে সময়ে দা প্রাতোর মধ্যস্থতায় ফ্লরেনস ও নির্বাসিত ব্যক্তিদের মধ্যে শান্তি ফিরিয়ে আনবার জন্য কথাবার্তা চলছিল। এতদিনে দান্তে অন্যান্য নির্বাসিত সহকর্মীদের সঙ্গে মিলেমিশে কাজকর্ম করছিলেন (প্রধানত রাজনৈতিক কাজ তা বলাই বাহুল্য) কিন্তু শীঘ্রই তিনি ‘লা কোমপাইঞা মালভাজা এ স্কেমপা’-এই দুষ্ট ও কুসঙ্গ পরিত্যাগ করলেন এবং কেবলমাত্র নিজেকে নিয়েই একটি দল তৈরি করলেন। দান্তের নিজের কথা থেকে এবং ওত্তিমো কোমমেনতো-র গ্রন্থকার যে সব উক্তি করেছেন তাতে মনে হয় দান্তের রাজনৈতিক দল দান্তের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ ছিল। আমরা এই অভিযোগ বা এর সত্যাসত্য সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানি না; তবে দান্তের প্রকৃতি ও চরিত্র যতটুকু জানা যায় তাতে স্বার্থপর সুযোগবাদী বিবদমান উপদলের দলাদলিতে তিনি টলবেন এমন আশা করা যায় না। তিনি নিজে নির্ভীক মতামতে অভ্যস্ত ছিলেন; অসাধারণ বুদ্ধি ও ব্যক্তিত্ব ছিল বলেই কৃষ্ণদল ও শ্বেতদল উভয় দলই হয় নিজেদের স্বার্থে তাঁকে দলে টানবার চেষ্টা করত, নয় তো তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনত। তিনি দু’টি উপদলের স্বরূপ ভালোই জানতেন—ব্রুনেত্তোর মারফৎ তিনি তার স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছেন।
প্রথমে ভেরোনার জমিদারবর্গের আশ্রয় গ্রহণ করলেন; কিন্তু বেশিদিন সে শহরে থাকেননি। নির্বাসনের তাপে জীবন ঝলসে গেলেও তিনি অবিচলিত ছিলেন। যে স্বদেশপ্রেমিক ‘আরনো-র জল পান করেছেন দাঁত ওঠবার আগেই’ তিনিই নির্বাসনকালে লিখতে লিখতে একজায়গায় বলেছেন —‘তাঁর কাছে এই দুনিয়াই হচ্ছে পিতৃভূমি (পাত্রিঅ) যেমন সমুদ্র মাছের কাছে’। বিলাপ করে বলেছেন —‘তাকে যাত্রী, প্রায় ভিক্ষুকের মতো দেশের সর্বত্র ঘুরতে হচ্ছে যতদূর ইতালিআন ভাষা উচ্চারিত’– যেন, ‘একটি ডিঙি (লেঞো) যার পাল নেই হাল নেই, ঠেলে নিচ্ছে বন্দরে বন্দরে, নদীর মোহানায়, তীরে তীরে শুকনো হাওয়ায় শুকনো দারিদ্র্যের নিশ্বাসে’। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে ওঠেন, ‘বিচার করব বুদ্ধি যুক্তির দ্বারা, হৃদয়াবেগে নয়’,—দোল্লিয়া মি রেকা নেল্ল কোর আর দিরে —দুঃখ আমার হৃদয়ে সাহস আনে। এই তাঁর চরিত্র, তাঁর নীতি, তাঁর সারাজীবনের আদর্শ—যৌবনে প্রেমে, রাজনীতিতে, নির্বাসনে একদিনের জন্যও এই আদর্শের ব্যত্যয় হয়নি।
নির্বাসিত সহকর্মীদের ত্যাগ করবার পর তাঁর অবস্থা যা দাঁড়ালো তা অনেকটা অমাত্যর মতো। এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়, এক শহর থেকে আর শহরে, দয়ালু ভূস্বামীদের দোরে দোরে আশ্রয়ের জন্য। সুখের বিষয় মধ্যযুগীয় ঐতিহ্যের জন্যই সে-সময় এমন অনেক সম্ভ্রান্ত পরিবার ছিলেন যাঁরা জ্ঞানী গুণীদের সমাদর করতেন, যদিও ওই একই সঙ্গে মল্লযোদ্ধা, ভাঁড় ইত্যাদির সমাদরও কিছু কম হত না। ফলে দান্তে সম্ভ্রান্ত পরিবারের এই ‘উদারতায়’ নিজেকে অনেক সময় বিব্রত বোধ করলেও নানা পাঁচমিশেলি অমাত্যবর্গের মধ্যে তাঁকে বাধ্য হয়ে দিন কাটাতে হয়েছে। ‘তুমি বুঝবে অন্যের রুটিতে নুনের স্বাদ কেমন’-এ কথা দান্তে নিজেই বলেছেন বৃদ্ধ প্রপিতামহ কাচ্চাগুইদার ভবিষ্যৎবাণী উল্লেখ করে। রাজন্যবর্গ ‘তারা (বংশমর্যাদার) গৌরব পালন করতেন বীরজনোচিত ভাবে নয়, স্থূল ব্যক্তিদের মতো —কুই নন হেরইকো মোরে সেদ প্লেবেও সেকুউনতুর সুপেরবিআম—-এই ধরনের শ্লেষাত্মক উক্তি তাঁর মন নিপীড়িত হত বলেই উচ্চারিত। ভূস্বামীদের অমাত্য হিসাবে বাস করলেও তাঁর আচরণে সাধারণ অমাত্যর মতো বশংবদভাব কোনও সময়ই প্রকাশ পেত না। নির্ভীক মতামত, নির্ভীক আচরণ, মুখের ওপর জবাব দিতে তিনি কসুর করেননি। এমনকি তাঁর শ্রেষ্ঠ দরদী বন্ধুপ্রতিম গুণী কানগ্রান্দেকে শ্লেষ ঠাট্টার উত্তরে কথা শোনাতে পেছ-পা হননি। নির্বাসনকালে এই সব ভূস্বামীদের সঙ্গে তাঁর ছোটখাটো সংঘাত নিয়ে বহু গল্প প্রচলিত আছে। দান্তে যেমন স্বভাবতই বিনয়ী ছিলেন, তেমনি ছিলেন গর্বিত।
যতই দিন যায় ততই তাঁর দেশে ফিরে যাবার বাসনা প্রবল হয়। তাঁর সেই আদর্শ–মধ্যযুগীয় শিষ্টাচার, শৌর্য, প্রেম, রাষ্ট্র ও ধর্মের ঐক্য, সবই যেন নির্মূল হল। ১৩০৩-এর একটি বিধান অনুযায়ী বয়স চোদ্দবছর হলেই দান্তের দু’টি ছেলেরও দান্তের ভাগ্য অনুসরণ করতে বাধ্য, অর্থাৎ নির্বাসন; এই কথা মনে হলে তিনি আরও বিহ্বল হয়ে পড়তেন। তিনি যে নিরপরাধ, কতখানি নিরপরাধ তা তিনি বারবার ব্যক্ত করেছেন বহু চিঠিপত্র লিখে। প্রায় নতজানু হয়ে প্রার্থনা করেছেন তাঁরই স্বদেশবাসীর কাছে তাঁকে যেন ফিরে যেতে দেওয়া হয় কোনও অপমানজনক শর্তে নয় —নিজ মর্যাদায়। সরকারের কাছে, ব্যক্তি বিশেষের কাছে, স্বদেশবাসীকে লক্ষ্য করে তিনি অনেক চিঠি লেখেন, তার মধ্যে একটি খুব বড় চিঠি, আরম্ভ —পপ্যুলে মেএ, কুইদ ফেকি তিবি? হে আমার স্বদেশবাসী আমি তোমাদের কী করেছি। চিঠি ছাড়া ফ্লরেনসকে তিনি একটি কানৎসোনে, গীতিকবিতাও পাঠান, তার শেষ পঙক্তি — কেল পেরদোনারে এ্য বেল ভিনচের দি গুএররা, ক্ষমার মধ্যেই নিহিত শ্রেষ্ঠ সুন্দর জয়। যদি তাঁর স্বদেশবাসী তাঁকে ক্ষমা করে থাকে তাহলে আমরা শুধু এইটুকুই বলতে পারি তারা জানত না দান্তে কী ধরনের মানুষ ছিলেন—কে নোন সান কোয়েল কে সোনো। তাঁর একমাত্র অপরাধ তিনি ফ্লরেনসকে ভালোবেসেছিলেন, শান্তি চেয়েছিলেন, সেই জন্যই কি তাঁকে নির্বাসিত হতে হয়? তাঁর এই আবেগ, বেদনা, অভিমান একটি কবিতায় বিশেষভাবে ব্যক্ত যার প্রথম চরণ — ত্রে দোন্নে ইনতোরনো আল কোর মি সন ভেনুতে —আমার হৃদয় ঘিরে আসে ত্রিভদ্রা রমণী।
‘স্বদেশবাসীরা’ তাঁর বিরুদ্ধে অনেকগুলি অভিযোগ এনেছিল, তার মধ্যে সবচেয়ে বড় অভিযোগ পোপের বিরুদ্ধতা। তাছাড়া স্বয়ং পোদেস্তা অর্থাৎ মেয়র অর্থাৎ আদালত যখন তাঁকে অভিযুক্ত করে দণ্ডদান করেছেন তখন তো তিনি নিশ্চিতভাবে দোষী। তিনি গুএলফো রাজনৈতিক দলের আদর্শ কোনো দিন মেনে চলেননি এও একটি অন্যতম প্রধান অভিযোগ। বহু চিঠিপত্রে তিনি এই সব অভিযোগের বিরুদ্ধে, নিজের কর্ম, আচরণ ও মতবাদের সপক্ষে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চেষ্টা করেন; কিন্তু স্বদেশবাসীকে বোঝাতে ব্যর্থ হন। তখন তাঁর মনে হয় শুধু চিঠিপত্রে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবেন না, তাঁর চিন্তাকে, তাঁর আদর্শকে তিনি রূপ দেবেন বই লিখে। তিনি লিখবেন। তিনি এখন নির্বাসিত, রাজনৈতিক দল থেকে বিচ্যুত, চরম দারিদ্র লাঞ্ছিত, তিনি তাঁর সমস্ত অভিজ্ঞতা —তা সে ব্যক্তিগত, রাজনৈতিক বা দার্শনিক হোক তাকে একটি তত্বে রূপ দেবেন। তাঁর মনে পড়ে গেল ভিতা নুওভার দিনগুলি, কী করে দিনের পর দিন প্রেমের অভিজ্ঞতাকে তিনি ‘যুক্তির’ মধ্যে বুঝতে চেষ্টা করেছেন, (যার জন্যই ‘রাজোনি’-র সৃষ্টি) যে-যুক্তির অবশ্যম্ভাবী পরিণাম একটি ‘বিশ্বাসে’। এখনও সেই যুক্তির আশ্রয়েই তিনি লিখবেন যাতে তাঁর ‘বিশ্বাস’ অবুঝ স্বদেশবাসীর হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। আনুমানিক ১৩০৪ থেকে ১৩০৭-এর মধ্যে তিনি দু’টি প্রবন্ধের বই লেখেন, কিন্তু দুটি বই-ই অসমাপ্ত থেকে যায়। একটি, দে ভুলগারি এলোকুএনতিআ, অর্থাৎ মাতৃভাষার লেখা সম্বন্ধে; অপরটি, ইল কনভিভিও, মুখ্যত নিজের কবিতার ব্যাখ্যা তথা দার্শনিক বিশ্ববীক্ষা।
কিন্তু তিনি যেন তৃপ্ত হতে পারছিলেন না। যৌবনের সেই আদর্শ স্বভাবতই নির্বাসনকালে তাঁকে নতুনভাবে উদ্বুদ্ধ করছিল —তিনি মানুষের দুঃখকে দূর করবার জন্যই রাজনীতির ব্যবহারিক প্রয়োগের কথা আরও বিশেষভাবে চিন্তা করতে লাগলেন। তিনি দেখলেন পৃথিবীতে ন্যায়বিচার নেই, শান্তি নেই, আইন কানুন আছে (ইতালিতে সে সময় রোমক আইন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত) কিন্তু এমন কেউ নেই যিনি তার প্রয়োগ করেন। চারিদিকে লোভ হিংসা জুলুম। নির্বাসনকালে ইতালির যেখানেই গেছেন সেখানেই তিনি তাঁরই মতো আরও অনেক দুঃখী নির্বাসিত লোক দেখতে পেয়েছেন; কোথাও কোনও শৃঙ্খলা নেই, —দলাদলি, অত্যাচার, জবরদস্তিই হচ্ছে সাধারণ নিয়ম। এর কারণ তাঁর কাছে ক্রমশই স্পষ্ট হয়ে উঠল। নির্বাসনকালে ১৩০৯ নাগাদ তাঁর রচিত প্রবন্ধে দে মনারকিআ (একচ্ছত্র শাসন সম্বন্ধে) এ বিষয়ে অনেক কথা আছে। দান্তের মত আদি পাপের ফলে মানুষের ধর্মীয় ও রাষ্ট্রীয় দু’টি প্রতিষ্ঠানের সমান প্রয়োজন (del mondo e di Deo. পুরগাতোরিও, ১৬,১০৮) এবং এটা ঈশ্বরের অভিপ্রায় যে, ধর্ম ও রাষ্ট্র আলাদা থেকে নিজের নিজের কাজ করে যাবে। রাষ্ট্র মানুষকে সাহায্য করবে পৃথিবীর পথে তার যাত্রা সুগম করতে; ধর্ম নিয়ে যাবে মানুষকে ঐশীপথে। এই জগতের জন্য প্রয়োজন ন্যায়নিষ্ঠ সম্রাট যিনি দায়ী থাকবেন ঈশ্বরের কাছে, পোপের কাছে নয়। আধ্যাত্মিক জগতে নিয়ে যাবার জন্য থাকবেন পোপ যিনি সম্রাটের কাছে দায়ী থাকবেন না, ঈশ্বরের অভিপ্রায় অনুযায়ী তিনি বিধান করবেন। রাষ্ট্র ও ধর্মের মিলিত সহযোগেই মানুষের কল্যাণ সম্ভব। দান্তের কাছে এ বিষয়ে শুধু বাইবেল নয় (দান্তের চিঠি ৫ ; সেন্ট জন, ১৯, ১০-১১) ইতিহাসেরও একটি নজির আছে। একদা কনস্তানতিনুস-এর মহানুভবতা এবং দূরদর্শিতার জন্য প্রাচ্যখণ্ডে রাষ্ট্র ও ধর্মের ঐক্য সম্ভব হয়েছিল এবং তার প্রভাব সমস্ত খ্রিস্টান জগতে সুদূরপ্রসারিত, মানুষের মনে নতুন আশা জাগিয়ে তুলেছিল — সেন্ট জনের মধ্যে খ্রিস্টের বাণী সার্থক মনে করেছিল; কিন্তু প্রতীচ্যখণ্ডে এই আদর্শ টিকল না ইতিহাস পাঠক মাত্রই তা জানেন। সেখানে রাষ্ট্র ও ধর্ম তথা সম্রাট ও পোপের বিবাদ সমাজ ও মানুষকে বিষিয়ে তুলেছিল। একদিকে শৃঙ্খলার জন্য সম্রাটের সংগ্রাম, অন্য দিকে মর ও অমর জগতের একক আধিপত্যের জন্য পোপের সংগ্রাম; এমনকি মনুষ্যত্বহীন, ধর্মহীন নির্মম রক্তাক্ত যুদ্ধের মধ্য দিয়েই প্রতীচ্যখণ্ডে সম্রাট ও পোপ স্ব স্ব প্রভাব বিস্তারে প্রয়াসী। দান্তের সময়ে ক্ষমতালোভী পোপ বোনিফাৎসো রাষ্ট্র ও ধর্ম দুই-ই সম্পূর্ণভাবে নিজের করায়ত্তে আনতে চেষ্টা করেন। এরই মূলে ইতালির চরম দুর্দশা দান্তে তাই মনে করতেন। সম্রাট ও পোপের দ্বন্দ্ব হওয়াতে যেমন সম্রাট ও পোপ উভয়েই পাপাচার থেকে বিরত হননি, তেমনি এঁদের উভয়ের সমর্থকরা অনাবিল পাপকার্যে বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হয়নি। অর্থাৎ রাষ্ট্র সমাজ ধর্মীয় পীঠস্থানেও উপর থেকে নীচে পর্যন্ত পাপের স্রোত বয়ে চলেছিল। এই ভয়াবহ জীবনের গতিকে প্রতিহত করতে হলে দান্তে কী করবেন? সামান্য চিঠি, দে ভুলগারি এলকুএনতিআ, কনভিভিও এমনকি সবচেয়ে পরিণত প্রবন্ধ দে মনারকিআ এই জীবনকে সম্পূর্ণ উদঘাটিত করে ফ্লরেনসবাসীর চিত্তশুদ্ধি আনতে পারবে না। অতি পুরোনো তাঁর সেই ভিতা নুওভা-র দিনগুলি আবার মনে পড়ে গেল –জীবনের প্রথম সেই কঠিন সমস্যাকে তিনি যুক্তির কাঠামোয়, বিশ্বাসের ভিত্তিতে, একটি পরম দৃষ্টির আলোয় দেখেছিলেন, থাকে কাব্যমণ্ডিত করেছিলেন। তিনি ঠিক করলেন শিল্পের আশ্রয় নেবেন— যে-শিল্প তার অনন্য ঔষধিবলে চিত্তশুদ্ধি আনবে। যে-বিশ্বদৃষ্টির বশে দান্তের বিখ্যাত রচনা সম্ভব হয়েছিল, সেই রচনাকে তিনি নাম দিয়েছিলেন কোমমেদিআ, কারণ তার লেখা সরল এবং তদানীন্তন আলংকারিক অর্থে রচনাটি আরম্ভ দুঃখে, শেষ আনন্দে। পরবর্তীকালে লোকে এই Sacrato poema-র নাম দিয়েছিল লা দিভিনা কোমমেদিআ–La Divina Commedia.
নির্বাসিত সঙ্গীদের ত্যাগ করার পর দান্তে কোথায় সবচেয়ে বেশিদিন কাটান তা সঠিক জানা যায় না। একটি উক্তি থেকে (পুরগাতোরিও, ৮,১২৪-১৬২) জানা যায় তিনি মালাসপিনা পরিবারের মধ্যে ছিলেন। মালাসপিনা-দের সঙ্গে লুনি-র বিশপের বিবাদ ছিল। দান্তের মধ্যস্থতায় এ বিবাদ বিসম্বাদ থামে। বোকাচ্চ-র একটি লাতিন কবিতা থেকে একটা মত এখনও চলিত আছে যে, তিনি আলপস পার হয়ে প্যারিস গিয়েছিলেন সম্ভবত ধর্ম ও দর্শনচর্চার আকর্ষণে, এমনকি অক্সফোর্ড পর্যন্ত; কিন্তু এই কয়েকটি পঙক্তি ছাড়া আর কোনও প্রমাণ পাওয়া যায় না।
১৩১০ সপ্তম হেনরি ইতালিতে পদার্পণ করবেন এই মর্মে সারা ইতালিতে ঘোষণা করা হয়। এই খবরে দান্তে খুব আশান্বিত হন; সম্রাটের অধীর প্রতিক্ষায় থাকেন। তিনি এই সম্রাটের উপর আস্থা রাখতেন, পোপ ও সম্রাটের মধ্যে বোঝাপড়া হবে, ইতালিতে, বিশেষ করে ফ্লরেনসে শান্তি ফিরে আসবে এই বিশ্বাস তাঁর ছিল। তার ওপর যখন পোপ স্বয়ং হেনরিকে সমর্থন করেন তখন সম্রাট নিশ্চয়ই বিনা বাধায় ফ্লরেনসে প্রতিষ্ঠিত হবেন এই আশা তাঁর মনে আরও দৃঢ় হল। বাস্তবিক পক্ষে হেনরির এমন কতকগুলি গুণ ছিল যাতে এই আশাকরা দান্তের অন্যায় হয়নি। এমন একজন সম্রাটের অপেক্ষায় তিনি কতদিন অপেক্ষা করেছেন! তিনি আর থাকতে পারলেন না, ইতালির রাজা, রাজকুমার, রাজন্যবর্গ, নাগরিকদের উদ্দেশ করে একখানি চিঠি লেখেন।
দুঃখিনী ইতালি তুই জয়ধ্বনি কর … (পাঁচ নম্বর চিঠি)
ধীরে ধীরেই আমরা লক্ষ করছি কী করে দান্তে একটি বিশ্ব-রাজ্যের কল্পনা করেছেন—যার অধিপতি হবেন একজন ন্যায়নিষ্ঠ সম্রাট যিনি সময়োপযোগী ন্যায়শাসনের মধ্য দিয়ে পৃথিবীতে শান্তি আনবেন। বলা বাহুল্য হেনরি-র মধ্যে আদর্শ সম্রাটের প্রতিমা দেখতে পেয়েছিলেন বলেই উপরোক্ত বিখ্যাত পত্রটি তাঁর পক্ষে লেখা সম্ভব হয়েছিল। যে-মুহূর্তে হেনরি ইতালির চৌহদ্দির মধ্যে পৌঁছলেন, দান্তে কালবিলম্ব না করে তাঁকে সম্বর্ধনা জানালেন একটি চিঠিতে (সাত নম্বর চিঠি)। উপরোক্ত চিঠির মতো এই চিঠিতেও আমরা দেখতে পাই তিনি যা বিশ্বাস করতেন তা শুধু অকপটে প্রকাশ করতেন তাই নয়, তাঁর সমস্ত সত্তা দিয়ে তা সমর্থন করতেন। সম্রাট হেনরিকে তিনি একজন আদর্শ ন্যায়নিষ্ঠ সম্রাট যিনি ঈশ্বরের অভিপ্রায় অনুযায়ী শাসন করবেন, এই ভাবেই গ্রহণ করেছিলেন। তাই হেনরিকে মনে করেছিলেন ঈশ্বর-প্রেরিত—তাঁর ‘পদস্পর্শে ও ওষ্ঠদ্বয়ের প্রার্থনায় নিজের ঋণ শোধ করতে চেয়েছিলেন’ (এপিসতোলা ৭,৪৩ পঙক্তি)।
এদিকে ফ্লরেনসের নাগরিকরা বিদেশি সম্রাটের আধিপত্য স্বীকার করতে চাইল না। সদ্য ফিউডাল সমাজ ভেঙে গিয়ে বুর্জোয়া গণতন্ত্রের স্বাদ তারা পেয়েছে—নগরে দলাদলি থাকলেও, শান্তির অভাব ঘটলেও, ইতিহাসের অমোঘ বিধান অনুযায়ী স্বার্থাণ্বেষী শক্তিশালী নতুন ব্যবসায়ীরা (লা জেনতে নুওভা) টাকা ছড়িয়ে নাগরিকদের হাত করলে, সম্রাট হেনরির বিরুদ্ধে দাঁড়াল। ফ্লরেনসের সঙ্গে দান্তের আবার এক নতুন সংঘাত উপস্থিত হল। উত্তর ইতালিতে হেনরি বিলম্ব করছিলেন — সেখানেও অনেক বাধা, বাধা দূর করতে হবে। দান্তের যেন ধৈর্যচ্যুতি ঘটছিল —তিনি হেনরিকে জানালেন, আসল বিপদ উত্তর ইতালিতে নয়, আরনো নদীর ধারে, অর্থাৎ ফ্লরেনসে। ফ্লরেনসে দান্তের এই ব্যবহারের প্রতিশোধ নিলে ১৩১১-তে যে-সব নির্বাসিত ব্যক্তির অপরাধ মার্জনা করা হয়েছিল সেই তালিকার মধ্যে দান্তের নাম বাদ দেওয়া হল। এ কাজটির জন্য বিশেষ ভাবে দায়ী ছিল ‘ধূর্ত উকিল’ বালদো দ্যগুল্লিওনে, সে-সময়ে সেই ছিল প্রিওর। একাধিক বার এই লোকটির উল্লেখ করেছেন দান্তে তাঁর কোমমেদিআ-তে —বলা বাহুল্য তার স্বরূপটি উদঘাটিত করেই।
কিন্তু হেনরি যখন দান্তের উপদেশ অনুযায়ী ফ্লরেনস আক্রমণ করতে উদ্যত হলেন, তখন এই আক্রমণের ফলে ফ্লরেনসের কী দুরবস্থা হবে, কত ক্ষয় ক্ষতি , কত প্রাণহানি হবে, সেসব ভেবে তিনি ভেঙে পড়লেন। যতই বিরোধ থাক তিনি ফ্লরেনসকে ভালোবাসতেন—তিনি শেষ পর্যন্ত হেনরির সঙ্গে যোগ দিতে পারলেন না। কোনও নথিপত্র পাওয়া যা না যে, তিনি চিঠিপত্র মারফত উৎসাহ দেওয়া ছাড়া হেনরিকে আর কোনও ভাবে সাহায্য করেছেন কি না। তাঁর চিঠিতে যে ঠিকানা উল্লেখ ছিল তাতে মনে হয় সে-সময় তিনি বাত্তিফোল্লে পরিবারের আতিথেয়তা গ্রহণ করে কাজেনতিনো-তে বাস করছিলেন।সম্ভবত হেনরির আগমন কালেই, নিজেকে সক্রিয়ভাবে ফ্লরেনসের বিরুদ্ধে যোগ দিতে ব্যর্থ হওয়াতে তিনি বিশ্বসাম্রাজ্য তথা খ্রিস্টিয় সাম্যবাদী বিশ্বরাজ্যের স্বপক্ষে দে মনারকিআ নামক গ্রন্থটি রচনা করেন।
১৩১২ শরৎকালে হেনরি ফ্লরেনস আক্রমণ করেন, কিন্তু নগর অধিকার করতে ব্যর্থ হন। তিনি পিজায় ফিরে যান এবং প্রায় ছ’মাস দোমনা হয়ে সেখানে কাটান। পরে তিনি দক্ষিণ রাজ্যের দিকে অগ্রসর হন এবং ২৪ অগস্ট ১৩১৩ হঠাৎ জ্বরাক্রান্ত হয়ে সিএনার নিকট বুওনকনভেনতো নামক জায়গায় মারা যান।
যদিও শেষের দিকে দান্তের মনে হয়েছিল হেনরি ইতালির ঐক্য আনতে পারবেন কিনা, তবু তিনি তাঁর উপরেই অনেকখানি আশা করেছিলেন। তাঁর এই আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি পুনরায় খুব বিচলিত হলেন। কিন্তু তাঁর ধৈর্যচ্যুতি হয়নি এমন দুঃসময়েও; তিনি আরও দৃঢ়ভাবে তাঁর রাজনৈতিক মতবাদ প্রচান করতে লাগলেন। ১৩১৪ খ্রি পঞ্চম ক্লেমেন্টের মৃত্যুর পর আভিঞঁ-র নিকটে কারপাঁত্রাস নামক জায়গায় কার্ডিনালরা জড় হলে দান্তে তাঁদের উদ্দেশ্য করে একটি চিঠি লেখেন (এপিসতোলা ৮)। রোম থেকে ধর্মপীঠ ইতিমধ্যেই আভিঞঁ-তে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে (১৩০৯ খ্রি) প্রধানত ফরাসি রাজাদের সহযোগিতায় ইতালির পোপ-বিরোধী দলগুলিকে জব্দ করবার জন্য। ধর্মপীঠ সরিয়ে নেওয়ার জন্য দান্তের বেদনা এই চিঠিখানিতে সিক্ত; কারণ তিনি আন্তরিকভাবে বিশ্বাস করতেন যে, জগতের কল্যাণের জন্য রোমেই হবে বিশ্ব-রাজ্যের রাজধানী তথা পীঠস্থান, যেমন খ্রিস্টীয় ধর্মেরও। বাইবেলের বিভিন্ন উক্তি তিনি স্মরণ করান আর বলেন —ধর্মবিরোধিতা দেখতে যেমন কষ্ট হয় তেমনি কষ্ট হয় আজ রোমের দিকে তাকাতে তার দুটি সূর্য —সম্রাট ও পোপ, দু’টিই অস্তমিত।
সম্রাট ও পোপ নিয়ে দান্তে যে-বিশ্বরাজ্যের কল্পনা করেছেন খ্রিস্টের বাণী স্মরণ করতে করতে, তাকে অনেক পণ্ডিত সমালোচকেরা অবাস্তব কাল্পনিক বলে আখ্যা দিয়েছেন; অনেকেই বলেছেন দান্তের ঐতিহাসিক বোধ ছিল না, ফ্লরেনসের ক্রমবর্ধমান অব্যর্থ ঐতিহাসিক গতি বুঝতে পারেননি। কিন্তু একজন প্রকৃত খ্রিস্টান এবং কবি হয়ে তিনি যে-দৃষ্টি লাভ করেছিলেন সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে বাস্তব জীবনবোধ থেকে আরম্ভ করে পারাদিজো-র শেষ তিনটি পঙক্তির অন্তে সেই মহান প্রেমের মধ্যে নিজের আসন লাভ করা পর্যন্ত তাঁর এক অসামান্য পরিণতি ও যুক্তি খুঁজে পাওয়া যায়।
দান্তের আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবদের এক এক সময় মনে হয়েছে দান্তে হয়তো ফ্লরেনসের বিধান অনুযায়ী ক্ষমা প্রার্থনা করে দেশে ফিরে আসতে পারবেন। ১৩১৫-তে ফ্লরেনস সিসিলির রাজা রবার্টের নেতৃত্বে পুনরায় নির্বাসিত ব্যক্তিদের ফিরে আসবার সুযোগ দিলে যদি তারা জরিমানা দেয় এবং দীক্ষাপীঠে (baptistry) একটি অনুশোচনা পর্ব পালন করে। দান্তের বেলায় শর্ত কিছুটা লাঘব করা হয়েছিল এবং সেইজন্যই তাঁর আত্মীয়স্বজন বন্ধুবান্ধবেরা আর একবার আশান্বিত হয়েছিলেন। কিন্তু নিরপরাধ গর্বিত দান্তে কোনও শর্তে ফিরে যাবেন না—তিনি যদি যোগ্য পদমর্যাদা ও সম্মান পান তবেই ফিরে যেতে পারবেন, তা না হলে না। এক পাদ্রিস্থানীয় ফ্লরেন্টীয় বন্ধু তাঁকে ফিরে যাবার অনুরোধ করেন, বোধহয় নতুন ‘ক্ষমা-ভিক্ষা’র অনুশাসনটি দান্তে লিখে জানান। এই চিঠির উত্তরে দান্তে ফ্লরেনসের ‘পুরস্কার’টি গ্রহণ করতে অসামর্থ্য জানান (চিঠি, ৯)। ইতিমধ্যে ১৩১৪-তে ফ্লরেনসের ‘ডিক্রি’ অনুযায়ী দান্তের পুত্রদ্বয়—পিএত্রো ও যাকোপো এরা দুজনেই মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত, কারণ তাদের চোদ্দো বছর পার হয়েছে। ঘোষণা করা হল তাদের ধরে সর্বসমক্ষে মুণ্ডচ্ছেদ করতে। ছেলে দু’টি অবশ্য ধরা পড়বার আগেই কোনও রকমে পালিয়ে পিতার কাছে যেতে সমর্থ হয়।
সেই বছরেই অগস্ট মাসে বহিঃশত্রুর চাপে খানিকটা অসহায় বোধ করে আরও একবার ফ্লরেন্টীয় কৌম কম বিপদজনক এমন সব নির্বাসিত ব্যক্তিদের ফিরিয়ে আনবার চেষ্টা করল—মৃত্যুদণ্ড মকুব করা হল, শুধু নগর সঙ্ঘ তাদের যে-সব এলাকায় থাকতে বলবে সেখানে থাকতে হবে। ১৫ অক্টোবরের মধ্যে এই শমনের জবাব দিতে হবে। দান্তের ওপরও এই শমন জারি করা হল, কিন্তু তিনি জবাব দিলেন না। ৬ নভেম্বর দান্তেকে মৃত্যুদণ্ডে ফের দণ্ডিত করা হল। এবারে শুধু একা দান্তে নয় তাঁর সঙ্গে তাঁর পুত্রদ্বয়ও, কারণ তারা বিদ্রোহীর সন্তান, এখানে বালক বলে কোনও ক্ষমার প্রশ্ন ওঠে না—তাছাড়া, তাদের চোদ্দ বছর তো আগেই পার হয়েছে।
বাকি আট বছর দান্তে কী ভাবে কাটিয়েছেন ঠিক জানা যায় না। তিনি বাত্তিফোল্লে পরিবারের মধ্যে কাজেনতিনোতে ছিলেন, না কি উগুচ্চোনের মোনতেকাতিনি-র যুদ্ধে সাফল্যের জন্য তাঁরই দিকে ঝুঁকেছিলেন? হেনরি-র ব্যর্থতার পর তিন কি মনে করেছিলেন হয়তো তিনিই ফ্লরেনসের দুর্দশা লাঘব করতে পারবেন? অথবা কোনও ব্যক্তিগত কারণবশত তাঁকে কানগ্রান্দের আশ্রয় ছেড়ে উগুচ্চোনের আশ্রয় গ্রহণ করতে হয়েছিল? এই সব প্রশ্ন অনেকেই তুলেছেন, জবাব কিছু বিশেষ মেলেনি। তবে এটা অনেকটা নিশ্চিত যে জীবনের শেষ কয়েকটা বছর তিনি অপেক্ষাকৃত স্বস্তির মধ্যে ছিলেন রাভেন্না শহরে তংার গুনগ্রাহী গুইদো দা পোলেনতা-র অনুগ্রহে। গুইদো তাঁকে একটি বাড়ি দিয়েছিলেন থাকবার জন্য। নির্বাসনে থাকাকালীন এই সর্বপ্রথম তিনি তাঁরই নিজের ব্যবহারের জন্য একটি বাড়ি পেলেন–এতদিন থাকবার জন্য শুধু ঘর পেয়েছেন, এমনকি কানগ্রান্দে যাঁকে দান্তে সবচেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করতেন, পারাদিজো উৎসর্গ করেন, তিনিও তাঁর থাকবার জন্য ব্যবস্থা করেছিলেন মল্লবীর ভাঁড় আর পাঁচজনের জন্য যেমন —একটি ঘর। যাই হোক গুইদো দা পোলেনতার দেওয়া বাড়িতে দান্তের ছেলেরা, মেয়ে বেআত্রিচে, এমনকি মিকেলে বারবি-র মতে স্ত্রীও এসে সেখানে থাকতে পেরেছেন।
গুইদোর বাড়িতে থাকলেও দান্তের আর্থিক অবস্থার কিছুমাত্র উন্নতি হয়নি। তিনি যে দরিদ্র সেই দরিদ্রই ছিলেন। পারাদিজো উৎসর্গকালে কানগ্রান্দেকে দান্তে যে বিখ্যাত পত্রখানি লেখেন কোমমেদিআ-র ব্যাখ্যা করে, তার মধ্যে একটি জায়গায় তিনি তাঁর কাছ থেকে অর্থ সাহায্য আশা করেন তার উল্লেখ আছে। বোকাচ্চও দান্তের শেষ বয়সের দারিদ্র্যের কথা উল্লেখ করেছেন, বলেছেন নানারকমের কাজ তাঁকে এ সময়ে নিতে হয়েছে, যেমন ছেলে পড়ানো, অলংকার শাস্ত্র সম্বন্ধে বক্তৃতা দেওয়া ইত্যাদি। তাঁর পাণ্ডিত্যের খ্যাতি এতই ছিল যে, কোনও ‘ডিগ্রি’ না থাকা সত্বেও ১৩২০ খ্রি. ভেরোনা শহরে ধর্মযাজকদের সামনে বক্তৃতা দেবার জন্য তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ‘জল ও পৃথিবী’ বিষয়ে একটি গভীর মতভেদ হয় পুরোহিতবর্গ পণ্ডিতদের মধ্যে, তাই সালিশি মানা হয় দান্তেকে। তিনি একটি নাতিদীর্ঘ বক্তৃতা করেন, বিষয়টি বৈজ্ঞানিক এবং লাতিন ভাষায় এই বক্তৃতাটির অনুলিখন রক্ষিত আছে। এই ভেরোনা ও রাভেন্না শহরেই তিনি কোমমেদিআ-র শেষ অংশটুকু লিখতে শুরু করেন এ পর্যন্ত জানা যায়। এর আগে কোথায় কবে এই বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থটি লিখতে শুরু করেন, কবে ইনফেরনো, পুরগাতোরিও শেষ হয়ে বই আকারে প্রকাশিত হয় —এ সব নিয়ে এত মতভেদ আছে যে, কোসমো তার এক সঙ্গত যুক্তি দিয়ে একটি অতিপ্রয়োজনীয় গ্রন্থতালিকা পর্যন্ত দিয়েছেন—শুধু এ বিষয়ে, অর্থাৎ কোমমেদিঅ লেখার সন তারিখ বিষয়ে যে-সব লেখা ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত লেখা হয়েছে।
সবে পারাদিজো শেষ করেছেন এমন সময় গুইদো দা লোপেনতা-র অনুরোধে তাঁকে ভেনিসে যেতে হয় দৌত্যকার্যে—রাভেন্না ও ভেনিসের মধ্যে একটি ঝগড়া মেটাবার জন্য। কথিত আছে ভেনিস দান্তের প্রতি সহৃদয় ব্যবহার করেনি, এমনকি অপেক্ষাকৃত নিরাপদ জলপথে ফিরে আসবার অনুমতি পর্যন্ত দেয় নি। কাজেই বাধ্য হয়ে দান্তে স্যাঁতস্যাঁতে জলাভূমির ভিতর দিয়ে ফিরে আসেন। ফেরবার পথে জ্বরে আক্রান্ত হন এবং ১৩ কি ১৪ সেপ্টেম্বর ১৩২১ রাভেন্নায় তিনি মারা যান।
গুইদোর আয়োজনে সান ফ্রানচেসকো গির্জায় তাঁকে রাজকীয় সম্মানে সমাধিস্থ করা হয়। জীবিতকালে যারা বার বার মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে, দান্তে মারা যাবার পর সেই ফ্লরেন্টীয়রা বহু শতাব্দী ধরে তাঁর পূতাস্থি ফিরে পাবার জন্য রাভেন্নার কাছে আবেদন জানায়, কিন্তু প্রত্যেক বারই আবেদন অগ্রাহ্য হয়। একদা যাঁর সেই লিখন—‘দুঃখ আমার হৃদয়ে সাহস আনে’, তাঁর সেই অপরাজেয় পৌরুষ আজও রাভেন্নার সমাধিস্থলে অক্ষুণ্ণ আছে।
৪র্থ বর্ষ ২য় সংখ্যা
(দান্তে বিশেষ সংখ্যা ১৩৭৩)
