বঙ্গীয় শিল্পধারা – কমলকুমার মজুমদার
হয় কী, একটি ত্রিকোণ যখন কেবলই সাদা কাগজের স্থান অধিকার করিয়া থাকে, তখন উহা তাহার নিজত্বের ভিতরেই থাকে ; আমরা বেশিক্ষণ উহার দিকে চাহিতে পারি না, সঠিক কালক্ষেপের সহজ বাস্তবতা উহার মধ্যে কতটুকু ; ওই বাস্তবতা অত্যন্ত নির্লিপ্ত, কোনও কিছুর নামমাত্র চিহ্ন সেখানে কই, যে আলো আর তাহার সম্বন্ধের – সমস্ত জগতের নামরূপ অন্তত বহন করিয়া আনে। এবং যে কোনও নির্দিষ্ট লোকের বাস্তবতার সহিত সহজে মিলিয়া যাইতে পারে। এতদিনকার এই অস্তিত্বের সহিত সাধারণত মুখ্য উদ্দেশ্যের কোনও যোগ নাই। এই বিরাট বিস্তৃতির মধ্যে দৃঢ় হইলেও ছোট একটি অপরিচিত বুদ্ধির মতোই পড়িয়া আছে ; তথাকার এই রূপ হইতেছে সেই রূপ যাহার সহিত আমাদের আন্তরিক যোগসূত্র বুঝি নাই। জানি না, বলিলে উচিত হইবে কী না, যে, আপনার অস্তিত্বকেই সেইখানে দেখিতে আকাঙ্ক্ষা হয়, ইহাকে উচ্চৈঃস্বরে নিন্দা করিবার সময় আমাদের নাই। ইহা আমরা অনেক সহজে বলিতে পারি, কিন্তু উহাকে নহে – যেখানে উল্লেখ আছে আপনার অস্তিত্বের সহিত মানুষের সম্বন্ধ কতটুকু। প্রথমটির চেতনার সবটুকু নামরূপ দেখা যায়, দ্বিতীয়কে কী বলিতে পারি এমন কথা জানা নাই। আমাদের দৃষ্টির সহিত তাহার হয়তো বা একটা সম্বন্ধ আছে, কিন্তু ইহা শুধুই কঠিন বস্তুর মতন, যাহা চতুষ্কোণ, যাহা যে কোনও আকারের! তাই কোনও নিজস্ব সম্বন্ধকে ঝটিতি অবলম্বন করিয়া অগ্রসর হইয়া আসিতে পারে না, বা কোনও অন্যরূপকে আশ্রয় করে না, কেন না ঠিক সেই সম্বন্ধটিই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম পরিবর্তনের মধ্য দিয়া আর এক রূপ পরিগ্রহ করে না, সেখানে আলোর লীলা কিছু সাহায্য করে হয়তো, ফলে সেখানে আলো যেমন পরিবর্তিত হয় রঙে, স্থান যেমন পরিবর্তিত হয় অবয়বে, আর আমাদের বদ্ধ অন্ধকার এবং সম্মুখের আলোকরেখার জন্যত্ব যাহা, তাহাকে অল্প সম্পূর্ণত অন্যরূপে মানিয়া লওয়া যায় না, সম্ভবও নহে। অন্তরের ক্রিয়াকাণ্ডের সহিত তাহার যোগসূত্র থাকিলেও নাই। কিন্তু যখন ত্রিকোণ কথা হইয়া যায়, যথা ‘অনন্ত ত্রিকোণ’, উহা আর আলো ধরে না, আর স্থান অধিকার করে না, উহা শব্দরূপ হইয়া যায়। এবং সহজেই আমাদের সমস্ত অস্তিত্বকে একটি বোধে লইয়া আসে, আমরা বুঝি। শব্দরূপটি আমাদের প্রাণে বড় বেশি জুড়িয়া আছে, শব্দের দিক হইতে আমাদের একটি বিশেষ রূপ আছে, আর তাহার সহিত একটি সম্বন্ধ আছে, যাহা ইহা অপেক্ষা জড়। নিছক শিল্পে শব্দের স্থান নাই, যতটুকু বা থাকে তাহা তুলির সহিত কাগজের, ছোটখাটো খসখসেই পরিণতি পায়, শেষ হইয়া যায়। কিন্তু শব্দের ব্যাপারে এইটুকু অর্থহীন শব্দটা একটু বড় রকমের।
কোনও স্থানে আমাদের রহিতে হইবে। শব্দের ঈঙ্গিত লইয়া সব কিছু পার হওয়া সম্ভব নহে, সব বাস্তবতাই আপনাকে বিলীন করে না। বিশেষত এ বাস্তবতা নিছক আলোর, নিছক স্থানের। তাহা কোনও মায়া সৃষ্টি করে না। এইখানে সেই হেতু একটি সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হয়, কেননা আলোর সাহায্যে স্থানটা কোনওদিন ঘটনা হয় না, তথা এমন একটা বাস্তবতা হয় না যাহাকে সহজেই শব্দে রূপান্তরিত করা যায়। তাহার নিজস্ব রসটা মানিয়া লওয়াই এইখানে উচিত এবং উহাকে আমাদের অগোচরে মানিতেই হয়। এবং আরও প্রমাণ সেটা যখন কথায় আমরা প্রকাশ করিতে পারি না। রস পাই না তাহার আরও একটি কারণ যে, কতকগুলি দূরত্ব সঠিকভাবে আমরা মনে রাখিতে সক্ষম নই, সেইগুলি কোথায় যেন জড়িভূত হইয়া যায়, এবং এক-একটি দূরত্ব আপনার সত্যকে রূপ দিতে সাহায্য করে না। সমস্ত দিক হইতে একটি সমতা আমাদের মানিয়া চলিতে হয়, এবং সে সমতা শুদ্ধভাবে আমাদেরই সমতা, সেই সত্যটি ক্রমাগত অতীত হইলেও চিরবর্তমান। এবং স্বয়ং একটি কার্যশক্তি। ইহা কিন্তু আমরা ভুল করিব না যে, সেটা সংযম ভিন্ন আর কিছুই নহে। এই শক্তিটি আপনাকে সমস্ত সম্বন্ধের সহিত বড় উত্তমরূপে দেখে, কোনওক্রমেই একটি মাত্র বিচারকে আশ্রয় করে না।
এই সমতা অল্পের থাকে। কারণ অল্পই অতীতকে অতীত বলিয়া মানে, যাহা জনসাধারণের পক্ষে দুঃসাধ্য। অতীত তাহার ঠিক একটি রেখায় পরিবর্তিত হয় না, ঠিক একটি সম্যক রূপ না। কোনও লোকে বলে অতীতই চিরবর্তমান, আমরা কিন্তু সেই কথা বলিতেছি না। অতীতের কতকগুলি সত্য অদ্য আমরা মুহূর্তে হাতে হাতে পাই, যাহা অতীতে যায় না, উহা তেমনই আছে, যাহার দূরত্বই আমাদের নিকট বর্তমান, যাহার রহস্য ক্রমাগত যুগে যুগে আলোক ভেদে, বহু অর্থ ধরিয়াছে, সেই কথা আমাদের নহে। অদ্য আমরা বহুভাবে বিভক্ত হইয়া গিয়াছি, যদিও দেহে আমাদের কোনও রং নাই, যেমন অন্য প্রাণীসকলের আছে ; সুধীরা বলেন আমাদের কিছুই বশ করিতে পারে না, তাহা হইলেও দেখা যায়, মানসিক বৃত্তির কোনও উন্নতি অনেকের হয় নাই। তাহারা শিল্পকে ঠিক শিল্প বলিয়া লইতে পারে না, মহেঞ্জোদারো হরপ্পায় যে মৃৎপাত্র দেখিতে পারেন, যে পুতুল দেখিবেন – আজও ভারতের বহু জায়গায় সেই কাজ দেখা যায় (উহা যে অবয়বের একটি সীমা আছে বলিয়া – সেই দিক হইতে আমরা বলিতেছি না), ঠিক তেমনি জনসাধারণের কোনও বদল হয় নাই। অন্তত বদল হইয়াছে একথা অনেকে মানিলেও কেহ কেহ আবার মানেন না, তাঁহাদের ধারণায় জনসাধারণ যেমন ছিল তেমনই আছে, কোনওরূপ সূক্ষ্মবৃত্তি বা সুকুমারবৃত্তি উপলব্ধি করিবার ক্ষমতা তাহাদের নাই। হয়তো কর্মক্লান্তির পর তাহা না থাকাই সম্ভব। রস উপলব্ধির ক্ষমতাকে তাঁহারা নিন্দা করেন, আপনার সহিত পরিচয় ধৃষ্টতার নামান্তর – ইহাই বিদগ্ধ সমাজের রূপ।
অনুমানের বাস্তবতা আমাদের মনকে সমস্ত ইন্দ্রিয়কে আচ্ছন্ন করিয়া আছে। জনসাধারণ এমন জায়গাকে মানিয়া লইয়াছে, যেখান হইতে তাহার সম্মুখের সমস্ত বাস্তবতাই আবছায়া, স্পষ্টভাবে আলোকসম্পাত সেখানে কোনও রূপের সম্ভাবনা পর্যন্ত দেয় না। অনুমানই তাহার নিকট পন্থা। সাধারণ সত্যগুলি সেইখানে তাহাকে অনুমান হইতে বিশ্বাসে লইয়া আসে না, যে বিশ্বাস তাহাকে সমস্ত রহস্যের সহিত পরিচয় করাইবে। ইহা না হওয়ার অর্থনৈতিক কারণ আমরা যতই দিতে চাই তাহার মধ্যে সত্য কতটুকু! অর্থনৈতিক কারণ বিশ্বের রহস্য নহে, যে রহস্যের আমরা হয়তো খানিক। ভালো খাওয়া-পরার উপর কিছুই নির্ভর করে না ; বিদুরের ধন ছিল না কিন্তু ভগবান তাহাকে দেখা দিয়াছিলেন ; কুব্জার রূপ ছিল না ! অনুমান লইয়া বহুলোক বাঁচে। তাহার নিকট তাই চিত্রশিল্পের বাস্তবতার কোন মূল্যই নাই, ছবি দেখা ছবিকে ভালবাসা তাহার পক্ষে অসম্ভব। কেননা প্রত্যক্ষের সত্যকে সে অবিশ্বাস করে। প্রত্যেক্ষর রস তাহার নিকট তিক্ত,কারণ নিজের নিকটই সে অপরিচিত, নিজেকেই তাহার ভালভাবে জানা নাই। বিশ্বপ্রকৃতির সাধারণ রূপ যাহারা জানে না, তাহারা কীরূপে রস গ্রহণ করিতে পারিবে! চিত্র-চেতনাকে রূপান্তরিত করে বিশ্বপ্রকৃতি, তাহার ঝড়, তাহার জল, তাহার অনন্ত আকাশ, তাহার আলোক-চাপল্য, তাহার মহিমা…। সেই মহিমাকেই সম্পূর্ণত প্রাণের ভিতর না পাইলে কেমন করিয়া আসিবে সেই চেতনা, যে চেতনা অপ্রত্যক্ষরূপে ক্রিয়া করিবে একের ভিতর। অধ্যাত্মভাব না থাকিলে আপনি সবকিছু পাইতে পারেন, কিন্তু রূপরসের কিঞ্চিন্মাত্র পাইবার যোগ্যতা আপনার থাকিবে না। সেই বাস্তবতাকে আমাদের বুঝিবার ক্ষমতা হইবে না। এই অনুমান যখন প্রত্যক্ষের সত্য দিয়া ভাঙিয়া যায় তখনই একটি অস্তিত্বের সহিত আমরা পরিচয় লাভ করি, যে পরিচয় আমাদের দৃষ্টিদান করে, এবং নব নব বাস্তবতার সহিত আমরা সাক্ষাৎ লাভ করি।
বাংলা দেশের সমস্ত দিক হইতে নিজস্ব একটি ইতিহাস আছে। সমস্ত দিক হইতে বাংলা দেশ স্বতন্ত্র। যদিও ভারতের মধ্যে সে একটি প্রদেশ মাত্র, সেই তুলনায় তাহার ঐশ্বর্য অনেক। বাংলা দেশে আবির্ভাব হইয়াছে নূতন নূতন বিশ্বাসের এবং বাস্তবতার। ধর্ম কাব্য চিত্র সংগীত – ইহাদের সহিত বাঙালির নাড়ির যোগ রহিয়াছে। ভারতের ভগবানের কোনও আদর্শ নাই বলিলে হাস্যকর হইবে, তেমনই বাঙালির শিল্পের কোনও আদর্শ নাই এই বাক্য যদি কেহ বলে, তাহা হইলে সকলেই তাহাকে বিদ্রুপ করিবে। এই আদর্শ কীভাবে পরিপুষ্ট হইয়াছে তাহা আমরা কিছু কিছু জানি। অন্যান্য দেশে আমরা বহুদিন যাবৎ কোনও উল্লেখই পাই না, কারণ সেইখানে নাকি অনেক যুদ্ধ হইয়াছে, অনেক লোক হতাহত হইয়াছে, এমনটি বাংলা দেশে যে হয় নাই তাহা নহে, তবু তাহার আদর্শের প্রতি গভীর ভক্তির হেতুই বাংলাকে ক্রমাগত রক্ষা করিয়া আসিয়াছে। এবং আজ তাই আমাদের একটি বাস্তবতা পাইবার সুযোগ দিয়াছে। বাংলা দেশ শিল্পকে কোনও নামেই জীবন থেকে বাদ দেয় নাই। সমস্ত সময় শিল্পকে আলিঙ্গন করিয়া ছিল। এমনভাবে থাকা তখনই সম্ভব যখন তাহার মধ্যে কিছু বাস্তবতা থাকে এবং সেই বাস্তবতা তাহাকে রাত্রদিন আনন্দ দেয়। সমস্ত শিল্প ও কাব্যকে যে খুব বিচার করিয়াই ভালোবাসা হইত তাহার বহু বহু প্রমাণ আমরা পাই এবং সে শ্রদ্ধা তাই কালের নিয়মে দেশ ছাড়িয়া কোনও অজুহাতেই যাইতে পারে নাই। একথা সকলেই স্বীকার করেন। এই শিল্পের আদর্শ, নিছকভাবে শিল্পের আঙ্গিককেও ভারতের বাহিরের অন্যান্য দেশের সঙ্গে আজ তুলনামূলকভাবে দেখিবার সময় আসিয়াছে। আমাদের শিল্পাঙ্গিকের বাস্তবতাটা আমাদের ধারণা, অন্য দেশ নিঃসংশয়ে মানিয়া লইতে পারিবেন। এই কথা বলিলে হয়তো ধৃষ্টতা হইবে না যে, তাহা অপ্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করিতে পারে। কারণ এর, বাংলার শিল্পাঙ্গিকের সমস্ত দিক হইতে একটি সর্বজনীনতা আছে। এবং একমাত্র বাংলার আলোক ব্যাতিরেকে, যে কোনও দেশে যে কোনও আলোকে একই থাকে, কৌতুহল হইতে আনন্দই বেশি দেয়।
এতই যদি বাস্তবতা থাকে, তাহা হইলে আমাদের দেশের শিল্পীরা সকলে তাহাকে স্বীকার করেন না কেন, এই কথা স্বভাবতই উঠিতে পারে। তাহার কারণও আমরা জানি, এবং সেই কারণে ব্যাপক প্রচার হইতে পারে নাই। কিন্তু ঘরে ঘরে তাহাকে বিস্মৃত হয় নাই, ঘরে ঘরে তাহার নিত্য পূজা হইয়াছে। আর আমাদের দেশের প্রসিদ্ধ শিল্পীদের মধ্যে তাহার প্রাণবস্তু আছে। আবার কাহারও মধ্যে তাহার হুবহু অনুশীলন দেখা যায়। ইহারা প্রত্যেকেই নানান দেশের নানান শিল্পপদ্ধতির সহিত পরিচিত হইলেও এই রসকে পরিত্যাগ করিতে পারেন নাই।
ঠিক এই নিজস্ব বাস্তবতা, যাহা বাংলার শিল্পাঙ্গিক সৃষ্টি করিয়াছে, তাহার মধ্যে আপাতদৃষ্টিতে মনে হইবে যে ইহা তো ছিল, কিংবা অন্য কোথাও আছে। এই কথা সত্য যে অন্যান্য দেশের প্রভাব নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু প্রভাব ব্যতীত এইখানে একটি শিল্পাঙ্গিক স্বতঃস্ফূর্তভাবে গঠিত হইয়াছে, যেমন হইয়াছে বঙ্গের অন্যান্য শিল্পের ক্ষেত্রে। বাংলার নিজস্ব শিল্পাঙ্গিকের মধ্যে প্রভাবের এখন আর চিহ্নমাত্র নাই বলিলে ভুল বলা হইবে না। এই কথা সকলেই স্বীকার করেন। যদিও সমগ্র ভারতে ‘নিয়তিকৃত নিয়মরহিতম’ কথার কতটুকু অর্থ ছিল বা আছে তাহা বিবেচনা করা দরকার। নিয়তির নিয়ম তাহারা মানিত না, মানিত না সেই বিষয়ে ইতঃপূর্ব্বে বহু গুণী বহু আলোচনা করিয়াছেন। এবং আমরা আমাদের, তথা ভারতের শিল্পকলায় দেখিতে পাইব এ কথাটি কোনও কোনও ক্ষেত্রে বিশেষভাবে পালন করা হইয়াছে। সারা জগৎ যখন অর্ধ আলোকে কিছুটা অনিত্যের বাস্তবতা লইয়া ছবি আঁকার চেষ্টা করিতেছে, ভারত তখন সত্যের সন্ধান পাইয়াছে, এই সন্ধান আমাদের আধ্যাত্মিক জীবনের ফলস্বরূপ। শাস্ত্র কখন সৃষ্টি হইয়াছিল তাহা জানিবার প্রয়োজন নাই, কিন্তু তাহার পিছনে যে একটি বিশেষ পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যাপার হইয়াছিল, তাহা আমরা বেশ উপলব্ধি করিতে পারি। আমরা সেই বাণী বহুদিন যাবৎ পালন করিয়াছি এবং তাই সমস্ত ভারতের পথ একরকম স্থিরীকৃত হইয়াছিল ; কিন্তু এখানে কথা উঠিতে পারে যে, সব শিল্পীই তাহা পালন করিয়াছেন। তাহা হয়তো নহে। মানসলোক হইতে একটা যে কোনও বস্তুকে মনগড়া করিবার উল্লেখ এই বাণীতে নাই, কেননা সব বস্তুই আনন্দ দিতে পারে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত আলো তাহাকে ঠিকভাবে কৃপা করে। মানসলোকে একমাত্র আলোর উপলব্ধিই সমীচীন। কেননা প্রকৃতিকে সব ক্ষেত্রেই চোখের সম্মুখে রাখার নির্দেশ আছে, প্রকৃতি এক মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয় না, এই কথা নিশ্চয়ই স্থির। এইবার অন্য দিক হইতে নিয়তির নিয়মে বাহিরে কথাটা এই অর্থ করে না যে আমরা মনুষ্য আকৃতিকে যেমন-তেমন করিয়া দিব, যাহা আমাকে- আপনাকে আনন্দের পরিবর্তে নিরানন্দ দিবে বেশি। বাণীটিকে কেউ বা কোনও শিল্পী সত্যভাবে উপলব্ধি করিয়াছেন, অতঃপর সেটিই সকলের আদর্শ হইয়া উঠিয়াছে। এই আদর্শকে অন্যে অনুসরণ করিয়াছে, ফলে অনেক ক্ষেত্রে সেই উজ্জ্বলতা আসে নাই, সেটা মুদ্রার ছবির মতোই অর্থহীন হইয়া পড়িয়াছে, সেইখানে আপনকার উপলব্ধির কোনও চিহ্ন নাই। অবশ্য ইহাতে এই অর্থ হয় না যে, ভারতে চিত্রশিল্প কিছু নহে। ভারতের চিত্রশিল্পের শুধু ইতিহাস হিসাবে দাম আছে আর শিল্প হিসাবে দাম নাই, এ উক্তি নিতান্ত জড়বাদী মূর্খের। অবশ্য এই কথা আমি বলিতেছি না, যেহেতু ওই দস্তুরমতোও সারগর্ভ কথাটি আছে বলিয়াই চিত্রশিল্পের পরিচয় বড়,এমনই যদি আপনারা কেহ চিত্রশিল্প বুঝিয়া থাকেন তাহা হইলে খুব সহজেই স্বীকার করিবেন যে ভারতের চিত্রসম্ভার, ভাস্কর্য যাহা কিছু আছে, তাহা অন্যান্য দেশের তুলনায় কিছু কম নহে। বরং অত্যধিক। ভাস্কর্য দেখিয়া সেই কথা কিছু কিছু উপলব্ধি নিশ্চয়ই হয়। আমরা বলি না গান্ধার বা অশোকের শিল্পপদ্ধতির কথা, যাহা প্রয়শ কলঙ্কময় লোকে বলে। আমি বলি তাহা ছাড়াও ভারতের বহু গিরিগুহা, বহু পোড়ামাটির কাজ দেখিতে, যেখানে আমাদের কথার সত্যতা উপলব্ধি হইবে। ঋষিরা অনেক বাস্তবতার মধ্য দিয়া পার হইয়াছেন, ফলে আমরা পাই ‘ষড়ঙ্গ’, আমরা পাইয়াছি এই অমর বাণী। এই কথাটির সার অর্থটি কেমনভাবে আমাদের দেশের শিল্পাঙ্গিকে মিশিয়া আছে তাহা আমরা পরে আলোচনা করিয়াছি। অনেক সময় হয়তো ইহার বিধিটা অঙ্কের নহে, ইহা যেমন একের পর আর এক আসে না, ইহাতে এই কথাই সিদ্ধ যে, একটা সংশয় থাকিয়া যাইতেছে। সংশয় কথাটা যদিও আসে না, তবু এ সংশয়ের সহিত সাধারণ ভাবের কোনও সম্বন্ধ নাই। একের উপলব্ধি যেখানে রহস্য, আমাদের সংশয় মনে হইতেই পারে, যদি পরিচয় না থাকে, যদি উপলব্ধি না থাকে। আমরা যে কথা বলিব সে বিষয়ে আমাদের সংশয় নাই, কেননা বাস্তবতা তাহাদের কাছে সংশয় যাহারা অন্যফেরে পড়ে। অনেক সময় আমাদের ঋষির তত্বকথা সংশয়ের সৃষ্টি করিয়াছে এবং তাই অনেকেই বেদ পড়িয়া নাস্তিক হয়, তাহার নিকট সমস্ত বাস্তবতা এমনইভাবে চুরমার হইয়া যায়, যে সে অথৈতে পড়িয়া যায়। কেননা যে আলোকপাত ঘটে তাহা একের পক্ষে সময় সময় অসম্ভব, আমরা অস্থির হইয়া পড়ি। এবং অস্থিরতাকেই অবলম্বন করিয়া কালাতিপাত করি।
আমাদের দেশে আবাল্য প্রত্যেকের নানা ধরনের কল্পনা দেখিতে পাই, বাঙালি কল্পনাপ্রবণ জাতি। জাতির দিক হইতে ইহা তাহার একটি গুণ। কল্পনা তাহার কেমন সে কথা বলিতে আমরা চেষ্টা করিব। এ কল্পনার মধ্যে বৈষয়িক লক্ষণ অতি অল্পই আছে, সব ক্ষেত্রেই তাহার মন অত্যন্ত দূরত্বই চায়। কোথাও গিয়া সে নিজেকে লইয়া থাকিবে। তাহার আদর্শ হইয়া যে ছবিটি ক্রিয়াশীল তাহা বিস্ময়কর। যদিচ তেমন অন্য দেশেও দেখা যায়, কিন্তু তাহার রচনা পদ্ধতির একটু ভিন্ন সমতল শেষে মেশে একটি দিগন্তের সহিত, দূরে তখনও সূর্য আছে, নদী – তাহাতে নৌকা, নদী – তাহাতে কুটির, – কখনও তাল অথবা নারিকেল গাছ। অত্যন্ত সাধারণ, অত্যন্ত আটপৌরে তাহার কল্পনা হইলেও ইহা একটি বিশেষ বাস্তব। একটি শান্তির ছবি। সে শান্তি নিস্তব্ধতাময়, উপরের অসংখ্য নিস্তব্ধতাকে কেন্দ্র করিয়াই আমাদের জীবন গড়িয়া উঠিয়াছে, নিস্তব্ধতার রং আছে, রং হয় নীল। আর বিস্তৃত খেত, যখন সেই খেত সবুজ, সমতল আর ধনুকের মতো বাঁকা আকাশ, অদ্ভুত সমারোহ। কোনও সবিশেষ কিছু নাই, শুধু আলো ছাড়া – আলো ছাড়া আর উপায় নাই, আলো আবার রং হইয়া গেল যখন তখন সন্ধ্যা, সূর্যের সঙ্গে একটা যেন সম্বন্ধ আছে। সূর্য মামা, চাঁদাও তাই। এই ভাবে বহু কথাই আমাদের মনে পড়ে, ‘গঙ্গা শুকু শুকু আকাশে ছাই’ – বলিতেই ঝটিতি তাহার সমস্ত রূপটা আমাদের চোখের মধ্যে ফুটিয়া উঠে। শুধু বলার ধরন নহে, শুধু ছন্দ নহে – বিশেষ করিয়া তাহার কথায় বিচার করিয়া কথা সাজানো ছিল বাংলার কাব্যের মর্ম (চৈতন্য চরিতামৃত), কাব্য চিত্রধর্ম্মী ‘জলের ভিতর ন্যাকাচোকা, ফুল ফুটছে চাকা চাকা, ফুলের বরণ কড়ি’, এইখানে যেন একটি ছবিকেই বর্ণনা করা হইয়াছে একেবারে পরিষ্কারভাবে, অবশ্য ছোট ছেলেটির চোখে যতটুকু ধরে, এবং আলো যেখানে প্রতীয়মান! এইরূপ কত ছড়াই না আছে, যাহা, হলফ করিয়া বলা যায়, যে কোন কাব্যের মার্গে উঠিতে পারে।
ঠিক এইভাবে বাংলার জীবনধারা বাস্তবতা পাইয়াছে। এই কথা ভুলিলে অন্যায় হইবে, যে ছয় ঋতু আমাদের দিয়াছে শিল্পবোধের অনেকখানি, নিদাঘের গরম আমরা দেখিয়াছি, কাকের স্বর বিকৃত হইয়াছে, আর সমস্তই ধূ ধূ, অতঃপর কালবৈশাখী, তাহার ঝড়, সেই ঝড়ে যত ভয় তত আনন্দ, গাছপালা ঝাপসা হইয়া আসিল, খাল বিল জলে জল শুধু জল, কখনও রামধনু ধূসর মেঘের উপর, এবং শরতের সকালের রোদ কাঁচা সোনার মতোই, ক্রমে কুয়াশা-ধানের রংয়ে শরতের আলো, এইবার শীত, মরা বেলগাছে শালিকের দল, তাহার গলার হলুদে স্পষ্টতই প্রতীয়মান, শুধু পলাশ আর মাদার, শুধু লাল, আর উপরে নীল আকাশ-আকাশে, নীচের আকাশে কচি কলাপাতার রং! জীবনের সঙ্গে মিশিয়া গিয়াছে ; তখনকার এখনকার বাংলার লোকেরা শিল্পবোধ পাইয়াছে। একদিকে তাহার ‘সম্যক রূপ’ প্রীতি, অন্যদিকে তাহার সরলতা তাহাকে অনেক দূর পর্যন্ত লইয়া আসিয়াছে, এবং ইহাকে সে কীভাবে ত্যাগ করিতে পারে! অবশ্য আমাদের দেশে বহু লোক দাস মনোভাববশত সেই বাস্তবতাকে লওয়া ঠিক হইবে কী না ভাবিয়া লন নাই, কয়েক জনের মধ্যে ছাড়া সে বস্তুর সাক্ষাৎ মেলে না।
‘সম্যক রূপ’ লক্ষণ এমনি যে, লোকে তাহার ব্যবহারিক জীবনে পর্যন্ত চেষ্টা করে, ইহার প্রতি তাহার বিশেষ ঝোঁক দেখা যায়, মাঝে মাঝে তাহার কথা বড়ই জটিল, একজনের পক্ষে সে কথা বুঝিয়া উঠা কঠিন, হয়তো তাহা শুধু জটিলতার রূপই বর্ণনা করে। আদত বাস্তবতা একটু দূরে সরিয়া যায়। তাই এই ‘সম্যক-রূপে’র পাশে সরলতা তাহাকে রাখিতেই হইয়াছে, সরলতা স্বয়ং একটি গুণ এবং তাহা ছাড়াও সে ‘সম্যক-রূপ’কে সাহায্য করে এবং একটি সুবোধ্য স্তরেই সব সময় ধরিয়া রাখে, যাহাতে তাহা শুধু প্যাঁচ হইয়া না দাঁড়ায়, আবার অন্য পক্ষে সরলতাকে ‘সম্যক-রূপ’ সাহায্য করে, যাহার সাহায্যে মনে হয় সরলতা শুধু সরলতা-ফড়িংয়ের ওঠানামা, ওড়া, ভোরের প্রথম আলো, এমনি একটা কিছু। এই সজীবতার ফল আমরা বহুদিন যাবৎ দেখিয়া আসিতেছি, ধর্মপালের সময়কার কাজে, ধীমানের নাম আমরা শুনিয়াছি, জয়দেব ও চণ্ডীদাসের কবিতায়, পটে, বৃষকাষ্ঠের দারুশিল্পে – এই সজীবতা যদি না থাকিত তাহা হইলে আমাদের দেশে বৈষ্ণব ধর্মও বেশি লোকের মন টানিত না।
বৈষ্ণব ধর্মের কাছে বাংলার জীবন যে কী ভাবে ঋণী তাহা স্বীকার না করিয়া পারা যায় না। শ্রীচৈতন্য মহাপুরুষ ছিলেন এবং তাঁহার আবির্ভাবের সঙ্গে সঙ্গে সমস্ত বাংলা দেশ জাগিয়া উঠিয়াছিল নবতম চেতনায়। শুধু মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথাই তাঁহার মধ্যে ছিল, এবং মানুষকে একটি নূতনতম চরিত্র দিয়াছিলেন ; সে চরিত্র অতুলনীয়, যে চরিত্র আলোক উদ্ভাসিত বাস্তবতার সঙ্গে একটি বিশেষ সম্বন্ধ রাখে, কেননা সে চরিত্র সাযুজ্য চায়, সে মানুষ সাযুজ্যের প্রতীক্ষায় অহর্নিশ অপেক্ষা করে, এ কথাও সে বিশ্বাস করে! সে স্বয়ং একটি শক্তিরূপ যে বৈষ্ণবরা নামকে বিশ্বাস করে, জপমালায় অসংখ্য নাম করে। আমরা জানি না থলির অন্ধকারে, একটুখানি আলোতে জপমালার পরিক্রমায় তাহারা কোন সত্য উপলব্ধি করে। তবে একটা জিনিস, একটি সত্য আমরা বুঝি, সেটা ভক্তি, অহেতুক ভক্তি তাহাদের মর্মবাণী, একথা শ্রীচৈতন্য বিশ্বাস করিতেন। তিনি নিজে বহু শাস্ত্র পাঠ করিয়াছিলেন এবং বিধান দিয়াছিলেন ভক্তি। এই ভক্তি হইতেছে সর্বশ্রেষ্ঠ দর্শন, আমরা যখন সাধনার উচ্চমার্গে যাই, তখন একমাত্র ভক্তিই সমস্ত সামঞ্জস্য রাখে, সে ভক্তি যেমন পারে উচ্চতম লোকের আত্মার সহিত মিলিবার রূপ দিতে, এবং সেই সঙ্গে স্তব্ধভাবে সক্ষম হয়, সমস্ত বিশ্বরহস্যের মধ্যে একটি বিশেষ রূপ আনিতে, তথা সাধক কোনও দ্বিধাই পায় না। বিশ্বরহস্যকে মানিয়া লইবার ভক্তি যদি তাহার মধ্যে থাকে, ভক্তি হইতেছে ব্যবহারিক জগতের যেমন বাস্তব, তেমনই সাধনমার্গে তাহার মূল্য হেয় নয়, সকলের আগে। যেহেতু সাধারণ সত্যকে বাস্তবতা দেয়, যে বাস্তবতা ব্যবহারিক জগতের বাস্তবতার সম্মুখে ঠিক থাকে। ভক্তিরসে মানুষকে জগৎ ছাড়িয়া শেষ পর্যন্ত যাইতে হয় নাই, আমাদের দেশের আবালবৃদ্ধবণিতা সংকীর্তনে মুখর হইয়া উঠিল। সঙ্গে সঙ্গে যেমন নূতন জীবনের চেতনা আসিল এবং প্রকাশের পথও পাইল, নূতন শিল্পচেতনাও উদ্বুদ্ধ হইল। যে শিল্পচেতনা একটি মহৎ প্রাণের নামান্তর, শুধু সরলতা, আমাদের ভক্তিরসের চিত্ররূপ সরলতা ছাড়া অন্য কিছু নয়। অবশ্য চৈতন্যদেবের আবির্ভাবের বহুপূর্বে আমাদের দেশে দু-জন মহাকবি জন্মাইয়াছিলেন, যাঁদের মধ্যে মানুষের প্রতি আন্তরিকতা ছিল কানায় কানায়, যাঁহাদের সরলতা ছিল প্রাণে প্রচুর। কিন্তু তাহার প্রচার হইল শ্রীচৈতন্যের পর। এবং এত সুষ্ঠুভাবে হইয়াছিল যে, আজও তাহার প্রভাব আছে, কোথাও এতটুকু মরে নাই। হয়তো আবার ধর্ম বৌদ্ধ ধর্মের মতোই জনসাধারণের কারণে বিকৃত হইয়া গিয়াছিল, কারণ ভক্তির বাস্তবতা তাহারা উপলব্ধি করে নাই, তাহাতে কোনও দুঃখ করিবার কিছু নাই। কিন্তু তাহার চেতনায় সমগ্র বাংলা যে নবচেতনা লাভ করিয়াছিল তাহা দিনের আলোর মতোই সত্য। ঠিক এইভাবে আমাদের চিত্রশিল্পের আঙ্গিক আপনার পথ পাইল এবং ক্রমেই সে আঙ্গিক একটি বিশেষ অবস্থায় আসিল যাহা তাহাকে অমর করিয়াছে এবং জগতের বিষয়কে বাংলা দেশ শুধু ভক্তির জন্যই বাস্তব করিয়া দেখিয়াছে, ভক্তি মূল হইলেও ক্রিয়াকর্ম যাগযজ্ঞ কোনও ব্যক্তি ছাড়ে নাই। কাঁসর ঘণ্টা বাজিতেছেই। ঘরে ঘরে বিগ্রহ প্রতিষ্ঠা ছিল, এবং আছে, কাহারও বাড়ি নিত্য পূজা, সকাল-সন্ধ্যা আরতি। তাহার কতকগুলি রূপ আমাদের শিল্পাঙ্গিক কে সাহায্য করিয়াছে। ভোরের গঙ্গাস্নানে আমরা দেখিয়াছি, সমস্ত গেরুয়া রং রাঙা, হিম-হাওয়া বহিতেছে, আর সম্মুখের জনপ্রবাহ মোভ, ছল ছল করে, দূরে মোটা মোটা কালো কালো বিরাট নৌকা, তাহার সিঁদুর আঁকা চোখ … ওপারে একটু একটু সবুজ ঘাস, এ জল, মোভ জলটি ছোট ঘটে তোলার জন্য সকলেই কী অদ্ভুত ব্যস্ত হইয়া উঠিত। আর সে গঙ্গার কী অদ্ভুত স্থানহীন রূপ, সে আমাদের মনে আছে। পূজার জন্য কচি কচি দুর্বা তোলা, … ঘাসে ঘাসে শিশির মুক্তার মতন, ঘাসটি সন্তর্পণে তুলিয়া নিতে সে কী অদম্য চেষ্টা, সে শিশির কণা পাছে না ঝরিয়া পড়ে, যখন ঝরিয়া পড়ে নাই তখন আমরা চোখের সম্মুখে আনিয়া দেখিয়াছি সে জল বই অন্য কিছু, সেটা শিশির, তাহার মধ্যে কত রং মৃদুভাবে রহিতেছে, এমনিভাবে বেল পাতাও পাড়িয়াছি, কচি কচি পাতার মধ্য দিয়া গায়ে কাপড়ে যখন রং পড়িত, তখন কেমন অবাক হইয়া যাইত সকলেই, তাহার সেই স্বচ্ছ রংলীলা গায়ের চামড়ায় কী অদ্ভুত! তিন-পাতা রাখিয়া অন্য পাতা ফেলিয়া দেয়, তাহার সামঞ্জস্যটা অদ্ভুত, যেমন ঘাসের, তবে এটা ফলা-ফলা গাছের – আর ওটা বেশ দিব্য সুন্দর। তিনটি পাতার কেমন সুন্দর একটা মিল আছে, তেমনি আবার আম পাতা পাড়ার মজা সর্বাধিক, ফাল্গুন-চৈত্র মাসে তখন আম পাতা সবে হইয়াছে, তাহার রং বেশ ব্রাউন, একটু হলুদাভ, এ রংটা সকলকে বেশি বিস্মিত করে, আবার আম পাতা কচি কলা পাতার মতো হইবে, পরে গাঢ় সবুজ হইয়া যাইবে। কোনও আম্র পল্লবের পাঁচটা পাতাই আমরা ঠিকভাবে বাহির করিতাম, যেন সব সমান হয়, যেন বেশ সার বাঁধা হয়। পিতলের ঝকঝকে কলসির উপর মোটা করিয়া লাল সিঁদুর দিয়া ‘নারায়ণ’ আঁকা হইত, তখন আমাদের চোখ কী ভাবে বিস্মিত হইয়াছে, কীভাবে হতবাক হইয়াছি! লাল রংটা একটি বিশেষ আকৃতি হইয়াছে, আর আলো পড়িয়াছে, পিতলের ঘটে, সে যে কী রূপ, কী রসের সৃষ্টি করে তাহা আমরা জানি, দাঁড়-করানো কলা গাছের পাতার রংয়ের আভাস মাঝে মাঝে কলসির উপরে পড়ে, আর লাল আর রোদ, আর সবুজে মিলিয়া যে কী শোভা সৃষ্টি করে তাহা বলা বা বর্ণনা করা অসম্ভব। এই রকম বহু বহু অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়া আমরা ছন্দটাকে উপলব্ধি করিয়াছি। সবুজ রং দিয়াছে একটি সততার সম্পূর্ণ রূপ – একদিন ছিল রাত্র রাত্রই, দিন দিন। সে ইতিহাস অনেক।
শব্দের উৎসুক্য লইয়া থাকা এই ছিল, শব্দের পিছনে বহু বহু আকার মিলিয়া একটি নিরাকার কোনও কিছু ছিল না, অন্ধকারের পর অন্ধকার। এ মাঠটা কী ভয়ংকর, শৈত্যে পরিপূর্ণ, মনের উপর কী সে বিছাইয়া থাকে, কী তাহা কাজ করে, যে কোনও বস্তু তখন সমস্ত শূন্য, সে শূন্যতা স্থান হইতে অত্যন্ত অধিক। এই শূন্যতা ভয়প্রদায়িনী! সেই ভয়ে হয়তো রক্ত আর তেমন লাল নহে ; তখন শুধু এই কারণেই সমস্ত কিছুই আপনকার স্বরূপ ছাড়িয়া ভয়ংকর হইয়া দাঁড়ায়, সমস্ত বিবেচনা, সমস্ত বুদ্ধি সে হারায় যে সে রাত্রে পথ চলে, বিষয়বুদ্ধি তাহার আর তেমন থাকে না, বিষয়গত চেতনাকে তখন আর তেমনভাবে মন আকর্ষণ করে না, কেননা দিনের প্রয়োজন এ কথাই সব ক্ষেত্রে মনে হয় তো হয়, দিনের জন্য বসিয়া থাকা। আলোকে কতটুকু মানুষ স্মরণ রাখিতে পারে, যাহাতে বিষয়ের সমস্ত বাস্তবতা তাহাকে তেমনিভাবে আকর্ষণ করিবে, রাত্রি অন্ধকার, মানুষ আপনার হইয়া বিষয়কে কল্পনা করিয়াছে, এ কথাও সত্য, আর দিনের আলোয় সে কল্পনা আস্তে আস্তে অন্তর্হিত হইয়াছে, পরিষ্কারভাবে গাছের গুঁড়িটাকে গাছের গুঁড়ি বলিয়াই সেই দেখিতে পাওয়া মহা আনন্দের, ক্রমে তাহার চেতনা দুই ভাগে বহুদিন পর্যন্ত ভাগ হইয়াই ছিল, ব্যক্তিগতভাবে দেখা তাহাদের পক্ষেই সম্ভব হইত যাহারা আলোতে অস্তিত্বগুলিকে ভালোভাবে বুঝিবার চেষ্টা করিতই না, মনগড়া রূপচর্চা করিয়া তাহারাই আরওপ করিত একেবারে নিজেদের স্বার্থে। ১-২-৩-৪এর মতো পরিষ্কার প্রকৃতিকে তাহারাই দেখিতে পাইত, যাহারা রাত্রের ভয়ের কথা বিশেষ মনে রাখিত, অনেকটা এইভাবে বিষয়ের সঙ্গে তাহার চেনা জানা হইয়াছে , হইলেও সে একটি দিক মাত্র বিষয়ে লইয়াছে, সেটা হয় আকার, আকারই তাহার সহায়, আকারই সেইখানে বিষয় বাস্তবতা, আর সবটুকু শব্দের, শব্দ সেখানে বানচাল, এবং আরও ব্যক্তিগত করে। আকার দিনেও সত্য। কিন্তু স্থান আর রং আর আলো তখন তেমনভাবে বিষয় নহে, স্মৃতিপটে তাহারা অনেকটা নিষ্ক্রিয় হইয়াই রহিয়াছে, আকার হিসাবে সেগুলি কাজে লাগে, তাহারা যে নিজেরাই এক একটি বাস্তব সত্য, তা ছিল না। হইলেও মানুষ এরই মধ্য হইতে কিছু সত্য পাইয়াছিল, দুটি বাস্তবতা, সেটি আবার একটি বাস্তব রূপ ধারণ করিলে যাহাকে বলা যায় পরিপ্রেক্ষণ বাস্তবতা, যা সবই সমস্ত। অদ্য দিন আর রাতে কোনও ভেদ নাই, মানুষ যেমন দিনের জন্য উতলা হইত, মানুষে তেমনি রাত্রির জন্য ব্যস্ত হইয়া ওঠে। এবং তাহার পারিপার্শ্বিক অবস্থা এমনি যে সে বিষয়কে বেশ দেখিতে পায়, শুধু দেখিতে পায় না আলো আর আলোকিত স্থান বিস্তৃত, কারণ যাহার ফলে যে, সে দেখিতে পায় তাহা হইতেছে অগ্নি। দিন ও রাত্রির চেতনায় আমাদের দুইটি সত্যের সহিত আড়াআড়িভাবে সম্পর্ক হইয়াছে; একটি বাস্তবতা, অন্তরে আর বাহিরে। একটি বাস্তবতা ব্যক্তিগত, কেননা দিবালোকে সে নিজের কী অদ্ভূত পরিচয় পায়, পাইলেও সে আরও পরিচয় পায় যে তাহার একটি বাস্তবতা আছে, আর সম্মুখে আছে বিষয়। সে দিবালোকের জন্য অপেক্ষা করিত, সে অপেক্ষায় শুধু এই কথাই আমরা শুনি, বিষয়ে পরিচয়। এখন সে রাত্রি অপেক্ষা করে। ক্লান্তি আমাকে-আপনাকে বড় বেশি করিয়া ছাইয়াছে, কোনও সত্য আর আমাদের আছে তাহা এখানে আলোচনার নহে।
অগ্নির আলো চোখকে কতটা সম্বন্ধ দিয়াছে, আজ তাহা কিছুই লেখাজোখা নাই, পৃথিবীর তথ্য যাঁহারা লেখেন তাঁহারা কোথাও তাহা বলেন নাই। ঋষিরা আমাদের অনেক কথাই বলেন, কিন্তু রাত্রি আর দিন আমার-আপনার রক্তে মিশিয়া গিয়াছে, তাই আমরা সেকথা ঠাহর করিতে পারি না। পরন্তু আমাদের কাছে কদর্থ হইয়াই তাহা দেখা দেয়। সূর্যালোক আর অগ্নির আলোকে নিশ্চয় ভেদ আছে। বিষয়কে এক-এক পদ্ধতিতে আমরা বিচার করি। সেটা বড়ই আশ্চর্যের। কেননা সর্বাধিক প্রয়োজনীয় যে স্থান সে আপনা হইতেই অদৃশ্য হইয়া থাকে, অদৃশ্য বলিতে আমরা শিল্পের দিক হইতে বুঝি, এ স্থানকে বিভক্ত করিয়া উপলব্ধি দিবালোকে সম্ভব হয় না, স্থানের বাস্তবতাকে সাধারণত আমরা রাত্রেই বেশি উপলব্ধি করি। সূর্য্যালোকের যে বিচার তাহা ক্রমাগত তাহার নানান গুণে সম্পন্ন হয়, সেখানে, স্থানলীলা ক্রমাগত রশ্মিময়, দৃশ্যত সেকথা আমরা বুঝিলেও তাহার সম্বন্ধে স্থান কতখানি থাকে, অথচ অন্যপক্ষে রাত্রে আমরা ক্রমে স্থান-চেতন হইয়া থাকি। আপনকার দৃষ্টিতেই স্থানকে বুঝিবার অথবা হৃদয়ঙ্গম করিবার চেষ্টা পাই। অগ্নির আলোতে স্থান রশ্মিময় হয় না। যতটুকু দেখা যায় সেটুকু শুধু স্থান, স্থানই, ধ্বনিহীন, রশ্মিহীন, ঠিক এ বিশেষত্ব অত্যন্ত গভীর, সেখানে আলো বস্তুবাচক। তাহার লীলা স্থান-হেতু দৃশ্যমান। একদিন শুধু এই প্রকৃতি জড় ছিলেন, কোথাও প্রাণের আভাস মাত্র ছিল না, লোকচরার নিস্পন্দ, উপরে সৌরলোকে মেঘাবৃত, ক্রমে আলো দেখা যায়, পুরুষত্বরূপ এবং আমরা সৃজনতত্ব সম্যক অনুধাবন করতঃ বিস্মিত হই। কেননা আমরা স্থানকে দেখি। এখানে আর একটি কথা আরও পরিষ্কার হয়, দিবালোকে দেখা বা যাহা দেখি তাহার একমাত্র গুণকে আমরা পর্যালোচনা করিয়া দেখিতে সক্ষম হই। অগ্নির আলোতে বস্তুর বস্তুত্ব তথা স্থান বিস্তার খুব ভালভাবেই উপলব্ধি হয়। বস্তুর একদিক আমরা দেখিতে পাই, আর দেখিতে পাই গভীরতা, – ঠিক যে তাহার চতুর্দিক দেখা যায় এমত বিশ্বাস আমরা উপলব্ধি করি না, এখানে অগ্নি আমাদের বস্তুর বস্তুবোধ দেয় এবং ঠিক স্থান রহস্য যখন বস্তুর মধ্যেই থাকে (ভাস্কর্য) এবং অপ্রত্যক্ষভাবে সমস্ত রূপকে একটি লীলার মধ্যে আনে, রূপ এইভাবেই আপনকার সত্তা পায় এবং সে চেতনা দিবালোকের অত্যধিক আলোকে বর্তমানতা হেতু ম্রিয়মাণ হয় না। এখন যে বাস্তবতা মানুষের সে শুধু অগ্নির, সে রাত্রির, দিনের বাস্তবতা এখন আমরা ঠিক এমনইভাবে লাভ করি নাই, সেইদিন অবশ্যই আসিবে। যাক সে কথা। অগ্নিই আমাদের আদি, অগ্নি বাস্তব এবং অগ্নি দৃষ্টিদানকারক, অগ্নিই মনুষ্যের ন্যায়ের কর্তা। ঠিক এই অগ্নির সম্পর্কেই বিষয়কে তথা বিষয়বাস্তবতাকে আমরা চিন্তা করি, বিবেচনাও করি, যেহেতু সাধারণত রাত্রেই আপনার অস্তিত্ববোধ সম্যক ভাবে হয়, কেননা আপনাকে আমরা যথেষ্ট সত্যরূপে দেখিবার চেষ্টা করি, কেননা আমার সম্বন্ধে, রাত্রে থাকে কয়েকটি তারা, আর নিরাকার স্থান এবং অগ্নির হেতুই আমার অস্তিত্ব নিবিড়ভাবে দেখায়, প্রজ্বলিত অগ্নি একবার আমার দিকে আসে, কেন্দ্রস্থ হয়, উত্তরে চলিয়া যায়, হে অগ্নি প্রাণস্বরূপ, আমি বাস্তব। আমরা যাহাকে অদ্যও বিষয় বলি তাহা অগ্নির সম্বন্ধেই আসিয়াছে, দিবালোকের নহে। দিবালোকের বাস্তবতা অন্য, এবং সংস্থান ব্যাপার একেবারে দিবালোকের সহিত কোনও অগ্নির সম্পর্ক নাই।
সাধারণত আমরা দেখিতে পাই, দিনের ব্যাপার ছাড়া ছবি হয় না। রাত্রির ছবি নাই। হয় তো আছে, হইলেও দুই-একটি। দিনের ব্যাপারের মতো রাত্রের অতটা জনপ্রিয়তা নাই। তাহার কারণ আপনারা সকলেই জানেন। কিন্তু প্রত্যহ যে অনেক অনেক ছবি আঁকা হয়, প্রত্যহ যে বহু শিল্পী ছবি আঁকার জন্য প্রস্তুত হয়, তাহার মধ্যে প্রাচীন একটি রহস্য বর্তমান, যে রহস্যের কথা বলিতেছি, তাহা তাহার আঁকা ব্যাপারের রহস্য। সে সব চিত্র দিবালোকে আঁকা হয়, তথা উত্তর-আলোতে আঁকা হয়, কিন্তু ঠিক তাহা দিবালোকের নহে, আমাদের হয়তো সে আলোকে চিনিতে পারা মুশকিল হয়, তবু একথা নিশ্চিত যে, ছবির মধ্যে যাহা কিছু তাহা অগ্নির সম্বন্ধে দেখা রূপ এবং সে রূপের রূপান্তর। অগ্নিতে দেখা রূপ শিল্পকে নিয়ন্ত্রিত করে, কারণ স্থান-চেতনা সে শিল্পীর অগ্নি-আলোতেই আসিয়াছে, তাই তাহার কাছে, হাতের কাছে চোখের পাশে বরাবর সেই নিস্পন্দ অন্ধকার থাকেই, সমস্ত দিবালোকের দৃশ্যটি সেই সেই স্থান-চেতনার উপরেই আশ্রয় করিয়া ক্রমে রূপান্তরিত হইতে থাকে। দিবালোকের বাস্তবতা তাহাকে কতটুকু ধরা দেয়, সে শুধু পরিপ্রেক্ষণ। তাহার সত্য বিচারে থাকে না। দিবালোকের সম্পর্কে আমরা যাহা দেখি তাহা রং। এবং রংয়ের তারতম্য। আর যা তাহা অগ্নির হইলেও আলোকের কথা আমরা অস্বীকার করিতে পারি না, যাহা আমাদের সব কিছুই দেয়, কিন্তু যতক্ষণ না পর্যন্ত আমরা তাহার সম্মুখে দাঁড়াইতে পারি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমরা কিছুই পাই না। ইদানীং এই আলোকের রহস্য পাশ্চাত্য দেশ কিছু কিছু বুঝিবার জন্য আগ্রহ প্রকাশ করিতেছে, কিন্তু তাহাদের ঠিক অধ্যাত্ম সম্পর্ক না-থাকার হেতু একটু বিপরীত রূপ লাভ করিতেছে, এবং যন্ত্রকে এড়াইবার চেষ্টা কারণে যাহা হইয়াছে, তাহা কল্পনাতীত ও লোকোত্তর। এই আলোর বাস্তবতা আমাদের দেশীয় শিল্পে বিশেষ পথপ্রদর্শন করিয়াছে, তাহা আমরা নিঃসন্দেহে বলিতে পারি।
আমরা অনেকখানি বাংলার শিল্পের ভিত্তি সম্বন্ধে, তাহার রূপ-চেতনার ধারাবাহিক ইতিহাস, কেমনভাবে সম্যকরূপ সরলতা পাইয়াছে, কেমনভাবে ভক্তির মাধুর্য কাজ করিয়াছে, বিষয় ও ব্যক্তিগত চেতনা, তাহার স্থানকল্পনা এবং অগ্নির কল্যাণে সংস্থান-চেতনা কীভাবে নামিয়া আসে একটিমাত্র চেতনায়, ও আমাদের দেশের লোকোত্তর শিল্পের মাঝে প্রাণস্বরূপ হইয়াছে এবং শিল্পকে অদ্ভুত গুণসম্পন্ন করিয়াছে তাহা আমরা বিশ্লেষণ করিয়া দেখার চেষ্টা করিব। ইহাকে সঙ্গতভাবে বাংলার নিজস্ব চেতনা বলিতে পারি, যে চেতনা বহুদিন হইতে আমাদের দেশে কাজ করিয়াছে।
এই ছোট উঠানে খুব আলো আসিয়া পড়িয়াছে, এখন সকাল, আলো স্থির হইয়া আছে, সামনে সমস্ত জমির রং ধূসর-একটু খসখসে; পিটুলির রং সাদা, উঠানময় কলাপাতা টানিয়া চলিয়াছে, এক-এক ব্রতে এক-একরকম মনের বাস্তবতা, আর সেই লতার বাস্তবতা স্বরূপ কোথায় যে একটি বিশেষ রূপ পাইতেছে তাহা আমরা ঠিকমতো বলিতে পারি না, কেমনভাবে তাহা নকশা হইল, কীভাবে বা কোন প্রয়োজনে! সীমা কথাটা শিল্পের পরিমাণ কথাটা বিজ্ঞানের; কিন্তু এমন নয় যে যাহাকে আমরা সীমা বলিব তাহাই পরিমাণ। এখন এই নকশাগুলির সঙ্গে সাধারণত বাংলার যোগ বহুদিনের, পৃথিবীর অন্য দেশের সঙ্গে যোগসূত্র নাই বা আছে, সেকথা তুলিতে চাই না, কারণ বাংলার আপনার বাস্তবতা আর মাধুর্য এতই উচ্চশ্রেণীর যে তাহা নিজেই প্রমাণ দেয় যে আলপনা আমাদের বহুদিনের। ধূসর সমতলভূমির উপর যে নকশা, তাহার একটি বিশেষ রূপ আছে, এটা হয়তো বলা ঠিক হইবে যে, স্থান যখন প্রকৃতির, আলো যখন সূর্যের তখন মনের রহস্য বুঝি বা এমনি করিয়াই স্থান লয়। ফলে ঠিক সেই সীমা হইতে নিজস্ব দৃষ্টি অন্য সব কিছু ছাড়িয়াই দেয়, এবং থাকে শুধু রেখা টানার ক্ষমতা এবং এমন করিয়াই নকশার সৃষ্টি। এটা আমাদের নিজস্ব ধারণা, এই খোলামেলা জায়গাটা কেমনভাবে একের কল্পনা, তাহার সঙ্গে মিশিয়াও জুড়িয়া থাকে, তাহা উপর হইতে দেখার বিচিত্র বাস্তবতা, আর রেখা-সমন্বয় একটি রসের সন্ধান দিয়াছে। পর পর লক্ষ্মীর পা-গুলি কী অদ্ভুত; প্রকৃতি যেমন পাথরের উপর দিয়া চলিয়া যায়, একটি অদ্ভুত রূপ দান করে, কে জানে আলো বহু আলো আর স্থান দৃষ্টির উপর দিয়া চলিয়া গিয়াছে, আর এই বাস্তবতা। প্রায় ব্রতের সবটুকুই হইতেছে খোলামেলা জায়গায়, মেলা জায়গা ঘরের মধ্যেও হয়, কিন্তু খোলা কথাটার এই অর্থ যে, সেখানে আলো আছে। আলোর মধ্যে বসিয়া, খোলা জমির উপরে বসিয়া তাহার আঁকার শুরু, পিটুলির রং সাদা, এই শ্বেত রং আলোকের নামান্তর, ফলে কোন অন্ধকারকে মেয়েটি কল্পনা করে না, যে অন্ধকার তাহাকে সব সময় এড়াইবার চেষ্টা করিতে হয় না, যেমন করিতে হয় সেই তাহাকে, যে চেষ্টা করে, আলো আর ছায়ার (কালো) একটি নাটক সৃষ্টি করিতে!
বাংলার মেয়েদের এই যে শুদ্ধজ্ঞান কবে হইতে হইয়াছে তাহা কে জানে, হয়তো মসলিনের বহু পূর্ব হইতে এই জ্ঞানের শুরু। সমতল ক্ষেত্র আঁকা হয় বলিয়াই রেখা কোনও সময়ই আলোকে উদঘাটন করে না, কেন না এই রেখা ঠিক যাহাকে বলে আলোর একটা হিসাবে তাহা নহে, ব্রতের রেখাচিত্র এই কারণে খুব নূতন, যদিও রেখার দিক হইতে এটি চিরকল্পিত তবু, কেননা পাশাপাশি অন্যান্য রেখার ধরন সম্বন্ধে মেয়েরা অভিজ্ঞ ছিল, বাড়ির রাধাকৃষ্ণের পট, সরা ইত্যাদির পদ্ধতি সম্পূর্ণ আলাদা, সেই ধরন দেখা সত্বেও নিজেদের ব্রতচিত্রকে তাহার পূর্ণরূপ হইতে কোনওদিনও সরায় নাই। ব্রত-চিত্র যাহা ছিল তাহাই আছে। ব্রত-চিত্রের সর্বাধিক বড় গুণ সীমাবোধ, মিলিত করিয়া হইয়াছে, স্থানে। আলোতে এবং দৃষ্টি ও কথনে, বিশেষত যখন এই সব চিত্রবিচিত্রের সম্মুখে এক একটি ফুল ধরা হয়, ইহার সত্যই কী অর্থ হইতে পারে, তাহা নির্ণয় করা অসম্ভব, ব্রতের ফুলের খুব বাঁধাধরা নিয়ম নাই, জবা দিয়া বৈষ্ণবের পূজা হইবেই না তাহা নহে। এখন ফুলের রং কী রংয়ের কাজ সারে তাহা আমরা জানি না। হইলেও হইতে পারে, না হইলেও কোনও কথাই নাই। সে যাহাই হোক, আর একটি কথা আমাদের বিশেষ স্মরণ করায়, যে তাহার সমস্ত প্রকারই বিশেষ আকর্ষণ করে, চিত্র রূপান্তরের বেলায় তাহার একটি বিশেষ সমতা আছে, যে কোনও ব্রতের চিত্র দেখিলেই মনে হয় তাহার মধ্যে অধোদৃষ্টির চিহ্ন বর্তমান এবং সেই অধোদৃষ্টির বাস্তবতা অধোদৃষ্টি দিয়াই আঁকা হয়, চোখের তলার সমতল জমির উপরে। ইহা কোনওক্রমেই তাহার সমস্ত কিছুর বাস্তবতা ছাড়াইয়া যায় না, এই ক্ষেত্রে দেখা যায় সেই কারণের আলোকেই মেয়েরা প্রাধান্য দিয়াছে বেশি। সেঁজুতি-ব্রতের আলপনার ধরনটা সংস্থানের দিক হইতে এবং সে সংস্থান সমস্ত আঁক-কাটা আঙ্গিক দিয়াই সম্পন্ন হয়, তাহার রূপটা কীরূপ তাহা আমরা টের পাইব। এখানে বাস্তবতার কোনও চিহ্নই নাই, সমস্ত সংস্থানের মধ্যে যতগুলি আকৃতি আছে, তাহা প্রথম চোটে দেখিলে মনে হইবে গুহাবাসীদের সৃষ্টির স্বরূপ, কিন্তু আদতে মাটির উপর পিটুলি দিয়া আঁকা যখন থাকে তাহার রূপটা অন্য, সেখানে আলো, যাহাকে শিল্পী পূর্বেই মানিয়াছে, সে আলো সমস্ত সংগঠনকে বাস্তব করিয়াছে ঘের-চেতনার দিক হইতে। ছবিটা যেমন শিশুকল্পিত নহে, তেমন সংস্থানও তাহার শিশুকল্পনার নহে, কেননা আকৃতির রূপভেদ বেশ ভালভাবে লক্ষ করার বস্তু, ছবিটিতে বিভিন্ন ধরনের আকৃতি আছে এবং ইহাতে শিল্পীর চেতনার একটু পরিচয় পাই। আর ঘের-চেতনার বিশেষত্ব আমরা বুঝি, যখন দেখি ছবিটার তলার দিকে অনেকখানি স্থান শূন্য রাখা হইয়াছে। এই ছাড়টি অন্য দেশের পূরাতন চিত্রে এইভাবে নাই। ইহা বিস্ময়কর!
ঘের নাই অথচ স্বয়ংসম্পূর্ণ চিত্র হইতেছে, ‘হাতে পো কাঁকে পো’র আলপনা – এটির কাহিনি না শুনিলেও এই ছবিটি দর্শককে অত্যন্তই আকর্ষণ করে। ইহাকে ঠিক কী ধরন বলা যাইবে, ভাব না প্রতীক, না জ্যামিতিক, সত্যই ইহার সীমাটা কোথা হইতে আসিয়াছে, তাহা বুঝা যায় না। অথচ সরল সংস্থানের কোনও চিহ্ন এখানে নাই, তাহা থাকিলেও আমরা একটা কিছু বলিয়া নিশ্চিন্ত হইতে পারিতাম, ছবিটি একটি সরলতার নিদর্শন কিন্তু তাহার সংস্থান অত্যন্ত বুদ্ধিদীপ্ত। সাধারণ ব্রত চিত্রে যে স্বাধীনতা নেওয়া হয়, তাহা এখানে আরোপ করা হয় নাই; ছেলেগুলিকে খুব ছড়াইয়া সাজানো যাইতে পারিত, কিন্তু মধ্যের বড় আকৃতির সঙ্গে তাহাদের এক নৈকট্য আনা হইয়াছে, হইলেও সমস্ত জিনিসকে একটি নকশা করা হয় নাই তাহা বুঝি তাহার সামঞ্জস্যের অভাবে। এখানে, একথা লক্ষ করা যায় যে, শিল্পীর পটু হাতের এক এক ঘায়ে এইগুলি মাটির উপর রূপায়িত হইয়াছে এবং সবদিক হইতে এই কথাই মনে হইবে সংস্থানের দিক হইতে ইহার মোটামুটি মূল্য আছে। সংস্থান জিনিসটা প্রাণ পায় খুব সাধারণভাবে তাহার ঘেরের দিক হইতে। সমস্ত দেশেই সংস্থানকে যখন মূল্য দেয় তখনই ঘের কথা থাকে, যদিও খুবই অপ্রত্যক্ষভাবে। এখানে এই সংস্থান স্বয়ংসম্পূর্ণ। যদিও ঠিক ভাস্কর্যের মতো নয়, ইহার সীমা প্রত্যক্ষভাবে আসিতেছে, ইহা আঙ্গিকগত, বস্তুগত নয় – ! এবং এই সংস্থান সম্পূর্ণভাবে দিনের আলো ও স্থানকে কোনও রকম ব্যাহত না করিয়া চিত্ররূপে তাহার মধ্যেই রহিয়া গিয়াছে। এই ধরনটি বা এই বাস্তবতাটি বাংলার নিজস্ব। তাহার সীমাকে কেমন করিয়া সংস্থানের কাজে প্রয়োগ করিতে হয়, সূর্যকে সে মানে, স্থান তো অপরিহার্য! ঠিক রূপটি অন্য কোথাও আছে বলিয়া আমাদের ধারণা নাই।
ব্রত বঙ্গীয় শিল্পাঙ্গিকের প্রথম ও প্রধান আলোক। সমস্ত বঙ্গদেশের বাল্যকাল এই বাস্তবতার উপর নির্ভর করিয়া গড়িয়া উঠিয়াছে এবং জীবনকে বহুযুগ ধরিয়া একটি নূতন বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় করাইয়াছে। ভগবানকে ভক্তি করিবার চেতনা বাংলার নিজস্ব, যদিচ বেদ ছিল, যদিচ দেশে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের রূপ ছিল, তাহা হইলেও বাংলার আধ্যাত্মিক চেতনা তাহার নিজের, তাহা আমরা জানি। এবং ঠিক এমনিই ঘটিয়াছে শিল্পের বেলায়। শিল্পচেতনা তাহার প্রাণস্বরূপ, যে চেতনা বিষয়কে নূতনভাবে নিজের করিয়া দেখিয়াছে, কোনও যুদ্ধ তাহাকে খর্ব করে নাই, মন্বন্তর পারে নাই, বন্যা নহে। অবশ্য অদ্য সে-বাংলাকে কাবু করিয়াছে রাজনীতির মহামারীতে। বহু রাজা ইতঃপূর্ব্বে আসিয়াছে, গিয়াছে, কেহই রাজনীতি করে নাই, ফিরিঙ্গিরা রাজনীতি করিয়াছে এবং সর্বনাশ করিয়াছে। এবং আমাদের সমস্ত সত্য, সমস্ত বাস্তবতা ইতিহাস হইয়া গিয়াছে; এ বাস্তবতা বাংলার কাহারও মাঝে ধরা দেয় নাই। এমন কেহ নাই, যাহার মধ্যে এই বাস্তবতা ঠিকভাবে কাজ করিতে দেখা যায়। প্রথমত অনেকের ধারণা এ চেতনা আদিমের। যে চেতনা সত্য তাহা আদিমের হউক, আর বুদ্ধের হউক, চৈতন্যের হউক কোনও কিছু ক্ষতিবৃদ্ধি হয় কি? সুধী পাঠকবর্গ নিঃসন্দেহে একথা স্বীকার করিবেন। ইহা ভিন্ন অনেক বস্তু হয়তো ব্রতের কবিতার মধ্যে আছে, তাহার কারণ হিসাবেই; তাহা হইলেও ছবির মধ্যে স্থান পায় নাই, এখানে প্রত্যহের বাঁচিবার ধর্ম কল্পনায় ছিল না, যাহা ছিল তাহা অন্য, যাহা ছিল তাহা যে কোনও কালের যে কোনও মেয়ের মনস্কামনা! একেবারে মেয়েদের নিজস্ব। প্রকৃতির মধ্যে শুধু ভয়, প্রকৃতির মধ্যে শুধু শত্রুর আবাস, এই কথা তাহাকে বিভ্রান্ত করে নাই। সাধারণত সাপ একটি প্রাণী, যে একটি বিশেষ অংশ গ্রহণ করে, সে দৃশ্য এখানে নাই, আর নাই জানোয়ার। শুধু আছে মনুষ্যোচিত ভাব এবং অনুভব, এই মনুষ্যোচিত কল্পনা এখানে, পিছনে প্রাণলীলা। এবং এই কারণে আরও নয় যে ব্রতের রূপ সমগ্রভাবে দের-চেতন, যে তাহার কাব্যে রসচেতনা আছে। আর এক সত্য আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, তাহা হইতেছে এই যে ব্রতের কামনা সব সময় বাস্তব কল্পনা করে, মনস্কামনা পূর্ণতা পাইতে চায় – কিন্তু তাহার ছবিগুলি, আলপনাগুলি তাহা হইতে পৃথক। দেখিয়া মনে হইবে, কোনও কাব্যের কোনও রূপের কল্পনা ইহাকে অনুপ্রাণিত করে নাই, সে যেন তাহার বিষয়বস্তুই নয়, আপনার ধর্মে আপনিই চেতনা লাভ করিয়া আছে। তাহার যাহা কিছু রূপ পরিণতি তাহা সাধারণত দৃষ্টির দিক হইতেই ঘটিয়াছে। অতএব তাহার তথা ব্রত-আলপনার লীলাটা নিজের মধ্যেই আছে অব্যাহতভাবে চিরকাল। বাংলার মেয়েরা শিব গড়ে, পুতুল গড়ে নিজেরাই – অতএব রূপের ‘ডাইমেনশন’ সম্বন্ধে চেতনা তাহার ছিল, কেননা বাস্তব করার বাসনা একান্ত ছিল, সে কথা আমরা জানি।
এবংবিধ চেতনার বাস্তবিক রূপ কাজ করিয়াছে, পূর্বেই বলিয়াছি। এবং কেমনভাবে রূপান্তর হইয়াছে তাহা আমরা বুঝিয়া দেখিব।
সভ্য মানুষের প্রাণান্ত চেষ্টা দেখি যে, তাহারা শিল্পকে ভাবিতে চাহে। ইহা জানি, শিল্প ভাবিবার নহে। কতটুকু সে স্বরূপ পরিত্যাগ করিয়া আর পাঁচের মতো ভাবনার বিষয়বস্তু হইবে, বা ভাবনা কতদূর একস্তরে গেলে সে শিল্পকে ভাবিতে পারিবে, তাহা লেখার নহে। একথা যথাযথ যে, শিল্পের একটি নিজস্ব বাস্তবতা আছে। এতক্ষণ এ কথা আমরা আলোচনা করিয়াছি, অধিকন্তু সে বাস্তবতা যাহার সহিত মিশিয়া আছে তাহা দৈনন্দিন আলোকের বেশ খানিক, এবং বাস্তবতার এক তরফে আছি আমি- আপনি- সে, সেই হেতু আধখানাই বরাবর পাই। তাহা হইলেও এই বাস্তবতা আর সেই আলোর যোগে এক লৌকিক বাস্তবতার সৃষ্টি সম্ভব হয় এবং যখন ঠিক আমাদের, সম্বন্ধের সেই বাস্তবতা ঠিক আর তেমনটি থাকে না, সে যে এক রহস্যে পরিণত হইয়াছে তাহা এবং আমাদের সম্বন্ধের কথা মনে মনেই রহিয়া যায়। সেই বাস্তবতার সহিত শত ইচ্ছাতেও সম্বন্ধ পাতানো আর সম্ভব হয় না। তাহার নিকট তাহা একান্তই অবস্তু; অবস্তু নিয়া কতটুকু কাঁহাতক ভাবিতে সক্ষম, বিশেষত আঙ্গিকতা যখন নিছকই অবস্তু ভিন্ন আর কোনও কিছু নহে!
অস্তিত্বের সঙ্গে স্থান নিয়া যে বাস্তবতার সৃষ্টি তাহার একটা অর্থ আমরা স্বভাবতই পাই। তাহার কারণ এক হইতে বহু। একটি কারণ এই যে, সেই স্থান দিয়া যে জিনিস গড়িয়া উঠে তাহার সার্থকতা আমরা দেখিয়াছি, তাহা একটি বাঁধাবন্দীর মধ্যেই, নিয়মের মধ্যেই । ঠিক ইহার উপর আমরা দেখি আলো আসিয়া পড়িয়াছে, এবং স্থানটা প্রত্যক্ষ হইয়া উঠিয়াছে, নিখুঁত সত্য, এ সত্য কতটুকু একজনকে স্পর্শ করিয়াছে? অণুমাত্র কদাপি নহে, ইহাই একটা ছল মাত্র, স্থানের কোনও অস্তিত্বকেই স্বীকার করা হয় না, বে-বারের হাটখোলার মতোই তাহা পড়িয়া থাকে। সে হয় সময়, যাহাকে আমরা এক বলিয়া মানি, সময়কে আমরা স্বীকার করি। আর সেই বশে ক্রমাগতই স্থানকে পরিক্রমণ করি, এমনও কী আলো, তাহাও যে সেই সময়। আমাদের নিকট সুন্দর হইতেছে সময়। সময়ই মানুষের প্রাণে বাস্তবতা হইয়া উঠিয়াছে।
কিন্তু, যদি আমরা শিল্পের মধ্য হইতে পৃথিবীর দিকে চাহি আর দেখি আর ভাবি, দেখিব যে তাহা আশ্চর্যের, দেখিব যে শিল্পে সময়ের কোনও সূচ্যগ্র স্থানও নাই! স্থান আর আলো, এ দুই সনাতন দুইটিই আছে। সময় লইয়াই, তাহাকে আশ্রয় করিয়া বাঁচিতে গিয়াই, আজ পরিণতির শেষ দৃশ্যে আসিয়া দাঁড়ানো গিয়াছে। যদিও অপ্রত্যক্ষভাবে স্থানের রূপ আছে, যদিও আলোর উল্লেখ দেখি, কিন্তু সেই রূপ এতটুকু সত্যদীপ্ত নহে। বহুদিন হইল সময় নিজের ক্ষমতা পাইয়াছে, এবং তাহার দৃঢ়তা অস্বীকার করা বা ভাবা যায় না। তবু বলিতে হয়, সময় রূপটার সঙ্গে কোনও সম্বন্ধ নাই প্রকৃতির, শুধু ইহার অস্তিত্ব মানুষের মধ্যেই, এবং কোনও সত্য সে দেয় না, না তাহার নিজের আছে।
এবং যে সময়ধর্মী তাহার পক্ষে, সাধারণত দেখা যায়, একেবারে স্থানকে মানিয়া লওয়া বা তাহার সত্যকে তথা বাস্তবতাকে মানিয়া লওয়া, বা সেখানে জীবনের লক্ষণ আছে কী না আছে সেকথা যাচাই করিয়া দেখা সম্ভবপর নহে। কেননা সঙ্গে সঙ্গে আলো আছেই, সে আলো তো শুধু কিরণসম্পাত নয়, যে যা হোক করিয়া সারিয়া দিলাম; এ বিষয়ে ভাবিবার প্রয়োজন, এবং সেই আলোকে স্বীকার করার ধারা অন্য। যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার বাস্তবতার উপর দিয়া তাহার বিস্তৃতি লক্ষ্য হইতেছে, উপলব্ধি হইতেছে, আলোকে এইভাবে স্বীকার করা হয় যে, সে চলমান সময়ের জন্যই। তাহা ভিন্ন তাহার অন্য সত্তা নাই। অবশ্য একথা প্রযোজ্য যে নিছক আলোককে স্বীকার করার মন আমাদের নাই, এখনও সম্ভব হয় নাই, সব ক্ষেত্রেই সে কোনও না কোনও সম্বন্ধেই আসে।
স্থানের সম্বন্ধে যে-আলোকলীলা তাহাই আমাদের ধর্তব্য। আলো আর স্থান মিলিতভাবে রস সৃষ্টি করে। স্থান যখন আলোকে উল্লেখ করে, আলো যেমন স্থানকে, সে রূপলীলা আমার যে বাস্তবতা দিয়া রূপান্তরিত হয়, সেই হইতেছে ছবি। একথা সকলেই স্বীকার করেন যে, এ সমস্তই একটি পটভূমিকাকে আশ্রয় করিয়া দাঁড়ায়, তখন আমরা তাহাকে গ্রহণ করি। আর সে ক্ষমতা বহুলোকের আছে।
সে ক্ষমতা নিজের কাছেও গোপনে থাকে, সেই গোপনতা যখন একজনের কাছে সম্যকরূপে তাহার সমস্ত লক্ষণ লইয়া দেখা দেয়, এবং সেই একজন যখন আমাদের সে কথা বলেন তখনই তিনি শিল্পী বলিয়া পরিগণিত হন।
ছবির কতগুলি দিক আছে, তাহার বস্তুগত দিক হইতে তাহা আমরা বুঝিতে পারি। পট নিজেই এক; যখন তাহাকে ছবি আঁকার জন্য প্রস্তুত করা হইল, চোখের সামনে যখন দণ্ডায়মান, তখন বিস্ময়ের সঙ্গে দেখা যাইবে যে তাহা নিজেই এক রহস্য; সে রহস্য ভারি অদ্ভুত। এবং বৈদিকরা যে সংশয়ের সম্মুখে দাঁড়াইয়াছিলেন, ইহাও ঠিক সেইরূপ। শুধু ইহা নহে, আর সেকথা খুবই অকিঞ্চিৎকর যে শুধু রূপের রূপান্তরের জন্য একখণ্ড স্থান, এবং স্থান বৈ আর অন্য নহে। আশ্চর্য তাহার এক দিকে আলো, অন্য পক্ষে অন্ধকার। পটের উপর আলো পূর্বাবধিই থাকে, পরে তুলির টান তাহার স্থান সৃষ্টি করে, এই সত্য। না, স্থান সেখানে আছেই এবং আলো টান পরম্পরা আসে। এ রহস্য বৈ অন্য আর কী! এই বাস্তবতাকে কীভাবে আমরা মানিতে পারি, তাহা আমরা দেখিব।
পটের নিজস্ব সীমা নাই, তাহাই তো রহস্য, যেমন আছে অঙ্গের দিক হইতে কাঠের বা পাথরের, তাহাকে মানিতেই হয়। পটরহস্য অভিনব।
সম্মুখের এই বাধা ক্রমাগত শিল্পীরা আপনকার লীলাস্বরূপে ভাঙিতে চেষ্টা করিতেছে। এ ইতিহাস সৃষ্টির ইতিহাস অপেক্ষা হৃদয়গ্রাহী। বাংলার শিল্পীরা একভাবে রূপপরায়ণ হইয়াছে, অন্য দেশে অন্যভাবে উৎসাহিত। সমস্ত ক্রিয়া-কাণ্ডই আন্দস্বরূপ। কেননা এই বিষয় কার্য নহে, কারণ নহে, এই বিষয় শুধুই শুদ্ধভাবে রূপ।
এই যুদ্ধের কথা, প্রতিনিয়তই যথাযথভাবে যাহা শিল্পীর মনের মধ্যে ঘটিতেছে প্রতিনিয়তই নবপ্রেরণায় উদ্বুদ্ধ হইয়া যে তাহাকে আমরা দেখিতেছি, সে সংঘাতের জন্য প্রস্তুত হইতেছে, সংঘাত করিতেছে-সে কথা কাব্যময়, এবং তাহা লইয়া হয়তো কাব্য রচনা করা যাইতে পারে। এ কথা সকলেরই ভালোভাবেই প্রত্যয় হইবে যখন সে সমস্ত কিছুকেই দেখিতে পাইবে দিনের আলোয়। এ সংঘাত মানুষের, শতহস্ত মানুষের, একটি হাতের কভু নহে। এ সংঘাত অন্য, ইহার সহিত বিজয়ী মানুষের কোনও সম্পর্ক নাই। কেননা এ সংঘাত নিশ্চয়াত্মক মনপ্রসূ, শান্ত একের, সৌম্য ব্যক্তির!
এখন পটের এ রহস্য কোন দূরত্ব অতিক্রম করে, দৃশ্যের মধ্যে ছোট অন্ধকার, এ পারে আমি বা আমরা। এ ছোট ব্যবধানকে আমরা ভুলিয়াই আছি, কবে যে সে আর নাই তাহার কোনও লেখাজোখা নাই। সেটা নাই, কিন্তু এক-একবার নিজস্ব অভিজ্ঞতায় দেখি তাহা যায় নাই, তাহা রহিয়াছে, তাহার অস্তিত্ব বেশ অক্ষুণ্ণ অবস্থায় আছে। কিন্তু দূরত্বের ওপারে সেই রহস্য অদ্যও সম্যক বর্তমান। এই দূরত্বই হইতেছে বাংলার শিল্পের প্রাণ-স্থান। এই দূরত্ব যত বেশি সঠিকরূপে পরিগণিত হয়, শিল্পের আঙ্গিককে স্বকীয়তা দেয় তাহাই প্রমাণ। সেই দূরত্বই একটি সত্তায় পরিণত হয় (আছেই), সত্য বলিয়া মানে, তখনই সম্পূর্ণতা আসে।
চোখের একটি নিজস্ব সত্তা আছে, সে মন নহে। তাহার নিজস্ব একটি রূপ গ্রহণ করিবার ঢং আছে, সেখানে সে নিশ্চয়! একথা তাহার নিকট সত্য, দৃশ্যমান জগতের, তাহার সমস্ত কিছুই, তথা একের সঙ্গে সম্বন্ধ একের, রংয়ের সঙ্গে রংয়ের। আমাদের খানিকটা সেখানে যোগ হয় না, তাহার সমস্ত প্রতিবিম্বিত হয় আপনকার রূপেই; পরিপাটি ঠিকভাবে, সেই অস্তিত্বের উপর কোনও ইচ্ছাই ছায়াপাত করিতে সক্ষম হয় না। বহুতর মানুষের ঘটনা সংঘাত সেখানে কিছুই করিতে পারে না। দেখার রূপকে রূপ বলিয়া গ্রহণ করা বড় কঠিন, আর যেখানে সময়ের চিহ্নমাত্র নাই, কোনও হেতু নহে, আর তাহাকে আরোপ করা সম্ভব নহে। সময়টা বহু পরে আসে। চোখের স্বকীয়তাকে আমরা বহুদিন ভুলিয়া আছি, ঠিক তাহার সীমাকে আমরা কোনওখানেই মানি না। সেই সীমাকে সুন্দর বলিবার চেষ্টা আমরা করি না। কিন্তু তাহাকে না উপলব্ধি করিলে ছবিকে আমরা কিছুই বুঝিতে পারিব না। শ্রীচৈতন্য সমুদ্র দর্শনে একদা বলিয়াছিলেন, কিছু নাই দেখিবার, সৌন্দর্য মনেতে যাহার আছে, সে দেখিতে পারে, এবং তাহারই ভালো লাগে। দৃষ্টির লীলাই এইখানে স্মরণ করা যায়, আর তাহা সত্য। সেই সীমাকে সর্বভাবে জীবনের অস্তিত্ব ছাপাইয়া গিয়াছে, তাহাকে নিশ্চিহ্ন করে এবং নিজের বাস্তবতাকেই প্রতিষ্ঠা করিয়াছে।
আজব এই বাস্তবতা, আমাকে-আপনাকে জড়ই করিয়াছে, জড় ছাড়া আর কী বলি! জীবন দুর্ঘটনার সমন্বয়, তাহার ঘটনাপরম্পরা তাহাকে অস্তিত্ব দিয়াছে এবং বুদ্ধি দিয়াছে, এবং মানুষকে ক্ষমতাবান করিয়াছে। সে ক্ষমতার মূল্য আমাদের দিক হইতে কতটুকু, কেননা সমস্ত দৃশ্যমান জগৎ তাহাকে সমভাবেই স্পর্শ করে, একটি মাত্র রূপেই আসে, যেটা সে ব্যবহার করিতে পারে। এ বাস্তবতায় আমরা আমাদের সীমাকে তুচ্ছ করিয়াছি, সীমা যে কী বিরাট সত্য তাহা ভুলিয়াছি। এবং বেশ বুঝা যায় এক জায়গায় আমরা জড় হইয়া আছি, ক্রমাগত জড় হইয়া যাইতেছি। আপনকার প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের কোনও সম্বন্ধই আর নাই, আলো উদঘাটিত কোনও সত্যের সঙ্গে পরিচয় করায় না।
আমাদের সে দৃষ্টি কোথায়, তাহা আমরা ঠাহর করিতে পারি না, কেননা সাধারণ জীবনের সঙ্গে এর কোনও যোগ নাই, যে দৃষ্টি শ্মশানের আগুনের সম্মুখেও নিরপেক্ষ থাকে, জীবনকে যে শাসন করে, জীবন যাহাকে ভয় করে, লক্ষ্মী বলিয়া মানে। সেখানকার আলো আর তাহারই সম্বন্ধ কিছু একটি অস্তিত্ব সৃষ্টি করে, সুস্পষ্ট অস্তিত্ব, যে অস্তিত্ব হেতু নহে, উপলক্ষ নহে। সেই বাস্তবতা কই, সে দৃঢ় কড়া বাস্তবতা, যাহা মরিয়াও মরে না, চিরস্থির এবং যাহা বাহিরকে দিয়াছে অবিচলিত অমরতা, সত্যই যাহার সত্য নিয়া অদ্যও মানুষ নির্ভীক! সর্বাধিক বড় রহস্য আমার সম্মুখের বিস্তৃতি, আর দৃশ্যমান সমস্ত স্থাবর-জঙ্গম তথা জড় ও প্রাণ! চোখের সঙ্গে সম্মুখের এই জগতের পরিচয়, এই জগতের আত্মীয়তা বিস্ময়কর! চোখই সমস্ত প্রমাণের শীর্ষে, আর সমস্ত প্রমাণই তাহার তুলায় কিছু নহে। অদ্য সে চোখের সত্তায় আসিবার মস্ত এক আহ্বান সর্বত্রই! দৃশ্যমান জগতকে দৃশ্য বলিয়াই মানিতে হইবে।
সমস্ত ইন্দ্রিয়ই অন্য একীভূত হইয়াছে, কোন কিছুর সীমা তাহার নিজের রূপের মধ্যে আবদ্ধ নহে, চোখে-হাতে-কানে-নাকে-মুখে কী অদ্ভুত এক জট পাকাইয়াছে, কী ভয়প্রদ! কেমন করিয়া এই জট খোলা যায়, তাহা ভগবানই জানেন। ইন্দ্রিয়কে ইন্দ্রিয় বলিয়া উপলব্ধি করা শুধু যোগের কাজ নহে, পরন্তু নিজের বাঁচিবার কাজ, ভদ্রভাবে যাহাতে বাঁচা যায় তাহারই একটি একমাত্র পন্থা। যে মানুষের ইন্দ্রিয়ভেদ নাই, সে জ্ঞানহীন।
সেই ইন্দ্রিয়নিচয়কে প্রত্যহের ঘটনা কেমনভাবে এক করিয়া দেয় সেই কথা সাহিত্যের, ফলে সমস্ত কিছুই অচেতন হইয়া যায়, আর তাহার স্বকীয় চেতনা থাকে না। সময় এ সকলের বিকার সৃষ্টি করিয়াছে, সমস্ত কিছুই সময়ে পরিবর্তিত হইয়াছে। মৃত্যুভয় কালকে মানে, সেও মহাজীবনের হেতু। সময়ের সংস্কার ভয়ংকর, কিন্তু আমরা এই কথা বলি না, এ সত্য মানি না। ছবিকে ছবি হিসাবেই দেখিব।
আলোকই জীবনের কারণ, এবং আদি পুরুষ। আর তৎপরে এ দৃশ্যমান সৃষ্টি-রহস্য।
বাংলার শিল্প কখনওই সেই কথা ভোলে নাই। যতটুকু সাহস তাহার মধ্যে দেখা যায় তাহা অত্যন্ত নির্ভীক। দূরত্ব এবং সেই দূরত্বের পরই বিস্তৃত আলোক, আর আলোক-আবিষ্কৃত স্থান – এ দুই সত্য বলিয়া মানিতে সাহস চাই। আলোকে কেমনভাবে তাহারা রূপান্তরিত করিয়াছে, সে আমরা দেখি। শুধু তাহা বস্তুর মধ্যে নহে, লাবণ্যটাকে আনিয়াছে নিজের অর্থেই ও বিষয়গতভাবে। আলোকে এতাবৎ আমরা অভ্যস্ত হইয়াছি দেখিতেই, ব্যক্তিগতভাবে তাহার সত্তা আছে। তাহাতে এটা বিশেষ বুঝায় না যে সেই পদ্ধতিতে বস্তুর গুণই শিল্পীর উদ্দেশ্য নহে, পুরাপুরিই তাহাতে অর্থাৎ সেই প্রকারে বস্তুর গুণই বুঝানো হইয়াছে, নিজের অনুমানকে সত্যে পরিণত করা হইয়াছে, প্রত্যক্ষের কোনও বালাই সেখানে নাই। বাংলার শিল্পে সেই প্রত্যক্ষের সত্য সম্যক বর্তমান, যে কোনও পট দেখিলেই আমরা বুঝিতে পারিব যে, আলোকে শিল্পীরা কোনওক্রমেই মনগড়া ভাবে খাটায় নাই।
ভাবের ঘরে চুরি করা বাংলার মনে একেবারে নাই, তাই সত্যকে সত্য বলিয়া মানিতে তাহার উৎসাহ বরাবর যথাযথভাবে আছে। আলোর যে রূপ তাহা বিষয়গতভাবে দেখিয়াছে, এখানে সেই কাজ করিতে গিয়া হয়তো অনেক সময় পদ্ধতি তাহার শুধু অবয়ব-আত্মক হয় নাই। অবশ্য অদ্য সকলেই স্বীকার করেন যে, তাহা না হইলেও কিছুই ক্ষতিবৃদ্ধি নাই। নিছক আলোটাই আসিয়াছে তাহা আমরা বেশ দেখিতে পাই। এবং ঠিক এই কারণে তাহার যেমন নিজস্ব আঙ্গিকে আসিয়াছে, তেমনি রংয়ের ব্যাপারেও দেখিতে পাই তাহার নিজস্ব পছন্দ আছে, ঠিকভাবে তাহার একটা সমতা আছে, এবং আলোকে আপনার স্বকীয়তা বিসর্জন না দিয়া প্রাধান্য দিয়াছে, সে প্রমাণ বহু বহু ছবিতে দেখতে পাই। বিষয়গতভাবে আলোকে খাটানো, ইহা আমাদের বহু দিনের, হয়তো এ কারণে অনভিজ্ঞ লোকের মনে হইবে জিনিসটা বহুস্থানে চিত্তির হইয়াছে। কিন্তু সেকথা ঠিক হইবে না, ঠিক এইভাবে আলোকলীলা দেখাইতে, আগেই বলিয়াছি, আমরা অভ্যস্ত নই, তাই ভ্রম হইতে বাধ্য। আর এ আলো শুধু এক বস্তুর সঙ্গে আর বস্তুর সম্বন্ধ ছাড়া আরও বিশেষ অন্য, আলোর সঙ্গে যে চোখের নিকট সম্বন্ধ আছে সেই কথাই বলে। তৈল রং একটি অদ্ভুত অস্ত্র এবং ইহাতে নিজ হইতেই ছবিকে অনেকখানি সাহায্য করে। কিন্তু আমাদের দেশে ছবিতে তৈলের স্থান নাই, যদিও প্রতিমার মুখ পালিশ করা হইত, কিন্তু তাহা অন্য ব্যাপার। শুধু কয়েকটি রংকে সহায় করিয়া আলোর স্বরূপকে উন্মুক্ত করা সত্যই আশ্চর্য। অনেক সময় দেখা যায় রসকলি টানিয়া সে সাক্ষ্যকে পুরাপুরি রাখা হইয়াছে – এ কথা মনে হইতে পারে, কিন্তু তাহা নয়। রসকলির প্রয়োজন অন্য। এবং কতগুলি রং আলোতেও আপনার সত্তায় থাকে এবং থাকিয়া আলোকে প্রমাণ করে। দেখা যাইবে প্রত্যেক রং-ই ব্যবহার করা হইয়াছে নিবিড় নিপট করিয়া, কোথা্য স্বচ্ছতা নাই, এবং তাই অব্যাহত হইয়াছে। এবং রেখামাধুর্য যাহা তাহাকে প্রাণ দান করিয়াছে এবং আলোকে ব্যক্ত করিয়াছে, সে আমরা পরম্পরা দেখিব। আলো শিল্পের চোখের পার দিয়া আসিয়াছে বরাবর, তাহা আমরা টের পাই। আর তাহার সঙ্গে প্রকৃতির একটি আপন স্বকীয়তাপুরঃসর যোগাযোগ আছে।
বহু বহু দেশে যখন রূপের বিষয়ে কথা ওঠে, এবং সেই সংক্রান্ত বহু তর্কের সূত্রপাত হয় – এ যাবৎ সেই প্রসঙ্গে সুধীরা বহু লিখিত বিষয় পাঠ করিয়া থাকিবেন। কিন্তু সে পাঠে আমাদের ছবি সম্বন্ধে বিশেষ কোনও বিশ্বাস জন্মায় না, যেহেতু রূপ যেকালে রূপান্তরিত তাহার সঙ্গে উহার সম্বন্ধ বিশেষ থাকে না। সেগুলি লিখিত বিষয়ের অঙ্গ বৈ অন্য নয়। এবং লিখিত বিষয় ও রূপান্তর দুইটিই আমাদের মতো সাধারণের কাছে এলোমেলো লাগে, আমরা বুঝিতে নারাজ নই, আমরা বুঝিতে পারি না
কেননা আমরা এ যাবৎ দেখিয়াছি, আর আমাদের অভিজ্ঞতা যে, সাধারণ ছবির রূপান্তরিত অবস্থায় একটি বিশেষ ফাঁকি আছে। ফাঁকি বলতে আমরা কোনও নিন্দা প্রকাশ করি না, না সে অধিকার আমাদের কখনও আছে, অবশ্য তাহাকে যদি একান্তই ফাঁকি বলা যায়ই। ফাঁকি আছে এ আমরা অত্যন্ত সরলভাবেই বলিতেছি এবং এও লক্ষ্যের বিষয় যে সেই কাজকে কেহ কোথাও ফাঁকি বলিয়া উত্থাপন পর্যন্ত করেন না, ইহার কারণ হয়তো ইহাকে নিয়া ভাবিবার প্রয়োজন মনে করা তাঁহাদের দিক হইতে ওঠেই না। সেই ফাঁকিটা কী অদ্ভুতভাবে তাঁহাদের নিকট সত্য, একমাত্র সর্বত্রই সর্বৈব সত্য। বাস্তবতার একটি দিকে এ ফাঁকি নিবিড়ভাবে জাঁকিয়া আছে। তাহার অস্তিত্বের অদ্বিতীয় কাঠামো অথবা ভিত্তির উপরে তাহার সমস্ত কিছু গড়িয়া উঠিয়াছে। এ ভিত্তিকে ঠিক সরাইতে পারা যাইবে না, যদিচ ইদানীং ক্কচিৎ দু-একজনের চেতনায় তাহা বিশেষভাবে ধরা পড়িয়াছে, কিন্তু আমরা সেটা শুধু সম্যকই উপলব্ধি করি।
বিশেষত বাস্তবতাবোধের অহংকার পাশ্চাত্য দেশের আছে, বাস্তবতাকে তাহারা ছলে-বলে-কৌশলে আনে, এবং সে কার্যে তাহারা অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দেয়। কিন্তু যদি কথা ওঠে বাস্তবতাকে গোঁসাইরা কতখানি উপলব্ধি করিয়াছেন তাহা হইলে মনে হয় তাঁহাদের একটু চঞ্চল করিবে!
দেখা যায় সাধারণতই উহারা যে কোনও একটি রূপকে তির্যকভাবে রূপান্তরিত করে, অন্যপক্ষে কেহ হয়তো আলোকেও সেইরূপে রূপান্তর করে, অথচ বৈঠকিভাবে বলে, সেকথা বিবেচনা করা দরকার, সোজাসুজিভাবে রূপান্তরের কথা তোলে, সেটা ঠিক উহার উপরে ভিত্তি করিয়াই বলে, ইহাতে তাহাদের বাস্তবতা ক্ষুণ্ণ হয় না। সেটা অনেক দিক হইতে সত্য না হইলেও বাস্তবতার প্রাণস্বরূপ। ইহার অস্তিত্ব একটু কৌতূহলের সৃষ্টি করে। বেশ দেখিতে পাওয়া যাইবে যে তাহা বিভিন্ন দৃষ্টিকোণের একটি যোগফল ছাড়া আর কিছুই নয়, এবং তা একটি দৃষ্টিকোণের সৃষ্টি করিয়াছে। ইহাতে হয় কী, একটি বিশেষ স্থানের উপর আর একটি বিশেষ স্থানের ছায়া থাকে সুস্পষ্টভাবে। এই যোগফল খুবই সাধারণ, ইহা আমাদের দেশের ছবির মার্গে আসিতেই পারে না। ইহাকে তাই আমরা ফাঁকি বলিতে সাহসী হইয়াছি। কেননা চোখের বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গিকে যাহা এক করে তাহা মানুষের স্মৃতি, তথা মন নিশ্চয়ই, সেই হেতু মন তাহার কর্তা হইয়া দাঁড়ায়-চোখ নয়। ফলে দেখা যায় সমস্ত ছবিই একটু বাঁকাভাবে সাধারণ পরিপ্রেক্ষণে আনিয়া ফেলা হয়। সোজাসুজি ভঙ্গির কোনও ছবি আঁকা একেবারে অসম্ভব। সোজা কোনও দৃশ্যকে বিচার করা, অথবা রূপান্তরিত করা একেবারে অন্য রীতির ব্যাপার। সহজভাবে বলিতে গেলে পদ্ধতির অনেক পারদর্শিতা থাকিলে তাহা সম্ভব হয়, নচেৎ তাহা মিথ্যায় পর্যবসিত। এবং এ যাবৎ বাঁকা করিয়া দেখাটাই চলিয়া আসিতেছে এবং এই চিরাচরিত কোণকে অদ্বিতীয় দৃষ্টিকোণ বলিয়াই সকলে মানিয়া নিয়াছে। দেখা যায় অত্যন্ত প্রামাণ্য শিল্পীরাও ইহাকে এড়াইতে পারে নাই। সেই দৃষ্টিকোণকে মানিয়া নিয়াই আলোকব্যবস্থা, আলো ও আঁধার বৈকি; আর দিব্য হইয়া উঠিয়াছে একটি বাস্তবতা, এবং সেই বাস্তবতা নিয়া তাহারা কাজ করিয়া চলিয়াছে। তাহার রংকে ইদানীং বেশ দক্ষতার সঙ্গে ব্যবহার করিয়াছে। রং-কে কখনও বস্তু হিসাবে, কখনও আলোর দিক হইতে ব্যবহার করিয়াছে, বহু বহু ক্ষেত্রে আমাদের ধারণা তাহাদের সাফল্য আসিয়াছে। অনেকখানি পথ পরিষ্কার করিয়াছে আলোকের, রং দেওয়া হইয়াছে প্রতীকী ভাবেই। আলোকের অস্তিত্ব এরকম স্বীকার করিয়া আমরা সাধারণ ছবির সম্মুখে দাঁড়াইয়া দেখিতে পাই তিনটি জিনিস। একটি বস্তু আর অন্যটি তাহারই সম্বন্ধে আলোকসম্পাত আর একটি সোজা দৃষ্টিকোণ। আর অন্য কিছুই দেখা যায় না। অতঃপর একটি নিবিড় অন্ধকার, সৃষ্টির বহু পূর্বের অন্ধকার, যদি প্রাণ সত্যই থাকে তাহা হইলে সে হাতড়ায় অন্য কিছু, সেখানে সে আপনকার বাস্তবতা খুঁজিয়া পাইতে আশা রাখে, সেই হেতু সে নিশ্চেষ্ট নয়। সেই রূপান্তরিত দৃষ্টিকোণ আর এই দৃষ্টিকোণ সকল সময় আড়াআড়ি যায়, কোনও অছিলায় যে কোনও সুযোগের বশে তাহারা আবার মিলিয়া যাইতে পারে না, বাধা ঘটে। যদি কখনও পারে, এমন সম্ভব হইত, তাহা হইলে একথা স্থির যে একটি নূতন সম্ভাবনা চোখে পড়িতই, এড়াইতে পারিত না।
এবংবিধ দৃষ্টিকোণ সাধারণের থাকে, ইহাই মস্ত মর্মস্পর্শী দুর্যোগ। এ দৃষ্টিকোণ সত্য দিয়া হঠাৎ এড়াইয়া যাওয়া কোনক্রমেই সম্ভবপর নয়। একথা যে কতখানি নিশ্চয়, তখনই তা প্রমাণিত হইবে যখন একটু পর্যালোচনা করিয়া দেখা যাইবে। ঠিক এর উপস্থিতি সম্যকভাবে বিচার বিবেচনা করা শিল্পের একটি গূঢ় ধর্ম। এর সীমাকে ছড়াইয়া যাওয়া শিল্পী সাধারণের বেশ মুশকিল। এই মায়াকে পৃথকভাবে দেখা অনুশীলনসাপেক্ষ, এ মায়া অনেককে ভুলাইয়া রাখে। আরও অধিকন্তু সম্মুখে এই পটভূমিকার সহ্য যাহা আঁধার ও আলোকে একটি রহস্যের মধ্যে ধরিয়া রাখিয়াছে, ইহা হইতেই জন্মলাভ করে অনেক কিছু রহস্য, আর বিপদ ঘনায় যখন দুইটি রহস্য মিলিয়া একটি মায়ার সৃষ্টি করে। তখন শিল্পীরা চিন্তিত হন, অস্থির হইয়া ওঠেন, তাঁহাদের কল্পনাতেও এই মায়া নিপট হইয়া ওঠে এবং অনড় বস্তুর মতোই মনে হয়। অনেকে আবার দেখা যায় ঠিক এই কথা উপলব্ধি করিয়াছিলেন, তাঁহাদের একথা চঞ্চল করিয়াছিল। কিন্তু আমাদের সুস্পষ্টভাবে কিছু বলিয়া যান নাই, আমরা সেকথা শুধু বুঝিয়াছি, যেহেতু তাঁহাদের প্রাণ আমাদের তাহা বুঝিতে সাহায্য করিয়াছে যথাযথভাবে।
এখন এই যে ‘অসম্ভব’ আমরা দেখিব কেমনভাবে আমাদের দেশে বরাবর ভাঙিবার চেষ্টা করিয়াছে, এবং সাফল্য ঠিক এই কারণেই হইয়াছে। তাহাদের যে কাজ আছে তাহার মধ্য হইতে বহু পরিচয়ই আমরা পাই, যদিও ছবি হিসাবে আমাদের হাতে খুব কম সংখ্যায়ই আজও আছে, কেন তাহার পনেরো আনা নষ্ট হইয়াছে, তাহার কারণও আমরা জানি।
এর বাস্তবতার সঙ্গে প্রশ্নের রূপের অনেকটা মিল আছে। অবশ্য অনেক দূর হইতেই। প্রশ্নের একভাগে কালো আর অন্যতে সাদা। পুরাপুরি যাহা একটি অবিশ্বাস, সেই অবিশ্বাস তাহার মূল, আবার ঠিকভাবে বিশ্বাসের জন্য প্রস্তুতিও লক্ষ করা যায়। বিবর্ত-আত্মিক তাহাই যাহাকে আমরা বলিব কোনও কিছুর সাদৃশ্য বা লক্ষণ থাকা, বিবর্ত বাস্তবতার পর একটি আধা স্থান জুড়িয়া আছে-কেউ কেউ অতিক্রম করার প্রয়াস মাত্র করি, হয়তো সেখানে সফলতা কেউ লাভ করে। যাক সে কথা। কিন্তু এই যে দৃষ্টিকোণ সমষ্টি সে কোনও নির্দিষ্ট বস্তুকে প্রত্যক্ষ করিতে চায়, আর তাহার পক্ষে আলোকের কোনও অস্তিত্বই নাই। এ দৃষ্টিকোণ সে সাহায্য চায় না, ঠিক ইহার সম্যক রূপ নিয়া আমরা কখনও ভাবি নাই। কিন্তু ইহার বর্তমানতা অস্বীকার করিবার নয়, আমাদের বহু কথাও আমরা জানি না। আমরা অস্তিত্বে অস্তিত্বে বহুতর, কতটুকু সত্যই বা ধরা পড়ে আয়নায়! ভাবিলে সত্যই বিস্ময় বোধ হয় যে কতটুকু ঐশ্চর্য নিয়া আমরা সম্পূর্ণ হইতে চাই!
সম্মুখে এই যে বিস্তৃত সকালবেলাকার ধান খেতটি, সবুজ হইয়া পড়িয়া আছে সকালের রোদে, তাহার কতখানি আমরা সত্যই লইয়া থাকি – তাহার স্থানকে কখনও আমরা লই না, আর তাহাকে কেবলই দেখার ক্ষমতাও আমাদের নাই। সেখানে বুঝিতে পারিব একটি বিশেষ অন্ধকার ছাইয়া আছে। নিছক ভাবে দৃষ্টিকোণের কোনও বাস্তবতা আমাদের সুধী করিবে, আলোই সেখানে একমাত্র কর্তা যাহা সমস্ত কিছুর স্বরূপ হইয়া দেখা দিবে, আলোই একমাত্র বিবর্ত, আর বিস্তৃত স্থান দেখা যাইবে নিজস্ব অস্তিত্বে যাহা এই দৃষ্টিকোণের সম্বন্ধে স্থিরীকৃত হইয়াছে, সমস্ত চেতনা যখন এইটুকু নিয়া অনেকখানি হইয়া থাকিবে।
শুধু একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণের মহিমা আমাদের সম্মুখে যে অন্ধতা রহিয়াছে, অনড় হইয়া আছে, তাহাকে মুছিয়া ফেলিবার কাজে লাগিবে। অন্ধকার আর আলোকের সম্বন্ধকে সম্যকভাব আমাদের চোখের সম্মুখে তুলিয়া ধরিবার চেষ্টা করিবে। আর তাহাকে সৃষ্টি করিবে একটি সম্পূর্ণ পৃথকভাবে, এবং তাহাকে দেওয়া হইবে একটির চেতনার দৃঢ় অস্তিত্ব, যাহাকে কেন্দ্র করিয়া, যাহার সম্ভার লইয়া ক্রমাগত প্রত্যক্ষের আনন্দ উপলব্ধি করিতে পারিবে, সে প্রত্যক্ষ হইতে সমস্ত দৃশ্যের যে কোনও বস্তুই তাহার স্বরূপেই দেখা দিবে; গাছ গাছ, পাথর পাথরই। বিশেষ বিশেষই। আর তাহাই সম্যক বোধ হইবে। আমাদের বিবেচনায় এখানে দেখা যাইবে ঠিক ধরনের দৃষ্টিকোণের সান্নিধ্য লাভ করিয়াছে, প্রায় জায়গা সমস্ত কিছু ছন্দিত হওয়ার রূপটা দেখা যায়, কিন্তু এখানে যে রূপ অব্যাহত হইয়া আছে।
রূপকে রূপান্তর করা ইহার অঙ্গীভূত হইলেও আর এক কল্পনা। লোকচরাচরে সব অস্তিত্বই ক্রমাগত আমাদের অস্তিত্বের উপর দিয়া আসে। ছোট বড় বহু অভিজ্ঞতার সমষ্টিকে কে ধরিয়া রাখিতে পারে? সে অভিজ্ঞতাগুলিকে ঠিকভাবে বশে আনা দুরূহ, কেননা সেইসব অভিজ্ঞতা বড় কাজের, যে জিনিস অপ্রত্যক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে কাজের তাহা কোনক্রমেই উপেক্ষার বস্তু নয়। আর তাহার মধ্য দিয়া সমস্ত দৃষ্টিগোচর বস্তু আসে, কতখানি তা দৃষ্টিকোণের সীমাকে মানে, আর কতখানি তাহা অভিজ্ঞতাকে স্বীকার করিয়া লয়, একতা নিয়া ঝটিতি একটি সিদ্ধান্তে আশা দুঃসাধ্য।
বস্তু একটি বিশেষ কোণে অবস্থিত, পট আর এক কোণে থাকে, ঠিক ইতোমধ্যে সমস্তই অভিজ্ঞতার, ঠিক ইহাকে এড়াইয়া দৃষ্টিকোণের বিশেষ রূপ কতখানি একা আসিতে পারে? মধ্য পথেই তা লুপ্ত হইয়া যায়। আবার তাহাকে খুঁজিয়া বাহির করা একরূপ অসম্ভব নয় তো কী! এমনও লোক আছেন যাঁহারা বেশ জোরের সঙ্গে বলিতে পারেন যে, কেমন হঠাৎ দৃষ্টিকোণ অন্তর্হিত হইল। এবং আবার সাড়া পড়িয়া যায়, আবার কোমর বাঁধা, আবার চেষ্টা নূতনভাবে, আবার নূতন করিয়া তাহার দিকে চোখ মেলিয়া দেখা, এবং তাহারই উপস্থিতিকে সম্যকভাবে মানিয়া নিবার চেষ্টা, যারপরনাই স্বীকার করিবার চেষ্টা করেন।
কিন্তু এখানকার দুর্যোগ অত্যন্ত বাস্তব, অত্যন্ত মন আকর্ষণ করে। দেখা যাইবে তাহার অতীত তাহার অভিজ্ঞতা তাহাকে সব সময় ধাক্কা দিতেছে, তাহাকে একপ্রকার চক্ষু রোধ করিয়া আছে, যাহাতে দিনের আলোতেও তাহাকে ভাবিতে হয় এটা কী! যেহেতু সে অভিজ্ঞতায় সম্যক বর্তমান বহুতর ইন্দ্রিয়ের স্পর্শ। এই ইন্দ্রিয়নিচয়ের মায়া এমনিভাবে দৃষ্টিকে তাহার স্বকীয়তা হইতে উদঘটিত করিতেছে যে তাহা ভাবনার – ফলেই বারংবার দৃষ্টি আমাদের পথমধ্যেই খোয়া যায়। অন্য পক্ষে, আর একটি বৈচিত্র্য দেখিব, তাহা সমানই বিস্ময়কর, যে, যে কোনও দুইটি বস্তু যখন পাশাপাশি একই দূরত্বে থাকে, তখন আমরা যে বিশেষ দৃষ্টিকোণের কথা বলিতেছি তাহাকে ঠিকভাবে মানা, তাহাকে কার্যে পরিবর্তন করা সম্ভবপর নয়; যেহেতু অভিজ্ঞতা, কোনক্রমেই তাহার এই কিম্ভূত খামখেয়ালি অস্তিত্বকে স্বীকার করিতে চাহিবে না, এবং ইহা ছাড়া যদি সম্মুখের কথা আমরা ভাবিয়া দেখি, তাহা হইলে দেখিব – একই ব্যাপার ঘটে। তাহা হইলে যদি সাধারণ স্বীকৃত সহজ পরিপ্রেক্ষণ না স্মরণ করা হয়, এবং সেই পরিপ্রেক্ষণে বসিয়া তাহাকে রূপান্তর করা না হয় তাহা হইলে সকলেই হাহা করিয়া হাস্যলীলা চাপল্যে অস্থির হইয়া সমস্ত আবহাওয়াকে ভরাইয়া তুলিবে।
সম্মুখের কোঁদা থামের পিছনে আরও থাম, এইখানে যথেষ্ট দিবালোক আছে, সমস্ত দৃশ্যই পাঁচজনের কাছে সুস্পষ্ট, আর যখন এই থামগুলিকে ঠিকভাবে দেখার দরকার তখন আমরা তাহাকে দেখি পুরাতন পরিপ্রেক্ষণের অঙ্কে, কেন সেটা মনে রাখা দরকার বেশি, সেই গড়ের পরিপ্রেক্ষণটা কতটুকু ঠিক তা বিবেচনা-সাপেক্ষ, সেই পরিপ্রেক্ষণটা বেশি ছন্দময়, সম্যকভাবে স্থানের দিক হইতে, স্থান যদি বিষয় হয়, তাহা হইলে দেখিব এই পরিপ্রেক্ষণের মূল্য ধূলা।
পাশাপাশি বস্তুর অস্তিত্ব যে কত অদ্ভুত তাহা যদি দেখা যায়, তাহা হইলে বুঝিব কী যে তা ভারি অদ্ভুত। সেখানের আলো, আর এ পাশের অন্ধকার, মধ্যে একটি অদ্ভূত বিধি আছে, আর সেটা লক্ষণীয়, প্রতি বস্তুই কেমন যেন বাঁকাচোরা, একটা থাম হয়তো ঠিকভাবে আসিল, পাশেরটি একেবারে ভাঙা ভাঙা, থামের বিশেষ রূপ যাহাকে অঙ্ক খানিক দিয়াছে, বস্তু খানিক দিয়াছে, সেইরূপ কতখানি ঠিকভাবে থাকে তাহা ভাবিবার।
এমনিধারা পরপর বহু বহু দৃষ্টিকোণের সঙ্গে আমাদের পরিচয় দরকার, কেননা সেটা বাস্তব, এবং সেই পরিচয় করাইয়া দিবার দায়িত্ব একমাত্র শিল্পীর। পরিপ্রেক্ষণ কতকটার সম্যক রূপ বহুলোকের কাছে, আমাদের পাঁচজনের মতোই ধরা পড়ে নাই। সকলই তাহাকে, পূর্বেই বলিয়াছি, একটি বিধিনিষেধের মধ্যে আনিয়াছে, আর সে নিয়ম অত্যন্ত কাব্যের মতন! শিল্পের দিক হইতে তাহারা কোনও অর্থ ঠিক ভাবে উপলব্ধি হয় না।
দেখা যাইবে একটি বিশেষ দৃষ্টিকোণকে বাংলার শিল্পীর মতো কেউ আমল দেয় নাই, যদিচ যেটি দেখা যায় সেটি অন্য বস্তুর বাস্তবতা নয়, নিছক ছাপ। ছবিতে দৃষ্টিকোণের ব্যঞ্জনা একরূপ থাকে না, সেটাও ছন্দের নকসা হইয়া প্রতীয়মান হয় (অবশ্য অন্যান্য নব্য শিল্পী ছাড়া বহুলোক এ দোষে দূষিত), আর তাহা নিতান্তই জ্যামিতিক। কেননা সেখানে অন্ধকার তাহার আপনার সত্তায় অক্ষুণ্ণ রহিল এবং বস্তুবিশেষের গড় রূপটাকেই মানা হইল। সেখানে তাহার সিদ্ধি কতটা হইয়াছে তাহার বিচারের ভার চিন্তাশীলদের কাছে, কেননা মনে হয় যে আলোকে তো ঠিকভাবে দেখিতে পায় নাই। না কিছু, না কোন বিশ্বাসের লক্ষণ সেখানে দেখা যায়। একটি স্থিরীকৃত রূপকে ঝটিতি বিষয়ের উপর সোজা চাপাইয়া দেওয়া কি ন্যায়সঙ্গত? পর পর যে এত রাশি রাশি বাস্তবতা তা কি হেলাফেলার?
যে চোখ দিয়া আমরা দেখি তাহার স্বভাব অতি বিচিত্র, তাহার নিজস্ব একটি ধর্ম আছেই, দৃষ্টিকোণের কতগুলি দৃঢ় সত্য আছে, যে সত্যকে, সেই পটের বাস্তবিকতাকে, রহস্যকে একের বিশেষভাবে মানা উচিত ছিল। সেকথা মানিলেই সমস্ত তর্কের শেষ হইত হয়তো, একথা আমরা পাঁচজন ভাবি। কেননা সেই বিশেষ দৃষ্টিকোণের সহজ রূপ আমাদের সমানই আনন্দ দিবে, যেমন অদ্য গড়ের মিল আমাদের আনন্দ বর্ধন করে।
প্রথম যাহাকে কাগজ আর তুলি দিয়া কোমর বাঁধিয়া অনুশীলন করিতে হয়, চোখের উপর ভারী পর্দার সঙ্গে বারংবার তাহাকে আঘাত পাইতে হয়। সম্মুখের বস্তুটার দিকের পর দিক রহিয়াছে, তাহার আলো আছে, সমস্ত থৈ হারাইয়া যায়। ক্রমে, অন্ধকারে অন্ধকারে সমস্ত কাগজ ভরাইয়া দেয়। ছবির উপর অনেকটা অন্ধকারে লেখা কথা যেমন আঁকাবাঁকা হইয়া যায় তেমনই ঘটে, আলো তাহাকে সাধারণত সমতা দেয়। এইবার দৃষ্টি নিয়া দেখা যাক, দেখা যাইবে নির্দিষ্ট বস্তুর সম্মুখে তাহার দেহ দুলিতেছে একবার এদিক, একবার ওদিক, চোখ ছোট করিয়া চাহিয়া আলোককে নিজের কাজে লাগায়, মন সংযোগ করিতে চেষ্টা পায়। এই মন সংযোগের অপেক্ষা বেশি কি চোখ সংযোগ করার প্রয়োজন আমরা অনুভব করি? এখানে, হয় কী, আপনার দৃষ্টির সঙ্গে সম্বন্ধ ঠিক হয়, আর এক দৃষ্টির সঙ্গে দূরত্ব ঠিক হয়। এই কথার তাৎপর্য আরও পরিষ্কারভাবে উপলব্ধি হইবে যে, যখন কোনও পশু সামনে থাকে তাহার নড়াচড়া বড় অস্থির করে, যতক্ষণ না, একটি স্থিরতার সৃষ্টি যে দিক হইতেই সম্ভব হয়, করার জন্য বড় ব্যস্ততা দেখা যায়। এবং সেই দূরত্ব যখন অভিজ্ঞতার নামান্তর হয়, আলো স্মৃতিরূপ লাভ করে, তখনই উহা রূপান্তরের অপেক্ষা করে, রূপান্তর-লক্ষণ যুক্ত হয়, ফলে আমরা একটা রূপ দেখি।
নূতনের প্রথম অনুশীলন তাই চিরাচরিত, গড় পরিপ্রেক্ষণটিকে চোখের পাশে আনিয়া ফেলা, মনে রাখা। উহাই তাহার মূল সত্য। যেখানেই সেই পরিপ্রেক্ষণ ছক পাইল, একটি বিশেষ সত্তায় আসিল, তাহার আর মাধুর্য অন্তত আমাদের ছবির সামনে দাঁড়াইয়া তেমনভাবে উপলব্ধি হয় না, না তাহা আনন্দদায়ক। চিত্রের মাহাত্ম্য সেখানে লুপ্ত হয় এবং এই ধরনের চিত্র ঠিক শিল্পের পর্যায়ে পড়ে কি না তাহা গুণীজনেরাই বলিতে পারেন। এখানে পরিপ্রেক্ষণ ছবির অন্যান্য বাস্তবতাকে ছাপাইয়া নিজেই একটি যোগ্যতা হিসাবে স্থান লাভ করিয়া সকলের প্রিয় হইয়াছে। অথচ একথা কখনও আমরা বলি না, এই এই গুণ থাকিলেই তাহা ছবি হইবে, আর না থাকিলে হইবে না।
তাই চিত্রকরের আশ্চর্য অনন্য। গাছ লতা পাতা, ওই যে সুদূরে চলমান মেঘরাশি, শ্রেণীরাজি, স্থানস্থাপত্য, বস্তুবিভিন্নতা – এই সব তাহার আশ্চর্যের কতটুকুই বা! আপনার দৃষ্টি ও তাহার বিচিত্র দৃষ্টিকোণ তাহার লীলা-অঙ্গ-তাহার রূপভেদ। এই দৃষ্টিকোণের বিচিত্রতার সঙ্গে সাক্ষাৎ কম শিল্পীরই হয়, অথবা ইহাও হয়তো সত্য, তাহারা আর আমরা সেই স্বতন্ত্র আশ্চর্যের জন্য কোনও ব্যক্তিই প্রস্তুত নহি। কোনও কোনও ব্যক্তি সেই স্বতন্ত্রতার নামে অনেক অদ্ভুতত্ব আমাদের দেখাইয়া চমৎকৃত করে, যাহা আপাতদৃষ্টিতে বিস্ময়কর বোধ হইলেও ঠিক তাহার মধ্যে সত্যের স্বরূপ নাই।
আপনার আশ্চর্য এমনইভাবে পটের উপর রূপান্তরিত হইয়াছে দেখিতে পাই। তাই সকলের চোখেই তা ধরা দিয়াছে, সকলেই, আমরা বুঝিতে পারি যে, এই সব চিত্রশিল্পীর নির্ভরযোগ্য অভিজ্ঞতা এবং এই রূপ তাহার আপনকার বিস্ময়, এবং শিল্পীর সঙ্গে আমরাও আনন্দের ভাগ পাই। বিশেষত আলোকে যেখানে সকলে স্মৃতি হইতে বাহির করিয়া নিয়া আসে, এবং দৃশ্যের উপর যোগ করে এবং আলো যে আমরা পর পর আপনার সুবিধা অনুযায়ী সাজাই তাহা ভুল প্রতীয়মান হয়। ঠিক সেই সময় দৃষ্টিকোণের সম্বন্ধে আলো সে তো নয়, সে যে আর এক লোক হইতে আসিয়াছে – তাহা একেবারে মানস লোক-সেখানে আলোকের অস্তিত্ব নিতান্তই সময়-ঘেঁষা।
রূপান্তর ক্রিয়াই আমাদের কাছে চির রহস্য। আমাদের কাছে তাই রহস্য, সেই বিশেষ অবস্থা, যেখানে দাঁড়াইয়া আমরা সব কিছুর দেখা পাই, যে, তাহা কেমনভাবে সম্ভব হইতেছে! সেখানে আলোকপাত সত্য প্রকৃতিগত, না, নয় এবং আমরা দেখিতেছি সেখানকার আলোক আর আমাদের আলোক এই দুইটি আলোকরেখা মিলিয়া একীভূত হইয়া যায় নিত্যই হয়তো, হয়তো ঠিক এই জন্যই রহস্য বেশি করিয়া ঘনীভূত হয়। আমরা বিস্ফারিত নেত্রে সেইখানে দাঁড়াইয়া ভাবিতে থাকি। শিল্পী তখন আমাদের ছাড়াইয়া বহু দূরে চলিয়া যায়। সেখানে তাহার সমস্ত অস্তিত্ব একেবারে নির্ভর না করিয়া স্থান অতিক্রম করে, কেননা এইখানেই স্পর্শের জগতের শেষ, আর তাহা যাইতে সক্ষম হয় না – কোনও অবলম্বন না পাইয়া পড়িয়া থাকে। হয়তো তখনও তাহার একটা ছায়া থাকে, কিন্তু তাহার সঙ্গে কোনও যোগসূত্র নাই, সেটা খুব নির্গুণ, সে স্পর্শচেতনা তাহার নিতান্ত অশরীরী সে স্পর্শের সঙ্গে রক্তের চাঞ্চল্যের জোয়ারভাটার সম্বন্ধ মনে পড়ে না। সে স্পর্শ তাই রক্তের সম্বন্ধ নির্ভর করিয়া নয়।
শুধু একটা আকার-চেতনা শুধু আকার বুঝায়। আগেই এই কথা সাব্যস্ত করা হইয়াছে যে দৃষ্টির মধ্যে অনেকটা স্পর্শের ব্যাপার আছে। অদ্য যেটা দৃষ্টি সেটা কতখানি দৃষ্টি তা শুধু বোঝা যায় তাহার রূপান্তরের উপর, কেননা, একটি ভঙ্গি নয়, সমষ্টিগতভাবে দৃষ্টিকেই দৃষ্টি বলা হয়, এবং এই সমষ্টিগত দৃষ্টি বিশদভাবে স্পর্শের অঙ্গের কাজ করে, ফলে সকল ক্ষেত্রে স্পর্শের অনুভব আনিয়া দেয়, পরে আলোকপাত ঘটে! সমস্ত দৃশ্যটা ঠিক একই সঙ্গে আসে, আর একই সঙ্গে রূপ দেওয়া যায় না বলিয়া হয়তো ধারণা হয়, কিন্তু তাহা যুক্তিসঙ্গত নহে। আমরা পাঁচজন বিশ্বাস করি যে কর্মধারা, বা উপায়, সহসা পাঁচমিশালি একটি মায়া সৃষ্টি করিতে সক্ষম, সে তাহার ইচ্ছাকৃত বা অভিপ্রেত রূপকে রূপান্তর করিতে পারে। তাহার বিবেচনায় ইহার বাস্তবতাকে হেলা করা উচিত নয় – এইটুকুই আমরা বলিব। আর দ্বিতীয়ত আমরা যখন বাংলার শিল্পের মধ্যে ভুরি ভুরি তাহার প্রমাণ দেখিতে পাই।
অনেক দেশে বিষয়বস্তুর উপরেই নির্ভর করিয়া আলোকে দেখাই স্বাভাবিকতা। অস্মদ্দেশের শিল্পীরা তাহার পক্ষপাতী নহেন। ইহাদের বিশ্বাস, বস্তু হইতেছে বস্তু, আলো হয় আলো। তাই খানিক বস্তুর গুণের জন্য সে আলো নির্ভর করে। বস্তুর উপর প্রতিভাত যে আলোক, তাহাতে বেশি দেখি। ইহাতে হয় কী ফলে আমরা পরিষ্কার স্পষ্টতই দেখি আলো, দেখি স্থান, আর বস্তু। এ তিন মিলিয়া একটি অলৌকিক রসের সৃষ্টি করে। আর একবার স্থির করা যাক – দেখি স্থান, দেখি আলো, আর দেখি দৃষ্টিকোণ, বস্তু নয়। এই তিন দৃঢ়তর সত্য, এ তিন কারণ, তিনিই কর্তা এবং কোনও কিছুকে আঁকার সময় তাহার আলোকব্যবস্থা, তাহার স্থানসংগঠন, দৃষ্টিকোণের বিশেষত্ব বজায় রাখিয়া ছাঁকিয়া নিয়া আসা সত্যই অদ্ভুত দক্ষের স্বপ্ন, এবং তাহার দ্বারাই সম্ভব। আমাদের যা কিছু বলার তাহা আমরা হয়তো এখনই উপমা দিয়া ঠাহর বলিয়া ফেলিতে পারিব, কিন্তু তাহাতে হয় এই যে বুদ্ধির পরিচয়ই দেওয়া হইবে, তাহাতে কীবর্তাইবে?
অবশ্য এ সত্যটা শিল্পীর কাছেও রহস্য বৈ আর কিছু নয়, এবং সত্যই যদি তাহা না হতই তাহা হইলে আমাদের মতো সাধারণের কাছে শিল্পীই শ্রেষ্ঠ একথা পরিগণিত হইতে পারিত না। সে রহস্যের গভীরতাই হইতেছে মানুষ, এবং ক্রমাগতই দেখা যায় এমন লক্ষ লক্ষ রহস্যের ভার তাহাকে নিয়তই বহিতে হয়, এবং প্রতিনিয়ত সে ভার নিয়া ক্রমাগতই সাধারণ হইতে চাহিতেছে। কোথাও তাহাকে নুইয়া পড়িতে দেখা যায় না।
আমাদের ধারণায় যে কথা এ যাবৎ আলোচনা হইল, বাংলার শিল্পে একথা নিশ্চয় বিশেষভাবে আছেই। ছবিতে যে তিনের সঙ্গে দর্শকে সাক্ষাৎ ঘটে, তাহা ঘটনা নয়, তাহা বাধা নয় – শুধু সেই তিন – আলো, আলো আর স্থান; স্থান, স্থান আর দৃষ্টিকোণ; দৃষ্টিকোণই তো বাংলার শিল্পের প্রাণবস্তু! একদা অদিম চিত্রে দেখা যায়, লোকে বিশেষভাবেই জোর দিয়া বলে, কোনও পরিপ্রেক্ষণ নাই। এটা সত্য, সে পরিপ্রেক্ষণ নিছক সেই জড় পরিপ্রেক্ষণ, যাহার মূল এক চোখ, তাহার চোখ; আর এক চোখ তাহার হাত ফলে দৃষ্টি সমষ্টি। যদি সত্যই সেই পরিপ্রেক্ষণ না থাকে, তাহা হইলে আমরা একটু সত্য পাইব। অর্থাৎ আমরা যে সত্যকে এতক্ষণ বুঝিতে চেষ্টা করিতেছিলাম, ঠিক সেই পক্ষ হইতে তাহার বশে আমরা সত্যই বুঝিতে পারিব যে, তাহারা হয়তো দৃষ্টিকোণ সম্বন্ধে আপনারা বেশ সচেতন ছিল, অথবা তখনও দৃষ্টিকে সমষ্টি করার ক্ষমতা মানুষ লাভ করে নাই। সম্মুখের দৃশ্যত সমস্ত স্থান, আলো-উদ্ভাসিত স্থানসমূহ তাহার কাছে রহস্য ছিল। বহু বহু এলোমেলো কোণ হইতে দেখা তাহারা ভালোভাবে পরীক্ষা করিতে পারে নাই, কেমনভাবে নিরীক্ষণ করা কর্তব্য তাহা তাহাদের কাছে ভালোভাবে ধরা দেয় নাই, তাহার রূপ তাহাদের মনে ছিল না। তখনও, লোকেরা বলে, পরিপ্রেক্ষণ অজানিত অবস্থায় ছিল, যদিও সেকথা আমাদের বিশ্বাস-অবিশ্বাসের সম্পূর্ণ বাহিরে, কারণ উহারা স্থান সম্বন্ধে আলো আর তাহার দেখিতে পাওয়া উপলব্ধি করিয়াও কাণ্ডজ্ঞানহীন! তবে তাহারা এতদূর অগ্রসর হইল কেমনভাবে, তাহা বিস্ময়কর নয়! মাঝে মাঝে ঐতিহাসিকদের মজার মজার কথা আমাদের মতো জনসাধারণের মজার কথাকে ছাড়াইয়া যায়।
সাধারণত যেহেতু প্রত্যক্ষ হইতেছে সর্বাপেক্ষা বড় প্রমাণ, সেই প্রত্যক্ষই যখন নিজেই একের অস্তিত্ব নানা দিক অদ্ভুতভাবে সৃষ্টি করিয়া দেয়, দিনের আলোর মধ্যে আনিতে দেয় না, সে প্রত্যক্ষের বিষয়ে এ ধরনের অবিশ্বাস কোনও রূপেই সম্মত নয়-কেননা তদানীন্তন সর্ব সংস্কারকে মিথ্যাই প্রমাণ করে। একজন চৌকাকে ঠিকভাবে চৌকাই দেখিয়াছে, আর যেটুকু তাহারা দেখে নাই, তাহারা দেখেই নাই। আর সময় সে কতখানি পাইয়াছে তাহারও ভাবিবার এবং কাজের উপর হইতেই তাহার ইত্যাকার অভিজ্ঞতার কথা আজ গুহায় লিখিত অবস্থায় আছে। গুহাবাসীদের চিত্র দেখিয়া মনে হয় অনুকরণই মাত্র।
দৃষ্টি-সম্ভব তথা দৃষ্টিকোণ-সম্ভব চিত্রকলার একটি বিশেষ ঐশ্বর্য। তাহা ছাড়া স্থানের সঙ্গে আলোকের অজস্র মহিমা বৈচিত্র্য ও তাহার আকার বিশেষে রূপান্তর। কেমনভাবে সমস্ত নিখিল বিশ্বে আলোক বিচ্ছুরিত অবস্থায় আছে, লাবণ্য তাহার নাম, সমস্ত কিছু বাস্তবতা এপারে অন্ধকারে আসিয়া থমকাইয়া দাঁড়াইয়াছে, আমরা হয়তো সেখানে যাইতে পারিতেছি না। বিষয় কি অদ্ভুতভাবে ওখানে সুস্পষ্ট হইয়া আছে, নিরেট হইয়া আছে – মেঘাবৃত আকাশে ওড়া পায়রার ঢেউয়ের মতোই চিত্তহারী! তাহার আপনকার রূপ পরিচিতি একটি বিশেষ গুণসম্পন্ন। আমরা আলোতে দাঁড়াইয়া আলোর লীলা দেখিতেছি, কেমন দেখি, কতখানি দেখি সেটাই চিত্রের আদর্শ।
অদ্য ফরাসি দেশে যেসব চিত্র আঁকা হয় তাহা সত্যই বিস্ময়কর, কেননা তা একটি সঠিক অস্তিত্ব আজকাল স্বীকার করিবার প্রয়োজন উপলব্ধি করিয়াছে। জনসাধারণ সহজেই সেই চিত্রগুলির মাধুর্য বুঝে যে চিত্র একটি দৃষ্টির, পুরাপুরি দৃষ্টির মাত্র একটি দিক-বিশিষ্ট। তাই তাহার আলো অন্ধকার, সব কিছুই একটি বিশেষ আনন্দের সৃষ্টি করিয়াছে। একটি সম্পূর্ণ বাস্তবতার একটি বিশেষ বাস্তবতা। ঠিক এ জিনিস – এই দৃষ্টিধারা ধারাবাহিকভাবে বঙ্গে ঐতিহ্য। আজ যে যে ভাঙা-চোরার কথা দেশে দেশে গুণগ্রাহীদের মুখে শোনা যায়, তাহার আদর্শ হওয়া উচিত দৃষ্টিকোণ, যথাযথভাবে তাহার বাস্তবতা। সে বাস্তবতা যেন কোনওরূপেই বিকৃত না হয়, আমরা যেন তাহাকে প্রমাণ করিয়া দেখিতে পারি যে, তাহার সত্য অক্ষুণ্ণভাবেই আছে।
এ দৃষ্টিকোণকে রূপায়িত করিতে রং-কে তাহাকে ভাবিতে হইয়াছে। রং একটি বিশেষ বস্তু; বিষয়ের আছে, দৃষ্টিকোণের সম্বন্ধে তাহার রূপ আছে, তাহা ছাড়া রং আলোর একটি অঙ্গ। রং জিনিসটার আবিষ্কার তাহাকে, সমস্ত কিছুকে তাই আর একটি সত্তায় নিয়া দাঁড় করাইল। এককালে যখন রং আসিল, তখন মানুষ আর দৃষ্টি নিয়া এতটা মাতামাতি করিবার প্রয়োজন বোধ করিল না, কেননা রংয়ের একটি জাদু আছে, আর সেই যাদুতে সকলেই মুগ্ধ হইয়াছিল। এবং তখন, অর্থাৎ পূর্বের রং জিনিসটা রংয়ের ব্যবহারই বর্ধিত করিয়াছিল, রংয়ের ব্যবসাই বড় হইল, এবং ছবিকে কোনও বিশেষ রূপ দিতে পারে নাই। মানুষের সাধ মিটিল, বহু বহু জিনিসের উপর রং দেখা গেল। হইলেও সেই আলোকের রূপ বিভিন্ন, হাতের পাশে তাই একথা যে রংই নিজেই আলোক, তা নিয়া অনেকে মাথা ঘামাইবার চেষ্টা করিল না।
রং-কে যখন রং বলিয়াই বোধ হইল, রংকে যখন আলোর অঙ্গ বলিয়া বোধ হইল, বস্তুর স্বরূপ বলিয়া বোধ হইল, তখন চিত্রকরেরা তৃতীয় নয়ন পাইল; রং বস্তুর না আলোর, কার স্বরূপ? রং সত্যই কী, না রং শুধু রং, আলো নয়, বস্তু নয়। রং আপনার ‘স্বভাব’ বশতঃই চিত্রের মধ্যে স্থান পাইয়াছে। তাহার আপনকার সত্তা আছে, সেই তাহার অধিকার। এক ছোপ রং-কে আমরা বস্তু বলি না। কখনও এমন ঘটে না যে আমরা তাহাকে আলো বলি, আমরা তাহাকে রংই বলি। হইলে এই কথা ঠিক, তাহার সঙ্গে আলো এবং যে কোনও আকারের বিশেষ সম্বন্ধ আছে। রংয়ের আপনকার সত্তা পরিত্যাগ করিলেও একটি দ্বন্দ্ব দেখা দেয় – রং কাহার, বস্তুর না আলোকের, কাহাকে রূপদান করা হইবে, এই বিষয়ে সকলের মধ্যে একটি ইতস্ততা লক্ষ করা যায়। একাধারে সে রং বস্তুকে উল্লেখিত করে, ঠিক সেই সঙ্গে ন্যায়সঙ্গতভাবে অন্যধারে আলোকেও উল্লেখ করে। এ দুইয়ের মধ্যপথে তাহার নিজস্ব বিশেষত্ব সম্যক বর্তমান। সে কথা আমরা অনেকটা বুঝি।
এবং এই একটি নিজস্ব বিশেষত্ব যা তাহার আছে, তাহার রূপ আমাদের চিত্রে দেখি – রংয়ের ঘনত্ব, বস্তুসাদৃশ্য এবং ইহা আলোকেই অস্তিত্ব পায়। তাই ঋষির মতোই বলিতে হইবে রং হইতেছে আলোই, আর অন্য কিছু নয়। এই বর্ণবিন্যাস বাংলার পটে অদ্ভুতভাবে আপনার স্বকীয়তা রাখিয়াছে। দেখা যাইবে এখানকার বর্ণ বস্তুকে রূপ দিতে গিয়া আপনার সত্তাকে ক্ষুণ্ণ করে নাই। রং বরাবর যথাযথভাবে আঙ্গিকতাকে সাহায্য করিয়াছে। অন্যদিকে নিজের আঙ্গিকতাকেও সোজা আর সহজভাবে বাঁচাইয়া রাখিয়াছে, কেননা শিল্পীরা রংয়ের মোহে পড়িয়া কোনওক্রমেই একথা ভুলিয়া যান নাই যে, রং আলোকের অংশ, অন্য কোন তাৎপর্য তাহার নাই, অন্য অস্তিত্বের কথা ভাবা বৃথা সময় নষ্ট ছাড়া কিছুই না এবং সেই কারণে ছবির মধ্যে বেশ ভালভাবে দেখা যাইবে যে রংয়ের ব্যবহার সব সময় আলোর অস্তিত্বই প্রচার করিয়াছে, এবং তাহা খুব সূক্ষ্মভাবেই সম্পন্ন হইয়াছে।
অনেক অনেক ছবির উপর রংয়ের আরোপ এক ভাবের। সেখানে বিষয়ের উপর হইতে রং-কে তুলিয়া বিচার করা যায়। সেখানে দেখি শুধু কতটা আলোর অস্তিত্ব বর্তমান; সঠিকভাবে বলিতে গেলে রং আপনার সত্তা এখানে হারাইয়াছে, নেহাত আলোর খাতিরেই আছে, তবে আলোর অঙ্গ হিসাবে খুব নয়। ঠিক তেমনিভাবে রংকে ব্যবহার করা, রংকে শুধু সেই রূপেই দেখা কাজের কাজ, আলোর লাবণ্য বস্তুর উদ্দেশ্যে দেখাই কর্ত্তব্য। এখানে অনেকটা সাহিত্যের কথার মতো রং থাকে। যেমন কথার পর কথা থাকে তেমনভাবে রংও রূপ হইয়াছে, দুয়ের কোনও মিলিত ইঙ্গিত দেখা যায় না। নীল জল, নীল কথাটা আগে, জল কথাটা পরে, নীল জল কথা একই গলায় উচ্চারণ করা সম্ভব হয় না নীলাম্বুর বেলাতেও সেই। দুটি বিভিন্ন গলায় দুটি বিভিন্ন কন্ঠস্বরে যদি তাহার স্বরূপ প্রকাশ করা যায় তাহা হইলে শুধু একটি অপরিষ্কার ঘোলা শব্দই শোনা যাইবে, আমরা কেউ কিছুই বুঝিতে পারিব না। ঠিক এমনিভাবে অনেক চিত্রের রূপ দেখা যায়, রং আর বস্তু ছাড়া-ছাড়া হইয়া আছে। অবশ্য অনেক সুচতুর চিত্রকর আমাদের সব ক্ষেত্রে একটি দূরত্বের ইঙ্গিত দিয়াছেন সেকথা বার বার আমাদের স্মরণ করাইয়া দেন। হয়তো একটি বিশেষ দূরত্ব হইতে তাহাকে দেখার দরকার, একথাও স্মরণ না করিয়া পারা যায় না। ইহাতে একটি দূরত্বই শুধু আমাদের কাছে খাড়া করা থাকে; এবং উহাই হইতেছে তাহাদের মূল। সেখানে দাঁড়াইয়া যে কোনও স্বাধীনতা তাঁহারা নিতে পারেন। এ দূরত্ব নিয়া আলোচনা পরে দেখা যাইবে। আপাতত ছবি সম্বন্ধে হয়তো অসাবধানতাবশত অনেক গর্হিত কথাই বলা হইল। সুধীজনেরা যেন মনে না এ ধারণা পোষণ করেন যে আমরা হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করিতেছি বা উপহাস করিতেছি। আমাদের বিশ্বাস এক এক সত্য এক একজনের। তাহা ছাড়া এইটুকু বলিলেই ঠিক হইবে যে সে অধিকার আমাদের নাই।
রংয়ের আপনকার মাধুর্য আছে এমতো বিশ্বাস সকলের আছে, এ সকলেই বিশ্বাস করি। আমাদের দেশে ঠিক রংয়ের জন্যই রং-কে ভালোবাসে, আমাদের দেশ সূর্য-প্রচুর দেশ, আমরা রংয়ের মাধুর্যের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে বিশেষ পরিচিত। আমাদের দেশ ফুল বর্ণের দেশ, আমরা বর্ণবৈভবের সঙ্গে বিশেষ পরিচিত। রংয়ের একমাত্র অন্ধকারে কোনও অস্তিত্ব থাকে না। রংটা অনুমান কোনও ক্ষেত্রেই নয়, সব সময় প্রত্যক্ষ। আমাদের দেশে আকাশের শেষে অনেকটা আকাশ সবুজ – ইহা শিল্পী দেখিয়াছে, চাঁদও গাঢ় সবুজ, ঠিক নীল নয়। রং-কে তাই আপনার সত্তায় ভালোবাসার সুযোগ বহু দিক হইতে বহুভাবে পাইয়াছি এবং সে সুযোগের ফল দেখা যায় আমাদের ছবির মধ্যে। রংকে তাহারা চিত্রের একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ অংশ দিয়াছে (সে অংশ দুয়ের সঙ্গে জড়িত, দূরত্বের ফল নয়, দৃষ্টিকোণের হেতু) তখনই যখন তাহাকে কেন্দ্র করিয়া অঙ্গ গড়িয়া উঠে। অঙ্গ এইখানে রংয়ের আধার হিসাবে আছে।
কতখানি রং সূর্যালোকের অঙ্গ জুড়িয়া থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত তাহা অনুভব হয়, ততক্ষণ অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নাই। এ কথা সত্য যে রংয়ের নিজস্ব একটি স্থান আছে, সে কথা দর্শকমাত্রেই অনুভব করেন। সেই স্থান-চেতনা অব্যাহতভাবে আমরা কালে কালে দেখিতে পাইব এই আশা করি। তবু এখানে উল্লেখ না করিয়া পারা যায় না যে, তাহার অস্তিত্ব আমাদের দেশের শিল্পীরা স্বীকার করিয়াছেন, এবং একটি বিশেষ রূপে তাহাকে আরোপ করিয়াছেন। সে আমরা বাংলার যে কোনও ‘সরা’ দেখিলে টের পাই। রং এখানে সম্যকভাবে আলোর অস্তিত্ব প্রমাণ করিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে আলোর নিজস্ব লীলাও আমাদের চোখে পড়ে। সেটা খুব বেশিভাবে বিষয়গত বা বস্তুগত নয়, যতটা বেশি দৃষ্টিগত। চোখের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে আলোর এ সম্বন্ধ পুরাতন, বড় সনাতন, যখন প্রত্যহ মানুষ আলোর জন্য উবু হইয়া বসিয়া থাকিত – তাহাকে নিছক তাহার গুণে ভালোবাসা হইতে আজ আমরা বহুদূরে চলিয়া গিয়াছি। যেহেতু শিল্পীর মধ্যে আছে, বহু শতাব্দীর ওপারে, ইতোমধ্যের বহু অন্ধকার পারে একটি ছোট ভূমিকা, যাহাকে যে কোন খাতিরেও ভুলা যায় না, তাহার মেরুদণ্ড এখন সটান সোজা-সেই সম্যক আনন্দ, সেই উষ্ণতা আজ বেশ ভালোভাবেই আছে। সেই বাস্তবতার হদিশ কেমনভাবে আছে, খুঁজিয়া সেই দিনকার সম্বন্ধ তুলিয়া আনিতে কী অদ্ভুত তাহার চেষ্টা ধ্যান ও ধারণা, স্রোতে স্রোতে মুখর! তবু আমরা কতটুকু তাহার পাই, সে বাস্তবতা কোথায় কোথায় তাহার চিহ্ন রাখিয়া গিয়াছে, কোথায় সে এ যাবৎ সজীব, শুধু সেইটুকুর উষ্ণতার স্মৃতিকে ঘিরিয়া, কেমনে তাহাকে চিনিয়া নেওয়া সম্ভব, সাদা আর সাদার পর কালো এইটুকুতেই কি সেই উষ্ণতাকে মূর্ত করা সম্ভবপর? সে হয়তো কিছু কিছু আমাদের ধরা দেয়, হইলেই অদ্যকার আমাদের জীবন তাহার কোনওক্রমেই পটভূমিকা নয়। দৃষ্টি আমাদের নাই, যাহার উপর অনায়াসে সে উষ্ণতা রেখাপাত করিতে পারে, যেখান হইতে আমরা মানিয়া নিতে পারিব। মূলত সে লীলা আর একভাবে আছে। রূপ এই স্তূপীকৃত অন্ধকারকে জড়াইয়া সৃষ্টি হইয়াছে, সেই উষ্ণতাকে তেমন বিস্ময়কর বলিয়া বোধ হইবে কি, অথবা না? এই ছোট ‘না’ টি বলিতে সত্যই দ্বিধা হয়। তখনকার অস্তিত্বের সঙ্গে এর সম্বন্ধ নিতান্ত বিষয়গত। পুরাতন সেই অভিজ্ঞতা আজিকার মানসলোকে নেহাৎ যে কোনও বস্তুর মতো, এমন কী যে কোনও একটি বস্তু যাহার ইন্দ্রিয়গত রূপ কোন মূল্য পায় না, কেননা সেটা শুধু বস্তু, সেটা ঠিক কয়েকটি রেখার সমষ্টি ছাড়া আর কিছু নয়, যাহার কোনও রূপকে মানিবার কোনও প্রয়োজন বোধ হয় না। সম্মুখের ছোট বুদ্ধ মূর্ত্তির সামনে আমরা, এইটুকু ফাঁকের মধ্যে বিগত আড়াই হাজার বছর, তিন হাজার বছর সময় (?) আমাদের চাপে পড়িয়া ভাঙিয়া পড়িতে চায়, আমাদের কেমন লাগে! ইহা কি তেমনি স্থান চেতনা দেয়?
কিন্তু শিল্পীর শ্রেষ্ঠ! বাস্তবতা তাহাদের চোখে ফেরে। তাহার কাছে সেই অন্ধকার পারের সমস্ত সম্বন্ধ এখনও আছে। এখনকার শীতলতা, শৈথিল্য কোনও বিকার আনে নাই। সেই নিপট সম্বন্ধটা আপনার মার্গেই সযত্নে রাখা আছে, যে কোনও আলোতে তাহা বস্তু নয়, বিষয় বাস্তব নয়। সেই সত্যকে নিয়া জুয়াখেলা করিবার মতো বৃত্তি তাহাদের নাই, সেই সম্পূর্ণ সম্বন্ধটা কোনওদিন সময়ের কোনও জাদু তাহাকে বশ করিয়া সরাইয়া নিতে পারে না। ধীরতা তাহাকে সমতা দেয়, ব্যগ্রতা থাকে। সেই বাস্তবতার সঙ্গে এতই নিকট সম্বন্ধ যে প্রাণ মাঝে মাঝে একাকার হইয়া যায়, সাযুজ্য লাভ করে এবং যাহার উপলব্ধি একটি নবতম বাস্তবতার সৃষ্টি করে ও নূতন অস্তিত্ব আনে, যাহা বিষয়গত নয়, ব্যক্তিগত নয়! অথচ তাহা অতি পুরাতন সত্য হইতে একেবারেই বিচ্ছিন্ন নয়, কেননা সময়কে চূড়ান্ত বলিয়া মানিয়া নেয় নাই, কেন না আপনার দৃষ্টিভঙ্গি বুঝিবার চেষ্টা যথাযথভাবে করিয়াছে এবং প্রখর দিবালোকে রংয়ের মাধুরী যাহা ছিল অদ্যও তাহাই আছে।
রং একদা দেওয়া হইত বিকৃতভাবে। সাধারণ সন্তোষের জন্যই, রংয়ের একটি সহজ ছন্দকে সকলেই মানিত, সেখানে দেখা যায় আলোকে তদানীন্তন চিত্রকরেরা গণ্য করিত, শুধু ঘষা ঘষা আলো করিয়া-স্থান বা তাহার সম্বন্ধ ভালোভাবে মানিত না, মানিত না লাবণ্যময় স্থানকে দৃশ্য। সব ক্ষেত্রে এই দিক হইতে বলা যাইতে পারে রংকে বেশি হালকা করিয়াই ব্যবহার করা হইয়াছে। তখন রংয়ের নিজস্ব অস্তিত্ব আমরা সাধারণেরা স্বীকার করিতাম নেহাত আটপৌরেভাবে, মানসিক প্রতিক্রিয়ার দিক হইতে, সাধারণ কথায় আমরা যেমন ব্যবহার করি, ‘রেগে লাল’, ‘ভয়ে চূর্ণ’ ইত্যাকার কথাবার্তায় একের বিশেষ লক্ষণ বর্ণনা করা হয়, সাহিত্যের গণ্ডির মধ্যে, এই কথা সকল মনেতে গণনার কথা নিছক, এই কথার সঙ্গে দৃষ্টির কতটুকু সম্পর্ক, সে কথা বলা বাহুল্য। এইসব কথা নিছক প্রকাশাত্মিক। অবশ্য আমরা সহজেই অনুভব করি মনের একটি বিশেষ ভাব ঘটিয়াছে, এবং তাহা দৃষ্টির সম্পূর্ণ বাহিরেই। সেইরূপ রং এইখানে অনেকটা মনের বাহন হিসাবে ব্যবহার হইয়াছে, সাহিত্য হইয়াছে, সত্যই ইহার সঙ্গে স্থান বা আলোক মহিমার কোন সম্পর্ক নাই।
উহা তখনকার একটা ঢং ছিল, এবং সেই বিবেচনার উপর এই ধারা গড়িয়া উঠিয়াছে। তখনকার সময়ে কোনও কিছুর নিখুঁত হিসাব ছিল না, তাহার সঙ্গে অন্যান্য, বাস্তবতার কোনও যোগাযোগ কেউ একবার ভাবিবার প্রয়োজন বোধ করে নাই। অথচ অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, আলোর সাক্ষ্য হিসাবে রং রহিয়াছে। এখানে সে রং কতটা কাহার উপর নির্ভর করিতেছে, তাহা বিবেচনা করা প্রয়োজন – রং কতখানি আলোর হেতু আর কতখানি তাহা বস্তুর হেতু। খুব সাধারণ কতগুলি রংকে একেবারে আলোর হেতুরূপে ব্যবহার করা হইয়াছে। অবশ্য এদিক হইতে উহাই আলোর এক প্রকার রূপ। কিন্তু এমনও কতকগুলি বস্তু আছে, যাহাকে রূপ দেওয়া মুশকিল, সেগুলির বেলায় কী করা যাইবে তাহা স্থির করা দরকার। অঙ্গ সম্বন্ধে যত বেশি আলোচনা হইয়াছে, তত বেশি রং সম্বন্ধে কথা হয় না। রং-কে সাধারণত অনেকে চট করিয়া 1’effet বলিয়াই ছাড়িয়া দিয়াছেন। এবং ঠিক উহাকে কেন্দ্র করিয়া তাহারা রংটা নানাভাবে দেখিয়াছেন, এবং যাচাই করেন। কিন্তু রংয়ের সঙ্গে বস্তুর যে অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধের কথা! তাহার দিকে তাকানোর মধ্যে কোথাও কোথাও একটা গলদ রহিয়া যাইতেছে।
এটুকু সত্য সকলেই স্বীকার করেন যে অবিচ্ছেদ্য, কিন্তু কতখানি তাহার সঠিক নির্দেশ নাই। তবে সাধারণ ১ আর একটা রং করা ১-এর যথেষ্ট পার্থক্য বুঝিতে পারি। একটি আলোক-লীলাকে পথ প্রদর্শন করে এবং একটি তাহা করে না। কিন্তু রংয়ে তাহার বাস্তবতা এতটুকু ক্ষুণ্ণ হয়না। এতে ঘটে যা তাহাকে ঠিকভাবে বলিতে গেলে, আগে আমরা গুণীদের অনুমতি চাহিব। আমাদের মত সাধারণের মনে হয়, নিশ্চয়ই তাহা একটি স্থানকে লক্ষণযুক্ত করে। এ স্থান রংয়ের স্থান, এবং তাহার যে স্থান জুড়িয়া বিষয় থাকে, এবং হইলেও রংয়ের আধার হয়। রং হইতেছে একটি নবতম স্থান, একাধারে যেমন বাস্তব তেমনি দৃঢ়মতি সত্য। এ সত্য নিছক মায়া নয় ইহা মায়ার সৃষ্টি করে না। অন্যান্য বহু বহু প্রত্যক্ষ কিছু সব সময় কোন না কোনও সম্বন্ধে তাহার অস্তিত্ব লইয়া দাঁড়ায়, কিন্তু রং স্বয়ংসম্পূর্ণ, রং নিজেই দাঁড়াইতে পারে।
আলোর আকাশের নীলিমা, রাতের আকাশের শ্যামরূপ তেমনিই আছে, তাহার তারতম্য কতটুকু ঘটে! আপাতদৃষ্টিতে যদি বা ঘটে তাহা হইলে মনেই তাহা ঘটে, সেখানে দেওয়া-নেওয়ার দর কষাকষি ভাব জড়ানো যায় না, সমস্ত সম্বন্ধে সব কিছু বদলায় হয়তো, বদলায় না মানুষের মন। এমনই রং হইতেছে সমস্ত সম্বন্ধের বাহিরে। সে নিজেও তাই সম্বন্ধের যোগে পরিবর্তন লীলা দেখার একমাত্র অধিকারী। সবেতে থাকিয়া কিছুতে সে নাই। চির সত্য স্থানের মত সত্য ব্যাপ্ত চরাচর। কে বলিতে পারে এ রং সূর্য্যের না স্থানের মধ্যের কোন অজানা লীলা! কে বলিতে পারে?
আমাদের এখনও বহু জড়তা আছে বলিয়াই তাহাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করিতে পারি নাই। হয় সেটা একটা সরল রেখার মতো হইয়া যায়, নয় সেটা অনড় থাকে, ঠিক তাহার চাঞ্চল্য তাহার অনঙ্গ মাধুর্য কাহারও চোখে ধরিয়া দেওয়া সম্ভব হয় নাই। ফলে রং-কে একটা বাছাই করা দূরত্বকে স্থির করিয়া নিতে হইয়াছে, এবং রংকে একটা চমৎকার রূপদান করার চেষ্টা হইয়াছে, যেটা বস্তুর কাজ – রংয়ের দায়িত্ব খুব পরিষ্কারভাবে আসে না।
কীভাবে রং-কে আনিতে হইবে সে ফতোয়া দিবার অধিকার আমাদের নয়। আমরা দেখিব কেমনভাবে আসিয়াছে, রং আসিয়াছে, যেটা বস্তু আর আলোর মধ্যপথে একটি বিশেষ হিসাবে রাখা হইয়াছে। এবং আলো আর বস্তু অস্তিত্বের একটা সুচিন্তিত অবস্থা দেখিতে পাই, এবং সমস্তটাই রংয়ের স্থানের উপর খাড়া হইয়া আছে। সে লীলা লক্ষণ অতি অল্প জায়গায়, অন্য জায়গায় দেখি। শুধু আলোতে রং আর রংয়ের গভীরতাই চোখে পড়ে। আমাদের বেলায় সবটাই যেমন প্রত্যেক্ষের বাস্তবতা হইতে ঘটিয়াছে, অন্য ক্ষেত্রে তাহা হইতেছে কিনা সন্দেহের।
আমরা একটি মাত্র ইন্দ্রিয়কে নির্ভর করিয়া সব সময় অগ্রসর হইবার চেষ্টা করিতেছি, পাঠক খেয়াল রাখিবেন। ফলে আমাদের কথাবার্তা অনেক সময় আপনার মনে দ্বিধা আনে, ভ্রান্তির সৃষ্টি করে, যেহেতু একটি মাত্র ইন্দ্রিয়কে কেন্দ্র করিয়া কোনও কিছু জানিতে আমরা অভ্যস্ত নই। যাক সে, এবং সেই রংয়ের লীলাই হইল চিত্রের বৈশিষ্ট্য, কিন্তু মধ্যে মধ্যে বস্তুর আঙ্গিকতা এমন বেশিভাবে তেল রং চিত্রে ধাক্কা দেয় যে, রংয়ের লীলা কোথায় যেন হারাইয়া যায়। অনেক দিন পর, ফরাসি দেশে যে আন্দোলন দেখা গিয়াছিল তা কয়েকজন ব্যক্তির অভিজ্ঞতা বলিয়াই প্রথম ধরা হইয়াছিল। রাস্তা চলতি লেখা নোট বইতে প্রমাণ আছে। তাহার সত্য একটি বিশেষ তোলপাড় আনিল, এবং সকলের চোখ রংয়ের দিকে ফিরিল। যাক, সেই আন্দোলনের একটি বিজয়ী কথার সঙ্গে জনসাধারণ বিশেষভাবে পরিচিত। সেটা হইতেছে রংয়ের স্পন্দন। এটা শুধু পাশাপাশি, তাড়াতাড়ি থাকার গুণবশতই ঘটে। কিন্তু এইখানেই এই, ধারার পরিণতি হয় নাই, কেননা তাহা হইতে যাহা সম্ভব হইয়াছে সেটা রংয়ের নয়, সেটা অন্য কিছুর।
কিন্তু রংয়ের স্পন্দন একদিক হইতে সর্বৈব সত্য, অন্য দিক হইতে তেমনই আংশিক সত্য। কেননা বস্তুর বাস্তবতা যেখানে দূরে পড়িয়া থাকে শুধু কতগুলি ছন্দময় রং সৃষ্টি করিয়া একটি মায়ার সৃষ্টিই হয়, বাস্তব সমস্ত কিছু আসিলেই ছবির লক্ষণযুক্ত হইবে। তাই ঠিক রূপটা ওখানে আসে নাই, সূর্যালোকের ব্যাপার লাবণ্য-বিশেষত্ব হিসাবেই আছে, আলো ঠিক এখানে-ওখানে-সেখানে পড়িয়াছে, ব্যক্তিগতভাবে তাহাকে দেখানো হইয়াছে। আলোর সে গভীরতা ঠিক ছবির সীমা ধরিয়া আসে নাই। আমরা তো তাহাকে একটা ছল-আলোক ফেলিয়া ঠিক হইয়াছে বলি, সেটাও দেখা যাইবে একটি স্মৃতি-আলোক ফেলিয়া বেশ দক্ষতার সঙ্গে আঁকা। কোথাও আলো আর রংয়ের লীলাটা তেমনভাবে স্থান সংগ্রহ করিতে পারে নাই।
যখনই ওরা বদলায় তখনই যন্ত্রকে এড়াইবার জন্য বদলায়, ঠিক ভিতরকার সাড়া সে পায় না। প্রচ্ছন্ন বাহির তাহাকে বদলাইতেছে। যেমন সবটুকু বদল আমাদের দেশে হইয়াছে অন্তরতম প্রদেশ হইতে, আমাদের দেশের সব কিছুই, তাহার শিল্প, তাহার সভ্যতা প্রকৃতির উপর নির্ভর করিযা ঘুরিয়াছে। তাই আলো তথা রংয়ের লীলাটা ভালোভাবেই আছে। রংকে কখনও ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার তাই হয় নাই, আমাদের দেশের অতীব নগ্ন পটে যে ছায়াটা আছে, যে লক্ষণ আছে, অন্য কোথাও তাহার জুড়ি মেলে না। রং আছে রংয়ের নিছক গুণে, বিষয়গতভাবে তাহা আমরা সহজেই বুঝিতে পারি। ফলে আলো ঠিক একইভাবে আছে এবং আপনার স্বকীয়তা না হারাইয়া সর্বক্ষেত্রে রূপকে ব্যক্ত করিয়াছে। তাই দেখি একই পটে আলো অভিব্যক্ত রং অভিব্যক্ত বস্তুর অভিব্যক্তি। যেমনভাবে পদ্মের রং থাকে এবং আলোকসম্পাতে ক্রমে দৃশ্যমান হয়, তাহার মিলন ঘটে, দেখা যাইবে ক্রমে রং হইয়া যায়, রং ক্রমে বস্তু, পদ্মের আকারে রূপান্তর হইয়াছে। সমস্ত ক্রিয়াটা একটা ক্রিয়ার আনোগোনা নয়, ইহাই ছবি। ইহাই আমাদের বিশেষ দৃষ্টিকোণ যোগে দেখিতে পাই পটের ছোটখাটো ছবির মধ্যে। আলো গভীর হইয়া রং ক্রমে বাস্তবতা।
অবয়বকে নিয়া-ই রংয়ের খেলা, তাহার সবটুকু আলো আর অনেকখানি রং। মধ্যবর্তী আধারের পারে, কত স্পন্দন কত নড়াচড়া, পড়িয়া থাকে কতখানি যে চোখের সামগ্রী তাহা চোখই বিচার করিয়া দেখে। এখানে পাথরের সমস্ত কিছু সোজা, অন্যান্য আর আর সমস্ত কিছুকে না মানিয়া তাহার স্পর্শ এড়াইয়া একা আসিতে একের অনুভব ক্ষমতা মনে হয় শব্দতরঙ্গের মতো ব্যোমপথে ঘুরিয়া বেড়ায়। একটি অস্তিত্বের নিকট হইতে অন্য একটি অস্তিত্বে, একটি স্পন্দন হইতে আর একটি ভিন্ন কোন মূক জড়তায়। এ সমস্ত কিছুর রহস্য কোথায় যে সম্যক সাধনায় ছোট একটি প্রস্ফুটিত ফুলের বাস্তবতা পায় – আলো পড়ে সকালের, অধিকন্তু তাহাকে আঁকাবাঁকা রেখায় কখন যে সচেতন অবস্থা অনায়াসে রূপান্তরিত করিয়া নেয় এবং আমাদের হাতে দেয়, সেকথা বিস্ময়ের নিশ্চয়। সেকথার তাৎপর্য আমরা সকলেই বুঝি সরলভাবেই, ইহা আমাদের স্বাভাবিক ধর্ম।
সামনের সমস্ত কিছু যখন আমরা দেখিতে থাকি তখন খানিক তাহা অনুভব করি, সেকথা নির্দিষ্ট করিয়া বলা সহজসাধ্য নয়। সমস্ত সম্বন্ধই এত ব্যক্তিগত যে ঠিকভাবে আমাদের সীমার মধ্যে পাওয়া যায় না, ক্রমে ক্রমে তাহার দূরত্ব আর দৃষ্টি মিলিয়া সে যাহা ছিল, তাহা আর নয়, কেননা দৃষ্টিই যখন, একটি বিশেষ দূরত্বে সমস্ত পরিণতির কারণ নয়, এই দুইয়ের মিলন একটি পটভূমিকার উপর ঘটে, তাহাকে এক বিশেষ রূপদান করে, সে রূপ নিছক না হইলেও তাহার মধ্যে, একথা সত্য, সে দৃষ্টির অনেকখানি আছে। দৃষ্টি সেখানে কতকগুলি রেখার সমষ্টি ও আপনাকে নিবদ্ধ রাখে, যে বস্তুর অন্যপ্রান্তে আর একটি সচেতন অবস্থা আছে, সে সচেতন অবস্থা সমস্ত ক্ষেত্রেই সজাগ। এখন এই প্রসঙ্গে একথা ওঠে যে আকার ব্যাপারটা কতখানি কাহার। দৃষ্টির নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে তাহার তবে সম্বন্ধ কতটুকু, আর এ সম্বন্ধ যদি নিশ্চয়, তাহা হইলে তাহা কেমনভাবে গড়িয়া উঠিয়াছে, এই কথার সঠিক উত্তর আমরা দিতে চেষ্টা করিব। তুলির মুখের যে রূপান্তর ক্ষমতা পরিবর্তিত হইতেছে, তাহা রেখার পর রেখা হইয়াই দেখা দেয়, ক্রমাগত সে সরলরেখা, ক্রমাগত সে বাঁকা। সব সময় দুটি অবস্থাকে নিয়া একটিতে পরিণত করিয়া চলিয়াছে, আর এই পরিণতি যখন আলোর বিস্তৃতির উপর দাঁড়ায়, তখন আর এক চেতন অবস্থার সৃষ্টি করে, এবং এই সুযোগে সে ব্যাপারটি পথ করে। আশ্চর্যের এই যে তাহার কোনও নিছক চোখের একেবারে নয়। অপ্রত্যক্ষভাবে তাহা স্থানের বাস্তবতা যদিচ লাভ করে, তবু একথা বলিতেই হইবে যে প্রত্যক্ষাবে তাহা, আমাদের ধারণায় কিছু নয়, আর সে আধারের সব কিছুর সঙ্গে স্পর্শের যোগসূত্র সর্বাপেক্ষা বেশি।
আমাদের ধারণা সম্বন্ধে নিশ্চয় পাঠকের একটি ধারণা লাভ হইয়াছে। ঠিক সেই ধারণার দিক হইতে আমরা প্রশ্ন করিতে পারি যে সত্যই দিক (‘ডাইমেনশন’) জিনিসটা কতটা চোখের, তাহা সত্যই কি চোখের? কেননা সেখানেও আর একটি সচেতন অবস্থার কথা আমরা টের পাই। সেকথাটা অনেকটা বিষয়গত, কিন্তু তাহার সম্যক চোখের দিক হইতে সবৈবভাবে সার্থকতা কোথায়, তাহা আমাদের ঠিক ঠাহর হয় না। আপাতদৃষ্টিতে সমস্তটার যোগ সোজাসুজি আছে বলিয়াই প্রতীয়মান হয়। কিন্তু তাহা নহে। দিক কথাটা সমস্ত দিক হইতে স্পর্শের। আর এই ইন্দ্রিয়ই তাহার যোগসূত্র স্থাপন করে। দিক কথাটার প্রাণবস্তু হইতেছে স্পর্শ, চক্ষুহীন যাহা অনায়াসে বুঝিতে পারে।
এ কথাটা আমরা জানিয়াও স্থির থাকি, সদর্পে ঘোষণা করি যে তাহার অস্তিত্ব বর্তমান। অনেক সময় একই সঙ্গে পুরা দুইটি দিক আমরা কখনোই দেখিতে পারি না। একই সঙ্গে সেই দুইটি দিক আমরা অনুভব করিতে পারি। এটা স্মৃতির ব্যাপার, ফলে দিকগুলি আমাদের কাছে যথাযথভাবে থাকে এবং পরে আমরা তাহা রূপান্তর করি।
যে অবয়বগুলি দেখি তাহার, তাহার দিক ছবির সীমা আর বাস্তবতার দিক হইতে কতদূর সত্য তাহা আমরা নির্ধারিত করিতে পারি নাই। সাধারণ পটের আপনকার একটা রহস্য আছে, এবং সেই বাস্তবতাকে ভাঙিতে গিয়া সৃষ্টি করা হয় একটা মায়ার – যাহার মধ্যে চোখের কল্পনা কতটুকু আছে, ক্ষমতা কীভাবে তাহার সম্পূর্ণতা লাভ করে, কীভাবে আর আর মনকে তথা চেতনাকে, এক জায়গায় দাঁড়াইয়া থাকিয়া সমস্ত কিছু মনকে টানে, বিবেচনা করে, এবং কেমন করিয়া সে আপনকার চেতনাকে এমন একটি অবস্থায় নিয়া যায়, এবং অনায়াসে সেখান হইতে বিষয়গত বাস্তবতার কোনও যোগফল কোনও একটি বিশেষ রূপকে প্রাণদান করিয়া নিজে সিদ্ধ হয়, ফলে যে রূপটা আমরা দেখিতে পাই, তাহা মায়াপ্রসূত। তাহাকে যাঁহারা শিল্প ভালোবাসেন তাঁহারা বলেন, মায়াকে মানিতে আমরা নারাজ! ‘নিয়মরহিত’ যাহাকে বলি সত্য, তাহার সীমার বাহিরে কী তাহা গেল! তাঁহাদের এককথায় অন্যেরা হয়তো যুক্তি দিবে, কিন্তু প্রশ্ন করিতে পারা যাইবে। উত্তর হিসাবে, জীবমাত্রেই সচেতন, জীবমাত্রেই অগ্নিকে ভয় করে, অতএব সকলেই তাহা হইলে এক। কিন্তু তাহাকে মায়া বলিয়াই মায়া হইয়া যাইবে না। সত্য কিনা আর একটু বিচার-সাপেক্ষ। এখানে সেই সূত্রে আমরা দেখিতে পাইব তাহার সব ব্যবস্থাই আলোর সম্মুখে ধরা রহিয়াছে, ছোট ছোট প্রমাণও রহিয়াছে। কিন্তু আমাদের বক্তব্য হইল এই যে, প্রত্যহের অভিব্যঞ্জনা যাহার মধ্যে স্থান পাইয়াছে, যাহার মধ্যে আছে অগ্নির সংস্কার আর ছোট উষ্ণতার একটি দীর্ঘ ইতিহাস, আমরা কতখানি তাহা বুকে রাখি? আলোতে তাহা নিঃশেষ হইয়া যায়, সেটা কী নূতন অভিজ্ঞতা না অন্য, তাহা আমাদের তাহা নয়, সত্যই এটি একটি আশ্চর্য ব্যাপার। কোথায় সচেতন অবস্থা আর এক অবস্থায় পর্যবসিত হইতেছে, কোথায় সে ঠিক আপনার বাস্তবতার পরিমাণ রাখার জন্য ব্যাকুল হইয়া ওঠে, অস্থির হইয়া উঠিয়াছে বারে বারে, একটি রেখার সম্বন্ধ চাহিতেছে, কোথাও সে আপনার সবটুকু ছাড়িয়া একটুখানি ধরিয়া রাত জাগিতেছে তাহা ভাবিলে অহংকারের চাইতে আশ্চর্য হইতে হয় বেশি।
রেখা জিনিসটা ক্রমাগত ঘোরাফেরা পরিবর্তন, ক্রমাগত মেলামেশা, নানান রূপে রূপান্তর হইয়া চলিয়াছে। ইহার ফলে ক্রমাগত কাটাছাঁটা ছোট বড় যাহা কিছু সব ঘটিতেছে, সেটাই দিক (‘ডাইমেনশন’), তাহার ফেরটা চিত্রকরেরা বলিতে পারেন। এবং সেই মায়ার অনুপাতে যাহা কিছু রং যাহা কিছু আলোকপাত, সব কিছু আমাদের বিশ্বাসের দিক হইতে ভ্রমাত্মক। এখানে একথা জানা দরকার, দৃষ্টিকোণের সঙ্গে ইহার পার্থক্য বহু, তাহার ফলে যাহা দিক আসে তাহার নাম বিশেষভাবে দিক বলা যাইবে না। সেটা দৃষ্টিকোণই, কেননা তাহা মনের নয়। প্রথম দিকটা হয়তো চোখের, অতঃপর তাহাকে কেন্দ্র করিয়া সমস্তটা মন হইতে গড়িয়া ওঠে, তাহার বাস্তবতা অতীব প্রকৃতিগত অল্পই।
সরার উপরকার লক্ষ্মীর রূপটি একটি আঙ্গিক হইয়া দাঁড়াইয়াছে। প্রথম দর্শনে আমাদের মনে হইবে, তাহার মধ্যে আলোকের চৈতন্য নাই। কিন্তু স্থির দৃষ্টিতে আমরা দেখিতে পাইব, যে কথা আমরা ভাবিতেছি সত্যই তাহা নহে। তাহার মধ্যে নিছক কোনও মায়া নাই, দৃষ্টির পিছনে ছোট জগতের সব সত্যের সঙ্গে ইহাকে মিলিয়া বিচার করিয়া লইয়া সঠিক একটি বাস্তবতা বলিয়া অভিহিত করা যায়, তখনই সেই হেতু ভালো লাগা, মনোগত করিয়া ভালো লাগার কোনও কিছু ইহার মধ্যে নাই। লক্ষ্মীর রূপটি দৃষ্টির অভিজ্ঞতা, ইহার সবটুকু। এখানে দেখা যাইবে একটি প্রত্যক্ষই অবয়ব সৃষ্টি করিয়াছে, আর একটি রংয়ের ব্যবস্থায়, একবার দেখি রেখায় আর রংয়ে, অন্যবার রং সহকারে রেখা। এমন দৃষ্টান্ত অন্য কোথাও বড় একটা দেখা যায় না, কেননা, যেহেতু অনুমান আর প্রত্যক্ষের যোগফলের ভিত্তির উপর সেখানকার শিল্পসাধনা চিরদিন হইয়াছে, এ কথার সত্যাসত্য সুধীগণের বিবেচ্য। দিক-কে ঠিকভাবে আনিতে গিয়া অনেক সময় ছবির লেভেলকে ছাড়াইয়া উঠিয়াছিল রংয়ের স্তর, আর আলো তাহার পার্শ্ববর্তী স্থানে ছায়া ফেলিয়াছিল, তাহার মন আর তেমন রহিল না, তাহার মন বাকজ্ঞানে পরিপূর্ণ ছিল, আর চোখে উপলব্ধিও ছিল, এবং পটের বাস্তবতাকে সে মানিত। সেই কারণে সবদিক হইতে তাহার আপনকার বাস্তবতা সহজ সত্যটুকু বুঝাইয়াছিল। অতএব ছবির একটা সীমা আছে। অনেক ফিরিঙ্গিরা বলেন, এতদ্দেশীয় শিল্পে-বঙ্গীয় শিল্পে দিক বলিয়া কোনও বস্তু নাই। কিন্তু জড়বাদীদের ধারণা একপ্রকার, আমাদের ধারণা অন্য। ইন্দ্রিয় জগতের বাস্তবতা সম্বন্ধে আমরা অন্যের নিকট হইতে শিক্ষালাভ করতে প্রস্তুত নহি। তাহাদেরই আমাদের নিকট হইতে অনেক শিক্ষার বস্তু এখনও আছে।
যেমন একজনের বাস্তবতা সম্যক উপলব্ধি করিয়াছিল যেসব রংয়ের স্তর প্রমাণ ছবি নহে, ঠিক তেমনই অনুমানহেতু যে রূপ তাহা চিত্র নহে, তেমনি বাঁকা করিয়া আঁকার সাধনা সাধনা নহে। তাহার বাস্তবতা অন্য, তাহা আগেই আমরা সাব্যস্ত করিয়াছি। যাহাই হউক এক প্রত্যক্ষ আর এক বাস্তবতার উপর প্রতিফলিত হইয়া এক অদ্ভুত লীলা সৃষ্টি করিয়াছে, তাহাই হইতেছে চিত্রের প্রাণবস্তু। ভালোভাবে বলিতে হইলে, দুইটি বিভিন্নতা স্পষ্টরূপেই আসিয়াছে। একটি হয়তো সাধারণ পরিপ্রেক্ষণ, আর অন্যটি তাহা নহে। সরা জিনিসটা গোল, একমাত্র গোলাকার জিনিস অনেকটা বেশি বাস্তবতা আনে, যে কোনও চতুষ্কোণ বস্তু অপেক্ষা একটি দৃষ্টিই অনায়াসে কাজ করিতে পারে। ধরুন সরার উপরে একটি লক্ষ্মীর মূর্তি আঁকা হইয়াছে, আঁকায় যাহা দাঁড়াইল, ঠিক তাহার পর উহাকে দেখা যায় আর একটি সম্পূর্ণ নিছক আলোর বাস্তবতায় এবং দৃষ্টিকোণের ফলে, এবং তাহা হইতে যে রূপ আমরা দেখিতে পাইলাম, যাহা রূপান্তরিত হইল, তাহাই হইল এখানকার ঐতিহ্যময় রূপদৃষ্টি। এমনিভাবেই রূপান্তরের পর রূপান্তর ঘটিয়াছে। এবং উহাই তাহার সত্য। এবং চিত্রের বাস্তবতাকে মানিয়া লইয়া এই ক্রিয়া যথাযথভাবে সম্পন্ন হইয়াছে, রেখায় রেখায় গভীর হইয়াছে। সেই রেখার তারতম্যে ডৌলত্ব চমৎকৃতি লাভ করিয়াছে, এবং সমস্ত দৃষ্টি আমাদের বহুদিন ধরিয়া আনন্দ বর্ধন করিয়াছে। এখানে তাহারা অনায়াসে পারিত বৃষকাষ্ঠের মূর্তিটাকে কাগজে পরিবর্তিত করিতে। কিন্তু সেটা গর্হিত তাহা তাহারা জানিত, কারণ তাহার বাস্তবতা এক দৃষ্টিতে বস্তুর দিক বুঝায় না।
এই প্রসঙ্গে আমরা গুহাবাসীদের কাজ, যাহা আমরা বহু দেখি, হয়তো উত্থাপন করিলে এইখানে দোষের বলিয়া বোধ হইবে না। সেসব কাজের দিকে চাহিয়া কে বলিতে পারে তাহাদের দৃষ্টি নিছক ছিল কিংবা ছিল না? দর্শনেন্দ্রিয়কে তাহার নিজ স্বরূপে তাহারা দেখিত, সে যে কোনও কারণেই হউক। ফলে দেখিতে পাই বস্তুকে, তাহার দিককে, মানিত না। সম্মুখের মুখাপেক্ষা তাই তাহার নিকট পার্শ্বমুখ ঢের বেশি চিত্তাকর্ষক, এবং উহাই তাহার ধারণায় চিত্রের স্বকীয়তা রক্ষা করিবার সম্যক রূপ। অন্য উত্তর ঐতিহাসিকদের। অদ্য দেখিতে পাই, বহু নামজাদা শিল্পী সেই বাস্তবতাকে বিশেষভাবে মানেন এবং মনেপ্রাণে অনুসরণ করেন। কেমন করিয়া তাহাদের সেই সরলতা, আজ যাহা বলা হয়, তাহা আসিতেছে তাহা কেহ ভালোভাবে আমাদের বলেন নাই। বেশ দেখা যায় যে, বস্তুর অস্তিত্বকে, চিত্রের বিষয় হিসাবে মানিয়াছে, অনুমানকে তাহারা নিশ্চিত মানে নাই। সেকথা আজকের পক্ষে অত্যন্ত মূল্যবান, অত্যন্ত সাহায্যকারী।
দ্বিতীয়ত আর এক ধরনে সে স্বকীয়তাকে বেশি মানা হয়। উহা যে মানসিক পরিণতির নামান্তর তাহা নহে, পূর্ণতাকে একভাবে বস্তুর সম্মুখীন হইতে হইয়াছে। সেই দৃশ্য তখনও বাস্তবতা তাহা নহে, নিছকই দৃশ্য, আকারময় মন এবংবিধ সত্যের ব্যাপারে কতখানি সাড়া দেয়! ঠিক এই মনের সুযোগ লইয়া ওদিকে যে রূপান্তর আমরা দেখি, সে বিস্ময়কর। এ সুবিধা লইতে আপনাকে মধ্যে মধ্যে চিনিয়া লইতে হইবে, তাহার অধিকার আর সীমাকে ভালোভাবে বুঝিতে হইবে। এখানে যে চেতনা পরপর সব সাহায্য করিবে, পরে আবার সেই চেতনাকেই নেতি বলিয়া বিদায় দিতে হইবে। কেননা সেখানে তাহার পরীক্ষা যখনই শেষ হইবে, আবার রোদ দেখা দিবে, সে উষ্ণতা কতখানি আপনার, কতখানি পরিমাণে আপনকার সত্তাকে অটুট রাখিতে পারে, ইহার মীমাংসা আলোর জন্যই হইবে। এইখানে আর নিজের অস্তিত্বের প্রমাণ নহে, যে প্রমাণ খানিক তন্দ্রার মধ্যেই অবলুপ্ত থাকিয়া যায়, আর খানিকটা চেতনার মধ্যে আসে। এখানে আলোই প্রথম, আলোকে যে কীভাবে আমরা স্মৃতির মধ্যে আনিবার প্রয়াস পাই তাহা মাঝে মাঝে আমরা ভাবি, ফলে আমাদের সবটুকু একভাবে আচ্ছন্ন হইয়া থাকে। যে দেহ, যে অবয়ব চিত্রকরেরা আঁকিয়াছেন, তাহার যদিও কোনও সম্বন্ধ আমাদের সঙ্গে নাই, একমাত্র শিল্পের দিক ছাড়া। আবার দেখা যাইবে সেই অবয়বের সম্যকভাবে নানা রূপান্তর ঘটিয়াছে। সেখানে তাহারা নিজস্ব পৃথিবীর পথ ধরিয়া যায়। তাই সত্য বলিয়া আমরা মানি, তাই তাহার সত্য। সেই জন্য যখন আলোর সম্বন্ধটা খুব নিকটে পাইবে এবং পুরামাত্রায় পাইবে, সোজা আলোর সঙ্গে ও পটের সঙ্গে, তাহার স্থানের সঙ্গে সম্বন্ধ, সেখানকার সংস্থান পদ্ধতি তাহার নিজের, এবং তাই সংস্থান কথাটার বস্তুর সঙ্গে আলোর সম্বন্ধ, এই সূত্র অপ্রত্যক্ষভাবে আলোকেই মানি। এখানে তাহা প্রত্যক্ষভাবে দেখা যাইবে, মানা হইয়াছে। আলো আর পটের সমস্ত কিছু একটি আধ্যত্মিক সত্তায় পরিণত হয়, তখন তাহা সত্যই চমকপ্রদ। ঠিক এই কারণে আমাদের ছবি প্রায় সব একপ্রকার, কারণ তা দিকের একটি সত্যকে মানে যা ভিন্ন দ্বিতীয় নাই। কিন্তু তাহা হইলেও, আমাদের আনন্দেরই কথা যে সেখানে আলো আছে। তাহা আমাদের শিল্পের চরম কথা। ঠিক এখানেই রংয়ের জন্য সে আঙ্গিকের সৃষ্টি হইয়াছে, রং সে অঙ্গকে ঘসিয়া মাজিয়া নিয়াছে। রং হয় আলোকের গৌণরূপ। রং যে কেমনভাবে সমস্ত লোকচরাচরের সঙ্গে মিশিয়া গিয়া সমান স্থির রহিয়াছে, তাহা আমরা বুঝি। রংয়ের আধার এবার রংয়ের কাঠামো হইয়া দেখা দেয়। এই কাঠামো আরও দৃঢ় হইবে এবং রং আলোকের অস্তিত্ব ও মনোহারিত্ব ঘোষণা করিবে। দৃশ্যাবলী তখন আরও সুন্দর হইবে। রংয়ের বর্ণাত্মক আঙ্গিকগুলি খুব দৃঢ়তার সঙ্গে শিল্পীরা আঁকেন, রং মাঝে মাঝে রেখার গণ্ডিকে সচেতনভাবেই ছাড়াইয়া যায়, সাধারণ দর্শকের মনে হইবে এইগুলি অত্যন্ত সমান, কিন্তু ইহাকে সমান বলা ভ্রম। কারণ ইহার লীলাটা ভালোভাবে অনুধাবন করা কর্তব্য। শুধু আলো ছাড়া অন্য কিছু বিচার করার সুযোগ আমাদের বড় একটা দেয় না। আলো যেন আর এক অস্তিত্ব, নিছকভাবে, আঁকা ছবির উপর পড়িয়া তাহাকে প্রাণদান করে, যেমন আলো দৃশ্যমান সব কিছুকে উদ্ভাসিত করিয়াছে, তেমনি মনে হইবে পটে আলো যেমন বাহির হইতে তাহাকে রূপদান করিয়াছে, যেমন স্থাপত্য করে, এ ধরন অনেকটা নূতন। আবার বহু বন্ধুর ধারণা আমাদের দেশের চিত্র স্থির। বলা যায় এক কথার উত্তরে, আলো নিয়া যাহারা সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম বিচার করিয়াছে, তাহাদের শিল্পধর্ম বুঝিয়া নেওয়া সবার পক্ষে সম্ভব নহে। সেখানে শুধু সমস্ত ক্ষণ একটি প্রকাণ্ড সম্বন্ধ নিয়া চাঞ্চল্য উপস্থিত, আলোকে কেন্দ্র করিয়াই তাহার অবয়ব, এবং সেই হেতু তাহার লীলা বুঝা সহজ নহে।
আর একটি কথা এখানে উত্থাপন না করিয়া পারা যায় না। মন আমাদের স্বভাবতই তর্কপরায়ণ। আমরা যদি দেখি তাহা হইলে আমাদের সম্মুখে একই ধরনের কতগুলি রূপ আমরা সব সময় দেখিতে পাইব। অনেকে এ ব্যাপারকে নিন্দা করেন। অবশ্য ইহার কারণ ছোট করিয়া আমরা আগেই বলিয়াছি। পাথরের স্বকীয়তাকে তাঁহারা মানিতে রাজি আছেন, কাঠের বাস্তবতাকে যে না মানিয়া উপায় নাই। ঠিক তেমনি বাস্তব করার জন্য অন্তত ছবির দিক হইতে তাহাকে একটি জমির কথাই ভাবিতে হইয়াছে, একটি দিকের কথাই ভাবিতে হইয়াছে। আর দেখিলাম দিকটাই, একমাত্র দৃষ্টিই সত্য এবং এই সীমাগুলি মানিয়া যে অবয়ব দাঁড়াইয়াছে, তাহা অনেকটা একই হয়। বৃষকাষ্ঠের সীমা মানিয়া যে অবয়ব গড়িয়া ওঠে তাহা প্রায় একই হয়, শুধু দুই একটি কমবেশি ছাড়া। যাহাই হউক, বাস্তবতার উপর ভিত্তি করিয়া যখন রূপান্তর হইয়াছে, তখন একমাত্র ডৌলত্বই দেখা দিয়াছে। এই ডৌলত্বই সেখানে প্রথম, এবং তাহাকে কেন্দ্র করিয়া একটি আভ্যন্তরিক স্থানসংগঠন হইয়াছে। আভ্যন্তরিক স্থান কী, আমরা পরে বিচার করিয়া দেখিব, আপাতত সেই ডৌলত্বের দিক হইতে যে কোন দৃষ্টিকোণের রূপ ফলত এক রকমই হয় দেখা যাইবে। যাহারা চিত্রের কতগুলি নিজস্বতা মানে না, তাহাদের মধ্যে কোনওকালেই ইহা ঘটে না। তাই যন্ত্রের আবিষ্কারে তাহাদের অন্তরাত্মা ছোট হইয়া যায় – সূর্যালোক পিঠ দেওয়া ছাড়া আর অন্য কাজে লাগে নাই।
হালে অবশ্য অন্যান্য দেশে অনেক কিছু বিশ্বাস হইয়াছে। তাহাদের মধ্যে অনেক চিত্র ছকা অবয়ব রূপে দেখা গিয়াছে। ইহা ওই সত্যের প্রথম সোপান এবং ওই পথই সমস্ত অন্যান্য চিত্রের স্বরূপের সঙ্গে পরিচয় করাইয়া দেয়। কালীঘটের প্যাঁচা বা কুকুর ইত্যাদি কিন্তু ঠিক ছকা অবয়ব নহে। ইহার মধ্যে আমাদের শিল্পের সত্য ঠিকভাবে বর্তমান। কালীঘাটের পুতুল ছিল বিখ্যাত-তাহার বেনে বউ (?)-তে অনেকে বলে, দেখিতে পাই, কাঠের বাস্তবতার সঙ্গে কেমনভাবে আমাদের বাস্তবতা যোগ দিয়েছে! এই সূত্রে বলা যাই পারে, যাহারা পটুয়া তাহারা তো যে যাতে নিখুঁত মূর্তি গড়িত, শাস্ত্রের বিধিনিষেধ মানিয়া ভারতে ভাস্কর্যের ছাপ (নাম্বার নয়) যাহার মধ্যে বিশেষভাবে বর্তমান, তাহারাই এই কাঠের মূর্তিটি গড়িয়াছে, প্যাঁচাটাকে সৃষ্টি করিয়াছে। ছকা অবয়ব বলিতে আমাদের আপত্তি যে সেখানে বস্তুর উপর দিয়া ঘটিয়াছে, আর এক ছন্দ সেখানে আপনকার কার্যসিদ্ধির জন্য কাজে লাগিতেছে। তাহার মধ্যে চেতনার রস নেই। যাহাই হউক, সেই পটুয়া এতই বাস্তবতার বিশ্বাস করিত যে, সে কখনই তাহার প্যাঁচাটাকে, তাহার বউটিকে শাস্ত্র বিধি নিষেধ, যোগ করে নাই, ষড়ঙ্গ তাহার নিজস্ব লীলায় আছে। তাহার সীমা অদ্ভুতভাবে আলাদা। হইলেও, সরস্বতী-লক্ষ্মীর প্রতিমায় বাংলার নিজস্ব দান আছে, সে কথা ছাড়া আমরা এক চোটেই বলতে পারি, একেবারে তাহার মধ্যে ছবির সার্থকতা আছে। একমাত্র প্রতীক সবখানটিই বিশেষভাবে বাংলার।
ইহার মধ্যে এক দিক হইতে দৃঢ় চরিত্রের স্থান, কৃষ্ণলীলার যখন বিশেষ কোনও বর্ণনা আঁকা হয়, দেখা যাইবে সেখানকার সমস্ত ঘটনা লইয়া বিচার করিবার অবকাশ আমাদের নাই। কোনও কাহিনির যোগসূত্র ধরিয়া আমরা কোনওক্রমেই আগাইয়া যাইতে পারিব না। মনোজগতের সঙ্গে তাহার সম্পর্ক অত্যন্ত অল্পই। আমরা সবিস্ময়ে দেখিতে পাইব, যতই আমরা ভাবিব, ততই তাহার লীলা আমাদের মধ্যে আলোকসম্পাত করিবে, কোনও ঘটনা বলিবে না, আমাদের সম্বন্ধ তাহার রীতি আর চিত্রাত্মক লীলার সঙ্গে, যে কথা এ যাবৎ আমরা আলোচনা করিতেছিলাম। সেখানে আমরা বুঝিতে পারিব, এক অবয়ব আর এক অবয়বে গল্প সূত্রে খাড়া হয় নাই। কেহ কাহারও উপরে তেমনভাবে নির্ভর করে না। প্রত্যেকটি অবয়বের নিজস্ব লীলা মহিমা আছে। একটি দৃষ্টিকোণের ফলযুক্ত, একটি আলোকসম্পাতের রং বৈচিত্র্যসম্পন্ন, এখানে অবয়ব স্বয়ংসম্পূর্ণ। অথচ কৃষ্ণলীলার সঙ্গে একটি মৌখিক সম্বন্ধ আছে। সে এতই গৌণ যে বিশেষ গুরুত্ব কেহ আরওপ করে না, যাহাকে নিছক কেতাবি ছবি বলে, তাহার কোনও ক্রমেই হয় নাই। অন্তত নব্য চিত্রের মধ্যে এই মাধুর্যের কিয়ৎ পরিচয় পাই। ঠিক এইভাবে অবয়ব সংগঠন রীতি ভারতের অন্যান্য চিত্রের মধ্যে দেখা যায়, কিন্তু সুস্পষ্টভাবে ইহার ক্রিয়া সম্পাদনা হয় নাই। যেসব রূপের মধ্যে বিশেষভাবে ছন্দকে স্থান দিবার ছাপ আছে। এখানকার অবয়ব ভারি সরল, অতশত খুঁটিনাটি নাই, অত খটমট নাই, খুব সোজা তাহার ব্যবস্থা। প্রত্যেকটি এক-একটি রূপের চরিত্র বর্তমান। তাহার নিজস্ব প্রকার আছে। যে প্রকারের সত্য আছে, সে প্রকারে আংশিক রং আছে, আংশিক আলো থৈ। কোথাও দেখা যাইবে ভাব প্রকাশ করিতেছে না, শুধু রং, শুধু তাহা অবয়বমাত্র-তাহার বিরাট পটল-চেরা চোখ কোনও কথাই বলে না। অন্যান্য দেশ বাস্তবতার বিশেষ সম্বন্ধ লইয়া চলে, কিন্তু আমাদের দেশ অনুরূপ নহে। পরমাণু হইতে বিশালের মধ্যে আমরা শ্রদ্ধার বস্তু পাই, সে সম্বন্ধের মধ্যে আমাদের উপলব্ধি করা সত্যের অংশ আছে।
সাদামাটা ভাবে যাহাকে সৌন্দর্য বলে তাহার খানিক কিছু নাই। ইহাতে আমাদের বিশ্বাস সৌন্দর্য কথাটা অত্যন্ত পঞ্চেন্দ্রিয় ব্যাপার, তাহার সঙ্গে এক ইন্দ্রিয়ের কোনও যোগসূত্র নাই। এখানে প্রত্যেকটি অবয়ব নিছক বাস্তবতার গুণে অস্তিত্ব পাইয়াছে। পটের মধ্যে প্রত্যেকটি স্থান পাইয়াছে। আপনি আপন চরিত্র নিয়া একটি ডৌলত্বের আভাস দিয়াছে। ইহাকে বুঝিতে হইলে আঁকিয়া বুঝিতে হইবে এবং তখনই বুঝা যাইবে তাহাতে বর্ণ কতখানি। ছক অবয়বে শুধু একটি অবয়ব থাকে, আর তাহা অনুমানের, আলোর বা অন্যান্য বাস্তবতার কোনও অংশ তাহার মধ্যে ওতপ্রোতভাবে দেখা যায় না। কোনও সামঞ্জস্য তাহার নাই। আমাদের অন্যান্য চরিত্রের বেলায় আমরা ব্যাখ্যায় দাঁড়াইতে পারিব। অবশ্য আমাদের সুধীসমাজ ধর্ম কথাটা শুনিলে কাণ্ডজ্ঞানহীন হইয়া পড়েন, এবং মনুষ্যধর্ম ভুলিয়া যান। যাহাই হউক ধর্ম্মের বোধের মধ্যে কোন রসের সন্ধান পান না, কিন্তু এসব চিত্রকে ধর্মের সঙ্গে না জড়াইয়া দেখিলেও পারেন, কারণ মানুষের সঙ্গে দেবতার কোনও প্রভেদ নাই।
‘নাড়ুগোপাল’-এর আকৃতিটি ধরা যাক। ঠিক এর বাল্যের এই বাস্তবতা লইয়া কোনওদিন কোনও রাজ্যে রূপান্তর করার চেষ্টা দেখা যায় নাই। এখানে শিল্পীর নজরের নিজস্ব ভাব দেখিতে পাই। পিছনে যদিচ বহু গল্পই আছে, হইলেও স্তন্যপানের কোনও ব্যঞ্জনা দেখা যায় নাই। সেখানে তাহার দেবত্ব প্রকাশ পায়, স্বয়ং ভগবান, এই কথা প্রচার হয়! নাড়ুগোপালের ভঙ্গিতে দেখিবেন যে, তাহার সমস্তটা রূপ উপর হইতে দেখিয়া আঁকা হইয়াছিল, তাহার কিঞ্চিৎ লক্ষণ এখনও আছে। তাহার মুখটা উপরে তোলা দেখিয়া তাহা বুঝা যায়। যশোদাদুলাল নবদুর্বাদলশ্যাম ছিলেন, এবং তাহাকে নীল বলাও হইয়াছে। আমরা হয়তো ভাবিব শিল্পীরা তাহার ছবিটা ধাঁ করিয়া টানিয়া করিয়া দিয়াছিল। কতগুলি আলোকময় রেখা সহযোগে সবুজ রং, চিত্রান্তরে লাল-তাহাকে ছাপাইয়া রেখার অস্তিত্বকে ঢাকিয়া দিয়াছে।
মুখবৈচিত্র্যকে কেহ আজকাল শিল্পের গুণ বলিয়া ধরেন না, এবং সেই দিক হইতে এই অবয়বসকলের বেশ মানে খুঁজিয়া পাই। আর এক দিক হইতে যেহেতু আমাদের দেশে সকলে জগৎতত্ব সম্বন্ধে বেশ অভিজ্ঞ, সাধারণ ভাবে, অনিত্যতাকে তাহারা বিশ্বাস করে, পুরুষ নামে একমাত্র ভগবান শ্রীকৃষ্ণকেই চিন্তা করে, আর প্রকৃতিকে চিন্তা করে শ্রীরাধার রূপে। সৃষ্টির রহস্য তাঁহারা, রহস্যের কারণ- এবং তাঁহারা ছিলেন, তাঁহারা আছেন। ঠিক এই সমস্ত রূপের উপর শিল্পীরাও নিজের বাসনা অনুযায়ী যে কোনও স্বাধীনতা লইতে সমর্থ হইত। স্বাধীনতা কথা একেবারে তাহার বাস্তবতার দিক হইতে বলা হইল, সেটা সম্ভব সাধারণ জীবনের উপর আরোপ করা যাইত না, তাহাতে হয়তো কথা উঠিতে পারিত। এ স্বাধীনতা লইলেও দেখিতে পাই, অন্যান্য গোপবালকের সঙ্গে শ্রীকৃষ্ণের কোনও প্রভেদ নাই। পূর্বেই বলিয়াছি এখানে কোনও রূপক স্থান পায় নাই, রূপই সব এক-এক ভঙ্গিতে, সেইগুলি নিজেরা জাগিয়া উঠিয়াছে, সেখানে ভাবের স্থান নাই, রং সেখানে চোখের রেখাকে ছাপাইয়া গিয়াছে, চোখের কোনও অভিব্যঞ্জনা কাহিনির দিক হইতে নাই। এই ভঙ্গিই আঁকিয়া গিয়াছে, যেহেতু তাহারা সকল সময় একের চরিত্র বুঝিয়াছে, আর তাহা অনুমানের বিষয়গত খুব কমই, এবং উহা নিছক চোখের বাস্তবতার অঙ্গীভূত।
সাধারণত একজন যদি দু’হাত তুলিয়া দাঁড়ায়, তাহা হইলেই তৎক্ষণাৎ একজন বলিবে একেবারে গৌরাঙ্গ, যদিচ লোকটি কালো হয়, যদিচ লোকটি কুরূপ হয়, তবু তাহার হাত তোলা দেখিয়াই এমত বিশ্বাস জন্মাইবে। তেমনি আবার কেহ পায়ের উপর পা দিয়ে হেলিয়া দাঁড়ায় – আহা যেন কেষ্টঠাকুর! সমস্ত সময় তাহার চরিত্র তাহার চোখ-নাক-কান হইতে সংগঠিত হয় না, যতটা হয় তাহার অঙ্গ হইতে। বাস্তবতা যেখানে চরম, নিশ্চিন্ত তুলির পারদর্শিতা যাহাকে রূপায়িত করে, উহা হয় অবস্তু, তাহার মধ্যে সাদৃশ্য থাকে না, শুধু থাকে তাহার চরিত্র; এই চরিত্রই বঙ্গদেশের চিত্রপটে সর্বময় হইয়া উঠিয়াছে। রেখায় সে শিল্পী অনেক খুঁটিনাটিতে যাইতে পারিত, শাস্ত্র তাহাকে খুঁটিনাটিতে যাইবার সাহায্য করিত, হইলেও সেখানে সে যায় নাই। কেননা রেখা হইতেছে আলোর আর স্থানের একটি অশরীরী প্রমাণ। তাই চরিত্র আলো আর রঙে পরিস্ফুট হইয়াছে, এবং চিত্ররূপ পাইয়াছে। এখানে হয়তো ভারতের অন্যান্য পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের মিল আছে বলিয়া বোধ হইবে। কিন্তু তাহা সত্যই নয়, যেমন সংকীর্তনে রাগরাগিণীর আভাস আছে, তবু তাহার স্বকীয়তা বিশেষভাবে অন্য প্রকতির, তেমনি পটের বেলাতেও সব যোগ থাকিয়াও কোনও যোগ নাই। ভারতের অন্যান্য চিত্র পদ্ধতি আর এক রকমের, তাহার সঙ্গে বাংলার যোগ নাই।
কাঠের অবয়ব ভিন্ন হইত, একটি কাঠের বাস্তবতাকে মানিয়া আর অন্যটির অনেকখানিতে কাঠের বাস্তবতার বিশেষ বিশেষ স্থানে থাকিত, কেননা তাহাকে কাপড় পরানো হইত। তাহার বিশেষত্ব থাকিলেও উহা ঠিক সেই অবয়ব ছাড়া অন্য কোথায় প্রভাববিস্তার করে নাই। পূর্বেই বলিয়াছি, রেখাভেদে আমাদের অবয়ব রূপায়িত হয়। এই রেখা জিনিসটা মানুষের শ্রেষ্ঠ অস্তিত্ব, একমাত্র মানুষের সৃষ্টি তাহার সমতার নিদর্শন। তদ্ভিন্ন আর কোনও বস্তুই তাহার নাই য়ুরোপ বলিয়াছে প্রকৃতির রেখা নাই, অথচ তাহারা দিক বেশ সুস্পষ্ট দেখে। ইহা কেমনভাবে সম্ভব তাহা অদ্যাবধি চিন্তার কথা। যদিও সেখানে রেখা পূর্বে ও পরে বহু জায়গায় ভালোভাবেই স্থান পাইয়াছে। কিন্তু সেখানে রেখা কোনও আলোর মূল্য, আলোর অস্তিত্ব নির্ধারণ করে না। তাহার রেখার কোনও সোজা মোটা তারতম্য নাই। টান আছে কিন্তু টানটা সম্পূর্ণ নয়। আরম্ভ আর শেষ নাই। কব্জি যথেষ্ট ভালোভাবে ঘোরে না। আমাদের দেশে আর্ট স্কুলে একটি কথা চলে, আমাদের তুলি যখন ভোঁতা হইয়া যায় তখন উহারা তাহা লইয়া ছবি আঁকে। কথাটায় রস আছে। কে বড় কে ছোট বলিতেছি না, তবু দুইজনের পার্থক্য আছে সে কথা বেশ বুঝা যায়। আমাদের দেশে রেখা আলোর অঙ্গ। রংয়ের গভীরতা। অনেক সময় সমালোচকেরা বলেন, কোন ছবিকে লক্ষ করিয়া, দেহের রেখা, কিন্তু তাহা সত্যই নহে। ওগুলি হইতেছে টোনের রেখা, আলোর অস্তিত্বই প্রমাণ করে, আলোকেই বর্ণনা করে। আবার কোনও বিশেষ দৃষ্টিকোণ হইতে দেখা সেই রেখা কেমন যায় তাহার পরিচয় আমরা কালীঘাটের পটে পাই, যদিও সেইগুলি প্রায়ই তুলি দিয়া আঁকা হইত না, আবার হইত, সেগুলি কাঁপা কাঁপা রেখা – সমস্ত ছবিকে বিস্তার করিয়া থাকে। এই সব রেখার বরণ যুগপৎ অবয়বের ডৌলত্ব ও আলোর রূপকে ব্যক্ত করে। যদি তাহা শুধু সমান রেখা হইত তাহা হইলে সে রেখা কোনও কাজের হইত না।
রেখাচিত্র বলিতেই সকলে একটা জ্যামিতিক রূপ কল্পনা করে, যাহার কোনও তাৎপর্য নাই। এইটুকুই প্রমাণ হইবে যে তাহারা কেহ ভালো করিয়া ছবির দিকে তাকাইয়া দেখে না। আমাদের দেশ রেখাকেই সর্বাধিক বড় করিয়া দেখে নাই, কেননা তাহা হইলে অন্য বাস্তবতার কোনও সঠিক মূল্যই থাকে না। রেখা সব সময় দিককে নির্ণয় করার সাহায্য করিয়াছে, রং-কে তাহার সুযোগ দিয়াছে, আলোকের অস্তিত্বকে খর্ব করে নাই, যেহেতু রেখার অস্তিত্ব ইহাদেরই অস্তিত্বের নাম-রূপ।
আদিম চিত্রে যে রেখার প্রচার ছিল অদ্য সভ্য দেশে ঠিক সেই ধরনের রেখার প্রচার আছে। কেননা আদিম চিত্রের জন্ম অস্ত্রের দ্বারাই সম্ভব হইয়াছে এবং তাহারা সেই রেখাকে বরাবর অনুসরণ করিয়াছে। ঠিকভাবে আলোর অস্তিত্বের দিক হইতে কোনও বিচারই সেখানে ছিল না, একথা আমরা তাহাদের চিত্র দেখিলে বুঝিতে পারি। বাটালি (?) ধরনের অস্ত্রে কতটুকু সম্ভব! আমাদের দেশে রেখাটা আসিয়াছে একেবারে প্রকৃতির মধু হইতে, যেখানে সূর্য আছে, আলো আছে, সন্ধ্যার পাখির সমস্ত কিছু ক্রমে একটি রেখা হইয়া যায় – উড়িয়া যায়।
আদিম চিত্রের সহিত সভ্যদের চিত্রের একটি বিশেষ প্রভেদ আছে। সমালোচকেরা আমাদের শুধু বলিয়াছেন, তাহাদের পরিপ্রেক্ষণ নাই, যদিও আমরা তাহা বিশ্বাস করি না। এইটুকুই তাঁহারা বলিয়াছেন। তদ্ভিন্ন কিন্তু আর একটি বিশেষ পার্থক্য আছে, যাহাকে বলিব ঘের-চেতনা, সমস্ত ছবিকে যাহা ঘিরিয়া থাকে। অর্থাৎ সমস্ত ছবিকে একটি বিশেষ ঘেরের মধ্যে রাখা তাহাদের দ্বারা সম্ভব হয় নাই। কেননা তাহারা আসলে ঘের-চেতনাসম্পন্ন ছিল না। এই ঘের-চেতনা আমাদের সভ্য যুগের। এতক্ষণ যাহা কিছু কথা হইয়াছে তাহা একটি ঘেরকে চোখের সামনে রাখিয়াই বলা হইল। ইহাও একটি রহস্য, ছবির প্রচ্ছদপট যেমন সত্য। এই চেতনার বাস্তবিকতা সম্বন্ধে আমরা আলোচনা অভ্যন্তরীণ স্থান বিষয়ে করিব।
যাহাই হউক, এই ঘের-চেতনা ছিল না। ঠিক তেমনই আমাদের দেশ ছাড়া অবয়ব-চেতনাটা এখনও আসে নাই, সেটা যে ‘ভয় থাকলেই ভূত দেখবে’ গোছের বিবর্তের (ন্যায়) অবতারণা করিবে তাহা নহে। সেটা ঠিক সত্যের উপর নির্ভর করিবে। যেমন আজ ঘের-চেতনা করে, যে কোনও জিনিসের দিকে তাকাইয়া আমরা চকিতে একটা সংস্থান খাড়া করিয়া লই, তাহার ঘের প্রত্যক্ষভাবে না থাকিলেও। ধরুন যেমন করিয়া ফুলদানিতে ফুল সাজাই, তাহার ঘের তাহা হইলে কোথা হইতে ঠিক হয়! সেটা অদ্ভুতভাবেই মনে মনে থাকে। তবে সংস্থানকে কতগুলি রেখা রূপ বাহির করিয়া আনিয়া দেখি। আলো আর রং পড়িয়া থাকে, কিন্তু অবয়ব-চেতনা যখন আসে তখন একেবারে সোজা সমস্ত কিছু লইয়াই সে আসে, সে অবয়ব-চেতনা আমাদের দেশের ছবিতে বিশেষভাবেই উল্লেখিত হইয়াছে।
ঠিক এই চেতনাই অভ্যন্তরীণ বিবেচনা করায়, এই সত্যটি সমস্ত ব্যাখ্যার একমাত্র প্রতিপাদ্য। এই অভ্যন্তরীণ স্থানের উল্লেখ অন্য কোথাও দেখা যায় না। কেননা এক-এক দেশ এক-এক ভাবে কাজ করিয়াছে। অন্য দেশে দেখি শিল্পীকে সর্বাধিক দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলিয়াছে পটের অচলতা। পটের জমিটার মধ্য দিয়া কেমন করিয়া যাওয়া যায়, এই কথাই শিল্পীর মনকে নাড়া দিয়াছে, একবারও ঘেরের কথা মনে হয় নাই। শুধু সকলেই সেখানে একটি গভীরতা সৃষ্টি করিবার জন্য ব্যস্ত, এবং সেই জন্য তাহাদের সমস্ত পণ করিয়া বসিতে হইয়াছে, এবং দেখা যাইবে, মনে হইবে তাহারা যেন পটভূমিকে খুঁড়িয়া চলিয়াছে। ইহাতে যদিও ফল লাভ হইয়াছে যথেষ্ট। শিল্পের দিক হইতে তাহা নিশ্চয় অদ্ভূত শ্রদ্ধার, তবু কতদূরে আমরা পৌঁছাইতে পারিয়াছি, অনেক বাস্তবতাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুরভাবে বাদ দিতে হইয়াছে। যেখানে আপনার বাস্তবতা কোনও রূপ না পাইয়া বরাবর ফিরিয়া গিয়াছে, ক্রমাগত সৃষ্টি করিয়াছে অস্থিরতার, শুধু নিজের মধ্যে নহে, পরন্তু সকলের মধ্যে। কারণ পটের বাস্তবতাকে ক্ষুণ্ণ করার একটা ভাব আছে, যেখানে পটটা পট থাকে, অর্থাৎ পট এক ভাগ আর রূপ এক ভাগ। যেমন পাথরের বেলায় হয়। বহু রং দিক (‘ডাইমেনশন’) আনিবার চেষ্টাও হইয়াছে অপরিসীম, কিন্তু পথ কোথায়, শেষে চৌকা আর লগা ছাড়া আর কিছু নাই, এই কথা স্বীকার করিয়া গিয়াছেন। কিন্তু একবার যদি মনে পড়িত, ঘের শুধু মাপ নায়, ঘের হইতেছে ছবির অঙ্গ এবং একদিক হইতে দিকের একটি অভিব্যক্তি, তাহা হইলে সমস্তটা সোজা হইয়া যাইত। আদিম চিত্রে ছিল না বলিয়াই আবার সরলতা ছাড়া কোনও কিছু নাই। এ ঘেরের একটি অপরিহার্য বাস্তবতা আছে, রহস্য, সীমা আছে, যাহার বর্ণনা আমাদের বাংলার চিত্রে দেখিতে পাই। অনেক সমস্ত অনেক ছবির একটু বাদ দিলেই তাহার শোভা নষ্ট হয়, কিন্তু এইখানে সে কথা ওঠে না। ঘেরের নিজের বাস্তবতা লিখিয়া বলা দুঃসাধ্য, ইহার বাস্তবতা অনুভব করা যায়, একমাত্র চোখের সম্বন্ধে এক অস্তিত্ব। আভ্যন্তরীণ স্থান ঠিক ইহার সীমাকে মানাইতে, সে সীমাকে সম্পূর্ণরূপে রহস্য বলিয়া ধরিয়া ছবির শুরু হয়, যেমন পটের বেলাতে হয়। আর দিক হইতে ইহাকে অস্বীকার করাই হইতেছে ইহার মূল। কথাটা পরিষ্কার করিয়া বলিলে এই দাঁড়ায় যে, পাথরের কাঠিন্যকে আমরা অনায়াসে অস্বীকার করিয়াছি, কিন্তু তাহার চরিত্রকে মানি, তাহা যদি না হয় তাহা হইলে যে নিছক মায়া হইয়া দাঁড়াইবে, যে মায়া চিত্রের সীমার মধ্যে আসে না, বহুদূরে থাকে! ইহাকে অস্বীকার করিতে পারা যায় দুইটি সত্য দিয়া, সেটা আলোকের আর আলোকপ্রসূত রং দিয়া। তদ্ভিন্ন হয়তো অন্য উপায় আর নাই। যেভাবে বাংলার শিল্পীরা করিয়াছেন তাহাই আমরা বলিতে চেষ্টা করিয়াছি। এবং ঘেরকে অস্বীকার করাতেই বাংলার শিল্প-ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য।
পটের মধ্যে সকল সময় সেই আভ্যন্তরীণ স্থানের সাক্ষাৎ ঘটে, এবং তখনই মনে হয় পটটি প্রকৃতির বাস্তবতায় নিবিড়। চৈনিক শিল্পে এবং সেই সূত্রে জাপানের যে কোনও চিত্রে দেখা যাইবে তাহারা ছবিটা যখন আঁকে তখন ঘেরটাকে একটি বেড়ার মতন মনে করে, কিংবা বহু জায়গায় দেখা যায় তাহারা ছবিটি যে বাস্তব এ প্রমাণ করিয়াছে। সহসা কিছু গাছের পাতা অথবা নলখাগড়ার গুচ্ছের বহু বহু টান দিয়া ঘের বাহির হইতে আসিয়াছে, ইহাতে আমাদের কোনও আপত্তি নাই, শ্রদ্ধাকে কিছু মাত্র খর্ব করিতে পারে না। তবে আভ্যন্তরীণ স্থান পাশ্চাত্যে তো নাই, অন্য কোথাও নাই। ইহা অনেক ক্ষেত্রে মানুষকে বুঝিতে সাহায্য করে না। কারণ আমরা এতাবৎ ছবি এক ভাবে দেখিতে অভ্যস্ত। ঘেরটার সঙ্গে বাঁধাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক। ঠিকভাবে তাহাকে কাজে পরিণত করা হয় নাই।
বাংলার এই বাস্তব-চেতনাকে আরও ভালোভাবে বিচার করিয়া দেখা দরকার। তাহার শিল্প বহু দেশকে প্রভাবিত করিয়াছে, সেটুকুই শুধু বিচার করার নয়, তাহার পদ্ধতি কেমনভাবে পরিণতি লাভ করিয়াছে তাহা ভালোভাবে দেখা প্রয়োজন। তাহাতে শুধু আমাদের দেশের নয় সর্ব দেশের কিছু উন্নতি হইতে পারে এবং বাংলার প্রাণধর্মের সঙ্গে সকলের পরিচয় ঘটে। এই আভ্যন্তরীণ স্থান তাহার প্রাণ ছিল এবং সে শিল্প অনেকখানি সর্বভাবে সাফল্য লাভ করিয়াছে।
এ চেতনা তাহার অধ্যাত্মবাদ হইতে আসিয়াছে – তাহার আনন্দ হইতে আসিয়াছে। বহুদিন পূর্ব্বে গঙ্গাতীরে বসিয়া একটি বালক দেখিয়াছিল অধ্যাত্মস্রোত। ওখানে কাহারা নাম গান করে, তাহার আওয়াজ সমস্ত সৃষ্টিকে একটি বাস্তবতায় পরিণত করিয়াছে, হাতে একটি তাস লইয়া কে যেন বসিয়া আছে, নীচে গঙ্গার স্রোত প্রবাহিত, কেমন করিয়া ইহারই মধ্য হইতে, ওই তো আকাশ – এই তো আমি, মৃত্যু আসে, কে যেন গোঙায়, তবু ইহার মধ্য দিয়া আসে একটি হঠাৎ হাওয়া, যমকে দেওয়া একটি আনন্দ, সমস্ত শিরা-উপশিরা স্পন্দিত সমস্ত কিছুই, এমন কি মাটির উপর, মৃত্যুর উপর, নারায়ণ ধ্বনির সমস্ত বাস্তবতাকে একটি রূপান্তর আনিয়া দিল, সে আনন্দকে নমস্কার।
এখন সময় নাই, দূরে গ্রামরেখা সবুজ হইয়া আছে, মাঠ ঘাট ফাঁকা, কোথাও গোরু চরে, আর সমস্ত কিছুই নিথর স্তব্ধ। ঠান্ডা হাওয়া আসে। ঝাঁকে ঝাঁকে পাখি উড্ডীয়মান সেই আলোতে, এমনি সময় দেখা যাইবে কালবৈশাখীর মেঘ সমস্ত আকাশ কালো করিয়া আসেয়াছে, বায়ুবেগ বাড়ে, কালো, কী অদ্ভুত কালো সে মেঘরাশি কালো চুলের মতোই, বায়ুবেগ বাড়ে, পাতা উড়ে, গাছের পাতা স্পন্দিত, গোরুগুলি হয়তো ডাক পাড়ে, সমস্ত বিশ্বের রহস্য একেবারে আদিম, এই ছোট মাঠের উপর যেখান সকলেই ত্রস্ত, সমস্ত প্রাণ তাহার জড় ভয়ে শিহরিত, নীলকালো মেঘ, ধূলা উড়ে – হঠাৎ ওই কাহারা, ওই যে সাদা সাদা পাখা মেলিয়া সারি সারি ডানা উঠে নামে, বরাভয়ের চারণ গান কি শুনা যায়, কী অদ্ভুত শোভা এই মাঠে, কালো মেঘ, শ্বেত বলাকার যাত্রা-আনন্দ ঘনীভূত হইয়া উঠে, ছেলেটি চঞ্চল হইয়া অস্থির হইয়া সম্বিৎ হারায়; এই সৌন্দর্য্য তাহাকে দৃষ্টিদান করিল, মাঠে ছেলেটি পড়িয়া রইল, সবুজ মাঠ, বহু ধূলা উড়িয়া গেল তাহার উপর দিয়া!
সমুদ্রের নীল দেখিয়া কী যেন হইল, কী যেন ঘটিয়া গেল, যে আলো ছিল, যে নীল ছিল তাহার মধ্যে সে জন কী যেন দেখতে পাইল, সে নীল তাহাকে অভিভূত করিয়াছিল, তাহাকে অস্থির করিয়া তুলিল, রং আর আলোর বাস্তবতা তাহাকে আর চেতনায় রাখিল না। নীলের মধ্যেই তাঁহার শেষ হইল।
৫ম বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা
(কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩৭৪)
