গণতন্ত্র, গোষ্ঠীস্বার্থ ও জনস্বার্থ – অমিয় বাগচী
ভারতবর্ষে গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণার উৎস বলা যেতে পারে ইংরেজ ইউটিলটিবাদীদের লেখা। রামমোহন ও বঙ্কিমচন্দ্র উভয়ের চিন্তাতেই বেনথামের প্রভাব যথেষ্ট বেশি ছিল। বঙ্কিমচন্দ্র অবশ্য পরে কোঁতের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। কিন্তু কোঁত (Comte) সম্বন্ধে তাঁর উৎসাহের মূলে ছিল জন স্টুয়ার্ট মিলের positivism সম্বন্ধে উৎসাহ। Fabian-রা Utilitarian-দের সাক্ষাৎ উত্তরাধিকারী আর জওহরলাল নেহরুর ওপর ফেবিয়ানদের প্রভাব তো অতি স্পষ্ট। গণতন্ত্রের এই ধারণার সঙ্গে প্রাচীন ভারতের গণসভার স্মৃতি পরে মিশে গিয়েছিল, এবং ইংরেজ মনীষীদের আমরা আমাদের গণতন্ত্র সম্পর্কিত চিন্তার উৎস না মনে করে পুনঃস্মারক হিসেবেই গ্রহণ করেছিলাম।
গণতন্ত্রের এই ধারণায় গণতন্ত্রকে প্রধানত সাধারণ লোকের শাসন হিসেবে মনে করা হত। গণতন্ত্র এবং প্রতিনিধিত্বমূলক শাসনতন্ত্র এখানে প্রায় সমার্থক। জন স্টুয়ার্ট মিল তাঁর Representative Government বই লেখার সময়েই জানতেন যে, আধুনিক আমলা কণ্টকিত শাসনব্যবস্থায় গণমানসের ইচ্ছা এবং শাসকের ইচ্ছার মধ্যে প্রচণ্ড দূরত্বের সৃষ্টি হতে পারে। গণমানসের ইচ্ছা কী তা সব সময়ে ঠিক করা যায় না। এবং এই অনিশ্চয়তার মাঝখানে শাসকগোষ্ঠীকে শাসন করতেই হবে; সুতরাং খুব সৎ, দায়িত্বপূর্ণ শাসকও সব সময় গণের ইচ্ছা অনুসরণ করতে পারবেন না।
আরও জানা ছিল আধুনিক আর্থিক ও শাসনব্যবস্থার বহু বিষয়েই সাধারণ মানুষ অতীব অজ্ঞ। একথা শুধু ভারতবর্ষের মতো গরিব প্রায়-অশিক্ষিত দেশের পক্ষে খাটে না, সুশিক্ষিত, সুপুষ্ট ইংরেজ ও আমেরিকানদের পক্ষেও একথা খাটে। এই অবস্থায় সাধারণ মানুষের অজ্ঞতার সুযোগ নিয়ে শাসকগোষ্ঠী অনেক কিছুই করতে পারে যা সাধারণের মঙ্গলের পরিপন্থী।
গণতন্ত্রের আদিম ধারণার সারাংশ পাওয়া যায় লিংকনের বিখ্যাত উক্তিতে It is government of the people, for the people, by the people । ঊনবিংশ শতকের এই শুভ্র ধারণার পটে বাস্তবের কালিমা আগেই লেপিত হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের কল্যাণ ও তার প্রকাশের সঙ্গে গণতন্ত্রের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক আছে একথা অস্বীকার করা হয়নি।
জন স্টুয়ার্ট মিল জানতেন যে সাধারণ মানুষের সাধারণ ইচ্ছা অনেক সময়েই স্বাধীনতার পরিপন্থী হয় (ম্যাককার্থীর তাণ্ডবের পিছনে অধিকাংশ সাধারণ আমেরিকানেরই বোধ হয় সম্মতি ছিল)। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে শিক্ষার সাহায্যে সাধারণ মানুষের দায়িত্ববোধ, সম্মানবোধ এবং স্বাধীনতাপ্রীতি বাড়ানো যেতে পারে। এই বিশ্বাস এত গভীরে প্রবেশ করেছিল যে মানুষের অভিমতের পিছনে সংকীর্ণ গোষ্ঠীস্বার্থ কাজ করতে পারে একথা সাধারণতন্ত্রে বিশ্বাসী লোকেরা মানতে চাননি। শিক্ষার প্রকারভেদে তা যে নিছক প্রোপাগান্ডা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারে পর্যবসিত হয় তা-ও তাঁরা মানতে চাননি।
শিক্ষা ও সামাজিক মঙ্গল বিচারকে (social value criticism) এই যে উঁচু স্থান দেওয়া হয়েছিল তার সঙ্গে সাধারণতন্ত্রবাদীদের আরেকটি আদর্শ জড়িত ছিল এই আদর্শ হল রাষ্ট্র ও সমাজের বিচ্ছেদ। জনসমাজের কতকগুলি মঙ্গলজনক কাজ রাষ্ট্রের ধারক সরকারকে দেওয়া হবে। কিন্তু মানুষের জীবনের অনেকখানি অংশই থাকবে রাষ্ট্রের আওতার বাইরে। এই বাইরে-থাকা স্বাধীনতা সংরক্ষণের একটি প্রধান উপায়; দুষ্ট শাসকের বিরুদ্ধে অভিমত বৃহত্তর সমাজের মধ্যে গড়ে উঠবে এবং দুষ্ট শাসনের অবসান ঘটবে। মানুষের জীবনের প্রসার ঘটবে নানারকম সমাজধৃত প্রতিক্রিয়ার মধ্য দিয়ে।
উনিশ শতকেই সাধারণতন্ত্রের এই আদর্শবাদ-আরোপিত ছবির বিরুদ্ধে আপত্তি ওঠে। আপত্তি ওঠে দুই তরফ থেকে মার্কস প্রমুখ সমাজবাদী লেখক Ideology এবং গোষ্ঠীস্বার্থের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্কের উপর জোর দেন। অন্যদিকে টকেভিল প্রমুখ রাজনীতিবিদরা সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও সামগ্রিক উন্মত্ততার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
অল্প কথার মধ্যে মার্কসের মতের সারাংশ দেওয়া দুষ্কর। এ-কথা বললে বোধহয় ভুল হবে না, কোনও গোষ্ঠীর যুক্তিগ্রাহ্য মতের মূলে যে অনেক সময়েই থাকে গোষ্ঠীস্বার্থও এ-কথা অত্যন্ত জোর দিয়ে মার্কস বলেছিলেন। গোষ্ঠী বলতে তিনি প্রধানত শ্রেণীকেই বুঝিয়েছিলেন, এবং শ্রেণীর গণ্ডী তিনি নিরূপণ করেছিলেন উৎপাদন প্রক্রিয়ায় সেই শ্রেণীর স্থান দিয়ে। পশ্চিমি গণতন্ত্র তাঁর মতে প্রধানত নতুন বুর্জোয়া শ্রেণীর হাতিয়ার। মানুষের স্বাধীনতার নামে যে কোনও ব্যবসায় মধ্যে দিয়ে লাভ করার স্বাধীনতাই বুর্জোয়া শ্রেণী খুঁজছিল। সাম্য বলতে ধনতান্ত্রিক দেশে প্রধানত রাষ্ট্র ও আইনের চোখে ব্যক্তির সাম্য বোঝানো হত; কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনকানুন স্বভাবতই এমন আকার ধারণ করত যাতে মানুষের আর্থিক সাম্য ক্ষুণ্ণ হত। এবং সম্পত্তিহীন শ্রমনির্ভর মানুষেরা আইনগত বা রাজনৈতিক সাম্য অথবা স্বাধীনতাও পুরোমাত্রায় উপভোগ করতে পারত না। উপভোগের পথে প্রধান অন্তরায় সম্পত্তিবান শ্রেণীর চাপ এবং সম্পত্তিবান শ্রেণীর তৈরি ideology। ধনতান্ত্রিক দেশের প্রতিটি মানুষের মনের ওপরে এই ideology নানাভাবে কাজ করে; ধর্মানুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে, শিক্ষার মধ্য দিয়ে, আপাত রাজনীতিমুক্ত সামাজিক কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে, রাজনীতিক বক্তৃতার মধ্য দিয়ে এবং খবরের কাগজের বিরামহীন প্রচারের মধ্য দিয়ে।
কিন্তু মার্কস বিশ্বাস করতেন এতৎসত্বেও যুক্তিগ্রাহ্য আবেদনের দ্বারা সাধারণ মানুষের কাছে তাদের মঙ্গলের কথা পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। একমাত্র শ্রেণীহীন সমাজেই এবং প্রকৃত অবস্থার মধ্যে সমতা ঘটবে, এবং একমাত্র শ্রেণীহীন সমাজেই মানুষের স্বাধীনতা ও সাম্যের দাবি প্রতি পদে ব্যাহত হবে না। সুতরাং শ্রেণীহীন সমাজের জন্য প্রচার মার্কস তাঁর জীবনের কাজ বলে মনে করেছিলেন। কিন্তু এ-কথা তিনি বিশ্বাস করেননি যে যুক্তিগ্রাহ্য আবেদনের দ্বারা শাসকগোষ্ঠীকে ক্ষমতা থেকে সরানো যাবে। শাসকগোষ্ঠীকে সরাবে তারাই যারা ধনতন্ত্রের উৎপাদন ব্যবস্থার প্রধান ধারক এবং যারা নতুন শ্রেণীহীন সমাজব্যবস্থা থেকে সবচেয়ে লাভ করবে, অর্থাৎ শ্রমিকশ্রেণী। মার্কস যুক্তির সাহায্যেই সমাজতন্ত্রের বিরোধীদের খণ্ডন করতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তাঁর প্রচারের লক্ষ্য ছিল শ্রমিকশ্রেণী এবং তাদের সঙ্গে যাদের স্বার্থ সবচেয়ে বেশি মেলে তারা।
গণতন্ত্রের অন্য সমালোচকরা বিভিন্ন শ্রেণীর মধ্যে বিশেষ পার্থক্য আনতে চাননি। যে কোনও জনতাই (mass) তাঁদের সমালোচনার লক্ষ্য। শুধুমাত্র ব্যক্তিই যুক্তির অধিকারী, শুধুমাত্র ব্যক্তির পক্ষেই ভালো কাজ করা অথবা নিজেকে সংযত করা সম্ভব। জনতা শুধু কয়েকজন ব্যক্তির সমষ্টি নয়, জনতার অঙ্গীভূত হলেই ব্যক্তি তার স্বাতন্ত্র্য, যুক্তি, দৃঢ়তা ও সাধারণভাবে মানবত্বের অনেকখানি হারায়। যে লোক ব্যক্তিগত জীবনে অতি শান্ত, ভদ্র ও নিরীহ প্রকৃতির সে-ই কোনও ‘সংগ্রামী জনতা’র অঙ্গীভূত হলে কাণ্ডজ্ঞানহীন, মারমুখী হয়ে ওঠে। জনতার বুদ্ধি সর্বদাই যে-কোনও একজন ব্যক্তির বুদ্ধির চেয়ে কম। সুতরাং জনতার হাতে শাসনের ভার দেওয়া যেতে পারে না।
প্রশ্ন হবে, তা হলে কার হাতে? এই প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে জনতা-শাসন বিরোধীরা দু’ভাগে ভাগ হয়ে পড়েন। একদল গণতন্ত্রের মূল আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বলেন যে গণতন্ত্রের উচিত কিছু বিশেষ গুণে গুণান্বিত লোককে নির্বাচন করে তাদের হাতেই শাসনের ভার ছেড়ে দেওয়া। কিন্তু নির্বাচন হতেই হবে। নয়তো সাধারণ মানুষের সাম্য ও স্বাধীনতার ওপরে হাত পড়বে।
জনতা-শাসন বিরোধীদের আর এক দল বিশ্বাস করেন না যে সাধারণ লোকে স্বাধীনতা বা সাম্য চায় অথবা গুণনির্বিশেষে স্বাধীনতা বা সাম্যের তারা অধিকারী। বুদ্ধি, গুণ, শক্তি সকল বিষয়েই কতকগুলি লোক অন্যদের তুলনায় অনেক উপরে; শাসনের ভার উপরের স্তরের লোকের হাতেই থাকা উচিত। গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচন হলে এ সম্ভাবনা থাকে যে অত্যন্ত দুর্বুদ্ধিসম্পন্ন কিছু লোক সাধারণ লোকের চাটুকারিতা করে এবং তাদের চোখে ধুলো দিয়ে ক্ষমতায় আসীন হবে। সেই সম্ভাবনা দূর করার জন্য দেশের গুণসম্পন্ন ব্যক্তিদের (elite-এর) হাতে শাসনভার তুলে দেওয়া উচিত। রাজনৈতিক জীবনের অমোঘ নিয়ম হল এই যে, মুষ্টিমেয় লোক বহুলোককে শাসন করবে; গণতন্ত্রেও এ-কথা সত্যি। কিন্তু গণতন্ত্রে ভয় আছে যে মুষ্টিমেয় ক্ষমতাশালী লোক নির্গুণ হবে। সুতরাং গণতন্ত্র বাদ দিয়ে অন্যভাবে গুণান্বিত গোষ্ঠীকে (elite-কে) ক্ষমতা দিতে হবে। কীভাবে যে ‘এলিট’কে ক্ষমতা দেওয়া হবে এ সম্বন্ধে অবশ্য জনতা-শাসন-বিরোধী এই তাত্বিককুল নীরব (বলা বাহুল্য এই তাত্বিকগণ অনেকেই ফ্যাসিজমের সমর্থক।)।
একনায়কতন্ত্রের গুণাগুণ আলোচনা বর্তমান প্রবন্ধের উদ্দেশ্য নয়। গণতন্ত্রের আলোচনা ‘গণ’কে বাদ দিয়ে শুধু ‘গোষ্ঠী’কে নিয়ে করা যায় কি না তা-ই আমাদের জিজ্ঞাস্য। আপাতদৃষ্টিতে বোধহয় যে রাজনীতির টানাপোড়েন যখন চলে গোষ্ঠীস্বার্থের ভাগ্য দিয়েই তখন রাজনীতি বোঝার জন্য জনস্বার্থের কথা ভাবা দরকার নেই। কিন্তু আসলে সকল গোষ্ঠীর ক্ষমতা, স্থায়িত্ব ও গুরুত্ব এক নয়। কোনও গোষ্ঠীর ক্ষমতা কতখানি এবং তার গুরুত্ব কতটা তা বিচার করতে গেলেই গণতন্ত্রের গণদেবতার ইচ্ছার কথা আসে এবং জনকল্যাণের কথাও ফিস ফিস করে আর বলা যায় না। জনতার গর্জন ও জনকল্যাণের দাবি গণতান্ত্রিক রাজনীতি সভার প্রধান মঞ্চ থেকে উচ্চারিত হয়। বর্তমান প্রবন্ধের শেষাংশে ভারতবর্ষের উদাহরণ দিয়ে ওপরের যুক্তিকে বলীয়ান করার চেষ্টা থাকবে।
।। দুই।।
প্রথম অংশে আমরা যে চিন্তাধারার সারাংশ দিয়েছি বিশ শতকের রাজনীতির লেখকরা সকলেই সেই চিন্তাধারার উত্তরাধিকারী। ইয়োরোপ এবং আমেরিকার রাজনীতিবিদরা সকলেই মার্কস, টকেভিল, মিল, লী বন (Le Bon), মিশেল (Michels), মসকা (Mosca) এবং বেবারের (Weber) দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। কিন্তু আমেরিকানদের ওপর এই চিন্তাধারার দুই বিশেষ উপধারা বেশি প্রভাব বিস্তার করেছে। সেই দুই উপধারার বিষয়বস্তু হল রাজনীতিতে যুক্তিবিচ্ছিন্ন প্রচারের প্রভাব, এবং রাষ্ট্রক্ষমতার ভাগাভাগিতে গোষ্ঠীগত স্বার্থের প্রচণ্ড চাপ। বর্তমান প্রবন্ধে আমি এই দুই উপধারাকে বিশ্লেষণ করতে চাই, কারণ সম্প্রতি কয়েকজন আমেরিকান লেখক ভারতবর্ষের রাজনীতি সম্বন্ধে বই লিখেছেন এবং তাঁরা সকলেই অল্পবিস্তর এই দুই উপধারার স্নাতক। মায়রন উইনার, সেলিগ হ্যারিসন, রিচার্ড পার্ক, জীন ওভারস্ট্রাট এবং রাসেল উইন্ডমিলারের নাম বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এঁদের সকলের লেখাতেই রাজনৈতিক অবস্থা সম্বন্ধে পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের গঠন ও লক্ষ্য সম্বন্ধে সুচিন্তিত বিশ্লেষণ পাওয়া যায়। আধুনিক-ভারতীয় রাজনীতির প্রতিটি ছাত্রকে এঁদের লেখা পড়তেই হবে। সেইজন্য এঁদের তাত্বিক কাঠামোর বিশ্লেষণ বিশেষ প্রয়োজন।
এঁরা সকলেই অবশ্য রাজনীতির ‘বৈজ্ঞানিক’ আলোচনায় বিশ্বাসী। অর্থাৎ তাঁরা গোড়াতে কোনও বিশেষ তত্ব থেকে আরম্ভ করেন না; পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে তাঁরা তত্ব খাড়া করেন। আসলে এ ধরনের প্রতি উক্তিই অংশত ভ্রমাত্মক। বৈজ্ঞানিক আলোচনা শুধু যদি কতগুলো ঘটনার অসংবদ্ধ কখনও না হয়, তার পেছনে তত্ব থাকবেই। এবং এই তত্ব প্রধানত আধুনিক আমেরিকান রাজনীতিবিদদের কাছ থেকে পাওয়া যায়।
এঁরা সকলেই pluralism বা বহুকেন্দ্রিকতায় বিশ্বাসী; এই কেন্দ্রগুলি ব্যক্তিমানস নয় বা আঞ্চলিক গণসমষ্টির ইচ্ছা নয়, এই কেন্দ্রগুলি বিভিন্ন বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর ইচ্ছা। রাজনীতির টানাপোড়েনে সরকার কোনও-না কোনও স্বার্থের ক্ষতি অথবা উপকার করবেই। সরকার অনেক সময় শ্রম আইনের মাধ্যমে মালিকের আর্থিক ক্ষতি করেন, অন্যদিকে বিদেশি পণ্যের উপর শুল্ক বসিয়ে দেশি ব্যবসায়ীদের পকেটে অর্থাগমের পথ প্রশস্ত করে দেন। যদিও প্রতিটি রাজনীতিবিদ জনস্বার্থের দোহাই দিয়ে ভোট চান এবং নির্বাচিত হন, এই রাজনীতিবিদদের বাঁচাতে হয়; তাঁদের নিজেদের নির্বাচনকেন্দ্রের মাতব্বর লোকেদের স্বার্থ বিশেষ করে দেখতে হয়, নির্বাচনে দাঁড়াবার জন্য বিশেষ স্বার্থগোষ্ঠীর আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য দরকার হয়, ভালো প্রেস বজায় রাখার জন্য ব্যবসায়ী, মিলমালিক ইত্যাদির শরণাপন্ন হতে হয়, কারণ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের সংবাদপত্রগুলো ব্যবসায়ীদেরই করতলগত। এই অবস্থায় রাজনীতিতে বিভিন্ন স্বার্থগোষ্ঠীর দ্বন্দ্ব অবশ্যম্ভাবী এবং গণতন্ত্রের শাসকদের প্রতিপদে এই সব স্বার্থগোষ্ঠীর মধ্যে সামঞ্জস্য করে চলতে হবে।
সুতরাং গণতন্ত্রের শাসক কোনও abstract সমাজকল্যাণের ধারণার দ্বারা চালিত হতে পারে না। ‘সর্ববৃহৎ জনসমষ্টির সর্বোত্তম মঙ্গল সাধন’ কীসে হবে এ নিয়ে মতবিরোধ থাকবেই; যদি শাসকের এই ধরনের কোনও লক্ষ্য থাকেও তিনি সেই আদর্শ বেশিদিন অনুসরণ করতে পারবেন না, কারণ সকল লোকের মঙ্গল সাধন করতে গিয়ে তিনি কোনও বিশেষ গোষ্ঠীরই মঙ্গল সাধন করতে পারবেন না এবং তার অবশ্যম্ভাবী ফলস্বরূপ তিনি ক্ষমতাচ্যুত হবেন। সরকার যদি সর্বজনের কল্যাণ সাধনেই সারাক্ষণ তৎপর না হতে পারেন, তবে রাজনীতিবিদরাই বা তা নিয়ে মাথা ঘামাবেন কেন? নীতি কী, ন্যায়নীতি কী, ন্যায়নীতি ও গণতন্ত্রের মধ্যে সম্পর্ক ইত্যাদি নিয়ে বক্তৃতার সময় উনিশ শতকের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে গেছে। এখন সৎ রাজনীতিবিদদের কর্তব্য রাজনৈতিক প্রক্রিয়া-সোজা কথা রাজনীতির মারপ্যাঁচ-খুঁটিনাটিভাবে লক্ষ করা এবং গণতন্ত্রের ধারকদের বলা কখন তারা আপস ও মীমাংসার পথ ছেড়ে একনায়কতন্ত্রের পিচ্ছিল পথে অগ্রসর হচ্ছে।
মায়রন উইনারের বই The Politics of Scarcity১ উপরিউক্ত মতের ব্যবহারিক প্রয়োগের এক প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
এই বইটির উপশিরোনাম (subtitle) হল ‘Public Pressure and Political Response in India’। এই subtitle দিয়ে বইটির বিষয়বস্তু সবচেয়ে ভালো বোঝা যায়। কীরূপে এবং কারা ভারতীয় সরকারের উপরে চাপ দিচ্ছে এবং সরকার কী কী ভাবে এই চাপের ফলে কাজ করেছে এই হল উইনারের গবেষণার প্রধান বিষয়। সরকারের উপরে চাপ দেওয়ার জন্য বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠী অথবা স্বার্থসংস্থা (interest group) তৈরি হয়। উইনার বিশেষ করে পাঁচ ধরনের স্বার্থসংস্থার প্রভাব আলোচনা করেছেন; প্রথমত জাতি (caste), ভাষা অথবা ধর্মের ভিত্তিতে গঠিত সংস্থা (Community Associations), শ্রমিকসংঘ (Trade Unions), ব্যবসায়ী সংঘ (Origanized Business), কৃষকদের দল ও আন্দোলন (Agrarian Movements), এবং ছাত্রসংঘ। সরকার কীভাবে এই সব সংস্থার দাবির সম্মুখীন হয়েছে তার আলোচনা তিনি করেছেন; তাঁর আলোচনার প্রধান উদাহরণ হিসেবে কাজ করেছে পশ্চিম বাংলা, বিশেষ করে কলকাতার বিভিন্ন আন্দোলন।
উইনারের প্রধান প্রতিপাদ্য (thesis) নিম্নলিখিতরূপ কংগ্রেসে সরকারের মনোভাব অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আদান প্রদান বা bargaining-এর পরিপন্থী হয়েছে। তাঁরা যেন সারা দেশের অভিভাবক এইভাবে তাঁরা কাজ করেছেন। ফলে আন্দোলন অনেক সময় মন্ত্রণাগৃহ থেকে রাস্তায় নেমে এসেছে। এবং রাস্তায় শ্লোগান ছোড়া পরিত্যাগ করে আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়েছে। উইনারের বক্তব্য এই যে গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি এভাবে দানা বাঁধে না। গণতন্ত্র সমস্ত দেশেই ( বিশেষ করে আমেরিকায়) দুই বা বহু স্বার্থসংস্থার আদান-প্রদানের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে। ভারতবর্ষের আর্থিক প্রগতি দরকার; কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে যদি এখানে গণতন্ত্রকে দাঁড়িয়ে থাকতে এবং বাঁচতে হয় তবে আদানপ্রদান মনোভাবকেও বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
উইনারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে আপাতদৃষ্টিতে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী অধিকাংশ লোকই একমত হবেন। কিন্তু যে-পদ্ধতিতে তিনি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন সেই পদ্ধতি পরীক্ষা করলে অনেক সংশয় মাথা চাড়া দেয়।
প্রথমত, কংগ্রেস সরকার কেন এ-রকম অভিভাবকসুলভ আচরণ করবেন? তাঁদের লক্ষ্য কী? এই প্রশ্নের উত্তর উইনারের আর একটি প্রবন্ধে (Some Hypotheses on the Politics of Modernization in India২) খুব পরিষ্কারভাবে পাওয়া যায়। তাঁর মতে ভারতবর্ষের elite প্রধান দুইভাগে বিভক্ত একভাগ ভারতবর্ষকে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দিক থেকে ‘আধুনিক’ করে তুলতে চায়, আর এক ভাগ পুরোনো সামাজিক, আর্থিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে বাঁচিয়ে রাখতে চায়। এইভাবে ভাগ করলে কংগ্রেস, কমিউনিস্ট, সংযুক্ত সমাজতন্ত্রী দল ও স্বতন্ত্র দলের বড় অংশই একদিকে পড়ে আর অন্যদিকে শুধু জনসংঘ, হিন্দু মহাসভা ইত্যাদি দলগুলো পড়ে। উইনারের সংজ্ঞার বন্ধ্যাত্ব এর থেকেই খানিকটা বোঝা যাবে।
তিনি আরও একটি বিভাগের কথা অবশ্য স্বীকার করেছেন
India is thus fragmented in at least two ways. There is, first of all, the fragmentation of the western-nonwestern gorups…, and secondly, the fragmentations which involve ethnic, class, religious, and linguistic pluralisms.
(উল্লিখিত প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ৩১-৩২)।
কিন্তু এই দ্বিতীয় ধরনের বিভাগকে তিনি ভারত রাজনীতি সমুদ্রের ওপরের তরঙ্গমালা মনে করেন
Politics in India represents more than a set of conflicts between interest groups, as we have noted throughout this paper, involve something far deeper the conflict between the forces for modernization and those against.
(উল্লিখিত প্রবন্ধ, পৃষ্ঠা ৩৭)।
প্রবন্ধের এই মত তিনি তাঁর বই The Politics of Scarcity-তে পরিবর্তন করেছেন। বইতে তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থের সংঘাতকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন, এবং তাঁর একটি প্রধান বক্তব্য হল এই যে ভারতীয় রাষ্ট্র যে পরিমাণে এই সব গোষ্ঠীস্বার্থের মধ্যে সামঞ্জস্য বজায় রেখে চলতে পারবে, এ দেশে গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ সেই পরিমাণেই উজ্জ্বল হবে।
শ্রীযুক্ত উইনারের বিশ্লেষণের গোড়াতেই দুটি মারাত্মক ত্রুটি থেকে গেছে। প্রথমত তিনি ভারতীয় কংগ্রেসের আভ্যন্ত্যরীণ গঠন কোনওরকম ভাবেই পর্যালোচনা করেননি। কংগ্রেস স্বাধীনতার আগে যে অবস্থায় ছিল, আজও প্রায় সেই অবস্থায়ই রয়ে গেছে, অর্থাৎ বিভিন্ন মতাবলম্বী উপদলের সমন্বয়। কংগ্রেসের সঙ্গে হিন্দুসমাজের কিছু সাদৃশ্য আছে বেদ অভ্রান্ত এবং উপনিষদ ভগবদ-আদিষ্ট মেনে নিলেই যেমন হিন্দু হওয়া যায়, একেশ্বরবাদী, বহু-ঈশ্বরবাদী, নিরাকারবাদী, সাকারবাদী সকলেই হিন্দু নামে আখ্যাত হতে পারে। ঠিক সেই রকম গান্ধী এবং নেহরুর বাণী সমস্ত আচরণের মূলসূত্র বলে মেনে নিয়ে কার্যক্ষেত্রে সমাজতন্ত্রী, অসমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রে বিশ্বাসী এবং অবিশ্বাসী সকলেই কংগ্রেসি বলে চলে যেতে পারে। একটি জায়গাতে অবশ্য এখনও দ্বিধা থেকে যায় (ঠিক যেমন দ্বিধা ছিল চার্বাকবাদীরা হিন্দু কি না এই সমস্যা নিয়ে) কেউ যদি নিজেকে অহিংসা ও সমাজতন্ত্রে অবিশ্বাসী বলে সর্বসমক্ষে ঘোষণা করেন; তিনিও কি কংগ্রেসি বলে গণ্য হবেন? বিভিন্ন মতাবলম্বী ও বিভিন্ন গোষ্ঠীস্বার্থের প্রতিনিধিস্থানীয় লোকেদের মধ্যে সংঘর্ষ অধিকাংশ ক্ষেত্রে কংগ্রেসি ঘেরাটোপের আড়ালেই চলে, সাংবাদিকের চোখে সহজে ধরা পড়ে না। তাছাড়া অনেক সময়েই কেন্দ্রের হুকুম সোজাসুজি অমান্য না করে বিভিন্ন রাজ্যসরকার কার্যক্ষেত্রে শুধু নিষ্ক্রিয়তার দ্বারা বানচাল করে দেন। সমবায় পদ্ধতিতে চাষ ব্যবস্থা করতে না পারা এ কথার জ্বলন্ত নিদর্শন। বিভিন্ন প্রাদেশিক ও সর্বভারতীয় কংগ্রেসি সভাসমিতির রিপোর্টগুলো বিশ্লেষণ করলে কংগ্রেসের ভেতরের দলাদলির অনেক খবরই বেরিয়ে আসে। কী নিশ্চিন্ত উপায়ে রাজ্যসরকার কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা বানচাল করে দেয় তার পুঙ্খানুপুঙ্খ কাহিনি প্রেস রিপোর্ট থেকেই পাওয়া যায়।
শ্রীযুক্ত উইনারের আলোচনার আর একটি মূলগত দোষ হল তিনি নতুনপন্থী ও প্রাচীনপন্থীদের প্রভেদের স্বরূপ নানাভাবে বর্ণনা করেছেন, কিন্তু ভারতবাসীদের মধ্যেকার সবচেয়ে বড় বিভেদের কথা প্রায় উহ্য রেখেছেন সে বিভেদ হল ধনী ও নিঃস্বের বিভেদ। এই বিভেদ পরিষ্কারভাবে আলোচনা করতে গেলেই দেখতে পেতেন স্বাধীন ভারতে নামত যে দল বা উপদলের হাতেই শাসনভার থাক না কেন, ক্ষমতা আছে ধনীদের হাতে। ( কেরালার কমিউনিস্ট সরকার কয়েক মাসের শাসনকালে এ অবস্থার পরিবর্তন করতে পারেনি; এবং তাদের অপসারণের মূলেও ছিল ধনীর হাত থেকে অপেক্ষাকৃত নির্ধনের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার চেষ্টা এবং ধনীর তরফ থেকে তার প্রতিরোধ।) ভারবর্ষে ঠিক কয়েকটি শ্রেণী আছে তা নিয়ে মতদ্বৈত থাকতে পারে, এবং শুধু অর্থসম্পর্কধৃত শ্রেণীবিভাগের সাহায্যে ভারতবর্ষের রাজনীতি বোঝা যাবে না এ বিষয়ও কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু শ্রেণীবিভাগ দুষ্কর এবং সব বৈজ্ঞানিক সমস্যার মুশকিল আসান নয় বলেই শ্রেণীর সম্বন্ধে কোনও কথাই বলা হবে না এ কোন ধরনের যুক্তি?
শ্রেণীর কথা বলতে গেলেই শ্রীযুক্ত উইনার দেখতে পেতেন যে, আধুনিকতার স্বপক্ষে বা বিপক্ষে সমাজের যে-সব নেতারা কথা বলছেন তাঁরা প্রায় সকলেই অপেক্ষাকৃত ধনী স্তর থেকে এসেছেন। তিনি এ-ও দেখতে পেতেন যে সমাজবাদী দলের অনেক নেতাও ধনীসম্প্রদায়-উদ্ভূত, আধুনিকীকরণের পক্ষপাতী কিন্তু তথাপি কংগ্রেসিদের সঙ্গে গোড়াতে এক বিরাট পার্থক্য কংগ্রেস সোজাসুজি নির্ধনের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে চায় না৩, সমাজবাদী দলের লোকেরা চায়। অনুসন্ধান এর পরে দুইদিকে চলবে একদিকে দেখতে হবে ধনীদের হাতেই যারা ক্ষমতা রাখতে চায় তাদের মধ্যে বিভেদ উঠছে কেন। আর একদিক থেকে দেখতে হবে সমাজবাদীদের সঙ্গে অন্য নতুনপন্থীদের কার্যপ্রণালীর আসল প্রভেদ কোথায়।
স্বাধীনতার পরেই ভারতবর্ষের বিত্তবানদের মধ্যে বড় এক সংঘর্ষ দেখা গিয়েছিল, সে সংঘর্ষ জমিতে সামন্ততান্ত্রিক অধিকার নিয়ে। কংগ্রেস সরকার সে অধিকার তুলে দিয়েছে। আজ অনেক দিক থেকে ভারতের বিত্তবান শ্রেণী অনেক বেশি সুসংবদ্ধ তারা সকলেই সরকারি ব্যয় থেকে লাভ করছে এবং করবে; কিন্তু তারা পরিকল্পনাকে এমন এক জায়গায় যেতে দিতে চায় না যেখানে সত্যি করে তাদের ক্ষমতার উপর হাত পড়বে। (জাতীয়করণের দ্বারা ক্ষমতা কমে না, বরং কয়লা শিল্পের মতো লোকসানের ব্যবসাকে জাতীয় মালিকানায় আনলে মালিকশ্রেণীর লাভ আরও বাড়ে।) এই ব্যাপারে গ্রামীণ ও শহুরে বিত্তবান একেবারে একমত। আস্তে আস্তে গ্রামে ধনতান্ত্রিক কৃষি ব্যবস্থার প্রয়াস হচ্ছে এবং সঙ্গে সঙ্গে নগর ও গ্রামের বিত্তবান শ্রেণীর স্বার্থের দ্বন্দ্ব কমে আসছে।
ভারতের বিত্তবান শ্রেণীর মধ্যে অন্য অনেক বিভেদের কারণ আছে ভারতীয় রাজনীতির পূর্ণাঙ্গ আলোচনায় এই সব বিভেদের আলোচনা অবশ্যই থাকবে। কিন্তু গত সতেরো বছর ভারতের বিত্তবান শ্রেণীর ক্রমবর্ধমান ঐক্য বিশ্বাসের কথা জোর দিয়ে না বললে সে আলোচনা একেবারে একপেশে হয়ে যাবে।
বিত্তবান শ্রেণীর জয়যাত্রার পাশাপাশিই আছে নির্ধন মানুষের শ্লথগতি। (উপযুক্ত পরিকল্পনার মাধ্যমে ধনীনির্ধন উভয়ের জয়যাত্রা সম্ভব, কিন্তু সে ক্ষেত্রে ধনীর আত্মম্ভরিতা অবশ্যই হ্রাস করতে হবে)। নির্ধন মানুষ কারা? সবার নীচে আছে ভূমিহীন মজুরের দল-প্রতি পাঁচজন ভারতবাসীর একজন ভূমিহীন মজুর। আর আছে ছোটচাষি-প্রতি চারজন ভারতবাসীর একজন ছোটচাষি; প্রায় কোনও বছরই তারা বছরের ফসলে কুলোয় না; যেটুকু ফসল যে পায় তারও বড় অংশ ফসল ওঠার সময় যায় মহাজনের ঘরে, কারণ ধার করেই তাকে চাষের কাজ ও সংসার চালাতে হয়। আর আছে শহরাঞ্চলের বেকার যুবক, মধ্যবয়সি ও বৃদ্ধের দল, আর রেলওয়ে, পোর্ট, কলকারখানায় খেটে খাওয়া casual labour যারা বছরের পর বছর একই জায়গায় কাজ করেও regular বলে গণ্য হয় না, কাজে কাজেই সমস্ত রকম শ্রম আইন ও শ্রম বীমা ব্যবস্থার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়।
ইতিহাসের প্রগতির পথে অবশ্যম্ভাবী জঞ্জাল (?) গোটা জাতির প্রায় অর্ধাংশকে এইভাবে নাকচ করে দিতে বুকের পাটার এবং এক ধরনের জ্যাঠামোর প্রয়োজন হয়। ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রাজনৈতিক দলই এই নির্ধন অংশকে সারাক্ষণ কাজে লাগিয়েছে কিন্তু তাদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার এতটুকু চেষ্টা করেনি। সমাজবাদী দলগুলির কার্য পরিকল্পনায় অবশ্য এই নির্ধনদের হাতে ক্ষমতা দেওয়ার ব্যবস্থা আছে কিন্তু তাঁরাও বেশিরভাগ সময় নির্ধনদের মিত্রশ্রেণীর-অর্থাৎ কলকারাখানার অপেক্ষাকৃত ভালো মাইনে পাওয়া শ্রমিক, বুদ্ধিজীবী, নিম্নমধ্যবিত্ত ইত্যাদির সমর্থন লাভের চেষ্টায় বেশি ব্যস্ত থাকেন। হয়তো অল্পদিনের কৌশল হিসেবে এতে কাজ দেবে কিন্তু ভবিষ্যৎ বিজয়ের জন্য ভূমিহীন শ্রমিক ও ছোট চাষির উপর নির্ভর না করে তাঁদের কি কোনও উপায় আছে?
বিত্তবান শ্রেণীর অধিকাংশের কার্যকলাপই নগরে। সুতরাং অনেক সময়েই তারা গ্রামের সমস্যাগুলোর সম্বন্ধে অবহিত নয়। সেই জন্যই তাদের গৃহীত অনেক নীতি অবাস্তব প্রতিপন্ন হয়েছে। কিন্তু সব সময়ে দোষের কারণ গ্রাম-নগর বিভেদ নয়, দোষের মূল কারণ ধনীনির্ধনের বিভেদ। একজন ভূমিহীন গ্রাম্য শ্রমিকের জীবধারণের সমস্যা একজন সাধারণ বিত্তবান নাগরিকের পক্ষে কল্পনা করাও দুষ্কর। শ্রীযুক্ত উইনারের গোষ্ঠীস্বার্থের বিশ্লেষণ এই জন্যই পল্লবগ্রাহী মনে হয় যে ভারতবর্ষের বিত্তবান শ্রেণী কীভাবে আইন ও শাসন ব্যবস্থা নিজেদের কাজে লাগিয়েছে তার কোনও আলোচনা তাঁর বইতে নেই। আশা করি কোনও ভারতীয় রাজনীতির ছাত্র আমাদের জ্ঞানের এই বিশাল শূন্যতা শীঘ্রই পূর্ণ করবেন।
এই প্রবন্ধ শুরু হয়েছিস ক্ল্যাসিক্যাল ও তথাকথিত আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণার তুলনা দিয়ে। আধুনিক আমেরিকানদের আলোচনায় গোষ্ঠীস্বার্থ যথেষ্ঠ প্রাধান্য পায় রাজনীতি যেহেতু অধিকাংশ সময়েই দার্শনিক আলোচনা নয় অতএব স্বার্থের নগ্ন সংঘাত যত পরিষ্কারভাবে দেখতে পাওয়া যায় ততই আলোচনা বেশি বৈজ্ঞানিক হবে। কিন্তু দার্শনিক আলোচনা অথবা সমাজনীতি ও মানবনীতির জন্য এই যুদ্ধ তাই বলে অবান্তর হয়ে যায়নি। ভারতবর্ষের সাধারণ মানুষের কল্যাণ একটি অত্যন্ত সোজা ধারণা; এই কল্যাণের বিরুদ্ধে আক্রমণের রূপও অত্যন্ত সোজা। শ্রমিকশ্রেণী অথবা ছাত্রশ্রেণীর গোষ্ঠীস্বার্থ যে সাধারণ মানুষের কল্যাণের সবচেয়ে বড় শত্রু নয় সে তো জানা কথাই। সুতরাং সমস্ত গোষ্ঠীস্বার্থকে একই ভাবে দেখার অর্থ প্রগতির বাধাগুলোকে চিরস্থায়ী বলেই মেনে নেওয়া হবে।
শুধু সমাজকল্যাণের দিক থেকে নয়, বৈজ্ঞানিক আলোচনার দিক থেকেও সমস্ত গোষ্ঠীস্বার্থকে সমান মনে করা অত্যন্ত ভ্রমাত্মক হবে। ভারতবর্ষের প্রায় সমস্ত দাঙ্গাহাঙ্গামার একটি মূল কারণ অর্থনীতিক; ভাষাগত, জাতিগত বিভেদ যাই থাকুক না কেন, আশু আর্থিক লাভের আশাই গুন্ডা, বেকার ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোককে প্ররোচিত করে। এই সাধারণ সত্য গোষ্ঠীস্বার্থের পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনায় প্রায়শ ঢাকা পড়ে যায়।
তাছাড়া অনেক সংঘাত পরিবর্তনশীল সমাজের গতির লক্ষণ মাত্র। এই সংঘাতগুলোর মধ্য দিয়ে যে-সব দল-উপদলের জন্ম হয় সেগুলোর জীবন দীর্ঘ নয়। তাদের যদি আর্থিক অথবা ধর্মীয় গোষ্ঠীর সমপর্যায়ে দেখা যায়, তবে সিদ্ধান্তগুলো বেশ একপেশে হয়ে যাবে।
ভারতবর্ষকে শিক্ষায়, সংস্কৃতিতে ও আর্থিক সম্পদে সমৃদ্ধশালী করা বিরাট উদ্যমসাপেক্ষ। সামাজিক অগ্রগতির বহু শত্রু চারপাশে বর্তমান। সবচেয়ে বড় শত্রু সেই সব প্রতিষ্ঠিত ধনী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপে যাঁদের ধর্মসঞ্চয় ব্যাহত হবে। প্রতিটি ভারতবাসীকেই তার যথেচ্ছাচারের ওপর হস্তক্ষেপ মেনে নিতে হবে, কারণ বহু কাজেই একের সামর্থ্য ও উদ্যম নিস্ফল হবে এবং বহুর উদ্যমের সাফল্যের জন্য সমষ্টির শৃঙ্খলার প্রয়োজন হবে। এই রকম অবস্থায় যদি সত্যিই মেনে নিতে হয় গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নীতি, আদর্শ ইত্যাদির কোনও স্থান নেই তবে অসহায় ভাবে ভাগ্যচক্রের-অথবা গোষ্ঠীচক্রের-আবর্তনের অপেক্ষা ছাড়া কোনও উপায় থাকে না। সৌভাগ্যক্রমে আমরা দেখেছি, বৈজ্ঞানিক আলোচনার অর্থ সমাজনীতি-আলোচনা বাদ দেওয়া তো নয়ই, উপরন্তু সমাজনীতি-আলোচনা ছাড়া রাজনীতির বহুরূপকে বুদ্ধির আওতায় আনার কোনও উপায়ই দেখা যায় না। সুতরাং এখনকার মতো আমাদের আমেরিকান শিক্ষকদের বর্ণনা-অংশটুকুতে তাঁদের অনুসরণ করে পরিষ্কার বিবেক নিয়ে আমরা আবার রামমোহন-বিদ্যাসাগর-বঙ্কিমের অসমাপ্ত কাজে ফিরে যেতে পারি; নির্ধন, অশিক্ষিত ভারতীয়কে তার অধিকার সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা।
সূ ত্র নি র্দে শ
১. Asia Publishing House, Bombay, 1963.
২. Richard L. Park and Irene Tinker (ed) Leadership and Political Institutions in India (Madras, 1960)
৩. নির্ধনের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়া এবং দরিদ্রকে নারায়ণ বলে ভক্তি করা বা দরিদ্রকে দরিদ্র রেখে আর কোটিপতিকে কোটিপতি রেখে তাদের সমান সম্মান দেওয়া যা এককথা নয়, এ কথা বলাই বাহুল্য।
৩য় বর্ষ ১ম সংখ্যা
(কার্তিক-অগ্রহায়ণ১৩৭১)
