বস্তুপ্রেমিক ফরাসী ‘নব’ উপন্যাস – লোকনাথ ভট্টাচার্য

বস্তুপ্রেমিক ফরাসী ‘নব’ উপন্যাস – লোকনাথ ভট্টাচার্য

সর্বপ্রথমেই শিরোনামার ওই ‘নব’ কথাটার একটু ব্যাখ্যা দরকার। হয়তো নব না বলে অভিনবই বলা আরও যুক্তিযুক্ত হত। কিন্তু তা বলা হয়নি কারণ ফরাসিরা-বিশেষত সেই সব ফরাসি ঔপন্যাসিকরা, যাঁদের কীর্তি একমাত্র প্রসঙ্গ বর্তমান আলোচনার — তাঁরা নিজেরাই জিনিসটাকে অভিনব বলতে চাননি (কেন জানি না), বলেছেন নব বা তাঁদের ভাষায–nouveau, যদিও তাঁদের সমস্ত কথাটি হ’ল-nouveau roman, যার আক্ষরিক অনুবাদ ‘নব উপন্যাস’-এ গিয়েই দাঁড়ায়। তবু প্রশ্নটা থেকেই যায়-নব কেন? কেন এই সস্তা, খেলো, অতি পরিচিত ও সর্বগূঢ়ার্থশূন্য বিশেষণ, বিশেষত বিশেষণটি যে-বস্তুর সেটি যখন সাংঘাতিকভাবে গূঢ়, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে সমজাতীয় অন্যান্য রচনা থেকে এত প্রকটভাবে পৃথক? কারণ কোন বইটা নব এ-জগতে? যেটা আজ বেরিয়েছে, বা যার প্রকাশ আসন্ন বলে আজ ঘোষণা করা হচ্ছে, পরিচিত অর্থে সেটাই তো নব, এবং সেটা কালই গতকালের জিনিস হয়ে যাবে, আর ততটা নব (ওই পরিচিত সর্বজনগ্রাহ্য অর্থেই) থাকবে না। সুতরাং, উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে যে ফ্রাঁসোয়াজ সাগাঁ-র (Francoise Sagan)যে-বইটা আজ সদ্য বেরোল, সেটাকেই বা নব উপন্যাস বলা যাবে না কেন তবে?

না, পরিচিত অর্থে বলা গেলেও আমাদের বর্তমান ও বিশিষ্ট অর্থে সেটিকে নব বলা যাবে না — শুধু সাগাঁর আজকের সদ্য প্রকাশিত বইটিকেই নয়, তাঁর আগের অন্যান্য বইগুলিকেও, এবং পরেও তিনি যত বই লিখবেন, যদি লেখেন, তারও সব ক’টিকেই (অবশ্য এক যদি তিনি রাতারাতি লিখন-ভঙ্গির ভোল সম্পূর্ণ না পালটে বসেন, তাঁর বক্তব্যটিরও এক প্রচণ্ড রূপান্তর সাধন না করেন)। সাগঁকে এর মধ্যে টানা শুধু উদাহরণ-প্রসঙ্গেই, তাঁর সপক্ষে বা বিরুদ্ধে জোর করে কিছু বলা বর্তমান উদ্দেশ্যের সম্পূর্ণ বহির্গত। যে-কথা তাঁর সম্বন্ধে বলা হল, তা সমানই প্রযোজ্য তাঁর শ্রেণীভুক্ত অন্যান্য বহু জীবিত ও সক্রিয় ফরাসি ঔপন্যাসিকদের ক্ষেত্রে, এবং যাঁরা সংখ্যাধিক্যে আলোচ্য মুষ্টিমেয় ‘নব’ ঔপন্যাসিকদের অনায়াসেই আচ্ছন্ন করতে পারেন। নব বলতে তাহলে এখানে বুঝতে হবে একটি অতি বিশিষ্ট জিনিস, এক ভিন্ন মানসিক সত্তা, যেটাকে ফরাসিরা বলবেন etatd’ esprit’ । আবার তাঁদের বক্তব্যের সেই সত্তাটিই শুধু নয়, তাঁদের বলার ভঙ্গিটিও সমানই ‘নব’ ও বিশিষ্ট। এবং এই ‘নব’ যেহেতু মুখ্য একটি মানসিক অবস্থার বিশেষণরূপে এখানে ব্যবহৃত, প্রচলিত অর্থের আজ-এর সীমিত সংজ্ঞায় সে নিজেকে উজাড় করে না। অর্থাৎ, কথাটাকে আরেকটু পরিষ্কার করে বলা যায় এই ভাবে যে এমন বেশ কয়েকটি ফরাসি উপন্যাস আছে যা যদিও প্রকাশিত হয়েছে দশ বা বিশ বছর আগে বা তারও আগে, তাদের আজও আমরা বর্তমানের অতি বিশিষ্ট অর্থে ‘নব’ বলতে সংকুচিত হব না।

এখানে বোধ হয় এটুকুও যোগ করা সমীচীন হবে যে এই জাতীয় উপন্যাসকে কোনও কোনও সমালোচক নব না বলে আঁতি-রোমাঁ(anti-roman)বা ‘প্রতি উপন্যাস’ বলে এক সময় চালাতে চেষ্টা করেছিলেন, কেউ কেউ তা আজও করে থাকেন। তাঁদের প্রতিপাদ্য হ’ল, উপন্যাস বলতে আমরা এতকাল যা বুঝে এসেছি, এক ঘটনা ও চরিত্র-সম্বলিত আখ্যান, এ-ধরনের উপন্যাস তার সম্পূর্ণ উল্টেপথে যায়। কথাটার মধ্যে যে যুক্তি নেই তা নয়, তবে নব উপন্যাসের ধ্বজাধারীদের আপত্তি ওই ‘আঁতি’ শব্দটা নিয়ে — তাঁরা বললেন তাঁদের উপন্যাসও উপন্যাস, যেমন বালজাক-এর(Balzac)পেয়ার গোরিও- ও (Pere Goriot)উপন্যাস, যদিও ঠিক এক অর্থে নয়। যে যুগের যা, এবং তাঁদের এই নব উপন্যাস এ যুগের জীবনের এক বিশ্বস্ত ও অর্থপূর্ণ প্রতিচ্ছবি বলেই এটাও কম উপন্যাস নয় বা উপন্যাসের বিরোধী কিছু সৃষ্টিছাড়া জিনিস নয়-তবে এটা নতুন ধরনের উপন্যাস। তাছাড়া, উপন্যাস বলে একমেবাদ্বিতীয় কিছু নেই, যার শুধু একটিমাত্র শেষ সংজ্ঞা বা ব্যঞ্জনা সম্ভব হতে পারে-তাকে যুগে যুগে নতুন করে তোলার দায়িত্ব ঔপন্যাসিকেরই। বালজাক-এর রচনা যেমন উপন্যাস বলে লোকে একদিন স্বীকার করে নিয়েছিল, এই নব উপন্যাসও তেমনি করে উপন্যাসের স্বীকৃতি একদিন পাবে পাঠকের কাছ থেকে। এবং সেদিনের সম্ভাবনা যে এখনও সুদূরপরাহত, তাও নয়-বলা যায়, সেদিন ইতিমধ্যেই এসে গেছে, ইতিমধ্যেই লোকে এটাকে উপন্যাস বলে স্বীকার করে নিচ্ছে, এই নিয়ে ফ্রান্সে (ও অন্যত্র) হইচই আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। ১৯৬৩-তেই লিখতে দেখি আল্যাঁ রব-গ্রীইয়েকে(Alain Robbe-Grillet, ফরাসি ‘নব ঔপন্যাসিকদের’ এক প্রকাণ্ড মুখপাত্র) ‘লোককে বুঝিয়ে ছাড়ার বাসনা যখন এত প্রচণ্ড, তখন দেখতে ভালো লাগে লোকে বুঝতে শিখছে।’

তবে এখানে আরও ছোট ছোট দুটি কথা আছে, তাও বলে নেওয়া দরকার। প্রথম কথাটি হল নব উপন্যাসের প্রসঙ্গে এক মানসিক সত্তার উল্লেখ করেছি। কিন্তু তার মানেই এই নয় যে সেই সত্তাটি একটি একক, অবিচ্ছেদ্য ব্যাপার, যার দ্বারা নির্বিশেষে চিহ্নিত সমস্ত নব উপন্যাসই বা ঔপন্যাসিকই। অর্থাৎ, নব উপন্যাসকে সাধারণ অর্থে একটি আন্দোলনের আখ্যা যদিও দেওয়া সম্ভব হয়, সেই আন্দোলনের প্রকৃতি কিন্তু বিভিন্ন লেখকে বিভিন্ন রূপ নেয়, এবং এই লেখকেরা নিজেদের একটি গোষ্ঠী বলে পরিচিত করতে ইচ্ছুক নন — সকলেই যে যার নিজের স্বাতন্ত্র্যে স্ব-আকাশবিহারী। বর্তমান প্রচষ্টোয় লক্ষ্য হল, তাঁদের বা তাঁদের বিভিন্ন রচনার মধ্যে কতকগুলি সাধারণ, মুখ্য ও বিশিষ্ট গুণের আবিষ্কার, ও সেগুলির আলোচনা। এবং তাঁদের রচনা হতে দুয়েকটি উদাহরণ দিয়ে ব্যাপারটা যথাসম্ভব প্রাঞ্জল করতে চাওয়া।

দ্বিতীয় কথাটির গুরুত্ব আরেকটু বেশি। এ আন্দোলন — যদি আন্দোলনই বলা চলে — এ একটা নিছক হুজুগ নয়, বীটনিক কবিসুলভ বাঁদরামি নয়, তথাকথিত ‘রাগী’ কবি সাহিত্যিকের ছ্যাবলামি বা প্রলাপ নয়, অ্যাবসার্ডের পূজারি নয়। এ এক প্রচণ্ড কসরত, এক ভয়ংকর বুদ্ধিজীবী ব্যাপার, ভাবে ও আঙ্গিকে এ যেমন বলিষ্ঠ, এর সম্যক অনুধাবন তেমনি শ্রমসাধ্য। এ-আন্দোলনে কোমর বেঁধে যোগদান করেছেন যে সব সাহিত্যিক, তাঁরা সকলেই সভ্য, শিক্ষিত (শিক্ষিত বলতে শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রিধারীদেরই বলছি না, যদিও সে-ডিগ্রিরও কোনও অভাব নেই এঁদের কারও কারও), আচার-ব্যবহারে বেশ-ভূষায় সুস্থ সবল মানুষ এবং যাকে বলে ইন্টেলেকচুয়াল, তার শেষ। শুদ্ধ বুদ্ধির রসে পাশ্চাত্য সভ্যতার সাম্প্রতিক ইতিহাসের সকল দুরূহ বক্তব্য এঁরা গুলে খেয়েছেন। এবং তাই তাঁদের নিজেদের বক্তব্যটাও কম নয়, এবং সে বক্তব্যটাকে ঠিক কোন মাধ্যমে কেমন করে বলতে হবে, তার সম্বন্ধেও তাঁরা সমান সচেতন। এঁদের প্রায় সকলেই খোলাখুলি আসরে নেমেছেন বহুবার, প্রবন্ধ ইত্যাদির আকারে (অর্থাৎ শুধু উপন্যাসের মাধ্যমেই নয়) পরিষ্কার করে বোঝাতে চেয়েছেন তাঁদের উপন্যাসটা ‘নব’ কেন, জিনিসটা কী, তাঁরা কী বলতে চান, ইত্যাদি।

এঁদের মধ্যে প্রধান যাঁরা, তাঁরা হলেন একে একে নাতালি সারোৎ (Nathalie Sarraute), ক্লোদ সিম (Claude Simon)অ্যাল্যা রব-গ্রীইয়ে(Alain Robbe-Grillet), মিশের ব্যুতব (Michel Butor) ও রবের প্যাঁজে (Robert Pinget) । মার্গরিৎ দ্যুরাস-এরও(Marguerite Duras) কোনও কোনও রচনা নব উপন্যাসের পর্যায়ে পড়ে, তাই তাঁকেও এঁদের দলে কেউ কেউ টেনে থাকেন। উচ্চস্তরের সিনেমা-প্রেমিক বহু বাঙালির কাছে দ্যুরাসের নাম পরিচিত হয়তো ইতিমধ্যেই, কারণ ইনিই প্রখ্যাত ফরাসি ফিলম Hiroshima Mon Amour-এর চিত্রনাট্য লেখেন এবং এঁর একটি উপন্যাস, মদেরাতো কান্তাবিলে(Moderato Cantabile) বা ‘মৃদু মন্দ গান’, সম্প্রতি ফিল্ম হয়ে সারা ইউরোপে রীতিমত সাড়া তুলেছে। কে এই নব উপন্যাসের প্রথম প্রণেতা বা ঠিক কোন প্রথম বইটিতে এই ধরনের উপন্যাসের সুস্পষ্ট সূত্রপাত, তা নিয়ে তর্কের অবকাশ আছে-তবে পথিকৃৎ হিসেবে অনেকেই মেনে নেন সারোৎকে, এবং সে-প্রসঙ্গে তাঁর যে গ্রন্থটির উল্লেখ সচরাচর শোনা যায়, সেটি হল ত্রোপিজম(Tropismes), এবং যা প্রথম প্রকাশিত হয় এখন থেকে বোধ হয় বাইশ কি তেইশ বছর আগে। আমার কাছে বইটির-যে সংস্করণ আছে, সেটি একটি পুনর্মুদ্রণ ও যা Editions de Minuit (এঁরাই যাবতীয় নব উপন্যাসের মুখ্য প্রকাশক) প্রকাশ করেন ১৯৫৭-তে।

ত্রোপিজম (বাংলা অনুবাদ সম্ভব নয়, তবে ১৯৬০-এ এই সম্বন্ধে আলোচনা করতে গিয়ে সরোৎ স্বয়ং লিখছেন ‘আমার গবেষণার বিষয় হল কতকগুলি বিশেষ গতিভঙ্গি যার মধ্যে নিহিত আমাদের বাক্য ও কর্মের প্রস্তুতি এবং যাকেই আমি ”ত্রোপিজম” আখ্যা দিয়েছি’)। উপন্যাস নয়, কয়েকটি সংক্ষিপ্ত গদ্য রচনার সমষ্টি, অনেকটা গদ্য-কবিতার মতো। তবু তাকে নব উপন্যাসের সূচক বলে যাঁরা গ্রহণ করেন, তাঁরা তার কাহিনি-হীনতাটাকে উপেক্ষা করে বইটির অন্তর্নিহিত প্রতিপাদ্য ভাববস্তুটির উপরই বেশি জোর দিয়েছেন। বহু ফরাসিকে বলতে শুনেছি, সারোৎ যেহেতু প্রথমত নারী, দ্বিতীয়ত মূলত রুশ ও বর্তমানে ফরাসি ও তৃতীয়ত ইহুদি, তাঁর মানসিক সত্তাটা তাই স্বভাবতই একটা জটিলতার অরণ্য, এবং সেই হেতুই এতে আশ্চর্য হবার কিছু নেই যদি নব উপন্যাসের মতো একটা সাংঘাতিক জটিল ব্যাপার তাঁর লেখনীর মধ্যে দিয়েই প্রথম আত্মপ্রকাশ করে। কিন্তু এমন একটা কথা মেনে নিলে এ-দলের (এঁরা অবশ্য ঠিক কেউই তেমন দল নয়, কোনও দলেই পড়তে চান না, আগেই বলেছি — তবে যে সাধারণ মিলটি এঁদের একত্র করে, তা সকলেরই নব ঔপন্যাসিক হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার বাসনা ও সাধনা) অন্যদের সম্বন্ধে কী বলব, যাঁদের অধিকাংশই না নারী, না মূলত রুশ, না ইহুদি? না, নব উপন্যাসের উৎসের কারণ খুঁজতে হবে যুগের অন্যান্য অনিবার্য অবিসংবাদিত লক্ষণের মধ্যে। এবং এটুকুও বলা দরকার এখানে যে সূত্রাপাত যেমন করেই হোক না, নব উপন্যাস কথাটা চালু করার পিছনে রব-গ্রীইয়ের দান নিঃসন্দেহে অন্য সকলের থেকে বেশি — ১৯৬৩-তে তিনি একটা প্রবন্ধ গ্রন্থই প্রকাশ করে বসলেন, ‘নব উপন্যাসের সপক্ষে'(Pour Un Nouveau Roman)। এই আঙ্গিকের অসামান্য সক্রিয় শিল্পী হিসেবে মিশেল ব্যুতরও কম যান না — সম্প্রতি দেখলাম, এক ফরাসি সমালোচক রব-গ্রীইয়ে ও ব্যুতরকে যথাক্রমে নব উপন্যাস আন্দোলনের রবেসপিয়ের(Robespierre)ও স্যাঁ-জুস্ত(Saint Just)বলে বর্ণনা করেছেন। সকলেই জানেন, রবেসপিয়ের ও স্যাঁ জুস্ত ফরাসি বিপ্লবের দুটি বহুখ্যাত ব্যক্তিত্ব, দুই দিকপাল।

তবে এই নব উপন্যাস নিয়ে তর্কাতর্কি যদিও ইতিমধ্যেই খুবই হয়েছে এবং ক্রমশই আরও বেশি করে হচ্ছে, এ-উপন্যাসের পাঠক আজও সীমিত। রব-গ্রীইয়ের একটি সাম্প্রতিক বই প্রথম মুদ্রণে ২৮,০০০ কপি ছাপা হয়েছে — এত বড় জনপ্রিয়তার ভাগ্য তাঁর আগের কোনও বই অর্জন করেনি। কিন্তু ফ্রাঁসোয়াজ সাগাঁর (এবং তাঁর শ্রেণীভুক্ত অন্যান্য জনপ্রিয় ফরাসি ঔপন্যাসিকের) যে কোনও বই প্রথম মুদ্রণে অনায়াসেই ১,০০,০০০ কপি ছাপা হয়। তবে নব ঔপন্যাসিকেরাও যে সাধারণ ফরাসি পাঠকের চোখে ধীরে ধীরে জাতে উঠছেন, তার একটি নিশ্চিত প্রমাণ পাই এই ঘটনাটিতে শুধু এই নতুন সাহিত্যের নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার দুরন্ত প্রেমিক Editions de Minuit-ই নন, Gallimard-এর মতোন ও লব্ধপ্রতিষ্ঠ বিশ্ববিশ্রুত প্রকাশক এঁদের কোনও কোনও বই সানন্দে গ্রহণ করছেন। অবশ্য সহজে স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য এঁরা কেউই লালায়িত নন, উল্টে পাঠকের মনকেই ধীরে ধীরে তাঁদের চিন্তার অনুকূল করে তুলতে চান। এঁদের সাহিত্য কতটা মূল্যবান বা একেবারেই মূল্যবান কি না তা নিয়ে তর্কের অবকাশ থাকলেও এঁদের ধৈর্য, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতা যে শ্রদ্ধেয়, তা তর্কাতীত।

যে-ক’জন মুখ্য নব ঔপন্যাসিকের নাম আলোচনা করেছি, তাঁদের প্রত্যেকেই বেশ কয়েকটি করে উপন্যাস ইতিমধ্যেই প্রকাশ করেছেন, এখনও লিখে চলেছেন ক্রমশই আরও জোর ও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে, একটি বছরের ভিতরেই কেউ কেউ দুই বা ততোধিক উপন্যাস লিখছেন — এবং এসব আমাদের দেশের পূজা সংখ্যার উপন্যাস নয়, যা যেমন-তেমন করে লিখে দেওয়া চলে এবং যা না লিখলেও কোনও সাহিত্যের কোনও ক্ষতি ছিল না। নব উপন্যাস একটার পর একটা লিখে যাওয়া চারটিখানি কথা নয়, কারণ প্রত্যেকটি উপন্যাসের পিছনে বিদগ্ধ অনুশীলন ও চিন্তার বহু খড়কুটো পোড়াতে হয়, একই পরিচ্ছেদ বা অংশ কখনও বারবার নতুন করে লিখতে হয়। এ প্রসঙ্গে ক্লোদ সিমঁর একটি উক্তি উদ্ধৃত করা যাক

ব্যক্তিগতভাবে আমার যা ভালো লাগে তা সেই ভাষাকে নিরন্তর শব্দে অনূদিত করে চলা, যাকে স্যামুয়েল বেকেট(Samuel Beckett) নাম দিচ্ছেন ‘সেটা কেমন করে’ বলে। বরং ‘কেমন করে সেটা এখন’, সেটা কেমন করে আজকের আমার শাশ্বত স্মৃতিতে। এই বর্তমানের মুহূর্তটিতে — সেই মুহূর্তটিকেই যদি একক করে ধরতে চাই — আমি তো কিছুই দেখতে পাই না।

১৯৫৯-এ বলতে দেখি মিশেল ব্যুতরকেও

উপন্যাস তাই এক আশ্চর্য মাধ্যমে নিজেকে দাঁড় করিয়ে রাখার পক্ষে, বুদ্ধিমানের মতো বাঁচার পক্ষে, বেঁচে চলার পক্ষে এমন একটি পৃথিবীর অভ্যন্তরে যা ক্রোধে প্রায় উন্মাদ ও যা আমাদের সর্বদাই আক্রমণ করতে উদ্যত দশ দিক হতে।

এই ধরনের নানান উক্তি এঁরা প্রত্যেকেই করেন, যেসব উক্তির মধ্যে নিহিত এঁদের একটি ক্ষুরস্য-ধারা সাধনার ইঙ্গিত।

যেহেতু স্ব -স্ব মহিমায় এঁদের প্রত্যেকেই মহীয়ান — এঁদের দুয়েকজনের উপর একাধিক গ্রস্থ পর্যন্ত লিখিত হয়েছে — একটি ছোট নিবন্ধের আলোচনায় এঁদের সকলকে একত্র করা খুবই কষ্টসাধ্য। এঁদের সকলের সব কথার সম্যক অনুধাবন আমাদের পক্ষে সহজ নয়। তার উপর আছে বই না পাওয়ার হাঙ্গামা। তবে সৌভাগ্যবশত, এখনও নিয়মিতভাবে দুটি একটি মুখ্য ফরাসি পত্র-পত্রিকা দেখা যায়-যাদের মধ্যে আছে বিশেষত ‘Critique’, শুদ্ধ বুদ্ধিজীবী সাহিত্যিক আলোচনার এক অনবদ্য মুখপত্র — তাই কী হচ্ছে না হচ্ছে, কে কী লিখছেন না লিখছেন, চোখে পড়ে। যা নিজে পড়িনি এবং যার সম্বন্ধে শুধু অন্যের আলোচনাই চোখে পড়েছে, সেরকম বই সম্বন্ধে কিছু বলা বা বলতে চাওয়া ধৃষ্টতা হবে।

আপাতত বড় আলোচনার সুযোগ নেই, তাই ধরেই নিচ্ছি, পাশ্চাত্যের আধুনিক কথাসাহিত্যে ভাব, মানস ও শৈলীর যে-যুগান্তকারী বিবর্তন সম্প্রতি সাধিত হয়েছে, বর্তমান নিবন্ধের পাঠকেরা অন্তত মোটামুটিভাবে সে-সম্বন্ধে অবগত আছেন। নব উপন্যাসের প্রসঙ্গে যে সমস্ত পূর্বসূরীর নাম অবশ্য উল্লেখ্য, তাঁদের মধ্যে আছেন, মুখ্যত, মার্সেল প্রুস্ত(Marcel Proust), কাফকা (Kafka), সার্ত্র (Sartre) ও কাম্যু (Camus)। বলা বাহুল্য, কীভাবে কী আঙ্গিকে, এঁদের সকলের বক্তব্যের মধ্যে কোনও বিবর্তনের একটি স্পষ্ট, ঋজু রেখার আবিষ্কার সম্ভব নয়, — অর্থাৎ একজনের একটি জিনিস থেকেই আরেকজনের অন্য জিনিসটা উদ্ভুত হয়নি; এখানে সব বক্তব্যগুলোরই স্থান আছে, সকলেই একসঙ্গে বাস করছে এক ভয়ংকরভাবে জটিল সমাজ ও জগতে। কেবল এইভাবে এক সঙ্গে বাস করার দরুনই যেন এই এই লেখকেরা, বা তাঁদের এই-এই লেখাগুলি, নিজেদের মধ্যেই এক ভিন্নতর সমাজের সৃষ্টি করেছে, যেখানে কখনও প্রত্যক্ষে কখনও পরোক্ষে এদের প্রভাব অন্যের উপর পড়ছে ক্রমাগতই। এই বস্তুজগত, এই সমাজ ও তাতে মানুষের অস্তিত্ব সম্বন্ধে যে কতকগুলি প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড প্রশ্নের সম্মুখীন হবার চেষ্টা করছে সব উপন্যাস, সে সবের ধারণা যদিও এক অর্থে নব ঔপন্যাসিকরা পেয়েছেন আগের সাহিত্যকীর্তি থেকে, সেই আগের সাহিত্যকীর্তিরই যে এক সোজাসুজি ও অনিবার্য পরিণাম এই নব উপন্যাস, সেরকম বলতে চাওয়া ঠিক হবে না। কিছুরই প্রত্যক্ষ পরিণাম কিছু নয়, না এই জগতে, না তার সাহিত্যে।

তাঁদের আঙ্গিকের একে প্রচণ্ড নূতনত্ব তো আছেই — যাতে পদে পদে হোঁচট খেতে হয়, একই অংশ বার বার পড়ে বোঝার চেষ্টা করতে হয় কী ঘটছে বা লেখক কী বলতে চান — যে ভাষা নব ঔপন্যাসিকদের সকলেই ব্যবহার করেন, তারও বৈশিষ্ট্য কিছু কম নয়। এত বিদগ্ধ, অনধ্যাত ভাষা অন্য ধরনের উপন্যাসে দেখা যায় না। এখানে সব কিছুই একটা আগে থেকে ছক-কাটা ব্যাপার — ভাষার সঙ্গে ভাব, আঙ্গিক ও বক্তব্য অবিচ্ছেদ্যভাবে বিজড়িত। ভাবের দিক থেকে দুটি প্রধান উক্তির মধ্যে নব উপন্যাসের প্রেরণার উৎস খোঁজা চলে — একটি দিয়োজেন দো-এনো-আন্দার (Diogene d’ Oenoanda) ‘অধিকাংশ লোকই অসুস্থ, যেন মহামারীতে আক্রান্ত, এবং সে অসুখটা তাদের কী? জগত সম্বন্ধে তাদের যত মিথ্যা ভুল ধারণা ও বিশ্বাস।’ দ্বিতীয় উক্তিটি ভের্নের হাইজেনবের্গের (Werner Heisenberg) ‘দেখা যাচ্ছে, আধিভৌতিক অণুপরমাণুর বাস্তব, নিরপেক্ষ সত্য সম্বন্ধে যে-ধারণা, তা কেবলি আশ্চর্যভাবে অদৃশ্য হচ্ছে, ধূমাচ্ছন্ন বা ভুল বোঝা সত্যের কোনও নতুন ধারণায় কুয়াশার মধ্যে নয়, তা অদৃশ্য হচ্ছে সেই গাণিতিক স্বচ্ছ তরল প্রাঞ্জলতায় যা আধিভৌতিক কণার অস্তিত্বের সত্যাসত্য সম্বন্ধে আগ্রহহীন, কিন্তু সেই কণার অস্তিত্বের যে জ্ঞানে আমরা সমৃদ্ধ, উক্ত প্রাঞ্জলতাটির বাসস্থান সেখানেই।’

সোজা করে, অল্প কথায় বলতে গেলে নব উপন্যাসের সাধারণ মানসিক গুণগুলি চারটি। প্রথমটি, তার নায়ক ও অন্যান্য চরিত্রেরা নামহীন, আসলে তাদের চরিত্রগত অস্তিত্বই নেই — যেন চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যে তাদের ফুটে ওঠার সমস্ত সম্ভাবনাকে সজাগ লেখক দৃঢ়হস্তে কেবলি রবার দিয়ে মুছে চলেছেন। তারা তাদের আশপাশের বস্তুরই সামিল। বলা হয়তো হচ্ছে কারও নাম দ্যুপঁ (Dupont), কারওর নাম ভালাস (Wallas), কিন্তু যে দ্যুপঁ, সে অনায়াসেই ভালাস হতে পারত, এবং ভালাসও হ’তে পারত দ্যুপঁ।’ এবং নামের উল্লেখ বইয়ে থাকলেও (এখানে কাফকার ‘দুর্গে’র K-র কথা সহজেই মনে আসা উচিত পাঠকদের) তা কয়েকটি বারের জন্য মাত্র — বইয়ের প্রায় সর্বত্রই সর্বনামের মিছিল, যেমন ‘আমি’ বললাম, তারপরে ‘সে’ এই বলল, তাপরে ‘তারা’ ওই করল। আবার নামহীন ব’লেই চরিত্রেরা (ও তাদের চিন্তা-কর্ম বাক্য) সর্ববিশেষহীন। বিশেষণ যদিও বা থাকে, তা যেন কিছুতেই কোনও কিছুর উপরই লেখক বা চরিত্রের মতামত আরোপ না করে। যেমন আকাশ যদি মেঘলা হয় তো তার আগে ওই মেঘলা বিশেষণটা না হয় যোগ করাই গেল, কিন্তু তাকে কোনওক্রমেই সুন্দর বা নিষ্ঠুর বা ভালো বা মন্দ বলা চলবে না। কারণ তা করলেই স্বেচ্ছাচারী মন তাঁর নিজের রঙে রঞ্জিত করছে সেই বাইরের বস্তুকে যা তার বেপরোয়া অস্তিত্বের সত্যে স্বাধীনভাবে বিরাজ করছে মনের অতীতে। মনস্তত্ব নিয়ে যে বাড়াবাড়ি দেখা গিয়েছিল একদিন কথাসাহিত্যে, তার সদর্প প্রতিবাদ এই নব উপন্যাস। তবে এটাও সত্য, এই আবেগশূন্য ও বিশেষণহীন রচনা বড় নির্মম, পড়তে রীতিমতো বেগ পেতে হয়।

নব উপন্যাসিকদের দ্বিতীয় সাধারণ গুণ হল, তাঁদের চরিত্রদের এক অবিচ্ছিন্ন গতিভঙ্গি, কখনও স্বতঃপ্রণোদিত কখনও আত্মবিস্মৃত হয়ে তারা কেবলি ঘুরে মরছে, বার বার একই রাস্তায়, একই বৃত্তের মধ্যে, ফিরে ফিরে আসছে একই পার্কে বা স্কোয়ারে — যেন একটা নিরন্তর আত্মজিজ্ঞাসার (এবং বাইরের বস্তুজগতের মধ্যে আত্মোপলব্ধির) পরিক্রমণে। লেখকদের বক্তব্য, ওই গতিটাই বা ভঙ্গিটাই বা হাত নাড়া পা নাড়াটাই সব, তা-ই মানুষকে পৃথক করছে বস্তু থেকে, তার বাইরে মন বলে আর কিছু নেই।

তৃতীয় গুণ রহস্যোপন্যাস বা ডিটেকটিভ কাহিনির সঙ্গে এই ধরনের রচনায় মিল। একটা খুন বা একটা তদন্ত বা একটা বলাৎকার, এই নিয়েই অধিকাংশ ঘটনা। এঁরা বলেন, রহস্য এঁদের কাছে একটা সহজ ও সরল মাধ্যম আত্মজিজ্ঞাসার ও বস্তুজগতে আত্মোপলব্ধির। একবার এইরকম তদন্তের মধ্যে পড়ে গেলে নিজেকে নিয়ে গবেষণার কাজটা বেশ ভালো করে শুরু হয়। তবে সচরাচর ডিটেকটিভ উপন্যাস বলতে যা বোঝায়, নব উপন্যাস তা একেবারেই নয়।

চতুর্থ ও অন্যতম প্রধান গুণ লেখককে কেবলি একটা আয়নার সম্মুখীন করা — লেখকের মনটা হওয়া উচিত ঠিক একটি স্বচ্ছ আয়নার মতো, এই বক্তব্য। এঁদের অনেকেই, বিশেষত নাতালি সারোৎ, পল ক্লী-র (Paul Klee) এই বিখ্যাত উক্তিটির প্রসঙ্গ পেড়েছেন বার বার ‘আর্টের উদ্দেশ্য দৃষ্টকে সংস্কার করা নয়, দেখানো’ (L’ art ne restitue pas le visible, il rend visible)। আয়নার কাজ, তাতে প্রতিফলিত জিনিসের হুবহু প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা — কিন্তু সে প্রতিচ্ছবি ঠিক সেই একই জিনিস নয় যার প্রতিফলন সেটা। যেমন, আয়নার মধ্য দিয়ে আমার ঘরের যে বইটিকে দেখছি, সেটি আমারই বই, আবার আমার বইটিও নয়, তাকে আমি ছুঁতে পারব না, সরাতে পারব না, তা আমার ইচ্ছার বা মনের সর্ব সংক্রমণের অতীত একটি বিশুদ্ধ স্বাধীন অস্তিত্বে বিরাজমান। আয়নার মধ্যে যখন নিজেকে দেখি, তখনও একই কথা-আমি হাত নাড়ালে আমার বেচারা নিরুপায় প্রতিচ্ছবিরও হাত যদিও নড়বে, সে প্রতিচ্ছবি বস্তুজগতের অঙ্গ, ওই প্রতিফলিত বই ও অন্যান্য জিনিসের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গীভাবে বিজড়িত — মনের অতীত। নিছক জড় বস্তুর সঙ্গে তার যেমন সম্পর্ক, তার সঙ্গেও বস্তুর সম্পর্ক তেমনি। আমি ও বাইরের জগত, এই দুয়ের অনিবার্য সংস্পর্শে যে অবিরাম সংঘাত, তাইতেই রূপ নেয় জীবন। মানুষ ও বস্তুর একমাত্র পার্থক্য হল, মানুষ ভঙ্গির দ্বারা চিহ্নিত করে নিজের অস্তিত্ব, বস্তুকে এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় নড়ায়। অন্যদিকে, বস্তুকে যেমন সে প্রভাবান্বিত করছে, বস্তুর প্রভাবও তার উপর পড়ছে ক্রমাগতই। বস্তুর সংস্পর্শলব্ধ যে-জ্ঞান, তা-ই মানুষের অস্তিত্বের একমাত্র সত্য।

উপরে যা বলা হ’ল, তার উদাহরণস্বরূপ ধরা যাক রব-গ্রীইয়ের একটি প্রখ্যাত উপন্যাস লে গম (Les Gommes) বা রবার। প্রথম যখন বইটি পড়তে বসি, মনে হয়, এই তাহ’লে নব উপন্যাস, এই নিয়েই এত হইচই? এতো একেবারে ডিটেকটিভ উপন্যাস। অবশ্য উপন্যাসটি শেষ করে (এবং বিশেষত, তারও বহু পরে বইটি সম্বন্ধে লেখকের নিজের বক্তব্য পড়ে) মত বদলাই। মার্কিন সমালোচক ব্রুস মরিসেট (Bruce Morissette) বইটিকে এক কথায় বর্ণনা করেছেন এই ব’লে বদ্ধ বৃত্তাবদ্ধ ইডিপাসের কাহিনি। অসহ্য জিনিসটি না গ্রিক নাটক, না ডিটেকটিভ উপন্যাস, কিন্তু উভয়েরই ধ্বনিমুখর ব্যঞ্জনা এতে। কাহিনি এক ভালাসকে নিয়ে, যাকে পাঠানো হয়েছে কোনও এক দ্যুপঁর খুনের তদন্তে। ধীরে ধীরে জানা গেল, দ্যুপঁ কিন্তু আসলে মরেনি, ও এক অনিবার্য ঘটনাস্রোতের মধ্য দিয়ে তাকে শেষ পর্যন্ত খুন করতে বাধ্য হবে ওই ভালাসই। বইয়ের প্রারম্ভে দেখি, তদন্তর করতে এসে গোয়েন্দা ভালাস অচেনা শহরে ঘুরে মরছে, একই রাস্তায় বার বার, একই লোককে ফিরে ফিরে নানা প্রশ্ন করে। এই শহর, ফিরে ফিরে ওই একই অচেনা লোকের মুখ বা একই রাস্তা, কখনও কোনও আয়নার মধ্য দিয়ে দেখা ওই শহরের একাংশ, ইত্যাদিতে তার সমস্ত যেন গুলিয়ে যাচ্ছে, মনে হচ্ছে একটার পর একটা ছলনার ফাঁদে পা দিচ্ছে। নিজেকে প্রশ্ন করছে, কে আমি, কে তুমি, কোথায় এলাম, অর্থ কী? কিন্তু লেখকের বক্তব্য, অর্থ কোথাও নেই, অমন প্রাণপণ অন্বেষণেই ভালাস নিজের বিড়ম্বনা নিজে ডেকে আনল। কারণ যেটা যেভাবে রয়েছে, সেটা ঠিক সেইটাই, তার অতীত কোনও অর্থে উৎসাহী নয়, বস্তুজগতের এই সত্যটা যদি ভালাস মনে মনে মেনে নিতে পারত তো সে নির্ঝঞ্ঝাটে ফিরে আসত, দ্যুপঁর সঙ্গে তার সাক্ষাৎকারও হত না, দ্যুপঁকে তার খুনও করতে হত না। যার খুনের রহস্য সমাধান করতে সে এল, শেষ পর্যন্ত তাকেই খুন করে সে হল খুনি। ওর দরকার ছিল, ওর ওই আমি-বস্তুটাকে মুছে ফেলা রবার দিয়ে, তাকে নিশ্চিহ্ন করা। তা নয়, বৃথাই একটার পর একটা রবার সে কিনে গেল ওই অচেনা শহরে নানা দোকান হতে — প্রশ্ন করতে সে বার বার ফিরে আসছে একই দোকানে, তাই পাছে লোকের সন্দেহ জাগে, যখনই আসে, প্রতিবারই একটা করে রবার কেনে।

রব-গ্রীইয়ের অব্যবহিত পরের (রবার-এর পরেই) যে-বইটি, ল্য ভোয়াইঅব (Le Voyeur) বা দর্শক, তাতে দৃষ্ট বস্তুজগতের সর্বস্বতা যেমন একদিকে আরও প্রকটভাবে প্রতিফলিত, অন্যদিকে তেমনি আমি ও বাইরের বস্তু জগতের সঙ্গে সে- আমার সম্বন্ধ নিয়ে যে-প্রশ্ন, তাও উত্থিত আরও জোরের সঙ্গে। কেটি সাত-আট বছরের বালিকার উপর ধর্ষণ ও অবশেষে তাকে হত্যা করা এই নিয়ে ঘটনা। এখানে কর্মকর্তা (বা নিশ্চল বস্তুজগতে ‘গতিভঙ্গির’ কর্তা) হল এক মাতিয়াস (Mathias), ব্যবসায়ী পর্যটক, যে একটি দিনের জন্য এক ঝকঝকে রৌদ্রস্নাত দ্বীপে এসে হাজির হয়েছে। দ্বীপটিতে অধিবাসীর সংখ্যা কম, এবং রৌদ্রালোকে ঝলকিত তার বস্তুজগত আপন স্বাতন্ত্র্যের সর্বসন্দেহাতীত অস্তিত্বে মাতিয়াসের দৃষ্টিতে বিধৃত। বইটি দু’ভাগে বিভক্ত – প্রথম ভাগ ধর্ষণের আগের অবস্থা নিয়ে, যখন মাতিয়াস ভাবছে, অন্য ভাগ ধর্ষণের পরের অবস্থা, যখন সে ব্যাপারটাকে গোপন করার চেষ্টা করেছে; মাঝখানে একটি পাতা ফাঁক, একেবারে সাদা, যেখানে নিশ্চয় ধর্ষণটি ঘটেছে, এবং যার কোনও বিবরণ লেখক দিলেন না। প্রথম ভাগে দেখি মাতিয়াসের লুব্ধ দৃষ্টি নিবদ্ধ রাস্তায় পড়ে থাকা একটি শক্ত মোটা দড়ির উপর, যা ফরাসি বা রোমান ৪ বা বাংলা চার-এর আকারে দৃঢ়ভাবে বাঁধা। সঙ্গে সঙ্গে পাঠকদের জানিয়ে দেওয়া হল, ছেলেবেলা থেকেই মাতিয়াসের এক বিষম আসক্তি মোটা দড়ি বা শক্ত সুন্দর ফিতা ইত্যাদি সযত্নে সঞ্চয়ের উপর, কৈশোর পর্যন্ত এক বহু পুরোনো খালি জুতোর বাক্সে এই ধরনের কত দড়ি ইত্যাদি সে নাকি জমিয়ে এসেছে। অতএব, যখন ওই ৪-আকারের দড়িটিকে সে লুব্ধ আনন্দিত মনে রাস্তা থেকে তুলে নিল, এবং দড়িটাকে নীচু হয়ে তুলতে গিয়েই হঠাৎ তার নজরে পড়ল মেয়েটিকে দাঁড়িয়ে আছে অদূরেই, এবং তার দিকে কৌতূহলপূর্ণ এক স্নিগ্ধ, অল্প, শান্ত হাসিতে চেয়ে আছে। এবং তারই সামান্য কিছু আগে মাতিয়াসের চোখে পড়ে একটি চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন — চলচ্চিত্রটির কাহিনি ধর্ষণ-সংক্রান্ত। সমস্ত ইঙ্গিতগুলিই (দড়ি, ৪-এর আকার, মেয়েটিকে দেখতে পাওয়া, ও ধর্ষণ-সংক্রান্ত চলচ্চিত্রের বিজ্ঞাপন) এত স্পষ্ট যে পরে কী ঘটবে বা ঘটতে পারে, তা ইতিমধ্যেই পড়া পাতার মতো — ওই রৌদ্র ঝলসিত দ্বীপের বস্তুজগতের মতোই প্রকটভাবে পরিষ্কার। দ্বিতীয়ভাগে আরম্ভ হচ্ছে দ্বীপের রাস্তায় রাস্তায় মাতিয়াসের স্বেচ্ছাকৃত পরিক্রমণ, রবাব-এর ভালাসের মতো কোনও ব্যর্থ আত্মজিজ্ঞাসার বা আত্মোপলব্ধির অন্বেষণের তাগিদে নয়, কিন্তু যা হয়ে গেছে সেটাকে নিয়ে কোনওরকম বাড়াবাড়ি না করার প্রচেষ্টাতে, সেটাকে ধামা-চাপা দিতে। একই পথে ওই বার বার পরিক্রমণের (যে পরিক্রমণও, লেখক জানাচ্ছেন, এক স্বেচ্ছাকৃত ৪-এর আকার নেয়) মধ্য দিয়ে নিজের আগের পদচিহ্ন সে লুপ্ত করে দিয়ে যাচ্ছে। ভালাসের মতো মাতিয়াসকেও দেখি একটার পর একটা ফাঁদে পা দিতে, জোর করে বস্তুজগতের শান্তি বিছিন্ন করতে, কিন্তু যেহেতু অন্বেষণের বিছায় তাকে কামড়ায়নি, শেষ পর্যন্ত ভালাসের মতো তাকে ধরা পড়তে হল না, নিজেরই কৃতকর্মের কারাগারে বন্দী হতে হল না, সে পালিয়ে গেল, মুক্তি পেল। এখানে যদি কেউ প্রশ্ন করেন — কিন্তু পালানোর পরেও আত্মগ্লানি থেকে কি সে মুক্তি পাবে? — তো তখন তাঁদের উত্তর দেওয়া চলতে পারে, নব ঔপন্যাসিকরা তো মন মানেন না; তাঁদের চোখে শুধু বস্তুই আছে, এবং সেই বস্তুজগতে মানুষের ভঙ্গিটুকুই আছে।

ওই যে পল ক্লী-র উক্তিটি-আর্ট দৃষ্ট বস্তুর ব্যাখ্যা বা সংস্কার করবে না, শুধু তাকে দেখাবে–যে উক্তিটি নব ঔপন্যাসিকদের সকলের পক্ষে এক অন্যতম প্রধান সত্য, তা শুনে মনে হয় হয়তো চলচ্চিত্রের সঙ্গে এই ধরনের উপন্যাসের একটা স্বাভাবিক যোগ থাকতে পারে; এবং যোগ আছেও। মদেরাতো কান্তাবিলে-র চিত্র রূপায়ণ সম্বন্ধে আগেই উল্লেখ করেছি — রব-গ্রীইয়েকেও দেখি সরাসরি দুটি চিত্র-উপন্যাস (cine-roman) লিখতে,অমর (L’immortelle) ও গত বছর মারিয়ানবাদে (L’annee derniere a Marienbad), অন্তত দ্বিতীয়টি (প্রথমটির কথা জানি না) তো চলচ্চিত্রে ইতিমধ্যেই রূপায়িত হয়েছে এবং সারা ফিল্ম-জগতে সাড়া তুলেছে। তবু এঁরা উপন্যাস ও চলচ্চিত্রকে দুটো সম্পূর্ণ বিভিন্ন ভাষা বলেই গ্রহণ করতে চান, বলেন, উপন্যাসের কাঠামো মূলত তৈরি হয় শব্দে (যা উচ্চারিত নয়, লিখিত), চলচ্চিত্রের কাঠামো দৃষ্টিতে।

উদাহরণ শুধু রব-গ্রীইয়ে হতেই দিলাম, কারণ প্রথমত নব উপন্যাস আন্দোলনের ইনি একজন ‘কর্তাব্যক্তি’; দ্বিতীয়ত বই দুটি সবেমাত্র পড়ে শেষ করেছি, তাদের বক্তব্যের আওয়াজটা এখনও মাথায় হাতুড়ি পেটাচ্ছে’। তবে অন্যদের রচনা থেকেও বহু উদাহরণ দেওয়া যেতে পারত। এঁদের বক্তব্য বা প্রতিপাদ্য সম্বন্ধে আমার ব্যক্তিগত আপত্তি প্রধানত দুটি। প্রথমত, অর্থ খোঁজার সকল প্রচেষ্টাকে হেসে উড়িয়ে দিতে চাওয়া সত্বেও আমার তো মনে হয় না যে অর্থের (বা অর্থের অন্বেষণের প্রচেষ্টায়) অস্তিত্বকে এঁরা তাঁদের লেখার মধ্যে অস্বীকার করতে পেরেছেন। নয়তো এত ভেবে-চিন্তে, কাটাকুটি করে, ছক কেটে লেখেন কেন? একটা কিছুকে চোখে আঙুল দিয়ে প্রমাণ করার জন্যেই নিশ্চয় এত কোমর বাঁধা, পাঁয়তাড়া কষা, কসরত করা — এবং না হয় মেনেই নিলাম, সেই একটা কিছু হল সব কিছুর চরম অর্থহীনতা; কিন্তু সেই অর্থহীনতাটাকেও কি ‘অর্থপূর্ণ’ ভাবে ফুটিয়ে তোলার পরিশ্রম করছেন না এঁরা? দ্বিতীয় আপত্তি হল লেখা সম্বন্ধে না হয় আয়নার প্রসঙ্গটাকেও মেনে নিতে বাধ্য হলাম। তবু প্রশ্ন থেকে যায় প্রতিচ্ছবি? ব্যক্তি-মানুষের বা সামাজিক মানুষের বা লেখক-মানুষের কাছে কোনটা তবে বড়? ওই আসল বস্তুটা না তার প্রতিচ্ছবিটা? আয়নার ভিতরে যদি দেখি আমার হাতটা নড়ছে, তা হলে আমি-নামক আসল বস্তুটা (এবং ইচ্ছাশক্তি সম্পন্ন মানসিক সত্তাটাও) নিশ্চয়ই সে-হাতটা কী ভেবে (এবং ভাবনার প্রশ্ন একবার এসে গেলেই সঙ্গে সঙ্গে মনের প্রশ্নও এসে যাবে) নাড়াচ্ছি, নয় কি?

বলা যায় না, হয়তো নব উপন্যাস ব্যাপারটা সম্পূর্ণ করে এখনও বুঝে উঠতে পারিনি বলেই এমন আপত্তি তুলছি। তবু দেখে ভালো লাগে, এ-ধরনের প্রশ্ন আমার মতো অর্বাচীনই নয়, কৃতবিদ্য আরও অনেক করছেন।

৪র্থ বষ ৫-৬ সংর্খ্যা

(শারদীয় ১৩৭৩)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *