মার্কসের ক্যাপিটাল ও আজকের মার্কসবাদ – অশোক সেন

মার্কসের ক্যাপিটাল ও আজকের মার্কসবাদ – অশোক সেন

মার্কসের বিরাট কীর্তি ‘ক্যাপিটাল’ গ্রন্থটির একশো হছর পূর্ণ হল। ১৮৬৭ সালের অগস্ট মাসে জার্মান ভাষায় বইটির প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। মার্কসের আলোচ্য বিষয়, তাঁর যুগান্তকারী বিশ্লেষণ ও মীমাংসার কথা ভাবলে আজ আশা আশংকায় মিশ্রিত নানা চিন্তা মনে আসে।

প্রবল আশার উৎস নিশ্চয়ই মার্কস ইতিহাসের বিজ্ঞানকে যে পরিপূর্ণ মানবিকতার সম্ভাবনায় আবিষ্কার ও প্রয়োগ করেছিলেন তার মধ্যে আমরা পাই। বিশেষত গত পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে ধনতন্ত্রের প্রতিপত্তি যেভাবে খর্ব হয়েছে, তার আভ্যন্তরীণ সংকটের চাপ যত বেড়েছে, পৃথিবীর বিরাট অংশে তেমনি সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা বিপুল উদ্যমে গড়ে উঠেছে। বৈজ্ঞানিক ইতিহাস বিশ্লেষণের যুক্তিতে মানবসমাজের সামনে যে শোষণমুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে মার্কস নির্দেশ করেছিলেন তার দিকে আজ আর শুধু অনাগত ভবিষ্যতের দূরবীক্ষণে চেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। সেই শোষণমুক্ত সমাজের সূচনা ও বিকাশ আমাদের কালের প্রত্যক্ষ ইতিহাসে বারবার উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আর পৃথিবীতে আজও দরিদ্র দেশের সংখ্যাই বেশি। তাদের দারিদ্র্যের ইতিহাসে ধনতন্ত্র এবং তার সেই বিকট আন্তর্জাতিক প্রকাশ সাম্রাজ্যবাদের নির্মম ভূমিকা নিতান্ত প্রাথমিক অভিজ্ঞতায় ধরা পড়ে। ফলে নানা বাধাবিপত্তি, সাময়িক বিফলতা, এমনকি কখনও কখনও বিবিধ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জটিলতায় বিভ্রান্ত অবস্থা সত্বেও এশিয়া আফ্রিকার মানচিত্র জুড়ে দেশে দেশে আজ দরিদ্র নিপীড়িত মানুষ সমাজতন্ত্রের লক্ষ্য অনুসারে সমাজ ও আর্থব্যবস্থা গড়তে চাইছে। দরিদ্র দেশগুলিতে ওই গণশক্তির সার্থক নেতৃত্ব ও পথনির্দেশের প্রশ্ন সমাজতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নির্ণয়ে অতীব গুরুত্ব লাভ করেছে।

সাম্প্রতিক দুনিয়ায় সমাজতান্ত্রিক প্রগতির পরিমাণ ও পরিস্থিতি নির্দেশ করতে গেলে অন্য একটি প্রশ্ন উঠে পড়ে। অন্তত প্রথম খণ্ড ক্যাপিটালের আলোচনা মনে রাখলে প্রশ্নটির তাৎপর্য উপেক্ষণীয় নয়। ওই প্রশ্নের সূত্রে আবার মার্কসীয় ইতিহাসবিচারের যোগ্যতা সম্পর্কে ব্যর্থতার অভিযোগ বা নিরাশার কারণ টেনে আনবার দৃষ্টান্ত বিরল নয়। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডে মার্কস ধনতন্ত্রের যে গতিবিধি নির্ধারণ করেছিলেন তাতে শিল্পবিপ্লবোত্তর পরিণত ধনতান্ত্রিক পর্যায় থেকে সমাজতন্ত্রের উত্তরণের যুক্তি ছিল সর্বাগ্রগণ্য। আজ পর্যন্ত কিন্তু ও রকম কোনও দেশে সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব ঘটেনি। পূর্ব ইওরোপে চেকোশ্লোভাকিয়া বা খণ্ডিত জার্মানির দৃষ্টান্তগুলি নানাকারণে খুব টিপিকল বলা চলে না। তাই অভিযোগ ওঠে যে ধনতন্ত্রের গতিবিধি সম্পর্কে মার্কসের মৌল মীমাংসায় কোনো গলদ দেখা যাচ্ছে।

মার্কসের বিশ্লেষণ সম্পর্কে এ ধরনের সমালোচনায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির বিষয়ে ভ্রান্ত ধারণার পরিচয় পাই। কোনো ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি বৈজ্ঞানিক রীতিতে নির্ধারণ করতে গেলে তার সূচনার পরিস্থিতি অনুযায়ী কয়েকটি প্রাথমিক ধারণা থেকে শুরু করতে হয়। আর এই প্রাথমিক ধারণাদির গ্রহণ-বর্জনে বৈজ্ঞানিক তাঁর অনুসন্ধানের মূল উদ্দেশ্য দ্বারা প্রভাবিত হবেন সেটা স্বাভাবিক। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডে মার্কস ধনতন্ত্রের গতিবিধি বিশ্লেষণের যে বৈজ্ঞানিক মডেল বা প্রকল্পটি গড়েছিলেন তার বিচার সেই বিশেষ চিন্তাবিন্যাসে প্রাথমিক ধারণাগুলির তাৎপর্য বাদ দিয়ে করা সঙ্গত নয়। বলা বাহুল্য প্রাথমিক সূত্রগুলি পালটে দিলে বিশেষ ব্যবস্থার গতিপ্রকৃতি সম্পর্কিত বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলিতেও তদনুযায়ী পরিবর্তন অনিবার্য হয়ে পড়ে।

দৃষ্টান্তস্বরূপ নির্বিত্তশ্রেণীর অবস্থার ক্রমাবনতি সম্পর্কে মার্কসীয় তত্বটির উল্লেখ করা যায়। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডে মজুরির লড়াইতে ট্রেড ইউনিয়নের ভূমিকা এবং তার ফলাফল পুরোপুরি ধরে নেওয়ার সূত্রটি প্রাসঙ্গিক ছিল না। অন্যপক্ষে সাম্রাজ্যবাদের ক্রমবিস্তারে ঔপনিবেশিক অতিমুনাফার সুযোগও মার্কসীয় মডেলের আদ্যসূত্রে বিধৃত নেই। ফলে বিশ্লেষণের সেই বিশিষ্ট শৃঙ্খলায় ধনিক-শ্রমিক সম্পর্কের আত্যন্তিক যুক্তিতে, সর্বোচ্চ মুনাফার বিপরীত মেরুতে নির্বিত্ত শ্রেণীর অবস্থার ক্রমাবনতি একটি অনিবার্য সত্যরূপে প্রতিপন্ন।

ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের ব্যাপ্তি ও সাফল্যের জোরে এবং ঔপনিবেশিক অতিমুনাফার সাশ্রয়ে আজ পরিণত ধনতন্ত্রের দেশগুলিতে ক্রমাবনতির অভিজ্ঞতা খানিকটা নিয়ন্ত্রিত হয়েছে সত্য। কিন্তু তার দরুন মার্কসীয় মডেলের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য কিছু কমে না। বরং উনিশ শতকের বুর্জোয়া বিজয়পর্বে ইংরজ মজুর শ্রেণীর শোচনীয় অবস্থা, সর্বগ্রাসী ধনিক শোষণের মুখোমুখি তাদের প্রতিরোধের আশু প্রয়োজন মনে রাখলে মার্কসের বৈজ্ঞানিক মডেল এবং তার আদ্যসূত্রাবলির যাথার্থ্য আমরা উপলব্ধি করতে পারি। আর সেই প্রতিরোধের দীর্ঘ ঐতিহাসিক কর্মধারাতেই তো ট্রেড ইউনিয়ন আন্দোলনের সফল ভূমিকা গড়ে উঠেছে।

এই প্রসঙ্গে ধনতান্ত্রিক সংকটের অনিবার্যতা নিয়ে মার্কসের বিশ্লেষণও উল্লেখযোগ্য। পরিণত ধনতন্ত্রের দেশে সমাজতন্ত্রের আবির্ভাব সম্পর্কে মার্কসীয় বিশ্লেষণের বিরুদ্ধে ভ্রান্তির অভিযোগ এই সংকটতত্বের সমালোচনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে জড়িত। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যক্তিগত মুনাফার উদ্দেশ্যে উৎপাদন এবং সামাজিক উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে বিরোধের সূত্রে মার্কস সংকটের মূল কারণ আবিষ্কার করেছিলেন। এই মৌল বিরোধের বিবিধ লক্ষণ মুনাফার হার কমে যাওয়ার ঝোঁক, ভোগের পরিমাণে ঘাটতি এবং উৎপাদনের বিভিন্ন ক্ষেত্রের মধ্যে অসামঞ্জস্যের মার্কসীয় তত্বসমূহে প্রকাশিত হয়েছিল। আবার ধনতান্ত্রিক বিবর্তনের পারম্পর্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বেশি মূলধনের জোরে একচেটিয়া প্রতিপত্তি অর্জন করে। শিল্পসংস্থার আয়তনবৃদ্ধির সঙ্গে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের যোগাযোগ খুব ঘনিষ্ঠ। ফলে ক্ষুদ্রতর প্রতিষ্ঠানগুলি প্রতিযোগিতায় পেরে ওঠে না এবং ক্রমশ কয়েকটি বৃহৎ ধনিকগোষ্ঠীর আয়ত্তাধীনে বিরাট মূলধনের অধিকার কেন্দ্রীভূত হতে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় নির্বিত্ত মজুর শ্রেণীর সংখ্যা আরও বৃদ্ধি পায়। ধনতান্ত্রিক শোষণের ক্রমবর্ধমান মাত্রায় সেই শ্রেণীর অবস্থা চরম অসহনীয় দুর্দশায় পৌঁছায়। সেই দুর্দশার প্রকাশ বিপুল সংখ্যক লোকের সীমাবদ্ধ ক্রয়ক্ষমতায় পরিস্ফূট, যার ফলে ভোগের ঘাটতি ও উৎপাদনের বিরাট অংশ অবিক্রীত থেকে যাওয়ার অবস্থা ঘটে।

আবার মজুরিবৃদ্ধি করে এই বাজারের সমস্যা সমাধানের পথেও নানা বাধা এসে পড়ে। মজুরিবৃদ্ধিতে শোষণের মাত্রা কমে গেলে তার থেকে মুনাফার হারে টান পড়বে। তাই উভয়সংকটে আক্রান্ত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উৎপাদনের পরিমাণ ও পরিচালনে স্থায়িত্ব বা সৌষ্ঠবের চিহ্নমাত্র থাকে না। অন্যপক্ষে চরম বিশৃঙ্খলার প্রতিবাদে মজুরশ্রেণির সংগঠন তুমুল শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং সেই বিরোধের বৈপ্লবিক মীমাংসায় সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের পথনির্দেশ মার্কস দিয়েছিলেন, যাতে সামাজিক উৎপাদনব্যবস্থা ব্যক্তিগত মুনাফার অরাজক আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবে।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ত্রিশের বিশ্বমন্দার অনুরূপ ঘোরতর কোনও সংকট ঘটেনি। উপরন্তু জাপান, পশ্চিম জার্মানি বা ইতালিতে যুদ্ধোত্তর দশকে বেশ চড়া হারে অর্থনৈতিক বিকাশের পরিচয় পাওয়া গেছে। এই সব অভিজ্ঞতার নজিরে মার্কসীয় সংকটতত্বের বিরুদ্ধে ভ্রান্তির অভিযোগ আনবার দৃষ্টান্ত আমরা দেখতে পাই। কিন্তু এক্ষেত্রেও মার্কসের তত্বকে তাঁর বিশিষ্ট প্রকল্পের বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য বাদ দিয়ে সমালোচনার ঝোঁকটা প্রকট হয়ে ওঠে। ধনতন্ত্রের অবাধ প্রতিযোগিতার পর্যায় ছিল মার্কসের আলোচনার বিশেষ ক্ষেত্র। ওই ব্যবস্থার গতিবিধি আর তার অনতিক্রম্য সংকটের যুক্তি মার্কস প্রতিযোগিতামূলক ধনতন্ত্রের সীমার মধ্যে অনুসন্ধান এবং নির্ধারণ করেছিলেন। মূলধনের কেন্দ্রীকরণ ও একচেটিয়া পুঁজির উদ্ভবের সম্ভাবনা মার্কসের বিশ্লেষণে স্পষ্ট। কিন্তু সেই পরিবর্তনের বিরোধদীর্ণ পরিস্থিতিতে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থার অবলুপ্তির সম্ভাবনা যে সব কারণে প্রবল হয়ে ওঠে তার বৈজ্ঞানিক বিন্যাস ছিল ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডের বিষয়বস্তু ; একচেটিয়া ধনতন্ত্রের গতিবিধি ওই বিশ্লেষণের প্রতিপাদ্য ছিল না।

তাই আজ ধনতন্ত্রের একচেটিয়া পর্যায়ের ক্রিয়াকলাপ ও ফলাফল নির্ণয়ে মার্কসীয় সংকটতত্বের হুবহু মীমাংসা খুঁজলে বৈজ্ঞানিক বিচারপদ্ধতিতে গোড়ায় গলদের দোষ বর্তাবে। আর একচেটিয়া প্রতিপত্তি ও ব্যবস্থায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার আগে কেন যে ধনতন্ত্রে বিশ্বব্যাপী অবলোপ ঘটেনি তার কারণ বাস্তব ইতিহাসের দ্বান্দ্বিক জটিলতায় অন্বেষণ করলে আমরা বুঝতে পারি। সেই জটিলতার বিচারে মার্কসের পদ্ধতি ও বিশ্লেষণ সঠিক পথের সন্ধান দেয়। মার্কস কখনওই কোষ্ঠির ফলাফলের মতো ধনতন্ত্রের রিষ্টিযোগ গুনতে বসেননি। সেটা ঠিক বিজ্ঞানের ব্যাপার নয়, সমাজবিজ্ঞানের তো নয়ই।

যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্রের তথাকথিত সংকটমুক্তির কারণগুলি তলিয়ে দেখলে ব্যাপারটা আরও স্পষ্ট হবে। প্রথম খণ্ড ক্যাপিটালের আলোচনায় ধনিক শোষণের একটি প্রক্রিয়ার ভূমিকা ছিল প্রধান। পণ্যোৎপাদনে সরাসরি মজুর নিয়োগ এবং মজুরি ও পণ্যমূল্যের মধ্যে পার্থক্যজনিত উদ্বৃত্ত মূল্য সেই শোষণপ্রক্রিয়ার ভিত্তিস্বরূপ। বাজারদরের উপর কোনও একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের জোর অবাধ প্রতিযোগিতার পর্যায়ে ধনিকদের থাকে না। একচেটিয়া ধনতন্ত্রের পর্যায়ে পণ্যোৎপাদনের ব্যয় বা ক্রয়মূল্য এবং বিক্রয়মূল্যের মধ্যে চাহিদা অনুযায়ী যথেচ্ছ ব্যবধান সৃষ্টির সুযোগে ধনিক শোষণের আর একটি প্রক্রিয়া কার্যকর হয়। তা ছাড়া ব্যাঙ্কিং ও শিল্পবাণিজ্যে নিয়োজিত মূলধনের নিবিড়তর যোগাযোগ মারফত নিছক আর্থিক বিনিয়োগের (financial investment) উপর মুনাফার সুযোগও বিশেষ প্রাধান্য অর্জন করে। মজুরির উদ্বৃত্ত, বাজারদরের যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণ এবং নিছক আর্থিক মূলধনের কুসীদজীবী মুনাফা এই ত্রিবিধ শোষণ প্রক্রিয়ার যোগসাজশ সাম্প্রতিক ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতিতে সদাবিদ্যমান এবং ফলে তার সঙ্গে ক্যাপিট্যাল-নির্দিষ্ট গতিবিধির খানিকটা পার্থক্য আমরা দেখতে পাই।

শোষণপ্রক্রিয়ার বৈচিত্র্যের উপর আবার যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্রের সংরক্ষণে রাষ্ট্রীয় ভূমিকার অবদান বিশেষ উল্লেখ্যযোগ্য। তার আদি নির্দেশ কেইনসীয় তত্ব থেকে এসেছে। উদীয়মান সমাজতন্ত্রের চ্যালেঞ্জের সামনে ধনতন্ত্র তার মৌল অসঙ্গতি সম্পর্কে অনেক বেশি আত্মসচেতন হয়ে উঠেছে। ধনতান্ত্রিক শোষণের অনিবার্য ফলস্বরূপ ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি এবং বাজারের সমস্যা মেটাবার জন্য আজ তাই রাষ্ট্রীয় ব্যায়ের পরিপূরণ পৃথিবীর প্রায় সব ধনিক দেশে গুরুত্ব আকার ধারণ করেছে। অবাধনীতি (laissez faire) থেকেও এই ব্যাপক অপসরণে মার্কস-নির্দিষ্ট ধনতান্ত্রিক গতিবিধির সত্যতাই প্রমাণিত হয়েছে, কারণ আজ ধনতন্ত্রের পাকা সমর্থকেরাও মানতে বাধ্য যে নিছক ব্যক্তিগত মুনাফার স্বয়ংক্রিয়ায় চরম সংকট থেকে রক্ষা পাওয়ার কোনও সম্ভাবনা নেই। কেইনসীয় অর্থনীতির মূল কথাও তাই। আর ওই বাজারসমস্যার সমাধান করতে গিয়ে ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এমন ধরনের ব্যয়বাহুল্য ঘটে যার সঙ্গে যুক্তিসম্মত মানবকল্যাণের বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।

তার একটি প্রকট উদাহরণ সামরিক ব্যয়ের পরিমাণে মিলবে। আমেরিকায় বিপুল জাতীয় উৎপাদনের শতকরা দশভাগেরও বেশি সামরিক প্রস্তুতিতে ব্যবহৃত হয়। বৈজ্ঞানিকদের প্রদত্ত হিসেবে ধরা পড়ে যে একটি ভারী বোমারু বিমানের খরচে ত্রিশটি আধুনিক স্কুলবাড়ি নির্মাণ করা সম্ভব, কিংবা দুটি এমন ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎযন্ত্র যাতে ষাট হাজার জনসংখ্যাবিশিষ্ট দুটি শহরের সব প্রয়োজন মিটতে পারে। এরকম দৃষ্টান্ত আরও অনেক দেওয়া সম্ভব। তাই ধনতন্ত্রের সংকট মুক্তি নিয়ে মার্কসকে নস্যাৎ করবার আগে মনে রাখা দরকার যে মরণের সরঞ্জামের পরিবর্তে অপর্যাপ্ত জীবনের সম্বলের মধ্যে সভ্যতার সমাধান চিরদিন ধনতন্ত্রের আয়ত্তাতীত থেকে যাচ্ছে। ধনতান্ত্রিক অন্তর্বিরোধের এবংবিধ প্রকৃতির দরুণ আজ শান্তি ও নিরস্ত্রীকরণের সঙ্গে সমাজতান্ত্রিক উত্তরণের যোগাযোগ নিবিড় হয়ে পড়েছে।

ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্রয়ক্ষমতার ঘাটতি এবং উদ্বৃত্ত আদায়ের সমস্যা নিবারণের জন্য অসামরিক ক্ষেত্রেও অপচয়ের পরিমান বিপুল আকার নিয়েছে। পণ্যরতির সম্মোহন বিস্তারের জন্য বিজ্ঞাপন, প্রচার, জনসম্পর্ক ইত্যাদি ব্যাপারে বৃহৎ ধনতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসমূহের ব্যয়ের মাত্রা অপর্যাপ্ত। সমস্যাটির মূলসূত্র মার্কস ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডে নির্দেশ করেছিলেন। তিনি একে বলতেন ‘মূলধনের সুরৎ জাহির করবার খরচা’ (expenses of representation of capital)। তবে মার্কসের প্রত্যক্ষ পরিবেশে, তাঁর প্রতিযোগী ধনতন্ত্রের বিশ্লেষণে এই অপচয়ের প্রকৃতি ও পরিমাপ গুরুতর ছিল না। আজকের মার্কিন জীবনে এর অবিরত আক্রমণ মানুষের জীবন ও মনকে পণ্যরতির সর্বময় গ্রাসে ঠেলে দিয়েছে। ত্রিশের সংকটের মতো কোনও বিপর্যয় যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্র এখন পর্যন্ত এড়িয়ে গেছে তা সত্য। কিন্তু সেই সংকটমুক্তির প্রক্রিয়ায় মানুষের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্পদ তার চৈতন্যের বিরুদ্ধে ধনতন্ত্র যে মারাত্মক দিনানুদৈনিক আঘাত হানছে সেই সর্বনাশের প্রতি চোখ ঠেরে আজ কোনো হিসেবনিকেশ সম্পূর্ণ হবে না। অহোরাত্র ভোগসর্বস্বতার দৌড়ে নাকাল, আপন অস্তিত্বের সমগ্রতা থেকে বিচ্ছিন্ন মানুষের করুণ পরিস্থিতির কথা ভেবেই নিশ্চয় টয়েনবি বলেছিলেন কমিউনিজমের সঙ্গে নয়, ম্যাডিসন অ্যাভিনিউর সঙ্গে লড়াইয়ের উপর পশ্চিমা সভ্যতার ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে।

অথচ এত অপচয়, ক্রিয়াপ্রক্রিয়া এবং শোষণবৈচিত্র্য সত্বেও সংকটমুক্তির ব্যাপারটা ধনতন্ত্রের নেহাৎ একটি মুখোশ বললেও চলে। প্রায়শ মার্কসের নির্ধারিত সেই গতিবিধি অনুযায়ী ধনতান্ত্রিক সংকটের আংশিক প্রকাশ যুদ্ধোত্তর কালেও আমরা দেখেছি। নানা ব্যবস্থা গ্রহণ করেও ধনতন্ত্র কেবল সংকটের বেগ ও তীব্রতা খানিকটা হ্রাস করতে পেরেছে। মার্কিন অর্থনীতিতে অনবরত স্বল্পস্থায়ী বাণিজ্যচক্রের ওঠানামা, সমৃদ্ধির চূড়াতেও বেকারের আধিক্য, ইংরেজ অর্থনীতির অটল অবসাদ বা বিভিন্ন বাজারে অবাধ অধিকার নিয়ে বিরোধে আমরা ধনতন্ত্রের অন্তর্লীন সংকটের পরিচয় বহুবার পেয়েছি। আর আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ক্রমাগত লড়াই-লড়াই ভাব, গরিব দেশের উপর নব্য উপনিবেশবাদের হামলা বা ভিয়েত নামের উপর নির্মম আক্রমণের অর্থনৈতিক তাৎপর্যেও তো সেই সংকটের অভিব্যক্তি আমাদের সামনে বিকটভাবে ঘটছে।

সৃজনশীল মার্কসবাদের পক্ষে ওই মুখোশের আড়ালে গভীর সংকটের সত্যকে চেনাটাই যথেষ্ট নয়। নতুন পরিস্থিতিতে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের সংগ্রামকে সফল ও সার্থক করে তুলবার জন্য সাম্প্রতিক ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতি সঠিকভাবে বোঝা দরকার। বিরাট অপচয়, বিপুল সমরসম্ভরের উৎপাদন এবং তার সঙ্গে খানিকটা প্রায় চিরস্থায়ী মুদ্রাস্ফীতির অবস্থা মিলিয়ে আজকের পরিণত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সংকট এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা সর্বদা চলেছে। ফলে নিছক টাকার হিসেবে মজুরির দাবি খানিকটা মানলেও ধনিকেরা পণ্যমূল্যের যথেচ্ছ নিয়ন্ত্রণের মারফত তাদের মুনাফা পুষিয়ে নিতে পারে। তার উপরে সর্বমোট চাহিদার স্বল্পতাজনিত পণ্যবিক্রয়ের সমস্যা অতিক্রম করবার জন্য সামরিক ও অসামরিক অপচয়ের বহরবৃদ্ধি তো সাম্প্রতিক ধনতন্ত্রের বিশিষ্ট লক্ষণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বাজারের আয়তন এবং তার বাধাবিপত্তি সম্পর্কে আত্মসচেতন হয়ে উঠবার পর ধনতন্ত্র আজ আর প্রত্যক্ষ শোষণের মাত্রার উপর একান্তভাবে নির্ভরশীল নয়। শিল্প, বাণিজ্য ও কুসীদজীবী মুনাফার যুগপৎ আয়ত্তিকরণের জোরে আজ ধনতন্ত্রের কর্মপন্থা পুঁজিবাদী লেনদেনের একটি মৌল সত্যকে নানা কৌশলে প্রয়োগ করছে। মজুরি বা বেতনবৃদ্ধির জন্য বুর্জোয়াসির ব্যায়ের মাত্রা বাড়তে পারে, কিন্তু শেষপর্যন্ত লেনদেনের চক্রাবর্তে তা পণ্যবিক্রয়লব্ধ আয়রূপে ধনিকশ্রেণীর কাছে ফিরে আসবে। ফলে মজুরিবৃদ্ধিতে উদ্বৃত্তের যা সংকোচন তাই আবার পণ্যমূল্যের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ মারফত পুষিয়ে নেওয়া যায়। তাছাড়া আয়ের অতিরিক্ত ব্যয়ের জন্য ক্রেতাসাধারণকে প্রলুব্ধ করবার বিবিধ ব্যবস্থা কাজে লাগছে, যা আবার শোষণপ্রক্রিয়ার বৈচিত্র্যের জন্যই সম্ভব, যেমন ভাড়া ও সুদের যুগ্ম শর্তে ধারে বিক্রির আয়োজন বা কিস্তির আকর্ষণের আড়ালে সুদকষার নিপুণ বন্দোবস্ত।

এরকম নানা উপায়ে আজ যেমন ধনতান্ত্রিক সংকটের প্রত্যক্ষ প্রকাশ, তার বেগ এবং তীব্রতা বেশ কিছুটা চাপা দিয়ে রাখা সম্ভব হচ্ছে, তেমনি অন্যপক্ষে এর ফলে সংগঠিত শ্রমিক আন্দোলনের ধনতন্ত্র বিরোধী উদ্যম-উদ্দীপনাও বহুক্ষেত্রে খানিকটা আড়ষ্ট, দিশাহারা হয়ে পড়তে দেখা যায়। ইয়োরোপ আমেরিকার পরিণত ধনতন্ত্রে এই সমস্যাটি খুব জটিল, কারণ উদ্বৃত্তের ঐতিহাসিক প্রাচুর্য, একচেটিয়া শোষণের রকমারি এবং তার সঙ্গে বিপুল অপচয়ের সামাজিক সাংস্কৃতিক ক্রিয়া-প্রক্রিয়াতে দেশগুলির পুরো চেহারা যা দাঁড়িয়েছে তাতে সেখানে সাধারণ শ্রমিকের চোখে মনেও খানিকটা ধনতান্ত্রিক বৈভবের আকর্ষণ প্রায় অবশ্যম্ভাবী মোহজাল বিস্তার করে। এমতাবস্থায় ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডের সেই ধনিক- শ্রমিক বিরোধের পটভূমি সাম্প্রতিক ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মেলে না। তার জন্য অবশ্য মার্কসীয় বিশ্লেষণের কোনও মূলগত সংশোধন নিষ্প্রয়োজন। শিল্প, বাণিজ্য ও আর্থিক কারবারে নিযুক্ত মূলধনের মধ্যে প্রকারভেদ, দ্বন্দ্ব ও যোগাযোগের ব্যাপারটা মার্কস নিজেই ক্যাপিটাল তৃতীয় খণ্ডে আলোচনা করেছিলেন। অসমাপ্ত হলেও সেসব আলোচনার সার্থকতা আজ অপরিসীম। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্রের প্রকৃত স্বরূপ এবং গতিবিধির বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ মার্কসের ওই দিগদর্শন অনুসারে আজ সম্পূর্ণ হওয়া দরকার।

আর সেই সম্পূর্ণ বিশ্লেষণের ভিত্তিতে শ্রেণীসংগ্রামের যুগোপযোগী দক্ষতা ও নেতৃত্বের সংস্থাপনা সাম্যবাদী আন্দোলনের আশু কর্তব্য। জীবিকার তাড়না প্রাথমিক ব্যাপার। কিন্তু শুধুমাত্র সেই চাপের সীমায় আজ রূপান্তরের অনুজ্ঞা অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে। পরিণত ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একচেটিয়া পুঁজিবাদের নতুন কলাকৌশল এবং রাষ্ট্রীয় ভূমিকার প্রবর্তনে সমাজতান্ত্রিক রূপান্তরের আগ্রহকে প্রতিরোধ করবার চেষ্টাটাই বড় কথা। সাধারণ সংকটের মধ্যেও আজ যে বিরাট সামরিক অসামরিক অপচয়ের আড়ালে ধনতন্ত্র টিকে থাকছে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক গণআন্দোলনের ভিত্তিতে সমাজতান্ত্রিক পরিবর্তনের কর্মপন্থা রচিত হওয়া দরকার। ফলে আজ জীবিকার উন্নতির সমস্যা শুধু মজুরিবৃদ্ধির দাবিতে সীমাবদ্ধ নয়, সমগ্র জীবনের নানাস্তরে তার তাৎপর্য সম্পর্কে সজাগ হয়ে উঠলেই ধনতান্ত্রিক বিরুদ্ধতার সঙ্গে সম্যক মোকাবিলা সম্ভব। ধনতান্ত্রিক সংকট প্রসঙ্গে কেইনস মন্তব্য করেছিলেন যে পরিপূর্ণ কর্মসংস্থানের (full employment) উপযুক্ত সর্বমোট চাহিদা সৃষ্টির জন্য যথেষ্ট ব্যয়ের ব্যবস্থা আদৎ সমস্যা, কিসের জন্য, কোন দিকে ব্যয় তা জরুরি নয়। কেইনসীয় মীমাংসার ওই পথনির্দেশে বিপুল সামরিক ও অসামরিক অপচয়ের মারফত যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্র তার রক্ষাকবচ খুঁজে বেড়াচ্ছে। আর কেইনসীয় সমাধানের ধনতান্ত্রিক প্রয়োগ এবং তার অন্তর্নিহিত নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে সমাজতন্ত্রের অভিযান আজ তাই সভ্যতার সম্পূর্ণ দাবিতে ব্যাপক হয়ে ওঠা সম্ভব। চৈতন্যের সেই ব্যাপ্তি এবং আন্দোলনের দৈনন্দিন কর্মসূচীতে তার পরিগ্রহণ বাদ দিলে পশ্চিমের পুঁজিসমৃদ্ধ ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় নির্বিত্তের আন্দোলন বারবার বুর্জোয়া বৈভবের বাজিতে বেকুব বনে যাবে। তার নজির ইতিমধ্যে আমরা খুব কম দেখিনি। এমনকি ভিয়েতনামের নির্লজ্জ আক্রমণের বিরুদ্ধেও বিশ্বশ্রমিকের স্বরূপে ভাস্বর কোনও জগৎজোড়া দুর্দম প্রতিরোধের দৃষ্টান্ত এখনো ঘটেনি।

যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতির সঙ্গে নতুন পদ্ধতিতে লড়াই করার উদ্দেশ্যে গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং বিশ্বশান্তি রক্ষার গুরুত্ব আজ দেশেদেশে সাম্যবাদী আন্দোলনের কর্মসূচীতে স্বীকৃতি পেয়েছে। ধনতন্ত্রের নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থার ফলে দশটি মেদিনী-কাঁপানো দিনের বিপ্লব বা দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধে তাকে পরাজিত করবার সম্ভাবনা প্রায় নেই। আচম্বিতে সশস্ত্র বৈপ্লবিক রূপান্তরের নিষ্ফল প্রয়াসে অবস্থা ফ্যাসিজমের অনুকূলে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। আর সমাজতন্ত্র ও ধনতন্ত্রের মধ্যে বিশ্বযুদ্ধ মারফত ব্যাপারটা নিষ্পত্তি করতে গেলে আণবিক অস্ত্রের চূড়ান্ত আঘাত প্রত্যাঘাতে সভ্যতার চরম বিলুপ্তি নিদারুণভাবেই সম্ভব। যুদ্ধোত্তর ধনতন্ত্রের গতিপ্রকৃতিতে রাষ্ট্রীয় ভূমিকার বিস্তার আবার গণতান্ত্রিক সংগ্রামের প্রয়োজন ও তাৎপর্য বাড়িয়ে দিয়েছে। সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রত্যক্ষ চ্যালেঞ্জের সামনে ধনতন্ত্র আপন সংকটের চরম প্রকাশ থেকে অব্যাহতি চায়। তাই আজ ধনতন্ত্রের পক্ষে রাষ্ট্রীয় ভূমিকা অপরিহার্য। রাষ্ট্রীয় ঘোষণায়, প্রতিশ্রুতিতে নানা অর্থনৈতিক দায়িত্ব নিতে হচ্ছে এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা অব্যবস্থার দায়ভাগে রাষ্ট্রও সরাসরি জড়িয়ে পড়ছে। ব্যাপক জনমতের সমর্থন লাভের জন্য রাষ্ট্র বারবার বিবিধ গণতান্ত্রিক প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য। আবার অনুরূপ রাষ্ট্রীয় প্রতিশ্রুতির সঙ্গে ধনতান্ত্রিক আর্থব্যবস্থার বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। গণতন্ত্রের সাধ ও ধনতন্ত্রের সাধ্যের মধ্যে এই দ্বন্দ্বের সূত্রে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রেণীসংগ্রামের ব্যাপক গণসমাবেশ গড়ে তোলা দরকার এবং তার জোরে শান্তিপূর্ণ সমাজবিপ্লবের সম্ভাবনা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে। বলা বাহুল্য যে এই গণআন্দোলনের কর্মধারায় কোনো আপোষচুক্তির অবকাশ নেই, সামরিক ও অসামরিক অপচয়ের ধনতান্ত্রিক বন্দোবস্ত, তার রকমারি শোষণপ্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে মানুষের প্রতিবাদকে জীবনের বহুস্তরে দৃঢ়সংবদ্ধ প্রকাশের জোরেই ধনতন্ত্রের বিনাশ সম্ভব হবে।

আমাদের মতো দরিদ্র দেশে সমস্যার পটভূমি খানিকটা আলাদা। নানাবিধ শোষণপ্রক্রিয়ায় সমর্থ একচেটিয়া ধনতন্ত্রের আধিপত্য ভারতবর্ষেও ঘটেছে। শতাধিক বছরের ঔপনিবেশিক অর্থনীতির ফলস্বরূপ আমাদের শিল্পোন্নয়ন সদাব্যাহত। এদেশে একচেটিয়া ধনতন্ত্র অকিঞ্চিৎকর শিল্পজ উৎপাদনের আওতায় গড়ে উঠেছে। ফলে পশ্চিমের অনুরূপ একচেটিয়া ধনতন্ত্রের ন্যায় যন্ত্রশিল্পের যথাযথ বিকাশ ঘটেনি। রাজনৈতিক স্বাধীনতার কুড়ি বছর পরেও শিল্পোন্নয়নের পক্ষে একান্ত প্রয়োজনীয় কৃষিবিপ্লবের অভিজ্ঞতায় আমরা বঞ্চিত রয়েছি। উপরন্তু ভূমিসংস্কারের চিন্তা ও কর্মে নানা গলদের ফাঁক দিয়ে বৃহৎ ভূম্যধিকারের সঙ্গে বণিক ও কুসীদবৃত্তির নিবিড় যোগাযোগ ঘটেছে। তা ছাড়া শিল্পোন্নয়নের বেগ এত স্তিমিত যে কৃষি থেকে শিল্পে স্থানান্তরিত কর্মীর সংখ্যাও আদৌ উল্লেখযোগ্য নয়। এই পারিপার্শ্বিকে ভারতের ধনতান্ত্রিক বিকাশে কোনওদিন শিল্পে নিয়োজিত মূলধনের প্রাধান্য স্থাপিত হয়নি, বণিকবৃত্তি ও আর্থিক বিনিয়োগের মারফত শোষণপ্রক্রিয়ার প্রতিপত্তি বজায় থেকেছে। ইংরেজ সাম্রাজ্যের সূচনা ও বিবর্তনে আমরা চিরদিন যে ছিন্নমূল বর্তমান ও অনায়ত্ত ভবিষ্যতের মধ্যে ঘুরে ফিরেছি, আজ স্বাধীনতার কুড়ি বৎসর পরেও সেই সৃষ্টিছাড়া দ্বন্দ্ব থেকে আমাদের মুক্তি ঘটেনি।

‘ক্যাপিটাল’ প্রথম খণ্ডের ধনতান্ত্রিক গতিবিধি, তার শ্রমিক-শিল্পপতি বিরোধের একান্ত গুরুত্ব এবং শিল্পোৎপাদনে নিযুক্ত মূলধনের বিশ্লেষণ আমাদের অবস্থার সঙ্গে পুরোপুরি মিলতে পারে না। বরং এই কালো টাকা, কালোবাজার, জোতদারী, ফাটকাবাজিতে পর্যুদস্ত অর্থনীতিতে ধনতন্ত্রের ভূমিকা নির্ধারণের জন্য ক্যাপিটাল তৃতীয় খণ্ডের বিশ্লেষণ থেকে, মূলধনের প্রাকধনতান্ত্রিক আদিম গতিবিধির বিচার থেকে আমরা পথের সন্ধান করতে পারি। সামন্ততান্ত্রিক ভাঙনের শেষ পর্যায়ে বুর্জোয়া আত্মপ্রতিষ্ঠা ও রূপান্তরের ভূমিকা বিচারে মার্কস বণিকবৃত্তি, কুসীদজীবী এবং শিল্পে নিয়োজিত মূলধনের মধ্যে পার্থক্য নির্ণয় করেছিলেন। উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে নানারকম মূলধনের বিভিন্ন সম্পর্কে ওই পার্থক্যের ভিত্তি মার্কসের বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয়েছিল। উৎপাদন ব্যবস্থার মূলগত পরিবর্তন এবং উৎপাদনপ্রক্রিয়ার উন্নতির সঙ্গে শিল্পে নিযুক্ত মূলধন ও মুনাফার উদ্দেশ্য প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে যায়। এরকম মূলধনের আবির্ভাব ও বিকাশ কৃষিবিপ্লবের পরিপূরণ ব্যতীত যুগান্তরের বেগ ও উদ্যম অর্জন করতে পারে না। অন্যপক্ষে বণিকবৃত্তি বা কুসীদজীবী মূলধনের ক্ষেত্রে অনুরূপ কোনও সম্পর্ক থাকে না। শিল্পে নিয়োজিত মূলধনের আধিপত্য এবং তার ফলে ব্যক্তিগত মুনাফা ও উৎপাদন বিকাশের মধ্যে পূর্বোক্ত যোগাযোগের দরুন পুঁজিবাদী শিল্পোন্নয়নের দিগ্বিজয় ধনতন্ত্রের সাবেক দৃষ্টান্তে সম্ভব হয়েছিল। আগেই বলেছি ভারতবর্ষে ঐতিহাসিক কারণে উৎপাদন ও ধনতন্ত্রের মধেও সেই যুগান্তকারী সংযোগ কোনওদিন স্থাপিত হয়নি। আর দূরীকৃত কৃষিবিপ্লব ও অপরিণত শিল্পজ উৎপাদনের পারিপার্শ্বিকে যে খাপছাড়া একচেটিয়া ধনতন্ত্রের উদ্ভব তার উৎপাদনবিমুখ শোষণপ্রক্রিয়ার আধিপত্যে কোনও বলিষ্ঠ বেগবান শিল্পবিপ্লবের সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।

তাই আমাদের পরিবেশ ও পরিপ্রেক্ষিতে শিল্পবিপ্লবের কর্তব্য গণতন্ত্রের সাধ এবং ধনতন্ত্রের সাধ্যের মধ্যে ব্যত্যয়ের প্রশ্ন স্পষ্ট করে দেয়। জাতীয় স্বার্থে আজ আমাদের পক্ষে শিল্পবিপ্লবের গুরুত্ব সর্বাগ্রগণ্য। সাম্রাজ্যবাদের অর্থনৈতিক প্রভাব, ঔপনিবেশিক অর্থনীতির অবরোধ থেকে মুক্তি শিল্পবিপ্লব ভিন্ন সম্ভব নয়। ইতিহাসের ধারায় ভারতবর্ষে শিল্পবিপ্লবের নেতৃত্ব বুর্জোয়াশ্রেণীর কাছ থেকে আসে নি। নেতৃত্বের এই ঐতিহাসিক শূন্যতাপূরণ আজ ভারতের শ্রমিকশ্রেণীর অপরিহার্য দায়িত্ব এবং তার ব্যাপক গণতান্ত্রিক অনুষঙ্গে শ্রেণীসংগ্রামের কর্মসূচি গঠিত হওয়া প্রয়োজন। আর আমাদের পরিস্থিতিতে শিল্পবিপ্লবের কার্যক্রম শুধু কয়েকটি কলকারখানা নির্মাণের ব্যাপার নয়। কৃষি ও শিল্পে ব্যাপক রূপান্তর জাতীয় জীবন ও চেতনার সর্বস্তরে এক অভূতপূর্ব সৃষ্টিময় উজ্জীবনের ধারাতেই শুধু তা সম্ভব। নেতৃত্বের জোর থাকলে সেই বিরাট কার্যক্রমের যথোচিত বিন্যাস ও সমাপনের জন্য আজ গণআন্দোলনের শক্তি দুর্নিবার হয়ে উঠবার কথা। উৎপাদনবিমুখ ভারতীয় ধনতন্ত্রের স্বরূপ, তার জাতীয় মুক্তির পরিপন্থী শোষণ-পদ্ধতির বিরুদ্ধে অনিবার সংগ্রাম ওই কার্যক্রমের আশু দায়িত্ব। বৃহৎ পুঁজি ও ভূসম্পত্তির অনাচার অব্যবস্থার বিরুদ্ধে গণতন্ত্রের জাতীয় প্রতিরোধ এবং সেই গণতান্ত্রিক শিবিরের নেতৃত্বে আজ ভারতবর্ষের শিল্পবিপ্লব সার্থক রূপ ও গতিতে সাফল্যমণ্ডিত হতে পারে।

তাই উৎপাদনের সর্বতোমুখী উন্নতির জন্য জাতীয় দায়িত্বের অঙ্গীকার গণতান্ত্রিক প্রগতির মৌল শর্ত হয়ে দাঁড়ায়। শতাধিক বছরের ঔপনিবেশিক সমাজ ও অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সর্বনাশ এই যে তার ফলে জীবনের সব স্তর থেকে কর্মের সার্থক সংজ্ঞা, উৎপাদনের অগ্রগণ্য তাৎপর্য বিলুপ্ত হয়ে যায়। চাষি নিষ্পিষ্ট হয় উৎপাদনের দায়িত্ববর্জিত সম্পত্তির আধিপত্যে, কারিগর ধ্বংস হয়ে যায় পরাক্রান্ত বিরুদ্ধতার সংঘাতে, জাতীয় জীবনের সমগ্রতা থেকে উৎসন্ন উৎপাদনের নিরিখ থেকে বিচ্যুত মধ্যবিত্ত নিদারুণ গৌণতার গণ্ডিতে বাঁধা পড়ে, বুর্জোয়াসিও আদিম লুণ্ঠনের লোভ কাটিয়ে মুনাফার স্বার্থের সঙ্গে যুগান্তরের প্রয়োজনকে মেলাতে পারে না, আর তার মুখোমুখি সামান্য শিল্পজ উৎপাদনের সংকীর্ণ সীমায় শ্রমিকের ঐতিহাসিক আত্মপরিচয়ও আড়ষ্ট, সদাব্যাহত থেকে যায়। আর এই দুঃসহ বিরুদ্ধতার প্রকোপে মানুষের নানা কাজকে প্রগতিমূলক সামাজিক উৎপাদনের মূলসূত্রের সঙ্গে মেলাতে না পারায় আমাদের হাতে সভ্যতার কোনও ক্যাটিগরি সৃষ্টির পরিপূর্ণতায় গড়ে ওঠেনি। উনিশ শতকের রেনেসাঁস থেকে গত বিশ বছরের স্বাধীনতার অভিজ্ঞতায় এই নিষ্ফলতার সত্য বারবার প্রকটভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এইরকম নিষ্ফলতার অনবিচ্ছিন্ন ধারায় আজ আমাদের জীবনের সর্বক্ষেত্রে নিদারুণ সংকট চরম অবস্থায় পৌঁছিয়েছে। খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির সংগ্রামে চাষিকে জয়যুক্ত করতে পারিনি, অভাবের সুযোগে অধিষ্ঠিত অতিমুনাফার নির্মম, নির্লজ্জ দস্যুবৃত্তির কাছে প্রতিনিয়ত হার মানছি। অনাচার, অনিয়ম, বিশৃঙ্খলায় সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থা প্রহসনে দাঁড়িয়েছে। আর শিল্পবিপ্লবের ফাঁকাবুলির আড়ালে দেশকে আকণ্ঠ দেনায় ডুবিয়ে আবার সাম্রাজ্যবাদের হাতছানিতে ওঠা-বসার কথা ভাবতে সুরু করেছি। এই প্রচণ্ড বিরুদ্ধতার করাল গ্রাস থেকে মুক্তির জন্য প্রয়োজন দেশজোড়া মানুষের জীবনে কর্মের হারানো সংজ্ঞা, উৎপাদনের অভিধার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাই হবে শিল্পবিপ্লবের পথে আমাদের মৌলিক ভাবাদর্শ, আমাদের জাতীয় গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি। তার প্রেরণা ছড়িয়ে পড়ুক আমাদের রুজি রোজগারের দৈনন্দিনে, ট্রেডইউনিয়ন, কৃষকসভার শ্রমদৃপ্ত পদক্ষেপে, শিক্ষার্থীর বাল্যকৈশোরযৌবনের প্রাণময় উন্মীলনে, মধ্যবিত্তের বন্ধনমুক্তিতে। সেই প্রতিষ্ঠা ও প্রগতির নেতৃত্ব ও পরিচালনাই আজ ভারতবর্ষের সৃজনশীল মার্কসবাদের অগ্রণী দায়িত্ব।

রাজনীতির কৌশলবিচারে আমাদের এই পরিক্রমা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের জোরে হওয়া সম্ভব, কারণ শিল্পবিপ্লবের সংকল্পে দেশশুদ্ধু মানুষের প্রয়াস প্রতিক্রিয়া খোদ কর্তাদের বিচ্ছিন্ন একাকিত্বে ঠেলে দিতে পারে। অন্যপক্ষে সশস্ত্র বিদ্রোহের চরমরীতিতে প্রগতির শিবিরেই নিঃসঙ্গতার সমস্যা দেখা যাবে। অনুরূপ বিদ্রোহের আশু বা সুদূর সাফল্যের সম্ভাবনা ইতিহাস ভূগোলেও মিলছে না। তাই গণতান্ত্রিক শক্তির সন্মিলিত আধিপত্যের জোরে প্রতিক্রিয়ার অবসান এখন আমাদের ইতিহাসের পথনির্দেশ। উপরন্তু বৃহৎ একচেটিয়া স্বার্থ, বণিকবৃত্তির ও কুসীদজীবী মুনাফার মোহমুক্ত বুর্জোয়াসির কোনও অংশের পক্ষে গণতান্ত্রিক শক্তি নিচয়ে যোগদানের যুক্তি আছে। দৃষ্টান্ত স্বরূপ লেনিন যাকে এশিয়ার বিশেষ পরিস্থিতিতে প্রগতিশীল বুর্জোয়াসির মুখ্য প্রতিনিধি বা সামাজিক অবলম্বন মনে করেছিলেন সেই উৎপাদনরত কৃষকের উল্লেখ প্রথমেই করতে হয়। ছোট কারিগরদের কথা বা ছোট ও মাঝারি শিল্পমালিকদের গণতান্ত্রিক শক্তিও উপেক্ষণীয় নয়। উৎপাদন ক্ষেত্রে মূলধন নিয়োগ এবং তজ্জনিত দায়িত্বের পরিগ্রহণে জাতীয় বুর্জোয়ার সংজ্ঞা নির্দেশ করা প্রয়োজন। সেই জাতীয় বুর্জোয়ার সঙ্গে বর্তমান পর্যায়ে গণতান্ত্রিক কর্মসূচির দুস্তর বিরোধ ঘটবে না। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডের শ্রমিক-শিল্পপতি বিরোধের গুরুত্ব এখানে পুরোপুরি প্রযোজ্য নয়, কারণ প্রকৃত গণতন্ত্রের ব্যাপ্তি ও জোরে এখানে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার অন্য উপায় আছে। তার জন্য এখনই উৎপাদনের ব্যক্তিস্বত্বমূলক উদ্যমকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করবার কোনো ঐতিহাসিক যুক্তি নেই।

প্রশ্ন উঠতে পারে যে গণতান্ত্রিক কর্মসূচিতে উৎপাদনের মূলগত গুরুত্বের সঙ্গে শ্রমিক-কৃষকের স্বার্থানুগ বন্টনের ন্যায় কীভাবে সমন্বিত হবে। মার্কসীয় বিচারে বণ্টনের সমস্যা, তার ন্যায়-অন্যায়ের মীমাংসা উৎপাদনের সামাজিক প্রশ্ন বাদ দিয়ে বিবেচ্য নয়। পুঁজিবাদ বিলোপের যুক্তি চূড়ান্ত হয়ে ওঠে যখন উদ্বৃত্ত মূল্যঘটিত শোষণরীতির সঙ্গে সামাজিক উৎপাদনের বিরোধ ধনতান্ত্রিক সংকটে পর্যবসিত হয়। মার্কসের বিশ্লেষণে বণ্টনের ন্যায় এবং তার ঐতিহাসিক তাৎপর্য উৎপাদনক্ষেত্রে শ্রমিকের অগ্রণী ভূমিকা বাদ গিয়ে বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পায়নি। তাই ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডের বিশেষ মডেলে ট্রেড ইউনিয়ন মারফত শ্রমিকের সুখসুবিধার সম্ভাবনা বড় কথা নয়, তার লজিকে উৎপাদনের নৈরাজ্যের সঙ্গে উদ্বৃত্তমূল্য শোষণের যোগাযোগ ধনতন্ত্রের গতিবিধিতে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আর আমাদের আজকের অবস্থায় দিল্লির মসনদ থেকে বারবার শ্রমজীবী মানুষের প্রতি উৎপাদনবৃদ্ধির যে ফতোয়া শোনা যায় তার মধ্যে বিরাট একটি ফাঁকি থাকে, কারণ দেশব্যাপী উৎপাদবিচ্যুত শোষণপ্রক্রিয়ার অপনোদন ব্যতীত সেই বহুঘোষিত উদ্দেশ্যের কোনও ভবিষ্যৎ নেই। তাই উৎপাদনের মূলসূত্র শিল্পবিপ্লবের উপযুক্ত ভাবাদর্শ একমাত্র গণতান্ত্রিক শিবিরের কর্মসূচিতে সার্থক সক্রিয়তা অর্জন করতে পারে।

ভারতবর্ষের আজ বন্টনব্যবস্থার নিদারুণ বৈষম্য উৎপাদনবিচ্যুত শোষণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। শ্রমজীবী মানুষের বিপক্ষে আয়বণ্টনের গতি পরিচালনে বণিকবৃত্তি ও কুসীদজীবী শোষণের অপ্রতিহত ভূমিকা সর্বাগ্রণ্য। ছোট চাষি, ভাগচাষি ও ক্ষেতমজুর তো তার চাপে সর্বদা নিষ্পেষিত। আবার উৎপাদনে চাষির সমস্ত উদ্যম ও উৎসাহ বড় জোতদারের (যিনি এখন মহাজন ও ফসলের কারবারিও বটে) কাছে কর্জ ও খাজনার চাপে বিলুপ্ত হয়ে যায়। আর শ্রমিকদের দাবিদাওয়ার লড়াইতেও বাজারদরের অনিবার ঊর্ধ্বগতির পটভূমি প্রধান সত্য। সেই পরোক্ষ শোষণপ্রক্রিয়ার প্রচণ্ড শক্তি মজুরিবৃদ্ধির প্রকৃত উদ্দেশ্যকে বারবার ব্যর্থতায় পর্যবসিত করেছে। তাই উৎপাদনবিচ্যুত শোষণরীতির সঙ্গে সংগ্রাম বণ্টনের ন্যায়নীতির সঙ্গে সংযুক্ত এবং বণ্টন ও উৎপাদনের মধ্যে এই ঐতিহাসিক সংযোগের ফলে আমাদের শিল্পবিপ্লবের জন্য শ্রমজীবী মানুষের নেতৃত্ব অপরিহার্য হয়ে দাঁড়ায়। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা গণতান্ত্রিক শিবিরের অধিকারে এলে জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তসমূহ এবং তাদের সমাপন আর ব্যক্তিগত মুনাফার স্বেচ্ছাচার চলবে না। গণতান্ত্রিক শক্তির অধিকারে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং অর্থনৈতিক ব্যাপারে ওই রাষ্ট্রের আধিপত্য জাতীয় গণতন্ত্র ও ধনতন্ত্রমুক্ত (non-capitalist) শিল্পবিপ্লবের মূল কথা।

ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ডের বিশেষ প্রকল্প, সেই মডেলের বিশেষ ক্ষেত্র এবং তার যুগান্তকারী মীমাংসা থেকে বোধ হয় খানিকটা দূরে সরে এলাম। কিন্তু পরিবর্তমান ইতিহাসের প্রতিটি অধ্যায়কে দেশকালের বাস্তবতায় বুঝবার চেষ্টা এবং সেই অবহিতির বিজ্ঞানে ভবিষ্যৎকে গড়বার প্রয়াসেই তো মার্কসের শ্রেষ্ঠ ঐতিহ্য আমাদের কাছে উদ্ভাসিত। আর ক্যাপিটালের অবদান শুধু ধনতন্ত্রের বিশেষ একটি পর্যায়ের বিশ্লেষণে কখনওই নিঃশেষ হয়ে যায় না, সেই বিশ্লেষণে শোষণমুক্তির পরিপূর্ণ মানবিক তাৎপর্য উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে, সমাজ অর্থনীতির আপেক্ষিকতায় মানুষের ওই মুক্তি অভিযানের রূপরেখা, তার আশু কর্তব্যের নির্ধারণে খানিকটা বৈচিত্র্য অবশ্যম্ভাবী। ইতিহাসের এবংবিধ বৈচিত্র্যকে বিজ্ঞানের আলোয় বুঝবার প্রয়োজন মার্কস স্পষ্ট করেছিলেন। তাঁর ইতিহাস-বিজ্ঞানের রীতিতে আমরা শ্রমের সামাজিক লক্ষণ, ঐতিহাসিক রূপান্তরের উৎক্রান্তিতে শ্রমজীবী মানুষের ভূমিকা এবং সামাজিক অস্তিত্বের প্রকারভেদ অনুযায়ী তার নেতৃত্বের প্রগতিশীল তাৎপর্য সম্পর্কে সচেতন হতে পেরেছি। তাই শ্রমজীবী মানুষের কল্যাণের সঙ্গে, তার আত্মপ্রতিষ্ঠার অন্বিষ্টের সঙ্গে ঐতিহাসিক অগ্রসৃতির পরিপূর্ণ সামঞ্জস্যে মজুর-কৃষকের যুগান্তকারী ভূমিকা আমাদের অবধার্য, যে সত্যের স্বীকৃতিতে এঙ্গেলস জগৎহিতায় চরিতার্থে নির্বৃত্ত শ্রেণীর স্বরূপ নির্দেশে করেছিলেন, ‘To carry through this world emancipating action is the historical mission of the proletariat.’

পরিণত ধনতন্ত্র বা দরিদ্র ভারতবর্ষে কোনও ক্ষেত্রে সেই ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রতি অবহেলাভরে প্রগতির পথনির্দেশ সম্ভব নয়। আর অবহেলার প্রকাশ বিচিত্র হলেও তার মৌল বিচ্যুতি মানুষের ভবিষ্যৎকে দুরপনেয় অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। তাই বুর্জোয়া বৈভবের দেশে সামরিক অসামরিক অপচয়ের বিরুদ্ধে তুমুল সংগ্রামের প্রশ্নটি এত জরুরি, কিংবা শতাধিক বৎসর ধরে সাম্রাজ্যের সর্বনাশা বোঝা টানার পরে শিল্পবিপ্লবের শ্রমিক নেতৃত্ব অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। না হলে সমাজ অর্থনীতির সমগ্র সমস্যা থেকে আলাদা করে কেবল মজুরি ঠেকা দেওয়ার আন্দোলনে আমরা ইতিহাসের চাবিকাঠি খুঁজে পাব না। পেটি-বুর্জোয়ার মন দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনের উদ্দেশ্য নির্ধারণের কথা মার্কস লেনিন কখনও বলেননি, চিরদিন তার কঠোর প্রতিবাদ করেছেন। আর শ্রমিকে কৃষকে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের সংকল্প কি শুধু কেতাবের কথা হয়ে থাকবে? গরিব চাষি, ভাগচাষি, ক্ষেতমজুর মিলিয়ে কৃষিকর্মে উৎসৃষ্ট বহু মানুষের সর্বনাশ যদি বছরের পর বছর বাকি দেশ মেনে নেয়, তাহলে তারপরে কোনও একদিন চাষির সেই সর্বনাশের দায়ভাগ দেশব্যাপী নিদারুণ দুর্ভিক্ষে ছড়িয়ে পড়ে। তখন তো নিশ্চয়ই মজুর-চাষিতে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ সত্য হয়ে উঠবার কথা। পশ্চিমবঙ্গে যুক্তফ্রন্টের বিজয় অভিষেকের পর থেকে ঐ প্রতিরোধের, সীমাবদ্ধ হলেও বলিষ্ঠ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠা ঘটবে আশা করেছি। জানি না এই লেখা যখন কেউ পড়বেন, তখন সেই আশার চেহারা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে।

সেই অনিশ্চয়তার আয়নায় আজ মার্কসবাদের কর্তব্য চিনে নেওয়ার সময় হয়েছে। সময় হয়েছে বলা অনৃতকথন, কারণ অনেক দেরির ক্ষতিপূরণ কীভাবে হবে তাই এখন প্রখর সমস্যা। বছরের পর বছর মধ্যবিত্ত গৌণতার গণ্ডিতে রাজনীতির ছক টেনে, আর কথায় কথায় বিপ্লবের কাল্পনিকতায় যে দায়সারা ব্যাপার চলে আসছে তার সঙ্গে মার্কসীয় পথনির্দেশের তো কোনো সম্পর্ক নেই। লোভের গুদাম থেকে খাদ্যের উৎপাদন ও বন্টন ব্যবস্থা এখনও মুক্ত না করতে পারার কারণ ওই সীমাবদ্ধ রাজনীতিতে মিলবে, যে রাজনীতির ফলে শ্রমজীবী মানুষের সার্থক সামাজিক ভূমিকা গায়েব হয়ে গেছে। খাদ্যসমস্যায় প্রতিক্রিয়ার জঘন্যতম আক্রমণের বিরুদ্ধে ব্যাপক গণপ্রতিরোধ গড়ে না উঠবার ব্যর্থতায় তার স্বীকৃতি। গণ আন্দোলনের দুর্দম শক্তি, সুদৃঢ় ঐক্য ও সৌষ্ঠব থাকলে কোনো একজন মন্ত্রী বা ভেতরে-বাইরে তাঁর সহধর্মীর দল, পুলিশের অনাচার বা এমনকী কেন্দ্রীয় সরকারের যথেচ্ছাচারও আমাদের এরকম প্রতিকারহীন পরাভবের লজ্জা দিতে পারত না। আজ খাদ্যের লড়াই শুধু কোনো সরকারের সঙ্গে নয়, আরও মূলে নির্বিত্ত মানুষের শ্রেণীশত্রুর বিরুদ্ধে, যা আবার সামগ্রিক বিন্যাসে জাতীয় প্রগতির প্রধান অন্তরায়। এই লড়াইতে নিতান্ত প্রয়োজন শ্রমজীবী মানুষের হারানো ভূমিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা। তাই এখন আমাদের মার্কসবাদ ও গণতান্ত্রিক শিবিরের সামনে কঠোর অগ্নিপরীক্ষা, কারণ শ্রমিক-কৃষকের ঐতিহাসিক ভূমিকার প্রস্তুতি ও বিকাশ, তার বাঁচবার ও বাঁচাবার পরিপূর্ণ আয়ত্তিতেই কেবল গণতান্ত্রিক রূপান্তরের কর্মধারা গঠিত হতে পারে। সেই সংগ্রামের সঙ্গে ব্যাপক অর্থে জড়িয়ে আছে প্রকৃত কৃষিবিপ্লবের সম্ভাবনা যা ছাড়া শিল্পবিপ্লব সুদূরপরাহত থেকে যাবে। আর সব দায়িত্ব ফাঁকি দিয়ে যাঁরা শুধু অশান্তির আস্ফালনে কাজ সারতে চান, ব্যর্থতাক্লিষ্ট মধ্যবিত্ত মনের উপর তাঁদের প্রভাব দুরপনেয় হলেও তাতে ইতিহাসের কাজ আর কিছু এগায় না। তাই আজ নকশালবাড়ির যুগসঞ্চিত প্রশ্নের মুখোমুখি মাদুরাই-এর স্ববিরোধ বড় সৃষ্টিছাড়া লাগছে। আবার দাবির নিহিত ন্যায্যতা সত্বেও অবাস্তব পদ্ধতির প্রয়োগ যে বৈপ্লবিক প্রয়াসকে ব্যর্থতার গ্লানিতে বিলীন করে, ইতিমধ্যে নকশালবাড়িতে তার করুণ প্রমাণ আমরা পেয়েছি।

দরিদ্র জনসাধারণের দেশ আমাদের। গ্রাসাচ্ছাদনের সংগ্রাম এখানে জীবনের প্রাথমিক দাবি, যার সাহস, উদ্যম, শিক্ষায় শ্রমজীবী মানুষ তার ইমানের জোর পুরোপুরি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করবে, সামাজিক মনুষ্যত্বের সর্বপ্রকার পরাভবের বিরুদ্ধে লড়াইতে প্রথম সারিতে হাজির হবে। জীবিকার যুদ্ধ ও জীবনের অগ্রগতির মধ্যে এই পারম্পর্যে মার্কস শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ইতিহাসের স্রষ্টাকে আবিষ্কার করেছিলেন। তাই আজ ক্যাপিটালের শতবার্ষিকীতে, রুশ-বিপ্লবের পঞ্চাশৎ বছরে মনুষ্যত্বের নির্লজ্জ পরাভবের সাম্প্রতিক দৃষ্টান্তগুলিকে চরম বলে মেনে নেওয়ার অপরাধ করব না। ক্যাপিটাল প্রথম খণ্ড রচনার পর মার্কস বার্লিনে এক বন্ধুকে চিঠিতে লেখেন যে, ষাঁড়ের চামড়ার মানুষ হলে স্বার্থপর স্বেচ্ছাচারে ডুবে থাকা যেত, শ্রেণীসমাজে মনুষ্যত্বের কঠিন যন্ত্রণা নিয়ে ভাববার দরকার হত না। আজকের চৈনিক বিচ্যুতি, স্বদেশে তার বিভিন্ন প্রকাশ এবং তারও প্রতিষেধে প্রকৃত কমিউনিস্ট প্রভাব ও উদ্যমের অকিঞ্চনতা কিংবা কোনও কোনও ধনীদেশে বুর্জোয়া বৈভবের বাজিতে বেকুব শ্রমিকের ফেরারিপনায় ইতিহাসের এক অসহনীয় নিরুদ্দেশ যাত্রার আশঙ্কা মাঝে মাঝে প্রকট হয়ে উঠলেও, শেষ পর্যন্ত মানুষের ভবিষ্যৎ নিশ্চয়ই ওই মার্কস-কথিত মনুষ্যেতর প্রতিক্রিয়ার কাছে হার মানতে পারে না। সেই অপরাজিত ভবিষ্যতের বৈজ্ঞানিক নিশ্চয়তায় ক্যাপিটালের মানবসংকল্প ভাস্বর হয়ে ওঠে।

‘নির্বাচিত এক্ষণ’-এ লেখকের সংযোজন

১. লেখাটি তৈরি হওয়ার পর বছর চল্লিশ কেটে গেছে। আশঙ্কার কথা যা ছিল, সবই বহুগুণ বেড়েছে। বিকট হয়েছে তার ব্যাপ্তি, বৈচিত্র্য এবং আরও অনেক জটিল চেহারা। আশা ভরসার কথা যা ছিল, তা এখন প্রায় শূন্য। বিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র সম্পর্কে তখনও কিছু প্রশ্ন ছিল নিশ্চয়। কিন্তু সবটাই যে এমন হারের ব্যাপার, তা তখন বুঝতাম না। Bad faith-এর এরকম ধাক্কা আগে টের পাওয়ার অনেক বাধা। যা হওয়ার, তা হয়ে যায়।

২. লেখাটিতে শিল্প বিপ্লবের পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে আমার বক্তব্যে মারাত্মক এক সরলীকরণ ছিল। পুঁজির (capital) নিজের নিয়মেই শিল্পায়নের কিছু বাধা তৈরি হয়। ঔপনিবেশিক অতীত তার ইতিহাসে নিশ্চয় যুক্ত। কিন্তু স্বাধীন হলেই সে বাধা চলে যায় না। যেমন, মস্ত বড় এক সমস্যা হল, ধনতান্ত্রিক বিকাশের পাশাপাশি স্বনিযুক্ত আর অসংগঠিত মেহনতি মানুষের বিপুল প্রাচুর্য। কৃষক এবং আরও অনেকরকম কাজের লোক। তাদের বেশির ভাগই উচ্ছন্ন যেন। তবে সেভাবেই তাদের বাঁচামরা। পুঁজির সঙ্গে লুণ্ঠনের (মার্কস বলতেন primitive accumulation) যোগাযোগ অবিচ্ছেদ্য আবার লুণ্ঠিত, নিঃস্ব মানুষ যে পুঁজির মজুর হতে পারবে, সেটাও নিশ্চিত নয়। যে-সময়ে এই লেখা, তার আগে-পরে এমন বিপদের দৃষ্টান্ত প্রচুর ছিল। গত দু-আড়াই দশক থেকে বিশ্বায়নের অভিজ্ঞতায় তা আরও জটিল এবং ভয়ানক হয়েছে। এই প্রসঙ্গেই তো ডাস ক্যাপিটাল-এর বিশেষ সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে আমাদের চিন্তাভাবনা যথেষ্ট নিবিষ্ট হওয়ার প্রয়োজন।

৩. তখনকার সমসাময়িক কিছু সমস্যা-রাজনীতি সমাজ অর্থনীতির কথা লেখাটিতে আছে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের ভূমিকা এবং তার জন্য জনমানুষের সমাজিক-রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ে যে-সব কথা বলেছিলাম, তার দায় ক্রমেই আরও জটিল হয়েছে। এ-দল, ও-দলের বাদবিচার, সবই কেমন নিরুদ্দেশ যাত্রায় ফেরার হল! নানাস্তরে সামাজিক উদ্যোগের আয়তন ও সমার্থ্য বাড়ানোই হয়তো একমাত্র উপায়। তা আজও প্রায় অনারদ্ধ এবং খুবই কঠিন হলেও নান্যপন্থা। সমাজের অনুকূল দলীয় স্বার্থের, তা সে যে-দলই হোক, যেন আর পাত্তাই নেই।

৪. গত শতাব্দীর সাতের দশকের আগে মার্কস-এর গ্রুনডরিস-এর সঙ্গে বিস্তৃত পরিচয় আমার কিছু ছিল না। তার বেশ কিছু জয়গা বারবার পড়বার পরে অনেক কথা নতুন করে বুঝেছি। সে-বোঝাপড়ার অনেক আগে এই লেখা। ডাস ক্যাপিটাল কোথায় বিশেষ বাস্তব, কী অর্থে বিশেষ, কোথায়ই বা নির্বিশেষ, তা-ও কী অর্থে, এসব ধারণায় তখন যে-সব অস্পষ্টতা আমার ছিল, তার পরিচয় লেখাটিতে আছে।

৫ম বর্ষ ৪-৫ সংখ্যা

(শারদীয় ১৩৭৪)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *