বাংলা অনুবাদ সাহিত্য ১৮০১-১৮৬০ – যোগেশচন্দ্র বাগল
প্রথমেই আমি অপরাজেয় কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের প্রতি আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য অর্পণ করি। যাঁহারা আমাকে এই সুযোগ দিয়াছেন তাঁহাদিগকেও আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাই। সাধারণের মনে হয়তো এই ধারণা বলবৎ যে, শরৎচন্দ্র শুধু কথাশিল্পীই ছিলেন, কিন্তু তাঁহার সাহিত্যচর্চার আর একটি দিকের প্রতিও আমি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করি। বহু বৎসর পূর্বে শ্রীযুক্ত গোপালচন্দ্র রায় শরৎচন্দ্রের চিঠিপত্র সংকলন করিয়া পুস্তক আকারে গ্রথিত করেন। এই পত্রাবলি হইতে মানুষ শরৎচন্দ্রকে আমরা ভালো করিয়া জানিতে পারি। তাঁহার সাহিত্যসাধনার কথাও ইহার কয়েকখানি পত্রে বিবৃত রহিয়াছে। তিনি কয়েকবারই লিখিয়াছেন যে, প্রতিদিন বারো ঘণ্টা হইতে চৌদ্দ তিনি অধ্যয়নে কালাতিপাত করেন। এই অধ্যয়ন বিভিন্ন ধরনের কঠিন কঠিন মননসাহিত্যমূলক গ্রন্থের মধ্যে নিবদ্ধ ছিল। বিজ্ঞান তাঁহার একটি প্রিয় বিষয়। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিভাগ, সমাজতত্ব প্রভৃতির সম্বন্ধে তাঁহার কতই না আগ্রহ ওই সব পত্রে পরিস্ফুট হইয়াছে। আবার তিনি অবসর সময়ে ছবিও আঁকিতেন। এই সকল কথা আমাদের জানিয়া রাখা আবশ্যক মনে করি। এই মননসাহিত্যচর্চার প্রতি লক্ষ রাখিয়াই আমি এখানে বাংলা সাহিত্যের একটি বিশেষ দিক সম্বন্ধে আলোচনা করিতে অগ্রসর হইতেছি।
সাম্প্রতিক কালে ‘অনুবাদ’ লইয়া বড়ো কথার ঝড় উঠিয়াছে। আমাদের আঞ্চলিক ভাষা অর্থাৎ প্রতিটি অঞ্চলের ব্যবহৃত মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্ববিদ্যা উচ্চতর স্তর পর্যন্ত আমাদের সন্তানসন্ততিগণকে শিক্ষা দিতে হইবে। ইহার জন্য সরকারি অর্থ ও প্রচুর ব্যয়বরাদ্দ হইয়াছে। বিভিন্ন বিষয়ে মূল্যবান প্রামাণিক বইগুলি প্রত্যেকটি অঞ্চলবাসীর মাতৃভাষায় অনুবাদ করিতে হইবে। কোনও কোনও বিজ্ঞজন এই অনুবাদের প্রচেষ্টার প্রতি প্রতিকূল মনোভাব পোষণ করিতেছেন বটে, কিন্তু একথা খুবই ঠিক যে অনুবাদ ছাড়া কোনও সাহিত্যই পরিপুষ্ট হইতে পারে না—কথাসাহিত্যও নয়, মননসাহিত্যও নয়। আজ কিন্তু মননসাহিত্যের দিকেই বেশি ঝোঁক পড়িয়াছে; কেননা উচ্চতম স্তর পর্যন্ত বিবিধ বিদ্যা শিখিবার ও শিখাইবার পক্ষে অনুবাদ একান্তই প্রয়োজন। সকল দেশেই বিভিন্ন স্তরের শিক্ষায় অনুবাদ ব্যাপারটি বিশেষভাবে গ্রাহ্য হইয়াছে। বিবিধ বিদ্যায় বইপুস্তকের অনুবাদ—সে ইতিহাস, পদার্থবিদ্যা, রসায়ন, মনোবিজ্ঞান, চিকিৎসাশাস্ত্র, আইনের বই যাহাই হোক না কেন। এক শ্রেণীর শিক্ষিতজনের মধ্যে যেমন আতঙ্কের ভাব পরিস্ফুট, তেমনি অপর বহু লোকের মনে ভাষাসাহিত্যের সত্যিকার উন্নতির জন্য আশার রেখাও উঁকিঝুঁকি মারিতেছে। অনুবাদ দ্বারা বিভিন্ন দেশের প্রথম শ্রেণীর সাহিত্য যে কীরূপ উন্নত হইয়াছে আজিকার দিনে তাহা বিশেষ করিয়া বলার প্রয়োজন দেখি না। শিক্ষার বিভিন্ন স্তরে অনুবাদের অত্যাবশ্যকতা সম্বন্ধে সন্দেহই বা জাগিবে কেন?
দেড়শতাধিক বৎসর পূর্ব হইতে বাংলা সাহিত্যের এই দিকটি সম্বন্ধে মনীষীদের ও শিক্ষাবিদগণের বিশেষ দৃষ্টি পড়িয়াছিল। বস্তুত বাংলা গদ্যের গড়নের ইতিহাসই এই অনুবাদসাহিত্যের ইতিহাস, এক কথায় বলিতে গেলে ইহাই বলিতে হয়। দেশবরেণ্য আশুতোষ মুখোপাধ্যায় বাংলা ভাষাসাহিত্যকে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমে উচ্চতম স্থান দিয়া যথোপযুক্ত মর্যাদা দান করিয়াছিলেন। ইহারও শতাধিক বৎসর পূর্বে শ্রীরামপুর ব্যাপটিস্ট মিশনের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা পাদ্রি জোশুয়া মার্সম্যান ১৮১৬ খ্রিস্টাব্দে ‘হিন্টস’ নামক একখানি শিক্ষাবিষয়ক পুস্তিকায় এই মর্মে লিখিয়াছিলেন যে, বাঙালিদের চিত্তোৎকর্ষ সাধন করিতে হইলে প্রাথমিক হইতে উচ্চতম শিক্ষার সর্বস্তরে মাতৃভাষা বাংলাকেই বাহন করিতে হইবে। তখন কিন্তু ইংরেজির আধিপত্য আদপেই শুরু হয় নাই। সংস্কৃত ও ফার্সির মাধ্যমে আমরা উচ্চতর শিক্ষালাভ করিতাম। মার্সম্যান বাংলাকে এই দুইটি ভাষার পাশমুক্ত করিয়া স্বীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহিয়াছিলেন। যখন কিছুকাল পরে ইংরেজি আসিয়া সংস্কৃত ও ফার্সির স্থান গ্রহণ করে এবং আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এক নতুন খাতে চালনা হইতে শুরু হয় তখনও পাদ্রি মার্সম্যান-পুত্র জন ক্লার্ক মার্সম্যান বাংলার সপক্ষে লেখনী ধারণ করিয়াছিলেন। গত শতাব্দীর প্রথম পাদের শিক্ষা তথা সাহিত্যপ্রচেষ্টার বিষয় পর্যালোচনা করিলে আমার স্পষ্টই দেখিতে পাইব যে, বিদ্যার বিভিন্ন বিষয়ে অনুবাদ দ্বারা বাংলা ভাষাসাহিত্য কতই না সমৃদ্ধ হইতেছে। সাহিত্যাশ্রয়ী কাহিনি, নীতিকথা, ইতিহাস, ভূগোল, জ্যোতিষ, জীবনী, রসায়ন, পদার্থবিদ্যা, ভেষজতত্ব, ব্যবচ্ছেদবিদ্যা, পশুপক্ষীতত্ব কোনওটিই ইহা হইতে বাদ পড়ে নাই। আবার শাস্ত্রগ্রন্থ সম্বন্ধে দেখুন —খ্রিস্টীয়, হিন্দু, নানা শাস্ত্রবিষয়ক গ্রন্থের অনুবাদ বাহির হইয়া বাংলা ভাষাকে কতই না সমৃদ্ধ করিয়া তুলিয়াছে। সাংগঠনিক প্রচেষ্টা ও ব্যক্তিগত প্রযত্ন দুই-ই অনুবাদকার্যের মূল রস ও রসদ জোগাইতেছিল। আমি এখানে এই বিষয়টি সম্বম্বন্ধেই আপনাদের কিছু শুনাইব।
২
কিন্তু ইহাতে আমি মৌলিকত্ব আদৌ দাবি করিতে পারি না। বাস্তবিকপক্ষে গত পঞ্চাশ বৎসরের মধ্যে এ বিষয়ে বিশেষ অনুসন্ধান আলোচনা গবেষণা চলিয়াছে। এখনও যে ইহার শেষ হইয়াছে এমন কথা বলিতে পারি না। গবেষণার ইংরেজি প্রতিশব্দ research কথাটির দ্বারা আমরা ইহার গূঢ়ার্থ সম্যক উপলব্ধি করিতে পারি। এখন পর্যন্ত গত শতাব্দীর প্রথম দিককার অনুবাদসাহিত্য সম্বন্ধে যেসব প্রামাণিক গ্রন্থাদি রচিত হইয়াছে তাহার কথা আগেই উল্লেখ করা প্রয়োজন। ডক্টর সুশীলকুমার দে History of Bengali Language and Literature গ্রন্থে এ বিষয়ের উপর কথঞ্চিৎ আলোকপাত করিয়াছেন। ইহার পরেই উল্লেখযোগ্য সজনীকান্ত দাসের বাংলা গদ্যের প্রথম যুগ। ইহার পরিবর্ধিত সংস্করণ বর্তমান দশকে বাংলা গদ্যসাহিত্যের ইতিহাস নামে মুদ্রাঙ্কিত হইয়াছে। বঙ্গীয় সাহিত্যপরিষৎ-প্রকাশিত সাহিত্যসাধক চরিতমালা-র কথাও এই প্রসঙ্গে বিশেষ করিয়া উল্লেখ করিতে হয়। ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সজনীকান্ত দাস এবং বর্তমান লেখক বহু পরিশ্রমে প্রামাণিক তথ্যাদির উপর নির্ভর করিয়া বঙ্গসাহিত্যসাধকদের সাহিত্যকীর্তির কথা পর্যালোচনা করিয়াছেন। মুখ্যত সমাচার দর্পণ হইতে ব্রজেন্দ্রনাথ কর্তৃক সংকলিত ও সম্পাদিত সংবাদপত্রে সেকালের কথা দুই খণ্ডেও এ বিষয়ে বহু প্রামাণিক তথ্য পাওয়া যায়। অনুবাদ দ্বারা বঙ্গভাষাসাহিত্য যে কীরূপ পরিপুষ্টি লাভ করিয়াছে তাহা এই সকল গ্রন্থ পাঠে আমরা সম্যক উপলব্ধি করিতে পারি। গবেষণার কোনও শেষ নাই। নবীন গবেষকগণও এ বিষয়টির অনুসন্ধান ও আলোচনায় প্রবৃত্ত হইলে আমরা অনেকানেক নূতন বিষয় হয়তো জানিতে পারিব।
একটু আগেই সাংগঠনিক প্রচেষ্টা এবং ব্যক্তিগত প্রযত্নের কথা বলিয়াছি। ইহার মূলে কতকগুলি বিষয় বিশেষভাবে কার্য করে। সরকারি উদ্যোগ বেসরকারি প্রচেষ্টা এবং বিভিন্ন ধর্মাশ্রয়ীদের মধ্যে নিজ নিজ ধর্মের গ্রন্থ প্রকাশ এবং আত্মরক্ষার্থ নানাবিধ প্রয়াস কার্য করিয়াছিল বিশেষভাবে। আমরা ক্রমে এ সম্বন্ধে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিতে চাই। প্রথমেই বিভিন্ন ধর্ম ও শাস্ত্রগ্রন্থের অনুবাদের কথা উল্লেখ করিব। শ্রীরামপুরে ব্যাপটিস্ট মিশন ও প্রেস প্রতিষ্ঠার অল্পকাল পরেই কেরির সম্পাদনায় ১৮০১ খ্রিস্টাব্দে নিউ টেস্টামেন্টের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হয়। যতদূর জানা যায় রামরাম বসু ১৭৯৩ খ্রিস্টাব্দে জন টমাসের আনুকূল্যে নিউ টেস্টামেন্টের অন্তর্ভুক্ত সেন্ট ম্যাথুর বঙ্গানুবাদ করিয়াছিলেন। কেরির সম্পাদনাকার্যেও রামরাম বসু বিশেষ সহায় হন। কেরি স্বয়ং এবং রামরাম বসু, জন টমাস, ফাউন্টেন ও জোশুয়া মার্সম্যান একযোগে অনুবাদকার্যে লিপ্ত হওয়ায় অনুবাদপুস্তক অত শীঘ্র বাহির হওয়া সম্ভব হইল। ওল্ড টেস্টামেন্টের অনুবাদ শুরু হয় ১৮০২ খ্রিস্টাব্দে। খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশিত হইয়া ১৮০৮ সনে সমগ্র ওল্ড টেস্টামেন্টের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হইল। সমগ্র বাইবেল গ্রন্থের দ্বিতীয়বার বাংলায় অনুবাদ করেন কলিকাতাস্থ ব্যাপটিস্ট পাদ্রিগণ। পাদ্রি উইলিয়ম ইয়েটসের কর্তৃত্বে ১৮৩৮ সনে এই অনুবাদকার্য আরম্ভ হয়। পরবর্তী ১৮৪৫ সনে তিনি ইহধাম ত্যাগ করেন। কিন্তু এই অনুবাদকার্য তাঁহার মিশনারি সহকর্মীগণ সমাপ্ত করেন কয়েক বৎসর পরে। দেখিতেছি কলিকাতা ব্যাপটিস্ট পাদ্রিগণ ১৮৫২ সনে সমগ্র বাইবেল গ্রন্থ ‘ধর্মপুস্তক। অর্থাৎ পুরাতন ও নূতন ধর্ম্মনিয়ম সম্বন্ধীয় গ্রন্থসমূহ’ প্রকাশিত করিয়াছেন।
প্রথমে ধর্মমুলক ও ধর্মাশ্রয়ী অনুবাদসাহিত্যের কথা বলিতেছি। কাজেই শ্রীরামপুরের পাদ্রিগণ কর্তৃক বাইবেল অনুবাদের পরই রামমোহন রায়ের ধর্মমূলক গ্রন্থাদি অনুবাদের কথা বলিতে হয়। রামমোহন ১৮১৪ সনে কলিকাতায় স্থায়ীভাবে বাস করিতে আরম্ভ করেন। তিনি একেশ্বরবাদী, একমেবাদ্বিতীয়মের উপাসক—একেশ্বরবাদের পরিপোষক ও সমর্থক। বেদান্ত এবং উপনিষদ গ্রন্থসমূহ বাংলায় তর্জমাকার্যে ব্যাপৃত হইলেন। তাঁহার প্রথম পুস্তক ‘বেদান্ত গ্রন্থ’—সংস্কৃত বেদান্তের অনুবাদ—প্রকাশকাল ১৮১৫ । ১৮১৯ সনের মধ্যে তিনি পর পর পাঁচখানি উপনিষদের অনুবাদ প্রকাশ করেন। এগুলি যথাক্রমে তলবকার উপনিষৎ (১৮১৬), ঈশোপনিষৎ (১৮১৬), কঠোপনিষৎ (১৮১৭), মাণ্ডুক্যোপনিষৎ (১৮১৭), মুণ্ডকোপনিষৎ (১৮১৯)। তিনি এই ক’বৎসরের মধ্যে রক্ষণশীল সুবিখ্যাত পণ্ডিতদের সঙ্গে শাস্ত্রবিচারেও প্রবৃত্ত হইলেন। ইহার ফলে বাঙালসাহিত্য একটা স্বতঃস্ফুর্ত গতি লাভ করিল। মিশনারিদের ধর্মপুস্তক সম্বন্ধে এ কথা কিন্তু আদপে প্রযোজ্য নয়। একেশ্বরবাদী হইলেও হিন্দুধর্মের প্রতি মিশনারিদের গালিবর্ষণ রামমোহন রায় কখনও বরদাস্ত করিতে পারেন নাই। সমাচার দর্পণে গালিবর্ষণ দেখিয়া তিনি খুবই বিচলিত হন। ইহার উত্তরদানকল্পে ব্রাহ্মনিকাল ম্যাগাজিন নামক একখানি পত্রিকা বাহির করিলেন ১৮২১ সনে। ইহার বাংলা অনুবাদও সঙ্গে সঙ্গে দেওয়া হয়। বাংলা পত্রিকার নাম ব্রাহ্মণ সেবধি। রামমোহন মিশনারিদের উদ্দেশ্য করিয়া জোরালো ভাষায় লেখেন, আমরা পরাধীন বলিয়া আমাদের ধর্মের উপর নির্বিচারে গালিবর্ষণ হইতেছে। পাদ্রিগণ তুরস্ক কী পারস্যে যান না? সেখানে গিয়া খ্রিস্টীয় ধর্ম প্রচারে রত হইলে কী দণ্ড বিধান হয় তাহা বুঝিতে পারিবেন।
রামমোহন হিন্দুধর্মের উচ্চতম পথ একেশ্বরবাদেরই সমর্থক ও প্রচারক। মূল হিন্দুধর্মের নিন্দা করিয়া তাঁহার লেখনীমুখে কেহ রেহাই পাইতেন না। ১৮১৩ সনে পাদ্রিদের এদেশে অবাধ বসবাসের অধিকার দেওয়া হইলে তাঁহারা খ্রিস্টধর্ম প্রচারে বিশেষভাবে লিপ্ত হইয়াছিলেন। এই প্রচারকার্যকে ব্যাহত করিবার জন্য সংঘবদ্ধ উদ্যোগ আয়োজন চলে। ইহার ফলে অনুবাদসাহিত্য কিরূপ সমৃদ্ধ হয় পরে আমরা তাহা দেখিতে পাইব। ধর্মমূলক ও ধর্মাশ্রয়ী অনুবাদসাহিত্যের কথা আগে খানিকটা বলিয়া লইলাম। এখন সাংগঠনিক প্রচেষ্টার বিষয় কিছু আলোচনা করি।
৩
কিন্তু ইহার পূর্বে একটি কথার প্রতি আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করিব। প্রশ্ন —বাংলা সাহিত্যের তথা গদ্যসাহিত্যের জনক কে? কেহ বলেন রামমোহন; আবার কেহ বলেন বিদ্যাসাগর। কিন্তু প্রথম সাংগঠনিক প্রচেষ্টার কথা বলিলে সাধারণের এই ভ্রমের নিরসন হইবে, ঠিক জবাবও হয়তো মিলিবে। আমি এখানে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের কথা বলিতেছি। কলেজ প্রতিষ্ঠা হয় ১৮০০ খ্রিস্টাব্দে। তবে উহার পূর্বে কি বাংলা গদ্য ছিল না? ছিল, কিন্তু তাহা ছিল দলিল দস্তাবেজের মধ্যে আবদ্ধ। সাহিত্যপরিষৎ পত্রিকা ও কথঞ্চিত অন্যান্য পত্রপত্রিকায় সপ্তদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীতে লিখিত পত্র ও দলিল কিছু কিছু ছাপা হইয়াছে। অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে বাংলায় কোম্পানির শাসন দৃঢ়বদ্ধ হইয়াছে। তখন বাংলার রাজন্যবর্গের সঙ্গে সরকারের পত্রালাপ হইত বাংলায়। ইংরেজি তখন ঐ অঞ্চলে প্রবেশ লাভ করে নাই এই জন্য। ডক্টর সুরেন্দ্রনাথ সেন সরকারি দলিলাদি ঘাঁটিয়া এইরকম বহু চিঠিপত্র উদ্ধার করেন এবং এসব কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক প্রকাশিত প্রাচীন বাঙ্গালা পত্র সঙ্কলন (১৯৪২) বইয়ে গ্রথিত হয়। কাজেই বাংলা গদ্য পূর্বেও যে ছিল সে সম্বন্ধে দ্বিমত নেই। কিন্তু লেখ্যভাষা ও কথ্যভাষার মধ্যে নৈকট্য সম্বন্ধ তখন মোটেই ছিল না। এই সম্বন্ধ স্থাপিত হয় অধ্যাপক উইলিয়ম কেরির নেতৃত্বে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজস্থ তাঁহার সহকর্মী পণ্ডিত-মনীষীদের দ্বারা। কলেজের উদ্দেশ্য ছিল অন্যান্য ভাষার মধ্যে বাংলা ভাষাও বিলাত হইতে নবাগত তরুণ সিভিলিয়ানদের শেখানো। যাহারা যে যে প্রদেশে স্থিত হইবে তাহারা সেই সেই প্রদেশের ভাষা শিখিত। কাজেই বাংলায় যাহারা স্থিত হইত তাহারা বাংলাই শিখিত। তরুণ সিভিলিয়ানদের নূতন ভাষা শিখাইতে হইবে, কাজেই এ জন্য প্রথমাবধি কেরি ও সহকর্মীগণ বাংলা পুস্তক রচনায় প্রবৃত্ত হন। আপনারা দেখিয়া থাকিবেন কোনও কোনও বইরে ভাষা খুব সহজ, এমনকি চলতি রীতিও তাহার মধ্যে বিবৃত। সাহিত্য ও ইতিহাস, ব্যাকরণ, অভিদান নানা ধরনের বই লেখা হইতে লাগিল। কেরির সাহিত্যকর্মীদের মধ্যে শীর্ষস্থানে ছিলেন পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার। ইহার পরেই রামরাম বসুর স্থান।
কেরি ও তাঁহার সহকর্মীগণ বিবিধ বিষয়ে পুস্তকরচনায় প্রবৃত্ত হন। আমি এখানে অনুবাদসাহিত্যেরই কথা বলিতেছি। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ প্রতিষ্ঠাবধি প্রথম দশ-বারো বৎসরের মধ্যে কতকগুলি প্রথম শ্রেণীর পুস্তক বাংলায় ভাষান্তরিত হইল। প্রথমেই উল্লেখযোগ্য হিতোপদেশ বইখানি। ১৮০১ হইতে ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ইহার সংস্কৃত হইতে তিনটি অনুবাদগ্রন্থ কলেজের আনুকুল্যে বাহির হইতে দেখি। প্রথমখানি পণ্ডিত গোলোকনাথ শর্মা কর্তৃক অনুদিত এবং ১৮০১ সনে প্রকাশিত। হিতোপদেশের দ্বিতীয় অনুবাদক পণ্ডিত রামকিশোর তর্কচূড়ামণি। এ বইখানি বাহির হয় ১৮০৮ সনে। এই বৎসরই কেরির প্রধান সহকর্মী পণ্ডিত মৃত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার মূল হিতোপদেশের আর একটি অনুবাদ প্রকাশিত করেন। ইহার পনেরো বৎসর পরে, ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে সমাচার চন্দ্রিকা-সম্পাদক ভবানীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও আর একখানি অনুবাদপুস্তক প্রকাশ করিলেন। হিতোপদেশ আমাদের সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট স্থান লাভ করিয়াছে। সম্প্রতি পঞ্চতন্ত্র ও হিতোপদেশ সম্বন্ধে একটি মনোজ্ঞ আলোচনা শুনি। প্রায় দু হাজার বৎসরেরও পুরাতন এই বই দুইখানি কত ভাষায়ই না অনুবাদ হইয়াছে। বিষ্ণুশর্মা-কৃত ‘পঞ্চতন্ত্র’ এবং নারায়ণকৃত ‘হিতোপদেশ’ বই দুইখানির বিষয়বস্তু প্রায় এক, তবে বিষয় সন্নিবেশে কিছু তফাত আছে। হিতোপদেশের পর অনুবাদগ্রন্থ হিসাবে উল্লেখযোগ্য ‘তোতা ইতিহাস’। কলেজের অন্যতম পণ্ডিত চণ্ডীচরণ মুন্সি ১৮০৫ সনে কাদের বক্স প্রণীত ফার্সি ‘তুতিনামা’ হইতে বাংলায় অনুবাদ করেন। ফার্সি বিভাগের অন্যতম প্রধান তারিণীচরণ মিত্র ঈশপ ও অন্যান্য প্রাচীন কাহিনি হইতে Oriental Fabulist নামক একখানি পুস্তক অনুবাদ করেন বাংলা হিন্দুস্থানি ও ফার্সিভাষায়। এখানি প্রকাশিত হয় ১৮০৩ সনে। হরপ্রসাদ রায়ের পুরুষপরীক্ষা বাহির হইল ১৮১৫ সনে। এখানি বিদ্যাপতিকৃত সংস্কৃত পুরুষপরীক্ষার অনুবাদ। একটি কথা মনে রাখিতে হইবে যে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ কর্তৃক গৃহীত বই কেরির সহকর্মীগণ ছাড়া বাহিরের লোকেরও অনেকে রচনা করিয়াছিলেন। বাংলা, কী মূলে কী অনুবাদে, গদ্যসাহিত্য একটি সুস্পষ্ট রূপ লাভ করে এই ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে। কেরি ও তাঁহার সহকর্মীরা প্রথমাবধি ইহাকে লালন করেন। কাজেই আধুনিক গদ্যসাহিত্যের স্রষ্টার গৌরব যদি কাহারও প্রাপ্য হয় তাহা হইলে তাহা এই সাহিত্যকর্মীগোষ্ঠীরই প্রাপ্য।
কেরির ‘ইতিহাসমালা’ নামক একখানি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮১২ খ্রিস্টাব্দে। এখানি বিভিন্ন পুস্তক হইতে সংগৃহীত ১৫০টি কাহিনির বঙ্গানুবাদ। এখানিও কলেজের তরুণ সিবিলিয়ানদের জন্য লিখিত হইয়া থাকিবে। কেরির একখানি উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ বৃহদাকারে প্রকাশিত বাংলা-ইংরেজি অভিধান। এখানিরও মূল উদ্দেশ্য ছিল সিভিলিয়ানদের ভাষা শিক্ষাদানে সহায়তা করা। অনুবাদ প্রসঙ্গে ঠিক না আসিলেও কেরির এই মহান কীর্তির কথা আমরা কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করিব।
৪
বাংলা গদ্যের গড়নের সময় আর একদিক হইতে বিশেষ প্রেরণা আসে। সাহিত্যে উচ্চ চিন্তা ও ভাবধারা প্রকাশে যে ওই সময়ই বাংলা ভাষা উপযুক্ত বিবেচিত হইয়াছিল রামমোহন রায়ের অনুবাদ ও বিচারমূলক গ্রন্থাদি হইতে আমরা তাহার আভাস পাইয়াছি। কিন্তু সাধারণ মানুষের শিক্ষণীয় ভাষা কিরূপ হইবে? ইহার পথ নিরূপণ করেন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সাহিত্যকর্মীরা, বিশেষ করিয়া কেরি ও মৃত্যুঞ্জয়। কিন্তু এই প্রচেষ্টা ছিল তরুণ ইংরেজ সিভিলিয়ানদের নিমিত্ত একান্তভাবে। সাধারণ মানুষের শিক্ষার উপযোগী গ্রন্থাদি রচনা ও প্রকাশের ভার নিলেন আর একটি সংগঠন বা সংস্থা। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসপাঠক ও গবেষকের নিকট ‘কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি’র নাম নূতন নয়। এই সোসাইটি দেশী-বিদেশী জ্ঞানীগুণীদের লইয়া ১৮১৭ সনের ৪ঠা জুলাই স্থাপিত হয় । দেখি ইহার মধ্যে ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের সাহিত্যকর্মীপ্রধানেরা কেহ কেহ রহিয়াছেন।—যেমন উইলিয়ম কেরি, তারিণীচরণ মিত্র প্রমুখ। তারিণীচরণ প্রথমাবধি এই সোসাইটির নেটিভ সেক্রেটারি বা দেশীয় সম্পাদক পদে কার্য করেন। এই সংস্থার উদ্দেশ্য, স্থানীয় ভাষাসমূহে বিবিধ বিদ্যার পুস্তক প্রকাশ। বাংলা, ইংরেজি, সংস্কৃত, ফার্সি, উড়িয়া, হিন্দুস্থানি প্রভৃতি বিভিন্ন ভাষারই পুস্তক প্রকাশের আয়োজন হয়। বাঙালি-অবাঙালি নির্বিশেষে সন্তানসন্ততিদের মধ্যে নিজ নিজ মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানে সহায়তা করাই ছিল ইহার উদ্দেশ্য। কিশোরপাঠ্য পুস্তক রচনায় সুবিদ্বান ব্যক্তিরা প্রবৃত্ত হইলেন। আমরা এখানে বাংলার কথাই বিশেষ করিয়া বলিতেছি। কিশোরপাঠ্য মৌলিক পুস্তক রচনা সময়সাপেক্ষ। সোসাইটির কর্তৃপক্ষ অনুবাদপুস্তক রচনা ও প্রকাশে অগ্রসর হইলেন। পাঠ্যপুস্তক রচনায় ইংরেজ বাঙালি উভয় সম্প্রদায়ের বিদগ্ধ ব্যক্তিরা হাত দিয়াছিলেন। বাঙালিদের মধ্যে তারিণীচরণ মিত্র, রামচন্দ্র শর্মা, তারাচাঁদ দত্ত, রাধাকান্ত দেব, রামকমল সেন, রামমোহন রায়, তারাচাঁদ চক্রবর্তী কখনও একযোগে কখনও বা স্বতন্ত্রভাবে পুস্তক রচনা করিতে লাগিলেন। ইউরোপীয়দের মধ্যে দেখি ফেলিক্স কেরি, উইলিয়ম ইয়েটস, জন ক্লার্ক, মার্সম্যান, ডব্লু. এইচ. পীয়ার্স, জে. ওয়েঙ্গার প্রমুখ মনীষীরা এ কাজে প্রবৃত্ত হইয়াছেন। সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, জ্যোতিষ, পদার্থবিদ্যা প্রভৃতি নানা বিষয়েই সোসাইটি পুস্তক প্রকাশ করিতে শুরু করিয়া দিলেন।
একটি কথা এখানে উল্লেখ করিব। পাঠ্যপুস্তক চালু করিতে হইলে গ্রহণযোগ্য পাঠশালা ও বিদ্যালয় চাই। সোসাইটির কর্তৃস্থানীয়দের মধ্যে অনেকে তাই বৎসরেক কাল যাইতে না যাইতেই ‘কলিকাতা স্কুল সোসাইটি’ নামে আর একটি প্রতিষ্ঠান স্থাপন করিলেন। ইহার উদ্দেশ্য ছিল দেশীয় পাঠশালাগুলির ‘সংস্কারসাধন এবং ক্রমে আদর্শ বাংলা ইংরেজি বিদ্যালয় স্থাপন। স্কুল বুক সোসাইটির উদ্দেশ্য সার্থকরূপ গ্রহণ করা সম্ভব হইল দ্বিতীয় সোসাইটির প্রতিষ্ঠার পর হইতে।
স্কুল বুক সোসাইটির কার্য অর্থাৎ পাঠ্যপুস্তক রচনা ও প্রকাশ দ্রুত অগ্রসর হইতে লাগল। বিভিন্ন বিষয়ে পুস্তকাদি অনুবাদ হইয়া বাঙালায় বাহির হইতে শুরু হইল অবিলম্বে। মনে রাখিবেন, এখানে শুধু বাংলা সাহিত্যের কথাই বলিতেছি। সোসাইটির, যতদূর যানা যাইতেছে প্রথম অনুবাদপুস্তক সঙ্কলন করেন ইহার দেশীয় সম্পাদক তারিণীচরণ মিত্র, রাধাকান্ত দেব ও রামকমল সেনের সহযোগে। ইহারা ইংরেজি ও আরবি হইতে ৩১টি কাহিনী বাছাই করিয়া অনুবাদ করেন এবং তাহার নাম দেন ‘নীতিকথা’। ১৮১৮ সনের এপ্রিল মাসে ইহার প্রথম প্রকাশ। কিশোরদের নিকট এই বইখানি এত প্রিয় হইয়া উঠে যে দুই বৎসরের মধ্যে কর্তৃপক্ষ কয়েকটি সংস্করণে বহু সহস্র খণ্ড ছাপাইতে বাধ্য হইলেন। সোসাইটি সহজ সরল ভাষায় লিখিত বিষরবস্তু হইয়া এই সময় (১৮১৮, এপ্রিল) বাংলা প্রথম মাসিকপত্র শ্রীরামপুর হইতে আত্মপ্রকাশ করে। ইহার প্রধান লেখক দুইজন-ফেলিক্স কেরি ও জন ক্লার্ক মার্সম্যান। সম্পাদকরূপে মার্সম্যানেরই নাম আমরা পাইতেছি। পত্রিকাখানির নাম দিগদর্শন। ইহাতে ইতিহাস, ভ্রমণবৃত্তান্ত, কাহিনি সরস করিয়া লেখা হইত। সোসাইটি কিশোরপাঠোপযোগী জ্ঞানে ইহার প্রতি সংখ্যার শত শত খণ্ড ক্রয় করিয়া পাঠশালায় বিলি করিতেন। দিগদর্শনে নানা ঐতিহাসিক কাহিনি এবং কোনও কোনও দেশের ইতিহাসের অনুবাদ স্থান পাইত। ইহাতে প্রকাশিত বিষয়বস্তু লইয়া পরে পুস্তকাদি প্রকাশিত হইয়াছিল। এইরকম একখানি পুস্তক-সদগুণ ও বীর্য্যের ইতিহাস। মার্সম্যন ইহার লেখক। চারিখণ্ডে প্রকাশের কথা ছিল। কিন্তু দুই খণ্ড মাত্র বাহির হয় যথাক্রমে ১৮২৯ ও ৩০ সনে। ইংরেজি Anecdotes of Vritue and Valour পুস্তকের অনুবাদ এখানি। প্রথমাবধি দিগদর্শনে ইতিহাস নামে বাহির হয়। সোসাইটি এখানি পাঠশালাসমূহে প্রচুর সংখ্যায় বিলি করিয়াছিলেন। মার্সম্যানের এধরনের অন্য উল্লেখযোগ্য অনুবাদ বই হইল পুরাবৃত্তের সংক্ষেপ বিবরণ (১৮৩৩), ইংরেজি সমেত বাংলায় ঈশপস ফেবলস (১৮৩৪) মারিচ গ্রামারের বঙ্গানুবাদ (১৮৩৪) শুনা যায় মার্সম্যান স্কুল বুক সোসাইটি প্রতিষ্ঠার পূর্বেই শ্রীরামপুর মিশন পরিচালিত স্কুলগুলির জন্য কয়েকখানি পাঠ্যবই লেখেন। ইহার মধ্যে একখানি হইল ‘জ্যোতিষ এবং গোলাধ্যায়’। অনুবাদ কী সংকলন তাহা নিশ্চয় করিয়া বলা যায় না। তবে, এ বিষয়টি এখানে উল্লেখমাত্র করিলাম।
পূর্বে যেমন বলিয়াছি সোসাইটি বিবিধ বই বিভিন্ন ভাষায় নিজেও প্রকাশ করিতেন। ইহার একটি উল্লেখযোগ্য প্রয়াস ‘পশ্বাবলী’ নামক কিশোরপাঠ্য মাসিকপত্রিকা-প্রকাশ ফেব্রুয়ারি ১৮২২ হইতে। এই পত্রিকাখানি প্রতি সংখ্যায় একটি করিয়া জন্তু, যেমন সিংহ, ব্যাঘ্র, ভল্লুক প্রভৃতির সচিত্র বিবিরণ বাহির হইত। পাদ্রি লসন ইহার ইংরেজি সংগ্রহ করিয়া দিতেন এবং ডব্লু. এইচ. পিয়ার্স বাংলায় অনুবাদ করিতেন। এই বিবরণগুলি কয়েক বৎকরের মধ্যে পুস্তক আকারেও পাঠশালায় প্রচারের নিমিত্ত গ্রথিত হয়। কিছুকালের মধ্যে পত্রিকাখানির প্রকাশ বন্ধ হইয়া যায়। রামচন্দ্র মিত্র ১৮৩৩ সনে এখানিকে পুনরুজ্জীরিত করেন। ইংরেজি ও বাংলা পাশাপাশি রাখিয়া ১৬ সংখ্যা পর্যন্ত বাহির হইয়াছিল। সোসাইটি প্রকাশিত ‘পশ্বাবলী’ পুস্তকখানির খুবই কদর হইয়াছিল। দেখিতেছি ১৮৫২ সনে কর্তৃপক্ষ তারাশঙ্কর তর্করত্নকে দিয়া আমূল সংস্কারসাধনপূর্বক এখানি পুনরায় বাহর করেন।
সোসাইটি প্রকাশিত বা আনুকূল্যপ্রাপ্ত বিভিন্ন বিষয়ে আরও কয়েকখানি জ্ঞানগর্ভ পুস্তকের এখানে উল্লেখ করা দরকার। ফেলিক্স কেরি গোল্ডস্মিথের History of England পুস্তকের অনুবাদ ‘ব্রিটিন দেশীয় বিবরণ সঞ্চয়’ নামে অনুবাদ করেন এবং এখানি ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। দিগদর্শন-এ তিনি জেমস মিলের ইংরেজি ভারতবর্ষের ইতিহাস গ্রন্থেরও অনুবাদ শুরু করেন, কিন্তু মৃত্যু হওয়ায় ইহা শেষ করিতে পারেন না। জন ক্লার্ক মার্সম্যান ইহা সমাপ্ত করিয়া দুই খণ্ডে প্রকাশিত করেন ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে। উইলিয়ম ইয়েটস সোসাইটি কর্তৃক অনুরুদ্ধ হইয়া ইতিহাস ও বিজ্ঞান বিষয়ে কয়েকখানি অনুবাদ রচনা করেন। এগুলি হইল যথাক্রমে-পদার্থবিদ্যা সার (১৮২৫), জ্যোতির্বিদ্যা (১৮৩০), সত্য ইতিহাস সার (১৮৩০), প্রাচীন ইতিহাস সমুচ্চ য় (১৮৩০)। জনসনের বিরাট ইংরেজি অভিধানের বাংলা তর্জমা শুরু করেন রামকমল সেন ও ফেলিক্স কেরি ১৮২১ সনে। কেরির মৃত্যু হওয়ায় ছাপা কার্য মনে হয় কিছু কাল বন্ধ ছিল। এখানি সম্পূর্ণ হইয়া প্রকাশিত হওয়ার কথা পরে বলিতেছি। কিন্তু এই সময়ে, ১৮২২ সনে মেণ্ডিস নামক এক ব্যক্তি জনসনের ইংরেজি অভিধানের একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ প্রকাশিত করেন। এখানিও সোসাইটির আনুকূল্য লাভ করিয়াছিল বলিয়া মনে হয়। এই রকম আরও কোনও অনুবাদগ্রন্থের উল্লেখ করা চলে। কিন্তু বাহুল্য ভয়ে নিরস্ত হওয়া যাক। বাংলা সাহিত্যের গড়নের যুগে স্কুল বুক সোসাইটি যে কৃতিত্ব দেখাইয়াছিলেন তাহা কখনও ভুলিবার নয়।
৫
দুইটি সংগঠন বা সংস্থার তরফে অনুবাদ সাহিত্য কতটা সমৃদ্ধ হইয়াছিল তাহার কিঞ্চিৎ আভাস আমরা পূর্বোক্ত আলোচনা হইতে পাই। এ কথা স্মরণ রাখা দরকার যে, ফোর্ট উইলিয়ম কলেজ একটি পুরাপুরি সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি একটি বেসরকারি সংস্থা। আমরা এখন এমন একটি সংগঠনের কথা বলিব যাহা ওই যুগের পক্ষে ছিল নিতান্তই অভিনব। এটি সম্পূর্ণ স্বদেশীয় প্রতিষ্ঠান, বঙ্গসাহিত্য অনুশীলন ছিল ইহার মুখ্য উদ্দেশ্য। এই সংগঠনের নাম ‘গৌড়ীয় সমাজ’। ইহার প্রতিষ্ঠাকাল ১৮২৩ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস। ইউরোপীয়দের সংঘবদ্ধ সার্থক প্রচেষ্টাগুলির দ্বারা উদ্ধুদ্ধ হইয়া ওই যুগের প্রবীণ ও নবীন, রক্ষণশীল ও প্রগতিপন্থী বাঙালিরা মাতৃভাষা সাহিত্যের অনুশীলন দ্বারা স্বীয় সমাজের উন্নতিসাধনকল্পে এই সমাজ প্রতিষ্ঠা করেন। সমাজ মৌলিক গ্রন্থ প্রকাশের বাসনা করিলেও তখনই উহা পাওয়া সম্ভবপর ছিল না; এই জন্য অনুবাদগ্রন্থের উপরই বেশি ঝোঁক দেন। ওই সময় খ্রিস্টান পাদ্রিদের পুস্তকপুস্তিকা প্রচারহেতু হিন্দুধর্মের ও সমাজের উপর নানারূপ আঘাত হানিতে দেখা যায়। এ কারণ সমাজকর্তৃপক্ষ আমাদের ধর্মগ্রন্থ এবং ‘সাহিত্যাদি শাস্ত্রগ্রন্থের সংকলন-অনুবাদের প্রতিও সভ্যগণের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকর্ষণ করে। ধর্মীয় আচার আচরণ সম্বন্ধে জ্ঞানলাভের নিমিত্তও কেহ কেহ পুস্তক পরিবেশনে প্রবৃত্ত হন। এই প্রসঙ্গে সমাজের সভ্য ভূকৈলাসের কালীশঙ্কর ঘোষালের ‘ব্যবহার মুকুর’ নামক গ্রন্থখানির উল্লেখ করিতেছি। সমাজ বেশিদিন স্থায়ী হয় নাই বটে, কিন্তু ইহা প্রাচীন ও নবীনদের মধ্যে যেরূপ উৎসাহ ও প্রেরণা জোগাইয়াছিল তাহাতে দেখা যায় পরবর্তী পনেরো বৎসরের মধ্যে বিস্তর সংস্কৃত শাস্ত্রগ্রন্থের তর্জমা ক্রমান্বয়ে বাহির হইতেছিল। পুরাণ, স্মৃতি, ভাগবদগীতা, মনুসংহিতা, মুগ্ধবোধ, অমরকোষ প্রভৃতি বিভিন্ন ধর্মীয় পুস্তক অনুবাদে পণ্ডিত-মনীষীরা ব্যাপৃত হইয়াছিলেন। আর এসব গ্রন্থপ্রকাশে কখনও এককভাবে এবং কখনও যৌথভাবে বাঙালি প্রধানেরা অগ্রসর হন। একটি কথা খুবই মনে রাখা দরকার। অপেক্ষাকৃত আধুনিককালে ‘বঙ্গবাসী’ পত্রিকার কর্তৃপক্ষ নানারূপ সংস্কৃত ও বাংলা শাস্ত্রসাহিত্য গ্রন্থাদি প্রকাশে সোৎসাহে লিপ্ত হন। ওই যুগেই দেখি এক একটি সংবাদপত্র প্রতিষ্ঠান বহু অর্থব্যয়ে এই ধরনের গ্রন্থাদির প্রকাশে উদ্যোগ করিতেছিলেন। ‘সংবাদ তিমিরনাশক’, ‘সমাচার চন্দ্রিকা’, ‘সংবাদ পূর্ণচন্দ্রোদয়’ প্রভৃতির পক্ষে নিজ নিজ মুদ্রাযন্ত্রে এই ধরনের বিস্তর বইপুথি ছাপা হইতে থাকে। তখন পাঠকসংখ্যা খুবই কম ছিল। কিন্তু উৎসাহ ছিল অপরিসীম। ওই সময়কার এই যে সাহিত্যকর্ম-তৎপরতা তাহার মূলে গৌড়ীয় সমাজের যথেষ্ট প্রেরণা ছিল। তথ্যপ্রমাণাদি বলে এ কথা আমি নিঃসংকোচে বলিতে পারি।
দুইখানি বিশেষ বইয়ের অনুবাদ-সংস্করণের কথা এখানে উল্লেখ করা যায়। মনুসংহিতার বাংলা ও ইংরেজি অনুবাদসহ মূল সংস্কৃত একসঙ্গে প্রকাশ করিতে শুরু করেন তারাচাঁদ চক্রবর্তী এবং বিশ্বনাথ তর্কভূষণ। বিশ্বনাথ স্বনামধন্য ভূদেব মুখোপাধ্যায়ের পিতা। শ্রীমদভগবদগীতার একাধিক অনুবাদ ইতিপূর্বে পয়ার ছন্দে হইয়াছিল, কিন্তু সরল বাংলায় মূলানুগ অনুবাদ যতদূর জানা যায় প্রথম প্রকাশ করেন গৌরীশঙ্কর তর্কবাগীশ মহাশয় ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে। তিনি পরে সম্বাদভাস্কর প্রতিষ্ঠা করিয়া প্রসিদ্ধ হইয়াছিলেন। গীতাখানি প্রথমে নবম অধ্যায় পর্যন্ত অনূদিত হয়; পরে অষ্টাদশ অধ্যায় পর্যন্ত সমগ্র গীতা তিনি অনুবাদ করিয়া প্রকাশিত করেন ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে। এই প্রসঙ্গে আরও কয়েকখানি অনুবাদ পুস্তকের উল্লেখ করি ব্রহ্মবৈবর্ত্ত পুরাণের ব্রহ্মখণ্ড (১৮২৫), মার্কণ্ডেয় পুরাণের অন্তর্গত চণ্ডী (১৮২৫), চৌরপঞ্চাশিকা (১৮২৫), চাণক্য শ্লোক (১৮২৫), মোহমুদগর (১৮২৫), দায়ভাগ ইত্যাদি (১৮২৫), মুগ্ধবোধ (১৮২৬), অমরকোষ (১৮৩২)।
এখানে একখানি মাসিকপত্রেরও উল্লেখ করিতেছি। ইহার বিশেষত্ব এই যে শাস্ত্রগ্রন্থাদির অনুবাদই এই পত্রিকায় প্রকাশিত হইত। পত্রিকাখানির নাম শাস্ত্রপ্রকাশ-জুন ১৮৩০ হইতে প্রকাশিত। ইহার সম্পাদক ছিলেন সুপণ্ডিত লক্ষ্মীনারায়ণ ন্যায়ালঙ্কার। ইহাতে কী কী বিষয় স্থান পাইত নিম্নোদ্ধৃত অংশ হইতে তাহা বুঝা যাইবে শাস্ত্রঘটিত বিষয় বাংলা ভাষায় তর্জ্জমা, বেদবেদাঙ্গ পুরাণোপপুরাণাদি শ্লোকের প্রকৃতার্থ ও ফল এবং ব্রতাদি ইতিকর্ত্তব্যতা নানা শাস্ত্র হইতে সংগৃহীত এবং সংক্ষেপে চলিত ভাষায় অনূদিত। বৎসর খানেক চলিবার পর ‘শাস্ত্রপ্রকাশ’ বন্ধ হইয়া যায়। কিন্তু যেমন একটু আগেই দেখিয়াছি, ইহার পূর্বে ও পরে বিচিত্র ধরনের বহু সংস্কৃত গ্রন্থ, মায় শাস্ত্র, মূল সংস্কৃত ও টীকাসহ অনুবাদে অথবা শুধু অনুবাদে প্রকাশিত হইয়া বঙ্গভাষাসাহিত্যকে সমৃদ্ধ করিয়া তোলে।
৬
বিভিন্ন সাংগঠনিক প্রচেষ্টা-ব্যক্তিগত প্রযত্নের কথাও আসিয়া পড়িয়াছে। এখানে স্থূল স্থূল কয়েকটি মাত্র উল্লেখ করিতেছি। নীতিকথা প্রসঙ্গে রামকমল সেনের উল্লেখ আমরা পাইয়াছি। তিনি ১৮১৯ খ্রিস্টাব্দে এক নূতন ধরনের পুস্তক লিখিয়া প্রকাশ করিলেন ঔষধসার সংগ্রহ নামে। এখানি কিন্তু ইংরেজি ফার্মাকোপিয়ারই আংশিক অনুবাদ। এই রকম আর একখানি বইয়েরও উল্লেখ করি। এখানির নাম চিকিৎসা গ্রস্থ। রবার্ট ডগলাস ইংরেজি সমেত বাংলা তর্জমা ১৮২১ সনে প্রকাশ করেন।
রামকমল সেনের প্রধান সাহিত্যিক কীর্তি কিন্তু তৎকৃত ইংরেজি-বাংলা অভিধান। তিনি জনসনের বিরাট ইংরেজি অভিধান হইতে ইংরেজি ও বাংলা প্রতিশব্দ প্রকাশের পরিকল্পনা করেন। উইলিয়াম কেরীর পুত্র ফেলিকস কেরী ও রামকমল একযোগে পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করিতে প্রবৃত্ত হন এবং খণ্ডাকারে প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। ইহার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয় ১৮২১ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু পর বৎসর ফেলিকসের মৃত্যু হওয়ায় এই কার্যে বিশেষ ব্যাঘাত ঘটিল। অভিধান প্রকাশ বন্ধ করিয়া দিতে হয়। কিন্তু রামকমল নিরস্ত হইবার পাত্র নন। পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত সাঙ্গ করিয়া তিনি এখানি ছাপাইতে আরম্ভ করিলেন। দেখি ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে এই বিরাট অভিধানখানি সমগ্রটাই দুইখণ্ডে রামকমল প্রকাশিত করিয়াছিলেন। ইহাতে তিনি একটি দীর্ঘ ভূমিকা জুড়িয়া দেন। বাংলা সাহিত্যের প্রথম দিককার ইতিহাসের পক্ষে ইহা একটি দিগদর্শনস্বরূপ। সাহিত্য গবেষকগণ এই ভূমিকা হইতে বিস্তর মালমশলা পাইতে পারেন।
অপর দুইখানি প্রামাণিক অভিধানের প্রসঙ্গও এখনে করি। এই ১৮৩৪ সনেই সংস্কৃত-বাংলা-ইংরেজি শব্দ-সমন্বিত একখানি অভিধান লন্ডন হইতে প্রকাশিত হয়। ইহার সংকলয়িতা সার গ্রেবস হোটন (Haughton)। অপর আভিধানখানি পণ্ডিত জয়গোপাল তর্কালঙ্কার-কৃত ফার্সি-বাংলা প্রতিশব্দ ইহাতে প্রদত্ত হয়। এই অভিধান প্রসঙ্গে ওই সময়কার কথা একটু বলি। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ১৮৩৮ সনে স্থির করেন যে আদালতে ফার্সির পরিবর্তে সব কাজকর্ম বাংলায় নির্বাহ হইবে। কিন্তু ফার্সি শব্দের সাধু বাংলা খুব কম লোকেরই জানা। একারণ এ অভাব পূরণের নিমিত্ত জয়গোপাল অভিধান প্রকাশে মনস্থ করিয়াছিলেন।
৭
এখন আমরা ফেলিকস কেরীর প্রযত্নের কথা অলোচনা করিব। স্কুল বুক সোসাইটির পক্ষে তিনি ইল্যান্ডের ইতিহাস অনুবাদ করেন তাহা আগেই বলিয়াছি। তাঁহার বড় কাজটির কথা বলিবার পূর্বে অন্য কোনও কোনও অনুবাদের কার্য বলিয়া লই। দিগদর্শনের কথা আগেই বলিয়াছি। মিলের বিখ্যাত ব্রিটিশ ভারতের ইতিহাস বইয়েরও তিনি অনুবাদ করিতে আরম্ভ করেন; অকালে মৃত্যু হওয়ায় তিনি ইহা শেষ করিয়া যাইতে পারেন নাই! তাঁর আর একখানি পুস্তক বানিয়ানের Pilgrm’s Progress-এর বঙ্গানুবাদ-যাত্রীদের অগ্রসরণ বিবরণ নামে দুই খণ্ডে এই অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত হয় ১৮২১ ও ১৮২২ সনে।
এখন ফেলিকসের বড় কাজটির কথা বলি। তাঁহার জীবন ছিল বৈচিত্র্যময়, দুঃসাহসিক অ্যাডভেঞ্চার পূর্ণ। ইহাকেও আমিএই পর্যায়ে ফেলতে পারি। ফেলিকস এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা পঞ্চম সংস্করণ হইতে অনুবাদে লাগিয়া গেলেন। এই কাজে তিনি কোনও কোনও পণ্ডিতের যে সাহায্য গ্রহণ করেন তাহা বলাই বহুল্য। প্রারম্ভিক প্রস্তুতির পর ফেলিকস ছাপা কার্যে অগ্রসর হন। প্রথম শব্দ Anatomy বা ব্যবচ্ছেদবিদ্যা দিয়া অনুবাদ শুরু করেন। কিন্তু আশ্চর্য এই যে, একটিমাত্র বিষয়ের অনুবাদ ১৪টি খণ্ডে প্রকাশ করিতে হয়। প্রথম খণ্ড বাহির হয় ১ অক্টোবর ১৮১৯ এবং শেষ খণ্ড ১ নভেম্বর ১৮২০। সম্পূর্ণ গ্রন্থ ৬৩৮ পৃষ্ঠায় সমাপ্ত হয়। ইহার মধ্যে বিস্তর ছবি এবং শেষ প্রায় ৪০ পৃষ্ঠা পরিমিত ‘ব্যবচ্ছেদবিদ্যা অভিধান’ নামে পরিভাষা সন্নিবেশিত করেন। ফেলিকস কেরী পণ্ডিতদের সহায়তায় সংস্কৃত এবং স্থানীয় ভাষ্য হইতে এই মূল্যবান পরিভাষাটি সংকলন করেন। পরবর্তীকালে এবিষয়ক গ্রন্থাদির পক্ষে এই পরিভাষাটি খুবই উপকারে আসে। আজিকার দিনেও অনুবাদ কালে ইহা হইতে পরিভাষাটি খুবই উপকারে আসে। আজিকার দিনেও অনুবাদকালে ইহা হইতে যে আমরা নানা শব্দসম্ভার গ্রহণ করিতে পারি তাহা সুধীজন অবশ্যই স্বীকার করিবেন। এই বিরাট অনুবাদ ব্যাপারের পরিকল্পনাকালে বইয়ের নাম দেওয়া হয় বিদ্যাহারাবলী। ফেলিকস নিজে চিকিৎসাবিদ্যা বেশ আয়ত্ত করিয়াছিলেন। কলিকাতার হাসপাতালসমূহে ঘুরিয়া ঘুরিয়া শল্য চিকিৎসা সম্বন্ধেও অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। উক্ত Anatomy শব্দটি লইয়া অনুবাদ আরম্ভ করার মধ্যে তাঁহার এই বিষয়ে মানসিক প্রবণতাও লক্ষণীয়। ফেলিকস কেরী দ্বিতীয় বিষয়টি বাছিয়া লন Jurisprudence। ইহার নাম দেন তিনি স্মৃতিশাস্ত্র-মাত্র দুই খণ্ড ১৮২১ সনে বাহির হইয়াছিল। ফেলিকসের মৃত্যুর (১০ নভেম্বর ১৮২২) পরেই এই বিরাট হিতকর প্রচেষ্টাটির অবলুপ্তি ঘটে।
আর একটি বিষয়েও ফেলিকসের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য। তিনি শ্রীরামপুর কলেজের অধ্যাপক জন ম্যাকৃ-কৃত ইংরেজি রসায়ন পুস্তকের বঙ্গানুবাদ করেন ১৮২২ সনে। বইখানির নাম শ্রীরামপুর কলেজের কারণ রসায়ন বিদ্যা। ম্যাক এই কলেজেই শুধু রসায়নশাস্ত্র পড়াইতেন না, দেখা যায় তিনি এশিয়াটিক সোসাইটিতেও রসায়ন সম্বন্ধে একপ্রস্থ বক্তৃতা দিয়াছিলেন। সজনীকান্ত দাস বলেন ফেলিকসের এই অনুবাদ বইখানি ম্যাকের পরবর্তী রসায়ন গ্রন্থের মধ্যে হয়তো আত্মগোপন করিয়া আছে। এই গ্রন্থখানি কিমিয়াবিদ্যার সার নামে ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ইংরেজি বাংলা দুইটি অংশই ইহাতে সংযোজিত হইয়াছে। ইংরেজি ভূমিকাটি আজিকার দিনেও বিশেষ মূল্যবান। ম্যাক এই ভূমিকায় রসায়নের পরিভাষঅ সম্বন্ধে সুচিন্তিত আলোচনা করিয়াছেন।
যাহা হোক ফেলিকস কেরীর পরেই উল্লেখযোগ্য জন ক্লার্ক মার্সম্যানের প্রযত্ন। দিগদর্শন, সমাচার দর্পণ, এবং Friend of India-র সম্পাদক রূপে তিনি সুধী-সমাজে বিশেষ পরিচিত হইয়া ওঠেন। ফেলিকসের মতে বাংলা ভাষাসাহিত্যেও তাঁহার দখল ছিল সুগভীর। এই মার্সম্যান সম্বন্ধে ইতিপূর্বে কিছু কিছু বলিয়াছি। এখানে একটি বিষয়ের দিকে আপনাদের দৃষ্টি বিশেষভাবে আকর্ষণ করিতে চাই। মার্সম্যানের পূর্বে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ উইলিয়ম কেরিকে ১৮২৪ সনে বাংলা অনুবাদক পদে নিযুক্ত করেন। ১৮৩০ সন পর্যন্ত তিনি এই পদে অধিষ্ঠিত থাকিয়া সরকারি আইনকানুন ও বিধিব্যবস্থার নিয়মিত বাংলা অনুবাদ করিয়া দিতেন। ১৮২২ সনের বাজেয়াপ্তি আইন এবং ১৮২৯ সনের সতীদাহ নিবারক আইনের তৎকৃত অনুবাদ উল্লেখযোগ্য বলিয়া কেহ কেহ মনে করেন। কেরির পরে মার্সম্যান এই অনুবাদকের পদে নিযুক্ত হইলেন।
মাতৃভাষা ইংরেজি হইলেও বঙ্গদেশে আশৈশব অবস্থান করায় মার্সম্যান বাংলাকে অতি সহজেই দ্বিতীয় মাতৃভাষা রূপে আয়ত্ত করিতে সমর্থ হইয়াছিলেন। এ বিষেয়ে তিনি ছিলেন সত্যসত্যই ফেলিক্স কেরির দোসর। মার্সম্যান সব্যসাচী। ইংরেজি ও বাংলায় তিনি বিস্তর বই লেখেন। ইহার মধ্যে প্রাচীন ও সমসাময়িক ইতিহাস, রাজনীতি, রাষ্ট্র ও প্রশাসনব্যবস্থা, সরকারি আইনকানুন, কৃষিবিজ্ঞান প্রভৃতি নানাবিষয়ক পুস্তক রহিয়াছে। এখানো অনুবাদসাহিত্যের কথাই বলা হইতেছে, একারণ আমার আলোচনা স্বভাবতই সীমিত। মার্সম্যানের দুই ধরনের অনুবাদগ্রন্থ সম্বন্ধে আমি এখানে কিছু উল্লেখ করিব।
প্রথমেই মার্সম্যান-কৃত অনুবাদপুস্তক ক্ষেত্র বাগান বিবরণ-এর কথা সংক্ষেপে বলিতেছি। কলিকাতাস্থ এগ্রিকালচারাল এন্ড হরটিকালচারাল সোসাইটি, সংক্ষেপে কৃষিসমাজ, ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষিব্যবস্থা এবং কৃষিজাত দ্রব্যাদির তথ্যনির্ভর বিবিরণ সংগ্রহ করিয়া নিজ জার্নালে এবং ট্রানজ্যাকশন্সে প্রকাশিত করিতেন। সে যুগের বহু খ্যাতনামা ইউরোপীয় ও ভারতীয় মনীষী ইহাতে স্বীয় অভিজ্ঞতাপ্রসূত প্রবন্ধাদি পরিবেশন করিতেন, অবশ্য ইংরেজিতে। বাঙালিদের মধ্যে রাধাকান্ত দেব এবং রামকমল সেনের নাম স্বতঃই মনে উদিত হয়। কৃষিসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮২০ সনে। দশ বৎসরের মধ্যে বহু কৃষিবিষয়ক রচনা এই দুইখানিতে প্রকাশিত হইল। সমাজকর্তৃপক্ষ এই সকল হইতে বাছুনি করিয়া আবশ্যক লেখাগুলির অনুবাদ প্রকাশে মনস্থ করেন এবং সুবিজ্ঞ সব্যসাচী জন ক্লার্ক মার্সম্যানের উপর এই ভার দেন। মার্সম্যান বিস্তর পরিশ্রম স্বীকার করিয়া ক্ষেত্র বাগান বিবরণ নামে প্রথম খণ্ড মুদ্রাঙ্কিত করেন ১৮৩১ খ্রিস্টাব্দে। এই পুস্তকের দ্বিতীয় খণ্ড বাহির হয় ১৮৩৬ সনে। দুই খণ্ডের মোট পৃষ্ঠাসংখ্যা ৭৩০। ভারতবর্ষে জাত ইক্ষু, এরারুট, কফি, চা, তামাক, তুলা, ধান্য, পিচ, গুটিপোকা প্রভৃতি সম্বন্ধে বিস্তর আলোচনা এই গ্রন্থে আছে। আমি কার্যবিবরণে দেখিয়াছি বিদেশ হইতে মাঝে মাঝে বহু উন্নত ধরনের শস্য ও সবজির বীজ, যেমন আলু, তামাক প্রভৃতি তখন আনা হইতেছিল। সাম্প্রতিক কালে কৃষির উপরে কর্তাব্যক্তিদের নজর পড়িয়াছে। এই সকল তথ্যনির্ভর পুস্তকের বহুল প্রচার বাঞ্ছনীয়।
মার্সম্যানের দ্বিতীয় বড়ো রকমের অনুবাদকার্যটি সম্বন্ধে এখন আপনাদের কিছু বলি। কেরির পর মার্সম্যান সরকার কর্তৃক অনুবাদকের কর্মে নিযুক্ত হন বলিয়াছি। তিনি সরকারি আইনকানুন বিধিব্যবস্থা প্রশাসনিক আচরণপদ্ধতি প্রভৃতি সম্বন্ধে অনেকগুলি ইংরেজি বই সংকলন করেন। আমি এখানে অনুবাদগ্রন্ধের কথাই বলিতেছি। এই শ্রেণীর তৎকৃত প্রথম অনুবাদ পুস্তক হইল দেওয়ানী আইনের সংগ্রহ। অর্থাৎ এখানিতে ১৭৯৩ হইতে ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আইন ও আইনের অর্থ, সার্কুলার, অর্ডার প্রভৃতি প্রদত্ত হয়। এই বই ছাপা হইয়া বাহির হয় ১৮৪৩ সনে। আইন সম্বন্ধীয় আর একখানি বইও বিশেষ উল্লেখযোগ্য। মার্সম্যান তদীয় Dictionary of Law Terms গ্রন্থখানির বঙ্গানুবাদ ব্যবস্থা বিধান ১৮৫১ সনে প্রকাশিত করেন। সে যুগের সরকারি আইনকানুন ও বিধিব্যবস্থা-সম্বলিত আদেশপত্রাদি বাংলায় হামেশা অনূদিত হইত। এখনও প্রাচীনেরা বাংলা উকিল ও বাংলা মোক্তারের কথা স্মরণ করিতে পারেন। তখনকার দিনে Middle Vernacular বা ছাত্রবৃত্তি পরীক্ষোত্তীর্ণ ব্যক্তিগণ বাংলা ভাষায় অনূদিত আইনকানুন বিধিব্যবস্থা পড়িয়া এ শাস্ত্রে পারঙ্গম হইতেন। পরবর্তীকালে এ রীতি বর্জিত হইয়াছে। নূতন পরিবেশে আইনকানুনের আঞ্চলিক ভাষায় অনুবাদ অনেকের দুশ্চিন্তার কারণ হইয়া উঠিতেছে। তাহাদিগকে গতযুগের এইসব প্রযত্নাদি অনুধাবন করিতে বলি। ওই সকল পুস্তকও আমাদের দিগদর্শন হইবে। সাময়িক পত্রপত্রিকার দ্বারা অনুবাদসাহিত্য কিরূপ পুষ্টিলাভ করে এখন সে সম্বন্ধে কিছু বলিয়া লই।
৮
পশ্বাবলী-র কথা আপনাদের বলিয়াছি। এখানি ছিল বড়ো সুন্দর ছোট্ট কিশোরপত্রিকা। কিন্তু এখন বড়োদের কাগজ সম্বন্ধে কিছু বলিব। ১০ মে ১৮২৯ দিবসে ইংরেজি সাপ্তাহিক ‘বেঙ্গল হেরাল্ড’ আত্মপ্রকাশ করে। ইহার দেশীয় ভাষায় চারিপ্রকার সংস্করণ বাহির হয়। বাংলা সংস্করণের নাম ‘বঙ্গদূত’। হুবহু অনুবাদ না হইলেও হেরাল্ডে প্রকাশিত প্রধান প্রধান বিষয়গুলির বাংলা তর্জমা বঙ্গদূতে বাহির হইত। এই ধরনের আর একখানি পত্রিকার নাম সমাচার দর্পণ। বহু বৎসর পূর্বে সাপ্তাহিক রূপে প্রকাশিত হইলেও এই বৎসর ১১ জুলাই হইতে এখানি ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষিক পত্রিকারপে প্রকাশিত হইতে থাকে। ইংরেজির অনুবাদ বাংলা, কী বাংলার অনুবাদ ইংরেজি তাহা জোর করিয়া বলিতে পারি না। কিন্তু এই সময়কার এবং পূর্বেকার ভাষা নিরীক্ষণ করিলে দেখা যাইবে দ্বিভাষী পত্রিকার সময় হইতে বাংলা অংশ বেশ গতিশীল হইয়া উঠিয়াছে। সংবাদপত্রে বিবিধ বিষয় পরিবেশিত হইয়া থাকে, একারণ বাংলাভাষার প্রকাশক্ষমতা অতি দ্রুত বাড়িয়া চলিল। এই শ্রেণীর তৃতীয় সাপ্তাহিক হইল রিফর্মার-১৮৩১ সনে প্রকাশিত। প্রসন্নকুমার ঠাকুর এই পত্রিকার পরিচালক ও সম্পাদক ছিলেন। কাগজখানির বাংলা অনুবাদ বাহির হয় ১৮৩১ সনের অগস্ট মাসে অনুবাদিকা নামে। বৎসর খানেক পরে এখানি বন্ধ হইয়া যায়। সুপ্রসিদ্ধ রসিককৃষ্ণ মল্লিক ও দক্ষিণারঞ্জন মুখোপাধ্যায় ‘জ্ঞানান্বেষণ’ নামে প্রথমে শুধু বাংলা এবং পরে ইংরেজি-বাংলা দ্বিভাষী সাপ্তাহিকরূপে প্রকাশ করিয়া সম্পাদনা করিতে থাকেন। এই প্রসঙ্গে পরবর্তী দশকের প্রথম দিকে প্রকাশিত আর একখানি সাপ্তাহিকের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করিতে হয়। জন ক্লার্ক মার্সম্যান দীর্ঘকাল পরিচালনা ও সম্পাদনা করার পর ১৮৪০ খ্রিস্টাব্দের মাঝামাঝি সমাচার দর্পণ প্রকাশ বন্ধ করিয়া দেন। তিনি পরে ৪ জুলাই ১৮৪০ সনে বাংলা গভর্নমেন্ট গেজেটের সম্পাদক পদে বৃত হইলেন। এখানিতে সরকারি আইনকানুনের বঙ্গানুবাদ নিয়মিতরূপে স্থান পাইত। ১৮৫২ সনের শেষাশেষি মার্সম্যান বিলাতে চলিয়া গেলে তাঁহার স্থলে পাদ্রি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এখানি সম্পাদনা করিতে আরম্ভ করিলেন। সরকারি আইনকানুনের বঙ্গানুবাদ এইরূপে রীতিমতোভাবে প্রচারের সুবিধা হইয়াছিল।
সংবাদধর্মী না হইলেও আর একখানি মাসিকপত্রের কথা এখানে বলা আবশ্যক। ১৮৩২ সনের এপ্রিল মাসে বিজ্ঞান সেবধি নামে একখানি বিজ্ঞানবিষয়ক মাসিক পত্রিকা বাহির হয়। এখানি ছিল পুরাপুরি অনুবাদ-পত্রিকা। প্রকাশ করেন সোসাইটি ফর ট্রানশ্লেটিং ইউরোপীয়ান সায়েন্সেস। প্রতিষ্ঠানটির নাম হইতে বুঝা যাইতেছে পাশ্চাত্য বিজ্ঞানের কথা অনুবাদের মাধ্যমে প্রচারের নিমিত্তই ইহার আবির্ভাব। লর্ড ব্রাউহামের বিজ্ঞানবিষয়ক গ্রন্থের ধারাবাহিক বঙ্গানুবাদ ইহাতে প্রকাশিত হয়। এই পত্রিকার অন্যতর সম্পাদক ছিলেন সুবিখ্যাত কবি ও সাংবাদিক কাশীপ্রসাদ ঘোষ। এখানিও কিন্তু দ্বাদশ সংখ্যা পর্যন্ত মাত্র বাহির হইয়াছিল।
এখানে আর একখানি দ্বিভাষী পত্রিকার উল্লেখ করি। নাম-বেঙ্গল স্পেক্টেটর। নব্যবঙ্গের নেতা রামগোপাল ঘোষের অর্থানুকুল্যে ও উপদেশে এখানি ১৮৪২ সনের এপ্রিল মাসে প্রথমে মাসিক, মধ্যে পাক্ষিক এবং শেষে সাপ্তাহিক রূপে বাহির হয়। ওই যুগের প্রসিদ্ধ লেখক তারাচাঁদ চক্রবর্তী, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং পাদ্রি কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় রীতিমতো রচনা পরিবেশন করিতেন। আমাদের বিবিধ জাতীয় সমস্যা লইয়া নূতন ভাবাদর্শে এই পত্রিকাখানির আবির্ভাব। বাংলা অনুবাদসাহিত্য এইরূপে বিবিধ আলোচনায় মুখর হইয়া উঠিল।
৯
জন ক্লার্ক মার্সম্যান প্রসঙ্গে এখানে আরও কিছু বলা যাক। তাঁহার বাংলা ও ইংরেজি বঙ্গদেশ এবং ভারতবর্ষের ইতিহাস ওই সময়ে খুবই প্রামাণিক বলিয়া বিবেচিত হইতে থাকে। বাংলা ইতিহাসের প্রথম অংশ গোবিন্দচন্দ্র সেন অনুবাদ করিয়া ১৮৪০ সনে বাঙ্গালার ইতিহাস (১২০৩-১৮৩৫) প্রকাশিত করেন। এই পুস্তকের দ্বিতীয় ভাগ নামে আর একখানি অনুবাদগ্রন্ধ পরে প্রকাশিত হয়; এ সম্বন্ধে যথাস্থানে বলা যাইবে। মার্সম্যানের ভারতবর্ষের ইতিহাস গ্রন্থের অনুবাদ করেন গোপাললাল মিত্র। ইহা গ্রন্থকারে প্রকাশিত হয় ১৮৪০ সনে মার্সম্যান-কৃত ইংরেজি গ্রন্থ অবলম্বনে বঙ্গদেশের পুরাবৃত্ত প্রকাশ করেন।
এই চল্লিশের দশকের প্রথম হইতেই আমরা এক নূতন যুগের সম্মুখীন হই। ইহার সূচনা কিন্তু কয়েক বৎসর পূর্বেই লক্ষ করা যায়। শিক্ষা ও সাহিত্যের আলোচনার জন্য এ বিষয়টি একটু পরিষ্কার করিয়া বলা যাক।
সরকারি স্কুলকলেজে শিক্ষার বাহন ইংরেজি স্থির হয় পূর্ব দশকের মাঝামাঝি সময় হইতে। ইংরেজি শিখিলে চাকরি মিলিবে এই ধারণা সাধারণের মধ্যে বলবৎ হইতে থাকে। কলিকাতায় ও মফস্বলে ইংরেজি স্কুল খোলার ধুম পড়িয়া গেল। ফলে বাংলা শিক্ষা এবং ইহার অনুষঙ্গরূপে বাংলা সাহিত্যেরও অপহ্নব ঘটিবার আশঙ্কা হয়। সমাজের চিন্তাশীল নেতৃবর্গ এইরূপ পরিণতির কথা ভাবিয়া হিন্দু কলেজের সঙ্গে ১৮৪০ সনে ১৮ জানুয়ারি ‘হিন্দু কলেজ পাঠশালা’ বা ‘বাংলা পাঠশালা’ নামে এমন একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন যেখানে সর্বস্তরে সকল বিষয় বাংলা ভাষার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়া যাইতে পারে। এই পাঠশালার আদর্শে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর আর একটি বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন ‘তত্ববোধিনী পাঠশালা’ নামে-ওই সনেরই জুন মাসে। সত্বর কলিকাতার সন্নিকটে এবং দূরে শাখা পাঠশালাও স্থাপিত হইল। নেতৃবর্গ শুধু পাঠশালা স্থাপন করিয়াই নিরস্ত হন নাই। নূতন যুগের উপযোগী পাঠ্য বই রচনা ও প্রকাশে মন দিলেন। ইতিহাস, ভূগোল, ব্যাকরণ, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয়ের বই বাংলায় সংকলিত ও প্রকাশিত হইতে শুরু হয়। এইখানেই বাধিল গণ্ডগোল। দেখি রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, অক্ষয়কুমার দত্ত, বাংলা পাঠশালার প্রধান শিক্ষক প্রমুখ অনেকে বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যপুস্তক রচনায় হাত দিয়াছেন। দেবেন্দ্রনাথ সংকলন করিলেন একখানি সংস্কৃত-বাংলা ব্যাকরণ।
কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি নূতন যুগের সঙ্গে তাল রাখিয়া চলিতে পারে না, অথচ দেশীয় সাহিত্যিক মনীষীদের লেখা পাঠ্য বইও সরকারি কর্তৃপক্ষের পছন্দ নয়। কী করা যাইবে? তাঁহারা শিক্ষাবিদ ও সুসাহিত্যিক উইনিযম ইয়েটসের মত লইয়া একটি অভিনব উপায় বাহির করিলেন। স্থির হইল সব বিষয়েরই পাঠ্য বই প্রথমে ইংরেজিতে লেখা হইবে এবং পরে উহার বাংলা অনুবাদ বা তর্জমা করিয়া প্রকাশিত করা যাইবে। কর্তৃপক্ষ আদেশ দিলেন যাবতীয় সরকারি স্কুলকলেজে এই ধরনের বই চালু করা হইবে। ইংরেজি বই সব ক্ষেত্রে অত তাড়াতাড়ি লেখা সম্ভব নয়। একারণ স্থির হইল লণ্ডনস্থ ‘চেম্বার্স এডুকেশানাল কোর্স’-এর অন্তর্গত কিশোরপাঠ্য বইগুলি এদেশে আনাইয়া বাংলা ও অন্যান্য দেশীয় ভাষায় অনুবাদ করাইতে হইবে। কিন্তু ইহাও দেখা গেল বেশ সময়সাপেক্ষ। তাই দেখি তাঁহারা ড. গ্রাণ্টকে ভার্নাকুলার ক্লাস বুক ইংরেজি হইতে সংকলনের ভার দেন। প্রথম সংকলন-বই হইতে সার সংগ্রহ নামে অনুবাদ পুস্তক লেখেন উইলিয়ম ইয়েটস (১৮৪৪)।
এ পরিকল্পনাও বিশেষ কার্যকর হয় নাই। কলিকাতা স্কুল বুক সোসাইটি চতুর্দশ রিপোর্টে (১৮৪০-৪৪) এই ব্যবস্থাকে নিতান্তই অবাস্তব বলিয়া উল্লেখ করেন। এবং দেখাও যায় ইহা সত্বর কার্যে পরিণত করার পক্ষে বিষম বাধা। এই সময়, অর্থাৎ ১৮৪৫ সন নাগাদ কর্তৃপক্ষ বঙ্গ প্রদেশে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাদানের নিমিত্ত মফস্বলের বিভিন্ন স্থলে ১০১ টি আদর্শ বঙ্গ বিদ্যালয় স্থাপনেও প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন। বৎসর দুয়েকের মধ্যে এই সংখ্যক বিদ্যালয় স্থাপিতও হইল। কিন্তু পাঠ্য বই কোথায় মিলিবে? স্কুল বুক সোসাইটি পুনরায় আসিয়া আসর জমাইলেন।
কিন্তু উক্ত ব্যবস্থা যে একেবারে কার্যকর হয় নাই তাহা বলা যায় না। বরং এই ব্যবস্থার দরুন একটি বিষয়ে আমরা খুবই লাভবান হইয়াছি। প্রামাণিক গ্রন্থাদি হইতে বিবিধ বিদ্যার লেখা সংকলন করিয়া তাহার বাংলা অনুবাদ প্রকাশ করানো উক্ত সরকারি পরিকল্পনার উদ্দেশ ছিল। নব্যবঙ্গের অন্যতম নেতা কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায় এই ব্যবস্থার পূর্ণ সুযোগ লইলেন। বিভিন্ন বিষয়ে বঙ্গসন্তানদের যথাযথ ও যথার্থ জ্ঞান বিতরণ তাঁহার বহুদিনের অভিপ্রায়। তিনি এই সুযোগ গ্রহণ করিয়া ‘বিদ্যাকল্পদ্রুম’ বা ইংরেজি এনসাইক্লোপীডিয়া বেঙ্গলেনসিস প্রণয়নে উদ্যোগী হইলেন ১৮৬৪ খ্রিস্টাব্দে। সরকার তাঁহার প্রস্তাবের সারবত্তা বুঝিয়া তাঁহাকে এই ধরনের গ্রন্থ প্রকাশের জন্য অর্থসাহায্য করিতেও অগ্রণী হন। নাম হইতেই বুঝা যায় এখানি বিলিতি কোষগ্রন্থেরই অনুসারী। পূর্ব যুগে ফেলিক্স কেরি কোষগ্রন্থ সংকলনের কার্যে হাত দিয়াছিলেন। কিন্তু তাহা তখন বেশিদূর অগ্রসর হইতে পারে নাই। এবারে কিন্তু এই প্রযত্ন অনেকটা সাফল্যমণ্ডিত হয়। ১৮৪৬ সন হইতে ১৮৫১ সনের মধ্যে বিদ্যাকল্পদ্রুম ১৩টি খণ্ডে বাহির হইয়াছিল। এই খণ্ডগুলিতে ইতিহাস, পুরাবৃত্ত, ভূগোল, বৃত্তান্ত, জীবনী, ক্ষেত্রতত্ব, বিবিধ পাঠ প্রভৃতি নানা বিষয় ইংরেজি হইতে কৃষ্ণমোহন সংকলন করেন এবং ইংরেজির পাশাপাশি তাহার বঙ্গানুবাদও প্রদত্ত হয়। একারণ কর্তৃপক্ষের সন্দেহ করিবারও কোনও কারণ ঘটে নাই। বাঙালিদের মধ্যে সাধারণ জ্ঞান বিস্তারকল্পে এই কোষগ্রন্থখানি যে সার্থকতা লাভ করে তাহা বিশেষ করিয়া বলার দরকার নাই। এই গ্রন্থের ইংরেজি বাদে সম্পূর্ণ বাংলা সংস্করণও বাহির হইয়াছিল বলিয়া শুনিয়াছি। শুধু বাংলা সংস্করণ দেখার সুবিধা বা সৌভাগ্য আমার হয় নাই।
এই দশকের প্রারম্ভে বঙ্গ মনীষীগণ জাতীয় আদর্শে উদ্বুদ্ধ হইয়া যে এক নূতন ধরনের সময়োপযোগী পাঠ্য বই রচনায় ও প্রকাশে যত্নপর হইয়াছিলেন তাহা তখন পূর্বোল্লিখিত কারণে সাফল্য লাভ করিতে পারে নাই। কিন্তু একটি নূতন ধরনের প্রচেষ্টার সূত্রপাত করিলেন তাঁহারা। এই কথাই এখন বলি।
১০
অনুবাদসাহিত্যে সাময়িকপত্রের দান ও কৃতিত্বের কথা আগেই উল্লেখ করিয়াছি। চল্লিশের দশকে এমন একখানি পত্রিকা নূতন ভাবাদর্শ লইয়া প্রকাশিত হইল যাহাতে সাধারণভাবে বাংলা সাহিত্য এবং বিশেষভাবে অনুবাদসাহিত্য সবিশেষ প্রেরণা লাভ করে। আমি এখানে সেকালের সুপ্রসিদ্ধ তত্ববোধিনী পত্রিকা-র কথা উল্লেখ করিতেছি। এ পত্রিকাখানি কলিকাতা ব্রাহ্মসমাজের পাক্ষিক মুখপত্ররূপে ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দের ১৬ অগস্ট আত্মপ্রকাশ করে (১৭৬৫ শকাব্দ, ১ ভাদ্র) পত্রিকাখানির পরিচালক ব্রাহ্মসমাজের কর্ণধার দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং সম্পাদক স্বনামধন্য অক্ষয়কুমার দত্ত। দেবেন্দ্রনাথ এই পত্রিকা সম্বন্ধে আত্মজীবনীতে অনেক কথা বলিয়াছেন। এই পত্রিকাখানি আবার প্রতিষ্ঠাবধি দেবেন্দ্রনাথের তত্ববোধিনী সভার মুখপত্র হইল। ব্রাহ্মসমাজের উপদেশ, ব্যাখ্যান প্রভৃতি বাদে যাবতীয় মানবিক বিদ্যার কথা ইহাতে রীতিমতো আলোচনা হইতে লাগিল। সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যের অনুবাদও বাহির হইতে দেখি। প্রথমাবধি দেখি উপনিষদ গ্রন্থসমূহের রামমোহন-কৃত বঙ্গানুবাদ ‘চূর্ণক’ নামে পুনর্মুদ্রিত হয়। এগুলি তখন দুষ্প্রাপ্য হওয়ার দরুনই ওই ব্যবস্থা। সম্পাদক অক্ষয়কুমার প্রামাণিক ইংরেজি গ্রন্থাদি হইতে ধারাবাহিকরূপে অনুবাদ প্রকাশ করিতে শুরু করিলেন। জর্জ কম্ব প্রণীত Constitution of Man নামক তৎকালীন প্রসিদ্ধ পুস্তকের অনুবাদ তিনি আরম্ভ করিলেন। ইহার নাম দেন বাহ্যবস্তুর সহিত মানবপ্রকৃতির সম্বন্ধ বিচার। পূর্ব পূর্ব দশকে ‘স্কুল বুক সোসাইটি’-র আনুকূল্যে এবং কখনও ব্যক্তিগতভাবে বিবিধ বিদ্যার বিস্তর বইয়ের বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হইয়াছিল। কিন্তু এ সবের বেশির ভাগই ছিল আক্ষরিক অনুবাদ এবং কিশোরপাঠ্যরূপে লিখিত হইলেও অনেক সময় দুর্বোধ্য হইত। অক্ষয়কুমার প্রমুখ সাহিত্যিকগণ অনুবাদের একটি নূতন পন্থা অবলম্বন করিলেন। তাঁহারা মূল ভাব রক্ষা করিয়া অনুবাদকালে কতকটা দেশকালোপযোগী পরিবর্তন করাও যুক্তিযুক্ত মনে করেন। কারণ এরূপ করিলে তারা সহজেই সাধারণগ্রাহ্য হইতে পারে। অক্ষয়কুমার লিখিয়াছেন অনুবাদকালে বইখানিতে যেসব বিলিতি দৃষ্টান্ত দেওয়া হয় তিনি তাহার পরিবর্তে স্বদেশীয় দৃষ্টান্ত দিয়াছেন-বিষয়টির তাৎপর্য সাধারণের নিকট সহজবোধ্য করিবার উদ্দেশ্যে। এই বিখ্যাত অনুবাদ গ্রন্থ পুস্তকাকারে পূর্ব নামেই দুই খণ্ডে গ্রথিত হয় ১৮৫১ ও ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দে। প্রতিখণ্ডের শেষে অক্ষয়কুমার এক প্রস্থ করিয়া পরিভাষা সংযোজিত করেন। যে সব ইংরেজি শব্দের তিনি বাংলা তর্জমা করিয়াছিলেন তাহা বুঝাইবার জন্য এই তালিকায় বাংলা ও তৎপ্রতিশব্দ ইংরেজি পাশাপাশি দিয়াছেন। পরিভাষার দিক হইতে এই দুইটি তালিকাই বিশেষ মূল্যবান। অক্ষয়কুমার-কৃত চারুপাঠ পঞ্চাশের দশকে পর পর ১৮৫৩, ‘৫৪ ও ‘৫৯ সনে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হইয়াছিল। অক্ষয়কুমার লিখিয়াছেন এখানিও নানা ইংরেজি গ্রন্থ হইতে সংকলনান্তর দেশোপযোগী করিয়া ভাষান্তর করিয়াছেন। বলা বাহুল্য ইহাও পূর্ব দশকে তত্ববোধিনী পত্রিকায় ধারাক্রমে প্রকাশিত হয়। চারুপাঠ ওই যুগে কিশোরপাঠ্য বই রূপে খুবই গ্রাহ্য হয় এবং যথাযথ প্রসিদ্ধি লাভ করে। অক্ষয়কুমারের আর দুইখানি বইয়ের কথাও এখানে প্রসঙ্গত উল্লেখ করি। একখানি হইল ১৮৫৬ সনে প্রকাশিত ধর্ম্মনীতি। ইহার একটি একটি অংশ পূর্বে তত্ববোধিনী পত্রিকায় ক্রমশ প্রকাশিত হইয়াছিল। অক্ষয়কুমারের ভাষায় পূর্বোক্ত গ্রন্থের মতো এখানিও ‘কোনও গ্রন্থের অবিকল অনুবাদ নহে; নানা ইংরেজি গ্রন্থ অবলম্বন করিয়া লিখিত হইয়াছে।’ অক্ষয়কুমারের সুবিখ্যাত ভারতবর্ষীয় উপাসক সম্প্রদায় গ্রন্থখানি দুই খণ্ডে বহু বৎসর পরে প্রকাশিত হয় বটে, কিন্তু উহাও প্রথমে তত্ববোধিনী পত্রিকায়ই ধারাক্রমে বাহির হয়, মুখ্যত হোরেস হেম্যান উইলসনের ইংরেজি রচনার উপর নির্ভর করিলেও এখানি অবিকল অনুবাদ নহে এবং অক্ষয়কুমার গবেষণাপ্রসূত বহু নূতন বিষয় ইহাতে সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন। এই রকমে বিজ্ঞানের নানা জ্ঞাতব্য বিষয়ও তিনি পত্রিকাস্তম্ভে অনুবাদ করিয়া কখনও সচিত্র কখনও অচিত্ররূপে প্রকাশ করিয়াছিলেন।
তত্ববোধিনী পত্রিকার অপরাপর সাহিত্যকৃতির কথাও এখানে বিশেষ করিয়া উল্লেখ করিতে হয়। আজিকার দিনে একথা হয়তো অনেকে জানেন না, যে ঋগ্বেদের প্রামাণিক সংস্করণ প্রকাশে দেবেন্দ্রনাথ একদা বঙ্গীয় এশিয়াটিক সোসাইটিকে সম্মত করাইয়াছিলেন। কিন্তু সোসাইটি যখন জানিলেন যে বিলাতস্থ কোম্পানির কর্তৃপক্ষ সুপণ্ডিত ম্যাক্স মূলারকে দিয়া ইহার একটি প্রামাণিক সংস্করণ প্রকাশে অগ্রণী হইয়াছেন তখন এ কাজ হইতে তাঁহারা নিরস্ত হইলেন। দেবেন্দ্রনাথ কিন্তু ইতিপূর্বেই কাশীধাম হইতে পুঁথি সংগ্রহ করিয়া আনাইয়াছিলেন। এ সমুদয়ের ভিত্তিতে ঋগ্বেদের বাংলা অনুবাদ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন। ১৮৪৮ সনের ১ অগস্ট হইতে মূল সূক্তসহ ঋগ্বেদের বঙ্গানুবাদ শুরু করিয়া দিলেন দেবেন্দ্রনাথ। পুরা বিশ সবসর পর্যন্ত প্রতি সংখ্যায় তাঁহার এই মূলসহ বঙ্গানুবাদ প্রকাশিত হইয়াছিল। ইহা কিন্তু তিনি পুস্তকাকারে গ্রথিত করেন নাই। রমেশচন্দ্র দত্তই সর্বপ্রথম মূলসহ ঋগ্বেদের বঙ্গানুবাদ প্রকশিত করেন বহু বৎসর পরে। শুধু বঙ্গানুবাদও আলাদা গ্রন্থরূপে বাহির হইয়াছিল।
এই প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের কথাও বলা দরকার। তত্ববোধিনী পত্রিকা তথা তত্ববোধিনী সভার সঙ্গে তাঁহার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক স্থাপিত হয়। এখানে পত্রিকার কথা বলার পূর্বে ঈশ্বরচন্দ্রের প্রথম দিককার তিনখানি অনুবাদগ্রন্থ সম্বন্ধে আগে বলি।
১১
তিনখানির মধ্যে প্রথম উল্লেখ করি বেতাল পঞ্চবিংশতি বইখানি। ঈশ্বরচন্দ্র হিন্দি বেতাল পঁচিশী হইতে এই বই অনুবাদ করেন। তিনি তখন ফোর্ট উইলিয়ম কলেজের প্রধান পণ্ডিত পদে নিযুক্ত। তরুণ সিভিলিয়ানদের পাঠ্য হিসাবে ঐ সময় এখানির বেশ কদর হয়। ঈশ্বরচন্দ্রের এই গ্রন্থখানি সম্বন্ধে আমি রাধাকান্ত দেবের চিঠিপত্রের পাণ্ডুলিপি বইগুলির মধ্যে কিছু উল্লেখ দেখি। রাধাকান্ত ইহার ভাষার উৎকর্ষ এবং পারিপাট্যাদি বিষয়ে ইহাতে লিখিয়াছেন। এখানিকে সার্টিফিকেট বা প্রশংসাপত্রও বলিতে পারেন। বাস্তবিকপক্ষে বেতাল পঞ্চবিংশতি হইতেই সাহিত্যসাধনায় ঈশ্বরচন্দ্রের জয়যাত্রা শুরু। বইখানির প্রথম প্রকাশ কাল ১৮৪৭ খ্রিস্টাব্দ।
দ্বিতীয় বইখানি বাঙ্গালার ইতিহাস। ২য় ভাগ ১৮৪৮ সনে প্রকাশিত। জন ক্লার্ক মার্সম্যানের An Outline of the History of Bengal পুস্তকের গোবিন্দচন্দ্র সেন-কৃত অনুবাদের কথা ইতিপূর্বে বলিয়াছি। ঈশ্বরচন্দ্র ওই পুস্তকের শে, ৯ অধ্যায় অবলম্বন করিয়া এই গ্রন্থ লিখিয়াছিলেন। ‘অবলম্বন’ কথাটির একটি তাৎপর্য আছে। গ্রন্থের বিষয়বস্তু নবাব সিরাজউদ্দৌলা অবধি বড়োলাট লর্ড উইলিয়াম বেন্টিক পর্যন্ত। অনুবাদকালে ঈশ্বরচন্দ্র এক অভিনব পন্থা গ্রহণ করেন, এই জন্যই ‘অবলম্বন’ কথাটি প্রয়োগ করিয়াছি। তিনি মার্সম্যান-বর্ণিত কোনও কোনও বিষয় বর্জন করেন এবং অনুসন্ধানপ্রসূত কোনও কোনও নূতন বিষয়ও ইহাতে সংযোগ করেন। বইখানির ভাষা বেশ প্রাঞ্জল। রীতিমতো পাঠ্যপুস্তক না হইলেও সামান্য-শিক্ষিতেরা পর্যন্ত ইহা পাঠে বিশেষ জ্ঞানলাভ করিতে পারিতেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের সেক্রেটারি বা কর্মসচিব মেজর জি. টি. মার্শ্যাল বইখানি পড়িয়া এতই মুগ্ধ হন যে, তিনি ইংরেজি অনুবাদ হুবহু প্রকাশের মনস্থ করিলেন। কিন্তু ইহাতে যে বাধা রহিয়া গিয়াছে, মার্শ্যাল সে বাধাও অতিক্রম করিতে সক্ষম হইলেন। তিনি মূল লেখক মার্সম্যানের অনুমতি লইয়া বাংলা সরকারের অর্থে ১৮৫০ খ্রিস্টাব্দে ইংরেজি অনুবাদগ্রন্থ প্রকাশিত করিলেন। আসলে অনুবাদ হইলেও ঈশ্বরচন্দ্রের গ্রন্থখানি ছিল মৌলিক উপাদানে ঠাসা। মার্শ্যাল ইহার জন্যই ইংরেজি অনুবাদে অতখানি আগ্রহী হইয়াছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্রের এই সময়কার তৃতীয় অনুবাদ বই জীবন চরিত প্রকাশিত হয় ১৮৪৯ সনে। এখানিও বাঙ্গালার ইতিহাসে-র মতো শুধু কিশোরপাঠ্য নহে। ভাষা এত প্রাঞ্জল যে সামান্য-শিক্ষিত ব্যক্তিও পাঠ করিয়া মর্ম গ্রহণ করিতে পারিতেন। জীবন চরিত রবার্ট উইলিয়াম চেম্বার্স প্রণীত Biography গ্রন্থের অনুবাদ। ইউরোপের গ্যালিলিও, নিউটন প্রমুখ কয়েকজন প্রথমশ্রেণীর বিখ্যাত বিজ্ঞানীর জীবন ও কর্ম সম্বন্ধে গ্রন্থখানিতে লেখা হইয়াছে। পুস্তকের শেষে ঈশ্বরচন্দ্র একটি পরিভাষাও জুড়িয়া দেন। স্বরচিত পরিভাষা পুস্তকের সঙ্গে জুড়িয়া দেওয়া এই নূতন নহে। ইতিপূর্বেও যে কোনও কোনও লেখক এইরূপ পরিভাষা নিজ নিজ পুস্তক সন্নিবেশিত করিয়াছিলেন তাহার উল্লেখ আমরা পাইয়াছি। পরিভাষা সংযোজনের উদ্দেশ সম্বন্ধে ঈশ্বরচন্দ্রের কথা এখানে কিঞ্চিৎ উদ্ধৃত করি
ইউরোপীয় পদার্থবিদ্যা ও অন্যান্য বিদ্যা সংক্রান্ত অনেক কথার বাঙ্গালা ভাষায় অসঙ্গতি আছে, ওই অসঙ্গতি পূরণার্থে কোনও কোনও স্থলে দুরূহ সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ ও স্থল বিশেষে তত্তৎ কথার অর্থ ও তাৎপর্য পর্যালোচনা করিয়া তৎপ্রতিরূপ নূতন শব্দ সঙ্কলন করিতে হইয়াছে, পাঠকগণের বোধ সৌকর্যার্থে পুস্তকের শেষে তাহাদের অর্থ ও ব্যুৎপত্তিক্রম প্রদর্শিত হইল।
এখন তত্ববোধিনী পত্রিকা-র কথায় পুনরায় আসা যাক। এই পত্রিকার সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রের যোগাযোগের কথা একটু আগেই বলিযাছি। প্রাচীন ও আধুনিক বিবিধ মানবিক বিদ্যার আলোচনায় পত্রিকাখানির পৃষ্ঠা ছিল ভরপুর। ইহা যে প্রধানত অনুবাদধর্মী তাহাও আমরা জানিতে পারিয়াছি। অক্ষয়কুমার ও দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্রও অনুবাদের মাধ্যমে কোনও কোনও বিষয় ইহাতে পরিবেশন করিতে লাগিয়া যান। তাঁহার মনোগত বাসনা ছিল মহাভারতের একটি প্রামাণিক অনুবাদগ্রন্থ তিনি বাহির করিবেন। এই জন্য তত্ববোধিনী পত্রিকা-র পৃষ্ঠায় ধারাক্রমে মহাভারতের উপক্রমণিকা অংশ কতকটা বাদসাদ দিয়া অনুবাদ করিতে শুরু করেন। এই অংশটি সম্পূর্ণ প্রকাশিতও হইয়াছিল। কালীপ্রসন্ন সিংহ এই অনুবাদ দেখিয়াই মহাভারতের একটি প্রামাণিক অনুবাদ প্রকাশ করিতে অনুপ্রেরণা লাভ করেন। ঈশ্বরচন্দ্র যখন কালীপ্রসন্নের অভিপ্রায়ের কথা জানিতে পারিলেন তখন তিনি মহাভারতের অনুবাদ প্রকাশে নিবৃত্ত হন এবং কালীপ্রসন্নের উপরে এই ভার ছাড়িয়া দেন। তিনি বুঝিয়াছিলেন ধনীর দুলাল কালীপ্রসন্নের পক্ষেই এইরূপ বিরাট অনুবাদগ্রন্থ সুষ্ঠুরূপে প্রকাশিত করা সম্ভব। ঈশ্বরচন্দ্রের আশীর্বাদ লইয়া কালীপ্রসন্ন এই কার্যে প্রবৃত্ত হইলেন। একথা পরে তাঁহার প্রসঙ্গে কিছু বলিতে হইবে।
এখন পরবর্তী পঞ্চাশের দশকে আমরা উপনীত হইতেছি। এই দশক ছিল বাংলায় সুকুমার সাহিত্য এবং মননসাহিত্যের অনুবাদ প্রকাশের এক সুবর্ণযুগ। এ সময় কী ব্যক্তিগত প্রযত্ন, কী সরকারি ও সংবদ্ধ প্রচেষ্টা সবদিকেই এক প্রচণ্ড কর্মচাঞ্চল্য লক্ষ করি। এই সাহিত্যকর্ম-তৎপরতাকে সিপাহি যুদ্ধও ব্যাহত করিতে পারে নাই। বাংলা সাহিত্যের বসন্তকাল যে সমাগত তাহাও বুঝিতে বিলম্ব হইল না। একটু কবিত্ব করিয়া বলিতে পারি এই সময়কার সাহিত্যসেবীগণ কোকিলের ভূমিকা গ্রহণ করিয়াছিলেন। পরবর্তী দশকে মধুসূদন, বঙ্কিমচন্দ্র, হেমচন্দ্র, দীনবন্ধু যে বসন্তের সূচনা করিয়াছিলেন তাহারই আগমনী এই সাহিত্য-তৎপরতার মধ্যে নিবদ্ধ রহিয়াছে। এই বিষয়টির দিকেই আমরা এখন চোখ ফিরাইতেছি।
১২
এখন আমরা পঞ্চাশের দশকে উপনীত হইতেছি। ১৮৫১ হইতে ১৮৬০ এই দশ বৎসর সাহিত্যক্ষেত্রে কী তৎপরতারই না যুগ! একদিকে ব্যক্তিগত প্রযত্ন অন্যদিকে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার দরুন নানা প্রচেষ্টা, আবার সংঘবদ্ধভাবে অনুবাদ বিষয়ে প্রয়াস সব মিলিয়া বাংলা সাহিত্যকে এক শক্ত পাকাপোক্ত ভিত্তির উপরে দাঁড় করাইতে সক্ষম হইতেছিল। সাহিত্যের ভাষা তথা অনুবাদ সাহিত্যের ভাষাও সাবলীল গতিলাভ করিতে থাকে। অনুবাদসাহিত্যের কথা বলিতেছি বলিয়া কেহ যেন মনে না করেন বাংলা মৌলিক পুস্তক আদৌ লিখিত হয় নাই। এই ভ্রান্তির নিরসনের নিমিত্ত এ যুগের মৌলিক সাহিত্যের কথাই কিছু কিছু বলিতে হয়। কবিবর ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্তের কবিতাবলি বাঙালিচিত্তকে বিবিধ রসে পরিস্নাত করে। প্যারীচাঁদ মিত্র প্রথমে মাসিকপত্রিকায় এবং পরে ১৮৫৮ সনে আলালের ঘরের দুলাল নামে প্রসিদ্ধ সামাজিক উপন্যাস প্রকাশিত করিলেন। কালীপ্রসন্ন সিংহের হুতোম প্যাঁচার নকশা যদিও কিঞ্চিৎ পরে প্রকাশিত, তথাপি এখানে রসসাহিত্যের প্রকৃষ্ট নিদর্শনস্বরূপ উল্লেখ করিতেছি। কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মিনী উপাখ্যান (১৮৫৮) প্রকাশে বাংলার কাব্যসাহিত্যে এক নবযুগের সঞ্চার হইল। মূলত টডের ‘রাজস্থান’ হইতে কাহিনিবিশেষ লইয়া এখানি রচিত বটে, তথাপি ইহাতে ইউরোপীয় সমসাময়িক কাব্যসাহিত্যের নূতন নূতন ভাব ভুরি ভুরি গ্রহণ করা হয়। একারণ এখানিকে মৌলিক রচনার কোঠায় ফেলা যাইতে পারে। যাহা হোক আমরা এখন আসল কথায় আসিতেছি।
এই দশকে অনুবাদ মারফত সুকুমার সাহিত্যের সঙ্গে আমরা বেশি করিয়া পরিচিত হইতেছি। একারণ এই বিষয়টি আগে বলি। এ যাবৎ শেক্সপিয়রের কোনও নাটকই বাংলায় অনূদিত হইতে দেখি নাই। ইহার আখ্যানভাগ অবলম্বনেও কোনও পুস্তক লেখা হইয়াছে বলিয়া জানি না। হরচন্দ্র ঘোষ ১৮৫৩ সনে শেক্সপিয়রের মার্চেন্ট অব ভেনিস অনুসরণে গদ্যেপদ্যে ভানুমতী চিত্তবিলাস লিখিলেন। ঠিক ঠিক অনুবাদ না হইলেও উক্ত পুস্তক যে এখানির মূল উপজীব্য হরচন্দ্রের কথা হইতেই এখানে বলিতেছি যদ্যপিও ইহাতে উল্লেখিত ইংরাজি কাব্যের আনুপূর্ব্বিক অনুবাদ না হউক, তথাপি বর্ণিত মহাকবি শেক্সপিয়রের সদ্ভাবের বহুলাংশ অথচ সম্পূর্ণ আখ্যানের মর্ম গ্রহণ করিয়ছি।
এই প্রসঙ্গে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ভ্রান্তিবিলাস বইয়ের উল্লেখ করি। এখানি অবশ্য বহু পরে প্রকাশিত হয়। ঈশ্বরচন্দ্র শেক্সপিয়র-কৃত কমেডি অব এররস নাটকের আখ্যানভাগ অবলম্বনে ভ্রান্তিবিলাস রচনা করেন।
হরচন্দ্রের পরই তারাশঙ্কর তর্করত্নের নাম উল্লেখ করিতে হয়। তিনি ১৮৫৪ সনে কাদম্বরী-র অনুবাদ প্রকাশ করিলেন। তাঁহারই কথায়-”সংস্কৃত ভাষায় কাদম্বরী নামে যে মনোহর গদ্য গ্রন্থ আছে তাহা অবলম্বন করিয়া এই গ্রন্থ লিখিত হইল। ইহা ওই গ্রন্থের অবিকল অনুবাদ নহে।…” কাদম্বরী অনুবাদসাহিত্যের ক্লাসিকস। তারাশঙ্করের দ্বিতীয় পুস্তক জনসনের ইংরেজি রাসেলাস গ্রন্থ অবলম্বনে লিখিত। পূর্বেও একবার এই ইংরেজি গ্রন্থখানির অনুবাদ বাহির হইয়াছিল। কিন্তু তারাশঙ্করের বইখানিই বিশেষ মান্য হইয়াছে।
নীলমণি বসাক আরব্য উপন্যাস প্রথমে আলাদা তিন খণ্ডে এবং পরে তিন খণ্ড একত্রে বাহির করিলেন ১৮৫৪ সনে। কতকটা সংশোধন ও কোনও কোনও নূতন বিষয় সংযোজন করিয়া বাংলা ভাষায় চিত্তবিনোদনকল্পে পুস্তকাদির একান্ত অভাব দেখিয়া তিনি এই বইখানির অনুবাদকার্যে প্রবৃত্ত হইয়াছিলেন এই মর্মে নীলমণি লিখিয়া গিয়াছেন। ইহার পূর্বেও কিন্তু আরেবিয়ান নাইটস-এর বঙ্গানুবাদ একবার প্রকাশিত হয়। কিন্তু বসাক মহাশয়ের অনুবাদই বিশেষ জনাদর লাভ করে।
বঙ্গসন্তানদের চিত্তবিনোদনকল্পে নীলমণি বসাক এই কাজে হাত দেন। তিনি লিখিয়াছেন যে, এরূপ আনন্দদায়ক গ্রন্থের একান্ত অসদ্ভাব। দেখিতেছি বৎসর তিনেকের মধ্যেই চিত্তবিনোদক পুস্তক বিস্তর ছাপা হইতে শুরু হইয়াছে। আলালের ঘরের দুলাল বইখানির উল্লেখ ইতিপূর্বে করিয়াছি। ইহার প্রায় সমসময়ে বাহির হয় ঐতিহাসিক উপন্যাস গ্রন্থখানি। ইহার লেখক সুপ্রসিদ্ধ ভূদেব মুখোপাধ্যায়। আলাল এবং ঐ বইখানির মধ্যে একটি মূলগত প্রভেদ রহিয়াছে। কারণ ভূদেববাবুর বইখানি ইংরেজি গ্রন্থের অনুসরণে লেখা। গ্রন্থের ভূমিকায় ভূদেব এইরূপ লিখিয়াছেন ”ইংরেজিতে ‘রোমান্স অব হিস্টরী’ নামক একখানি গ্রন্থ আছে, তাহারই প্রথম উপাখ্যান লইয়া ‘সফল স্বপ্ন’ নামক উপন্যাসটি প্রস্তুত হইয়াছে। ‘অঙ্গুরীয় বিনিময়’ নামক দ্বিতীয় উপন্যাসেরও কিয়দংশ ওই পুস্তক হইতে সংগৃহীত হইয়াছে।”
আলালের ঘরের দুলাল এবং ঐতিহাসিক উপন্যাস ইহার কোনটি আগে আত্মপ্রকাশ করে তাহা লইয়া কিঞ্চিৎ মতানৈক্য আছে। আমি এখানেও এ তর্ক তুলিতে বিরত রহিলাম।
১৩
পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে নাট্যসাহিত্য এবং নাট্যাভিনয় বাঙালিচিত্তে কী রকম আলোড়ন সৃষ্টি করে তাহা আমরা অনেকেই অল্পবিস্তর অবগত আছি। সাহিত্যের এই বিভাগেরও সূচনা দেখি আলোচ্য পঞ্চাশের দশকে। পণ্ডিত রামনারায়ণ তর্করত্ন ছিলেন উচ্চস্তরের সাহিত্যশিল্পী। তিনি নাটক রচনায় অগ্রসর হইলেন। বাঙালা সাহিত্যকে রামনারায়ণ কিরূপ প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন, ইহার উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে তাঁহার কিরূপ সুস্পষ্ট ধারণা ছিল সে সম্বন্ধে আমরা জানিতে পারি তাঁহার একটি বক্তৃতা হইতে। রামনারায়ণ প্রতিষ্ঠাবধি (২মে ১৮৫৩) হিন্দু মেট্রোপলিটন কলেজের বাংলা ভাষায় যে বক্তৃতা দিয়াছিলেন তাহার মধ্যেই উপরের কথাগুলির সারবত্তা পরিলক্ষিত হয়। বাংলা সাহিত্যের প্রতি শ্রদ্ধাবিমিশ্রিত অনুরাগের পরিচয় ওই বক্তৃতা হইতে আমরা পাই। এই দিক দিয়া রামনারায়ণ ছিলেন পণ্ডিত মুত্যুঞ্জয় বিদ্যালঙ্কার এবং রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের সমগোত্রীয়।
এই সময়ে রামনারায়ণ পরপর অনেকগুলি নাটক লেখেন। তাঁহার অত্যধিক নাটকপ্রীতি দেখিয়া লোকে তাঁহাকে ‘নাটুকে রামনারায়ণ’ বলিত। ১৮৫৮ সনে ‘কুলীন কুল সর্ব্বস্ব’ নাটক প্রকাশিত হইলে বাঙালিসমাজে বেশ একটা চাঞ্চল্য উপস্থিত হয়। এখানি রামনারায়ণের মৌলিক রচনা। নাটকখানির নাম হইতেই সমাজের যে সমস্যা ইহাকে দিন দিন জীর্ণ করিতেছিল তাহার আভাস আপনারা পাইবেন। রামনারায়ণ সংস্কৃত নাটক হইতে কয়েকখানি হুবহু অনুবাদ করিয়াছিলেন। এগুলি ওই সময় সুধীসমাজে বিশেষ সমাদৃত হয়। ‘কুলীন কুল সর্ব্বস্ব’-সমেত এ সবেরও কিছু কিছু রঙ্গমঞ্চে অভিনীত হইতে দেখি। রচনাপারিপাট্যে এবং রঙ্গমঞ্চের দৃশ্যপটে দুই দিক দিয়াই এগুলি সার্থক হইয়াছিল। রামনারায়ণের অনুবাদনাটকগুলি তারিখওয়ারি এইরূপ ১. বেণীসংহার নাটক, ১৮৫৬; ২. রত্নাবলী নাটক, ১৮৫৮; ৩. অভিজ্ঞান শকুন্তল নাটক, ১৮৬০। এই তিনখানি বাদে রামানারায়ণ মৌলিক নাটক প্রহসনও কয়েকখানি লিখিয়াছিলেন। অনুবাদ-নাটকগুলিতে যে চলিতভাষা ব্যবহৃত হইয়াছে বিবিধার্থ সংগ্রহ তাহার সপ্রশংস উল্লেখ করেন।
অনুবাদ-নাটক প্রসঙ্গে আমরা কালীপ্রসন্ন সিংহের কৃতিত্বের কথাও স্মরণ করি। কিশোর বয়স হইতেই তিনি সাহিত্যচর্চায় লিপ্ত হন। বিদ্যোৎসাহিনী সভা, বিদ্যোৎসাহিনী রঙ্গমঞ্চ এবং বিদ্যোৎসাহিনী পত্রিকা তাঁহার সাহিত্যপ্রীতি ও সাহিত্যসাধনার প্রকৃষ্ট নিদর্শন। অন্যান্য বইয়ের মধ্যে এই অনুবাদ পুস্তক ক-খানির কথা বলা যাক ১. বিক্রমোর্ব্বশী নাটক, ১৮৫৭ ২. মালতী মাধব নাটক, ১৮৫৯। তাঁহার আর একখানি নাটক, ‘সাবিত্রী সত্যবান নাটক’-মহাভারতের মূল আখ্যায়িকা হইতে পরিগৃহীত।
কালীপ্রসন্নের কিন্তু প্রধান সাহিত্যকর্ম মহাভারতের বঙ্গানুবাদ। মহাভারত অনুবাদের প্রেরণা যে তিনি ঈশ্বরচন্দ্রের নিকট হইতে পান এবং তাঁহারই আশীর্বাদ হইয়া তিনি যে এ কার্যে অগ্রসর হন সে বিষয়ে আগে উল্লেখ করিযাছি। বস্তুত মহাভারত অনুবাদের বাসনা ত্যাগ করিয়া ইহার ভার তিনি পুরাপুরি কালীপ্রসন্নের হস্তে ছাড়িয়া দেন। কালীপ্রসন্ন সে যুগের বহু প্রসিদ্ধ পণ্ডিতের সহায়তায় ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে অনুবাদকার্যের শুরু করেছিলেন। ইহার প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হইল ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দে। ১৮৬৬ সনের মধ্যে অনুবাদ সম্পূর্ণ হইয়া সমগ্র মহাভারত প্রকাশিত হয়। বঙ্গভাষায় মহাভারতের অনুবাদ কালীপ্রসন্ন সিংহের অক্ষয় কীর্তি।
মহাভারতের অনুবাদ প্রসঙ্গে আরও দু-চার কথা বলিলে অতিশয়োক্তি হইবে না। ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে হইতে সিংহভবন একটি সাহিত্যসংস্কৃতির পীঠস্থান হইয়া উঠে। কালীপ্রসন্ন মহাভারত ও রামায়ণের বঙ্গানুবাদ কার্য একই সঙ্গে পরিচালনা করিবেন প্রথম দিকে এইরূপ বাসনা ছিল। কিন্তু মহাভারত লইয়াই তাঁহাকে একান্তভাবে দীর্ঘকাল ব্যাপৃত থাকিতে হয়। এই কার্যে কী কঠোর পরিশ্রম স্বীকার করিতে হয় তাহা তিনি নিজেই লিখিয়া গিযাছেন। প্রাচীন পুথিসমূহের পাঠ মিলানো একটি দুরূহ কার্য। সপ্তদশ খণ্ডে মহাভারত সমাপ্ত হয়। ইহার অষ্টাদশ পর্বের শেষে উপসংহারে কালীপ্রসন্ন এইরূপ লেখেন ”বহু দিবস সংস্কৃত সাহিত্যের সম্যক পরিচালনার বিলক্ষণ অসদ্ভাব হওয়াতে আপাতত মূল মহাভারতের হস্তলিখিত পুস্তক সমুদায়ের পরস্পর এ প্রকার বৈলক্ষণ্য হইয়া উঠিয়াছে যে, ২/৪ খানি গ্রন্থ একত্র করিলে পরস্পরের শ্লোক, অধ্যায় ও প্রস্তাবঘটিত অনেক বিভিন্নতা দৃষ্ট হয়। তন্নিবন্ধন অনুবাদকালে সবিশেষ কষ্ট স্বীকার করিতে হইয়াছে।…”
মহাভারত অনুবাদকালে যে রীতি অনুস্যূত হয় সে সম্বন্ধেও কালীপ্রসন্নের উক্তি স্মরণীয় ”…অনুবাদ সময়ে মূল মহাভারতের কোনও স্থলই পরিত্যাগ করি নাই ও উহাতে আপাতরঞ্জন অমূলক কোনও অংশই সন্নিবেশিত হয় নাই; অথচ বাঙ্গালাভাষার প্রসাদগুণ ও লালিত্য পরিরক্ষণার্থ সাধ্যানুসারে যত্ন পাইয়াছি এবং ভাষান্তরিত পুস্তকে সচরাচর যে সকল দোষ লক্ষিত হইয়া থাকে, সেগুলির নিবারণার্থ বিলক্ষণ সচেষ্ট ছিলাম।…”
কালীপ্রসন্নের অনুবাদ-সভায় সে যুগের বহু গণ্যমান্য পণ্ডিতের সমাবেশ হইয়াছিল। গ্রন্থসমাপ্তিকালে যাঁহারা পরলোক গমন করিয়াছিলেন তাঁহাদের নাম তিনি উল্লেখ করেন। জীবিতদের মধ্যে মাত্র চারিজন পণ্ডিতের নাম এখানে পাইতেছি। তাঁহারা-অভয়াচরণ তর্কালঙ্কার, কৃষ্ণধন বিদ্যারত্ন, রামসেবক বিদ্যালংকার ও হেমচন্দ্র বিদ্যারত্ন। পণ্ডিত তারানাথ তর্কবাচস্পতি এবং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিকট হইতেই কালীপ্রসন্ন যে নানারকম উপদেশ, পরামর্শ ও সহায়তা লাভ করেন সে কথা এই প্রসঙ্গে কৃতজ্ঞতার সহিত স্বীকার করিয়াছেন। আজিকার দিনে হয়তো আমাদের নিকট আশ্চর্য ঠেকিবে কিন্তু সত্য সত্যই বিপুল অর্থব্যয়ে অনুবাদিত ও প্রকাশিত বিরাট মহাভারত কালীপ্রসন্ন বিনামূল্যে বিতরণ করিয়াছিলেন। স্বদেশীয় সাহিত্যসংস্কৃতিকে তিনি প্রাণ দিয়া ভালবাসিতেন-একথা বলা আজিকার দিনেও বাহুল্য মাত্র।
১৪
এতক্ষণ আমরা ব্যক্তিগত প্রযত্নের কথাই বিশেষ করিয়া বলিয়াছি। আর ইহা যে সুকুমার সাহিত্য সম্পর্কে তাহাও আপনারা লক্ষ করিয়াছেন। এখন মননসাহিত্যের দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক। শতাব্দীরর প্রথমার্ধে যেমন দেখিয়াছি, এ দশকেও তেমনি পাঠ্যভিত্তিক পুস্তকাদি মননসাহিত্যের প্রধান উপজীব্য ছিল, কিন্তু ইহার রকমফের প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। এতদিন কিশোরপাঠ্য বইপুথিই বেশি করিয়া প্রকাশিত হইত এবং সাধারণের মধ্যে শিক্ষা প্রসারকল্পে তাহা গৃহীত হইতে থাকে। এখন কিন্তু আর এক শ্রেণীর পাঠ্যপুস্তক রচিত হইতে দেখি যাহা শুধু যে কিশোরপাঠ্য নয় তাহাই নহে, ইহা বিজ্ঞানের উচ্চস্তরের বিষয়াদি লইয়া বিরচিত। অবশ্য কিশোরপাঠ্য বইও বিস্তর লিখিত হইতেছিল। কিন্তু এ বিষয়ে নামজাদা সাহিত্যিক মনীষী হস্তক্ষেপ করায় ইহাও একটি উন্নত স্তরে গিয়া পৌঁছায়। এই দুইটি বিষয়েরই কথা অতঃপর আপনাদের কিছু বলিব। প্রথমে উচ্চতর পাঠক্রমের কথায় আসা যাক।
এই যুগের শিক্ষাসংস্কৃতির কথা লইয়া যাঁহারা আলোচনা করেন তাঁহারা অবশ্যই কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজের বাংলা বিভাগ বা শ্রেণীর কথা শুনিয়াছেন। বাংলা বিভাগে চিকিৎসাবিষয়ক যাবতীয় বিষয়ই বাংলার মাধ্যমে শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা হইয়াছিল। এই বাংলা বিভাগ খোলা হয় ১৮৫২ খ্রিস্টাব্দে কলিকাতা মেডিক্যাল কলেজের অনুষঙ্গরূপে। কিন্তু ইহার পূর্ববর্তী দুই একটি কথাও এখানে বলিয়া লই।
মেডিক্যাল কলেজের সঙ্গে একটি হিন্দুস্থানি শ্রেণী খোলা হয় ১৮৩৯ খ্রিস্টাব্দে। ভারতবর্ষে বিভিন্নস্থলে সৈন্যবিভাগের ছাউনি ছিল। সেখানে বিস্তর হিন্দুস্থানি সিপাহির সমাবেশ। তাহাদের চিকিৎসার সুবিধার নিমিত্তই কলেজে এই বিভাগের উদ্ভব। ১৮৪২-৪৩ সনে বিভাগটি পুনর্গঠিত হয় এবং ইহার অধ্যক্ষপদে নিযুক্ত হন মধুসূদন গুপ্ত। এই বিভাগ পরিচালনা এবং বিশেষ করিয়া রক্ষণশীল হিন্দুস্থানিদের অস্ত্রোপচারে প্রবৃত্ত করানোর ব্যাপারে মধুসূদনের বেশ খ্যাতি হয়। সরকারি শিক্ষাবিষয়ক রিপোর্টে বহুবার তাঁহার প্রশস্তি দেখিয়াছি। বাংলা বিভাগ খোলা সম্বন্ধেও যে প্রস্তুতি পূর্ব হইতেই চলিতেছিল একটি বিষয় হইতে তাহা আঁচ করিতে পারি। ১৮৪৫ সনেই মধুসূদন সরকারি নির্দেশে লণ্ডন ফার্মাকোপিযার অনুবাদ শেষ করেন। কিন্তু ইহা ছাপা হইতে আরও চার পাঁচ বসর লাগিয়া যায়। ফার্মাকোপিয়ার প্রথম বঙ্গানুবাদ বাহির হইল ১৮৪৯ সনে। বইখানির পুরা নাম-‘লন্ডন ফার্ম্মাকোপিয়া/অর্থাৎ/ইংলন্ডীয় ঔষধ কল্পাবলী’। মধুসূদন প্রদত্ত ভূমিকা হইতে পুস্তকখানি সম্বন্ধে জানিতে পারি
শ্রীযুক্ত গবর্ণমেণ্টের আজ্ঞানুসারে লণ্ডন ফর্ম্মাকোপিয়া অর্থাৎ ইংরাজী ঔষধ কল্পাবলীর সাধু বঙ্গভাষাতে অনুবাদিতা ও মুদ্রিতা হইল। যে রূপ ঐ গ্রন্থ হিন্দীতে অনুবাদিত হইয়াছে সেইরূপ বঙ্গভাষাতে হইবেক এই আজ্ঞাহেতুক আমি সেই রীতিক্রমে এই গ্রন্থ প্রস্তুত করিয়াছি অর্থাৎ প্রত্যেক ঔষধের ইংরাজী ও লাটিন নাম অগ্রে লিখিয়াছি পশ্চাৎ ঐ সকলের নাম বঙ্গভাষাতেও লিখিয়াছি। যে সকল ঔষধাদির নাম বঙ্গভাষাতে নাই তাহা কল্পিত করিয়া অনায়াসে বোধগম্য যাহাতে হয় তাহা করিয়াছি কিন্তু অনেক ইংরাজী দ্রব্যের নাম বঙ্গভাষায় প্রাপ্ত না হওয়াতে তাহাদিগের কেবল ইংরাজ নাম লিখিত হইয়াছে যেমন ইপিকাকুহ্নানা ইত্যাদি। এই চিকিৎসা গ্রন্থে ব্যবহৃত শব্দ সকল চলিত বঙ্গভাষায় প্রায় না থাকায় এই গ্রন্থে অনেক সংস্কৃত শব্দ প্রয়োগ করা গিয়াছে কিন্তু বঙ্গভাষাতে যাহা চলিত আছে তাহা সাধ্যমতো পরিত্যাগ করা যায় নাই।
শ্রীমধুসূদন গুপ্ত।
মধুসূদনের দ্বিতীয় বইখানিও হয় অনুবাদ না হয় অনুবাদ-ভিত্তিক রচনা। এখানির কথা বলিবার পূর্বে মেডিক্যাল কলেজের বাংলা বিভাগ খোলা সম্বন্ধে কিছু বলিতেছি। বাংলা ভাষায় চিকিৎসাবিদ্যার অন্তর্গত বিভিন্ন বিষয়ের পুস্তক রচনায় এই বাংলা বিভাগ যে বিশেষ, প্রেরণা জোগায় তাহা অনস্বীকার্য। এ বিষয়টি অনুধাবন করার নিমিত্তই এই কথাগুলির অবতারণা। বাংলার অভ্যন্তরে জেলা ও মহকুমা শহরে এবং থানায় ও বর্ধিষ্ণু গ্রামে পর্যন্ত চিকিৎসক নিয়োগের প্রয়োজন অনুভূত হইতেছিল। স্থানে স্থানে হাসপাতাল স্থাপনেরও কথা চলে। কিন্তু চিকিৎসক হইবেন কাহারা? মেডিক্যাল কলেজের ছাত্রসংখ্যা সীমিত। প্রতিবৎসর অল্পসংখ্যক ছাত্রই শেষ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়। প্রধান প্রধান শহরে চাহিদা মিটাইতেই তাঁহারা ছিলেন নিতান্ত অপ্রচুর। এই কারণে বাংলা বিভাগ বা শ্রেণী খোলার উদ্যোগ আয়োজন হইতে লাগিল। পূর্বেই বলিয়াছি এই শ্রেণীর প্রতিষ্ঠা হয় কলেজেরই মধ্যে ১৮৫২ সনে। মধুসূদনকে অন্যান্য কর্তব্যের মধ্যে এই বিভাগটি পরিচালনার ভার লইতে হয় সরকারি নির্দেশে। মধুসূদন হইলেন অ্যানাটমি অর্থাৎ শারীরবিদ্যা এবং শল্য বিদ্যার অধ্যাপক। এই বিভাগের সুপারিন্টে ডেণ্ট বা অধ্যক্ষ হনও তিনি। শিবচন্দ্র কর্মকার মেটিরিয়ামেডিকা বা ভৈষজ্যসংহিতা অধ্যাপক হইলেন। মেডিসিন বা ভেষজ পড়াইবার ভার পড়ে প্রসন্নকুমার মিত্রের উপর। এই দু’জনও ছিলেন মেডিক্যাল কলেজের শেষ পরীক্ষোত্তীর্ণ কৃতী ছাত্র।
বাংলা বিভাগ খোলা হইল। স্থির হইল, বাংলা জানা এবং নির্দিষ্ট মান পর্যন্ত পড়া ছাত্রদের এখানে বাংলার মাধ্যমে চিকিৎসা সংক্রান্ত বিবিধ বিষয় শিখাইতে হইবে। কিন্তু এ সব বিষয়ে বাংলা বই কোথায় মিলিবে? উপরে ফার্মাকোপিয়ার বঙ্গানুবাদের কথা বলিয়াছি। মধুসূদন এবং তাঁহার সহকর্মীরা কালবিলম্ব না করিয়া এ কার্যে অগ্রসর হইলেন। মৌলিক গ্রন্থ অত অল্প সময়ে রচনা ও প্রকাশ সম্ভব নয়, তাঁহাদের অগত্যা অনুবাদেরই আশ্রয় লইতে হয় চিকিৎসাবিদ্যার সহায়করূপে উদ্ভিদবিদ্যা, রসায়ন প্রভৃতিও ছেলেদের শেখানো দরকার। এ ধরনের পুস্তকাদি প্রণয়নেও কেহ কেহ মন দিলেন। কথা উঠিয়াছে আঞ্চলিক ভাষায় উচ্চতম পরীক্ষা, অন্তত চিকিৎসাশাস্ত্রে উচ্চতম শিক্ষা দেওয়া যাইবে কি না। বই কোথায়? গত শতাব্দীর মধ্যভাগ হইতে এই দিক দিয়াও যে প্রচেষ্টা শুরু হয় সে সম্বন্ধে আমাদের পুরাপুরি জ্ঞান জন্মিলে বর্তমান হীনমন্যতা হইতে আমরা কতকটা নিস্তার পাইতে পারি।
মধুসূদন অ্যানটমি বাংলায় রচনা করিয়া ১৮৫৩ খ্রিস্টাব্দেই প্রকাশিত করিলেন। কোনও বিশেষ গ্রন্থের অনুবাদ বলিয়া ইহাতে উল্লেখ নাই। তথাপি উক্ত বিষয়ের ইংরেজি গ্রন্থসমূহ হইতেই এখানি সংকলিত বলা যায় ফার্মাকোপিয়ার মতো এ বইয়েরও শেষে শারীরতত্ববিষয়ক একটি মূল্যবান পরিভাষা গ্রন্থকারে সংযোজিত করিয়া দিয়াছেন। বইখানি নিরতিশয় দুষ্প্রাপ্য। আমি সৌভাগ্যক্রমে মধুসূদনের জনৈক বংশধরের নিকট হইতে এখানি আনিয়া ব্যবহার করি। দেখিতেছি মধুসূদন এনাটমির বাংলা প্রতিরূপ দিয়াছেন শারীরবিদ্যা। ফেলিক্স কেরি কিন্তু বিদ্যাহারাবলী-তে ইহাকে ব্যবচ্ছেদবিদ্যা কহিয়াছেন। সাম্প্রতিকালে রাজশেখর বসু ইহার প্রতিশব্দ করিয়াছেন শারীরস্থানবিদ্যা। মধুসূদনের ভূমিকাংশ হইতে বুঝিতেছি এই প্রতিশব্দই যুক্তিসংগত।
মধুসূদন ভূমিকায় লেখেন
এনাটোমীর প্রকৃত অর্থ ছেদবিদ্যা বস্তুতঃ চিকিৎসার্থক শারীর বিদ্যা। শারীরজ্ঞেরা মানব শারীরবিদ্যাকে শাখাদ্বয়ে বিভক্ত করিয়াছেন প্রথম জেনারেল এনাটোমী অর্থাৎ সামান্য শারীরবিদ্যা এবং দ্বিতীয় ডিষ্ক্রিপটিব এনাটোমী অর্থাৎ নির্দ্দেশক শারীরবিদ্যা। / শরীরের নির্ন্মাপক সমবায়ি দ্রব্য সকলের স্বভাব ও সামান্য গুণ সমূহের বিবরণের নাম সামান্য শারীরবিদ্যা। / দেহের নানা ইন্দ্রিয় ও প্রত্যেক অঙ্গ প্রত্যঙ্গ এবং প্রদেশ সকল এবং পৃথক পৃথক অংশের বাহ্য আকৃতি ও আভ্যন্তর নির্ম্মিত এবং তাহাদিগের যথাযথরূপ পরস্পর অবস্থিতি এবং যোগ ওই সমস্ত অংশের উৎপত্তির পর যে রূপ উত্তরোত্তরাবস্থা ইত্যাদির বিবরণের নাম নির্দ্দেশক শারীরবিদ্যা।
বাংলা বিভাগের অধ্যয়নকাল ছিল মাত্র তিন বৎসর। এই সময়ের মধ্যে ছাত্রদের মোটামুটি সকল বিষয় শিখাইবার ব্যবস্থা হইল। এ সময় হইতে পরবর্তী দুই দশকের মধ্যে বিস্তর বই যোগ্য ব্যক্তিরা রচনা করেন। এই প্রসঙ্গে অমৃতবাজার-স্থিত নেটিভ অর্থাৎ বাংলা ডাক্তার চন্দ্রকান্ত কর্মকারের সর্পদংশনের চিকিৎসা এবং আশুতোষের পিতা ডা. গঙ্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘ধাত্রী বিদ্যা’র উল্লেখ করা যায়।
১৫
এখন যে বিষয় লইয়া আলোচনায় প্রবৃত্ত হইতেছি তাহা সাধারণভাবে বাংলা সাহিত্যকে সবিশেষ সমৃদ্ধ করিয়াছি। অনুবাদের মাধ্যমে ইহা যে অনেকটা সম্ভব হইয়াছে তাহা বলা বাহুল্য মাত্র। এই দশকের প্রথমেই শিক্ষা বিষয়ের নিয়ামক সরকারি শিক্ষা সমাজ দুইটি বিষয়ে পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের উপরে ভার অর্পণ করেন। প্রথমটি হইল গভর্নমেন্ট সংস্কৃত কলেজের পুনর্বিন্যাস। এখানে একটি কারণে এ বিষয়টি উল্লেখ করিতেছি। ঈশ্বরচন্দ্র সংস্কৃতকে শিক্ষিত সাধারণের গ্রাহ্য করিয়া তোলেন একটি উপায়ে। মুগ্ধবোধ-এর অনুবাদের কথা পূর্বে বলিয়াছি। ঈশ্বরচন্দ্র পাণিনিকে ভিত্তি করিয়া প্রথম উপক্রমণিকা ও পরে ব্যাকরণ কৌমুদী বঙ্গভাষায় প্রকাশ করেন। এই সময় হইতে জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি ঐতিহ্যের সঙ্গে আমরা যে ক্রমে পরিচয় লাভ করিতে থাকি তাহার মূলে বলিতে পারি এই ব্যাকরণ কৌমুদী। এখন দ্বিতীয় বিষয়টির দিকে দৃষ্টি ফেরানো যাক।
বঙ্গ সন্তানদের সুষ্ঠুভাবে মাতৃভাষা বাংলা শিক্ষার যথেষ্ট অপহ্নব ঘটিতে থাকে শিক্ষার বাহন ইংরেজি ধার্য হইবার সময় হইতে। সরকারি ও বেসরকারিভাবে ইহা রোধ করিবার চেষ্টা হয় বটে, কিন্তু তাহা আশানুরূপ আদৌ ফলবতী হয় নাই। রাজনারায়ণ বসু তো বলিয়াই ছিলেন, বাংলা বিদ্যায়তনগুলির প্রতি সরকার ‘সপত্নীপুত্র’ ব্যবহার করিয়া থাকেন। আলোচ্য দশকের প্রথম দিকে ঈশ্বরচন্দ্রের উপর এই বাংলা শিক্ষার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্যও ভার দিলেন ছোট লাট হ্যালিডের নির্দেশে তৎকালীন সরকারি শিক্ষা বিভাগ। ঈশ্বরচন্দ্র দক্ষিণ বঙ্গের বিভিন্ন জেলার শতাধিক আদর্শ বঙ্গ বিদ্যালয় স্থাপন করিলেন। ইহার ব্যয়ভার লইলেন বাংলা সরকার। প্রায় সব সময়ে তিনি বহুস্থলে আদর্শ বালিকা বিদ্যালয় স্থাপনেও প্রবৃত্ত হইলেন। কিন্তু বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাই তো সবটা নয়। বিভিন্ন বিষয়ে সময়োপযোগী পাঠ্যপুস্তক রচনা এবং প্রকাশও আবশ্যক। ঈশ্বরচন্দ্র নিজে ও বিষয়ে তো মন দিলেনই, উপরন্তু তিনি আরও বহু বিদ্বজ্জনের সহযোগিতা লাভ করেন এই সম্পর্কে। শেষোক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে অক্ষয়কুমার দত্ত, রামগতি ন্যায়রত্ন, মদনমোহন তর্কালঙ্কার, রাজেন্দ্রলাল মিত্র, দ্বারকানাথ বিদ্যাভূষণ প্রমুখ সাহিত্যিক মনীষীদের নাম উল্লেখ করিতে পারি। ঈশ্বরচন্দ্র বহু পুস্তক নূতন করিয়া প্রকাশ করিলেন। ইহার মধ্যে কতকগুলি অনুবাদ-পুস্তক এবং কিছু কিছু সংকলন-গ্রন্থও রহিয়াছে। বইগুলি যথাক্রমে বোধোদয় (১৮৫১), কথামালা, চরিতকথা, আখ্যান-মঞ্জরী প্রভৃতি। ইহার মধ্যে কথামালা সম্পূর্ণই অনুবাদ-পুস্তক। এ সম্বন্ধে একটু বিশেষ করিয়া বলি।
ঈশ্বরচন্দ্র কথামালা-র ভূমিকায় লিখিয়াছেন শ্রীযুক্ত রেবারেণ্ড টমাস জেমস, ঈসপ রচিত গল্পের ইঙ্গরেজি ভাষায় অনুবাদ করিয়া যে পুস্তক প্রচারিত করিয়াছেন, অনুবাদিত গল্পগুলি সেই পুস্তক হইতে পরিগৃহীত হইয়াছে। ইংরেজি বই হইতে ৬৮টি গল্প প্রথমে গ্রথিত করেন, আরও ছয়টি গল্প পরে ইহাতে সংযোজিত হয় আপনাদের স্মরণ থাকিতে পারে পূর্ব প্রস্তাবে ঈসপস ফেবলসের উল্লেখ আমি করিয়াছি। তারিণীচরণ মিত্রের ‘ওরিয়েণ্টাল ফেব্যুলিস্ট-এ ঈসপের কতকগুলি গল্প অনুবাদিত হয়। জন ক্লার্ক মার্সম্যান ঈসপস ফেবলসের একটি ইংরেজি-বাংলা সংস্করণ প্রকাশ করেন ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে। এ সময়কার লিখিত পাঠ্যপুস্তকগুলি রচনাশৈলিগুণে সাহিত্যের পর্যায়ে উন্নীত হইয়াছে। যে সব মনীষীপ্রধানদের নাম উপরে করিলাম তাঁহাদের পুস্তকগুলিও এই পর্যায়ে পড়ে। এই প্রসঙ্গে অক্ষয়কুমারের পদার্থবিদ্যা (১৮৫৬), রামগতির ‘বস্তুবিচার’ (১৮৫৮), রাজেন্দ্রলালের প্রাকৃত ভূগোল (১৮৫৪), দ্বারকানাথের গ্রীস দেশের ইতিহাস (১৮৫৭), রোম রাজ্যের ইতিহাস (১৮৫৭), পুস্তকের কথা আপনাদের মনে রাখিতে বলি। মদনমোহনের ‘পাখি সব করে রব’ কবিতাটির কথা আপনারা হয়তো কেহই ভুলিতে পারেন নাই।
ঈশ্বরচন্দ্র-স্থাপিত এবং সরকারি অর্থে পোষিত আদর্শ বাংলা বিদ্যালয়গুলি সম্বন্ধে এখানে আরও কিছু বলা দরকার। কারণ কিঞ্চিৎ পরবর্তীকালে বাংলার বিবিধবিদ্যাবিষয়ক সাহিত্যের উন্নতি ও প্রসার ঘটিবার সুযোগ হয় ইহার দরুন। বাংলা শিক্ষা তথা বাংলা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে সরকারি নীতি মাঝে মাঝে বদলাইয়াছে সত্য, কিন্তু সর্বত্র সত্বর শিক্ষা যে অতটা প্রসার লাভ করে তাহার ভিত্তি রচনা হয় ঐ আদর্শ বিদ্যালয়গুলির মধ্যে। মিডল ভার্নাকুলার স্কুল বা মাইনর ছাত্রবৃত্তি স্কুলগুলি দিকে দিতে স্থাপিত হইল। উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম বাংলার সর্বত্রই এই ধরনের বিদ্যালয়গুলি চালু হইতে দেখি। বিবিধ বিষয়, যেমন সাহিত্য, ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, গণিত বাংলার মাধ্যমে শেখানো হইত এবং পরীক্ষা দিয়া ছাত্রেরা উত্তীর্ণ হইতে পারিলে চিকিৎসা, আইন প্রভৃতি শিখিবার উপযুক্ত বিবেচিত হইত। যখন ইংরেজি আসিয়া ওই স্থান দখল করে তখনও দেখি মাইনর ছাত্রবৃত্তি স্কুলগুলির প্রাচুর্য অব্যাহত রহিয়াছে। বর্তমান শতাব্দীর প্রথমে ইংরেজি শিক্ষার প্রাবল্য ঘটিলে এই বিদ্যালয়গুলি একে একে বিলুপ্ত হয়। বাংলা চর্চার ক্রমিক ধারা যাহা একদিন উচ্চতর ও উচ্চতম স্তরে পর্যন্ত প্রসারিত হইবার সম্ভাবনা ছিল তাহাও আর রহিল না। শুধু বাংলা শিক্ষায় নহে, বাংলার মননসাহিত্যের বিকাশের পক্ষে ইহার নিমিত্ত বিষম বাধা উপস্থিত হয়। অনুবাদসাহিত্য আমার বক্তব্য হইলেও মাতৃভাষার মাধ্যমে বিদ্যাচর্চায় ভাঁটা পড়িল কেন সেদিকেও সুধীবৃন্দের দৃষ্টি পড়িবার সময় আসিয়াছে। অনুবাদসাহিত্যের প্রেরণাও এই সময় হইতে যেন কোথায় মিলাইয়া গেল।
এখন আবার পূর্ব কথায় আসি। মদনমোহন তর্কালঙ্কারের কথা ইতিপূর্বে সামান্যত উল্লেখ করিয়াছি। মদনমোহনের কবিপ্রতিভা বিংশতি বৎসর বয়সেই প্রকটিত হয় বাংলা বাসবদত্তা-র মধ্যে। এই নামে সংস্কৃত বইখানি হইতে তিনি আখ্যানভাগ গ্রহণ করেন। ঈশ্বরচন্দ্রের শকুন্তলা (১৮৫৫) এবং সীতার বনবাস (১৮৬০) অনুবাদধর্মী হইয়াও রচনার পারিপাট্যে মৌলিক পুস্তকের গুণান্বিত। রামগতি ন্যায়রত্ন ক্যাপটেন রিচার্ডসনের ইংরেজি গ্রন্থ হইতে অনুবাদ করেন কালকাতার প্রাচীন দুর্গ এবং অন্ধকূপ হত্যার ইতিহাস (১৮৫৮) নামে। কিশোরপাঠ্য পুস্তক প্রসঙ্গে বলিতেছি বলিয়া কেহ মনে করিবেন না এগুলি ওই শ্রেণীর বই। প্যারীচাঁদ মিত্র কলিকাতাস্থ কৃষি-সমাজের আনুকুল্যে ভারতবর্ষীয় কৃষিবিষয়ক বিবিধ সংগ্রহ খণ্ডে খণ্ডে প্রকাশ করেন ১৮৫৩ সন হইতে। ১৮৫৫ সনে ইহার পঞ্চম খণ্ড বাহির হইয়া বন্ধ হয়। এই পুস্তক উক্ত সমাজের জার্নাল এবং ট্রানস্যাকশান্স-এ প্রকাশিত কৃষিবিষয়ক বিবিধ রচনার অনুবাদ। পূর্বেও কৃষি-সমাজের পক্ষে জন ক্লার্ক মার্সম্যান এইরূপ দুই খণ্ড পুস্তক অনুবাদ করেন। উদ্দেশ্য দেশবাসীর মধ্যে কৃষিবিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধির সহায়তা।
১৬
পঞ্চাশের দশকে ব্যক্তিগত প্রযত্ন এবং সরকারি আনুকূল্যে আরদ্ধ কোনও কোনও প্রচেষ্টার কথা এই মাত্র বলিলাম। এই দশকের শুরুতেই আর একটি বেসরকারি উদ্যোগ দেখি। ‘বঙ্গভাষানুবাদক সমাজ’ বা সংক্ষেপে ‘অনুবাদক সমাজ’ই এই বেসরকারি উদ্যোগ। প্রতিষ্ঠাকাল-ডিসেম্বর ১৮৫০। প্রকৃত প্রস্তাবে পরবর্তী সনে ইহার কার্যারম্ভ হয়। নাম হইতেই বুঝা যায় অনুবাদসাহিত্য প্রকাশ ও প্রচারকল্পেই মুখ্যত ইহার উদ্ভব। ইংরেজিতে এই সমাজের নাম নানাভাবে প্রকটিত হয়। একটি দেখি, নাম দেওয়া হইয়াছে Vernacular Translation Society বা Committee। আমি বহুবৎসর পূর্বে পত্রিকান্তরে অনুবাদক সমাজ সম্বন্ধে বিশদ আলোচনা করিয়াছি। (প্রবাস, শ্রাবণ ও চৈত্র ১৩৬১ এবং বৈশাখ ১৩৬২)। এখানে স্থূল স্থূল কয়েকটি বিষয়ের কথা মাত্র বলিতে পারিব।
অনুবাদক সমাজ প্রতিষ্ঠার মূলে ইউরোপীয় ও বাঙালি মনীষার যুগ্ম পরিকল্পনা লক্ষ করি। উত্তরপাড়ার জমিদার বদান্যবর জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় এবং হাওড়া জেলার অ্যাসিস্ট্যাণ্ট ম্যাজিস্ট্রেট হজসন প্রাট এই উদ্দেশ্যে হাতে হাত মেলান। তখন কলিকাতা তথা বঙ্গদেশে এমন কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ছিল যাহাদের মাধ্যমে বিভিন্ন বিদ্যা বিষয়ে অনুবাদ-পুস্তক প্রস্তুত হইতেছিল। কিন্তু সাধারণ বা সামান্যশিক্ষিত সাবালক নারীপুরুষের পক্ষে ইহা অধিগম্য করা কঠিন হইত। অনুবাদক সমাজ প্রথমেই বলেন যে, এখানকার অনুবাদ-পুস্তকগুলি হইবে সহজ সরল ভাষায় সুখপাঠ্য করিয়া লেখা। চিত্তোৎকর্ষ সাধন এবং চিত্তবিনোদন দুইই ইহার দ্বারা সম্ভব করার চেষ্টা শুরু হইতেই চলে। ভালো ভালো ইংরেজি বইয়ের অনুবাদ আরম্ভ হইল। প্রথমেই দেখি জন রবিনসন রবিনসন ক্রুসোর ভ্রমণবৃত্তান্ত, ডা. রোয়ার সেকসপীয়র-কৃত গল্প এবং হরচন্দ্র দত্ত লার্ড ক্লাইব চরিত্র ইংরেজি হইতে অনুবাদ করিয়াছেন। এই অনুবাদকার্যে আরও অনেকে সমাজের নির্দেশে লিপ্ত হইলেন। দেখি ভূদেব মুখোপাধ্যায়, রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়, রাজেন্দ্রলাল মিত্র প্রমুখ মনীষীপ্রধানদের নাম অনুবাদকের তালিকাভুক্ত হইয়াছে।
১৮৫১ সনের অক্টোবর নাগাদ বিলাতের পেনী ম্যাগাজিনের আদর্শে বিবিধার্থ সংগ্রহ নামে একখানি সচিত্র মাসিকপত্র অনুবাদকসমাজের মুখপত্র স্বরপ প্রকাশিত হয়। সম্পাদক হইলেন রাজেন্দ্রলাল মিত্র। পূর্বেও কোনও কোনও পত্রিকায় চিত্র মাঝে মাঝে বাহির হইত। কিন্তু বিবিধার্থ সংগ্রহ-এ বহু চিত্র নিয়মিতভাবে লেখার সঙ্গে প্রকাশিত হইতে আরম্ভ হয়। অচিরেই কাগজখানি নানা কারণে, বিশেষত অঙ্গসৌষ্ঠবে সুধিসমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ ইহার প্রশস্তি করিয়াছেন। বঙ্কিমচন্দ্রও এখানির অযাচিত প্রশংসায় মুখর ছিলেন। অর্থাভাবহেতু এই দশকের মধ্যভাগে কিছুকাল বন্ধ থাকিলেও পরে ১৮৫৯ নাগাদ রাজেন্দ্রলালেরই সম্পাদনায় এখানি পুনঃপ্রচারিত হয়।
একটি কথা বলিতে ভুলিয়াছি। সে যুগের খ্যাতনামা ইংরেজ ও বাঙালি এই সমাজের কর্মকর্তৃসভায় স্থান পাইয়াছিলেন। তখন পর্যন্ত ও দুয়ের একত্রে কা করিতে কোনও বাধার সৃষ্টি হয় নাই। বাংলা সাহিত্যের অন্যতম উৎসাহদাতা ড্রিঙ্কওয়াটার বেথুন প্রথমাবধি এই সমাজকে প্রচুর অর্থ দান করেন। পাদ্রি লঙ অনুবাদকসমাজের আর একজন প্রধান কর্মকর্তা। বাঙালিদের মধ্যে দেখি সে যুগের প্রধান সাহিত্যিক মনীষী রাধাকান্ত দেব, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, প্যারীচাঁদ মিত্র প্রমুখকে। প্রাট ও জয়কৃষ্ণ প্রথমে যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন। প্রাট অন্যত্র চলিয়া গেলে আর. বি. চ্যাপম্যান নামে একজন মাঝামাঝি সময়ে সমাজের সম্পাদক হন। পরে ১৮৫৮ খ্রিস্টাব্দে সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ ই. বি. কাওয়েল এই পদে অধিষ্ঠিত হইলেন।
ইংরেজি হইতে বাংলায় অনুবাদ প্রকাশ করাই ছিল এই সমাজের প্রধান কাজ। কিন্তু অন্যান্য বিষয়েরও বই কিছু কিছু ইহার আনুকূল্যে প্রকাশিত হয়। বিভিন্ন সাময়িক পত্র হইতে সারগর্ভ প্রস্তাবসমূহ সঙ্গলন করিয়া পাদ্রি লং ‘সংবাদ সার’ নামে একখানি সুন্দর পুস্তক ইহার আনুকূল্যে প্রকাশিত করেন। তৎসংকলিত ও সম্পাদিত ১২৬২ ও ৬৩ সালের নূতন পঞ্জিকা দুইখানি এই সময়কার উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ। পঞ্জিকায় সাধারণত যেসব বিষয় থাকে তদুপরি ওই সময়ের সরকারি আইনকানুন বিধিব্যবস্থা বিভিন্ন প্রদেশে চালু মুদ্রা এবং বাংলার দূর দূর অঞ্চলের মেলা প্রভৃতি বহু জ্ঞাতব্য ও প্রয়োজনীয় তথ্য ইহাতে সন্নিবেশিত হয়। সমাজের আর্থিক অবস্থা খারাপ হইলে স্কুল বুক সোসাইটির সঙ্গে ইহা একযোগে কিছু কিছু বই বাহির করিতে থাকে। প্রামাণিক ইংরেজি গ্রন্থের কতকগুলি চরিত্র, যেমন, আলেকজান্ডার, চেঙ্গিস খাঁ, তৈমুর লঙ্গ, নূরজাহান, পীটার দি গ্রেট প্রভৃতি জীবনীগুলি এক একটি ছোট আকারের বইয়ে অনুবাদান্তে প্রকাশিত হয়। এই সকল পুস্তকের প্রধান অনুবাদক ছিলেন পণ্ডিত রামনারায়ণ বিদ্যারত্ন।
দেখিতেছি ১৮৫৬ সনে সমাজ লেখকদের নিকট বইয়ের পাণ্ডুলিপি যাচ্ঞা করিয়াছেন। উদ্দেশ্য-প্রতিটি উৎকৃষ্ট বইয়ের জন্য ২০০ টাকা পুরস্কার প্রাদন। দশখানি পাণ্ডুলিপি আসে। কিন্তু তাহার মধ্যে দুইখানি উৎকৃষ্টতম বিবেচিত হয়। প্রথমখানি সমাজের সরকারি সম্পাদক মধুসূদন মুখোপাধ্যায়ের সুশীলার উপাখ্যান নামক উপন্যাস; দ্বিতীয়খানি কবি রঙ্গলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের সুবিখ্যাত পদ্মিনী উপাখ্যান। রঙ্গলাল এখানি নিজ ব্যয়ে পরে ছাপান। সুশীলার উপাখ্যান অনুবাদকসমাজেরই সম্পত্তি। পরপর আরও দুইখণ্ড অর্থাৎ একুনে তিনখণ্ড প্রকাশিত হয়। এখানি যে সামান্য-শিক্ষিতদের মধ্যে খুব সমাদৃত হয় তাহার প্রমাণ পাই পরবর্তী দুই দশকের মধ্যেই ইহার সাত-আটটি সংস্করণে। সমাজ প্রকাশিত পুস্তকাবলির নাম দেওয়া হইয়াছিল গার্হস্থ্য সাহিত্য। বাস্তবিকই এই নাম সার্থক বিবেচনা করি। গদ্যের বিদ্যাসাগরীয় রীতি এবং আলালি রীতির সম্বন্ধে বঙ্কিমচন্দ্র আলোচনা করিয়াছেন। কিন্তু এই দুয়ের অন্তরালে আর একটি রীতিও বাঙালিচিত্তে গ্রাহ্য হইতে থাকে। সুশীলার উপাখ্যান এবং সমাজপ্রকাশিত বিবিধ কাহিনি, গল্প, জীবনী প্রভৃতির মধ্যে এই রীতি বিধৃত। বঙ্কিমচন্দ্র এই বইগুলির প্রশংসা করিতে পারেন নাই। কিন্তু তখন যে বাংলা গদ্যের সহজ সরল ও সুরুচিপূর্ণ সুখপাঠ্য রূপও পাঠকবর্গকে মুগ্ধ করে তাহা ভুলিলে চলিবে না। সহজ সরল বাংলার সঙ্গে আমরা বাস্তবিকই পরিচিত হই ওই সময় হইতে।
ইংরেজিই শুধু নয়। সংস্কৃত হইতেও সমাজের আনুকল্যে কোনও কোনও বই অনূদিত হয়। পণ্ডিত আনন্দচন্দ্র বেদান্তবাগীশের বৃহৎ কথা দুই খণ্ড এইরূপ বই। পরবর্তী দশকের প্রারম্ভে জীববিদ্যা শীর্ষক একখানি অনুবাদ বই এবং রাজেন্দ্রলাল মিত্রের শিল্পিক দর্শন (১৮৬০) ও শিবজির চরিত্র (১৮৬২) সমাজের আনুকূল্যে প্রকাশিত হয়। ‘বিবিধার্থ সংগ্রহে’র পর সমাজ ‘রহস্য সন্দর্ভ’ মাসিক পত্র প্রকাশিত করেন। ইহারও সম্পাদক ছিলেন রাজেন্দ্রলাল। ১৮৬২ সন নাগাদ অনুবাদকসমাজ স্কুল বুক সোসাইটির সঙ্গে মিলিত হয়। তথাপি কয়েক বৎসর যাবৎ ইহার স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বজায় রাখিতে দেখি। অনুবাদকসমাজ এক যুগ ধরিয়া বাংলা সাহিত্যেকে প্রধানত অনুবাদের মাধ্যমে সমৃদ্ধি করিতে চেষ্টা পান। আজকাল প্রাপ্তবয়স্কদের শিক্ষার জন্য কত রকম উদ্যোগ দেখি, ভাষার সারল্য রক্ষা করিতে কতই না চেষ্টা। কিন্তু গত শতাব্দীর মধ্যভাগে সামান্য শিক্ষিত মানুষের চিত্তোৎকর্ষ ও চিত্তবিনোদনের যে উপায় অবলম্বিত হইতেছিল তাহার দিকে আমরা একবার দৃষ্টি ফিরাইতে পারি না কি? আমি এখানে অনুবাদকসমাজেরএবং ইহা কর্তৃক প্রকাশিত ও অনুবাদিত পুস্তকাদির কথা সামান্যই বলিতে পারিলাম। এ বিষয়ের অনুসন্ধানে নবীন গবেষক আগ্রহী হইলে ভাষাসাহিত্যের ইতিহাস সুষ্ঠুরূপে প্রণয়ন সুসাধ্য হইবে।
আমার কথা এখানেই শেষ হইল। অনুবাদের মাধ্যমে ভাষাসাহিত্য সে যুগে, সেই সাহিত্য গড়নের যুগে কতখানি সহায় হইয়াছিল এখন হয়তো আপনারা ইহা কতকটা আঁচ করিতে পারিতেছেন। ফোর্ট উইলিয়ম কলেজে যে গদ্য মূলে ও অনুবাদে লালিত হইতেছিল এই পঞ্চাশের দশকে তাহার একটি সুন্দর ও সহজবোধ্য রূপ প্রত্যক্ষ করি। কথা ও লেখ্য ভাষার মধ্যে দূরত্ব দূর করার সার্থক চেষ্টা আমাদের চোখে না পড়িয়া যায় না। অনুবাদসাহিত্যের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সবশেষে একটি কথা বলিয়া আমি বিদায় লই। আপনারা যে এই দুরূহ বিয়য়টি ধৈর্যসহকারে অনুধাবন করিয়াছেন তাহার জন্য আপনাদিগকে আমার আন্তরিক ধন্যবাদ।*
*আমি দৃষ্টিশক্তিহীন। এ কারণ, বলা বাহুল্য প্রতিটি কাজে আমাকে অপরের সাহায্য লইতে হয়। বর্তমান বক্তৃতা প্রস্তুতকালে শ্রীমান কানাইলাল দত্ত, নারায়ণচন্দ্র ব্রহ্ম এবং প্রশান্তকুমার বাগল আমাকে বিশেষ সাহায্য করিয়াছে। -লেখক।
‘বাংলা অনুবাদ সাহিত্য’ (১৮০১-১৮৬০) কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের
‘শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্মারক বক্তৃতা’ (১৯৬৮)-রূপে এ বছর ১২, ১৩ ও ১৪ মার্চ
শ্রীযুক্ত যোগেশচন্দ্র বাগল প্রদত্ত বক্তৃতা। – স. এ।
৬ষ্ঠ বর্ষ ৬ষ্ঠ সংখ্যা
(ফাল্গুন-চৈত্র ১৩৭৫)
