কার্ল মার্কসের ইতিহাসতত্ব – হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

কার্ল মার্কসের ইতিহাসতত্ব – হীরেন্দ্রনাথ মুখোপাধ্যায়

সংস্কৃতে কথা আছে যে অজ্ঞানতিমিরে যে অন্ধ, জ্ঞানাঞ্জনের শলাকা দিয়ে তার চক্ষু উন্মীলিত যিনি করতে পারেন তিনিই হলেন গুরু। কাল মার্কসকে যদি বর্তমান যুগের শ্রেষ্ঠ গুরু বলা হয় তো অত্যুক্তি ঘটে না। কারণ ইতিহাসের ধারা বুঝতে হলে, আজকের দুনিয়াকে জানতে হলে, সমাজের গতিপ্রকৃতি সম্বন্ধে সজাগ থাকতে হলে কার্ল মার্কস যে শিক্ষা দিয়ে গেছেন তার অঞ্জন চোখে না মাখলে বাস্তবিকই চোখ খোলে না, ঘটনাপরম্পরার মধ্যে কোনও সংগতি, কোনও বিধি লক্ষ করা যায় না। আমাদের দেশে গুরুবাদ আর কর্তাভজামি এমন কটু হয়ে প্রায়ই দেখা দিয়ে থাকে যে ‘গুরু’ শব্দটি ব্যবহার করতে সংকোচ আসে। তবে গুরুবাদ বলে যে বস্তু এদেশে প্রচলিত তা থেকে মার্কসবাদের প্রভেদ একেবারে চূড়ান্ত। শিষ্যদের কাণ্ডকারখানা দেখে মার্কস একবার উত্যক্ত হয়ে বলেছিলেন ‘কী বাঁচোয়া যে আমি ‘মার্কসবাদী’ নই।’ আন্দোলনের শৃঙ্খলারক্ষার নামে (কখনও কতকটা সংগত কারণে, কখনও বা অসংগতভাবে) মার্কসবাদের বিশুদ্ধ প্রয়োগ নিয়ে গোঁড়ামির যে আতিশয্য বহুবার দেখা দিয়েছে তা একেবারেই মার্কসের অভিপ্রেত ছিল না। মার্কসকে গুরু বলার অর্থ তাই স্থানকালপাত্র নির্বিশেষে তাঁর চিন্তা ও কর্মের আক্ষরিক ব্যাখ্যা নয়। প্রায় যেন পাখিপড়া বুলি আউড়ে যাওয়া নয়। মার্কসের শিক্ষা চিন্তাকে মুক্ত করেছে, আপ্তবাক্যের চাপে তার শ্বাসরোধ ঘটায়নি, শ্রেণীসভ্যতার সহস্র সংস্কারের জটিল জাল থেকে নিস্তার এনে দিয়েছে। অধিকাংশ পাঠকের কাছে ইতিহাস হল ঘটনার পর ঘটনার বর্ণনা। রাজারাজড়ার কীর্তিকলাপের আর যুদ্ধবিগ্রহের ফিরিস্তি, এই যেন ইতিহাসের উপজীব্য। ছাত্রদের পক্ষ থেকে সাধারণ ইতিহাসের প্রতি কর্তব্য সমাপ্ত করা হয় কোনওক্রমে কতকগুলো অবাঞ্ছিত তথ্য কণ্ঠস্থ করে পরীক্ষার খাতায় উদগার করে দেওয়া। শুধু ছাত্রদের কথাই বা কেন, গিবন-এর মতো ঐতিহাসিক-শিরোমণি একবার সখেদে বলেছিলেন যে ইতিহাস যেন মানুষের অপরাধ আর নির্বুদ্ধিতা আর দুর্ভাগ্যের তালিকা। কবি শেলি বর্তমানের ক্লেদ দূর করে ভবিষ্যসমাজ গঠনের স্বপ্ন দেখতেন, কিন্তু তিনিও বলেছিলে ‘অতীতকে নিয়ে পৃথিবী ক্লান্ত; সে-অতীত হয় মরুক নয় একেবারে বিশ্রাম নিক।’ আধুনিককালে মার্কিন দেশের বিখ্যাত শিল্পপতি হেনরি ফোর্ড ইতিহাসকে বলেছিলেন ‘বুজরুকি’ (‘bunk’)। এ-সব কথা যে বলা হয়েছে তার মূল হেতু এই যে ইতিহাসকে ভাবা হয়ে এসেছে শুধু কতকগুলো তথ্যের সমষ্টি, যে তথ্যের মধ্যে কার্যকারণ সম্বন্ধ খোঁজা নিরর্থক, আর যা নাকি নিছক কতগুলি ঘটনা। আবার অনেকে ভেবেছেন যে সবকিছু ঘটেছে ঈশ্বরনির্দিষ্ট পরিকল্পনা অনুযায়ী, যার অর্থভেদ মানুষের অসাধ্য। কেউ কেউ বলেছেন যে মাঝে মাঝে কয়েকজন মহৎ ব্যক্তি আবির্ভূত হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। কিংবা ব্যাপারটাকে শুধু আরও ধোঁয়াটে করে অনেকে গম্ভীরভাবে বলেছেন যে বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন যুগধর্ম ইতিহাসকে পরিচালনা করেছে, অথচ এক যুগের ‘ধর্ম’ আর এক যুগের ‘ধর্ম’ থেকে তফাত কেন তা বোঝাতে পারেননি। এমন অবস্থায় ইতিহাসকে বুজরুকি অপবাদ যে শুনতে হয়েছে, তাতে আশ্চর্যের কিছু নেই।

কার্ল মার্কস ইতিহাসকে এই পণ্ডিতি বিড়ম্বনা থেকে উদ্ধার করেছিলেন। তাঁর আজীবন সহচর ও সহকর্মী এঙ্গেলস তাঁর সমাধিকালে যা বলেছিলেন তার পুনরাবৃত্তি করে বলা যায় যে প্রকৃতিজগতে ডারউইন যেমন বিবর্তনের বিধান আবিষ্কার করেন, তেমনই ইতিহাসের ক্ষেত্রে কৃতিত্ব হল কার্ল মার্কসের। তিনি এই অত্যন্ত সহজ অথচ একেবারে সার কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দেন যে বাঁচতে হলে মানুষকে সবচেয়ে আগে গ্রাসাচ্ছাদন আর বাসস্থানের বন্দোবস্ত করতে হয় – রাজনীতি, শিল্পসাহিত্য, ধর্ম ইত্যাদি ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামানো তা না হলে সম্ভব হয় না। তাই মানুষ কীভাবে উৎপাদন করছে, আর উৎপাদন করতে গিয়ে পরস্পরের মধ্যে কী সম্পর্ক স্থাপিত হচ্ছে, এই হল এক একটা যুগের ইতিহাসের মূল কথা। যুগে যুগে মানুষ কীভাবে কাজ করে এসেছে, বেঁচে থাকার জন্য কীভাবে উৎপাদন চালিয়ে এসেছে, তাদের পরস্পরের সম্পর্ক কীরকম ছিল, এসব জানলে তবেই আমরা তাদের তদানীন্তন রাষ্ট্রব্যবস্থা, সমাজবিধি এবং চিন্তাধারা কী ছিল এবং কেন ছিল তা বোঝার সম্ভাবনা রাখব। মানুষের জীবনযাপনের বাস্তব ধারাকে অনুধাবন করলে তবেই বুঝব যে বারবার কেন যুগ বদলেছে, মন্বন্তরে মনু চলে গেছে-পরিবর্তন কেন আসে এবং কেমন করে সমাজের মানুষই ঘটাতে পারে তা জানতে পারব, সমাজবিকাশের মধ্যে যে বিধান কাজ করে চলেছে তার সন্ধান পাব।

সতত সঞ্চারমান এই বিশ্বে কিছুই অটল অবস্থায় থাকে না, সর্বদাই অদলবদল চলছে। কয়েকশো কোটি বছর আগে পৃথিবীটা ছিল প্রকাণ্ড আগুনের গোলার মতো। জীবন বা জীবনের সম্ভাবনা পর্যন্ত তখনও দেখা দেয়নি। বহু কোটি বছর পূর্বে প্রথম পৃথিবীতে জীবনের আবির্ভাব ঘটল। কয়েক কোটি বছর আগে এখানে প্রচুর গাছপালা আর জলেস্থলে নানারকমের প্রাণী দেখা গেল। আজকের পৃথিবীর সঙ্গে সেদিনকার পৃথিবীর পার্থক্য প্রচুর, কিন্তু আমাদের জানা দরকার যে বহুযুগ ধরে অবিরাম পরিবর্তনের ফলেই পৃথিবীর বর্তমান চেহারা প্রকাশ পেয়েছে।

যুগযুগব্যাপী এই পরিবর্তন আকস্মিকভাবে বা দৈবক্রমে ঘটেনি, হঠাৎ বেখাপ্পা ধরনে ঘটেনি। একটা নিয়মিত বুদ্ধিগ্রাহ্য বিধান অনুসারেই তা হয়েছে। আমরা যদি শুধু আজকের জীবন নিয়েই আলোচনা করি তো সেই বিধানের খোঁজ পাব না। তাই দেখা যায় যে যতদিন পৃথিবীর আদিযুগের খবর অজানা ছিল, যতদিন কোটি কোটি বছর আগেকার প্রাণী ও গাছগাছড়ার দেহাবশেষ ভূগর্ভ থেকে বার করা হয়নি, ততদিন বিদ্বান ব্যক্তিরাও বিশ্বাস করতেন যে হঠাৎ একদিন জগৎ সৃষ্টি হয়েছিল আর গোড়া থেকেই তার চেহারা ছিল মোটামুটি আজকেরই মতোন।

সেদিন পর্যন্ত এ নিয়ে অনেক রূপকথা প্রচলিত ছিল। একজন মস্ত পাদরি বলেছিলেন-আর প্রায় সবাই সে কথায় সায় দিতেন-যে খ্রিস্টজন্মের ৪০০৪ বছর আগে হঠাৎ এক মঙ্গলবার সকাল ৯টা নাগাদ সময়ে ভগবান জগৎ সৃষ্টি করে বসেন! আজ যিনি সামান্য শিক্ষাও পেয়েছেন, তিনি একে আজগুবি আর গাঁজাখুরি বলে হেসে উড়িয়ে দেবেন।

পণ্ডিত-অপণ্ডিত সবাই যে আগে একথা মানতেন, তার কারণ শুধু যথাযথ জ্ঞানের অভাবেই নয়। সমাজে যাদের কর্তৃত্ব, তাদের পক্ষে এরূপ ধারণা খুবই মনঃপূত ছিল। জগৎ যদি নিত্য, সনাতন, শাশ্বত, অপরিবর্তনশীল হয়ে থাকে তাহলে মানুষের সমাজ এবং ভবিতব্য নিশ্চয়ই তাই। আজ যে ব্যবস্থা চলছে, ধনী-নির্ধনের ভেদাভেদের মতো যেসব প্রথা প্রচলিত, তা আগেও ছিল, পরেও থাকবে, বনিয়াদি কোনও অদলবদল সংসারে ঘটে না, ঘটেনি, ঘটবে না-একথা বিশ্বাস করা এবং অপরকে বিশ্বাস করানো সমাজপতিদের পক্ষে একান্ত মূল্যবান তো বটেই।

ভূতত্ব প্রাণিবিজ্ঞান নৃতত্ব প্রভৃতির প্রসারের ফলে একদিন আকস্মিকভাবে অপরিবর্তনীয় জগৎসৃষ্টির রূপকথা ভেঙে গেছে। আর যে-রূপকথা বলে যে সমাজ আজ যেমন আছে, আগেও মোটের উপর তেমনই ছিল, সুতরাং পরেও তাই থাকবে, সেই রূপকথার বিনাশ ঘটাচ্ছে ইতিহাস ও প্রত্নতত্ব। মানুষ আর মানুষের সমাজ যুগযুগ ধরে বদলে আসছে, ভবিষ্যতেও বদলে চলবে – এই হল অমোঘ নিয়ম। ভাঙাগড়ার ইতিহাস হল সমাজের বিবর্তনের ইতিহাস। তাই ইতিহাস দিতে পারে অতীতের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যৎ সম্বন্ধে পূর্বাভাস, সহায়তা করতে পারে ভবিষ্যৎকে নিয়ন্ত্রণ করার শক্তি অর্জনে। ইতিহাস বিনা তাই রাষ্ট্রনীতি পঙ্গু। ইতিহাসবোধ না থাকলে অচেতন অবস্থায় বহু সমস্যা ও পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়ে তাই যেন অন্ধকারে যথাসাধ্য হাতড়ে বেড়াতে হবে।

বহু জ্ঞানী ব্যক্তি বলে এসেছেন এবং আজও বলেন যে ইতিহাসের বিভিন্ন ধারা, চিন্তা, নীতি প্রকাশ পেয়েছে বিশেষ বিশেষ যুগে। অর্থাৎ এক-একটি নীতি বা ধারা এক একটি যুগে আত্মপ্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে মার্কস লেখেন

দৃষ্টান্ত-স্বরূপ ধরা যাক যে (ইয়োরোপে) একাদশ শতাব্দীতে কতৃত্বের নীতি বলবৎ ছিল, ঠিক যেমন অষ্টাদশ শতাব্দীতে দেখা গিয়েছিল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের নীতিকে। সুতরাং তর্কশাস্ত্রের রীতি অনুসারে বলতে হবে যে শতাব্দীকে নীতিই নির্দিষ্ট করেছিল, শতাব্দী নীতিকে নির্দিষ্ট করেনি। অর্থাৎ নীতিই ইতিহাস সৃষ্টি করে, ইতিহাস নীতিকে সৃষ্টি করে না। তবে যদি আমরা নীতি (principle) এবং ইতিহাস উভয়কেই বাঁচাবার জন্য প্রশ্ন করি যে একাদশ শতাব্দীতে এক নীতি এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে অন্য এক নীতি আত্মপ্রকাশ করেছিল কেন, আর উভয় নীতিই বা একই শতাব্দীতে আত্মপ্রকাশ করেনি কেন, তাহলে বাধ্য হয়ে তখনকার খুঁটিনাটি খবর আমাদের খুঁজতে হবে, জানতে হবে একাদশ ও অষ্টাদশ শতাব্দীর মানুষ কেমন ছিল, তাদের সামাজিক জীবনের চাহিদা কী কী ছিল, তাদের উৎপাদনশক্তি কেমন ছিল, উৎপাদনের পদ্ধতিই বা তাদের কীরূপ ছিল, কোন কোন কাঁচামাল নিয়ে তারা উৎপাদন চালাত, আর অবশেষে জানতে হবে তখন মানুষে মানুষে সম্পর্ক কী ছিল…কিন্তু যে-মুহূর্তে আমরা এভাবে মানুষকে তার নিজস্ব ইতিহাসের স্রষ্টা এবং সেই ইতিহাসে অভিনেতা রূপে দেখি, তখনই আমরা যেন এক চক্র ঘুরে ঠিক আসল রওনা হওয়ার জায়গায় ফেরৎ পৌঁছে যাই, কারণ তখন আমরা যে-শাশ্বত নীতি নিয়ে খোঁজ আরম্ভ করেছিলাম তাকে পথে ফেলে দিয়ে এসেছি।

এখনও শোনা যায় যে এক-একটি নীতি বা ভাবধারা বা চিন্তার প্রকাশ এক একটি যুগকে শুধু চিহ্নিত করা নয় তাকে প্রকৃত পক্ষে সৃষ্টি করেছে – যেমন কোনও একটি যুগ হল ধর্মবিশ্বাসের কিংবা যুক্তিবাদের যুগ। আমাদের দেশে সুপরিচিত ইংরেজ ঐতিহাসিক জি. এম. ট্রেভেলিয়ন একবার প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পর্যন্ত ইয়োরোপের তিনশো বছরের ইতিহাসে মূল বৈশিষ্ট্য দেখেছিলেন স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার লড়াইয়ে, এবং গর্বভরে জানিয়েছিলেন যে ওই যুগে তাঁর স্বদেশ ইংল্যান্ড চারবার ইয়োরোপকে বাঁচিয়েছে – স্পেনের দ্বিতীয় ফিলিপ, ফ্রান্সের চতুর্দশ লুই এবং নেপোলিয়ন, আর জার্মানির কাইজার উইলিয়ামের হাত থেকে বাঁচিয়েছে। ইতিহাস আলোচনায় এ-ধরনের গুরুগম্ভীর অথচ সত্যই হাস্যকর কথা পণ্ডিতদের কাছ থেকে প্রায়ই শোনা গিয়েছে। এই অবান্তর বাকবিলাস থেকে আর যাই জানা যাক, ইতিহাসের মর্মবস্তু সম্পূর্ণ অজ্ঞাত থেকে যায়। তথ্য সংগ্রাহকদের চিন্তায় এই যে তারল্য, মার্কস তাকে কশাঘাত করেছেন। ইতিহাসের প্রকৃতি অনুধাবন করে যে প্রতীতি তাঁর এসেছিল তা হল এই যে যুগে যুগে মানুষের বাস্তব জীবনব্যবস্থার ছাপ পড়েছে তার চিন্তা, তার স্বপ্ন, তার আদর্শ, তার ধ্যানধারণার উপর। চিন্তা কর্মকে নির্ণীত করে না, কর্মই চিন্তাকে নির্ণীত করে, চেতনা জীবনকে নিয়ন্ত্রিত করে না, জীবনই চেতনাকে নিয়ন্ত্রিত করে।

অ্যাডাম স্মিথ, রিকার্ডো প্রমুখ মনীষীদের প্রতি মার্কস প্রগাঢ় শ্রদ্ধা পোষণ করতেন, কিন্তু ইতিহাসবিষয়ে তাঁদের শৈথিল্য মার্জনা করতে পারেননি। এঙ্গেলস একবার কৌতুক করে লেখেন যে এইসব বিরাট পণ্ডিতেরা যখন কিছু বলেন তখন মনে হয় যে যদি ইংল্যাণ্ড একাদশ শতাব্দীতে ‘সিংহহৃদয়’ রাজা রিচর্ড একটু অর্থনীতির খোঁজ রাখতেন তাহলে ৬০০ বছরের বিড়ম্বনা এড়ানো যেত, কারণ রিচর্ড তাহলে আর খ্রিস্টানদের হয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে (ক্রুসেডস) সময় নষ্ট না করে দেশে দেশে স্বাধীন বাণিজ্যের ব্যবস্থা করতে পারতেন, আর ইয়োরোপ স্বস্তিতে থাকত।

কমিউনিস্ট ইস্তাহার-এর প্রারম্ভেই বলা হয়েছে ‘আজ পর্যন্ত মানুষের বহুবিধ সমাজ দেখা দিয়েছে এবং তাদের সকলেরই ইতিহাস হল শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস।’ পাদটিকায় এঙ্গেলস জানিয়েছেন যে এখানে ইতিহাস বলতে বোঝাচ্ছে ‘লিখিত ইতিহাস’, কারণ ১৮৪৭-৪৮ সালে প্রাগৈতিহাসিক যুগের বৃত্তান্ত খুবই অস্পষ্ট ছিল। সেই প্রাগৈতিহাসিক যুগে রাষ্ট্র ছিল না, তার প্রয়োজনও ছিল না। রাষ্ট্রের আবির্ভাব হল তখনই, যখন মানুষের উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নিছক ব্যক্তিগত প্রয়োজনের অতিরিক্ত উৎপাদন উপভোগ নিয়ে প্রশ্ন উঠল। তখনই শ্রেণীবিভাগ সমাজে প্রথম দেখা দিল, শোষক ও শোষিতের কাহিনি, অত্যাচারী ও অত্যাচারিতের বিবরণ আরম্ভ হল। অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতোই রাষ্ট্র স্বয়ম্ভূ, সনাতন, নিত্যস্থায়ী কিছু নয়। সমাজপতিরা জেঁকে বসার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কর্তৃত্ব চালু রাখার হাতিয়ার হল রাষ্ট্রব্যবস্থা। তখনই মানুষের যে-ইতিহাস আমরা মোটামুটি জানি তার সূচনা হল, আর তখন থেকেই নানা প্রকরণে শ্রেণীসংগ্রামেরও বিরতি নেই।

অন্যান্য প্রাণী থেকে স্বতন্ত্র হওয়ার পর মানুষকে বহু লক্ষ বছর ধরে জানোয়ারদের সঙ্গে লড়তে হয়েছে, প্রকৃতি-জগতের প্রতিকূলতাকে প্রশমিত করতে হয়েছে। এ-কাজ মানুষ কোনও বিশেষ অধ্যাত্মগুণের অধিকারী বলে করেনি; নিছক বাঁচার তাগিদেই তাকে ক্রমাগত লড়াই করে যেতে হয়েছে। এই লড়াইয়ের ফলেই মানুষ উৎপাদন করতে শিখেছে – একদা যে শুধু গাছের ফল আর জানোয়ারের কাঁচা মাংস খেয়ে জীবনধারণ করত, সেই মানুষ ক্রমে ভূগর্ভ থেকে খাদ্য উৎপাদন করতে শিখেছে, আগুনের ব্যবহার জেনেছে, শীত বর্ষা গ্রীষ্মের প্রকোপ থেকে নিস্তার খুঁজতে গিয়ে বহু পরীক্ষার পর ঘর বানাতে পেরেছে, পরনের কাপড় তৈরি করেছে, সেই মানুষই শিকারের উদ্দেশ্যে পাথরের অস্ত্র ব্যবহার করতে করতে কয়েক লক্ষ বছরের চেষ্টার পর অন্য ধাতুর সন্ধান পেয়েছে। আমাদের পূর্বপুরুষদের যে-সংগ্রামের বিবরণ মনোমুগ্ধকর ; তার সংক্ষিপ্ত পরিচয়ও এখানে দেওয়ার চেষ্টা সম্ভব নয়। শুধু বলা দরকার যে বাঁচার লড়াই চালাতে গিয়েই সভ্যতার জন্ম হয়েছে ; আদিম শিল্পে – যেমন গুহাগাত্রে ছবি কিংবা বহুজনের মিলিত নৃত্যে – ঠিক সেই বাস্তব জীবনেরই রূপ আমরা দেখি। ‘অমৃতের পুত্র’ হয়ে জন্মে মানুষ যে অকস্মাৎ ভগবৎকৃপায় সভ্যতার ইমারৎ বানাতে লেগেছিল তা একেবারেই নয়। খ্রিস্টান ধর্মশাস্ত্রে বলে যে প্রথমে আবির্ভূত হল বাক্য (In the beginning was the Word)- অনেকটা হিন্দু চিন্তায় ‘ওঁ’ শব্দেরই মতো। কিন্তু আসলে বাক্য নয় কার্য-নিছক বেঁচে থাকার তাগিদে কাজের মধ্যে দিয়েই মানুষের ইতিহাস শুরু হয়েছে। জীবন স্থাণু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে না, তাই একান্ত সংকীর্ণ ও বিশিষ্ট পরিবেশে বসবাসকারী, ক্রমশবিরল আদিম গোষ্ঠী ব্যতিরেকে সর্বত্র উৎপাদনপদ্ধতিতে পরিবর্তন ঘটে চলেছে। উৎপাদনে উন্নতির মূল্যও মানুষকে দিতে হয়েছে প্রচণ্ড। আদিম সমাজে রাষ্ট্র ছিল না, দণ্ড ছিল না, জুলুম-জবরদস্তির অধিকার কয়েকজনের হাতে ন্যস্ত ছিল না, কতকটা অভ্যাসের বশে এবং সম্মানী ব্যক্তিদের প্রভাবে সমাজ নিয়ন্ত্রিত হত। উৎপাদনবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে যখন একজনের পরিশ্রম-ফল অপরের পক্ষে বিনা পরিশ্রমে ভোগ করার বাস্তব সম্ভাবনা দেখা দিল, তখন সেই অতিরিক্ত উৎপাদন গ্রাস করল কিছু লোক যারা হল সমাজপতি, যারা পরশ্রমভোগী হয়ে নানা কৌশলে নিজেদের বিশেষ অধিকার সাব্যস্ত করতে লাগল। এই সময় থেকেই দাসপ্রথা পরিলক্ষিত হয়, আর তখন থেকেই চলে এসেছে শ্রেণীকর্তৃত্ব ও শ্রেণীদ্বন্দ্ব। দাসপ্রথা, ভূমিদাসপ্রথা, জায়গিরদারি, জমিদারি, পুঁজিদারি-সকল ব্যবস্থারই বৈশিষ্ট্য হল যে সমগ্র জনতার তুলনায় নিতান্ত অল্পসংখ্যকের কর্তৃত্ব বজায় রাখার চেষ্টা চলেছে; আধুনিক যুগে গণতন্ত্রের মুখোশ এঁটেও শ্রেণীশাসনের প্রকৃত রূপকে ঢেকে রাখা সম্ভব হয়নি।

গ্রিসের মহামনীষী প্লেটো ও অ্যারিস্টটল বলেছিলেন যে দাসপ্রথা একান্ত স্বাভাবিক, প্রতিদিন সুর্যোদয়-সূর্যাস্তের মতোই অকাট্য। তৎকালীন সভ্যতার পিলসুজ হয়ে ছিল দাসের দল, উপরে জ্বলত সভ্যতার প্রদীপ আর তারই ঠিক নীচে অন্ধকারে দাসেরা মেহনতের জোরে সেই সভ্যতাকে টিকিয়ে রাখত। মাঝে মাঝে ক্ষীণ কবিকণ্ঠে দাসপ্রথা নিন্দিত হয়েছিল বটে, কিন্তু সংগঠনের পথে অপার বাধা সত্বেও দাসেরা বারবার অভ্যুত্থান করেছিল বলেই ক্রমে তা অবলুপ্ত হয়েছিল। মহানুভবদের করুণায় তা ঘটেনি, ঘটেছে কঠোর অকরুণ শ্রেণী-সংঘাতের ফলে। অধিকারীশ্রেণী যখন বুঝল যে আগেকার কায়দায় দাসদের পদানত রাখা আর চলে না তখনই সে-প্রথা রদ হতে লাগল। আজও এমন অঞ্চল আছে যেখানে শ্রেণীসংগ্রাম ওই পর্যায়ে উঠতে পারেনি বলে দাসপ্রথাও বহাল আছে।

দাসপ্রথা থেকে ভূমিদাসপ্রথার বিবর্তন একটা বিপ্লব বটে, কিন্তু তখনও শোষণ ব্যবস্থার অবসান ঘটতে বহু বিলম্ব- মাত্র শোষণের পদ্ধতিতে কিছু পরিবর্তন এসেছিল। তখন সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী হল জায়গিরদার-জমিদার গোষ্ঠী; রাজাকে পর্যন্ত তাদের সহায়তা ও সমর্থনের উপর নির্ভর করতে হল; ধর্মযাজকরা মঠ বা গির্জার সংলগ্ন জমির উপর দখল নিয়ে বসল। দেশে দেশে সমান্ততন্ত্রের চেহারা কিছুটা পৃথক হলেও সর্বত্র তখন গ্রাম্যজীবনের ছাপ ছিল বেশি, কৃষিকর্মই প্রধান বৃত্তি। মুষ্টিমেয় শহরবাসীর চাহিদার জন্য, রাজা এবং পারিষদদের বিলাসব্যসনের দ্রব্য উৎপাদনের জন্য, ছোট ছোট কারখানা কিছু ছিল। ক্রমশ বাণিজ্যের প্রসার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শহরের গুরুত্ব বাড়তে লাগল, তবে জীবনের গ্রন্থি বাঁধা ছিল গ্রামের সঙ্গে শহরগুলো কিছুটা যেন বেখাপ্পা অবস্থায় রয়ে গেল। সামন্ততান্ত্রিক যুগের পূর্বেও অবশ্য দেশে দেশে বাণিজ্যের বহু দৃষ্টান্ত আছে; প্রাচীন ভারতবর্ষ তো পশ্চিম এশিয়া ও রোম সাম্রাজ্যের সঙ্গে ব্যাবসা করত। কিন্তু ‘ফিউডল’ (সামন্ত্রতান্ত্রিক) যুগের শেষ দিকে বাণিজ্যের প্রসার ইয়োরোপের শহরগুলিতে নতুন এক স্তরে উপনীত হল। অজ্ঞাতপূর্ব এক সামাজিক শ্রেণীর তখন উদ্ভব হল যারা ‘বুর্জোয়া’ (‘নগরবাসী’), যারা জায়গিরদারি ব্যবস্থায় বাণিজ্যের ক্ষতি লক্ষ করে প্রায়ই জায়গিরদারদের ক্ষমতায় ঈর্ষান্বিত এবং কথঞ্চিৎ বিপন্ন রাজাকে সাহায্য করল, নিজস্ব অধিকার আদায় করল, আর চেষ্টা করল যাতে গোটা দেশে একধরনের শাসন স্থাপিত হয়, ব্যাবসার মাল লেনদেন করতে গিয়ে নানান জমিদারের এলাকায় নানাবিধ শুল্ক না দিতে হয়, আর দরকারমতো গ্রামাঞ্চল থেকে কারিগর জোগাড় করা যায়, হরেক রকম খাজনা, ভেট, বেগারি, মাঝে মাঝে জমিদারের হুকুমে তার হয়ে যুদ্ধে যাওয়া ইত্যাদি দায় থেকে নিস্তার পাবে। শহর আর বাণিজ্য বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বোঝা গেল যে আর খুব বেশিদিন সামন্ত্রতন্ত্র টিকবে না।

মুসলমানদের দখল থেকে খ্রিস্টান তীর্থগুলোকে উদ্ধার করার যে লড়াই বহুদিন ধরে চলছিল (ত্রুসেডস) তার টান শুধু ধর্মের নয়, অর্থেরও। এর আনুষঙ্গিক ফল হল বাণিজ্যের বৃদ্ধি, এশিয়ার ঐশ্বর্য দেখে ইয়োরোপের বিস্ময়, আর কিছু পরে অগাধ দৌলতের দেশ বলে বিখ্যাত ভারতবর্ষে পৌঁছাবার জলপথ খুঁজতে গিয়ে কলম্বাস করলেন আমেরিকা আবিষ্কার, আর দুশো বছর ধরে বহু নৌঅভিযান চলল। ক্যাথলিকদের ধর্মগুরু পোপ নবাবিষ্কৃত দেশগুলোকে দুই ভক্ত দেশ স্পেন এবং পর্তুগালের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে দিলেই ইংল্যান্ড, হলান্ড প্রভৃতি খুব খাপ্পা হয়ে ওঠে, পোপকে অমান্য করে প্রটেস্টান্ট হওয়ার একটা বড় কারণ হল তাই। যাই হোক, অর্থনীতির ধাত আর উৎপাদনপদ্ধতি বদলাবার সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাস বদলাতে লাগল, যার প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত মিলছে ইংল্যান্ডের ক্ষেত্রে। টিউডর শাসনের যুগে (১৪৮৫-১৬০৩) পশম আর পশমি দ্রব্যের ব্যবসা খুবই লাভজনক হওয়ায় চাষের জমি থেকে চাষিকে খেদিয়ে মেষপালনের বন্দোবস্ত হয়, মস্ত বড় এলাকা (enclosure) ঘিরে একটা রাখাল রাখলেই কাজ চলত বলে চাষিদের উৎখাত করা হল, তারা সর্বস্বান্ত হয়ে বেকারের ভিড় বাড়ালো শহরে, সেখানে ‘ভবঘুরে’ অপরাধে তাদের বেত্রাঘাত ও অন্যান্য শাস্তি দেওয়া হল – মানবপ্রেমিক টমাস মূর তাঁর ‘ইউটোপিয়া’ গ্রন্থে তাই লিখলেন ‘মানুষকে ভেড়ার দল গিলে খাচ্ছে।’ এই ব্যবসা জাঁকিয়ে চালাবার জন্য ক্যাথলিক গির্জা আর মঠগুলোর বিপুল ভূসম্পত্তি কেড়ে নেওয়া হল, রাজাকে যারা এ কাজে সাহায্য করেছিল তাদের মধ্যে এই সম্পত্তি বণ্টন করা হল, নতুন এক ধনবান সম্প্রদায় সৃষ্টি হল। টিউডরের পর স্টুয়ার্ট যুগে (১৬০৩-৮৮) বাণিজ্য এবং তৎসম্পর্কিত পেশা থেকে যাদের উপার্জন তারা রাজা এবং তাঁর অভিজাত বন্ধুদের হাত থেকে দেশশাসন এবং প্রধানত বাণিজ্যনীতি নির্ধারণ ব্যাপারে কর্তৃত্ব করতে গিয়ে যে লড়াই চালায় (১৬৪২-৬০), তাতেই রাজা প্রথম চার্লস-এর প্রাণ যায়, পার্লামেন্টের ক্ষমতা বাড়ে। মধ্যযুগে, যখন সামন্ততন্ত্র ছিল প্রধান, তখন রাষ্ট্রশাসনবিষয়ে যাদের কোনও ক্ষমতা ছিল না, সেই শ্রেণীই এসে সপ্তদশ শতাব্দীতে এই বিপ্লব ঘটিয়েছিল।

এর চেয়ে বনিয়াদি ঘটনা হল ফরাসি বিপ্লব (১৭৮৯-৯৫), যার ক্ষেত্র প্রস্তুত হচ্ছিল কিছুকাল আগে থেকে। ১৭৬০ সাল নাগাদ শিল্পে, উৎপাদনপদ্ধতিতে বাষ্পায়ন ইত্যাদি নতুন বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের প্রয়োগ আরম্ভ হল, উৎপাদনের পরিমাণ যন্ত্রের সহায়তায় পূর্বের তুলনায় অভাবনীয় ধরনে বৃদ্ধি পেল। ইতিমধ্যে পশ্চিমের বহু জাতির বণিক ও নাবিক মিলে এশিয়ায় (ভারত ও অন্যত্র) এবং আমেরিকায় হাজির হয়ে সেখানকার দৌলত লুঠ করে আনতে পেরেছিল বলে বড় বড় কারখানা ফাঁদার পক্ষে প্রয়োজনীয় টাকাও ইয়োরোপের শ্রেষ্ঠীদের হাতে মজুদ ছিল। এ জন্যই যে বাষ্পযান সম্বন্ধে দু-হাজার বছর পূর্বেকার বৈজ্ঞানিকদের স্পষ্ট ধারণা থাকা সত্বেও তার ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটেনি, সেই বাষ্পযানের কদর হল। লোভী ধনবানেরা চাষির জমি কেড়ে তাকে উৎখাত করার ফলে একদিকে পেটের দায়ে বহু লোক মজুরি খুঁজছিল, আর অন্য দিকে নানা দেশে বাণিজ্য করে এবং সওদাগরের ছদ্মবেশে সাম্রাজ্যস্থাপনের প্রথম ধাপ পার হয়ে সেখানকার টাকা আর কাঁচামাল শ্রেষ্ঠীরা ইয়োরোপে চালান দিচ্ছিল বলে শিল্পবিপ্লব হল, ঘটল ধনিকের আবির্ভাব, প্রবর্তিত হল বুর্জোয়া যুগ, সঙ্গে সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক যুগের অবসান ঘটল। ক্যাপিটাল গ্রন্থের ঐতিহাসিক অধ্যায়ে আছে কার্ল মার্কসের অবিস্মরণীয় উক্তি ‘টাকা দুনিয়ায় প্রথম আসে তার গালে জন্মসময়ের রক্তের ছাপ নিয়ে, কিন্তু পুঁজি যখন এসে হাজির হয় তখন তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত, প্রতি লোমকূপ থেকে রক্ত আর ক্লেদ ঝরতে থাকে।’ সেই পুঁজির চেহারা যে কত বীভৎস আর অমানুষিক হতে পারে তা যারা আজ অ্যাটম আর হাইড্রোজেন বোমার হুমকি দিয়ে গোটা দুনিয়াটা কব্জা করে রেখে নিজের মুনাফার পাহাড়কে ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলতে চায়, যারা ভিয়েতনামের অকুতোভয় মুক্তিকামনাকে পরাজিত করার জন্য অমানুষিকতার চূড়ান্ত করতে পশ্চাৎপদ নয়, তাদের দিকে নজর দিলেই জানা যাবে।

কমিউনিস্ট ইস্তাহার-এ ঘোষিত হয়েছিল

আজ পর্যন্ত মানুষের যত সমাজ দেখা গেছে তাদের সকলের ইতিহাস হল শ্রেণীসংগ্রামের ইতিহাস। স্বাধীন মানুষ ও দাসগণ, অভিজাত ও সাধারণ লোক, মধ্যযুগের ‘গিলড’ (কারিগর-সংস্থা) প্রতিষ্ঠানের কর্তারা ও তাদের মেহনতকারি কর্মচারীরা, এক কথায় প্রতি যুগের অত্যাচারী ও অত্যাচারিত শ্রেণী সর্বদা পরস্পরের প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, অবিরাম লড়াই চালিয়েছে, কখনও আড়ালে আবার কখনও মুখোমুখি হয়ে।…’ফিউডল’ সমাজের ধ্বংসাবশেষ থেকে আধুনিক যে বুর্জোয়া সমাজ জন্ম নিয়েছে, তার সঙ্গে সঙ্গে শ্রেণীবিরোধ স্তব্ধ হয়ে যায়নি। নতুন সমাজ শুধু প্রতিষ্ঠা করেছে নতুন শ্রেণী, অত্যাচারের নতুন ব্যবস্থা। পুরাতনের বদলে সংগ্রামের নতুন ধরন। আমাদের যুগ অর্থাৎ বুর্জোয়া যুগের বৈশিষ্ট্য হল এই যে শ্রেণীসংগ্রাম এখন সরল হয়ে এসেছে। গোটা সমাজ ক্রমেই দুটো বিশাল শিবিরে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে-বুর্জোয়া ও প্রলেটেরিয়ট (সর্বহারা) এই দুই বিরাট শ্রেণী সোজাসুজি পরল্পরের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছে।

ইতিহাস পর্যালোচনা করে মার্কসবাদ লক্ষ করেছে যে এক একটি যুগে উৎপাদনের যে পদ্ধতি প্রচলিত, তারই আনুষঙ্গিক রূপে উৎপাদনের ফলে প্রতিষ্ঠিত বিভিন্ন মানুষের পরস্পর সম্পর্কের বিষম অসংগতি ক্রমশ প্রকট হয়ে ওঠে। বুর্জোয়া যুগের উৎপাদনপদ্ধতি বিজ্ঞানের কল্যাণে এমনই শক্তিশালী যে উৎপাদন ফল সকল মানুষের জীবনে স্বস্তি আনবার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু বুর্জোয়া যুগে উৎপাদনসম্পর্ক এমন, অর্থাৎ বুর্জোয়া ও প্রলেটেরিয়ট, বিত্তবান ও নির্বিত্ত, মালিক ও মজুরের সম্পর্ক এমন যে যথাসম্ভব বেশি মুনাফার লোভে মালিক মজুরকে যথাসম্ভব বেশি শোষণের চেষ্টা করে এবং মজুর একজোট হয়ে শ্রেণীস্বার্থ-রক্ষার লড়াইয়ে নেমে ক্রমশ বুঝতে পারে যে বুর্জোয়া শ্রেণীরই উচ্ছেদ-বিনা তার স্বস্তি বা সুখের কোনও সম্ভাবনা নেই। এই পরস্পরবিরোধী শ্রেণীস্বার্থে যে অবিরাম সংঘাত চলতে থাকে, তারই চরম চেহারা দেখা যায় বিপ্লবের সময়, যখন প্রাচীন সমাজশক্তি নবীনের কাছে পরাজিত হয়, যেমন হয়েছিল ১৯১৭ সালে সোভিয়েত বিপ্লবে। সমাজের আভ্যন্তরীণ এই সংঘর্ষ একসময় এমনই পরিণতির পরিস্থিতিতে উপনীত হয় যে (কার্ল মার্কসের কথার প্রতিধ্বনি করে বলা যায়) সামাজিক কাঠামোর ভিতরকার গ্রন্থিগুলি ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়, তৎকালীন কর্তৃপক্ষীয় শোষকদের অন্ত্যেষ্টির দিন এসে উপস্থিত হয়, যারা শ্রমিকদের উৎখাত করেছিল, সবদিক থেকে বঞ্চিত করে রেখেছিল, তারা নিজেরাই উৎখাত হয়ে যায়।

মার্কসের মতে ইতিহাসের শিক্ষা হল এই যে শ্রেণীসমাজের মধ্যে তারই দেহসম্ভূত অসংগতি ঠিক যেন মাতৃগর্ভে নবজাতকের আবির্ভাব ও জন্মের মতো নতুন সমাজের আবির্ভাব ও জন্মের মধ্য দিয়ে পরিপূরিত হয় এবং তখনই সমাজের ইতিহাসের নতুন অধ্যায় আরম্ভ হয়। ১৮৫৬ সালে মার্কস লিখেছিলেন

আমাদের যুগে প্রত্যেক বস্তুই যেন তার বিপরীত, যা তার সঙ্গে একাত্মভাবে যুক্ত হয়ে রয়েছে। আমরা দেখছি, যে-যন্ত্র মানুষের পরিশ্রমের লাঘব ঘটাবার এবং তাকে সুফলপ্রসূ করার আশ্চর্য শক্তি রাখে, সেই যন্ত্র মানুষকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করাচ্ছে অথচ উপবাসী রাখছে। কোন এক বিস্ময়কর মোহমন্ত্রে যেন সম্পদের নব রীতিসিদ্ধ উৎসগুলি অভাবের উৎসে পরিণত হচ্ছে। মানুষ যখন প্রকৃতির উপর প্রভুত্ব বিস্তার করতে পারছে, তখনই সে যেন অপর মানুষের কিংবা নিজেরই কলঙ্কের দাস হয়ে পড়ছে। তবে আমরা জানি যে সমাজের নতুন ঢঙের যে শক্তি আজ এসেছে তাকে যদি সন্তোষজনক কাজে লাগাতে হয় তাহলে নতুন ঢঙের মানুষকে দিয়েই সেই শক্তি নিয়ন্ত্রিত করতে হবে – আর এই নতুন ঢঙের মানুষ হল মেহনতি মানুষ। যন্ত্রের মতোই এই মেহনতি মানুষ হল আধুনিককালের আবিষ্কার।

ইতিহাসের নিগূঢ় বাস্তব বিশ্লেষণ দ্বারা মার্কস এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন এবং নিঃসংকোচে ঘোষণা করেছিলেন তাঁর নিঃসংশয় ভবিষ্যদ্বাণী – উৎপাদন-পদ্ধতির রূপান্তরের সঙ্গে সঙ্গে পূর্বতন উৎপাদনসম্পর্কে যখন আর সামঞ্জস্য থাকে না তখন বিপ্লব অবশ্যম্ভাবী। এই ব্যাখ্যাতে অসন্তুষ্ট হয়ে কেউ কেউ বলার চেষ্টা করেছেন যে মার্কসের কাছে মানুষ হল গৌণ, মুখ্য বস্তু হল ইতিহাস বলে প্রায় যেন এক মনঃসৃষ্ট ধারণা-উৎপাদনব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গেই যদি যুগান্তর ঘটে তো মানুষ হল নিষ্ক্রিয়, তার নাগালের বাইরে কোনও এক গূঢ় শক্তির হাতের পুতুল মাত্র। মার্কসের রচনাবলি থেকে বিচ্ছিন্নভাবে কোনও একটি বাক্য তুলে ধরে এই আপত্তিকে যুক্তিসংগত বলে প্রচার করা দুরূহ নয়। ‘ক্যাপিটাল’-এ আছে এমন কথা যে ইতিহাস ‘অমোধ লৌহগতিতে তার অনিবার্য পরিণতির দিকে অগ্রসর হচ্ছে।’ কিন্তু শুধু বিচ্ছিন্নভাবে উদ্ধৃতি তুলে ধরা সততার পরিচয় নয়, আর আজ একশো বছরেরও বেশিকাল মার্কসের সমালোচকরা পাণ্ডিত্য দেখালেও প্রকৃত সততা দেখিয়েছেন অতি কদাচিৎ। জনসমষ্টির সক্রিয়, সদাচলমান আন্দোলন বিনা যে যুগান্তর সম্ভব নয়, তা মার্কস বহুবার বলেছেন, বুঝিয়েছেন, নিজের জীবনে ও কর্মে প্রমাণ করেছেন, সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তির অবদানকে অস্বীকার করা দূরে থাক তাকে অকুণ্ঠ স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে মার্কসবাদের শিক্ষা হল এই যে ইতিহাসের বিধি যথাসম্ভব জানতে পারার উপর মানুষের স্বাধীন কর্মপ্রচেষ্টা সার্থক হওয়ার সম্ভাবনা নির্ভর করছে। সেই বিধির পরিধি না জানা থাকলে মানুষের পক্ষে সফল কর্মে নিরত হওয়া সম্ভব নয়। শুধুমাত্র স্বাধীন চিন্তার জোরে কেউ কি প্রকৃতির বিধান অগ্রাহ্য করে নিজের শরীরের দৈর্ঘ্যে একহাত বৃদ্ধি ঘটাতে পারে? পদার্থবিজ্ঞানের বিধি অনুযায়ী মানুষের পক্ষে স্বয়ং আকাশে উড়ে যাওয়া অসম্ভব জেনে তবেই মানুষ আকাশযানে বিচরণ করতে শিখেছে। ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা মানুষকে খর্ব করে না, তার মহিমাকে প্রতিষ্ঠিত করে বৈজ্ঞানিক ভিত্তিভূমির উপর।

নিকৃষ্ট স্তরের সমালোচকদের পক্ষ থেকে কুৎসা রটানো হয়েছে যে মার্কসের মতো মানুষ হল স্বার্থপর, নিছক অর্থনীতিগত উদ্দেশ্যে তারা কাজ করে, অর্থাৎ মার্কসবাদ উদার মানবতার ইতিবৃত্তকে নস্যাৎ করে দেয়। কিন্তু কখনও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ওই ধরনের নিরেশ কথা বলে না। দৃষ্টান্তস্বরূপ বলা যায়, ফরাসি বিপ্লবকালে ‘জিরন্দ’ দল সম্পর্কে মার্কসবাদী ঐতিহাসিক যখন লেখেন তারা নিজেদের শ্রেণীর কর্তৃত্ব বাকি সকলের উপর চাপাবার জন্যই ব্যস্ত ছিল, তখন হয়তো ‘সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতা’-র বাণীতে মুগ্ধ হয়ে কেউ বলতে পারেন যে কন্দর্সের মতো দার্শনিক কখনও শুধু শ্রেণীস্বার্থের দ্বারা পরিচালিত হতেন কল্পনাও করা যায় না, সুতরাং তাঁর দলের কাজকে ওইভাবে চিহ্নিত করা অপবাদ মাত্র। কিন্তু মার্কসবাদী ঐতিহাসিকের কাছে নিছক ব্যক্তিগত অভিপ্রায় অনুসন্ধান করা একটা গৌণ ব্যাপার; ইতিহাসের মঞ্চে যারা নেমেছেন তাঁদের বিচার হবে বাস্তব কৃতকর্মের ভিত্তিতে – এ জন্যই লেনিন একবার বলেন যে কোনও একজন ব্যক্তি খুবই ‘আন্তরিক’ (sincere)-ভাবে কাজ করে থাকতে পারেন, কিন্তু আন্তরিকতার পরিমাপ করতে পারে এমন যন্ত্র (sincerometer) যখন আমাদের নেই তখন কাজই হবে বিচারের মানদণ্ড, কারণ কাজ হল বাস্তব ব্যাপার, তার হদিস পাওয়া কঠিন নয়। ইতিহাস আলোচনায় মুখ্য কর্তব্য হল জানার চেষ্টা করা যে কেন একটা বিশেষ সময়ে একটা বিশেষ আদর্শ বহুজনের মনে স্থান পেল। মার্কসবাদ এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে আদর্শ আকাশ থেকে টুপ করে পড়ে মনের ভিতর ঢোকে না, কিংবা হঠাৎ আপনা-আপনি মাটি থেকে গজিয়ে ওঠে না – জীবনের বাস্তব পরিস্থিতি থেকেই তার উদ্ভব। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ যদি বলত যে মানুষ সর্বদা তার স্বার্থসাধনের জন্যই কাজে নামে তো নিশ্চয়ই তা হাস্যকর হয়ে দাঁড়াত। স্বয়ং মার্কস ‘ক্যাপিটাল’-এর প্রথম খণ্ড লেখা শেষ করে একটা চিঠিতে লিখেছিলেন যে ‘ষাঁড় হয়ে জন্মালে’ তিনি নিশ্চয়ই সব কিছু ভুলে ওই গ্রন্থ রচনায় কায়মনোবাক্যে লাগতে পারতেন না।

মানুষ ইতিহাস সৃষ্টি করে না ইতিহাস মানুষকে গড়ে, এ-প্রশ্নের উত্তর মার্কস-এঙ্গেলস খুবই স্পষ্টভাবে দিয়েছেন ‘মানুষ ইতিহাস গড়ে, তবে যেমন খুশি তেমনভাবে নয়।’ তাঁরা একবার লেখেন ইতিহাস কিছু করে না; তার বিপুল সম্পদ নেই; ইতিহাস যুদ্ধ করে না, এসব কাজ করে মানুষ, জীবন্ত, সক্রিয় মানুষ – তারই আছে সম্পদ, সেই যুদ্ধ করে। ‘ইতিহাস’ কোনও একটি ব্যক্তির মতো নিজের উদ্দেশ্যসাধনের জন্য মানুষকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে না। নিজেদের উদ্দেশ্যসাধনে মানুষের কার্যকলাপ ছাড়া ইতিহাস আর কিছু নয়।

পবিত্র পরিবার

মানুষের মহিমা, মানবমাহাত্ম্যের বিভূতি কার্ল মার্কসের বাক্যে ও কর্মে জাজ্বল্যমান হয়ে রয়েছে। ইতিহাস অনুধাবন করেই মার্কসবাদ একদিকে যেমন নভোচারিতাকে বর্জন করতে চেয়েছে তেমনই অপর দিকে বলেছে ‘অকাট্য বিধির রাজ্য থেকে স্বাধীনতার রাজ্যে মানুষের উত্তরণ’-এর কথা (the ascent of man from the kingdom of necessity to the kingdom of freedom)।

অর্থনৈতিক উৎপাদনের উপর সব চেয়ে বেশি জোর দিলেও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বলে না যে ইতিহাসে অন্যান্য শক্তির মূল্য নেই, বলে না যে একই সোজা, বাঁধা রাস্তা দিয়ে মানুষের বিবর্তন ঘটেছে এবং ঘটবে। বরঞ্চ মার্কসের শিক্ষা হল এই যে ইতিহাস হল পরস্পরসম্বন্ধ অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ঘটনাবলীর জটিল সমাবেশ। ১৮৯০ সালের ২১ সেপ্টেম্বর এঙ্গেলস এক চিঠিতে লেখেন

ইতিহাসের বস্তুবাদী ব্যাখ্যা অনুসারে ইতিহাসনিয়ন্ত্রণে চরম শক্তি হল বাস্তব জীবনে উৎপাদন ও পুনরুৎপাদন। মার্কস কিংবা আমি এর বেশি কিছু কখনও দাবি করিনি। সুতরাং যদি কেউ আমাদের কথা বিকৃত করে বলে অর্থনীতি হল ইতিহাসনিয়ন্ত্রিত একমাত্র শক্তি, তাহলে সেটা হবে অর্থহীন, অবান্তর এবং উদ্ভট। অবশ্য অর্থনৈতিক পরিস্থিতি হল বনিয়াদ, কিন্তু সেই বনিয়াদের উপর যেসব বিভিন্ন কামরা বানানো হয় – যেমন শ্রেণীসংগ্রামের রাজনৈতিক চেহারা এবং তার ফলাফল, জয়ের পর বিজয়ী শ্রেণী কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত সংবিধান ইত্যাদি, আইনকানুনের রকমফের, এমনকি তারপর সংগ্রামে যারা অংশ গ্রহণ করছে তাদের মস্তিষ্কে বাস্তব সংগ্রামের প্রতিফলন, রাষ্ট্রনীতি, শাসনবিধি, দর্শনবিষয়ক মতবাদসমূহ, ধর্মচিন্তা এবং অকাট্য সিদ্ধান্তের মধ্যে সেই চিন্তার বিকাশ – এ সমস্ত ব্যাপারই ঐতিহাসিক সংগ্রামের গতিকে প্রভাবিত করে এবং বহুক্ষেত্রে সেই সংগ্রামের রূপকে পর্যন্ত নির্ণীত করে দেয়। এইসব ধারার মধ্যে একটা পরস্পর সম্পর্ক রয়েছে। … তা না হলে ইতিহাসের যে কোনও যুগে (মার্কসের) ওই নীতি প্রয়োগ করা বীজগণিতের একটা সরল সমীকরণের চেয়েও সহজ হত।

আর একটা চিঠিতে এঙ্গেলস খেদ করে বলেছিলেন যে বস্তুবাদের নামে অনেকে এতদূর যায় যে বিভিন্ন চিন্তাধারা ইতিহাসের উপর প্রভাব বিস্তার করে একথাও মানতে চায় না তারা। বস্তুনিরপেক্ষ চিন্তার কোনও স্বতন্ত্র ইতিহাস নেই ; চিন্তা কর্মের সঙ্গে, জীবনের বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সর্বদাই সংলগ্ন থাকতে বাধ্য। কিন্তু চিন্তাধারা যে ইতিহাসে কোনও প্রভাব ফেলে না, একথা ভুল। আবার এক চিঠিতে তিনি অনুযোগ করেন ‘এরা সবাই ‘ডায়ালেকটিক’ সম্বন্ধে কোনও জ্ঞান রাখে না। এরা শুধু দেখে যে একদিকে কারণ আর অন্যদিকে কার্য। এরা বোঝে না যে এভাবে বিচার করলে সিদ্ধান্ত হবে একেবারে অবাস্তব। এরা বোঝে না যে বস্তুজগতে এমন প্রখর, প্রকট, চিন্তাপ্রসূত বৈপরীত্য দেখা যায় কেবল তখনই যখন পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত সংকট উপস্থিত হয়; এরা বোঝে না যে সাধারণত (সমাজবিকাশের) সমগ্র বিরাট পদ্ধতি বিকশিত হতে থাকে বিভিন্ন ও অসমান শক্তি ও ধারার ঘাতপ্রতিঘাতে, আর তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই সব চেয়ে শক্তিশালী, সব চেয়ে প্রাথমিক এবং যুগান্তকারী হল অর্থনৈতিক অগ্রগতি।’ মার্কস-এঙ্গেলসের এই শিক্ষা আত্মস্থ করে লেনিন একবার বলেন যে বিপ্লব কখনও সোজা, পাকা রাস্তা দিয়ে চলে না, সর্বদাই যে বিপ্লবের কাজ একই ঢঙে চলবে তা নয়, অনেক আঁকাবাঁকা পথ দিয়ে, মাঝে মাঝে পিছু হটে পর্যন্ত, এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে হবে। মূলগতভাবে সামাজিক পরিবর্তন ও রাষ্ট্রনৈতিক বিপ্লবের প্রকৃত কারণ খুঁজে পাওয়া যায় এক-একটা যুগের চিন্তায় নয়, পাওয়া যায় তার বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থায়। কিন্তু ইতিহাসের মধ্যে অন্য বহু ধারা অল্পাধিক প্রভাববিস্তার করতে পেরেছে বলে সর্বদা বহুমুখী পরিস্থিতির বাস্তব বিশ্লেষণ করে তবেই বিপ্লবী কর্তব্যের প্রকৃত সন্ধান মিলবে। বিপ্লব নিশ্চয়ই অনিবার্য, সমাজদেহের মধ্যেই তার অঙ্কুর বৃদ্ধি পেয়ে থাকে। কিন্তু সর্বসময়ে সেই আবশ্যম্ভাবিতার কথা স্মরণ করে যত্রতত্র বিপ্লবের আওয়াজ তুলে বেড়ানো একরকমের বিপজ্জনক বিলাসিতা যাকে মার্কসবাদসম্মত বলা অন্যায় হবে।

বর্তমান যুগে ধনবাদের পতন ও সমাজবাদের জয় সম্বন্ধে সর্বোপরি কার্ল মার্কস বাস্তব বৈজ্ঞানিক রীতিসিদ্ধ তথ্যের ভিত্তিতে শতাধিক বর্ষ পূর্বে সিদ্ধান্ত প্রচার করেছিলেন। সমাজতাত্বিকরূপে তিনি ভবিষ্যদ্বাণী অবশ্যই করেছিলেন, কিন্তু ফলিত জ্যোতিষ তাঁর বৃত্তি ছিল না, গণৎকারের মতো দিনক্ষণ গুণে মানবসমাজের কোষ্ঠীবিচার করতে তিনি বসেননি। বুর্জোয়া ব্যবস্থারই আত্মজ হয়ে যে অমিততেজ শ্রমজীবী শ্রেণী উদ্ভূত হয়েছে, তার চেতনা আজ প্রখর, সর্বদেশে যুগান্তর সংগঠনের অনুকূল পরিস্থিতি প্রস্তুত হয়ে আসছে, জগৎ জুড়ে জনতার জয়ের আর অতিরিক্ত বিলম্ব নেই। অর্ধশতাব্দী পূর্বে সোভিয়েত বিপ্লবে যার ভাস্বর সূচনা, বর্তমানে সর্বদেশে জায়মান সেই নবসমাজ আজ সর্বদেশে মহামনীষী কার্ল মার্কসের ১৫০-তম জন্মজয়ন্তীকে অভিবাদন জানাচ্ছে। সর্বোপরি তাঁর কাছ থেকে বিশ্বের মেহনতি মানুষের আন্দোলন শিক্ষা নিয়েছে, অনুপ্রেরণা পেয়েছে। মার্কসের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে গুহ্যতত্বে তাদের বিশ্বাস সেই, শুধুমাত্র আবেগ-সঞ্জাত মনোভাব তাদের কাছে স্বতঃসিদ্ধ সত্য নয়, দৈব অনুগ্রহে বা কোনও অতিমানবিক প্রক্রিয়ার ফলে স্বর্গরাজ্যের দ্বার একদিন উন্মুক্ত হবে সে-আশার কুহকে তারা মুগ্ধ নয়। মার্কসবাদী জানে যে ইতিহাসে যে-শক্তিপুঞ্জ সক্রিয় হয়ে রয়েছে, মানুষ সেখানে প্রধান। মার্কসবাদী জানে যে নিয়তির মতো অনিবার্যভাবে ভবিষ্যৎ সমাজ এসে উপস্থিত হয় না। সমাজের বিবর্তন অকাট্যভাবে ধনিক ব্যবস্থার পতন এবং সমাজবাদের অভ্যুদয়কে নিশ্চিত করছে বটে, কিন্তু সেই শুভ ঘটনার দিনক্ষণ নির্দিষ্ট হয়ে নেই, মানুষের স্বকীয় সংহত প্রচেষ্টা বিনা বিপ্লব সাঙ্গ হবে না, নব সমাজের আবির্ভাব ঘটবে না। সমাজবাদের অভ্যুদয় সম্বন্ধে কোনও সন্দেহ নেই, কিন্তু কল টিপে পুতুল বেরিয়ে আসার মতো একদিন নতুন ব্যবস্থার জন্ম হবে না – ‘জয় কখনও স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে এসে হাজির হয় না ; তাকে হাত ধরে টেনে আনতে হয়।’

(কার্লমার্কস ১৯৬৮)

৬ষ্ঠ বর্ষ ২-৩ সংখ্যা

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *