ঋগ্বেদ ১০।০৯৭

ঋগ্বেদ ১০।০৯৭
ঋগ্বেদ সংহিতা ।। ১০ম মণ্ডল সূক্ত ৯৭
ওষধি দেবতা। ভিষক ঋষি(১)।

১। পূর্বকালে তিন যুগ ধরিয়া দেবতারা যে সমস্ত প্রাচীন ওষধি সৃষ্টি করিয়াছেন, সেই সকল পিঙ্গলবর্ণ ওষধির একশত সপ্ত স্থান বিদ্যমান আছে, আমি এইরূপ জ্ঞান করি।

২। হে জননীস্বরূপা ওষধিগণ! তোমরা মৃত্তিকাতে রোহণ কর, অর্থাৎ উৎপন্ন ও তোমাদিগের একশত এমন কি একসহস্র স্থান আছে। তোমাদিগের ক্রিয়া শত প্রকার, তোমরা আমার আরোগ্য বিধান কর।

৩। হে পুষ্পবতী ফলপ্রসবকারিণী ওষধিগণ! তোমরা রোগীর প্রতি সন্তুষ্ট হও। তোমরা ঘোটকের ন্যায় জয়শীল মৃত্তিকাতে জন্ম গ্রহণ কর, রোগীকে রক্ষা কর।

৪। হে দীপ্তিশালী ওষধিগণ! তোমরা জননীস্বরূপা। তোমাদিগের সমক্ষে আমি স্বীকার করিতেছি, যে আমি চিকিৎসক ব্যক্তিকে গো, অশ্ব, বস্ত্র, এমন কি, আপনাকে পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত আছি।

৫। হে ওষধিগণ! অশ্বথ বৃক্ষে তোমরা উপবেশন কর। পলাশ বৃক্ষে তোমরা বাস কর। যখন রোগীর প্রতি অনুগ্রহ কর, তখন তোমাদিগকে গাভী দান করা উচিৎ হয়, অর্থাৎ বিশিষ্ঠ কৃতজ্ঞতার ভাজন হও।

৬। যেমন রাজাগণ যুদ্ধে একত্র হন, তদ্রুপ যে ব্যক্তির নিকট ওষধিগণ মিলিত হয়, অর্থাৎ যে ওষধী জানে, সেই বুদ্ধিমান ভিষক ব্যক্তিকে চিকিৎসক, কহে, সে রোগদিগকে ধ্বংস করে।

৭। অশ্ববতী, সোমবতী, উর্জয়ন্তী, উদোজস প্রভৃতি তাবৎ ওষধি সংগ্রহ করিয়াছি, অভিপ্রায় যে এই ব্যক্তির আরোগ্য বিধান করিব।

৮। হে রোগী! এই দেখ, যেমন গোষ্ঠ হইতে গাভীগণ বাহির হয়, তদ্রুপ ওষধিবর্গ হইতে তাহাদিগের গুণ সমস্ত বাহির হইতেছে, ইহারা তোমাকে তোমার স্বাস্থ্য ধন প্রদান করিবে।

৯। হে ওষধিগণ! তোমাদিগের মাতার নাম ইষ্কৃতি। তোমরা রোগের নিষ্কৃতি স্বরূপ। যাহা কিছু শরীরকে পীড়া দেয়, তোমরা তাহা বেগবতী পক্ষিণীর ন্যায় বাহির করিয়া দাও।

১০। যেরূপ কোন চোর গোষ্ঠ অতিক্রম করিয়া যায়, তদ্রূপ বিশ্বব্যাপী সর্বত্রগামী ওষধিগণ রোগদিগকে অতিক্রম করিল। শরীরে যে কিছু পীড়া বিদ্যমান ছিল, ওষধিগণ তাহা দূরীকৃত করিল।

১১। যখনই আমি এই সকল ওষধিকে হস্তে গ্রহণ করিলাম এবং রোগীর দৌর্বল্য নিরাকরণ করিলাম, তখনই রোগের আত্মা নষ্ট হইল, সেই রোগ তৎপূর্বে প্রাণকে আক্রমণ করিয়া যেন বসিয়াছিল।

১২। যেরূপ বলবান ও মধ্যবর্তী ব্যক্তি সকলকেই আয়ত্ত করেন, তদ্রূপ হে ওষধিগণ! তোমরা যাহার অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ও গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে বিচরণ কর, তাহার রোগ সেই সেই স্থান হইতে দূরীকৃত কর।

১৩। চাষ ও কিকিদীবি পক্ষী যেমন দ্রুতবেগে উড়িয়া যায়, অথবা বায়ু যেমন বেগে গমন করে, অথবা গোধা যেমন ধাবমান হয়, হে রোগ! তুমিও তদ্রূপ শীঘ্র অপসৃত হও।

১৪। হে ওষধিগণ! তোমাদিগের একজন আর একজনকে রক্ষা করুক, তাহাকে আর একজন রক্ষা করুক। এইরূপে সকলে পরস্পর একমত ও এক কাৰ্যকারিণী হইয়া আমার এই কথা রক্ষা কর।

১৫। যাহারা ফলবতী আথবা যাহারা ফলবতী নয়, যাহারা পুষ্পবতী, অথবা যাহারা তাদৃশ নয়, বৃহস্পতিকর্তৃক উৎপাদিত সেই সমস্ত ওষধি আমাদিগকে পাপ হইতে রক্ষা করুক।

১৬। কেহ অভিসম্পাত করাতে আমার যে পাপ হইয়াছে, অথবা বরুণের পাশ অথবা যমের নিগড় হইতে এবং অন্যান্য সকল দেবতাসংক্রান্ত পাপ হইতে ওষধিগণ আমাকে রক্ষা করুক।

১৭। ওষধিগণ স্বর্গ হইতে নিয়ে পতিত হইবার সময় বলিয়াছিল, আমরা যে প্রাণীকে অনুগ্ৰহ করি, তাহার কোন অনিষ্ট উপস্থিত হয় না।

১৮। সোম যে সকল ওষধির রাজা, যাহারা অসংখ্য এবং নানা উপকার করিয়া থাকে, হে ওষধি! তুমি তাহাদিগের শ্রেষ্ঠ, তুমি বাসনা পূর্ণ করিতে এবং হৃদয়কে সুখী করিতে সমর্থ।

১৯। সোম যে সকল ওষধির রাজা, যাহারা পৃথিবীর নানা স্থানে বিস্তৃত আছে, বৃহস্পতি কর্তৃক উৎপাদিত, সেই সকল ওষধি এই রোগী ব্যক্তির বলাধান করুক, অথবা এই উপস্থিত ওষধিকে বীৰ্যবতী করুক। (এ স্থলে ভিষক যে ওষধিটী উপস্থিত রোগে ব্যবহার করিবেন, তাহার বিষয়ে কহিতেছেন)।

২০। হে ওষধিগণ! আমি তোমাদিগের খননকর্তা, আমি যেন নষ্ট না হই, এবং যাহার জন্য খনন করিতেছি, সেও যেন নষ্ট না হয়। আমাদিগের যাহা কিছু সম্পত্তি আছে, দ্বিপদ হউক, চতুষ্পদ হউক, সকলি যেন নীরোগ থাকে।

২১। যে সকল ওষধি আমার এই বাক্য শুনিতেছে, অথবা যাহারা অতি দূরে আছে, সেই সকল ওষধি একত্র হইয়া এই উপস্থিত ওষধিকে বীৰ্য্যবতী করুক।

২২। ওষধিগণ সোমরাজার সহিত এই কথোপকথন করিতেছে, হে রাজন্! স্তোতা যাহার চিকিৎসা করে, তাহাকেই আমরা পরিত্রাণ করি।

২৩। হে ওষধি! তুমি শ্রেষ্ঠ; যেখানে যত বৃক্ষ আছে, সকলেই তোমার নিকট হীন। যে আমাদিগের অনিষ্ট চিন্তা করে, সে যেন আমাদিগের নিকট হীন হয়।

————

১) এই সূক্তটা ঔষধ ও রোগের চিকিসা সম্বন্ধে। ইহার শেষ অংশে অনেকগুলি পীড়াআরোগ্যের মন্ত্র লক্ষিত হয়। সূক্তটি অপেক্ষাকৃত আধুনিক।