৯. অভিজ্ঞান
কলেজে ইলেকশানের ঘণ্টা বেজে গেছে। প্রচণ্ড গরমের জন্য থিয়োরি ক্লাস হচ্ছে না। ফার্স্ট ইয়াররা সবাই মিলে প্ল্যান করে একসঙ্গে পনেরো দিনের ছুটি নিয়েছে। টিচাররা স্টুডেন্টদের ওপরে রাগ দেখালেও মনে মনে খুশি। এই চিংড়িপোড়া গরমে ক্লাস নেওয়া কষ্টকর।
ফাইনাল ইয়ারের শিয়রে শমন। সামনেই ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষা। তারা হোস্টেলের রুমে গাঁতিয়ে পড়াশুনো করছে। কলেজে দেখা যাচ্ছে সেকেন্ড আর থার্ড ইয়ারের ছেলেমেয়েদের। সেকেন্ড ইয়ারের স্টুডেন্টের সংখ্যাও নগন্য। সেকেন্ড এমবিবিএস পরীক্ষা ঘাড়ের কাছে!
এপ্রিল মাসের গরমে কলকাতা শহর হাঁসফাঁস করছে। হাতপাখা, সিলিং ফ্যান, এসি, ইনভার্টার, আইসক্রিম আর বিয়ারের বিক্রি বেড়ে গেছে। সকাল দশটার পরে রাস্তাঘাটে লোকে কম বেরোচ্ছে। গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গে উত্তর ভারতের মতো শুকনো গরম কেন পড়ছে এই নিয়ে আবহাওয়াবিদরা রোজ কাগজে মতামত দিচ্ছেন। লু লেগে মৃত্যুর খবর রোজই কাগজে দেখা যাচ্ছে।
শুনশান, ফাঁকা কলেজে আসতে অভির ভালো লাগে। বড়বড় বিল্ডিং-এর গায়ে রোদ পড়ে চকচক করে, থেকে থেকেই গরম বাতাসের ঝাপটা আসে, ধুলোর ঝড় ওঠে, শুনশান রাস্তায় দু’একজন ছেলেমেয়ে মুখে রুমাল বা মাথায় ওড়না বেঁধে দ্রুত চলে যায়। দাঁড়ে বসে অভি দেখে। জীবনদার ক্যান্টিনে বসে অভি দেখে। সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে বসে অভি দেখে। চা-ওলা বা জীবনদা বা লাইব্রেরিয়ান তাকে অনেকবার বলেছে এই গরমে ঘুরে না বেড়াতে। অভি শোনেনি। মরে যেতে তার কোনও আপত্তি নেই।
কিংবা, হয়তো অভি মারাই গেছে। তার জোম্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে। নিজেকে মৃত মানুষ বলে মনে হয় অভির। তার জীবন থেকে বৃন্দা নিজেকে সরিয়ে নিল, এ ঘটনা কতদিন আগে ঘটেছে? পনেরো দিন? এক মাস? এক বছর? মনে নেই অভির। শুধু মনে আছে প্রত্যাখ্যান শুনে অসম্ভব রাগ হয়েছিল। মনে হয়েছিল, বন্দুকের গুলির মতো আছড়ে পড়ে বৃন্দার হৃৎপিণ্ডে, আর এফোঁড় ওফোঁড় করে দেয়। মনে হয়েছিল, কুমায়ুনের মানুষখেকো বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে বৃন্দার ওপরে। দাঁত-নখ দিয়ে ছিন্নভিন্ন করে দেয় পুতুল-পুতুল চেহারা। মনে হয়েছিল, সবার সামনে গলা টিপে ধরে মেয়েটার, অ্যাসিড ঢেলে দেয় মুখে, খাবারে বিষ মিশিয়ে দেয়, সাপ হয়ে ছোবল মারে শরীরে।
অভি জানে, এসব সে করতে পারবে না। কিন্তু রাগ তাকে দিয়ে এইসব ভাবিয়ে নিয়েছিল। রাগের পরে এল অবিশ্বাস। যে, না। এ হতে পারে না। নিশ্চয়ই কোথাও ভুল হচ্ছে। বিরাট বড় কোনও ভুল। ড্যামেজ কন্ট্রোল সম্ভব। আলাপ আলোচনার মাধ্যমে মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং ক্লিয়ার করা যায়। কথাবার্তার মাধ্যমে বৃন্দা নিজের ভুল বুঝতে পারবে। অভি তখন বৃন্দার মোবাইলে ক্রমাগত ফোন করত। বৃন্দা ফোন ধরত না। তিন দিনে চারশোবার, পাঁচশোবার, ছ’শোবার ফোন কল। চতুর্থ দিন থেকে বৃন্দার মোবাইল সুইচ্ড অফ। এখন অভি জানে, বৃন্দা নতুন নম্বর নিয়েছে। সেই নম্বর অভির কাছে নেই। অভি সেই নম্বর চায় না। সে জানে, বৃন্দা চিরকালের জন্য গেছে। অবিশ্বাস্য হলেও এটাই সত্যি।
অবিশ্বাসের পরে এসেছিল সেল্ফ পিটি। নিজেকে প্রতি মুহূর্তে করুণা করত অভি। নিজেকে নর্দমার পোকা বলে মনে হত। মনে হত এক তাল আবর্জনা। এই পৃথিবীতে যার কোনও প্রয়োজন নেই। যার একমাত্র অবস্থান ডাস্টবিনে।
সেল্ফ পিটির থেকে এল আত্মহত্যার প্রবণতা। দিনরাত মাথায় ঘুরত সুইসাইডের আইডিয়া। ঘুমের বড়ি, না গলায় দড়ি? মেট্রোর থার্ড রেল, না ছুটন্ত ডানকুনি লোকালের সামনে ঝাঁপ? হাতের শিরা ব্লেড দিয়ে কাটা যায়, কিন্তু সেটা খুব নাটকীয়। সে নিঃশব্দে এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চায়।
অনেক ভেবেচিন্তে ঘুমের ওষুধ জমাতে শুরু করেছিল। জমিয়েও ফেলেছিল গোটা পঞ্চাশ। হাসপাতালের আউটডোর স্লিপে দশটা অ্যালোপামের নাম লিখে, তলায় হিজিবিজি সই করে শেয়ালদার ওষুধের দোকান ঘুরে ঘুরে কিনছিল। ধরা পড়ে গেল শ্রীপর্ণার কাছে। ও স্যানিটারি ন্যাপকিন কিনতে একই ফার্মাসিতে ঢুকেছিল। অভিকে অ্যালোপাম কিনতে দেখে দোকানে কিছু বলেনি। দোকান থেকে বেরোতেই কলার ধরে হিড়হিড় করে টেনে এনেছিল দাঁড়ে। তারপর ব্যাচের মেয়েগুলো মিলে তাকে অনেক ভোকাল টনিক দিয়েছিল। সেই হেনস্থার কথা ভাবলে আজ আর খারাপও লাগে না। অভি এখন অনুভূতিশূন্য হয়ে গেছে।
.
এই দুপুরবেলায় দাঁড়ে বসে রয়েছে একগাদা চেনা মুখ। রিপু, টিনটিন, বান্টি, সুব্রত, লাটু, চন্দন। ইউনিয়ন ইলেকশান সংক্রান্ত কোনও মিটিং হচ্ছে নির্ঘাত। অভি ওদের মধ্যে ভিড়ে গেল। গোপন মিটিং হলে অভিকে ওরা ফুটিয়ে দেবে। অভি তা হলে বেঁচে যায়। কিন্তু এড়িয়ে গেলে প্রচণ্ড আওয়াজ দেবে। সেটা অভি সহ্য করতে পারবে না।
‘আজ তেইশে এপ্রিল। নমিনেশান জমা দেওয়ার শেষ দিন এগারোই মে। ইলেকশান একুশে মে। কাউন্টিং তার পরের দিন। তেইশে এপ্রিল থেকে বাইশে মে—এই একমাস জান লড়িয়ে দে। তারপর তোর কাছে কিছু চাইবো না।’ অভির কাঁধে হাত দিয়ে বলল রিপু।
অভি মনে মনে রিপুর লিডারশিপ কোয়ালিটির প্রশংসা করল। রিপু এক বারের জন্যও প্রশ্ন করল না অভি এতদিন কোথায় ছিল। অথবা সে দাড়ি কামায়নি কেন। অথবা তাকে এত রোগা লাগছে কেন। বৃন্দার সঙ্গে কী নিয়ে ঝামেলা, তাও জানতে চাইল না। সরাসরি নির্বাচনী রুটিনের মধ্যে ঢুকিয়ে নিল। যেন কিছুই হয়নি। একটু স্বচ্ছন্দ লাগল অভির। মনে হল, সে আবার জোম্বি থেকে স্বাভাবিক মানুষ হয়ে উঠতে পারবে। শুধু কলেজের বন্ধুদের সাহায্য চাই। আর কিস্সু না। পাশাপাশি এটাও মনে হল, বড্ড গরম! মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতিগুলো তার মধ্যে ফিরে আসছে বোধ হয়! রিপুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘তোমাদের প্যানেল ঠিক হয়েছে?’
‘তোমাদের না। বল আমাদের।’ পাশ থেকে বলল চন্দন। ‘হ্যাঁ ঠিক হয়েছে। জেনারেল সেক্রেটারি পোস্টে আমি দাঁড়িয়েছি। প্রেসিডেন্টের পোস্টে জেম্সি।’
‘জেম্সি? ও কী বোঝে স্টুডেন্ট পলিটিক্সের?’ অভি অবাক।
‘স্টুডেন্ট ইউনিয়নের ইলেকশানে একটু গ্ল্যামার লাগে। জেম্সি কিছু বোঝে না বলেই ওর নাম ভাবা হয়েছে। শি উইল বি আওয়ার রাবার স্ট্যাম্প ক্যান্ডিডেট। সেক্স অ্যাপিলের জন্য ভোটে জিতে যাবে। সারা বছরের কাজ আমরা তুলে দেব।’ বলল বান্টি।
‘সেক্স অ্যাপিল দিয়ে ভোট?’ শ্রাগ করল অভি। আইডিয়াটা তার একদম পছন্দ হয়নি।
‘তোকে এ নিয়ে মাথা না ঘামালেও চলবে। তুই কালচারাল সেক্রেটারির পোস্টে দাঁড়াচ্ছিস। আমার উত্তরসূরী। খাটতে খাটতে জান নিকলে যাবে।’ অভির কাঁধ থাবড়ে দেয় টিনটিন।
‘আমি?’ অবাক হওয়ার চরম সীমায় পৌঁছে অভি বলে, ‘তোমাদের সার্কিটের সব তার কেটে গেছে। এত ইম্পর্ট্যান্ট সিটটা কেন প্লেটে করে সুরজের হাতে তুলে দিচ্ছ? আমি ভোটে দাঁড়ালে তিনটে ভোটও পাব না।’
‘নিজের পপুলারিটি নিয়ে আমাদের পোয়েটের কোনও ধারণাই নেই। আজ সকাল-এর সম্পাদকীয় পাতায় তোর লেখা ‘শিল্পায়নের প্রাথমিক খসড়া’ কবিতাটা পড়ে কত ছেলেপুলে আমাকে এসে বলেছে যে, অভি তাদের সঙ্গে এক কলেজে পড়ে, এ নিয়ে তারা গর্বিত। কয়েকটা ছেলেমেয়ে নিজের লেখা কবিতা তোকে পড়াতে চায়। কেমন হয়েছে, তুই যদি বলে দিস। অনেকে তোর ফোন নম্বর চেয়েছে। কিন্তু তুই কারও ফোন ধরছিস না। অথবা মোবাইল অফ রাখছিস। এক দিনের জন্য তোর পপুলারিটি কত বেড়ে গিয়েছিল, তা জানিস?’ টিনটিন আবার অভির কাঁধ চাপড়ে দেয়।
‘এক দিনের জন্য?’ মিনমিন করে বলে অভি।
‘খবরের কাগজে একটা পদ্য লিখে ক’দিনের পপুলারিটি চাস? রোজ লেখ, রোজ বিভিন্ন লিট্ল ম্যাগের এডিটরদের ফোন করে পিআর কর, নিয়মিত কবিতা ছাপার ব্যবস্থা কর, বছরে একটা কবিতার বই বার কর, নিয়মিত কলেজ স্ট্রিটে ঠেক মার, নিয়মিত কবি সম্মেলনে যা— এই রুটিন আগামী পঞ্চাশ বছর ফলো কর, তবে তোর কবিতার এক-দু’লাইন বাঙালি মনে রাখবে।’
টিনটিনের জ্ঞান শুনে অভি বিরক্ত। ‘কে মনে রাখবে, অথবা কেউ মনে রাখবে কি না, সেই জন্যে আবার কেউ পদ্য লেখে নাকি?’
‘ও, তুই ফেমাস হবার জন্য লিখিস না?’ টিনটিন আওয়াজ দেয়, ‘এনিওয়ে, তুই কেন পদ্য লিখিস সেটা তোর ব্যাপার। আপাতত মন দিয়ে ক্লাস কর, ব্যাচমেটদের রেগুলার কনট্যাক্ট কর, ‘দেবদাস’ ইমেজ বদলে একটু ফিটফাট হ। বাকিটা আমরা দেখছি।’
‘দেবদাস’ শব্দটা কট করে অভির কানে লাগল। সবাই তা হলে সব জানে! সামনে কিছু বলছে না। পিছনে বলছে, ‘ওই যাচ্ছে, আমাদের কলেজের দেব-ডি! ঝাড় খাওয়ায় মাস্টার ডিগ্রি করেছে!’ রিপু-টিনটিন–চন্দনের উত্তপ্ত বাক্যবিনিময় থেকে নিজেকে গুটিয়ে নিল অভি। টুকটুক করে এগোল ক্যান্টিনের দিকে। এই গরমে ক্যান্টিনে হার্ডকোর ঠেকবাজ ছাড়া আর কারও থাকার কথা নয়। বৃন্দা তো কিছুতেই থাকবে না।
বৃন্দা! দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি। ইচ্ছে না থাকলেও ওর সঙ্গে রোজই দেখা হয়। কখনও থিয়োরি ক্লাসে। কখনও প্র্যাকটিকাল ক্লাসে। থিয়োরি ক্লাসে সমস্যা হয় না। এসএলটি বা এলএলটি এত বড় যে মুখ লুকোনোর জায়গার অভাব হয় না। সমস্যা প্র্যাকটিকালের সময়। কখনও এক রো শেয়ার করতে হয়েছে, কখনও পাশাপাশি টুলে বসতে হয়েছে। একবার প্যাথলজি প্র্যাকটিকাল ক্লাসে এক্সামিনেশানে টেবিল শেয়ার করতে হয়েছে। সেই সব দিনগুলোয় চোখকান খোলা থাকলেও কিছু দেখেনি অভি। কিচ্ছু শোনেনি।
ক্যান্টিনে যাদের থাকার কথা, তারাই আছে। সুরজ, সঞ্জয়, প্রবাল, আর দীপ। কোনের টেবিলে বসে কাগজ পেনসিল নিয়ে হিসেব নিকেশ করছে। অভিকে দেখে সুরজ বলল, ‘আও ঠাকুর!’
ওফ! একলা শান্তিতে বসে থাকারও উপায় নেই! যান্ত্রিক হাসি মুখে সেঁটে অভি বলল, ‘গব্বর সিং কি ইলেকশানে দাঁড়াচ্ছে?’
‘দাঁড়াচ্ছে এবং জিতছে।’ অভিকে নিজের পাশে বসিয়ে সুরজ বলল, ‘তুই শালা মোচার মাল। তবু তোর কাছে ভোট চাইছি। দিবি না?’
অভি ফিকফিক করে হাসছে। ‘বেড়ে মজা তো! তোর দলের কারা কারা ভোটে দাঁড়াবে সেটা এর মধ্যে ঠিক হয়ে গেছে?’
‘আমি সেটা ঠিক করেছি। অ্যান্ড দ্যাটস ফাইনাল। মোচাপার্টির মতো লোক দেখানো গণতন্ত্র করে কোনও লাভ নেই। ওখানেও একজনই ঠিক করে। পরে একটা ঢপের মিটিং ডেকে সকলের মতামত চাওয়ার নামে পার্টির ডিসিশন শুনিয়ে দেয়। ঠিক কি না?’
অবিকল হীরক রাজার সভাসদের মতো সঞ্জয় বলল, ‘ঠিক!’
‘দ্যাখো বস,’ অভিকে বোঝায় সুরজ, ‘আমি জেনারেল সেক্রেটারি পোস্টে ফাইট করব। সঞ্জয় প্রেসিডেন্ট পোস্টে। আমার ফাইট চন্দনের সঙ্গে।’
‘তুই ওদের প্যানেল জানলি কী করে?’
‘এর জন্য জাসুসি লাগে না। আমাদের ব্যাচের সব থেকে পপুলার ক্যান্ডিডেট চন্দন। এখন আবার বৃন্দাকে ছিপে গেঁথেছে। ও জিএস হবে না তো কি তুই হবি?’
বৃন্দার নাম শুনে অভির মুখটা কালো হয়ে গেল। মনে হল এখান থেকে এক ছুটে সে পালিয়ে যায়। হোস্টেলের ঘর হোক বা লাইব্রেরিতে—তার এখন একটু ফাঁকা জায়গা দরকার। মুখ লুকিয়ে কাঁদার জন্য। ঘড়ঘড়ে গলায় অভি বলল, ‘আমি আসছি।’
‘বৃন্দার নাম শুনে ধস খাচ্ছিস কেন?’ অভির কলার ধরে বলল সঞ্জয়, ‘ক্যারামের বোর্ডে লাল ঘুঁটির দিকে দু’পক্ষেরই নজর থাকে। তুই আগে পকেট করতে না পারলে তোর কম্পিটিটর পকেট করবে। কবিতা শুনিয়ে কি প্রেমিকা পোষা যায়? রেগুলার পাম্পিং করতে হয়…’
‘বাজে বকিস না!’ আগুন চোখে বলে অভি।
‘রেগো না বস। সত্যি কথাটা গোদা করে বললাম।’ হাত জোড় করে বলে সঞ্জয়। ‘হোস্টেলের মেসে সুরজকে ক্যালানোর ভিডিয়োটার কথা তুই কাউকে বলিসনি। এই জন্যে আমি আর সুরজ তোর প্রতি গ্রেটফুল। ওই ভিডিয়োটা আমাদের হোস্টেল বোর্ডার্স কমিটির অর্ধেক সিট আমাদের দিয়েছে। আমাদের পার্টিকে ভালোবেসে ওই কাজ তুই করিসনি। চন্দনের ওপরে খার খেয়ে করেছিস। অ্যাজেন্ডা যাই হোক না কেন, এতে আমাদের লাভ হয়েছে। তুই আর একটা উপায়ে চন্দনের ওপরে প্রতিশোধ নিতে পারিস। ওদের মিটিংগুলোতে তুই থাক। কী আলোচনা হল আমাদের জানা। তোর কাছ থেকে কোনও গেম প্ল্যান জেনে গিয়ে আমরা চন্দনকে হারিয়ে দিতে পারি…’
আবার অভির কান্না পেল। এরা তাকে কী মনে করেছে? বক্সিং প্র্যাকটিস-এর বস্তা? যেমন খুশি ধামসানো যাবে? সে কিছু বলবে না? আঘাত খেয়ে ফিরে আসবে পরবর্তী আঘাতের জন্য? নিজেকে নরকের কীট মনে হয় অভির।
কিন্তু এদের সামনে দুর্বলতা দেখালে চলবে না। কান্না সামলে অভি বলল, ‘আমার কিন্তু কোনও চাপ নেই। আমার জন্য বেফালতু লোড নিচ্ছিস।’
‘ঠিক হ্যায় চল! পরে কথা হবে।’ টাটা করে সঞ্জয়। ‘আর, ওরা নিজেদের মধ্যে বসে কী ভাটায়, সেটা আমাদের টাইম টু টাইম ইনফর্ম করিস।’
‘আচ্ছা!’ ক্যান্টিন থেকে বেরোয় অভি। সারাদিন ভাটিং করে করে মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। এখন বাড়ি কাটবে নাকি? বাড়িতে গেলে তো সেই এক মেগা সিরিয়াল। রাধা পাগলিকে নিয়ে বাবামায়ের ঝগড়া সেকেন্ড থেকে থার্ড গিয়ারে ঘোরাফেরা করে। তার মধ্যে ঋষিতা নামের একটা মেয়ে ঢুকে পড়বে। ব্যাস! ঝগড়া টপ গিয়ারে। মা কাঁদবে, বাবা সোফায় রাত কাটাবে, মানদা সারারাত বিড়বিড় করবে।
বাড়িতে দু’দিন পুলিশ এসেছিল। রাধার মেয়ে ছায়া থানায় ডায়েরি করেছে। মিসিং পার্সন স্কোয়াড কোনও খবর দিতে পারেনি। কাগজে আর টিভিতে ‘সন্ধান চাই’ বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়েছে। ডায়রিতে ছায়া কী লিখেছে কে জানে! পুলিশ এসে মনোজ আর অরুণাকে ট্যারাব্যাঁকা প্রশ্ন করছিল। ‘আপনারা মেন্টাল টর্চার করতেন?’‘ফিজিক্যাল টর্চার?’‘ওঁর সোর্স অব ইনকাম কী ছিল?’‘আপনার বাড়ি থেকে উনি মিসিং হলেন, আপনারা থানায় ইনফর্ম করলেন না কেন?’ পুলিশ একদিন এসে বিলুর সঙ্গেও কথা বলেছে।
বিলুর কথা মনে পড়তে অস্বস্তি হল অভির। বাড়িতে যেদিন পুলিশ এসেছিল সেদিন বিলু ধড়মড় করে তিনতলায় উঠে অভির ঘরের খাটের তলায় লুকিয়েছিল। সে এক দেখার মতো দৃশ্য।
অবাক হয়েছিল অভি। বিলু রাজনীতি করে, বাবার সঙ্গে সিরিয়াস পলিটিকাল ঝগড়া করে, শনি-রবিবার মেডিকাল ক্যাম্পে যায়—এগুলো অভি জানে। কিন্তু গত কয়েক সপ্তাহ যাবত বিলুকে ভীষণ অন্যমনস্ক, শেকি, ভিতু লাগছে। দিনরাত হোস্টেলে বডি ফেলে রাখা বিলু এখন অধিকাংশ সময়ে লক্ষ্মী নিবাসে কাটায়। রাস্তায় বেরিয়ে পঞ্চপাণ্ডবের সঙ্গে আড্ডা মারে না। মোবাইলের সুইচ অফ রাখে। কলিং বেল বাজলে জানলা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে কে এল। নিজের ঘরের দরজা জানলা সব সময় ভেতর থেকে বন্ধ রাখে। বাড়ি আসার পরে প্রথম দিকে সবার সঙ্গে বসে দুপুর বা রাতের খাবার খেত। এখন ঘরেই খায়। অরুণা বা মানদা থালাবাটি দিয়ে এবং নিয়ে আসে। মনোজ-অরুণা এই নিয়ে চিন্তিত নন। ছেলে বাড়িতে থেকে পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশান নিচ্ছে, এতেই তাঁরা খুশি।
কিন্তু অভির আন্দাজ, ডাল মে কুছ কালা হ্যায়। দময়ন্তীর সঙ্গে দাদা ছুপকে ছুপকে মেলামেশা করত। সেটা বন্ধুত্ব, না প্রেম, না পলিটিকাল বন্ডিং—ধারণা নেই। দু’জনের মধ্যে আর যোগাযোগ নেই, এটা অভি আন্দাজ করতে পারে। দময়ন্তীকে জিজ্ঞাসা করলে পাত্তা দেবে না। মেয়েটা বড্ড ট্যাঁশ।
এই কথা ভাবতে না ভাবতেই চোখের সামনে দময়ন্তী। সে ছাড়াও রয়েছে আপ্পু, সাবিনা, জেম্সি, শ্রীপর্ণা এবং বৃন্দা। সবাই মিলে একটা ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের দিকে যাচ্ছে। ট্রলিতে পায়ে প্লাস্টার করা অবস্থায় ফুলমতিয়া শুয়ে রয়েছে।
‘কী হয়েছে?’ জিজ্ঞাসা করল অভি?
ফুলমতিয়া ট্রলিতে শুয়ে একগাল হেসে বলল, ‘তিনদিন পেহেলে সিঁড়ি সে গিরে গিয়েছিলাম। ফ্যাকচার হয়েছে। দিদিরা সোবাই আমাকে হাসপাতালে এডমিসান করে দিল। পেলাস্টার আগেই হয়ে গেছে। আজ ছুটি ভি দিয়ে দিল।’
‘এখন ক’দিন কাজ করা যাবে না।’ ফুলমতিয়াকে পরামর্শ দিয়ে এগোচ্ছিল অভি, এমন সময়ে আপ্পু বলল, ‘অ্যাই অভি শোন!’
আপ্পুর কথা না শোনার ভান করে সে এজেসি বোস রোডের দিকে হাঁটা দিয়েছে। তবে আপ্পু ছোড়নেওয়ালি নয়। খপাত করে অভির কলার ধরে বলল, ‘পতলি গলি সে নিকলনে নহি দেঙ্গে। তুই আমার সঙ্গে লেডি আর্চার্সে চল।’
‘বাড়ি যাব।’ কলার ছাড়াতে ছাড়াতে বলে অভি। সবাই আজ তার কলার ধরছে কেন? তাকে দেখে পকেটমারের মতো লাগছে নাকি?
আপ্পু অভির কানে কানে বলে, ‘বৃন্দা আর দময়ন্তীকে সিন থেকে সরিয়ে দিচ্ছি। তুই থাক। দরকার হ্যাজ।’ তারপর গলা তুলে বলল, ‘বৃন্দা, তুই আর তোর রুমমেট মিলে ট্রলি ঠেলে হোস্টেলে ঢোকা। আমরা গেস্ট রুমে একটা মিটিং করব।’
বৃন্দা কিছু না বলে ট্রলি ঠেলতে লাগল। দময়ন্তী বলল, ‘অ্যাজ ইউ উইশ।’
লেডিজ হোস্টেলের গেস্টরুমের সোফায় বসে আপ্পু বলল, ‘শোন, সামনে ভোট। জেম্সি প্রেসিডেন্ট পোস্টে দাঁড়াচ্ছে। জানিস নিশ্চয়?’
‘হ্যাঁ।’ জেম্সিকে থাম্স আপ দেখায় অভি।
‘লেডিজ হোস্টেলে ক্যাম্পেনের দায়িত্ব আমার। প্রতিদিন সন্ধেবেলা দশ মিনিট ক্যাম্পেন করলে ভোটের আগে তিনবার কভার হয়ে যাবে। কিন্তু ছেলেদের মধ্যে, ডে-স্কলারদের মধ্যে, অন্য ইয়ারের ছেলেমেয়েদের মধ্যে জেম্সির পরিচিতি কম। শুধু সুন্দরী আর সেক্সি বলে জেম্সিকে স্টুডেন্টরা ভোট দেবে না। কাজেই কলেজ টাইমে ওকে ক্যাম্পেন করতে হবে। রিপুর সঙ্গে কথা বলে ঠিক করেছি, ওর সঙ্গে তুই থাকবি।’
‘আমি? কেন?’
‘ন্যাকা সাজিস না! তোকে একটা কাজ দিয়েছি। উতরে দিবি। অত কোয়েশ্চেন করছিস কেন?’
‘যাশ্শালা! জেম্সি ক্যাট মেয়ে। আর আমি মফস্সলি গাম্বাট। ট্যাঁশের পাশে আমাকে মানাবে না। আমরা হলাম চক আর চিজ!’
‘সেই জন্যই তোদের মানাবে!’ আপ্পু জেম্সির হাত ধরে অভির পাশে বসায়। ‘অ্যাজ পার ইয়োর ল্যাঙ্গোয়েজ, জেম্সি ইজ ট্যাঁশ অ্যান্ড ক্যাট। বাকি ট্যাঁশ ও ক্যাটদের সঙ্গে ওর এমনিই র্যাপো আছে। কিন্তু তোর মতো যারা মফস্সলি টাইপ্স? ফ্রম ভিলেজ, ডাউন টাউন, ডিস্ট্রিক্টস, সাবার্বস? যারা ইংরিজি বলতে পারে না? যার হটপ্যান্ট পরা মেয়ে দেখলে চোখ বুঁজে ফেলে? যারা তোর মতো ফেকলু মাল? তাদের কাছে জেম্সি পৌঁছবে কী করে? তোর হাত ধরে। সিম্পল!’
নিজেকে আবার বক্সিং প্র্যাকটিসের বস্তা মনে হচ্ছে অভির। গদাম গদাম করে তার ওপরে এসে পড়ছে মুষ্ট্যাঘাত। ‘মফস্সলি টাইপ্স।’ ফেকলু মাল!’‘ইংরিজি বলতে পারে না।’‘যারা হটপ্যান্ট পরা মেয়ে দেখলে চোখ বুঁজে ফেলে।’
দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে আর এক দফা কনট্রোল করে অভি। এদের সামনে কান্নাকাটি করলে আওয়াজ খেতে হবে। বেস্ট উপায় হল, সিচুয়েশানটাকে ক্যাজুয়ালি নেওয়া। যেন কিছুই হয়নি।
‘ঠিক আছে।’ জেম্সির পিঠে আলতো ঠেলা মেরে অভি বলল, ‘কাল থেকে জেম্সির সঙ্গে চিপকে থাকবো। আমি যেখানে যেখানে যাব, ওকেও যেতে হবে। কিন্তু ভোট চাওয়ার কাজটাও কি আমিই করব? না ওটুকু জেম্সি করতে পারবে?’
‘ডার্লিং!’ অভিকে চোখ মেরে, ফ্লায়িং কিস ছোঁড়ে জেম্সি, ‘আমি সব করতে পারব। তুমি শুধু আমাকে অ্যাকসেস দাও। অ্যায়াম নট বদার্ড অ্যাবাউট ইলেকশান অর কলেজ পলিটিক্স। সন অব আ গান সুরজ আর তার সাইডকিক সঞ্জয়কে হারানো আমার ডিউটি। দে হ্যাভ ট্রমাটাইজড দময়ন্তী ব্যাডলি। দে নিড সলিড কিক্স অন দেয়ার বাট।’
‘ইয়ে…’ সাবিনা আর শ্রীপর্ণা জড়িয়ে ধরে জেম্সিকে। মুহূর্তর জন্য জেম্সিকে ভালো লেগে যায় অভির। মেয়েটাকে যতটা ফিল্মি, সুপারফিশিয়াল টাইপ মনে হচ্ছিল, অতটা নয়! সিরিয়াস থিঙ্কিং আছে! আপ্পুকে টাটা করে লেডি আর্চার্স হোস্টেল থেকে বেরোয় অভি। এবার বাড়ি যেতে হবে। সারাদিন ফালতু ভাটিং করে কাটল।
.
বাড়ি ঢুকে সোজা তিনতলার ঘরে চলে গেল অভি। জামাকাপড় ছেড়ে দোতলায় নামল। সন্ধে সাতটা বাজে। মনোজ এখনও ফেরেননি। অরুণা নিউজ চ্যানেল চালিয়ে রান্না করছেন। মানদা মেঝেতে বসে খবর শুনছে। আশ্চর্যের বিষয় বিলুও সোফায় বসে খবর শুনছে। বিলুকে দেখে অভি বলল, ‘কী ব্যাপার? শরীর ভালো নেই নাকি?’
বিলু ঘোরের মধ্যে ছিল। অন্য কোনও জগতে। গোঁফ দাড়ির জঙ্গল, ভাঙা চোয়াল, না কামানো চুল, জ্বলজ্বলে চোখ। দেখে অভির মায়া হল। বছরদুয়েক আগেও এই ছেলেটা ‘দাবাং’ দেখিয়েছে। সিগারেট খাওয়ার কথা মাকে বলে দেবে বলায় র্যাগিং-এর ভয় দেখিয়েছে। রাজনীতি করার কথা মাকে বলে দেবে বলায় আবার র্যাগিং-এর ভয় দেখিয়েছে। মানে, টোটাল দাদাগিরি।
কিন্তু পরীক্ষার চাপে, অথবা রাজনীতির গলতায়, অথবা মেয়েছেলের চক্করে টোটাল ধস খেয়ে আছে। অভির প্রশ্নের উত্তরে বিলু কিছুক্ষণ ভাবল। অবশেষে জোর করে গলার আওয়াজে আর বডি ল্যাঙ্গোয়েজে ফুর্তি ফুটিয়ে বলল, ‘বৃন্দার কাছে ঝাড় খেয়ে মেনিমুখো হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিস তুই। আর আমার শরীরের খবর নিচ্ছিস? রঙ্গতামাশা হচ্ছে?’
‘রঙ্গতামাশা’ শব্দটা অনেকদিন বাদে শুনল অভি। রোজের কথায় আজকাল আর ব্যবহার হয় না। ‘রংতামাশা, রংতামাশা… তোমার সাথে রংতামাশা…’ আপন মনে বিড়বিড় করে সে। মাথার মধ্যে হঠাৎ শব্দেরা খেলা করতে শুরু করেছে। একে অন্যের হাত ধরে লঘু চালে তৈরি করছে বাক্য আর পংক্তি। যতিচিহ্নরা টুকটাক নিজেদের জায়গা খুঁজে নিচ্ছে। জন্ম নিচ্ছে লঘু চালের এক লঘু পদ্য।
কলিং বেলের আওয়াজ শুনে বিলু বারান্দার দিকে দৌড় লাগিয়েছে। অরুণার ধোপার খাতা আর পেনসিল টেনে নিয়ে অভি লিখতে শুরু করে…
.
‘তোমার সাথে রংতামাশা, তোমার সঙ্গে ঝগড়া আড়ি।
তোমার সাথে কিশোর আশা। তোমায় কি আর ভুলতে পারি?
তোমার সাথে ঠান্ডাগরম, তোমার সাথে ফক্কিকারি,
তোমার সাথে শক্ত-নরম। তোমায় কি আর ভুলতে পারি?
তুমিই প্রথম চাঁদ দেখালে। চাঁদকে, এবং কলঙ্ককে
তুমিই প্রথম মিলিয়ে দিলে। অন্য কথা বলল লোকে।
শরীর শুধু শরীর! তোমার মনটি কোথায়? দুষ্টু মেয়ে!
পলতে পোড়ে সময়-বোমার, পার পাবে না পালিয়ে গিয়ে।
পার খোঁজে কে? তল খুঁজেছি অরূপরতন আশা করে।
রূপসাগরে ডুব দিয়েছি। কলেজ জীবন কাঁপছে ঝড়ে।
তুমিই প্রথম ঝড় থামালে। ছিটিয়ে দিলে শান্তি বারি।
তুমিই আবার ঝাড় নামালে। তোমায় কি আর ভুলতে পারি?’
.
এক টানে কবিতা লিখে ধোপার খাতা নামিয়ে রাখে অভি। তার চোখে জল। লঘু চালের পদ্য শেষ লাইনে এসে এই রকম বাঁক নেবে, লেখা শুরু করার সময়ে সে জানত না।
একতলায় চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। দোতলার বারান্দা দিয়ে নীচে তাকিয়ে অভি একটা অদ্ভুত দৃশ্য দেখল। মানদা আর রাধা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছে। পাশে মনোজ দাঁড়িয়ে। বিলু আর অরুণাও এখন নীচে।
প্রথম নীরবতা ভাঙল অরুণা। খ্যানখেনে গলায় বলল, ‘কোন চুলোয় মরতে গিয়েছিলে? আর গেলেই যদি, তাহলে ফিরলে কেন? তোমার দুশ্চিন্তায় বাড়ি শুদ্ধ কারও ঘুম নেই। থানাপুলিশ, হাসপাতাল—কম ঝক্কি গেল?’
‘বউমা, কথা বোলো না,’ থেমে থেমে বলে রাধা, ‘তোমাকে নির্দিষ্ট সংখ্যক কথা দিয়ে তিনি এখানে পাঠিয়েছেন। ধরো তোমার আঁচলে পাঁচ লাখ কথা আছে। তোমার আয়ু যদি সত্তর বছর হয়, তাহলে এই পাঁচলাখ কথা দিয়েই কাজ চালাতে হবে। যদি আগে ফুরিয়ে যায়, তাহলে কথাহীন জীবন।’
রাধা ধবধবে সাদা থান পরে আছে। শরীরে কষ্টের কোনও লক্ষণ নেই। দেখে বোঝা যাচ্ছে, এতদিন যেখানে ছিল, আরামে ছিল।
অভি বলল, ‘এতদিন কোথায় ছিলে?’
রাধা বলল, ‘গারো পাহাড়।’
‘ঢঙি! গারো পাহাড় না কচু! নির্ঘাৎ মেয়ের কাছে কাটিয়ে এল! আর মেয়ে মিছিমিছি থানায় ডায়েরি করল! আমরা টেনশানে ভাজাভাজা হলাম’ চেঁচায় অরুণা।
রাধা অরুণার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘কোটা শেষ হয়ে গেলে তুমি পাথর হয়ে যাবে। তিনি জানেন। তিনি বলেছেন।’
অরুণাকে টানতে টানতে দোতলায় নিয়ে যাওয়ার সময়ে বিলু প্রশ্ন করল, ‘পাথর মানে? মা কি পাষাণী অহল্যা হয়ে যাবে?’
‘পাথর কি আর এক রকমের রে পাগলা? অনেক রকম পাথর আছে। বুকে পাথর বাঁধতে হয়। শোকে মানুষ পাথর হয়ে যায়…’ বিড়বিড় করতে করতে নিজের ঘরে যায় রাধা।
অভি দোতলার টেবিল থেকে ধোপার খাতা তুলে নেয়। কবিতাটা এডিট করতে হবে। একটা নামও দিতে হবে।
.
