হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২৫

২৫. অভিজ্ঞান

মেডিসিন থিয়োরি পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে ফার্মাকোলজি থিয়োরি পরীক্ষার কথা মনে পড়ে গেল অভির। চারটে বড় প্রশ্নে আশি নম্বর। পাঁচ নম্বরের চারটে শর্ট নোট। ফার্মা পরীক্ষার সময় সে সব প্রশ্নের উত্তর জানত। আজকেও সব প্রশ্নের উত্তর জানে। সেই সময় সে এডিটিং করতে পারত না। এখন পারে। জীবন তাকে বাধ্য করেছে অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেটে বাদ দিতে। পরীক্ষার খাতায় একই কাজ করতে হবে। সুতরাং চলো। সব চেয়ে ছোট উত্তর দিয়ে শুরু করা যাক। গল ব্লাডারের ক্যানসার।

ফাইনাল এমবিবিএসের আগে অভি নিজের ওপরে নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচার করেছে। কবিতার খাতা গঙ্গায় ফেলে আসার পরে একদিনের জন্যও বাংলা হরফের মুখ দেখেনি। বাংলা গল্প কবিতা দূরস্থান, বাংলা সংবাদপত্রও পড়েনি। বাংলা কেন, কোন সংবাদপত্রই পড়েনি। টিভি দেখেনি। শুধু ডাক্তারির বই পড়েছে।

ভোর পাঁচটা থেকে সকাল আটটা। সকাল ন’টা থেকে দুপুর বারোটা। দুপুর একটা থেকে বিকেল চারটে। বিকেল পাঁচটা থেকে রাত আটটা। রাত ন’টা থেকে রাত বারোটা। এই পাঁচটা সার্কলে পড়াশুনোকে ভাগ করে নিয়েছিল অভি। মাঝখানের সময়গুলোয় দাঁত মাজা, বাথরুম যাওয়া, স্নান, খাওয়া, ঘুম ইত্যাদি চলত। চুল কাটেনি। দাড়ি কামায়নি। নিজের কাছে প্রমিস করেছে পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সেলুনে যাবে না।

অরুণার কাছে অভি আবদার করেছিল, কয়েক জোড়া সাদা টিশার্ট আর সাদা বারমুডা কিনে দিতে। অরুণা দিয়েছেন। বিলুর জামা প্যান্টও দিয়েছেন। অভির মনে হচ্ছে, অরুণা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন বিলুকে ভুলে যাবার। বিলুর স্মৃতিসমূহ লক্ষ্মী নিবাস থেকে মুছে ফেলা হয়েছে।

দোতলায় বিলুর ঘরে শিফ্‌ট করেছে অভি। তিনতলার চিলেকোঠার ঘর ফাঁকা করে সেই ঘরে বিলুর খাট-আলমারি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। অরুণা বিক্রি করে দিতে চেয়েছিলেন। মনোজ রাজি হননি। বিলুর দোতলার ঘরে এখন অভির খাট, অভির আলমারি, অভির টেবিল চেয়ার, অভির বুক র‌্যাক। পুরো লক্ষ্মী নিবাসের মধ্যে একমাত্র এই ঘরটিতে রঙের পোঁচ পড়েছে। দামি প্লাস্টিক ইমালসান। অভির কথামতো তিনদিক সাদা। একদিকে হালকা নীল। হালকা নীল রঙের দেওয়ালে পেরেক মেরে ড্যানিয়েল আর্চারের আঁকা মাইনর উন্ডস সিরিজের ছ’টা ছবি ঝুলিয়েছে অভি। দশ ইঞ্চি বাই বারো ইঞ্চি সাইজের প্রিন্টগুলোয় জোয়াকিমদের উড়তে দেখা যাচ্ছে। বাই দ্য ওয়ে গ্যালারির ছ’টা ছবির প্রিন্টের সেটের দাম দুশো টাকা। দময়ন্তী তাকে সেটটা গিফ্‌ট করেছে। ফ্রেমিং করতে লেগেছে এক হাজার টাকা। ছবি ঝোলানোর পরে ঘরটার চরিত্রই বদলে গেছে। অনেক বেশি ঝকঝকে, অনেক বেশি শিল্পিত, অনেক বেশি বাসযোগ্য হয়েছে।

বিছানার চাদর, বালিশের ওয়াড় সাদা। টেবিল ক্লথ সাদা। বইয়ের মলাট সাদা। অভি বুঝতে পারে তার মধ্যে অবসেসিভ কমপালসসিভ ডিজর্ডারের বীজ বপন হচ্ছে। অরুণার আছে। এবার তার হয়েছে। তবে এই ডিজর্ডারকে সে পজিটিভ দিকে নিয়ে গেছে। ঘর নোংরা লাগছে? ইএনটি-র দশটা চ্যাপটার শেষ না করে ঝাঁট দেব না। সিলিং-এ ঝুল হয়েছে? সার্জারি বইয়ের প্রথম দুশো পাতা রিভাইস না করে রাধাদিকে ঝুলঝাড়া আনতে বলব না। বাথরুমের কমোডটা যথেষ্ট সাদা নয়? মানদাকে দিয়ে ঝকঝকে করানোর আগে মেডিসিনের টেক্সট বইয়ের পাঁচটা চ্যাপটার শেষ করতে হবে।

এর ফল হাতেনাতে পেয়েছে অভি। থিয়োরি পরীক্ষার সাতদিন আগে সব সাবজেক্টের রিভিসন কমপ্লিট। হোস্টেলে মাঝে মাঝে থেকেছে। বেশির ভাগ সময়েই বাড়িতে। পরীক্ষার সাতদিন আগে হোস্টেলে চলে এসেছে কারণ এখানে থেকে পরীক্ষা দিলে সময় বাঁচবে। নোংরা রুম নিয়ে খুঁতখুঁতুনি যাচ্ছে না। বামুন ঠাকুরকে দিয়ে রুম সাফ করিয়েছে, মেঝে মুছিয়েছে, ঝুল ঝাড়িয়েছে। যাবতীয় আবর্জনা ঘর থেকে সরিয়ে খাটে সাদা চাদর পেতে তবে স্বস্তি। এই ঘরে সে একা। সাতদিনে সবক’টা সাবজেক্টের ইমপর্ট্যান্ট জায়গা আর একবার দেখা হয়ে গেছে।

বাকি তিনটে শর্ট নোট লিখে সময় দেখল অভি। পঞ্চাশ মিনিট লেগেছে। ঐকিক নিয়মের হিসেবে ছত্রিশ মিনিট লাগার কথা ছিল। চোদ্দো মিনিট বেশি লেগেছে। তবে এটা ম্যানেজ করা যাবে। লং কোয়েশ্চেনে যায় অভি। অপেক্ষাকৃত কম লিখতে হবে—এমন প্রশ্নে হাত দেয়। হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা।

হার্ট অ্যাটাক হওয়ার উপক্রম হয়েছিল মনোজের। যেদিন বিধানসভা ভোটের রেজাল্ট বেরোল। লিখতে লিখতে মনে পড়ে যায় অভির…

.

ভোট দিতে যাওয়া মানে সময় নষ্ট। অভি নিজের ঘরে পড়াশুনো করছিল। মনোজ এসে ধমক দিলেন, ‘শুধু “ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ” আজকালকার দিনে চলে না। দেশ ও সমাজকে জানতে হয়। চিকিৎসকদের আরও বেশি করে জানতে হয়।’

‘তোমার সব কথা ঠিক। তবে ওর সঙ্গে ভোট দেওয়ার কোনো সম্বন্ধ নেই।’ বিরক্ত হয়ে বলে অভি।

‘মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না। ভোটটা দিয়ে আয়।’

‘তোমার দলের লোককে বলে দাও। দিয়ে দেবে। গত দু’বার তো তাই করলাম।’

‘না না। ওতে গণতন্ত্রের মূলে আঘাত হানা হয়। ও জিনিস ঠিক নয়।’ ঘনঘন ঘাড় নাড়েন মনোজ।

অরুণা ফুট কাটেন, ‘আসল কথাটা বলো না। কেন্দ্রীয় সরকার হাজার কোম্পানি সৈন্য পাঠিয়েছে। বিএসএফ, সিআরপিএফ, র‌্যাফ পাড়ায় ফ্ল্যাগমার্চ করছে গত চারদিন ধরে। পুলিশ হাজার খানেক গুণ্ডাকে অ্যারেস্ট করেছে হাওড়া থেকে। এবারে আর রিগিং করা বা ছাপ্পা ভোট দেওয়া যাবে না। ইলেকশান কমিশন এই একটা ভালো কাজ করেছে।’

‘ওফ! তুমি আর মৃন্ময়ের হয়ে কাঁদুনি গেয়ো না তো। রিগিং আমাদের কালচার নয়। আমরা ওসব কোনোদিন করিনি।’ মনোজ গজরগজর করে।

‘থাক! আজ আর সাধু সাজতে হবে না। লক্ষ্মী নিবাসের একতলায় বরাবর ওইসব হয়ে এসেছে। একগাদা বোরখা, নানা রকমের শাড়ি, নানা রকমের জুতো, সিঁদুর, আলতা, শাঁখা, পলা নিয়ে হাজির হত তোমাদের মহিলা সমিতির সম্পাদক। ছাপ্পা ভোটারদাতার আঙুল থেকে ভোটের কালির দাগ তুলে দিত। ডিটেলের দিকে খুব নজর ছিল। যে মেয়ে পায়ে আলতা পরে আছে তাকে বোরখা পরতে দিত না। কমবয়সি মেয়েকে সিঁদুর পরাত না। একেকটা মেয়ে তিরিশটার কমে ভোট দিত না। তাই নিয়ে আবার নিজেদের মধ্যে কম্পিটিশন করত। ‘আমি পনেরো!’ ‘আমি কুড়ি!’ ‘আমি পঁচিশ!’ ‘আমি তিরিশ!’ গোড়ায় যখন জনমোর্চা সরকার এল তখন এদের জন্য রুটি-তরকারি রান্না করে কোমর ব্যথা হয়ে যেত। গত কয়েক বছর তো প্যাকেটে বিরিয়ানি আসছে। তাই আর আমার দরকার পড়ে না।’

‘বাজে কথা বোলো না তো!’ চেঁচিয়ে ওঠেন মনোজ। পুরোনো প্রসঙ্গ আজকের দিনে টেনে আনার কী প্রয়োজন? যা অভি। তুই ভোট দিয়ে আয়। বুথ ফাঁকা আছে।’

‘বুথ ফাঁকা তো থাকবেই। বুথ জ্যাম করার কোনও স্কোপ নেই যে! হরিয়ানা, দিল্লি, পঞ্জাবের ইয়া ইয়া জওয়ান এসেছে। ছ’ফুট লম্বা, তাগড়াই মোচ, হাতে মানুষখেকো বন্দুক। এক লাইন বাংলা বোঝে না। বেশি ত্যান্ডাই ম্যান্ডাই করতে গেলে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে পোলিং বুথ থেকে বার করে দিচ্ছে। ওয়েস্ট বেঙ্গল পুলিশ বা কলকাতা পুলিশের ছাপোষা কনস্টেবল হলে তোমার দলের ক্যাডাররা চমকে আর বিরিয়ানি খাইয়ে ম্যানেজ করত। এদের ম্যানেজ করা যাবে না।’

‘তুমি চুপ করবে!’ অরুণাকে প্রবল ধাতানি দেন মনোজ। মনে মনে মুচকি হাসে অভি। ভোটার আইকার্ড নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে ভাবে, বাবা-মায়ের মধ্যে আগে কোনও কথাই হত না। এখন নিয়মিত ঝগড়া হচ্ছে। এটা সুলক্ষণ। আশা করা যায় ভবিষ্যতে সম্পর্কটা স্বাভাবিক হবে। অভি বুঝতে পারে মনোজ তাকে ভয় পান। সামান্য কৃতজ্ঞতা বোধও আছে। ঋষিতা প্রসঙ্গ অরুণার মন থেকে অভি যে ভাবে তাড়িয়েছে, তাতে মনোজের আজীবন কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

জিটি রোডে পৌঁছে অভি থ। ভোটের দিনে এমন শুনশান রাস্তা সে কোনওদিনও দেখেনি। প্রেস, পুলিশ, মিলিটারি, ইলেকশান কমিশনের গাড়ি ছাড়া অন্য কোনও গাড়ি চলছে না। বিধি মেনে এবার পোলিং বুথের কাছে রাজনৈতিক দলের কোনও অফিস নেই। পোলিং বুথ থেকে অনেক দূরে, পাড়ার মধ্যে, গলিতে একটা টেবিল আর দুটো চেয়ার পেতে দলের কর্মীরা বসে। ভোটাররা তাদের কাছে ঘেঁষছে না। জিটি রোডের একটা চায়ের দোকানে পঞ্চপাণ্ডব বসে আড্ডা মারছে। এরা গত বিধানসভা নির্বাচনেও জনমোর্চার মিছিলে হেঁটেছে, জনমোর্চার হয়ে দেওয়াল লিখেছে, জনমোর্চার প্রার্থীর জন্য প্রচার করতে বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটার স্লিপ পৌঁছে দিয়েছে। বছর দুয়েক আগে পালটি খেয়েছে। এখন নবযুগের সক্রিয় সদস্য। অভিকে দেখে প্রথম পাণ্ডব হাত নেড়ে ডাকল। দোকানে না ঢুকে অভি বলল, ‘কী বলছ?’

দ্বিতীয় পাণ্ডব বলল, ‘কাকে ভোট দিবি?’

অভি বলল, ‘সেটা তোমায় বলব কেন?’

তৃতীয় পাণ্ডব বলল, ‘দাদাটা তো নকশাল না খ্যাঁকশাল—কী একটা করত। সে বেচারি বিপ-বিপ-বিপ্লব করতে গিয়ে পটল তুলেছে। তুই কী চাস?’

‘বিপ-বিপ-বিপ্লব’ শুনে অভি বেশ খুশি। বুঝে হোক বা না বুঝে, এই গাধাটা একটা ভালো কথা বলেছে। তবে বিলুর প্রসঙ্গ ওঠায় বিরক্ত হয়ে বলল, ‘মরে যাওয়া মানুষকে নিয়ে আবার টানাটানি কেন? যা বলার আমাকে বলো না।’

চতুর্থ পাণ্ডব বলল, ‘সিধে গিয়ে নবযুগ পার্টির “পার্থি”-কে ছাপ মেরে আসবি।’

‘র’ ফলা উচ্চারণ করতে না পারাটা নবযুগ পার্টির সবার সমস্যা নাকি? মুচকি হেসে অভি বলল, ‘পার্থি না প্রার্থী?’

পঞ্চম পাণ্ডব কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। তার আগেই ছয় ফুটিয়া এক জওয়ান এসে পঞ্চপাণ্ডবকে বলল, ‘আপলোগ ইঁয়াহা কেয়া কর রহা হ্যায়?’

পঞ্চপাণ্ডব টুঁ শব্দ না করে চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে গেল। জওয়ানের দিকে তাকিয়ে অভি ভাবল, এর মতোই কেউ একজন সব্যসাচীদাকে গুলি করে মেরেছে। আবার এদের জন্যই সে নিশ্চিন্তে ভোট দিতে পারছে। ‘বাহবা সময় তোর সার্কাসের খেলা!’

লালবাবা কলেজে ঢুকে অভি আবার অবাক হল। প্রতিটি বুথের সামনে লম্বা লাইন।

ভোট দেওয়ার লাইন দেখে সে অভ্যস্ত। বুথ জ্যামের লাইনে অনেক অচেনা মুখ থাকে। হ্যাহ্যাহিহি বেশি হয়। যে ঘরে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম আছে তার সামনে ফালতু জটলা থাকে। পুলিশরা অন্য প্রান্তে বসে ক্যাডারদের সঙ্গে আড্ডা মারে। কিন্তু এ লাইন সুশৃঙ্খল। লাইনের সবার মুখ চেনা। সদ্য আঠেরোয় পড়া প্রথম ভোটার থেকে নব্বই পেরোনো বৃদ্ধা—সবাই আছে। কেউ কোনও কথা বলছে না। শান্তভাবে লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। লাইনে এগোচ্ছে দ্রুত। শেষতম ব্যক্তি হিসেবে লাইনে দাঁড়িয়ে অভি দেখল তার আগে ত্রিশজন দাঁড়িয়ে। কুড়ি মিনিটের মধ্যে সে লাইনের গোড়ায়। পিছন ফিরে দেখল তার পিছনে এখন আরও ত্রিশজন।

এত লোক ভোট দিচ্ছে? এই রকম শৃঙ্খলায়? অভির অবাক হওয়ার কথা। কিন্তু সে অবাক হল না। বেশি ভোট কেন পড়ে সবাই জানে। এই নির্বাচন প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার নির্বাচন। ত্রিশ বছরের একটা মাফিয়া পাওয়ার স্ট্রাকচারকে ধূলিসাৎ করার নির্বাচন। অভি জানে মৃন্ময় চ্যাটার্জির কথাবার্তার ছিরিছাঁদ নেই, গিমিকের রাজনীতি করেন, কোনও আদর্শ নেই। কিন্তু ভদ্রলোকের মুখোশ পরে সন্দীপ সামন্ত ও তার দল গত ত্রিশ বছরে যে পরিমাণ অন্যায় করেছে, তার বিকল্প হিসেবে মৃন্ময়ই আসুন। আর কেউ তো এই পাওয়ার স্ট্রাকচারের বিরুদ্ধে লড়াই করার হিম্মত দেখাল না। ইভিএম মেশিনের সামনে গিয়ে নির্দ্বিধায় নবযুগ পার্টির চিহ্নওয়ালা বোতাম টিপল অভি। পিঁ-ই-ই-ক করে শব্দ হল। ভোট শেষ। এবার পড়তে বসতে হবে।

মায়োকার্ডিয়াল ইনফর্মশান সংক্রান্ত প্রশ্নের উত্তর লেখা শেষ করে আবার ঘড়ি দেখল অভি। সময়মতো শেষ হয়েছে। পরের প্রশ্ন হাত দেওয়া যাক। ক্রনিক রেনাল ফেলিওর। এই প্রশ্নের উত্তর ছোট করে নামানো যাবে। চার্ট আর ডায়াগ্রাম বেশি হবে, এই যা!

.

ভোটের দু’দিন পরে রেজাল্ট। অতীতে যখন ব্যালট পেপার গোনা হত, তখন টিভি চ্যানেলগুলো একটানা দু’তিন দিন ধরে ভোটের রেজাল্টের লাইভ কভারেজ দিত। সেফোলজিস্টরা নানা প্রেডিকশান করতেন। এখন ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের কারণে বেলা দুটোর মধ্যে রেজাল্ট সক্কলের চোখের সামনে। সেফোলজিস্টদের রমরমা বাজার আর নেই। রাজনৈতিক দলের নেতারা টিভি স্টুডিওয় এসে বাজার গরম করেন।

রেজাল্ট বেরোনোর তারিখ ছিল তেরো। সেদিন আবার শুক্রবার। ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্‌থে সন্দীপ সামন্ত এবং জনমোর্চার ভাগ্য নির্ধারিত হল। মনোজ ভোরবেলা থেকে টিভি খুলে বসে। অরুণা বারবার চা দিচ্ছেন। বিরক্ত হয়ে কটু কথাও শোনাচ্ছেন। মনোজের বিকার নেই। তিনি টেনস্‌ড। কিছুটা ভীতও। অভি বলল, ‘বাবা, ফিয়ার অব ফ্রাইডে দ্য থার্টিন্‌থকে ইংরিজিতে কী বলে জানো? আমি সাইকায়াট্রিতে পড়েছি।’

‘জানি না। জানার প্রয়োজনও নেই। রেজাল্ট বেরোনোর পরে জেনে নেব।’ মনোজ হুমকি দিয়েছিলেন।

 অভি মুচকি হেসে পড়তে বসেছিল। দুপুর দুটো নাগাদ বোমা ফাটার শব্দ, মুহুর্মুহু স্লোগান, চিৎকার, হইহল্লা শুনে সে ঘর থেকে বেরোয়। স্কুপ চ্যানেলে নির্বাচনের ফলাফল দেখা যাচ্ছে। নবযুগ পার্টি একা পেয়েছে একশো নব্বইটি আসন। সহযোগী দল পেয়েছে আরও পনেরোটি। দুশো পঁয়ত্রিশ আসনের বিধানসভায় জনমোর্চা পেয়েছে মাত্র ত্রিশটি আসন।

মনোজকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না। যেমন টিভির পর্দায় দেখতে পাওয়া যাচ্ছে না জনমোর্চার নেতাদের। পার্টি অফিসগুলো ফাঁকা। নবযুগ পার্টির সমর্থকরা হলুদ আবির মাখছে, মিষ্টি বিতরণ করছে, নাচছে, গাইছে, কাঁদছে। একজন তো বলেই বসল, ‘দ্বিতীয়বার স্বাধীন হলাম।’

টিভি বন্ধ করে অভি বাইরের বারান্দায় যায়। অরুণা বারান্দায় দাঁড়িয়ে রাস্তার মিছিল দেখছেন। মনোজও দেখছেন। তবে পর্দার আড়াল থেকে। লক্ষ্মী নিবাসের সামনে তাসা পার্টির কুড়কুড়ির তালে তালে ‘তু চিজ বড়ি হ্যায় মস্ত মস্ত’ গানের সঙ্গে নাচছে ছেলেছোকরার দল। শ’পাঁচেক লোকের মিছিল লক্ষ্মী নিবাসের গেট খুলে ভেতরে ঢুকে পড়ল। মিছিলের গোড়ায় পঞ্চপাণ্ডব। প্রথম পাণ্ডব বলল, ‘মনোজদা কই? ও বউদি, মনোজদা কই?’

একতলা থেকে রাধা বলল, ‘দুপুরবেলা মদ খেয়ে ধিনিকেষ্টর মতো নাচছিস কেন? শারুক খানের নতুন ছবি বেরিয়েছে, না বউ মরেছে?’

‘ধুর পাগলি!’ এক ধাক্কায় রাধাকে সরিয়ে দুদ্দাড়িয়ে ওপরে উঠে আসে পঞ্চপাণ্ডব। কেউ কিছু বোঝার আগেই প্রথম পাণ্ডব মনোজকে খুঁজে বার করে। দু’হাত ভরতি হলুদ আবির উপুড় করে দেয় মনোজের মাথায়, মুখে, ঘাড়ে, গলায়, গেঞ্জির ভিতরে। মনোজ প্রতিবাদ করার কোনও সুযোগ পেলেন না।

‘মৃন্ময় চ্যাটার্জি জিন্দাবাদ!’ গর্জন করে দ্বিতীয় পাণ্ডব। ‘বলো মনোজদা, মৃন্ময় চ্যাটার্জি জিন্দাবাদ।’

মনোজ ঘাড় গোঁজ করে দাঁড়িয়ে। অভি বুঝতে পারছে, তার কিছু বলা উচিত। এইভাবে বাড়ির মধ্যে ঢুকে আবির মাখানোর মধ্যে প্রচ্ছন্ন হুমকি আছে। কিন্তু সে কিছু বলে উঠতে পারছে না। তার ভয় করছে।

প্রতিবাদ করলেন অরুণা। ‘দ্যাখো ভাই। এভাবে বিনা অনুমতিতে বাড়িতে ঢোকা ঠিক নয়।’

‘আপনার কাছে অনুমতি লাগবে বউদি?’ খ্যাকখ্যাক করে হাসছে তৃতীয় পাণ্ডব। ‘আমি তো এই বাড়িরই ছেলে। মনোজদা আমাকে স্লোগান দিতে শিখিয়েছিলেন। ‘সন্দীপ সামন্ত জিন্দাবাদ।’ আমি দিয়েছিলাম। কী মনোজদা, দিইনি? তা হলে আজকে তুমি দেবে না কেন? একেই তো ডেমোক্র্যাসি বলে। “মিলে সুর মেরা তুমহারা, তো সুর বনে হমারা।” বলো মনোজদা?’

মনোজ চুপ। অরুণা মনোজকে জড়িয়ে ধরে বলেন, ‘ওকে তোমরা ছেড়ে দাও।’

চতুর্থ পাণ্ডব হিশহিশ করে বলল, ‘বলো মনোজদা। মৃন্ময় চ্যাটার্জি জিন্দাবাদ…’

‘মৃন্ময় চ্যাটার্জি…’ হলুদ আবিরে মাখামাখি মনোজের মুখ। গাল দিয়ে ঝরে পড়ছে চোখের জল।

‘বলো মনোজদা। জিন্দা-আ-আ… বাদ।’

‘জিন্দাবাদ।’

‘ওরকম মিয়োনো মুড়ির মতো নয়। বাঘের বাচ্চার মতো বলো। বলো।’ ঘেউঘেউ করে ওঠে পঞ্চম পাণ্ডব।

‘মৃন্ময় চ্যাটার্জি-ই-ই-ই! জিন্দা-আ-আ… বা-আ-আদ!’ ডান হাতের মুঠো ওপরে তুলে, দুই ফুসফুস নিংড়ে সবটুকু বাতাস বার করে স্লোগান দিলেন মনোজ। পঞ্চপাণ্ডব খুশি হয়ে চলে গেল। চলে গেল পাঁচশো লোকের মিছিল।

মনোজ দৌড়ে বাথরুমে গেলেন। দরজা বন্ধ না করেই হুড়হুড় করে এক বালতি জল মাথায় ঢাললেন। সাদা পাজামা, সাদা পাঞ্জাবি, সাদা মেঝে আবিরের রঙে হলুদ। আতঙ্কিত চোখে হলুদ মেঝের দিকে তাকিয়ে মনোজ পাঞ্জাবি খুলে ছুড়ে দেন বাথরুমের বাইরে। শাওয়ার চালিয়ে সাবান দিয়ে ঘষে ঘষে গা থেকে রং তুলতে থাকেন। অভি অবাক হয়ে মনোজের দিকে তাকিয়ে। অরুণা বাথরুমের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে বলে, ‘পাগলামি করছ কেন? বাথরুমের দরজা বন্ধ করো। শ্যাম্পু লাগাও।’

বাথরুমের দরজা বন্ধ করার আগে কাঁদতে কাঁদতে মনোজ অরুণার হাত ধরে বলেন, ‘আজ আমি বুঝতে পারছি, তুমি কেন বারবার হাত ধোও! পারলে আমাকে ক্ষমা করে দিও অরুণা।’

পড়তে বসার আগে অভি ভাবল, কত বছর বাদে সে দেখল যে মা বাবাকে স্পর্শ করছেন!

ইলেকট্রোলাইট ইমব্যালেন্স। যে কোনও চিকিৎসকের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জটিল একটি বিষয়। অভি উত্তর লেখা শুরু করে। হাতে সময় আছে খানিকটা। এই উত্তরটা শেষ করার পরে এক নম্বর প্রশ্নে হাত দেবে।

.

নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পরবর্তী কয়েকদিন রাজ্য জুড়ে তুমুল রাজনৈতিক অস্থিরতা। জেলায় জেলায় পলিটিকাল ভায়োলেন্স, খুন, ধর্ষণের ঘটনা ঘটে গেল একের পর এক। মৃন্ময় চ্যাটার্জি মুখ্যমন্ত্রীর পদে শপথ নিলেন। নতুন মন্ত্রীসভা গঠিত হল। সন্দীপ সামন্ত এবং জনমোর্চার নেতারা সংবাদপত্র বা টিভিতে মুখ খুলছেন না। কাগজে প্রতিদিন বেরোচ্ছে সারা রাজ্য জুড়ে ভাঙা হচ্ছে জনমোর্চার পার্টি অফিস। জেলা কমিটি, জোনাল কমিটি, লোকাল কমিটির বাড়ির দখল করে নিচ্ছে নবযুগ পার্টির সমর্থকরা। কোনও বাড়ি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিচ্ছে, কোনও বাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে, কোনও বাড়িতে নবযুগের পার্টি অফিস খুলছে। লেনিন, স্ট্যালিন, মাও জে দং, মার্কস বা এঙ্গেলসের ছবি আছড়ে আছড়ে ভাঙা হচ্ছে। ভাঙা হচ্ছে পাড়ার মোড়ের শহীদ বেদি। কোথাও কোথাও বেদী দখল হয়ে যাচ্ছে। নবযুগের কর্মীরা বলছে, ‘এই শহীদ বেদীর দেখভাল এখন থেকে আমরা করব।’

যেদিন অভি হোস্টেলে চলে আসবে, তার আগের দিন লক্ষ্মী নিবাসে অদ্ভুত একটা ঘটনা ঘটল। একতলায় চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ঘর থেকে বেরিয়ে অভি দেখে পঞ্চপাণ্ডব মনোজকে ঘিরে ধরে তড়পাচ্ছে।

প্রথম পাণ্ডব বলছে, ‘লজ্জা করে না? বাড়িতে রেন্ডিখানা খুলেছেন?’

দ্বিতীয় পাণ্ডব বলছে, ‘সরকারি চাকরি করে অনেক বেতন পান। তাও এইসব নোংরামি কেন?’

মনোজ মুখ শুকিয়ে সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে। অরুণা তাকে আগলে রেখেছেন। রাধা পাগলি উঁচু গলায় চেঁচিয়ে যাচ্ছে। তার কথা কেউ শুনছে না। পাড়ার লোকজন বাড়ির সামনে জড়ো হয়ে দেখছে এক যুগলকে। মানদা আর নন্দন।

নন্দনের পরনে সাদা পাজামা-পাঞ্জাবি। মানদার পরনে লাল পাড় সাদা শাড়ি। দু’জনে থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে। পাণ্ডবদের দাবড়ানি শেষ হতে নন্দন বলল, ‘আপনি প্লিজ এইসব কথা বলবেন না। আমরা দু’জনে স্বামী স্ত্রী। সদ্য রেজিস্ট্রি অফিস থেকে বিয়ে করে এলাম। ম্যারেজ সার্টিফিকেট দেখতে চান?’

‘বেশ্যার আবার বিয়ে হয় নাকি?’ তৃতীয় পাণ্ডব হুঙ্কার ছাড়ে।

‘হ্যাঁ, হয়।’ কঠিন গলায় বলে নন্দন। অভির মনে হয়, এতদিন সে নন্দনকে মন দিয়ে দেখেনি। এই প্রথম দেখল। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা ছাড়িয়ে তার ব্যক্তিত্ব এখন সবার ওপরে।

আর মানদা? লালপেড়ে সাদা শাড়ি পরা মানদার মাথা ভরতি সিঁদুর। কপালেও সিঁদুর ল্যাপা। দক্ষিণেশ্বরের কালী ঠাকুরের প্রসাদের চুবড়ি অরুণার হাতে দিয়ে বলল, ‘বউদি, আমি আর এখানে থাকব না। আমার জন্য তোমার অনেক অসম্মান হল। আমায় ক্ষমা করে দিও।’ তার ভেজা ভেজা কণ্ঠস্বর, তার কপাল ভরতি সিঁদুর, তার খুশিতে উজ্জ্বল মুখ দেখে অভি ভাবল, কী হবে জেনে, মানদা বাড়ির বাইরে গিয়ে কী করে? সে একজন মানুষ। এইটুকু পরিচয় কি যথেষ্ট নয়!

একজন শারীরিকভাবে খুঁতো। অন্যজন সমাজের চোখে খারাপ মেয়ে। সমাজ এদের নিয়ে ঠাট্টা, ইয়ার্কি, রংতামাশা করতেই থাকবে। তার মধ্যে ওরা যদি নিজেদের নিয়ে খুশি থাকে, তাতে কার কী? এ তো আনন্দের খবর। সেলিব্রেশনের খবর। অভি দ্রুত দোতলায় উঠে ফ্রিজ খুলে সন্দেশের বাক্স বার করে। দুদ্দাড়িয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে পঞ্চপাণ্ডবের সামনে বাক্স খুলে বলে, ‘তোমরা মিষ্টিমুখ করে যাও। আজ শুভ দিন!’

বিরস বদনে সন্দেশ খেয়ে বিদায় নিয়েছিল পঞ্চপাণ্ডব। অরুণা আর মনোজকে প্রণাম করে, অভির গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে একটু পরে বিদায় নিয়েছিল মানদা আর নন্দন। সে দিন পড়াশুনায় মন বসছিল না। চুপি চুপি একতলায় নেমে রাধাদির ঘরে ঢুকেছিল অভি। দেখেছিল রাধাদি লম্বা একটা কাগজে চিঠি লিখছে। ভেজা ভেজা কণ্ঠস্বরে বলছে,

.

‘টু দ্য প্রিন্সিপাল সেক্রেটারি,

ডিপার্টমেন্ট অব হেল্‌থ অ্যান্ড ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার,

রেসপেকটেড ম্যাডাম,

আপনার জ্ঞাতার্থে জানাই যে মানদারও বিয়ে হয়ে গেল। সে ড্যাংডেঙিয়ে চলে গেল। না শ্বশুরবাড়ি নয়। দ্য গ্রেট অলিম্পিক সার্কাসে। সেখানে মাদ্রাজি মালিক, চাইনিজ ট্রাপিজ আর্টিস্ট, মারাঠি লায়ন টেমার, আপিমখোর বাঘ, হাপ ন্যাংটো মেয়ে, ক্ষুধার্ত জলহস্তী ও বামন স্বামীকে নিয়ে তার একান্নবর্তী সংসার। হে প্রভু আপনার জগতে সবার ঠাঁই আছে। তাহলে এই উন্মাদিনীর জন্য কোনও স্থান নেই কেন? এই জীবন লইয়া আমি কী করিব? প্রণাম গ্রহণ করিবেন।

দিস ইজ ফর পাবলিক ইন্টারেস্ট। ইগারলি অ্যাওয়েটিং ইয়োর রেসপন্স।

ইয়োরস্‌ ট্রুলি,

রাধা।’

.

আজ, মেডিসিন পরীক্ষার শেষ প্রশ্নের উত্তর লিখতে শুরু করে, রাধা পাগলির জন্য চোখে জল আসে অভির। হাতে চল্লিশ মিনিট আছে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *