হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ১৯

১৯. চন্দন

সূর্যাস্ত হচ্ছে। আলো কমছে। অন্ধকার বাড়ছে। লেকের জলে একটু আগেও চিকমিকে ঢেউ দেখা যাচ্ছিল। এখন সেখানে গহন আঁধার।

অন্ধকার শান্তিধামের তিনতলাতেও। লেকের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে সোফায় পাশাপাশি বসে রয়েছে কুনাল আর তাপসী। হাতে হাত স্পর্শ করে আছে। সিঁড়ি দিয়ে কয়েকজন ওপরে গেল। কিছুক্ষণ পরে তারা বেরিয়েও গেল। কুনাল আর তাপসী ঘুরেও দেখল না। দেওয়াল ঘড়িতে আটটা বাজার শব্দ শুনে তাপসী বলল, ‘এখন তো কোনও কাজ নেই এখানে। ক’দিনের জন্য বাড়ি ঘুরে এসো।’

‘ইচ্ছে নেই,’ সংক্ষিপ্ত জবাব কুনালের। তাপসী চুপ করে রইল। কিছুক্ষণের জন্য কুনালও চুপ। এবার সে বলল, ‘তুমি কিছুদিনের জন্য বাড়ি ঘুরে এসো। এখন বসের যা অবস্থা, ওটি করতে পারবেন না।’

‘ভাবছি যাব। আমাদের ওদিকে নানা পলিটিকাল গন্ডগোল লেগে আছে। দাদাকে পুলিশ খুঁজছে। একা যেতে ভয় করছে।’

‘নিজের বাড়ি একা যেতে ভয় করছে?’ হালকা হাসে কুনাল।

‘এ একা সে একা নয়। একাকীত্বকে কোনও দিনই খারাপ লাগে না। ওটা এনজয় করি। গোলাগুলি খুনোখুনির মধ্যে বাড়ি যাওয়ার কথা উঠল বলে মনে হল, একটা ব্যাটাছেলে সঙ্গে থাকলে বল পেতাম।’

‘শুধু বল হলেই হবে? না সঙ্গে ব্যাটও লাগবে?’

‘সে রকম ‘বডিগার্ড বটব্যাল’ আর পাচ্ছি কই?’

‘আমি যাব?’

‘তুমি? জগদ্দল ছেড়ে নতুনগাঁয়ে? বউ ছেড়ে অন্য মহিলার সঙ্গে? বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে না?’

‘আহা! আমি তো ব্যাটাছেলে হিসেবে যাচ্ছি। আই মিন ‘বডিগার্ড বটব্যাল’ হিসেবে। মানে আমার তো অন্য উদ্দেশ্য নেই…’ অপ্রস্তুত হয়ে তোতলাচ্ছে কুনাল। তাপসী কুনালের হাতে সামান্য চাপ দিয়ে ছেড়ে দেয়। বলে, ‘কাল মঙ্গলবার। ভোর-ভোর বেরিয়ে পড়ব। দুটো রাত ওখানে কাটিয়ে বেস্পতিবার বিকেলের মধ্যে ফিরে আসব। চলো। স্যারকে গাড়ির জন্য বলা যাক।’

‘গাড়ি কেন? আজকাল কত এসি বাস রয়েছে। ধর্মতলা থেকে ছাড়ে।’ আপত্তি করে কুনাল।

‘ধুর! তুমি খুব ভীতু। আমি স্যারের কাছ থেকে পারমিশান নিয়ে আসছি। সুলতানকে নিয়ে যাব। ওরও ঘোরা হবে। আমাদের বাড়িতে ঘরের অভাব নেই।’

‘সুলতানকে নেওয়ার কী দরকার? নিজের গাড়ি না থাকলেও আমি ভালো ড্রাইভার। ন্যাশনাল হাইওয়েতে চালিয়ে হাত পাকিয়েছি। তোমার চিন্তা নেই।’ লেকের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বলে কুনাল। তাপসী কুনালের কাঁধে চিমটি কেটে বলে, ‘এবার কিন্তু আমার ভয় করছে। একা যাওয়ার ভয় নয়। দোকা যাওয়ার ভয়।’

কুনাল সোফা থেকে উঠে বলল, ‘আমার ছেলে সামনের বছর জয়েন্ট এনট্রান্স দেবে। আমি এখন নখদন্তহীন বৃদ্ধ সিংহ। ঢোঁড়া সাপ।’

‘বাঁদর বুড়ো হলেও ডিগবাজি খাওয়া ভোলে না।’ টেবিল থেকে কাপ-প্লেট তুলতে তুলতে বলল তাপসী। ‘তুমি গাড়ির ব্যবস্থা করো। আমি ব্যাগ গোছাই। কাল ভোর ছ’টায় বেরোব।’

‘তিন বাঁদরের গল্প জানো তো? একটা বাঁদরের কানে হাত। একটার মুখে হাত। তিন নম্বরটার চোখে হাত। মানে হল, খারাপ কিছু শুনি না, খারাপ কিছু বলি না, খারাপ কিছু দেখি না। চার নম্বর বাঁদরটির হাত কোথায় ছিল বলো তো?’

‘কোথায়?’ উত্তর আন্দাজ করে মিটিমিটি হাসছে তাপসী। নাকের পাটা ফোলা। কপালে ঘাম জমেছে।

‘দু’পায়ের ফাঁকে। অর্থাৎ খারাপ কিছু করি না।’ মুচকি হেসে চারতলায় স্যামির কাছে গাড়ির জন্য দরবার করতে যায় কুনাল।

.

মেডিসিন ওয়ার্ডে রাউন্ড দিতে দিতে চন্দন আর বৃন্দাকে দেখে রিপু বলল, ‘ঘুরে ফিরে সেই আমার খপ্পরে পড়লি তোরা। ভেবেছিলি রিপুদা সিন থেকে আউট। কিন্তু না। “আবার সে এসেছে ফিরিয়া।” ’

রিপুর মুখে ‘আবার সে এসেছে ফিরিয়া’ শুনে চন্দন বলল, ‘ভাই পাগলা দাশু, তুমি সিন থেকে কবে আউট হলে এটা বুঝিয়ে বলবে? বাই দ্য ওয়ে, মেডিসিন ওয়ার্ডের বাকিরা কোথায়?’

পেশেন্টের ব্লাড টানতে টানতে রিপু বলে, ‘টিনটিনও আছে।’

চন্দন অবাক হয়ে রিপুকে দেখছে। রিপু স্টেথোস্কোপ লটকে, এপ্রন পরে পেশেন্ট দেখছে। ব্লাড টানছে, ইসিজি করছে, বিজ্ঞের মতো এক্স রে প্লেট দেখছে। কিছুদিন পরে চন্দনও এই রকম করবে!

রিপু বলল, ‘আমি এখন জনমোর্চার জুনিয়র ডাক্তার অ্যাসোসিয়েশান বা জেডিএতে নাম লিখিয়েছি। কিন্তু আমাদের ছাত্রমোর্চার কী অবস্থা?’

‘ভালোমন্দ মিশিয়ে চলছে। নতুনগ্রামে সন্দীপ সামন্তর পুলিশ দশজনকে গুলি করে মারল বলে সবাই আমাকে ঘেন্নার চোখে দেখছে। অথচ ওই গ্রামের বাসিন্দা হয়ে আমার মতামত সম্পূর্ণ আলাদা।’

‘তোর আবার কী মত?’ রিপু আর চন্দনের আলোচনায় বৃন্দা ঢুকে পড়েছে।

‘সব্যদা, বিলুদা, গোপাল নস্কর— এরা সবাই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। যুদ্ধে জয় পরাজয় অনিবার্য। সব্যদা বা বিলুদা সেটা জেনেই হাতে অস্ত্র তুলে নিয়েছিল। তাই ওদের মৃত্যুতে শোক পালন করা যেতে পারে। কিন্তু সন্দীপ সামন্তর সরকারের বিরুদ্ধে কিছু বলা উচিত নয়।’

‘কী উচিত আর কী অনুচিত সেটাও কি তোদের সরকার ঠিক করে দেবে?’ রাগ রাগ গলায় বলে বৃন্দা।

‘স্যামি ব্যানার্জির মেয়ে রাজনীতিতে উৎসাহ দেখাচ্ছে।’ হাসতে হাসতে বলে রিপু। ‘আগামী বিধানসভা ইলেকশানে কী হবে কে জানে!’

‘রিপুদা, আমরা কাটলাম।’ হাত নাড়ে চন্দন। ‘আজ একবার বাড়ি যাব। বাবা তলব করেছে।’

মেডিসিন ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে আসে চন্দন। পাশে বৃন্দা। রাস্তায় নেমে বৃন্দা বলে, ‘আজ বাড়ি যাবি? আমাকে বলিসনি তো!’

‘বাড়ি যাব, এটা বলার কী আছে? এরপর তো বাথরুম যাওয়ার আগেও তোর পারমিশান নিতে হবে। ওসব ছাড়। কাকুর শরীর কেমন?’

চন্দনের ক্যাজুয়াল উত্তর শুনে বৃন্দা দাঁত দিয়ে ঠোঁটে টিপে রইল। মুখ লাল। রাগের চোটে ফোঁসফোঁস করে শ্বাস পড়ছে। অবশেষে বলল, ‘এখন অনেক বেটার।’

বৃন্দা যে রেগে গেছে এটা চন্দন খেয়াল করেনি। সে বলল, ‘তুই এখন কোথায় যাবি?’

‘লাইব্রেরি? কেন? তুই আমার সঙ্গে যাবি?’

‘না না! এখন তোর সঙ্গে টাইম ওয়েস্ট করা যাবে না। তুই যা! আমি হোস্টেল থেকে ব্যাগ নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দেব। টাটা।’

বৃন্দাও টাটা করে। চোখেমুখে কনফিউশান। চন্দনকে সে বুঝতে পারছে না। তার সঙ্গে থাকলে চন্দনের টাইম ওয়েস্ট হয়? এটা একটা রিভিলেশান। বৃন্দাকে দখল করার আগে কী পরিশ্রমটাই না করল! আর এখন কোনও আগ্রহ নেই। এটাও বোধ হয় সেই ফার্স্ট হওয়ার আকাঙ্ক্ষা। কলেজের সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাকে আমার চাই। যেই পাওয়া হয়ে গেল, অমনি পরবর্তী টার্গেটের দিকে দৌড়। লাইব্রেরির দিকে যেতে যেতে বৃন্দা ভাবল, চন্দনের সঙ্গে একদিন খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।

যতই ভোর ছ’টায় বাড়ি থেকে বেরোনোর প্ল্যান করা হোক না কেন, বেরোতে বেরোতে সাড়ে আটটা বাজল। কুনাল ঘুম থেকে উঠলো পৌনে আটটায়। স্নান করে রেডি হতে সময় নিল আধঘণ্টা। তারপর শুরু হল টিকির টিকির। ‘এখনও হল না? সত্যি বাবা। মেয়ে জাতটাই ইনকরিজিব্‌ল।’ অথবা, ‘সাধে বলা হয় যে পথি নারী বিবর্জিতা?’ সমানে এইসব বাজে কথা। এদিকে তাপসী যে লুচি আর আলুর দম রেঁধে ফেলেছে – সে খেয়াল নেই।

গাড়িতে উঠে লুচি আর আলুর দমের কথা শুনে কুনাল বলল, ‘কেন নিলে? রাস্তায় শের-ই-পঞ্জাব ধাবা আছে। চমৎকার ব্রেকফাস্ট পাওয়া যায়। সঙ্গে ঠান্ডা ঠান্ডা, কুল কুল বিয়ার।’

‘অ্যাই। তুমি ওইসব ছাইপাঁশ গিলবে না বলে দিলাম। গাড়ি চালানোর সময় ওসব খেতে নেই। আর দেখছ তো বসের অবস্থা। ওই সব খেয়ে কী হাল হয়েছে।’ ড্রাইভারের পাশের সিটে বসে সিটবেল্ট বেঁধে নিচ্ছে তাপসী।

‘এক বোতল বিয়ার খেলে কিস্যু হবে না। চলো, তোমাকেও খাওয়াব।’ শান্তিধাম থেকে গাড়ি বার করে কুনাল। শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির নামাঙ্কিত রাস্তা দিয়ে রবীন্দ্র সদন বরাবর গাড়ি ছোটায়। বাঁ-দিকে ঘুরলেই সেকেন্ড হুগলি ব্রিজ। টোল ট্যাক্স পেরিয়ে ধুলাগড়, কোনা, শলপ হয়ে ন্যাশনাল হাইওয়ে সিক্স বরাবর গাড়ি ছুটছে হু-হু করে। স্পিডোমিটারের কাঁটা আশি পেরিয়ে এগোচ্ছে নব্বইয়ের দিকে। এসি চলছিল। তাপসী বলল, ‘এসি বন্ধ করো। দিনরাত ওটিতে এসির ঠান্ডা বাতাস খাও। স্বাভাবিক হাওয়া বাতাস কেমন জানতে ইচ্ছে করে না?’

‘স্বাভাবিক হাওয়া বাতাস সাসপেন্ডেড পার্টিকল, কার্বন ডাই অক্সাইড, সালফার এবং কারসিনোজেনে ভরতি। ওই বাতাসে শ্বাস নেওয়ার থেকে এসি অনেক ভালো।’

‘খালি ডাক্তারি কপচানো।’ কুনালের হাতে চিমটি কেটে জানলার কাচ নামাতে যায় তাপসী। কুনাল এসি বন্ধ করে চারটে জানলার কাচ একসঙ্গে খুলে দেয়। ঝোড়ো বাতাস দস্যুর মতো ঢুকে পড়ে গাড়ির ভিতরে।

সাঁ-সাঁ করে পেরিয়ে যাচ্ছে ফুলেশ্বর, উলুবেড়িয়া, বাগনান। সাউন্ড সিস্টেম বাজছে রবীন্দ্র সঙ্গীত। তাপসী বলল, ‘সেই একঘেয়ে পচা গান। অন্য গান নেই।’

‘আছে।’ এফএম রেডিও চালায় কুনাল। বেজে ওঠে আশা ভোঁসলের গান, ‘আর কত রাত একা থাকব…’

তাপসী লজ্জা পেয়ে বলে, ‘এম্‌মা! কী অসভ্য গান! এখনকার গানের কথাবার্তা কী নোংরা! আমাদের সময়ে এমনটা ছিল না।’

‘ধুর বাবা!’ বিরিক্ত হয়ে কুনাল বলে, ‘এটা অনেক পুরোনো গান। বুড়িদের মতো কথাবার্তা বলা বন্ধ করো তো! ‘চন্দন পালঙ্কে শুয়ে একা একা কী হবে? জীবনে তোমায় যদি পেলাম না’—গানটা শুনে কানে আঙুল চাপা দাও না কি?’

‘কোন গানের সঙ্গে কোন গানের তুলনা!’ আপত্তি করে তাপসী, ‘ওই গানটা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়।’

‘কোথায় কাঁটা দিল। দেখি।’ স্টিয়ারিং থেকে হাত সরিয়ে তাপসীর ডান হাতে নিজের বাঁ হাত বুলোয় কুনাল। তাপসী সিঁটিয়ে বসে থাকে। সামান্য পরে বলে, ‘সারা জীবন একা থাকলাম তো, তাই যখন কেউ একা থাকা নিয়ে অভিযোগ করে, তখন তার মানে বুঝতে পারি না।’

আকাশে অল্প অল্প মেঘ করেছে। ঠান্ডা, ভিজে বাতাস বইছে। নরম গলায় কুনাল বলল, ‘তুমি কত বছর বয়সে স্বামীকে হারিয়েছ?’

‘পনেরো বছর বয়সে। বাঁজাপলাশ গ্রামে তখন ঘরে ঘরে অজানা জ্বর হচ্ছে। হেল্‌থ সেন্টারে তালা। বর একশো চার জ্বর নিয়ে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছিল। বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যে মারা যায়। তার এক সপ্তাহের মধ্যে আমার বাবামায়েরও অজানা জ্বর হল। দু’জনেই মারা গেল। সেই সময় দাদা খুব হেল্প করেছিল। দাদার জন্যেই আমি পড়াশুনো চালাতে পেরেছি। নার্সিং-এর পরীক্ষা দিলাম। চান্স পেয়ে পিজি হাসপাতালে ভর্তি হলাম, ওখান থেকে পাশ করলাম। সরকারি চাকরির পরীক্ষা দিয়েছিলাম। পাইনি। তারপর শান্তিধামে কাজ জুটে গেল। দেখতে শুনতে ভালো নই। কম বয়সে বিধবা। পরে কখনও কেউ প্রেম বা বিয়ের কথা বলেনি। পুরুষ মানুষ কী জিনিস—এ জীবনে জানা হল না।’

নিঃশব্দে কিছুক্ষণ গাড়ি চালাল কুনাল। কোলাঘাট ব্রিজে উঠে বলল, ‘তোমার সঙ্গে লুচি আর আলুর দম আছে না? বিয়ারের সঙ্গে ভালো জমবে।’

‘আমি কখনও ওসব খাইনি কুনাল।’ সাহস করে ‘স্যার’ থেকে ‘কুনাল’-এ এসেছে তাপসী। ‘আর, রাস্তার ধারে গাড়িতে বসে বোতলে মুখ দিতে পারব না। আমি ওই ভাবে বড় হইনি।’

‘বড় হইনি না বলে বুড়ি হইনি বললে ঠিক শোনাবে। এত সমাজ, নিয়ম, সংস্কার মেনে লাভটা কী হল?’ শের-ই-পঞ্জাবের সামনে গাড়ি দাঁড় করিয়ে তাপসীর ডান থাইয়ে হাত রাখে কুনাল। ‘এখানে থাকার হোটেল আছে। আমরা একটা রুম বুক করে ঘরে বসে খাওয়াটা সারি। তাহলে সব সমস্যার সমাধান।’

‘না।’ দ্রুত মাথা ঝাঁকায় তাপসী। ‘মোটেই না। এসব নোংরামো আমার দ্বারা হবে না।’

‘নোংরামো?’ ফিচেল হাসে কুনাল, ‘আমি লুচি আলুর দম খাওয়ার কথা বলছিলাম। চুমু খাওয়ার কথা বলিনি।’

‘আমি বলেছি।’ ঘনঘন শ্বাস ফেলতে ফেলতে বলে তাপসী। ‘এখান থেকে তোমার ওই ছাইপাঁশ কিনে নাও। একদম বাড়ি গিয়ে খাব। কী এমন করছি যে লুকিয়ে করতে হবে? চোখের আড়ালে, হোটেলের ঘরে করতে হবে? নিজের বাড়িতে তোমাকে নিয়ে গিয়ে সকলের সামনে দোরে খিল দেব। দেখি, কে কী বলে?’

‘আইব্বাস! টোট্‌টাল নারী স্বাধীনতা। আমি কিন্তু ভয় পাচ্ছি!’ ভীতু ভীতু মুখ করে বলে কুনাল। তাপসী ভেংচি কাটে, ‘অ্যা-অ্যা-অ্যা!’

কুনাল বলে, ‘তাহলে বিয়ার কিনতে হবে না। আমার কাছে ভদকা আছে। বাড়ি গিয়ে ঠান্ডা জল আর লেবুর চাকতি দিয়ে হালকা করে বানাবো। আরাম পাবে।’

গাড়ি আবার চালু হয়। মেচেদা পেরিয়ে তাপসী জিজ্ঞাসা করে, ‘আচ্ছা, তোমার কোনও গিলটি ফিলিং হচ্ছে না?’

‘না।’ সংক্ষিপ্ত উত্তর কুনালের। তাপসী কী প্রসঙ্গে প্রশ্নটা করেছে, সে বুঝতে পেরেছে।

‘তুমি আগেও কি…?’

‘হ্যাঁ।’ তাপসীর না বলা প্রশ্নের উত্তর দেয় কুনাল।

‘তাহলে আমি কেন? তারা তো আছে। খুব সুন্দরী। আর কী যেন বলে আজকাল…‘সেক্সি’ না কী যেন…ওই জিনিস নির্ঘাত! খুব ছলাকলা জানে। আমি ওদের নখের যুগ্যিও নই। তাহলে আমি কেন?’

‘এখনও আমাদের মধ্যে কিছু হয়নি তাপসী। কিছু না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। ঘরের মধ্যে কাছাকাছি আসার পরে তোমার গিল্‌টি ফিলিং আসতে পারে। আমার বউ-বাচ্চার কথা মনে পড়ে যেতে পারে। তবে, সতীত্বের ধারণায় বা শারীরিক শুচিতার কনসেপ্টে আমি বিশ্বাস করি না!’

‘শারীরিক শুচিতার কথা বাদ দাও। স্নান করলেই সব শুদ্ধ। মানসিক শুচিতার ব্যাপারে কী মত?’

কুনাল হঠাৎ গাড়ি দাঁড় করাল। এক হাতে তাপসীর মাথা আর অন্য হাতে চিবুক ধরে নিজের কাছে টেনে এনে ঠোঁটে ঠোঁট দিল। অকস্মাৎ এই আক্রমণে প্রথমে ধড়ফড় করে উঠল তাপসী। দু’হাত দিয়ে কুনালকে ঠেলে দূরে সরাতে লাগল। কিছুক্ষণ পরে বাধাদান বন্ধ হল। দু’হাত এখন কুনালের পিঠে বেড় দেওয়া। চুলের মুঠি ধরে ক্রমশ কুনালকে নিজের দিকে টেনে আনছে সে।

দীর্ঘ চুম্বনের শেষে হঠাৎ তাপসীকে ছেড়ে দিল কুনাল। হাঁফাতে হাঁফাতে, বাঁ-হাতের তালুর পিছন দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে বলল, ‘এত কথা কেন? এত যুক্তি, আবেগ, মরাল পোলিসিং কেন? সেক্স একটা অসাধারণ ফিলিং। আমাদের শরীরের মধ্যে এত মজা লুকিয়ে আছে, সেটা আগে জানতে? তা না, খালি বকবক, বকবক…’

তাপসীও হাঁফাচ্ছে। চোখমুখ লাল। উত্তেজিত হয়ে সে বলল, ‘ডাকাত একটা! ডাকাত!’

‘বুড়িদের মতো কথা বলবে না।’ আবার গাড়িতে স্টার্ট দিয়েছে কুনাল। ‘মদ খাওয়াকে ‘ছাইপাঁশ গেলা’ বলা, ‘সেক্সি’ শব্দটা উচ্চারণ করার আগে এবং পরে তানানানা, চুমু খাওয়ার সময় অনিচ্ছার অভিনয়, এইসব সতীপনা এখন কোনও মেয়ে করে না। তারা তাদের পাওনা কড়ায় গণ্ডায় বুঝে নেয়। আর, তোমার মনে যদি এই প্রশ্ন থাকে যে আমি এখনকার মেয়েদের সম্পর্কে এত কথা কী করে জানলাম, তবে তার উত্তরে বলি, সপ্তাহান্তে স্ত্রী সংসর্গ করে জীবন কাটানোর মতো লোক আমি নই। টাকা দিয়ে কখনও সেক্স কিনিনি। তবে দু’একজন বান্ধবী আছে। তারা আমাকে দিয়ে তাদের চাহিদা মেটায়। আমিও আমার হিসেব বুঝে নিই। অতীতে একে বলত ‘পার্ট-টাইম লাভার’। এখন বলা হয় “ফাক বাডি”। নো বিগ ডিল।’

তাপসী জানলা দিয়ে রাস্তা দেখছিল। আপনমনে বলল, ‘ফাক বাডি! আচ্ছা, আমিও কি আর একজন ওই?’

কুনাল তাপসীর ডান হাতে নিজের বাঁ-হাত রেখে বলল, ‘এত ক্রুড ভাবে বলা উচিত হয়নি। অ্যায়াম সরি। কিন্তু আমি ভালোবাসা দিতে পারব না। এই শরীরটুকু দিতে পারি। বাই দ্য ওয়ে, তুমি বিধবা পিসিমাদের মতো আচরণ করা বন্ধ করো। নতুনগ্রাম আর দশ কিলোমিটার।’

.

যৌথ বাহিনীর আক্রমণের দিন থেকে গোপাল নস্কর পলাতক। অন্য যারা এই বাড়িতে থাকত, সেই সব ওড়িয়া আর দক্ষিণী ছেলেমেয়েরাও বেপাত্তা। বাড়ি শুনশান। গোপালের সঙ্গে যোগাযোগ কমে এসেছিল তাপসীর। ন’মাসে ছ’মাসে বাড়ি এসে দেখত দাদা ইস্কুল মাস্টারি, বেলাকূলের সম্পাদকগিরি, আর পার্টির কাজ নিয়ে ব্যস্ত।

গোপালের ওপরে গোপন রাগ আছে তাপসীর। দাদা কেন তার বিয়ে দেয়নি? মেয়েরা কখনও নিজের মুখে বিয়ের কথা বলতে পারে? ফাঁকা দোতলা বাড়ির গেট খুলতে খুলতে তাপসীর মনে হল, ভালো মেয়ের অভিনয় করে আস্ত জীবনটা চলে গেল।

তাপসী কাগজে পড়েছে, টিভিতেও দেখেছে—এই বাড়িতে পুলিশ ঢুকেছিল। পবনকাকু ফোন করে জানিয়েছেন, বাড়ি সিল করা হয়নি। মালিকের বোনের প্রবেশে বাধা নেই। বাড়ির ডুপ্লিকেট চাবি তাপসীর কাছে আছে। যৌথ বাহিনীর সঙ্গে বাঁজাপলাশ গ্রামের বাসিন্দাদের গুলি বিনিময় হয়েছিল বাঁজাপলাশ গাছটার আশেপাশে। জায়গাটা এখান থেকে সামান্য দূরে।

বাড়িতে ঢুকে তাপসীর চক্ষুস্থির। কয়েকদিন কেউ না থাকার ফলে বাড়ি অসম্ভব নোংরা হয়েছে। বালি, ধুলো, পাখির পুরীষ, গাছের পাতা আর কাঁটায় নরক হয়ে রয়েছে।

তাপসী কুনালকে বলল, ‘তুমি দোতলায় যাও। ওখানে একটা গেস্টরুম আছে। আমি একতলাটা পরিষ্কার করে আসছি।’

কুনাল বলল, ‘দুপুর দুটো বাজে। খাওয়াদাওয়া কখন হবে?’

‘তুমি লুচি তরকারি খেয়ে নাও। নোংরা বাড়ি সাফ না করলে আমি স্বস্তি পাব না।’

কুনাল অগত্যা এক পেগ ভদকা খেল। পেট পুরে লুচি আলুর দম খেল। অনেকক্ষণ গাড়ি চালালে মানসিক ক্লান্তি আসে। ভদকা, পেট ভর্তি খাবার, ক্লান্তি— সব মিলিয়ে প্রবল ঘুম পেয়েছে। তাপসী বুদ্ধি করে গেস্ট রুমটা আগে সাফ করেছে। পুরনো আমলের খাট, নরম গদি, নতুন চাদর, নতুন বালিশের ওয়াড়। শোওয়া মাত্র কুনাল ঘুমিয়ে পড়ল।

ঘুম ভাঙল তাপসীর হাতের স্পর্শে। ‘এই যে মশাই। উঠে পড়ো। আদা দিয়ে চা করেছি।’

ঘুম থেকে উঠে ভোম্বলের মতো কিছুক্ষণ বসে রইল কুনাল। সে কোথায় রয়েছে, কেন রয়েছে, কার সাথে রয়েছে—এই সব বুঝতে দশ সেকেন্ড সময় লাগল। অবশেষে মাথা পরিষ্কার হল। সে দেখল, এখনে লোডশেডিং। রাত ন’টা বাজে। তাপসী হ্যারিকেন জ্বালিয়েছে। বড়সড় হাই তুলে তাপসীর হাত থেকে চায়ের কাপ নিয়ে কুনাল বলল, ‘এক নম্বর প্রশ্ন। তোমার ঝিগিরি শেষ হয়েছে?’

‘হ্যাঁ।’

‘সেকেন্ড কোয়েশ্চেন। তুমি খেয়েছ?’

‘হ্যাঁ। লুচি আলুর দম শেষ।’

‘তিসরা পুছতাছ। আমরা রাত্তিরে কী খাব?’

‘বাব্‌বাঃ। কী কেতা!’ খুকখুক করে হাসে তাপসী। ‘ওসব নিয়ে তোমাকে ভাবতে হবে না। তুমি যখন ঘুমোচ্ছিলে আমি বাজার করে এনেছি। ডিনার রেডি। রুটি, মুরগির ঝাল আর লাল দই। ভদকার সঙ্গে চাট হিসেবে গয়না বড়ি ভেজেছি। মৌরলা মাছ ভাজাও আছে।’

‘ওফ! ফ্যান্টাসটিক!’ সড়াত করে চুমুক দিয়ে চা শেষ করে কুনাল বলে, ‘আমরা বারান্দায় বসব না সমুদ্রের ধারে? এখান থেকেই ঢেউয়ের শোঁশোঁ আওয়াজ শোনা যাচ্ছে।’

‘তুমি চান করে নাও। আমি ঝাউবনে সতরঞ্চি পাতছি।’ শাড়ি গাছকোমর করে পরে সিঁড়ির দিকে এগোয় তাপসী। কুনাল বলে, ‘একটা ভদকা মেরে যাও। ফুর্তি আসবে।’

কুনাল দুটো গ্লাসে ভদকা ঢাকছে, এমন সময় ঘটনাটা ঘটল। টর্চের চড়া আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে গেল দু’জনের। চোখের সামনে হাত রেখে তাপসী বলল, ‘কে?’

কোনও মুখ দেখা যাচ্ছে না। আলোকবৃত্তের ওপার থেকে তামাকখেকো খসখসে পুরুষকণ্ঠ জড়ানো গলায় বলল, ‘এনজয়মেন্ট হো রহা হ্যায়?’

হিন্দিভাষী। হরিয়ানভি উচ্চারণ। এখানে এখনও যৌথ বাহিনীর পোস্টিং আছে। এ আর্মির লোক। রাতে মাল খেয়ে বাওয়াল করতে বেরিয়েছে। কুনাল চড়া গলায় বলল, ‘বিনা পুছকে অন্দর কেয়সে ঘুসা? আপলোগ ফোর্স কা আদমি হ্যায়। অগর হাম ফোন করে তো আপলোগো কা হালত বিগড় যায়গা।’

টর্চের আলোর পিছনের মানুষটি একপা এগিয়ে এসেছে। সে বলল, ‘ডিসটার্ব কিঁউ হো রহা হ্যায়? তুম এনজয় করো। হমলোগ ভি এনজয় করেঙ্গে। বাজার কা রোটি বাপ ভি খাতা হ্যায়, বেটা ভি খাতা হ্যায়, ফেকনে সে কুত্তা ভি খাতা হ্যায়! হ্যায় না ডার্লিং?’

‘শাটাপ ইয়ু বাস্টার্ড!’ চিৎকার করে খাট থেকে উঠে বসে কুনাল। টর্চওয়ালা এখন এক হাতের মধ্যে। কুনাল মোবাইলের জন্য হাত বাড়ায়।

‘তেরি মা কি!’ সপাটে এক থাপ্পড় আছড়ে পড়ে কুনালের গালে। তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে স্নিকারের তলায় ফেলে ভেঙে দিল টর্চওয়ালা। তাপসী আতঙ্কিত হয়ে দেখল সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসেছে জনা পাঁচেক লম্বা চওড়া ছায়ামানুষ। সবাই ট্র্যাক স্যুট পরে আছে। আর্মিওয়ালাদের টিপিকাল রাতপোশাক।

দু’নম্বর ছায়ামানুষ তাপসীর কবজি ধরে বলল, ‘বুড্‌ডি হ্যায়। লেকিন আজ ইসিসে হি কাম চলানা পড়েগা।’

‘না,’ গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে ভদকার বোতল আর গেলাস আলোক বৃত্তের দিকে ছুড়ে মারে তাপসী। ঝনঝন শব্দে গ্লাস আর বোতল ভেঙে যায়। এবং এই মোক্ষম সময় কারেন্ট চলে আসে। মুহূর্তের মধ্যে টর্চওয়ালা কুনালের চোখে হাত চাপা দেয়। কুনাল সর্বশক্তি দিয়ে প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। কিন্তু লোকটার গায়ে আসুরিক শক্তি। সে ঠেলতে ঠেলতে কুনালকে পাশের ঘরে ঢুকিয়ে গামছা দিয়ে পিছমোড়া করে বাঁধে। রুমাল দিয়ে মুখ বাঁধে। এক ধাক্কায় ঘরের কোণে ফেলে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দেয়। মেঝের এক কোণে পড়ে থাকা অবস্থায় কুনাল শুনতে পায় তাপসীর অসহায় চিৎকার, ‘কুনা-আ-আ-ল! বাঁ-চা-আ-আ-ও!’

তারপর সব চুপচাপ।

.

সকালবেলা নন্দন হাঁফাতে হাঁফাতে আবাসবাড়ি ঢুকে চন্দনকে ঘুম থেকে তুলে বলল, ‘যৌথ বাহিনী আবার দু’জন উগ্রপন্থীকে ধরেছে। একজন ডাক্তার। অন্যজন কে জানিস? গোপালকাকার বোন। আমাদের তাপসীদি।’

চন্দন তড়াক করে বিছানার থেকে ওঠে। বাবা-মা বাড়িতে নেই। নির্ঘাৎ গোপাল নস্করের বাড়ি গেছেন। নন্দনের সঙ্গে দৌড়য়।

বাড়ি পর্যন্ত যাওয়ার প্রয়োজন হল না। বাঁজাপলাশ গাছের সামনের পুকুরে ভাসছে তাপসীর রক্তাক্ত, উলঙ্গ মৃতদেহ। পুকুরে ভাসছে অজস্র লাল রঙ-এর কাগজ। দেখে মনে হচ্ছে, পলাশ ফুলের পাপড়ি ঝরে পড়েছে পুকুরে। ভালো করে দেখে চন্দন বুঝল, ওগুলো আইপিপির প্যামফ্লেট। প্যামফ্লেট ছাড়াও ভাসছে রাজনৈতিক বই আর পোস্টার।

পুকুরপাড়ে বসে রয়েছে একটা মাঝবয়সি লোক। মাতাল, না অসুস্থ, না ড্রাগ্‌ড—বোঝা যাচ্ছে না। লোকটার হাতে মাও জে দঙের মুখ আঁকা একগাদা লাল প্যামফ্লেট। লোকটা একটা একটা করে প্যামফ্লেট পুকুরে ছুঁড়ছে। লোকটা তাপসীর উলঙ্গ শরীর ঢাকতে চাইছে। পুকুরের সবুজ চালচিত্রে লাল প্যামফ্লেটগুলি খুব দৃষ্টিনন্দন লাগছে। বাতাসে ভেসে দূরে চলে যাচ্ছে কাগজ। জলে ডুবে যাচ্ছে। তাপসীর শরীর ঢাকা পড়ছে না। লোকটা আবার প্যামফ্লেট ভাসাচ্ছে।

জোয়াকিম জনগোষ্ঠীর বামনরা পুকুরপাড়ে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দাঁড়িয়ে রয়েছে মাইকেল আর জুলি ধীবর। পুলিশের জিপের হুটার শোনা যাচ্ছে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *