হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২২

২২. বৃন্দা

পিরিয়ডের দিনগুলোয় বৃন্দার মাথা গরম থাকে। একগাদা শারীরিক অস্বস্তি সবসময় তাড়িয়ে নিয়ে ফেরে। পেটে ক্র্যাম্প, ব্রেস্টে ব্যথা, পায়ে জ্বালা জ্বালা ভাব… অসুবিধের একশেষ। পিরিয়ডের সেকেন্ড আর থার্ড ডে-তে তো তিনবার প্যাড চেঞ্জ করলে ভালো হয়! অসহ্য! সেই সঙ্গে খিটখিটে মেজাজ আর ছেঁড়া ছেঁড়া ঘুম। হালকা ডিপ্রেসন চটচটে আঠার মতো শরীরে লেপটে থাকে।

মন্দিরা বলেন পিরিয়ড বন্ধ হয়ে গেলে নাকি আরও মন খারাপ হয়। মনে হয় আমি শুকিয়ে গেছি, আমার দিকে ছেলেরা আর তাকাবে না, বর আর আমার কাছে ঘেঁষবে না। মন্দিরা জানেন এইসব ধারণা ভুল। মন্দিরাকে দেখতে পুরুষরা সব সময় আগ্রহী। অ্যালকোহল-মুক্ত জীবনে স্যামিও আবার গিন্নিকে নিয়ে ছোঁকছোঁকানি শুরু করেছেন। তাছাড়া কনট্রাসেপশান নিয়ে মাথা ঘামাতে হয় না। কিন্তু, মন হারামজাদি কিছুতেই মানে না!

শান্তিধামের গেটে সুলতানের পাশে বসে ভাঁড়ের চা খেতে খেতে জিভ কাটল বৃন্দা। কলেজে থেকে থেকে তার মুখ খারাপ হয়ে গেছে। অবলীলায় অশালীন শব্দ উচ্চারণ করে। গতকাল বৃন্দার পিরিয়ড শুরু হয়েছে। রাতে মন্দিরার সঙ্গে এই নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কথা বলতে বলতে বৃন্দা বেশ কয়েকবার, ‘দুর শালা’ বলেছে। শুনে মন্দিরার চোখ কপালে। বৃন্দা মন্দিরাকে বুঝিয়েছে এই সব শব্দ আজকের দিনে গালাগালি নয়। হামেশাই বলা হয়।

‘তা বলে তুই? তা বলে মেয়েরা?’

‘মেয়েরা আজকাল ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে গালাগালি দেয় মা। ছেলেদের থেকে অনেক বেশি খিস্তি করে। ঘরের মধ্যে নয়, পাবলিক প্লেসে। এ নিয়ে কোনও ট্যাবু নেই। আমাদের বয়সি ছেলেরা কিছু মনে করে না। তোমাদের মতো সিনিয়ররা চোখ কপালে তোলে।’

‘তোর বাবার মুখে শুনেছি, সে ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় তার বাবার সামনে “মাইরি” বলে ফেলেছিল। তোর ঠাকুরদা হাতপাখা দিয়ে আধঘণ্টা ঠেঙিয়েছিলেন। তোর বাবা জীবনে প্রথম ‘শালা’ বলেছিল কলেজে ঢুকে। বাড়িতে কখনও বলেনি। ফুলশয্যার রাতে আমাকে অনেকগুলো গালাগালি শিখিয়েছিল। আমার এখনও মনে আছে। তোর বাবা বন্ধুবান্ধবদের সামনেই একমাত্র খারাপ কথা বলে। অন্যান্য সময়ে কক্ষনও বলে না। তার মেয়ে হয়ে তুই…’

বৃন্দা চোখ কপালে তুলে মন্দিরাকে বলেছে, ‘বাবা তোমাকে খিস্তি শিখিয়েছিল? তাও আবার ফুলশয্যার রাতে। কী খিস্তি, মা? ভেরি ইন্টারেস্টিং। ভেরি সেক্সি!’

‘সেক্সি?’ মন্দিরার চোখ কপালে, ‘এ কী ভাষা?’

‘ওফ! সেক্সি মানে ইন্টারেস্টিং! কী শিখিয়েছিল বাবা?’

‘সেক্সি মানে ইন্টারেস্টিং? এটা কবে থেকে হল?’

‘উফ! বাজে বোকো না তো! বলো না!’

‘ধুত! ও আমি বলতে পারব না।’

‘আচ্ছা। আমি হেল্প করছি। শালা শিখিয়েছিল?’

‘হ্যাঁ। ওটা অবশ্য আমি আগেই জানতাম।’

‘দু’অক্ষরের আর কোনও গালাগাল?’

‘বৃন্দা! বাড়াবাড়ি কোরো না!’ মন্দিরা গার্জেনি ফলানোর সময় ‘তুই’ থেকে ‘তুমি’তে শিফ্‌ট করেন।

‘বুঝেছি বুঝেছি। দু’অক্ষরের ক’টা শিখিয়েছিল?’

‘দুটো বাংলা আর দুটো হিন্দি।’

‘তিন অক্ষরের ক’টা শিখিয়েছিল?’

‘উম্‌ম্‌… একটা।’

‘চার অক্ষরেরটা নিশ্চয়ই শিখিয়েছিল। ওটা তো খুব কমন।’

‘হ্যাঁ। এবার থামো। পড়াশুনা নেই?’

‘পাঁচ অক্ষর? ছয়? সাত?’

‘বৃন্দা। প্লিজ। আমার ভয় করছে। সাত অক্ষরের গালাগালি হয় নাকি?’

‘হ্যাঁ তো! সাত, আট, নয়… সব হয়।’

‘ওরে চুপ কর। পড়তে বোস। দেশের কী অবস্থা! মেয়েরা আজকাল গালাগাল দিচ্ছে। তাও আবার ন’ অক্ষরের! ও মাগো!’ ভয়ের চোটে মন্দিরা ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’তে ফেরত এসেছেন। মন্দিরার কাণ্ড দেখে বৃন্দা হাসতে হাসতে বলল, ‘তুমি খুব ঘাবড়ে আছো মা! একটু চিল করো।’

‘চিল, শকুন… আমি কিচ্ছু করব না। তোর মুখ থেকে এইসব কথা যেন আমি আর না শুনি।’ মাতৃসুলভ ধমক দিয়েছিলেন মন্দিরা।

‘তথাস্তু!’ গুডিগুডি মেয়ের মতো ঘাড় নেড়েছিল বৃন্দা।

আজ ভোরবেলা পেট ব্যথার চোটে ঘুম ভাঙতেই বৃন্দা বলেছিল, ‘উফ! শালা! কী ব্যথা রে!’ তারপর নাইট ড্রেসের ওপরে হাউসকোট চাপিয়ে বারান্দায় এসেছিল। এখনও চারিদিকে অন্ধকার। একটা ট্রাম গুড়গুড় করে যাচ্ছে, রাস্তায় পথচারীদের দেখা যাচ্ছে না। ওপর থেকে বৃন্দা দেখল, সুলতান চেয়ারে বসে আপনমনে খৈনি ডলছে। বৃন্দা একতলায় নেমে এল। বৃন্দাকে দেখে সুলতান বলল, ‘এত ভোরে? কী ব্যাপার?’

‘ঘুম ভেঙে গেল,’ হাই তুলে বলে বৃন্দা। ‘সুলতানচাচু, তুমি আমাকে ওই দোকানের চা খাওয়াবে?’

‘ভাঁড়ের চা? খাবে?’ খৈনি মুখে ফেলে সুলতান হাক পাঁড়ে, ‘অ্যাই লছমন। এই দিকে দুটো চা ভেজে দে।’

লক্ষ্মণ রাস্তার ওপার থেকে বলল, ‘ব্যয়ঠকে হুকুম কিঁউ করতা হ্যায়। ইয়াহাঁ আকে লে জাও। দুধ চিনি সব মেশানো হ্যায়। ভালো হুয়া।’

‘ঘণ্টা ভালো হুয়া।’ গজগজ করতে করতে চা আনতে যায় সুলতান। এমন সময়ে গেটের সামনে সাইকেল থামায় সুপ্রভাত।

ঝুনুকে আজই প্রথম সামনাসামনি দেখল বৃন্দা। অনেকটা লম্বা, শ্যামলা, গাল ভরতি নরম দাড়ি, ঘুম না ভাঙা চোখ। কার সঙ্গে যেন মুখের মিল আছে। মনে করার চেষ্টা করল বৃন্দা। পারল না। ঝুনু কাগজের বান্ডিল আর ম্যাগাজিনের তাড়া বৃন্দার হাতে দিয়ে বলল, ‘সুলতানদা কোথায়?’

‘চা আনতে গেছে। তুমি কাগজগুলো দাও।’ ঝুনুর দিকে তাকিয়ে বলে বৃন্দা। ছেলেটার মায়াময় চোখ দেখে কার কথা যেন মনে পড়ছে…

কাগজের বান্ডিল বৃন্দার হাতে ধরিয়ে দিয়ে ঝুনু সাইকেল চালিয়ে চলে গেল। সুলতান দু’ভাঁড় চা নিয়ে এসে বলল, ‘নাও। চায় পিয়ে নাও।’

ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে বৃন্দা আজ সকাল-এর প্রথম পাতা দেখছে, এমন সময়ে সুলতান বলল, ‘ঝুনুকে তোমার ক্লাসফ্রেন্ড জ্যায়সা দেখতে। দুব্‌লা ওই ছেলেটার কী নাম যেন…’

অভি! শুধু বৃন্দা নয়, সুলতানেরও মনে হয়েছে। ঝুনুর চেহারায় অভির ছায়া স্পষ্ট। মুখের গড়নে, চুলের ছাঁটে, চোয়ালের গঠনে, না কামানো দাড়িতে, অভিমান ভরা চোখে…

চোয়াল শক্ত করে বৃন্দা বলে, ‘কার কথা বলছ? আমি বুঝতে পারছি না।’ খালি ভাঁড় ডাস্টবিনে ছুড়ে, বাড়ির জন্য বরাদ্দ খবরের কাগজ আর ম্যাগাজিন নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে।

এখনও লিফ্‌ট চালু হয়নি। স্যামি এখনও ইলেকট্রিকের বিল মেটাতে পারছেন না। শান্তিধামে পেশেন্ট নেই।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে বৃন্দা ম্যাগাজিনে চোখ রাখে। উইকেন্ডের এইবারে কভার স্টোরি, ‘বেঙ্গল। রেপ্‌ড অ্যান্ড মার্ডার্‌ড।’ মলাটে তাপসী নস্করের মুখ। কালচে নীল জলের পটভূমিকায় ধর্ষিতা তাপসী কিছুটা ডুবে আছে, অনেকটা ভেসে আছে। সন্দীপ সামন্ত ও মৃন্ময় চ্যাটার্জির দুটি প্রোফাইল ছবি মলাটের দুই প্রান্তে। একজন চেঁচাচ্ছেন, ঠোঁটের কোণ দিয়ে থুতু ছিটকোচ্ছে। অন্যজন আঙুল তুলে শাসাচ্ছেন, চোখ ভাঁটার মতো লাল। দারুণ প্রচ্ছদ।

দ্রুত ম্যাগাজিনের পাতা উল্টোয় বৃন্দা। বিধানসভা ভোটের মাত্র তিন মাস বাকি। তার আগে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক উথালপাথাল নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী। পশ্চিমবাংলার সবকটা জেলার সবরকম আর্থিক অবস্থার মানুষদের নিয়ে সমীক্ষা হয়েছে। সমীক্ষার ফল কোথাও খুব পরিষ্কার। কোথাও খুব গোলমেলে। পাঁচ শতাংশ ভোট সুইং-এর ফলে সন্দীপ সামন্তর জনমোর্চা সরকার যাবে। মৃন্ময়ের নবযুগ সরকার আসবে।

পাতা উল্টে পার্শ্বরচনায় গিয়ে বৃন্দা দেখল ড্যানিয়েল আর্চারের নতুন এক্সিবিশন ‘মাইনর উন্ডস’-এর রিভিউ বেরিয়েছে। ছবিগুলো মুগ্ধ হয়ে দেখল বৃন্দা। দময়ন্তীর বাবার পেইন্টিং-এর একাধিক কফি টেবিল বুক তাদের বাড়িতে আছে। দিল্লি ডিকনস্ট্রাকটেড, গোয়া নাগেট্‌স, বেনারস মনসুন, কেরালা কালেকশান বা মুম্বই আনবাউন্ড সিরিজের ছবির থেকে একদম আলাদা এইসব ছবি।

মহামিছিল নিয়ে একটা পার্শ্বরচনা রয়েছে। মিছিলে থ্রি মাস্কেটিয়ার্স-এর সঙ্গে লোনলি ওয়াইফকেও দেখা যাচ্ছে। মন্দিরা মিছিলে গিয়েছিলেন, বৃন্দা জানত। সেটা নিউজ ম্যাগাজিনে ছবিসহ প্রকাশিত হবে—ভাবতে পারিনি। চারদিকে এত সেলিব্রেটি।

আবার সুপ্রভাতের কথা মনে পড়ে গেল বৃন্দার। নাকি অভির কথা? যে বৃন্দাকে কখনও ভালোবাসেনি। শান্তিধাম আর স্যামি বান্যার্জিকে ভালোবেসেছিল। শাঁসালো শ্বশুর চেয়েছিল! যাক! ওইসব পুরোনো কথা আর মনে করতে চায় না বৃন্দা। চন্দনকে পেয়ে সে হ্যাপি।

তিনতলার ল্যান্ডিং-এ এত সকালে তিনটে শালিখ বসে রয়েছে। বৃন্দা চোখ বন্ধ করে বলল, ‘হুশ! যাহ্‌! হুশ!’ তারপর চোখ খুলে দেখল, তিনটে শালিখ অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে। নিজের জায়গা থেকে কেউ নড়েনি। রাগের চোটে বৃন্দা বলল, ‘সক্কাল বেলা আমার সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছিস কেন? আমি হ্যাপি হলে তোদের কী?’

শালিখ তিনটে নিজেদের মধ্যে কী সব আলোচনা করল। ঘাড় বাঁকিয়ে বৃন্দাকে দেখে টরটর করে কী সব বলে উড়ে গেল। বৃন্দা রাগ করে বলল, ‘ওকে! আমি আনহ্যাপি! এবার খুশি?’

দেওয়াল থেকে টিকটিকি বলল, ‘টিক টিক টিক।’

‘আরে শয়তান!’ দেওয়ালের দিকে তাক করে উইকেন্ড ম্যাগাজিন ছুড়ে মারে বৃন্দা। টিকটিকির কিছুই হয় না। সে সরসর করে দরজার আড়ালে গিয়ে আবার বলে, ‘টিক টিক টিক!’

ম্যাগাজিন তুলে নিয়ে ব্যাজার মুখে চারতলায় উঠে বৃন্দা দেখল, ড্রইং রুমে বসে স্যামি আর মন্দিরা টিভি দেখছেন। স্যামি এখন আগের থেকে অনেক ভালো। পায়ের ফোলাভাব কমেছে। পেটে জল জমার সমস্যা আর নেই। হাতকাঁপা বন্ধ না হলেও আগের মতো নেই। আর কখনও সার্জারি করতে পারবেন কি না কে জানে! সাদা পাজামা পাঞ্জাবি পরা স্যামিকে দেখে মায়া হল বৃন্দার। কাজপাগল একজন মানুষ শুধুমাত্র নেশা করার কারণে কোথায় তলিয়ে গিয়েছিলেন!

স্যামি টিভির দিকে তাকিয়ে ভেবলুর মতো বসে আছেন। কিছু দেখছেন না। মন্দিরা বৃন্দার হাত থেকে কাগজের বান্ডিল নিয়ে স্যামির হাতে বেঙ্গল নিউজ ধরিয়ে বললেন, ‘নাও।’

‘নাহ!’ ঘাড় নাড়েন স্যামি।

‘কাগজ পড়বে না?’ মন্দিরা অবাক, ‘গত কয়েকদিন ধরে তুমি কাগজ পড়ছ না। কী ব্যাপার বল তো? ডিপ্রেশন হচ্ছে নাকি?’

‘কাগজ তো আমি অনেকদিন ধরেই পড়ছি না মন্দিরা।’ মেঝের দিকে তাকিয়ে বলেন স্যামি।

‘আহা, তখন তুমি অসুস্থ ছিলে। এখন তো আর নও।’ বৃন্দা স্যামির পাশে বসে বলে।

‘অসুস্থ নই?’ দু’হাত বৃন্দার দিকে বাড়িয়ে স্যামি বলেন, ‘হাতে কী ট্রেমর হচ্ছে তুই দেখ! ডু ইউ থিংক আমি আর কোনও দিনও সার্জারি করতে পারব?’

বৃন্দা দেখে, স্যামির দুচোখ দিয়ে ঝরঝর করে জল পড়ছে। অসামান্য রূপবান পুরুষটি ভেঙেচুরে প্রৌঢ়ত্বের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছেন। শরীর এতদিনের অত্যাচারের মাশুল গুনছে। ঘোলাটে চোখে, ভাঙা গালে, উঁচু হয়ে থাকা কণ্ঠায়, লিকলিকে হাত পায়ে, নাদা পেটে সময় তার নির্মম চিহ্ন লিখে গেছে।

‘শান্তিধামের জন্য আমাকে মাসে দশলাখ টাকার ইএমআই গুনতে হয়। স্টাফের মাইনে, ওভারহেড কস্ট, রেকারিং এক্সপেন্ডিচার মিলিয়ে আরও পাঁচলাখ। মাস গেলে পনেরো লাখ টাকা কোথা থেকে আসবে, এই ভেবে আমার হাত কাঁপা বেড়ে যাচ্ছে।’ অসহায় ভাবে বলেন স্যামি।

মন্দিরা ভুরু কুঁচকে বলেন, ‘এখনও একবারও ডিফল্টার হয়েছ নাকি?’

‘না। তবে আগামী মাসের ইএমআই-এর জন্য অ্যাসেটে হাত দিতে হবে।’

‘অ্যাসেট বলতে?’ মন্দিরার ভুরু কুঁচকে গেছে।

স্যামি বলে, ‘চারটে গাড়ির মধ্যে তিনটে বিক্রি করে দেব। একতলা আর দোতলাটা ভাড়ায় বা লিজে দেব। হয়তো তিনতলাটাও দেব।’

‘তাতে খরচ উঠবে?’

‘স্টাফ স্ট্রেংথ তো কমেই গেছে। তাপসী বা অন্য সিস্টাররা আর নেই। কুনালকে বসিয়ে মাইনে দেওয়ার মানে হয় না। বেচারা নিজের ঘরে পড়ে পড়ে ঘুমোয় আর মাঝে মাঝে বাদশা ঘোষের কাছে হাজিরা দেয়। ওকে বলব অন্য কোথাও কাজ দেখে নিতে। সুলতানকেও তাই বলব। ঝুনুর মাকে ছাড়ব না। ও না থাকলে তোমাদের অসুবিধে হবে।’

বৃন্দা স্যামিকে জড়িয়ে ধরে বলল, ‘এ তুমি কী বলছ বাবা? বরাবর তুমি বলে এসেছ, খরচ না কমিয়ে রোজগার বাড়ানোর চেষ্টা করতে। সেই তুমি এইসব কথা বলছ?’

‘উপায় নেই মা!’ বৃন্দার মাথায় কাঠি কাঠি আঙুল বোলান স্যামি, ‘চন্দ্রিমার কেসটা আউট অব দ্য কোর্ট সেট্‌ল করতে একগাদা টাকা বেরিয়ে গেল। এমন বদনাম হল যে চেম্বারে পেশেন্ট আসা কমে গেল। তাও সামলে নিতাম। অন্য ভিজিটিং সার্জনরা এলে ক্লিনিকগুলো রান করত, প্যাথলজি আর রেডিয়োলজি ইউনিট চলত, ফার্মাসি চলত, রোজ একটা দুটো ওটি হলেও রানিং কস্ট উঠে যেত। কিন্তু কুনাল আর তাপসীর কেসটা হয়ে যাওয়ার পরে কোনও সার্জন এখানে আসতে চাইছেন না। ওঁরা জানেন, এটা ফল্‌স অ্যালিগেশান। কুনাল কোনও দিনও আইপিপির সঙ্গে যুক্ত ছিল না। কিন্তু ডাক্তারির কেরিয়ার বড় ঝামেলার। আমায় সব সার্জন সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ওঁরা ঝামেলার মধ্যে ঢুকবেন না।’

‘কুনালদাকে তুমি ওই জন্যে ছাড়াতে চাইছ?’ জানতে চায় বৃন্দা।

স্যামি বলেন, ‘বোথ ইয়েস অ্যান্ড নো। আমি অকৃতজ্ঞ নই। শান্তিধাম ছেড়ে যারা যারা গেছে, নিজের ইচ্ছেয় গেছে। প্রতিটি নার্সকে আমি অন্য কোনও নার্সিং হোমে রেকমেন্ড করেছি। কেউ উপার্জনহীন হয়নি। পাশাপাশি এটাও মানতে হবে যে কুনাল আর তাপসীর এ র‌্যাটিক বিহেভিয়ারের জন্যই আমাদের এই হাল। ইফ দে ওয়ান্টেড টু ফাক অ্যারাউন্ড, দেন হোয়াই বাঁজাপলাশ? ওরা এখানে অনেক সেফলি এনজয় করতে পারত। নো পেশেন্ট, নো ডিউটি, ফাঁকা ঘর। আর কী চাই?’

‘বাবা! মুখ সামলে!’ ধমক দেয় বৃন্দা।

মন্দিরা বলেন, ‘আমার মনে হয়, তাপসী আর কুনাল অন্য কোনও কারণে ওখানে গিয়েছিল। তুমি যা বলছ, ওটা আসল কারণ নয়। অন্য কোনও ব্যাপার আছে। যা আমরা জানি না।’

‘বাঙালিরা নিজের বাড়িতে অ্যাডাল্টারি করতে ভয় পায়। চতুর্দিকে এত রিসর্ট গজাচ্ছে কেন? ওখানে কারা গিয়ে ওঠে? স্বামী-স্ত্রী? বললে আমি বিশ্বাস করব?’

বৃন্দার এক পলকের জন্য মনে পড়ল অভির বাবা আর ঋষিতার কথা। ওরা কোনও হোটেল বা রিসর্টে যায়নি। অফিসেই যা করার করত। স্যামি ঠিক বলছেন না।

বৃন্দার চিন্তার মধ্যে মন্দিরা বললেন, ‘আমার কাছে একটা মেগা সিরিয়ালের অফার আছে। নেব? দে পে হ্যান্ডসামলি।’

‘না।’ একব্‌গগার মতো বলেন স্যামি, ‘ওই সব ফালতু কাজ তোমাকে মানায় না। তুমি ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পাওয়া অ্যাকট্রেস।’

মন্দিরা বৃন্দার দিকে তাকালেন। দু’জনের চোখেই বিস্ময়। দু’জনেই বুঝল, বাড়ির বউয়ের কাজ করায় স্যামির আপত্তি। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ডের প্রসঙ্গটা অজুহাত।

মন্দিরা বললেন, ‘আমার কাছে যাত্রার অফার আছে। ‘শাশুড়ি শয়তান, জামাই বেইমান’। মনোরমা যাত্রা কোম্পানির মালিক ফোন করেছিলেন। আগামিকাল রবীন্দ্র সরণিতে ওঁদের অফিসে যাওয়ার কথা। যাত্রার পেমেন্ট খুব ভালো। যদিও বড্ড ঘুরতে হয়।’

‘তোমার কি মাথা খারাপ?’ উত্তেজিত হয়ে বলেন স্যামি। তাঁর চোখে ঘোলাটে ভাব আর নেই। রাগের কারণে মুখে লাল আভা। হাত কাঁপা বেড়ে গেছে।

‘তুমি উত্তেজিত হোয়ো না!’ মন্দিরা স্বামীকে বোঝান। ‘তুমি সার্জারি করতে পারছ না। অন্য সার্জনরা শান্তিধামে কেস করছেন না। এই অবস্থায় তুমি ইএমআই দেবে কী করে? আর যাত্রা একটা রেসপেক্টেবল প্রফেশান। মুম্বই থেকে অভিনেতা অভিনেত্রীরা এসে যাত্রা করে যান।’

‘চুপ করো।’ শান্ত কণ্ঠে বলেন স্যামি।

‘ওঁরা গাড়ি পাঠাবেন। তুমি গাড়ি বিক্রি করে দিলেও আমার প্রবলেম নেই।’

‘চুপ।’ দাঁতে দাঁত চিপে বলেন স্যামি।

‘ঠিক আছে। আমি ওদের ঝুলিয়ে রাখছি। কিন্তু সেটা কয়েক দিনের জন্য। আমাদের কোনও অ্যাসেটে তোমাকে হাত দিতে দেব না। ব্যাঙ্কের সব অ্যাকাউন্ট জয়েন্ট। শান্তিধাম তোমার আর আমার নামে। গাড়ি তিনটের মধ্যে দুটো তোমার নামে, একটা আমার নামে। আমার অনুমতি ছাড়া কোনও তুমি কিছু বেচতে পারবে না। কোনও এফডি বা শেয়ার ভাঙাতে পারবে না, কোনও অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারবে না।’

‘তা হলে কী করে শোধ করব?’ আবার ঝুঁকে পড়েছে স্যামির কাঁধ। শরীরে ভাষায় ফিরে এসেছে ইনকনফিডেন্স।

‘সেটা তোমার ব্যাপার। বউ রোজগার করলে আপত্তি। এদিকে নিজে ঠুঁটো জগন্নাথ। এদেরকে বাংলায় বলে, “ভাত দেওয়ার মুরোদ নেই। কিল মারবার গোঁসাই।”’ ড্রইং রুম থেকে হনহন করে বেরিয়ে শোওয়ার ঘরে ঢুকে যান মন্দিরা।

বৃন্দা স্যামির পাশে বসে বলে, ‘তুমি আবার চেম্বার শুরু করো। তোমার কাছে যে সব কেস আসে, তার সবগুলোতেই যে সার্জারি লাগে তা তো নয়। কনজারভেটিভ ম্যানেজমেন্টে যারা ভালো হয়, তাদের ভরতি করো। কুনালদা সামলে দেবে। আমিও অল্পবিস্তর হেল্প করব। এত বড় এস্ট্যাবলিস্টমেন্ট ফাঁকা ফেলে রাখা ঠিক না।’

স্যামির চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। কাঁপতে থাকা হাত দুটো তুলে বললেন, ‘সার্জারি শব্দটার উৎস খুঁজতে গেলে দেখবি হাতের ব্যবহারের কথা বলা আছে। আমার হাত নিয়ে আমি এ কী করলাম!’

স্যামিকে সান্ত্বনা দেবার চেষ্টা করল না বৃন্দা। ঝুনুর মা টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজিয়েছে। এক্ষুনি স্নান করে কলেজ দৌড়তে হবে। গপগপ করে রুটি আর সয়াবিনের তরকারি খেতে খেতে বৃন্দা দেখল স্কুপ চ্যানেলে মৃন্ময় চ্যাটার্জির ইন্টারভিউ হচ্ছে। মৃন্ময় বলছেন, ‘আমার নতুন কিছু বলার নেই। বাংলার মানুষ গত ত্রিশ বছর ধরে যা বোঝার বুঝেছেন। আমার কাজ আগামী বিধানসভা ভোটের আগে সব কেন্দ্রে নবযুগ পার্টির হয়ে একজন কাঃ প্রার্থী দাঁড় করানো। আর কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে দরবার করে মিলিটারি এবং প্যারামিলিটারি ফোর্সের তত্ত্বাবধানে ভোট করানো। জনগণ ব্যালট বাক্সয় নিজের মতামত দেবেন।’

মলিন পাজামা পাঞ্জাবি পরা, কম বয়সে স্ত্রী হারানো, মাঝবয়সি, লড়াকু লোকটিকে কিছুক্ষণ দেখল বৃন্দা। পশ্চিমবাংলার ভাবী মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে এঁকে মানাবে? কে জানে! ব্যাগ কাঁধে দৌড় লাগায় সে। কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে।

.

বাচ্চাদের ওয়ার্ডে একগাদা সদ্যোজাত শিশু কম্বল মুড়ি দেওয়া অবস্থায় কুঁকড়ে মুকড়ে শুয়ে। এক ঝুড়ি গোলাপি উলের বল বলে মনে হচ্ছে। কেউ কাঁদছে, কেউ হাসছে, কেউ দেয়ালা করছে, কেউ ঘুমোচ্ছে, কেউ পাশের জনকে খামচে দিচ্ছে। কী কিউট! বৃন্দার ইচ্ছে করছিল সবক’টাকে নিয়ে ঘাঁটুঘাঁটু করতে। উলি বাবালে! কী মিত্তি লে!

আপ্পু অবশ্য হাত দিতে দিল না। কড়া ধমক দিয়ে বলল, ‘শুধু এপ্রন পরলে চলবে না। ক্যাপ আর মাস্ক পরে আয়। বাচ্চাগুলোর ইনফেকশান হতে পারে।’

বৃন্দা তাড়াতাড়ি ক্যাপ আর মাস্ক পরে এল। একে কলেজে আসতে দেরি হয়েছে, তার ওপরে বাচ্চাগুলোকে দেখে আনন্দের আতিশয্যে সে নিয়ম কানুন ভুলে মেরেছে।

বাচ্চাগুলোর ওজন মাপতে মাপতে চন্দন আর বৃন্দাকে পুষ্টি আর অপুষ্টি পড়াচ্ছে আপ্পু। ‘ইথিয়োপিয়া আর আমলাশোলের হাড়জিরজিরে বাচ্চারাই শুধু ম্যালনারিশ্‌ড নয়। আমেরিকার দেড়শো পাউন্ড ওজনের ছেলে বা জাপানি সুমো রেসলাররাও ম্যালনারিশ্‌ড। খেতে না পাওয়া এবং বেশি খাওয়া—দুটোকেই অপুষ্টি বলে।’

‘এর মধ্যে আমলাশোল এল কোথা থেকে?’ বিরক্ত হয়ে বলে চন্দন।

আপ্পু ম্লান হেসে বলল, ‘রাজনীতি নিয়ে কথা বলতে চাই না। তবে এইটুকু বলা যায় যে স্টুডেন্ট ইউনিয়ন চালানোর বাধ্যবাধকতা না থাকায় আমি হ্যাপি।’

‘কেন? হঠাৎ কী হল?’ নাছোড় প্রশ্ন চন্দনের।

‘যে ছাত্র সংগঠনকে ভালোবেসে রাজনীতিতে এসেছিলাম, তার চেহারা গত চার বছরে এত বদলে গেছে যে রাজনীতি নিয়ে ঘেন্না ধরে গেছে।’

‘তাই?’ কণ্ঠস্বরে সারকাজ্‌ম ছড়িয়ে চন্দন বলে, ‘নাকি, স্টুডেন্ট লাইফে নেতাগিরি করে পলিটিক্সের ক্ষীরটুকু খেয়ে এখন অ্যাপলিটিকাল সাধু সাজছ?’

‘কী ক্ষীর খেলাম?’ এক নবজাতককে ওজন যন্ত্রে চাপিয়ে প্রশ্ন করে আপ্পু।

‘একটাও সাপ্লি খেলে না। ফাইনাল এমবিবিএসে তোমার মেডিসিনের থিয়োরি পেপারে পাঁচ নম্বর শর্ট ছিল। বিডিআরকে বলে সেটা ম্যানেজ হল। এটা ক্ষীর নয়?’

ওজন যন্ত্র থেকে বাচ্চা নামিয়ে আপ্পু বলল, ‘আমি এভাবে ভাবি না।’

‘আমি ভাবি,’ সপাট উত্তর চন্দনের। বৃন্দা চন্দনের হাত ধরে ধমক দেয়, ‘নেতাগিরি করা মানে সিনিয়রদের মুখের ওপরে কথা বলা নয়। তোর মনে পড়ে, কলেজে ঢোকার প্রথমদিন আপ্পুদি আমাদের কী মিষ্টি র‌্যাগ করেছিল? আমাকে আর তোকে প্রেমিক প্রেমিকা বানিয়েছিল?’

‘আমার সব মনে আছে।’ শ্রাগ করে চন্দন, ‘প্রতিটি মুহূর্ত মনে আছে। এনিওয়ে, আমরা চললাম। আমলাশোল নিয়ে পরে কথা হবে।’

সেন্টিনারি বিল্ডিং থেকে বেরিয়ে, দাঁড়ে বসে সিগারেট ধরিয়ে চন্দন বলল, ‘আপ্পুদি মাঝে মাঝে এমন কথা বলে যে মটকা গরম হয়ে যায়। অ্যান্টি গর্ভনমেন্ট হওয়া এখন খুব ফ্যাশনেব্‌ল হয়েছে। অকৃতজ্ঞ কোথাকার।’

‘সামান্য বিষয় নিয়ে এত হাইপার হচ্ছিস কেন?’ চায়ের ভাঁড় চন্দনের হাতে তুলে দিয়ে বলে বৃন্দা। ‘গণতন্ত্রে কেউ পক্ষে বলবে, কেউ বিপক্ষে বলবে— এটাই স্বাভাবিক। আগের দিন আমি অ্যান্টি গভর্নমেন্ট কথা বলেছিলাম বলে তুই কত কী শোনালি। কিন্তু এটা তো ঠিক যে জনমোর্চা সরকার গত তিরিশ বছরে এই স্টেটের হাল খুব খারাপ করে ছেড়েছে। প্রাইমারি সেকশান থেকে ইংরিজি তুলে দিয়ে কয়েকটা জেনারেশানকে ঠুঁটো করে দিল। অটোমেশান হলে চাকরি চলে যাবে বলে কম্পিউটারকে এই রাজ্যে ঢুকতে দিল না। আজ তারাই সেক্টর ফাইভকে “সানশাইন ইন্ডাস্ট্রি” বলে নিজেদের কৃতিত্ব দাবি করছে।’

‘মানুষ মাত্রেই ভুল করে। জনমোর্চাও করেছে। কিন্তু আমরা ভুল স্বীকার করি। বাকিরা করে না।’ গলগল করে ধোঁয়া ছাড়ে চন্দন।

‘ভুলের লিস্টি লম্বা চন্দন। তোদের দলের সর্বভারতীয় নেতার সামনে সুযোগ এসেছিল প্রধানমন্ত্রী হবার। তোরা হতে দিলি না। বললি, ‘“আমরা রাষ্ট্রক্ষমতা পুরোপুরি দখলের আগে সংসদে ঢুকবো না। তা হলে পুতুল হয়ে যাব।” পরে পাবলিকের খিস্তি খেয়ে বললি, “সরি! ওটা ঐতিহাসিক ভুল ছিল।” হেল্‌থ হাবের জন্য জোর করে জমি অধিগ্রহণ করে বললি, “যা করেছি বেশ করেছি।” পরে মৃন্ময়ের মহামিছিল দেখে ঘাবড়ে গিয়ে বললি, “স্থানীয় মানুষের মতামত না নিয়ে ভুল হয়ে গেছে।” এত ভুল লোকে মানবে কেন?’

‘হ্যাঁ। বড্ড বেশি ভুল করা হয়েছে। স্যামি ব্যানার্জি আকণ্ঠ মদ্যপান করে চন্দ্রিমার অপারেশন করতে গিয়ে যখন তাকে খুন করলেন, তখন তাতে নাক গলানো ভুল হয়েছিল। লেক থানার পুলিশকে বুঝিয়ে এফআইআর না নেওয়ানো ভুল হয়েছিল। মিডিয়ার লোককে ম্যানিপুলেট করা ভুল হয়েছিল। সেই রাতে ওঁকে “কেয়ার অ্যান্ড কিওর’ নার্সিং হোমে ভর্তি করা ভুল হয়েছিল।” ’

বৃন্দা চায়ের ভাঁড় হাতে নিয়ে চন্দনের দিকে তাকিয়েছিল। বলল, ‘এই নিয়ে আগেও কথা হয়েছে। তোকে এইসব করতে কেউ বলেনি। অন্তত আমি বলিনি। তুই-ই অধীরদার সঙ্গে পরীক্ষার আগের রাতে লাফাতে লাফাতে লেক থানায় গিয়েছিলি। আমি যদি বলি, ওই ঘটনায় তুই আর অধীরদা অ্যাডভান্টেজ নিতে চেয়েছিলি? স্যামি বানার্জিকে হেল্প করে পলিটিকাল মাইলেজ পেতে চেয়েছিলি।’

‘যে লোকটা ইএমআই পে করতে পারছে না, তাকে হেল্প করে কী মাইলেজ পাব বৃন্দা? বাই দ্য ওয়ে, তোর যদি মনে হয় শান্তিধামে আরএমও লাগবে, তা হলে আমাকে বলতে পারিস। ডিগ্রি না থাকলেও বেসিক ক্লিনিক্স জানি। রাতের বারো ঘণ্টা সামলে দেব। আইপিপির কুনালকে ফোটা। ওর জন্যই সার্জনরা শান্তিধামে যাচ্ছেন না।’

বৃন্দার চা শেষ। সে ডাস্টবিনে ভাঁড় ফেলে দিয়ে বলল, ‘আমার বাবা ইএমআই দিতে পারছেন না, শান্তিধামে অন্য সার্জনরা আসছেন না—এত কথা তুই জানলি কী করে?’

চন্দনেরও চা খাওয়া শেষ। ডাস্টবিন লক্ষ্য করে ভাঁড় ছুড়ল সে। নিখুঁত লক্ষ্যভেদ। ভাঁড় গিয়ে পড়ল ডাস্টবিনের মাঝখানে। পুরোনো সিগারেট ফেলে নতুন সিগারেট ধরিয়ে চন্দন বলল, ‘এসব খবর হাওয়ায় ভাসে। সবাই জানে। কেউ তোকে সামনাসামনি বলছে না। আমি ঠোঁটকাটা, তাই বলে দিলাম। রাগ করিস না। আরআরএমও-শিপের কথাটা তোর বাপকে জিজ্ঞাসা কর। আমি টাকাপয়সা নেব না।’

‘দেয়ার্‌স নাথিং ফ্রি ইন দিস ওয়র্ল্ড চন্দন। ক্যাশ না নিলে তুই অন্য কিছু নিবি। ইনট্যানজিব্‌ল কিছু। সেটা কী জানতে পারি?’

‘ফ্রি ডিনার অ্যান্ড ব্রেকফাস্ট।’

‘দেয়ার্‌স নো ফ্রি লাঞ্চ ইন দিস ওয়র্ল্ড!’ বিড় বিড় করে বৃন্দা। চায়ের দাম মিটিয়ে মেডিসিন ওয়ার্ডের দিকে এগোয়। তার মুখ আষাঢ়ের মেঘের মতো জলভরা, গম্ভীর, কালো। পিছন থেকে চন্দন হাঁক পাড়ে, ‘আমি ওয়ার্ডে চললাম। বাড়ি যাওয়ার আগে ফোন করিস।’

বৃন্দা জবাব দেয় না। তার মাথা রাগে দুশ্চিন্তায়, টেনশানে দপদপ করছে। সকালবেলার ক্র্যাম্প ফিরে আসছে। ফিরে আসছে সুপ্রভাতের মুখ।

সুপ্রভাত? নাকি অভি? কে জানে।

বিরক্ত হয়ে বৃন্দা বলে, ‘দুর শালা!’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *