হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২০

২০. দময়ন্তী

‘Imagine there’s no country
It’s easy if you try
No hell below us
Above us only sky
Imagine all the people living for today.
You too…’

.

ড্যানিয়েলের স্টুডিওতে আজ রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছে না। আজ গিটার নিয়ে গান ধরেছেন জন লেনন। ‘ইম্যাজিন’ গানটা সকাল থেকে এই নিয়ে দশবার শুনলেন ড্যানিয়েল। একবার শুনে সাউন্ড সিস্টেম অফ করছেন। ছবি আঁকছেন। কাঁদছেন। আবার শুনছেন।

‘বাবা, শরীর খারাপ?’ জানতে চায় দময়ন্তী।

‘ক’দিন ধরে খুব দুর্বল লাগছে। পেটেও অস্বস্তি আচ্ছে।’ আপনমনে পেট থাবড়ালেন ড্যানিয়েল, ‘আসলে আমার মন খারাপ। আর তার কারণ এইটা।’ মেয়ের দিকে খবরের কাগজ এগিয়ে দিলেন ড্যানিয়েল। দময়ন্তী দেখল, ‘আজ সকাল’ এবং ‘বেঙ্গল পোস্ট’-এর প্রথম পাতায় বাঁজাপলাশ গ্রামের পুকুরের ছবি। কালচে সবুজ জলে কিছুটা ডুবন্ত ও কিছুটা ভাসমান তাপসী। রক্তের লাল রং কোথাও ফিকে, কোথাও গাঢ়। লাল প্যামফ্লেট লজ্জা নিবারণের চেষ্টা করছে। বেঙ্গল পোস্ট-এর হেডলাইন, ‘অ্যানাদার ডেথ ইন বাঁজাপলাশ।’ আজ সকাল-এর হেডলাইন, ‘বিধবাপুকুর।’

খবরে চোখ বুলোয় দময়ন্তী। ‘পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত বলেছে, এটি খুন ও ধর্ষণের ঘটনা। মৃতদেহ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। ডক্টর কুনাল রায় নামে যে চিকিৎসককে মৃতার সঙ্গে পাওয়া গেছে, তাঁকে হাসপাতালে ভরতি করা হয়েছে। তিনি এখন কথা বলার অবস্থায় নেই। চিকিৎসকের বাড়ি জগদ্দলে। তিনি কলকাতার শান্তিধামে নার্সিং হোমের রেসিডেন্ট মেডিকাল অফিসার ছিলেন।’

শান্তিধাম? চমকে ওঠে দময়ন্তী। বৃন্দার বাবা অসুস্থ। তার মধ্যে নতুন ঝামেলা? আজ কলেজে গিয়ে কথা বলতে হবে। এখন ফোন করার কোনও মানে হয় না।

ড্যানিয়েলের ‘মাইনর উন্ডস’ সিরিজ আঁকা শেষ হয়েছে কয়েকদিন আগে। ফ্রেমিং করে ছবি চলে এসেছে। হৈমবতী একদিন বাড়িতে এসে ছবিগুলো দেখে গেলেন। মিক্সড মিডিয়ার কাজ। ইনস্টলেশান এবং পেইন্টিং—দু’রকমের শিল্পকর্মই আছে। বাই দ্য ওয়ে গ্যালারিতে এক্সিবিশন হবে। ক্যাটালগ এবং ফোল্ডার ছাপা হয়ে গেছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের কার্ড পাঠানো শেষ। হঠাৎ সকালবেলায় কাগজ পড়ে ড্যানিয়েলের এই শৈল্পিক খ্যাপামির শুরু। এই ছবিও মাইনর উন্ডস সিরিজে ঢুকবে।

ছবিটা ভালো করে দেখল দময়ন্তী। অনেক দিন বাদে ড্যানিয়েল এত বড় ক্যানভ্যাস ব্যবহার করছেন। চিত্রশিল্পীর মেয়ে হওয়ার কারণে, ছবি আঁকার আঁতুড়ঘরে থেকে থেকে ফাইনাল প্রোডাক্ট কী হতে পারে আঁচ করতে পারে দময়ন্তী। ড্যানিয়েল মিক্সড মিডিয়া ব্যবহার না করে ফিরে গেছে সনাতন তেলরঙে। সবচেয়ে অদ্ভুত ব্যাপার তাঁর স্ট্রোক এমন হচ্ছে যে তেলরঙের ব্যবহার সত্ত্বেও ছবিটিকে দেখে মনে হচ্ছে জলরঙে আঁকা।

জল। বিসর্জন। দুর্গা ভাসান। এই তিন মোটিফ রয়েছে ছবি জুড়ে। মা দুর্গার ভাসানের ছবি প্রতি বছর বিসর্জনের পরের দিন খবরের কাগজে ছাপা হয়। বহু ব্যবহার সত্ত্বেও ক্লিশে হয় না। কেন না, এ মোটিফ বাঙালির হৃদয়ে খোদাই করা আছে। ড্যানিয়েলের ছবি সেই অব্যর্থ মুহূর্তকে ধরেছে। তৃতীয় নয়নওয়ালা মাতৃমূর্তির সঙ্গে জলে ভাসছে মৃত নীলকণ্ঠ পাখি, মাও জে দঙের মুখ, সিংহের ছৌ মুখোশ, রাংতার মুকুট, গাঁদা ফুলের মালা। ছবি দেখতে দেখতে দম আটকে আসে দময়ন্তীর। এত ভায়োলেন্ট, এত মরবিড, এত ডার্ক ছবি আগে কখনও আঁকেননি ড্যানিয়েল। তাপসীর মৃত্যুশোক ক্যানভাসে উজাড় করে দিচ্ছেন।

দময়ন্তী ড্যানিয়েলকে বলল, ‘ছবি আঁকার পাশাপাশি এক বার ফিজিকাল চেক আপ করিয়ে নাও। তোমাকে বেশ ফ্যাকাশে লাগছে।’

ড্যানিয়েল মেয়ের কথা শুনতে পাননি। তিনি আবার আঁকায় ডুবে গেছেন।

ঘড়ি দেখল দময়ন্তী। পৌনে দশটা বাজে। দশটা থেকে গাইনি ওয়ার্ডে ক্লাস আছে। এক্ষুনি বেরোতে হবে। খাবার টেবিলে ঢাকা দেওয়া স্যান্ডুইচ হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে সে। কলেজে বৃন্দার সঙ্গে দেখা হবে। ওর কাছ থেকে কুনাল রায়ের ব্যাপারে জানা যাবে। লোকটা কি আইপিপির সঙ্গে যুক্ত ছিল? দময়ন্তী খুব বেশি দিন আইপিপির সঙ্গে নিজেকে জড়ায়নি। যাদের সঙ্গে তাৎক্ষণিক আলাপ হয়েছিল তাদের মধ্যে কুনাল নামে কোনও ডাক্তার ছিল না। সব্যদা বা বিলুদার মুখে কখনও নাম শোনেনি দময়ন্তী।

বিলু! কুনালের প্রসঙ্গ থেকে কীভাবে বিলু চলে এল কে জানে! দময়ন্তী খেয়াল করল, সে কাঁদছে। কোনও দুখঃবোধ নেই, কোনও পাপবোধ নেই, কোনও অনুশোচনা নেই, তবু চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে। মাথার মধ্যে বাজছে বিলুর সঙ্গে শেষ ফোনালাপের অডিও ক্লিপ। রোজই বাজে। ঘুমের ঘোরে। স্বপ্নে বিলুকে দেখতে পায় না দময়ন্তী। স্বপ্নে আসে অচেনা বাজার দিয়ে প্রাণপণ দৌড়। সেই চায়ের দোকান, সেই বৃষ্টি, সেই পুরোনো বাড়িতে মেয়েদের দল, সুরজের সেই ছুটে আসা। ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোরে ঘনঘন মোবাইলের রিংটোন, এসএমএস-এর টুংটাং। ফোনের লাইনে শনশন করে হাওয়া বইছে, আর বিলু বলছে, ‘তাহলে তোমার বাড়িতে থাকতে দাও। প্লিজ! আমি এই চাপ নিতে পারছি না। সারাক্ষণ ভয় করছে।’ কথার মধ্যে হাওয়ার শব্দ ঢুকে পড়ে। হাওয়া দেয় জোরে। তার মধ্যেই বিলু বলে, ‘মনে হচ্ছে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। নকশাল আমলে যে সব টর্চারের কথা শুনেছি, সেসব আমি সারাক্ষণ দেখতে পাই দিঠি। সিলিং থেকে পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা যতক্ষণ না নাক দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ে,’ হাওয়া দেয় আবার… হাওয়া… ‘গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, পেছনে রুল ঢুকিয়ে দেওয়া, একটা একটা করে নখ উপড়ে নেওয়া, পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, জলন্ত বাল্বে চুমু খাওয়া—সব আমি দেখতে পাই। তুমি আমায় আশ্রয় না দিলে আমি আর বাঁচব না দিঠি।’ হাওয়া… হাওয়া…

ঘুমের ঘরে দময়ন্তী এপাশ ওপাশ করে। ডাবল ডোজের অ্যালোপাম তাকে নিথর করে দিয়েছে। সে হাত নাড়াতে পারলে কানে আঙুল দিত। হাওয়ার শব্দ তাকে পাগল করে দিচ্ছে। কিন্তু সে হাত নাড়াতে পারছে না। বোবার মতো গোঁগোঁ করতে করতে শোনে, ‘একটা ছেলে মরে যাওয়ার আগে তোর কাছে কিছু চাইছে। হারামি মাগি, উত্তর দে। “হ্যাঁ”, “না”, “তোমাকে থোড়াই কেয়ার করি”—কিছু একটা বল। শয়তানি করিস না। আমি তোকে সত্যি সত্যি ভালোবাসি রে!’ হাওয়া… হাওয়া… ‘এর মধ্যে পার্টি পলিটিক্স নেই। বিশ্বাস কর, নেই। দেশকে ভালোবেসে রাজনীতি করার পাশাপাশি মানুষকেও ভালোবাসা যায় রে পাগলি! মাইরি বলছি! বিশ্বাস কর। তুই আমায় ভালোবাসিস না? সত্যি করে বল! বল “মাক্কালি”! বল!’

হাওয়া বইছে… হাওয়া… শনশন হাওয়ায় দময়ন্তীর শীত করে, মুখ শুকিয়ে আসে, বিছানায় পেচ্ছাপ হয়ে যায়, মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়। রাত পোশাক ছুড়ে ফেলে উলঙ্গ দময়ন্তী হাতড়ে হাতড়ে আরও দুটো অ্যালোপাম মুখে দেয়। আহঃ! শান্তি!

গতরাতের দুঃস্বপ্নময় ঘুম পেরিয়ে সকাল এসেছে। স্নান করে শক্তিরূপার স্টাডিতে উঁকি দেয় দময়ন্তী। স্টাডি ফাঁকা। শক্তিরূপা সকাল হতে না হতেই বেরিয়ে গেছেন। তাড়াতাড়ি বেরোনর কারণ দময়ন্তী আন্দাজ করতে পারছে। বাঁজাপলাশ গ্রামের ঘটনাটার পরিপ্রেক্ষিতে আবার উইকেন্ডের কভার স্টোরি চেঞ্জ হবে। বিবস্বানের সঙ্গে মিটিং করতে হবে। অফিস থেকে সোজা যাবেন বাই দ্য ওয়ে গ্যালারিতে। সন্ধে ছ’টায় ড্যানিয়েলের এক্সিবিশনের উদ্বোধন।

দময়ন্তীও যাবে। স্যান্ডুইচ হাতে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সারাদিনের কর্মসূচী ছকে নেয় সে। দশটা থেকে বারোটা পর্যন্ত ক্লিনিক্স। সাড়ে বারোটা থেকে সাড়ে চারটে পর্যন্ত চারটে থিয়োরি ক্লাস। অতগুলো ক্লাস করা যাবে না। প্রথম দুটো করে, বাকি দুটোয় প্রক্সির বন্দোবস্ত করে গোলমহল চলে আসবে। সাজুগুজু করে সন্ধেবেলা বেরোবে। আর্টিস্ট তার বাবা। স্পেশাল গেস্টের অ্যাপিয়ারেন্সও স্পেশাল হওয়া উচিত।

একতলার ডিটিপি অফিসের শাটার তোলা। ঋষিতা এখনও আসেনি। পাপ্পু অফিসের মেঝে ঝাঁট দিচ্ছে। দময়ন্তী চোখ নাচাল। ‘কী রে? তোর মালকিন কোথায়? তাকে কয়েকদিন ধরে দেখছি না কেন?’

‘তার মন খারাপ হয়েছে।’ ফিচেল হেসে বলে ছোকরা। ‘দিনরাত দাদার ধাঁতানি খায়। শুনছি পাগলের ডাক্তারের কাছে যাবে।’

‘বেশি পাকামি করিস না!’ চোখ পাকিয়ে ছোকরাকে ধমক দিয়ে গোলমহল থেকে বেরোয় দময়ন্তী। বিলুদার মুখাগ্নির সময় বালির বার্নিং ঘাটে গিয়ে তার একটা কমেন্ট ঋষিতাকে মানসিকভাবে অসুস্থ করে দেবে, এ সে ভাবতে পারেনি। বিলুদার বাবাই বা কীরকম? বুড়ো বয়সে এই ছোঁকছোঁকানি!

এনিওয়ে! মাথা থেকে চিন্তা ঝেড়ে ফেলে দময়ন্তী। একটু পরেই গাইনি ওয়ার্ড ক্লাস শুরু হবে।

.

ডক্টর জ্যোতির্ময় মল্লিক অবস্টেট্রিক্স এবং গাইনিকলজি ডিপার্টমেন্টের প্রধান। ছাত্ররা শর্টে বলে ‘অবজিন’ ওয়ার্ড। ডক্টর মল্লিক ছেলেমেয়েদের বললেন, ‘কারা কারা রোজ আসবে, কারা কারা একদিনও আসবে না, কারা কারা মাঝে মাঝে আসবে? ওপেনলি বলো। আমি সেই মতো রোস্টার সাজাবো।’

না আসার তালিকায় অনেকগুলো হাত উঠল। মল্লিক বললেন, ‘তোমাদের অ্যাটেন্ড্যান্স নিয়ে সমস্যা হবে না। বাট টেল মি, তোমরা কেন আসতে চাও না?’

‘সাবজেক্টটা পছন্দ নয়।’ সমস্বরে উত্তর এল। অভি এদের মধ্যে পড়ে।

‘যাও।’ মাছি তাড়ানোর ভঙ্গিতে হাত নাড়লেন মল্লিক। ছেলেমেয়েরা পালিয়ে বাঁচল।

‘কারা মাঝেমাঝে আসবে?’ মল্লিকের এই প্রশ্নে গোটা দশেক হাত উঠল। কারণ হিসেবে তারা জানাল, পরীক্ষার জন্য হোস্টেলে থেকে পড়াশুনো করবে বলে রোজ আসবে না। তবে তারা সাবজেক্টটা কাজ চালানোর মতো শিখতে চায়।

‘ফেয়ার এনাফ।’ কাগজে নামগুলো লিখে নিয়ে প্রত্যেককে সপ্তাহে তিনদিন ডিউটি দিলেন মল্লিক। তারাও চলে গেল। যে ক’জন পড়ে রইল, তাদের দিকে তাকিয়ে মল্লিক বললেন, ‘কেন থাকবে?’

‘গাইনিতে হাউসজব করব। সাবজেক্টটা আমার পছন্দ।’ বেশির ভাগ ছেলেমেয়ে এই উত্তর দিল। বৃন্দা এবং দময়ন্তী এদের মধ্যে পড়ে। চন্দন শুধু বলল, ‘কাজ শিখতে চাই। ফাঁকি মারতে চাই না।’

‘ভেরি গুড।’ চন্দনের পিঠ চাপড়ে মল্লিক বললেন, ‘তাহলে তুমি আমার ইউনিটে চলে এস। চলো, এবার আমরা রাউন্ডে যাই।’

পরবর্তী দু’ঘণ্টা ধরে রাউন্ড হল। রাউন্ডের শেষে দময়ন্তী বুঝতে পারল এই ওয়ার্ডে কাজের চাপ প্রচুর।

রাউন্ডের শেষে মল্লিক বললেন, ‘আমার দু’জন ওয়ার্কিং হ্যান্ড চাই। যারা হোস্টেলে থাকে, সিনসিয়ার, ডাকলে পাওয়া যাবে, কাজ করতে আগ্রহী। নো-ননসেন্স টাইপ। টানা তিনমাস কাজ করো। সাবজেক্ট আপনা আপনি শিখে যাবে।’

চন্দন বলল, ‘আমি আর বৃন্দা।’

‘বৃন্দাকে নেওয়ার ব্যাপারে আমার একাধিক প্রবলেম আছে।’ মুচকি হেসে বললেন মল্লিক। ‘ও হোস্টেলে থাকে না। এবং ওকে আমি বকতে পারব না।’

‘কেন?’ চন্দন অবাক।

‘ও আমার বন্ধুর মেয়ে। ইনফ্যাক্ট বৃন্দার ডেলিভারি আমি করেছিলাম। সো বৃন্দা ইজ আউট। অন্য কেউ?’ হাসতে হাসতে বললেন মল্লিক।

চন্দন ভিতরে ভিতরে কালো হয়ে যায়। নতুনগ্রামের চাষার ব্যাটা, তুই কী করে বুঝবি কলকাতার ডাক্তারি কালচার? যা তোকে প্রতিদিন লড়াই করে অর্জন করতে হচ্ছে, তা এরা কবচ কুণ্ডল হিসেবে পেয়ে জন্মেছে। এদের সঙ্গে পারা যায়?

‘যায়।’ দাঁতে দাঁত চিপে নিজেকে বলে চন্দন। অধিকার ছিনিয়ে নিতে হয়। মল্লিকের সামনে এটা প্রমাণ করা জরুরি যে, ‘আপনি যার জন্ম দিয়েছেন, আমি তার বাচ্চার বাবা হব। আজ না হোক, কাল! সেটা আপনাকে জানিয়ে দিতে চাই।’

বিনীতভাবে চন্দন বলল, ‘বৃন্দাই থাক স্যার। আমাদের কাজ করতে সুবিধে হবে।’

‘আচ্ছা?’ মল্লিকের ডান ভুরু ঊর্ধ্বগামী। ‘কী রে বৃন্দা, তোর অমত নেই তো? এ ছেলে তো বহুবচনে কথা বলছে।’

‘বহুবচনে বলুক গে। ও নিয়ে তুমি…’ জিভ কেটে বৃন্দা ‘তুমি’ থেকে ‘আপনি’তে শিফ্‌ট করে, ‘…সরি, আপনি মাথা ঘামাবেন না। আমি ‘তোমার’… সরি, ‘আপনার’ ইউনিটেই থাকব। না হলে বাবা বকবে।’ মিষ্টি হেসে জানায় বৃন্দা। চন্দনের পাকামিতে সে অত্যন্ত বিরক্ত। স্যামি যদি কোনওভাবে এই প্রসঙ্গ জানতে পারেন, তা হলে তুলকালাম বাঁধাবেন। গাইনি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়েই চন্দনকে ঝাড় দেবে, এই রকম প্ল্যান করে রাখল বৃন্দা।

প্ল্যান সফল হল না। ক্লিনিক থেকে বেরোনো মাত্র দময়ন্তী বৃন্দাকে চেপে ধরল। ‘নতুনগ্রামে আবার কী হয়েছে রে? কাগজময় ধর্ষণ আর খুনের ছবি। তোর বাবার নার্সিং হোমের এক ডাক্তারও বিলুদার দলের সঙ্গে যুক্ত?’

বৃন্দা বলল, ‘সব বলছি। চল জীবনদার ক্যান্টিনে বসি।’

জীবনদার ক্যান্টিন ফার্স্ট ইয়ার আর সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেমেয়েতে ভর্তি। বেশির ভাগই দময়ন্তীর অচেনা। চন্দন অবশ্য সবাইকে চেনে। চন্দনকেও সবাই চেনে। জুনিয়রদের সঙ্গে কিছুক্ষণ গল্প করে চন্দন কোনার দিকের একটা টেবিলের দখল নিল। অর্ডার দিল পিৎজা আর কোলার। জীবনদা গরমাগরম থিন ক্রাস্ট পিৎজা আর হিমশীতল কোলা দিয়ে গেল। এক টুকরো পিৎজা মুখে দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘ডক্টর কুনাল বসু শান্তিধামের আরএমও। আর তাপসী নস্কর মেট্রন।’

‘তাপসীদি আমাদের পাড়ার মেয়ে।’ বলে চন্দন, ‘আমার বাবা চাকরি করার পাশাপাশি একটা উইকলি নিউজ ম্যাগাজিনে সাংবাদিকতা করেন।’

‘আইব্বাস! আমার মায়ের সঙ্গে তোর বাবার কত্তো মিল রে!’ কোলায় চুমুক দিয়ে বলে দময়ন্তী। ‘আমার মা-ও উইকলি নিউজ ম্যাগাজিনের সঙ্গে যুক্ত।’

‘দুটো এক হল না দিঠি,’ বাধা দেয় চন্দন, ‘আমার বাবা সখের সাংবাদিকতা করেন। তোর মায়ের এটা পেশা। সেকেন্ডলি, আমার বাবা এডিটর নন। তোর মা এডিটর। তিন নম্বর, “বেলাকূল” নামের একটা গ্রাম্য নিউজ বুলেটিনের সঙ্গে ‘উইকেন্ড’-এর মতো ইংরিজি নিউজ ম্যাগাজিনকে এক করে দেখা ঠিক না।’

‘আই বেগ টু ডিফার,’ আপত্তি করে দময়ন্তী। ‘বৃন্দার বাবার মতো চূড়ান্ত সফল সার্জন আর কুনালের মতো আপাত-ব্যর্থ আরএমও—দু’জনেই কিন্তু পেশাগতভাবে ডাক্তার। একই ভাবে, উইকেন্ড-এর এডিটর আর বেলাকূল-এর নিজস্ব সংবাদদাতা—দুজনেই আদতে সাংবাদিক। সফল বা ব্যর্থ—এগুলো বিশেষণ। বিশেষ্য হল সাংবাদিক। এনিওয়ে, আলোচনাটা আমরা ভুল দিকে নিয়ে যাচ্ছি। চন্দন, কী বলছিলি বল।’

‘বেলাকূলের সম্পাদক গোপাল নস্করের বোন হল তাপসীদি। কম বয়সে বিয়ে হয়েছিল। বিয়ের এক সপ্তাহের মধ্যে বিধবা। তারপর নিজের চেষ্টায় আর গোপালকাকার সাহায্যে পড়াশুনা করে নার্সিং-এর কাজ জুটিয়েছিল। আমরা ডাক্তারি পড়তে ঢোকার কিছুদিন পরে আমাদের বাড়ি এসে তাপসীদি তোর কথা বলে গিয়েছিল।’

‘উনি আইপিপির সঙ্গে ভিড়লেন কী করে?’ দময়ন্তী প্রশ্ন করে।

‘তাপসীদি ওসব কিছু করত বলে আমার মনে হয় না। গোপালকাকা বরাবরই ওই লাইনের লোক। গোপালদার বাড়িতে অন্ধ্রপ্রদেশ, উড়িষ্যা, ঝাড়খন্ডের কয়েকজন ছেলেমেয়ে থাকত। ওখানে ফায়ার আর্মস প্র্যাকটিস হত…’ দময়ন্তীর চোখে চোখ রেখে বলে চন্দন, ‘সব্যদা আর বিলুদাকে আমি ওখানে আর্মস প্র্যাকটিস করতে দেখেছি।’

দময়ন্তী খুব মন দিয়ে পিৎজা খাচ্ছে। টেবিল জুড়ে নীরবতা।

বৃন্দা বলল, ‘তাপসীদি আর কুনালদা বাবার কাছে গাড়ি চেয়েছিল। দু’দিনের জন্য তাপসীদি দেশের বাড়ি যাবে। কুনালদা সঙ্গে যাবে। বাবা আপত্তি করেনি। ড্রাইভার দিতে চেয়েছিল। কুনালদা ড্রাইভার নেয়নি। এখন এই অবস্থা। বাবার শরীর খারাপ। তার মধ্যে বাদশা ঘোষ এসে বাবাকে জেরা করে গেছে। গাড়িটার রেজিস্ট্রেশান বাবার নামে। কোয়্যারি হবেই। তবে পুলিশ আন্দাজ করেছে যে যৌথ বাহিনীর জওয়ানরা এই দুষ্কর্ম করেছে। তারাই আইপিপির প্যামফ্লেট, পোস্টার আর রাজনৈতিক বইপত্র ছড়িয়ে সন্দেহ অন্যদিকে ঘোরাচ্ছে। সেটা বুঝতে পেরেই বাদশা ঘোষ বাবাকে হ্যারাস করেননি। গাড়িটা আমরা পেয়ে গেছি। কুনালদা এখন শান্তিধামে। বড় দু’বোতল লোকাল মদ ওর মুখে গুঁজে, সবটা খাইয়ে দিয়েছিল। কুনালদা মরে যায়নি এই ঢের। এখন নার্সিংহোমে শুয়ে আছে। স্যালাইন চলছে। ভেরি স্যাড। আমাদের শান্তিধাম একের পর এক ফালতু কারণে নিউজে আসছে। ব্যাড রেপুটেশন হয়ে যাচ্ছে।’

দময়ন্তী নরম গলায় বলল, ‘তাপসীদির শেষকৃত্য কোথায় হল?’

চন্দন বলল, ‘বাঁজাপলাশ গ্রামের শ্মশানে। পোস্টমর্টেম হয়ে বডি এল সন্ধে সাতটায়। তারপর ঘাটকাজ। ওর তো কেউ নেই। পঞ্চায়েত প্রধান মাইকেল ধীবর মুখাগ্নি করল।’

মাইকেল ধীবরের নাম শুনে দময়ন্তী কোলায় চুমুক দেয়। বৃন্দা কড়া গলায় চন্দনকে বলে, ‘মিডিয়ার এত হইচই, কাগজে ছবি, টিভিতে আলোচনা সভা…অথচ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা নিয়ে সন্দীপ সামন্ত অথবা জনমোর্চার কেউ একটা বিবৃতি পর্যন্ত দেয়নি। সরকারের তরফ থেকে কোনও ইনভেস্টিগেশন অথবা জেনারেল ডায়ারি অথবা এফআইআর হয়নি। শুনলাম বিরোধী নেতা মৃন্ময় চ্যাটার্জি আজ বাঁয়পলাশে যাবেন। এতসব ঘটনা ঘটে যাচ্ছে—এই নিয়ে ইউনিয়নের জিএস হিসেবে তোর কোনও স্ট্যান্ড নেই?’

চন্দন কোলায় চুমুক দিয়ে বলে, ‘তুই আবার কেন পলিটিক্সে ঢুকেছিস? তোর তো এই সব বিষয়ে কখনও কোনও উৎসাহ ছিল না। আজ কী হল?’

‘কখনও ছিল না বলে কখনও তৈরি হবে না, তা তো নয়। আর, আমি রাজনীতি নিয়ে কোনও কথা বলছি না। কথা বলছি গর্ভন্যান্স নিয়ে। এই দেশে সরকার বলে কিছু আছে বলে আমার মনে হয় না। ত্রিশ বছর ক্ষমতায় থেকে থেকে তোদের নেতা আর মন্ত্রীদের বড্ড চর্বি হয়ে গেছে। একের পর এক ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। তারপর সেটা সংশোধন না করে, মাস্‌ল ফুলিয়ে ভুল ডিসিশান ক্যারি আউট করছে। নিরীহ লোক মারা যাচ্ছেন। একজন মহিলা রেপ অ্যান্ড মার্ডার হলেন। তোর কোনও বিকার নেই কেন?’ বৃন্দা প্রচণ্ড উত্তেজিত।

চন্দন আবার কোলায় চুমুক দিয়ে বলল, ‘মিনিমাম কৃতজ্ঞতা থাকলে এই কথাগুলো বলতিস না। তোর বাবা যখন মদ খেয়ে চন্দ্রিমাকে মেরে ফেলল, তখন কে থানায় গিয়ে তোর বাবাকে অ্যারেস্ট হওয়া থেকে বাঁচিয়েছিল? আমি আর অধীরদা। অর্থাৎ জনমোর্চা। এই শাসকদল। এই সরকারি যন্ত্র। এই সন্দীপ সামন্তর পুলিশ। আজ তার সমালোচনা করতে একটুও আটকাচ্ছে না? নুন খেলে গুণ গাইতে হয়— এই কথা ভুলে গেলি?’

বৃন্দা অবাক হয়ে চন্দনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। রাগে চোখমুখ লাল। ঠান্ডা গলায় বলল, ‘আমি কি তোকে বলেছিলাম, তোর অধীরদাকে নিয়ে লেক থানায় যেতে?’

‘বলিসনি। কিন্তু বারণও করিসনি। মৌনতা সম্মতির লক্ষণ।’

‘ইউ আর ক্রসিং লিমিট্‌স!’ দাঁতে দাঁত চিপে বলে বৃন্দা। চেয়ার সরিয়ে উঠে জীবনদার ক্যান্টিন ছেড়ে গটগট করে বেরিয়ে যায়। চন্দনও চেয়ার ছেড়ে লাফিয়ে উঠে বৃন্দার পিছনে দৌড় লাগায়। ‘ওরে বৃন্দা শোন! অত সিরিয়াস হোস না। বৃন্দা!’

পুরো ঝগড়াটা চুপচাপ শুনে হতাশ ভাবে ঘাড় নাড়ে দময়ন্তী। তাকে এখন পিৎজা আর কোলার দাম মেটাতে হবে। প্রেমিক-প্রেমিকার এই নেকুনেকু ঝগড়া অসহ্য লাগে। থিয়োরি ক্লাসেই দেখতে হবে, দু’জনে পাশাপাশি বসে নোট্‌স এক্সচেঞ্জ করছে।

.

যেমন প্ল্যান ছিল, দুটো থিয়োরি ক্লাস করে কলেজ কাটল দময়ন্তী। বৃন্দা পরের ক্লাস দুটোয় প্রক্সি দিয়ে দেবে। মেয়েটা এর মধ্যে চন্দনের সঙ্গে লেপটে গেছে। অসহ্য!

গোলমহলে পৌঁছে ডিটিপি অফিসের দিকে তাকাল দময়ন্তী। ঋষিতা কাজ নিয়ে ব্যস্ত। এ ফোর সাইজের কালার্‌ড প্রিন্ট আউট বার করছে ঝড়ের গতিতে। পাপ্পু পাতলা পিচবোর্ডের ওপরে প্রিন্টগুলো আঠা দিয়ে লাগাচ্ছে। পিচবোর্ডের গায়ে একটা বাঁশের কঞ্চি তার দিয়ে বাঁধা। অর্থাৎ প্ল্যাকার্ড তৈরি হচ্ছে। দময়ন্তী সিঁড়ি বেয়ে উঠতে যাচ্ছে, এমন সময় একটা প্ল্যাকার্ডের দিকে চোখ পড়ল। এটা একটা পেইন্টিং। তুলির সপাট টানে আঁকা বামনের ছবি। বামনটি উড়ছে। তার দু’কাঁধে দুটি ডানা। তলায় লেখা, ‘আমাদের চন্দ্রাভিলাষ।’

দাঁড়িয়ে গেল দময়ন্তী। তুলির টান বলছে, এ ছবি ড্যানিয়েলের আঁকা। ড্যানিয়েলের ছবির প্রিন্ট আউট এখান থেকে বেরোচ্ছে কেন? ড্যানিয়েল আঁকাআঁকির ব্যাপারে অত্যন্ত ডিসিপ্লিন্‌ড এবং সিক্রেটিভ। এক্সিবিশন হওয়ার আগে মেয়ে-বউকেও ছবি তুলতে দেন না। তাঁর আঁকা ছবি এভাবে রাস্তার দোকানে কিলোদরে রি-প্রিন্ট হচ্ছে। ব্যাপারটা কী?

দময়ন্তীকে দাঁড়াতে দেখে ঋষিতাই উত্তর দিল। ‘তোমার বাবা এই ছবিটা দিয়ে গেলেন ঘণ্টা দুয়েক আগে,’ মূল ছবিটা দেখায় সে, ‘বলেছেন রিপ্রিন্ট করে পাঁচশোটা প্ল্যাকার্ড বানিয়ে ধর্মতলায় গাঁধীমূর্তির পাদদেশে পৌঁছে দিতে। আড়াইশো পাঠিয়ে দিয়েছি, বাকি আড়াইশো কী করে শেষ করব কে জানে!’

ঋষিতাকে অনেকদিন পরে দেখল দময়ন্তী। আগের সেই ছলবলে ভাব আর নেই। প্যাস্টেল রঙা সালোয়ার কামিজ, নো মেকআপ লুক, টপনট করে বাঁধা চুল, বিষণ্ণতা মাখা মুখ…দেখে মনে হচ্ছে গভীর শোকাচ্ছন্ন। বোধহয় অভির বাবার সঙ্গে লটঘট বন্ধ আছে।

এনিওয়ে, অভির বাবা অথবা ঋষিতাকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। সাজুগুজু করতে হবে। বাই দ্য ওয়ে গ্যালারি খুবই আপমার্কেট এবং হেপ। ওখানে যাওয়ার আগে বুদ্ধি করে সাজতে হবে। তরতর করে দোতলায় ওঠে দময়ন্তী। ড্যানিয়েল নিশ্চয়ই এখনও রেডি হননি।

দোতলায় উঠেই চমক। শক্তিরূপার স্টাডিতে বসে রয়েছেন শক্তিরূপা এবং হৈমবতী। শক্তিরূপা দময়ন্তীকে দেখে পাশের চেয়ারে বসতে বললেন। হৈমবতীকে বললেন, ‘আপনাকে আমার কিছু বলার নেই। আপনি সবই বোঝেন। ড্যানিয়েলের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে আমি হাত দিতে পারি না। ওঁর স্ত্রী হিসেবেও পারি না। আপনার স্বামীর বেতনভূক কর্মচারী হিসেবেও পারি না।’

‘আমি জানি।’ হতাশ হয়ে বলেন হৈমবতী, ‘আজকের প্রদর্শনীর উদ্বোধন করছেন মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী। ‘মাইনর উন্ডস’ সিরিজটা ভীষণভাবে অ্যান্টি গভর্নমেন্ট। তা-ও উনি রাজি হয়েছেন। বুদ্ধিমান, রুচিশীল বাঙালি। বিরোধীদের যথোচিত মর্যাদা দেন। দ্য ইভেন্ট উইল গেট ন্যাশনাল ফোকাস। এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ দিনে ড্যানিয়েল সরকার-বিরোধী মিছিলে চলে যাবেন? এটা কি ঠিক? নিজের এক্সিবিশানে থাকা ওঁর কর্তব্য নয়? ড্যানিয়েল তো দাবি করেন, উনি পাক্‌কা পেশাদার।’

এতক্ষণে দময়ন্তী ডিটিপি অফিসের কর্মকাণ্ডের মানে বুঝতে পারল। তাপসীর ধর্ষণ ও খুন ড্যানিয়েলকে এতটাই নাড়িয়ে দিয়েছে যে, আজন্ম শিল্পী মানুষ স্টুডিও ত্যাগ করে রাস্তায় নেমেছেন।

‘ইট অল স্টার্টেড উইথ চেন মেইলস, গ্রুপ এসএমএস অ্যান্ড ফেসবুক আপডেট্‌স। আজ সকাল থেকে এই জিনিস চলছে। গাঁধীমূর্তির পাদদেশ থেকে শ্যামবাজার পর্যন্ত রাজনৈতিক রং বর্জিত মিছিলের একটাই দাবি, সরকারের বদল চাই। কলকাতার প্রায় সমস্ত বুদ্ধিজীবী রাস্তায় নেমেছেন। চিত্র পরিচালক মনোতোষ, কবি সুদিন, ঔপন্যাসিক বিপিন, অভিনেত্রী মন্দিরা, চিত্রশিল্পী ড্যানিয়েল… কে নন,’ টিভি অন করেন শক্তিরূপা, ‘ড্যানিয়েল বাড়ি থেকে বেরোনোর সময় বলে গেলেন, “আজ যদি না যাই, তা হলে কাল থেকে আয়নায় নিজের মুখ দেখতে পারব না। ছবি আঁকতেও পারব না। আর যে অনুষ্ঠানে সন্দীপ সামন্ত থাকবেন, সেই অনুষ্ঠানে আমি থাকব না।” ’

হৈমবতী শান্ত গলায় বললেন, ‘এই এক্সিবিশনটা হয়ে যাক। পরবর্তী প্রদর্শনীতে ড্যানিয়েল কিন্তু আমাদের ব্যাকআপ পাবেন না। আমি চললাম। হাতে আর এক ঘণ্টা সময় আছে।’

হৈমবতী সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেলেন। দময়ন্তী দরজা বন্ধ করতেও গেল না। তাঁর চোখ টিভির দিকে। স্কুপ চ্যানেলের পর্দা জুড়ে মহামিছিলের ছবি।

কয়েক বছর কলকাতায় থেকে মিছিল দেখে দময়ন্তী অভ্যস্ত। কানায় কানায় পূর্ণ ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ড, পতপত করে উড়তে থাকা জনমোর্চার লাল পতাকা, গ্রাম থেকে ইচ্ছেয় বা অনিচ্ছেয় আসা কৃষক ও তার বউ, হাঁ-করা বাচ্চা, মুখ গোমড়া বাবু ও চ্যাংড়া কলেজ পড়ুয়ার দঙ্গল—এই হল রুটিন।

আজকের মিছিল আলাদা। মিছিলের সামনের সারিতে রয়েছে কলকাতার বুদ্ধিজীবী সম্প্রদায়। ড্যানিয়েল, মন্দিরা, বিপিন, সুদিন, মনোতোষ। সবার হাতে প্ল্যাকার্ড। তাতে উড়ন্ত জোয়াকিমদের ছবি। কোনও প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘আমাদের চন্দ্রাভিলাষ’। কোনও প্ল্যাকার্ডে লেখা ‘সন্দীপ সামন্তর পদত্যাগ চাই’। কোনও প্ল্যাকার্ডে লেখা, ‘মৃন্ময় চ্যাটার্জির নেতৃত্বে সরকার-বিরোধী আন্দোলন তীব্র করুন।’ কোনওটায় শুধু ‘ছি:!’

দময়ন্তী অবাক হয়ে বলল, ‘বাবা পলিটিকাল অ্যাকটিভিটিজমে ঢুকল নাকি?’

শক্তিরূপা বলল, ‘এগুলো হল লিটমাস টেস্ট। তোর বাবার মতো শান্ত, নিরুপদ্রব মানুষ খেপে গেছে মানে সন্দীপ সামন্তর সরকার পড়বেই। বিধানসভা ভোটে সুনামি আসছে। সুনামি…’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *