৭. চন্দন
‘ডিফাইন হেল্থ!’ নিরোধ স্যার এসএলটির ছাত্রছাত্রীর উদ্দেশে প্রশ্নটা ছুড়ে দিলেন। দেড়শো জনের ক্লাসরুম চুপচাপ। চন্দনটা উত্তরটা জানে, কিন্তু আগেভাগে হাত তুলল না। আর কে কে জানে দেখা যাক। আড়চোখে সাইলেন্ট মোডে রাখা মোবাইলের দিকে তাকায় সে। আজ পয়লা বৈশাখ। তার প্ল্যান ছিল গতকাল বাড়ি কেটে পড়ার। চৈত্র সংক্রান্তিতে গ্রামে চড়কের বিরাট মেলা হয়। চড়কগাছ থেকে গামছা বেঁধে পুণ্যার্থীকে ঝুলতে দেখলে ছোটবেলায় বেদম ভয় করত। এখন মজা লাগে।
এই ক্লাসটা শেষ হলেই বাড়ি পালাবে, এই রকম বাসনা। বছরকার প্রথম দিনে সকালবেলা বাড়িতে জমিয়ে খাওয়াদাওয়া হয়। এ বছর সেটা মিস হয়ে গেল।
কেউ কোন, উত্তর দিচ্ছে না দেখে চন্দন হাত তুলে হেল্থের সংজ্ঞা বলল।
নিরোধ স্যার বললেন, ‘গুড! এই ডেফিনিশন থেকে কী বুঝলে, ছাত্রনেতা?’
‘আপাতত আমি শুধু ছাত্র। নেতাগিরি ক্লাসে ফলাই না। আপনি অনুমতি দিলে একটা খটকার কথা আপনাকে বলতে পারি।’ বিনীতভাবে বলে চন্দন।
‘বলে ফেলো ছাত্রনেতা! সরি ছাত্র!’ বললেন নিরোধ স্যার।
‘সংজ্ঞায় সামাজিক ভাবে ভালো থাকার প্রসঙ্গ আছে। সেটা যদি বুঝিয়ে বলেন।’
‘না হে! শুধু ছাত্র বলে তোমাকে ছোট করব না। ছাত্রনেতা বলেই ডাকি।’ টুকটুক করে ঘাড় নাড়েন নিরোধ স্যার। ‘এই সংজ্ঞা কার তৈরি জানো?’
‘ওয়র্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশান ওরফে হু।’
‘একজ্যাক্টলি! এই পৃথিবীতে স্বাস্থ্য এবং সুস্থতা নির্ণয় বিষয়ক অ্যাপেক্স অর্গানাইজেশান। জেনিভায় হেড অফিস।’ নিরোধ স্যার এতক্ষণ এলএলটির প্ল্যাটফর্মে পায়চারি করছিলেন। এবার টেবিলে রাখা ল্যাপটপের কি বোর্ড টিপলেন। পিছনের পর্দায় ভেসে উঠল একদল অভুক্ত আফ্রিকান শিশুর ছবি। পরনে ন্যাকড়া। গাল ঢোকা, চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, হাত-পাগুলো ঝাঁটার কাঠির মতো সরু, পেটগুলো নাদা। এক শ্বেতাঙ্গ সৈনিক তাদের চকোলেট বিলি করছে।
‘ব্যক্তির স্বাস্থ্য নিয়ে চিন্তা করতে গেলে তাকে ইনক্লুসিভ হতে হবে। সমাজের পাঁচজন লোক ভালো না থাকলে আমিও ভালো থাকব না—এই বোধ প্রতিটি মানুষের মধ্যে জাগ্রত হতে হবে। যাকে রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘আপন হতে বাহির হয়ে।’ শুধু নিজের কথা ভাবলে হবে না। আমার সুস্বাস্থ্যের স্বার্থেই সমাজকেও ভালো রাখতে হবে।’
পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশানে এখন পরের স্লাইড। আমেরিকার একটি হেল্থ ক্লাব। রাস্তায় ঢাউস ঢাউস গাড়ি দাঁড়িয়ে। গাড়ি থেকে নেমে অসম্ভব মোটা এক ভদ্রলোক এসকালেটের চড়ে হেল্থ ক্লাবে ঢুকেছেন। পাশে যদিও সিঁড়ি রয়েছে।
পরের স্লাইড। আবার আফ্রিকা। একটি জিরাফ প্রস্রাব করছে। দু’তিনজন বাচ্চা মূত্র পান করে তৃষ্ণা মেটাচ্ছে। এলএলটি জোড়া দমচাপা নৈঃশব্দ্য।
‘সমস্ত ব্যাধিই আসলে সামাজিক।’ এলএলটি জুড়ে গমগম করছে নিরোধ স্যারের কণ্ঠস্বর। ‘সভ্যতার একদম গোড়া থেকে অসুখের বিরুদ্ধে লড়াই জারি আছে। গাঁওবুড়ো, সুদ-সেয়ার, ফেথ-হিলার, ওঝা, ক্রিস্টাল-গেজার, আয়ুর্বেদ, ইউনানি, হেকিমি, মডার্ন মেডিসিন, হোমিয়োপ্যাথি, আকুপাংচার, রিফ্লেক্সোলজিস্ট, টাচ থেরাপিস্ট—সবাই নিজের মতো করে মানুষের অসুখ সারানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিজ্ঞান মেনে, নাকি না মেনে, সেই প্রসঙ্গে আমি ঢুকছিই না। কেউ মাথার দিব্যি দেয়নি যে বিজ্ঞান শেষ কথা বলে। বিজ্ঞান নিজেই সেই কথা বলার স্পর্ধা কোনওদিনও দেখায়নি। আমার প্রশ্ন, চিকিৎসার প্রয়োগ নিয়ে। কেউ স্বাস্থ্যকে দেখেন মানুষের মৌলিক অধিকার হিসেবে। কম খরচে, আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির হাত ধরে, কমদামি ওষুধ লিখে, লাইফ স্টাইল মডিফাই করে, পরিবেশ পরিষ্কার রেখে মানুষকে সুস্থ করার চেষ্টা করে। অন্য মতাবলম্বীরা আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতির ধার ধারেন না। প্যাথলজি ও রেডিওলজির রিপোর্ট দেখে, দামি ওষুধ লিখে, ওষুধ কোম্পানির কাছ থেকে কাটমানি খেয়ে, ল্যাবরেটরি আর স্ক্যান সেন্টার থেকে মাসিক সাদা খামের ব্যবস্থা করে চিকিৎসা করেন। স্বাস্থ্য এঁদের কাছে পণ্য। তোমাদের ঠিক করতে হবে, তোমরা কী রকম ডাক্তার হবে। স্বাস্থ্যকর্মী না স্বাস্থ্য ব্যবসায়ী? স্বাস্থ্য তোমাদের কাছে কী? পরিষেবা না পণ্য।’
নিরোধ স্যারের ক্লাসের একটি ঘণ্টা কীভাবে কেটে গেল, বুঝতে পারল না চন্দন। সাধারণ কথা থেকে শুরু করে বিষয়ে ঢুকলেন মসৃণ ভাবে। শিশু মৃত্যু এবং গর্ভবতী মায়েদের মৃত্যুর কারণ পড়ালেন। এত স্বচ্ছ এবং হৃদয়গ্রাহী আলোচনা যে চন্দনের এক মুহূর্তের জন্যেও একঘেঁয়ে লাগল না। পুরো ক্লাস গপগপিয়ে গিলল।
পরের ক্লাস এসএলটিতে। ভাইরাস নিয়ে মাথা ঘামাতে ইচ্ছে করল না চন্দনের। সিগারেট ধরিয়ে চলল জীবনদার ক্যান্টিনে। সেখানে সিনিয়ার দাদারা ঠেক মারছে। বিষয়, কলেজ নির্বাচন। চন্দনকে দেখে টিনটিন বলল, ‘এই যে, হিরো হিরালাল, কোনও খবর নেই কেন?’
‘ওর এখন খবর না থাকারই কথা। সামনে সেকেন্ড এমবিবিএস পরীক্ষা।’ বলে রিপু।
‘পরীক্ষা কখনও সামনে থাকে না। পরীক্ষা সব সময়ে পিছনে থাকে।’ টিপ্পনি কাটে বান্টি। সবাই হ্যাহ্যা করে হেসে ওঠে। রিপুর পাশে বসে চন্দন বলল, ‘তোমাদের তো সামনে ফাইনাল এমবিবিএস। টেনশান নেই?’
‘আছে। ইউনিয়নের ইলেকশান হয়ে যাওয়ার পরের সাতমাস আমাদের তোরা কলেজে দেখতে পাবি না। হোস্টেলে বসে গাঁতাবো আর হসপিটালের ক্লিনিকাল ক্লাসগুলো অ্যাটেন্ড করব।’ চন্দনের হাত থেকে সিগারেট নিয়ে রিপু বলে। ‘বাই দ্য ওয়ে, তোর জুড়ুয়া ভাই কোথায় গেল? তাকে কয়েকদিন কলেজে দেখছি না কেন?’
‘অভি? কী জানি! এর মধ্যে ওকে কয়েকবার ফোন করেছিলেম। হারামিটা ফোন ধরল না।’
‘আজকের আজ সকাল খবরের কাগজের এডিটোরিয়াল পেজে, অভির লেখা একটা কবিতা বেরিয়েছে। পুরো পাতাটাই সরকারের শিল্পনীতির বিরোধিতা করে সাজানো। তার মধ্যে হারামির কবিতাটা আলাদা করে ছাপা মানে বিরাট ব্যাপার। অভি নামকরা কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে গেল।’ সুব্রতর হাতে ‘আজ সকাল’ কাগজ। সম্পাদকীয় পাতা বার করে কবিতাটা পড়ছে সে।
‘ধুর্বাল!’ আপত্তি করে টিনটিন, ‘খবরের কাগজের আয়ু বেলা এগারোটা পর্যন্ত। খবরের কাগজ কবিকে প্রতিষ্ঠা দিতে পারে না। তবে কবিতাটা চমৎকার হয়েছে।’
‘নিকুচি করেছে কবিতার!’ বিরক্ত হয়ে বলে রিপু, ‘ছোঁড়াটা কলেজে আসছে না কেন সে খবর নিয়েছিস? ফোনে ওকে না পেলে বৃন্দাকে ধর! বৃন্দার সঙ্গে তো দিনরাত চিপকে থাকে। সে পটের বিবি এখন কোথায়?’
‘বৃন্দা থিয়োরি ক্লাসে গেল।’ রিপুকে ইনফো দিল চন্দন। ‘সত্যিই তো, গত এক সপ্তাহ অভির কোনো খবর নেই। এটা আমার ভাবা উচিত ছিল।’
‘হয় তো বারোদুয়ারি কিংবা ছোট ব্রিস্টলে গিয়ে কবিতা লেখার অ-আ-ক-খ শিখছে।’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলে টিনটিন।
প্রতিবাদ করে রিপু বলে, ‘অভিকে আমি কখনওই নেশাভাং করতে দেখিনি। হি ইজ ভেরি রেগুলার গাই। মনে হয় শরীর খারাপ।’
‘শরীর না, ওর মন খারাপ হয়েছে।’ মৃদু গলায় বলল আপ্পু। চন্দন আপ্পুর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘মন খারাপ? তোমাকে কে বলল?’
‘আমি কিছু জানি না বাবা! আমাকে তোরা এসবের মধ্যে ঢোকাস না।’ তড়িঘড়ি টেবিল থেকে উঠে আপ্পু বলে, ‘আমার সার্জারি ক্লিনিক আছে। ঠিক সময়ে না গেলে স্যামি বড্ড খিচখিচ করেন।’
‘বৃন্দাকে বলে দে। বাপকে টাইট দিয়ে দেবে।’ ফুট কাটে লাটু।
‘বৃন্দা বাপের ভয়ে সব সময় কাঁটা হয়ে থাকে। ও সব করে কোনও লাভ হবে না। তবে একটা সুবিধে হল, স্যামি রিসেন্টলি দিনের বেলাও ড্রিংক করছেন। একটু আধটু ফাঁকি মারলে বুঝতে পারছেন না।’ ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যায় আপ্পু।
চন্দন রিপুকে বলে, ‘আমি লাইব্রেরি চললাম।’
‘ফোট শালা!’ চন্দনের পিঠে থাবড়া কষায় বান্টি। জীবনদার ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে চন্দন এমার্জেন্সি বিল্ডিং-এর দিকে হাঁটা লাগায়। লাইব্রেরি পরে গেলেও চলবে। আগে আপ্পুকে ধরতে হবে। আপ্পু এমার্জেন্সির দিকেই যাচ্ছে।
সার্জারি ওয়ার্ডের বাইরে আপ্পুকে পাকড়াও করে চন্দন বলে, ‘অভির মন খারাপের কেসটা একটু খুলে বলো। আমার টেনশান হচ্ছে।’
‘ওফ! কী কৌতূহল রে বাবা!’ হাসতে হাসতে আপ্পু বলে, ‘তোর বন্ধু মনোকষ্টে আছে আর তুই জানিস না? এটা কোনও কথা হল?’
চন্দন বলল, ‘আমি সত্যিই কিছু জানি না।’
আপ্পু বলল, ‘এই নিয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। তোর যদি খুব কৌতূহল থাকে, তাহলে শ্রীপর্ণার সঙ্গে কথা বল।’
‘শ্রীপর্ণা?’ চন্দন অবাক। ‘কী ব্যাপার বলো তো? তোমরা কী কিছু লুকোতে চাইছ?’
‘আমি চললাম।’ তাগড়াই শরীর নিয়ে রোগীর বাড়ির লোকের জটলা সরিয়ে আপ্পু সার্জারি ওয়ার্ডে ঢুকে যায়। চন্দন ঘড়ি দেখে। থিয়োরি ক্লাস এবার শেষ হবে। তারপর ফরেনসিক মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল ক্লাস। ওইখানে শ্রীপর্ণাকে ধরতে হবে।
ফরেনসিক মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল ক্লাসে ডক্টর রেপ আজ ব্যালিস্টিক্স পড়াচ্ছেন। এয়ারগান, ওয়ান শটার, শটগান, পিস্তল, রিভলভার—দেওয়াল থেকে নামিয়ে এক একটা করে দেখাচ্ছেন এবং বিভিন্ন অংশ খুলে বর্ণনা দিচ্ছেন।
ক্লাসে ঢুকে চন্দন শ্রীপর্ণার পাশের চেয়ারের দখল নিয়েছিল। রেপ স্যারের লেকচারের ফাঁকে ফিসফিস করে বলল, ‘অভির কী হয়েছে রে?’
থ্রি-নট-থ্রি কার্তুজ দেখতে দেখতে চোয়াল শক্ত করল শ্রীপর্ণা। ভুরু কুঁচকে ভাবল। টেবিলে রাখা খাতায় লিখল, ‘জানি না!’
‘মিথ্যে কথা বলিস না।’ লেকচার শোনার অভিনয় করতে করতে তলায় লিখল চন্দন। এক পলক লেখাটা দেখে, জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল বার করল শ্রীপর্ণা। বেঞ্চের তলায় মোবাইল রেখে, কিপ্যাডের দিকে না তাকিয়ে মেসেজ অপশানে গিয়ে রোমান হরফে বাংলায় লিখল, ‘তোকে কে বলল?’
মেসেজ করার কাজে চন্দন শ্রীপর্ণার মতোই সড়গড়। শ্রীপর্ণার হাত থেকে মোবাইল নিয়ে এক ঝলক স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে দেখল শ্রীপর্ণা কী লিখেছে। মেসেজ মুছে লিখল, ‘আপ্পুদি।’ মোবাইলের হাত বদল হল।
মেসেজ দেখে শ্রীপর্ণা লিখল, ‘তাহলে আপ্পুদিকেই জিগ্যেস কর। হোয়াই মি?’
‘আপ্পুদি তোর সঙ্গে কথা বলতে বলল। তুই বলবি কি?’ চন্দনের মেসেজের শেষে রাগি মুখের ইমোজি।
‘ওফ! রাগের কী হল? বলছি। অভি আর বৃন্দার মধ্যে বোধ হয় গন্ডগোল হয়েছে।’
‘তুই কী করে জানলি?’
‘গন্ডগোলের সময় আমি ওদের সঙ্গে ছিলাম।’
‘সঙ্গে ছিলি? তাহলে ‘বোধ হয়’ বলছিস কেন?’
চন্দনকে চমকে দিয়ে রেপ স্যার প্রশ্ন করলেন, ‘বাবা চন্দন, বুলেট ইনজুরিতে খালি চোখে উন্ড অব এন্ট্রি আর একজিট তফাত করার আর কোনও উপায় জানা আছে?’
রেপ স্যারের চোখ চন্দনের দিকে। টেবিলের তলা দিয়ে মোবাইল শ্রীপর্ণার হাতে পাচার করে চন্দন উঠে দাঁড়াল। মাথা চুলকে কিছু বলতে যাওয়ার আগে শুনতে পেল, পিছন থেকে দময়ন্তী ফিসফিস করে বলছে, ‘এন্ট্রি উন্ডে অ্যাব্রেসান কলার আর ডার্ট কলার থাকে।’
‘এন্ট্রি উন্ডে অ্যাব্রেসান কলার আর ডার্ট কলার থাকে।’ না বুঝে আউড়ে দেয় চন্দন।
রেপ স্যার বলেন, ‘গুড!’
চন্দন ঘাড় ঘুরিয়ে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। চন্দনের দৃষ্টি বলছে, ‘বিপদের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য ধন্যবাদ।’ পাশাপাশি এটাও বলছে যে, ‘আমি জানি তুই নিয়মিত বন্দুক চালাস।’
দময়ন্তী চন্দনের দৃষ্টির মানে পড়তে পেরেছে। সে হালকা হেসে শ্রাগ করল।
রেপ স্যার বুলেট ইনজুরির টাইপ নিয়ে বক্তব্য রাখছেন। শ্রীপর্ণা বেঞ্চির তলা দিয়ে আবার মোবাইল এগিয়ে দিয়েছে। তাতে লেখা, ‘সঙ্গে থাকলেও সব কিছু বোঝা যায় না। তাই ‘বোধ হয়’ বলেছি।’
‘বুঝলাম। ‘গন্ডগোল’ মানে কী?’
‘ব্রেক আপ।’
এই মেসেজ পড়ে চন্দন আড়চোখে শ্রীপর্ণার দিকে তাকাল। শ্রীপর্ণা ভীষণ মন দিয়ে লেকচার শুনছে। দেখে বোঝা অসম্ভব, যে আসলে কিছুই শুনছে না। চন্দনের মেসেজের অপেক্ষায় আছে।
চন্দন ডানদিকে তাকাল। ফরসা, ফুটফুটে, নরম সরম, ডলপুতুল বৃন্দা মন দিয়ে বন্দুক-পিস্তলের ইতিহাস শুনছে। চন্দন মোবাইলে লিখল, ‘কে কাকে ঝাড় নামাল?’
‘বৃন্দা অভিকে।’
‘কেন?’
‘সেটা জানি না। অভি খুব কান্নাকাটি করছিল।’
ক্লাস শেষ। রেপ স্যার ক্লাস রুম থেকে বেরোতে বেরোতে বললেন, ‘পরের দিন স্নেক ভেনম পড়াবো।’
জেম্সি চেঁচিয়ে বলল, ‘সাপের বিষ অবধি ঠিক আছে। প্র্যাকটিকালে হাতে নিয়ে সাপ হ্যান্ডেল করতে হবে না তো স্যার? তাহলে সিয়োর ফেল করব।’
‘না।’ বেরিয়ে গেলেন রেপ স্যার। চন্দন শ্রীপর্ণার কবজি ধরে হিড়হিড় করে বাইরে টেনে এসে বলল, ‘তুই সিওর? অ্যাবাউট দ্য ব্রেক আপ?’
‘হাত ধরে টানছিস কেন? পুলিশে যদি খবর দিই তাহলে থানায় নিয়ে গিয়ে কেলিয়ে কলম্বাস বানিয়ে দেবে।’
‘হাত ধরে না টানলে বলবি ইমপোটেন্ট, হাত ধরে টানলে বলবি চরিত্রহীন— তোদের নিয়ে মাইরি হেবি প্রবলেম।’
‘তুই ইমপোটেন্ট কি না জানতে চাই না। কী বলছিস বল।’ হাত ছাড়িয়ে বলে শ্রীপর্ণা।
‘কী হয়েছিল ঠিকঠাক বল তো।’
‘না বললে কী করবি?’
‘ওফ! কিচ্ছু করব না। প্লিজ তুই বল।’ কাতর মিনতি করে চন্দন।
‘বলার কিছু নেই। বৃন্দা অভিকে ঝাড় নামিয়ে গটগট করে বাড়ি চলে গেল। অভি বাচ্চা ছেলের মতো ভেউভেউ করে কাঁদছিল। আমি ওকে ডাকলাম। দাঁড়ে বসিয়ে চা খাওয়ালাম, চোখমুখ মুছিয়ে বাড়ি পাঠালাম। সেই যে বাড়ি গেছে, আর কলেজমুখো হয়নি। আমি অনেকবার ফোন করেছি। একবার মাত্র ধরেছিল। শুনছি কারও ফোনই ধরছে না।’
‘তোকে কে বলল যে অভি কারও ফোন ধরছে না?’
‘অনেকেই বলল। দময়ন্তী, প্রবাল, জেম্সি…’
‘হুম! অভির জন্য চিন্তা হচ্ছে।’
‘তুই চিন্তা কর। আমি হোস্টেলে চললাম। এইসব বোকাবোকা প্রেমের ন্যাকামো আমার অসহ্য লাগে।’ গটগট করে লেডি আর্চার্স হোস্টেলের দিকে হাঁটা লাগাল শ্রীপর্ণা। শ্রীপর্ণার সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যে চন্দন আড়চোখে দেখে নিয়েছে যে দময়ন্তী দাঁড়ের দিকে এগোচ্ছে। বৃন্দার গন্তব্য লাইব্রেরি।
বৃন্দা লাইব্রেরি যাচ্ছে মানে অনেকক্ষণ থাকবে। ওকে পরে পাকড়াও করলেও হবে। চন্দন হাঁক পেড়ে বলে, ‘অ্যাই দময়ন্তী! তোকে আজ আমি চা খাওয়াবো।’
চন্দনের চিৎকার শুবে মুচকি হেসে দময়ন্তী বলল, ‘বুলেটের এন্ট্রি উন্ডের বৈশিষ্ট্য বলে দেওয়ার জন্যে? আমার স্কুলের কারিকুলামে ফায়ার আর্মস প্র্যাকটিস ছিল। যারা একবার ফায়ারিং প্র্যাকটিস করে, তাদের কাছে এসব নস্যি।’
‘কিন্তু এসব খবর পুলিশের কাছে যাওয়া বিপজ্জনক।’ দাঁড়ে বসে দু’ভাঁড় চায়ের অর্ডার দিল চন্দন। দময়ন্তীও রেলিং-এ উঠে বসেছে।
‘কোন খবর পুলিশের কাছে যাওয়া বিপজ্জনক?’ দময়ন্তীর পাশ থেকে প্রশ্ন করলেন এক মাঝবয়সি ভদ্রলোক। তাঁর হাতেও চায়ের ভাঁড়।
দময়ন্তী তেড়ে উঠে বলল, ‘আপনি কে মশাই? আমাদের কথায় নাক গলাচ্ছেন?’
চন্দন দময়ন্তীকে থামিয়ে বলল, ‘চুপ কর। উনি তপন চৌধুরী। এন্টালি থানার ওসি। আমার পরিচিত।’
তপন নিজের হাতের ভাঁড়ের চা দময়ন্তীর দিকে বাড়িয়ে বললেন, ‘হাসপাতালে চক্কর মারা আমার ডেলি রুটিনের মধ্যে পড়ে। তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে ভাবিনি।’
চন্দন বলল, ‘আপনি কিন্তু আর হোস্টেলে আসছেন না।’
চন্দনকে আর এক ভাঁড় চা এগিয়ে তপন বললেন, ‘ছেলেটাকে নিয়ে একটু ব্যস্ত ছিলাম। প্রচণ্ড পেটে ব্যথা। ডাক্তার বলল, অ্যাকিউট অ্যাপেন্ডিসাইটিস। ডক্টর সমীরণ ব্যানার্জিকে দিয়ে অপারেশান করালাম।’
স্যামির প্রসঙ্গ উঠতে দময়ন্তী আর চন্দন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। ভাঁড়ে চুমুক দিয়ে চন্দন বলল, ‘হাসপাতালে ওটি হল। একবার বললে পারতেন!’
‘এখানে হয়নি। হয়েছে ওঁর নার্সিং হোমে। মেডিক্লেম করা ছিল তাই বাঁচোয়া। সত্তর হাজার টাকা খরচ পড়ল।’
‘ছেলে এখন কেমন আছে?’ প্রসঙ্গান্তরে যায় চন্দন।
‘ভালো। কাল থেকে কলেজে জয়েন করবে। ওদের দাঁতের ডাক্তারির কোর্স তোমাদের মতোই হিউজ। বই দেখলে আমার মাথা খারাপ হয়ে যায়।’ এক চুমুকে নিজের চা শেষ করে তপন বলেন, ‘তোমরা আড্ডা মারো। আমি চললাম।’
তপন চলে যাওয়ার পরে দময়ন্তী বলল, ‘এই লোকটা পুলিশ? বেশ বাবা টাইপের দেখতে!’
‘পুলিশ বলে মানুষ নয় নাকি?’ ইয়ার্কি মারে চন্দন।
‘বাজে কথা রাখ। আমায় ডাকলি কেন বল।’
‘অভিকে ক’দিন কলেজে দেখছি না…’ হালকা মন্তব্য হাওয়ায় ছেড়ে দেয় চন্দন। দময়ন্তী উত্তর না দিয়ে চা শেষ করে। ভাঁড় ডাস্টবিনে ফেলে বলে, ‘সব জেনেশুনে ন্যাকামো করিস না। একটা সুযোগসন্ধানি, ধান্দাবাজ ছেলে তোর বন্ধু হতে পারে। বৃন্দার নয়।’
‘অ্যাই মেরেছে!’ চন্দন কপাল চাপড়ায়। যদিও তার মন খুশিতে ভরে উঠেছে। প্ল্যান তাহলে সাকসেসফুল! অভিকে সোশাল ক্লাইম্বার হিসেবে বৃন্দার কাছে এসটাবলিশ করা গেছে। এই কারণেই বৃন্দা অভিকে ঝাড় নামিয়েছে! খুশিয়াল মুড চেপে রেখে বিষণ্ণ গলায় চন্দন বলল, ‘তুই কি অভির সঙ্গে ঝগড়া করেছিস? করে থাকলে মিটিয়ে নে। ছেলেটা বড্ড ভালো!’
‘আমার সঙ্গে ঝগড়া করে অভি কলেজে আসবে না, এত ইম্পর্ট্যান্ট আমি নই। আর অভির সঙ্গে আমি ঝগড়া করব, এতটা ইম্পর্ট্যান্ট অভি নয়।’ দাঁড় থেকে নেমে এজেসি বোস রোডের দিকে হাঁটা দেয় দময়ন্তী। চন্দন আস্তে আস্তে দাঁড় থেকে নামে। রুমাল দিয়ে মুখ মোছে। টিশার্ট ভালো ভাবে ইন করে। বেল্ট একঘর টাইট করে। পানবিড়ির দোকান থেকে মিন্ট ফ্লেভার্ড চিউইং গাম কিনে মুখে পোরে। শাহরুখ খানের কায়দায় আঙুল দিয়ে চুল ব্যাককোম্ব করে লাইব্রেরির দিকে এগোয়। সামনে কঠিন রাস্তা। মেপেজুপে, সাবধানে পা ফেলতে হবে।
.
জানলার ধারে বসে মোটকা বই খুলে বৃন্দা লিভারের প্যাথলজি বুঝছে। একগাদা লুজশিট, স্কেচপেন, হাইলাইটার, স্টেপলার টেবিল জুড়ে ছড়ানো। একটা জার্নাল নিয়ে বৃন্দার সামনে দাঁড়িয়ে চন্দন বলল, ‘এখানে বসলে তোর অসুবিধা হবে?’
‘অ্যাঁ?’ চমকে উঠল বৃন্দা। চন্দন দেখল, বৃন্দার চোখে জল। গাল আর নাক লাল। রুমাল দিয়ে নাক মুছে বৃন্দা বলল, ‘না। তুই বোস। আমি উঠব।’
‘কী ব্যাপার? তুই কাঁদছিস কেন?’ অনুমতির তোয়াক্কা না করে বৃন্দার পাশে বসে চন্দন বলে, ‘এমন সুন্দর মেয়ের মনে কীসের দুঃখ?’
‘আমি উঠছি।’ নিমেষে গাম্ভীর্যের মুখোশ পরে নিয়েছে বৃন্দা। ‘বাড়ি যাব।’
‘বোস।’ বৃন্দার কবজি চেপে ধরে চন্দন তাকে চেয়ারে বসিয়েছে। ‘আমাকে সবকিছু না শেয়ার করে তুই এখান থেকে উঠতে পারবি না। দ্যাট্স হোয়াট ফ্রেন্ডস আর ফর!’
‘ফ্রেন্ডস…’ ফ্যাকাশে হাসে বৃন্দা। চন্দনের কাঁধে মাথা রেখে হুহু করে কেঁদে ফেলে।
নিজের কাঁধ এগিয়ে দিয়ে চন্দন ভাবে, একেই শহরের লোকেরা ‘লেন্ডিং এ শোল্ডার টু ক্রাই অন’ বলে না? নতুনগ্রামের চাষার ছেলে ঠিক পথেই এগোচ্ছে। শুধু একটু ধৈর্য ধরতে হবে।
.
