হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২৯

২৯. অভিজ্ঞান

লক্ষ্মী নিবাসের তিনতলায় এখন চমৎকার বাগান। মরশুমি ফুল তো আছেই। লঙ্কা, লেবু, বেগুন, পুঁইশাকও চমৎকার ফলছে। কৃতিত্ব মনোজের।

নবযুগ সরকার আসার পরে মহাকরণে কর্মসংস্কৃতির ধুম লাগল। মাস দুয়েক পরে যে কে সেই। নোংরা টেবিল, ধুলোমাখা চেয়ার, ঝুলে ভরা দেওয়াল, ফাইলের পাহাড়ে নিয়ে পুরোনো সাবেকি ছন্দে ফিরে গেছে ক্ষমতার পীঠস্থান। এতে মনোজের সমস্যা হওয়ার কথা নয়। তাঁর সমস্যা অন্য জায়গায়। জনমোর্চার সমর্থক এবং পার্টি সদস্যরা রাতারাতি ভোল বদলে নবযুগ পার্টিতে নাম লিখিয়েছে। মনোজের মতো গুটিকয় পুরোনো পাপী রয়ে গেছেন পুরোনো দল, পুরোনো পতাকা আঁকড়ে। ইউনিয়ন রুম নবযুগের দখলে, রিহার্সাল রুম নবযুগের দখলে, জীবন সংগ্রাম কল শো পাচ্ছে না, নতুন নাটক সাজানোর উপায় নেই। কেননা নাটক করার লোক নেই।

নাটক মানে মেকআপ আর অভিনয় নয়, ডায়ালগ ডেলিভারি আর ক্ল্যাপ নয়। রাতের পর রাত জেগে পার্ট মুখস্থ করা, দিনের পর দিন মহড়া দেওয়া, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সেট আর প্রপ তৈরি… নাটকের পিছনে অনেক কান্না, ঘাম, রক্ত আর শ্রম মিশে থাকে। একা মনোজ কত দিক সামলাবেন?

নাটক নেই, রিহার্সাল নেই, সান্ধ্য আড্ডা নেই, গোপন জীবনের উত্তেজনা নেই, অরুণার সঙ্গে ঝগড়া নেই, পুত্রশোক ফিকে হয়ে আসছে। বহুবাহু-বিশিষ্ট মিড-লাইফ ক্রাইসিসে পড়ে মনোজ ডিপ্রেস্‌ড হয়ে গেলেন। বাড়ি ফিরে থম মেরে বসে থাকেন। টিভি চালিয়ে পা দোলান। থেকে থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেলেন। মাঝে মাঝে হাত উল্টে বলেন, ‘ধুস্‌সালা!’

মনোজের সমস্যা প্রথম খেয়াল করে রাধা। সে নিজের মতো করে অরুণার কানে তোলে। বলে, ‘এবার তোমার বরের ডাক পড়েছে।’

‘কোথায়?’ বিরক্ত হয়ে বলেন অরুণা।

‘কোথায় ডাক পড়েছে নয়। জিজ্ঞাসা করো, কার কাছে ডাক পড়েছে। স্বয়ং ‘তিনি’ ডেকেছেন।’ আকাশের দিকে তর্জনী নির্দেশ করে রাধা। প্রচণ্ড রেগে গিয়ে অরুণা বলেন, ‘অলক্ষুণে কথা বলা বন্ধ করো। তোমার এই নোঙরা স্বভাব কবে যাবে?’

‘মূর্খ মেয়েছেলে কোথাকার!’ দাঁত খিঁচোয় রাধা। ‘ডাক পড়েছে মানেই মৃত্যু হয়? কখনও কখনও মানুষ ইহ জগতে থাকলেও আত্মাটা তাঁর কাছে বন্ধক রাখে। আত্মাকে তিনি খাইয়ে পরিয়ে বড় করেন। আর আত্মাহীন মানুষ, তোমার বরের মতো, ধরাধামে ঘুরে বেড়ায়।’

এতক্ষণে বিষয়টা মাথায় ঢুকেছে অরুণার। সে বলে, ‘তা হলে উপায়?’

‘অত বড় ছাদ থাকতে উপায়ের অভাব?’

‘মানে?’

‘মল্লিকা, চাঁপা, শেফালি, করবী, জুঁই, বকুল থাকতে তোমার কীসের চিন্তা?’

একগাদা মেয়ের নাম শুনে অরুণা আবার রাধাকে ঝাড় দিতে যাচ্ছিলেন। হেঁয়ালি মাথায় ঢোকায় কিছুক্ষণ গুম মেরে রইলেন। অবশেষে বললেন, ‘গাছপালা নিয়ে থাকলে মানুষটা সুখে থাকবে বলছ?’

‘গাছের প্রাণ আছে।’ অবিকল জগদীশচন্দ্রের মতো গালে হাত দিয়ে পোজ দেয় রাধা। অরুণা হাসতে হাসতে বলেন, ‘খারাপ বলোনি।’

সেই থেকে শুরু। অরুণা একদিন রোববার সকালে একাই ট্যাক্সি নিয়ে চলে গিয়েছিলেন হাওড়া স্টেশানের গ্লোব নার্সারিতে। অস্ট্রেলিয়ান জবা, বোগেনভিলিয়া, অপরাজিতা, গোলাপ, পিটুনিয়া, জারবেরা, বেলফুলের চারা কিনেছিলেন। কিনেছিলেন জলঝারি, মাটি, সার, পোকা মারার ওষুধ, খুরপি। মনোজের কাছে টাকা চাননি, একবারের জন্যও ছাদের বাগানের কাজে হাত লাগাতে বলেননি। নিজেই নিজেই টবে মাটি ভরেছেন, গাছ পুঁতেছেন, সার আর জল দিয়েছেন।

কবে থেকে অরুণার বাগানবিলাস মনোজের মধ্যে সংক্রামিত হল কে জানে! এখন মনোজই বাগান পরিচর্যা করেন। অরুণা টুকটাক সাহায্য করেন। তিনতলার ছাদ, সিঁড়ি, দোতলা আর একতলা জুড়ে চারশো টব। বাইরের বাগানে শ’খানেক গাছ। মনোজ ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠে গাছে জল দেওয়া দিয়ে দিন শুরু করেন। সেই পর্ব শেষ হতে না হতেই অফিস যাওয়ার সময় হয়ে যায়। অফিস থেকে বাড়ি ফিরে আবার গাছের পরিচর্যা। শেষ হতে রাত সাড়ে নটা। সবুজের অভিযান নিয়ে মনোজ আপাতত শান্তিতে আছেন। অরুণাও। সুখী দাম্পত্যের অভিনয় করে চমৎকার কেটে যাচ্ছে দিন।

সকাল সাতটার সময় অভির ঘুম ভাঙল ফুলের গন্ধে। ছাদ ভরতি অজস্র ফুল ঝিম ধরা গন্ধ-জলসা বসিয়েছে। তিনতলা থেকে দোতলাতেও গন্ধ আসছে। অভির মাথা ব্যথা করছে। পরাগ রেণুতে তার অ্যালার্জি। রোজ সকালে যখন ঘুম ভাঙে, তখন নাক দিয়ে জল পড়ছে, চোখ লাল। মনোজের বাগান বিলাসের সঙ্গে অ্যালার্জির যোগটা প্রথম কয়েকদিন ধরতে পারেনি অভি। বাগানচর্চা যখন শুরু হয়েছিল, তখন সে হোস্টেলে পরীক্ষা নিয়ে ব্যস্ত। পরীক্ষা শেষে বাড়ি ফেরার পরে এই উৎপাত। অ্যান্টি-অ্যালার্জিক ট্যাবলেট খেয়ে ম্যানেজ করছে। ছাদবাগানের মাধ্যমে বাড়িতে অনেক কষ্টে স্থিতাবস্থা এসেছে। অ্যালার্জির জন্য সেটা বিগড়োতে দেওয়া যাবে না।

আজ মার্চ মাসের চার তারিখ। ফাইনাল এমবিবিএস-এর রেজাল্ট বেরোনোর দিন। বিছানার পাশে জলের বোতল আর ট্যাবলেট রাখা রয়েছে। চট করে ট্যাবলেট মুখে দেয় অভি। বিছানা থেকে উঠে ছাদে যায়। ছোট ছোট বাঁশগাছে ছাদ ভর্তি। গাছগুলো বেশ লাগে অভির। চকচকে সবুজ পাতা দেখল মন ভালো হয়ে যায়। মনোজ খুরপি দিয়ে বাঁশগাছের গোড়ার মাটি নিড়োচ্ছেন। অভিকে দেখে বললেন, ‘আজ রেজাল্ট?’

‘হ্যাঁ। সওয়া নটার ট্রেনে কলেজে যাব। তুমি কখন বেরোবে?’

‘আমি নটায় বেরোবো। কী রেজাল্ট হল, জানাস।’

‘জানাব।’

পচে যাওয়া পাতা কাটতে কাটতে মনোজ বলল, ‘পাশ করলেই কি রেজিস্ট্রেশান নম্বর পাবি?’

‘না। এর পরে আছে এক বছরের ইন্টার্নশিপ। এটা বাধ্যতামূলক। সেটা কমপ্লিট করার পরে রেজিস্ট্রেশান নম্বর পাওয়া যায়। তারপরে আছে হাউসস্টাফশিপ।’

‘ইন্টার্ন মানে জুনিয়র ডাক্তার। তাই তো?’

‘ইন্টার্ন থেকে আরম্ভ করে হাউসস্টাফ, পোস্ট গ্র্যাজুয়েট ট্রেনি— সবাই জুনিয়র ডাক্তার। এখন ইন্টার্নশিপে বাইশ হাজার টাকা স্ট্রাইপেন্ড দেয়।’

‘বাবা। সে তো অনেক টাকা।’ হাত থেকে মাটি ঝাড়ছেন মনোজ।

‘আমি টাকা নিয়ে বদার্‌ড নই। পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান নিয়ে বদার্‌ড। সব্বাই ইন্টার্নশিপ থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এনট্রান্স এক্সামিনেশানের জন্য পড়তে বসে যায়। অজস্র কোচিং সেন্টার আছে, যারা পিজি এনট্রান্স এক্সাম ক্র্যাক করার ব্যাপারে সাহায্য করছে। ওগুলোতে এনরোল না করলে পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে চান্স পাওয়া প্রায় অসম্ভব।’

‘অনেক টাকা নেয় নিশ্চয়?’

‘ভালোই টাকা নেয়। তবে ইন্টার্নশিপের স্ট্রাইপেন্ড জমালে ও টাকা উঠে আসে। তোমাকে এই নিয়ে না ভাবলেও চলবে।’ মুচকি হাসে অভি, ‘আমি এক বছর মন দিয়ে মেডিসিনে হাউসজব করব। তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েট এনট্রান্স এক্সামের জন্য পড়তে বসব। তোমার কোনও খরচ করাবো না। দু’বেলা দু’মুঠো খেতে দিও। তা হলেই হবে।’

‘ও ভাবে বলছিস কেন?’ টবের মাটিতে উল্টোপাল্টা খুরপি চালান মনোজ, ‘তুই এবার দাড়িটা কামা। বিবাগীদের মতো দেখতে হয়েছিস। আমাদের সময় প্রেমে পরিত্যক্ত হলে বিরহী পুরুষ এইরকম দাড়ি রাখত। আমরা বলতাম দেবদাস ভাইরাস। তোর সেইরকম কিছু হয়েছে নাকি?’

অভি মনোজের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘গত মাসে ঋষিতার বিয়ে হয়ে গেছে।’

ইলেকট্রিক শক লাগলে মানুষ যেমন চমকে ওঠে, মনোজ তেমনই চমকে উঠলেন। অভির দৃষ্টি থেকে নিজেকে লুকোতে ছাদের অন্য প্রান্তে গিয়ে স্থলপদ্মের পচা পাতা বাছতে লাগলেন।

দূর থেকে মনোজকে একপলক দেখল অভি। প্রত্যাঘাতটা না করলেই হত! যাক গে! যা হওয়ার হয়ে গেছে। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামে সে। এবার কলেজে যেতে হবে।

.

জীবনদার ক্যান্টিনে জড়ো হয়েছে চন্দন, সুরজ, প্রবাল, দীপ এবং গোটা গ্যাং। অভি দময়ন্তীর পাশে বসল। জীবনদা সবার হাতে কোলার ক্যান ধরিয়েছে। ঠান্ডা পানীয়ে চুমুক দিতে দিতে নীচু গলায় আলোচনা চলছে।

বিধানসভা ভোটের পরে কলেজে এবং হোস্টেলের রাজনৈতিক চেহারায় বড়সড় পরিবর্তন এসেছে। জনমোর্চার পুরোনো ছাত্র ইউনিয়ন এখনও আছে। কিন্তু চন্দন একশো আশি ডিগ্রি পালটি খেয়ে এখন নবযুগ পার্টির ছেলে। ঘটনাটা কী ভাবে ঘটল, সার্জারি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ার পরে দময়ন্তী অভিকে বলেছে।

রোল নম্বরের জটিল অ্যারেঞ্জমেন্টের কারণে সার্জারি প্র্যাকটিকালেও অভি আর দময়ন্তী একসঙ্গে। সেদিনও দু’জনের পরীক্ষা তাড়াতাড়ি শেষ হয়ে গিয়েছিল। সার্জারি ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে অভি বলল, ‘তোর লং কেস কী ছিল?’

‘সিএ প্যানক্রিয়াস। জনডিসের পেশেন্ট।’ মাথা নীচু করে উত্তর দেয় দময়ন্তী।

‘এইসব পেশেন্টকে পরীক্ষার জন্য রাখা ঠিক নয়।’ ঘাড় নাড়ে অভি। ‘বেচারি মাত্র কয়েক মাস বাঁচবে। তার মধ্যে একগাদা ছেলেমেয়ে পেট টেপাটিপি করবে। ওর মানসিক অবস্থার কথা ভাবা উচিত।’

অভির কথার মধ্যে দময়ন্তী হাউহাউ করে কেঁদে ফেলে। অভি অবাক হয়ে বলে, ‘কী হল রে? পরীক্ষা ভালো হয়নি? লং কেসে ঝুলিয়েছিস?’

‘ওসব কিছু না।’ নাক মুছতে মুছতে দময়ন্তী বলে, ‘আমার বাবার প্যানক্রিয়াসে ক্যানসার ধরা পড়েছে।’

‘কবে জানতে পারলি?’ দময়ন্তীর হাত ধরে টানতে টানতে দাঁড়ের দিকে নিয়ে যায় অভি।

‘পরশু বাড়ি গিয়ে জানলাম। গত কয়েক মাস ধরেই বাবার শরীরটা ভালো নয়। নানারকম ভেগ সিম্পটম ছিল। ইউএসজিতে অ্যাবডোমেনে শ্যাডো পাওয়া যায়। সেটা দেখে ফিজিশিয়ান সিটি স্ক্যান করতে বলেছিল।’

‘কোন স্টেজ?’

‘আমি জানি না। পরীক্ষাটা যাতে না বিগড়ে যায়, তাই প্লেটগুলো দেখে রিপোর্ট না পড়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে এসেছি। কিন্তু ব্যাক অব দ্য মাইন্ডে ইস্যুটা কাজ করেই যাচ্ছে। আজ লং কেস পাওয়ার পরে মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল।’

এক ভাঁড় চা দময়ন্তীর হাতে ধরিয়ে অভি বলে, ‘আর মাত্র কয়েকটা দিন। চুপচাপ বসে থাক। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষাগুলো ভালো করে দে। তারপর সবাই মিলে তোর বাবাকে নিয়ে ভাবব। অত বড় শিল্পী। গভর্নমেন্ট নিশ্চয় এগিয়ে আসবে।’

‘গভর্নমেন্টের ওপরে আমার কোনও ভরসা নেই। নবযুগ সরকার গঠিত হওয়ার পরে বাবাকে শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল। বাবা যায়নি। তারপর থেকেই বাবার ওপরে মৃন্ময় চ্যাটার্জির রাগ। একদিন সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছেন, ‘অনেক পিঁপড়ে লাভের গুড় খাবে বলে ঘুরঘুর করছিল। তাদের পিষে দিয়েছি।’ বাবা ওই বক্তৃতা শুনে রেগে গেছে। মরে গেলেও সরকারের কাছে সাহায্য চাইতে যাবে না।’

‘ড্যানিয়েল আর্চারের মতো শিল্পীর কারও কাছে সাহায্য চাইবার প্রয়োজন নেই। ওঁর যথেষ্ট সুনাম এবং প্রতিপত্তি আছে। তা ছাড়া উনি ইচ্ছে করলেই লন্ডনে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারেন।’

চা শেষ করে ভাঁড় ডাস্টবিনে ফেলে দময়ন্তী বলল, ‘বাবাকে লন্ডনে নিয়ে গিয়ে চিকিৎসা করানো যাবে না।’

‘কেন?’

‘এটা খুব জটিল, সেন্টিমেন্টাল ইস্যু। বাবার গায়ের চামড়া সাদা হলেও বাবা ভারতবর্ষকে নিজের দেশ বলে মনে করে। বাবা মনে করে লন্ডনে থাকলে কবেই নেশা করে মরে যেত। বাবাকে দ্বিতীয় জন্ম দিয়েছে এই বাংলা। বাবাকে নতুন জীবন দিয়েছে শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্রনাথ, মা। বাবা এখানেই চিকিৎসা করাবে।’

‘আজকের দুনিয়ায় এইসব সেন্টিমেন্ট একটু অদ্ভুত নয়?’

‘একটু নয়, খুব অদ্ভুত। কিন্তু ওই পাগলামির জন্যেই বাবা আজ নামকরা পেন্টার। এনিওয়ে, তোকে দুটো ইম্পর্ট্যান্ট খবর দিই। এক নম্বর হল, চন্দন এখন জনমোর্চা ছেড়ে নবযুগ পার্টিতে ভিড়েছে।’

‘তুই কী করে জানলি?’

অভির দিকে বিষণ্ণ দৃষ্টি বিছিয়ে দময়ন্তী বলে, ‘কী ভাবে জেনেছি বলব না। এই কলেজের সঙ্গে আমার আর কোনও ইমোশনাল অ্যাটাচমেন্ট নেই। যদি থাকত, তা হলে চন্দনের বারোটা বাজিয়ে রেখে দিতাম। কিন্তু পাস্ট ইজ পাস্ট। তোকে সেকেন্ড ইম্পর্ট্যান্ট খবরটা দিই। ঋষিতার বিয়ে হয়ে গেল। রোম্যানো স্যান্টোসের অন্য মালিক সন্তোষের সঙ্গে।’ মোবাইল বার করে দময়ন্তী অভিকে দেখায়, ‘এই দ্যাখ, ওর বিয়ের ছবি।’

চন্দনের দল বদল নিয়ে ভাবছিল অভি। হঠাৎ ঋষিতার প্রসঙ্গ ওঠায় সেই চিন্তা মাথা থেকে উড়ে গেল। দময়ন্তীর মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকাল সে। কাজল টানা দুটি চোখ তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। মোবাইল হাতে নিয়ে পরের ছবিগুলো দেখে অভি। পেঁয়াজ খোসা রং-এর বেনারসি পরে একটা মেয়ে ঠোঁট চেপে হাসছে।

এই মেয়েটাই ঋষিতা? এর জন্যেই মনোজ বউ আর ছেলেদের মিথ্যে কথা বলতেন?

অভির হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে দময়ন্তী বলল, ‘তুই এত মন দিয়ে কী দেখছিস? ঋষিতাকে পছন্দ হয়েছে বুঝি?’

‘দেখছিলাম মেয়েটার মধ্যে এমন কী আছে যা আমার মায়ের মধ্যে নেই।’

‘স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কখন, কী ভাবে অন্য মেয়ে বা ছেলে ঢুকে পড়ে তা জানা শিবের বাপের অসাধ্য। তুই ওই নিয়ে ব্যাটারি খরচা করিস না। বরং আমার কথা শোন। ঋষিতা আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করল। খুব রিপেন্ট্যান্ট মনে হল। বলল, আশীর্বাদ করো, যেন সুখী হই।’

অভি ফ্যাকাশে হেসে বলল, ‘গুড নিউজ। আমার বাবাকে নেমন্তন্ন করেনি, এটা আরও গুড নিউজ।’

আজ সকালে মনোজকে ঋষিতার বিয়ের খবর দিয়ে নিষ্ঠুর আনন্দ পেয়েছিল অভি। এখন ক্যান্টিনে বসে খারাপ লাগছে। ওইভাবে না বললেই হত।

.

ক্যান্টিনে ঢুকেছে রিপু আর আপ্পু। ওরা মেডিসিনে হাউসজব করছে। বাজারে জোর খবর, দু’জনে বিয়ে করবে। ওদের দেখে হইহই করে জেম্‌সি বলল, ‘বাধাই হো! মু মিঠা করাও।’

‘আগে ফাইনাল এমবিবিএস-এ পাশ কর। তারপর চ্যাঁচাবি।’ জেম্‌সিকে দাবড়ানি দেয় রিপু। চন্দনকে বলে, ‘কী বস! গাছের খাওয়া তো শেষ। এবার কি তলার কুড়োচ্ছিস?’

‘হ্যাঁ।’ কনফিডেন্টলি বলে চন্দন, ‘তবে তোমাদের জ্বালায় গাছে কিছু ছিল না। তলাতেও কিছু নেই। কী বল সুরজ!’

সুরজের মধ্যে নেতা-নেতা ভাব এসেছে। দেশ ও জাতির দায়িত্ব এখন তার ঘাড়ে। সে বলল, ‘তোমরা সব জিনিসকে বড্ড লাইটলি নাও। এই জন্যই আজ এই অবস্থা। তিরিশ বছর কোনও কাজ করোনি। আগামী দশ বছর রেস্ট নাও। আমাদের কাজ করতে দাও।’

সঞ্জয় পাশ থেকে বলল, ‘অলরেডি এনএইচকিউ আর লেডি আর্চার্স হোস্টেলে সার্কুলার চলে গেছে। যাদের হোস্টেলে থাকার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে, তাদের হোস্টেল ছাড়তে হবে। বছরের পর বছর বিনা পয়সায় হস্টেলে থেকে দাদাগিরির দিন শেষ।’

সবুজ বলল, ‘লেডি আর্চার্স হোস্টেলে বেডের ক্রাইসিস আছে। সেখানে এই রকম নিয়ম চালু হওয়া ভালো। কিন্তু নিউ হাউস স্টাফ কোয়ার্টারে অজস্র রুমে তালা মারা থাকে। অজস্র বেড খালি পড়ে আছে। সেখানে যদি কোনও স্টুডেন্ট এক বছর থেকে পড়াশুনো করে পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান এনট্রান্স এক্সামিনেশানে চান্স পায়, তাহলে আপত্তি কোথায়? আমরাও তো এক বছর বাদে এই সিচুয়েশানে পড়ব!’

‘রুল ইজ রুল বস।’ জানায় সঞ্জয়।

‘তোরা হোস্টেল ছাড়বি তো?’ তেড়ে ওঠে সবুজ। চন্দন সবাইকে থামিয়ে বলে, ‘নিজেদের মধ্যে ঝগড়া করে লাভ নেই। বৃন্দা, তোর বাবা কী বলেছেন? কখন রেজাল্ট বেরোবে?’

বৃন্দা এই হই হট্টগোলের মধ্যে এককোণে বসে শ্রীপর্ণার সঙ্গে গুজগুজ করছিল। চন্দনের কথা শুনে শ্রাগ করে বলল, ‘আমার বাবা এবার পরীক্ষা নিচ্ছে না। আমি পরীক্ষা দিচ্ছি বলে বাবা সিস্টেমের বাইরে।’

‘সেটা তো আমরা জানি। কিন্তু রেজাল্ট আউটের আগে এইচওডি-র সইসাবুদ লাগে। তাই জিজ্ঞাসা করলাম।’

জীবনদা হঠাৎ এসে বলল, ‘কোল্ড ড্রিঙ্কের দাম কে মেটাবে? তাড়াতাড়ি টাকা দিলে আমি তোমাদের একটা সিক্রেট খবর দেব।’

‘সিক্রেট খবর?’ চন্দন হাঁক পাড়ে, ‘তুমি আবার কোন গোপন খবর জানলে?’

জীবনদা বলল, ‘টাকা না পেলে কিস্‌সু বলব না।’

বৃন্দা, দময়ন্তী, জেম্‌সি, সাবিনা আর শ্রীপর্ণা মিলে কোলার দাম মিটিয়ে বলল, ‘এবার বলো, কী তোমার গোপন খবর।’

জীবনদা মুচকি হেসে বলল, ‘অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এ তোমাদের রেজাল্ট বেরিয়ে গেছে। ক্যান্টিনের এক ছোকরা আপিসে চা নিয়ে গিয়েছিল। সে বলল। বিবেকানন্দ দত্তরায় আর স্যামি ব্যানার্জি মিলে নোটিশ ঝোলাচ্ছেন।’

জীবনদার কথা শেষ হওয়ার আগে সব ছেলেমেয়ে এক সঙ্গে চেয়ার ছেড়ে উঠল। একসঙ্গে টেবিল ঠেলল। একসঙ্গে জীবনদার ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে অ্যাকাডেমিক বিল্ডিং-এর দিকে দৌড়ল।

নোটিশ বোর্ড ঘিরে পুরোনো দিনের মতো জটলা। অভি ভিড়ের মধ্যে ঢুকল না। অতীতে দু’বার রেজাল্ট আউট হওয়ার সময় তাড়াহুড়ো করেনি। আজও করবে না।

কিছুক্ষণের মধ্যে ভিড় পাতলা হয়ে গেল। প্রায় সকলের মুখে হাসি। দময়ন্তী চেঁচিয়ে বলল, ‘অভি, তুই পাশ। এবারে সাপ্লি খুব কম হয়েছে। মাত্র দশটা।’

অভির খবরটা শুনে কোনও হেলদোল হল না। পরীক্ষা দেওয়ার সময়ে বোঝা যায়, কেমন রেজাল্ট হবে। সে যখন ফেল করেছিল, তখন বুঝতে পেরেছিল যে ফেল করবে। এবার পরীক্ষা দিতে দিতে বুঝতে পেরেছিল, পরীক্ষা ভালো হচ্ছে। কত ভালো, সেটা মার্কশিট না পেলে জানা যাবে না।

চন্দন অভির পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। অভিকে বলল, ‘আমরা এখন ডাক্তার?’

অভি মৃদু হেসে বলল, ‘টেকনিক্যালি হ্যাঁ। যদিও রেজিস্ট্রেশান নাম্বার না পাওয়া পর্যন্ত ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের বাইরে ডাক্তারি করতে পারব না।’

চন্দন অভির কথা শোনেনি। সে আপনমনে বিড়বিড় করছে, ‘ডাক্তার হয়ে গেলাম? ডাক্তার?’

‘খুব আনন্দ হচ্ছে, না রে?’

‘তোর হচ্ছে না?’

‘আমার মধ্যে ইমোশান একটু কম আছে। তাই ফেল করলে কষ্ট হয় না, পাশ করলে আনন্দ হয় না।’

‘ইমোশান নয়, তোর মধ্যে অ্যাম্বিশান কম আছে। জীবনে কখনও স্ট্রাগল করতে হয়নি তো! যা চেয়েছিস, সঙ্গে সঙ্গে হাতের মুঠোয় পেয়ে গেছিস। তাই মূল্য বুঝতে পারছিস না। আমাকে প্রতিটা জিনিস লড়াই করে ছিনিয়ে নিতে হয়েছে। কোনও কিছুই আমার জীবনে এমনি আসেনি।’

‘তা ঠিক।’ ঘাড় নাড়ে অভি। সত্যিই তো! তার জীবনে কোনও স্ট্রাগল নেই।

অভির চিন্তার মধ্যে তার কাঁধে বিডিআর-এর হাত। চমকে উঠে অভি বলে, ‘স্যার, আপনি!’

‘স্যামিও আছেন,’ পাশে দাঁড়ানো সমীরণ ব্যানার্জির দিকে ইশারা করেন বিডিআর। স্যামি বলেন, ‘স্টুডেন্টস, পরশু থেকে ইন্টার্নশিপ শুরু হচ্ছে। কে কোন ডিপার্টমেন্টে জয়েন করবে, তার একটা লিস্ট প্রিন্ট হচ্ছে। সেটা একটু বাদে ঝুলিয়ে দেওয়া হবে। পরশু সকাল ন’টার সময়ে প্রত্যেককে আমি ডিপার্টমেন্টে দেখতে চাই। ফাঁকিবাজি করলে অ্যাটেন্ডান্স খাতায় লাল দাগ পড়বে এবং মাইনে কাটা হবে।’

কেউ কোনও কথা বলল না।

স্যামি বললেন, ‘আর একটা কথা বলতে চাই। এই বছর ফাইনাল এমবিবিএস-এ সব সাবজেক্টে হায়েস্ট নম্বর পেয়ে ইউনিভারসিটিতে টপার হয়েছে অভিজ্ঞান লাহিড়ী। মেডিসিন আর গাইনির টপারকে ইউনিভারসিটি থেকে গোল্ড মেডাল দেওয়া হয়। সে দুটো মেডেলও অভিজ্ঞান পাবে।’

চন্দন অবাক হয়ে বলল, ‘অভি টপার হয়েছে?’

স্যামি ভুরু কুঁচকে বললেন, ‘কেন? তোমার আপত্তি আছে নাকি?’

চন্দন বলল, ‘হ্যাঁ… মানে… না। মানে, আমার রেজাল্ট?’

‘আমার শুধু এক নম্বরের রেজাল্টটাই মনে আছে। তোমারটা কাল দেখে নিও।’ শ্রাগ করে অফিসের দিকে এগোন স্যামি। অভি চেঁচিয়ে বলে, ‘স্যার, আমার একটা কথা আছে।’

‘বলো।’ ঘুরে দাঁড়িয়েছে স্যামি। বিডিআর অভিকে দেখছে।

‘আমাদের সহপাঠী দময়ন্তী সেনগুপ্তর বাবা ড্যানিয়েল আর্চারের প্যানক্রিয়াসে ক্যানসার ধরা পড়েছে। অ্যাই দময়ন্তী, এ দিকে আয়।’ ভিড়ের মধ্যে থেকে দময়ন্তীর কনুই ধরে টানতে টানতে স্যামির সামনে নিয়ে আসে অভি, ‘আমাদের থিয়োরি পরীক্ষার মধ্যে ডায়াগনসিস হয়েছিল। প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর থেকেই ওঁকে কয়েক জায়গায় দেখানো হয়েছে। সবাই বলছেন, ‘এটা আর্লি স্টেজ, অপারেবল।’ আপনি পেশেন্টকে একবার দেখুন স্যার!’

‘আমি?’ এক পা পিছোন স্যামি। ‘হোয়াই মি?’

‘অঙ্কোসার্জনরা বলছেন, “গো টু স্যামি ব্যানার্জি। এফআরসিএস-এ ওঁর থিসিস পেপার ছিল প্যানক্রিয়াটিক কারসিনোমা এবং হুইপ্‌লস অপারেশান। আজও সেটা আইডিয়াল থিসিস পেপার হিসেবে ওখানকার ছাত্রদের পড়ানো হয়।” তা ছাড়া আপনি কিছুদিন আগেও হাসপাতালে নিয়মিত অঙ্কোসার্জারি করতেন। এরপরে আমরা কোথায় যাব স্যার? অ্যাই বৃন্দা! তোর বাবাকে বল না!’

বৃন্দা চমকে উঠল! কতকাল বাদে অভি তার নাম ধরে ডাকল? কতকাল? পরীক্ষায় পাশ করে তার আনন্দ হয়েছিল। অভি ফার্স্ট হয়েছে শোনার পরে আনন্দ দশগুণ হল। আর এখন, অভি তার নাম ধরে ডাকার পরে তার সারা শরীর জুড়ে স্থলপদ্ম ফুটল। মার্চ মাসের সূর্যের তেজি আলোয় আকাশি নীল ফিল্টার পড়ল। ফুরফুরে, ঠান্ডা সুপবন বইতে লাগল। মাথার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে অজস্র স্মাইলি। বুকের বাঁ দিকে গোলাপি, হার্ট শেপের একটা সফ্‌ট টয় ধকধক করছে। অসহ্য সুখে কাঁপতে কাঁপতে, মুখ নীচু করে বৃন্দা বলল, ‘তোরা সন্ধেবেলা কাকুকে নিয়ে শান্তিধামে আয়।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *