৩৮. বৃন্দা ও অভিজ্ঞান
বৃন্দাকে থামিয়ে অভি বলল, ‘আমার নাম অভিজ্ঞান লাহিড়ী। আমাদের বাড়ির মানদার সঙ্গে এখানকার নন্দন সরকারের বিয়ে হয়েছে…’
বেঁটে মহিলার গলার আওয়াজে বদল এল। নরম গলায় সে বলল, ‘ওমা! তাই? তুমি তা হলে আমাদের কুটুম। আমার নাম জুলি ধীবর। আর ওই যে ওদিকে দাঁড়িয়ে রয়েছে! ও আমার বর মাইকেল ধীবর।’
অভি আর জুলির কথোপকথনের মধ্যে বৃন্দা চলে গেছে শক্তিরূপার কাছে। সে জিজ্ঞাসা করল, ‘কাকিমা, কী হয়েছিল?’
‘তোমাকে তো ফোনে বললাম’ বললেন শক্তিরূপা, ‘উল্টোদিক থেকে একটা লরি এসে হেড অন মারতেই ড্রাইভার মুহূর্তের মধ্যে মাংসের তাল হয়ে গেল। আমি পিছনের সিটের বাঁদিকে বসেছিলাম। হুড়মুড় করে বাঁদিকের দরজা খুলে গাড়ি থেকে নামলাম। ড্যানিয়েলকেও এক ঝটকায় টেনে নামালাম। তার মধ্যেই যা হওয়ার হয়ে গেল। আমার বোধহয় ডান কাঁধে ফ্র্যাকচার হয়েছে। ড্যানিয়েলের ডান হাতে, ডান পায়ে ফ্র্যাকচার হয়েছে, ডান দিকের রিব কেজ আর ডান রিস্টেও হয়ে থাকতে পারে। মাথা ফেটে গিয়ে প্রচণ্ড ব্লিড করছে। নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। আমি আর সিস্টার মিলে ব্যান্ডেজ করেছি। তাও বন্ধ হচ্ছে না। অ্যাকসিডেন্টের পর থেকেই অজ্ঞান।’
জুলির সঙ্গে কথাবার্তা সেরে অভি শক্তিরূপার কাছে এসেছে। সে ন্যাপস্যাক খুলে শুকনো তোয়ালে, টি-শার্ট আর ট্র্যাক স্যুটের লোয়ার শক্তিরূপার দিকে এগিয়ে বলল, ‘আপনি সিস্টারদের রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে নিন। ভেজা কাপড়ে বসে থাকলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন।’
‘থ্যাঙ্কস!’ বাঁহাত দিয়ে ডান কাঁধ চেপে ধরেছেন শক্তিরূপা।
অভি বলে, ‘কাকুকে আগে দেখি। তারপরে আপনাকে দেখছি।’
‘তোমরা আর কী দেখবে!’ ম্লান হাসলেন শক্তিরূপা, ‘এখানে সিটি স্ক্যান নেই, এক্স-রে মেশিন নেই, অপারেশান থিয়েটার নেই, অপারেশানের যন্ত্রপাতি নেই, স্টেরিলিটি নেই। এখানে তোমরা ঢাল-তরোয়ালহীন নিধিরাম সর্দার। তা-ও চেষ্টা করো। ও মরে গেলে ভাবব বিনা চিকিৎসায় মরেনি।’
ছোট্ট গ্রামীণ হাসপাতালেও ছেলে এবং মেয়েদের আলাদা ওয়ার্ড আছে। ছেলেদের ওয়ার্ডে ড্যানিয়েল ছাড়া আর কেউ ভরতি নেই। মেয়েদের ওয়ার্ডে জনাচারেক বামন মহিলা মুখ শুকিয়ে বসে রয়েছে। তাদের সবার কোলে একটা করে বাচ্চা। পায়খানার গন্ধে ঘরে টেকা দায়। নীল সাদা পোশাক পরা এক সেবিকা মাস চারেকের বাচ্চার হাতে স্যালাইনের সূচ ফোটানোর চেষ্টা করছেন। অভি তাঁকে বলল, ‘নমস্কার! আমরা…’
‘জানি। জুলিদি আমাকে বলেছে।’ পুঁচকে বাচ্চার হাতে স্যালাইনের সূচ ফোটাতে ব্যর্থ হতে মেজাজ গরম সিস্টারের। গম্ভীর গলায় তিনি বললেন, ‘এখানে আপনারা কাজ করতে পারবেন না। পেশেন্টের কিছু হয়ে গেলে আমি বিপদে পড়ব।’
অভি থমকে গিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। মেল ওয়ার্ড থেকে উঁকি মেরে বৃন্দা বলে, ‘অভি, কাকুর মাথায় স্টিচ করতে হবে।’
তেড়ে উঠে সিস্টার বলেন, ‘আপনারা ডাক্তার-মোক্তার যাই হোন না কেন, এখানে কাজ করতে পারবেন না। কখনও শুনেছে যে একজনের আপিসে গিয়ে অন্যজন কাজ করে আসে?’
‘হাসপাতালে যার কাজ করার কথা, সে নেই কেন?’ ওয়ার্ডে ঢুকেছে মাইকেল। তার পাশে অন্যান্য বামনরা। সবার পোশাক ভিজে স্যাঁতস্যাঁত করছে। সবার হাতে বেঁটে লাঠি। সবার চোখ লাল। বৃষ্টিতে ভিজে লাল না রাগের চোটে— বোঝা দায়। সিস্টার বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনারা আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন নাকি?’
‘এখনও পর্যন্ত দেখাইনি। তবে এবার দেখাব।’ টেবিলের কোনা ধরে, নিজেকে হিঁচড়ে চেয়ারে তোলে মাইকেল, ‘গত দশ বছর ধরে এখানে কোনও ডাক্তারের পোস্টিং নেই। একটা হেল্থ ক্যাম্প চলত। সেটাও গরমেন্ট তুলে দিল। সাহেবটার মরো মরো অবস্থা। চারটে বাচ্চা ডাইরিয়া নিয়ে ভর্তি হয়েছে। আপনি স্যালাইন চালাচ্ছেন না। ওরা আস্তে আস্তে শিবনেত্র হয়ে যাচ্ছে। দু’জন ডাক্তার কাজ করতে চাইছে। তাদের কাজ করতে দিচ্ছেন না। আপনি কেমন সিস্টার?’
‘আমি কেমন সিস্টার আপনি জানেন না?’ তেড়ে ওঠেন সিস্টার, ‘গত দশ বছর ধরে এই সেন্টার কে চালাচ্ছে? ডেলিভারি কে করাচ্ছে? কোনও ডাক্তার না আমি? বাচ্চাগুলো জল না পেয়ে শুকিয়ে কাঠ হয়ে আছে বলে ভেন পাচ্ছি না। সে কি আমার দোষ?’
‘আপনি আপনার কাজ করুন,’ হাতজোড় করে মাইকেল, ‘এই দু’জনকে কাজ করতে দিন।’
‘আমি হাত তুলে দিলাম,’ কাঁধ ঝাঁকান সিস্টার। ‘পেশেন্টের কিছু হয়ে গেলে আমাকে দোষ দেবেন না।’
সিস্টারদের চেঞ্জিং রুম থেকে ভিজে পোশাক বদলে বাইরে বেরিয়েছেন শক্তিরূপা। তাঁর পরনে অভির দেওয়া টি-শার্ট আর লোয়ার। সেদিকে আড়চোখে তাকিয়ে মাইকেল সিস্টারকে বলল, ‘রুগিদের কী আর হবে? বড়জোর মারা যাবে। আমাদের ওতে অভ্যেস আছে। এবার শহরের সাহেব-মেমদের অভ্যেস হোক।’
শক্তিরূপা ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে বাইরের দালানে চলে গেলেন। কথা ঘোরানোর জন্যে বৃন্দা সিস্টারকে বলল, ‘আমাদের ক্যাপ, মাস্ক আর গ্লাভ্স দিন।’
অভি মেল ওয়ার্ড থেকে চ্যাঁচাল, ‘সবার আগে সার্জিকাল ট্রে দিন। মাথায় সেলাই দিতে হবে।’
জোয়াকিমরা ওয়ার্ডে ঢুকতে যাচ্ছিল। মাইকেল আর জুলি দু’হাত বাড়িয়ে বলল, ‘কেউ ভেতরে ঢুকবে না। সবাই বাইরে দাঁড়াও। ডাক্তারবাবুরা কাজ করছেন।’
.
হেল্থ সেন্টারের পিছনে গাড়ি পার্ক করার জায়গা না পেয়ে সুলতান আবার সামনে চলে এসেছে। ভাঙাচোরা বিল্ডিং আর তুবড়োনো গাড়ির পাশে এসইউভি পার্ক করে সে দালানে উঠে এল। শক্তিরূপা বেঞ্চিতে বসে ছিলেন। সামান্য সরে গিয়ে সুলতানকে বললেন, ‘এখানে বসুন।’
সুলতান বসল না। দাঁড়িয়েই বলল, ‘না না! আমি ঠিক আছি। আপনি আরামসে বসুন।’
শক্তিরূপা সুলতানের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আমার মেয়ের মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনার নাম সুলতান। তাই তো?’
‘চশমা পরা দিদিমণি আপনার লড়কি আছে?’ রুমাল দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে বলে সুলতান, ‘যে ফরেন গেল?’
যন্ত্রণায় শক্তিরূপার মুখ-চোখ বেঁকে গেছে। তিনি কোনও রকমে বললেন, ‘হ্যাঁ।’
সুলতান বলল, ‘আমার দিদিভাই আর ওই ছেলেটা কোথায় গেল?’
শক্তিরূপা বিড়বিড় করে কী একটা প্রার্থনা করছিলেন। প্রার্থনা থামিয়ে বললেন, ‘ওরা ভিতরে।’ তারপর আবার প্রার্থনা শুরু করলেন।
সুলতান শুনতে গেল শক্তিরূপা বলছেন, ‘রেন রেন গো অ্যাওয়ে, কাম এগেন অ্যানাদার ডে। রেন রেন গো অ্যাওয়ে। কাম এগেন অ্যানাদার ডে।’ প্রার্থনা থামিয়ে সুলতানের দিকে তাকিয়ে শুকনো হেসে তিনি বললেন, ‘যখন আমার হাতে কিস্সু নেই তখন ভগবানকে ডেকে ভরসা পাচ্ছি। একটু ভরসা না থাকলে বাঁচি কী করে বলুন তো?’
সুলতান এতক্ষণে বেঞ্চির একপাশে বসল। আকাশের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল, ‘ওম্ মেঘা স্তম্ভয় স্তম্ভয় কুরু কুরু স্বাহা!’
শক্তিরূপা বলল, ‘এটা কী বললেন?’
‘বারিশ বন্ধ না হলে হমার দিদা এটা বলত। এটার মতলব জানি না। শুধু জানি যে বলতে হয়।’
শক্তিরূপা চোখ বন্ধ করে বলল, ‘রেন রেন গো অ্যাওয়ে, কাম এগেন অ্যানাদার ডে। রেন রেন গো অ্যাওয়ে। কাম এগেন অ্যানাদার ডে।’
সুলতান চোখ বন্ধ করে বলল, ‘লেবু পাতায় করমচা, হে বৃষ্টি ধরে যা।’
শক্তিরূপা অবাক হয়ে সুলতানের দিকে তাকালেন। সুলতান বলল, ‘এটা দিদিভাইয়ের কাছে শেখা। এটারও মতলব জানি না। শুধু জানি যে এটা বললে বারিশ বন্ধ হয়ে যায়।’
বেঞ্চিতে বসে দু’জনে মিলে নিজের প্রার্থনা শুরু করল। শক্তিরূপা বলছেন, ‘রেন রেন গো অ্যাওয়ে, কাম এগেন অ্যানাদার ডে।’ সুলতান বলছে, ‘ওম্ মেঘা স্তম্ভয় স্তম্ভয় কুরু কুরু স্বাহা! লেবু পাতায় করমচা, হে বৃষ্টি ধরে যা। ওম্ মেঘা স্তম্ভয় স্তম্ভয় কুরু কুরু স্বাহা! লেবু পাতায় করমচা, হে বৃষ্টি ধরে যা।’
.
দ্রুত হাতে সার্জিকাল গ্লাভস পরল অভি। ড্যানিয়েলের মাথায় জড়ানো ব্যান্ডেজ খুলতে শুরু করল। ব্যান্ডেজের গায়ে থোকা থোকা রক্ত জমাট বেঁধে রয়েছে।
অনভ্যস্ত হাতে ব্যান্ডেজ খুলে ফেলে অভি। মাথার ডানদিকে বড় চোট। এক খাবলা তুলো স্পিরিটে চুবিয়ে ক্ষতস্থানে চেপে ধরে সে। ড্যানিয়েল অজ্ঞান। তাঁর কোনও প্রতিক্রিয়া নেই।
রক্তমাখা তুলো ফেলে আর এক খাবলা তুলো নেয় অভি। জীবাণুনাশক তরলে চুবিয়ে ক্ষতস্থান আবার পরিষ্কার করে। এবার সেলাই দিতে হবে। মাথার চামড়ায় সূচ ফোটাল অভি। ড্যানিয়েলের ভুরু কুঁচকে গেল। ঠোঁট ফাঁক হয়ে আওয়াজ অস্ফুট বেরোল, ‘আঃ!’
অভি পাত্তা দিল না। আবার সূচ ফোটাল। বার করল। আবার ঢোকাল।
বাঁ হাত তুললেন ড্যানিয়েল। চোখ খুলে কিছু বলার চেষ্টা করছেন। কোনও রকম অ্যানাস্থেসিয়া ছাড়া সেলাই করা হচ্ছে। অসম্ভব যন্ত্রণা হচ্ছে। কিন্তু অভি নিরুপায়। দাঁতে দাঁত টিপে সে সেলাই করতে থাকে।
‘উফ্! মাগো!’ ঘড়ঘড়ে গলায় বললেন ড্যানিয়েল। তাঁর নাক দিয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত বেরচ্ছে।
হঠাৎ অভির মাথাটা হাল্কা হতে শুরু করে। অনেক বছর আগে, অ্যানাটমি পরীক্ষার সময়ে এই রকম হয়েছিল। চোখের সামনে লাল নীল বল ভাসছে। এবার ঝপাং করে একটা কালো পর্দা নেমে এসে অভিকে অজ্ঞান করে দেবে…
‘তুই সর!’ অভির হাত থেকে নিড্ল হোল্ডার আর নিড্ল কেড়ে নিয়ে বলে বৃন্দা। অভি টলোমলো পায়ে ড্যানিয়েলের পাশের ফাঁকা বেডে গিয়ে বসে। খুব ঘাম হচ্ছে, পায়ে শক্তি নেই। মুখের ভেতরে কে যেন বালি পুরে দিয়েছে। বেডে বসে বৃন্দাকে দেখে অভি।
অভ্যস্ত হাতে সেলাই করে চলেছে বৃন্দা। অভির মাথার টলোমলো ভাব কাটছে। ঘাম হওয়া বন্ধ হচ্ছে। কিন্তু এখনও পা ল্যাগব্যাগ করছে। সে শুনতে পেল ড্যানিয়েল বলছেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা। বিপদে আমি না করি যেন ভয়।’
প্যাঁটপ্যাঁট করে সূচ ফুটিয়ে বৃন্দা বলল, ‘লোকাল অ্যানাস্থেশিয়া দিইনি বলে নিজেই নিজেকে ভোকাল অ্যানাস্থেশিয়া দিচ্ছেন?’
‘হ্যাঁ মাননীয়া চিকিৎসক দিদি। উনিই আমার একমাত্র উপশম।’ চোখ বন্ধ অবস্থায় বললেন ড্যানিয়েল।
সেলাই শেষ করে বৃন্দা বলে, ‘আমাকে দিদি না বললেও চলবে। আমি বৃন্দা।’
‘বৃন্দা? মানে শল্য চিকিৎসক সমীরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা?’ একটা চোখ অর্ধেক খুলে জানতে চান ড্যানিয়েল।
‘আপনার অনুমান সঠিক।’ ক্ষতস্থানে ব্যান্ডেজ করে বৃন্দা জিজ্ঞাসা করে, ‘আপনার নাম?’
‘ড্যানিয়েল আর্চার।’
‘স্ত্রীর নাম?’
‘শক্তিরূপা সেনগুপ্ত।’
‘মেয়ের নাম?’
‘দময়ন্তী সেনগুপ্ত আর্চার।’
‘আজ কত তারিখ?’
‘তা তো মনে নেই। তোমার চলভাষ দাও। দেখে বলছি।’
হাসতে হাসতে বৃন্দা বলে, ‘এটা কি মোবাইল ফোনের বাংলা?’
‘হয়নি, না?’ যন্ত্রণার কারণে ভুরু কুঁচকে আছে। তাও লাজুক হাসেন ড্যানিয়েল।
বৃন্দা বলে, ‘চোট লাগার পরে আপনি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলেন। নাক দিয়ে রক্ত বেরোচ্ছে। আপনার হেড ইনজুরি হওয়ার চান্স খুব বেশি।’
‘মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে আমার জ্ঞান এত তাড়াতাড়ি ফিরত কি?’
বৃন্দা উত্তর না দিয়ে ড্যানিয়েলের হাত এবং পায়ের নানা পরীক্ষা করে অভিকে বলল, ‘কাকিমা বলছিলেন অনেকগুলো ফ্র্যাকচার আছে। কিন্তু এঁর তো ডান কনুই ছাড়া আর কোনও ফ্র্যাকচার নেই। রিব কেজে ফ্র্যাকচার থাকতে পারে।’
ড্যানিয়েল হঠাৎ ধড়মড়িয়ে বিছানায় উঠে বসলেন। চিৎকার করে বললেন, ‘শক্তিরূপা কোথায়? ওর কিছু হয়নি তো?’
‘উনি ঠিক আছেন। আপনি শুয়ে পড়ুন।’ অভি ধমক দেয় ড্যানিয়েলকে।
ড্যানিয়েলের মুখ হঠাৎ টকটকে লাল হয়ে যায়। রাগে ঠোঁটের কোনা বেঁকে গেছে। এক ধাক্কায় অভিকে সরিয়ে দিয়ে চিৎকার করে তিনি বললেন, ‘কোথায় শক্তিরূপা? তোমরা জবাব দাও!’
ড্যানিয়েলের চিৎকার মেল ওয়ার্ড ঝনঝন করে উঠল। সিস্টার ওয়ার্ডের এক কোণে বসে তিনজনকে দেখছিলেন। তিনি একলাফে বাইরে চলে গেলেন।
ড্যানিয়েলকে আটকে রাখা যাচ্ছে না। বিছানা থেকে উঠে অভিকে ধাক্কা মারেন তিনি। বিছানার ছত্রি ধরে হাঁক পাড়েন, ‘শক্তিরূপা-আ-আ! কোথায় তুমি?’
ড্যানিয়েলের চিৎকার শুনে ওয়ার্ডের দরজা দিয়ে উঁকি মারেন শক্তিরূপা। তিনি এখনও বাঁহাত দিয়ে ডান কাঁধ ধরে আছেন। সিস্টার তাঁকে টানতে টানতে ড্যানিয়েলের বেডের কাছে নিয়ে আসে। শক্তিরূপার পিছনে দেখা যাচ্ছে সুলতানের মুখ।
শক্তিরূপাকে দেখে ড্যানিয়েলের মেজাজ মুহূর্তের মধ্যে ঠান্ডা। বিছানায় বসে তিনি বলেন, ‘তোমার কোথায় লেগেছে?’
‘আমার কিছু হয়নি। তুমি ষাঁড়ের মতো চেঁচাচ্ছ কেন?’
‘তোমাকে দেখতে না পেয়ে আমি ভাবছিলাম যে…’
‘কী ভাবছিলে? আমি মরে গেছি?’
ড্যানিয়েলের চোখে জল। তিনি অভির দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করে বললেন, ‘আমাকে মাফ করে দিন। অন্যায় হয়ে গেছে। আপনার শরীরে হস্তক্ষেপ করে অন্যায় করেছি।’
‘ “শরীরে হস্তক্ষেপ” না বলে “গায়ে হাত তুলে” বললে ঠিক হত।’ বলেন শক্তিরূপা।
‘হয়নি, না?’ লাজুক মুখে বলেন ড্যানিয়েল। ‘আসলে তোমাকে না দেখলে আমার বাংলায় গন্ডগোল হয়ে যায়।’
‘ন্যাকা!’ মুখে হাসি আর চোখে জল নিয়ে বলেন শক্তিরূপা, ‘তোমার মাথায় চোট আছে। বেশি কথা বোলো না।’
দুই বয়স্ক প্রেমিকের কথার মাঝখানে বৃন্দা মূর্তিমান বেরসিকের মতো বলল, ‘অনেক কথা বলেছেন। এবার মুখ বন্ধ করে শুয়ে পড়ুন।’
বাধ্য ছেলের মতো শুয়ে পড়েন ড্যানিয়েল। তাঁর নাক দিয়ে এখনও রক্ত বেরোচ্ছে। বাঁ হাতের পিছন দিয়ে সেটা মুছে বলেন, ‘শক্তিরূপার কাঁধে কী হয়েছে?’
বৃন্দা বলল, ‘মনে হয় ডান কাঁধের হাড় সরে গেছে।’
‘তা হলে তুমি ঠিক করে দাও,’ আবার নাক মুছলেন ড্যানিয়েল, ‘বেচারি খুব কষ্ট পাচ্ছে।’
‘আপনি কাকিমাকে খুব ভালোবাসেন, তাই না?’ ফিসফিস করে বলে বৃন্দা।
ড্যানিয়েল বলে, ‘সেটা তো জানি না। তবে ওর কষ্ট হলে আমারও কষ্ট হয়।’
অভির দিকে আড়চোখে তাকিয়ে বৃন্দা মেল ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে গেল। ড্যানিয়েল চোখ বুঁজে কিছুক্ষণ কী যেন ভাবলেন। তারপর বললেন, ‘আমার ডান দিকের বক্ষ পিঞ্জরের চার, পাঁচ এবং ছ’নম্বর অস্থি ভেঙে গেছে।’
অভি অবাক হয়ে বলল, ‘ফ্র্যাকচার হয়েছে, এইটা না হয় যন্ত্রণার জন্য বুঝতে পারলেন। কিন্তু সেটা কত নম্বর রিবে হয়েছে সেটা কী করে বুঝলেন?’
‘আমি চিত্রশিল্পী। মানব শরীরের অঙ্গসংস্থান আমাদের জানতে হয়।’
ড্যানিয়েলের কথার মধ্যে অভি হাঁক পাড়ল, ‘সিস্টার! ও সিস্টার!’
অভির চিৎকার শুনে সিস্টার মেল ওয়ার্ডে ফেরত এসেছেন। একগাদা ইঞ্জেকশান পটাপট ড্যানিয়েলের হাতে ফুটিয়ে বললেন, ‘আর কিছু?’
অভি বলল, ‘ক্রেপ ব্যান্ডেজ লাগবে। হাত যাতে না নড়ে তার ব্যবস্থা করব।’
ড্যানিয়েল অভিকে বললেন, ‘লিওনার্ডো দা ভিঞ্চির আঁকা মানবশরীর দেখেছ? ত্বকের নীচের হাড়, মাংসপেশী, শিরা ধমনী, স্নায়ু—সব এঁকেছেন।’
‘আপনি বড্ড বকছেন। এর থেকে একটা জিনিস প্রমাণ হয়। আপনার মাথার ভিতরে চোট লাগেনি।’
ড্যানিয়েল বললেন, ‘আমি কম কথার মানুষ। মাথার ভিতরে যে কোনও চোট নেই সেটা বোঝাতে বকবক করছিলাম। এই কথাটা তুমি শক্তিরূপাকে গিয়ে বলো। ও খুব খুশি হবে।’
অভি সরু চোখে ড্যানিয়েলের দিকে তাকাল, ‘ভেরি স্মার্ট!’ তারপরে ডান হাতে ব্যান্ডেজ বাঁধা শুরু করল। ড্যানিয়েল বাঁ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে নাক মুছলেন। রক্তের ধারা এখনও বন্ধ হয়নি। বিছানায় শুয়ে পড়ার পরে ইঞ্জেকশানের প্রভাবে ড্যানিয়েল ঘুমিয়ে পড়লেন। ছেলেদের ওয়ার্ড থেকে বেরিয়ে মেয়েদের ওয়ার্ডে ঢুকে অভি দেখে বৃন্দা শক্তিরূপাকে নিয়ে ব্যস্ত।
তাঁর কাঁধের হাড় সরে গিয়েছে। ফিমেল ওয়ার্ডের বিছানায় তাঁকে শুইয়ে ঘুমের ইঞ্জেকশান দেওয়া হয়েছে। বৃন্দা তাঁর ডান হাত ধরে টানাটানি করতেই মিনিট দশেকের মধ্যে কাঁধের হাড় স্বাভাবিক জায়গায় চলে গেল।
ঘুমের ইনজেকশানের প্রভাবে শক্তিরূপা আচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে। সিস্টারকে তাঁর পাশে রেখে বৃন্দা বাচ্চাগুলোর কাছে যায়। অভিও চলে এসেছে। এখানে রয়েছে মাইকেল আর জুলি ধীবর। তিনটে বামন বাচ্চা প্লাস্টিকের ওপরে শুয়ে রয়ে পিচকিরির মতো পায়খানা করছে। ওদের মায়েরা মুছিয়ে দিচ্ছে। পরমুহূর্তে আবার যে কে সেই। বাচ্চাগুলোর হাতপা লিকপিকে। চোখ অক্ষিকোটরে ঢুকে গেছে। জিভ শিরিষ কাগজের মতো শুকনো। মায়েরা নুন-চিনি-লেবুর জল গুলে ঝিনুকে করে খাওয়াচ্ছে। বাচ্চাগুলো খেতে পারছে না। ঠোঁটের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে।
বৃন্দা একটা বাচ্চার কনুইয়ের ওপরটা চেপে ধরল। হাত এত সরু যে বৃন্দার তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের মধ্যে ধরে গেল। অভি একটা সরু সূচ নিয়ে বাচ্চাটার ভেন খুঁজছে। জলশূন্যতার কারণে কোনও ভেন দেখা যাচ্ছে না। অন্ধের মতো সূচ ফোটাল অভি। বৃন্দা সঙ্গে সঙ্গে স্যালাইনের পাউচের কল খুলে দিল।
মাইকেল আর জুলি হাততালি দিচ্ছে। অভি দেখল, ফোঁটা ফোঁটা স্যালাইন ঝরে পড়ছে। শিশুর শরীরে ঢুকছে মহামূল্যবান জল। বাচ্চাটি মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসছে।
কী সামান্য আয়োজন! অথচ তাতেই একটি জীবন বেঁচে যাচ্ছে। আজ যদি এখানে সে আর বৃন্দা না আসত, তা হলে এই বাচ্চাটি মারা যেত। কী আশ্চর্য এই সমাপতন!
অন্য তিনটে বাচ্চার হাতে ফ্লুইড চালিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি। হঠাৎ তার বিলুর কথা মনে পড়ে যায়। দাদা এইখানে রেগুলার মেডিকাল ক্যাম্প করতে আসত। দাদা স্বপ্ন দেখত দিন বদলের। দিন বদলাল না। মাঝখান থেকে দাদা এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিল।
আবার দীর্ঘশ্বাস ফেলে অভি। এই যে মানবজন্ম, এর মানে কী? এক শুক্রাণু আর এক ডিম্বাণুর হঠাৎ মোলাকাত, নিষেক, গর্ভাধান, ভ্রুণস্থাপন। এই সবই প্রতি মুহূর্তে, পৃথিবীর প্রতিটি প্রান্তে ঘটে চলেছে। দশ মাস গর্ভে থাকার পর শিশু পৃথিবীতে আসছে। মায়ের মুখ দেখছে, স্তন্যপান করছে, হামাগুড়ি দিচ্ছে, হাঁটছে, দৌড়চ্ছে। জন্মের সঙ্গে সঙ্গে তার যাত্রা শুরু হচ্ছে মৃত্যুর দিকে। মৃত্যুই একমাত্র ধ্রুব সত্য। তা জেনেও মানুষ হাসে, গান গায়, চাঁদে রকেট পাঠায়, ছবি আঁকে, পেনিসিলিন আবিষ্কার করে, কবিতা লেখে, যুদ্ধ করে।
একজন মানুষের গড় আয়ু কত? ষাট বছর? বড়জোর আশি! এই ক্ষুদ্র সময়কাল নিয়ে এত হামবড়া? এত শহর, এত গ্রাম, এত বাস-ট্রাম-প্লেন-ইয়াচ, এত নাচ-গান-হাসি-খেলা, এত সুখ-দুঃখ-প্রেম-ভালোবাসা?
বিগ ব্যাং থেকে জন্ম হয়েছিল এক সবুজ গ্রহের। সে কি আজকের কথা! দাউদাউ আগুনে জ্বলতে থাকা সেই গ্রহ একদিন ঠান্ডা হল। সম্ভাবনা তত্ত্বের বিচিত্র খেয়ালে, অথবা বিজ্ঞানের সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা মেনে জন্ম নিল প্রাণ! সিম্পল সেল থেকে কমপ্লেক্স সেল হতে সময় লাগল নয় বিলিয়ন বছর। তারপরে আস্তে আস্তে এল মাছ, উভচর, স্থলচর, পোকামাকড়, সরীসৃপ, স্তন্যপায়ী। এল পাখি, ফুল, প্রাইমেট, গ্রেট এপ। বিবর্তনের বিচিত্র লীলাখেলা চলল আরও কয়েক বিলিয়ন বছর ধরে। অবশেষে এল মানুষ। আজ থেকে মাত্র দু’লক্ষ বছর আগে।
অনন্ত মহাকাশের মধ্যে একটা নীল রঙের গ্রহ ক্রমাগত নিজের চারদিকে ঘুরছে। একই সঙ্গে ঘুরছে সূর্যের চারিদিকে। তাকে ঘিরে ঘুরছে এক উপগ্রহ। কী অসম্ভব, কী ইথারাল এই ব্যালান্স! মহাজাগতিক এই জাগ্লিং-এর মধ্যে অভির ভূমিকা কী? কনফিউজ্ড লাগে। খুব কনফিউজ্ড লাগে।
মাথা নীচু করে ওয়ার্ড থেকে বেরোয় অভি। ঘরের ভিতরে চলছে শিশুদের কান্না, বাবাদের গালগল্প, মায়েদের হাসিঠাট্টা। বাইরে প্রকৃতি কী রুদ্ররূপ দেখাচ্ছে, কে জানে!
হাসপাতালের বারান্দায় এসে অভি অবাক! বৃষ্টি থেমে গেছে! আকাশ এখনও মেঘাচ্ছন্ন। কিন্তু মেঘের কালো আস্তরণ চিরে পৃথিবীর বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ছে কমলা-রঙা রোদ। চড়া রোদের বার্তা খুব পরিষ্কার। দুর্যোগ, বৃষ্টি, মেঘলা আকাশ— তোমাদের সময় শেষ। এখন আমি এলাকার দখল নিলাম।
বাতাসের স্যাঁতসেঁতে ভাব আর নেই। ফুরফুরে, শুকনো হওয়া বইছে ক্যাশুরিনা গাছের ফাঁক দিয়ে। হাওয়াও পাঠাচ্ছে একই বার্তা। কালরাত্রি শেষ হয়েছে। এখন নতুন দিন।
শক্তিরূপা মোবাইলে স্যামি ব্যানার্জির সঙ্গে কথা বলছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে বৃন্দা। শক্তিরূপা বলছেন, ‘ড্যানিয়েল ভালো আছে বলেই মনে হচ্ছে। অ্যাজ পার অভি, ব্রেনে হেমারেজ হয়নি। কনুই আর রিব ভেঙেছে।’
বৃন্দা শক্তিরূপার হাত থেকে ফোন নিয়ে কানে দিল। ‘বাবা, কাকিমার শোলডার ডিসলোকেশান হয়েছিল। আমি ঠিক করে দিয়েছি। তুমি কলকাতা থেকে কতক্ষণ আগে রওনা দিয়েছ? কাকুর নাক দিয়ে ব্লিডিং বন্ধ হয়নি। হি নিড্স ইমিডিয়েট অ্যাডমিশন। এই নাও, সুলতান চাচুর সঙ্গে কথা বলো।’
ফোন কেড়ে নিয়ে সুলতান বলে, ‘এখন কোথায় স্যার? বিজয় মেমোরিয়াল গ্রাউন্ড পেরিয়ে গেছেন? ও! তা হলে তো আর মিনিট পাঁচেক।’ শক্তিরূপাকে মোবাইল ফেরত দেয় সে।
অভি দেখে জোয়াকিমরা হাসপাতালের প্রাঙ্গণে গোল হয়ে বসেছে। মাইকেল আর জুলি ধীবর অদ্ভুত সুরে গান করছে। গানের লাইনগুলো খুব মজার।
‘সাবি সাবি তু তো মোরঅ নালি পানঅ বিবি।
চিড়িয়া ইস্কা টিকা নয় গো, শুধু নালি পানঅ বিবি…’
জোয়াকিম জনগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, নিজস্ব গান। এখানে হেল্থ হাব হলে জোয়াকিমরা অরণ্যের গভীরে চলে যেত। চলে যেত প্রতিবেশী রাজ্যে। আপাতত বাঁজাপলাশে রয়ে গেল। কতদিন, কে জানে! ভূমিপুত্রদের পেরিয়ে সে সমুদ্রের কাছাকাছি চলে যায়।
সমুদ্রতটে চলে এসেছে বৃন্দাও। সারি সারি ক্যাশুরিনা গাছ। কেয়াগাছের ঝোপ। ফণিমনসার ঝাড়। সে সব পেরোলে ঝকঝকে বিচ। ছোট্ট, কিন্তু সুন্দর। এখন জোয়ারের সময়। নোনাজল খলবল করে উঠে আসছে। তিনভাগ জল যেখানে একভাগ স্থলের সঙ্গে ফক্কুড়ি করছে, সেইখানে দাঁড়িয়ে রয়েছে অভি। খালি পা। দুই হাত পেছনে। টুকটুক করে হেঁটে অভির পাশে গিয়ে চুপ করে দাঁড়ায় বৃন্দা।
ঘাড় ঘুরিয়ে অভি বৃন্দাকে দেখে। কোনও কথা বলে না।
দু’জনেই এখন চুপচাপ। শুধু সাগরতীরে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ। শুধু লোনা বাতাসের হুহু করে বয়ে যাওয়া।
অবশেষে বৃন্দা বলে, ‘সরি। আমার ভুল হয়েছিল। র্যাদার দিঠি আমাকে ভুল বুঝিয়েছিল যে…’
‘থাক।’ সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে অভি।
‘না। এটা তোর জানা উচিত। এ সব চন্দনের প্ল্যান। দিঠি বোকার মতো ওর কথা শুনেছিল। আমিও আর এক বোকা। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনে চিলের পেছনে দৌড় দিলাম।’
‘যা গেছে তা যাক।’
‘কী গেছে? চিল? না সম্পর্ক?’ অসহায়ের মতো প্রশ্ন করে বৃন্দা।
‘জাস্ট চিল বেবি!’ বৃন্দার দিকে তাকায় অভি। তার ঠোঁটের কোণে পাতলা হাসি।
‘ইস! কী বোকাবোকা লাগছে।! সিনেমাতে এইরকম গ্যাদগেদে সিকোয়েন্স থাকে।’ মুখে হাসি ফুটিয়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করতে করতে কেঁদে ফেলে বৃন্দা। ‘তাও আমি এই কথাটা বলব। হ্যাঁ রে অভি, আমরা আবার আগের জায়গায় ফেরত যেতে পারি না?’
অভি বৃন্দার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। লালচে, ফোলা-ফোলা গালে বড় বড় অশ্রুকণা। কমলালেবুর কোয়ার মতো ঠোঁটগুলো মুচড়ে রয়েছে। লোনা হাওয়ায় উড়তে থাকা বৃন্দার চুলে হাত বুলিয়ে অভি বলল, ‘আমরা কেউই আর আগের জায়গায় ফেরত যেতে পারি না। যে অভিকে তুই ছেড়ে চলে গিয়েছিলি, আর যে অভির কাছে তুই ফিরে আসতে চাইছিস—তারা আলাদা দুটো মানুষ। সেই ছেলেটা ছিল ইমপ্র্যাকটিকাল, লক্ষ্যহীন, কবি যশোপ্রার্থী, পড়াশুনোয় ফালতু এক মফস্সলি। আর এখন তোর সামনে যে দাঁড়িয়ে, হি ইজ ভেরি মাচ সিওর অ্যাবাউট হিমসেল্ফ। যথেষ্ট ভালো অ্যাকাডেমিক কেরিয়ার। সেটা আরও ভালো হবে। এমডি এবং ডিএম করার পরে ছেলেটা এ দেশে থাকবে না বিদেশে সেট্ল করবে—সেটা সময় বলবে। কিন্তু সে আর কবিতা লিখবে না। তার কাছে সময় ভীষণ মূল্যবান। সেই অভি আর এই আমির মধ্যে মিল শুধু চেহারায়। ভেতরটা একদম বদলে গেছে। এগুলো তুই ভেবে দেখেছিস?’
‘তুই আর পদ্য লিখবি না? কেন?’ হাহাকার করে ওঠে বৃন্দা।
‘এত কথার মধ্যে থেকে তুই ওই একটা অ্যাজেন্ডা পিক আপ করলি?’ হাসতে হাসতে বলে অভি, ‘অনেকদিন আগে থেকেই আমি কবিতা লেখা বা পড়া ছেড়ে দিয়েছি। ও সব বাদ দে। পিছন ফিরে দ্যাখ। তোর বাবা এসেছেন।’
ঘাড় ঘুরিয়ে বৃন্দা দেখল হেল্থ সেন্টারের সামনে শান্তিধামের নামাঙ্কিত অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে। অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামছে সুজাতা সিস্টার, অপু আর ফেলু। স্যামির নতুন এসইউভিও দাঁড়িয়ে। স্যামি গাড়ি থেকে নেমে শক্তিরূপার সঙ্গে কথা বলছেন। সুলতান আঙুল তুলে বৃন্দা আর অভির দিকে দেখাল। বৃন্দাকে দেখে স্যামি দূর থেকে হাত নাড়লেন। পালটা হাত নেড়ে বৃন্দা অভিকে বলল, ‘তুই যেমন বদলে গেছিস, আমিও তেমনি বদলে গেছি। বাবার সিরোসিস অব লিভার। ইএমআই দিতে না পারার জন্য বাড়ির ইলেকট্রিকের লাইন কেটে দিয়েছিল। ব্যাংক বলেছিল শান্তিধাম নিলামে তুলবে। বাবা মাতাল অবস্থায় সার্জারি করতে গিয়ে পেশেন্ট মেরে ফেলেছিল। শান্তিধামে গুন্ডা ঢুকেছিল। বাবার নামে এফআইআর। টাকা রোজগারের জন্য মাকে চিৎপুরের যাত্রার অফার নিয়ে ভাবতে হয়েছে।’
‘তাই?’ অভি অবাক, ‘জানতাম না তো!’
‘আমি সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্মেছি। এই নিয়ে আমার কোনও গিলটি ফিলিং নেই। কিন্তু এই সব ঘটনার পরে রিয়্যালিটি চেক হয়ে গেল। কলেজে ঢোকার সময়ে সখ করে বাসে-ট্রামে চাপতাম। পরের দিকে বাসে চড়তাম টাকা বাঁচাতে। আমিও আর আগের মতো নেই অভি। সময় আমাকেও বদলে দিয়েছে।’
বৃন্দার চোখে চোখ রেখে বলে অভি নীচু গলায় বলল,
‘তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।
যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।
যদি থাকি কাছাকাছি,
দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি—
তবু মনে রেখো…’
অভির হাত ধরে বৃন্দা বলল, ‘এ তো কবিতা! সুর বাদ দিলে নাছোড় প্রেমিকের আকুতি অনেক স্ট্রংলি ধরা পড়ে।’
অভি বলছে,
‘যদি জল আসে আঁখিপাতে,
এক দিন যদি খেলা থেমে যায় মধুরাতে,
তবু মনে রেখো।
এক দিন যদি বাধা পড়ে কাজে শারদ প্রাতে—মনে রেখো।
যদি পড়িয়া মনে
ছলোছলো জল নাই দেখা দেয় নয়নকোণে—
তবু মনে রেখো।’
বৃন্দা বলল, ‘এ তো আমার কথা!’
‘আমারও!’ ম্লান হাসে অভি, ‘আমার জীবনে এই একজন কবিই রয়ে গেলেন। এবার কলকাতা ফেরার পালা। হেল্থ সেন্টারের পরাবাস্তবতা থেকে ফিরে যেতে হবে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের ক্যাম্পাসে। কাল থেকে আবার ক্র্যাকপিজি নিয়ে পুরোনো রুটিনে ফেরত যেতে হবে। তাই না?’
ভেজা বেলাভূমি দিয়ে হাঁটছে অভি আর বৃন্দা। ওদের হাতে হাত। ওদের মুখে কোনও কথা নেই। ওরা জানে না, পুরোনো সম্পর্কের জায়গায় আবার ফিরে যেতে পারবে কি না। ওরা জানে না, নতুন করে সম্পর্ক তৈরি করা যায় কি না। জন্ম থেকে মৃত্যুর দিকে এই যে ক্রমাগত পথচলা, যার অন্য নাম জীবন, তার কোন বাঁকে কী ঘাত প্রতিঘাত অপেক্ষা করে আছে, ওরা জানে না। চলতে চলতে সেটা ওরা বুঝে নেবে। একা বুঝবে না একসঙ্গে বুঝবে, সে অন্য গল্প।
সমাপ্ত
