হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ১৮

১৮. বৃন্দা

‘ক্লিনিকাল হিসট্রি সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। যার মধ্যে নাম, পদবী, বয়স, ঠিকানা, ছেলে না মেয়ে, ড্রাগ হিস্ট্রি, ডিজিজ হিসট্রি—সব পড়ে। ইট অল হেল্পস টু গেট আ ডায়াগনসিস।’ছেলেদের মেডিকাল ওয়ার্ডে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেমেয়েদের বললেন মেডিসিন ওয়ার্ডের বিভাগীয় প্রধান বিবেকানন্দ দত্তরায় ওরফে বিডিআর।

আজ সেপ্টেম্বর মাসের তিন তারিখ। সেকেন্ড এমবিবিএস-এর সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষার রেজাল্ট বেরিয়েছে। সবাই পাশ করে গেছে। আজ থেকে তাদের ক্লিনিক্স শুরু হল। পাশাপাশি ফাইনাল এমবিবিএস পরীক্ষা হয়ে গেছে। রিপু, আপ্পু, টিনটিন, সুব্রত, বান্টি, লাটু—সব্বাই পাশ করে গেছে। ওরা এখন ইন্টার্ন হয়ে সাদা এপ্রন চাপিয়ে ওয়ার্ডে ঘোরাঘুরি করছে।

‘এই পেশেন্টের কোন কোন ফিচার চোখে পড়ছে। পেশেন্টের গায়ে হাত না দিয়ে বলো।’ রোগীর দিকে ইঙ্গিত করে বৃন্দাকে জিজ্ঞাসা করলেন বিডিআর। বৃন্দা আগেই দেখে রেখেছিল। সে থেমে থেমে কয়েকটা ডাক্তারি টার্ম বলল।

‘গুড। সোজা বাংলায় পায়ে জল জমেছে, পেটে জল জমেছে, অসম্ভব রোগা হয়ে গেছে, ভুল বকছে। আর কিছু?’

‘অ্যাবডোমেনে ভেনাস প্রমিনেন্স দেখা যাচ্ছে।’

‘পেটের চামড়ার ধমনীগুলো মোটা হয়ে ফুলে আছে। ডায়াগনসিস কী?’

‘হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি। মে বি, ডিউ টু অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজ।’ বিডিআরের প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরে বৃন্দা কোনও শ্লাঘা অনুভব করল না। কেন না, এইসব তথ্য সে বই পড়ে শেখেনি। এই মুহূর্তে তার বাড়িতেই অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজের একজন পেশেন্ট রয়েছেন। স্যামিকে গত সপ্তাহের আগের সপ্তাহে কেয়ার অ্যান্ড কিয়োর নার্সিং হোম থেকে বাড়ি আনা হয়েছে। স্যামির অনুপস্থিতিতে শান্তিধামের অপারেশনের টার্নওভার কমে গেছে।

বিডিআর অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজের রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। সবাই মন দিয়ে শুনছে এবং নোট নিচ্ছে। চন্দন আর বৃন্দা টুক করে ওয়ার্ড থেকে কেটে পড়ল। জীবনদার ক্যান্টিনের চায়ের জন্য মন কাঁদছে।

ক্যান্টিনে বসে একা একা চা খাচ্ছে দময়ন্তী। তাকে দেখে বৃন্দা বলল, ‘তোর সার্জারি ক্লিনিক চলছে না? পালিয়ে এলি যে বড়?’

‘সার্জারির এইচডিও এখন ছুটিতে।’ একগাল হেসে বলে দময়ন্তী। ‘ডিপার্টমেন্টের অন্য ভিজিটিং সার্জনরা পাত্তা দিল না। তাই পালালাম।’

‘সার্জারির এইচওডি পরের সোমবার জয়েন করছেন। তখন পালাবার পথ পাবি না। হি ইজ ওয়ার্কোহলিক। সিরিয়াস সার্জারি অ্যাডিক্ট।’

‘আমাদের বাবাগুলো এই রকম কেন বলতো?’ চন্দন স্বগতোক্তি করে। ‘আমার বাবা পলিটিক্‌স অ্যাডিক্ট, দময়ন্তীর বাবা পেইন্টিং অ্যাডিক্ট, বৃন্দার বাবা একই সঙ্গে ওয়ার্ক আর অ্যালকোহল অ্যাডিক্ট, অভির বাবা মেয়েছেলে অ্যাডিক্ট।’

‘শাটাপ চন্দন।’ বৃন্দা চন্দনের মাথায় চাঁটি কষায়। ‘আমার বাবা মোটেই অ্যালকোহলিক নন।’

‘ওরে রাগিস না। রাগলে তোর কান দিয়ে ধোঁয়া বেরোয়।’ বৃন্দার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয় দময়ন্তী। ‘বাই দ্য ওয়ে, চন্দ্রিমার কেসটায় আল্টিমেটলি কী হল রে?’

বৃন্দা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘কেন পুরোনো কথা টেনে আনছিস। পাস্ট ইজ পাস্ট।’

চন্দন বলল, ‘ঘটনার দিন সন্ধেবেলা আমি আর অধীরদা মিলে লেক থানায় গিয়ে বড়বাবুর সঙ্গে কথা বলে ব্যাপারটা ম্যানেজ করে এসেছিলাম।’

‘তাই?’ দময়ন্তী অবাক! ‘ভাবি শ্বশুরের জন্য জান লড়িয়ে দিয়েছিলি। যদ্দুর মনে পড়ছে পরের দিন আমাদের কোনও একটা পরীক্ষা ছিল।’

‘শ্বশুর-ফসুর বলিস না। মানুষের বিপদে হেল্প করাটা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। তোকে কখনও হেল্প করিনি? বুকে হাত দিয়ে সত্যি কথা বল!’

‘আমার বুকে আমিই হাত দেব? তাহলে তুই কী করবি? এই না বললি তুই খুব হেল্পফুল?’ নীচের ঠোঁট কামড়ে শীৎকারের অভিনয় করে দময়ন্তী।

জীবনদা চা দিয়ে গেছে। চুমুক দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘দময়ন্তী নিম্‌ফোম্যানিয়্যাক হলে আমার কোনও প্রবলেম নেই। কিন্তু চন্দন নেতাগিরি ফলালে এনাফ প্রবলেম হ্যাজ।’

‘আয়্যাম নট আ নিমফো। তোদের জন্য ইয়ার্কিও মারা যাবে না।’ মুখ ভেটকে বলে দময়ন্তী।

ঠান্ডা মাথায় চন্দনের দিকে তাকিয়ে বৃন্দা বলল, ‘বিশাল কপুর এবং ভিকিকে ঘাড় থেকে নামাতে চন্দন বা ওর অধীরদা কোনও কাজেই লাগেনি। ইট ওয়জ অ্যান আউট অব দ্য কোর্ট সেটলমেন্ট বিটুইন চন্দ্রিমাজ ফাদার অ্যান্ড মাই ফাদার। যদিও চন্দ্রিমার বাবার হয়ে ডিলটা করেছে বিশাল। ওই লোকটা বাবার কাছ থেকে পঁচিশ লাখ টাকা নিয়েছে। চন্দ্রিমার বাবা, অ্যাজ ফার অ্যাজ আই নো, সাত লাখ টাকা পেয়েছেন। তোর অধীরদা তিন লাখ। বাকি পনেরো লাখ টাকা বিশাল পকেটে ভরেছে।’

চন্দন বলল, ‘অধীরদা কাটমানি খেয়েছেন? ইম্পসিব্‌ল! বৃন্দা, তোর অ্যাপলিটিক্যাল স্ট্যান্ডটা সহ্য করা যায় কিন্তু অ্যান্টি-পলিটিকাল স্ট্যান্ডটা অসহ্য। দুটোর মধ্যে কোনও তফাত নেই, তবে মুখোশ হিসেবে প্রথমটা বেটার।’

বৃন্দা শ্রাগ করে চায়ে চুমুক দিল। চন্দন বলল, ‘ফরগেট অ্যাবাউট বৃন্দার বাবা। অভির বাবার কী ব্যাপার? উনি যেন কী একটা অ্যাডিক্ট?’

‘এই যাঃ! বন্ধুদের বাবা, নিয়ে বাজে কথা বলা ঠিক না।’ মুচকি হাসছে দময়ন্তী।

‘বল না বাবা! ন্যাকামি করিস না। বিলুদার সুইসাইডের দিন আমি যাইনি। তোরা বার্নিং ঘাটে গিয়ে কী একটা কেলেঙ্কারি বাঁধিয়ে এসেছিলি। প্লিজ বল।’ মিনতি করে বৃন্দা।

দময়ন্তী ফিচেল হেসে বলে, ‘আমি তোদের একবার রোম্যানো স্যান্টোসে খাইয়েছিলাম। মনে আছে?’

‘আছে।’ বলে চন্দন।

‘রমেন আর সন্তোষ রেস্তরাঁটার মালিক। রমেনের বোন ঋষিতা আমাদের বাড়ি গোলমহলের একতলায় ডিটিপির দোকান চালায়। মেয়েটা মাঝেমধ্যেই দুপুরবেলা তুমুল সেক্সি, রিভিলিং এবং অড পোশাক পরে অফিসে আসত।’

‘তো?’ ভুরু কুঁচকে বলে বৃন্দা। ‘সেক্সি পোশাক পরা কবে থেকে অপরাধ হল?’

‘আমি বলতে চাইছি যে, চোখে পড়ার মতো অড। মে মাসের দুপুরে ফুশিয়া কালারের লেহঙ্গা চোলি পরে ডালহৌসি স্কোয়ারে আপিস করতে গেলে যেমন অড লাগবে, সেই রকম অড। না হলে আমি আলাদা করে মেয়েটাকে মনে রাখব কেন? একতলায় আরও তো গাদাগাদা দোকান আছে। আমি জানিও না সেখানে কারা কাজ করে। এনিওয়ে, ওর কাছে কয়েক বার এক ভদ্রলোককে আসতে দেখেছি। কত লোককেই তো রোজ এখানে ওখানে দেখি। মনে থাকার কথা নয়। বাট, সাম হাউ অর আদার, মুখটা স্মৃতিতে রয়ে গিয়েছিল। ঋষিতার সঙ্গে দেখেছিলাম বলেই মনে ছিল। শ্মশানে দেখা মাত্র দেজাভু হল। মনে হল যে আগে কোথাও দেখেছি। প্লেস করতে পারছি না।’

‘দেজাভু যেন কীসের সিমটম?’ চন্দন প্রশ্ন করে বৃন্দাকে।

বৃন্দা বলে, ‘টেমপোরাল লোব এপিলেপ্‌সি। হ্যাঁরে দিঠি, তোর মৃগী নেই তো?’

‘নরমাল লোকেরও দেজাভু হয়।’ দময়ন্তী বলল।

‘বারবার হয়?’ সরু চোখে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বৃন্দা। ‘একবার ই-ই-জি করিয়ে নিলে পারিস!’

‘বলব না! যা!’ ঠোঁট ফুলোয় দময়ন্তী।

বৃন্দা হাসতে হাসতে বলে, ‘সরি সরি। আর বোর করব না। তুই বল।’

চা শেষ করে দময়ন্তী বলল, ‘অভির বাবাকে দেখে দেজাভু হল। আমি পটাং করে বললাম, ‘আপনিই অভির বাবা? আপনাকে তো অনেকবার আমাদের বাড়ির একতলায় দেখেছি।’ অভির বাবা অবাক হয়ে বললেন, ‘কোথায়?’ আমি বললাম, ‘ঋষিতার অফিসে। আপনি ওখানে নিয়মিত ডিটিপি করাতে যান।’’

‘অভির বাবা কী বললেন?’ কৌতূহলে বৃন্দার চোখ গোল হয়ে গেছে।

‘উনি ক্যাজুয়ালি বললেন, ‘দেখে থাকতে পারো। ওখান থেকে আমাদের নাটকের ম্যানাস্ক্রিপ্ট ডিটিপি করাই।’ কিন্তু আমি তখন অভিকে দেখছিলাম। ওর রিঅ্যাকশান দেখার মতো হল। চোখদুটো রসগোল্লা হয়ে গেল। পরে আলাদা করে ডেকে আমায় বলল, ‘ঋষিতার কেসটা কী রে?’ আমি ভ্যাড়ভ্যাড় করে সব বলে দিলাম। অভি দাঁত কিড়মিড় করে বলল, ‘শালা! শুয়োরের বাচ্চা!’’

‘বাবাকে শুয়োরের বাচ্চা বলল?’ চন্দন হাসতে হাসতে বলে, ‘আমাদের ওদিকে একটা গ্রাম্য গালাগাল আছে। রেগে গেলে মা-ঠাকুমারা বলেন, ‘শোরের লাতি’। মানে, শুয়োরের নাতি। খুব ভুল কিছু বলেন না।’

চন্দনের কথা শুনে বৃন্দা পেট চেপে হাসছে। ওদের থামাতে দময়ন্তী বলল ‘অর্ডার! অর্ডার! পিএনপিসি বন্ধ হোক।’

চন্দন হাসি থামিয়ে বলল, ‘সত্যি, এটা খুব চাপ হয়ে গেল। বাবাকে শুয়োরের বাচ্চা বলা!’

বৃন্দা বলল, ‘এর পরে মেডিসিনের থিয়োরি ক্লাস আছে? তোরা কেউ যাবি?’

দময়ন্তী বলল, ‘আমি যাব না বস। বাবা আর মা এত ব্যস্ত যে বাড়িটা অসম্ভব নোংরা হয়ে আছে। আজ সাফ করতেই হবে।’

‘তোর বাবা তো পেইন্টিং অ্যাডিক্ট। তিনি আবার কী নিয়ে ব্যস্ত?’ প্রশ্ন করে চন্দন।

‘পেইন্টিং নিয়ে, অবভিয়াসলি।’ টাটা করে দময়ন্তী ক্যান্টিন থেকে বেরিয়ে যায়। চায়ের দাম মিটিয়ে চন্দন বৃন্দাকে বলে, ‘আমি হোস্টেলে যাচ্ছি। আজই মেডিসিনের টেক্সট বই কিনলাম। একটু উল্টেপাল্টে দেখি।’

‘ঠিক হ্যায়। বাই।’ বৃন্দা ক্যান্টিন থেকে বেরোয়। বাড়ি ফিরতে হবে।

.

শান্তিধামের চারটে ইলেকট্রিক মিটার। প্রতি মাসে ইলেকট্রিক বিল ওঠে সত্তর থেকে আশি হাজার টাকা। স্যামি টাকা মেটাতে পারেননি বলে ইলেকট্রিক সাপ্লাই থেকে লোক এসে দুটো মিটারের লাইন কেটে দিয়ে গেছে। অন্য দুই মিটারের মাধ্যমে কাজ চলছে। ন্যূনতম আলোপাখা চালানো হচ্ছে। লিফ্‌ট চলছে না।

সিঁড়ি দিয়ে উঠতে উঠতে ফাঁকা ফ্লোর দেখে খারাপ লাগল বৃন্দার। একটা ঘটনা সব বদলে দিল। ক’দিন আগেও এই জায়গাগুলো পেশেন্টে গমগম করত। তাপসীর নেতৃত্বে একদল সিস্টার চব্বিশ ঘণ্টা কাজ করত। তাপসী ছাড়া সব সিস্টারকে তিন মাসের অগ্রিম বেতন দিয়ে ছুটি করে দেওয়া হয়েছে।

তিনতলার লবিতে বসে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রয়েছে কুনাল। বৃন্দা তার পাশে দাঁড়িয়ে বলল, ‘মন খারাপ?’

‘খুব খারাপ। আয় বোস।’ বৃন্দার হাত ধরে টেনে পাশে বসায় কুনাল, ‘চা খাবি?’

‘মন খারাপ কেন? বাবার জন্য? না শান্তিধামের জন্য?’ কুনালকে প্রশ্নটা করে বৃন্দা। খেয়াল করে তাপসী ট্রেতে দু’কাপ চা নিয়ে আসছে। তাপসীর হাত থেকে ট্রে নিয়ে কুনাল বলল, ‘আর একটা কাপ নিয়ে এসো। বৃন্দাও চা খাবে।’ তাপসী কাপ আনতে গেল।

‘কেন মন খারাপ বললে না তো!’ আবার বলে বৃন্দা।

‘জীবনে কিছুই হল না, বুঝলি!’ আত্মসমালোচনার ভঙ্গিতে বলে কুনাল, ‘পোস্ট গ্র্যাজুয়েশান করতে পারলাম না, বিদেশ যেতে পারলাম না, সরকারি চাকরি পেলাম না, প্র্যাকটিস জমাতে পারলাম না। এই রকম ডাক্তার হয়ে কী লাভ বল তো?’

‘আমি জানি না! তবে হ্যাপিনেস ইজ আ স্টেট অব মাইন্ড। সেটা বাইরের অর্নামেন্ট দিয়ে হয় না। কথায় আছে, আপ ভালা তো জগত ভালা।’

‘জগৎই তো ভালো থাকতে দিচ্ছে না রে! রোজ ফোনে বউ ধাতায়, ‘এখনও গাড়ি কিনতে পারলে না। ছেলে বাসে করে স্কুল যাচ্ছে। লজ্জায় আমার মাথা কাটা যায়।’ কিংবা, ‘তোমার বেড়ানো মানে সেই দিঘা-পুরী-দার্জিলিং। এদিকে তোমার বন্ধুরা থাইল্যান্ড, ব্যাংকক, হংকং ঘুরে এল।’ প্রতিদিন এই ভারবাল অ্যাবিউজ আমি আর নিতে পারছি না।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে কুনাল বলে, ‘আচ্ছা তুই বল তো, প্রতিটি মানুষ যদি সফল হবে, এক নম্বর হবে, তা হলে সেকেন্ড, থার্ড, ফোর্থ কারা হবে? লাস্ট কারা হবে? অসম্ভব সফল, ঝকঝকে চিকিৎসকে দেশ ভরে গেলে আম জনতার নিশ্চয়ই খুব উপকার হয়, কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। হেরো না থাকলে হিরোদের ঝকমকানি বোঝা যায় না।’

‘অনেক জ্ঞান দিয়েছ। এবার চা খাও।’ টেবিলে কাপ রেখে দু’কাপ চা তিনটে কাপে সমান মাপে ঢেলে তাপসী বলল, ‘গিন্নি এত গঞ্জনা দেয়, তাহলে বাড়ি যাও কেন?’

‘ওমা! বউবাচ্চার কাছে যাব না? দিনরাত শান্তিধামে পড়ে থাকব?’

‘আমিও তো এখানেই থাকি। আমাকে কি প্রতি হপ্তায় বাড়ি যেতে দেখেছ?’ নরম সুরে বলে তাপসী।

বৃন্দা চকিতে তাপসীকে দেখে নেয়। পঞ্চাশের আশেপাশে বয়স। মুখে বলিরেখা পড়তে শুরু করেছে। সূর্যাস্তের আলোয় ঝিলমিল করছে রগের রুপোলি চুল। কম বয়সে বিধবা তাপসীর ভিতরে কোথাও কি কুনালের জন্য দুর্বলতা আছে? কুনাল কি সেটা জানে?

‘কোনও একজন মানুষ আমার কথা ভাবছে, আমার জন্য অপেক্ষা করে আছে— এই বোধটা বেঁচে থাকার জন্য ভীষণ জরুরি। যার কেউ নেই, তার কাছে মরাবাঁচা সমান।’ দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলে কুনাল।

‘আমি তাহলে কেন বেঁচে আছি?’ চোখের কোণে ঝিলমিলে হাসি ফুটিয়ে বলে তাপসী।

বিলুর মৃত্যুকে এক পাশে আর তাপসী-কুনালের গোপন প্রেমকে অন্য পাশে রেখে জীবন নামের পাজ্‌লের সমাধান খোঁজার চেষ্টা করে বৃন্দা। পারে না। দাঁড়িপাল্লার এক পাশে অভি আর অন্য পাশে চন্দনকে রেখে বোঝার চেষ্টা করে, ভালোবাসা মানে কী? সেটাও পারে না।

চা অনেকক্ষণ শেষ হয়ে গেছে। তাপসী আর কুনাল চেয়ারে বসে লোকের জলের দিকে তাকিয়ে। একটু আগেও শেষ সূর্যের আলো পড়ে একটা দুটো ঢেউ ঝিলমিল করছিল। এখন সেখানে চাপচাপ অন্ধকার। অন্ধকার শান্তিধামের থার্ড ফ্লোর জুড়ে। সেই অন্ধকারের মধ্যে এক অসুখী বিবাহিত প্রৌঢ় চিকিৎসক আর এক অসুখী, কম বয়সে বিধবা সেবিকাকে রেখে বৃন্দা চারতলায় আসে।

মন্দিরা টিভিতে সিনেমা দেখছেন। সত্যজিৎ রায়ের চারুলতা। ফিক করে হাসল বৃন্দা। মায়ের নাম লোনলি ওয়াইফ সে অকারণে দেয়নি। মন্দিরার পাশে বসে বৃন্দা চেঁচাল ‘উওম্যান ফ্রাইডে, এক কাপ কফি!’

মন্দিরা বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘ও আবার কী সম্বোধন। তুমি কি রবিনসন ক্রুসো না কি?’

মন্দিরার ধমকে পাত্তা না দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘এই সিনেমাটা তুমি আজ পর্যন্ত কতবার দেখেছ?’

‘জানি না। ডিভিডিতে সুযোগ পেলেই দেখি। আজ টিভিতে দেখছি।’

ঝুনুর মা কফি নিয়ে এসেছে। মন্দিরার হাতে এক কাপ ধরিয়ে অন্য কাপে চুমুক দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘এক্ষুনি চা খেলাম। আবার কফি। আমার এবার অ্যাসিডিটি ডেভেলপ করবে।’

‘কলেজেও তো খাস! ক’কাপ হয়?

‘কলেজে কাপ না। ভাঁড়। অনেক ভাঁড় হয়ে যায়। বাই দ্য ওয়ে, তোমাকে আজ অন্যরকম লাগছে। সামথিং ইজ গ্লোয়িং উইদিন ইউ। কী ব্যাপার গো মা?’

লজ্জা পেয়ে মন্দিরা বলল, ‘কিছু না। এমনিই।’

‘ওম্‌মা! তুমি ব্লাশ করছ! হাউ চুইট! নিশ্চয়ই কিছু একটা হয়েছে। বলো বলো, প্লিজ বলো…’ মাকে জাপটে ধরে আদর করে বৃন্দা। আদরের মধ্যে হঠাৎই বেদম জোরে কলিং বেল বেজে ওঠে।

‘কে রে বাবা!’ ভয় পেয়ে মন্দিরাকে ছেড়ে দেয় বৃন্দা। ‘নার্সিং হোমে আবার গোলমাল নাকি? বাবা কেমন আছে?’

‘ভালো। ও ঘরে শুয়ে আছে। তুই বাবার কাছে যা।’

‘কলিং বেল কে বাজাল দেখব না?’ মন্দিরার কথায় বিস্মিত বৃন্দা। সমানে কলিং বেল বেজে যাচ্ছে অথচ মায়ের কোন টেনশান নেই। অদ্ভুত ব্যাপার তো! আর একটা বিষয়ও বৃন্দা খেয়াল করল। মন্দিরা মেকআপ করে আছেন। খুব বেশি নয়। কিন্তু চোখে পড়ার মতো। একটু ফাউন্ডেশান, অল্প লিপস্টিক, সামান্য কাজল। শাড়িটাও কায়দা করে পরা। কী ব্যাপার রে বাবা!

ঝুনুর মা দরজা খুলে দিয়েছে। হইহই করতে করতে ঢুকছেন থ্রি মাস্কেটিয়ার্স! ঔপন্যাসিক বিপিন, কবি সুদিন এবং চিত্র পরিচালক মনোতোষ। মনোতোষের হাতে রসগোল্লার হাঁড়ি। চিৎকার করে তিনি বললেন, ‘কনগ্র্যাচুলেশ্‌নস মন্দিরা!’

‘থ্যাংক ইউ!’ সলজ্জ হেসে মন্দিরা বললেন।

বৃন্দা অবাক হয়ে বলল, ‘কীসের সেলিব্রেশন হচ্ছে?’

‘ওরে খুকি, তোর মা বিধবাপুকুরের জন্য বেস্ট অ্যাকট্রেসের ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন। মাইন্ড ইট, বাংলা ছবির অভিনেত্রী হিসেবে নন, ভারতীয় ছবির সেরা অভিনেত্রী হিসেবে। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেবেন।’ বৃন্দার থুতনি নেড়ে দেন বিপিন।

‘তার সঙ্গে এটাও বল, যে বিধবাপুকুর সেরা ভারতীয় ছবি হিসেবে সম্মানিত হয়েছে।’ গর্বের সঙ্গে বলেন মনোতোষ। ‘আমিও রাষ্ট্রপতির হাত থেকে স্বর্ণকমল নেব।’

‘আজ সকাল কাগজ থেকে তোমার ছবি তুলতে চিত্র সাংবাদিক এসেছেন। আয় পার্থ।’ কমবয়সি, দাড়িওয়ালা এক ছোকরাকে ডেকে নেন সুদিন। পার্থ ঘরে ঢুকেই কারও পারমিশানের তোয়াক্কা না করে ফটাফট সুইচ টিপে ঘরের সব আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।

মন্দিরা লাজুক গলায় বললেন, ‘টেলিফোনে ইন্টারভিউ দিয়ে দিয়ে আমি টায়ার্ড। কাল সকালে অনেকগুলো টিভি চ্যানেল থেকে লোক আসবে। আজ রাতে স্কুপ চ্যানেলের দশটার স্লটে একটা টক শোও আছে।’

‘ওটাতে আমিও যাব। এসো, আমাদের ইন্টারভিউটা দিয়ে নিই।’ মন্দিরার একপাশে বসে মনোতোষ। অন্য পাশে বিপিনকে বসান।

মন্দিরা বলেন, ‘ইন্টারভিউ? কে নেবে? পার্থ?’

‘আমি আছি কী করতে? খোদ মালিকের হুকুম, আমাকে ইন্টারভিউ নিতে হবে। এবং এই ইন্টারভিউটার একটা অ্যাঙ্গেল হল, শান্তিধামে থ্রি মাস্কেটিয়ার্সের আড্ডা। যেখান থেকে এই ছবির আইডিয়া মেটিরিয়ালাইজ করেছিল।’ টেবিল চাপড়ে বলেন সুদিন, ‘পার্থ, তুই তোর মতো ছবি তোল। আমি প্রশ্ন করছি। মন্দিরা, প্রথমেই বোকা বোকা প্রশ্নটা করে ফেলি। ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড পেয়ে কেমন লাগছে? এতদিন লাইমলাইটের বাইরে থেকে আবার ফিরে আসা, এবং ঝপাং করে এক নম্বর চেয়ারটা দখল করা— কেমন লাগছে?’

মন্দিরা বললেন, ‘এক নম্বর ট্যাগে আমার আপত্তি আছে। এগুলো প্রযোজ্য হয় কমার্শিয়াল ছবির হিরো-হিরোইনদের ক্ষেত্রে। আমার নায়িকা হওয়ার বয়স নেই। মেনস্ট্রিম কমার্শিয়াল ছবি করার বাসনা থাকলেও উপায় নেই। কাজেই প্রশ্নের ওই অংশের উত্তর দেব না। বরং বলি, সেরা অভিনেত্রীর স্বীকৃতি পেয়ে আমি খুশি। রেকগনিশন পেতে কার না ভালো লাগে?’

‘সেরা অভিনয়ের জন্য জাতীয় পুরস্কারে সম্মানিত হওয়া অভিনেত্রীকে এক নম্বর বলা যাবে না? বেশ, তোমার কথা মেনে নিলাম। তুমি বরং বলো, এই চরিত্রে অভিনয়ের জন্য কী রকম প্রিপারেশান নিয়েছিলে? মেথড অ্যাক্টিং? না সেটে মনোতোষ যা বলেছিল, তা অন্ধের মতো ফলো করেছিলে?’

‘শক্ত প্রশ্ন! বিপিনের উপন্যাসটা আমার আগেই পড়া ছিল। পড়তে পড়তে বেদানা দাসীর রোলে নিজেকে দেখতে পাচ্ছিলাম। উপন্যাসে বাহ্যিক ঘটনা কম ঘটেছে। বেদানার আভ্যন্তরীন জার্নিটাই মূল উপজীব্য। ওই জার্নির সঙ্গে নিজেকে আইডেন্টিফাই করতে পারছিলাম।’

‘এখানে আমি একটা কথা বলি।’ মন্দিরাকে থামিয়ে মনোতোষ বলেন, ‘উপন্যাসটা পড়তে পড়তে প্রট্যাগনিস্টের চরিত্রে আমি মন্দিরাকে দেখতে পেয়েছিলাম। তোদের নিশ্চয় মনে আছে, এক সন্ধেবেলার আড্ডায় আমি স্যামিকে বলি যে, তোর বউ রাজি থাকলে তবেই আমি ছবিটা করব।’

‘মনে আছে। সব মনে আছে।’ প্রশ্নকর্তার ভূমিকা ভুলে সুদিন চেঁচিয়ে ওঠেন।

ইন্টারভিউ জমে উঠেছে। পার্থ একের পর এক ছবি তুলে যাচ্ছে। সাংবাদিকের ভূমিকায় চমৎকার মানিয়েছে সুদিনকে। মন্দিরা, মনোতোষ এবং বিপিন তর্ক করছেন, কথার চিমটি কাটছেন, মিথ্যে ঝগড়া করছেন। কিছুক্ষণ এইসব দেখে বৃন্দা চুপচাপ বসার ঘর থেকে সরে এসে মাস্টার বেডরুমে ঢুকল।

বিছানায় শুয়ে রয়েছেন স্যামি। চেহারা শুকিয়ে গেছে। হাতগুলো কাঠি কাঠি। পেটে জল জমেছে। জল জমেছে পায়ে। চোখের মণি হলুদ। পেটের চামড়া ফেটে মোটা ধমনী দেখা যাচ্ছে। অ্যালকোহলিক লিভার ডিজিজের রোগী হয়ে বিছানায় শুয়ে রয়েছেন ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের সার্জারির হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট, শান্তিধামের প্রাণপুরুষ, কলকাতার এক নম্বর সার্জন—স্যামি ব্যানার্জি। মুখে মদের গন্ধ।

স্যামির পাশে বসে বৃন্দা বলল, ‘তুমি আজও কনজিউম করেছ। আমি জিজ্ঞাসা করব না, কে তোমাকে অ্যালকোহল সাপ্লাই দিচ্ছে। আমি শুধু বলব, তোমার মদ খাওয়ার তিন পার্টনার এই মুহূর্তে এক ফোঁটা মদ খেয়ে নেই। ওঁরা কাজের সময় কাজ করেন। আনন্দর সময় আনন্দ। তুমি কাজ আর আনন্দকে গুলিয়ে ফেলেছ। তোমার কাছে আনন্দ মানেই মদ। আর মদ খেয়ো না বাবা।’

‘আমি আর মদ খাই না রে।’ শ্বাস টানতে টানতে বলেন স্যামি। ‘এখন মদ আমাকে খায়। আমি এই চক্কর থেকে আর বেরোতে পারবো না। হেপাটিক এনসেফালোপ্যাথি নিয়ে, খ্যাংরা কাঠির মাথায় আলুর দম মার্কা চেহারা নিয়ে, দিনে ঘুমিয়ে আর রাতে জেগে থেকে, ভুল বকতে বকতে একদিন মরে যাব। আমি উইল করে রেখেছি। আমার অবর্তমানে শান্তিধামের মালিক হবি তুই আর মন্দিরা। এ আমার প্রাণের থেকেও প্রিয় রে।’

বৃন্দা কাঁদতে কাঁদতে বলল, ‘তুমি ভালো হয়ে যাবে। রেস্ট নাও। আমি তোমার কাউন্সেলিং করাব। তুমি ঠিক হয়ে যাবে।’

স্যামি ঘুমিয়ে পড়েছেন। বৃন্দার কান্না তিনি শুনতে পাচ্ছেন না। বৃন্দা শুনতে পেল, ইন্টারভিউয়ের শেষে স্কুপ চ্যানেলের টক শোয়ের জন্য মন্দিরা বেরোচ্ছেন। সঙ্গে ফটোগ্রাফার পার্থ এবং থ্রি মাস্কেটিয়ার্স।

আয়নার দিকে তাকিয়ে বৃন্দা নিজের প্রতিবিম্বকে বলে, ‘বাবাকে আমি ভালো করবই! এ আমার চ্যালেঞ্জ!’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *