১৪. বৃন্দা
সেকেন্ড এমবিবিএস-এর ফার্মাকোলজি থিয়োরি পরীক্ষার প্রশ্ন দেখে মাথা খারাপ হয়ে গেল বৃন্দার। প্রশ্ন শক্ত নয়, কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর লেখা মানে আস্ত চ্যাপ্টার লেখা। ডক্টর মুখার্জি পাগল হয়ে গেলেন নাকি? না হলে দু’ঘণ্টার পরীক্ষায় টেক্সট বুকের এক তৃতীয়াংশ ওগরাতে বলেন? ঘামতে ঘামতে পাশে তাকাল বৃন্দা। তার এক দিকে সুরজের সিট পড়েছে। অন্য দিকে সবুজের। সুরজ গালাগালি দিয়ে বলল, ‘আনসার কমপ্লিট করা যাবে না।’
সবুজ বলল, ‘দিস এক্সামিনেশান নিড্স লট্স অব এডিটিং।’
‘ঠিক, ’ সবুজকে সমর্থন করল বৃন্দা। দু’ঘণ্টায় চল্লিশ নম্বরের উত্তর লিখতে হবে। তার মানে ঘণ্টা পিছু কুড়ি নম্বর। টার্গেট বেঁধে লিখতে শুরু করে বৃন্দা। সে সব প্রশ্নের উত্তর জানে। কতটুকু লিখবে আর কতটুকু বাদ দেবে, এইটা ইম্পর্ট্যান্ট।
একটা লং কোশ্চেন শেষ করে ঘড়ি দেখল। দশ নম্বর হল। তারপর লিখল তিন নম্বরের আটটা শর্ট নোট। আরও চব্বিশ নম্বর। মোট চৌত্রিশ নম্বরের উত্তর লেখা শেষ হল দু’ঘণ্টা শেষ হওয়ার পাঁচ মিনিট আগে। বাকি রয়েছে ব্লাড প্রেশার কমানোর ওষুধ নিয়ে চার নম্বরের প্রশ্ন।
ড্রাগের শ্রেণিবিভাগ, প্রতি বিভাগে ওষুধের নাম, তার কার্যপ্রণালী—এই তিনটে শিরোনাম লিখতে না লিখতেই ঘণ্টা পড়ল। ডক্টর মুখার্জি চিৎকার জুড়লেন, ‘খাতায় যেন আর কলম না ঠেকে। আমি খাতা নিয়ে নিচ্ছি। টানাটানিতে ছিঁড়ে গেলে তোমাদের দোষ। খুব সাবধান!’ স্যারের চিৎকারে পাত্তা না দিয়ে বৃন্দা লিখতে লাগল। কিছুক্ষণ পরেই খাতায় টান, ‘দাও।’
খাতা ছেড়ে বৃন্দা বলল, ‘রিভিসন হল না। উত্তর কমপ্লিট হল না। একটু দেখবেন স্যার।’
‘উত্তর কারওরই কমপ্লিট হবে না। নো বিগ ডিল। আমি কাউকে ফেল করাই না। চিন্তা কোরো না।’ সুরজ আর সবুজের খাতা নিয়ে বলেন ডক্টর মুখার্জি।
‘থ্যাঙ্কু স্যার!’ ডক্টর মুখার্জিকে লম্বা ধন্যবাদ জানিয়ে লাফাতে লাফাতে পরীক্ষার হল থেকে বার হল বৃন্দা। তাদের থিয়োরি পরীক্ষা শুরু হয়েছে আঠেরোই জুন, প্যাথলজি দিয়ে। একদিন গ্যাপ দিয়ে, আজ, বিশে জুন, বুধবার ছিল ফার্মাকোলজি। কাল ছুটি। তারপরে বাকি পরীক্ষা আছে।
পরীক্ষা হল থেকে বেরোতে না বেরোতে চন্দনের সঙ্গে দেখা। বৃন্দা জিজ্ঞাসা করল, ‘কেমন হল?’
‘লেনদি কোয়েশ্চেন। একটা শর্ট নোট বাদ গেল। ব্যাড টাইম ম্যানেজমেন্ট।’
‘হায়েস্ট মার্ক হবে?’
‘না।’ সিগারেট ধরিয়ে বলে চন্দন।
‘তোর সবেতে ফার্স্ট হতে ইচ্ছে করে?’ চন্দনকে বাজিয়ে দেখে বৃন্দা।
‘হ্যাঁ।’ গলগল করে ধোঁয়া ছেড়ে চন্দন বলে, ‘সেকেন্ড হওয়া আমার ধাতে নেই। তা হলে নিজেকে ইনফিরিয়ার লাগে।’
‘যদি কখনও ফার্স্ট না হতে পারিস?’
‘ফার্স্ট এমবিবিস-এর একটা সাবজেক্টে হতে পারিনি। এবার দেখা যাক।’
বৃন্দার মনে পড়ে অন্য এক অ্যাচিভারের কথা। যে জীবনে কখনও সেকেন্ড হয়নি। স্যামি মুখার্জি। সেই কনট্রোল ফ্রিকের হাত থেকে পালাতেই তো সে ছুটে গেছে অভি অথবা চন্দনের কাছে। কিন্তু দেখা গেল, অভি ফার্স্ট হতে চায় কিন্তু পারে না। আর চন্দন ক্রমাগত ফার্স্ট হয়। সব ছেলেই কি এইরকম?
চন্দন জিজ্ঞাসা করল, ‘কী ভাবছিস? পরীক্ষা কেমন হল?’
মাথা থেকে চিন্তা সরিয়ে বৃন্দা বলল, ‘খারাপ না।’
বৃন্দার পাশে চলে এসেছে দময়ন্তী। সে বলল, ‘প্লিজ। হোস্টেলে চ। পরশু মাইক্রোবায়োলজির থিয়োরি পরীক্ষা। ব্যাক্টেরিয়া আর ভাইরাসের নাম রিভাইস করতে গিয়ে বাবার নাম ভুলে যাব।’
চন্দন পুরোনো সিগারেট থেকে আর একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, ‘রাত্তিরে ফোন করব। মোবাইল অন রাখিস।’ তারপর হনহন করে বয়েজ হোস্টেলের দিকে চলে গেল।
যাত্রাপথের দিকে তাকিয়ে বৃন্দা বলল, ‘দময়ন্তী, আজকের জন্য আমায় ছেড়ে দে। মায়ের জ্বর এসেছে। বাড়ি যেতেই হবে।’
‘মায়ের জ্বর তো তোর কী? বাড়িতেই তো নার্সিং হোম।’ অবাক হয়ে বলে দময়ন্তী।
‘অথবা নার্সিং হোমটাই বাড়ি।’ পাশ থেকে মন্তব্য করে জেম্সি। সে-ও পরীক্ষা শেষে এদের সঙ্গে ভিড়েছে।
‘গত এক সপ্তাহ বাড়ি যাইনি। মা একবার দেখতে চাইছে।’ লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলে বৃন্দা। ‘কাল সকাল আটটার মধ্যে হোস্টেলে ঢুকে যাব।’
হাঁটতে হাঁটতে তিনজনে লেডিজ হোস্টেলের সামনে চলে এসেছে। সুলতান সুইফ্ট ডিজায়ারের চালকের আসনে বসে বৃন্দাকে দেখে ঘাড় নাড়ল। দময়ন্তী বলল, ‘আমি একা একা তেরো নম্বরে থাকতে পারব না। আমিও বাড়ি চললাম। পিক আপ অ্যান্ড ড্রপের দায়িত্ব তোর। চল, রুম থেকে মাইক্রোবায়োলজি বইটা নিয়ে আসি। বাড়ি গিয়ে ওটাই পড়ব। কাল সকাল সকাল চলে আসবি কিন্তু।’ বকবক করতে করতে তিন বান্ধবী হোস্টেলে ঢুকে যায়।
.
মন্দিরা খাটে শুয়ে রয়েছেন। গায়ে চাদর, হাতে বঙ্কিম রচনাবলী। চোখ দুটো ছলছল করছে। ঘুরে ঢুকে বৃন্দা বলল, ‘এই গরমে এসি না চালিয়ে শুয়ে আছ?’
‘ঠান্ডা লেগেই তো জ্বরটা হল।’ দুর্বল গলায় জবাব দিলেন মন্দিরা। ঘরের দরজা জানলা টপাটপ বন্ধ করে, এসির তাপমাত্রা ছাব্বিশ ডিগ্রিতে সেট করে বৃন্দা বলে, ‘এত গরমে থেকো না। কী ওষুধ খাচ্ছো?’
‘কুনাল বলল ভাইরাল ফিভার হয়েছে। ওষুধ দিয়ে গেছে।’ সাইড টেবিল দেখালেন মন্দিরা।
বৃন্দা বলল, ‘আমি তোমার কাছে ঘেঁষছি না। ভাইরাল ফিভার ভীষণ ছোঁয়াচে। তখন পরীক্ষার বারোটা বেজে যাবে।’
‘তুই এই ঘর থেকে যা।’ হাত নাড়েন মন্দিরা। ‘কুনাল বলে গেল, ওষুধ না খেলে ভাইরাল ফিভার সাত দিনে সারে। আর ওষুধ খেলে এক সপ্তাহে।’
‘ঠিকই বলেছে। এটা সেল্ফ লিমিটিং ডিজিজ। এনিওয়ে, বাবা কোথায়?’ প্রশ্ন করে বৃন্দা।
‘চন্দ্রিমা সেন আবার ভরতি হয়েছে। ওঁর ওটি আছে।’ ঠান্ডা গলায় বলেন মন্দিরা।
‘চন্দ্রিমা? মানে বিশাল কপুরের কেপ্ট?’
‘আহঃ! বৃন্দা!’
‘ওহ! সরি সরি! কেপ্ট নয়। দ্বিতীয় বউ। যদিও হিন্দু ম্যারেজ অ্যাক্ট অনুযায়ী দ্বিতীয় বিবাহ আইনসিদ্ধ নয়।’
‘তোকে আইন কপচাতে হবে না। চন্দ্রিমার কী ওটি আছে জিজ্ঞাসা করলি না তো?’
‘বাবা গাইনিকলজিস্ট হলে জিজ্ঞাসা করতাম না। বুঝতাম অ্যাবর্শান করাতে এসেছে। কিন্তু সার্জন হওয়ায় কেসটা ঘেঁটে গেল। কী অপারেশন গো? বছর দুয়েক আগে তো অ্যাপেনডিক্স অপারেশান করিয়ে গেল। আবার কোথায় কী হয়েছে? ভ্যাজাইনোপ্লাস্টি করবে নাকি?’
‘কলেজে ঢুকে তোর খুব বাড় বেড়েছে!’ চোখ পাকায় মন্দিরা। ‘ওর গলব্লাডারে পাথর হয়েছে।’
‘চন্দ্রিমার বয়সের গাছপাথর নেই, এটা জানতাম। অ্যাট লিস্ট পাথরটা পাওয়া গেল।’ মন্দিরাকে টাটা করে নিজের ঘরে ঢুকে যায় বৃন্দা। পাঁচটা বাজে। স্নান সেরে, সামান্য কিছু খাওয়াদাওয়া করে, একঘণ্টা রেস্ট নিয়ে পড়তে বসবে সাড়ে ছ’টার সময়। উঠবে সাড়ে এগারোটায়। পাঁচ ঘণ্টায় অনেকটা পড়া হবে।
স্নান করে লিনেনের কুর্তি আর ট্র্যাকপ্যান্ট পরল বৃন্দা। ঝুনুর মা টেবিলে রেখেছে চিঁড়ের পোলাও। গপাগপ পোলাও খেতে খেতে বৃন্দা বলল, ‘জম্পেশ এক কাপ কফি খাওয়াও তো।’
ঝুনুর মা বলল, ‘তুমি পড়তে বোসো! আমি করে দিচ্ছি। নীচ থেকে গন্ডগোলের আওয়াজ আসছে না?’
বৃন্দা কান খাড়া করে শুনে বলল, ‘কারা যেন চ্যাঁচামেচি করছে। নার্সিং হোমে কোনও গন্ডগোল হল না কি?’
‘নার্সিং হোমে কবে আর গন্ডগোল হয় না? পেশেন্ট পার্টিরা এত আজেবাজে প্রশ্ন করে না! রুগি কী খাবে এইটে জিজ্ঞেস করে করে তোমার বাবাকে রাগিয়ে দেয়!’
‘রাগের কী আছে? বাড়ির লোক তো জানতে চাইবেই।’ এক চামচ পোলাও মুখে দিয়েছে বৃন্দা।
‘ধুস! তুমি কিছু বোঝোই না। আচ্ছা, ধরো, তুমি সার্জেন আর আমি রুগির বাড়ির লোক। এবার আমি জিগ্গেস করি?’
‘করো।’ মুচকি হেসে বলে বৃন্দা।
ঝুনুর মা ব্যাকুল গলায় প্রশ্ন করে, ‘আচ্ছা, ডাক্তারবাবু, পেশেন্ট কী খাবে?’
বৃন্দা গেরামভারি গলায় জবাব দেয়, ‘সাত দিন আগে অপারেশান হয়েছে। সেলাই কাটাও হয়ে গেছে। আজ রোগীকে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছেন। বাড়িতে যা হয়, সবই দিতে পারবেন। তবে খুব মশলাদার খাবার দেবেন না।’
‘আচ্ছা, একটা কথা বলব?’
‘একটা কেন, দশটা বলুন।’
‘ভাত আর লাইট করে চারাপোনার ঝাল খেতে পারবে? শুধু কালোজিরে ফোড়ন দিয়ে?’
‘হ্যাঁ। দিন না।’
‘আচ্ছা, পোস্তবাটা দেওয়া যাবে?’
‘না না, ওসব ক’দিন থাক। পোস্তবাটায় সর্ষের তেল পড়ে।’
‘তা হলে ডাঁটা চচ্চড়ি?’
‘ওফ! তুমি এবার থামবে?’ বিরক্ত হয়ে বলে বৃন্দা। ‘কী ভ্যাজরং ভ্যাজরং করছ বলো তো?’
‘এতেই মেজাজ গরম হয়ে গেল? এখনও তো জিগ্গেস করিনি হরলিক্স খাবে না মলটোভা; বাদাম তেলে রাঁধব না সূর্যমুখী তেলে; প্রতি সাড়ে তিন ঘণ্টায় খেতে দেব না পৌনে পাঁচ ঘণ্টায়…’
ঝুনুর মাকে থামিয়ে বৃন্দা বলল, ‘চ্যাঁচামেচি কিন্তু বাড়ছে!’
‘তুমি ও নিয়ে ভেবো না। একগাদা সিকিয়োরিটি আছে, ওরা সামলে দেবে। সুলতান লেক থানায় খবর দিয়ে দেবে। তুমি খেয়েদেয়ে পড়তে বোসো।’
চিঁড়ের পোলাও খুব টেস্টি হয়েছে। অনেকটা খেয়ে ফেলেছে বৃন্দা। ঝুনুর মা গরম কফির কাপ টেবিলে রেখে নীচে গেছে। ধীরে সুস্থে কফি শেষ করে বৃন্দা নিজের ঘরের এসির তাপমাত্রা সেট করল কুড়ি ডিগ্রিতে। এখন ছ’টা কুড়ি। দশ মিনিট হাতে আছে। পড়তে বসার আগে একবার নীচে থেকে ঘুরে আসা যাক। ঘর থেকে বেরিয়ে ডাইনিং স্পেসে আসে বৃন্দা। ড্রইং রুম পেরিয়ে লিফ্টের সামনে দাঁড়ায়। কী ভেবে লিফ্ট ছেড়ে, সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে।
নীচের তলায় কুনাল, তাপসী আর অন্যান্য সিস্টার থাকে। এই ফ্লোরটা ফাঁকা আর শুনশান। তার নীচের তলা থেকে কথা কাটাকাটির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে বৃন্দা।
কথা কাটাকাটি বদলে যাচ্ছে চিৎকারে। কুনালের গলা, তাপসীর গলা, স্যামির জড়ানো, শিথিল গলা। আর একটা চেনা গলার আওয়াজ শুনতে পেল। ‘মদ খেয়ে অপারেশান থিয়েটারে ঢুকেছিলি? লজ্জা করে না? বাস্টার্ড!’
আবার একপ্রস্থ চ্যাঁচামেচি। ঝুনুর মায়ের চিৎকার শোনা গেল, ‘গায়ে হাত দিবেনি বলে দিচ্ছি! জানোয়ার কোথাকার!’
মাঝসিঁড়িতে দাঁড়িয়ে বৃন্দা আন্দাজ করার চেষ্টা করল, ভারী গলার আওয়াজটা কার। সাম্প্রতিক অতীতে এই ‘বুমিং ভয়েস’ সে শুনেছে। ‘বুমিং ভয়েস’ শব্দবন্ধটি মাথায় আসতেই মনে পড়ে গেল কণ্ঠস্বরের উৎস। সুপ্রিয়া সিনেমা হলের ডলবি ডিজিটাল সাউন্ড সিস্টেমে, বিধবাপুকুর সিনেমার প্রিমিয়ার শোতে এই আওয়াজ শুনেছে সে। বিশাল কপুরের গলা।
আর এক ধাপ সিঁড়ি ভাঙে বৃন্দা। চন্দ্রিমার গল ব্লাডার অপারেশন করার সময় স্যামি মাতাল ছিলেন? ওটিতে কোনও গন্ডগোল হল নাকি?
বৃন্দার চিন্তার মধ্যে সিঁড়ি বেয়ে দৌড়ে এল ঝুনুর মা। সে পরিত্রাহি চিৎকার করছে, ‘ওরে মা রে! ওরে বাবা রে! আমি মরে গেলাম। মেরে আমার মাথা ফাটিয়ে দিল গো!’ তার পিছনে দৌড়ে আসছে একটা ষণ্ডা ছেলে। পরনে বারমুডা আর টিশার্ট। পায়ে হাওয়াই চপ্পল। হাতে লোহার রড। রড না। ওটা মশারি টাঙানোর জন্য পেশেন্টের খাটের ছত্রি। ছোকরা এইটা দিয়ে ঝুনুর মাকে মেরেছে?
ঝুনুর মায়ের কপালে হাত। শাড়ির আঁচল মেঝেয় লুটোচ্ছে। ব্লাউজ ছেঁড়া। বৃন্দাকে দেখে সে চেঁচিয়ে উঠল, ‘ওগো তুমি থানায় খবর দাও। এরা বাড়ি ভেঙে তছনছ করে দিচ্ছে।’
ছেলেটা বৃন্দাকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আমার মায়ের ডেথ হয়েছে। ইন অপারেশান থিয়েটার। বিকজ অব দ্যাট ড্রাংক সার্জন। আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব।’
একগাদা ইনফো আছড়ে পড়ল বৃন্দার মাথায়। এক নম্বর, এই ছোকরা হল ভিকি। মুম্বইয়ে বিশাল কপুরের যে স্ত্রী থাকে তার পুত্র। যে রকম ফ্লুয়েন্ট বাংলা বলছে, আন্দাজ করা যায়, কলকাতায় আসা যাওয়া আছে। দু’নম্বর ইনফো, ভিকি প্রফেশনাল গুন্ডা নয়। এ যুক্তি দিয়ে কথা বলছে। যুক্তিবাদীরা মারকুটে হয় না। তিন নম্বর, বাংলা সিনেমার অন্যতম হিরোইন চন্দ্রিমার ‘ডি ও টি’ বা ‘ডেথ অন অপারেশন থিয়েটার’ হয়েছে। এক্ষেত্রে দায়িত্ব বর্তায় সার্জন ও অ্যানাস্থেটিস্টের ওপরে। স্যামি যে মাতাল এটা বিশাল এবং ভিকি ধরে ফেলেছে। অন্তিম ইনফো, ঝুনুর মায়ের কোনও বড়সড় চোট লাগেনি।
‘আপনি আর এগোবেন না। এটা রেসিডেন্সিয়াল এরিয়া।’ ভিকিকে বলে বৃন্দা, ‘ইউ উইল বি বুক্ড আনডার ট্রেসপাসিং, ডেকয়টি অ্যান্ড মলেস্টেশান। নীচে যান। নার্সিং হোমের প্রবলেম নার্সিং হোমে সল্ভ করুন। গো।’ নিচের দিকে তর্জনী দেখায় বৃন্দা।
ভিকি শ্রাগ করে। লোহার রড সিঁড়ির কোনায় রেখে বলে, ‘সুস্থ স্বাভাবিক একজন মহিলা অপারেশন থিয়েটারে ঢুকল, আর দু’ঘণ্টা বাদে তার ডেডবডি বেরিয়ে এল—দিস দিজ ইজ নট ডান। দিস ইজ জাস্ট নট ডান! স্পেশালি হোয়েন দ্য সার্জন ইজ ডেড ড্রাংক।’
বৃন্দা উত্তেজনায় কাঁপছে। ভয়ে তার বুক ধড়ফড় করছে। টেনশানে পেটে পাক দিচ্ছে। কোনও মতে সে বলল, ‘আমি পুলিশে খবর দিচ্ছি।’
‘দিতে পারেন। আমরা অলরেডি খবর দিয়েছি। ডক্টর ব্যানার্জিকে কোনও গভর্নমেন্ট হসপিটালে নিয়ে গিয়ে ব্লাডে অ্যালকোহল লেভেলটা মাপা অত্যন্ত জরুরি। উই নিড দ্য প্রুফ, যে উনি মাতাল অবস্থায় ওটি করেছেন।’
‘গেট আউট।’ থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলে বৃন্দা। মনে মনে ভিকির যুক্তিক্রমকে সমর্থন করছে বলেই খারাপ ব্যবহার করতে খারাপ লাগছে তার। কিন্তু কিছু করার নেই। আগে বাবাকে বাঁচাতে হবে।
নীচে চড়থাপ্পড়ের আওয়াজ। মা-বোন তুলে গালিগালাজ। কাচভাঙার ঝনঝন শব্দ। ভিকি তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নামতে চায়। কিন্তু এখন তার রাস্তা আটকে সুলতান এবং স্যামি। স্যামির মাথা ফেটে গেছে। ঠোঁট ফেটে গেছে। চুল উস্কোখুস্কো। সার্জনের ক্যাপ না থাকলেও গলায় মাস্ক ঝুলছে। পরনে ওটির নীল পোশাক। এক পায়ে ওটির চপ্পল। সুলতান তাকে ধরে ধরে ওপরে নিয়ে আসছে। ভিকি চেঁচিয়ে বলল, ‘পাপা, ইয়ে ভাগ রহা হ্যায়। কুছ করো।’
বিশাল সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে আসছেন। উর্দি পরা সিকিয়োরিটি তার হাত ধরে টেনে রেখেছে। সুলতান ভিকির টিশার্টের কলার ধরে এক ঘুষি মারল। পাঁচসাত ধাপ গড়াতে গড়াতে ল্যান্ডিং-এ কোণে আছড়ে পড়ল ভিকি। সুলতান স্যামিকে পাঁজাকোলা করে তুলে ওপরে এনে কোলাপসিব্ল গেটে তালা মেরে বৃন্দাকে বলল, ‘তুম আপনি পঢ়াই পে ধ্যান দো। ইয়ে সব চক্কর মে মত ঘুসো।’ ঝুনুর মাকে বলল, ‘হম পিছেওয়ালা লিফ্ট সে স্যর কো বাহার লেকে যা রহা হুঁ। রাসবিহারী মোড় মেঁ “কেয়ার অ্যান্ড কিওর নার্সিং হোম” হ্যায়। ওখানে স্যরের দোস্তলোগ আছেন। ওরা স্যরের ড্রেসিং করে দেবেন। আজ রাতে স্যর ওখানে ভর্তি থাকবেন।’
‘আর চন্দ্রিমা?’ অবাক হয়ে বলে বৃন্দা।
‘কুনাল স্যার অওর তাপসী সিস্টার গন্ডগোল সামহাল লেগা। তোমাকে পড়তে যেতে বললাম না?’ হিন্দি বাংলা মিশিয়ে কড়া গলায় বৃন্দাকে ধমক দিল উত্তেজিত সুলতান। ধমক শুনে বৃন্দা ওপরে উঠে এল। উঠে এল ঝুনুর মা-ও। সে এর মধ্যে শাড়ির আঁচল ঠিক করে নিয়েছে। চোখেমুখে আতঙ্কিত ভাব আর নেই। বৃন্দার ঘরে ঢুকে বলল, ‘আর বেরোবে না। আমার ছেলের দিব্যি রইল।’
বৃন্দা বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোমার দেখছি কিছুই হয়নি। শুধুমুধু চ্যাঁচাচ্ছিলে কেন?’
‘না চ্যাঁচালে হত?’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে ঝুনুর মা। ‘আমি নীচে নেমে দেখি এক দঙ্গল পেশেন্ট পার্টি ওটির বাইরে দাঁড়িয়ে। সব সিকিওরটির লোকজন ওদের হাতে ধোলাই খেয়েছে। সুলতানের রাবুনে চেহারা, তাই ওকে কিছু করতে পারেনি।’
বৃন্দা আর ঝুনুর মায়ের কথোপকথনের মধ্যে মন্দিরা শোওয়ার ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে বললেন, ‘বৃন্দা, তোর বাবা কোথায়?’ তাঁর মুখ লাল। চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে। ঝুনুর মা তাড়াতাড়ি মন্দিরার পাশে গিয়ে তাকে ধরে টানতে টানতে শোওয়ার ঘরে ঢুকিয়ে, খাটে শুইয়ে বলল, ‘তোমাকে উঠতে বারণ করেছি না?’
বৃন্দা মন্দিরার বেডরুমে ঢোকেনি। দরজা থেকে মাকে হাত নেড়ে আবার নিজের ঘরে ঢুকল। এবার পড়তে না বসলে পরশু কপালে সাপ্লি নাচছে। চেয়ারে বসে বই খুলতে না খুলতেই এক কাপ কফি আর একটা কাপকেক নিয়ে ঝুনুর মা ঢুকল। এই মহিলা সত্যিই উওম্যান ফ্রাইডে। টেবিলে কফির কাপ রেখে বৃন্দার হাতে কাপকেক ধরিয়ে বলল, ‘গুলুকোজ খাও। মাথা খুলবে।’
হাসতে হাসতে বৃন্দা বলল, ‘তোমার মাথা গুলুকোজ না খেলেও শার্প থাকে। মলেস্টেশানের অভিযোগটা বানিয়ে বানিয়ে করলে কেন?’
‘ও সব না বললে তোমার বাবাকে বাঁচানো যেত? আমি নীচে নেমে দেখি ভিকি ওর বাপ মিলে তোমার বাপকে ওটির বাইরে একটা চেয়ারে বসিয়ে রেখেছে। মোবাইল ফোনের ভিডিও তুলছে।। ভিকি তোমার বাবাকে ধমকাচ্ছে, ‘বলুন যে আপনি মদ খেয়ে অপারেশান করেন।’ আমি গিয়ে ছোকরার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিয়ে এক দৌড়ে ওয়ার্ডে ঢুকে জলের গামলায় ফেলে দিয়েছি। ঝুনু আমায় বলেছে যে মোবাইলের সব চেয়ে বড় শত্তুর হল জল। তখনই ওই ভিকি আমাকে রড নিয়ে তাড়া করে। মোবাইল কেড়ে নেওয়ার সময় ধস্তাধস্তি হয়েছিল। এই দ্যাখো, কবজিতে চোট আছে। আমি এখন থানায় গিয়ে ওই ছোকরার নামে কেস দেব।’
‘কেন মিথ্যে কেস দেবে ঝুনুর মা?’ কফিতে চুমুক দেয় বৃন্দা।
‘তা না হলে তোমার বাপকে বাঁচানো যাবে? নেই নেই করেও ওই হিরোটার ভালোই ক্ষমতা। নেহাত কলকাতার লোক নয়, তাই এ যাত্রার তোমার বাবা বেঁচে যাবে। তবে সিনেমার হিরোইনের মিত্যু তো! কাগজে লেখালেখি হবে।’
‘বাবাকে বাঁচাতে তোমার আগ্রহ কেন ঝুনুর মা?’ কফি শেষ করে কাপ কেকে কামড় দেয় বৃন্দা, ‘তোমার মনিব বলে?’
নীচের ঠোঁট কামড়ে ঝুনুর মা সামান্য ভাবে। বলে, ‘হ্যাঁ।’
‘বাবা মদ খেয়ে অপারেশান করে। এটা কি ঠিক?’
আবারও ঝুনুর মা নিচের ঠোঁট কামড়ায়। ফাঁকা কফির কাপ নিয়ে নাড়াচাড়া করে। বলে, ‘অসুখ বিসুখ হলে লোকে ডাক্তারের কাছে যায়। মামলা-মোকদ্দমার জন্য যায় উকিলের কাছে। মামলায় হারজিত আছে। ডাক্তারিতেও হারজিত আছে। যমে-মানুষে টানাটানিতে কখনও যম যেতে। কখনও ডাক্তার। ডাক্তারের হাতে রুগি না মরলে কার হাতে মরবে? কিন্তু ডাক্তার মোদো মাতাল হলে, আমি তার কাছে চিকিচ্ছে করাব না।’
‘বুঝলাম।’ বই হাতে নিয়ে বৃন্দা বলে, ‘তুমি মা-র কাছে যাও। আশা করি মা কিছু টের পায়নি।’
বৃন্দার কথার মধ্যে তার ঘরের দরজা খুলে গেছে। মন্দিরা মুখ ঢুকিয়ে বললেন, ‘আওয়াজ শুধু হাওয়ায় আসে না। মোবাইল ফোনেও আসে।’
এক লাফে চেয়ার থেকে ওঠে বৃন্দা বলল, ‘মা, তুমি ঘরে যাও।’
ঝুনুর মা বলল, ‘তোমায় কে ফোন করেছিল বউদি?’
টকটকে লাল মুখ আর ছলোছলো চোখ নিয়ে মন্দিরা বললেন, ‘বিশাল।’
‘কী বলল?’ বই বন্ধ করে প্রশ্ন করে বৃন্দা।
‘ও লেক থানায় তোর বাবার বিরুদ্ধে এফআইআর করছে। কাল মেডিকাল কাউন্সিলে লিখিত অভিযোগ জানাবে। পিআইএল করবে।’
‘পিআইএল আবার কী?’ ফুট কাটে ঝুনুর মা।
‘পাবলিক ইন্টারেস্ট লিটিগেশান।’ ক্লান্ত গলায় বলেন মন্দিরা। ‘বিশাল বলল, ও মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ সামন্ত এবং বিরোধী দলনেতা মৃন্ময় চ্যাটার্জির সঙ্গে দেখা করবে। চন্দ্রিমার মৃত্যু যেহেতু আনন্যাচরাল ডেথ, তাই ম্যাজিস্ট্রেট লেভেলে এনকোয়ারি হবে। পোস্টমর্টেমের পরে ওকে একদিন পিস হ্যাভেনে রাখবে। পরশুদিন টালিগঞ্জের স্টুডিওয় ওর বডি রাখা থাকবে। ভক্তরা অন্তিম শ্রদ্ধা জানাতে এলে, তাদের বলা হবে স্যামি চ্যাটার্জি কীভাবে চন্দ্রিমাকে খুন করেছেন। লিফলেট বিলি হবে। পোস্টার মারা হবে। ব্যানার টাঙানো হবে।’
ঝুনুর মা বৃন্দাকে বলল, ‘তুমি পড়ো। তোমাকে এ নিয়ে মাথা ঘামাতে হবে না। কাল ভোরবেলা হোস্টেলে চলে যাবে। পরীক্ষা চুকিয়ে বাড়ি ফিরবে। ততদিনে এদিকটা ঠান্ডা হয়ে যাবে।’
‘আর ঠান্ডা! আমার জীবনটা ছারখার হয়ে গেল।’ হাউহাউ করে কেঁদে ফেলেন মন্দিরা। ঝুনুর মা তাঁকে ধরে ঘরের বাইরে নিয়ে যায়। বৃন্দা কিছুক্ষণ নিথর বসে থাকে। ঘরের দরজা ভিতর থেকে বন্ধ করে, রিমোট টিপে এসির তাপমান ষোল ডিগ্রিতে আনে। মাথা দপদপ করছে। এখন পড়াশুনা হবে না। নিজেকে চিন্তামুক্ত করতে সে মোবাইল তুলে নেয়। একবার চন্দনকে ফোন করা যাক।
.
