১০. বৃন্দা
সুপ্রিয়া সিনেমা হলের সামনে হাজারখানেক লোকের ভিড়। স্কুল এবং কলেজ পড়ুয়া, পথচারী, অডিও-ভিশুয়াল এবং প্রিন্ট মিডিয়ার সাংবাদিকে ভরপুর ফুটপাথ। একসঙ্গে এত দেশি-বিদেশি গাড়ি, এত ওবি ভ্যান, এত ফ্ল্যাশবাল্ব, এত নক্ষত্র সমাগম সাম্প্রতিক কালে কলকাতা শহর কোনও বাংলা ছবি রিলিজের আগে দেখেনি। মায়াকম বিধবাপুকুর চলচ্চিত্রের প্রিমিয়ার শো করছে বলিউডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।
রাস্তায় লাল কার্পেট পাতা রয়েছে। অতিথিরা একে একে রেড কার্পেট দিয়ে হাঁটছেন এবং ক্যামেরাবন্দি হচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতেই তারা ক্যামেরার দিকে চুমু ছুড়ে দিচ্ছেন, ফোটোজেনিক পোজ দিচ্ছেন। সুপ্রিয়া সিনেমা হলের ভিতরের ফয়্যারে ‘বড়মার থান’ বানানো হয়ে হয়েছে। বিধবাপুকুরের পাড়ে বড়মার থান ছবিতে অনেকখানি জায়গা জুড়ে আছে। সিঁদুর লেপা, লাল সুতো জড়ানো, ছোট ছোট শিবলিঙ্গে ঠাসা থানটি দেখে কে বলবে যে এটি বানানো? সেলিব্রেটিরা সেখানে গিয়ে পোজ দিচ্ছেন। টকাটক ছবি উঠছে।
শান্তিধামে প্রিমিয়ার শোয়ের কার্ড নিয়ে এসেছিলেন মনোতোষ। কার্ড দেখে বৃন্দা মুগ্ধ। সাদা থান কাপড়ে সিল্ক স্ক্রিন প্রিন্টিং করা। ১০ মে, বৃহস্পতিবার সন্ধে ছ’টায় প্রিমিয়ার। মনোতোষের অনুরোধ, মন্দিরা যেন সপরিবারে পাঁচটার সময়ে পৌঁছে যান। প্রিমিয়ার শোয়ের পরে আফটার-পার্টি আছে হোটেল টিউলিপ বেঙ্গলে। রাত দশটা থেকে।
প্রিমিয়ার শোতে ছবির নায়িকা কখনও ঠিক সময়ে যায়? তা-ও আবার সপরিবারে?মনোতোষের বুদ্ধি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মন্দিরা। সকালে স্যামিকে বলেছেন, ‘আজ বিধবাপুকুরের প্রিমিয়ার শো। মনোতোষ নিজে এসে তোমাকে নেমন্তন্ন করে গেছে। তবে আমি বলে দিয়েছি যে তুমি যাবে না।’
মন্দিরাকে অবাক করে স্যামি বললেন, ‘গানগুলো খুব ভালো। কীর্তন ব্যবহারের আইডিয়াটা কার?’
‘তুমি আবার কোত্থেকে গান শুনলে?’ মন্দিরা ডবল অবাক।
‘গাড়ির এফএম চ্যানেলে। ক’দিন ধরে সব চ্যানেলে কীর্তন আর বৈষ্ণব পদাবলী ছাড়া কিছু শুনতে পাচ্ছি না।’
‘মাটি নামের গানের দলটি মিউজিক করেছে। ওরা খুব ট্যালেন্টেড। এনিওয়ে, কাল আমার ফিরতে দেরি হবে। বৃন্দাও সঙ্গে যাবে বলেছে। ঝুনুর মাকে বলে দিয়েছি, তোমার ডিনারের সময় থাকবে।’
‘কিন্তু আমি তো যাব।’ তৃতীয় বারের জন্য মন্দিরাকে অবাক করে স্যামি বললেন, ‘মনোতোষ আমাকে ফোন করেছিল। আমি বলে দিয়েছি পাঁচটার সময়ে পৌঁছে যাব।’
মন্দিরা ভুরু কুঁচকে স্যামির দিকে তাকিয়ে রইলেন। অবশেষে বললেন, ‘আচ্ছা।’
পাঁচটায় পৌঁছে বৃন্দারা দেখে, কেউ আসেনি। রেড কার্পেট পাতা হয়নি। কোনও সাংবাদিক দূরস্থান, বিধবাপুকুর টিমের একজনও আসেনি। সুপ্রিয়ার মালিক হাঁহাঁ করে দৌড়ে এসে বললেন, ‘এত তাড়াতাড়ি?’
‘উনি জোর করলেন!’ স্যামির দিকে আঙুল দেখান মন্দিরা। স্যামি শ্রাগ করে বলেন, ‘আমার কাছে পাঁচটা মানে পাঁচটা। টাইম ইজ মানি।’
‘একশো বার!’ ঘাড় নাড়ে সুপ্রিয়ার মালিক, ‘টাইম ইজ মানি। কিন্তু কার্ডে তো ছ’টায় আসার কথা লেখা আছে।’
‘মনোতোষ ফোনে পাঁচটায় আসতে বলল…’ গজগজ করতে করতে দোতলার কফি শপে বসেছেন স্যামি। মন্দিরাকে সুপ্রিয়ার মালিক আলাদা ঘরে সরিয়ে দিলেন। স্যামির পাশে বসে বৃন্দা কিছুক্ষণ বোর হল। তারপর যে মিডিয়া সার্কাস শুরু হল, সেটা ওপর থেকে দেখতে দিব্যি লাগছে।
চিত্রসাংবাদিকরা সাড়ে পাঁচটা থেকে বডি ফেলে দিয়েছে। রেড কার্পেটের ছবি তোলার জন্যে প্রবল গুঁতোগুঁতি চলছে। ছ’টা টিভি চ্যানেলের ওবি ভ্যান অনেকটা জায়গা খেয়েছে। সুদৃশ্য এবং সুবেশা অ্যাঙ্কররা হাতে বুম নিয়ে চুল ঠিক করছে।
ছ’টা থেকে অতিথি সমাগম শুরু হল। প্রথমে ঢুকলেন কলকাতার মডেল সম্প্রদায়। ওয়েল-টোন্ড বডিওয়ালা ছোকরা, আর অসম্ভব রোগা মেয়েরা অদ্ভুত সব পোশাক পরে এক সঙ্গে ঢুকলেন। ক্যামেরার জন্য পোজ দেওয়া, এয়ার কিসিং, উল্ফ হুইসল—রেড কার্পেট গোড়াতেই জমে গেল।
এরপর এলেন কলকাতার চিত্রশিল্পী সম্প্রদায়। বেশির ভাগই অচেনা। তবে ড্যানিয়েল আর্চারকে চিনতে অসুবিধে হল না বৃন্দার। দময়ন্তীর মা শক্তিরূপা ড্যানিয়েলের পাশেই রয়েছেন।
এরপর এলেন ফ্যাশনিস্তা আর বিজনেসম্যান। ইংরিজি কাগজের মেট্রো সেকশানে রোজই এঁদের ছবি বেরোয়। নিজেদের ছবি তোলানোর জন্য এঁরা আফটার পার্টিগুলো নিজের কোম্পানির নামে স্পনসর করে থাকে। ছবির মধ্যেও ব্র্যান্ডের প্রোমোশান হয়। বিধবাপুকুরে যেমন একটি স্বপ্নদৃশ্যে বেদানা দাসীকে এক গা গয়না পরতে হয়েছে। গয়নাগুলো বানিয়ে দিয়েছে ত্রিধা জুয়েলার্স। ত্রিধার মালকিন সারিকা গোয়েল বিশাল বপুতে ডিজাইনার ড্রেস জড়িয়ে বরকে নিয়ে ঢুকলেন। ফটোগ্রাফাররা খচাখচ ছবি তুলল।
টিভি সিরিয়ালের হিরো হিরোইন, টলিউডের বড় মেজো সেজো তারকারা এলেন পৌনে সাতটা নাগাদ। হর্ষদ্বনি, করতালি, ফ্ল্যাশবাল্বের চকমকানি দেখে বৃন্দা ক্লান্ত। এমন সময় একটা কুচকুচে কালো মার্সিডিজ বেন্জ রেড কার্পেটের সামনে দাঁড়াল। স্যামি বিরক্ত হয়ে বলল, ‘প্রোডিউসারের পয়সায় মনোতোষ ফুটুনি মারছে। চিপ পাবলিসিটি।’
মার্সিডিজের দরজা খুলে, বৃন্দাকে অবাক করে নামলেন মন্দিরা। পুরোনো শাড়ি, মেকআপ, অ্যাকসেসারি এবং হেয়ার ডু বদলে গেছে। মন্দিরার পরনে এখন অফ শোল্ডার সিলভার কালারের গাউন। চুলে টপনট। কানে প্ল্যাটিনামের ড্যাঙ্গলার। হাতে প্ল্যাটিনামের চুড়ি। সাদা পোশাকের মধ্যে গলায় রুবির চোকার আর হাতে লালরঙা ক্লাচ। পায়ে ন্যুড রঙা পিপ-টো। মাকে দেখে মুগ্ধ হয়ে গেল বৃন্দা। অবিকল ডিভার মতো ক্যামেরার দিকে হাত নাড়লেন মন্দিরা। হাজার ফ্ল্যাশবাল্ব ঝলসে উঠল। রেড কার্পেট দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে স্ট্র্যাটেজিক পয়েন্টে দাঁড়িয়ে পিছন ফিরে হাত নাড়লেন। যেন কাউকে ডাকছেন।
মন্দিরার আহ্বানে নিতান্ত অনিচ্ছে নিয়ে মার্সিডিজ থেকে নেমেছেন মনোতোষ। পরনে জিন্স আর ইটরঙা কুর্তা, পায়ে কোলাপুরি চপ্পল। ট্রিম করা গোঁফদাড়িতে আর না-আঁচড়ানো-চুলে ‘সযত্নে অযত্ন’-র ছাপ। মুখে বিরক্তির হালকা ছায়া। ভাবটা এই রকম যে, এই ঝলমলে অনুষ্ঠানে, এই অগাবগা লোকজনের মধ্যে আমাকে ডাকাডাকি কেন!
বৃন্দা একটা পুঁচকে ডিজিটাল ক্যামেরা এনেছে। এতক্ষণে সে শ’দেড়েক ছবি তুলে ফেলেছে। ছবি তুলতে তুলতেই সে শুনল পাশ থেকে স্যামি বললেন, ‘ছেনালি হচ্ছে!’
ছবি তোলা বন্ধ রেখে বাবার দিকে তাকাল বৃন্দা। স্যামি বন্ধুদের আড্ডায় কী বলেন সেটা ব্যক্তিগত ব্যাপার। কিন্তু স্ত্রী বা কন্যার সামনে গালাগাল দিতে একদমই শোনা যায় না। হঠাৎ কী হল?
বৃন্দা দেখল, স্যুটের পকেট থেকে ওয়াইন ফ্লাস্ক বার করেছে স্যামি। চ্যাপটা, রুপোর তৈরি ফ্লাস্ক। এগুলো বরাবর ক্যাবিনেটে সাজানো থাকে। বৃন্দা কখনও ব্যবহৃত হতে দেখেনি। আজ স্যামির কাণ্ড দেখে অবাক! তার ছবি তোলার ফাঁকে স্যামি মদ্যপান করেছেন। বৃন্দা আন্দাজ করল, স্যামি অন্য দিন যা খান তার থেকে বেশি খেয়ে আছেন।
বৃন্দা খানিকটা বিরক্ত আর খানিকটা অবাক হয়ে বলল, ‘মা-র জন্যে তোমার প্রাউড ফিল করা উচিত। বাট আই থিংক ইউ আর জেলাস!’
ঘোলাটে চোখে মেয়েকে মাপলেন স্যামি। বললেন, ‘আমি চিকিৎসক। নেক্সট টু গড। অ্যাকট্রেস থেকে প্রাইম মিনিস্টার—সবাই আমার সামনে এসে হাত জোড় করেন। আমি জেলাস ফিল করব! আর ইউ ইন ইওর সেন্সেস?’
কোনও উত্তর না দিয়ে বৃন্দা স্যামির হাত ধরে টানল। ‘চলো। সিনেমা শুরু হয়ে যাবে।’ চেয়ার ধরে উঠে দাঁড়িয়ে, টাল খেয়ে পড়ে যেতে গিয়ে নিজেকে সামলে স্যামি বললেন, ‘ঢপের ফিলিম, গাঁজার ছিলিম। বাংলা ছবি কোনও ভদ্দরলোকে দেখে!’
বৃন্দার খুব লজ্জা করছে। স্যামির হাত ছেড়ে পালিয়ে যেতে ইচ্ছে করছে। কিন্তু কোনও উপায় নেই। হয় তিনি পড়ে যাবেন, নয় কারও সঙ্গে পায়ে পা বাঁধিয়ে ঝগড়া করে পরোক্ষে মন্দিরাকে অপমান করবেন।
ইনভিটেশান কার্ডে সিট নাম্বার লেখা আছে। কাফে থেকে বেরিয়ে লিফ্টে করে বৃন্দা দোতলা থেকে তিনতলায় উঠল। সিঁড়ি আর ফয়্যার ভিআইপিতে গমগম করছে। স্যামিকে ওখানে নিয়ে যাওয়া যাবে না। ড্রেস সার্কেলের দরজার সামনে পৌঁছতেই জিন্স আর লাল টিশার্ট পরা ঝকঝকে ছোকরা তাদের নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে একদম পিছনের দুটো রিক্লাইনিং সিটে বসিয়ে দিল। সিটের অবস্থান দেখে আশ্বস্ত হল বৃন্দা। আইল সিট। পাশেই সিঁড়ি। স্যামি বেশি মাতলামি করলে নিঃশব্দে তাঁকে ধরে টানতে টানতে বেরিয়ে যাওয়া যাবে।
মিনিট পনেরোর মধ্যে হল ভরতি হয়ে গেল। ছ’টার বদলে সাতটা পনেরোয় শুরু হল সিনেমা। আলো নিবে গেল। সেন্ট্রাল বোর্ড অব ফিল্ম সার্টিফিকেশনের ছাড়পত্র থেকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যটি খুঁজে নিল বৃন্দা। একশো দশ মিনিটের ছবি।
পর্দায় দেখাচ্ছে, মায়াকম প্রযোজিত…
অন্ধকার স্ক্রিনে আস্তে আস্তে সূর্য উঠছে।
বিপিন দত্তর ‘বিধবাপুকুর’ উপন্যাস অবলম্বনে…
লং শট। গ্রামের আলপথ। তিনজন বিধবা ব্যাক টু দ্য ক্যামেরা হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে।
মনোতোষ ঘোষের ছবি…
মিড লং শট। প্রথম বিধবা আলপথে হোঁচট খেল। বলল, ‘মা গো!’
বিধবাপুকুর।
ক্লোজ আপ। দ্বিতীয় বিধবা বলল, ‘মর মাগি! শুকনো ড্যাঙায় আছাড় খাচ্ছিস কেনে?’
মন্দিরার মুখে ‘মাগি’ শুনে স্যামি বেশ জোরে বললেন, ‘ছেনালি!’ বৃন্দা স্যামির হাত শক্ত করে চেপে ধরে বলল, ‘বাবা। চুপ করো। সিনেমাটা দেখতে দাও।’
তৃতীয় বিধবা বলল, ‘জানিস বেদানা, হিমি আজকাল রোজই আছাড় খাচ্চে। পরশু দেকলুম, বড়বাবুর সামনে পোঁদের কাপড় তুলে উলটে পড়লে।’
হিমি আলপথ থেকে উঠে দাঁড়িয়েছে। তার পা কেটে গেছে, রক্ত বেরোচ্ছে। বেদানা বলল, ‘হেই মা! রক্ত!’
হিমি হিসহিস করে বলল, ‘সোহাগখুড়ি, আমার বয়েস কম। এখান ওখান থেকে রক্ত বেরোলে কিচু আসে যায় না। বড়বাবুর সামনে পোঁদের কাপড় খুলে গেলে লাভ বই খেতি নেই। কিন্তু তোমার মতো শুঁটকি, বুড়ি মাগির কী হবে বলো তো? গাড়োয়ানগুলো গ্যাঁজা টেনেও তোমার দিকে তাকায় না।’
বেদানা বলল, ‘হিমি, মুখ সামলে! সোহাগদিকে কিছু বললে তোর জিভ আমি টেনে ছিঁড়ে নোবো।’
বৃন্দার ধমক খেয়ে স্যামি চেয়ারে বসে ভোঁসভোঁস করে ঘুমোচ্ছেন। বৃন্দা সিনেমায় মন দিল। দু’চোখ ভরে দেখল অসাধারণ একটা সিনেমা। বিপিন দত্তর বিধবাপুকুর উপন্যাসটিতে কম বয়সে বিধবা হওয়া বেদানা দাসীর মানসযাত্রার বর্ণনা আছে। উপন্যাসে ঘটনাবলী কম। নানা চরিত্রের ইঙ্গিত আছে, ইতিহাসের উপাদান আছে, ঐতিহাসিক চরিত্রদের ঝাপসা ভাবে আঁকা আছে। মনোতোষের কৃতিত্ব হল, তিনি চরিত্রগুলোকে রক্তমাংসের ছাঁচ দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ ও বিবেকানন্দ দু’টি দৃশ্যে আছেন। চমৎকার মানিয়েছে। অজস্র টুকরো টুকরো ঘটনার মালা গেঁথে বেদানার মানসযাত্রার ফিজিকাল রূপ দেওয়া হয়েছে। মূল কাহিনির শেষে ছিল, বড়বাবু জানতে পেরে যাবেন, লেঠেলের সঙ্গে বেদানার শারীরিক সম্পর্ক আছে। তখন তিনি লেঠেলকে হত্যা করেন ও বেদনাকে ধর্ষণ করেন। বেদানা বিধবাপুকুরে ডুবে আত্মহত্যা করে। মনোতোষ শেষটা বদলে দিয়েছেন। সিনেমার ক্লাইম্যাক্সে আকণ্ঠ মদ্যপান করে বড়বাবু লেঠেলকে হত্যা করেন। বেদানাকে ধর্ষণ করে নিজের ঘরে ঘুমিয়ে পড়েন।
সকালবেলা। লং শট। নিজের পালঙ্কে বড়বাবু ঘুমোচ্ছেন। জানলা দিয়ে রোদ এসে মশারি ভেদ করে বড়বাবুর চোখে পড়ছে। রোদের তেজ দেখে অনুমান করা যায়, অনেকক্ষণ সকাল হয়েছে। সাউন্ড ট্র্যাকে নাসিকা গর্জন। নাক ডাকার আওয়াজ হঠাৎ বন্ধ হয়। সাউন্ড ট্র্যাকে এখন মেয়েদের কলকাকলি।
ক্লোজ শট। বড়বাবু চোখ খুলেছেন। রক্তচক্ষু মেলে শুনছেন মেয়েদের হাসিঠাট্টার শব্দ।
মিড লং শট। বড়বাবুর রিঅ্যাকশান। খোঁয়াড়ি, কনফিউশান, গত রাতের স্মৃতিচারণ, প্রতিশোধের ভিলেনি হাসি, আবার কনফিউশান। বড়বাবু পালঙ্ক ছেড়ে উঠলেন।
লং শট। ব্যাক টু দ্য ক্যামেরা বড়বাবু ধীরে ধীরে জানলার দিকে যাচ্ছেন। এই জানলা দিয়ে বিধবাপুকুর দেখা যায়। জানলা দিয়ে বড়বাবু কী দেখছেন? ট্রলিশটে ক্যামেরা জানলার দিকে এগোয়।
লং শট। বড়বাবুর দৃষ্টিকোণ থেকে ক্যামেরা বিধবাপুকুরকে ধরেছে। জলে দাপাচ্ছে তিন নারী। এরা কারা?
ক্যামেরা এখন পুকুরপাড়ে। লংশট। বেদানা, হিমি আর সোহাগ বিধবাপুকুরে স্নান করছে। হিমি সাঁতার কাটছে, সোহাগ ঘাটের সিঁড়ি বেয়ে গভীর জলে নামছে। বেদানা গায়ে গামছা ঘষছে। গত রাতের কথা সে কি ভুলে গেল? স্বামী মারা গেছে অনেক বছর আগে। ভালোবাসার মানুষটা খুন হল গত রাতে। মৃতদেহর সামনে, ইচ্ছের বিরুদ্ধে দেহদান করতে হল। অপবিত্র শরীর নিয়ে বেদানা এখন কী করবে? আত্মহত্যা ছাড়া আর কোনও রাস্তা আছে কি?
এখনই ক্লোজ আপ-এর সময়। কাছ থেকে দেখা যাচ্ছে বেদানার অনুভূতিশূন্য মুখ। কী ভাবছে সে? হঠাৎ সাউন্ড ট্র্যাকে চিৎকার, ‘মা গো!’
মিড লং শট। সোহাগ কোমরজলে দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখে যন্ত্রণার ছাপ। সাঁতার কাটতে কাটতে হিমি বলল, ‘ও সোহাগখুড়ি! কী হল?’
মিড লং শট। সোহাগ কোমর জল থেকে উঠে এসে বেদানার পাশে বসে। পা তুলে বেদানাকে দেখায়। বলে, ‘কীসে কাটল দেখত!’
ক্লোজ শট। সোহাগের পা থেকে শামুকের খোলা বার করে বেদানার হাত। সাউন্ড ট্র্যাকে শোনা যায় সোহাগের গলার আওয়াজ, ‘উহঃ! মা গো!’
মিড লং শট। সোহাগের গায়ে জলের ঝাপটা দিয়ে হাসতে হাসতে বেদানা বলে, ‘পচা শামুকে পা কেটেচিস? একটু কষ্ট তো হবেই!’
মিড লং শট। সোহাগ বেদানার গায়ে জলের ঝাপটা দিয়ে বলে, ‘মর মাগি!’
লং শট। বিধবাপুকুর দাপিয়ে সাঁতার কাটছে তিন প্রজন্মের তিন বিধবা। জমিদার বাড়ির দোতলার জানালায় বড়বাবুকে আবছা দেখা যাচ্ছে। পর্দায় ‘সমাপ্ত’ শব্দটি ফুটে উঠল।
হলজোড়া স্ট্যান্ডিং ওভেশান। বৃন্দাও দাঁড়িয়ে হাততালি দিচ্ছে। তার চোখে জল। স্যামির ঘুম ভাঙেনি। একদিকে ঘাড় কাত করে তিনি নাক ডাকছেন।
সিনেমার শেষে হৈমবতী হ্যান্ড মাইক নিয়ে বিনয়ের সঙ্গে জানাল, ‘সাংবাদিক সম্মেলন এবং আফটার পার্টির আয়োজন করা হয়েছে হোটেল টিউলিপ বেঙ্গলে। এখান থেকে পাঁচ মিনিটের রাস্তা। পর্যাপ্ত পরিমাণে গাড়ির ব্যবস্থা আছে। প্লিজ, আপনারা সবাই আসুন।’
বৃন্দা নিজের আসনে চুপচাপ বসে রইল। পাঁচ মিনিটের মধ্যে হল ফাঁকা। বৃন্দা স্যামিকে বলল, ‘বাবা! ওঠো!’
দু’একবার ধাক্কা দেওয়ার পরে স্যামি চোখ খুলল। ভুরু কুঁচকে বলল, ‘কী?’
‘বাড়ি চলো।’
‘বাড়ি?’ এদিক ওদিক তাকিয়ে ফ্যালফ্যালে দৃষ্টি মেলে স্যামি বলেন, ‘সিনেমা শেষ?’
‘হ্যাঁ। তুমি ওঠো।’ স্যামিকে ধরে ধরে তিনতলার লিফ্টের কাছে নিয়ে আসে বৃন্দা। এই ফ্লোরে এখন কেউ নেই। লাল টিশার্ট পরা তিন চারটে ছেলে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার নিয়ে ড্রেস সার্কলে ঢুকে পড়ল পরিষ্কার করতে। লিফ্টে উঠে স্যামিকে একহাতে ধরে, অন্য হাতে গ্রাউন্ড ফ্লোরের বাট্ন টেপে বৃন্দা। নিজের মোবাইল থেকে সুলতানের মোবাইলে মিস্ড কল দেয়। সুলতান গাড়ি নিয়ে সিনেমা হলের সামনে চলে এলে স্যামির লটকে পড়া ঘাড় আর ল্যাগব্যাগ করে হাঁটা কেউ দেখতে পাবে না।
সুলতান গাড়ি নিয়ে সামনেই দাঁড়িয়ে। স্যামিকে কোনও রকমে গাড়িতে তুলে নিজেও উঠে বৃন্দা বলল, ‘চলো সুলতানচাচু।’
‘বউদি আসবে না?’ গাড়ি স্টার্ট না দিয়ে প্রশ্ন করে সুলতান।
‘পরে আসবে।’ বিরক্ত হয়ে বলে বৃন্দা।
‘কীসে আসবে?’ এখনও সুলতান গাড়িতে স্টার্ট দেয়নি। সুলতান আর বৃন্দাকে অবাক করে দিয়ে স্যামি ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে জড়িয়ে বললেন, ‘তুমি চিন্তা কোরো না সুলতান। তোমার বউদি প্রোডিউসারের কোলে চেপে ঠিক চলে আসবে।’
‘আহ! বাবা!’ ধমক দেয় বৃন্দা। স্যামি আবার ঘুমিয়ে পড়ে। সুলতান গাড়িতে স্টার্ট দেয়। শান্তিধাম ফিরে, স্যামিকে খাটে শুইয়ে, স্নান সেরে, পোশাক বদলে ঘড়ি দেখে বৃন্দা। রাত দশটা বাজে। হোটেল টিউলিপ বেঙ্গলে এতক্ষণে পার্টি শুরু হয়ে গেছে। তার খুব ইচ্ছে ছিল থাকার। এক কোণে চুপ করে দাঁড়িয়ে থেকে অনেক ইন্টারেস্টিং লোক দেখা যেত। ‘নিউ অ্যান্ড ইমপ্রুভ্ড’ মন্দিরা ব্যানার্জিকেও দেখা যেত। অফ শোল্ডার সিলভার কালারের গাউন আর লাল রুবির চোকারে কী সুন্দর যে লাগছিল! আয়নার দিকে তাকিয়ে ভেংচি কাটে বৃন্দা। বলে, ‘মিস আইএমসি না ছাই! মায়ের রূপের কাছে তুই নস্যি!’
আয়না থেকে বৃন্দা নাম্বার টু পালটা ভেংচি কেটে বলে, ‘নস্যি কাকে বলে জানিস?’
আয়নার এপার থেকে বৃন্দা নাম্বার ওয়ান বলে, ‘জানি না। ওটা কথার কথা। মাকে যে হেব্বি দেখাচ্ছিল এটা তো মানবি!’
‘মানবো। তবে তুইও কম যাস না। সারা কলেজ তোর রূপে দিওয়ানা। আজ অভি চিৎপটাং হচ্ছে তো কাল চন্দন। তোর ব্যাপারই আলাদা।’ আয়না থেকে বৃন্দা টু অদৃশ্য হয়ে যায়।
আয়নার এপারে বৃন্দা এখন একা। টুকটুক করে হেঁটে নিজের ঘরের জানলা দিয়ে সে লেকের দিকে তাকায়। অভিকে নিজের জীবন থেকে মুছে ফেলে তার কোনও পাপবোধ নেই। একটা খারাপ ছেলে, একটা নোংরা ছেলে, শুধুমাত্র পিতৃপরিচয় দেখে ভালোবাসার অভিনয় করেছিল। এসব ছেলেকে কাছে ঘেঁষতে দেওয়াই উচিত হয়নি। দময়ন্তী আর চন্দন তাকে না বললে অভির অভিনয় সে বুঝতে পারত না।
চন্দন! দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৃন্দা। গত কয়েক সপ্তাহে চন্দন তার কাছাকাছি চলে এসেছে। বড্ড কাছাকাছি। বৃন্দা খেয়াল করেছে, চন্দনের মধ্যে একটা ইগারনেস আছে। কোথাও পৌঁছনোর তাড়া আছে। চন্দন ছেলেটা পড়াশুনায় ভীষণ ভালো। ফোকাস্ড। ফার্স্ট এমবিবিএসে দুটো সাবজেক্টে গোল্ড মেডেল পেয়েছে। রাজনীতি করতে গিয়ে পড়াশুনোর সঙ্গে কমপ্রোমাইজ করে না। সব সময় বৃন্দার পাশে পাশে থাকে। কিন্তু কোনও আদিখ্যেতা করে না। কোথায় যেন বৃন্দা পড়েছিল, প্রথম প্রেমে অভিশাপ থাকে। হবে হয়তো। অভিকে সে হৃদয় থেকে ভালোবেসেছিল। সেই প্রেম জীবন থেকে মুছে যাওয়ার পরে আপাতত অন্য সম্পর্কে যাওয়ার ব্যাপারে আগ্রহী নয়। তা হলে সে কি চন্দনকে হাতে রাখতে চাইছে? কে জানে বাবা! অ্যাপ্রিশিয়েশান কার না ভালো লাগে?
ঝুনুর মা খাবার বেড়েছে। বৃন্দা একাই খেতে বসল। স্যামিকে ঘুম থেকে তোলার কোনও মানে হয় না। মন্দিরার আসতে দেরি হবে। আগামিকাল কলেজ আছে। তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়তে হবে।
খাটে শরীর এলিয়ে দিয়ে বৃন্দা ভাবল, কাল দুটো ইম্পর্ট্যান্ট ঘটনা আছে। এক নম্বর, বিধবাপুকুরের রিভিউ বেরোবে। সে সব পড়লে বক্স অফিসে ছবিটার ভাগ্য আন্দাজ করা যাবে। অনেক সময় চিত্র সমালোচকরা ফিল্মটাকে গালাগালি দিয়ে উড়িয়ে দেন কিন্তু দর্শক ছবি ভালোভাবে নেয়। উল্টোটাও হয়। চিত্র সমালোচকরা ‘আহা-উহু’ করলেন, পাবলিক ছুঁয়েও দেখল না। বিধবাপুকুরের ক্ষেত্রে কোনটা ঘটে দেখা যাক।
কালকের দিনটা অন্য কারণেও গুরুত্বপূর্ণ। কাল এগারোই মে। কলেজ নির্বাচনের জন্য নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার দিন। বৃন্দা পলিটিক্স থেকে একশো হাত দূরে থাকে। চন্দন আর জেম্সির অনুরোধে যেতে হবে।
প্রেসিডেন্ট পোস্টের জন্য মোচার হয়ে ভোটে দাঁড়িয়ে জেম্সি পুরো লেডিজ হোস্টেলকে নিজের কবজায় এনে ফেলেছে। ডে-স্কলার আর হোস্টেলাইট ছেলেরা জেম্সিকে দেখে এক হাত জিভ বার করে এগিয়ে যাচ্ছে। জেম্সির দালাল হয়ে দিনরাত কলেজে চক্কর কাটছে অভি।
অভি কালচারাল সেক্রেটারির পোস্টে দাঁড়িয়েছে। বৃন্দার মাঝে মধ্যে সন্দেহ হয়, অভি কি জেম্সির সঙ্গে কোনও ছক কষছে? পর মুহুর্তে বৃন্দা টু তাকে ধমক দেয়। ‘ছক কষলে কষুক না! তোর তাতে কী? অভি তোর কে হয়?’ ঘুমোনোর আগের মুহূর্তে ফিক করে হেসে ফেলে বৃন্দা নাম্বার ওয়ান। বলে, ‘অভি তোর কে হয়?’—এই বাক্যটা ভীষণ ফিল্মি। ‘হাম আপকে হ্যায় কৌন’-এর অনুবাদ বলে মনে হচ্ছে।’
বৃন্দা নাম্বার টু টুক করে অদৃশ্য হয়ে গেল।
.
ভোরবেলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে ঝুনুকে দেখল বৃন্দা। সুলতানের হাতে কাগজ আর ম্যাগাজিনের পাঁজা ধরিয়ে সাইকেলের ক্যারিয়ার ভরতি কাগজ নিয়ে টলমল করতে করতে চলে গেল। মনে মনে তার দিকে হাত নেড়ে বৃন্দা বলল, ‘বিদায় সুপ্রভাত!’
নাম দেওয়ার খেলায় এর পরেই আসছেন লোনলি ওয়াইফ মন্দিরা। যদিও এই নামটা তার সম্পর্কে আর খাটে না। আর যাই হোক না কেন, মন্দিরা এখন লোনলি নন। গতকাল রাতে কখন বাড়ি ফিরেছেন, বৃন্দা জানে না। কিন্তু ভোর ছ’টাতেই স্নান সেরে নতুন হাউজ কোট গলিয়ে কাগজের পাঁজা নিয়ে ডাইনিং টেবিলে বসে গেছেন। মায়ের পাশে বসে আজ সকাল টেনে নেয় বৃন্দা। এরা কী বলে দেখা যাক!
আজ সকালের শুক্রবারের সাপ্লিমেন্টের নাম ‘ম্যাটিনি শো’। তাতে সুদিনকে দিয়ে ছবির রিভিউ করানো হয়েছে। এছাড়াও সুদিন আলাদা করে কাহিনিকার বিপিন, চিত্রপরিচালক মনোতোষ এবং নায়িকা মন্দিরার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। ম্যাটিনি শোতে আলোচনার বিষয় একটাই। বিধবাপুকুর।
ইন্টারভিউ পরে পড়লেও চলবে। দ্রুত ফিল্ম রিভিউ পড়ে বৃন্দা। আধপাতা, সাতকলাম জোড়া চিত্র সমালোচনার ব্যানার হেডলাইন, ‘ভাষা বাংলা। মান আন্তর্জাতিক!’ সমালোচনার সঙ্গে যে ফিল্ম স্টিলটি দেওয়া হয়েছে, সেটা দেখে লজ্জা পেল বৃন্দা। বেদানার স্বপ্ন-দৃশ্যে এই সিকোয়েন্সটি আছে। বেদানা দাসী অবচেতনে বড়বাবুকে শরীর দিতে চায়। কিন্তু বড়বাবু চায় তাকে লুটে নিতে। পেইন ও প্লেজার নিয়ে তৈরি এই স্বপ্নদৃশ্যে ভিজে কাপড় লেপটানো বেদানা বড়বাবুর সঙ্গে ফস্টিনস্টি করে। সিনেমায় আধ মিনিটের সিকোয়েন্স। সেখানে একটি চুম্বন দৃশ্য আছে পাঁচ সেকেন্ডের। সেই চুম্বন দৃশ্যটি স্টিল ফোটোতে ব্যবহার করা হয়েছে। ছবি থেকে চোখ সরিয়ে রিভিউয়ে মনোনিবেশ করে বৃন্দা।
সাত কলাম জুড়ে সুপারলেটিভের ছড়াছড়ি। চিত্রনাট্য, অভিনয়, সম্পাদনা, সঙ্গীত ও সঙ্গীত পরিচালনা—সবেতেই দশে আট নম্বর পেয়েছে বিধবাপুকুর। মন্দিরার জন্য আলাদা একটি প্যারাগ্রাফ খরচ করা হয়েছে। তাতে বলা হয়েছে স্বেচ্ছা আত্মগোপন থেকে মন্দিরার বেরিয়ে আসা উচিত। টালিগঞ্জ এবং মুম্বইতে মন্দিরার মতো চরিত্রাভিনেত্রীদের অত্যন্ত প্রয়োজন।
আজ সকাল রেখে বেঙ্গল নিউজ তুলে নেয় বৃন্দা। এখানে ফিল্ম রিভিউ-এর হেডলাইন, ‘আ স্লাইস অফ হিসট্রি, রি-টোল্ড সুপার্বলি।’ এখানেও কুণ্ঠাহীন প্রশংসা। পড়তে পড়তে আড়চোখে মন্দিরার দিকে তাকাল বৃন্দা। অবাক হয়ে দেখল, কোনও রিভিউ না পড়ে মন্দিরা তার দিকে তাকিয়ে চুপটি করে বসে রয়েছেন।
বৃন্দা অবাক হয়ে বলল, ‘কী দেখছ?’
লজ্জা পেয়ে মন্দিরা বলেন, ‘কিছু না।’
বৃন্দা আবার কাগজে মুখ নামায়। ঝুনুর মা বৃন্দার সামনে স্যান্ডুইচের থালা ঠক করে রেখে বলে, ‘খাও। মায়ের ছবি দেখলে পেট ভরবে না।’
স্যান্ডুইচ চিবোতে চিবোতে অন্য কাগজে চোখ বোলায় বৃন্দা। দৈনিক পত্রিকা লিখেছে, গত দশ বছরের মধ্যে এত ভালো বাংলা ছবি হয়নি। মন্দিরার অভিনয়ের প্রশংসা করে বর্তমান লিখেছে, সেরা অভিনেত্রীর জন্য ন্যাশনাল অ্যাওয়ার্ড তারই পাওয়া উচিত।
ফোন বাজছে। টেবিলে পড়ে থাকা কর্ডলেস তুলে বৃন্দা বলল, ‘হ্যালো!’
‘মন্দিরা ব্যানার্জি আছেন?’ ও প্রান্তে মহিলা কণ্ঠস্বর। ‘আমি স্কুপ চ্যানেল থেকে কথা বলছি।’ মুখ ভেটকে শ্রাগ করে বৃন্দা মায়ের দিকে ফোন এগিয়ে দেয়। মন্দিরা ফোন ধরে বললেন, ‘বলছি…’
পরবর্তী দু’ঘণ্টা মন্দিরাকে নিজের মোবাইল আর বাড়ির ল্যান্ডলাইন নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হল। স্যামি ঘুম থেকে উঠে প্রাতঃকৃত্য সেরে খাবার টেবিলে বসলেন, খাওয়া শেষ করে নার্সিং হোমে রাউন্ড দিতে গেলেন, রাউন্ড থেকে ফিরে কোট গলিয়ে নীচে চলে গেলেন। মন্দিরা ফোন ছাড়তে পারলেন না। একটা সময় ঝুনুর মা ফোন কেড়ে নিয়ে বলল, ‘আগে খাও। পরে কথা বলবে।’
মন্দিরা অপরাধীর মতো মুখ করে বৃন্দাকে বললেন, ‘তোর বাবা বেরিয়ে গেল? খুব খারাপ হল। আসলে ন্যাশনাল চ্যানেল থেকে ফোন তো…’
বৃন্দা কলেজ যাবার জন্য রেডি। কাঁধে ব্যাগ লটকে সে বলল, ‘মা, একটা কথা বলব?’
‘কী বলবি?’ শঙ্কিত দৃষ্টিতে তাকান মন্দিরা।
‘বিধবাপুকুর আমার দেখা সেরা মুভি। তোমার অভিনয় আমার দেখা সেরা অভিনয়। ভিভিয়ান লি, মেরিলিন মনরো, গিনেথ প্যালট্রো, ডেমি মুর, মধুবালা, শ্রীদেবী, রানি মুখার্জি, বিদ্যা বালান— সবাইকে হিসেবের মধ্যে ধরে বলছি।’
মন্দিরা বড় বড় চোখ করে কিছুক্ষণ মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ঝরঝর করে কাঁদতে কাঁদতে বৃন্দাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘থ্যাংক ইউ সোনা, থ্যাংক ইউ। বুকের মধ্যে একরাশ অপরাধবোধ জমে ছিল। তুই সরিয়ে দিলি। এর থেকে বড় প্রাপ্তি আমার আর কিছুতে হবে না।’
ছটফটিয়ে উঠে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বৃন্দা লিফটের দিকে এগোল।
.
