৩০. বৃন্দা
‘নমস্কার।’ স্যামির দিকে তাকিয়ে হাত জোড় করলেন ড্যানিয়েল। শক্তিরূপাও নমস্কার করলেন।
স্যামি বললেন, ‘বসুন।’
দময়ন্তী আর বৃন্দা পিছনে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাদের লক্ষ্য করে স্যামি বললেন, ‘তোরা এখানে থাকবি না ওপরে যাবি?’
‘এখানেই থাকব।’ দু’জনে একসঙ্গে বলে ওঠে।
স্যামির চেম্বার আগের থেকে অনেক বদলে গেছে। সুস্থ হওয়ার পরে স্যামি যখন আবার প্র্যাকটিস শুরু করলেন, তখন সবার আগে চেম্বারের চেহারা বদলালেন। মদ্যপান সংক্রান্ত যাবতীয় স্মৃতি মুছে ফেলতে হবে। আসব-সঙ্গীদের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। এবার পরিবেশ বদলানোর পালা। আগে ছিল রাজকীয়, বনেদি চেম্বার। এখন হয়েছে কেজো, ফাংশনাল চেম্বার।
‘আমার অগ্ন্যাশয়ের কর্কট রোগকে এই কারণে ধন্যবাদ দেওয়া উচিত যে আপনার মতো খ্যাতিমান মানুষের সঙ্গে আলাপ করালো।’ হাসতে হাসতে বললেন ড্যানিয়েল।
স্যামি বললেন, ‘শিল্প সংস্কৃতি সম্পর্কে আমার ধারণা কম। তবে স্ত্রীর কাছে আপনার ছবির প্রশংসা শুনেছি। আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চিত্রশিল্পীর সঙ্গে আলাপ হল, এ আমার গর্বের বিষয়। আপনার ইনভেস্টিগেশনের রিপোর্টগুলো দেখান।’
শক্তিরূপা ব্যাগ খুলে একটা কাগজ বার করে স্যামির দিকে এগিয়ে বললেন, ‘ড্যানিয়েলের অনেক রকম পরীক্ষানিরীক্ষা হয়েছে। অত কাগজ দেখিয়ে আপনাকে বিরক্ত করব না। আমি এই কাগজে তারিখ ধরে ধরে সব রিপোর্ট টাইপ করে এনেছি। যদি ওরিজিনাল রিপোর্ট দেখার প্রয়োজন বোধ করেন তাহলে আমি বার করে দেব।’
‘বউ এডিটর হওয়ার কত সুবিধে দেখছেন?’ ড্যানিয়েলকে বলেন স্যামি। এ-ফোর সাইজের কাগজ নিয়ে পড়তে থাকেন। মিনিট পনেরো ধরে পড়ে বলেন, ‘সিটিস্ক্যানের সিডিটা দেখব।’
শক্তিরূপা সিডি বাড়িয়ে দেন। কম্পিউটারে সিডি ঢুকিয়ে অনেকক্ষণ ধরে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেন স্যামি। বলেন, ‘এমআরআই-এর সিডি দেখব।’
শক্তিরূপা পুরোনো সিডি নিয়ে নতুন সিডি বাড়িয়ে দেন। এটিও অনেকক্ষণ ধরে দেখেন স্যামি। দেখার পাট চুকলে ড্যানিয়েলের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এই সব ক্ষেত্রে চিকিৎসক ও রুগির সংলাপের একটা ক্লাসিকাল প্যাটার্ন আছে। সেটা দিয়েই শুরু করি। আই হ্যাভ গট আ গুড নিউজ অ্যান্ড আ ব্যাড নিউজ ফর ইউ। কোনটা আগে শুনবেন?’
ড্যানিয়েল মুচকি হেসে বললেন, ‘সমুদ্রে পেতেছি শয্যা, শিশিরে কী ভয়? ভালো সংবাদটাই আগে শুনি।’
‘আপনার প্যানক্রিয়াসের ক্যানসার হয়েছে। এই রোগের অসুবিধে হল, রোগ ধরা পড়ে দেরিতে। তখন কিছু করার থাকে না। কিন্তু আপনার ক্ষেত্রে ঘটনাটা অন্য রকম ঘটেছে। আপনার ক্ষেত্রে খুব আর্লি সিম্পটম ডেভেলপ করেছে। আপনি ডাক্তারের কাছে তাড়াতাড়ি গেছেন। এখনও পর্যন্ত রোগটা এক জায়গায় চুপ করে বসে আছে। ছড়িয়ে যায়নি। সুতরাং আপনার সম্পূর্ণ রোগমুক্তি সম্ভব।’
‘তাহলে খারাপ খবরটা কী?’ শক্তিরূপা হড়বড়িয়ে জিজ্ঞাসা করেন।
‘খারাপ খবর হল, এই রোগের অপারেশানটি অসম্ভব লম্বা এবং জটিল। এই অপারেশানের পেটের অনেক কিছু বাদ দিয়ে আবার জোড়া হয়।’
‘এত কিছু বাদ দেওয়ার পরে বেঁচে থাকবো তো?’ ড্যানিয়েল প্রশ্ন করেন।
শক্তিরূপা তাঁর হাতে হাত রেখে চুপ করিয়ে বলেন, ‘অপারেশন লম্বা এবং জটিল হতে পারে। কিন্তু সেটা ব্যাড নিউজ কেন?’
‘দেখুন ম্যাডাম,’ দীর্ঘশ্বাস ফেলেন স্যামি, ‘আমি হঠাৎ করে অ্যালকোহলিক হয়ে পড়েছিলাম। হাত কাঁপত, কনসেনট্রেশান থাকত না। আমার হাতে পেশেন্ট মারা গেছেন। আমার সিরোসিস হয়েছিল। অনেক কষ্টে ওই দুষ্ট ব্যাধির হাত থেকে মুক্তি পেয়েছি। কিন্তু কনফিডেন্স একদম চলে গেছে। আজকাল ফোঁড়া কাটতেও ভয় করে। আজকের স্যামি ব্যানার্জি অতীতের ছায়া মাত্র। তাকে দিয়ে এত বড় অপারেশান করানো ঠিক হবে না। আয়্যাম নট মেন্টালি ফিট টু পারফর্ম দিস ম্যামথ ওটি।’
বৃন্দা আর দময়ন্তী একে অপরের দিকে তাকাল। দু’জনে একসঙ্গে তাকাল শক্তিরূপার দিকে। শক্তিরূপা নিজের ঠোঁট কামড়ে কী সব ভাবছেন। অবশেষে বলল, ‘তাহলে যে সমস্ত অঙ্কোসার্জন আপনার নাম রেকমেন্ড করলেন?’
‘আমি যে আর আগের স্যামি নেই, সে কথা ওঁরা কী করে জানবেন? আয়্যাম ভেরি সরি, কিন্তু আমার কিছু করার নেই।’
টেবিল জুড়ে নীরবতা। টক টক করে দেওয়াল-ঘড়ির সেকেন্ডের কাঁটা নিজের নিয়মে ঘুরছে। বৃন্দা আর দময়ন্তী আবার একে অপরের দিকে তাকাল।
‘আপনার জন্য আমার কাছে একটি সু ও একটি দুঃসংবাদ আছে।’ নীরবতা ভাঙলেন ড্যানিয়েল। ‘কোনটি আগে শুনতে চান?’
ভুরু তুলে চোখ গোলগোল করে স্যামি বললেন, ‘রোল রিভার্সাল? ঠিক আছে। আগে ভালো খবরটা শুনি।’
‘আমার স্ত্রী সাংবাদিক। আমিও পড়াশুনো করতে ভালোবাসি। আমার রোগনির্ণয় হওয়ার পরে দু’জনে মিলে এই বিষয়ে জ্ঞানলাভ করেছি। আমরা দেখেছি যে অন্তর্জাল এবং শল্য চিকিৎসার পত্রিকা বলছে, এই শল্য চিকিৎসাটি সেই লোকের হাতেই হওয়া উচিত যিনি নিয়মিত, অনুগতভাবে এই শল্য চিকিৎসা করেন। কারণ শরীরের এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ অংশ কাটার পরে শরীর জীবাণুদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। রোগী মারাও যায়। সেই হিসেবে এই শল্য চিকিৎসা আপনার করা উচিত নয়।’
‘অন্তর্জাল… অনুগতভাবে… জীবাণুদুষ্ট…’ বিড়বিড় করে বৃন্দা।
‘ইন্টারনেট, ডেডিকেটেড ওয়েতে, ইনফেক্টেড…’ অনুবাদ করে দেয় দময়ন্তী।
‘থ্যাংকস ড্যানিয়েল।’ পেশাদারি ভঙ্গিতে স্যামি বলেন, ‘আপনি সমস্যাটা বুঝতে পেরেছেন বলে আমি খুশি। আমি দেখছি, অন্য কোথায় আপনাকে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া যায়।’
‘আমি কিন্তু খারাপ খবরটা এখনও বলিনি।’ মুচকি হাসছেন ড্যানিয়েল।
‘হ্যাঁ বলুন।’ ল্যাপটপে নিদানপত্র লিখছেন স্যামি।
‘আমার শল্য চিকিৎসা আপনিই করুন। এটা আমার দাবি। এটা আমার অনুরোধ। এটা আমার অনুনয়।’
কি বোর্ডে আঙুল চালাতে চালাতে থমকে যান স্যামি। অবাক হয়ে ড্যানিয়েলের দিকে তাকান। তাকান শক্তিরূপা, বৃন্দা আর দময়ন্তীর দিকে। এক চুমুক জল খেয়ে বলেন, ‘ক্যা… আই মিন কেন?’
‘আমার বাবা শিল্পের ইতিহাসবিদ এবং মা শিল্প পুনস্থাপক ছিলেন।’
দময়ন্তী ফিশফিশ করে বলল, ‘আর্ট হিস্টোরিয়ান আর আর্ট রেস্টোরার।’
ড্যানিয়েল বললেন, ‘আমি ঠিক বাংলাই বলছি। তোমরা অকারণ ইংরিজি বলা বন্ধ করো। যাই হোক। যা বলছিলাম। তাঁরা নিজেরা ছবি না আঁকলেও বাড়ি ভরতি ছবির বই আর শিল্প সামগ্রী ছড়িয়ে থাকত। লেগে থাকত শিল্পীদের আনাগোনা। অনেক বছর আগে, যখন আমি যুবক ছিলাম, ছবি আঁকার নাম করে একদল নেশাড়ু শিল্পীর পাল্লায় পড়ি। তখন আমি ঘোরতর মদ্যপায়ী হয়ে গিয়েছিলাম।’
স্যামি দেখলেন ড্যানিয়েলের নীল চোখ ঝকঝক করছে। অনেক দিন আগের কথা মনে পড়ায় খুশিতে উপচে উঠেছে মুখ। তিনি বলছেন, ‘আজ নেশা করাকে মানসিক ব্যাধির মান্যতা দেওয়া হচ্ছে। অতীতে এমন ছিল না। মদ্যপান ও শিল্পচর্চাকে তুল্যমূল্য মনে করা হত। আমি যখন বুঝলাম যে নিজের জীবন নষ্ট করছি, তখন আমাকে বাঁচানোর জন্য আমার পাশে কেউ ছিল না। ছেঁড়া ঘুড়ির মতো চেত্তা খেতে খেতে শান্তিনিকেতনে এসে পড়েছিলাম। রবি ঠাকুর আমার রোগমুক্তি ঘটালেন। আমার জীবন বদলে দিলেন। মাননীয় চিকিৎসক, আমি জানি এই দেবদাস অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া কত শক্ত। আমি “অজানা নেশাড়ু” সংগঠনের স্বেচ্ছাসেবক। আমি চাই আরও অনেক মানুষ নেশার এই ব্যাধি থেকে মুক্ত হোক। আপনি নিজের চেষ্টায় এতদূর এসেছেন। আপনাকে আর একটু আগে নিয়ে যাওয়া আমার কর্তব্য। আপনার সব আছে। শুধু নিজের ওপরে ভরসা নেই। ওটা আমি আপনাকে দিচ্ছি। আপনি শল্য চিকিৎসা করুন।’
বৃন্দা ফিশফিশ করে দময়ন্তীকে জিজ্ঞাসা করল, ‘ “অজানা নেশাড়ু” মানে কী?’
দময়ন্তী বলল, ‘অ্যালকোহলিক্স অ্যানোনিমাস। যারা মদ্যপান ছাড়তে চায়, তাদের জন্যে একটা এনজিও।’
স্যামি বললেন, ‘দেখুন ড্যানিয়েল, এটা অপারেশান। সোশাল ওয়ার্ক নয়। ‘অ্যালকোহলিক্স অ্যানোনিমাস’-এর ভলান্টিয়ার হওয়া, আর ইনকনফিডেন্ট সার্জনকে দিয়ে হুইপল্স অপারেশান করানো এক জিনিস নয়। এটা লাইফ অ্যান্ড ডেথের প্রশ্ন।’
‘আমি জানি। আমি এও জানি যে অগ্ন্যাশয়ের কর্কট রোগ এবং হুইপ্ল সাহেবের নামাঙ্কিত শল্য চিকিৎসা নিয়ে আপনার গবেষণাগ্রন্থটি আজও বিলাতে পড়ানো হয়। আমি জানি, আপনি বিলাতে থাকাকালীন একশোর বেশি ওই শল্য চিকিৎসা করেছেন। কলকাতার সরকারি হাসপাতালে করেছেন আরও গোটা বিশেক। সারা ভারতের প্রধান চিকিৎসা কেন্দ্রগুলি আপনার নাম সুপারিশ করছে। এ শল্য চিকিৎসা আপনিই করবেন। আপনি না করলে আমি বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতির দিকে যাব।’
‘আমি আপনার চিকিৎসা করছি, না আপনি আমার?’ স্মিত হেসে বলেন স্যামি।
‘সাদাকাঠির বিজ্ঞাপনে যেমন লেখা থাকে, ’ পাল্টা হাসেন ড্যানিয়েল, ‘দু’জনে দু’জনার।’
বৃন্দা আর দময়ন্তী এতক্ষণ অবাক হয়ে দুই বাবার কথার মারপ্যাঁচ শুনছিল। বৃন্দা ভয়ে ভয়ে বলল, ‘তা হলে আঙ্কল কবে এখানে ভরতি হচ্ছেন?’
‘আঙ্কল এখানে ভরতি হবেন না বৃন্দা।’ ড্যানিয়েল বৃন্দার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ভরতি হবেন কাকু। হয় পুরো বাংলায় কথা বলো। না হয় পুরো ইংরিজিতে।’
‘আমি একটা কথা বলি,’ ড্যানিয়েলের পণ্ডিতির মধ্যে শক্তিরূপা স্যামিকে বলেন, ‘আমি আর ড্যানিয়েল মানসিকভাবে এই অপারেশানের জন্য প্রস্তুত। আমরা দু’জনেই সার্জন হিসেবে আপনাকে চাই। আমি আপনার ফিজিকাল এবং মেন্টাল সিচুয়েশান সম্পর্কে ওয়েল অ্যাওয়ার। চন্দ্রিমার ডেথ ইন ওটি নিয়েও আমরা খবরও করেছিলাম। কিন্তু আমার কখনও মনে হয়নি আপনার স্কিল নষ্ট হয়েছে। আমার মনে হয়েছে আপনার কনফিডেন্সের অভাব হচ্ছে। সেটা কোনও বড় ব্যাপার নয়।’
‘এই রকম ভোকাল টনিক পি কে ব্যানার্জিও দিতে পারতেন না।’ দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলেন স্যামি। ড্যানিয়েলকে বলেন, ‘আপনি আগামিকাল ভরতি হয়ে যান। আমি সব ইনভেস্টিগেশান আবার করাব। অ্যানাস্থেটিক চেক আপও হবে। ঠিক পাঁচ দিন বাদে ওটি করছি। শুভস্য শীঘ্রম।’
‘ধন্যবাদ।’ হাত জোড় করেন ড্যানিয়েল। ‘ঈশ্বর আপনার মঙ্গল করুন।’
.
কুনাল নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পরে নতুন দু’টি ছেলে রেসিডেন্ট মেডিকাল অফিসার বা আরএমও হিসেবে শান্তিধামে জয়েন করেছে। দু’জনেই ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের ছাত্র। দু’জনেই সার্জারিতে এমএস করেছে স্যামির আন্ডারে। দু’জনেই নিউরোসার্জারিতে এমসিএইচ করতে চায়। এরা জানে শান্তিধামে ওয়ার্কলোড কম। মাইনেও কম। কিন্তু এরা টাকাপয়সার জন্য লালায়িত নয়। হাতখরচা তোলার জন্য আরএমও হিসেবে কাজ করছে। শান্তিধামের এসি কোয়ার্টারে অগাধ শান্তি। দু’বেলা রাউন্ড আর মাঝে মাঝে একটা ওটি ছাড়া কোনও কাজ নেই। পড়াশুনো করার জন্যে আদর্শ পরিবেশ।
ছেলে দু’টির নাম অপূর্ব চক্রবর্তী আর প্রদোষ দাশগুপ্ত। স্যামি ইয়ার্কি মেরে অপু আর ফেলু বলে ডাকেন। অপূর্ব বিবাহিত। এক ছেলের বাপ। প্রদোষ একটি মেয়ের সঙ্গে প্রেম করে। মেয়েটি এই মুহূর্তে মুম্বইতে পিডিয়াট্রিক্সে এমডি করছে। ফিরলে বিয়ের প্রসঙ্গ উঠবে।
শান্তিধামে যোগদান করার পরে অপু প্রশ্ন করেছিল, ‘কুনাল স্যারের কোনও খোঁজ পাওয়া গেল না?’
‘না,’ হতাশ হয়ে বলেছিলেন স্যামি, ‘ওর যে কী হল কে জানে! আমি পুলিশে খবর দিলাম। ওর বউ জগদ্দল থেকে এসে থানায় মিসিং পারসন্স ডায়রি করল। কাগজে ‘নিরুদ্দেশ সম্পর্কে ঘোষণা’, টিভিতে ‘সন্ধান চাই’, সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে ছবি আপলোড করে খোঁজপাত্তা চালানো—সব করা হয়েছে।’
‘মর্গ বা হাসপাতাল…,’ নীচু গলায় বলেছিল ফেলু।
‘ওসব আগেই হয়ে গিয়েছে। কোনও খবর নেই। সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, যাবতীয় ফিনান্সিয়াল ডকুমেন্ট কুনাল খুব যত্ন করে ফোল্ডারে সাজিয়ে সুজাতার হাত দিয়ে আমার কাছে পাঠিয়েছিল। কুনালের প্রপার্টি, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, এলআইসি, এফডি—সবকিছুতেই বউয়ের সঙ্গে জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট। কুনালের বউ কাগজপত্র নিয়ে জগদ্দল চলে গেছে। মহিলাকে দেখে মনে হয়নি যে আনহ্যাপি।’
‘হ্যাপিনেস যে কাকে বলে…’ বিড়বিড় করে ফেলু।
‘বিয়ে না করেই দার্শনিক!’ অপু অবাক।
‘একটা ইন্টারেস্টিং ইনফর্মেশান পুলিশ আমাকে দিয়েছে। সেটা হল, কুনালের অ্যাকডেমিক ফাইলের দুটো ডকুমেন্ট মিসিং।’
‘অ্যাকডেমিক ফাইল মানে?’ জানতে চায় ফেলু।
‘যে ফাইলে ওর এমবিবিএস-এর মার্কশিট, এমবিবিএস ডিগ্রির কাগজ, মেডিকাল রেজিস্ট্রেশান নাম্বার—এই সব রাখা ছিল। ওই ফাইলে রেজিস্ট্রেশান নম্বর আর এমবিবিএস ডিগ্রির অরিজিনাল কাগজ দুটো মিসিং। স্টেথোস্কোপ, ব্লাড প্রেশার মাপার যন্ত্র এবং আনুষঙ্গিক ডাক্তারি যন্ত্রপাতি ভরতি ব্যাগটাও মিসিং। অথচ পাসপোর্ট, ভোটার আইকার্ড, প্যানকার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স এবং অন্যান্য পরিচয়পত্র একটা পাউচে ভরে আমাকে দিয়ে গেছে। নর্দমা থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে কাঁচি দিয়ে কাটা ডেবিট আর ক্রেডিট কার্ড। পুলিশের সন্দেহ, কুনাল সচেতনভাবে এবং স্বেচ্ছায় ঘর ছেড়েছে। আত্মহত্যা, দুর্ঘটনা বা খুনের ঘটনা এটা নয়। বেঁচে থাকতে হলে উপার্জন করতে হবে। একজন ডাক্তারের টাকা রোজগার করতে কোনও প্রবলেম হবে না। তবে তার জন্য ডিগ্রি এবং রেজিস্ট্রেশান নাম্বার চাই। পুলিশের ধারণা ও অন্য কোনও রাজ্যে গিয়ে ডাক্তারি করে খাচ্ছে। পুলিশ খোঁজাখুঁজি বন্ধ করে দিয়েছে।’
‘এই রকমটা কেন করবে?’ অবাক হয়ে বলে অপু।
‘কেন করবে না বল তো?’ বিরক্ত হয়ে বলে ফেলু। ‘সবারই নিজের মতো করে বাঁচার অধিকার আছে। যে জীবন, ফড়িঙের, দোয়েলের, সিমলতার, সে জীবন কেন কুনালের হবে না?’
অপু বলল, ‘কী সব বলছিস রে? ফড়িং, কোকিল, সিমগাছ! এগুলো কী?’
ফেলু বলে,
‘নারীর হৃদয়–প্রেম–শিশু–গৃহ-নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো–এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;’
.
কবিতা শুনে স্যামি মুচকি হেসে বললেন, ‘ফেলুকে চোখে চোখে রেখো। ওর মধ্যেও নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার স্ট্রিক আছে।’
‘বিয়ের আগেই?’ অপু ফেলুর পিঠে থাবড়া কষায়।
.
শান্তিধামে এখন দশজন পেশেন্ট ভরতি আছে। স্যামির আন্ডারে আটজন। ফেলুর দু’জন। অন্যান্য সার্জনরা এখনও পেশেন্ট ভরতি করা শুরু করেননি। কিন্তু স্যামির কাজে ফেরার খবর গোপন নেই। দিনরাত অপু আর ফেলুর কাছে ফোন আসছে। ড্যানিয়েলের অপারেশানের আগের দিন সকালবেলা মিন্টো ক্লিনিকের সার্জন ডক্টর রায় ফোন করে বললেন, ‘হ্যাঁরে অপু, স্যামি হুইপল্স করবে?’
অপু ব্রেকফাস্ট করছিল। সামনে সুজাতা বসে। তার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ফোনে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘লোকটা সেলিব্রিটি খুন করার ব্যাপারে রেকর্ড করবে দেখছি।’
‘কেন এ কথা বলছেন?’
‘এর আগে হিরোইন চন্দ্রিমাকে মারল। জনমোর্চা গর্ভনমেন্টের সঙ্গে দহরম মহরম ছিল। সন্দীপ সামন্তর এক গেলাসের বন্ধু বলে পার পেয়ে গেল। মৃন্ময় চ্যাটার্জির আমলে মার্ডার করলে কিন্তু সোজা জেল। রেজিস্ট্রেশান নাম্বার চলে যাবে। মালটাকে সাবধানে থাকতে বলিস।’
‘দেখুন ডক্টর রায়, আমি স্যামি ব্যানার্জির পিজিটি ছিলাম। ওঁকে হাসপাতালে কখনও মাতলামি করতে দেখিনি।’
‘দেখবি কী করে! ওর লীলাখেলার জায়গা শান্তিধাম। সাধে আমি ওখানে ওটি করা ছেড়েছি! অনেক দুঃখে মিন্টো ক্লিনিকে জয়েন করেছি।’
‘দুঃখ কেন? মিন্টো ক্লিনিক কলকাতার এক নম্বর নার্সিংহোম! ওখানকার ভিজিটিং হওয়ার রেলাই আলাদা।’
‘তোকে বোকা বললে আদ্দেক বলা হয়। এখানকার কী ঝামেলা তোর কোনও ধারণাই নেই। টিপিক্যাল কর্পোরেট স্ট্রাকচার। মান্থলি মিটিং-এ টার্গেট বেঁধে দেয়। যে, আগামী মাসে দশ লাখ টাকার ব্যবসা দিতে হবে। তার জন্য এত ঝক্কি পোয়াতে হয় যে দিনের শেষে খুব খারাপ লাগে।’
‘আপনি এত বড় সার্জেন। নিজের বিবেকেক্টমিটা করে নিতে পারছেন না!’
‘বিবেকেক্টমি! সেটা আবার কী?’
‘অ্যাপেন্ডিসেক্টমি মানে অ্যাপেন্ডিক্স কেটে বাদ দেওয়া। বিবেকেক্টমি মানে…’
ডক্টর রায় ফোন কেটে দিয়েছেন।
ওদিকে বালাজি মেডিকাল রিসার্চ সেন্টার বা বিএমআরআই-এর গ্যাস্ট্রো-ইনটেস্টিনাল সার্জন ডক্টর গণেশ আগরওয়াল ফোন করেছেন ফেলুকে! ‘কী বস! কী খবর?’
‘অ্যাজ ইউজুয়াল। তোমার কী খবর?’
‘চলে যাচ্ছে। গ্যাস্ট্রোতে এমসিএইচ করে বিএমআরআইতে জয়েন করেছি। সুপার স্পেশালিস্ট নিয়ে তারাপদ রায়ের গপ্পোটা জানিস তো?’
‘তুমি মেড়ো হয়ে তারাপদ রায়ের নাম জানো!’
‘চুপ কর শালা! গত আট জেনারেশান ধরে আমরা কলকাতার লোক। আমার দাদুর আমল থেকে বাড়িতে দেশ পত্রিকা ঢোকে। আমি তারাপদ রায় জানব না কি তুই জানবি?’
‘বলো বলো!’
‘তারাপদ রায় লিখেছিলেন বিশেষজ্ঞ মানে যে গুপ্তযুগের একটা খাটের বাঁদিকের পায়ায় যে সিলমোহরটা আছে, সেটা সম্পর্কে সব জানে। বাকি পায়াগুলো জানে না, খাটটা জানে না, গুপ্তযুগ জানে না, বর্তমান জানে না, ভবিষ্যৎ জানে না—অর্থাৎ কিছুই জানে না। আমার হয়েছে সেই হাল। গ্যাস্ট্রো-ইন্টেস্টিনাল সার্জন হয়ে কোনও কেস পাচ্ছি না। অ্যাপেন্ডিক্স আর গল ব্লাডার জেনারেল সার্জনরা কেটে দিচ্ছেন। পলিপ আর হেমরয়েডস হাউসস্টাফরা কেটে দিচ্ছেন। ক্যানসার সার্জারি অঙ্কোসার্জনরা করে দিচ্ছেন। কবে একটা লিভার ট্রান্সপ্ল্যান্ট হবে, তার আশায় বসে থাকবো নাকি! বউ হেবি খিস্তি করে বলছে, গুড়ের নাগরি মার্কা মেড়ো-প্রোমোটারকে বিয়ে করলে অনেক সুখে থাকত।’
‘যাঃ! সরিতাদিও তো ডাক্তার!’
‘ওর টাকাতেই তো সংসার চলছে। ভেবেছিলাম ড্যানিয়েল আর্চারের কেসটা পাব। একটা হুইপল্স করলে বিএমআরআই আমাকে প্রোমোট করত। সেও তো স্যামি ব্যানার্জি খেয়ে নিলেন।’
‘খেয়ে নিল আবার কী কথা! স্যামি অপারেশানটা করতে চাননি। ড্যানিয়েল জোর করেছেন।’
‘আর্টিস্টগুলো শালা বুড়বক হয়। মাতালকে দিয়ে কেউ কেস করায়? ওটি টেবিলে না মরলেও রিকভারি ফেজে মারা যাবে। শান্তিধামে অত বড় ওটি করার সেট আপ আছে নাকি?’
‘আচ্ছা, তুমি কি চাও বলো তো? স্যামি ফেল করুন?’
‘চাই তো! একশোবার চাই। স্যামি এই কেসটায় সাকসেসফুল হলে আবার বাজারে ওঁর নাম ফাটবে। ড্যানিয়েল আর্চারের সার্জারির খবর কাগজে বেরোবে। আবার লোকে স্যামির কাছে ভিড় করবে। আমি তা হলে খাব কী?’
‘তুমি ভাট বকছো। তুমি স্যামির ছাত্র! বসকে ব্যাপক রেসপেক্ট করো।’
‘রেসপেক্ট করি বলেই রেগে যাচ্ছি। সিনিয়ররা রিটায়ার না করলে আমরা ফ্লারিশ করব কী করে? স্যামিকে দেখলে, ‘ “কেমন আছেন?” বলতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় বলি, “কেন আছেন?” ’
‘সরিতাদিকে বলছি দাঁড়াও। তুমি খুব বাজে বাজে কথা বলছ।’
‘বসকে বলে দিস, উনি যেদিন ড্যানিয়েলকে টেবিলে তুলবেন, সেদিন সারা কলকাতার সমস্ত সার্জন দমবন্ধ করে অপেক্ষা করবেন। একশো জনের মধ্যে সত্তর জন চাইবেন স্যামি সফল হোন। বাকি তিরিশ জন চাইবেন স্যামি ফেল করুন। এবং এই তিরিশ জনের লবি খুব স্ট্রং।’
‘তুমি কোন দলে? ওটি তো আগামিকাল।’
‘আমি আর সরিতা মিলে বসের জন্য কালিঘাটে পুজো দিয়ে এলাম রে! ফেরার সময়ে সুলতানের হাতে প্রসাদ আর ফুলও দিয়ে এসেছি। কাল ওটিতে ঢোকার আগে মাথায় ফুল ছুঁয়ে নিস।’
ফেলুর গলার কাছে কী একটা আটকে আছে। বুক ভারী হয়ে আসছে। চোখে জল। সে ফিসফিস করে বলে, ‘থ্যাংক ইউ গণেশদা। আমি অফিসিয়ালি নাস্তিক। কিন্তু আগামিকাল ওটিতে ঢোকার আগে তোমার পাঠানো প্রসাদী ফুল মাথায় ছোঁয়াবো। প্রমিস।’
.
ড্যানিয়েল হালকা নীল রঙের পাজামা আর ফতুয়া পরে বেডে শুয়ে রয়েছেন। সকাল বেলা নাপিত এসে সারা শরীর কামিয়ে দিয়েছে। দাড়িও কামিয়ে দিয়েছে। ডিলাক্স রুমের সাউন্ড সিস্টেমে বাজছে, ‘ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে, বাদল বাতাস কাঁদে মালতীর গন্ধে গন্ধে।’
সোফায় বসে রয়েছে শক্তিরূপা। তিনি অফিস না গেলেও সামনে ল্যাপটপ খোলা। চোখ মনিটরে। দময়ন্তী মায়ের পাশে বসে মুখ শুকনো করে মোবাইল ঘাঁটছে। স্যামি ঘরে ঢুকে বললেন, ‘গুড মর্নিং! আজ হঠাৎ এই গান?’
‘গানটা শুনলেই আমার মাথার মধ্যে একটা ছবি তৈরি হয়,’ করুণ হাসেন ড্যানিয়েল। ‘হাতে তৈরি কাগজে জলরং-এর খামখেয়ালি চলনের মতো বর্ষা নামছে— এ আমি দেখতে পাই। এর পরেই কবিগুরু লিখছেন, ‘ “ব্যাধের চরণধ্বনি শুনিতে না পায় ভীরু হরিণ দম্পতি।” ওই কথাগুলো শুনলেই বুকের মধ্যে মায়া টলটল করে ওঠে। আমি সঙ্গমরত হরিণদের দেখতে পাই। ব্যাধকে দেখতে চাই না। কিন্তু নাছোড়বান্দা ব্যাধ ফ্রেমে থাকবেই।’
বৃন্দা আর সুজাতা একসঙ্গে ঢোকে। বৃন্দা দময়ন্তীর পাশে বসে। সুজাতা স্যামিকে বলে, ‘আপনি ওটিতে গিয়ে চেঞ্জ করুন। আমি পেশেন্ট পাঠাচ্ছি।’
‘অপু আর ফেলু কোথায়?’
‘দু’জনেই ওটিতে। অ্যানাস্থেটিস্ট মানসদা আর নিরুপমদা, কার্ডিওলজিস্ট অশোকদা, গ্যাস্ট্রোর দিবাকরদা, প্যাথোলজির মল্লিকাদি—সবাই রেডি। আপনি আসুন স্যার।’
ড্যানিয়েলের মাথায় হাত বুলিয়ে, দময়ন্তীর পিঠ চাপড়ে, শক্তিরূপাকে হাত নেড়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলেন স্যামি। ওয়ার্ড বয় ট্রলি নিয়ে এসেছে। তারা ড্যানিয়েলকে ধরে ট্রলিতে তুলতে যায়। ড্যানিয়েল বলেন, ‘আমি নিজে উঠব।’
বেড থেকে উঠে দময়ন্তীকে চুমু খেলেন ড্যানিয়েল। শক্তিরূপাকে বললেন, ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো, এ নহে মোর প্রার্থনা। বিপদে আমি না করি যেন ভয়।’
শক্তিরূপা চুপ করে বসে থাকেন। ড্যানিয়েল ট্রলিতে উঠে বৃন্দাকে বলে, ‘আজ বিকেলে রবীন্দ্রনাথের ‘ক্ষণিকা’ বইটা নিয়ে আসিস তো মা। অবেদনবিদের ওষুধের কারণে ঘোরে থাকব। শক্ত জিনিস মাথায় ঢুকবে না। চার লাইনের ছোট্ট ছোট্ট পদ্য পড়ে সময় কাটাবো।’
বৃন্দা বলে, ‘অবেদনবিদ?’
শক্তিরূপা বলেন, ‘অ্যানাস্থেটিস্ট। উনি অ্যানাস্থেটিক ড্রাগের এফেক্ট বোঝাতে চাইছেন।’
বৃন্দার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছে, ‘বাপ রে!’ নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, ‘আচ্ছা আঙ্কল!’
‘আঙ্কল নয়। কাকু।’ ধমক দিলেন ড্যানিয়েল। বৃন্দা লজ্জায় জিভ কাটল।
ওয়ার্ড বয় ট্রলি ঠেলতে ঠেলতে ওটির দিকে চলে যায়। সাউন্ড সিস্টেমে গান বাজতে থাকে, ‘মুখর নির্ঝর কলকল্লোলে, ব্যাধের চরণধ্বনি শুনিতে না পায় ভীরু হরিণদম্পতি।’
অপারেশান থিয়েটারের বাইরে লাল আলো জ্বলে ওঠে।
.
