হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ১১

১১. চন্দন

ঘুম থেকে উঠে মেসে টিফিন করতে গিয়ে আজ সকাল খবরের কাগজ দেখে চন্দনের চোখ কপালে উঠল। কাগজটায় শুক্রবারের ‘ম্যাটিনি শো’ সাপ্লিমেন্টে বিধবাপুকুর-এর রিভিউ বেরিয়েছে। সাত কলাম জুড়ে প্রশংসা। সমালোচনার মাঝখানের ফোটোতে হাফ-ন্যাংটো বৃন্দার মাকে জাপটে ধরে বিশাল কপুর সাপটে চুমু খাচ্ছে।

কাল রাতে বৃন্দার সঙ্গে কথা হয়নি। চন্দন জানত যে সুপ্রিয়া সিনেমা হলে ফিল্মের প্রিমিয়ার শো আছে। তারপরে মদ খাওয়ার পার্টি ছিল কোন একটা হোটেলে। সেখানে বৃন্দা যায়নি। রিভিউ পড়ে বৃন্দাকে ফোন করল চন্দন।

‘হ্যালো!’ আদুরে গলায় বলল বৃন্দা।

চন্দন বলল, ‘আজ নমিনেশান পেপার জমা দিয়ে বিধবাপুকুর দেখতে যাব। হিন্দ সিনেমা হলটা কিছুদিন আগে মাল্টিপ্লেক্স হয়ে গেছে। ওখানে দেড়টার শোয়ে। ঠিক সময়ে কলেজে চলে আসিস।’

বৃন্দা গাঁইগুঁই করে বলল, ‘মেয়েরা সবাই আমার ঘাড় ভেঙে সিনেমাটা ফোরামে দেখবে বলেছে। আমি কতবার একই মুভি দেখব?’

‘কাল একবার দেখেছিস। আজ আর একবার দেখবি। পরে আর একবার। ভালো রিভিশান হবে।’ ফোন কাটল চন্দন। ঘড়ি বলছে সকাল সাড়ে সাতটা বাজে। দশটা অবধি লেখাপড়া করতে হবে। এগারোটার সময়ে নমিনেশান পেপার জমা দেওয়া আছে। সেটা চুকিয়ে দেড়টার শোয়ে সিনেমা দেখতে যাওয়া। তারপরে বাড়ি ফেরা। কাল রাতে পারুল ফোনে ইনিয়ে বিনিয়ে নতুনগ্রাম আর বাঁজাপলাশ গ্রামের নানা গন্ডগোলের কথা বলছিলেন।

ফোনের প্রসঙ্গ মনে হতেই হাতের মোবাইল বাজতে শুরু করেছে। নম্বর দেখে খুশি হয় চন্দন। অধীর বিশ্বাস ফোন করেছেন। শোনা যাক নেতা কী বলছেন। সবুজ বোতাম টিপে সে বলে, ‘বলুন অধীরদা।’

‘ডাক্তার, যা বলছি মন দিয়ে শোনো। মাঝখানে একটাও কথা বলবে না। ক্লিয়ার?’

চন্দন চুপ করে থাকে।

‘গুড। আমার কথা শোনার জন্য ধন্যবাদ। তা হলে বলি। আমার কাছে খবর আছে, এবার কলেজ ইলেকশানে আমরা হারছি।’ অধীর পজ নেন। চন্দন বলতে যাচ্ছিল, ‘আমার কাছে এ রকম কোনও খবর নেই।’ বলল না।

‘উপায় একটাই। ওদের নমিনেশান পেপার জমা দিতে দেওয়া যাবে না।’

চন্দন চুপ।

‘হ্যাপি তিওয়ারির নাম জানো?’

চন্দন চুপ।

‘কথা বলছি কানে যাচ্ছে না?’ খেঁকিয়ে ওঠেন অধীর। চন্দন বলে, ‘আপনি বললেন মাঝখানে একটাও কথা না বলতে। তাই চুপ করে ছিলাম।’

‘ন্যাকামি কোরো না। হ্যাপি তিওয়ারির নাম জানো?’

চন্দন বলল, ‘হ্যাঁ জানি। চিকনার মুখে শোনা। শেয়ালদা এলাকায় নবযুগ পার্টির জন প্রতিনিধি।’

‘জন প্রতিনিধি না বাল!’ আবার খেঁকিয়ে ওঠেন অধীর। ‘ফালতু মস্তান। তোলাবাজি, হ্যাঙ্গাম-হুজ্জুত, চাঁদা নিয়ে মাস্তানি—এই সব করে। সুরজের সঙ্গে ভালো র‌্যাপো। আমি শুনছি রেগুলার তোমাদের হোস্টেলে আর্মস ঢুকছে।’

‘আমি এরকম কিছু শুনছি না।’

‘মাঝখানে কথা বলতে বারণ করেছি না?’ আবার চেঁচান অধীর। ‘একবার চিকনাকে দিয়ে তোমার কাছে একটা জিনিস পাঠিয়েছিলাম। জিনিসটা রাখোনি কেন?’

চন্দন চুপ।

‘কথা বলছ না কেন?’

‘বারণ করলেন তো!’

‘ন্যাকামি কোরো না। উত্তর দাও।’

‘মেডিকাল কলেজে ওই রাজনীতি চলে না অধীরদা। স্টুডেন্টরা জানলে একটা ভোটও দেবে না। আপনার ওই চিকনাকে বলে দিয়েছিলাম ফারদার যেন হোস্টেলে পা না দেয়। ছেলেটা কথা রেখেছে।’

‘দাদাগিরি হচ্ছে?’ ধমক দিলেন অধীর। ‘আজ তোমাদের নমিনেশন পেপার জমা দেওয়ার সময় চিকনা থাকবে। নিজেদের নমিনেশন পেপার জমা দিয়ে সিধে হোস্টেলে ফেরত চলে যাবে। তারপরে কী হবে না হবে সেটা জানার প্রয়োজন নেই।’

‘আপনি কি কলেজে গন্ডগোল বাঁধাবেন?’

‘আমার কথার মাঝখানে কথা বলতে বারণ করেছি না?’ আবার ধমক দেন অধীর।

‘সে কথা আপাতত শুনছি না। কারণ এইবার আমি বলব। কলেজ ইলেকশানে আমি জিতছি এবং ইউনিয়নের জেনারেল সেক্রেটারিও হচ্ছি। আপনি সেটা আটকাতে পারবেন না।’

‘তুমি কি পেগলে গেলে ডাক্তার? তোমার জিএস হওয়া আমি আটকাব কেন? আমি তো চাই যে তুমি জেতো।’

‘আপনি চাইলেও আপনার রাজনীতি চায় না। মেডিকাল কলেজের ভোটে পাড়ার রাজনীতি খাটে না। এটা আপনি যত তাড়াতাড়ি বুঝবেন, তত আপনার লাভ।’ ফোন কেটে চন্দন কিছুক্ষণ মাথা নীচু করে ভাবে। তারপর তপন চৌধুরীকে ফোন করে।

দুটো রিঙের পরে অন্য প্রান্ত থেকে এন্টালি থানার ওসির খুশিয়াল গলা শোনা যায়, ‘গুড মর্নিং চন্দনবাবু। বলুন। আপনার জন্য কী করতে পারি!’

তাপনের গলা শুনে মন ভালো হয়ে গেল চন্দনের। বলল, ‘আজকে আপনার রুটিন কী?’

‘আজ আমার অফ ডে। ছেলের কলেজে ব্লাড ডোনেশান ক্যাম্প আছে। সেখানে একবার যাব।’

‘ও… আচ্ছা।’ চন্দন ফোন কাটতে যায়।

‘আরে যা বলার নির্ভয়ে বলো। নো চাপ।’

‘আসলে, আজ আমাদের কলেজ ইলেকশানের নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার দিন। মনে হচ্ছে গন্ডগোল হবে। তাই ভাবলাম আপনাকে একবার ইনফর্ম করে রাখি।’

‘হুম!’ তাপসের গলা এবার গম্ভীর। ‘গতকাল অধীরের সঙ্গে কথা বলছিলাম। মনে হল ও টেনস্‌ড। তবে এ নিয়ে কিছু বলল না।’

‘আমার মনে হল তাই ফোন করলাম। প্লিজ কিছু মনে করবেন না।’

‘অ্যাই দ্যাখো! তুমি আবার এত ফর্মাল হচ্ছ কেন? আমি তো বলেইছি, তুমি আমার পুত্রতুল্য। ছেলের কলেজের ব্লাড ডোনেশান ক্যাম্পে মুখ দেখিয়ে তোমার কাছে যাচ্ছি। চিন্তা কোরো না।’ হাসতে হাসতে বলেন তপন।

‘না না। আপনাকে আসতে হবে না। আপনার অফ ডে। অন ডিউটি থাকলে তাও কথা ছিল।’

‘তুমি রাখো তো। থানার দু’জন কনস্টেবলকে এমনিতেই চব্বিশ ঘণ্টার জন্য হাসপাতালে পোস্টিং দেওয়া থাকে। হাসপাতালে টহল দেওয়া আমার রুটিন কাজের মধ্যে পড়ে।’ তপন ফোন কেটে দিলেন।

মেসের বিস্বাদ চা খেয়ে একশো পঁচিশ নম্বর রুমে ঢুকল চন্দন। ঘণ্টাদেড়েক পড়াশুনো করে ঘড়ি দেখল। পৌনে এগারোটা বাজে। এবার বেরোতে হবে।

জিন্‌স আর টিশার্ট গলিয়ে, সবুজ আর লাটুকে নিয়ে হোস্টেল থেকে বেরিয়ে ক্যান্টিনের দিকে যেতে যেতে হঠাৎ অন্য রকম অনুভূতি হল চন্দনের। দশ-বারো পা হাঁটার পরে সবুজকে জিজ্ঞাসা করল, ‘আজ একটু অন্য রকম লাগছে না?’

‘লাগছে তো! টিভির ওয়েদার রিপোর্ট বলছে আজকের টেম্পারেচার বিয়াল্লিশ ডিগ্রি। হিউমিডিটি নাইন্টি এইট পার্সেন্ট। রাস্তাঘাটে লোক নেই।’ জবাব দেয় সবুজ।

তাপমাত্রা বা আর্দ্রতা নিয়ে সবুজের কথা উপেক্ষা করল চন্দন। কানে নিল রাস্তাঘাটে কম লোকের প্রসঙ্গ। এইটাই তার অস্বস্তির কারণ। এত বড় মেডিকাল কলেজে লোকজন আজ খুবই কম। কোনও ছাত্র, শিক্ষক বা অন্য কর্মচারীকে দেখা যাচ্ছে না। যাদের দেখা যাচ্ছে, যারা পাঁচিলে বসে বা গাছের ছায়ায় রোদ পোয়াচ্ছে— তাদের চেনে না চন্দন। জিন্‌স-টিশার্ট আর হাওয়াই চপ্পল পরা অবাঙালি মুখগুলো আগে কোনও দিনও দেখেনি।

হনহন করে হেঁটে ক্যান্টিনে ঢুকল চন্দন। বৃন্দার নেতৃত্বে মেয়েদের গ্রুপটা টেবিল বাজিয়ে গাইছে, ‘না যায়ো সাঁইয়া, ছুড়াকে বাঁইয়া।’

চন্দন বৃন্দাকে বলল, ‘আজ কলেজে না এলেই পারতিস।’

‘সে আবার কী? তুই-ই তো বললি নমিনেশান পেপার জমা দেওয়ার পরে সিনেমা দেখতে যাবি।’ ভুরু তুলে বলে বৃন্দা।

‘একটা নাগাদ এলে পারতিস। আজ তো কোনও ক্লাস হবে না।’ প্রসঙ্গ ঘোরায় চন্দন। এই মেয়েটাকে দেখলেই তার বুকের মধ্যে কেন যে সোনু নিগম গান ধরে…কেন যে শাহরুখ খান দু’হাত দু’দিকে ছড়িয়ে স্লো-মোশানে দৌড়য়… কেন যে মনে হয় সব বিপদ, ঝড়, ঝঞ্ঝা থেকে দু’হাত দিয়ে মেয়েটাকে আগলে রাখি! কেন যে…

জেম্‌সি চন্দনের থুতনি নেড়ে বলল, ‘এই যে সাঁইয়া, চলো আমরা প্রিন্সিপালের অফিসের দিকে রওনা হই! যে কাজের জন্য কলেজে আসা, সেটা সেরে ফেলা যাক।’

‘চল।’ বৃন্দার হাত ধরে টানে চন্দন। ‘পাঁচ মিনিটের কাজ। তারপরে ক্যান্টিনে এসে আড্ডা মারব।’

প্রিন্সিপাল অফিসের দিকে যেতে যেতে চন্দন পিছন ফিরে তাকায়। বেশ বড় একটা গ্রুপ হয়েছে। ফার্স্ট এবং সেকেন্ড ইয়ারের ছেলেমেয়ে মিলিয়ে জনাতিরিশ তো হবেই। বৃন্দার দিকে তাকিয়ে চন্দন বলল, ‘আজ কলেজের পরিবেশটা অন্য রকম লাগছে না?’

‘লাগছে! তার কারণ আজ আমাদের আশেপাশে চেনামুখ কম। অচেনা মুখ বেশি। বেশির ভাগ ডিপার্টমেন্টে টিচার আসেননি। আমরা ছাড়া কোনও স্টুডেন্ট নেই।’

বৃন্দার কথার মধ্যে চন্দন আবার পিছন ফিরে তাকায়। তিরিশ জনের গ্রুপটার পিছনে জনা পঞ্চাশ ছেলের একটা গ্রুপ আসছে। হোস্টেল এবং কলেজের বিভিন্ন প্রান্তে যে সব অচেনা ছেলেছোকরা বসে বা দাঁড়িয়ে ছিল, তাদের গ্রুপ। একটা চেনামুখ দেখে শঙ্কিত হল চন্দন। লম্বা, ফর্সা, ব্যাকব্রাশ করা চুল, সুন্দর দেখতে কিন্তু দাঁতগুলো পানমশলা খেয়ে কালো। চিকনা! জিন্‌স, টিশার্ট আর হাওয়াই চপ্পল পরে ক্যাজুয়ালি হাঁটছে। চন্দনকে দেখে না চেনার ভান করল!

এক্ষুনি একটা ডিসিশন নিতে হবে। কলেজের ইলেকশানকে কেন্দ্র করে বাইরের গুন্ডা ঢোকানোটা কার আইডিয়া, সেটা চন্দন বুঝতে পারছে। তড়িঘড়ি পকেট থেকে মোবাইল বার করে কনট্যাক্ট লিস্টে যায়। ফোন করতে হবে অধীরকে।

‘কী বস! খুব টেনস্‌ড লাগছে! কী হল?’ চন্দনের কাঁধে বন্ধুত্বপূর্ণ থাপ্পড়। চন্দন ঘুরে দেখে তপন চৌধুরী। নীল জিন্‌স আর সাদা টি শার্টে চমৎকার দেখতে লাগছে। ছেলের কলেজে যাবে বলে আজই চুলে আর গোঁফে কলপ করেছেন। সদ্য কামানো গালে নীলচে জেল্লা। চন্দন বলল, ‘আপনার তো আর একটা বিয়ে দেওয়া যাবে। বয়স দশ বছর কমিয়ে ফেলেছেন মশাই!’

‘বিয়ে না হয় করা যাবে। তুমি বললে একটা নয়, দুটো করব। কিন্তু তোমরা এখানে কী কেলোর কিত্তি বাঁধিয়েছো বল তো? শেয়ালদা চত্বরের সবক’টা আসামিকে নিয়ে মিছিল করছ!’

‘ঐ জন্যই তো টেনস্‌ড, তপনদা।’ অধীরকে ফোন করতে করতে বলে চন্দন, ‘আমি বন্ধুদের নিয়ে নমিনেশন পেপার জমা দিতে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি একগাদা আউটসাইডার ঘিরে রয়েছে। কী ব্যাপার কে জানে!’

‘আমিও এখন অফ ডিউটি…’ বিড়বিড় করতে করতে এন্টালি থানায় ফোন করেন তপন।

অধীরের ফোন এনগেজ্‌ড। চন্দন ফোন কেটে দেয়। সামনেই ফরেনসিক মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট এবং প্রিন্সিপালের অফিস। নমিনেশান ফর্ম জমা দেওয়ার পর্ব চোকানো যাক।

রেপ স্যার চেম্বারে বসে ল্যাপটপে থিয়োরি ক্লাসের জন্য প্রেজেন্টেশান বানাচ্ছিলেন। চন্দনকে দেখে ভুরু নাচালেন।

চন্দন বলল, ‘স্যার, আমি বাকি স্টুডেন্টদের চেম্বারের বাইরে বসিয়ে রেখেছি। একটা জরুরি কথা বলতে একা এলাম।’

‘বলে ফেলো।’

‘এখন কলেজে প্রচুর আউটসাইডার। আমাদের ফলো করে আপনার অফিস পর্যন্ত এল। এরা কারা বুঝতে পারছি না। আপনি একবার থানায় ইনফর্ম করবেন?’

‘দ্যাখো চন্দন, আমাকে এসব বলে কোনও লাভ নেই।’ নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলেন রেপ স্যার। ‘ছাত্র রাজনীতি করছ। ছাত্র রাজনীতির হ্যাপা তোমাকেই পোয়াতে হবে। নিকারাগুয়ায় চাল পাঠাবে, ইথিওপিয়ায় ডাল পাঠাবে, রক্ত দিয়ে তারাপীঠে তাপবিদ্যুৎ প্রকল্প গড়বে, বীর্য দিয়ে বক্রেশ্বরে পরমাণু বিদ্যুৎ প্রকল্প গড়বে—আর তালতলা, বেলেঘাটা থেকে গুন্ডা এলে আমার কাছে কাঁদবে, এটা হতে পারে না। তোমার নমিনেশান পেপার আগে জমা করো। তারপর বাকিদের পাঠিয়ে দাও। কাজ শেষ হলে কাটো। এরপর সুরজ আর সব্যসাচীরা আসবে।’

চন্দন চুপচাপ নমিনেশান পেপার জমা দিল। সেটা স্ক্রুটিনি করতে করতে রেপ স্যার বললেন, ‘ঝামেলার আশঙ্কা থাকলে তাড়াতাড়ি বাড়ি কেটে পড়ো।’

চন্দন প্রিন্সিপালের চেম্বার থেকে বেরিয়ে আসতে জেম্‌সি ঢুকল। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের বাইরে বেরিয়ে চন্দন দেখল অপরিচিত লোকের সংখ্যা বেড়ে শ’দেড়েক হয়েছে। তারা দু’ভাগে বিভক্ত। ডিপার্টমেন্টের সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে একদল অন্য দলকে মাপছে। মাঝখানে দাঁড়িয়ে লাঠিধারী দুই কনস্টেবল এবং তপন। চিকনার দলের লোকসংখ্যা শ’খানেক। অন্য দিকের সংখ্যা পঞ্চাশের মধ্যে। অবাঙালি লোকেদের মধ্যে একটি চেহারা চোখে পড়ার মতো। লুঙ্গি এবং ফতুয়া পরা। গলায় কবচ ও হাতে মাদুলি। মাঝারি মাপের ভুঁড়ি, চুলে কলপ করা। সদ্য দাড়ি কামানো গাল চকচক করছে। মধ্য পঞ্চাশের মানুষটি অত্যন্ত দামি মোবাইল ফোনে চাপা গলায় কথা বলছে।

চন্দনের ফোন বাজছে। ফোন হাতে নিয়ে দেখে, ‘অধীর বিশ্বাস কলিং।’ তড়িঘড়ি ফোন ধরে চন্দন, ‘অধীরদা, আপনাকে ফোন করেছিলাম। এনগেজ্‌ড এল। আপনি কোথায়? কলেজে ঝামেলা হতে পারে।’

আরও অনেক কথা এক নিঃশ্বাসে বলতে যাচ্ছিল চন্দন। তাকে থামিয়ে অধীর কেটে কেটে বললেন, ‘যা বলছি চুপচাপ শোনো। দু’বার বলব না। ক্লাসমেটদের নিয়ে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কলেজ থেকে বেরিয়ে যাও।’

‘কোথায়?’ চন্দন বোকার মতো প্রশ্ন করল।

‘জাহান্নামে।’ খেঁকিয়ে ওঠেন অধীর। ‘যা বলছি করো। ওখানে এখন হ্যাপি তিওয়ারি রয়েছে। তোমাদের কিছু হয়ে গেলে কারও বাপ বাঁচাতে পারবে না।’

চন্দন বড়সড় দম নিল। ডিপার্টমেন্টে আবার ঢুকে দেখল সবার নমিনেশান পেপার জমা দেওয়া হয়ে গেছে। সে জেম্‌সি আর বৃন্দাকে বলল, ‘চল। বেরোই।’

‘তোকে টেনস্‌ড লাগছে কেন?’ জেম্‌সি প্রশ্ন করল।

‘পরে কথা বলব। কুইক।’ মেয়েদুটোর কনুই ধরে রাস্তায় নামে চন্দন। পিছন পিছন বাকি সবাই। দুই দলের মাঝখান দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে শুনতে পায় তপন মোবাইলে চ্যাঁচাচ্ছে, ‘এক্ষুনি ফুল ফোর্স নিয়ে এসো। এখানে সবাই গান ক্যারি করছে। বড়সড় ঝামেলা বাঁধতে চলেছে।’

শ্রীপর্ণা চিৎকার করে উঠল, ‘দে আর ক্যারিইং গান? ও মাই গড।’

‘শাটাপ!’ শ্রীপর্ণার মুখ চেপে ধরে টানতে টানতে নিয়ে যায় সাবিনা। জেম্‌সি বলে, ‘আর দে হুলিগান্‌স? মেডিকাল কলেজের মধ্যে ওপেনলি আর্মস নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে! এরা কারা চন্দন?’

শ্রীপর্ণা আবার চেঁচিয়ে ওঠে, ‘বাবা এইজন্যেই বলেছিল, পলিটিক্যাল পিপ্‌লদের সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপ করিস না। দে উইল ইউটিলাইজ ইউ। হি ওয়াজ রাইট।’

সাবিনা আবার শ্রীপর্ণার মুখ চেপে ধরে বলে, ‘না চেঁচিয়ে হোস্টেলে চল।’

লেডি আর্চার্স হোস্টেলের দিক থেকে সুরজের ন্যাবাপার্টি আসছে। কপালে সবুজ টিকা লাগিয়ে দশ-বারোজন ছেলেমেয়ে নমিনেশান পেপার জমা দিতে আসছে। প্রবাল, দীপ, সঞ্জয়, ছাড়াও ফার্স্ট ইয়ারের কয়েকটা ছেলেমেয়ে রয়েছে। চন্দন তাড়াতাড়ি সুরজের কাছে গিয়ে বলল, ‘এখন যাস না। পরে জমা দিস। প্রচুর আউটসাইডার রয়েছে। মনে হচ্ছে বাওয়াল হবে।’

‘আমাকে ধুর পেয়েছিস নাকি?’ চন্দনের হাত ছাড়িয়ে বলল সুরজ। ‘আমরা যাতে নমিনেশান পেপার জমা দিতে না পারি, তার জন্য মৌলালি আর বেলেঘাটার গুন্ডাগুলোকে নিয়ে এসেছিস। শালা অধীর বিশ্বাসের চামচা! তোদের দু’নম্বরি বন্ধ করার জন্য হ্যাপিদাও ছেলে পাঠিয়েছে। আমরা ভয় পাই না। নমিনেশান ফর্ম জমা দেবই। ফোট বে!’

চন্দনের ভীষণ অসহায় লাগছে। মাথায় নানান চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। যেভাবে অ্যাকোয়ারিয়ামে ঘুরপাক খায় লাল-নীল মাছ। সে কি সুরজের সঙ্গে ঝগড়া করে অধীরের পক্ষে যাবে? না সুরজকে সাবধান করে অধীর আর হ্যাপি দু’জনেরই বিরাগভাজন হবে? কলেজের রাজনীতিকে কলেজের গণ্ডিতেই আটকে রাখবে? নাকি বাইরের শক্তির হাতে লাগাম ছেড়ে দেবে?

এইসব চিন্তার মধ্যে চন্দন দেখল, সে আবার সুরজের হাত ধরেছে। বলছে, ‘যাস না। এক ঘণ্টা পরে জমা দিস।’

দূর থেকে বৃন্দা ডাকল, ‘চন্দন, চলে আয়।’

চন্দন দেখল, তার ব্যাচমেটরা লেডি আর্চার্স হোস্টেলের গেটের কাছে পৌঁছে গেছে। ওরা সবাই নিরাপদ দূরত্বে। সুরজের সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সে আবার চলে এসেছে যুযুধান দুই পক্ষের মধ্যে। দুই কনস্টেবল লাঠি তুললেও তাদের চোখেমুখে আতঙ্ক। তপন দৌড়ে এসে চন্দনকে বলল, ‘তুমি এখান থেকে যাও!’

ভীত, সন্ত্রস্ত, আতঙ্কিত চন্দন শুনল হ্যাপি তিওয়ারি ঠান্ডা, কেজো গলায় বলল, ‘বাবলু, ঠোক দে সালে কো।’

পরবর্তী ঘটনাগুলো ঘটল স্লো-মোশানে। অথবা চন্দনের মস্তিষ্ক এতটাই সক্রিয় ছিল যে চারপাশে অত্যন্ত দ্রুত ঘটে যাওয়া ঘটনাবলী দেখতে পেল টুকরো টুকরো দৃশ্য হিসেবে। যেমন…

হ্যাপির পিছনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি ছেলে চন্দনের দিকে মুঙ্গেরি ওয়ান-শটার তাক করে শ্বাপদের গতিতে এগিয়ে আসতে লাগল। এই ছেলেটির নামই তাহলে বাবলু! হ্যাপি তিওয়ারির নির্দেশ পালন করছে দলীয় সৈনিক।

কিছু ছেলে হঠাৎ স্লোগান দেওয়া শুরু করল। ‘নবযুগ পার্টি জিন্দাবাদ! মৃন্ময় চ্যাটার্জি জিন্দাবাদ! জনমোর্চা হায় হায়! সন্দীপ সামন্ত হায় হায়!’

অন্য পক্ষ ছেড়ে কথা বলার লোক নয়। তারাও শুরু করল, ‘জনমোর্চা জিন্দাবাদ! নবযুগ পার্টি মুর্দাবাদ!’ রুলিং ও বিরোধী পার্টির স্লোগান ও পালটা স্লোগানে সরগরম হয়ে গেল এলাকা। চন্দন শুনছে…

চিকনা বেল্টের খাঁজ থেকে বার করেছে ওয়ান শটার। এইটাই কি সে চন্দনের কাছে রেখে যেতে চেয়েছিল? ওয়ান শটারের বাঁট দিয়ে সুরজের মাথার পিছনে মারল চিকনা। ছ’ফুট দু’ইঞ্চি লম্বা সুরজ কাঁপতে কাঁপতে রাস্তায় পড়ে গেল। চন্দন দেখছে…

বাবলু ক্রমশ চন্দনের দিকে এগিয়ে আসছে। ভিড়ের জন্য সে লক্ষ্য ঠিক করতে পারছে না। ঠ্যালাঠেলির জন্য তার হাত লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে বারবার। চন্দন দেখছে…

চিকনার পরবর্তী লক্ষ্য এক কনস্টেবল। ওয়ান শটারের বাঁটের আঘাতে সেও উল্টে পড়ল। তার হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে চিকনা এলোপাথাড়ি চালাতে শুরু করল। এই ভিড়ে কলেজের ছেলে বলতে চন্দন আর সুরজ। সুরজের সঙ্গী প্রবাল আর দীপ আগেই পালিয়েছে। সঞ্জয় চিকনার লাঠির বাড়ি খেয়ে ছিটকে পড়েছে। মাথা থেকে ঝরঝর করে রক্ত বেরোচ্ছে। মাথা চেপে ধরে সে উঠে বসার চেষ্টা করছে। চন্দন দেখছে…

বাবলু এখন চন্দনের থেকে পাঁচ হাত দূরে। তার দৌড় বন্ধ হয়নি। তার নিশানায় এখনও চন্দন। হ্যাপি তিওয়ারি আবার বলল, ‘বাবলু, ঠোক ডাল সালে কো!’ চন্দন শুনছে…

চন্দনের থেকে তিন হাত দূরে দাঁড়িয়ে বাবলু ওয়ান শটারের নল তাক করল। আশেপাশে কেউ নেই। বাবলুর হাত স্থির। চন্দন দেখছে…

তপন দ্বিতীয় কনস্টেবলের হাত থেকে লাঠি কেড়ে নিয়ে বাবলুর পায়ের হাড় লক্ষ্য করে চালালেন। মট করে একটা শব্দ হল। বাবলু সেখানেই বসে পড়ল। তার হাতের ওয়ান শটার এখন মাটিতে পড়ে রয়েছে। চন্দন দেখছে…

রক্তাক্ত মাথা চেপে ধরে সুরজ উঠে দাঁড়িয়েছে। চন্দন দৌড়ে সুরজের কাছে গেল। বলল, ‘আয়! পালাই।’ সুরজ পিছন ফিরে দেখল তার দলের কেউ কোথাও নেই। চন্দনের হাত ধরে সে উঠে দাঁড়াল।

এই সময় খুব কাছাকাছির মধ্যে পরপর তিনটে বোমা ফাটল। বোমার স্প্লিন্টার এসে বিঁধল চন্দনের পায়ে, সুরজের হাতে। চন্দন আবার শুনতে পেল হ্যাপির কণ্ঠস্বর, ‘বাবলু, ঠোক!’

ধোঁয়া। বারুদের গন্ধ! রক্ত! পুলিশ জিপের হুটারের ওঁয়া ওঁয়া! স্লোগান। তার মধ্যে চিকনা ওয়ান শটার তাক করে দৌড়চ্ছে হ্যাপি তিওয়ারির দিকে। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের সামনের রাস্তা এখন যুদ্ধক্ষেত্র। ছেঁড়া চপ্পল, ফেস্টুন, ব্যানার, পুলিশের লাঠি, আগ্নেয়াস্ত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে এদিক ওদিকে। প্রিজন ভ্যান থেকে নামছে একের পর এক র‌্যাফ। জলপাই সবুজ উর্দি পরা, মাথায় হেলমেট, হাতে ঢাল আর লাঠি নিয়ে তারা বেধড়ক মারধর শুরু করছে। আশেপাশে কথাও একটা টিয়ার গ্যাসের শেল ফাটল। আবার ধোঁয়া। ভয়ঙ্কর চোখ জ্বালা করছে। তার মধ্যে চন্দন দেখতে পেল বাবলু পা ভাঙা অবস্থায় বসে বসে চিকনাকে টার্গেট করে গুলি চালাল।

ফটাস করে আওয়াজ হল। যেন কেউ কোল্ড ড্রিঙ্কের বোতল খুলল। চিকনা অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে বাবলুর দিকে তাকিয়ে। দৃষ্টি অবিকল রেখে রক্তের গার্গল করতে করতে আছড়ে পড়ল রাস্তায়। সারা শরীর জুড়ে শুরু হল প্রবল খিঁচুনি। কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে করতে মরে গেল চিকনা।

এখন না হলেও আধঘণ্টা বাদে সে শহীদের মর্যাদা পাবে। বাজার দখলের লড়াইতে গুন্ডার মৃত্যু—এই ঘটনায় রাজনৈতিক মতাদর্শের চোলাই যুক্ত হলে সেই মৃত্যুকে বলা হয় শহীদের মৃত্যু। ‘শহীদের রক্ত, হবে নাকো ব্যর্থ। কমরেড চিকনা অমর রহে’—এই স্লোগান সহযোগে মিছিল বেরোতে মাত্র কয়েক ঘণ্টা বাকি।

কিন্তু এখন কী হচ্ছে? এখন চন্দনের চোখ জ্বালা করছে। সুরজের হাত ধরে পালাতে গিয়ে সে দেখল, তার ঠিক সামনে পা-ভাঙা বাবলু বসে। জিন্‌সের পকেট থেকে সে বার করেছে আর একটা মুঙ্গেরি ওয়ান শটার। চন্দনের নাকের ডগায় সাপের ফণার মতো নাচছে ওয়ান শটারের নল। চন্দন দেখছে…

‘অ্যাই শুয়োরের বাচ্চা। ওর গায়ে হাত দিস না। ও আমার ছেলে।’ একলাফে চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ালেন তপন। তাঁর হাতে লাঠি। মাথায় র‌্যাফেদের কাছ থেকে জোগাড় করা হেলমেট। বাবলুকে তাক করে লাঠি তুললেন তিনি।

বাবলু বোকার মতো হাসল। ঘোলাটে চোখে চন্দনকে মেপে নিয়ে ওয়ান শটারের ট্রিগার টিপল। ঘোড়া টেপার অব্যর্থ মুহূর্তে তপন চন্দনের সামনে দাঁড়িয়ে তাকে বুক দিয়ে আগলালেন।

বন্দুক থেকে গুলি একবার বেরিয়ে গেলে আর ফেরত আসে না। সে কিছু না কিছু ফুঁড়ে যায়। ওয়ান শটারের গুলি তপনের বুক ফুঁড়ে দিল। সাদা টিশার্ট রক্তে ভিজে শপশপ করছে। তপনের চোখে অবিশ্বাসীর দৃষ্টি। তিনি আস্তে আস্তে পড়ে যাচ্ছেন।

চন্দন চিৎকার করল, ‘কে কোথায় আছ! এঁকে এমার্জেন্সি নিয়ে চলো। এঁর বুকে গুলি লেগেছে।’

তপন শূন্যে চোখে বললেন, ‘আমার… বাড়িতে… খবর! ছেলেকে…খবর…’

তপনকে জড়িয়ে ধরে চন্দন হাউহাউ করে কাঁদছে। তার আশেপাশে এখন র‌্যাফ ছাড়া কেউ নেই। পা-ভাঙা বাবলু ল্যাংচাতে ল্যাংচাতে এজেসি বোস রোড ধরে গায়েব হয়ে যাচ্ছে।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *