হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ৫

৫. বৃন্দা

মহারাষ্ট্রের সব চেয়ে বড় উৎসব গণেশ চতুর্থী। লং শটে দেখা যাচ্ছে, হাজার হাজার লোক হাঁক পাড়ছে ‘গণপতি বাপ্পা মোরিয়া।’ আকাশে লাল আবির আর হলুদ গুলাল। হাফ প্যান্ট আর টাইট বেনিয়ান পরা রঙিন যুবকের দল তৈরি করছে হিউম্যান পিরামিড। লক্ষ্য, ‘মটকা’ ভাঙা।

মৃদঙ্গ এবং ঢাকের শব্দে কান ঝালাপালা হওয়ার জোগাড়। হঠাৎ দেখা গেল অজস্র মানুষের ভিড় দু’ভাগ হয়ে যাচ্ছে। কেননা মটকা ভাঙার জন্য স্লো মোশনে দৌড়ে আসছে বিজয় দীননাথ চৌহান ওরফে হৃত্বিক রোশন। হাঙরের পাখার মতো নাক, সমুদ্রের মতো সবুজ আর গভীর চোখ। ছেনি দিয়ে কোঁদা চোয়াল। শরীরটি কুমোরটুলিতে অর্ডার দিয়ে বানানো। সুরজ জোরসে সিটি মেরে হল কাঁপিয়ে চিৎকার ছাড়ালো, ‘হৃত্বিকনে কেয়া বডি বানায়া!’ সুরজের সিটি শুনে চমকে উঠল বৃন্দা। লোকে এই রকম কী করে পারে? তাকেও শিখতে হবে।

বৃন্দা আর দময়ন্তী জীবনদার ক্যান্টিনে আড্ডা মারছিল। হঠাৎ জেম্‌সি এসে দু’জনকে পাকড়াও করে ট্যাক্সিতে তুলল। এজেসি বোস রোড ধরে ট্যাক্সি দৌড়ল বেকবাগানের দিকে। এলগিন রোডে ফোরামের সামনে নেমে বৃন্দা দেখে তাদের ব্যাচের অনেকেই উপস্থিত। সুরজ, প্রবাল, দীপ, সবুজ আর সঞ্জয় তো আছেই। শ্রীপর্ণা, সাবিনাও হাজির। বৃন্দা সুরজকে প্রশ্ন করল, ‘চন্দন এল না?’

‘ও শালা ভাও খাচ্ছে। আসতে বললাম, এল না। আমি আর মাসকা মারতে পারব না।’ উত্তর দিল সুরজ।

বৃন্দা দময়ন্তীর দিকে তাকাল। সুরজকে মেয়েটা অ্যাভয়েড করে। আজ উপায়হীন ভাবে এসেছে। এখন শূন্য দৃষ্টিতে রাস্তার দিকে তাকিয়ে রয়েছে।

সুরজ টিকিট কাটতে যাওয়ার পরে সঞ্জয় বৃন্দার দিকে তাকিয়ে শুকনো হেসে বলল, ‘অভি আসেনি?’

‘ও লাইব্রেরিতে বসে আমার প্র্যাকটিকাল খাতায় ডায়াগ্রাম আঁকছে,’ বৃন্দা বলে।

সুরজ এর মধ্যে দশখানা টিকিট কেটে এনেছে। মুচকি হেসে বলল, ‘স্পেশাল টিকিট কাটলাম।’

‘কীরকম?’ জিজ্ঞাসা করে সাবিনা, ‘সবগুলো আইল সিট?’

‘নাহঃ!’ চোখ মেরে সুরজ বলে, ‘বললাম পাশের সিটটা যেন লেডিস সিট হয়।’

‘ভ্যাট! খালি বাজে কথা!’ সুরজকে মারতে যায় শ্রীপর্ণা। সুরজ টিকিট নাচিয়ে বলে, ‘মারাপিটি বাদ মে হোগা। পিকচার শুরু হোনেওয়ালা হ্যায়। সব কোই অন্দর চলো।’

মালটিপ্লেক্সের একদম পিছনের রোয়ের দামি টিকিট কেটেছে সুরজ। জেম্‌সিকে বসাল দেওয়ালের দিকে। নিজে বসল জেম্‌সির পাশে। চ্যালা সঞ্জয়কে বসাল অন্য পাশে। ব্যারিকেড কমপ্লিট। বাকি ছেলেমেয়েরা ব্যারিকেডের অন্যদিকে। দময়ন্তী বসল বৃন্দার পাশে। সে-ই একমাত্র আইল সিট পেয়েছে।

মূল ‘অগ্নিপথ’ সিনেমাটা বৃন্দা টিভিতে দেখেছে। অমিতাভ বচ্চন বিজয় দীননাথ চৌহানের ভূমিকায় অভিনয় করেছিলেন। তবে এই সিনেমাটায় ভায়োলেন্স বড্ড বেশি।

‘চিকনি চামেলি’ গানটা শুরু হল। ক্যাটারিনা কাইফের হিপ শেকিং শাকিরাকেও লজ্জায় ফেলবে। মাল্টিপ্লেক্সের অভিজাত দর্শকরা সিটি মারছে, তালি দিচ্ছে। পুরোনো দিনের মতো ঠনঠন করে খুচরো পয়সা পড়ছে। সুরজ আর সঞ্জয় সিটের ওপরে জামা খুলে নাচছে। নাচছে জেম্‌সি আর শ্রীপর্ণাও।

এই গান শুনে, এই নাচ দেখে তারও কি নাচা উচিত? নিজেকে প্রশ্ন করে বৃন্দা। এটা কি নারী শরীরের কমোডিফিকেশন নয়? এই গান দেখে এবং শুনে অনুপ্রাণিত হয়ে রাস্তার ছেলেরা যদি তাকে ‘ওয়ে চিকনি’ বলে আওয়াজ দেয় তা হলে কার দোষ? ছেলেটার? না যারা ছবিটা বানিয়েছে তার? না যারা ছবিটা টিকিট কেটে দেখে প্রযোজকের পকেট ভরাচ্ছে তাদের? বৃন্দা বুঝতে পারে না। সে দময়ন্তীর দিকে তাকায়। দেখে, দময়ন্তী ভুরু কুঁচকে মাথা নীচু করে বসে। কিছু দেখছে না।

গান শেষ। আবার ধুমধাড়াক্কা শুরু। তিনঘণ্টা সিনেমায় ক্রমাগত ভায়োলেন্স আর রক্তপাত দেখে বৃন্দার মাথা ধরে গেছে। হল থেকে বেরিয়ে বলল, ‘তাড়াতাড়ি কিছু খাইয়ে আমাকে তোরা ছেড়ে দে। বাড়ি যাব। খুব মাথা ব্যথা করছে।’

সুরজ সহমত হল। বলল, ‘ইতনা ভায়োলেন্স দিখানে সে অন্দর মে ঘুটন সা আ জাতা হ্যায়। আই নিয়ারলি পিউক্‌ড।’

‘স্টপ টকিং অ্যাবাউট পিউকিং। আমরা এখন খাব।’ সাবিনা সুরজের পিঠে চাঁটি কষায়।

ফুডকোর্টে ঢুকে সবাই মিলে এত হল্লাগুল্লা শুরু করল যে ওয়েটার শশব্যস্ত হয়ে কোনের দিকের একটা টেবিল ফাঁকা করে দিয়ে বলল, ‘আপনারা এখানে বসুন।’

‘এখানে সেল্‌ফ সার্ভিস না?’ মেনু কার্ড তুলে ভুরু নাচায় শ্রীপর্ণা।

‘ইয়েস ম্যাম, কিন্তু আমরা প্রতি আওয়ারে একটা গ্রুপকে সারপ্রাইজ দিচ্ছি। আপনাদের উঠতে হবে না। আমরাই সার্ভ করব।’ হাসিমুখে বলে ওয়েটার।

‘ঢপ মেরোনা মান্তু-ছোনা!’ ওয়েটারকে চোখ মেরে শ্রীপর্ণা বলে, ‘আমরা তোমাদের এখানে ঢুকে বাওয়াল করছি, আমাদের চিৎকারে কাস্টমাররা পালাচ্ছে, তাই এই গিফ্‌ট। এনিওয়ে, মেনু কার্ডে তোমার নাম নেই কেন? ডেজার্ট হিসেবে আমার প্লেটে আমি তোমাকে চাই। চেটে চেটে খাব। এখন এখান থেকে ফোটো, চিকনা।’

যুবক ওয়েটারটির গাল লাল। সে পিছু হটে কিচেনে মিলিয়ে গেল। সুরজ বলল, ‘গাইজ অ্যান্ড গ্যাল্‌স! দিস ট্রিট ইজ অন মি। কে কী খাবে?’

‘ভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব?’ জানতে চায় বৃন্দা। পেটমোটা মানিব্যাগ থেকে ক্রেডিট কার্ড বার করে টেবিলে রেখে সুরজ বলে, ‘বিন্দাস বোল। কোই চাপ নহি হ্যায়।’

সাবিনা বলল, ‘পিৎজা বলি?’

‘আমি ইতালিয়ান পাউরুটি খাব না।’ প্রতিবাদ করে জেম্‌সি। ‘ঘাসফুসও খেতে পারব না। তোরা বিয়ার অর্ডার কর। তার সঙ্গে কোনও চাইনিজ ডিশ।’

‘ঘাসফুসটা কী বস্তু?’ জানতে চায় সবুজ।

বৃন্দা বলে, ‘ভেজিটেরিয়ান ফুডকে জেম্‌সি ‘ঘাসফুস’ বলছে। বাংলায় যাকে বলে শাকাহারী।’

‘তুই বল সবুজ,’ জানতে চায় জেম্‌সি, ‘কমিউনিটি মেডিসিনে তো আমরা ফুড পিরামিড পড়ছি। ফুড চেনের একদম নীচে আছে শ্যাওলা, প্রবাল – এই সব জিনিস। তার ওপরে আছে তারা, যারা নীচের স্তরকে খেয়ে বেঁচে থাকে। যত ওপরে উঠবি, তত পপুলেশান কমবে। যে কারণে স্ট্রাকচারটা পিরামিডের মতো। চওড়া বেস, ন্যারো টিপ। সেই টিপে অবস্থান মানুষের। এত ওপরে সে কী ভাবে উঠল? নীচের সবাইকে খেয়ে খেয়ে। ইভলিউশান অনুযায়ী মানুষ সর্বভুক। হঠাৎ করে মাছ-মাংস ত্যাগ করলে হবে?’

‘হাম ভেগান হ্যায়!’ দাবি করে সঞ্জয়। মিল্ক অ্যাড ডেয়ারি প্রোডাক্টস ভি নহি খাতা হ্যায়।’

‘ভিএলএমএল কাকে বলে জানিস?’ হঠাৎ প্রশ্ন করে দময়ন্তী।

‘বলে দে।’ বলল সঞ্জয়।

দময়ন্তী বলল, ‘সারা বিশ্বে ভেজিটেরিয়ানিজমের নানা ভাগ আছে। যেমন ল্যাক্টো-ভেজিটেরিয়ানিজম বা ওভো-ল্যাক্টো-ভেজিটেরিয়ানিজম। প্রথম গ্রুপটা মিল্ক অ্যান্ড ডেয়ারি প্রোডাক্টস খায়। দ্বিতীয় গ্রুপ দুধের সঙ্গে ডিম খায়। এদের বিশ্বাসের ভিত্তি হল প্রাণী হত্যা না করে আহার করা। এরা মনে করে দুধ এবং ডিম খেলে প্রাণী হত্যা করা হল না। ইয়োরোপে ভেজিটেরিয়ান বলতে ওভো-ল্যাক্টো-ভেজিটেরিয়ান মিন করা হয়। এয়ারলাইন ইন্ডাস্ট্রিতে ভিএলএমএল একটা চালু টার্ম। প্লেনের টিকিট কাটতে গেলে ফুড প্রেফারেন্সে এটা থাকে। এর মানে, ভেজিটেরিয়ান ল্যাকটো-ওভো মিল।’

‘আচ্ছা আচ্ছা, আমরা জানি যে তোর অনেক দেশ ঘোরা। এবার থাম।’ দময়ন্তীকে আওয়াজ দেয় সাবিনা, ‘সুরজ, সঞ্জয় আর আমি ঘাসফুস খানেওয়ালা। হমলোগোঁকো লিয়ে কেয়া হ্যায়?’

সাবিনার কটুক্তিতে দময়ন্তীর মেজাজ গরম হয়ে যায়। সারাক্ষণ সুরজের কাছাকাছি থাকা, সেক্স আর ভায়োলেন্সে ভরপুর একটা সিনেমা দেখা, সাবিনার বাঁকা কথা—সব মিলিয়ে দময়ন্তীর মাথায় রাগের উনুনে একপাঁজা কয়লা ঢালল কেউ। অল্প কেরোসিন ছড়াল। জ্বলন্ত দেশলাই কাঠি গুঁজল। দপ করে আগুন জ্বলে উঠল মাথায়।

সুরজ এর মধ্যে অন্য এক ওয়েটারকে পাকড়েছে। সে এসে সবাইকে বিয়ার দিয়ে গেল। চারটে প্লেটে দিয়ে গেল মশলাদার চানাচুর, চিপ্‌স, বাদাম। সাবিনা ওয়েটারকে ডেকে দশজনের জন্য ভেজ আর নন ভেজ মিলিয়ে মেনু বলে দিল। সকলে মিলে গান ধরল, ‘হ্যাপি বার্থডে টু ইউ।’

ফটাফট হাততালির মধ্যে ওয়েটারটি কোথা থেকে একটা পুঁচকে কেক যোগাড় করে এনেছে। তার ওপরে একটাই মোমবাতি জ্বলছে। ফুডকোর্টের ম্যানেজার দেঁতো হাসি হেসে সবাইকে একটা করে রাংতা দিয়ে তৈরি রঙিন টুপি দিল। সেই টুপি পরে সুরজ কেক কাটল। ম্যানেজার কেকের থেকেও পুঁচকে একটা ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলে নিল। বৃন্দা আন্দাজ করল, বিলের সঙ্গে এই ছবির প্রিন্ট আউট ফ্রেমবন্দি হয়ে আসছে, ভ্যালু অ্যাডেড সার্ভিস হিসেবে।

দুই ওয়েটার একগাদা প্লেট নিয়ে এসেছে। বৃন্দা দ্রুত চোখ বোলায়। নিরামিষাশীদের জন্য সাবিনা উত্তর ভারতীয় খাবার অর্ডার করেছে। লাচ্ছা পরোটা, কালি ডাল, পালক পনির আর পঞ্চমেলা কা সবজি। সঙ্গে স্যালাড আর রায়তা। নন ভেজ ডিশের ব্যাপারে সাবিনা চিনপন্থী। মিক্সড ফ্রায়েড রাইস, মিক্সড চাউমিন, সেজুয়ান চিকেন, লেমন চিকেন, চিকেন সুইট অ্যান্ড সাওয়ার।

বিয়ারে চুমুক দিয়ে বৃন্দা বলল, ‘থ্যাংক্স সুরজ ফর দ্য ট্রিট।’

‘মাই প্লেজার।’ ঠোঁট থেকে বিয়ারের ফেনা মুছে সুরজ বলল, ‘তোর মা, আই মিন আন্টির সিনেমাটা করে রিলিজ করবে? ওই সিনেমার প্রিমিয়ার শোতে আমরা যাব। দ্যাট উড বি মাই ফার্স্ট বেঙ্গলি ফিল্ম ভিউইং।’

‘পোস্ট প্রোডাকশানের কাজ চলছে। কবে রিলিজ করবে জানি না। গত দু’বছরে তুই একটাও বাংলা সিনেমা দেখিসনি?’ বৃন্দা অবাক।

‘নাহ! তোরা বড্ড বেশি কালচার মাড়াস। নো ঢিসুম ঢিসুম, নো সেক্স।’

‘আই বেগ টু ডিফার।’ জেম্‌সি আপত্তি করে, ‘বাংলা সিনেমায় এখন হেব্‌বি সেক্স থাকে। একেকটা ছবি তো নিয়ার পর্নোগ্রাফি। বেডরুম থেকে ক্যামেরাম্যান বেরোতেই চায় না।’

‘এই সিনেমাটাতেও প্লেনটি অফ সেক্স আছে। মাকে তিনটে কিসিং সিন করতে হয়েছে। মা বলছিল লেসবিয়ান আন্ডারটোনও আছে।’ লেমন চিকেন নিয়ে বলে বৃন্দা।।

‘কী নাম যেন সিনেমাটার? কাগজে দেখছিলাম…’ সুরজের পাশ থেকে সঞ্জয় বলে।

‘বিধবাপুকুর। ইটস আ পিরিয়ড মুভি। যখন বহুবিবাহ চালু ছিল, তখন একজন ব্রাহ্মণ একাধিক মেয়েকে বিয়ে করত। নব্বই বছরের বুড়োর আশিটা বিয়ে, সব থেকে ছোট বউয়ের বয়স দশ—এমন উদাহরণও আছে। সে বুড়ো মরলে একসঙ্গে অনেক মেয়ে বিধবা হত। সতীদাহ তখন ফুল ফর্মে। প্রপাটির লোভে আত্মীয়রা মেয়েটাকে জ্বালিয়ে দিত। এইসব অত্যাচার থেকে বাঁচতে বিধবারা গলায় দড়ি-কলসি দিয়ে পুকুরে ডুবে সুইসাইড করত। একটা পুকুরে একাধিক বিধবার সুইসাইডের ঘটনা ঘটত। সেইরকম একটা পুকুরের গপ্‌পো নিয়ে এই সিনেমা।’

‘ইন্টারেস্টিং!’ সুরজ বলে, ‘এর শুটিং কোন একটা গ্রামে হল না? বাঁজাপলাশ না কি যেন নাম?’

‘ভালোই তো বাংলা শিখেছ বাছা! কায়দা করে, “কী যেন নাম” বলার কী আছে?’ আওয়াজ দেয় বৃন্দা।

‘আন্টির সিনেমার আউটডোর লোকেশান বলে নয়। দ্যাট ভিলেজ ইজ ইন নিউজ ফর ডিফারেন্ট রিজ্‌ন। হোয়াট ডু ইউ থিংক অ্যাবাউট দ্যাট বৃন্দা।’ সুরজ হঠাৎ সিরিয়াস।

‘প্লিজ সুরজ, বার্থডে পার্টিতে ট্রিট দিতে এনে পলিটিক্স করিস না। ইটস চিপ।’ আপত্তি করে শ্রীপর্ণা।

‘ইস মে চিপওয়ালা কেয়া হ্যায়?’ সঞ্জয় আলোচনায় যোগদান করেছে, ‘যে গর্ভনমেন্ট নিজেকে গরিবের বন্ধু বলে, সে একদল গরিবকে লাথ মেরে সরিয়ে ক্যাপিটালিস্টকে বসতে দিচ্ছে। এটা বললেই দোষ?’

দময়ন্তী চুপ করে শুনছে।। সঞ্জয় এবং সুরজ যা বলছে, সে তার সঙ্গে একমত। তাহলে তার মাথায় রাগের উনুনে আগুন দপদপিয়ে জ্বলছে কেন? বিলু বলেছিল বৃন্দাকে কনভিন্স করে পিএমএফ-এর দিকে টানতে। সেই কাজটা দময়ন্তী করার আগে নবযুগ পার্টি করে ফেলেছে বলে তার রাগ? তাই হবে। কথা ঘোরানোর জন্য দময়ন্তী বলে, ‘লেমন চিকেনটা একটু দে তো!’

খাবার নিয়ে কথা শুরু হতে, আলোচনা ঘুরে গেল। ছেলেরা আর একবার বিয়ার নিল। মেয়েরা একটা বিয়ার নিয়েই খুশি। দ্বিতীয় বিয়ার না নিলেও তারা সুরজকে বাধ্য করল মিনারেল ওয়াটার কিনে দিতে। দু’ঘণ্টার পানভোজন, আড্ডা আর গজল্লার শেষে বিল হল চার হাজার টাকা।

‘খুব একটা কস্টলি নয় তো!’ মৃদুস্বরে বলে বৃন্দা।

‘তা নয়।’ বৃন্দার হাত ধরে দময়ন্তী বলে, ‘কী ভাবে বাড়ি ফিরবি? গা দিয়ে বিয়ারের গন্ধ বেরোচ্ছে।’

‘ওটা আমি ঠিক করে রেখেছি। ওয়াশরুমে গিয়ে সারা গায়ে ডিও ছড়াবো। একটা মিন্ট ফ্লেভারড চিউইং গাম খাব। এখান থেকে বেরিয়ে তুই আর আমি হাঁটতে হাঁটতে এক্সাইড মোড় পর্যন্ত যাব। ওখান থেকে আমি মেট্রো ধরব। তুই মৌলালির বাস ধরিস। বাড়ি পৌঁছনোর আগে বিয়ারের গন্ধ হাপিশ!’

‘আরিব্বাস! এক বছর আগেও কলকাতায় কিছু চিনতিস না। নিজের বাড়ি, মর্ডান হাই স্কুল আর ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজ – এই তিনটে জায়গায় গাড়িতে ঘোরাঘুরি করতিস। এখন সব রুটের লিস্টি দিয়ে দিচ্ছিস?’

দুই বন্ধুতে খিলখিল করে হেসে নেয়। ওয়াশরুমে ঢুকে ফ্রেশ হয়ে যখন বেরোচ্ছে তখনও হাসিপর্ব চলছে। প্রবাল বলে, ‘আমরা ট্যাক্সি করে হোস্টেলে ফিরব। তোরা আসবি তো?’

‘না। আমি বাড়ি যাব।’ জানায় বৃন্দা।

‘আমিও বাড়ি যাব।’ বলে দময়ন্তী।

‘দময়ন্তী আমাদের সঙ্গে আয়।’ ট্যাক্সির দরজা খুলে বলে শ্রীপর্ণা। ‘প্রবাল আর দীপ আমাদের ট্যাক্সিতে থাকবে। জেম্‌সি, সাবিনা, সঞ্জয় আর সুরজ অন্য ট্যাক্সিতে উঠে গেছে।’

‘দরকার নেই। আমি বৃন্দাকে রবীন্দ্রসদন মেট্রো স্টেশনে ড্রপ করে দেব। তোরা যা।’ হাত নাড়ে দময়ন্তী।

‘অ্যাজ ইউ উইশ।’ ফরাসি কায়দায় কাঁধ ঝাঁকিয়ে ট্যাক্সিতে ওঠে শ্রীপর্ণা। দুটো ট্যাক্সি এলগিন রোড ধরে এগিয়ে যায়। নিজের ব্যাগ হাঁটকে মিন্ট চুইংগাম বার করে দময়ন্তীর হাতে একটা দিয়ে, নিজের মুখে একটা ফেলে বৃন্দা বলল, ‘সিনেমাটা ভালোই। রওফ লালার রোলে ঋষি কপুর খুব ভালো অ্যাক্টিং করেছেন।’

‘হৃতিকও ভালো। তবে ওর ডায়ালগ ডেলিভারি আমার ভালো লাগে না। হাঁসের মতো প্যাঁকপ্যাঁক করে কথা বলে। মনে হয় মুখস্থ বলছে।’

‘কোথায় যেন পড়েছিলাম যে ছোটবেলায় ডুগ্‌গুর ডিসলেক্সিয়া ছিল।’ কথা বলতে বলতে দুই বান্ধবী ফ্যাব ইন্ডিয়ার শো-রুমের পাশে। দু’জনে কিছুক্ষণ উইনডো শপিং করে। বৃন্দা বলে, ‘এখানে খুব ভালো কুর্তি পাওয়া যায়। কিনবি?’

‘ফ্যাব ইন্ডিয়া পরে গায়ে কালশিটে হয়ে গেছে।’ মুখ ভেটকে বলে দময়ন্তী, ‘দিল্লিতে থাকার সময় মা হজ খাসের ফ্যাব ইন্ডিয়া আউটলেট থেকে সব কিনত। মায় অর্গ্যানিক সাবান আর শ্যাম্পু পর্যন্ত। বাবা প্রায়ই বলত, আমাকেও নাকি মা ফ্যাব ইন্ডিয়া থেকে এনেছে।’

‘ভাট বকিস না। আয়।’ বৃন্দা দোকানে ঢুকে পড়েছে। দুটো পার্পল রঙের কুর্তি বেছে একটা দময়ন্তীর হাতে ধরিয়ে বৃন্দা বলে, ‘ট্রায়াল দিয়ে আয়।’

‘তুই গিফ্‌ট করছিস? সিওর? আমার কাছে কিন্তু পয়সা নেই।’ চোখ পাকায় দময়ন্তী। তার মাথার রাগের উনুনে এখন কয়লা কম। ধোঁয়া বেরোনো বন্ধ আছে।

‘হ্যাঁ বাবা হ্যাঁ। তুই যা।’ দময়ন্তীকে ধাক্কা দেয় বৃন্দা। ট্রায়াল রুমে ঢুকে পোশাক বদলে বাইরে বেরিয়ে দময়ন্তী বলে, ‘কেমন লাগছে? লাইক সিন্ডারেলা?’

‘একদম একদম!’ বাসন্তী রঙের একটা পাঞ্জাবি নাড়াচাড়া করতে করতে বলে বৃন্দা।

‘এবার তুই যা।’ বৃন্দাকে ঠেলা দেয় দময়ন্তী। ট্রায়াল রুমে ঢোকার আগে বৃন্দা বলে, ‘এই পাঞ্জাবিটা কেমন রে?’

বাসন্তী রঙা পাঞ্জাবির দিকে তাকিয়ে দময়ন্তী বিড়বিড় করে বলে, ‘ভালোই তো!’ আবার তার মেজাজ গরম হচ্ছে। কেন কে জানে! একটা অ্যালোপাম খেয়ে নেবে নাকি?

দুটো কুর্তি আর একটা পাঞ্জাবি কিনতে দেড় হাজার টাকা লাগল। টাকা মিটিয়ে আবার দুই সই ফুটপাথে। ‘সাবওয়ে’ কোম্পানির স্যান্ডউইচের প্রাণকাড়া গন্ধ টপকে, গোর্কি সদনের সামনে এজেসি বোস রোডে এসে পড়ল। আর মিনিট পাঁচেক হাঁটলে রবীন্দ্রসদন। পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভার হওয়ার পরেও এই চত্বরে জ্যাম কমেনি। অজস্র গাড়ির চাপে শ্বাস ফেলার উপায় নেই। নতুন ফ্লাইওভারগুলো অক্টোপাসের মতো শহরটাকে জাপটে ধরে একটু একটু করে মেরে ফেলছে। ধুলো, ধোঁয়া, কার্বন ডাই অক্সাইডের বিষবাষ্পে শহরের বাতাস ভারী। সন্ধে নামার মুখে কলকাতা শহর কালো রঙের বোরখা পরে নিয়েছে।

নিজাম প্যালেসের সামনের ফুটপাথে বেশ ভিড়। সরু একফালি ফুটপাথের ওপরে পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকান, ভুট্টা পোড়ানোর উনুন, ঘুগনির গামলা, টোস্ট-স্যান্ডুইচের ঠেলা। ভিড় টপকাতে টপকাতে দময়ন্তী বলল, ‘বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিটা কার জন্য কিনলি? অভি?’

‘হ্যাঁ।’ লাজুক হেসে বলে বৃন্দা।

‘আগে আর কখনও কিছু দিয়েছিস?’

‘হ্যাঁ। ওই আর কি! টুকটাক।’

‘অভি তোকে কখনও কিছু দিয়েছে?’

‘এটা কি ‘দেওয়া-নেওয়া’ সিনেমা? স্টারিং উত্তমকুমার অ্যান্ড মিসেস সেন?’

‘না-না। তা কেন? জাস্ট আস্কিং।’

‘আমম…’ সামান্য ভেবে বৃন্দা বলে, ‘আমাকে অনেক কবিতা লিখে দিয়েছে।’

‘দ্যাটস ফাইন। কিন্তু টাকাপয়সা দিয়ে কিনে কিছু দিয়েছে কি?’

‘ইজ দ্যাট ইম্পর্ট্যান্ট?’ বিরক্ত হয়ে বৃন্দা বলে।

‘না। ডেফিনিটলি না।’ থতমত খেয়ে দময়ন্তী বলে, ‘কিছু মনে করিস না বৃন্দা, আমি একটা কথা শুনলাম। শেয়ার না করে পারছি না।’

‘কী?’ হোটেল হিন্দুস্তান ইন্টারন্যাশনাল ফুটপাথে দাঁড়িয়ে পড়ে বৃন্দা বলে, ‘তোর মুখ-চোখ দেখে মনে হচ্ছে, ইউ আর গোইং টু আটার সামথিং হুইচ উইল বি ওমিনাস। কাম অন। শুট।’

‘না…মানে সে রকম কিছু না।’ চিন্তিত মুখে বলে দময়ন্তী। ‘অভি আর বিলুদা সম্পর্কে কয়েকটা কথা শুনলাম। ভাবছি তোকে বলব কি না।’

‘দময়ন্তী, তোর বোধ হয় পারসোনালাটি ডিজঅর্ডার আছে।’ ভুরু কুঁচকে, কণ্ঠস্বরে সারকাজ্‌ম মিশিয়ে বলে বৃন্দা। ‘এমনিতে নরমাল একটা মেয়ে। সুন্দরী, টাফ, ইন্টেলিজেন্ট, গো গেটার…কিন্তু ছেলেদের প্রসঙ্গ এলেই কেমন গুটিয়ে যায়। টিপিকাল আমাদের ঠাকুমার জেনারেশানের মতো। ম্যাদামারা, নেকু-পুষু-মুনু, ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগা, নিতম্বিনী বালিকা বিদ্যালয় থেকে ক্লাস সেভেন পাশ করা ইতুপিসি, বিয়ের পর বর যার দিকে ঘুরেও তাকায় না, যার চোঁয়া ঢেকুর ওঠে, যার মাথার চুল উঠে যাচ্ছে, যার সাদা স্রাব হয়। আই থিংক সুরজের মলেস্টেশনের এফেক্ট এখনও যায়নি।’

‘তাই?’ চশমার আড়ালে দময়ন্তীর চোখ ঝিকমিকিয়ে ওঠে। মাথার মধ্যে উনুন এখন আগ্নেয়গিরি! গলগল করে লাভা বেরিয়ে ঝলসে দিচ্ছে দময়ন্তীকে। দময়ন্তী জানে যে বৃন্দা ঠিক বলেছে। তার মুড সুইং হয় যখন তখন। সুরজের অসভ্যতা একটা ট্রিগার মাত্র। ওটা না হলেও অন্য ট্রিগার তাকে কোনও না কোনও দিন খেপিয়ে দিত। নিজের জিনের ওপরে দময়ন্তীর হাত নেই। কোন মানসিক রোগীরই বা থাকে?

কিন্তু নিজের ওপরে রাগা যায় না। নিজের ওপরে প্রতিশোধ নেওয়া যায় না। তাই, লাভা স্রোতের হাত থেকে নিজেকে বাঁচাতে নীচের ঠোঁট কামড়ে, বাঁকা হেসে দময়ন্তী বৃন্দার গিফ্‌ট করা কুর্তির দিকে তাকায়। গলা খাঁকরে বলে, ‘অ্যালাও মি টু বি ব্লান্ট, রুথলেস অ্যান্ড ক্রুয়েল। আমি শুনলাম, অভি তোর সঙ্গে প্রেম করছে না। প্রেম করছে স্যামি ব্যানার্জির সঙ্গে। হোয়াট হি নিডস ইজ আ রিচ ফাদার ইন-ল। নট আ ডোসাইল ওয়াইফ। সাফল্যের সিঁড়ি ওপরে বেয়ে ওঠার জন্য তুই পয়লা ধাপ।’

হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে বৃন্দা দময়ন্তীর গালে এক থাপ্পড় কষায়। শেষ বিকেলের পথচারীরা অবাক হয়ে দেখে এক তরুণী সমবয়সি অন্য তরুণীকে থাপ্পড় মারল। বলল, ‘ডার্টি বিচ!’

চড় খেয়ে দময়ন্তীর ভাবান্তর হল না। কুর্তির প্যাকেট গালে বুলিয়ে ক্রুর হেসে বলল, ‘পাশাপাশি এটাও শুনলাম, বিলুদা আমাকে তোল্লাই দিচ্ছে ড্যানিয়েল আর্চার আর শক্তিরূপা সেনগুপ্তর জামাই হওয়ার জন্য। আমিও তোর মতো মইয়ের প্রথম ধাপ।’

বৃন্দা নিজের অনুভূতিগুলোকে গোছাতে না পেরে দাঁত দিয়ে নখ কাটছে, চুল ঠিক করছে, নাক মুছছে, প্যাকেট হাত বদল করছে। লজ্জা, রাগ, ঘৃণা, বিরক্তি, অসহায়তা একসঙ্গে খেলা করছে তার কোঁচকানো ভুরুতে আর লালচে নাকে। হিসহিস করে সে বলল, ‘ “আমি শুনলাম” বলছিস কেন? কার কাছ থেকে শুনলি? হু ইজ দ্যাট বাগার?’

‘যদি আমায় পাবলিকলি না মারতিস, তাহলে বলে দিতাম। আর বলব না। সন্দেহের ক্যাকটাস গাছ যে তোর মনে পুঁততে চায়, তাকে আমি আড়ালে রাখব। তার নাম আমি তোকে কোনও দিনও বলব না। আমি চাই যে আজীবনকাল, প্রতি মুহূর্ত তুই দগ্ধে দগ্ধে মর। এটাই আমার প্রতিশোধ। এনিওয়ে, বাকি রাস্তা তুই একা চলে যা। আমার এখন তোর সঙ্গে হাঁটতে ইচ্ছে করছে না। অ্যান্ড, থ্যাংকস ফর দ্য কুর্তি।’ বৃন্দার দিকে আগুনে দৃষ্টি হেনে রাস্তা পেরোয় দময়ন্তী। ফ্লাইওভারের নীচে যে উঁচু ডিভাইডার আছে, সেটা একলাফে পেরিয়ে হাঁক পাড়ে, ‘ট্যাক্সি!’

আর বৃন্দা? সে এখনও নিজাম প্যালেসের ফুটপাথে একা দাঁড়িয়ে। পথচারীরা অবাক হয়ে দেখছে, ডল পুতুলের মতো সুন্দর একটা মেয়ে, বাসন্তী রঙের পাঞ্জাবিতে মুখ গুঁজে হাউহাউ করে কাঁদছে। চোখের জলে ভিজে যাচ্ছে পাঞ্জাবি, পাঞ্জাবির প্যাকেট, ফুটপাথ। বৃন্দার কান্না দেখবে না বলে পথচারীরা অন্যদিকে মুখ করে সিগারেট টানছে, ভুট্টাওয়ালা মন দিয়ে ভুট্টার দিকে তাকিয়ে, ট্রাফিক পুলিশ ক্যামাক স্ট্রিটের যানজট সাফ করতে ব্যস্ত। ঘুগনিওয়ালা ডেকচির ঢাকনা লাগিয়ে মোবাইলে কার সঙ্গে কথা বলতে লাগল, সিগারেটের দোকানি নতমুখে খুচরো গুনতে লাগল। বৃন্দাকে আড়াল করতে সূর্যদেব আজ তাড়াতাড়ি অস্ত যাচ্ছেন, কলকাতার বাতিস্তম্ভে আলো জ্বলতে দেরি হচ্ছে। চারিদিকে ঘনিয়ে আসছে অন্ধকার।

বৃন্দা কাঁদছে। অন্ধকারে। একা।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *