১২. দময়ন্তী
‘আমি কখনও ভাবিনি যে খবরের সোর্স বাড়ির মধ্যে থাকবে।’ ল্যাপটপের কি বোর্ড টিপতে টিপতে বললেন শক্তিরূপা। ড্যানিয়েল ভুরু কুঁচকে বসেছিলেন। দময়ন্তীকে বললেন, ‘তোর যদি মনে হয় মাকে কোনও কথা বলবি না, তাহলে তোর সে অধিকার আছে।’
‘বলব না কেন? একশোবার বলব। অ্যাই অ্যাম উইলিং টু সিং লাইক আ ক্যানারি। যত গুন্ডা বদমাইশ কলেজে এসে মানুষ খুন করে যাবে আর আমরা সাফার করব, ইটস নট ডান।’ ফোঁসফোঁস করে বলে দময়ন্তী।
‘শান্ত হ। রেগে কোনও কাজ হয় না।’ মেয়ে এবং তার বন্ধুদের দিকে তাকিয়ে বলেন শক্তিরূপা। তাঁর স্টাডি রুমের টেবিলের চারিদিকে বসে রয়েছে চন্দন, সুরজ, জেম্সি, সঞ্জয় এবং সবুজ। কাজের লোক ট্রেতে করে নিয়ে এল আমপোড়ার সরবত আর তরমুজের ঠান্ডা ফালি।
তপন চৌধুরীর মৃত্যু পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে বিরাট ধাক্কা। রাজ্য ছেড়ে জাতীয় স্তরে এর অভিঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। সমাজবিরোধীর গুলিতে পুলিশের মৃত্যুর ছবির একটি ভিডিও পাওয়া গেছে। ভিডিওটি তুলেছেন রেপ স্যার। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের জানলা দিয়ে, মোবাইল ক্যামেরায়। দশ মিনিটের মিনিটের ভিডিওতে চন্দনের ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা থেকে চন্দনের কোলে তপন চৌধুরীর মৃত্যু—পুরো অংশটা রেকর্ড করা আছে।
সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইট থেকে টিভি— সর্বত্র ভিডিওটি ভাইরাল। সন্দীপ সামন্তর সরকারের সমালোচনায় মুখর সারা দেশের মানুষ। সন্দীপ সামন্ত একাধারে মুখ্যমন্ত্রী এবং পুলিশমন্ত্রী। তিনি তপন চৌধুরীর বাড়ি যাননি। সংবাদমাধ্যম মারফত সমবেদনা জানিয়ে বলেছেন, মৃতের স্ত্রী পুলিশ ডিপার্টমেন্টে চাকরি পাবেন।
এ বিষয়ে বিরোধী নেতা মৃন্ময় চ্যাটার্জি অনেক সংবেদনশীল। তিনি তপনের বাড়ি গেছেন। তপনের বিধবা স্ত্রীর সঙ্গে কথা বলেছেন। তপনের ছেলে, যে ডেন্টাল কলেজে পড়ে, তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলেছেন, ‘তোমার লেখাপড়ার ব্যয়ভার আজ থেকে নবযুগ পার্টির। আমরা ক্ষমতায় এসে তোমাকে চাকরিও দেব।’
মৃন্ময়ের এই পিতাসুলভ কনসার্ন জনগণ খোলামনে গ্রহণ করেছে। গরিব মানুষ ধন্যধন্য করেছে।
কলকাতা পুলিশ আটচল্লিশ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেফতার করেছে খুনিকে। এন্টালির বাসিন্দা বাবলু নবযুগ পার্টির হ্যাপি তিওয়ারির ডানহাত। দুটো খুন করার পরেও সে রাজ্য ছেড়ে পালায়নি। খিদিরপুরের আক্রা ফটকের কাছে বোনের বাড়িতে লুকিয়ে ছিল। গ্রেফতার হওয়ার পরে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদের সময় বাবলু জানিয়েছে যে চন্দনকে খুন করার জন্য হ্যাপি তাকে নির্দেশ দিয়েছিল। হ্যাপি এই অভিযোগ বেমালুম অস্বীকার করেছে।
সন্দীপ সামন্ত এবং তাঁর রাজনৈতিক দল আপাতত বেঁচে গেল একটি মাত্র কারণে। সেটা হল চিকনার মৃত্যু। চিকনা গ্রেফতার হলে শাসকদলের বড় বড় নেতাকে জেলে ঢুকতে হত। চিকনা মরে গিয়ে অনেককে বাঁচিয়ে গেল। চিকনার মরদেহ নিয়ে সেই দিন সন্ধেবেলা বিশাল মিছিল বেরিয়েছিল আনসারুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিস থেকে। অধীর বিশ্বাসের নেতৃত্বে সেই মিছিলে পা মিলিয়েছিল চন্দন, রিপু, লাটু, বান্টি, টিনটিন, সবুজ, অভি, আপ্পু, জেম্সি, সাবিনা। শ্রীপর্ণা, বৃন্দা আর দময়ন্তী আসেনি। সবার না আসার আলাদা আলাদা কারণ। শ্রীপর্ণা আসেনি, কেন না সে আর রাজনীতির সঙ্গে নিজেকে জড়াবে না। আর্মি অফিসার বাবা পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, কেউ যদি তাকে রাজনীতির কথা বলে, তা হলে সে যেন সোজা বাবাকে ফোন করে। বাকিটা তিনি বুঝে নেবেন। বৃন্দা আসেনি, কেন না চন্দন তাকে আসতে বারণ করেছে। পলিটিক্যাল ঝামেলা চন্দন নিজে সামলাবে। এর মধ্যে আদরের ডল পুতুলকে ঢুকতে দেবে না। দময়ন্তী আসেনি, কেন না ও রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে রেখেছে।
কলকাতার এই অস্থির, ভায়োলেন্ট সময়ে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজে ভোট হয়ে গেল। এলিটিস্ট কলেজে রাজনৈতিক খুনজখম বা বহিরাগতদের হাঙ্গামাকে ছাত্রছাত্রীরা ভালো মনে নেয়নি। ভোট পড়েছে মাত্র পঞ্চাশ শতাংশ। কাউন্টিং-এর শেষে দেখা গেল জনমোর্চা এবং নবযুগ পার্টির ছাত্র সংগঠন সমান সমান ভোট পেয়েছে। চোদ্দটা সিটের মধ্যে সাতটায় জিতেছে জনমোর্চা। সাতটায় নবযুগ। প্রোগ্রেসিভ মেডিকাল ফোরাম অন্যান্য বছরের মতোই মোট ভোটের টেন পার্সেন্ট পেয়েছে।
ইউনিয়নের নতুন সেক্রেটারি চন্দন। সুরজ হেরে গেছে। প্রেসিডেন্ট পোস্টে হেরে গেছে জেম্সি। জিতেছে সঞ্জয়। অভি কালচারাল সেক্রেটারি পোস্টে হেরেছে। ছাত্রছাত্রীরারা বলেছে, অভি ভালো কবি হতে পারে, কিন্তু কালচারাল সেক্রেটারি পোস্টে চাই কাজের লোক। ওপিয়াম ফেস্টিভালের মতো বিশাল অনুষ্ঠান উতরে দেওয়ার ক্ষমতা ওর নেই। নবযুগের প্রবালকে কালচারাল সেক্রেটারির পোস্টে জিতিয়ে জনতা জনার্দন প্রমাণ করে দিয়েছে, তারা দলতন্ত্র চায় না, কাজের লোক চায়।
এই রাজনৈতিক বাতাবরণে উইকেন্ড ম্যাগাজিনের কভার স্টোরি হল, ‘স্টুডেন্ট পলিটিক্স’। বাম, দক্ষিণ ও অতিবামপন্থী একাধিক নেতা ও মন্ত্রী এই সংখ্যার অতিথি লেখক। শক্তিরূপা এমন লোকেদের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, যাঁদের রাজনীতিতে হাতেখড়ি ছাত্র রাজনীতি করে। এই সব লেখা ছাড়াও শক্তিরূপা একটা গোলটেবিল বৈঠক অর্গানাইজ করেছেন ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের ছেলেমেয়েদের নিয়ে। সেই বৈঠকটাই এখন ঘটবে। শক্তিরূপা চেয়েছিলেন আলোচনা উইকেন্ডের অফিসে হোক। দময়ন্তী আপত্তি করেছে। খবরের কাগজের অফিসে যেতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী আগ্রহী নয়। কলেজের ঘটনা নিয়ে ভুল খবর ছেপে, টিভি চ্যানেলে ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে মিডিয়া এদের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা হারিয়েছে।
ড্যানিয়েল ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে মোবাইলের অডিও রেকর্ডার অন করে শক্তিরূপা বললেন, ‘সাম্প্রতিক কালে ছাত্র রাজনীতিতে আবার একটা জোয়ার এসেছে। তিয়েনআনমেন স্কোয়্যার অনেক পুরোনো কথা। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে দেশে এবং বিদেশে—সর্বত্র তোমরা নিজেদের ছড়িয়ে দিয়েছ।’
‘আমরা এসব কিছু করিনি।’ আমপোড়ার সরবতে চুমুক দিয়ে বলে জেম্সি। ‘এই রকম লিখলে পত্রিকার বিক্রি বাড়বে। তাই আপনি আমাদের মুখে আপনার কথা বসাচ্ছেন।’
সব্বাই চুপ। দময়ন্তী খুব মন দিয়ে আঙুলের নখ দেখছে। বাকিরা টেবিলের দিকে তাকিয়ে। সবার বডি ল্যাঙ্গোয়েজে প্যাসিভ অ্যাগ্রেসান। প্রত্যেক মনে মনে বলছে, নেহাত দময়ন্তী ডেকেছে, তাই আমরা এসেছি। আপনার ম্যাগাজিনের কনটেন্টের জন্য আমরা কেন মাথা ঘামাব?
শক্তিরূপা কর্মপদ্ধতি ঠিক করে নিলেন। একটু হালকা চালে শুরু করা যাক। বরফ গলার জন্যে সময় দিতে হবে।
‘আমি জেম্সিকে দিয়ে শুরু করছি। জেম্সি, আমি তোমাকে একটা শব্দ বলব। সেটা শুনে তোমার যা মনে হবে, বলবে। ক্লিয়ার?’
‘ওকে!’ শ্রাগ করে জেম্সি।
‘তা হলে বলো। পার্টি।’
‘খুব খারাপ।’
‘পলিটিক্স।’
‘আরও খারাপ। পোচা।’
‘কেরিয়ার।’
‘দ্য মোস্ট ইম্পর্ট্যান্ট থিং।’
‘নতুনগ্রাম।’
‘আই কেয়ার আ ড্যাম।’
‘ভোট।’
‘ফোট।’
শক্তিরূপা দেখল চন্দন রাগী মুখে জেম্সির দিকে তাকিয়ে। এই মুহূর্তে চন্দনকে প্রশ্ন না করে শক্তিরূপা বেছে নিলেন প্রবালকে। সদ্য ভোটে জেতা তরুণ তুর্কি কী বলে দেখা যাক। ‘প্রবাল, তুমি বলো। পার্টি।’
‘ব্যান্ড পার্টি।’
‘পলিটিক্স।’
‘পলি-ট্রিক্স।’
‘কেরিয়ার।’
‘মাই ড্রিম।’
‘নতুনগ্রাম।’
‘জানি না।’
‘ভোট।’
‘ডেমোক্র্যাসি।’
‘ভেরি অনেস্ট আনসার।’ তরমুজের ফালি হাতে নিয়ে বলেন শক্তিরূপা। ‘এবার সুরজকে জিজ্ঞাসা করা যাক। পার্টি।’
‘পাওয়ার।’
‘পলিটিক্স।’
‘পাওয়ার।’
‘কেরিয়ার।’
‘মাই ড্রিম।’
‘নতুনগ্রাম।’
‘ওয়াটারলু।’
‘ভোট।’
‘উইন।’
চন্দন বিরক্ত হয়ে বলল, ‘তোদের কারও মনে হচ্ছে না যে, পার্টি মানে একটা অর্গানাইজেশান যেখানে রেজিমেন্টেশান ও হায়ারার্কি আছে!’
‘না,’ মিষ্টি হেসে আপত্তি করল দময়ন্তী।
‘কারও মনে হচ্ছে না, যেভাবে বেঁচে আছি আর যেভাবে বেঁচে থাকতে চাই, এই দূরত্বটা অতিক্রম করা যায় রাজনৈতিক লড়াই করে?’
‘না বস!’ আমপোড়ার সরবতে চুমুক দিয়ে বলল সঞ্জয়।
‘কারও মনে হচ্ছে না, যে কেরিয়ার জীবনযাপনের জন্য প্রয়োজনীয় একটা ধাপ? ততটাই প্রয়োজনীয়, যতটা পলিটিক্স?’
‘নো ওয়ে!’ একযোগে আপত্তি জানায় সবাই। আড্ডা জমে ওঠে। ঝগড়া বাড়াবাড়ি পর্যায়ে চলে গেলে শক্তিরূপা দু’একটা কথা বলছেন। ভালো মডারেটর মানে বোবা মডারেটর—এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন তিনি।
দু’ঘণ্টা বাদে আলোচনা শেষ হল। শক্তিরূপা খুশি। যথেষ্ট ভালো আলোচনা হয়েছে। সামান্য এডিট করে পুরোটাই ছাপানো যাবে। তিনি দময়ন্তীকে বললেন, ‘তুই ওদের নীচ পর্যন্ত ছেড়ে দিয়ে আয়।’
‘আচ্ছা,’ বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে নীচে নামে দময়ন্তী। ডিটিপি অফিসের বাইরে ঋষিতা ভীষণ সেজেগুজে মাঝবয়সি একটা লোকের সঙ্গে ঝগড়া করছিল। মেয়েটা অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছে বলে চোখ টোপাকুলের মতো লাল আর ফোলা। নাকটাও লাল। মাঝবয়সি ভদ্রলোককে প্রায়ই আসতে দেখে দময়ন্তী। ভদ্রলোক বললেন, ‘এই রকম করলে আর আসা যাবে না।’
দময়ন্তীদের দেখে আলোচনা ঘুরিয়ে ঋষিতা বলল, ‘ষোল ফন্টে টাইপ করব। প্রুফ দেব দু’বার। পার পেজ তিরিশ টাকা নেব।’
লোকটা বাজে অভিনেতা। কথার পিঠে কথা চালাতে মিনিমিন করে বলল, ‘ওটা কুড়ি টাকা করা যায় না?’
‘অসম্ভব। আপনি মার্কেটে ঘুরে দেখুন। কাগজ আর কালির যা দাম হয়েছে!’
টিপিকাল ক্রেতা-বিক্রেতার সংলাপ। দময়ন্তী কনভিন্সড হল না। এদের চক্করটা জানতে হবে। অনেকদিন ধরে চোর-পুলিশ খেলা চলছে। এবার একটা ফয়সালা হওয়া উচিত।
বন্ধুরা চলে গেছে। দময়ন্তী সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে যাবে এমন সময়ে মোবাইলে টুংটাং। দময়ন্তী জানে কার নম্বর। এই রিং টোন নির্দিষ্ট একটা নম্বরের জন্য সেট করা আছে। বিলুদা! কিছুদিন আগেও এই রিং টোন শুনলে দময়ন্তীর বুক আনচান করে উঠত। এখন চূড়ান্ত বিরক্ত লাগে। লাইন কেটে দেয় দময়ন্তী।
আবার ফোন। আবার সেই রিং টোন। আবার লাইন কাটে দময়ন্তী।
আবার সেই রিং টোন। ছেলেটা সাইকোপ্যাথ হয়ে গেল নাকি? বিরক্ত হয়ে ফোন ধরে দময়ন্তী। ঠান্ডা মাথায় বিলুকে বোঝাতে হবে যে এই ভাবে কোনও মেয়েকে টেলিফোনে বিরক্ত করতে নেই। পুলিশে খবর দিলে সমূহ বিপদ।
‘হ্যালো।’ ও প্রান্তে অচেনা গলা।
‘হ্যালো? কে?’ অবাক হয়ে বলে দময়ন্তী।
‘হ্যালো? আমি সব্যসাচীদা। বিলুর ফোন থেকে ফোন করছি। আমার মোবাইলের সিমটা নষ্ট করে দিলাম।’
‘কেন?’
‘চতুর্দিকে পুলিশি ঝামেলা, তাই। এনিওয়ে, তোকে ফোন করলাম অন্য কারণে। তোর সঙ্গে কি এখন চন্দন আছে?’
‘একটু আগে ছিল। এখন আর নেই। কেন?’
‘ওর মোবাইল বেজে যাচ্ছে। ও ফোন ধরছে না।’
‘চন্দনের মোবাইল সাইলেন্ট মোডে রাখা ছিল। কিন্তু তুমি ভ্যানতাড়া করছ কেন? কী নিয়ে এত টেনশান?’
‘এক্ষুনি জানলাম চন্দনের বাবা পবন সরকার আর আমাদের নেতা গোপাল নস্করকে শক্তিধর মাইতির লোকজন মিলে মারধর করেছে। চন্দনের বাবার মাথা ফেটে গেছে। গোপালদার হাতে তিনটে স্টিচ পড়েছে। প্রাথমিক চিকিৎসার পরে ওঁরা থানায় গিয়েছিলেন। থানা এফআইআর নেয়নি।’
‘শক্তিধর মাইতি কে?’
‘নতুনগ্রামের নবযুগ পার্টির নেতা। আমাদের কলেজে যেমন সুরজ, ওখানে তেমনি শক্তিধর।’
দময়ন্তী পুরো খবরটা হজম করল। বলল, ‘এই খবর আমাকে দেবার মানে কী? আমি আর কোনও রকম পলিটিকাল অ্যাক্টিভিটির সঙ্গে যুক্ত নই। যা করেছি, ভুল করেছি।’
‘তোর সেন্টিমেন্টকে একশো শতাংশ সমর্থন করছি। এবার বলি কী কারণে তোকে ফোনে করলাম। গোপালদা যখন থানায় এফআইআর করতে গিয়েছিলেন, তখন থানার ওসি গোপালদাকে অনেকক্ষণ বসিয়ে রেখেছিলেন। এফআইআর নিয়ে টালবাহানা করার মধ্যে বলেছে, ‘মন দিয়ে শিক্ষকতা করুন, মন দিয়ে সখের সাংবাদিকতা করুন। কিন্তু সরকারি কর্মচারি হয়ে রাষ্ট্রবিরোধী কাজকর্ম করবেন না। কলকাতা থেকে আপনার ওপরে নজর আছে। আপনার ফোন কল মনিটর করা হয়। কারা কারা আপনার কাছে আসে, কারা থাকে, কারা ফায়ার আর্মস নিয়ে প্র্যাকটিস করে, আমরা সব জানি। এই সব শুনে গোপালদা কিছু বলেনি। পরে মেচেদা স্টেশনে এসে পাবলিক বুথ থেকে ফোন করে বলেছে মোবাইলে যোগাযোগ না রাখতে। এবং বেনামে নতুন মোবাইল নিতে। সেটাই তোকে জানিয়ে দিলাম।’
দময়ন্তী বলল, ‘আমি আমার মোবাইল বদলাব না। বেনামে অন্য সিমও নেব না। পুলিশ আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আমি পুলিশকে সহায়তা করব।’
‘তা কর!’ হতাশ গলায় বলে সব্যসাচী। ‘কিন্তু এর ফলে আমরা বিপদে পড়ব, এই কথাটা মনে রাখিস।’
‘বিপদের কথা ভেবেই আমি তোমাদের রাজনীতি থেকে দূরে সরে এসেছি সব্যদা। ইনফ্যাক্ট কখনও কাছে যেতে চাইনি। বিলুদা আমাকে ওই সবে ঢুকিয়েছিল। পলিটিক্স যারা করে, তারা সম্পর্ক নিয়েও পলিটিক্স করে, এটা তখন বুঝিনি। ভুল হয়ে গেছে।’ দীর্ঘশ্বাস ফেলে দময়ন্তী, ‘আমি বিলুদার থেকে, তোমাদের রাজনীতি থেকে, টু বি মোর স্পেসিফিক, স্টুডেন্ট পলিটিক্স থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছি। আমার কাছে কলেজটা কেরিয়ার গড়ার জায়গা। তোমাদের কাছে পার্টিটাই কেরিয়ার। আমি বিপদ থেকে দূরে থাকতে চাই। তোমাদের কাছে বিপদ প্রফেশনাল হ্যাজার্ড। বিপদ তোমাদের মেনে নিতে হবে।’
‘ঠাট্টা করছিস?’
‘না। সত্যি কথা বলছি।’ লাইন কেটে দিয়ে দময়ন্তী চন্দনকে ফোন লাগায়। ও কি জানে যে ওর বাবার মাথা ফেটে গেছে?
দু’তিনটে রিং হওয়ার পরে চন্দন ফোন ধরে বলল, ‘আমি জানি। আমি বাড়ি যাচ্ছি।’
‘সব্যদার সঙ্গে কথা হল?’
‘বিলুদার সঙ্গে হল। একগাদা মিস্ড কল দেখে বিলুদার নম্বরে ফোন করলাম। সেটা এনগেজ্ড। তখন সব্যদার নম্বরে ফোন করলাম। সেটা ‘নট রিচেবল’ হয়ে গেল। তারপর বয়েজ হোস্টেলের ক্যান্টিনের ল্যান্ডলাইন থেকে ফোন এল। বিলুদা করেছিল। ওর মুখ থেকে সব জানলাম। কিন্তু তোকে কে বলল?’
দময়ন্তী বুঝতে পারল, সব্যসাচী আর বিলু বয়েজ হোস্টেলের ক্যান্টিনে বসে ফোন করেছিল। চন্দনের প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে সে বলল, ‘রাতের দিকে ফোন করে জানাস, বাবা কেমন আছে।’
‘ঠিক হ্যায়।’ ফোন কাটল চন্দন।
.
মেচেদা স্টেশনে নেমে চন্দন মোবাইলে সময় দেখল। সন্ধে সাড়ে সাতটা বাজে। আজ বাড়ি ফেরার প্ল্যান ছিল না। দময়ন্তীদের বাড়ি থেকে বেরোনোর পরে বিলুদার ফোন পেয়ে ছুটে আসতে বাধ্য হয়েছে। নন্দন এখন বাড়িতে। তাকে ফোন করে খবরটা কনফর্ম করেছে চন্দন। তারপর আর কলেজে ঢোকেনি। শেয়ালদা–হাওড়া ময়দান স্টেট বাস ধরে সোজা হাওড়া স্টেশন। খড়্গপুর লোকালের দমবন্ধ করা ভিড়ে ভ্যাপসা হতে হতে মেচেদা স্টেশন।
মেচেদা স্টেশন সংলগ্ন বাসস্ট্যান্ড আজ শুনশান। ট্রেনে আসার সময় সে খবর পেয়েছে, জেলার বিভিন্ন এলাকায় একাধিক রাজনৈতিক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বাঁজাপলাশ গ্রামে এক কোম্পানি র্যাফ পাঠানো হয়েছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল মেচেদা-নতুনগ্রাম জাতীয় সড়কের একাধিক জায়গায় অবরোধ করেছে। বাস মালিকরা বাস গ্যারেজে ঢুকিয়ে দিয়েছে। একে লোকসানের জ্বালা, তার ওপর ভাঙচুরের ভয়। কে রিস্ক নেবে?
বাস নেই। স্টেশন চত্বর সংলগ্ন মিষ্টির দোকান, পাইস হোটেল, থাকার হোটেল, কম্পিউটার শিক্ষাকেন্দ্র, পানবিড়ির দোকান, জামাকাপড়ের শোরুম—সবেতে ঝাঁপ ফেলা। স্ট্রিট ল্যাম্পের আলোতে বিশাল এলাকা খাঁখাঁ করছে।
যত অফিস যাত্রী ট্রেন থেকে নামল তারা সবাই বাড়ি ফিরবে। নির্ঘাত কোনও উপায় আছে। চন্দন দৌড়োদৌড়ি করে প্রাইভেট গাড়ির সন্ধান করতে লাগল। পুরোনো মডেলের অ্যাম্বাস্যাডার এই রুটে ভাড়া খাটে। সতেরো কিলোমিটার যেতে একশো টাকা পার হেড নেবে। ঝামেলা না করে উঠে পড়তে হবে।
আজ তারাও নেই। অবশেষে একটা পিকআপ ভ্যানের ড্রাইভারকে চন্দন রাজি করালো। নতুনগ্রাম পর্যন্ত যাবে। মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা। পাবলিক তাতেই রাজি। জনা বিশেক লোক গাদাগাদি করে উঠে পড়ল। দাঁড়িয়ে, ঝাঁকুনি খেতে খেতে যাওয়া। কিন্তু কী আর করা! বাড়ি পৌঁছনো জরুরি।
সওয়া আটটা নাগাদ নতুনগ্রামের বাসস্ট্যান্ডে পিকআপ ভ্যান থেকে নামল চন্দন। অন্যদিন আটটার সময়ে এলাকা সরগরম থাকে। রিকশা, ভ্যান, ভ্যানো, বাস, লোকাল ট্যাক্সিতে চারদিক ভনভন করে। পান-বিড়ি-সিগারেটের দোকানে লুকিয়ে চুল্লুর পাউচ বিক্কিরি হয়, রিকশা আর ভ্যানওয়ালারা চুল্লু খেয়ে বাওয়াল করে।
আজ সব শুনশান। বাসস্ট্যান্ড ফাঁকা। রিকশা, ভ্যান, ভ্যানো, ট্যাক্সি, লোকাল বাস—কিচ্ছু নেই। চালকরাও বেপাত্তা। মাতালদের টিকি দেখা যাচ্ছে না। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে হেঁটে আবাসবাড়ির সামনে পৌঁছল চন্দন। গ্রামের দিকে একটু রাত হলে রাস্তা শুনশান হয়ে যায়। তবে আজকের মতো শ্মশানের নৈঃশব্দ্য আগে শোনেনি চন্দন। এত কী সিরিয়াস ঘটনা ঘটে রে বাবা!
গেট খুলতে খুলতে চন্দন শুনতে পেল তার বাবা আর গোপাল নস্কর উঁচু গলায় ঝগড়া করছেন। পবন বলছেন, ‘সাতাশ বছর ধরে ক্ষমতায় আছি। তা সত্ত্বেও পুলিশের হাতে মার খেলাম। এর পরও তুমি বলবে এই রাজ্যে গণতন্ত্র নেই?’
‘একশোবার বলব। হাজারবার বলব। পুলিশ হচ্ছে সরকারি গুন্ডা। পাশাপাশি, পুলিশ হচ্ছে হাওয়া মোরগ। ওরা বুঝে গেছে যে সন্দীপ সামন্তর সরকার যাচ্ছে, মৃন্ময় চ্যাটার্জির সরকার আসছে। তাই শক্তিধরের কথা শুনে তোমায় দু’ঘা দিতে ওদের আটকায়নি। ওরা ভবিষ্যতের মুখ্যমন্ত্রীর কাছে নিজেদের দাসত্ব প্রমাণ করছে।’
‘আমরা কি সত্যিই হেরে যাব?’ পবনের গলায় হাহাকার।
‘হারবে। তোমার মতো বালিতে মুখ গুঁজে থাকা উটপাখি মার্কা কমরেড ছাড়া পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি লোক বুঝতে পারছে যে এই রাজ্যে তোমাদের আর স্থান নেই। জনগণ তোমাদের রিজেক্ট করেছে।’
‘এখন তাহলে কী কর্তব্য?’
‘নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকো। বাঁজাপলাশ গ্রামের মানুষের পাশে দাঁড়াও। আমি বলছি না যে আমার মতো সক্রিয় ভাবে জোয়াকিমদের হয়ে রাস্তায় নামতে হবে। আমার মতো পার্টিজান তুমি নও। তোমার অনেক পিছুটান আছে। কিন্তু সহজ-সরল সত্যি কথাটা বলো। মানুষের মাথার ওপর থেকে ছাদ আর পায়ের নীচ থেকে মাটি এইভাবে কেড়ে নেওয়া যায় না। বিদেশি বানিয়ার হাতে দেশের মাটি বেচে দেওয়া যায় না। ডেভেলপ্ড হোক বা ডেভেলপিং, প্রতিটি দেশের সরকারের সামাজিক দায়বদ্ধতা আছে। জাঙ্ক ফুড খেয়ে ওভারওয়েট বাচ্চা আর বিয়ার টেনে ওভারওয়েট বাবা-মা আমেরিকা-ইংল্যান্ড থেকে এখানে এসে কম খরচে ডিটক্সিফায়েড হবে, আর তার জন্য নতুনগ্রাম উজাড় হয়ে যাবে— এ মেনে নেওয়া যায় না। জনমোর্চা সরকার কোষাগার পূর্ণ করার জন্য অনেক দিন থেকেই সিগারেট আর মদ খেতে উৎসাহ দিচ্ছে। আমাদের যুবা বয়সে এ জিনিস ছিল?’
‘ঠাকুরপো। এবার থামো।’ পারুলের ঠান্ডা গলার আওয়াজ শুনতে পায় চন্দন।
গোপাল বলে, ‘এটাই সত্যি। পছন্দ না হলেও এই দিকেই হাঁটছে জনমোর্চা সরকার। পবন, তুমি শুধু স্বীকার করো যে এটা ভুল সিদ্ধান্ত। স্বীকার করো যে, যে সরকার এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তার যাওয়া উচিত।’
‘তা বলে মৃন্ময় চ্যাটার্জির দল ক্ষমতায় আসবে? অশিক্ষিত, মিথ্যেবাদী, দুর্নীতিগ্রস্ত একটা লোক! নবযুগ দলের সবক’টা নেতা মাতাল, খুনি, বাটপাড়, ঠগ! ওরা এলে পশ্চিমবাংলার সর্বনাশ হয়ে যাবে গোপালদা!’
‘সর্বনাশ হতে আর বাকি কী আছে পবন? ধুতিপরা, পক্ককেশ, বুদ্ধিজীবী-সুলভ ইমেজে টইটম্বুর সন্দীপ সামন্ত কোন দুর্নীতি আটকাতে পেরেছেন? সন্দীপ তোমার দলের মুখোশ। মুখ হল চোর, বাটপাড়, প্রোমোটার আর ধর্ষকের দল। এবং নিষ্ক্রিয়, ধামাধরা, মধ্যবিত্ত ইয়েস ম্যানের দল। যার মধ্যে তুমি পড়ো।’
‘আমাকে রাগিয়ে লাভ হবে না গোপালদা। আমি ছাত্র নই যে আদর্শের নীতিকথা শুনিয়ে দলে টানবে। ঝুনো পার্টিকর্মীকে ওভাবে মোটিভেট করতে পারবে না। আমার রাজনৈতিক সত্বা নয়, আমার সাংবাদিক সত্বাকে খোঁচাও, তোমার স্বার্থসিদ্ধি হবে।’
‘বেলাকূলের সম্পাদক হিসেবে আমি সাংবাদিক পবন সরকারকে বলছি। অনেক তো আন্তর্জাতিক আর জাতীয় খবর নিয়ে কচলানো হল। আমাদের গ্রাম এখন সংবাদের শিরোনামে। আমাদের কোনও দায়িত্ব নেই?’
চন্দন এতক্ষণ বসার ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আলোচনা শুনছিল। এবার ঘরে ঢুকল। ছেলেকে দেখে হইহই করে উঠলেন পবন। ‘ওগো! দ্যাখো! তোমার ছোট ছেলে এসেছে।’
পারুল রান্নাঘর থেকে খুন্তি হাতে দৌড়ে এলেন। তাঁর চোখে বিস্ময়। নন্দন নিজের ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বলল, ‘কীসে করে এলি? বাস তো বন্ধ!’
চন্দন বাবাকে দেখছিল। মাথার বাঁদিকের রক্ত জমে ফুলে আছে। বাঁ-চোখের নীচে রক্ত জমে আছে। গোপাল কাকার হাতে ব্যান্ডেজ। কপালে কাটাছেঁড়ার দাগ। দু’জন বিদ্বস্ত মাঝবয়সি মানুষ বসে দেশ-কাল নিয়ে আলোচনা করছেন।
ভীষণ অসহায় লাগে চন্দনের। নিজের স্বার্থ চরিতার্থ করতে সে ছাত্র রাজনীতির চক্রব্যূহে ঢুকেছে। শহুরে চালিয়াতদের হাতে নিজেকে মুরগি হতে দেবে না বলে, পাঁচ বছরের জন্য সুপার থেকে সুইপার— সবার ওপরে ছড়ি ঘোরাবে বলে রাজনীতির আঙিনায় এসেছে। ক্ষমতার অলিন্দে না থাকলে নতুনগ্রামের ‘বোমাবস’কে আজ লাস্ট বেঞ্চে সিঁটিয়ে থাকতে হত। ফার্স্ট হওয়া চন্দনের রক্তে। লাস্ট হতে সে জানে না।
কিন্তু জনমোর্চা সরকার চলে গেলে কী হবে? কলেজে কলেজে ছাত্র ইউনিয়নে জনমোর্চা হারতে থাকবে। হারবেই। সে ক্ষেত্রে ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের ইউনিয়নের সেক্রেটারির পদ থেকে সরে যেতে হবে। তখন?
যাক গে! এখনও এত ভাবার সময় আসেনি। বিধানসভা নির্বাচনের এখনও দেরি আছে। চিন্তার বোঝা হালকা করতে সে বাবা আর পবনকাকার শরীরের খবর নিতে লাগল। পারুল এর মধ্যে তৈরি করে ফেলেছে মুড়িমাখা। পাশে একথালা পেঁয়াজি, ফুলুরি, আর বেগুনি। মুড়ি শেষ হওয়ার আগেই চলে এল গরমাগরম চা। আবাসবাড়ির আড্ডা জমে উঠল। রাত এগারোটার সময় চন্দন দময়ন্তীকে ফোন করল।
ফোন ধরে দময়ন্তী বলল, ‘বাড়ির খবর কী?’
‘ঠিক আছে। সিরিয়াস কিছু নয়। মা পাঁঠার মাংস রাঁধছে।’
‘উফ! চুপ কর তো! বাঙালিদের জীবনে খাওয়া ছাড়া আর কিছু নেই।’ বিরক্ত হয়ে ফোন কাটে দময়ন্তী। তারও ডিনারের সময় হয়েছে।
.
ডাইনিং টেবিলে বসে ড্যানিয়েল গুনগুন করে গান গাইছেন। সুর শুনে দময়ন্তী আন্দাজ করল কী গান। ‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান, তুমি কি এমনি শক্তিমান।’ শক্তিরূপা ভুরু কুঁচকে মোবাইলে কথা বলছেন। গলার স্বর নীচু। বোঝা যাচ্ছে, অফিস সংক্রান্ত ফোন।
শক্তিরূপা আর ড্যানিয়েলের প্লেটে দুটো করে রুটি দিল দময়ন্তী। নিজে নিল তিনটে। বেবিকর্ন আর ব্রকোলি দিয়ে হালকা একটা সাইড ডিশ হয়েছে। সঙ্গে পাতলা চিকেন কারি। রুটি আর সবজি মুখে পুরছে দময়ন্তী, এমন সময়ে শক্তিরূপা ফোন রাখলেন। দময়ন্তীকে বললেন, ‘উইকেন্ডের নেক্সট ইস্যুর কভারস্টোরি করার জন্যে আমাকে কাল সকালে বাঁজাপলাশ যেতে হবে। চন্দনের ফোন নাম্বারটা দে।’
.
