হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২৪

২৪. দময়ন্তী

‘হাম হ্যায় নয়ে, আন্দাজ কিঁউ হো পুরানা?’ ড্রাম বিট্‌সের সঙ্গে নাচছে আমির খান, সেফ আলি খান, রাহুল খন্না। আকাশ, সমীর আর…আর…সুরজ! চমকে ওঠে দময়ন্তী। এখানে সুরজ কোথা থেকে এলো? ‘দিল চাহতা হ্যায়’ সিনেমায় রাহুল খন্নার চরিত্রটার নাম কী ছিল?

‘বিগড়ে দুনিয়া, বিগড়নে ভি দো…’ নাচতে নাচতে সুরজ, চন্দন আর আমির খান এগিয়ে আসছে তার দিকে। চন্দন শ্রাগ করে বলল, ‘কেক খানে কে লিয়ে হমলোগ কহিঁ পে ভি যা সকতে হ্যায়!’

চন্দন? আবার চমকায় দময়ন্তী। এই ডায়ালগটা তো সেফ আলি খান বলেছিল, ডিম্পল কাপাডিয়ার জন্মদিনে। এটা চন্দন বলছে কেন? সেফের নাম ছিল সমীর। রাহুল খন্নার নাম সিড। ডিম্পলের নাম ছিল তারা জয়সোয়াল। অ্যালকোহলিক এক চিত্রশিল্পীর ভূমিকায় অসাধারণ অভিনয় করেছিলেন।

‘ঝগড়ে দুনিয়া, ঝগড়নে ভি দো…’ এবার নাচছে বিলুদা। কাঁধে এ কে সাতচল্লিশ, পরনে জলপাই সবুজ কমব্যাট গিয়ার, পায়ে স্পাইক লাগানো বুট, মাথায় সবুজ ফেট্টি, বিলুদা নাচছে। সুরজ আর চন্দনের সঙ্গে পা মিলিয়ে। আর গাইছে, ‘হাম হ্যায় নয়ে, আন্দাজ কিঁউ হো পুরানা?’

আবার স্বপ্ন! বিরক্ত বোধ করল দময়ন্তী। স্বপ্নহীন ঘুম সে কি কোনও দিনও দেখবে না? চারটে পয়েন্ট ফাইভ অ্যালোপাম জিভের তলায় নিয়ে শুতে গিয়েছিল এই আশায় যে সকালবেলা ঝরঝরে মাথায় ঘুম ভাঙবে। ফাইনাল এমবিবিএস এসে গেছে। এখন শরীর বা মন খারাপের বিলাসিতা পোষায় না। চোখ না খুলে দময়ন্তী আন্দাজ করার চেষ্টা করল ক’টা বাজে! পৌনে পাঁচটা? দেখা যাক ঠিক সময় ভেবে উঠতে পেরেছে কি না! বালিশের পাশে রাখা সাইলেন্ট মোডে থাকা মোবাইল হাতে নেয় সে। ধুস! মাত্র পৌনে দুটো। রাত সাড়ে বারোটায় চারটে অ্যালোপাম খেয়ে পৌনে দুটোয় ঘুম ভেঙে যাচ্ছে। শরীর অ্যালোপামে অভ্যস্ত হয়ে যাচ্ছে। ডোজ বাড়াতে হবে। টেবিল থেকে স্ট্রিপ তুলে নিয়ে আরও দুটো ট্যাবলেট মুখে পোরে। এবারে আশা করা যায় ভোর পাঁচটার অ্যালার্মের শব্দে ঘুম ভাঙবে।

জানুয়ারি মাসের পনেরো তারিখ। পরীক্ষার ঠিক এক মাস বাকি। দময়ন্তী লেডি আর্চার্স হোস্টেলের তেরো নম্বর ঘরে চলে এসেছে। আবারও রুমমেট বৃন্দা। এখন হোস্টেলে রুমের সংকট কম। অনেক সিনিয়র দিদি পোস্ট গ্র্যাজুয়েটে চান্স পেয়ে অন্য কলেজে চলে গেছে। কয়েকজনের বিয়ে হয়ে গেছে। কয়েকজন রাজ্য বা কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে যোগদান করেছে। লেডি আর্চার্স হোস্টেলে এখন চাইলেই রুম পাওয়া যায়।

বৃন্দার কাছে দময়ন্তী শুনেছে স্যামি এখন আগের থেকে অনেক ভালো। মদ খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। সিরোসিসের সমস্যা নেই বললেই চলে। রক্ত পরীক্ষার রিপোর্ট প্রায় স্বাভাবিক। একটাই সমস্যা। ওঁকে কাজে ফেরানো যাচ্ছে না। বৃন্দাকে গতকাল রাতেই দময়ন্তীকে দুঃখ করে বলছিল যে হাউস বিল্ডিং লোনের ইএমআই শোধ করতে প্রবলেম হচ্ছে। এক মাস ডিফল্টার হওয়ার পরে স্যামি আবার চেম্বার শুরু করেছেন। ফোঁড়া কাটা, ছোটখাটো টিউমার অপারেশান। জেনারেল প্র্যাকটিশনাররা যা করে থাকেন। হার্নিয়া, হাইড্রোসিল, গল ব্লাডার অপারেশনের মতো রুটিন ওটি করতেও সাহস পাচ্ছেন না। স্যামি আর কয়েকমাস ডিফল্টার হলেই ব্যাংক নোটিশ পাঠাবে। তারপর প্রপার্টি ক্রোক করার কথা বলবে।

ভালো নেই ড্যানিয়েলও। দময়ন্তীর কথা শুনে টোটাল চেক আপ করাননি তিনি। ফল হিসেবে মিটিং করতে করতে একদিন অজ্ঞান হয়ে রাস্তায় পড়ে যান। মৃন্ময় চ্যাটার্জি নিজে ড্যানিয়েলকে অ্যাম্বুলেন্সে করে পিজি হাসপাতালে ভরতি করেন। রুটিন চেকআপ করে দেখা গেছে হিমোগ্লোবিন সামান্য কম আছে। পিজির ডাক্তাররা পেটের আলট্রাসাউন্ড করতে বলেছিলেন। ড্যানিয়েল সে সব না করে বাড়ি চলে এসেছেন।

এইসব উল্টোপাল্টা চিন্তা আর উৎকট দুঃস্বপ্নের মধ্যে বাকি ঘুমটা কাটল। অ্যালার্ম ক্লকের ঝনঝনানি শুনে টলতে টলতে ঘুম থেকে উঠল দময়ন্তী। ধুস! সকালটা বাজে ভাবে শুরু হল। এইরকম ড্রাউজিনেস নিয়ে পড়তে বসলে কিছু মাথায় ঢুকবে না। বিছানায় বসে চারদিকে তাকিয়ে দেখল দময়ন্তী।

অ্যালার্ম বাজা সত্ত্বেও দিব্যি ঘুমিয়ে যাচ্ছে বৃন্দা। মেয়েটা অসম্ভব ঘুমকাতুরে। মোবাইলের মিহি অ্যালার্মে ঘুম ভাঙবে না বলে পুরোনো আমলের টেবিল ঘড়ি বাড়ি থেকে এনেছে। সেটাই কানের পাশে ঝনঝন করছে। তা সত্ত্বেও ঘুম ভাঙেনি। অ্যালার্ম ক্লকের পাশে পরপর রাখা টেক্সট বুকগুলো দেখে বুকটা ছ্যাঁত করে ওঠে দময়ন্তীর। সব সাবজেক্টের বই মেঝেতে একটার ওপরে আর একটা রাখলে দময়ন্তীর থেকেও লম্বা। এত বিদ্যে সে কোথায় রাখবে?

বৃন্দার ঘুম ভেঙেছে। সে টেবিল ক্লকের মাথায় থাবড়া মেরে অ্যালার্ম থামাল। দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে চোখ পিটপিট করে বলল, ‘আজ সকালে ইএনটি পড়ার কথা। যা, তাড়াতাড়ি মুখ ধুয়ে আয়।’

হাই তুলে দময়ন্তী বলল, ‘ঘুম পাচ্ছে।’ বৃন্দা বিছানা থেকে তড়াক করে উঠে বিছানার চাদর ঝাড়পোঁছ করতে করতে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ইউ আর লুকিং টেরিব্‌ল। রাত্তিরে ঘুম ভালো হয়নি?’

‘না। লট্‌স অফ নাইটমেয়ার!’

‘দ্যাট ব্যাড? রাত্তিরে আবার ওষুধ খেতে হয়েছিল?’ ব্রাশে পেস্ট লাগাচ্ছে বৃন্দা। দময়ন্তী মুখে ব্রাশ গুঁজে, কাঁধে তোয়ালে আর হাতে সাবান-শ্যাম্পু-কন্ডিশনারের লটবহর নিয়ে বলল, ‘খাইনি। ওই জন্যই প্রবলেম।’

সত্যিই এটা প্রবলেম দময়ন্তীর। অ্যালোপাম অ্যাডিকশানের কথা সে কাউকে বলতে পারেনা। সাইকায়াট্রি বইতে পরিষ্কার লেখা আছে, এ জিনিস বন্ধ করা যায়। নির্দিষ্ট ওষুধও আছে। কিন্তু পরীক্ষার একমাস আগে দময়ন্তী রিস্ক নিতে চায় না। যেমন চলছে চলুক। পরীক্ষার পরে কনট্রোল করা যাবে।

পরীক্ষার আর এক মাস বাকি। পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের বাকি পনেরো দিন। ফাইনাল ল্যাপে দৌড়চ্ছে জনমোর্চা আর নবযুগ। সিনিয়র লোকজন বলছেন, এত চমকপ্রদ ইলেকশান ক্যাম্পেন গত কুড়ি বছরে দেখেননি। জনমোর্চা ত্রিশ বছর আগে ক্ষমতায় এসেছিল। বিপ্লবের স্বপ্ন দেখিয়ে বাঙালিকে লেফ্‌ট অথবা লেফ্‌ট লিবারাল করে তুলেছিল। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাস করাটা বাঙালিদের সেকেন্ড নেচার হিসেবে দেখা দিল। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মানেই বামাচারী—এটাই নিয়ম। পরবর্তীকালে সেই দল বিপ্লবের আদর্শ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার সিংহাসন আঁকড়ে থাকার জন্য যখন যাবতীয় নোংরামি, গুণ্ডামি, পেশী প্রদর্শন শুরু করল—তখনও বাঙালি বদলাল না। বিপ্লব বটিকায় বুঁদ হয়ে ত্রিশ বছর কাটিয়ে দিল।

মৃন্ময় চ্যাটার্জি প্রথম এই ধারণায় জোরসে ধাক্কা দিয়েছেন। তিনি আওয়াজ তুলেছেন যে বামপন্থার নামে এই দল যা করছে, তা আসলে ডিকটেটারশিপ। কেরানি কমিউনজম আজ দলদাসদের কোটারি তৈরি করেছে। এই অচলায়তন ভাঙতে পারে একমাত্র নবযুগ পার্টি।

জনমোর্চা ক্যাম্পেন করছে নিজের ঢঙে। জেলায় জেলায়, মহকুমায় মহকুমায়, ব্লকে ব্লকে, পাড়ায় পাড়ায়, মহল্লায় মহল্লায় ক্যাডার বাহিনী অর্গানাইজ করে চলেছে মিছিল, মিটিং, জমায়েত, জাঠা, স্ট্রিট কর্নারিং। সন্দীপ সামন্তর বক্তৃতার সিডি বাজছে। স্থানীয় শিল্পীরা গণসঙ্গীত পরিবেশন করছেন, স্থানীয় নেতারা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিচ্ছেন, ওপরতলার নেতানেত্রী প্রার্থী সম্পর্কে ভালো ভালো কথা বলছেন। মানুষের ভিড়ও হচ্ছে। রুটিন ভিড়। যেমন গত তিরিশ বছর ধরে হয়ে এসেছে। আবেগহীন, প্রতিক্রিয়াহীন, যান্ত্রিক হাততালি। মিটিং সেরে তারা ঘরমুখো হচ্ছে।

নবযুগ পার্টি ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন নয়। ওয়ান ম্যান পার্টি। মৃন্ময় চ্যাটার্জিই এই দলের প্রথম এবং শেষ নেতা। বাকিরা এক্সট্রা। স্প্রিং দেওয়া পুতুলের মতো মৃন্ময় দৌড়ে বেড়াচ্ছেন সর্বত্র। প্রচারের কাজে ব্যবহার করছেন হেলিকপ্টার। সন্দীপ সামন্ত প্রশ্ন তুলেছেন, ‘এত ব্যয়বহুল প্রচার উনি করছেন কী ভাবে? টাকার সোর্স কী?’

উত্তর পাওয়া যায়নি। দেশের মানুষ উত্তর শুনতে আগ্রহী নয়। তারা মৃন্ময়কে দেখতে আগ্রহী। উত্তর ও দক্ষিণবঙ্গের জেলাগুলোয় মৃন্ময় চ্যাটার্জির মিটিং মানেই জনবিস্ফোরণ। বাড়ির মেয়েবউয়ের দল স্বতঃস্ফূর্তভাবে কোলেকাঁখে বাচ্চা নিয়ে, কোঁচড়ে মুড়ি বেঁধে মিছিলে হাঁটছে, মিটিং-এ যাচ্ছে। প্রতিটি মাঠ উপচে পড়ছে মানুষের ভিড়ে। মৃন্ময়কে এক পলক দেখার জন্য, তার কথা শোনার জন্য জনগণেশের আকুলিবিকুলি দেখলে বুঝতে অসুবিধা হয় না, এবার ভোটের ফল কী হবে।

ইলেকশান কমিশন ‘ফ্রি অ্যান্ড ফেয়ার ইলেকশান’ করানোর জন্য উঠে পড়ে লেগেছে। কোম্পানির পর কোম্পানি কেন্দ্রীয় বাহিনী আসছে। শোনা যাচ্ছে ভোটের দুদিন আগে থেকে এলাকার দখল নেবে তারা। দু’বেলা ফ্ল্যাগমার্চ হবে। বুথের দুশো মিটারের মধ্যে জমায়েত, রাজনৈতিক দলের বুথ নির্মাণ বা রাজনৈতিক কার্যকলাপ নিষিদ্ধ হবে। রিগিং বা ছাপ্পা ভোটের সম্ভাবনাকে নিশ্চিহ্ন করার এই প্রয়াসকে সব দল স্বাগত জানালেও জনমোর্চা পার্টি ক্রমাগত আক্রমণ শানাচ্ছে ইলেকশান কমিশনের বিরুদ্ধে। ঠারেঠোরে তারা বলছে নবযুগ পার্টি এবং ইলেকশান কমিশন চলছে আমেরিকার টাকায়। সিআইএ চক্রান্ত করছে কমিউনিজমের শেষ দুর্গ বাংলাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিতে। প্রমাণ স্বরূপ ইতিহাস থেকে একের পর এক উদাহরণ দেখাচ্ছে তারা। ঠান্ডা লড়াই, পূর্ব ইওরোপ, রাশিয়ার পতন। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং ভোগবাদের বিপদ, বহুজাতিকের লালসা ও আত্মধ্বংসী মনোভাবের কথা বারবার বলা হচ্ছে। কিন্তু পাবলিক জাস্ট নিচ্ছে না। তারা অনেক বেশি আগ্রহী মৃন্ময়ের সরকার বিরোধী ভাষণ শুনতে। নতুন সরকার এলে নতুন বাংলার চেহারা কেমন হবে—সেই স্বপ্নে মশগুল বাংলার মানুষ।

প্রিন্ট এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়া হাওয়া মোরগের মতো। বাতাস কোনদিকে বইছে, সেটা বুঝতে পারে সবার আগে। তারাও সেইমতো ঘোরে। আজ সকাল এবং বেঙ্গল টুডে কাগজ দু’টি প্রতিদিন মৃন্ময়ের জনসভার ছবি ছাপছে। প্রথম পাতায় নবযুগ পার্টির ক্যাম্পেন ছাড়া অন্য কোনও খবর থাকছে না। নবযুগ পার্টির মেজ, সেজো, ছোট নেতার ছবিও কাগজে জায়গা পাচ্ছে। ফুটেজ পাচ্ছে স্কুপ টিভিতে। প্রতিদিন সন্ধেবেলা টক শো। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের লোককে এক জায়গায় বসিয়ে তাদের মধ্যে ঝগড়া লাগিয়ে সঞ্চালক পরিমল চুপটি করে বসে থাকছেন। হিরোর ভূমিকায় নামছে নবযুগ পার্টি। ভিলেনের ভূমিকায় জনমোর্চা। অন্যান্য দল সাপোর্টিং অ্যাক্টর। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যাচ্ছে। সমাধানহীন বাদানুবাদের শেষে অনুষ্ঠান শেষ। টিআরপি তুঙ্গে। মায়াকমের লাভের ঝুলি বিজ্ঞাপনদাতার টাকায় উপচে উঠছে।

সপ্তাহে দু’দিন থাকছে মৃন্ময়ের ইন্টারভিউ এবং ফোন-ইন অনুষ্ঠান। সঞ্চালক পরিমল ও মৃন্ময়ের আলাপচারিতার মধ্যে ফোন আসছে পশ্চিমবঙ্গের সমস্ত জেলা থেকে, বাকি ভারত থেকে, এমনকী বিদেশ থেকে। প্রতিটি ফোন মৃন্ময় শুনছেন এবং উত্তর দিচ্ছেন। সমস্ত উত্তরের মূল সুর একটাই। আর ক’টা দিন সবুর করুন। মহাকরণে আমাকে থিতু হতে দিন। আপনার সব সমস্যার সমাধান তুড়িতে করে দেব।

রাজ্যময় এই রাজনৈতিক অস্থিরতার রেশ আছড়ে পড়েছে গোলমহলেও। শক্তিরূপা এবং ড্যানিয়েল সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণে টেনশানে আছেন। গত রবিবার বাড়ি গিয়ে টেনশান উপলব্ধি করতে পেরেছিল দময়ন্তী।

সকাবেলা ড্যানিয়েলের স্টুডিওতে রবীন্দ্রসঙ্গীত বাজছিল। ‘শীতের হাওয়ায় লাগল নাচন আমলকির ওই ডালে ডালে।’ স্ফূর্তির গান। কিন্তু ড্যানিয়েলের চোখেমুখে আনন্দের লেশ নেই। আরামচেয়ারে শরীর এলিয়ে চোখ বুঁজে শুয়ে আছেন। হাতলে আঙুলের ঠোকায় বোঝা যাচ্ছে ঘুমিয়ে নেই, জেগে রয়েছেন।

শক্তিরূপা মেঝেতে বসে প্রাণায়াম করছেন। সামনে ল্যাপটপ খোলা। গান শেষ হতে রিমোট টিপে সাউন্ড সিস্টেম বন্ধ করে ড্যানিয়েল শক্তিরূপাকে বললেন, ‘তুমি বিবস্বানের সঙ্গে কথা বলো।’

শক্তিরূপার প্রাণায়াম শেষ পর্যায়ে। তিনি চোখের ইশারায় দময়ন্তীকে বসতে বললেন। ড্যানিয়েলকে বললেন, ‘বলব।’

দময়ন্তী আন্দাজ করল উইকেন্ড নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। দময়ন্তীর অফিসে কোনও ক্রাইসিস হল নাকি? পাশে পড়ে থাকা উইকেন্ডের পুরোনো ইস্যুগুলো উল্টোতে লাগল সে। গত সাতটা ইস্যুর কভার স্টোরিতে মৃন্ময়ের ছবি। নতুনগ্রাম, জোয়াকিম সম্প্রদায়, তাপসী নস্কর, হেল্‌থহাব, পশ্চিমবাংলার অবনমন—ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই বিষয়। শক্তিরূপাকে দময়ন্তী জিজ্ঞাসা করল, ‘অফিসে প্রবলেম?’

‘প্রবলেম ভাবলে প্রবলেম। না ভাবলে নয়।’ প্রাণায়াম শেষ করে বলেন শক্তিরূপা। ‘মায়াকমের প্রতিটি প্রোডাক্টের মার্কেট সার্ভে এবং ইন্টার্নাল রেটিং হয়। তার ওপরে ভিত্তি করে আগামী সংখ্যার বিষয় ঠিক হয়। রেটিং বলছে, পাবলিকের কাছে মৃন্ময়ের ডিমান্ড হাই। সুতরাং আমাকে মৃন্ময়-কেন্দ্রিক স্টোরি ছাপতে হচ্ছে। আমার ইচ্ছে থাকলেও অন্য কোনও বিষয় দিতে পারছি না।’

‘তুমি না এডিটর?’ দময়ন্তী অবাক।

‘এডিটর হলেও পলিসি মেকিং মিটিং-এর সময়ে আমাকে সার্কুলেশান, ব্র্যান্ডিং বা মার্কেটিং ডিপার্টমেন্টের কথা শুনে চলতে হয়।’

‘এটাকে জার্নালিজম বলে নাকি? এ তো ম্যানেজারগিরি? যে কেউ করতে পারে।’

‘পারে তো! ইনফ্যাক্ট এডিটর পোস্টের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে একটা মিটিংও আছে কয়েক দিন পর।’

‘যাব্বাবা! এডিটরও ইনডেসপেনসিব্‌ল নয়?’ দময়ন্তী সত্যিই অবাক হল।

‘নো বডি ইজ ইনডেসপেনসিব্‌ল। একটু ভাও দেখিয়েছ, একটু ট্যাঁফুঁ করেছ, অমনি তুমি আউট।’

‘ট্যালেন্টের কোনও ভ্যালু নেই?’

‘টু বি ভেরি অনেস্ট, বেঙ্গলে ট্যালেন্ট নেই। ট্যালেন্টেড বাঙালি আছে বাংলার বাইরে। সেটা বিদেশে হতে পারে, সেটা ভারতের অন্য রাজ্যে হতে পারে। পশ্চিমবাংলার বাঙালি আদতে নিম্নমানের।’

‘এটা তুমি নিজের বিটারনেস চাপা দিতে বলছ।’ আপত্তি করে দময়ন্তী।

শক্তিরূপা বলেন, ‘আমার কোনও বিটারনেস নেই দিঠি। আমি চিরকাল নিজের টার্মসে কাজ করেছি। সে কাজ সংসারের হতে পারে। সে কাজ অফিসের হতে পারে। আমি আমার ভ্যালুজে স্টিক করে থাকব। বস বোকা নয় যে যুক্তি বুঝবে না। নেগোশিয়েট করতে হবে, যুক্তি দিতে হবে, আমার পয়েন্ট অব ভিউ বোঝাতে হবে। আশা ছেড়ে দিলে চলে?’

ড্যানিয়েল এতক্ষণ মা-মেয়ের আলাপচারি, শুনছিলেন। এবার বললেন, ‘তোমার সঙ্গে মনিবের ঝামেলা হচ্ছে। আর আমার সঙ্গে তোমার মনিবের বউয়ের ঝামেলা হচ্ছে।’

‘তোমার ঝামেলা তুমি নিজে তৈরি করেছ।’ হাসতে হাসতে বলেন শক্তিরূপা। ‘নিজের এক্সিবিশনের ওপেনিং-এর দিন মিছিল করতে চলে গেলে। নিজের আঁকা ছবি রাস্তার দোকানে ফটোকপি করালে। এতে শিল্পীর ইজ্জত থাকে? তুমি ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকো বলেই তোমার সইয়ের অত দাম। রাস্তায় নেমে স্টার ভ্যালু হারিয়ে ফেলো না।’

‘হৈমবতী আমাকে ঠিক এই কথাগুলোই বলছিলেন। আচ্ছা, আমি তো মানুষ। মাইকেল জ্যাকসন কিংবা মেরিলিন মনরোর মতো তারকা নই যে বুদবুদের মধ্যে থাকতে হবে, আকাশের গায়ে ঝুলে থাকতে হবে। আমি তো বাজার যাই, দোকানে যাই, হাঁটতে বেরোই—তাতে তো কোনও সমস্যা নেই।’

‘তুমি পারফর্মিং আর্টিস্ট নও যে রাস্তায় লোকে তোমার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়বে। তোমার ফ্যান বেস আলাদা। তাঁরা ছড়িয়ে আছেন সারা বিশ্বে। তারা তোমার সিগনেচারকে তুমি বলে মনে করেন। তোমার তুলির স্ট্রোক দিয়ে তাঁরা তোমাকে চেনেন। তোমার বাজার করার ছবি কাগজে বেরোয় না। তাই তাঁরা জানেন না। কিন্তু তোমার মিছিলের ছবি সব চ্যানেল দেখাচ্ছে। ন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল কভারেজে বাঁজাপলাশ গ্রাম এবং এই মিছিল আছে। তাতে তোমার ফ্যান বেস খুশি নয়। হৈমবতীর অসন্তুষ্ট হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।’

‘সারা জীবনে একটা মিছিলে হাঁটলাম বলে আমার শিল্পীসত্তার বারোটা বেজে গেল? আমি উন্মাদ না জনমোর্চা যে আমাকে এইসব বোঝাচ্ছ?’ উত্তেজিত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন ড্যানিয়েল।

‘তুমি ভুল করছ।’ শান্তকণ্ঠে বলেন শক্তিরূপা। ‘শিল্পসৃষ্টি এক জিনিস। তার বিপণন অন্য রকমের খেলা। তুমি ছবি আঁকো। হৈমবতী তোমার ছবি বিক্রি করেন। তোমার ছবি তোমার দর্শকের কাছে পৌঁছে দেন। তাঁর মতামত তোমার মতোই গুরুত্বপূর্ণ!’

‘তাই নাকি?’ পায়চারি করতে করতে হাসেন ড্যানিয়েল। ‘চিত্রকর আর চিত্র-বিক্রেতা এক হয়ে গেল তা হলে?’

‘বাস চালায় ড্রাইভার। টিকিট কাটে কন্ডাক্টর। এদের মধ্যে কাকে সরিয়ে নিলে বাস বন্ধ হয়ে যাবে বলে তোমার মনে হয়?’ ড্যানিয়েলকে প্রশ্ন করেন শক্তিরূপা।

‘এটা কোনো প্রশ্ন হল?’ তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলেন ড্যানিয়েল, ‘চালক, অবশ্যই।’

‘ভুল। দুজনেই সমান গুরুত্বপূর্ণ। ড্রাইভারকে সরালে বাস সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ হয়ে যাবে। কন্ডাক্টারকে সরালে টিকিট কাটা বন্ধ হয়ে যাবে। মালিকের রোজগার বন্ধ হয়ে যাবে। টাকার অভাবে ডিজেল বা পেট্রল কেনা বন্ধ হয়ে যাবে। ফলে দিন দশেক পরে বাস বন্ধ হবে। ঠিক তো?’

‘উপমাকে আমি বলি কুযুক্তি। চিত্রশিল্পী ও চিত্র বিক্রেতার সমীকরণ এবং গাড়িচালক ও পরিষেবা প্রদানকারীর সমীকরণ এক নয়। এটা তুমি ভালো করেই জানো।’ চেয়ার ধরে দাঁড়ালেন ড্যানিয়েল, ‘আমার হৃদয় চেয়েছিল আমি এই সামাজিক অন্যায়ের প্রতিবাদ করি। আমি হৃদয়ের কথা শুনেছি। তুমি জানো কি না জানি না, কোনও কোনও শিল্পী বলছেন, প্রদর্শনীর উদ্বোধনের দিন আমার মিছিলে যাওয়াটা চমক দেওয়ার চেষ্টা। ছবির বাজার বাড়ানোর চাল। এবার তুমি কী বলবে?’

‘আমি শুধু বলব যাঁরা এই কথা বলছেন, তাঁরা মূর্খ, অশিক্ষিত, ফ্রাস্ট্রেটেড। তাঁরা ড্যানিয়েল আর্চারের ছবি বোঝেন না, ড্যানিয়েল আর্চারের ছবির বাজারও বোঝেন না। না বোঝেন আর্টস, না বোঝেন কমার্স। তুমি এঁদের কথায় নেচো না।’

ড্যানিয়েল উত্তেজিত হয়ে হাঁফাতে হাঁফাতে বললেন, ‘ওঁদের যুক্তি মানবো না। কিন্তু তোমার যুক্তি মানবো, তাই তো?’

‘হ্যাঁ। আমার এবং হৈমবতীর।’

‘তোমার এবং হৈমবতীর যুক্তি মেনে ছবির বাজার ধরে রাখার জন্য আমাকে মানুষের থেকে বিচ্ছিন্ন থাকতে হবে। কিন্তু আমি তো নিজেকে এইভাবে মানুষের কাছে পেশ করতে চাইনি। এই প্রক্ষেপণ সংবাদ মাধ্যমের বানানো।’

‘প্রক্ষেপণ মানে কি ইমেজ বলতে চাইছ?’

‘হয়নি, না?’ লাজুক হাসেন ড্যানিয়েল।

‘আমি বুঝেছি মানে হয়েছে। কিন্তু আসল কথাটা হল, তোমার ওই ইমেজ যাদেরই বানানো হোক না কেন, ওটাই তুমি।’

‘আমি তার জন্য কী করতে পারি?’ নিজের বুকে থাপ্পড় মেড়ে বলেন ড্যানিয়েল। তারপর ধড়াম করে মেঝেতে পরে যান।

‘কী হল?’ বলে লাফিয়ে ওঠেন শক্তিরূপা। দময়ন্তীও ড্যানিয়েলের কাছে দৌড়ে যায়।

.

ড্যানিয়েলকে নার্সিং হোমে ভর্তি করে হোস্টেলে এসেছে দময়ন্তী। বড় কিছু হয়নি। দুর্বলতার কারণে পড়ে গিয়েছিলেন। রক্তচাপ কম, মাথা ঘোরা, শরীরে নুনের অভাব— যে কোনও কারণ হতে পারে। রাতে ফোন করে শক্তিরূপার কাছ থেকে দময়ন্তী জেনেছে যে ড্যানিয়েলের ইসিজি, ইইজি, ব্রেনের সিটি স্ক্যান, চেস্ট এক্সরে রিপোর্ট নর্মাল। পেটের আলট্রা সোনোগ্রাফিতে হালকা একটা শ্যাডো আছে। সোনোলজিস্ট শ্যাডোর কারণ ব্যাখ্যা করতে না পেরে সিটি স্ক্যান করতে বলেছেন। ব্লাড রিপোর্ট কাল রাত পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। আজ দেবে বলেছে। বাবা-মায়ের কাজের চাপ, বাবার শরীর খারাপ—সব মিলিয়ে দময়ন্তীর মন খারাপ। ওই জন্যই অ্যালোপাম।

মাথায় জল পড়তে ঘুমঘুম ভাব কিছুটা কাটল। কারগো আর টিশার্ট গলিয়ে ডাইনিং হলের দিকে রওনা দিল দময়ন্তী। ভরপেট ব্রেকফাস্ট করে এক কাপ কফি খেয়ে দেখা যাক—ওষুধের খোঁয়াড়ি কাটে কি না।

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে স্বপ্নে শোনা গানটা আবার শুনতে পেল দময়ন্তী, ‘হাম হ্যায় নয়ে, আন্দাজ কিঁউ হো পুরানা।’

এতক্ষণ শ্রাব্য হ্যালুসিনেশান ছিল। এবার যুক্ত হল দৃশ্য হ্যালুসিনেশান। সিঁড়িতে তার ঠিক আগে বিলুদা নাচছে। কাঁধে এ কে সাতচল্লিশ, পরনে জলপাই সবুজ কমব্যাট গিয়ার, পায়ে স্পাইক লাগানো বুট, মাথায় সবুজ ফেট্টি। জলপাই সবুজ শার্ট রক্তে লাল হয়ে যাচ্ছে। বিলুদা হঠাৎ নাচ থামিয়ে বলল, ‘তুই বাদশা ঘোষকে সব কথা না বললেই পারতিস। তাহলে সব্যসাচী আর আমাকে মরতে হত না।’

‘আমি খবর দিইনি।’ ঝাঁঝিয়ে ওঠে দময়ন্তী। ‘ওরা সব জানত। আমার কাছে ক্রস চেক করতে এসেছিল। আমি সত্যি কথা বলে দিয়েছি।’

‘সত্যি কথা বলার সময়ে তুই জানতিস এর আফটার এফেক্ট কত মারাত্মক হতে পারে?’

‘তুমি আমাকে অ্যাকিউজ করছ নাকি?’ চিৎকার করে ওঠে দময়ন্তী।

‘অ্যাকিউজ করছি না। যাকে ভালোবাসি, তাকে কি অ্যাকিউজ করা যায়? তুই বল?’

‘আমি ভালোবাসা বুঝি না।’ ছটফটিয়ে উঠে বলে দময়ন্তী, ‘লং টার্ম কমিটমেন্টে যেতে আমার ভয় করে। মনে হয়, যদি সম্পর্কটা আবার নষ্ট হয়ে যায়? তা হলে আবার কষ্ট পেতে হবে।’

‘আমি তো তোকে বলেছিলাম, দু’জনে মিলে ইংল্যান্ড চলে যাব। ন্যাশনাল হেল্‌থ সার্ভিসে জয়েন করব। তুই হ্যাঁ বা না, কিচ্ছু বললি না। বোবার মতো চুপ করে রইলি।’

‘আমি জানি না। আমি কিচ্ছু জানি না। কেন তুমি আমাকে বারবার এক কথা বলে বিরক্ত করো?’ চিৎকার করে বলে দময়ন্তী।

বৃন্দা পাশ থেকে বলে, ‘কী রে! পাগল হয়ে গেলি নাকি? কার সঙ্গে ঝগড়া করছিস?’

নিজেকে সামলায় দময়ন্তী। এক হাতে রেলিং আর অন্য হাতে বৃন্দার কাঁধ খিমচে বলে, ‘আয়্যাম হ্যাভিং অডিটারি অ্যান্ড ভিশুয়াল হ্যালুসিনেশান। আমাকে একবার সাইকায়াট্রি ওয়ার্ডে নিয়ে যাবি? পরীক্ষাটা বড্ড চাপের হয়ে যাচ্ছে।’

বৃন্দা দময়ন্তীকে ধরে আছে। মেয়েটা থরথর করে কাঁপছে। সিঁড়ি থেকে পড়ে না যায়। সান্ত্বনা দেবার জন্য সে বলল, ‘চল, এখনই তোকে নিয়ে যাচ্ছি। আজ সকালে পড়াশুনা করতে হবে না। দুপুরে মেসে খাব না। রোম্যানো স্যান্টোস থেকে খাবার কিনে ফিরবো। কী খাবি বল। মিক্সড ফ্রায়েড রাইস না মিক্সড চাউমিন?’

ওয়াক তুলতে তুলতে দময়ন্তী বলল, ‘রোম্যানো স্যান্টোসের খাওয়ারের কোয়ালিটি আগের থেকে খারাপ হয়ে গেছে। মনে হয় দোকানটা বন্ধ হয়ে যাবে।’

‘কেন রে?’ অবাক হয়ে বলে বৃন্দা।

‘অভির বাবাকে ছেড়ে ঋষিতা ক’দিন হল সন্তোষকে পাকড়েছে। এটা রমেনের বাড়িতে জানাজানি হয়ে যাওয়ায় রমেন আর সন্তোষের মধ্যে বেদম ঝগড়া হয়েছে। এনিওয়ে! চল, চেঞ্জ করে সাইকায়াট্রি ওপিডিতে যাই। আই সিরিয়াসলি নিড হেল্প।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *