হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ১৬

১৬. দময়ন্তী

সকালবেলা দময়ন্তীর ঘুম ভাঙল বৃন্দার ঝাঁকুনিতে। ‘দিঠি ওঠ। আটটা বাজে।’

‘আটটা?’ একলাফে বিছানায় উঠে বসে দময়ন্তী। ‘সকাল সাতটার সময় অ্যালার্ম দিয়েছিলাম। অ্যালার্ম বাজল না কেন? মোবাইলের ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে? তোকে কতবার বলেছি মোবাইলে ঠিকঠাক চার্জ দিতে। এই স্মার্টফোনগুলো খুব ব্যাটারি খায়…’

‘চুপ! বেশি কথা বললে মারব।’ দময়ন্তীকে থাপ্পড়ের মুদ্রা দেখায় বৃন্দা। ‘মোবাইলের অ্যালার্ম প্রতি দশ মিনিট অন্তর বেজে গেছে। আমাদের ঘুম ভাঙেনি। আচ্ছা, তুই না হয় ঘুমের ওষুধ খেয়ে মড়ার মতো ঘুমোস। আমার কী হল বল তো?’

‘জানি না। দশটার থেকে ফরেনসিক মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা। ভেবেছিলাম সকালে দু’ঘণ্টা পড়ে টক্সিকোলজি রিভাইস করব। সব মায়ের ভোগ্‌স হয়ে গেল। ধুস্‌ শালা!’

‘মেলা ফ্যাচফ্যাচ করিস না। গৌতম বিশ্বাসের টেক্সট বুক খোল। মুখেমুখে একঘণ্টায় রিভিসন হয়ে যাবে। বাথরুমে এখন বিপুল চাপ। ওদিকে না যাওয়াই ভালো।’

‘ঠিক হ্যায়,’ ফসফস করে পাতা উলটে দময়ন্তী বলে, ‘বল, আইডিয়াল হোমিসাইডাল পয়েজনের ফিচার্‌স কী কী?’

আজ আজ এগারোই জুলাই। সেকেন্ড এমবিবিএস শেষ হচ্ছে ফরেনসিক মেডিসিনের প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা দিয়ে। এক সপ্তাহ ছুটির পরে ফাইনাল এমবিবিএসের থিয়োরি ক্লাস শুরু হবে।

মিনিট পঁয়তাল্লিশ পড়াশুনা করার পরে বৃন্দা বলল, ‘বাইরে একটা ভনভনানি শুনতে পাচ্ছি। করিডোরে কারা যেন ঘোঁট পাকাচ্ছে।’

‘মরুকগে যাক! তুই ইলেকট্রিকাল বার্নের পোস্টমর্টেম ফাইন্ডিং বল।’

‘দাঁড়া।’ গৌতম বিশ্বাসের বই বন্ধ করে বিছানা থেকে ওঠে বৃন্দা। করিডোরে উঁকি মারে। একটু বাদে আজ সকাল খবরের কাগজ নিয়ে ঘরে ঢোকে। তার চোখমুখে বিবমিষা।

‘কী হল?’ অবাক হয়ে বলে দময়ন্তী। ‘নতুন কোনও সিনেমার অ্যাড দিয়েছে? আজকাল তো ফ্রন্ট পেজেও অ্যাড থাকে।’

‘এই দ্যাখ!’ দময়ন্তীর হাতে ‘আজ সকাল’ কাগজ ধরিয়ে ওয়াক তোলে বৃন্দা। বলে, ‘ভায়োলেন্সের গ্রাফিকাল ছবি খবরের কাগজ কেন ছাপে? একটু রাখঢাক থাকা উচিত। দিস ইজ টু মাচ।’

দময়ন্তী কাগজ নিয়ে প্রথম পাতার ছবিটা দেখল। সাত কলম জুড়ে ব্যানার হেডলাইন। ‘জমি অধিগ্রহণ ঘিরে জনতা পুলিশ সংঘর্ষে মৃত এগারো।’ হেডলাইনের তলায় ছবি। কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ানরা চারটে মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। যেভাবে তারকেশ্বরের বাঁক কাঁধে পুণ্যার্থীরা দৌড়য়, অবিকল সেই রকম লাগছে। প্রতিটি বাঁক বহন করছে দু’জন জওয়ান। বাঁক থেকে দড়িবাঁধা হয়ে ঝুলছে লাশ। ছবিতে চারটে লাশের মধ্যে সামনের তিনটে দেখে মনে হয় বাচ্চা ছেলের লাশ। ছবিটা আবার দেখল দময়ন্তী। ওরা বাচ্চা ছেলে নয়। ওরা বাঁজাপলাশ গ্রামের জোয়াকিম। বুকটা ধড়াস করে উঠল তার!

খুঁটিয়ে আর একবার ছবিটা দেখল। একদম পিছনে যে লাশটি দেখা যাচ্ছে, এতক্ষণে তাকে চিনতে পারল দময়ন্তী। চোখে চশমা নেই। কিন্তু চাপদাড়ি আর গোঁফের কারণে সব্যসাচীকে চিনতে ভুল হল না। কান্না চেপে রিপোর্টিং-এ চোখ বোলায় সে।

‘১০ জুলাই, বাঁজাপলাশ। হেল্‌থ হাব নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণকে কেন্দ্র করে আজ জনতা ও পুলিশের সশস্ত্র সংঘর্ষে দশ গ্রামবাসী ও এক ডাক্তারি ছাত্রের মৃত্যু হয়েছে। ছাত্রের নাম সব্যসাচী সেন। তিনি ইন্ডিয়ান মেডিকাল কলেজের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র ছিলেন। এগারোটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে গতকাল সন্ধ্যা থেকে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়ে উঠেছে।

উন্নতমানের হেল্‌থ হাব তৈরির জন্য অনেকদিন ধরেই জমি খুঁজছিল সন্দীপ সামন্তর জনমোর্চা সরকার। রাজ্যে ল্যান্ড ব্যাংক না থাকার কারণে একলপ্তে একহাজার একর জমি পেতে অসুবিধা ছিল। শিল্প এবং স্বাস্থ্য দফতরের অনুমোদনক্রমে ভূমি রাজস্ব দফতর বাঁজাপলাশ গ্রামে জমি অধিগ্রহণের নোটিশ জারি করে। এতে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। জনমোর্চা সরকারের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ এই অধিগ্রহণের বিরোধিতা করছিলেন মৃন্ময় চ্যাটার্জি এবং তার নবযুগ পার্টি। তামিলনাড়ু, উড়িষ্যা এবং ঝাড়খন্ড এলাকায় সক্রিয়, নিষিদ্ধ ইন্ডিয়ান পিপল্‌স পার্টি নবযুগ পার্টির সঙ্গে মিশে কাজ করছিলেন—এই অভিযোগ করেন মুখ্যমন্ত্রী সন্দীপ সামন্ত। আজ ডাক্তারি ছাত্র সব্যসাচী সেনের মৃত্যু তাঁর দাবিকে মান্যতা দিল। মৃন্ময় চ্যাটার্জি অবশ্য দাবি করেছেন, কেন্দ্রীয় বাহিনীর পোশাকে জনমোর্চার ক্যাডাররাই জনগণকে হত্যা করেছে। কেন্দ্রীয় বাহিনীর পূর্বাঞ্চলের প্রধান গুরমিত সিং এবং কলকাতা পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের বাদশা ঘোষ অভিযোগ অস্বীকার করে যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, বাঁজাপলাশ গ্রামের একটি বাড়িতে অত্যাধুনিক ইনস্যাস, এ কে সাতচল্লিশ, হ্যান্ড গ্রেনেড ও মুঙ্গেরি ওয়ান শটার লুকিয়ে রাখা ছিল। ব্যাপক খানাতল্লাশির পরে সমস্ত অস্ত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

গন্ডগোল এড়াতে জনমোর্চা আজ জেলায় চব্বিশ ঘণ্টার বন্‌ধ ডেকেছেন। বন্‌ধের ঘোষণা উড়িয়ে দিয়ে মৃন্ময় চ্যাটার্জি বলেছেন, আজই তিনি বাঁজাপলাশ গ্রামে যাবেন। সন্দীপ সামন্ত, জনমোর্চার কর্মী, রাজ্য পুলিশ অথবা কেন্দ্রীয় বাহিনী তাঁকে বাধা দিতে গেলে রাজ্যে রক্তগঙ্গা বইবে…’

‘কাগজ রাখ।’ দময়ন্তীর হাত থেকে কাগজ কেড়ে ঘরের কোণে ছুড়ে ফেলে বৃন্দা বলল, ‘ইলেকট্রিক বার্ন পড়ব না ব্যালিস্টিক্স পড়ব? বুলেট উন্ডের ক্ষেত্রে উন্ড অব এন্ট্রি আর উন্ড অব এক্সিটের তফাত বল।’

‘বুলেট উন্ড…’ শূন্য দৃষ্টিতে বৃন্দার দিকে তাকিয়ে থাকে দময়ন্তী। হঠাৎ হাউহাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলে, ‘ক’দিন আগে স্পেশাল ব্রাঞ্চের বাদশা ঘোষ আমার কাছে এসে সব্যসাচী আর বিলুদার কথা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। আমি সব বলে দিয়েছি। বলেছি, যে আমি আর ওদের সঙ্গে নেই। বাদশা সেদিন চলে গিয়েছিলেন। হ্যাঁরে বৃন্দা, ওরা এবার আমাকে ধরবে না তো?’

‘যা করেছিস ঠিক করেছিস। কখনও কখনও সেলফিশ হতে হয়। না হলে বাঁচা যায় না। ও সব বাদ দে। আয়, আমরা রিভাইস করি। উন্ড অব এন্ট্রির ফিচার বল।’

‘আমার মনে পড়ছে না বৃন্দা। আমার মাথা কাজ করছে না।’

‘ইন দ্যাট কেস, আমি সেলফিশ হলাম। যেটুকু সময় আছে, আমাকে রিভাইস করতে দে।’ ফরেনসিক মেডিসিনের বই নিয়ে খাটে উপুড় হয়ে শোয় বৃন্দা। দময়ন্তী চেয়ারে বসে থাকে। সব্যসাচীর মৃতদেহ চ্যাংদোলা করে নিয়ে যাওয়ার ছবিটা মাথার মধ্যে ইলেকট্রিক ড্রিল দিয়ে গাঁথা হচ্ছে। নিজেকে সামলানোর জন্য টেবিলের ড্রয়ার থেকে অ্যালোপামের ফয়েল টেনে নিয়ে দুটো ওষুধ মুখে ফেলে চুপ করে বসে থাকে সে। বৃন্দা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে বলে, ‘আমি চান করতে যাচ্ছি।’ দময়ন্তী বসে থাকে।

স্নান সেরে এসে দময়ন্তীকে টেনে তোলে বৃন্দা। জোর করে বাথরুমে পাঠায়। নিজে ঝটপট পোশাক বদলায়। বাথরুমের দরজার কাছে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করে, দময়ন্তী বাথরুমে কী করছে। কোনও সাড়াশব্দ নেই, জল ঢালার আওয়াজ হচ্ছে না। বিরক্ত হয়ে বাথরুমের দরজায় দুমদাম কিল মারে বৃন্দা।

ধাক্কাধাক্কিতে দরজা খুলল দময়ন্তী। এক পলক দেখেই বৃন্দা বুঝল, দময়ন্তী কাঁদছিল। মেয়েটার ঘেঁটি ধরে রুমে নিয়ে এসে পোশাক বদলাতে বাধ্য করল। সৌভাগ্যবশত কাল রাতেই দু’জনে পরীক্ষার ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিল। কাঁধে ন্যাপস্যাক ঝুলিয়ে, এক হাতে দময়ন্তীর ন্যাপস্যাক আর অন্যহাতে দময়ন্তীকে নিয়ে ফরেনসিক মেডিসিন ডিপার্টমেন্টের সামনে পৌছে, দময়ন্তীর হাতে ব্যাগ ধরিয়ে বৃন্দা বলল, ‘ঘোড়াকে নদীর ধারে পৌঁছে দিলাম। জল খাওয়ার দায়িত্ব তার নিজের।’

একা হয়ে ঘাবড়ে গেল দময়ন্তী। একাধিক চিন্তাসূত্র তার মাথার ঘুরপাক খাচ্ছে। একটা সূত্র বলছে, দুটো অ্যালোপাম খাওয়া ঠিক হয়নি। পরীক্ষা দিতে গিয়ে ঘুম পাবে। আর একটা সূত্র বলছে, সব্যসাচীদা মারা গেল? তৃতীয় সূত্র বলছে, কিছু মনে নেই, কী পরীক্ষা দেব? চতুর্থ সূত্র বলছে, সকালে কিছু খাইনি। মাথায় কম গ্লুকোজ থাকলে কিচ্ছু মনে পড়বে না। পঞ্চম সূত্র বলছে…

ডক্টর পট্টনায়েক দময়ন্তীর নাম ধরে ডাকলেন। তার নাম ধরেই ডাকলেন তো? দময়ন্তী তারই নাম, তাই না? মে বি, মে বি নট! চেয়ার থেকে ওঠে দময়ন্তী। কিছু বোঝার আগেই এত জোরে মাথা ঘুরল যে সে উলটে পড়ে যাচ্ছিল। চেয়ারের হাতল ধরে সামলাল। বড় বড় হাই উঠছে। ঘুমে চোখ ঢুলে আসছে। মুখে হাত চাপা দিয়ে দিয়ে হাই আটকায় দময়ন্তী। জোর করে চোখ খোলা রাখে। সন্তর্পণে ভাইভা টেবিলে বসে। ডক্টর পট্টনায়েকের পাশে এক্সটার্নাল এক্সামিনার বসে। মহিলা বললেন, ‘রাতে ঘুমোওনি।’

‘ঘুমিয়েছি।’ সংক্ষিপ্ত জবাব দময়ন্তীর।

‘তাহলে নিশ্চয় টেনশান হচ্ছে?’ সহানুভূতির সঙ্গে বললেন তিনি।

‘অল্প।’

‘ঠিক আছে, তাহলে সোজা প্রশ্ন দিয়ে শুরু করি। তোমার কাছে পোস্ট মর্টেমের জন্য একটা ডেডবডি এসেছে। বাড়ির লোক বলছে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। পড়শি বলছে, গলায় ফাঁস লাগিয়ে মেরে ফেলে তার পরে ঝুলিয়ে দিয়েছে। তুমি ডেডবডিতে কী খুঁজবে?’

দময়ন্তীর মাথায় একমনি পাথর বসানো। কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। যুক্তিবুদ্ধি কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। হাই চেপে সে বলল, ‘ডেথ বাই হ্যাঙ্গিং অথবা স্ট্র্যাঙ্গুলেশান। এবং সেটা অ্যান্টেমর্টেম না পোস্টমর্টেম। তাই তো?’

‘আমি উত্তর চাইছি। কোনও প্রশ্ন নয়।’ মহিলা এক্সামিনার ঠোঁটের কোণে সরু হাসি ঝুলিয়ে দময়ন্তীর দিকে তাকিয়ে। ডক্টর পট্টনায়েক পাশ থেকে উৎসাহ দিচ্ছেন, ‘বলো। এ তো সোজা প্রশ্ন। গলায় ফাঁস দিয়ে খুন করলে ধস্তাধস্তি হবে। তাহলে কী পাবে?’

‘ক্লু দেওয়ার চেষ্টা করবেন না রেবতীদা।’ ক্রুর হাসলেন মহিলা। ‘আপনার কলেজের এক্সামিনার গতকাল আমার কলেজে গিয়ে দেড়শো জনের মধ্যে পঁচিশজনকে ঝাড় নামিয়ে এসেছেন। দোজ টুয়েন্টি ফাইভ আর ক্রাইং ফর ব্লাড। আমারও ওয়ান ফিফ্‌থ কোটা আছে। পঁচিশজনকে ঝাড় না নামালে ওরা আমায় ছিঁড়ে খাবে। আমি উওম্যান অব প্রিন্সিপাল। উত্তর দিতে পারলে পাশ করাব। না দিতে পারলে ফেল।’

মহিলার কথায় দময়ন্তীর মাথার কুয়াশা কেটে গেল। মন খারাপের ব্যামো, ঘুমের ওষুধের প্রভাব, সব্যসাচীদার জন্য দুঃখবোধ—সব হাওয়া। গ্লুকোজহীন মাথা যথাসম্ভব চাঙ্গা। দময়ন্তী ভাবল, ‘ফরেনসিক মেডিসিনের মতো ইন্টারেস্টিং এবং র‌্যাশনাল সাবজেক্টে আমার সঙ্গে পাঙ্গা? টেক্সট বুকটা মিনিমাম দশবার পড়েছি। মোস্ট প্রোবাব্‌লি, তোর থেকে থিয়োরি বেশি জানি। আয় শালি!’

দময়ন্তীর ঠান্ডা মাথায় উত্তর দেওয়া শুরু করল। ‘গলায় ফাঁস লাগিয়ে হত্যা করার পরে ঝোলালে ওজন ক্যারি করার জন্য দড়ির ফাইবার ছিঁড়ে যাবে। তা ছাড়া যে বিমে বডি ঝোলানো হয়েছে, সেই বিমেও দড়ির ফাইবার থাকবে। সুইসাইডাল হ্যাঙ্গিং-এ সেটা হবে না। এছাড়াও গলায় দড়ি পরানোর সময় ভিক্টিম রেজিস্ট করলে তার শরীরে অ্যাব্রেসান মার্কস থাকবে। যদি ঘুমের ওষুধ বা অন্য কিছু খাওয়ানো হয়ে থাকে, তাহলে স্টম্যাকে তার এভিডেন্স পাওয়া যাবে।’

‘আর কিছু?’ এক্সটার্নাল মহিলা বেশ অবাক। ঝিমোতে থাকা একটা মেয়ে হঠাৎ এত নিখুঁত উত্তর দেবে আশা করেননি। ‘হ্যাঙ্গিং আর স্ট্র্যাঙ্গুলেশানের তফাৎ কী করে বুঝবে?’

‘হ্যাঙ্গিং-এ, পেশেন্ট যদি রাইট হ্যান্ডার হয়…’ বলে চলল দময়ন্তী।

টানা তিন ঘণ্টা ভাইভা এবং প্র্যাকটিকাল পর্বের শেষে সবাই মুক্তি পেল। দময়ন্তী আন্দাজ করতে পারছে, সে পাশ করেছে। এক্সাটার্নাল পরের দিকে কঠিন কঠিন প্রশ্ন করেছিলেন। সব উত্তর দিয়েছে। প্রবাল, দীপ, সঞ্জয়, সুরজ, সবুজ, জেম্‌সি, অভি মুখ চুন করে বেরোচ্ছে। এদের মধ্যে অনেককেই ঝাড় নামিয়েছেন মহিলা।

যাক গে! ওসব ভেবে লাভ নেই। সেকেন্ড এমবিবিএস শেষ। আজ রাতে পার্টি করা উচিত। বাকিদের পরীক্ষা জুতের হয়নি বলে ওদের পার্টি করার কথা বলা যাবে না। চন্দন আর বৃন্দা ভালো পরীক্ষা দিয়েছে—এ নিয়ে কোনও সন্দেহ নেই। কিন্তু আজ ওদের মাঝখানে কাবাব মে হাড্ডি হওয়ার মানে হয় না। দময়ন্তী লেডি আর্চার্স হোস্টেলে পাঁচ মিনিটের জন্য ঢুকল। ন্যাপস্যাকে নোংরা জিনস, টপ, ম্যাক্সি, প্যান্টি, ব্রা আর অন্যান্য হাবিজাবি ঢুকিয়ে দরজায় তালা মেরে উঁকি দিল আপ্পুর ঘরে।

মেডিসিনের বই খুলে আপ্পু উদাস হয়ে বসে। হাতে আজকের আজ সকাল। দময়ন্তীকে দেখে বলল, ‘পরীক্ষা কেমন হল?’

‘নট ব্যাড। পাশ করে যাব।’

‘জেম্‌সি আর সাবিনা কান্নাকাটি করছে।’

‘জানি।’

‘সব্য-র খবরটা জানিস?’

‘জানি।’

‘পুলিশ কি তোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল?’

আপ্পুর প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে দময়ন্তী জিজ্ঞাসা করল, ‘তোমার প্রিপারেশান কেমন চলছে?’

‘ফাইনাল এমবিবিএস-এর প্রিপারেশান কখনও শেষ হয় না। আমি আর রিপু মিলে গ্রুপ স্টাডি করছি। মেডিসিন সাবজেক্টটা এত ভাস্ট যে পাগল পাগল লাগছে।’

পাগলের প্রসঙ্গ ওঠায় খুশি হল দময়ন্তী। বলল, ‘ওয়েলকাম টু দ্য ম্যাড মেডিক ক্লাব। ডাক্তারি পড়তে ঢুকে, চাপ নিতে না পেরে প্রতি বছর কেউ না কেউ পড়া ছেড়ে দেয়, অথবা সুইসাইড করে। আমাদের ব্যাচে সেরকম কিছু হবে না?’

আপ্পু ভুরু কুঁচকে বলল, ‘ফালতু বকিস না। আমার প্রশ্নের জবাব দে। পুলিশ কি তোর সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল?’

সামান্য থমকালো দময়ন্তী। নিচের ঠোঁট দাঁত দিয়ে কামড়ে ভাবল। বলল, ‘পরীক্ষা শেষ। বাড়ি চললাম। নেক্সট উইকে দেখা হবে।’ আপ্পুর উত্তর শোনার জন্য অপেক্ষা করল না।

শেয়ালদা চত্বর আজ শুনশান। জনমোর্চা একটা জেলায় বনধ ডেকেছে। রাজ্যের বাকি অংশে তার প্রভাব পড়ার কথা নয়। কিন্তু সকাল থেকেই স্কুপ টিভিতে বাঁজাপলাশ গ্রামের হত্যাদৃশ্য এত বার দেখানো হয়েছে যে রাজ্য জুড়ে বিক্ষিপ্ত রাজনৈতিক হিংসা ছড়িয়ে পড়েছে। কোথাও জনমোর্চা আর নবযুগের ক্যাডারদের মধ্যে বোমাবাজি, কোথাও জনতা-পুলিশ সংঘর্ষ, কোথাও নবযুগের ক্যাডারের সঙ্গে পুলিশের লাঠালাঠি। ফল হিসেবে কলকাতায় অঘোষিত বন্‌ধ। বাস, ট্রাম, ট্যাক্সি, প্রাইভেট কার— কিচ্ছু চলছে না। সরকারি বাসের টিকি দেখা যাচ্ছে না। সার্কুলার রোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে দময়ন্তীর মনে হল বন্‌ধ থাকলে শহরটাকে অনেক পরিষ্কার লাগে। মালিন্যহীন, ঝকঝকে লাগে। শহরের স্বাস্থ্যের কারণে প্রতি মাসে একবার বন্‌ধ পালন করা উচিত।

দ্রুত পায়ে মৌলালি টপকালো দময়ন্তী। অধিকাংশ দোকান বন্ধ। মোড়ে মোড়ে জটলা। কমবয়সি চ্যাংড়া ছোঁড়া, বাইক বাহিনী আর দলীয় পতাকা হাতে ক্যাডারদের মার্চপাস্ট কাটিয়ে রোম্যানো স্যান্টোসের সামনে পৌঁছেছে দময়ন্তী, এমন সময় তার দশ হাতের মধ্যে একটা বোম ফাটল। হঠাৎ চোখের সামনে বারুদের ঝলকানি, কানের পর্দা ফাটানো ‘দড়াম’ শব্দ আর বাঁ পায়ে তীব্র যন্ত্রণা। আওয়াজ আর যন্ত্রণার অভিঘাতে দময়ন্তী ফুটপাথে পড়ে গেল। চশমা ভেঙে গেছে, ন্যাপস্যাক কাঁধ থেকে ছিটকে গেছে, মোবাইল কোথায় কে জানে!

আশপাশ ঝাপসা! আগুনের ঝলক। চিৎকার। ধোঁয়া! আর্তনাদ! পুলিশের বুটের শব্দ! হঠাৎ হঠাৎ একটা দুটো স্লোগান। সন্দীপ সামন্তর মা-বোন তুলে খিস্তি। মৃন্ময়কে নিয়ে পাল্টা খিস্তি। আবার বোমার আওয়াজ!

কেউ একজন দময়ন্তীকে এক ঝটকায় ফুটপাথ থেকে টেনে তুলল। ফুটপাথ হাতড়ে মোবাইল উদ্ধার করল দময়ন্তী। ভাঙা চশমার ফ্রেম আর ন্যাপস্যাকও পাওয়া গেছে। আগন্তুকের হাত ধরে ফুটপাথ দিয়ে কোনও একটা গলিতে ঢুকে পড়ে দময়ন্তী খেয়াল করল, তার উদ্ধারকারিণী হল ঋষিতা। আর, তার গোড়ালিতে বোমার স্প্লিন্টার লেগে দরদর করে রক্ত বেরোচ্ছে।

দময়ন্তী ঋষিতাকে বলল, ‘থ্যাংকস।’

একটা রিকশাওয়ালাকে ঋষিতা বলল, ‘এন্টালি যাব। ভেতর দিয়ে চলো।’ রিকশাওয়ালা গন্ডগোল থেকে পালানোর তাল করছিল। ভাড়া পেয়ে যাওয়ায় সে খুশি হয়ে রিকশা নিয়ে সাঁ-সাঁ দৌড় দিল।

এই প্রথম ঋষিতার পাশে বসেছে দময়ন্তী। এতদিন ঋষিতার সঙ্গে দু’একটা কথা আর সৌজন্য বিনিময় ছাড়া কিছু হয়নি। আজ মেয়েটা তার প্রাণ বাঁচাল। রুমাল দিয়ে ক্ষতস্থান বাঁধতে বাঁধতে দময়ন্তী বলল, ‘তুমি ফিরবে কী করে?’

‘এখন ফিরব না। আমার অফিস খোলা। দাদাকে একটা দরকারি কাগজ দিতে রোম্যানো স্যান্টোসে এসেছিলাম। বেরোতে গিয়ে দেখি এই কাণ্ড!’

‘আজ অফিস খোলা রাখবে?’

‘হ্যাঁ। গোলমহলের ভেতরে গন্ডগোল পৌঁছবে না। কোনও কাস্টমারও আসবে না। ঠান্ডা মাথায় কাজ করব।’

দু’জনের কথার মধ্যে গোলমহল চলে এসেছে। ঋষিতা দময়ন্তীকে টাকা বার করতে দিল না। ভাড়া মিটিয়ে বলল, ‘আমি তোমাকে ওপরে পৌঁছে দেব?’

‘না। থ্যাংক ইউ।’ কেঠো ধন্যবাদ জানিয়ে দোতলায় ওঠে দময়ন্তী। ড্যানিয়েল তাকে কোনও ফোন না করলেও শক্তিরূপা একটা মেসেজ করেছেন। ছোট্ট বক্তব্য। ‘জাস্ট ইনফর্ম মি দ্যাট ইউ আর ওকে।’

‘আই অ্যাম ওকে। অ্যান্ড অ্যাট হোম। ফিল ফ্রি টু রিং।’ পাল্টা মেসেজ পাঠায় দময়ন্তী। চাবি দিয়ে কোলাপসিব্‌ল গেট খুলে বসার ঘরে ঢোকে। দেখে সোফায় বসে এক মনে টিভির দিকে তাকিয়ে রয়েছেন ড্যানিয়েল। দময়ন্তী এসেছে দেখতে পাননি।

টিভিতে কোনও শব্দ নেই। ড্যানিয়েলের পাশে রাখা রয়েছে পোর্টেব্‌ল মিডিয়া প্লেয়ার। সেটা ফিট করা অ্যামপ্লিফায়ারের সঙ্গে। দেবব্রত বিশ্বাস গাইছেন,

‘বিধির বাঁধন কাটবে তুমি এমন শক্তিমান,

তুমি কি এমনি শক্তিমান

আমাদের ভাঙাগড়া তোমার হাতে

এমন অভিমান তোমাদের এমনি অভিমান…’

.

টিভিতে আছড়ে পড়ছে একের পর এক দৃশ্য। কেন্দ্রীয় ফৌজ ও পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের যৌথ বাহিনীর সাঁড়াশি অভিযান চলছে বাঁজাপলাশ গ্রামে। দিনেদুপুরে ফায়ারিং চলছে। ঝাউবন, ক্যাশুরিনার সারি আর বালিয়াড়ির পিছন থেকে পাল্টা ফায়ারিং হচ্ছে। একের পর এক মানুষ বালিতে পড়ে কাতরাচ্ছে। কাঁপতে কাঁপতে স্থির হয়ে যাচ্ছে।

ড্যানিয়েল হঠাৎ বললেন, ‘রক্ত!’

দময়ন্তী তাঁর পাশে গিয়ে বলল, ‘টিভিটা বন্ধ করে দিই?’

ড্যানিয়েল আবার বললেন, ‘রক্ত!’ তাঁর চোখ দময়ন্তীর পায়ের দিকে। দময়ন্তী বলল, ‘রাস্তায় গন্ডগোল হচ্ছিল। সামান্য চোট লেগেছে। আমি ব্যান্ডেজ করে নিচ্ছি।’

ছ’ফুটের ওপর লম্বা, বলশালী, রোমশ, থলথলে, ড্যানিয়েল শিশুর মতো কেঁদে উঠলেন। দময়ন্তীর পায়ের কাছে বসে বললেন, ‘তোর কী করে লাগল? তোকে হাসপাতালে নিয়ে যাব? ডাক্তার ডাকব?’

‘তোমায় কিছু করতে হবে না। এটা মাইনর উন্ড। আমি ড্রেসিং করে নিচ্ছি। তুমি যাও। ছবি আঁকো। অনেকদিন ক্যানভাসের কাছে যাওনি।’

‘ক্যানভাস… উন্ড… মাইনর উন্ড…’ অন্যমনস্ক হয়ে বিড়বিড় করতে করতে স্টুডিওয় ঢুকে পড়েন ড্যানিয়েল। দময়ন্তী গোড়ালি থেকে ছোট কাচের কুচি বার করে। সাবানজল দিয়ে ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে অ্যান্টিবায়োটিক অয়েন্টমেন্ট লাগায়। পরে একটা টিটেনাস ইঞ্জেকশান নিতে হবে।

সারা দিনের মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রমের পরে শরীর আর চলছে না। দুটো অ্যালোপামের এফেক্ট এখনও যায়নি। দময়ন্তী ফ্রিজ খুলে কলা আর ক্রিম বার করে মিক্সিতে দিয়ে ব্যানানা স্মুদি বানালো। বড় একটা গ্লাসে ঢেলে এক চুমুকে সবটা খেয়ে নিল। তারপর গোলঘরের দিকে রওনা হল। লম্বা একটা ঘুম দেওয়া যাক। শক্তিরূপা ফিরলে তবে উঠবে। মোবাইল সাইলেন্ট মোডে পাঠিয়ে বিছানায় শোওয়া মাত্র ঘুমের দেশে চলে গেল। ফরেনসিক ডিপার্টমেন্টের ক্যাডাভারের সঙ্গে এখন আর তার কোনও তফাত নেই।

দময়ন্তীর ঘুম ভাঙল শক্তিরূপার গলার আওয়াজে। নরম গলায় তিনি বলছেন, ‘ওঠ। খেতে চল।’

ধড়মড়িয়ে ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে মাথায় মায়ের নরম হাতের স্পর্শ পেয়ে দময়ন্তী চুপ করে শুয়ে রইল। ভাবার চেষ্টা করল, আজ কত তারিখ, কী বার, সে কোথায় শুয়ে আছে। এই বিভ্রম প্রায়ই হয়। হঠাৎ ঘুম ভেঙে মনে হয় কলেজে যেতে হবে। পর মুহূর্তে মনে হয়, আরেঃ! আমি তো হোস্টেলেই আছি। আর, এখন বিকেল।

দময়ন্তীর প্রথম কিছু মনে পড়ল না। তারপর একে একে প্রয়োজনীয় তথ্য মাথায় খেলে গেল। চোখ খুলে সে বলল, ‘ক’টা বাজে?’

‘তিনটে।’

‘ইউ মিন রাত তিনটে? আমি তা হলে অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি। তোমার ফিরতে এত দেরি হল?’

‘আজ সব সাংবাদিকেরই অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। সন্দীপ সামন্তর সরকার যা করল, তাতে পশ্চিমবঙ্গবাসী হিসেবে ভারতের কাছে মাথা হেঁট হয়ে গেছে। উই আর ডুইং অ্যান ইন ডেপ্‌থ অ্যানালিসিস অন হোয়াট ওয়েন্ট রং উইদ বাঁজাপলাশ। গাদাগাদা এডিটরিয়াল মিটিংস, ডেড লাইন্‌স, পাতা সাজানো… রিসেন্টলি বাঁজাপলাশ আর নতুনগ্রাম ঘুরে আসাটা খুব বেনিফিট দিচ্ছে।’

একটা গণহত্যা মানুষকে কতরকম ভাবে প্রভাবিত করে! দীর্ঘশ্বাস ফেলে দময়ন্তী বলে, ‘বাবা ঘুমোচ্ছে?’

‘তোর বাবা যে কাজটা করছে, সেটা তোকে দেখাব বলেই ফোন না করে নিজে ওপরে এলাম। হি হ্যাজ গন কমপ্লিটলি ম্যাড।’

শক্তিরূপার মুখে প্রশ্রয় ও গর্বের হাসি দেখে দময়ন্তী বুঝতে পারল, ‘কমপ্লিটলি ম্যাড’ শব্দবন্ধের অন্য মানে আছে। অব্যর্থ অনুমানে সে বলল, ‘বাবা আবার আঁকছে।’

ঠোঁটে তর্জনী রেখে শক্তিরূপা মেয়ের হাত ধরে টানলেন। তিনতলার গোলঘর থেকে নিঃশব্দে নেমে এল দু’জনে। দময়ন্তী এর মধ্যে মোবাইলে চোখ বুলিয়ে নিয়েছে। সে যখন ঘুমের দেশে ছিল তখন বেশ কয়েকটা ফোন এসেছে। তার মধ্যে আটটা ফোন বিলুর।

শক্তিরূপা আর দময়ন্তী ড্যানিয়েলের স্টুডিওর জানলার বাইরে দাঁড়াল। স্টুডিওর দরজা জানলা ভিতর থেকে বন্ধ থাকলেও কাচের জানলা দিয়ে ভিতরটা পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। ঝকঝকে নিয়নের আলোতে এক সঙ্গে তিনটে ক্যানভাস জুড়ে কাজ করছেন ড্যানিয়েল। তিনটে ইজেল থেকে ঝোলানো তিনটে ক্যানভাস তিনি জুড়েছেন চট সেলাইয়ের সুতো দিয়ে, এবড়ো খেবড়ো ভাবে। যে ভাবে ডোমেরা পোস্ট মর্টেম করার পরে মড়া সেলাই করে।

আজ ফরেনসিক মেডিসিনের পরীক্ষা ছিল বলে এই উপমাটা দময়ন্তীর মনে এল, এমনটা নয়। তিন ক্যানভাস জুড়ে একটাই ছবি ড্যানিয়েল আঁকছেন। তাতে দশ বামনের পোস্টমর্টেম পরবর্তী মৃতদেহের ছবি। কারও খুলি উড়ে গেছে, কারও হাত নেই, কারও পেট ফেটে নাড়িভুঁড়ি বেরিয়ে গেছে। ক্যানভাস সেলাই এমনভাবে করা হয়েছে, যাতে পোস্টমর্টেম পরবর্তী সেলাই আর ক্যানভাস সেলাই মিলে যায়।

ছবির কেন্দ্রে রয়েছে একটি গাছ। পুষ্পপত্রহীন পলাশ গাছটি এখনও পর্যন্ত ন্যাড়া ছিল। ড্যানিয়েল এক ছোপ খুনখারাপি লাল রং লাগিয়ে ছবিটি শেষ করল। অন্য একটা ইজেলে আর একটা ক্যানভ্যাস লাগালেন।

‘তোর বাবাকে এখন ডিস্টার্ব করব না। আয় আমরা খেয়ে নিই।’ মেয়ের হাত ধরে ডাইনিং টেবিলে বসেন শক্তিরূপা। রুটি আর বেগুনভাজা খেতে খেতে দময়ন্তীর মনে হল, ডিনার সেরে বিলুকে ফোন করতে হবে।

.

‘বলো।’

‘তুমি ফোন ধরছ না কেন দিঠি? গতকাল কী হয়েছে জানো না?’

‘আমার পরীক্ষা চলছিল।’

‘তুমি এত নিষ্ঠুর কেন? পরীক্ষাটাই জীবনের সব হল? গোপাল নস্করকে পুলিশ জেরা করেছে। সব্যসাচী আর নেই। আমাকে পুলিশ খুঁজছে। তোমার খারাপ লাগছে না?’

‘লাগছে বিলুদা।’

‘তা হলে আমাকে একটু লুকিয়ে রাখো না! শান্তিনিকেতনে তোমাদের বাড়ি আছে না? ওখানে আমাকে ক’দিন থাকতে দেবে?’ হাহাকার ঝরে পড়ে বিলুর গলায়।

‘ওটা আমার বাড়ি নয়। মায়ের বাড়ি। তুমি মায়ের সঙ্গে কথা বলো।’

‘তাহলে তোমার বাড়িতে থাকতে দাও। প্লিজ! আমি এই চাপ নিতে পারছি না। সারাক্ষণ ভয় করছে। মনে হচ্ছে পুলিশ আমাকে ধরে নিয়ে যাবে। নকশাল আমলে যে সব টর্চারের কথা শুনেছি, সে সব আমি সারাক্ষণ দেখতে পাই দিঠি। সিলিং থেকে পায়ে দড়ি বেঁধে উল্টো করে ঝুলিয়ে রাখা যতক্ষণ না নাক দিয়ে টপটপ করে রক্ত পড়ে, গায়ে সিগারেটের ছ্যাঁকা দেওয়া, পেছনে রুল ঢুকিয়ে দেওয়া, একটা একটা করে নখ উপড়ে নেওয়া, পুরুষাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেওয়া, জলন্ত বাল্বে চুমু খাওয়া— সব আমি দেখতে পাই। তুমি আমায় আশ্রয় না দিলে আমি আর বাঁচব না দিঠি।’

দময়ন্তী চুপ করে থাকে।

বিলু বলে, ‘কিছু বলো। প্লিজ কিছু বলো।’

দময়ন্তী চুপ করে থাকে।

বিলু উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘একটা ছেলে মরে যাওয়ার আগে তোর কাছে কিছু চাইছে। হারামি মাগি, উত্তর দে। “হ্যাঁ”, “না”, “তোমাকে থোড়াই কেয়ার করি”—কিছু একটা বল। শয়তানি করিস না। আমি তোকে সত্যি সত্যি ভালোবাসি রে! এর মধ্যে পার্টি পলিটিক্স নেই। বিশ্বাস কর, নেই। দেশকে ভালোবেসে রাজনীতি করার পাশাপাশি মানুষকেও ভালোবাসা যায় রে পাগলি! মাইরি বলছি! বিশ্বাস কর। তুই আমায় ভালোবাসিস না? সত্যি করে বল! বল “মাক্কালি”! বল!’

দময়ন্তী চুপ করে থাকে।

বিলু উত্তেজিত হয়ে চ্যাঁচাচ্ছে, ‘কিছু বলো। ওরে আমার সোনাটা, ওরে আমার মনাটা, ওরে আমার তপ্ত দুধের ফেনাটা— কিছু বলো। আচ্ছা, তোমাকে কিছু বলতে হবে না। আমি বলছি। দিঠি, উইল ইউ ম্যারি মি? তুমি আর আমি বিয়ে করে এই শহর ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যাব। উত্তরপ্রদেশের টান্ডা নামের একটা আধা শহরে দু’জনে মিলে চেম্বার করব। তুমি গাইনি পেশেন্ট দেখবে, আর আমি জিপি করব। সন্ধেবেলা দু’জনে ছোট্ট গাড়ি নিয়ে বাজার করতে বেরোব। ওখানে মাছ পাওয়া যায় না। আমরা ডিম আর মাংস কিনব। পপিতা আর নেনুয়ার দাম নিয়ে ঝামেলা পাকাবো। বঙ্গালি ডক্টরনির খুব সুনাম হবে ওখানে।’

দময়ন্তী চুপ করে আছে।

বিলু কাঁদতে কাঁদতে বলছে, ‘অথবা আমরা এই দেশ ছেড়ে অন্য দেশে চলে যেতে পারি। সিনিয়ররা যেমন যাচ্ছে। ইংল্যান্ডের ন্যাশনাল হেল্‌থ সারভিসে জয়েন করে যাব। পাউন্ডে মাইনে, দু’জনের আলাদা আলাদা গাড়ি, গ্রামের দিকে পোস্টিং। ওদের গ্রাম অবশ্য আমাদের মতো নয়। সাসেক্স বা সাফোক বা সারেতে থাকব। সপ্তাহান্তে লম্বা ড্রাইভ করে বাঙালি বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে যাব। ডিনার হবে পট লাক। সবাই বাড়ি থেকে একটা ডিশ রেঁধে আনবে। কেউ জানবে না অন্যরা কী রেঁধেছে। একদিন এমন হবেই, যেদিন সব্বাই সিঙ্গল মল্টের সঙ্গে শুধু পটলের দোলমা খেয়ে বাড়ি ফিরবে, কেন না সবাই ওই ডিশটাই রেঁধে এনেছে। যাবে, দিঠি?’

দময়ন্তী চুপ করে আছে।

বিলুও চুপ। মোবাইলের মধ্যে বাতাস বয়ে যাওয়ার শনশন আওয়াজ ছাড়া আর কোনও শব্দ নেই। বাঁজাপলাশ গ্রামের ঝাউ আর ক্যাশুরিনা গাছের ফাঁক দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস বয়ে যাচ্ছে ইথার তরঙ্গে। আর কোনও শব্দ নেই।

নৈঃশব্দ্য ভঙ্গ করে শান্ত গলায় বিলু বলল, ‘এই নীরবতাই তোমার শেষ কথা?’

দময়ন্তী চুপ করে আছে।

বিলু বলে, ‘রাখছি। তোমরা সবাই ভালো থেকো।’

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *