হৃদয়ের নৈঃশব্দ্য – ২৮

২৮. দময়ন্তী

‘প্রতি বছর এই টাইমটায় আমার হেব্বি মজা লাগে।’ খিলখিলিয়ে হাসছে ফুলমতিয়া। সে তেরো নম্বর ঘরে বসে এক গ্লাস দুধে চকোলেট বার গুলছে। চেয়ারে বসে ওয়াক তুলছে দময়ন্তী আর বৃন্দা। শুধু এই ঘরে নয়, পুরো লেডি আর্চার্স হোস্টেল জুড়ে ‘ওয়াক ওয়াক’ রব। কোনও মেয়ে বমি করছে, কোনও মেয়ে গলায় আঙুল দিয়ে বমি করার চেষ্টা করছে, কোনও মেয়ে বমি বন্ধ করার ওষুধ খাচ্ছে।

‘কেন মজা লাগে? ওয়াক!’ মেডিসিনের টেক্সট বইয়ের প্রথম খণ্ড টেবিলে রেখে প্রশ্ন করল দময়ন্তী।

‘মনে হয়, তুমাদের সবার এক সঙ্গে পেট হয়েছে।’ হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে ফুলমতিয়া।

‘ভ্যাট! ওয়াক!’ দুধের গ্লাস হাতে নিয়ে আপত্তি জানায় বৃন্দা। ফুলমতিয়া বলে, ‘হর সাল দেখি, এই পরিক্‌ছার আগে তোমরা সব থেকে বেশি দুখ পাও। যখন ফেরো, সব্বাই খুশ। দেখে ভালো লাগে। এই তো সেদিন তোমরা এখানে ঢুকলে। দেখতে দেখতে পাঁচ বছর পেরিয়ে গেল। এবার হোস্টেল ছেড়ে চলে যাবে। ঘরে নতুন ইস্টুডেন্ট আসবে।’

‘বর্ষে বর্ষে দলে দলে… ওয়াক। আসে বিদ্যামঠতলে… ওয়াক!’ আধখাওয়া দুধের গেলাস রেখে উঠে পড়ে বৃন্দা, ‘এই চাপ আর নিতে পারছি না। চল বেরোই।’

‘চান করবি না? দময়ন্তী অবাক।

‘চানখাওয়া বিকেলের জন্য তোলা থাক। সবার সামনে পোশাক বদলাতে বদলাতে বলল বৃন্দা।

‘ও রকম কোরো না। মাথায় গুলুকোজ না গেলে জানা জিনিসও ভুলে যাবে।’ ফুলমতিয়া পরামর্শ দেয়। ‘আর, তোমাদের এই পরিক্‌ছা অনেক লম্বা হয়। শেষ হতে হতে রাত হবে।’

হতাশ হয়ে খাটে বসে পড়ে বৃন্দা বলে, ‘আর পারছি না। এই টর্চার সহ্য করা অসম্ভব। আমি এবার সুইসাইড করব।’

‘সুইসাইড পরে করিস। পরশু সার্জারি প্র্যাকটিকাল। রাত ন’টায় ফিরে আবার পড়তে বসতে হবে।’ চেয়ার থেকে উঠে বাথরুমে যেতে যেতে বলে দময়ন্তী। দময়ন্তীর কথা শুনে, ‘উঃ! মাগো!’ বলে চিৎকার করে টেবিলে মাথা ঠোকে বৃন্দা। ফুলমতিয়া তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, ‘দুধটুকু খেয়ে নাও। তোমার পরিক্‌ছা ভালো হবে। সবই তো জানো। শুধু বুঢ্‌ঢাগুলোর সামনে গিয়ে উলটি করতে হবে।’

উলটি শব্দটা শুনে বৃন্দা বলল, ‘ওয়াক্‌!’

.

মেডিসিন প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় থাকে একটা লং কেস, একটা শর্ট কেস, একটা স্পট কেস আর ইনস্ট্রুমেন্টের টেবিল। লং কেস বলতে রোগগ্রস্থ একজন মানুষ। পেটে বা বুকে জল জমেছে; হৃদয়, ফুসফুস বা স্নায়ুর কোনও অসুখে ভুগছেন তিনি। রোগীর হিসট্রি নেওয়া, পরীক্ষা-নিরীক্ষা, ডায়াগনসিস—সব লিখে ফেলতে হয় একঘণ্টার মধ্যে। তারপর এক্সামিনার এসে মৌখিক পরীক্ষা নেন।

শর্ট আর স্পট কেসে থাকে ছোটোখাটো রোগ। চামড়ার দাগ, হৃদয়ের শব্দ, স্নায়ুর সমস্যা, বড় প্লীহা—এইরকম। ডায়াগনসিস ঠিক বলতে পারলে মৌখিক পরীক্ষা শুরু হয়। ভুল বললে ওখানেই পরীক্ষা শেষ।

ইনস্ট্রুমেন্টের টেবিলে পরীক্ষক একগাদা ডাক্তারি যন্ত্র সাজিয়ে বসে থাকেন। তার মধ্যে থেকে যে কোনও একটা যন্ত্র তুলে সেটার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন করবেন। সেখানে থেকে ঢুকে যাবেন জটিলতর বিষয়ে।

দময়ন্তীর লং কেস হিসেবে বিছানায় বসে আছে কমবয়সি একটি ছেলে। অসম্ভব রোগা। পাখির মতো সরু হাত-পা। হাড়ের ওপরে চামড়ার আস্তরণ। এক ঝলক দেখেই রোগনির্ণয় হয়ে যায় দময়ন্তীর। ইনসুলিন নির্ভর ডায়াবিটিস।

রোগীর আদ্যেপান্ত পরীক্ষা করে কেস হিস্ট্রি লিখতে একঘণ্টা নিল দময়ন্তী। যে কোনও ক্রনিক রোগের পেশেন্ট নিজের রোগ এবং চিকিৎসা সম্পর্কে অনেক কথা জানে। মনিরুদ্দিন নামের ছেলেটি দময়ন্তীকে গড়গড় করে অনেক কথা বলে দিল। ব্লাড সুগার লেভেল কত থাকে, প্রতিদিন কত ইউনিট ইনসুলিন নেয়— সব।

এক ঘণ্টার মাথায় কলম থামাল দময়ন্তী। তার সামনে দাঁড়িয়ে মেডিসিনের হেড বিডিআর। দময়ন্তী কেস শিট ওঁর হাতে তুলে দিল। মিনিট খানেক ধরে খাতা পড়লেন বিডিআর। সন্তুষ্ট হয়ে বললেন, ‘তোমার হিসট্রি লেখা দেখে বোঝা যাচ্ছে ডায়াবিটিস সাবজেক্টটা জেনে এসেছ। তাই থিয়োরিটিকাল প্রশ্ন না করে কাজের প্রশ্ন করি। একজন ডায়াবিটিস পেশেন্ট হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে গেছেন। সেটা ব্লাড সুগার বেড়ে না কমে হয়েছে— কী ভাবে বুঝবে?’

পরবর্তী পনেরো মিনিট ব্লাড সুগার মাপার পদ্ধতি এবং তার নানা ফাঁকফোঁকর নিয়ে আলোচনা হল। দময়ন্তী কনফিডেন্ট যে সে লং কেসে ভালো নম্বর পাবে।

লং কেসের মৌখিক পরীক্ষার সূত্রে বিডিআর তাকে টেনে নিয়ে গেলেন স্পট কেসের আছে। একটা বাচ্চা মেয়েকে দেখিয়ে বললেন, ‘বলো।’

দময়ন্তী আঁতকে উঠে বলল, ‘পেশেন্ট দেখার সময় দেবেন না?’

‘এটা স্পট কেস। দেখো এবং ডায়াগনসিস বলো।’

প্রাথমিকভাবে ঘাবড়ে গেলেও বাচ্চাটাকে মন দিয়ে দেখল দময়ন্তী। ফ্যাকাশে চেহারা। মাড়ি দিয়ে রক্ত পড়ছে। প্লীহা বড়। অসহায়ের মতো দময়ন্তী বলল, ‘এর তো স্যার একগাদা ডায়াগনসিস সম্ভব। ব্লাড রিপোর্ট না জেনে…’

‘যে কোনও একটা ডায়াগনসিস বলো।’

‘লিউকিমিয়া।’

লিউকিমিয়া নিয়ে মিনিট পাঁচেক প্রশ্ন করে বিডিআর তাকে শর্ট কেসের কাছে নিয়ে গেলেন। দময়ন্তী দেখেই ডায়াগনসিস করল। তার প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় বিডিআর সন্তুষ্ট হয়ে বিডিআর বললেন, ‘আধঘণ্টার একটা ব্রেক নেব। তারপর ইনস্ট্রুমেন্টের টেবিল।’

‘এখনই নিয়ে নিন স্যার।’ ঘড়ি দেখে বলে দময়ন্তী। ‘চারটে বাজে। তাড়াতাড়ি পরীক্ষা চুকে গেলে হোস্টেলে ফিরে একঘণ্টা এক্সট্রা ঘুমোতে পারবো।’

‘আচ্ছা চলো। আমাদের লাঞ্চ এখনও রেডি হয়নি। বাই দ্য ওয়ে, তুমি খাবে না?’

এনার্জি বার কড়মড় করে চিবোতে চিবোতে দময়ন্তী বলল, ‘হোস্টেলে ফিরে খাব।’

‘আমি তাহলে তোমাদের আরও একজনকে ডেকে নিই। দুজনের পরীক্ষা এক সঙ্গে নিলে সময় কম লাগবে। তোমরাও কনফিডেন্স পাবে। অ্যাই অভিজ্ঞান!’

অভিজ্ঞান এক্সটার্নাল এক্সামিনারের কাছে সদ্য শর্ট কেস দেওয়া শেষ করেছে। সে বলল, ‘বলুন স্যার।’

‘তুমি আর দময়ন্তী ইনস্ট্রুমেন্টের টেবিলের ভাইভা একসঙ্গে দেবে?’

‘আপনি বললে দেব।’

‘চলে এসো।’ ইনস্ট্রুমেন্ট টেবিলের অন্য প্রান্তে রাখা চেয়ারে বসলেন বিডিআর। এই প্রান্তে দময়ন্তী আর অভি। দময়ন্তী আড়চোখে অভিকে দেখল। ছেলেটা রোগা হয়েছে, ফরসা হয়েছে, দাড়ি রাখার ফলে ম্যাচিওর্‌ড হয়েছে। চেহারায় এক ধরনের নির্লিপ্তি এসেছে। পরীক্ষার প্রিপারেশন কেমন নিয়েছে কে জানে!

‘কী ইনস্ট্রুমেন্ট নেবে?’ ট্রে-র ওপরে হাত ঘুরছে বিডিআর-এর। চোখের কোণে ফিচেল হাসি। যাদুকরের মতো আঙুল ঘোরাতে ঘোরাতে বললেন, ‘আচ্ছা, এইটা নাও।’

দময়ন্তী অবাক হয়ে দেখল ওঁর হাতে খানিকটা তুলো।

তুলো? এটা ইনস্ট্রুমেন্ট? এটা ডাক্তারির কোন কাজ লাগে? ড্রেসিং করতে? স্যানিটারি ন্যাপকিন বানাতে? রক্তক্ষরণ হলে প্রেশার ব্যান্ডেজ দিতে? কিন্তু এগুলো তো তুলোর সাধারণ ধর্ম। ইনস্ট্রুমেন্ট হিসেবে তুলোর ব্যবহার তো এগুলো নয়! দময়ন্তী ঘামতে ঘামতে হাত বাড়ায়। হাতে তুলো নেওয়া মাত্র শুরু হবে বিডিআর-এর প্রশ্নবাণ। কী হবে এবার? এত ভালো পরীক্ষা দিচ্ছিল সে। তীরে এসে এইভাবে তরী ডুববে? ইনস্ট্রুমেন্ট টেবিলে খারাপ পারফর্ম করা মানে সাপ্লি। আবার তাকে মেডিসিন পড়তে হবে? ও মাগো!

দময়ন্তীকে টপকে তুলোটা হাতে নিল অভি। দু’আঙুলের ফাঁকে পাকিয়ে সলতে বানালো। বলল, ‘কর্নিয়াল রিফ্লেক্স দেখতে আমরা এই ইনস্ট্রুমেন্ট ব্যবহার করি।’

‘গুড’, মিষ্টি হাসেন বিডিআর, ‘দময়ন্তী, এটা পারতে?’

‘হ্যাঁ স্যার।’ কনফিডেন্টলি মিথ্যে কথা বলে দময়ন্তী। পরীক্ষার সময় সত্যবাদী যুধিষ্ঠির সাজার কোনও মানে হয় না। ‘তবে আমি ড্রেসিং আর প্রেশার ব্যান্ডেজের অপশনগুলোও বলতাম।’

‘কর্নিয়াল রিফ্লেক্সের পাথওয়ে বলো।’ প্রশ্ন করলেন বিডিআর।

আবার অ্যানাটমি? আবার সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম? আবার কঠিন কঠিন পাথওয়ে? দময়ন্তীর মনে নেই। কুঁতিয়ে কুঁতিয়ে উত্তর দিল। কিন্তু ততক্ষণে যা সর্বনাশ হওয়ার, হয়ে গেছে। বিডিআর দময়ন্তীর উইক পয়েন্ট ধরে ফেলেছেন। এখন পরের সব প্রশ্ন সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম থেকে হবে।

‘লাইট রিফ্লেক্সের পাথওয়ে বলো।’ স্মিত হেসে বললেন বিডিআর।

‘এটা আমি বলি স্যার!’ বিনীত ভাবে বলল অভি। তারপর কাগজ কলম টেনে নিয়ে নিখুঁত পাথওয়ে এঁকে দেখাল। বিডিআর খুশি হয়ে বললেন, ‘গুড। ভালো উত্তর দিয়েছ। এবার তাহলে তোমাকে কঠিন প্রশ্ন করি। ডিকর্টিকেট এবং ডিসেরিব্রেট রিজিডিটি মনে আছে?’

‘আছে।’

‘বোঝাও।’

দময়ন্তী পরবর্তী আধঘণ্টা চুপ করে বসে রইল। অবাক হয়ে শুনল, সকলের অজান্তে অভি কী বিপুল পড়াশুনো করেছে। সেন্ট্রাল নার্ভাস সিস্টেম এবং অন্যান্য সিস্টেম থেকে বিডিআর ওকে পঁচিশটা প্রশ্ন করলেন। অভি সব প্রশ্নের নিখুঁত এবং টু দ্য পয়েন্ট উত্তর দিল। সাবজেক্টের ওপরে অসম্ভব দখল না থাকলে চাপের মধ্যে এত ভালো পরীক্ষা দেওয়া যায় না।

আধঘণ্টা পরেও বিডিআর–এর ভাইভা নেওয়ার ইচ্ছে ছিল। লাঞ্চের জন্য ডাকাডাকি শুরু হওয়ায় ট্যাবুলেশন শিট এপ্রনের পকেটে পুরে বললেন, ‘তোমরা এসো।’

‘আমার ভাইভা স্যার?’ কাঁদো কাঁদো গলায় বলে দময়ন্তী।

‘নিলাম তো!’ বিডিআর অবাক।

‘ওতেই হবে?’

‘হবে। পাশ করে গেছ। যাও।’ হাত নাড়েন বিডিআর। মুহুর্তের মধ্যে দময়ন্তীর শরীর ঝলমলিয়ে ওঠে। গা বমিবমি ভাব, মাথাব্যথা, পেটব্যথা, পটি পাওয়া— সব বন্ধ হয়ে যায়। তীব্র খিদে পায়। একপাল হেসে দময়ন্তী বলে, ‘থ্যাংক ইউ স্যার।’

‘সোজা হোস্টেলে চলে যাও। এখানে আর ঘুরঘুর করবে না।’ গম্ভীর গলায় বলেন বিডিআর, ‘তা হলে আবার লং কেস নেব।’

দময়ন্তী আর অভি এক দৌড়ে মেডিসিন ডিপার্টমেন্ট থেকে পালাল। বিল্ডিং-এর বাইরে এসে দময়ন্তী বলল, ‘বাপ রে! তুই হেবি ফান্ডা করেছিস তো!’

অভি এপ্রন খুলে বলল, ‘হোস্টেলে চললাম। তুই কোথায় যাবি? হোস্টেল না বাড়ি?’

‘বাড়ি যেতে হবে। কিন্তু তুই আমার কথার উত্তর দিলি না। এই রকম বিদ্যের জাহাজ কবে থেকে হলি?’

‘পরশু সার্জারি প্র্যাকটিকাল। বাজে না বকে রেস্ট নে। এক ঘণ্টা বেশি ঘুমোলে এক্সট্রা এনার্জি পাবি।’ ব্যাকপ্যাক আর এপ্রন কাঁধে ঝুলিয়ে বয়েজ হোস্টেলের দিকে চলে গেল অভি।

দময়ন্তী একঝলক ঘড়ির দিকে তাকাল। আজ ঋষিতা আর সন্তোষের বিয়ের রিসেপশান। সেটা রোম্যানো স্যান্টোসেই হবে। ঋষিতা দময়ন্তীকে নেমন্তন্ন করেছে। পরীক্ষার মধ্যে দময়ন্তী হরগিজ যেত না। কিন্তু ড্যানিয়েলের পেটের সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট আজই আসবে। ওই জন্যেই বাড়ি ফেরা। এখন টুক করে গোলমহল ঘুরে আসা যাক। বৃন্দা প্র্যাকটিকাল পরীক্ষা দিয়ে ফেরার পরে, দু’জনে একসঙ্গে ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিয়ে পড়তে বসবে। দ্রুত বাড়ির দিকে এগোয় দময়ন্তী।

রোম্যানো স্যান্টোস পৌঁছে দময়ন্তী দেখল, সে ছাড়া আর কোনও অতিথি আসেনি। রমেন অপ্রস্তুত হেসে বলল, ‘আমি ছাড়া আর কেউ নেই কিন্তু।’

‘ঠিক আছে।’ দময়ন্তী বলে, ‘মুখ দেখিয়ে গেলাম। পরে আর আসতে পারব না। আমার পরীক্ষা চলছে।’

‘তুমি কি গোলমহল যাচ্ছ? তাহলে ঋষিতার সঙ্গে দেখা হবে।’ জানায় রমেন, ‘ও অফিসেই সাজগোজ করছে। ওর এক বান্ধবী পার্লার চালায়। তাকে ডেকে নিয়েছে।’

‘তা হলে তো ভালোই হল।’ বাড়ির দিকে এগোয় দময়ন্তী।

ঋষিতার অফিসের শাটার তোলা। কাচের দরজা ভিতর থেকে ছিটকিনি দেওয়া। সন্তর্পণে ঠকঠক করল দময়ন্তী। ভিতর থেকে ঋষিতার গলায় আওয়াজ শোনা গেল, ‘কে?’

‘আমি দময়ন্তী।’

‘দাঁড়াও।’ খসখস, ঠুকঠাক আওয়াজের শেষে একটি অচেনা মেয়ে দরজা খুলে দিল। অফিসের ভিতরে ঢুকে ঋষিতাকে দেখে চমকে উঠল দময়ন্তী। তারপরে খ্যাকখ্যাক করে হাসতে লাগল। ছেলেরা যদি জানত, সুন্দর দেখানোর জন্য মেয়েরা নিজেদের ওপরে কী পরিমাণ টর্চার করে!

লাফিং বুদ্ধর মতো দু’হাত ওপরে তুলে সোফায় আধশোওয়া হয়ে রয়েছে ঋষিতা। শরীরের মাঝখানে একটা পাতলা কাপড় দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গগুলো ঢাকা রয়েছে। হাতে, বগলে এবং পায়ে লোম তোলার ক্রিম লাগানো। মুখে ফেসিয়ালের সাদা লেই। চোখের ওপরে গোল করে কাটা শসা। চুলে মেহেন্দি লাগানো। ঠোঁট না নেড়ে ঋষিতা বলল, ‘হাই দময়ন্তী।’

দময়ন্তী বলল, ‘তোমার বর যদি তোমাকে এখন এই অবস্থায় দেখত, তা হলে মোটেই বিয়ে করত না।’

পার্লারের মেয়েটা স্প্যাচুলা দিয়ে পা থেকে ক্রিম তুলছে। সে বলল, ‘ফুলশয্যার রাতে বউয়ের আন্ডারআর্মে হেয়ার দেখলে ভালো হত?’

‘বিটুইন ডেভিল অ্যান্ড ডিপ সি!’ ঘাড় নাড়ে দময়ন্তী। ‘তোমার তো চোখ খুলতে আরও কিছুক্ষণ সময় লাগবে। আমি ততক্ষণ ওপর থেকে ঘুরে আসি। হোস্টেলে ফেরার আগে দেখা করে যাব।’

‘পরীক্ষা পরশু?’ আবারও ঠোঁট না নাড়িয়ে জানতে চায় ঋষিতা।

‘তোমাকে কে বলল?’

‘তোমার মা। একটু আগে ওঁরা ফিরলেন।’

‘আমি ওপর থেকে ঘুরে আসছি। বাই।’

দোতলায় শক্তিরূপার স্টাডি অন্ধকার। দোতলার ল্যান্ডিং-এ আলো জ্বলছে না। ড্রয়িং রুম বা মাস্টার বেডরুমও অন্ধকার। অবাক হল দময়ন্তী। এইসব ব্যাপারে শক্তিরূপা খুব খুঁতখুঁতে। সন্ধে হলে সব ঘরে অন্তত একটা আলো জ্বেলে রাখেন। কী ব্যাপার কে জানে!

ড্যানিয়েলের স্টুডিও অন্ধকার। সেখান থেকে দেবব্রত বিশ্বাস অব্যর্থ ব্যারিটোনে গাইছেন,

‘তবু মনে রেখো যদি দূরে যাই চলে।

যদি পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নবপ্রেমজালে।

যদি থাকি কাছাকাছি,

দেখিতে না পাও ছায়ার মতন আছি না আছি—

তবু মনে রেখো।’

আওয়াজ না করে স্টুডিওয় ঢোকে দময়ন্তী। আরাম কেদারায় চোখ বুজে বসে রয়েছেন ড্যানিয়েল। বাইরের পোশাক এখনও খোলেননি। সাদা পাজামা এবং গেরুয়া পাঞ্জাবিতে অপূর্ব সুন্দর লাগছে। শক্তিরূপা স্টুডিও সংলগ্ন বাথরুমে। সেখান থেকে জল পড়ার শব্দ আসছে। ড্যানিয়েলের পাশে, মেঝেতে বসল দময়ন্তী। চোখ খুলে মেয়েকে দেখে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন ড্যানিয়েল। দময়ন্তী বলল, ‘আলো জ্বালাওনি?’

ড্যানিয়েল উত্তর দিলেন না।

শক্তিরূপা বাথরুম থেকে বেরিয়েছেন। দময়ন্তীকে দেখতে পাননি। ড্যানিয়েলকে বললেন, ‘আজ দময়ন্তীর মেডিসিন প্র্যাকটিকাল ছিল। পরশু সার্জারি প্র্যাকটিকাল। মেয়েটা বলেছিল পরীক্ষার পরে বাড়ি ফিরবে। বারণ করে দিই?’

ড্যানিয়েল বললেন, ‘আলো জ্বালাও।’ তারপর রিমোট টিপে গান বন্ধ করে দিলেন। শক্তিরূপা স্টুডিওর আলো জ্বালিয়ে দময়ন্তীকে দেখে বললেন, ‘ও! তুই এসে গেছিস। আমি দেখতে পাইনি।’

‘কী হয়েছে মা? তুমি কাঁদছ কেন?’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল দময়ন্তী।

কোনও ঘরে আলো জ্বলছে না। বাবা বাড়ি ফিরে পোশাক বদলাননি। মা কাঁদছেন। দময়ন্তী যাতে বাড়ি না ফেরে তার জন্য ফোন করার কথা বলছেন। একাধিক ক্লু। সবকটা ক্লু থেকে একটাই উত্তর তৈরি হয়। সেই উত্তর জানার জন্যে প্রয়োজনীয় প্রশ্নটা করল দময়ন্তী। ‘সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট কোথায়?’

‘এ নিয়ে পরে আলোচনা করব।’ কঠিন, কেজো গলায় বলেন শক্তিরূপা। ‘কফি করছি। কফি খেয়ে তুমি হোস্টেলে ফিরে যাও।’

দময়ন্তী টপ করে উঠে দাঁড়াল। টকাটক স্টুডিওর সব আলো জ্বালাল। এই ঘরে সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট নেই। স্টুডিও থেকে বেরিয়ে ড্রয়িং রুম, মাস্টার বেডরুমের আলো জ্বালালো। নেই। স্টাডির আলো জ্বালাল। এই তো! শক্তিরূপার টেবিলে সিটি স্ক্যানের প্লেটগুলো রাখা। পাশে রাখা রয়েছে রিপোর্ট। দময়ন্তী খেয়াল করল, শক্তিরূপার ল্যাপটপে সিটি স্ক্যানের ইমেজগুলো দেখা যাচ্ছে। ডায়াগনস্টিক সেন্টার দেওয়া সিডি ল্যাপটপে ঢুকিয়ে শক্তিরূপা দেখেছেন।

রিপোর্টটা পড়লেই জানা যায়, ড্যানিয়েলের কী হয়েছে। সেটা না করে দময়ন্তী ল্যাপটপের পর্দায় চোখ রাখল। ড্যানিয়েলের বুক থেকে তলপেট পর্যন্ত পেটের ভারচুয়াল সেকশান। এত ছবির মধ্যে কোন রিজিয়নে প্যাথলজি আছে খুঁজে নিতে হবে। দময়ন্তী চোখ বোলাতে থাকে।

বেশিক্ষণ লাগল না। অগ্ন্যাশয়ের মাথার কাছে বেশ বড় একটা মাংসপিণ্ড। পিণ্ডের কুৎসিত, হিংস্র চেহারা বলে দিচ্ছে, এটি ক্যানসার!

ড্যানিয়েলের অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার হয়েছে? শরীরে যত রকম ক্যানসার আছে, তার মধ্যে অন্যতম খারাপ পরিণতি এই রোগের।

‘তুই এখন এগুলো না দেখলেই পারতিস।’ দময়ন্তীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন ড্যানিয়েল। তিনি কখন স্টাডিতে চলে এসেছেন দময়ন্তী খেয়াল করেনি। মাথায় বাবার স্নেহস্পর্শ উপভোগ করতে করতে দময়ন্তীর মনে পড়ল, এক ঘণ্টা হয়ে গেছে। এবার হোস্টেলে ফেরা উচিত। পরশু সার্জারি প্র্যাকটিকাল।

এই ক্রিটিকাল সময়ে পড়াশুনোর চিন্তা? নিজের প্রতি ধিক্কার জাগানোর চেষ্টা করল দময়ন্তী। বাবার ক্যানসার হয়েছে আর সে স্বার্থপরের মতো পড়াশুনোর কথা ভাবছে? ছিঃ!

দুঃখের বিষয়, ধিক্কার পাত্তা পেল না। শক্তিরূপার স্টাডি থেকে বেরিয়ে দময়ন্তী ড্যানিয়েলকে বলল, ‘সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট ইনিশিয়াল ফাইন্ডিং। আরও ইনভেস্টিগেশন করতে হবে। এখনই ঘাবড়ানোর কিছু নেই।’

‘পেশাদার চিকিৎসকের মতো কথা বলছিস!’ মুচকি হেসে ড্যানিয়েল দময়ন্তীকে জড়িয়ে ধরেন। দময়ন্তী ড্যানিয়েলকে ক্যাজুয়ালি হাগ করে বলে, ‘আমি চললাম। পরশু সন্ধেবেলা আসব। মাকে বলে দিও।’ তারপর তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসে।

গোলমহলের একতলায় পেঁয়াজ খোসা রঙের বেনারসি পরে দাঁড়িয়ে রয়েছে ঋষিতা। মোম মসৃণ ত্বক, একঢাল চুল, মাথায় শোলার টোপর, লাল চেলি, এক গা গয়না, কপালে কনে চন্দন। দময়ন্তীকে দেখে একগাল হেসে বলল, ‘আমাকে কেমন লাগছে বলো তো?’

দময়ন্তীর মাথা কাজ করা বন্ধ করে দিল। হঠাৎ পাওয়ার ফেলিওর হলে ঝলমলে, হুল্লোড়বাজ ইডেন গার্ডেনে যেভাবে শ্মশানের নীরবতা নেমে আসে, সেভাবেই নৈঃশব্দ্য গ্রাস করল দময়ন্তীকে।

ঋষিতা আবার বলল, ‘বলো, আমায় কেমন লাগছে?’

দময়ন্তীর ভিতরে এখন একটাই অনুভূতি। ভয়! সার্জারি প্র্যাকটিকাল পরীক্ষায় ফেল করার ভয়। একটাই ইচ্ছে। এক্ষুনি পড়তে বসতে হবে। অন্য কোনও অনুভূতি হচ্ছে না।

এবার তাহলে অনুভূতির অভিনয় করতে হবে। বানানো হাসি মুখে লেপ্টে, তর্জনি আর বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ জুড়ে সে বলল, ‘অসাম লাগছে!’ মোবাইলে দু’তিনটে ছবি তুলে ঋষিতাকে দেখাল, ‘দেখো, তোমাকে কী দারুণ লাগছে।’

‘থ্যাংক ইউ!’ ছবি না দেখে দময়ন্তীকে জড়িয়ে ধরে ঋষিতা। কানে মুখ রেখে বলে, ‘আশীর্বাদ করো, যেন ভালো বউ হতে পারি।’

‘আমি কেন আশীর্বাদ করব? আমি তো ছোট।’ ঋষিতার বেড়ের মধ্যে হাঁসফাঁস করছে দময়ন্তী।

‘তোমার আশীর্বাদ আমার লাগবে। না হলে পাপস্থালন হবে না।’ দময়ন্তীর পায়ে হাত দিয়ে নমস্কার করে ঋষিতা। তার চোখে জল।

অনুভূতিহীন মুখমণ্ডলে আবার আনন্দের হাসি ফোটায় দময়ন্তী। ঋষিতার চিবুক ধরে বলে, ‘সুখী হও। খুশি হও। ভালো থাকো।’ তারপর গোলমহল থেকে এক ছুটে বেরোয়। একঘণ্টা সময় পেরিয়ে গেছে। এখন একটাই কাজ। সব কিছু ভুলে গিয়ে সার্জারি পরীক্ষার জন্য প্রিপারেশন নেওয়া।

.

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *